গল্প : ডানা : ফাতেমা আবেদীন

আমি একজন পঙ্গু মানুষ, আমাকে সাহায্য করুন … আমি একজন পঙ্গু মানুষ আমাকে সাহায্য করুন―প্রায় দুই ঘণ্টা ধরে একজন দুই হাত কাটা লোক একঘেঁয়ে সুরে পড়েই যাচ্ছে। খুব রাগ ও বিরক্ত লাগলেও কিছু করার নেই। আমি পিজির পেছনের গেটের সামনে বসে আছি। আমার বান্ধবী, থুক্কু, প্রেমিকা ঋতি এসেছে ওর চাচাকে দেখতে। পিজির সি ব্লক সে চেনে না, ফলে আমাকে চিনিয়ে দিতে হবে। চাচা আইসিউতে। চাচাকে দেখতে পাবে কি না, জানি না, চাচার ছেলে-মেয়েদের সঙ্গে দেখাটাই মূল উদ্দেশ্য।

ঋতি আর আমার সাড়ে চার বছরের প্রেম। এই সাড়ে চার বছর ধরে প্রায় প্রতিদিন আমি ঋতিকে বলে গেছি চলো বিয়ে করি, চলো বিয়ে করি। ঋতির এক কথা পরিবারের সবাইকে রাজি করিয়ে তারপর বিয়ে করবে। ঋতির বড় চাচা পরিবারের প্রধান কর্তা। তিনি কোনও ব্যবসায়ী ছেলের সঙ্গে বিয়ে দেবেন না মেয়ের। তার ইচ্ছা সরকারি কর্মকর্তার সঙ্গে মেয়ের বিয়ে হবে। তার বোনদেরও জামাইরা সব হোমরা-চোমরা আমলা। সেখানে আমার মতো ইভেন্ট ম্যানেজমেন্টের তরুণের কোনও জায়গা নেই। ঋতির বোনদের জামাইরা রুটিন ওয়ার্ক হিসেবে শ্বশুরবাড়ির লোকদের দেখতে আসতে পারে। আর আমি দুই ঘণ্টা ধরে পিজির পেছনের গেটে বসে থাকতে পারি। এর মধ্যে এই এলাকার সব স্ট্রিট ফুড খাওয়া হয়ে গেছে। কাচের বাক্সে সাজিয়ে রাখা সব ফল। সরিষা দিয়ে মাখা পেয়ারা, আম, স্ট্রবেরি খাওয়া শেষ। জুস খাওয়া নিষেধ আছে জন্ডিস হওয়ার পর থেকে, তাই দুটো ডাব খেয়ে ফেলেছি। অফিস থেকে আসা ১৬টা কল অ্যাটেন্ড করে ফেলেছি।

আজকে এক সচিবের মেয়ের বিয়ের ইভেন্ট। বিয়ের মঞ্চ আকাশি নীল জারবারা দিয়ে সাজানো লাগবে, আর মালা বদলের মালাতে টিউলিপ আর অপরাজিতার একটা মিশেল হবে। ফুল বিষয়ক যেকোনও কিছু আমাদের ইভেন্টের কেশব দেখে। ঐ আটবার কল দিয়েছে। আকাশি নীল জারবারা খোদ যশোরেও নাই। যশোরেই ফুল চাষ হয়। সেখানেও খোঁজ নিয়েছে কেশব, থাকলে ফ্লাইটে ফুল এনে ফেলা এই ছেলের জন্য কোনও ব্যাপার না। অবশেষে চারপাশ থেকে শিক্ষা নিয়ে কেশবকে বললাম সাদা জারবারা স্প্রে কালার দিয়ে আকাশী নীল করে দাও। আর টিউলিপের জন্য গাজিপুরে বাইক গেছে এলেই মালা হয়ে যাবে। আমি যে চায়ের দোকানটায় বসে আছি তার উল্টা পাশে একটা ছোট্ট ওয়েল্ডিংয়ের দোকান। ওয়েল্ডিং করার পর স্প্রে কালার দিয়ে কি সুন্দর কালো একটা মরচে পড়া লোহাকে বেগুনি রঙ দিল। এখান থেকেই আইডিয়া পেলাম। এভাবে প্রেমিকার জন্য অপেক্ষা করতে করতে কতকিছু যে শিখে ফেললাম।

কিন্তু ভীষণ অসহ্য লাগছে এই ‘আমি একজন পঙ্গু মানুষ’ এই ঘেনঘেন। লোকটা গত দুই ঘণ্টা ধরে একইভাবে ঘেন্ঘেন্ করে যাচ্ছে। কোনও বিরতি নেই। লোকজন ভিক্ষা দিচ্ছে। মায়াই লাগছে। ডেকে একটা ডাব খাওয়াব কি না, বুঝতে পারছি না। ঋতি এসে যদি দেখে ভিক্ষুকের সঙ্গে গল্প করছি আর ডাব খাওয়াচ্ছি তবে আমার মোটামুটি সানডে মানডে ক্লোজ হয়ে যাবে। এই জন্য উচ্চবিত্ত পরিবারের মেয়েদের সঙ্গে প্রেম করতে নেই। প্রেমে অবশ্য আমি পরে পড়েছি। ঋতিই বেশি নাছোড়বান্দা ছিল। ওদের ইউনিভার্সিটিতে একটা কনসার্ট অর্গানাইজ করতে গিয়েছিলাম। তখন আমার নতুন ব্যবসা। মাত্র ৭/৮টা ইভেন্ট করেছি। গায়ক টিপু ভাই পাড়ার লোক বলে ইউনিভার্সিটির ইভেন্টটা জুটিয়ে দিলেন। খুব সুন্দর করে ইভেন্ট সামলেছিলাম। শেষ বেলায় ঝামেলাটা করেছিল ঋতি। ব্যাক স্টেজে এসে গায়কের অটোগ্রাফ নিতে আসবার সময় স্ট্যান্ড ফ্যানের তারে প্যাঁচিয়ে যা কাণ্ড করেছিল। এখনও ভাবলে গায়ের রোম খাড়া হয়ে যায়। সেই মূহূর্তে ক্যাবল টান দিয়ে ছিঁড়ে না ফেলতে পারলে চোখের সামনে ঋতি কাবাব হয়ে যেত নিশ্চিত। জিএফসি স্ট্যান্ড ফ্যানগুলো যে ভোল্টেজ টানে।

সেদিন অবাক করে ঋতিকে বাইকে বাড়ি পৌঁছে দিয়ে এসেছিলাম। পথে জুস খাইয়েছিলাম, ওকে ধাতস্থ করার জন্য। আসলে নিজের ধাতস্থ হওয়া দরকার ছিল। কোনও একটা দুর্ঘটনা ঘটলে আমার খবর ছিল। কেউ দেখবে না ঋতি কী করে তারে প্যাঁচ খেল। সবাই দেখবে আমার ইভেন্ট, কতটা অদক্ষতা ছিল আমার। এই ট্রমা এক মাস পর্যন্ত তাড়িয়ে বেড়িয়েছে। ঐ সময় ঋতিকে একটু বেশিই পাত্তা দিয়ে ফেলেছিলাম। যত যাই হোক মৃত্যুমুখ থেকে ফিরে এসেছে মেয়েটা। বেশি পাত্তাটাই প্রেম প্রেম হয়ে গেল। শেষে ভালোবেসেই ফেললাম। এখন কোনও একটা সকাল ঋতিকে ছাড়া ভাবতে পারি না। নইলে সচিবের মেয়ের বিয়ে ফেলে ঋতির জন্য এই হাসপাতালের বাইরে ঠাঠা রোদের মধ্যে বসে থাকার কারণ নেই। এখানে অতিরিক্ত লেদলেদা প্রেম ছাড়া কিছুই নেই, আছে অনন্ত অপেক্ষা আর বিরক্তি। তবে যতই বিরক্ত হই না কেন, ঋতির মুখ দেখলে আমি একদম গলে মেলটেড বাটার হয়ে যাই। নিজেকে তখন পুশহীন বোতলের বাটার লোশন মনে হয়। শুধু ঋতির গায়ে গড়িয়ে পড়ি আরকি।

আমি একজন পঙ্গু মানুষ, আমাকে সাহায্য করুন … আমি একজন পঙ্গু মানুষ আমাকে সাহায্য করুন―এই ঘেনঘেনে সুরটা খুব কাছে চলে এসেছে। দুই হাত কাটা একটা লোক। এত অদ্ভুত পলিশিং দিয়ে দুই হাত কি করে কাটল সেটা খুব অদ্ভুত লাগল। একটা ফতুয়া পরা সেটা কাঁধ পর্যন্ত হাতা, যাতে খুব স্পষ্ট করে বোঝা যায় হাত দুটো নেই। কপাল থেকে ঘাম বেয়ে পড়ছে। গলায় একটা ব্যাগ ঝোলানো, সেটায় সবাই টাকা দিচ্ছে। ইশারায় ডাকলাম।

কপাল কুঁচকে―আমি একজন পঙ্গু মানুষ―বলতে বলতে এগিয়ে এলেন।

ভাই, এবার থামেন। আপনার ক্লান্ত লাগে না ?

বেশ তাতিয়ে উঠলেন―কেলান্ত হইলে আপনে ভাত দিবেন ?

না ভাই আমি ভাত দেব না, তবে দুই ঘণ্টায় খুব বিরক্ত হইছি।

আপনেও তো দুই ঘণ্টা ধরে এই রাস্তার সব খাওন খায়া ফেলছেন। আমি বিরক্ত হইছি ? আমারও খিদা লাগছে, আমি একবার আইসা কইছি খাওন দেন। হাত নাই চাইরডা টাকা দিবেন যামু গা।

আমার এবার সত্যিই মায়া লাগল। ভাই, কিছু খাবেন ? অর্ডার করি ? আমার পক্ষ থেকে।

এবার লোকটি চোখ দিয়ে ছাইভষ্ম করে দেয় প্রায়। একদম খেঁকিয়ে উঠল। আপনে আমারে ভাতার মনে কইরা খাওয়ায় দেবেন ? দেখতাছেন না হাত নাই ? খামু কেমনে ?

এবার তীব্র অপরাধবোধে আমার মন ছোট হয়ে গেল। কত প্রিভিলেজ নিয়ে থাকি। আচ্ছা লোকটার তো পিঠ চুলকাতে গেলেও একটা সাপোর্ট লাগে, ভিক্ষা করতে করতে যদি পেশাব-পায়খানা পায়, তাহলে কোথায় যায় লোকটি, কীভাবে যায় ?

আমি নির্দ্বিধায় বললাম ভাই খাইয়ে দেব। বসেন আপনি। একটা ডাব খান।

ডাবের অর্ডার দেন, বলে উনি ‘এই মতলুব, এই মতলুব মিয়া’ কই তুই ?

দশ, এগারো বছরের একটা ছেলে কোথা থেকে ছুটে এল। লোকটি তার হাতে ডাব দিতে বলল। মতলুব মিয়া ডাব হাতে নিয়া এক চুমুক খেয়ে আরেক চুমুক পিচিক করে ফেলে লোকটির মুখে ধরল। লোকটি বিড় বিড় করে কি জানি গালি দিল, মতলুব মিয়া খিল খিল করে হেসে দিয়ে বলল―ডাব খাইলেই মুত পাইব, আমি ছাড়া গতি আছে, হুদা তেজ দেখাইও না। আমার লাইগা একটু রাইখো।

ও কে ?

আমার অ্যাসিট্যান্ট।

আমি হেসে ফেললাম।

উনি আমার হাসিকে খুব সিরিয়াসলি নিয়ে গজ গজ করতে থাকলেন।

খালি আপনেগোই অ্যাসিস্ট্যান্ট থাকব, আমাগেরও থাকা লাগে।

আমি নাম জিজ্ঞাসা করলাম, জানালেন মিন্টু।

হাত কি হইছে ?

সে এক বিরাট ইতিহাস, কথা কইলে ভিক্ষা দেবেন ? এর মধ্যেই মতলুব মিয়া তাড়া দিয়ে উঠল―আমার লাইগা একটু রাহেন, আচ্চাডা কিন্তু আমি খামু।

অনেক দিন পর আচ্চা শব্দটা শুনলাম। আমার দাদাবাড়িতে ডাবের খোলকে আচ্চা বলে।

আমি পকেট থেকে একটা ৫০০ টাকার নোট বের করে বেঞ্চের ওপর রাখলাম। আর একটা সিগারেট ধরালাম। বলেন এবার আপনার গল্প।

মিন্টু আমার সিগারেটের দিকে জুলজুল করে তাকিয়ে আছে, খাবেন বেনসন ?

না একটা ফাইবস্টার কিন্না দেন।

মতলুব মিয়া দায়িত্ব নিয়ে ফাইবস্টারের অর্ডার দিয়ে ধরিয়ে নিয়ে এল। আমি ধমকে উঠতেই হেসে ফেলল। এত নির্মল হাসি। এই অ্যাসিস্ট্যান্টের চাকরি তার খুব পছন্দ বলেই মনে হলো।

মিন্টু বলতে শুরু করল―আমি বিদ্যুৎ অফিসে লাইনম্যানের কাজ করতাম। কি ঠাটবাট আছিল, আমার হাতে মাইনষের বাড়ির লাইন, মন চাইলে কাইট্টা দিতাম, মন চাইলে কাউরে ডাবল লাইন দিতাম। অফিস থিকা এইডি কেউ দেখত না। মানিকনগর ময়লাপট্টির পাশের সব লাইন আমার আন্ডারে আছিল। আমার সিনিয়র লাইনম্যান আছিলেন―উনি খালি সপ্তাহে বখরা নিতেন। টেকাই টেকা আছিল। বাড়িতে পাকা দালান দিলাম, মায়ে বিয়ার লাইগা ডাকল। আমি কেলাস ৯ পাস, যতই টেকা থাকুক গ্রামে কেউ মাইয়া দিতে চায় না। শিক্ষিত পোলা খুঁজে। আমার মামায় হের শালার মাইয়ারে দিয়া প্রস্তাব আনল। মোমেনা। সুন্দর মাইয়া। চ্যাটাং চ্যাটাং আছিল। আমার খুব মনে ধরল―

সুন্দর আছিল মানে ? এখন নেই ?

কথার মইধ্যে বায়া হাত ঢুকান কেন, মন দিয়া শোনেন …

আমার সত্যিই খুব আগ্র হচ্ছে, তাই চুপ করে গেলাম। ঋতি মনে হচ্ছে চাচাকে আইসিউ থেকে বের করেই আসবে, আর এই সময়ে আমার ওকে কল করা নিষেধ। সো কল করেও জানতে পারব না কখন বের হবে। টেক্সট দিয়েছি ৫ মিনিট রিপ্লাই ব্যাক করেছে। এর মানে ৩০ মিনিটও হতে পারে।

মোমেনার লগে বিয়া হইল ধুমধাম কইরা, এক লাখ টেকা দেনমোহর ধরছিলাম। গয়না দিয়া উসুল করছি। মেলা লোক খাওয়াইছি। মোমেনারে লেহেঙ্গা কিন্না দিছিলাম নিউ মার্কেট থিকা। গ্রামের লোকে কতদিন কইছে―হিন্দি বইয়ের লাহান বিয়া অইছে।

মোমেনারে ঢাকায় নিয়া আসলাম। তখন মুগদা ঝিলপাড়ে একটা দুই রুমের বাসা লইছি। দালান বাড়ি, বাথরুম, বেসিন, গ্যাসের চুলা সব দেইখা হের খুশি ধরে না। কত্ত জায়গায় ঘুরাইছি মাগিরে। কাজের বেডি পর্যন্ত রাইখা দিছিলাম। এমুন দাগা দিব কেডা জানত ?

কি দাগা ?

আমার তহন কাম-কাইজের নেশায় পাইছে। লাইন লাগাইলেই পাত্তি। খালি টেকা। বসের থিকাও লুকানো শিখ্যা গেছি। নিজেই তালেবর হইছি। মোমেনা খালি কয়, একলা ঘরে হের ভালা লাগে না। হেরে টিভি কিন্না দিছি, ডিশের লাইন কিন্না দিছি। হের কেন ভালা লাগবে না। একদিন দিলাম ধইরা মাইর। এইরাম ঘেনঘেন করবি না। টেকার নেশায় আমার প্রেমের বাতাসে উথাল-পাতাল লাগল। মোমেনার লগে সম্পর্ক আলগা হইতাছিল। হেইডা ব্যাপার আছিল না, টেকা, আর সোহাগ পাইলে বেডিরা সব ভুইলা যায়। হেই আশায় কামায়া যাইতেছিলাম। এর মধ্যে নতুন লাইনম্যান নিছে অফিস। জোবেদ আলি, সেই চাল্লু পোলা। প্রথম দিনই বুইঝা ফেলছি হেরে হাত করা লাগবে। নইলে কাম শেষ। আমি লাইনের পিছনে পইড়া থাকুম।

আমার দাদি কইত, বেডাগো দুই খিদা, চ্যাডের খিদা আর পেডের খিদা। প্রথমটা না দিতে পারলেও জোবেদরে বাড়িত নিয়া বউয়ের রান্ধন খাওয়াইতে পারুম। বাড়িত নিয়া আইলাম ছ্যাড়ারে। রাইতে রাইখা দিলাম। মোমেনা মেমান দেইখা খুব খুশি। কত কিছু রাইন্ধা খাওয়াইল। আমি ছ্যাড়ারে হাতে ধইরা কাজ শিখাইতে লাগলাম। যাতে আমারে টপকায়া না যাইতে পারে। পারলে প্রেত্যেক দিন হেরে বাইত আইন্না খাওয়াইতাম। জোবেদ আমারে এত ইজ্জত দিত, আমি পুরা ধান্ধায় পইড়া আছিলাম। ৬ মাস পরে আমার অ্যাক্সিডেন্ট হইল―স্টেডিয়ামের লাইন থেকে দুই নম্বর লাইন দিতে গিয়া কারেন ধরল আমারে। এত বড় ফ্লাড লাইটের লাইন সামলাইতে পারুম না আগেই বুঝনের দরকার আছিল। নীচে এক চায়ের দোকানে লাইন দিতে গিয়ে পড়লাম দুই তালা থিকা। দুই হাত পুইড়া কালা হয়া গেল। হাসপাতালে আছিলাম একত্রিশ দিন। সব কাম-কাইজ ফালায়া জোবেদ আর মোমেনা আমারে নিয়া টানা হ্যাচড়া করল। ডাক্তার বাধ্য হইল দুই হাত কাইটা ফালাই দিতে। আমার দুনিয়া উল্টায় গেল। কাউরে ভালা লাগে না। মোমেনারে খালি গাইল-মন্দ করি। জোবেদরে গাইল দেই। কিন্তু চ্যাত দেখায়া কি লাভ। এরা হুতায়া দিলে হুততে পারি, মুতায়া দিলে মুততে পারি। এক ফোঁটা পানি খাইতেও লোক লাগে আমার।

আমারে মুগদার বাড়িতে আনলো মোমেনা। অফিস থিকা আমারে ক্ষতিপূরণ দেয় নাই, উল্টা জরিমানা করছে―অনুমতি ছাড়া লাইন খুলতে গেছিলাম কেন। এক লাখ টেকা জরিমানা। সেই সময় জোবেদের হাতে সব টেকা-পয়সার হিসাব তুইলা দিলাম। আর কিছু করনের আছিল না … সারাদিন বিছানায় হুইতা থাকি, যে সিনেমা মোমেনা ছাইড়া দিয়া যায় হেইডা দেখি। মোমেনা খাইতে দিলে খাই। একদিন মোমেনা আর জোবেদ আমার সব টেকা-পয়সা সব কিছু নিয়া আমারে ফেলায়া চইলা গেল। টের পাইছি মেলা পরে। খালি উইঠা হাঁটতে পারি। আর তো কিছু করতে পারি না। খাইতে পারি না, হাগছি সুচতে পারি নাই, মুতছি যেই লুঙ্গিতে হেইডা পইড়াই ঘরে পইড়া আছি। বাইরে থিকা আটকায় গেছে আমারে। চিক্কুর দিলাম। নীচতালায় আর কেউ থাকত না। কেউ শুনল না। পানি পিপাসায় মুখ বালতিতে চুবায়া পানি খাইছি, মুতার সময় এই বালতিতেই আমার মুত ছিটা গেছে দেখছি। মুখ দিয়া কল ঘুরাইতে পারতেছিলাম না।

দুইদিনে আমি দুনিয়াতে নরক দেহা শুরু করলাম। আমার দাদি কইত মানুষের হাত কিছু নারে, মানুষের ডানা থাহে, এই ডানা দিয়া মানুষ উইড়া অন্য দুনিয়াতে যায়। আমি সেই ডানার খোঁজ লাগাইলাম। বন্ধ ঘরে নিজের গু মুতের ওপর বইসা আমি ডানা খুঁজি। তিনদিনের দিন দরজা খুইলা পরির মতো আইল আমাগো কাজের বেডি সেলিনা। আমারে সাফ-সুরত কইরা ঘর বাড়ি সাফ কইরা খাওন পাকাইল। খাওন খাওয়াইল।

ঘরের টেকা পয়সা জেহরপাতি তো নিছেই, শালীর বেডি আমার মোবাইল লিয়াও গেছে। আমার চাল-ডাল পর্যন্ত নিয়া গেছে। সেলিনা আমারে এই বাড়ি ছাইড়া হের বস্তিতে উঠতে কইল। হের কথা মানা ছাড়া কিছু করনের আছিল না। একবার মায়েরে ফোন দিলাম―পঙ্গু-অচল কামাইছাড়া পোলার কোনও দাম পাইলাম না। মায়ে মোমেনার মতোই জিগাইল―এহন কী করবি ? বাড়িত আইলে তোরে দেখব কিডা ?

বুঝলাম বাড়ির দরজা বন্ধ হয়া গেছে। মোমেনা ভাইগা গেছে শুইনা মায় উল্টা আমারে কয়―হের বাপ আইছিল ছাড়াই নিতে, নিজে গেছে গা ভালা হইছে। আমি এই শহরে দুই হাত ছাড়া কেমনে থাকুম, কি খামু কিছুই জিগাইল না মায়। চোখের সামনে দুনিয়া কালা হয়া গেল। সেলিনা আমারে ভিক্ষা করাইব কইল। মতলুব সেলিনার পোলা। পেডে পোলা দিয়া এক বেডা হেরে রাইখা গেছিল গা। বাসা বাড়িত কাম কইরা এই পোলারে বড় করছে। হেরা মায়ে-পুতে মিলা পেডের খিদা, চ্যাডের খিদা সব দেহে। আমি খালি ইনকাম করি।

মিন্টুর চোখ চকচক করছে। বোঝাই গেল মিন্টুর ইনকাম অনেক ভালো।

মিন্টু আমার দিকে তাকিয়ে বলল―যে আপার লাইগা বইসা আছেন, হেয় হইলো আপনার ডানা। আপনারে উড়ায়া নরকে নিয়া যাইব, দুইন্যাতে দোজখ দেখাইব। মনে চাইলে দুইন্যাতেই বেহেশত দেখাইব। আপায় ঢকের আছে। বেডা মাইনষের হাত কিছু না, দুইন্যাতে চলতে ডানা লাগে, সেলিনা আমার ডানা। আবার মোমেনা ডানা কাইট্টা নিয়া গেছিল গা, উডি …

মিন্টু আবার একঘেয়ে সুরে ‘আমি একজন পঙ্গু মানুষ, আমাকে সাহায্য করুন… আমি একজন পঙ্গু মানুষ আমাকে সাহ্য্যা করুন’―বলতে বলতে শাহবাগের দিকে হাঁটতে শুরু করল …

এমন সময় ঋতি রীতিমতো উড়তে উড়তে আমার কাছে এল―পাঁচ মিনিটকে আধঘণ্টা করেই এসেছে। রীতি একটা হলুদ ঘেরের জামা পরেছে―মনে হচ্ছে ডানাওয়ালা একটা হাঁসের ছানা উড়ে এল …

বড় চাচাকে আইসিউ থেকে বেডে দিয়েছে―তাই তার এত দেরি হয়েছে। চাচা আমাকে নিয়ে যেতে বলেছেন―হাসপাতাল থেকে ফিরেই আমাদের বিয়ে দেবেন। ঋতি হড়বড় করে বলেই চলছে। আমি শুধু ঋতির দুটো ডানা দেখতে পাচ্ছি, আমাকে উড়িয়ে নিয়ে যাবে বহুদূর … কেশব ফোন দিল―সব জারবারা আকাশি করে ফেলেছে … বোঝা যাচ্ছে না আর্টিফিশিয়াল। কেশব ফোন দিলে ছাড়তে চায় না। ফুলে কী কী কালার করে ইভেন্টের চেহারা পালটে দেবে সেই আলাপ করতে লাগল, আমি হু হু করতে করতে ঋতির কথা শুনছিলাম। আমাদের বিয়ের ইভেন্টটাও খুব গর্জিয়াসলি করতে হবে। এই একটা জায়গায় আমি আর মিন্টু এক হয়ে গেলাম, ইলেকট্রিসিটির একটা দুর্ঘটনা দুই মেরুর দুই পুরুষকে দুটো ডানা দিয়ে গেছে …

ভর দুপুরের রোদ তাঁতিয়ে উঠেছে, আসলে ঋতি এখনও আসেনি, ডানা প্রত্যাশী আমি আকাশ-কুসুম স্বপ্ন দেখে ফেললাম ক্ষণিকে, হয়ত আর আসবে না সে, বড় কাকা হয়ত মারা গেছেন, মৃত্যুর আগে নসিয়ত করে গেছেন মেয়ের আমলার সঙ্গে বিয়ে দিতে হবে, মৃত ব্যক্তির ওসিয়ত ভেঙে এই শহরে ঋতি আসবে না, আমি বাইক স্টার্ট দিলাম, ফোন না দিয়ে মনে মনে ১০০ পর্যন্ত গুনব যদি ঋতি আসে…  

সচিত্রকরণ : রাজীব দত্ত

Leave a Reply

Your email address will not be published.

shares