গল্প : ব্ল্যাকি : আব্দুল আজিজ

ক.

সূর্যটা ব্যাংকের লোনে দেউলিয়া হওয়া পুরুষের আত্মহত্যার হিমঘরে টলতে টলতে ঢুকে পড়ার মতো অস্ত যাওয়ার আগে, অচেনা কিছু মুখ কাজিয়া দেখার জন্য ভন ভন করতে থাকে। আলো থাকতে থাকতে স্পষ্ট বোঝা যায় তাদের চোখে মুখে বিস্ময়, এর আগে এমন কীর্তিকলাপ তারা দেখেনি। তাবিজ-কবচ আর জোড়া ফণাসহ সর্পমণি অংকিত লোহার লক্কড়ঝক্কড় ট্রাংকে সাপের ছোট বড় কাঠের খুপরি বাসস্থান গুছিয়ে নিতে থাকে মোঁচারু বাইদ্যা। সেও মিট মিট করে তাকায়, কাজিয়া করা মেয়েদের সঙ্গে এই মোঁচারু বাইদ্যার আলাপ থাকলেও তার দৃষ্টি অন্যত্র  হাঁকিয়ে দুম করে উঠে পড়ে। পেচ্ছাপের চাপ ধরে রাখার মতো অসহ্য যন্ত্রণা জগতে নাই, মূত্রথলি ভারী হয়ে গেছে। কটকটে ব্যথা নিয়ে তলপেটে একটা থাবা দিয়ে লক্কড়ঝক্কড় লোহার ট্রাংকটা বাঁ পা দিয়ে সরিয়ে চলে গেল মুদি দোকানের পেছনটায়। সে অপেক্ষা করছে সাঁঝ লাগার আগে আগে যদি কাজিয়াটা লাগে তাহলে দেখে যাবে।

এ এমন একটি ভ্রাম্যমাণ চরিত্র, নামে না পরিচিত হলেও ঠিক পদবি নিয়ে (মোঁচারু বাইদ্যা) রাজাবাড়িহাটে ব্যবসা করছে বেশ কয়েক বছর ধরে। সাধে কি ও এখানে এসে পড়ে আছে  তার ভেতরেও রয়েছে চরম গুপগুপি। সে ব্ল্যাকির মাল কিনে এবং তার বড় দুই ছেলেকে ব্ল্যাকির মাল বিক্রির তালিম দিয়ে ছেড়ে দিয়েছে অন্যান্য স্থানে, যেখানে রোজগারের ফাঁক বেশি আর ব্ল্যাকির মালের গাহাক মেলাই। তারা তানোর, কাঁকনহাট কিংবা রহনপুর, পোরশা আর নাচোল অথবা সোনাইচণ্ডির  হাটগুলোকে টার্গেট করে। সেইসব স্থানে কলবল করে ঢুকে যায় তেলুক গলার ললি। জাদুমন্ত্রের মতো তাদের মুখস্থ কথা বাস্তবে একেবারে ফলিয়ে দেয়, জড়ো হওয়া মানুষের ব্যক্তিগত আঁধারগুলোতে। মানুষ ও জন্মের বোকা তারা মোঁচারু বাইদ্যার ছেলেদের কাছে কথার চোটে নাস্তানাবুদ হয়ে যায়, তাদের সঙ্গে কোনও মেয়ে বাইদ্যানী না থাকলেও তারা দুই ভাই দারুণ এক্সপার্ট হওয়ার কারণে তুলকালাম বাঁধিয়ে ফেলে। ইদানীং দুই ভাই প্যান্ট শার্ট পরে হাট মাড়িয়ে বেড়ায়, পায়ে চামড়ার বাটা স্যান্ডেল, আর তাদের অনামিকা মধ্যমায় আটকে থাকা চকচকে পাথরের আংটি দ্যুতি ছড়ায়। ইচ্ছে হলে কখনও বিয়েতে পাওয়া সোনালি রঙের হাতঘড়িটি পরলেও বাম হাতের কব্জিতে তা ঢলফল করে, জুত হয়ে বসে থাকে না। বয়ান শুরুর আগে আড্ডায় মানুষের জমায়েত বাড়িয়ে একটা বিভিন্ন দেশি বিদেশি সাপের ছবিসহ লেমনেটিং করা মোটা অ্যালবাম বের করে সবাইকে দেখায়। বলে তারা নাকি আসামের কামাক্ষ্যা মন্দিরের কালী সাধন করা গুরুর শিষ্য, সাপ মুখে নিয়েও খেল দেখাবার শক্তি তাদের আয়ত্তে। উৎসুক জনতা কথার ফুলঝুরি শুনে হুমড়ি খেয়ে পড়ে, আর যখন সাপের বাক্স খোলা হয় তখন সবাই পেছনে সরে যায়। ভয়ে, বিস্ময়ে।

ভাটিবেলা কাজিয়াটা যখন শুরু হলো।

মরন বুইল্যা ডর করিস। খোদা যে তোর জিভ্যা ক্যাট্যা লিবে। লজর এমন দিয়্যাছিল খোদা তোকে, বুইলছে  উুঁ নাকি একা সংসার করে।

লজ্জা কর গুঢ়িপাড়ায় ব্ল্যাকির মাল বেচিস, ফের পহার দেখিস সুন্দর নাঙের।

মিথ্যুক রে মিথ্যুক, তুই মিছা ছেচায় এক্সপাট। তোর না ঘরে স্বামী তাও বুলিস তুই বিনা ভাতারি।

গজব পড়লে সহিতে পারবি ?

আসমান জমিনের কির‌্যা কাটছি। তুই কিন্তু সহিতে পারবিন্যা।

ছি!

ছি বুলিসন্যা, তোর মুখে মুততেও যাব না, সে শক আমার নাই।

রাজাবাড়িহাটের খরচাকা সীমান্ত দিয়ে ব্ল্যাকির মাল নিতে এসে গুঢ়িপাড়ার একদল নারী এই ভাবে কাজিয়া করে। একে অন্যকে গালি দেয়। মুখামুখি থেকে হাতাহাতিতে চলে যায়। কাজিয়ার এসব ভাষা আধুনিক ভ্রাম্যমাণ মানুষের কানে ঢুকে আবার ছিটকে পড়ে। তারা মেয়েমানুষগুলোকে কল্পনা করে এভাবে যে তারা কীভাবে মুখে এসব আবাদ করে চলেছে।

স্থানীয় মানুষেরা কাজিয়া দেখে তাদের তাড়াতে গেলে বলে, কি বুইলছ ? এখানে ন্যাড়া তালতলায় রহা বসাখানও তোমাদের সহ্য হয় না।

কে বুইলছে তোরাকে য্যাতে ও ত্যাতলতলায় বসগা য্যায়ে।

অত দরদ হইতে বুলিনি এই গুঢ়িপাড়ার বিটির‌্যা নিজেদের বসার জাগা ঠিকি ঢুইর‌্যা লিবে। চোখ পাকিয়ে তারা স্থান  পরিবর্তন করে।

বড় পদ্মা, খরচাকা সীমান্ত তারপর ছোট পদ্মানদী, দূর্গাদহ বিল পার হয়ে ব্ল্যাকের মাল আসতে সেই সন্ধ্যা হয়ে যায়।

গুঢ়িপাড়ার মেয়েদের জন্য একটি বাস দাঁড়িয়ে থাকে। এই স্থান থেকে রাজশাহী শহরের দূরত্ব ৮ মাইল। শহরের উপকণ্ঠে এদের বসবাস। তাদের দাবি তারাই রাজশাহীর আদিম বাসিন্দা। ভাষায় তাদের মূল প্রমাণ।

ফুলেরার সঙ্গে যে কজন মেয়ে এসেছে  তাদের সবার বয়স কমবেশি ২৮ থেকে ৩০ এর কাছাকাছি।

ফুলেরা তাদের উদ্দেশ করে বলে এতক্ষণ ধইর‌্যা বইস্যা আছি ছুড়ির‌্যা বুলিসন্যা ক্যান কদান তাস খেলা হইতোক, গহাতে বুঝি আন্দাজ থাকে না ?

পাশে থেকে অন্য একটি মেয়ে টিপ্পনী কাটে মানুষের মনে রং খেললে কি আমরা খেলার রং ধরাইতে পারব। খিলখিল হাসিতে চারপাশ ভরে ওঠে।

ফুলেরা উন্মাদের মতো সেই মেয়েটির চুলের মুঠি ধরে। চেঁচানি  শুরু হয়। এই মাগী ছাড়, কি বুইলনু তোকে, আটে তোরা দেখছিস কি ছুটা ছুটা আমাকে মাইরে ফেলবে যে, অর আইজ বিষ উঠ্যাছে। ফুলেরার গড়ন দোহরা হাড়ের, মাঝবয়েসি পুরুষরাও তাকে পেরে ওঠে না।

এসব শুরু হলে আশপাশ থেকে তালি পড়তে শুরু করে।

মানুষজন হো হো করে চিল্লাতে থাকে। ল্যাগ্যাছে রে ল্যাগ্যাছে।

কাজিয়া দেখে জুটে যাওয়া বান্দারা বলে ও দ্যাখ লাগিনী লাগিনী ল্যাগাছে।

তাদের ঝগড়া দেখে যারা অভ্যস্থ নয় কিংবা কখনও দেখেনি তারা আশপাশের দোকানদারকে জিজ্ঞাস করে ওরা কাজিয়া করছে ক্যান ?  কোনও কোনও দোকানদার হেসে বলে ওরা ওরকমি বজ্জাত একেকটা।

দিব্যি কাজিয়া শেষে ওরা আবার একসঙ্গে তেঁতুলতলায় বিড়ি ফুঁকে। রঙ্গ তামাশায় মেতে যায়। অশ্লীল শব্দ তাদের রসের ভাণ্ডার। সত্যি বলছি কিন্তু, খোদ্দার কির‌্যা।

খ.

হাটের দিন পান সিগারেটের দোকানে ভিড় খুব। মিষ্টির দোকানগুলোতেও একই অবস্থা। এদের মধ্যে আদিবাসী সাঁওতালদের সংখ্যা বেশি। দেখা যায় তাদের মহিলাদের আঁচড়ান চুল, একছেটি করে পরা কাপড়ের সঙ্গে হাতে নকশা কাটা ধবধবে সাদা শাঁখা, গলায় কানে চান্দির গহনা আর সিঁথিভরা সিঁদুর দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে। হ্যাঁ এটুকুই সাজগোঁজ। মজু যার এই রাজাবাড়িহাটে ছোট একটি পান সিগারেটের দোকান। দোকান ছোট হলে কী হবে, চলে বেশ রমরমা।

সেদিন শুক্রবার বলে দুপুরের দিকে মানুষের যাতায়াত ছিল কম। যে স্থানে বাস থামে সেখানে কিছু সাঁওতাল নারী কৃষক আর গুঢ়িপাড়ার যাত্রী দাঁড়িয়ে।

রাজশাহীর দিক থেকে একটি বাস এসে যাত্রী উগলে চাঁপাইনবাবগঞ্জের দিকে চলে গেল।

যাত্রী নামল মোটে দুইজন। একজন মাঝারি গড়নের বুড়ো আর সঙ্গে এক যুবতী মহিলা। যুবতীটির চালচলনে বুঝা গেল সেও গুঢ়িপাড়ার মেয়ে কিন্তু নতুন। এই এলাকায় প্রথম।

মজু দোকান সেটে মুখে পান গুঁজছিল। এরই মধ্যে সেই বুড়ো তার দোকানের সামনে এসে দাঁড়ালো। হাতজোড় করে প্রণাম করল। যুবতীটি পেছনে দাঁড়ানো। মজুকে দেখে সে হাসছিল।

বুড়োটি যুবতীর হাসি বুঝতে পেরে  পেছনে মুখ ঘুরিয়ে বলল অহ ছুড়ির মুখে দিব লাথ।

যুবতীটি কিছুক্ষণ হাসি থামিয়ে আবার হাসল। সে হাসির কোনও শব্দ ছিল না। তার হাসি দুই ভ্রু আর ঠোঁটের কোণে চমকে উঠল।

মজু যুবতীটির হাসি দেখে পানের পিক ফেলল। চাচা কিছু বুইলছে নাকি ?

হ্যাঁ গো কিছু বুইলব। ব্ল্যাকির মাল কোন জাগায় পাব ? ব্যবসা নতুন লয় কিন্তু গুঢ়িপাড়ার ছুড়িদের কাছে জিনিস লিলে মেলা দাম ল্যায়। ঠকায়। তাই এই জাগার নাম শুইনা আনু।

বুড়োর সঙ্গের যুবতীটি তার কথা শেষ হবার পর বলল বুড়্যা তুমি ঠইকব্যা না তো কি … বলতে গিয়ে থেমে গেল।

হ্যাঁ চাচা এই খানে ব্ল্যাকির মাল পাওয়া যায়। ঐ যে ত্যাতলতলার পেছনে সবাই বসে আছে। আইজ মাল আসা বন্ধ। কাইল পাইবেন গে। ওখানে গিয়্যা গাইড়া বইসেন। খান। ঘুমান। দিশ্যা হইবে। মজু বলল।

যুবতীটির নাম বেলি। তার দিকে তাকিয়ে বুড়োটি বলে উঠল চল বেলি। হ চল, চোলাইত যাছি। বেলি আড়চোখে মজুর দিকে তাকাল। মজু বেলিকে দেখে পানের পিক জোরে দূরে আওয়াজ করে ফেলল। বেলি হেসে সেই মাঝারি গড়নের বুড়োকে অনুসরণ করে চলে গেল।

প্রতিবারের মতো শেষ আশ্রয় রাজাবাড়িহাটের মুক্তিযোদ্ধা অফিসের টিনের বারান্দা। সেখানে মোটা পলিথিনের একটা ঘের দিয়ে ঘরের মতো বানিয়ে একসঙ্গে গুঢ়িপাড়ার পুরুষ এবং মহিলারা চাপাচাপি করে রাত কাটিয়ে দেয়। এটা তারা প্রায় করে, তাছাড়া এখানে একরাতের জন্য ঘর ভাড়া করে থাকা তাদের লাভের ধানে টিয়া বসানোর মতো। তাদের কথা হলো যেখানে রাইত সেখানেই কাইত। এই সিস্টেম দেখে অনেকেই বলাবলি করে ওরা বাজে মহিলা বলেই পরপুরুষকে সঙ্গে নিয়ে শুতে পারল।

তার পরের দিনের ঘটনা। বেলি মজুর দোকানের সামনে তার সামগ্রীর ঝাঁকা নামিয়ে ঝুঁকে পান চাইল। পান দাও।

ঐ ছুড়ি ও বটা তোর কে লাগে ? বেলি মুখে পান গুঁজে সুপুরি টুকরো দাঁতের তলায় দিয়ে জিব্বায় চুন লাগাল। তারপর ড্যাবড্যাব করে মজুর দিকে তাকিয়ে বলল ও আমার স্বামী গো। প্যাচপ্যাচ শব্দ করে পিক ফেলে মজুর দোকানের খুঁটি ধরে আবারও হেলে পড়ল বেলি।

এ ম্যা ঐ বুড়্যাডা তোর ভাতার, ভ্রু তুলল মজু। কোমরে হাত ঘুরিয়ে বলল হ্যাঁ, ঘরে দুই ব্যাটা আছে ওর অরিশ, আমার গর্ভে জন্ম বিশ্বাস হয় ন্যা। এজ্জা তাহিলে কেমুন কইর‌্যা বিশ্বাস করাব গে। গাল ভাঙা হাসি, কপালে হাত, কাচের চুড়ি বেজে উঠল, আমি বেলি হিন্দুর বেটি ছোড়ার বয়েস একটু বেশি কিন্তুক জুয়ান ছিল গে নাহিলে আমার কোঁখে দুই ব্যাটা। দেখ্যাছিল্যা দুকানদার তুমার সঙ্গে  কথা বুইলব্যার সময় ক্যামুন কইর‌্যা বুড়্যার চোখ পরীক্ষ্যা করছিল, বুইঝ্যাছ ? আবার কোমর ভাঙা ইঙ্গিত।

ও কত বুড়্যা চড়াইনু, আইজ থাইক্যাকি দুকান করি ঐ যে ত্যাতলতলার মাগীর‌্যা কাইয়্যার মতন ক্যা ক্যা কইর‌্যা গুর ঝুক্যাইয়্যা কাইজ্জা করে ওরা তো এখ্যানে মানুষ এই মজুর দুকানে।

ও কমলা মাগী বিড়ি খোরনি, পাক্কা খানগি গাইল দিব না বিটি ছ্যালা জাইত, তোমার সোনার অঙ্গে লাগতে পারে। উুঁ ঢেমনি বিড়ি খাইয়্যা এখন টাকা দিতে পারে না, ওদের কাছে টাকা নাই আমি বিশ্বাস করব!  টাকা চাহিতে গেলে গা ঘেঁষিয়ে দিল, আমি বুঝিন্যা ওদের ছলা কলা।

বেলি বলল আমার ছলা কলা নাই বুঝি দুকানদার, তারপর মুখে কার্তিকের হাসি ক্ষুর ধারালো।

অনেকক্ষণ রঙ্গ তামাশার পর খিকখিক করে হাসি শেষে-তুমি তো মুছলমানের ঘরের ব্যাটা, আমি হেন্দু ঘরের বহু বেটি, লাগরগিরি করিওনা মরদ বলে চ্যাপ্টা জিব্বাহ চুন লাগাবার জন্য সাপের মতো বের করল বেলি। পান চিবুবার চপর চপর শব্দ শুনে মজু বলল তোর আওয়াজ খান কত মিঠ্যা, যেনে গানের সুর বইহ্যা যাইছে। বেলির উদাম বুকের রেখায় এমিটেশনের মালা ঝুলছে তা দেখে মজু  বলল মালাখানটা তোর বুকের উপর এমন সোন্দর লাইগছে রে, কি বুলব। বেলি উত্তরে বলল মালাখানটা লাওয়ার ব্যবস্থা করো তুমাকে দিয়া দিছি। খিকখিক হাসি। এই কথা শোনার পর মজু বেলির শরীরের অন্যান্য অংশের অশ্লীলতায় ভরা রসালো  প্রশংসা করতে থাকে। তা শুনে বেলি আবার বলে ও তোমার মন ভুলানো কথা দুকানদার, টাকা লিব্যানা ল্যাও ল্যাও বলে বেলি তার বুক মজুর দিকে এগিয়ে দেয়। বেলির খোলা বুকের দিকে কুয়াতে পানি দেখার মতো ঝুঁকে এল মজু , তারপর বলল যা বেলি, তোর আইজকার পানের দাম মাফ।

গ.

আশির দশকের শেষ দিকে আব্দুল হান্নান রাজাবাড়িহাটে এসে এই ব্ল্যাকির কারবার দেখে হতভম্ব হয়ে যান। ছাত্র বয়সে ছাত্র ইউনিয়ন করার জেরে পুলিশের ভয়ে পালিয়ে বেড়ান বিভিন্ন  অঞ্চলে। তারপর কীভাবে যেন বদলে ফেললেন নিজেকে, ইউনিয়ন ফিউনিয়নের ভূত ভাগিয়ে লম্বা চুল স্কয়ার করে কেটে দাড়ি ছেচে ক্লিন সেভ করে দ্রুতই নিজেকে পালটে ফেললেন। তিনি যে সংগ্রাম ও স্বপ্নের বাস্তবায়নের জন্য পুলিশের মার খেয়ে, সাধু সন্ন্যাসীর মতো চেহারা করে এ দুয়ার ও দুয়ার ঘুরে বেড়ালেন অবশেষে তার এই মসৃণ চকচকে অবস্থা দেখে তার দলের অনেকেই চমকে যেতে পারেন, কিন্তু কেউ কেউ তো চমকে যাননি কারণ আব্দুল হান্নানের মতো তার সাথকার অনেকেই এই শীতল, সুরক্ষিত ঝামেলাহীন জীবন বেছে নিয়ে ঘর সংসার করছেন। সেই আব্দুল হান্নান  যখন বদলি হয়ে  নতুন জায়গায়  নতুন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হলেন তখন জায়গাটা আব্দুল হান্নানের বেশ পছন্দ হয়ে গেছে। শহর থেকে খানিক দূরে গ্রামীণ পরিবেশ। এখানকার মানুষসব সহজ সরল। আর রয়েছে প্রচুর আদিবাসীর (সাঁওতাল, ওঁরাও, বুনা, ধাঙ্গর ও ডোম) বসবাস।

গ্রীষ্মের প্রথমেই আব্দুল হান্নান অফিসের কোয়ার্টারে পরিবার নিয়ে  উঠলেন। এখানে গরম খুব। গাছপালা যদিও যথেষ্ট রয়েছে তবুও গরম। কোয়ার্টারের পেছনে পদ্মা নদী আর সামনে বিশ্বরোড হাইওয়ে। এইসব সরকারি কোয়ার্টারেও একসময় ব্ল্যাকির মালামালের হাওয়া এসে লাগে, সস্তাতে পাওয়া যায় সেসব ব্ল্যাক হয়ে আসা ওপারের জিনিসপত্র। একদিন হঠাৎ আব্দুল  হান্নান তার জুনিয়র কলিগের কাছে গিয়ে বললেন আলি ভাই আপনার ভাবি একটি পশমি চাদরের বায়না ধরেছে, সে শুনেছে এখানে নাকি অল্প দামে অনেক কিছুই পাওয়া যায়। সবার ঘরে ঘরে পরনের থ্রি পিস, কাপড়সহ বিছানার চাদরটাও নাকি  ইন্ডিয়ান! আলি মুচকি হেসে বললেন জ্বি স্যার ভাবি সত্যটাই বলেছেন, তবে একটা ঝামেলা আছে আপনি হয়ত জানেন কি জানেন না, এখানে আর ব্ল্যাকির মাল পাওয়া যাচ্ছে না। হান্নান সাহেব বললেন কেন―কেন ?

রাজাবাড়িহাটের চেকপোস্টে এক কড়া অফিসার এসেছেন, তিনি নাকি প্রচণ্ড রকম সৎ। কাউকে কোনও প্রকার ছাড় দিচ্ছেন না পিটিয়ে সিধা করে ছাড়ছেন। হাটের ভেতর এক দোকানের সামনে কেরোসিনের ড্রাম উল্টে আগুন দিয়ে দিলেন কারণ সেই কেরোসিন নাকি ভারতে ব্ল্যাক হয়ে যাওয়ার কথা ছিল। তিনি গুঢ়িপাড়ার মেয়েদেরও নাকি মেরে হাগিয়ে মুতিয়ে ছেড়েছেন, যখন ইন্ডিয়ান কাপড়গুলো অফিসারের কাছে দেওয়া হচ্ছিল তখন অফিসার বললেন নিয়ে যা, টাকা দিয়েই তো নিয়েছিস ভাত মারব না বিক্রি করে টাকাটা তুলে অন্য ব্যবসা করিস। এখানে যেন আর কোনও দিন না দেখি। সেই থাকে রমরমা ব্যবসায় ভাটা পড়েছে। আলি কিছুক্ষণ পর বললেন একদিক দিয়ে ভালোই হয়েছে স্যার। আব্দুল হান্নান জানার জন্য উদগ্রীব হয়ে উঠে বললেন কি রকম! আমাদের দেশে  জনগণের চাহিদা থাকা সত্ত্বেও দরকারি জিনিসপত্র ব্ল্যাকি হয়ে চলে যাচ্ছে ভারতে। বিশাল মজার খেলা হয় ব্ল্যাকির ধান্দায়। যখন বাংলাদেশে দাম পড়ছে তখন ভারতে চলে যাচ্ছে আর ওদিকে দাম পড়লে এদিকে  আসছে। মানে একই জিনিস এপার ওপার হতে থাকে, দামের কম বেশির উপর পারাপার নির্ধারিত হয়।  দুধ, চিনি, কিউকারপিন তেল, বিড়ির পাতা, তামাক, রেডিও, মশলা, পেঁয়াজ, থ্রি পিস, কেরোসিন থেকে কাচপেয়ালার জিনিস পর্যন্ত চালাচালি হয়েছে। বাংলাদেশ থেকে যখন কোন নিম্নমানের পলেস্টার কাপড় গেছে, বুদ্ধি করে তারাই আবার সেই কাপড়ের উপর নকশা কিংবা প্রিন্ট করে বাংলাদেশে বেশি দামে পাঠিয়ে দিয়েছে। আব্দুল হান্নান, আলিকে থামিয়ে বললেন, তাহলে তো কেস খেয়ে গেলাম এখানে যেহেতু পাব না অগত্যা গুঢ়িপাড়ায় যেতে হবে। আপনি কি গুঢ়িপাড়া গেছেন কখনও ? আলি বললেন আমি তো কখনও যাইনি তবে ঠোরে ঠোরে গেলে ঠিকই চিনতে পারব। তাহলে কালই সকালে চলুন, আলি মাথা নাড়লেন, আচ্ছা স্যার―।

পরদিন সকাল ১০ টার দিকে একটি লোকাল বাসে উঠলেন আব্দুল হান্নান আর আলি। বাসে খালি সিট ছিল না বিধায় দাঁড়িয়ে যাচ্ছেন। গরমে যেন সেদ্ধ হবার উপক্রম। ঝিম ধরে বাস চলছে তারপর থেমে থেমে যাত্রী তুলছে নামাচ্ছে।

হরিপুরের কাছে এসে বাসটি কয়েকমিনিটের জন্য থামল।

বাসের ছাদে মালামাল উঠছে এই জন্যে দেরি। আব্দুল হান্নান বিরক্ত হয়ে বললেন কি অবস্থা বলুন তো, আলি বললেন কিছু করার নাই স্যার পথে যখন নেমেছি তখন না পৌঁছে থামছি না।

বাসটি চলতে লাগল। মনে হচ্ছে কে যেন পেছন থেকে বাসটিকে ঠেলছে আর তার সাহায্যে চাকা গড়ছে।

বাসটি মানুষে গিজগিজ করছে। এদের মধ্যে কোনও বিরক্তি কিংবা অস্থিরতা কিছুই নাই। সটান হয়ে  যে যার মত পজিশন নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে, আর যারা সিটে  বসা তারা কেউ ঘুমুচ্ছে কেউ জানালা দিয়ে বাইরের বাতাস টেনে নিচ্ছে একাই নিজের ভেতরে।

এরইমধ্যে হঠাৎ ভিড় ঠেলে কয়েকটি মেয়ে তাদের দুজনের  মাঝামাঝি এসে দাঁড়াল।

অদ্ভুত ব্যাপার। বলা নাই কহা নাই সেই মেয়ে দুটি পজিশন নিতে আব্দুল হান্নানের পিঠে নিজেদের সুডৌল বুক আর পশ্চাৎপদ দিয়ে হুড়াতে লাগল।

তিনি এসব সহ্য করতে না পেরে বলতে থাকলেন এই মেয়ে, এই মেয়ে ছি ছি তোমার লজ্জা করে না। তুমি বুক ঠেকাচ্ছ, পাছা ঠেকাচ্ছ। গুঢ়িপাড়ার মেয়েদের তো আব্দুল হান্নান চেনেন না তারা একেকটা বারুদ। সারা রাস্তায় পুরুষদের ঠেলে ঠিকই জায়গা করে সটান হয়ে দাঁড়িয়ে গেছে তারা, কোন তোয়াক্কা নাই তাদের মধ্যে নিজের জায়গা পেলেই ব্যস তখন তুমি কোন চ্যাটের ছ্যাতা। শহরের মুখে বাস  এসে থামলে তারা নামতে লাগল। তাদের উদ্দেশ্য করে আব্দুল হান্নান বললেন এই যাও তো যাও, তাড়াতাড়ি নামো ইশ্ কী বিরক্তিকর পরিবেশ, কী যন্ত্রণা। মেয়েটি বাস থেকে নেমে সরাসরি আব্দুল হান্নানের দিকে বিষ করে তাকিয়ে বলল : অ্যাই শালা তোর পুটকি মারব। মেয়েটির এই অশ্লীল কথা শোনার পর আব্দুল হান্নান নিচে নেমে একবার আলির দিকে তাকান একবার মেয়েটির দিকে তাকান, অল্প সময়ের জন্য তিনি বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েন। আলি  লজ্জিত হয়ে বললেন বাদ দেন স্যার এসব মাইন্ড করলেই করা হবে। তিনি কাঁপতে কাঁপতে বললেন আরে এতো ডেঞ্জারাস মেয়ে। আপনি ডেঞ্জারাসের কি দেখেছেন স্যার চলেন দেখাচ্ছি, খানিকক্ষণ পরে আলি আবার বললেন আসেন স্যার ওদের সঙ্গেই তো আপনাকে যেতে হবে। কি বলেন আপনি! হ্যাঁ স্যার। তাহলে এখানে একটু থামি ওরা আগে চলে যাক। আসলে গুঢ়িপাড়ার মেয়েরা তো হাঁটে না, বাস থেকে নেমেই মারে দৌড়।

গুঢ়িপাড়া নিতান্তই ঘুপচি বসতির মতো, সবার চালে চালে বাস। এখান ঘর এখান হেঁসেল তার মধ্যে পায়খানা অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ। আবার রাস্তামুখো বারান্দায় কাঠের চৌকির ওপর চাদর বিছিয়ে ব্ল্যাকির বিভিন্ন ধরনের মালামালের পসরা সাজিয়ে, মেয়েরা পরনে শুধু ছায়া ব্লাউজ আর বুকে ওড়না অথবা গামছে ফেলে একটা টুলে বসে থাকে। তাদের লিখাট্টু স্বামীদের তেমন কোন কাজ থাকে না, ঘরের বউ মেয়েরাই এই ব্যবসা দেখছে। এসবের ভেতর তাদের অতি গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো রাস্তার মোড়ে বসে বিড়ি ফুঁকানো আর খেয়াল করা : পাড়ার দিকে পুলিশ কিংবা বিডিআর আসছে কিনা। মাঝেমধ্যে ছোট ছোট ছেলেপিলেরা পাড়ার মধ্যে দৌড়ে এসে বলে পুলিশ ঢুকেছে, তা শুনেই মেয়েরা চাদরের দুইকোণা দুজনে ধরে গিঁট মেরে নিমিষেই চম্পট। কোথায় যে তারা হাওয়া হয়ে যায় কেউ টেরই পায়না। শহরের উপকণ্ঠে খাসজমিতে বসতি গেড়ে পেশা বদলের (কখনও মুটে, কুলি, রিক্সাওলা, ফেরিওয়ালা) ঝুঁকিপূর্ণ উপেক্ষিত জীবন কি অবশেষ আব্দুল হান্নান ও আলি উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন ?

ঘ.

আশ্বিন মাসের কৃষ্ণপক্ষের পঞ্চম তিথি। খেতুরের মেলা। জমজমাট আয়োজন, সেই উপলক্ষে রাজাবাড়িহাট―বিজয়নগর ―প্রেমতলী লোকে লোকারণ্য। বিখ্যাত এই মেলায় পদ্মা স্নানের দিন খুব ভিড়। এর মধ্যে অনেক সময় গড়িয়ে গেছে, ওলট পালট হয়েছে অনেকের জীবন। ধরি যদি বেলিরই কথা, সে মজু দোকানদারের সাথে লাইন করে বিয়ে করেছে, মুসলমান হয়েছে। ওসব দিন শেষে বেলির সেই আগিলা বুড়ো স্বামী আরও বুড়ো হয়েছে। খেতুর ধামের তীর্থ যাত্রায় পদ্মায় স্নানের উদ্দেশ্য সেও প্রেমতলী এসেছে। এবং থাকছে পালিয়ে বিয়ে করা স্ত্রীর বাড়িতে, সাথে দুই ছেলেকে নিয়ে। এসব নিয়ে আপত্তি তুলেনি মজু, সংকীর্তনে যোগ দেওয়ার জন্য বুড়ো ও তার ছেলেরা বাড়ি থেকে বাহির হলে মজুকে অনেকেই জিজ্ঞেস করে এরা কে ? ঘনিষ্ঠ কেউ হলে তাদের সামনে সে হেসে উত্তর দেয় এরা হচ্ছে তার স্ত্রীর আগিলা তরফের স্বামী এবং ছেলে।

বেলি তাদের থাকা খাওয়ার কোন ত্রুটি রাখেনি, দ্বিতীয় তরফের ছেলে মেয়েরা বেলির আগের দুই ছেলেকে ভাই বলেই ডাকছে তারাও এদের স্নেহ করছে। বেলির স্বাভাবিক কথাবার্তা দেখে বুড়োটা অবাক হয়, এই কি তার স্ত্রী! কয়বছরই বা তার সাথে ঘর সংসার করেছে সে,  তা মনে করতে পারে না কিন্তু সেই অল্প সময়ে দুটি ছেলেও হয়ে গেছিল ভাবতে ভাবতে সে অবাক হয়। এখন বয়সটা অবাক হওয়ার। সে বেলিকে প্রথম প্রথম শাপ শাপান্ত করলেও এখন কেমন মায়া জাগে তার প্রতি। তাকে ক্ষমা না করলে কীভাবে সে এই বেলির নতুন সংসারে এসে উঠল। মুসলমানের ঘরে এসে থাকছে খাচ্ছে তা নিয়ে বুড়োর ভেতর  তেমন খচখচানি নাই। মনে খচখচানিরই বা কি আছে বড় সমাজের সাথে না আছে উঠবস, না কোন সমাজের লোকে তাকে পুছে। তারা তো বরাবরই উঁচু সমাজের নিকট ব্রাত্য, জাতের ভয় তার নাই, কে দেখছে তাকে ? মাত্র তিন দিনের তো ব্যাপার। সে মহাপ্রভু চৈতন্য দেব এবং নরোত্তম ঠাকুরের নাম স্মরণ করে, হরিনাম জপে এই তার সম্বল। ওসব ভাবতে ভাবতে বেশরম বেলির সেই লাছন কুদনের  দিনগুলো  সব বুড়োর চোখের সামনে ভেসে ওঠে।

পদ্মায় স্নানের দিন বুড়োর শরীরটা ফ্যাকাসে মনে হলো। দুই ছেলেকে সঙ্গে করে তবু ফ্যাকাসে মুখ নিয়ে সে পদ্মায় স্নান সেরে ফিরে এল বাড়িতে। সেদিন সারাদিন এবং রাতে কিছুই খেলোনা। শেষ রাত্রিতে বুড়োর ভয়াবহ  গোঙানির শব্দে বেলি ও মজু দৌড়ে এল তাদের ঘরে। তার ছেলেরা তাকে ধরাধরি করে উঠিয়ে বসিয়েছে। বেলি তার স্বামীর কানে কানে  বলছে  বুড়্যার কপালে  আর বোধহয় দানা নাই। মজু  বিরক্ত হয়ে তাকে ধমক দিয়ে বলল, চোপ।

তারপর সে ধরমর করে লুঙিটা বেঁধে দরজাটা খুলে বাইরে বেরিয়ে এল, সঙ্গে বেলিও।

বেলি বলল, কুনঠে ?

দেখি কামালের ভ্যানখানটা পাই কিনা ও বটাকে আগে হাসপাতালে লিয়া যাইতে হইবে, এই বলে মজু দোকানদার বড় রাস্তায় নামতেই আশ্বিন মাসের কৃষ্ণপক্ষের অন্ধকার তাকে গিলে ফেলল।

সচিত্রকরণ : রাজীব দত্ত

Leave a Reply

Your email address will not be published.

shares