গল্প : রুপালি দিন : মঈন শেখ

ক্যানগে, রূপালিকে দেখাছ ?

কই এদিকে আসেনিত।

দ্যাখোদিনি, হারামি গ্যালো কুনঠে ? গামি যে হয়রান হইয়া গেনু, গোটা পাড়া ঢুঁড়নুগে।

কেন কিছু হয়াছে নাকি ? ফুলবাবুর কিছু হয়াছে ?

নাগে, তার কিছু হয়নিখো। রুপালিক মেডিকেলে ভর্তি করাব, কিন্তু মাগি ঢুকলা কুন খাদে। তার জ¦ালাত বিষ খাব না গলাত দড়ি দিবোগে ?

মেয়েকে খুঁজে হয়রান কাকলি। যাকে সামনে পায় তাকেই ধরে ধরে বলে, তার রুপালিকে দেখেছে কি না, কিন্তু মিলে না।

১৬ ডিসেম্বর। স্বাধীনতার ৪০ বছরপূর্তি আজ। উৎসবের পরিবেশ সবখানে। ছুটির দিন হলেও সকল অফিসে উড়ছে জাতীয় পতাকা। সাজান হয়েছে সকল চত্বর। কয়েক হাজার কয়েদিকে মুক্তি দেওয়া হয়েছে এই উপলক্ষে। জেলখানা, শিশুসদন, হাসপাতাল প্রভৃতিতে দেওয়া হবে বিশেষ ভালো খাবার।

উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের পাশেই রুপালিদের বাড়ি। বরিনভূমির এই উপজেলা এখনও অন্যদের তুলনায় অনেকটা পিছিয়ে। ৩১ শয্যার হাসপাতাল হলেও পঞ্চাশের অধিক রোগী থাকে সব সময়। অবশ্য শীতে কিছুটা কম থাকে। এর মধ্যে কিছু অরোগীও থাকে। তাদেরকে চিররোগীও বলা যেতে পারে। এরা অধিকাংশই অ্যজমা রোগী। ভিক্ষুক। শীত এলে শ্বাসকষ্ট বাড়ে। ভিক্ষা করতে যেতে পারে না বাইরে। ফলে বাড়ির কাছের হাসপাতালে ভর্তি হয়ে থাকে দু’দশদিন। বসে বসে একদিন খেতে পাওয়া কম কথা নয়। এক্ষেত্রে হাসপাতাল পাড়ায় নিজেকে নেতা ভাবা কিছু লোক তার নেতৃত্ব ফলায় হাসপাতালে এসে তাদের ভর্তির ব্যাপারে। ডাক্তাররাও এখন বুঝে গেছে, ভর্তি নিতে হবে। এখন এলেই নেয়। একই কারণে রুপালিকে খুঁজে মরে তার মা। রুপালি অবশ্য অ্যাজমা রোগী নয়। কোরবানি ঈদ ছাড়া খাসির মাংস তাদের মুখে জোটে না। সকালে জেনেছে, হাসপাতালে আজ খাসির মাংস হবে। থাকবে মিহি চালের ভাত। প্রতিদিনের মতো মোটা, তামড়ি বা আশপাশের মসজিদের তোলা মুষ্টির চাল থাকবে না। অন্যদিন বেশি রোগী হলে ডায়েট কন্ট্রাক্টরের মন খুশি হলেও, বিশেষ দিনে বেজার হয়। খাসিমারা দিনে অল্প হলেই ভালো।

আজ সকাল সকাল ভর্তি না হলে পরে হওয়া না হওয়া সমান কথা। ঠুনকো অছিলায় বলবে, আগেই গণনা হয়ে গেছে। দুপুরে খাবার হবে না। রাত থেকে পাবেন। অর্থাৎ যেই লাউ সেই কদু। এই শঙ্কা রুপালির মায়েরও মনে। যে যে বাড়িতে রুপালি ঠিকে কাজ করে, তার প্রতিটিতেই খোঁজা শেষ।

রুপালি কালো। কালো; তবে গড়নেও খামতি আছে। বুদ্ধিতেও খাটো। হাসলে সেই হাসিটাকেও মানুষের হাসি বলে মনে হয় না। কেমন অন্য অন্য ঠেকে। তারপরেও বাপ-মা নাম দিল রুপালি। রহিম, রফাত বা রাব্বানির মেয়ে বলে যে রুপালি; তাও নয়। বাপের নাম হামিদ, মায়ের নাম কাকলি। তারপরও নাম হলো রুপালি। দেখে না হোক, অন্তত ডেকে শান্তি আসবে মনে। রুপালির বিয়েও হয়েছিল পাশের গ্রামে। হানিফের সঙ্গে। মানুষ ডাকে হানপ্যা বলে। আবার কেউ বলে হানপ্যা পাগলা। হানিফ অনেকটা পাগলও বটে। দুই গ্রামের মানুষ মিলে বেশ ধুমধাম করেই বিয়ে দিয়েছিল। কেউ দিল পুকুরের বড় মাছ কেউ দিল আলু। আলু আর মাছে প্রায় সমান। হলো আলু-ঘন্ট। চালও উঠল একইভাবে। বিয়ে হলো হানিফ আর রুপালির। যতটা খুশি তারা, তার অধিক খুশি দুই গ্রামের মানুষ। দুই পাগলের পাগলামি দেখবে বলে। কিছুদিন পাগলামিও দেখল মানুষ। তবে ছয় মাসের বেশি টিকল না বিয়ে। বিয়ে না বলে সংসারও বলা চলে। এক রাতে পালিয়ে এল রুপালি। হানপ্যা পাগল নাকি মাঝে মাঝে হানপ্যা দানব হয়ে ওঠে। সে রাতেও হয়েছিল। কোনও রকমে পালিয়ে এসেছে রুপালি। আর যায়নি। তবে একা আসেনি। সন্তান এনেছিল পেটে করে। সবাই স্রষ্টাকে বলেছিল, রুপালির যেন বেটা হয়। এবে যদি পাগলীর দুঃখ যায়। স্রষ্টা শুনেছিল মানুষের কথা। ছেলে জন্ম দিল রুপালি। তাতে কি। রুপালি যে সুখ চেয়ে আসেনি স্রষ্টার কাছ থেকে। সুখ তার ঝুলিতে উঠবে না। তার ছেলে হলো প্রতিবন্ধী। শারীরিক প্রতিবন্ধী। এতে গ্রামসুদ্ধ বেজার হল। অখুশি হলো স্রষ্টার প্রতি। যদি গ্রামবাসীর মানববন্ধন বা মিছিল করা যেত স্রষ্টার বিরুদ্ধে; তবে সেটাও বোধহয় করত তারা। সবাই অখুশি হলেও রুপালি কিন্তু মোটেও বেজার নয়। সে তার ছেলের নাম দিল ফুলবাবু। বড় যত্নে বড় হতে লাগল ফুলবাবু। ফুলবাবু এখন ১২ তে। হুইল চেয়ারে থাকে। বেশ ফুলবাবু হয়েই থাকে।

ডিসেম্বর হলেও আজ বেশ ঝরঝরে সকাল। সূর্য তখনও শিব নদের পুবধারে। উত্তর থেকে দক্ষিণ বাহিনী এই নদ এখন বেশ শীর্ণ। নদের পাশ দিয়ে বিলকুমারী বিল। বিলের শাপলা-শালুক আর মাছের বেশ সুনাম আছে। এই নদ বা বিলের পশ্চিম ধার ঘেঁষে হাসপাতাল। হাসপাতাল পাড়ার অনেক ছেলে-মেয়ে সূর্য ওঠার আগেই বিলে নেমে পড়ে। কেউ শালুক, কেউ শামুক তোলে। আবার কেউ মাছ ধরে। তারা এখন ঘরে ফিরছে। কাকলি হতাশ হয়ে আপন মনে রুপালির সাত গুষ্টি উদ্ধার করতে করতে বাড়ি ফিরছিল। এমন সময় চোখে পড়ল বিল হতে বাড়ি ফেরা ছেলে-মেয়েদের। হঠাৎ কি মনে হয়ে তাদেরকে জিজ্ঞাসা করবার জন্য মুখ তুলল―তারা রুপালিকে দেখেছে কি না ? মুখ তুললেও জিজ্ঞাসা করতে হলো না। খানিক দূরেই রুপালিকে দেখতে পেল। সেও কোঁছাতে করে কি যেন আনছে। মা ভাবল শামুক। রুপালির মুখের চনমনে ভাব এখন হঠাৎ ফ্যাকাসে। কাকলি চিল্লিয়ে উঠল―‘এই মাগির বেটি মাগি, তুই কতটা হাঁস পাইড়্যাছিস যে শামুল তুলতে গেল্ছিলি ? হামি সারা পাড়া ঢুঁইড়্যা মরছি আর মাগি বিলে মরতে গেল্ছিল।’ রুপালি তখন মূর্তি। তবুও সে মাথা নিচু করে মাকে বলল―‘শামুল লয়খো, শালুক। ফুলবাবু খাবে।’ রুপালি দাঁড়ায় না। দ্রুত বাড়ির দিকে পা বাড়ায়। মাও পিছু পিছু হাঁটে আর চিল্লায়―‘চল মাগী, তুক শামুলই গিলামু।’

কাদা মাখা জামাটাই শুধু বদলিয়েছে। গা পা যে খুব ভালো করে ধুয়েছে, তাও নয়। কানের ফোকরে তখনও কাদা ঘাপটি মেরে আছে। সেন্ডেল পরার সুযোগ দেয়নি। সেন্ডেল জোড়া তখন রুপালির হাতে। অন্যহাত মা ধরে টানতে টানতে নিয়ে চলে হাসপাতালের দিকে। যেন আবাদ খাওয়া গরুকে  নিয়ে যাচ্ছে খোয়াড়ে পুরতে।

জরুরি বিভাগের গেটের কাছে যেতেই থমকে গেল কাকলি। এই সুযোগে রুপালি পায়ে সেন্ডেলজোড়া ঢুকিয়ে নিল। রোগী ভর্তি নিয়ে ভেতরে ঝগড়া চলছে। রোগী দুজন পাশের পাড়ার। ভিক্ষুক। অ্যাজমা রোগী। রোদের তাপ বাড়াতে দুদিন হলো ভিনগ্রামে গিয়েছিল। দিনটার কথা খেয়াল ছিল না। সকালে মনে হওয়াতে তালকানা হয়ে ছুটে এসেছে। রোদ ওঠাতে হাঁপানির টানে খানতি পড়লেও আজ সকালে ছুটে আসাতে ঠাণ্ডা বাতাসের ধাক্কায় আবার জোর পেয়েছে। কথা বলতে কষ্ট হলেও সেটা নিয়েই ঝগড়া করছে ডিউটিরত ডাক্তারের সঙ্গে। ডাক্তার যতটা কথা বলছে তার অধিক কথা বলছে ডায়েট কন্ট্রাকটর। ভর্তি রোগী এমনিতেই চল্লিশ পার হয়ে গেছে। ব্যবসা লাটে উঠবে। আজ খাওয়াতে গিয়ে যে ঘাটতি পড়বে, তা তুলতে অন্যদিন মুষ্টির বারমিশালী চালেও কুলাবে না। লোম ওঠা খেঁকির মতো খেঁকিয়ে উঠল কন্ট্রাক্টর―‘আগে হুঁশ ছিল না। খাসির গুশতো খাবার জন্য লালা পড়লে গতকালই ভর্তি হোতু।’

‘তাই তো ছিনুরে ভাই। একন্যা রোদ উঠাতে বাইরে গেছুনু। পকেটে পয়সা ছিল না একেবারে। আজক্যা ভর্তি লে, আল্লা ভালো করবে।’ ছদু ফকিরের কথাতে পাশে দাঁড়ান সমুও সায় দিল। তবে তাদের কথা যেন কন্ট্রাক্টর দিপেনের কানে গেল না। সে আরও রেগে বলল―‘ও সমুন্দিরা, তুরা দুইদিকেই তাল রাখিস। গাছের খাবি আবার মাটিরও কুড়াবি। এই শালা, হাসপাতালে ভর্তি থাকবি আর ইয়ে ভরে খাবি, ট্যাকা কী হোবে ?’

‘ভাত না হয় দিবু কিন্তু বিড়ি সিগারেট কি তুর নাঙ্গে দিবে ?’ ছদুও এবার লাফ দিয়ে উঠল।

‘শালা ফকিন্নির বাচ্চার আবার জমিদারি ভাব।’ মুখ বাঁকিয়ে মাড়ি পিষে কথাটা বলল দিপেন। তবে এরসঙ্গে একদলা থুতু ফেলাতে মুখটা আরও বিকৃত দেখাল।

‘এই দিপেন, তুই আবার কুন লাটের বেটা হে ? বাপ তো ছিল গরুর দালাল। হুরমতের বকরি চুরি করে জুতার মালাও লিয়াছিল। মেডিকলের কন্টেক্টারি পাইয়া ভারি চর্বি জম্যাছে।’ দিপেনের মুখে কোনও কথা এল না। জুতসই কিছু খুঁজেও পায় না বলবার জন্য। সমু যে এভাবে হাটে হাঁড়ি ভাঙবে সে বুঝতে পারেনি। তবু ভেতরের রাগগুলো সব জড় করে খেঁকিয়ে উঠল।―‘সমুন্দির ঠ্যাং ভাইঙ্গা দিমু। হট এখান থেকে। আর কোনও দিন মেডিকলের সীমানার মধ্যে ঢুকবি না।’

দিপেনের কথা কেড়ে নিল ছদু।―‘হুঁরে চাঁড়াল, তুর বাপের মেডিকল। থাম, এখন ইওনো ছারের কাছ যাইছি। তুর চর্বি যুদি না গালিছি তয় আমার নাম ছদুই লয়।’ দম তোলাফেলা করতে এখন বেশ কষ্ট হচ্ছে ছদুর। শরীর কাঁপছে। এতক্ষণ সবাই উপভোগ করছিল তাদের কাণ্ড। এরই মধ্যে অনেকেই জুটেছে সেখানে। দু-চারজন রোগীও এসেছে তাদের বেড থেকে নেমে। রুপালি আর তার মা একটু এগিয়ে এলেও খানিক দূরে থেকেই গিলছে পুরো ঘটনা। ডাক্তারও উপভোগ করছিল। তবে ইউএনও স্যারের কথা শুনে লাফ দিয়ে উঠল।―‘আরে দিপেন বাবু থামেন থামেন। করছেন কি। তাদেরকে বরং ভর্তি নিয়ে নিই। স্যারের কাছে গেলে ঝামেলা বাড়বে।’

‘থামেন তো স্যার, ও শালাদের দৌড় আমার জানা আছে। এদিক ওদিক ঘুরে ঠিকই ফিরে আসবে।’

ছদু ও সমু ততক্ষণে ঘর থেকে বেরিয়ে গেছে। কে যে কাকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে বোঝা যায় না। তবে দুজন দুজনার হাত ধরে টানাটানি করে বাহির রাস্তার দিকে হাঁটছে। তাদের হাঁপানির টান এখন বেশ বোঝা যায়। বুকের শব্দও শোনা যায় দূর থেকে। কাকলি রুপালির হাত ধরে টানতে টানতে যায় ছদু ও সমুর পিছু পিছু। কাকলিও যেতে চায় ইউএনওর কাছে। দল ভারী করতে চায়। তবে কাকলি অবাক হলো হাসপাতালের বাহির গেটের কাছে এসে। সমু আর ছদু বসে পড়ল আমগাছের মরা এক গুঁড়ির ওপর। বিড়িতে আগুন দিয়ে টানতে লাগল দুজনেই। হাপানির কাশিতে দম আটকে যায় ছদু ফকিরের। সমুও কাশতে লাগল ছদুকে হারানোর ঢঙে। থামে না কারও কাশি। দুজন দুজনকে পাল্লা দেয়। কাশির তোড়ে পানি ঝরে দুচোখ দিয়ে। যারা আগের ঘটনা জানে, তারা এই পানি ঝরার কারণ অন্যখ্যানে মিলাল। ছদুর হাতের বিড়িটা তখন পড়ে গেছে কাশির ঝাঁকুনিতে। সমুর বিড়ি তখনও পড়েনি। তবে বিড়ির আগুন  পেছনে সরতে সরতে এখন দুই আঙ্গুলের চিপার মধ্যে জ¦লছে। জ¦লছে মনেও। তবে সেই জ¦লনির কাছে আঙ্গুলের জ¦লনি পাত্তা পেল না।

কাকলি হতাশ হয়ে রুপালির হাতে একটা হেঁচকা টান দিল। বাড়ির দিকে পা বাড়িয়ে বলল―‘মাগী, তুকে আজ থাইক্যা শামুলই গিলামু।’

সচিত্রকরণ : রাজীব দত্ত

Leave a Reply

Your email address will not be published.

shares