গল্প : সন্ধ্যা নামার আগে : মঈনুল হাসান

মরিয়মের ঘুম দেখে জিদ চড়ে যায় পল্টুর। নাক ডাকার ভোঁসভোঁসানি আওয়াজে থলথলে বেঢপ শরীরটা হাঁপিয়ে উঠছে শ্বাস-ওঠা শুয়োরের মতো। হাঁটুর নীচ থেকে পরনের কাপড় অনেকখানি সরে গিয়ে হাঁ হয়ে আছে উদোম মোটা পাগুলো। পেটিকোটের আড়াল থেকে বেসামাল হওয়া পায়ের সেই বিচ্ছিরি কালো অংশ নজরে এলে গা আরও জ্বলে ওঠে তার। অসময়ে পা ছড়িয়ে তার এ নিশ্চিন্তের ঘুম পল্টুর বিরক্তিকে নিয়ে যায় চরমে।

তিন মাসের বাচ্চাটা ঘুম থেকে জেগে ট্যাঁ ট্যাঁ করছে এদিকে। সেদিকে একদম খেয়াল নেই ওর। কাঁদবেই তো। বাচ্চার মুখ থেকে মাই সরে গেছে। কাঁচা আমের বোঁটাভাঙা কষের মতো চুপসান কালো মাই থেকে টিপ টিপ করে গড়িয়ে পড়ছে দুধ। কিন্তু, তা বাচ্চার মুখে না গিয়ে গড়িয়ে পড়ছে বিছানায়। এক রত্তি মাই-খাওয়া বাচ্চা ট্যাঁ ট্যাঁ তো করবেই।

মরিয়ম, এই মরিয়ম।

হুঁ… বলে ঘুমের ঘোরেই কী যেন বলে আবার পাশ ফিরে শোয় মরিয়ম। আগের মতোই ঘুমাতে থাকে সে।

এই মাগি ওঠ। কথা কানে যায় না তোর।

মহাবিরক্ত হয়ে খিস্তি ঝাড়ে পল্টু। ইদানীং তার মেজাজ সারাক্ষণ খিটখিটে হয়ে থাকে। পেটে মাল পড়লে কিংবা মরিয়মকে দেখলেই কেন জানি তা আবার দ্বিগুণ হয়ে যায়। আপন মনেই এবার বিড়বিড় করে ওঠে, ‘কোইত্থেকে যে এত ঘুম আসে মাগিটার’। তারপরেই আচমকা এক ধাক্কা মারে মরিয়মের গায়ে।

কী রে, কানে শুনস না তুই ? ওঠ তাড়াতাড়ি। বাবু যে কান্দে চোখে দেহস না ?

ধড়মড় করে জেগে ওঠে মরিয়ম। আলুথালু চুল আর টকটকে লাল চোখের কারণে উদভ্রান্ত পাগলের মতো দেখা যায় তাকে। নীল ব্লাউজের নিচের খোলা দুটা বুতাম লাগানোর আগে চিমসান মাইগুলো সামলে নেয় ব্লাউজের ভেতরে। ভ্যাবাচেকা চোখে বোকার মতো তাকিয়ে থাকে পল্টুর দিকে।

চাইয়া দেহস কী ? বাবু কানতাছে, অরে দুধ দে।

ঘুমের সময় দিমু নে। অহন আর খাইব না।

তাইলে কান্দে ক্যান ? পোলাপাইনের কান্দা আমার সয় না।

মানিকের শইলডা বেশি ভালা না। গাডা কেমুন আগুনের মতো পুইড়া যাইতাছে। তাই কানতাছে মনে হয়। তুমি আইছ কখন ?

মরার মতো ঘুমাইলে কি আর হুঁশ পাওন যায় ? তুই আইজ কামে যাস নাই ?

মানিকের এই অবস্থায় আমি যাই ক্যামনে ? তোমার বাপে তো বুড়া হইয়াও ঘ্যান ঘ্যান করে সারাদিন। পোলাপাইনের মতো সারাদিন ধইরা আমারে জ্বালায়। মানিকরে কার কাছে থুইয়া যাই ? তুমি তো সারাদিন ঘুইরাই বেড়াও। কামডা কী তোমার ? একটু ঘরে থাকলেও তো পারো। 

পায়ের কাছে উপুড় হয়ে থাকা একটা টিনের বালতিতে সজোরে লাথি মারে পল্টু। তিন হাত ছিটকে গিয়ে টিনের বাসন-কোসনে হুংকার তুলে গড়াগড়ি খায় ওটা। প্রচণ্ড জিদের ঠেলায় পা চালালেও একটু চোটও লাগে বুঝি। সত্যিই তো। মরিয়ম কিছু মিথ্যা বলেনি। পল্টুর হাতে তেমন কাজ-কর্ম নেই। খোঁড়া পা আর ভাঙা শরীর নিয়ে তার কামাই একদম পড়ে গেছে। মরিয়মের কাজে না যাবার সংবাদে উল্টা সংসারের অর্থনৈতিক ভিত ভেঙে পড়ার আশঙ্কায় ভীষণ শঙ্কিত পল্টু তাই অযথাই খেঁকিয়ে উঠছে আজকাল। তবে তার এ কর্মহীন বসে থাকা আর চরকির মতো ঘুরে বেড়ানোর জন্যে তো মরিয়মও কিছুটা দায়ী।

পর্দার ওপাশ থেকে খুনখুনে গলায় যে অচল বৃদ্ধ মানুষটা কঁকিয়ে যায় সে পল্টুর কাজের ওস্তাদ; যাকে সে এখন বাপ বলে জানে। আর জন্ম না দিলেও বাপই তো! কারণ সে তাকে মানুষ করে এনেছে এই পর্যন্ত। মরিয়ম ওসব কিছু জানে না বলে বাপ জ্ঞান করেই খেতে দেয় এখনও। চিকন একটা কাঠের চৌপায়ায় তেলচিটে মাদুরের ওপর কাতরাচ্ছিল বৃদ্ধটা। একটু শান্ত হয়ে ঝিম মেরে কান খাড়া রেখে পল্টুর সেসব কথা শোনে। 

মরিয়ম দুইডা খাইতে দিলে খাই নাইলে পইড়া থাকি। খামাখা অর লগে ফাল পাড়স ক্যান ? একটা কাজ কামের সন্ধান করলেও তো পারস। এত্তগুলান মানুষ একজনার ওপরে … মানুষটার কথা শেষ হবার আগেই কথা লুফে নেয় মরিয়ম, ‘আমি গতর বেইচা খাইটা মরি, আর উনি ফুলবাবু সাইজা খালি ঘুরবেন’।

বেড়ার গায়ে মাথা রেখে ফুঁপিয়ে কথাগুলো বলে যায় মরিয়ম। থেমে থেমে ওঠা কান্নার মাঝেই মানিককে পরম আদরে বুকে আগলে নেয় সে। শত সান্ত্বনাও তাকে থামাতে পারে না। আর এর মধ্যেই হঠাৎ ঢুলু ঢুলু পল্টুর দিকে নজর যায় মরিয়মের। তাতেই দারুণ ক্রোধে ফেটে পড়ে সে।

ইস, ছাল নাই কুত্তার বাঘা নাম। সংসারে চার আনার জোগান নাই অথচ উনার ফুটানি ষোলো আনা। মানিকের ওষুধ আনার পয়সা নাই, দুই টাকা কামাইয়ের মুরোদ নাই আর উনি নেশা কইরা ফিরছেন।

চুপ থাক মাগি, একদম … চুপ …। 

খোঁয়াড়িভাঙা অবসাদগ্রস্ত পল্টুর শেষ বাক্য আর শেষ হয় না। ‘একদম চুপ’ বলতে বলতেই টলকে সটান নেতিয়ে পড়ে জীর্ণ তক্তপোষের ওপর। ঘুমের মধ্যে চমকে ওঠে কেঁদে কেঁদে ক্লান্ত হওয়া মানিক। একটু জেগেও ওঠে যেন। স্যাঁতসেঁতে ঘরের গুমোট গন্ধ নিঃশ্বাসের সঙ্গে বুকে ভরে নিয়ে নিঃসাড় হয়ে পড়ে থাকে পল্টুর দেহটি। এক সময় তার নিঃশ্বাস আরও ভারী হয়ে যায়। একফালি পর্দার আড়াল নিয়ে ঘরের অন্য পাশ থেকে শতচ্ছিন্ন কাহিল বৃদ্ধ মানুষটা শ্লেষ্মাজড়ানো কণ্ঠে চেঁচিয়ে যেতে থাকে। সেই অক্ষম আহাজারির অর্থ ঘরের চার দেওয়ালের মধ্যে হোঁচট খেয়ে ঘুরে বেড়ায়। নেশার অতলে হারিয়ে যাওয়া পল্টুর কান পর্যন্ত একটা অক্ষরও প্রবেশ করে না।

দুই

ছোট্ট মফস্সল শহর ঢুলিগঞ্জের হল্পাড়ায় এলে সত্যিকার শহরের সিকিভাগ স্বাদ-গন্ধ পাওয়া যায়। ব্যস্ত এলাকাটার এখানে ওখানে জমজমাট কিছু বিপণিবিতান দাঁড়িয়ে গেছে খেয়াল খুশিমতো। রাতারাতি দাঁড়ানো এসব মার্কেটের অন্যপাশে বিশাল হাসপাতাল চত্বর। জীবন বাঁচাতে কিংবা জীবন সাজাতে শহুরে মানুষগুলোর জীবিকার অনিবার্য অনুষঙ্গ-উপাদানগুলো এখানে থরেথরে সাজান। জীবনের দ্বন্দ্ব-সংঘাত, দ্রোহ-বিগ্রহ এখানে চলে জৈবিক চাহিদা ও দিনানুদৈনিক টানাপড়েনের সঙ্গে সমানুপাতে, সমানতালে।

জীবিকার তাড়নায় এ রকম একটি জায়গায় আগেই শিকড় গেড়ে নেওয়া মরিয়ম তাদেরই একজন। কমলিনী সিনেমা হলের বাইরে ব্যস্ততম সড়কের পিঠে ফুটপাতের এক কোণে তাই নিজের মতো করে ব্যবসা সাজিয়েছিল মরিয়ম। পল্টুর সঙ্গে আলাপ পরিচয়ের আগে এক পেটের খোরাক জোগাতে এটা তার জন্য যথেষ্টই ছিল। মরিয়মের আগে পিছে কেউ নেই, ছিল বলতে তিনবেলা বেঁচে-বর্তে থাকবার এক টুকরো স্বাধীনতা। নিজের ক্ষুন্নিবৃত্তির জোগান দিতে গিয়ে নিজের মতো করে গুছিয়ে নিয়েছিল সব।

আর হলপাড়াটা তো খুব সুবিধার জায়গা নয়। এক হাতে ব্যবসা চালাতে গিয়ে অনেক আজেবাজে লোকের পাল্লায়ও পড়েছিল মরিয়ম। কিন্তু, বরাবরই ওসবের থোড়াই কেয়ার করেছে সে। শুধু মাঝে মাঝে অবস্থা বুঝে তার জীবিকার জায়গাটির দখল পাকাপোক্ত করে রাখতে নিয়মিত মাসোহারা গুনে দিতে হতো হলের লোকদের। নবায়নের এ সুযোগে অবশ্য মাঝে মাঝে তার মাগনায় সিনেমা দেখার সুযোগ ঘটে যেত। তাছাড়া পুলিশ কিংবা স্থানীয় কিছু উটকো মাস্তানের বাড়তি যন্ত্রণা তো ছিলই। সবকিছু একা সামাল দিয়ে মরিয়ম অবশেষে থিতু হয়েছিল সেখানে। 

একটা ছোট্ট পিঠার দোকান দিয়ে বসেছিল মরিয়ম। সেখানে বিক্রি-বাট্টা একেবারে মন্দ হতো না। দুপুরের শো শুরুর আগে আগে একদল এসে হুমড়ি খেয়ে পড়ত তার দোকানে। আবার সন্ধ্যার শো শেষে একটা তুমুল ভিড়ের চাপ উঠত। একা একা সামলাতে গিয়ে হাঁপিয়ে ওঠায় রাস্তা থেকেই কুড়িয়ে নিয়েছিল শিবুকে।

হলমালিকেরা নতুন সিনেমা নামালে মরিয়মের ভেতরে ভেতরে খুশির বন্যা বয়ে যেত। বরাবরই সে চাইত যেন সপ্তাহের পর সপ্তাহ হলপাড়ায় ভিড় লেগে থাকুক। আর ঈদ, পূজা-পার্বণ হলে তো কোনও কথাই নেই। ব্যবসা রমরমা। হলকে ঘিরেই ছিল তার জীবিকা, চারপাশের এ মানুষগুলোর মাঝেই লুকিয়ে ছিল তার জীবন।

পল্টুকে এখানেই প্রথম ঘুরঘুর করতে দেখেছিল সে। ঢ্যাঙা হালকা গড়নের একটা মানুষ চোখে চাপা তেজ নিয়ে ইতস্তত ঘুরে বেড়াচ্ছে। প্রথমে খুব একটা আমলে নেয়নি সে। একটু দূরে দাঁড়িয়ে থেকে দেখেছে ভিড়ের চাপ আন্দাজ করে হঠাৎ মানুষটা উধাও। আবার দেখা দিয়ে কিছুক্ষণের মধ্যেই হারিয়ে যাচ্ছে অন্য ভিড়ের মধ্যে। ঠিক ভেসে ওঠা ডুবোচরের মতো―এই আছে, এই নেই। 

প্রথমে তার মনে হয়েছিল লোকটা বুঝি টিকিটের দালাল। পরক্ষণেই আবার ভেবেছে, মফস্সল টাউনের সিনেমা হলের ভিড়ইবা কী―তার ওপর আবার দালাল। শিবু যখন মরিয়মের কানে কথাগুলো তোলে আস্তে আস্তে সব খোলাসা হয় তার কাছে। শুধু কমলিনী সিনেমা হলের সে এলাকা নয়, বরং তার চারদিক ঘিরে যত গলিঘুঁজি রয়েছে সবখানেই সেট করা আছে পল্টুর দলের লোক। হেন কোনও খারাপ কাজ নেই যা তারা করে না―মদ, মাদক, মেয়েছেলে সব কিছুরই নাকি সংস্থানদাতা সে। মরিয়মের পিঠাঘরেও দিব্যি খেয়েদেয়ে বেশ বাকি করে ফেলেছিল সে। শেষমেশ শিবুর ইশারায় মুখ ফুটে কিছু বলেনি মরিয়ম। সেই থেকে পল্টু বা তার দল সম্পর্কে একটা জানাশোনা হয়ে গেছে তার। আর পল্টুও ঘন ঘন কাজের খাতিরে এদিক সেদিক আসা যাওয়ার কারণে একসময় কাছ ঘেঁষে মরিয়মের।

মরিয়ম ও পল্টুর মধ্যে কোনও ঘনিষ্ঠতা বা এর চেয়ে বেশি কোনও নির্ভরতা ছিল কি না সেটা জানা যায়নি তবে বিপত্তি বাঁধে সেইদিন। একদিন ছোকরা বয়েসি একজনের পকেট কাটতে গিয়ে হাতেনাতে ধরা পড়ে গেল পল্টু। ছোকরাটা এসেছিল একটা বড় দলের সঙ্গে সিনেমা দেখতে। সিনেমা দেখে উৎফুল্ল চেহারা নিয়ে দলটি কেবল হল থেকে বেরিয়েছে। কিন্তু, ঠিক বুঝতে না পেরে পল্টু যেই না হাত দিয়েছে অমনি ধরা পড়ে যায় ওদেরই অন্যজনের কাছে। আর রক্ষে নেই।

পরের ঘটনাগুলো অ্যাকশন সিনেমার মতো ঘটে যায় মুহূর্তে। সিনেমার শেষ দৃশ্যের মতো ঠিক পুলিশ আসার আগে একটা ল্যাম্পপোস্টের সঙ্গে পিছমোড়া করে হাত বাঁধা ছিল পল্টুর। আহা, সেই কী মার। এখনও মনে করলে রক্ত হিম হয়ে আসে শরীরের। গায়ে কাঁটা দিয়ে ওঠে মরিয়মের। প্রচণ্ড মার খেয়ে গালে পিঠে কালসিটে দাগ পড়ে গিয়েছিল তার। পরে জানা যায়, গণপিটুনিতে বাম পায়ের হাড় ভেঙে একেবারে অচল হয়ে পড়েছিল বিছানায় অনেকদিন।

প্রায় তিন সপ্তাহ দেখা নেই পল্টুর। বস্তিতে পল্টুকে দেখারও কেউ ছিল না। শুধু বুড়ো ওস্তাদ প্রথম থেকেই লেপটে ছিল তার সঙ্গে। বুঝ হবার পর থেকে ভালোমন্দ সবকিছুই তো দেখছিল লোকটা। ব্যস, কোনও কথা নেই। পঁচিশ দিন বাদে পল্টুর ঠিকানা খুঁজে গাট্টি-বোঁচকা বেঁধে নিয়ে মরিয়ম সুড়সুড় করে হাজির হয়ে যায় তার ঘরে। আগের কোনও বোঝাপড়া নেই, ভাব-ভালোবাসার চিহ্নমাত্র নেই শুধু অদ্ভুত এক পারস্পরিক নির্ভরতার ছুতো নিয়ে মরিয়মের এ হঠাৎ আগমনে বস্তিতে তেমন তোলপাড় সৃষ্টি হলো না। বস্তির জীবন অমনই যার সংজ্ঞা কোথাও লেখা থাকে না। সিনেমার মতো সেখানে কোনও বিরতি নেই, শুধুই বিরামহীন ছুটে চলা। সেই থেকে ওদের তথাকথিত সংসার, বনিবনার শুরু।

তিন

অনেকদিন আর হলমুখো হয়নি পল্টু। ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে উঠলেও তার বাম পা’টা চিরজীবনের জন্য খোঁড়া হয়ে গেল। সঙ্গে মেজাজটাও হলো আগের চেয়ে চড়া। পল্টুর জীবনে হঠাৎ ধেয়ে আসা অন্ধকারকে অলৌকিক প্রাপ্তি মনে হয় তার, যার জন্য সে মোটেই প্রস্তুত ছিল না। জীবনটা এমন অন্ধকারের হবে তা আগে জানলেও আয়-উপার্জন তো বাঁধাধরা কিছু ছিল না। অথচ এখন অনন্যোপায় হয়ে মরিয়মই টেনে নিয়ে যাচ্ছে সে সংসারের নড়বড়ে চাকা। এদিক থেকে মরিয়মের প্রতি তার নির্ভরতা বেড়েই চলছিল দিনশেষে।

পল্টুর দলের বাইরের কিছু ছেলে ক’দিন ধরে বেশ উত্ত্যক্ত করে যাচ্ছিল মরিয়মকে। ততদিনে সব স্পষ্ট জানা হয়ে গিয়েছিল তার। সে তো এই অচ্ছেদ্য অদৃশ্য চক্রের বাইরের কেউ নয়। পল্টুর বিরুদ্ধ পক্ষ মাঠ দখল করতে চাইছে বিষয়টা এখন পরিষ্কার। আর তখনই সিদ্ধান্তটা নিয়ে নেয় মরিয়ম। ব্যবসাপাতি চাঙ্গে তুলে সব কিছু গুটিয়ে নিয়ে পুরাদস্তুর নির্ভর হয়ে পড়ে পল্টুর অনিশ্চিত কামাইয়ের ওপরে। এই ধাক্কাও ক্রমশ সয়ে নেয় পল্টু।

আসলে নিত্য অভাব-অনটনের নৈমিত্তিক যুদ্ধের পাশাপাশি একটা বিবদমান পক্ষকে সামাল দিয়ে শঙ্কিত হয়ে বেঁচে থাকতে হয়। সামাজিক সংঘাতের দুর্বোধ্য চক্রে এ ধরনের অদৃশ্য যুযুধান পক্ষগুলো কখনই সন্ধি-শর্তে বাধ্য নয়। তাই এভাবেই পালিয়ে বাঁচিয়ে এক ধরনের চেষ্টা করতে হয় পল্টুদের।

আজকাল ছিঁচকে হাত সাফাইয়ের কাজটা পল্টুর আর ভালো লাগে না। একটু ভিন্ন ধরনের বড় কারবারের ধান্দা খুঁজে নিতে চায় সে। আগে এক সময় ভালোই কামাই ছিল তার। কিন্তু, খুঁড়িয়ে চলা জীবনের সঙ্গে তাল মেলাতে গিয়ে এখন আর ধাতে সয় না, মোটেও পোষায় না তার। ধীরে ধীরে সে তার ওস্তাদ রুস্তমের আসনে পাকাপোক্তভাবে নিজেকে বসিয়ে নেয়। কয়েকটা ছেলে ওর হয়ে কাজ কারবার করে, ফুট ফরমায়েশ খাটে। বাকিরা ভিড়ে গেছে অন্য দলে। কাজের জায়গা আগের চেয়ে গুটিয়ে এনেছে সে। তাই তার খিচখিচানিও বেড়ে উঠেছে ইদানীং। 

দিনশেষে ছাপরায় ফিরে পল্টু নানান গল্প ফেঁদে বসে মরিয়মের কাছে। আয় রোজগারের উপায় খুঁজে বেড়াচ্ছে এ বুঝটাই যেন সে দিতে চায় মরিয়মকে। তাছাড়া খিঁচ ওঠা মেজাজে মরিয়মের ওই থলথলে শরীরের সঙ্গে শুয়ে খুব একটা জুত পায় না আজকাল। আসলে কামাই না থাকলে তার চড়া মেজাজের কেউ ধার ধারে না। তখন মরিয়মের কথার খোঁচাই লাগসই হয়ে ওঠে। এক সময় চুপসান বেলুনের মতো ফুটুস হয়ে লেংচান নেড়ি কুত্তার মতো শুয়ে পড়ে বিছানায়।

পল্টু আজ তাড়াতাড়ি বস্তিতে ফিরে এসেছে। প্রতিদিন সন্ধ্যাশেষে জয়নালের রিকশার গ্যারেজে তাদের ভাগ-বাটোয়ারা হয়। তাদের বলতে হলপাড়ার সামনে ও পেছনের গলির দিকটায় কাজ করে আজগর। চতুর শিয়ালের মতো ধূর্ত সে। চিলের মতো ছোঁ মেরে হাত সাফাইয়ের কাজটা বাগিয়ে নিতে পারে। এছাড়া আছে আরও কয়েকজন; শিবু, বেলাল, বিল্টু আর শামসু। বেলাল ও শামসু সামলায় হলপাড়ার উত্তর-পূর্ব কোনাসহ গোটা বিপণিবিতানের কাছটা। তরুণীদের প্রচুর ভিড় থাকায় ভালোই কামাই হয় ওদিকে। আর সিনেমা হলের ঠিক বিপরীতে অর্থাৎ একেবারে দক্ষিণ প্রান্তে হাসপাতালের বিশাল এলাকায় কাজ করে শিবু, বিল্টুসহ আরও কয়েকজন।

পল্টু শুধু খোঁজ রাখে কেউ কোথাও বিপদে পড়ল কি না! ব্যস, বাকি দায়িত্ব তার। মুরগি বাদলের দলের সঙ্গে একটা অলিখিত সন্ধি আছে তাদের। আর তা হলো, কেউ কোথাও বিপদে পড়লে তারা উভয় দল মিলেমিশে সেসব সামলে নেবে। কিন্তু, এতসব খবর মরিয়ম জানে না। পল্টুই হয়ত জানতে দেয় না তাকে। মরিয়ম এখন ক্ষুধা নিয়ে হলেও সম্মানের সাথে বেঁচে থাকতে চায়। আর তাই তো পল্টুকেও বুঝিয়েছে সে জগৎ থেকে ফিরে আসতে। 

জয়নালের গ্যারেজে বিল্টু আসেনি। শিবুই জানায়, কী যেন সমস্যা আছে তার। তবে ভাগ-বাটোয়ারা শেষে যে যার মতো হিস্যা বুঝে নিলে পল্টু তড়িঘড়ি করে বিদায় করে দেয় বেলাল আর শামসুকে। কিন্তু, শিবু থেকে যায় তার সঙ্গে। বিল্টু না আসায় ভাবছে ওদিকটা সে নিজেই সামাল দেবে কি না ?

আয়-উপার্জনের একটা পথ বের না করলেই নয়। যদিও ইদানীং পল্টুর উপায় করা টাকা সব ওই নেশার পেছনেই সর্বস্বান্ত হয়। এদিকে বেলাল আর শামসু আঁতকে উঠেছে পল্টুর কাজে নামার কথা শুনে। পইপই করে তারা নিষেধ করে দিয়েছে; ‘ওস্তাদ খবরদার, ওই রিস্ক নিতে যেও না। পাবলিক এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি সতর্ক। একেবারে কাটা পড়ে যাবে’। এ কথা শুনে শিবুও বেশ আপত্তি জানায়, ‘খোঁড়া পায়ে তোমার না যাওয়াই ভালো ওস্তাদ। পাবলিকের নাগালে একবার পড়লে আর রক্ষে নাই। হাত ফসকে বের হওয়া মুশকিল। এ বড় কঠিন কাজ গো ওস্তাদ’।

দীর্ঘক্ষণ কেউ কোনও কথা বলে না। শিবু পল্টুর গা ঘেঁষে উদাসীন চোখে বসে থাকে। এক সময়ের তেজী বাঘের দুর্দশার দৃশ্যটা সিনেমার পর্দার মতো চোখের সামনে ভেসে ওঠে শিবুর। একজনের ভেঙে পড়া সে সাম্রাজ্যের দখল নিতে মরিয়া শিবুর চোখে তখন নতুন সূর্যের অন্যরকম তেজ ঝলকানি দিয়ে যায় বারবার।

পল্টু আর শিবু অনিশ্চিত অপেক্ষা নিয়ে বসে থাকে অনেকক্ষণ। বসে থাকে নতুন জীবন শুরুর অপ্রত্যাশিত যাত্রায়। জীবনের রূঢ় বাস্তবতাকে হালকা করে নিতে চায় দুজনেই। তাই গলায় এক-আধটু চোলাই ঢেলে জীবন উপভোগের বহুদিনের পুরনো অভ্যাসটা ঝালিয়ে নিতে চায় আরেকবার। সে আশায় দুজনেই অধীর হয়ে অপেক্ষা করতে থাকে জয়নালসহ আরও কয়েকজনের জন্যে। কিছুক্ষণ পরেই যে শুরু হবে তাদের নতুন করে বেঁচে থাকার আশা কিংবা দ্বিতীয় জন্মের মরীচিকা।

চার

সূর্যের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেলা তেতে উঠেছে ভীষণ। আর সে রোদের উত্তাপ নিয়ে পাখির ছানার মতো ছটফট করে চলেছে ছোট্ট মানিক। গতকাল রাতে পল্টু ফিরে আসেনি ঘরে। তাই মানিকের সঙ্গীন অবস্থার কথা তাকে জানানো সম্ভব হয়নি। এমনিতেই বেশ কয়েকদিন কাজে যাওয়া হয়নি মরিয়মের। কিছু টাকার সংস্থানে মরিয়া হয়ে তাই সে ছুটে যায় তার কাজের বাড়িতে। তবে কাজে গেলেও মন পড়ে থাকে বস্তির ছাপরা ঘরে। পাশের ছাপরার খালাকে আজ বলে এসেছে; কাজশেষেই ঠিক ফিরে আসবে, মানিকের দিকে একটু যেন খেয়াল রাখে।

হাতে নগদ কিছু টাকা নিয়ে কাজশেষে রুদ্ধশ্বাসে বস্তির দিকে ছুটে যায় মরিয়ম। অসুস্থ মানিককে নিয়ে এখনই তার যেতে হবে হাসপাতালের দিকে। দুপুর গড়িয়ে বিকাল হয়ে গেলে আর ডাক্তার পাওয়া যাবে না। তাই মুখে কিছু একটু গুঁজে মরিয়ম মানিককে বুকে নিয়ে ছুটে যায় তার পরিচিত সেই হাসপাতাল এলাকার দিকে। কয়েক বছরে জায়গাটা আগের চেয়ে কত বদলে গেছে। সেখানে পৌঁছুতে তার প্রায় তিনটা বেজে যায়। দুপুরের এ সময়ে লোকের বাড়তি ভিড়ের চাপ একটু কমই থাকে।

ডাক্তারের কক্ষের বাইরে দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষায় বসে থেকে তার পায়ে খিল ধরে যায়। দুপুর বিরতির পর কাউকে তেমন দেখা যায় না। দিগি¦দিক জ্ঞানশূন্য হয়ে সে ছুটে যায় এদিক-ওদিকে, কখনও জরুরি বিভাগের দিকে। না, সেখানেও কাউকে পাওয়া যায় না। এদিকে প্রচণ্ড জ্বরের তাপে মানিকের মুখে সাদা ফেনা ভাঙছে, ছোট্ট বুকের ধুকপুকানি থির হয়ে আসছে ক্রমাগত। নিরুপায় মরিয়ম ভাবলেশহীন বসে থাকে দরজার বাইরে, একেবারে খোলা চত্বরে।

বেলা গড়িয়ে যায়। একসময় মানিকের নিথর দেহটা নিয়ে উদভ্রান্তের মতো সে বের হয়ে আসে হাসপাতালের গেট থেকে। রাস্তার ওপারেই হলপাড়া। সিনেমা হলের বাইরে রঙিন পোস্টার-ব্যানারে ছেয়ে আছে চারদিকের দেওয়াল। মাইকে গান ভেসে আসছে ওদিক থেকে। হল-মালিকেরা নতুন ছবি নামিয়েছে। পল্টুকে নিয়ে একসাথে বিনা টিকিটে দুপুরের শো দেখার কথা মনে পড়ে যায় মরিয়মের। আহা, সিনেমার মতোই কী আশ্চর্য সুন্দর ছিল সেই দিনগুলো।

দুপুরের শো শেষে দলে দলে মানুষ বেরিয়েছে। উপচে পড়া ভিড়ের মধ্য থেকে হঠাৎ তুমুল একটা শোরগোল ওঠে। এই ধর, ধর…। নিয়ে গেলরে সব। পকেটমার… পকেটমার…।

লোকজন তার পেছনে ছুটছে জান বাজি রেখে। মরিয়ম হাসপাতালের গেটে দাঁড়িয়ে দেখে, খোঁড়া একটা ছায়ামূর্তি তার সামনে দিয়ে একজন মহিলার ভ্যানিটি ব্যাগ ছিনিয়ে নিয়ে বিদ্যুতের মতো পালিয়ে যাচ্ছে। খোঁড়া পায়ের কারণে লোকটা বেশি দূর এগোতে পারে না―কিছুদূর গিয়েই হোঁচট খেয়ে হুমড়ি খেয়ে পড়ে। তাকে ঘিরে সংক্ষুব্ধ জনতার উল্লাস ধ্বনি শোনা যায়। ‘মাস্তান’ না কী যেন একটা ছবির দৃশ্যের কথা তার মনে পড়ে গেল হঠাৎ। সিনেমায় দেখা সেই পরিচিত দৃশ্যপটের মতো নিছক দৃশ্য কল্পনা করে হতবিহ্বল মরিয়ম সেখানে দাঁড়িয়েই থাকে।

সচিত্রকরণ : ধ্রুব এষ

Leave a Reply

Your email address will not be published.

shares