প্রচ্ছদ রচনা

কামাল চৌধুরীর

কবিতায় প্রকৃতি-ভাবনা

কাবেদুল ইসলাম

 

বাংলাদেশের আধুনিক বাংলা কবিতার এক অন্যতম নাম কামাল চৌধুরী (১৯৫৭-)। দারুণ ছন্দসচেতন এই কবির বিষয়ভাবনা বহুমুখী, বহুচারী; বিশেষ করে স্বদেশ, মাতৃভাষা, মুক্তিযুদ্ধ, প্রেম, প্রকৃতি তাঁর কবিতায় প্রায়শ অনায়াসে স্থান করে নেয়। যাই হোক, বর্তমান নিবন্ধে আমরা তাঁর নিসর্গপ্রীতি বা প্রকৃতি-ভাবনা তুলে ধরতে চাই।

বস্তুতপক্ষে নিসর্গের বা প্রকৃতির কথা বলতে গেলে প্রথমেই যে বিষয় ভাবনাটি আমাদের মাথায় চলে আসে, তার একদিকে যেমন থাকে আমাদের পরিপার্শ্ব বিশেষত মানুষ ও ভূদৃশ্য (Landscape)  এবং অন্যদিকে ইংরেজিতে যেটিকে মাত্র দুটি শব্দে পরিচিত করা যায়, তা হলো- Flora বা উদ্ভিদ এবং Fauna বা প্রাণী- এ সব কিছুর সমন্বিত এক বিশ্বরূপ। এই বিশ্বরূপের অন্তর্নিহিত সৌন্দর্য ও মাহাত্ম্য মূলে অখণ্ড সত্তার বহিঃপ্রকাশ হলেও দৃশ্যত বিভিন্ন দেশের ক্ষেত্রে এর বৈচিত্র্যও কম দৃষ্টিনন্দন, প্রীতিপদ ও প্রণিধানযোগ্য নয়। ফলত বিষয় হিশেবে ‘নিসর্গ’ বা প্রকৃতি (Nature) বহু বর্ণিল, বহু রৈখিক ও দূর বিস্তৃত হলেও আমরা এখানে কয়েকটি ক্ষেত্রে এ আলোচনা সীমাবদ্ধ রাখব।

আধুনিক কবিরা মূলত প্রকৃতিবাদী বা একান্তভাবে প্রকৃতিনির্ভর কবি নন, অন্যকথায় প্রকৃতিই তাঁদের কাব্যভাবনার প্রধান উপজীব্য বা একমাত্র উপকরণ নয়। আধুনিক যুগমানসের কবি কামাল চৌধুরীর কবিতায়ও তাই প্রকৃতির সমগ্র সত্তা অনুভব্য নয়। বরং তাঁর কবিতায় প্রকৃতিনিষ্ঠা বা নিসর্গচেতনাকে অন্যান্য বিষয়বস্তুর আধারে অর্থাৎ খণ্ডিত আকারে ও বিচ্ছিন্নভাবে খুঁজে নিতে হয়।

যাই হোক, তাঁর কাব্যভাবনায় প্রকৃতির মুখ্য উপাদান ‘উদ্ভিদ’ ও ‘প্রাণী’- এ দুটো পরস্পর কীভাবে অন্তর্লীন হয়ে থাকে, তার স্বভাবপ্রবণতা বোঝাতে শুরুতেই কবির হে মাটি পৃথিবীপুত্র কাব্যগ্রন্থের অন্তর্ভুক্ত ‘আজ এই লেখার খাতায়’ শীর্ষক কবিতার মুখস্তবকটি তুলে ধরা হলো :

অবশেষে লেখার খাতায় এসে পড়ল দু’চারটে পাখি

ওরা থাকত হিজলে তমালে, ওরা মাছরাঙাদের মতো

মৎস্য অভিসারী

ওদের ডানায় ওমে দারুণ উড়াল-শব্দ, চঞ্চুতে অক্ষরের

হীরের নোলক

 

আমরা জানি, সুবিশাল বাংলা বরাবরই এক নদীমাতৃক দেশ। যদিও মূলত ফারাক্কা বাঁধের এবং আরও নানাবিধ মানুষিক (‘মানবিক’ শব্দটি এক্ষেত্রে আমরা ব্যবহারে ইচ্ছুক নই) অপকর্মের কারণে এবং অবশ্যই চিরাচরিত প্রাকৃতিক পরিবর্তনের ফলে বাংলার ছোট-বড় এসব নদ-নদীর অনেকগুলোই এখন বিলুপ্ত তথা সম্পূর্ণ অস্তিত্বহীন, অন্যভাবে বললে পুরানো ভৌগোলিক মানচিত্রেই কেবল এগুলোর স্থিতির প্রমাণ লভ্য। আর যেগুলো এখনও বর্তমান, তারও একটা বড় সংখ্যা জীবন্মৃত বা নিঃশেষিত হওয়ার পথে। এছাড়া একদা দুরন্ত, প্রতিনিয়ত কূলপ্লাবী ও ভাঙনপ্রবণ এবং ‘প্রমত্তা’, ‘কীর্তিনাশা’ বা ‘রাক্ষুসী’ বলে যেগুলোর পরিচিতি ছিল, যেমন পদ্মা প্রভৃতি, সেগুলোও আজ তাদের অতীত ঐতিহ্য ও প্রাণচাঞ্চল্য হারিয়ে ফেলেছে। তারপরও বলতে হবে বছরের অন্য সময়গুলোতে না হলেও অন্তত ভরাবর্ষা মৌসুমে এই নদীগুলো হঠাৎই যেন ফিরে পায় তাদের রিক্ত যৌবন- চিরচঞ্চল গতিপ্রবাহ। তখন সত্যিই এরা হয়ে ওঠে বিষধর সর্পসদৃশ, ‘প্রমত্ত খুনি’র রূপ নিয়ে আবির্ভূত হয় নদীলগ্ন ও নদীপারের পল্লিজনের সামনে।

প্রসঙ্গত, আমরা জানি, বৃহত্তর ঢাকার একটি গুরুত্বপূর্ণ ও ইতিহাসপ্রসিদ্ধ নদী ‘শীতলক্ষ্যা’, সংক্ষেপে ‘লক্ষ্যা’, তবে জনপদ-সংহারী হিশেবে নদীটির কুখ্যাতি নেই। তবু সেটিই কবির চোখে যে-রূপে প্রতিভাত হয়েছে, তাতে লক্ষ্যা বাংলার বর্ষাকালীন নদ-নদীর প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে বললে ভুল হয় না। কবির ভাষায় :

এখন লাফায় নদী; এই মাঝি, ভয় নাই তোর?-

সাপের ফণার মতো রোষে ফোঁসে এই লক্ষ্যা নদী

সোনালি আঁশের ঘ্রাণ একপাশে, অন্যপাশে গ্রাম

(প্রাচীর, টানাপোড়েনের দিন)

 

অধিকাংশ বাঙালি কবির ন্যায় কামাল চৌধুরীর জন্মও গ্রামে। তাঁর শৈশব-বাল্য-কৈশোরের বেড়ে ওঠা, স্কুলপাঠ, বন্ধুবান্ধব-সংযোগ ইত্যাদি আগাগোড়া গ্রামকেন্দ্রিক বা গ্রামোৎসারিত না হলেও চিরায়ত গ্রামের সঙ্গে তাঁর বরাবরই ছিল এবং রয়েছে এক ধরনের গভীর, প্রীতিস্নিগ্ধ ও হার্দিক সংরাগ। কবিতাসংগ্রহ-এর মুখবন্ধ তথা ‘কবিতা কি আমার কথা শোনে’ শীর্ষক রচনায় কবি লিখেছেন, ‘এক সময় ছিল যখন আমার মুখস্থ ছিল গ্রামের পথঘাট, বনবাদাড়, পানাপুকুর। অন্ধকারে ঝিঁঝিঁর ডাক, জোনাকির ওড়াউড়ি ছিল অতি চেনা। শীতের রাতে দল বেঁধে খেজুরের রস নামিয়ে পায়েস রেঁধেছি। কত শীতের সকালে, চুলোর চারপাশে আমরা সব ভাই গোল হয়ে বসেছি মায়ের হাতে পিঠা খাওয়ার জন্য। পূর্ণিমা রাতে কবিগান শুনতে, যাত্রা দেখতে ছুটে গেছি মঠতলার মেলায়। কত আলোভরা রাত কেটে গেছে হা-ডু-ডু হা-ডু-ডু শব্দে। গ্রাম জীবনের এইসব অসাধারণ অভিজ্ঞতার মধ্যে সঙ্গোপনে কবিতার বীজ অঙ্কুরিত হয়েছিল কিনা জানা নেই।’

স্বভাবত নদী ও নদীনির্ভর মানব-বসতির স্মারক বাংলার এই গ্রামগুলোর সঙ্গে কবির আজন্মলালিত স্বপ্ন-বাসনার অবিচ্ছেদ্য সংশ্লেষ, সেখানে ফিরবার দুর্মর আকুতি ধ্বনিত হবে তাঁর কবিতায়, সেটাই তো স্বাভাবিক ও প্রত্যাশিত। কেননা গ্রাম, গ্রামের মানুষ, প্রকৃতি ও নদীর প্রতি তাঁর অনুরাগ আবাল্য ও অকৃত্রিম। কাজেই একই কবিতায় তিনি যখন বলেন :

আমি তো পৌঁছুতে চাই মানবিক গ্রামের সবুজে

আজি কি সম্ভব যাওয়া?..-

আমিও বাঁধতে চাই তবু সব ছিঁড়ে খুঁড়ে খসে

পড়ে জলে।..-

তবু মাঝি আর নয়, যাই আজ ফিরে চল ঘরে

উথালপাতাল নদী চোখে তার প্রমত্ত খুনিরা

নাচে, শান্ত হোক শীতলক্ষ্যা মৃদুমন্দ ঢেউ থাক

তবু ফিরাবি না নাও, নিজেও ডুববি বুঝি মাঝি?

আমরা দু’জন মিলে পার হবো জলের প্রাচীর।

 

– তখন বুঝতে পারি, উচ্চতর পাঠ ও কর্মসূত্রে অধুনা তাঁর বাস বা অবস্থান শহরে হলেও গ্রাম ও গ্রামের অবিচ্ছেদ্য অংশ নদী তাঁকে এখনও টানে অবিরত। তবে কবিকে পিছু-ডাকা সেই গ্রামটা যেন হয় সর্বার্থে ‘মানবিক’ ও সবুজে-ছাওয়া এটাই তাঁর একান্ত বাসনা।

পান্থশালার ঘোড়া কাব্যের ‘নদী বিমুখ করবে না’ শীর্ষক কবিতায় তো স্পষ্টই তাঁর তথা বাঙালি কবিদের কাব্যরচনার এক অপরিমেয় উৎসের কথা বলেছেন :

মাছের চোখের দিকে তাকাতে তাকাতে চলে যাচ্ছি

জেলে-নৌকো, আমিও ভাটিয়ালি গ্রামের মানুষ-

রাত নামছে দেখে আমি একা নই

নদী নালা খাল বিল উপচে পড়ার জন্য আজ

নতুন গান বেঁধেছি-

ভয় নেই, আমাদের নদীতে

অনেক কবিতা আছে।

 

আসলেই তো নদীকে উপজীব্য করে বাঙালি কবিরা যুগে-যুগে অসংখ্য কবিতা, গান, পদবন্ধ রচনা করেছেন, যাতে নদীর চিরাচরিত বৈশিষ্ট্য ও রূপ-মাহাত্ম্য নানামাত্রিক দৃষ্টিকোণে প্রতিফলিত হয়েছে।

চাকরি বা কর্মসূত্রে কামাল চৌধুরী বিভিন্ন সময়ে দেশের নানাস্থানে বা প্রান্তে অবস্থান করেছেন। সঙ্গত কারণে এসব অঞ্চলের অতুলনীয় ভূ-প্রাকৃতিক দৃশ্যাবলি, পরিবেশ-প্রতিবেশ ও জীববৈচিত্র্য তাঁর কবিতায় নানারূপে, নানাভঙ্গিতে স্থান করে নিয়েছে। আর এই চিত্রভাষ্যে পাহাড়ি অরণ্য-প্রকৃতি ও প্রাণীকুলের একটি বিশেষ ভূমিকা লক্ষণীয়। প্রসঙ্গত, তাঁর টানাপোড়েনের দিন কাব্যের ‘অরণ্যে বিলীন’ কবিতার অংশবিশেষ দেখা যায় :

এ অরণ্য যাদের আবাস

ছড়ার স্বচ্ছ জলে মধ্যরাতে তৃষ্ণাতুর বুনোহাতীদের দল

ওরা আসে রাতের অতিথি।

মাঝে মধ্যে হরিণের যূথবদ্ধ ডাক

গয়ালের নিঃশব্দ গমন-

রাতের বাতাসে কেঁপে বুনোপাতা নড়ে, শব্দ হয়

ডাকে পাখি, বুনোহাতী, চিতল হরিণ

 

উপরের এ-প্রকৃতিচিত্র বর্ণনায় যদিও প্রাণীকুলেরই আধিক্য, তথাপি গোটা কবিতাটি যদি গভীরভাবে পাঠ করা হয়, তাহলে দেখা যাবে এটি তাঁর প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতাজাত ও স্নিগ্ধ অনুভূতিরঞ্জিত। বাহ্যত কবিতাটি জীবনানন্দ দাশের বিখ্যাত ‘ক্যাম্পে’ কবিতার ভাবাবহ হলেও, এবং এতে ‘নীরব নিস্তব্ধ তাঁবু, মাথার ওপরে জাগে গোলচাঁদ’ বাক্যবন্ধ থাকলেও অরণ্যচারী প্রাণীর প্রতি কবির গভীর আবেগ ও মমত্ববোধ স্ফুট হয় যখন তিনি তাদের স্বাভাবিক জীবাচারের মধ্যেও সারল্য ও সৌন্দর্য অবলোকন করেন, এবং বলে ওঠেন :

কে যাবে এমন পথে অগম্য নিশীথে

পেরিয়ে পাহাড় খাদ শ্বাপদ নিবাস

ঝোপঝাড় ভেঙে দ্রুত চলা শব্দ ওঠে

কে যায় কে?

ভয়ংকর সুন্দরের স্বরে ডাকে কারা

 

‘ভয়ংকর সুন্দরের স্বরে’ ডাকা এই প্রাণীরা হচ্ছে- বুনোহাতি, গয়াল, হরিণ, চিত্রল হরিণ ও নানা পাখপাখালি। বস্তুত প্রবল ‘নেতি’র মধ্যে ইতিবাচকতা, অশুভের মধ্যে শুভ ও অন্ধকারের মধ্যে আলোর দ্যুতি অবলোকনের দৃষ্টি যে একমাত্র কবিকুলেরই গ্রাহ্য, উদ্ধৃত বাগ্বন্ধে তারই পুনরুচ্চার প্রতিধ্বনিত।

ঠিক অনুরূপ চিত্রভাষ্য রচিত হয়েছে দেখি এই পথ এই কোলাহল কাব্যের ‘এই শীতে’ শীর্ষক কবিতায়। এবার পাহাড়-টিলার প্রান্তবাসী মানুষ ও জীবপ্রকৃতি যেন আরও একাকার, প্রাণবন্ত :

কুয়াশা নেমেছে পথে আকাশের ঘরবাড়ি ছেড়ে

মনে হলো টিলার উপর থেকে দল বেঁধে নেমে

সাদা হরিণেরা সব পথজুড়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে-

আগুন জ্বেলেছে কারা? অস্পষ্ট আলোয় নড়ে ছায়া

খড় জ্বেলে মানুষেরা বানিয়েছে আগুনের ছাদ

কুয়াশা মাথায় চেপে উড়ে আসে আলো কবুতর।

 

অন্যদিকে পূর্বোক্ত কাব্যগ্রন্থের ‘ইনানী’ নামক কবিতার গোটাটাই কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতসরণির সমনামের একটি সৈকত ও এর সংলগ্ন প্রকৃতিপুঞ্জের চিত্র ও চিত্রকল্পের প্রতিভাষ্য রচনা করেছে বললে ভুল হয় না। এতে সপ্রাণ ও নির্জীব প্রকৃতির যে উপভোগ্য উপস্থিতি লভ্য, তা একমাত্র প্রত্যক্ষদর্শীর পক্ষেই অনুভব্য ও আস্বাদ্য। নিষ্প্রাণ ইনানী সৈকতের ‘ক্ষয়মান পাথরের গায়ে সমুদ্রের ক্ষুব্ধ অধীর গর্জন’, ‘ঢেউয়ের কাছাকাছি জাল ফেলে জেলে বালকের’ ‘চিংড়ি পোনা ধরা’, ‘লাল কাঁকড়ার ত্রস্ত ছোটাছুটি’ ও মানুষের বা জান্তব উপস্থিতি টের পেয়ে তাদের ‘পালাবার প্রিয় গর্ত মুখ’, ‘বন বিভাগের বাংলো’, ‘নারকেল বীথি’, ‘মাঝে মাঝে সমুদ্রের বুকে জেলে নৌকা’, ‘নুড়ি’ পাথর, ‘ভাটায় চান্দের গাড়ি’ (পুরোনো ‘জীপ’ থেকে রি-মডেল বা রি-শেপকৃত এ-অঞ্চলে চলাচলের উপযোগী এক ধরনের চার চাকার যন্ত্রযান)-র দ্রুত ছুটে চলার ফলে বালিতে সৃষ্ট ‘চাকার দাগ’, পরক্ষণেই ফেনায়িত প্রবল জোয়ারে সেই দাগ মুছে যাওয়া প্রভৃতির পাশাপাশি সপ্রাণ ‘জেলিফিশ’ ও ‘শামুকে’র বালুকাবেলায় উঠে আসা এবং সর্বোপরি অস্তবেলায় চরাচরব্যাপী সূর্যরশ্মির যে মোহময় দৃশ্য ভ্রমণপিপাসু পর্যটকদৃষ্টি আকৃষ্ট করে, সেসব কবিতাটিতে সহজ ও অনেকটা চলচ্চিত্রিক মাত্রা পেলেও সামগ্রিকভাবে কবির প্রকৃতিলগ্নতার স্বরূপ এবং তাঁর অন্তর্দৃষ্টির প্রক্ষেপ ও প্রেক্ষণবিন্দু স্পষ্ট হয় যখন এর মধ্যেও তিনি মানবীয় কল্পনা, চিন্তা ও মুক্তির দার্শনিক অভীক্ষা খুঁজে ফেরেন। তাঁর ভাষায় :

এই দৃশ্যে নিজেকে লুকাতে আসে ঝাউ

আর সুপারির সারি

নৈঃসঙ্গ্য ছাপিয়ে ওঠে ভেতরের তীব্র কোলাহল

সমুদ্রে বেড়ানো সব মানুষের খিস্তি থেকে দূরে

হৈ হুল্লোড়হীন এক শান্ত অনুভব

মিশে যায় ভেজা বালি, নগ্ন পদতলে…-

এই দৃশ্য মুক্তির- চোখ মেলে দূরে তাকাবার।

 

‘বৃক্ষ’ (কাব্যগ্রন্থ রোদ বৃষ্টি অন্ত্যমিল) কবিতায় কবির নিসর্গপ্রীতি বা আরও নির্দিষ্ট করে বললে বৃক্ষপ্রেম কতটা ব্যাপক ও ঐকান্তিক রূপ পেয়েছে, তা বোঝা যায় যখন তিনি বৃক্ষ ও পাখি- অন্যকথায় Flora ও Fauna-কে নিজের মাতৃভাষার প্রণোদনার সঙ্গে একীভূত করে দেখেন এবং সম্পূর্ণ বিপরীতধর্মী দুটো বস্তুবিশ্বের মধ্যে অন্তর্গূঢ় সম্বন্ধ স্থাপন করেন :

খাতা ভর্তি পাতা লিখি, বৃষ্টি-গাছে পদ্য, পদাবলি

বটপাতা আমপাতা বুনোফুল প্রথম কদম

পাণ্ডুলিপি ভরে যায়, সাদা খাতা অভিজ্ঞান-লিপি

বীজের উত্থান শেষে গাছেরাই প্রকৃত প্রেমিক।

বাংলা ভাষা পাখিদের, বাংলা ভাষা বৃক্ষ-জাতিময়

সবুজ পুস্তিকা ছাড়া মহাকালে কেউ কবি নয়।

 

‘সবুজ পুস্তিকা’ দ্বারা এখানে ব্যাপকার্থিক নিসর্গ বা প্রকৃতিকে বোঝানো হয়েছে এবং এর প্রতি অসঙ্কোচ সংশ্লেষ ও সংলগ্নতা ব্যতীত অতীতে যেমন কোনও কবির কোনও সার্থক কাব্য বা পদবন্ধ রচনা সম্ভব হয়নি, তেমনি একালেও কবিকুলের কাছেও এর প্রভাব অনতিক্রম্য।

স্মর্তব্য, কবি যেখানে প্রকৃতিবিহারী প্রাণীকুলের উল্লেখ করেন, তাতে মূলত অরণ্যচারী ও শ্বাপদজাতীয়দেরই প্রাধান্য থাকে। কিন্তু এবারে তাঁর প্রকৃতিনিষ্ঠতার আতীব্র সংরাগ বোঝাতে উদ্ভিদ-প্রাণীময় একটি আস্ত কবিতা উৎকলন করে দেখব যাতে বস্তুত নিরীহ প্রাণী, বাংলার সবুজ শ্যামল প্রকৃতি, নদী, ফুল, গ্রামজীবনের প্রাতিস্বিক অনুষঙ্গাদি উঠে এসেছে। কবিতার নাম ‘তোমাদের প্রেমের যাত্রা শুরু হোক’; ধূলি ও সাগর দৃশ্য কাব্যের অন্তর্লিপ্ত গুচ্ছকবিতার শুরুর কবিতা :

একদিন আমরা ডানা বদল করলাম

একবার শালিকের, একবার দোয়েলের

একদিন বনবাদাড়, কাঁটাঝোপ, হালট, ধুলো, কাদা

পানাপুকুর, সাঁকো পার হয়ে

আমরা হয়ে উঠলাম বুনোফুল

পথের পাশে ফুটে থাকা মহুয়াকে ডাকলাম বন্ধু

মহুয়া নেশার মধ্যে বাতাস দোলা দিল, ঝরে পড়ল

আশীর্বাদ কণা

বসন্ত বসন্ত…

তাই দেখে দিগন্তের স্বপ্ন কাঁধে, বনভূমি বুকে জড়িয়ে

পাখিদের কিচির মিচির নির্দেশিকায় হাঁটতে হাঁটতে

আমরা পৌঁছুতে গেলাম লোকালয়ে

জোছনা-প্রস্রবণে-

একদিন আমাদের স্পন্দন থেকে জেগে উঠল

সমুদ্র, স্রোতস্বিনী নদী- বর্ষাভেজা গোমতি, আড়িয়াল খাঁ

আমরা নৌকায় তুলে দিলাম সূর্যোদয়, ভোর

সাদা খাতা, অক্ষর চুম্বন, কুপিবাতি-

আমরা ভেসে চললাম-

পেছনে সন্দিগ্ধ চোখ, সংশয়- পিতৃকুল মাতৃকুল

অসম সমাজ…

 

কামাল চৌধুরীর কবিতায় ঋতু পরিবর্তনের ফলে বাংলার (দু-একটি ক্ষেত্রে বিদেশের) অপরূপ ভূ-প্রাকৃতিক যে বৈচিত্র্য ধরা পড়ে তাতে বস্তুত শীতেরই একচেটিয়াত্ব, যদিও ষড়ঋতুর মধ্যে অন্য তিনটি ঋতুও, যথা- বর্ষা, বসন্ত ও হেমন্তের কথা কবিতাবিশেষে উচ্চারিত হয়েছে। কিন্তু সে যেন চকিত বর্ণনা মাত্র। একইভাবে বারো মাসের মধ্যে বোশেখ বা বৈশাখ, আষাঢ়, শ্রাবণ, কার্তিক, মাঘ, চৈত্র ইত্যাদি এলেও কার্তিকের এবং শীতের প্রতিসঙ্গ হিশেবে কুয়াশা ও শিশিরের (মূলত শরৎ বা শারদীয় ঋতুর প্রতীক) তাতে ছড়াছড়ি।

তাঁর কবিতায় শীত ও এ ঋতুটির নানারং, রূপ কখনও এসেছে স্রেফ ঋতুবর্ণনার সহজ সূত্রে, কখনও উপমা-উৎপ্রেক্ষার আভাসে, কখনও রূপক ও চিত্রকল্প ইত্যাদির বর্ণিলতায়।

এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করা যেতে পারে- মিছিলের সমান বয়সী-র ‘পদচিহ্ন’, ‘যুগল কথা’, ‘প্ল্যাটফর্মে একাকী যাত্রী’, ‘খরা’; টানাপোড়েনের দিন-এর ‘যমজ’, ‘এই শীতে’, ‘আজ বাতাসের মন’; এই পথ এই কোলাহল-এর ‘আয় সূর্য’; এসেছি নিজের ভোরে-র ‘পান্থশালা কোন বনভূমি’, ‘জন্মদিন’; এই মেঘ বিদ্যুতে ভরা-র ‘দেয়াল জিজ্ঞাসা’, ‘অধিগ্রহণ’, ‘ভ্রমণ কাহিনি’; ধূলি ও সাগর দৃশ্য-এর ‘সেতু ও বিরহ’; রোদ বৃষ্টি অন্ত্যমিল-এর ‘অভয় মিনার’, ‘শ্রাবণের প্রেম ভাষা’; হে মাটি পৃথিবীপুত্র-এর ‘অভিনয়’, ‘দূরত্ব’, ‘পথের কবিতা’, ‘আজ এই লেখার খাতায়’; পান্থশালার ঘোড়া-র ‘কারণ আমরা ফিরছি’, ‘এই দেশ তাঁতিপাড়া থেকে দূরে নয়’, ‘ফুটনোটে বসন্ত’, ‘নতুন কবিতার জন্য’ ইত্যাদি কবিতার নাম।

যাই হোক, কামাল চৌধুরীর কবিতায় প্রকৃতি ও মানুষ কীভাবে একাত্ম হয়ে যায় বা থাকে, তার স্বরূপ বোঝাতে নমুনা হিশেবে ‘শীত’ ও ‘বসন্ত’ ঋতুকেন্দ্রিক দুটো কবিতার অংশবিশেষ নিচে পরপর তুলে ধরা হলো :

 

শীত ঋতু

 

হে পূর্ণিমা, হে শীত,

শীতের কুয়াশায় ভেজা কনকনে হিমেল বাতাস

তোমরা সাক্ষী থাকো

ধলেশ্বরী যদি কোনোদিন জিজ্ঞেস করে

তাকে বলে দিও

তিনজন অনুভূতিপ্রবণ যুবক ভালোবেসে এই সব

পদচিহ্ন রেখে গেছে।

(পদচিহ্ন, মিসব)

 

বসন্ত ঋতু

 

এসব সরল শব্দ, এই লেখা, এই পৃষ্ঠা পাঠ

এমন বসন্তদিনে সুরে সুরে পাখির আওয়াজ

দ্যাখো হে শালিক ডানা (ছানা?), পথে পথে পাড়া-কুড়োনির মেয়ে

অমুদ্রিত অন্ত্যমিলে ভরে নিচ্ছে অদৃশ্য কোঁচড়

সেখানে তুমিও দিও ছন্দজ্ঞান, টীকাভাষ্য, ধূলিদের ভ্রাম্যমাণ চুমু।

(যখন সকাল হবে, রোবৃঅ)

 

তবে তিনি যে কেবল বাংলার সবুজ শ্যামল প্রকৃতি ও জীবময় প্রাণচাঞ্চল্যই দৃষ্টিলভ্য করেছেন তা নয়, পরন্তু তাঁর কোনো কোনো কবিতার রূপাভাসে নিদাঘ রুক্ষতাও ধরা পড়ে কাব্যকলার আশ্চর্য নৈপুণ্যে। তাই কবি যখন বলেন :

খরায় জ্বলছে মাঠ আমি সেই প্রান্তরের পোড়া অধিবাসী

তামাটে গাত্রের ’পরে জেগে থাকে প্রজ্জ্বলন্ত ক্ষুধা

একটু বৃষ্টির ছোঁয়া- এ আকাশে শ্রাবণের মেঘেরা কোথায়?

লবণাক্ত ঘাম শুধু সকরুণ, অসহায় দরিদ্র স্বদেশে।-

এখানে প্রান্তর মাঠ শীতের ওষ্ঠের মতো ফাটা

গভীর ফাটল থেকে হা হা করে উঠে আসে দুর্ভিক্ষের ধ্বনি

প্রবল বন্যার আগে যেভাবে সমুদ্র ডাকে

আসন্ন বিপদ দেখে যে রকম হাম্বা ডাকে ভয়ার্ত বাছুর

চৌচির প্রান্তর মাঠ সে রকম দ্রুতস্বরে ডাকছে কেবলি।

(খরা, টাদি)

 

– তখন বুঝতে পারি, কবির নিসর্গপ্রীতি অবিমিশ্র সুখকর ও প্রীতিস্নিগ্ধ নয়, বরং তাতে অনপনেয় হয়ে রয়েছে শূন্যতার হাহাকার, নিরন্ন ও অনিকেত মানববৃত্তির আলেখ্যও।

পরিশেষে তাঁর কাব্যভাবনায় নিসর্গচেতনা বিশেষত উদ্ভিদ ও প্রাণী জগতের এবং ঋতুবৈচিত্র্যের ও নদ-নদীর যে-উপস্থিতি লক্ষ করা যায়, তার একটি তালিকা তৈরি করে এ-আলোচনা শেষ করব।

 

উদ্ভিদ : অশত্থ (অশ্বত্থ), অশোক, আঙুর, আপেল, আম, কদম, কমলালেবু, কলা, কামিনী, গজারি, গন্ধম (?), গোলাপ, ঘাস/ দূর্বা, চন্দন, চা, জবা/রক্তজবা, জাম, ঝাউ, ত-ুল, তমাল, তাল, দারুচিনি, দেবদারু, দ্রাক্ষা, ধান, নারকেল, নার্সিসাস, নীলকমল, পদ্ম/স্থলপদ্ম, পরাগ, পলাশ, পাট, বকুল, বট/বুড়োবট, বাঁশ, বেত, ভাঁটফুল, মল্লিকা, মহুয়া, মৃণাল, মেপল বৃক্ষ, রাবার গাছ, শাপলা, শাল, শিউলি, শিমুল, শেয়াকুল কাঁটা, সুপারি, সেগুন, সেঁজুতি, হাসনুহেনা, হিজল

 

প্রাণী : অজগর, অশ্ব/ঘোড়া, ইঁদুর, ঈগল, উই, উকুন, উদবিড়াল/ বেড়াল, কবুতর, কাক, কাকাতুয়া, কাশ, কাঁকড়া/ রাজকাঁকড়া, কুকুর, কুম্ভীর, কেন্নো, খেঁকশিয়াল, গয়াল, গরু/গাই/গাভী/ধেনু (বাছুর), গাধা, ঘাসফড়িং, ঘুঘু, চড়ুই, চন্দ্রবোড়া, চাতক, চিংড়ি, চিতা (বাঘ), চিল, জিরাফ, জেলিফিশ, জোনাকি, ঝিঁঝিঁ, তক্ষক, তিমি, দোয়েল, পিঁপড়ে, পেঙ্গুইন, প্রজাপতি/ভ্রমর, বক, বন্যবরাহ, বাঘ/ বাঘিনী, বাদুড়, বাঁদর, মহিষ/বুনোমহিষ, মাকড়শা, মাছরাঙা, মোরগ, ষাঁড়, লালমুনিয়া, শকুন, শামুক, শালিক, শেয়াল, শ্যামা, সারস, হরিণ/হরিণী, হাঙর, হাড়গিলা, হাতি/বুনোহাতি, হায়েনা, হাঁস/রাজহাঁস

 

ঋতু : বর্ষা, হেমন্ত, শীত ও বসন্ত

 

নদ-নদী : (বাংলার ও ভারতের) গঙ্গা, গোমতি, ধলেশ্বরী, পদ্মা, বংশাই, বুড়িগঙ্গা, যমুনা, লক্ষ্যা/শীতলক্ষ্যা; (আন্তর্জাতিক) দজলা, নীল, ফোরাত, সিন্ধু

 

সূত্র: এ নিবন্ধে অনুসৃত হয়েছে ঢাকাস্থ বিদ্যাপ্রকাশ থেকে প্রকাশিত কবি কামাল চৌধুরীর কবিতাসংগ্রহ শীর্ষক ৯টি কাব্যের সমষ্টি বা সংকলন (পরিমার্জিত তৃতীয় প্রকাশ, ফেব্রুয়ারি ২০১৫)।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares