মাকিদ হায়দার

চিঠি

গত পরশু আমাদের  বাড়ির কুয়োর ভেতর নেমেছিল

পাড়ার ডুবুরি।

                  কুয়োর ভেতর কিছু না পেয়ে, তখুনি

উঠে এসে জানালো আমাকে,

                              এবার নামব তোর বুকের ভেতর

                              দেখব সেখানে

                              কেউ জেগে, বসে আছে কি না!

ডুবুরি নামল অনায়াসে,

তিন রাত দুই দিন পরে

ফিরে এসে

    দেখাল আমাকে

    পেয়েছি একটি লাল, নীল চিঠি

চিঠি পড়ে দেখি

চেনা জানা হস্তলিপি

সাদা কালো কালি দিয়ে লেখা।

               লিখেছেন তিনি,

               থাকব পাতাল রেলে কামরা উনিশে,

               এলে দুখী হব।

                  ইতি, অবহেলা।


অসীম সাহা

তোমার মুখের মতো চাঁদ

অকস্মাৎ কাল রাতে মরে গেছে পূর্ণিমার চাঁদ।

আকাশের কোথাও নক্ষত্রেরা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে নেই,

পৃথিবীকে গ্রাস করেছে ভয়াল অন্ধকার-

তার বিশাল থাবায় হরিণের কোমল মাংসের মতো ঝুলে আছে

জ্যোৎস্নার আলো-বাতাসের ঘায়ে কেঁপে ওঠে

লাফিয়ে পড়ছে অন্ধকারের ভেতরে-

যেন সমুদ্রের মধ্যে সজোরে নিক্ষিপ্ত

ক্ষুদ্রাকার একটি মাটির ঢেলা সামান্য আঘাত হেনে

                              মিলিয়ে গেলো অথৈ জলের নিচে।

আমার চোখ দুটি বিস্ফারিত।

বেদনায় ক্রমশ নীল হয়ে উঠছে শিরা-উপশিরা।

বুকের ভেতরে ঘূর্ণিবাত্যার মতো জমে আছে গভীর বিষাদ;

একমাত্র অন্ধকার ছাড়া কিছুই চোখে ভাসছে না।

কৃষ্ণসাগরের তীরে দাঁড়িয়ে একটি ভোরের প্রতীক্ষায়

                                             কেটে যাচ্ছে ব্যথিত প্রহর

ঠিক তখনই অন্ধকার ভেদ করে স্ফুরিত আলোর মতো

                                             বেরিয়ে আসছে তোমার মুখ;

উজ্জ্বল জ্যোতিষ্কের মতো সেই মুখ একটি তীব্র আলোকপিণ্ড হয়ে

পৃথিবীকে ভাসিয়ে দিচ্ছে আলোর বন্যায়;

চোখ-ধাঁধানো সেই আলোতে স্নিগ্ধ হয়ে উঠছে মাটি;

কৃষ্ণসাগরের তীরে দাঁড়িয়ে

জ্যোৎস্নার আলোয় ভিজতে ভিজতে বারবার মনে হচ্ছে :

তোমার মুখের মতো এ রকম চাঁদ আমি এ জীবনে কখনও দেখিনি।


মুহম্মদ নূরুল হুদা

সপ্রাণ সঘ্রাণ

আঙুলে আঙুল রেখে

কলম  করেছ যদি

মায়ার আঙুল,

হৃদয়ে হৃদয় রেখে

কলম করেছ যদি

হৃদয় ব্যাকুল,

সপ্রাণ তুমিও তবে

 চোখে চোখে চোখ রেখে

ভালোবাসা শেখো,

ঢালু পাহাড়ের গায়ে,

সমতলে, জুম চাষে

শেওলা ও শস্যবীজ রেখো;

ভালোবেসে

বীজে বীজে সর্বশস্য চাষ,

ভালোবেসে

ঘ্রাণে ঘ্রাণে ঘ্রাণসহবাস;

ভালোবেসে

পরস্পর অধরে অধর,

ভালোবেসে

প্রাণীবিশ্ব প্রাণের বাসর;

মানুষ, তুমিও সেই প্রাণবিশ্বে যাও

সমতায় মমতায় প্রাণঘ্রাণ নাও।

০৩.০৪.২০২২


জুলফিকার মতিন

তোমার কাছেই

ভালোবাসাটা তো এখানেই ছিল                                                                                                                                                 কে নিয়ে গেল ছিনতাই করে ?                                                                                                                                    সে কি আকাশের চাঁদ, না, শরতের জ্যোৎস্নাময়ী রাত ?                                                                                                                   না কি গোলাপ বনের চতুর ভ্রমর ?                                                                                                                                            না কি যুথিকা-সিক্ত বর্ষার গহন প্রলাপ ?

আমি কি পুলিশের কাছে যাব                                                                                                                                           হারানো জিনিসের কমপ্লেন লেখাতে?                                                                                                                                       না কি বের করে আনব একটি সার্চ ওয়ারেন্ট,                                                                                                                           যাতে তারা ভাল করে খুঁজে দেখতে পারে হেমন্তের গোধূলিÑ

চৈত্রদিনের ঝরা পাতার গানÑজবার পাঁপড়িÑমাধবী লতার ঝাড়                                                                                                    অথবা হাসনাহেনার মুগ্ধ সুবাস।

রেখেছিলাম তো এখানেই,                                                                                                                                             কিম্বা ভুল করে রাখিনি তো জামাটার বুক পকেটে,                                                                                                                 সেটাকে কি সেভ করে রেখেছি কমপিউটারে ?                                                                                                         বেখেয়ালে রেখে দিতেও তো পারি মানিব্যাগের ভেতর।                                                                                                             লুকিয়ে রাখার আর জায়গাগুলো কিই বা আছে ঘরের মধ্যে,                                                                                                          বালিশ-তোষক-আলনাÑজুতার সুখতলা।

খুঁজলাম তো সব জায়গাতেই,                                                                                                                                           কিন্তু পাওয়া যাচ্ছে না কিছুতেই।                                                                                                                                     সময় তো হাত থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে দ্রুত,                                                                                                                         অনিশ্চিত পরমায়্―ু                                                                                                                                                    নৈঋত কোণে মহা প্রস্তুতি চলছে প্রলয়ের,                                                                                                                           পাহাড় সমান উঁচু হয়ে আসছে সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাস,                                                                                                                        আগ্নেয়গিরির লাভাস্রোত ঢেকে দিচ্ছে সব কিছু,                                                                                                                    দাবানলে পুড়ে যাচ্ছে বসতবাটী,                                                                                                                                                      পৃথিবী নামক গ্রহটাই যেন এক মহাবিস্ফোরণে                                                                                                                         সূর্যের বলয় থেকে ঝরে পড়বে ছাই হয়ে।

তাই বলছি,                                                                                                                                                                    মরে যাচ্ছি মরে যাচ্ছি মরে যাচ্ছি…                                                                                                                            কিন্তু তাকে ছাড়া মরতে চাই না,                                                                                                                                                 যে করেই হোক খুঁজে ওকে পেতেই হবে।                                                                                                                               মনে করে দেখ তো তোমার কাছেই                                                                                                                                    গচ্ছিত রেখেছি কি না ভালোবাসাটাকে ?


রবীন্দ্র গোপ

বঙ্গবন্ধু তুমি আছ আমার হৃদয়জুড়ে

আমি তোমাকে দেখিনি বঙ্গবন্ধু, তোমার গল্প আমি শুনেছি

আমার আকাশসমান হৃদয়জুড়ে তোমারই আসন পাতা,

তুমি বাঙালির মহাননেতা, তোমারই ডাকে বাঙালি জেগেছিল একদিন

ঘরে ঘরে গড়ে তুলেছিল দুর্গ।

তোমারই কবিতার শ্রেষ্ঠ পঙ্ক্তি অন্তরে ধারণ করেছিলÑ

‘এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম, এ অমর বাণী

ঘরে ঘরে সাতকোটি বাঙালির প্রাণে বেজে উঠেছিল।

এ মহামুক্তির মন্ত্রে দীক্ষিত বাঙালিÑত্রিশ লক্ষ প্রাণ

করে গেল বলি দান, তাঁদেরই রক্ত দানে ভোরের রক্তলাল

সূর্য উঠল, আমাদের সবুজ শস্যমাঠেÑপতাকার বুকে

ইতিহাসের পাতায় সোনার অক্ষরে লেখা হলো সোনার বাংলা

তুমি আমাদের মুক্তিদাতা পিতা, ভোরের পাখির সুরে

নদীর প্রাণে প্রাণে, মাঝির গানে গানে আজও শুনতে পাই

তোমারই করুণ রক্ত দানের শোকগাথা,

বঙ্গবন্ধু তুমি আছ আমার হৃদয়জুড়ে আছ স্বপ্নসাগরে

উথাল পাথাল ঢেউয়ে ঢেউয়ে শ্রাবণের বৃষ্টির কান্নায়

তুমি আছ আমার ধ্যানের অনন্তে, ধমনিতে রক্ত স্পন্দনে।


মাহবুব বারী

কুবরা

বসে আছি একা-একা, কত কাল কে জানে!

সামনে মিষ্টি পানির নহর। কুবরা!

এ কী বিভ্রম আমার! নাকি কল্পনা নাকি জীবন্ত সত্য!

জানি না আমি। কিন্তু জান্নাতের মতো মনে হলো।

যদি আমি কৃষ্ণের মতো বাঁশি বাজাতে পারতাম!

মধ্যরাতে আমি যখন আচ্ছন্ন এক ঘুম

আর তন্দ্রাচ্ছন্ন এক জাগরণে নিমজ্জিত

তখন আমার দৃষ্টিকে সচকিত করে

তুমি উঠে এলে কোন অতল থেকে সুন্দরী

দীর্ঘ কেশের সারি লুটাতে লুটাতে, ধীরে ধীরে ধীরে

যেন স্বর্গের হেরেম থেকে কোনও,

                                             মাথায় বেলি ফুলের গন্ধ;

সামনে এসে দাঁড়ালে তুমি-আমিই কুবরা।

আর দুই হাতে মাথার চুল পেছনে উড়িয়ে দিয়ে

নিমিষে আমাকে জড়িয়ে ধরলে-

যেন আমি স্বর্গপ্রাপ্ত হলাম, স্বর্গপ্রাপ্ত হলাম, স্বর্গপ্রাপ্ত হলাম!

তবে আমিই কি সেইসব স্বর্গপ্রাপ্তদের একজন!-

এই কথা ভেবে ভেবে যখন

তোমার হৃদয়ের গহিনে ডুবে যাচ্ছি ক্রমাগত

তখন নিদারুণ এক উষ্ণতায়

গলে গিয়ে নেমে গেলে আবার সেই নহরের মধ্যে।

যদি আমি কৃষ্ণের মতো বাঁশি বাজাতে পারতাম।


ফারুক মাহমুদ

উৎস : কালিদাস

শৃঙ্গারতিলক

ক.

নারীর শরীর যেন পুণ্যস্নাত স্নিগ্ধ সরোবর

প্রকৃতি, নির্মাণকৃতি প্রতি অঙ্গে চিরবিরাজিত

লাবণ্যের রতিরশ্মি ঢেউ খেলে কাকচক্ষুজলে

বাহু তার উচ্ছলিত, ঢলোঢলো মৃণালের ডাঁটা

পদ্মঠোঁটে হেসে থাকে শিশিরের মৃদু শিহরণ

শানবাঁধা ঘাট। ক্রমান্বয়ে নেমে আসা সিঁড়িদের মতো

নিতম্ব, জঘন, উরুদেশ, হাঁটু, গোড়ালির খাঁজ

ভ্রমরের কালো পাখা উড়ুউড়ু চোখের পাতায়

আষাঢ়ের কালো মেঘ হেসে থাকে চুলের আলোয়

স্তনের সাহস তার চক্রবাকমিথুনের মতো

বাহুর বেষ্টনী নেই । রতিরাত্রি তুষের আগুন

কোকিলের মধুগীতি কানে ঢালে অতিতপ্ত বিষ

অমল জ্যোৎস্না নেই, স্থানে স্থানে করোটির স্তূপ

কপোলে বিস্তৃত ছিল কস্তুরীর শোভন প্রলেপ

তাম্বুলে রঞ্জিত ঠোঁট, স্তনতটে চন্দন-তিলক

সকলই অক্ষত আছে! সখী, সঙ্গমে হওনি রত ?

পতি কি বালক মাত্র! অথবা কি কামশৈত্যলোক!

‘ব্যাপক প্রস্তুতি ছিল, গন্ধশয্যা, নিবৃত্ত বসন

শৃঙ্গারের ঢেউ এসে ভাসিয়েছে তটতলদেশ

ঘোড়ার উন্মাদ হ্রেষা, নৌকার দোলনি ব্যপক…

চূড়ান্ত শুরুর আগে হলো তার যবনিকাপাত।

এরপর রতিপ্রশ্নে আর কোনও কথা বাকি থাকে !

খ.

ও প্রিয়া! পদ্মফুলের সকল রূপমঞ্জুরি দিয়ে

          সাজানো হয়েছে ব্রীড়ানত

            তোমার নয়নশোভা। সামান্য কটাক্ষে

                 পরাভব মানে বীরত্বের

                       শৈলচূড়াগাথা

দাঁত যেন কুন্দফুলবীথিÑকমলার কোয়া

      কোমরে নদীর বাঁক, গিরিদরী শ্রোনি

             নতুন পাতার মতো অধরঝিলিক

                  স্তনবৃন্তে মধুমাছি, স্তূপাকার তুলো

                        গ্রীবাদেশে চাঁদ হেসে থাকে

এরপরও অনড় (!) পাথর কেন তোমার হৃদয় ?

নির্দোষ সরল প্রশ্ন, কোনও দিন দাওনি জবাব!!

গ.

কারও যদি ভাগ্য হয় পদ্মদলে বসে থাকা খঞ্জনা দেখার

                             সোনার সঙ্গে সোহাগা মেলে

হাতি ঘোড়া রথ পদাতিক-

চতুরঙ্গ সেনা পরিচালনার সে আধিপত্য পায়

আমি, তোমার এ পদ্মমুখে

রোজ দুটো খঞ্জনাক দেখি

                  চক্ষু হয়ে হেসে বসে আছে

অপেক্ষা আর অপেক্ষা শুধু-

দেখি না, আমার ভাগ্যে কোন শিকা ছেঁড়ে


কামাল চৌধুরী

অনিশ্চিত

আঙুলের পাশে কারা আজ সকালের গল্প,

কবে ভোর হবে আমাকে জানাও

কোথাও চূড়ান্ত কোনও মেঘ নেই, বৃষ্টি নেই

অনুপ্রবেশের স্মৃতি মনে হচ্ছে নিহত সকাল

বাড়ি থেকে বেরিয়েছ কবে, এখন তারার মতো

স্মৃতি নিবু নিবু

ফের সেই অলস নিদ্রার দিন

থমকে যাওয়া কোলাহলে অবলুপ্ত ভেতরমহল

এমন পাতক দিনে, প্রান্তরেখা ছুঁয়ে ছুঁয়ে পাশের বাড়িটা

কোথায় যাচ্ছে একা!

আদিম

মেয়েটির হাত থেকে উপচে পড়েছ তুমি

সমুদ্রের কথা ভাব স্বেদবিন্দু, আমি তার জল

প্রতিটি গলির মোড়ে আমাদের বানভাসিকালে

এখন শ্রাবণদিন, আমরাই অতর্কিত স্নানঘর!

আজ এই ভেজা হাতে বিন্দু বিন্দু প্ররোচনা পেয়ে গেছি ভোরে

জোছনা পেরিয়ে যদি রাত আসেÑসেই দৃশ্য তোমার একার

ঝরাপাতাদের শীতে উড়ে যেতে যেতে

আমিও দাঁড়িয়ে থাকা বনতরু, বৃক্ষকর্তনের দৃশ্যে

কাঠুরিয়াদের কাছে সিগারেট, দেশলাই খুঁজে খুঁজে

আগুন জ্বালানো দিনে গুহামানবের মুখ

চতুর্দিকে জল, অগ্নি, সবুজের মাঝখানে, কারও হাত ধরে

আমিও তোমার মতো এসে গেছি পৃথিবীতে!


শামীম আজাদ

ডার্লিংটনে সকাল

আকাশ থেকে আলোর মোরগ ডেকে উঠেছে

ক্রমশ রাত্রির হুইস্পারগুলো হুইসেল হয়ে যাবে

চোখের পাতায় শোয়া ঘুম

জেগে উঠে জুতো পরে

হয়ে যাবে প্রবল পরাক্রমশালী প্রভাত

আরও কিছু সময় পর

প্রভাত ঝুলে পড়বে পিঠে

পিঠের পর দেহের গিঁটে গিঁটে

গিঁট থেকে সম্বিতে সম্বিতে।

তারপর সেই বহুদিনগুলোর মতো

মেঘ ডেকে আলো উঠতে থাকবে

জল থেকে বেরিয়ে আসবে গাছের এভিন্যু

হ্যালোজেন রোদ বলবে হ্যালো!

যতক্ষণ বরাদ্দ আলো থাকবে

যতক্ষণ আলো থেকে অঙ্গার পাব

যতক্ষণ পবন থেকে পাঠ নিতে পারব

যতক্ষণ শবরীর মতো প্রেমে আবদ্ধ থেকে

ঠক ঠক করে কাঁপবো

আমি কাহ্নু কবির মতো

উঁচা উঁচা পাহাড় পেরুবার জন্য

চলতেই থাকব

          চলতেই থাকব

                   চলতেই থাকব …


সোহরাব পাশা

তোমার বাগান

কেন অমন পাগলামি করছিলে দুপুরবেলা

আগুনভরা জলের গাড়ি এলো রাতে

কে জানত দূর অধরা মাধুরী তুমি উড়ালের

নীলপাখি, ছায়াসঙ্গে উড়ে যাবে ঠিক সন্ধ্যেবেলা

কে বোঝে দুর্বোধ্য আহ্লাদী হাসির ভাষা

চোখের ভেতরে কাঁপা অন্য নদীর উতলা ঢেউ

গোপনে বেঁধে রাখা পারাপারের সোনার পানসি

কেউ কী জানত বিনিদ্র রাত্রির প্রিয় নোটখাতা

ভেসে যাবে বেনোজলে,

জানতে আমার পৃথিবীটা খুব ছোট

আকাশটা তো আরও ছোট মাত্র এক টুকরো নীল

দেখা যায়, যাতে বিস্তর দলছুট মেঘের

ডালপালা পড়ে কখনও আবার কুয়াশার ভিড়

দূর হলুদ বাড়ির তুমি আর তোমার বাগান

যা দেখার মাত্র ছোট্ট একটি জানালা

ভোরবেলায় দেখি জানালায় ক্ষিপ্র রাত্রি দাঁড়িয়ে

আছে উদ্ধত ভঙ্গিতে

তোমার বাগানে একটিও ফুল নেই

দেয়াল তুলে দিয়েছে কেউ


খালেদ হোসাইন

কতদিন দেখি না তোমাকে, আমার স্বদেশ ? 

রোজ কত বাচালতা করি,

বাঁচার জন্য।

রোজ কত অনর্থক প্রহর কাটাই, প্রহসন করি

অর্থের জন্য, জীবনের অর্থবহতার জন্য।

কতদিন কথা বলি না, তুমি নেই, তাই।

কতদিন দেখি না তোমাকে।

এ জন্মে আর দেখা হওয়ার সম্ভাবনা নেই।

অন্য কোনও জন্মও তো নেই।

মিছিমিছি বাগযন্ত্রের ব্যবহার, চারপাশে-কী যে যন্ত্রণা! 

কোন ঋতু এল, গেল, আকাশে মেঘের কী হাল

পাখি না বোমারু বিমান-কে যায়, কে আসে

কোথাও কি যুদ্ধ হচ্ছে, তড়পাচ্ছে ক্ষুধার্ত মানুষ ?

কিছুই জানি না আর, তুমি নেই, তাই।

হ্রদের পাশেই ঘর, সে আমার রাখে না খবর।

অথবা আমার কোনও ঘর নেই, স্বর নেই।

পিপাসায় জিভ শুকিয়ে লৌহপিণ্ড হয়ে থাকে।

জলপুষ্প ফোটে কি-না সুবিশাল পাতাদের মাঝে

মনেও পড়ে না আর চোখেও পড়ে না।

আনন্দের মৃত্যু নেই, মানি, যদি তার দেখা আমি পাই

কোনওদিন। না, আমি খুঁজি না তাকে, যদি দেখা পাই-

একটি প্রশ্ন করে চলে যেতে দেব, মর্মে কেন দিয়েছিলে ঘাঁই,

স্বপ্ন গুঁজে চোখে?

রোজ কিছু বাচালতা করি, বাচালতা শুনি। রোজ কিছু চলাচল করি,

রোজ দৃষ্টি ক্ষীণ হয়ে আসে। ভাবতেও চাই না আর-

আমি কি দেশের মতো, কেউ কি আমাকে ভালোবাসে ?

কত দিন দেখি না তোমাকে, আমার স্বদেশ ? 


রেজাউদ্দিন স্টালিন

সুষম বণ্টন

বদলে দিতে পারি তোমার ভুল বিশ্বাসগুলো

ভালোবাসার শক্তি অসীম

প্রেমের আলিঙ্গন পাপ এই ভয় আমাদের মিলনকে কত যুগ ঠেকিয়ে রেখেছে

ঈশ্বর প্রেরিতগণ পুরুষ বলে

তাদের ক্ষমতা নিরঙ্কুশ

পতির পায়ের নিচে স্ত্রীর স্বর্গ

এ এক প্রহসন

আর কখনও পুরুষের পাঁজর থেকে

জন্মাওনি তুমি

সন্তানের জন্মদাতা কেবল পুরুষ নয়

নারীর জরায়ু সৌরউদ্ভিদ

সভ্যতার মাপকাঠি সম্পদের সুষম বণ্টন

এবং অবশ্যই মা-বাবার মূলধনে

সমান অংশীদারিত্ব তোমার

ফুলের সৌরভ নেয়া

কিংবা নীলাকাশ দেখার অধিকার জন্মগত

শুধু সন্তান লালন আর রুটির কারাগারে ক্রুশবিদ্ধ হতে জন্মাওনি তুমি

অতীতে আগুন দিলে বর্তমান অধরা থাকে না

সহমরণের অগস্ত্যযাত্রায় পুড়তে পুড়তে স্বর্গে যাবে

এই বিভীষিকার বাজপাখি ঠুকরে খাচ্ছে পৃথিবীর মুখ

প্রকাশ্য চুম্বন নিষিদ্ধ

কিন্তু কি অবলীলায় মেনে নিচ্ছো পাশবিকতা

তোমার সম্ভ্রম হানি করে এমন ক্ষমতা

কারও নেই

হাজার পুরুষ তোমাকে স্পর্শ করলেও

তুমি থাকো অনাঘ্রাতা

কুমারী মেরি


হাসানাত লোকমান

নতুন সূর্যোদয়ের দেশ

অপার বিস্ময়ে ভরা পর্বতশৃঙ্গের মতো উঁচানো আঙুল

আকাশ ছেঁদে স্পর্শ করেছে আরেক আকাশ।

আঙুলের দিকে তাকিয়ে শঙ্কাহীন জেগে ওঠে দুখী বাঙালি

তাদের বুকজুড়ে ভাসতে থাকে দুর্দমনীয় স্বপ্নের সাম্পান

কৃষকের লাঙল হয়ে যায় বিস্ফোরণোন্মুখ গ্রেনেড

ছাত্রের কলম হয়ে উঠে দূর পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র

কারখানার আগুন হয়ে যায় একেকজন শ্রমিক।

তারা প্রত্যেকেই সমস্বরে গেয়ে ওঠে স্বদেশের গান

ক্ষুধার্তের যেমন চলে না নিদেনপক্ষে এক টুকরো রুটি না হলে

তৃষ্ণার্তের যেমন চলে না সুপেয় জলের জোগান না হলে

তার চেয়েও অধিক ভয়ংকর ক্ষুধা আর তৃষ্ণা নিয়ে

বাংলার কৃষক ছাত্র শ্রমিক গ্রহণ করে স্বাধীনতার দীপ্ত শপথ!

তারপর বাংলার সবুজ বুকে ছড়িয়ে পড়ে

                                                            শহিদের সকরুণ আর্তি

তারপর ভোরের আকাশে

বাংলার মাটি ঘাসে হাসে নতুন সূর্যোদয়ের দেশ।


মারুফ রায়হান

দূরবর্তিনীর প্রতি

আমাদের দেখা হোক এ গ্রহের তপ্ত নগরীতে

দেখা হোক মিহি মাইনাসে, ঈষাণ-নৈঋতে,

নর্থ-এন্ডে, হাজিময় কাজি আলাউদ্দিন রোডে

দেখা হোক চাঁদনি-চকে, ম্যানহাটনের রোদে

আমাদের দেখা হোক বনে-উপবনে ধ্বস্ত ইউক্রেনে

দেখা হোক ফুটপাথে চা-বাগানে আন্তঃনগর ট্রেনে

মহাকাশে, মারিয়ানা ট্রেঞ্চে, নভোনীলে

দেখা হোক ব্যস্ত মতিঝিলে, শাপলার বিলে

আমাদের দেখা হোক বরষার দিনে, কবিতা-উড্ডীনে

দেখা হোক কোকিলের স্বরে গানের আসরে

রবীন্দ্র সরোবরে, টেট মডার্নে, মেঘনার ঘাটে

দেখা হোক প্রভাতফেরিতে, প্রাচীন গ্রামীণ হাটে

দুজনার অজ্ঞাত অতীতে একবার হোক না দেখা

পরিচয়ের আগে পৃথক পৃথক ভুলে ভরা রাতে

পীড়নপিষ্ট বিনষ্ট প্রভাতে, দেখা হোক শুকোনো কান্নায়

সময়ের উচ্ছ্রিত পান্নায়, সাগর-ফেনিলে, ভূস্বর্গে ভূতলে

ঊষর পর্বতে ফুল ফোটানোর মন নিয়ে ঢের

দেখা হোক আমাদের ॥


ফকির ইলিয়াস

দ্যা স্টোন ব্র্যাকেট

পৃথিবীকে শাসন করে যে পাথরে নির্মিত মমি,একদিন

তারও প্রাণ ছিল! একদিন এই সুড়ঙ্গপথে অন্য কোনও

ছায়াভ্রমণ সম্পন্ন করত যে ঋতুÑতাকে বিবেচনা

করা হতো জগতের প্রথম গ্রহ হিসেবে। আর যারা

হিস্যাবিদ্যায় পারদর্শী;

         তারা মানুষকে দেখাতো নতুন গণিত।

মূলত ভাগ-বিয়োগই নির্ধারণ করে আগামীর ভ্রƒণপ্রবাহ,

আর যোগ-পূরণের আকাশ ঘিরে রাখে যে দিগন্তমঙ্গল-

সেটাই সকল কোলাহল ভেঙে বৃক্ষের জন্য জমা করে

জাগৃতির নিশ্বাস। বর্ষায়,

ঝড়েরা তা বিতরণ করে পরিকল্পিত রহস্যে রহস্যে।

মানুষ প্রেমে অথবা বিরহে আক্রান্ত হলেই ভাঙতে চায়

সেই রহস্যের স্টোন ব্র্যাকেট। প্রাচীন যুদ্ধবিদেরা;

তর আর ধনুক নিয়ে যেভাবে রণমগ্ন হতো, আজকের

সমরনায়কেরা আণবিক চুল্লীর ভয় দেখিয়ে

সেই স্টোনগুলোকেই  দেশ থেকে দেশান্তরে পাচার করে মাত্র !


শাহীন রেজা

একা নই

কেউ পাশে নেই অথচ নিজেকে একা মনে হচ্ছে না; মনে হচ্ছে না অসহায়,

তুমি নেই সে নেই ওরা নেই

অথচ আমি একা নই-

ঠিক জন্মমুহূর্তের মত ভেসে বেড়াচ্ছি নিবিড় নৈঃশব্দ্যের অনিমেষ রক্ত-উপত্যকায়;

হয়তো কোথাও আছে কানি বক, রত্নদ্বীপ আর বোগেনভিলিয়ায় ঠোঁট ছোঁয়ানো শেষ চৈত্রের ওম, আছে নির্ঘুম স্বপ্নবিলাপ, কাব্যের আলুথালু বোধ আর চৈতন্যের খুনসুটি এবং তুমি।

ঠিক এখন এখানে আমার চারপাশে ঘুরে বেড়াচ্ছে নির্জনতা এবং তুমি, বিশ্বাস কর;

আমি একা নই-

কেউ না থাকলেও মানুষ নিঃসঙ্গ হয় না

কখনও কখনও; যেমন আমি।


সৌমনা দাশগুপ্ত

ডোডোপাখি  

বালিতে বালিতে বুজে যাচ্ছে স্বর। পাখিটি হারিয়ে ফেলছে তার শিসের দ্যোতনা। ইগলুর ভেতরে বসে আগুনে রক্ত  সেঁকে নিতে নিতে স্মৃতির ভোজালি এক ধারালো পেজমার্কার, উড়তে থাকে ঘরজুড়ে, তখন নিজের আয়নাতেই নিজের হাড়গোড় শিরা-ধমনি রক্তজালিকা মজ্জারস মেলে ধরতে ধরতে কেঁপে উঠি, দেখি কোথাও কোনো চোখ নেই, আছে শুধু অসীম গহ্বর, চামড়া জড়ানো সেই গহ্বরে ঘুমিয়ে আছে শত-শত মাটির মাকড়। খাবি খাওয়া ইচ্ছেগুলো ছড়িয়ে পড়ছে, মিশে যাচ্ছে অনন্ত ভূমায়। আর তাকে ধরব বলে বাড়িয়ে দিচ্ছি হাত, দু-হাতের মুঠোয় তখন শুধুই কুয়াশা। মুঠো বন্ধ করি আর খুলি, দেখি কুয়াশার ভেতর থেকে জেগে উঠছে ডোডোপাখি

আর জল খুলে যাচ্ছে, আর জল এগিয়ে আসছে, যেন বাইসনের দল, যেন টর্নেডো। ভিজে যাচ্ছে স্যান্ডডিউন, ভিজে যাচ্ছে পরম খর্জূর। গভীর জঙ্গলের পেট চিরে পথ, কালো ও উজ্জ্বল পিচরাস্তা, দূর থেকে মনে হয় নদী… রাস্তার ধারে ভাতের হোটেলে শালপাতার থালায় রাখা আছে কয়েক হাতা ভাত, তার ওপর গড়িয়ে যাচ্ছে টকটকে লাল মাংসের ঝোল, তার ওপর গড়িয়ে যাচ্ছে শালগাছের দীর্ঘশ্বাস। শরীরে তিন-চারটে বুলেট নিয়ে ভাত পাহারা দিচ্ছে যে মানুষটি, সে কিন্তু বেশ কয়েকবার মারা গ্যাছে সেই কোন্ কালেই। সে কি ভাত পাহারা দিচ্ছে, নাকি পাহারা দিয়ে চলেছে তার নিজেরই রক্ত!

মুঠো থেকে গড়িয়ে পড়ছে কুয়াশা। উত্তাপ ও বালিঘড়ি ঢেকে দিতে দিতে সে আসলে ঢেকে দিতে চাইছে একটি জিয়োল মাছের ধুঁকপুক। স্থিরছবি হয়ে দাঁড়িয়ে আছে চিতল হরিণের দৌড়। স্পর্শের গল্প খুঁজতে খুঁজতে কে যেন হারিয়ে যাচ্ছিল মেঘের ভেতরে। আর কয়েকশ বছরের দূরত্ব তৈরি হচ্ছিল ইন্দ্রিয় ও আঙুলের মধ্যে। আসলে গল্পটা শুধু আঙুলের ভাবলে ভুল হবে, আবার গল্পটা ছিল আঙুলেরই। ছাড়া-কাপড়ের গন্ধ নিতে নিতে, টাঙিয়ে রাখা চামড়ার গন্ধ নিতে নিতে তুমি তখন টাস্কিডার্মির কথা ভাবছিলে, আর খড়ে ঠাসা চিতাবাঘের থেকে ছুটে আসছিল থাবা, থাবার ভেতরে লুকিয়ে রাখা নখগুলো তখন তোমাকে দেখছিল, থাবার ভেতরে লুকিয়ে রাখা আঁচড়ের স্পর্শগুলো তখন তোমাকে জড়িয়ে ধরবে বলে ছায়াচিত্রের মতো এগিয়ে আসছে ধীরে…  

ক্রিস্টালে ভরে আছে ঘর, আর ঘুলিয়ে ওঠা জলের মধ্যে ডুবে যেতে যেতে চোখ তখন এক সমুদ্র-ঘোটক। আমি তো ভ্রমণে যাব, ভেঙে দেব প্রবাল-প্রাচীর। বালিখেত ভরে দেব তারার ফসলে। বেলাভূমিতে চোখ পেতে, কান পেতে সেঁচে নেব বালির কান্না। হাতবাক্সে তুলোর পেলবে জমা হচ্ছে কান্নার কেলাসিত দানাগুলি। ওই যে পায়ের ছাপ নেমে গ্যাছে জলের গভীরে, সেই পথে চলে যাবে আমারও পায়ের পাতা…

এখন অনেক লম্বা দিন, দিনের পর্দায় ঢাকা বৃষ্টিঘোরে আমি ভরে দেব ঘাসদোতরার স্বর, তার ভাইব্র্যান্ট শেডস। আজ আর আগুন নেই, ঘরে ঘরে দেশলাই নেই, নেই কোনও ছন্ন কুহু-কেকা। ডুবুরি নেমেছে, তুমি এইখানে স্থির হয়ে বসো…

যে নাবিক তোমাকে বলেছে তার নৌচালনার কারুকৃতি, তাকে বলো এখনও বহুদূরে দাবানল, এখনও আঠা লেগে আছে তার পায়ে। তাকে আর উনুনে ডেকো না। শুধু ধোঁয়া ওড়ে, যেন সে ধুনুচি কোনও, তোমাকে নাচাবে এক ভাসানের দিনে। চাক ভেঙে উড়ে যায় রানি-মৌমাছি। দূর থেকে হেঁটে আসে গাছ, তার ছায়া পড়ে তোমার চায়ের কাপে, চোখের শাদায় … 


কাজী জহিরুল ইসলাম

শেষ বিকেলের গান

৪৬.

শুনেছ কি ভয়ের আজান তুমি কোনও দিন ?

মধ্য-শীতে কাঁপছে দুপুর,

কাঁপছে দেখো মুয়াজ্জিনের দুধ-শাদা আস্তিন।

অসময়ে আজান হাঁকে

দূর প্রবাসে এÑকোন মুয়াজ্জিন ?

এখনও যে সারা অঙ্গে

লেগে আছে ফেব্রুয়ারির ঋণ।

মহাকালের কাছে আমি করছি নিবেদন,

বাড়িয়ে দাও একটু সময়

শেষ করি রন্ধন।

অভুক্ত সব দীন-মুসাফির আছে অপেক্ষাতে

রান্না হলে খাবার তুলে দেব তাদের পাতে।

বাজার থেকে সব এনেছি,

শব্জি-আনাজ, মাংস ও মাছ, মসলা, তেল ও নুন

এখন শুধু লাকড়ি ঠেলে ধরাব উনুন।

৪৭.

শুকনো ডালে স্যান্টাক্লসের শুভ্র দাড়ি।

অনতিদূর, গর্বভরে

দোলায় সবুজ জীবন্ত ঝাউ সারি।

উঠবে আবার সবুজ ঠেলে কুঁড়ি

স্বপ্ন দেখে ফেব্রুয়ারি,

বাড়ির পাশে কাফন পরা থুত্থুরি এক ম্যাগনোলিয়া-বুড়ি।

দৃষ্টি জুড়ে শুভ্র দিগন্ত…

গাছ-খোড়লে কাঠবেড়ালি স্বপ্ন বোনে

কচি-সবুজ পাতার নিচে উষ্ণ বসন্ত।


সুমিতা মুখোপাধ্যায়

পর্ণমোচী

যে যায় সে যায়

যূথবদ্ধ হাত গলে নীরবে ঝরে যায় বালি

বাসন্তী রঙে চোবানো দিন চলে যায়

ঠিকানাবিহীন কোন এক পাতাল অভিসারে

যে যায় সে যায়

পিচ্ছিল শরীর চলে যায়

হিমেল সাপের মতো;

তেপান্তরের মাঠ পেরিয়ে চলে যায়

অদ্ভুত অন্ধকারে,

বিগত প্রেমিকের অবাধ্য পাশবিক মনের মতো

হারিয়ে যায় সব;

বিপ্রতীপ হাওয়ায়।

যে যায় সে যায়

সযত্নে  লালিত পেঁজা পেঁজা মেঘ

ভেসে যায় ভারহীন,

প্রাচীন এক মায়াবী সন্ধ্যার মতো

অভিমানী মুখ কেবলই সরে সরে যায়।


টোকন ঠাকুর

জ্বরের কলঙ্ক

জ্বর নেই, জ্বরের কলঙ্ক লেগে আছে

ঠোঁটের কোনায় কুঁড়ি কুঁড়ি ফুসকুড়ি

মানুষ কত কী জানে, তবু কেউ কি জানতÑ

একদিন আমাকেই লিখতে হবে

জ্বর-ঠোঁট কিম্বা ফুসকুড়ি-বৃত্তান্ত!

প্রেম নেই, প্রেমের কবিতা জেগে আছে

জ্বর নেই, জ্বরের কলঙ্ক লেগে আছে


ভাগ্যধন বড়ুয়া

বীজধান, আমার শরীর

মা নেই অথচ মনে থাকে না আমার

ঘরে ঢুকে ডাক মারি মা …মা …

সাড়াশব্দ নেই, প্রতিধ্বনি আসে খালি হাতে

রোদ সরে যেতে যেতে প্রলম্বিত ছায়া …

জানালায় দৃশ্যমান যে আকাশ তাতে ভাসমান মেঘ

পাখি কই গেল আজ পাখি ঘরে ফিরত এই পথে

ফুলেরা কি ভুলে গেছে  প্রস্ফুটনের নিয়ম ?

স্বতঃস্ফূর্ত হাসি হয়ে ফুল কবে ফুটবে আঙিনায় ?

চৌরাস্তার বৃক্ষ চেনে  মাকে, বংশ পরম্পরা

আলিঙ্গনে বুঝা যায়, বন্ধন বিশ্বাস  অনুভব

শাদা কাপড়ের ছোট্ট দেহ খাটিয়ায় পার হয় মোড়

সম্পর্কিত স্রোত গতি তোলে চোখে, মনোতলে বান

মা থাকে কোথায় ? কোষে ? শরীর তো জরায়ু আধার

কে কার ভেতর ? ধাঁধা! অস্তিত্ব বিলীন মমতায়

চামড়া কুঁচকে গেলে বুঝি গোধূলির ঘ্রাণ, মাটিলগ্ন টান

গোরে শুয়ে আছে যিনি-বীজধান, আমার শরীর


অতনু তিয়াস

এবার আদিম হবো

ধার নিয়ে ফেরত দিতে গিয়ে

আরও টাকা ধার চেয়ে বসি

ফিরে আসি শূন্য পকেটে

অনলাইনে টাকা ওড়ে

টাকা ওড়ে মুক্তবাজারে

নগদে

    বিকাশে

         রকেটে

মৌলিক মানবিক চাহিদাগুলো

         বদলে যাচ্ছে দিন দিন

ভার্চুয়াল দুনিয়ায়   

মানুষ অভ্যস্ত হচ্ছে গাণিতিক জীবন আচারে

স্পেসড্রেস পরা উত্তরাধুনিক হৃদয়

নিজেকে হারিয়ে ফেলছে

         ক্লোনের অরণ্যে

হয়ত একদিন

মানুষই খাদ্য হবে ডিজিটের!

অতশত বুঝি না তো

পাগল মানুষ

বিনয়ী বোকা মেনে খুশি আছি

জোর করে ভালো থাকার

         ব্যর্থ প্রয়াস নেই

আমাকে যে যা-ই খুশি ভাব

পণ্যের ডাক

পিছে পড়ে থাক

এবার আদিম হবো।


শতাব্দী জাহিদ

ঢাকা

সিটি কলেজের জ্যাম চন্দ্রিমার হাত ধরে নিউমার্কেট ছাপিয়ে হয়ত

চাংখারপুলের বিরিয়ানি খায় শরতের শুকনো বাতাসে।

লেগুনায় মোনাজাতের ভঙ্গিতে তোমার পায়ের পাতা

কোভিডের ভাইরাস মেঘ ঠেকাতে বর্ষাতি ডেকেছেÑঠোঁট

বিড়ালের চোখের মতো লাফিয়ে বেড়াচ্ছে চোখ;

কতসব আঁকছ বসে স্পিডব্রেকারের ধাক্কায় ধাক্কায়

রিকশা, বাস, বিলবোর্ড  অন্তর্বাস সাজানো ফুটপাথ, পুরুষের বুক

আর আমি!

ভাবছিÑবাগানে বসে আছি তুমি-আমি

জবা, হিজল, জারুল, কাঁঠালচাঁপা আর অশ্বত্থের মর্মর গানে।


শামীম হোসেন

আত্মদগ্ধ আয়ু

তোমার দুঃসময়ের পাশে আমাকে রেখো

ঝড় কবলিত দিকহারা কোনও পাখি

যদি তোমার ছোট্ট ঘরে আশ্রয় নেয়

তাকে তাড়িয়ে দিও না

কিছু খুদকুড়ো তার ঠোঁটে তুলে দিও

বীজ বোনার একদিনেই ফল ধরে না

তোমার লৌহবেদনাকে পাকতে দাও

আর সবুজ টমেটোর দিকে চেয়ে থেকো

লাল হওয়া অবধি অপেক্ষা করো

মাতৃবাহুর গন্ধ ভুলিনি, কেউ ভোলে না

যে ভোলে শস্য তার গোলায় ওঠে না

ফুলের সুবাস ফিকে হবার আগে

হর্ষধ্বনি ছাপিয়ে পা বাড়াও পথে

আত্মদগ্ধ আয়ুকে সূর্যের মুখোমুখি করো

আর সেই পাখিটির প্রাণের কথা ভাব

মমতার গৃহে যে পেয়েছিল আয়ুর প্রসাদ

স্বনির্মিত গর্ভাশয়ে আটকে থেকো না

হেমন্তপ্লাবিত ঝলমলে শস্যের দিনে

ছায়ামর্মরিত আমাকে, মনে রেখো না


তুষার কবির

এই অতিমারি পার হয়ে

এই অতিমারি পার হয়ে

হাওয়ায় ভেসে আসে শুধু অমুদ্রিত শোকবার্তা!

আর আমি ছুটে যাই

মড়ক ও মারিচেরা রোদে-

হেঁটে হেঁটে খুঁজে ফিরি কাফনে মোড়ানো যত কান্নাগাথা!

ছাই ওড়া শ্মশানের পাশ ঘেঁষে

এই অতিমারি পার হয়ে

আমি খুঁজে ফিরি গোধূলির গান সুর ব্যথা!

এই অতিমারি পার হয়ে মৃত্যু ও হাহাকার শেষে

বুঝি তুমিই আমার আরোগ্যালয়;

নিঝুম সেবাসদন-শুশ্রুষার শব্দ স্বপ্ন কথা!


নওশাদ জামিল

ইশারালিপি

তোমার ইশারালিপি পাঠ করি ধীরে

মনে হয়Ñআমরা ছিলাম মুখোমুখি

গুহার ভেতরে, অগ্নিপরিখার ঘরে

একদিন নিজেরই গলার স্বর শুনে

বুঝি যে চিৎকারে কেঁপে ওঠে শিলাখণ্ড

দুলে ওঠে প্রত্নত্রস্ত পূর্ণাঙ্গ শরীর 

এতদিন কী দেখেছি-একে একে বলি

গুমোট, দুঃসহ, ভারী সেই নীরবতা।

অগ্নিপরিখার ঘরে দাঁড়াই আবার

দেখি আজ হাওয়ায় দুলছে বনলতা

কাঁপছে উদ্ভিন্ন স্তন তীব্র শিহরণে

একদিন নিজেরই গলার স্বর শুনে

বুঝি যে বিস্ফারে কেউ চলে যায় দূরে

কেউ থেকে যায়- মুখোমুখি গুহাঘরে।


মিছিল খন্দকার

বক্র পৃথিবী

যথা সবকিছু অস্থির হলো বলে

তবে না সন্ধ্যা

তাহলে সন্ধ্যা বরই গাছের তলে

ঘনায়ে আসেন মিহি কুয়াশায়

পাখির ফেরার মাপে

তাতে

বসে থাকে কেউ পুরনো বাড়ির

নিরালা সিঁড়ির ধাপে

বসে আছে যেন বসে থাকা তার

শুয়ে থাকা নয় বলে

হেঁটে আসা যায়, ম্লান হাসা যায়

হেঁটে আসে তাই ফলে

গিয়ে দেখে আসে, ঋতু বেঁকে আসে

ঝরে যাওয়া পাতা ওড়ে

মনে ডাকো যাকে, নাই শোনে যদি

ডাক দাও মৃদুস্বরে

নোন করে দেখো, টোন করে রাখো

ফেলে দাও হাত থেকে

বক্র পৃথিবী বঙ্কিম যদি

কত আর যাবে বেঁকে!


ফিরোজ শাহ

বিয়োগ চিহ্ন

ক. মানুষ

মানুষ নিজেই একটা বিয়োগ চিহ্ন

ট্রেনের বগির মতো

জোড়া লেগে পালিয়ে যাচ্ছে স্টেশন থেকে …

খ. উত্তরাধিকার

বাবার প্লেটে আলুভর্তার পাশে আস্ত একটা চাঁদ

জোছনা খেতে খেতে বাবা একদিন জোনাকি হয়ে যায়

পোড়ামরিচের অন্ধকারে দৌড়ে

আয়ুরেখা অতিক্রম করেছিল মা

পান্তাভাত আর কাঁচামরিচের পাশে উৎপন্ন শীতকাল

আমার উত্তরাধিকার।

গ. ক্লেশ

রং ওঠা বিকেল

একটার ওপর একটা বিছিয়ে কাঁথা সেলাই করতেন মা

অস্ত যাওয়া সূর্যেও চকচকে লাল সুতোয়

ভেসে উঠত মায়ের লাল কষ্ট

সেলাই শেষে

সূর্যটা ঘুড়ির মতো নেমে আসত মায়ের কাঁথায়।

ঘ. তরমুজ

ট্রাক-ভর্তি তরমুজ

শহরে

বাজারজাত হচ্ছে মাটির লাল কষ্ট।


আনন্দময়ী মজুমদার

ফাগুন-পুন্নিমা তারা

ফাগুন-পুন্নিমা তারা

জলে কাদায়

তারা আলোকিত

সত্তা মেলেছিল

উষ্ণতা অঢেল ছিল

মায়েরা

যতটুকু রাখে ইতিহাসে

রেখে যায় মানুষ 

যারা একটু 

ভালোবাসে

আলোকিত সিঁড়ি ধরে

উষ্ণতা পাঠায়

চলে গেছে যারা

‘আমরা কৃতজ্ঞ’ বললেই,

যারা চুপিচুপি আসে।

যে-জন্মেছে আর বেঁচে-থাকা

ভুলে গেছে

 সে যেমন নতুন করে বাঁচে

তেমন করে

বারবার শিখতে হয়

আলোর জোগান

বিষম প্রভাতে

সন্ধে

প্রতিদিন,

রাতে

কাঁটাতার 

মানুষকে বিচ্ছিন্ন রাখে,

কাঁটা তাদের শিখিয়েছে হাঁটার

শতেক নিয়ম

চিনতে চিনতে হয়ত তারা

বুঝতে শিখেছে

অথবা অবুঝ থেকে গেছে

তবু বারবার

অনুভূতির পাঠ থেকে

তাদের শিখতে হয়েছে

দুঃখ

এই সব গহিন নিঃসঙ্গতা

নতুন সব দুর্দশা

মানুষের নব্য ইতিহাসে।

ছিল পূর্বমানুষ

আত্মসম্মান নিয়ে যারা

দাঁড়িয়েছে চিরকাল

আত্মসম্মানের আরেক নাম

 প্রেম হতে পারে

কারণ

চলে যায় যারা

তারা তো আসলেই থাকে

পূর্বমানুষ

এই সব অন্ধকারে

আলোর জোগান রেখে গেছে

পূর্বমানুষ স্মৃতির কাহন ধরে

ঘুরে ঘুরে আসে

জেনেছিল তারা

খোলসের মতো

মানুষ

ত্যাগ করতে পারে তাদের

একাট্টা শরীর

ছড়িয়ে যায় তারপর

মহাজগতের

রন্ধ্রে

প্রেমের  ভেতর

তারা দেখেছিল

আস্থার ওপর আস্থা রাখতে

ঝুলে গেলে

মরে যায় মানুষ

আস্থা-মন্ত্র বিড়বিড় করে তারা

দেখেছিল

আলো ফিরে আসে

দেখেছিল তারা 

মানুষের থাকে অনুভূতির বন্যা

অজস্র ক্রোধ

অবাক পৃথিবীর জন্য

সেই সব

ইতিহাসে

নীলকণ্ঠ কাব্য

হয়ে আসে

—————–

Leave a Reply

Your email address will not be published.

shares