গল্প : স্বপ্ন ভাঙার দিন : গৌতম বিশ্বাস

কাঁখে কলসি, খালি পা, ফুলমতি যখন বেরিয়েছিল, মাথার ওপর দাউ দাউ জ্বলা সূর্যটা একটু কেমন মিইয়ে আসতে শুরু করেছে। হলদেটে রোদের গায়ে পড়ন্ত বেলার আঁচ। ঝকঝকে আকাশটা ঘিরতে শুরু করেছে বাদামি আভায়। একেই বুঝি বলে দিন শেষের ইশারা। এমনই ইশারা মাখা আকাশটার দিকে একবার তাকিয়ে পুরোনো কথাটা মনে পড়ে গিয়েছিল ফুলমতির।

ফুলমতির তখনও বিয়ে হয়নি। শরীরে ভরন্ত যৌবন। চোখে স্বপ্ন। হ্যাঁ, নতুন একখানি সংসারের স্বপ্ন সবে দেখতে শুরু করেছে তখন। নতুন সংসার। নতুন ঘরবাড়ি। নতুন একজন মানুষ।

তখন এক অন্য রকম জীবন ফুলমতির। সারা দিন খায়দায় আর বন-বাদাড়, মাঠঘাট ঘুরে বেড়ায়। ইচ্ছে হলে আকাশ দ্যাখে। ইছে হলে বন-জঙ্গলে ঢুকে পাখির বাসা খোঁজে। মেটে আলুর গাছ খোঁজে। আবার কখনও হয়ত গাঁয়ের পাশের মাঠটার এক কোণে দাঁড়িয়ে কেবল চেয়েই থাকে ওই দূরের প্রান্তে যে গ্রাম দেখা যায়, ঠিক তার দিকে। এক একটা সময় দুই চোখে ভেসে ওঠে অচেনা একজন মানুষের মুখ। যে হয়ত বা ওই গাঁয়েরই একজন। একদিন এসে সে নিয়ে যাবে ওই গাঁয়েরই কোনও ঘরে। ভাবতে গিয়ে নতুন একটা বাড়ির ছবিও ভেসে ওঠে তার চোখের সামনে। ছোট্ট একখানি ঘর। ঘরের সামনে ফালি উঠান। উঠানজুড়ে ছায়া দেওয়া হিমসাগর আমের গাছ। তুলসির চারা।

মেয়ের এমন ভাবসাব দেখে মা একদিন জিজ্ঞেস করেছিল, তোর কী হইছে ক দেহি ?

ফুলমতি অবাক, ক্যান ? আমার আবার কী হবে ?

তা কী আর আমি জানি ?

আমার কিছু হয় নাই।

তাহলি মাঝে মধ্যি অ্যাত্তো কী সপ ভাবিস ?

হেসে উঠেছিল ফুলমতি, এই কথা ?

এতে হাসার কী হলো ?

হাসপো না ? কোনও দিক চাইয়ে থাকলিই বুঝি কিছু হইয়ে যায় ? তুমিও না!

মেয়ের কিছু হয়নি ভেবে এবার যেন খানিক নিশ্চিন্তই হয়েছিল মা। তবু বলেছিল, অহন বড় হইছিস। এট্টুস বুঝ্যে শুন্যে চলিস।

সে কী এক সুন্দর জীবন ছিল ফুলমতির। যদিও সেই জীবনে অপেক্ষা ছিল। সেই অপেক্ষায় সুখও ছিল। আর ছিল ভালোলাগা।

তো তেমনই এক ভালোলাগা সন্ধ্যেবেলায় নিবারণ ঘটক এসে বসেছিল দাওয়ায়। দিনের সব আলো ফুরিয়ে তখন সন্ধ্যে নামছে। আকাশের গা বেয়ে নামছে আঁধারের ধূসরতা। জ্বলজ্বলে বড় একটা তারা এরই মধ্যে উঠে এসেছে পুবের আকাশটায়। চারপাশে শুরু হয়েছে ঝিঁঝিঁর ডাক। আশপাশে জোনাকিরাও বুঝি বেরোই বেরোই। বাপ রাইচরণ সবে মাঠ থেকে ফিরে কলতলায় হাত-মুখ ধুয়ে দাওয়ার একপাশে খেঁজুর পাতার চাটাইটা টেনে বসেছে। ঠিক সে সময়ই প্রস্তাবটা দিয়েছিল ঘটক।

রাইচরণ জিজ্ঞেস করেছিল, তা ছেল্যের বাড়ি কুথা ?

খানিক নড়েচড়ে বসেছিল ঘটক। জামার পকেট থেকে বিড়ি বের করে দিয়াশলাই জ্বেলে তাতে আগুন ধরিয়ে আয়েশ করে বার দুইটান দিয়ে একরাশ ধোঁয়া উগরে দিয়ে বলেছিল, সে খানিক দূরই বটে। পটাশডাঙা।

দাওয়ার খুঁটিতে হেলিয়ে দেওয়া পিঠটা আচমকা সোজা করে যেন লাফিয়েই উঠেছিল রাইচরণ, না গো ঘটক, অমন গাঁয়ে আমি আমার মেইয়ের বে দেব না।

মেয়ের বাপের মুখে এমন কথা শুনে ঘটক যেন অবাক। বলেছিল, কও কী হে রাইচরণ ? এমন ছেল্যে দশে এট্টা মেলে। যেমনি গায় গতরে, তেমনি তার চেহারা। বাপের এক ছেল্যে। বাড়িঘর, হাঁস-মুরগি, গোর-ছাগলে ভরন্ত সোংসার। এমুন ছেল্যে হাতছাড়া করবা ?

বাপ তার সিদ্ধান্তে অনড়, ছেল্যে মন্দ তা তো কছি নে। আমার আপত্তি তো ওই গাঁ নিয়্যে। চোত মাস পড়তি না পড়তি যে গাঁয়ে জলের আকাল পড়ে, তেষ্টা মেটাতি তিন মাইল পথ ভাঙতি হয়, সেই গাঁয়ে মেইয়ের বে দিয়্যে মেইয়েরে কী আমি জলে ভাসাবো ?

ব্যাপারটা তখন একেবারেই মাথায় ঢোকেনি ফুলমতির। কিন্তু এখন বেশ বুঝছে কেন এ গাঁয়ে বাপ তার বিয়ে দিতে চায়নি। মা অত জোরাজুরি না করলে বাপ তো রাজিই হতো না। না হলেই বোধকরি ভালো হতো। ভর জ্যৈষ্ঠের রোদ মাথায় নিয়ে পথ চলতে চলতে এটাই ভাবছিল ফুলমতি। প্রতিদিনই সে এমনটা ভাবে। ভাববে নাই বা কেন ? ফি বছর চোত মাস পড়তে না পড়তেই যা আকাল শুর হয় জলের। সারা গাঁয়ে তিনটে মাত্র টিউবওয়েল। তাও পঞ্চায়েত থেকে বসিয়ে দিয়ে গিয়েছিল বছর পাঁচেক আগে। বছরের অন্য সময় যা হোক তা দিয়ে চলে যায়। কিন্তু গরমের দিন এল তো তাতে জল বেরোনো একেবারেই বন্ধ। যতই চাপাচাপি করও বাতের ব্যথায় কাবু বুড়ো মানুষের মতো কঁকিয়েই যাবে। অথচ একফোঁটা জল তাতে বেরোবে না। চোত মাস থেকে শুরু হবে আর তা চলবে আষাঢ়ের মাঝামাঝি। এ ক’দিন তেষ্টা নিবারণের একমাত্র পথ তিন মাইল হেঁটে নিত্যদিন নদী থেকে জল আনা। সে নদীই বা কী, আর নদী থাকে তখন ? মাঘ ফাল্গুনেই শীর্ণ হয়ে আসে তার ধারা। চৈত্র পড়তেই তার বুকজুড়ে কেবল বালি আর বালি। গাঁয়ের মেয়ে-বউরা সেই বালি খুঁড়ে গর্ত করে তার পাশে কলসি নিয়ে বসে থাকে তৃষ্ণার্ত চাতকের দৃষ্টি নিয়ে। ধীরে ধীরে গর্তের গা বেয়ে চু্যঁইয়ে আসা জল গর্তে জমা হতে হতে যখন বেশ খানিকটা হয়ে আসে তখন তা সঙ্গে আনা বাটি দিয়ে কলসিতে ভরে নিয়ে ফের একবার বাড়িমুখো হয় তারা। তার আগে কেবলই অধীর অপেক্ষা।

সেই অপেক্ষাতেই এখন বসে আছে ফুলমতি। মাথার ওপর খর জ্যৈষ্ঠের খাঁ খাঁ রোদ অবশ্য নেই। বেলা পড়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে সে যেন বরং কিশোরী মেয়ের মতো লাজুক। বেশ একটা ঠাণ্ডা হাওয়াও বইছে। কিন্তু তাতে শরীর জুড়োলেও মনটা একেবারেই জুড়োচ্ছে না ফুলমতির। নিত্যদিন এতখানি পথ ভেঙে জল নিতে আসতে একদমই ইছে হয় না তার। মনে হয়, এর চেয়ে অন্য গাঁয়ে চলে যায় তারা। নতুন কোনও গ্রাম। নতুন পরিবেশ। নতুন করে বানানো ঘরবাড়ি।

কতবার করে লখিন্দরকে বুঝিয়েছে, চলো আমরা অন্য কুনো গাঁয় গে বাড়ি করি।

প্রতিবারই তার কথা শুনে আঁতকে উঠেছে লখিন্দর, কও কী ? বাপ-দাদার ভিটে ছেড়্যে কুথায় যাব ?

 সে আমি জানি নে। তয় যে গাঁয়ে জলের কষ্ট নাই, তেমুন কুনো গাঁয়।

সামান্য এট্টু জলের জন্যি গাঁ ছেড়্যে চল্যে যাব ? তুমি না মেইয়ে মানুষ ? মেইয়ে মানষের এটুকুতি ভয় পেলি চলে ? আমার মা-ঠাউরমা সারা জেবন ইভাবেই তো―

 তারা পারলিও আমি পারি নে। তা ছাড়া, আমার ভালোও লাগে না নিত্যিদিন ইভাবে―

মাত্তর তো কয়ডা দিন। সারা বছরই তো―

এভাবে ক’দিনের কথা বলতে বলতে কতগুলো বছর কেটে গেল। ফুলমতি কেবল স্বপ্নই দ্যাখে একদিন এই দুঃখের দিন তার শেষ হবে। কিন্তু না, দিন তার শেষ হয় না। আর না লখিন্দরকে বোঝাতে পারে সে। আসলে বোঝার কোনও চেষ্টাই করে না লখিন্দর। সে আছে তার কাজ নিয়ে। বৌয়ের কথা ভাবার তার সময় কোথায় ? এ জন্যে অবশ্য এক একটা সময় লখিন্দরের ওপর খুব রাগ হয় ফুলমতির। বাপ-দাদার ভিটের প্রতি সবারই একটা টান থাকে। সে তো ফুলমতিরও আছে। তা বলে সে কী বাপের ভিটে ছেড়ে আসেনি ?

এসব কথা ভাবতে ভাবতেই ফের একবার ঘাড় কাত করে আকাশটার দিকে তাকালো ফুলমতি। না, একফোঁটা মেঘের দেখা নেই কোথাও। অথচ শেষ বৃষ্টি হয়েছিল সেই আশ্বিনের মাঝামাঝি। চাদ্দিকে তখন পুজো পুজো ভাব। আকাশে পেঁজা তুলোর মতো ফালি ফালি মেঘ। সেই মেঘ থেকেই হয়েছিল বৃষ্টি। তারপর আজ এতগুলো দিন হয়ে গেল না দেখা আছে বৃষ্টির, আর না একফালি মেঘের। খানিক মেঘ জমলেও তো বোঝা যেত, কষ্টের দিন প্রায় শেষ হয়ে এল।

পুজোর কথাটা মনে পড়তেই আচমকা বাপের বাড়ি সুন্দরপুরের কথা মনে পড়ে গেল ফুলমতির। কতদিন হয়ে গেল পুজোয় বাপের বাড়ি যাওয়া হয় না। একার হাতে সংসার, যাবেই বা কী করে ? তবু এবার যাবে ভেবেছিল। কিন্তু যাওয়া হয়নি। এ বছরও নির্ঘাৎ বিশ্বাস বাড়িতে পুজো হয়েছিল। খালপাড়ে নিশ্চয়ই আগের মতই ফুটেছিল কাশফুল। খালপাড়ের ওই কাশবনে কত ঘুরে বেড়িয়েছে ফুলমতি। ওখানেই তো এক বিকেলে কাশবনের আড়াল পেয়ে তাকে জড়িয়ে ধরেছিল নাদু। অনন্ত বিশ্বাসের বাড়ির গোর-বাছুর দেখাশোনা করত সে। খালপাড়ে গোর চরাত। সুন্দর বাঁশি বাজাতে পারত নাদু। গোরগুলো খালপাড়ে ছেড়ে দিয়ে সুর তুলত বাঁশিতে। ওই বাঁশির সুর নাড়া দিয়ে যেত ফুলমতির ভেতরটায়। আর তাই বোধ হয় আচমকা নাদুর জড়িয়ে ধরাটায় এতটুকু রাগ করতে পারেনি সেদিন। তবু কপট রাগের ভান করে বলেছিল, আমারে এমুন কইরে ধরছো ক্যান ? আমি যদি বাড়িত গে কইয়ে দেই ?

ঝট করে ফুলমতির হাত দু’টো জড়িয়ে ধরেছিল নাদু। বলেছিল, না গো কাউরে কইও না। এই দুইন্যায় আমার কেউ নাই। বাবু জানতি পারলি আমারে বাড়ির থে বাইর কইরে দেবে। তাহলি আমি থাকপো কুথা ? খাবো কী ?

না, কাউকেই বলেনি ফুলমতি। নাদুও আর কোনও দিন করেনি এমন। আজ কতদিন পরে মানুষটার কথা মনে পড়ে চোখের কোনে দু’ফোটা জল বুঝি উঁকি দিয়ে গেল হঠাৎ। কেমন আছে মানুষটা ? বিয়ে করেছে ? নিজের কাউকে পেয়েছে কী ?

কোথায় একটা ঘোরের মধ্যে যেন হারিয়ে গিয়েছিল ফুলমতি। আচমকা একটা দমকা হাওয়া দিতেই ঘোরটা কেটে গেল তার। আর অমনি লখিন্দরের ওপর রাগ হয়ে গেল। এমনিতেই কত কাজ ফুলমতির। হাঁস-মুরগি, গোর-ছাগলের দেখাশোনা। দু’বেলা উঠোন ঝাঁটানো। রান্নাবান্না, ঘরদোর পরিষ্কার, আরও কত যে কাজ। সংসারটাই তো বলতে গেলে একা ফুলমতির হাতে। লখিন্দর তো কেবল জন খেটে পয়সাটাই আনে। আর বড়জোর গাই-বাছুরের খড়বিচুলিটা কেটে দেয়। সংসারের বাকি সবটাই তো করতে হয় ফুলমতির। আর এসব করতে করতে এক একটা সময় হাঁপিয়ে ওঠে। তখন মনে হয়, এই সংসার ছেড়ে চলে যাই। কিন্তু পারে না। কোথায় যাবে ? বাপের বয়স হয়েছে। ছেলের সংসারে বাপ-মাই এখন পরগাছা। তার ওপর যদি আবার ফুলমতি গিয়ে ওঠে।

তা ছাড়া, ছাড়তে চাইলেও ছাড়তে পারে না ফুলমতি। লখিন্দরের মুখটা মনে পড়ে যায় তখন। মানুষটা বেজায় ভালোবাসে তাকে। রাতে বিছানায় শুয়ে আদর সোহাগে―

তবে মানুষটা এখনও একটা সন্তান দিতে পারল না ফুলমতিকে। দোষটা কী কেবল ফুলমতির ? ফুলমতির তা মনে হয় না। দোষ যদি তারই হবে তাহলে এই যে এত যে তাবিজ মাদুলি পরলো, কোবরেজ বদ্যি দেখালো, এই যে এত তেলপড়া, জলপড়া―কোনই কী কাজ হতো না ?

কথাটা একদিন বলেই ফেলেছিল ফুলমতি। তা শুনে লখিন্দর বলেছিল, ধৈয্য ধরো, সপ ঠিক হইয়ে যাবে। আরে সপকিছুর জন্যি সমায় লাগে তো।

অধৈর্য্য হয়ে পড়েছিল ফুলমতি, আর কত ধৈয্য ধরব কও তো ? কম দিন তো আর হলো না। তার চেইয়ে বরং আমি কই কী তুমি না হয়―

একটু বুঝি অবাকই হয়েছিল লখিন্দর, আমি ? আমি কী করব ?

 তুমি না হয়, এট্টাবার কোবরেজ বাড়ি চলো।

‘হাঃ,হাঃ’ করে হেসে ওঠে লখিন্দর বলেছিল, দ্যাহো দেহি কয় কী, আরে অসুবিধে আমার ক্যান হতি যাবে ? বাচ্চা কী আমার প্যাটে আসপে ?

এমন অকাট্য যুক্তি খণ্ডন করার মতো কিছুই ছিল না ফুলমতির কাছে। আমতা আমতা করে তবু বলেছিল, কিন্তুক বিন্দুখুড়ি যে কয়―

 কী কয় ?

 কয় দোষ নেকি তুমারও হতি পারে।

 তুমি তাই বিশ্বেস করও ? আরে বিন্দুখুড়ি ইসপের কী বোঝে ? মানষের কথায় কান না দিয়ে ধৈয্য ধর। দ্যাকপা ঠিকই একদিন―

অনাগত সন্তানের কথা মনে পড়ে এই খর জ্যৈষ্ঠের ফুটিফাটা প্রান্তরে বসেও বুঝি দু’ফোঁটা জল গড়িয়ে নামল ফুলমতির চোখ দিয়ে। আকাশের দিক থেকে চোখ নামিয়ে ফের একবার গর্তের দিকে তাকাল সে। আর অমনি একরাশ খুশির ঝলক ছুঁয়ে গেল তার চোখ দু’টো। যা জল জমেছে তাতে ঠিক এক কলসি হয়ে যাবে।

অগত্যা বাটি দিয়ে কলসিতে জল ভরতে লাগল ফুলমতি।

জল ভরা হয়ে গেলে একবার সোজা হয়ে উঠে দাঁড়াল সে।

মাথার ওপর বেশ মনোরম একখানি আকাশ এখন। কে বলবে এই আকাশটাই খানিক আগেও রাজ্যের আগুন ছড়াচ্ছিল। হ্যাঁ, দুপুরের রোদটা ঠিক আগুনের মতই ছিল। অথচ সেই রোদই এখন বেশ মনোরম। বেশ একটা ভালোলাগায় ছুঁয়ে দিয়ে যায়। একটা ঠাণ্ডা হাওয়াও বইছে। চারপাশে দিন শেষ হয়ে আসার ইশারা।

কলসি মাথায় নিয়ে বাড়িমুখো হাঁটা দিল ফুলমতি।

খানিক দূরেই জল ভরছিল বাবলি। যতীনের বোন। বিয়ের বয়সটা পেরোতে গেল অথচ আজও দাদার সংসারেই পড়ে আছে। বাপ-মা কবেই মারা গেছে তার। আর কপালটাও পুড়িয়ে দিয়ে গেছে। বোনটার যে এখনই বিয়ে দেওয়া দরকার তেমন ভাবনা যতীনের কই। আসলে তার বৌ বড্ড মুখরা। সেই মুখের ভয়েই হয়তো―

এমন বিনে পয়সায় একটা কাজের মেয়ে সংসারে থাকলে কেই বা আর তাকে দূরে সরাতে চায়। যতীনের বৌও বোধকরি চায় না। চাইলে এত এত মেয়ের বিয়ে হয়ে যাছে আর বাবলি কি না, একাই পড়ে থাকে ? আসলে সংসারের সব কাজ বলতে গেলে একার হাতেই করছে মেয়েটা। বদলে দু’বেলা দু’পেট খাওয়া আর শরীরটাকে কোনওমতে ঢেকে ঢুকে রাখার মতো এক আধখানা শাড়ি।

ফুলমতিকে হাঁটা দিতে দেখে গলা তুলল বাবলি, বৌদি দাঁড়াও, দাঁড়াও।

ঘাড় ঘুরিয়ে একবার বাবলির দিকে তাকাল ফুলমতি, কিছু কবা ?

হঃ, কব তো।

 তাহলি তাড়াতাড়ি কও। আমার আবার দেরি হইয়ে যাছে।

 একা একাই চল্যে যাছো। আমারে নে যাবা না ?

হাসলো ফুলমতি, কী যে কও না ভাই। আমি তুমারে নে যাব ক্যামনে ?

না গো বৌদি, কোলে কইরে নে যাতি হবে না। তুমার সঙে নে গেলিই হবে।

কিন্তুক আমি যে দাঁড়াতি পারব না ভাই। বাড়িত অনেক কাজ পড়্যে আছে। জানোই তো একার হাতে সপ কত্তি হয়।

হঃ, জানি তো। তয় আমার জন্যি তুমার সমায় নষ্ট হবে না। আমারও হইয়ে গেছে। খালি কলসডায় ভত্তি যতক্ষণ।

বেলা এখন বেশ দ্রতই পড়ে আসছে। সূর্যটা দিগন্তের একেবারে কাছাকাছি দাঁড়িয়ে শেষবারের মতই যেন দেখে নিছে দিনান্তের পৃথিবীকে। চোখে তার ঘুম ঘুম ভাব। আকাশের নীল পুরোপুরি মুছে গিয়ে এখন বাদামি। মাথার ওপর দিয়ে একঝাঁক সাদা ডানার বক উড়ে গেল। আড়চোখে একবার সেদিকে তাকিয়ে ফের চোখ নামিয়ে নিল ফুলমতি।

ততক্ষণে বাবলির জল ভরা শেষ। জল ভরা কলসি মাথায় নিয়ে হেঁটে এসে ফুলমতির কাছে দাঁড়ালো বাবলি। বললো, চলো।

মাথার ওপর ভরা কলসি। পায়ের নিচে খটখটে মাঠ। এভাবে হেঁটে এই মাঠ পেরোনো বড়োই কঠিন। অথচ এই কঠিন কাজটাই নিত্যদিন করতে হয় ফুলমতিদের। হেঁটে হেঁটেই এই মাঠখানি পেরোতে হয় তাদের। ওই যে মাঠের প্রান্তে দেখা যাচ্ছে তাদের রুখা শুখা গাঁ। তা বলে একেবারেই যে জল নেই গাঁয়ে এমনটা নয়। গোটাকতক পুকুর, ডোবায় এখনও জল আছে। তবে তা একেবারেই তলানিতে সে জলে গোর-ছাগলের খাওয়া চলে। কিন্তু মানুষের নয়। তাই তো এই নিত্যদিন এতখানি পথ হাঁটা।

এক দমকা হাওয়া এসে গা’টা জুড়িয়ে দিয়ে গেল অনেকখানি। চুপচাপ এতখানি পথ হাঁটার থেকে কথায় কথায় গেলেই ভালো। তাহলে কখন পথটা ফুরিয়ে যায় টেরও পাওয়া যায় না।

অগত্যা ফুলমতিই শুর করলো প্রথম। ঘাড় না ঘুরিয়েই বলল, তুমার তো ভাই কষ্টের দিন ফুরোতি গেল। বে’ হলিই গাঁ ছেড়্যে চল্যে যাবা। অথচ আমার দ্যাহো সারা জেবন এই কইরে যাতি হবে। এট্টু জলের জন্যি নিত্যিদিন ই সপ ভাল্লাগে ?

ফুলমতির কথা শুনে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো বাবলির ভেতর থেকে। নিজেকে সামলে নিয়ে সে বলল, কী যে কও না তুমি বৌদি। সে কপাল কী আমার আছে ?

 ক্যান ? এমুন কথা কও ক্যান ?

 এ জেবনে আমার আর সে সৌভাগ্যি হবে না বৌদি।

না গো, মন খারাপ কইরো না। সমায় হলি দ্যাকপা সপ ঠিক হইয়ে যাবে।

 আর কবে সমায় হবে কও ? গাঁয় আমার বয়াসি কোন মেইয়েডা বে’ না হইয়ে বস্যে আছে ? কত ছোট ছোট মেইয়ের বে’ হইয়ে গেল আর আমি―

 ক্যান, তুমারে যে সিদিন দেকতি আলো তার কী হলো ?

 দেকতি তো কতই আসে। যা দিনকাল পড়িছে তাতে খালি ছালায় মুখ আটে না বৌদি, যে-ই আসে কিছু না কিছু দেনা-পাওনার কথা কয়। আর সেই দেনা-পাওনা মেটায়্যে কেডা আমার বে’ দেবে কও ?

একটা কান্না যেন ভেতরে ভেতরে ডুকরে উঠল বাবলির। ব্যাপারটা টের পেয়ে এ নিয়ে আর কথা বাড়ালো না ফুলমতি। কথায় কথায় অনেকটা পথই তারা চলে এসেছে। এখান থেকে গ্রামের অনেক কিছুই স্পষ্ট দেখা যায়। দেখা যায়, গ্রামের গাছপালা। বাড়িঘর। এমনকি মানুষজনও।

এদিকে দিনের আলো দ্রতই ফুরিয়ে আসছে। চারপাশে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে দিনান্তের ইশারা। মাটির ফাটল দিয়ে মুখ বাড়িয়ে থাকা অস্পষ্টতা বেরিয়ে আসার প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছে।

হঠাৎই একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল ফুলমতির ভেতর থেকেও। কোথায় যেন বাবলির সঙ্গে একটা মিল খুঁজে পেল সে। বাবলি স্বপ্ন দ্যাখে একটা নতুন রকমের দিনযাপনের। নতুন ঘর। নতুন সংসার। নতুন একজন মানুষ। নতুন একজন মানুষের স্বপ্ন দ্যাখে ফুলমতিও। ছোট্ট একটা হাসিমাখা মুখ। ছোট্ট ছোট্ট পায়ে ছুটে বেড়ানো। ফুলমতির সন্তান। বুকের মধ্যে জমিয়ে রাখা ভালোবাসা।

ভাবতে গিয়ে কোথায় যেন হারিয়ে গিয়েছিল ফুলমতি। আচমকা মাটির ঢেলায় পা আটকে হোঁচট খেয়ে পড়ে গেল সে। আর অমনি মাথা থেকে ছিটকে পড়া মাটির কলসি ভেঙেচুরে ছড়িয়ে পড়ল চারপাশে। হাঁটতে হাঁটতে খানিক পিছিয়ে পড়া বাবলি ছুটে এল তার দিকে, এ কী, এ কী হলো বৌদি ?

উত্তর দিল না ফুলমতি। সে ঘোর লাগা চোখে তাকিয়ে রইল ভেঙে যাওয়া কলসির দিকে। তার মনে হলো কলসি নয়, এ যেন তার স্বপ্নেরই ভেঙে পড়া।

সচিত্রকরণ : কাব্য কারিম

Leave a Reply

Your email address will not be published.

shares