গল্প : বন্ধু ও বউ : হামীম কামরুল হক

আদিলের বাসায় পৌঁছে দেখে প্রচুর লোকজন। আজ ভোরের দিকে আদিল মারা গেছে। সকাল ৯টার দিকে নীরব করা ফোনটা সরবতায় আনতে গিয়েই দেখে, আদিলের নামটা ভেসে আছে। ফোন করতেই, আয়েষা বাষ্পরুদ্ধ কণ্ঠে বলে, আপনার বন্ধু তো আর নেই।

নকিব একটু চুপ করে থাকে। মুহূর্ত কয়েক। এর ভেতরে আয়েষা ডুকরে কেঁদে ওঠে।

―ভাবি অস্থির হবেন না। আমি এক্ষুনি আসছি।

নকিবের পৌঁছাতে খুব দেরি হয়নি। আয়েষা ফোন রাখার পরপরই সে বেরিয়ে পড়েছিল। যদিও বুঝতে পারছিল না―তাকে কী কী করতে হবে।

অনেক মহিলার মাঝখানে বিছানায় আয়েষা বসে আছে। দেখে মনে হলো, খুব শান্ত হয়ে আছে। শান্ত গম্ভীর মুখ। নকিব সেখানে আসতেই সঙ্গে চোখাচোখি হয়।

নকিব টেরও পায় না, কিন্তু সে চোখের ভাষায় বলে ফেলে, সব ঠিক হয়ে যাবে। আয়েষা সে ভাষাটুকু পড়েই কী চোখ নামিয়ে নিল ?

নকিব আদিলের ছেলেমেয়ে দুটোকে খোঁজে। এক মহিলা দুই ভাই-বোনকে দুই পাশে নিয়ে বসে আছে। নকিব তাদের কাছে গিয়ে দাঁড়ায়। মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়। তারপর সরে আসে।

আদিল সব সময় বলত, আয়েষার খুব বুদ্ধি। ‘আসলে মেয়েমানুষ, কিন্তু বুদ্ধি নাই।―এটা অসম্ভব। এমনটা তুমি পাবেই না। আমার এক চাচা আমার বাপকে বলেছিল, মেয়েমানুষকে কখনও জ্ঞান দিতে যাইবা না, তারা এমনিতেই জ্ঞানী।’―নিজের স্ত্রীর বুদ্ধিতে তাঁর নাকি এ কথাটা বার বার ফিরে ফিরে মনে পড়ত। আদিল বলত, ‘আমি এক বিচিত্র স্বভাবের মানুষে পরিণত হয়েছি। আমার স্বভাবে একটার সঙ্গে আরেকটার তাল মেলে না। মনে যেখানে দয়া থাকার কথা, সেখানে আমি হিংস্র। যেখানে ঈর্ষাহিংসা থাকার কথা সেখানে আমার কোনও কিছুই জাগে না। মেয়েমানুষের শরীর প্রেমহীন ভোগ করা ছাড়া আসলে আর কোনও কিছু আমার শরীরে কাজ করে না। হাঃ হাঃ হাঃ!’

এখন শান্ত আয়েষার সকালের কান্নার কথা নকিবের মনে ফিরে আসে। স্বামী মারা গেল এই কান্না কী ভালোবাসার না কি, এখন তাঁর কী হবে ? কোথায় কীভাবে থাকবে ?―এই ভাবনা থেকে উঠে আসা ? আয়েষার তো তা হওয়ার কথা নয়। আদিল তাকে বলেছে, আয়েষা ও ছেলেমেয়ের জন্য সে কী কী রেখে গেছে: ঢাকায় দুটো ফ্ল্যাট। একটা জমি পুর্বাচলে। ব্যাংকে কয়েক কোটি টাকা। সবকিছুর নমিনি আয়েষা। এক শ ভাগ।

আদিল তাকে বলেছিল, তার একটা টাকাও ঋণ নেই। সে তো যে কোনও দিন মরে যাবে। তাতে আয়েষার তেমন কোনও সমস্যা হবে না। ‘তুই তো আছিস আয়েষার জন্য। আর তোকে ও আয়েষাকে স্রেফ হিসাব মতো চলতে হবে। আর কিছুই করার চিন্তা ধীরে করলেই হবে। কারণ, বসে বসে খেলে রাজার ধনও শেষ হয়ে যায়। বুদ্ধিমতি আয়েষা নিশ্চয়ই সেটা জানে।―তোর সঙ্গে বিয়ে হলে তো আর সেটাও লাগবে না!’

আয়েষা কি আদিলকে ভালোবাসত ? বা আদিল আয়েষাকে ? আদিল কেন নিজেকে দ্রুত মেরে ফেলতে চেয়েছিল ? একদিন ঘোরের ভেতরে বলেছিল, ‘এই জীবন যন্ত্রণাময়। মরে যাওয়া ছাড়া এ জীবনের হাত থেকে মুক্তি নেই। আমি মৃত্যুকে ভয় পাই না। আমার ভয় এই জীবনকে।’

নকিব জানে, এমন কথা সাধুসন্তরাই নাকি বলে। আদিল তো কোনও সাধুসন্ত নয়। পাঁড় ব্যবসায়ী। তরিয়ে তরিয়ে জীবন উপভোগ করা মানুষ। তাহলে তার ভয় কী নিয়ে ? যতক্ষণ বেঁচে আছে, ততক্ষণ তো সে আনন্দেই থাকবে। সে বলেছে, ‘আমার একটাই নীতি: যাকে যেমন, তাকে তেমন। ব্যস। সাপের ফণার সামনে কী ধরতে হবে, আর ব্যাঙের মুখের সামনে কী ধরতে হবে। চুম্মা আমি কাউকেই খাই না। আমি কেবল আমার কাজ উদ্ধার করি। ভালোবাসা প্রেম―মাইফুট। কিন্তু আমার মনে হচ্ছে, আমার আয়েষার জন্য একটা ভালোবাসার ব্যবস্থা করা দরকার। তাকে আমি আর ঠকাতে পারি না। তুই-ই সেটা পারবি দিতে। আই অ্যাম ড্যাম শিওর দোস্ত।’

ভালোবাসা কী ? সে তো নিজের জীবনের দেখেনি। সে প্রায় প্রেমহীন কামহীন মানুষ। তার মন কখনও এদিকে যায়নি। একেবারেই যে যায়নি, তা নয়, কিন্তু ঠিক গুয়ে পাড়া দেওয়ার আগে যদি কেউ গন্ধটা টের পায় এবং পাওয়া মাত্র পা তুলে নেয়, নকিবের তাই হয়েছে। মাঝে মাঝে ঘুম থেকে উঠে দেখেছে লুঙ্গি আঠা আঠা হয়ে গেছে। ঊরুতে বীর্য শুকিয়ে তার সঙ্গে লুঙ্গি সেঁটে গেছে, টান দিতে গেলে পট পট আওয়াজ হচ্ছে, দুয়েকটা লোমও উঠে এসেছে। সে এক বিশ্রী দশা। এগুলো সম্পর্কে সে একেবারে কিছু জানে না, তা তো নয়। নারী-পুরুষে বিয়ে ছাড়াও যে শরীরী বিনিময় হয়, তা তো তার অজানা নয়। তাদের ব্যাচের প্রথমবর্ষে পরীক্ষা প্রায় শেষ হয়ে গেলে, তারা নীলছবি দেখার আয়োজন করে। কেউ বলত বিশ্বকাপ। কেউ বলত আজকে আদমফাইট দেখানো হবে। সেদিন রাতে আদিল যখন কমনরুমে তাকে নিয়ে গিয়েছিল। ঢোকার মুখে ভারী পর্দা দেওয়া। সেই পর্দা সরিয়ে নকিবকে যখন ভেতরে নিয়ে গেল। টিভিতে উদ্দাম সঙ্গম দৃশ্য। সামনে টিভির আলোয় নীলাভ শ’খানেক মাথা। দুয়েকজনের কিছু রসাল মন্তব্য ভেসে আসে। একটা মন্তব্যের ভেতরে আরেকটা মন্তব্য ঢুকে পড়ে। হি হি করে চাপা হাসি শোনা যায়।

নকিব দেখে বলল, এরা কি স্বামী-স্ত্রী ?

আদিল পরে নকিবের এই গল্পটা সবাই রসিয়ে বলত।

শালা তো বেওয়াচ দেখার সময় ঘুমিয়ে পড়ে।―এই ছিল নকিব। পরে নকিব নিজেই এ নিয়ে মনে মনে হেসেছে।

বয়স এখন প্রায় ৩২। আদিলটা দুম করে মরে গেল। আদিল বিয়ে করেছিল বিশ্ববিদ্যালয় পাস করেই। বিয়ের প্রথম তিন বছরে দুটো বাচ্চা। প্রথমজন মেয়ে, দ্বিতীয়টি ছেলে। সুখের সংসার বলতে যা বোঝায়। শিক্ষিত মেয়েদের হবু স্ত্রী হিসেবে আদিল বাতিল করে দিত। বলত, ‘শিক্ষিত মেয়েদের নিয়ে সংসার করা যায় না। তাদের সঙ্গে প্রেম করতে পার, সেক্স করতে পার, কিন্তু সংসার নয়। সংসারের জন্য লাগবে স্বল্প শিক্ষিত কিন্তু সতেজ সজীব বুদ্ধিমতি স্থির মাথার মেয়ে। যার বাড়তি কোনও চাপ নেই। প্রয়োজনের বেশি শিক্ষা মানুষকে নষ্ট করে দেয়।’

নকিব কিছু বলত না, কিন্তু চকিতে তার মনে না হয়ে পারেনি যে, আদিলের সঙ্গে মোল্লাদের তো তেমন তফাৎ নেই তাহলে। তাহলে নিজে সে পড়ল কেন ?

আয়েষাকে বিয়ে করার কারণ সে বুদ্ধিমতি, আদিল বলত, ‘আয়েষা বুদ্ধিমতি ও সেক্সি। মেয়েদের এই দুটোই হতে হয়। বাড়তি লেখাপড়া দিয়ে মেয়েরা কেন, কারও কোনও লাভ নেই। আর যেটুকু না হলে চলে তার বাইরে লেখাপড়ার কোনও মানে নেই। লেখাপড়া করবে কেবল শিক্ষকতা আর গবেষণা করে যারা, এ ছাড়া পড়ালেখা স্রেফ ইউজলেস।’

আয়েষার বয়স কম। মাত্র বাইশ বছর বয়স। দুই ছেলেমেয়ের মা। নকিব বত্রিশ। ফলে সে মরে গেলে আয়েষার সঙ্গে জমিয়ে প্রেম করতে বা সেক্স করতে পারে।―এটা আদিল তাকে সরাসরি সহজভাবে বলেছিল, ‘আমি মরে গেলে তুই কিন্তু আয়েষাকে বিয়ে করবি। আয়েষা কিন্তু রাজি আছে। মজা করছি না। সিরিয়াসলি বলছি। আয়েষা যদিও উড়িয়ে দিয়েছে। আলাই বালাই শাট বলেছে। কিন্তু ওর চোখে কিন্তু রঙ খেলতে দেখেছিলাম। দেখে সত্যি ঈর্ষা হয়নি। আয়েষাকে আমি আমার হাত থেকে মুক্তি দিতে চাই। ও নিজে এটা ভালো মেয়ে। ভালো লোকের সঙ্গেই ওর থাকা উচিত। আমার মতো বাজে লোকের সঙ্গে নয়।’

আদিল বলত, ‘আয়েষাকে সেক্স ছাড়া রাখা যাবে না। একটা ক্ষুধার্ত বাঘিনী বুঝলি।―আদর দিলে পুরো শান্ত, কিন্তু কদিন না পেলেই অস্থির হয়ে ওঠে।’―এই সব এত সোজাসাপ্টা বলতে পারত আদিল। এসব শুনে তার নিজের কি কোনও বাড়তি পুলক জাগত ? কে জানে ? নইলে এসব বাদ দিয়ে আদিল কোনও আলাপে কিছু বলত না, ‘আমি মরে গেলে তুই আয়েষাকে বিয়ে করবি!’―এটা আগে মধ্যে বা শেষে কোনও জায়গা একবার না একবার তুলে এর সঙ্গে আরও কথাজুড়ে দেবেই দেবে প্রতিবারই।

তার সঙ্গে প্রথমবার দেখা হলে যখন ফোন নম্বর নিয়েছিল নকিবের কখনও মনে হয়নি, আদিল তাকে এভাবে প্রতিদিন ফোন করবে, বাসায় নিয়ে যাবে। বৌয়ের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেবে। মাঝে মাঝে তাদের সবার সঙ্গে এক টেবিলে খাবে। নকিবের আয়েষাকে নিয়ে তেমন কোনও অস্বস্তি হতো না। দোহারা গড়নের লম্বা। স্বাস্থ্যবতী। একবার কেবল খেয়াল করেছে যে আয়েষার কোমরের ওপরে নিচে শরীর আশ্চর্য রকমের ভারী। অথচ কোমর একদম সরু। মেদহীন পেট।

আদিল নিজেই স্ত্রীর বর্ণনা দিত। আয়েষার শরীরটা আশ্চর্যরকমের সুন্দর। কোথাও কোনও শিথিলতা নামেনি। তোর সঙ্গে বিয়ে হলেই বুঝতে পারবি তোকে কী দিয়ে গেলাম। আল্লাহর কাছে শুকরিয়া করি প্রতিবার সেক্স করেই। প্রথম প্রথম শুনে নকিব লাল হয়ে যেত। পরে বিরক্ত না হলেও তো শুনত। শুনতে শুনতে তার কি কোনও আনন্দ হতো ? অরোক্ষ পুলক জাগত ?

….

প্রথমবার আদিলের অফিসে যায় কোনও এক বৃহস্পতিবার। পরের দিন ছুটি। এ জন্যই আদিলও তাকে বৃহস্পতিবার আসতে বলেছিল। অফিসের অভ্যর্থনাকক্ষে বেশ চোখে পড়ার মতো সুন্দর একটি মেয়ে। কথাবার্তায় তত চাল্লু মনে হলো না। আদিল তাকে নিজেই বলে, মালটাকে দেখেছিস ? সুন্দর না ? নিজেকে সব সময় সুন্দর দিয়ে ঘিরে রাখবি। হয় সুন্দর বাড়ি, নয় সুন্দর নারী। নয় সুন্দর সুন্দর সব জিনিসপত্র। কী বলিস, ভালো বলিনি। হা হা হা। বলেই ঘর ফাটিয়ে হাসি।

কী খাবি ?

কিছু না।

সন্ধ্যার পর এমনি বাসায় কাজ কী ?

কোনও কাজ নেই।

কিছু তো করিস।

এই টিভি দেখি। খবরের কাগজ পড়ি।

আর ?

আর কী করব ?

প্রেম করিস ?

না।

সেক্স ?

দুরো।

দুরো কেন ? শালা, তোমার ওটা নাই ?

না।

তাহলে চলে কী করে ?

জগতে সবার কি একই রকম করে সব চলে ?

বাহ! এটা ভালো বলেছিস। তা তোর কীভাবে চলে ?

আমি তো সারা দিন ব্যস্ত থাকি। অফিসে মন দিয়ে কাজ করি। ভোরে উঠেই গোসল করি, তারপর নাস্তা খেয়ে অফিসের গাড়ি ধরি। সারা দিন অফিসে। সন্ধ্যায় বা রাতে যখনই ফিরি, ফিরেই গোসল করি।

শালা তোমার শুক্র-শনিবার নেই ?

আছে। ওই দুটো দিন ঘুমাই।

একা, না কাউকে নিয়ে ?

একাই।

কারণ, তুই তো বললি যে, সবার সব রকমে চলে না। তোর কী রকমে চলে ?

এসব কথা বাদ দেওয়া যায় না ?

আহারে আমার সোনার চান পিতলা ঘুঘু। আদিল বাচ্চাদের আদর করে তু তু লে লে করার মতো করে ওঠে। ওলে বাবালে!

নকিব আদিলের কাণ্ড দেখে একটু হাসে। আদিল বরাবরই এমন। একেবারেই সে যা তার উলটা। কিন্তু কেন তার আদিলকে অপছন্দ হয়নি ? তাকে এড়িয়ে চলেনি কোনও দিন ? আদিল ভার্সিটিতে পড়ার সময় চাওয়া মাত্র ওকে টাকা ধার দিয়েছে ? এ জন্য ? কখনও নিজে যেচে টাকা ফেরত চায়নি।

এত দিন পর যখন যেটুকু তার সঙ্গ সে নিয়েছে, যথেষ্ট সময় তার সঙ্গে থেকে, তাকে ছেড়ে দিয়েছে। তবে আদিল সব সময় তাকে জিজ্ঞাসা করে নিয়েছে, তোর হাতে কাজ কী ?

সে যদি বলে কাজ আছে, তাহলে আবার চলে গিয়েছে। জোর করেনি।

আদিল বলে, ‘একজন মানুষের কাজের সময় ইচ্ছা করে নষ্ট করাই হলো তাকে সর্বোচ্চ অসম্মান করা। তুই বন্ধু হতে পারিস, কিন্তু বন্ধু হোক প্রেমিকা হোক, সবার কাজের প্রতি প্রত্যেকের সম্মান থাকতে হবে। সম্মানহীনতা একটা মানুষেরই শুধু নয়, সব কিছুই পতনের মূল।’

নকিব আগে বলত, ‘তোমার কাছে তো এমন মূল কত যে আছে। এটা পতনের মূল, ওটা পতনের মূল কারণ।’

কথাটা মাঝে মাঝে মনে পড়ে যায়, সময় নষ্ট করার কেবল অন্যকে অসম্মান করা নয়, নিজের কাজের সময় নষ্ট করা নিজেকেই অসম্মান করা। বিশ্ববিদ্যালয়ে জীবন হঠাৎ কী কী আলাপে আদিল জিজ্ঞাসা করে, তুই আসলে কী হতে চাস ?

একটা কাজ করব। যত দিন আয়ু থাকবে বাঁচব।

তোমার জীবনের দর্শন কী ?

বাঁচা। ভালোভাবে সৎভাবে, ভালো মন নিয়ে, ভালো ব্যবহার করে বাঁচা।

আর কিছু না ?

না।

কিছু হতে চাস না ?

কী হব ?

এই ধর, লোকে হয় না …

দেখ লোকে হওয়ার ভেতরে ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার, প্রফেসর, কেউ খেলোয়াড়, কেউ শিল্পী-সাহিত্যিক, বিজ্ঞানী হয়। আমার রাষ্ট্রবিজ্ঞানী হওয়ার একটা সুযোগ আছে। কিন্তু সেটা নিতে পারব কি না, জানি না। আমি ছোট মানুষ। অভাবের সংসার। সেটাকে বাঁচাতে হবে। বোনের বিয়ে দিতে হবে। মায়ের থাকার একটা ভালো ব্যবস্থা করতে হবে।―এই আর কী ?

বিয়ে করবি না ?

জানি না।

ওমা! ভালো থাকতে চাইছিস, কিন্তু বিয়ে করবি না।

বিয়ে করলে মানুষ ভালো থাকে ? জানি না তো!

তা ঠিকই বলেছিস―বিয়ে করে বহু লোকের জীবনের বারোটা বেজে গেছে। আচ্ছা, তোকে নিজের কাছে কেমন মনে হয়, বোকা না বুদ্ধিমান ?

বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে এসেছি, কিছু বুদ্ধি তো আছে নিশ্চয়ই। তবে আমি চালাক নই। বোকা কি না, তাও জানি না।

তোর নিজেকে নিয়ে আস্থা কতটা ?

আত্মবিশ্বাস ?

হু।

আছে। নইল বাঁচতে পারতাম নাকি।

প্রতিটি বেঁচে থাকা মানুষই কি আত্মবিশ্বাসী ?

তা হয়ত না। কিন্তু আমার তো মনে হয়, জগতে একমাত্র আত্মবিশ্বাসীরাই বেঁচে থাকে।

একদিন নুরুর দোকানে চা খেতে খেতে রাতের বেলা এসব জিজ্ঞাসা করে উত্তর দিয়েছি। সেদিন আদিল দেখেছিল, নকিব একদম আরেক রকমের মানুষ হয়ে যেতে পারে। এটা তার কাছে আশ্চর্য লেগেছিল। শেষে বলেছিল, অনেক প্রশ্ন করলি। দুমদাম প্রশ্ন আর উত্তর যাকে বলে।

 শেষে নকিব জানতে চায়, তোমার নিজের কাছে এসব প্রশ্নের উত্তর আছে তো ?

―না নেই।

আমার কাছে এত জানতে চাইলি যে ?

দেখলাম তোকে একটু টোকা দিলাম আর কী! নিজেরটা নিজে বের করব।

সেটা কী দুম করে হয়ে যাবে ?

তা হবে না। তুই কিন্তু ভালো জবাব দিয়েছিস। আগে পেপারওয়ার্ক করেছিলি কখনও ?

না।

বাংলার কায়সার বলে, লিখে লিখেই নাকি সবচেয়ে ভালো জানা যায়। মাথায় কিছু থাকবে। কিন্তু কাজের জন্য খাতায় দাগাতেই হবে। কখন কবে কী করবি, কতদূর কোথায় যাবি―খাতায় ও মাথায় দুই জায়গায় থাকতে হবে।

মন্দ বলেনি।

….

আদিলের মনে হতো নকিব ছেলে ভালো। তার সঙ্গে সারা জীবন যোগাযোগ রাখা যায়। ঠাণ্ডা মাথার মানুষ। ধীরে, কিন্তু অবিরাম চলার মানুষ। এমন মানুষ জীবনে কখনও কখনও ভালো কাজে দিতে পারে। তা ছাড়া, কোনও কিছুর দায়িত্ব দিলে ঠিকঠাক পালন করতে পারে। বন্ধু মানে ভালো মানুষের বন্ধুত্ব। দুষ্টু মানুুষের বন্ধুত্ব মানে যেচে সম্ভাব্য শত্রু আগে তৈরি করে রাখা। ভাবত, ভালো মানুষ হওয়া কতটা কঠিন জানি না, পাওয়া কঠিন। সে নিজে ভালো মানুষ নয়, কিন্তু ভালো মানুষের সে পছন্দ করে।

আয়েষার সঙ্গে প্রথম পরিচয়ে আদিল বলেছিল, ‘আমার বন্ধু নকিবুদ্দিন আহমেদ। একজন ভালো মানুষ। সৎ পরিশ্রমী সরকারি কর্মকর্তা। উচ্চপদস্থ সময়মতো হয়ে যাবে। দোষ একটাই―কথা কম বলে। অবশ্য এটাও গুণ। কান দুটো, চোখ দুটো, মুখ একটা! কথা বলো কম, কিন্তু দেখ দ্বিগুণ, শোনো দ্বিগুণ।―তাই না দোস্ত ? আমি মূর্খ হলেও এটুকু জানি। মানি না যদিও।’―হো হো করে হেসে ওঠে আদিল।

আয়েষা অল্প হেসে, সালাম দিয়েছিল। মাথায় কাপড় দেওয়া ছিল। লাবণ্যময় সুন্দর মুখ।

বৌ কেমন দেখলি আমার।

ভালো তো।

কত ভালো ?

দুরো।

আরে এমন মেয়ে নাই জানিস। দারুণ বৌ।

তাহলে তো ভালো। তোর অনেক ভালো হলো।

আমার জন্যই শুধু ভালো না; তোর জন্যও ভালো।

মানে ?

মানে অন্য দিন। আজ না।

….

মরা বাড়িতে খুব অস্বস্তি হচ্ছিল। কিছু লোককে দেখছিল ব্যস্ত। আদিলের ডেথ সার্টিফিকেট, কবরের জায়গা, আজিমপুরে না বসিলা যেতে যে নতুন কবরস্থান হয়েছে, কোনখানে নেবে।―এসব আলাপের ভেতরে নকিব যেতে পারছিল না। আদিল যে সে বন্ধু সেটা আয়েষা ছাড়া আর কেউ তো জানে না। সে একটা বাইরের লোকের মতোই নিজেকে মনে করছিল।

একবার ভাবল আয়েষার কাছে যাবে। কিন্তু গিয়ে তারপর ? ঠিক তখন তার ফোনটা বেজে ওঠে। আবার দেখে আদিলের নাম।

নকিব বুঝতে পারে কোনও একটা বন্ধ জায়গা থেকে ফোন করছে আয়েষা। বাথরুমে ঢুকেই হতে পারে।

―আপনি কি চলে গেছেন ?

―না। আছি।

থাইকেন। সবাই চলে গেলে আপনার সঙ্গে আমার কিছু কথা আছে। সামনাসামনি বলতে হবে।

―আচ্ছা।

 সেদিন রাতে নকিবের হাতে সব নানান কাগজপত্র, দলিলপত্রে ভরা একটা ব্যাগ তুলে দিয়েছিল আয়েষা। শুধু বলেছিল, আপাতত এগুলো আপনার কাছে থাকুক। পরে আমি সময়মতো নেব।

…..

―নিজেকে আমার খুব ভাগ্যবতী মনে হয়। জানো।

―কীরকম ?

―এই যে না চাইতেই তোমার মতো একটা লোক পেয়ে গেলাম। আমার জীবনটা এবার সত্যিই ভরে উঠল।

নকিব বলতে পারে না সেই বা কম ভাগ্যবান নাকি। আয়েষা সত্যিই দারুণ! আর সঙ্গে আদিলের রেখে যাওয়া বিপুল না হলেও যতটুকু দরকার, এই সম্পত্তির জন্য, তাকে আয়েষা বা তার পুত্রকন্যাকে নিয়ে বাড়তি কোনও চাপেই পড়তে হবে না।

চট করে তার মনে হয়, আয়েষাকে সে বিয়ে করেছে কী হিসাব করেই ? ভালোবাসা পছন্দ টান থেকে নয় ? তা কেন হবে ? তাহলে তো আরও সময় নিতে পারত। আদিল তার মাথায় দিনের পর দিন এমনভাবে আয়েষার ছবিটা বসিয়ে গেছে যে সে ছবিটা আর কোনওমতেই সরানো যায়নি। আর ছবিটা বড় সত্য ছিল। আর সেজন্যই এর টান ছিল অমোঘ।

নকিবের মনে হয়, খেলাটা আদিলই তাহলে খেলে দিয়ে গেছে তার জীবনে। অদ্ভুত সে আগে বিন্দুমাত্র টেরও পায়নি।

বার বারই মনে হয়েছে, আদিল যেভাবে মরে গেল, এটা তো একধরনের আত্মহত্যাও।

সচিত্রকরণ : ধ্রুব এষ

Leave a Reply

Your email address will not be published.

shares