মুক্তগদ্য : ফেসবুক : বিশ্বমানবের সংহতি নাকি অসহায় মানুষের প্রতিচ্ছবি ? : মঞ্জু সরকার

মানুষ মূলত সামাজিক জীব। এই সহজ সত্যটা জোয়ান-বুড়ো সব মানুষই জানে। সবচেয়ে বেশি জানে সম্ভবত ফেসবুক প্রতিষ্ঠাতা মার্ক জাকারবার্গ। তার উদ্ভাবিত ও প্রতিষ্ঠিত কোম্পানি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকের  গ্রাহকসংখ্যা এখন দুইশ কোটির ঊর্ধ্বে। এ ছাড়া আছে বহুল প্রচলিত ইনস্টগ্রাম, হোয়াটস্অ্যাপ ও মেসেঞ্জার। সব মিলিয়ে জাকারবার্গ তার প্রতিষ্ঠিত সামাজিক  নেটওয়ার্ক প্লাটফরমে বিশে^র কত কোটি মানুষকে জড়ো করতে সক্ষম হয়েছে, তার হালনাগাদ পরিসংখ্যান গুগল সার্চ দিয়ে যে কেউ জানতে পারবেন। প্রতিষ্ঠার পর দুই দশক কাটতে না কাটতেই  কোনও কোম্পানির বিশ^ময় দুইশ কোটির অধিক মানুষ নিয়মিত ভোক্তা! অতএব মালিকের স্বল্প সময়ে বিশ^সেরা এক ধনাঢ্য ব্যক্তিতে পরিণত হওয়ার মধ্যে বিস্ময়ের কিছু নেই। কেননা, যেমন করেই হোক অধিক মুনাফা লোটার প্রতিদ্বন্দ্বিতাতেই চলছে পুঁজিবাদী দুনিয়া। ফেসবুকের ক্ষেত্রেও মালিক ও ভোক্তার নগদ লাভের দিকটা স্পষ্ট। তারপরও দেখেশুনে মনে সংশয় ও প্রশ্ন জাগে। ফেসবুক ব্যবহার করে মানুষে মানুষে যে বন্ধুত্ব, চেনা-অচেনা হাজারো বন্ধুর সঙ্গে তাৎক্ষণিক যোগাযোগ এবং ভার্চুয়াল আদান-প্রদানের ফলে বাস্তবে মানুষে মানুষে সহমর্মিতা বাড়ছে নাকি কমছে ? জাতি-বর্ণ-ধর্ম নির্বিশেষে বিশ^ মানবতাবোধ সংহত হচ্ছে কতটা ? ডিজিটাল যুগের ভার্চুয়াল জগৎ ঐতিহ্যবাহী দৃশ্যমান সভ্যতা ও মানবসমাজকে দ্রুতগতিতে কোনও কল্যাণময় লক্ষ্যে, নাকি ধ্বংসের দিকে ধাবিত করছে আসলে ? এসব প্রশ্নের সদুত্তর নিজের ফেসবুক ব্যবহারের সীমিত অভিজ্ঞতা থেকে খোঁজা যাবে। তার আগে ইন্টারনেট-পূর্ব মানবসমাজের বৈশিষ্ট্য ও অগ্রগতির ইতিহাসের দিকে খানিকটা আলোকপাত করা প্রয়োজন।

জন্মগত প্রবণতার ফলে পৃথিবী নামের এই গ্রহে আবির্ভাবের পর থেকে মানুষ জোড় বেঁধেছে। যূথবদ্ধ হয়েছে অস্তিত্ব রক্ষার গরজে। মানুষের যূথবদ্ধ থাকার স্বভাব ও গরজকে ভিত্তি করেই এগিয়েছে সমাজ ও সভ্যতা। পারস্পরিক সহযোগিতা ও আদান-প্রদানের ভিত্তিতে বিকশিত হয়ে চলছে মানবসমাজ এবং গোটা বিশ^প্রকৃতি। এই অগ্রগতির প্রয়োজনেই মানবসমাজে সৃষ্টি হয়েছে নানা পেশা, গোত্র, ধর্ম, জাত, শ্রেণি এবং রাষ্ট্র। বর্তমানের পুঁজিবাদী বিশ^ব্যবস্থায় এসে রাষ্ট্র ও মানবসমাজে ধনবৈষম্য যেমন দ্রুত হারে বেড়েছে, কেন্দ্রীভবন ঘটেছে বিশ^পুঁজির। তৈরি হয়েছে বিশ^ বাজারব্যবস্থা ও বিশ^ময় অভিন্ন ভোক্তা শ্রেণি। অন্যদিকে উদ্ভব হয়েছে মানব-অস্তিত্ব বিনাশের নানারকম হুমকি এবং বিধি-ব্যবস্থাও। এসবের মধ্যে জলবায়ু সংকটের কুফল ভোগ করতে শুরু করেছে বিশ^বাসী। নানামুখী হুমকি ও সংকটের ফলে নিজের জন্মগত  প্রাচীন ও সহজ সত্যটাকে ভুলে বিপন্ন মানুষ ক্রমবর্ধমান হারে বিচ্ছিন্ন ও অসহায় বোধ করছে। সম্প্রতি অদৃশ্য করোনাভাইরাস-আতঙ্ক বিশ^ব্যাপী মানুষকে মানুষের সঙ্গরোধক পরিবেশে থাকতে বাধ্য করায় মানুষের এই ঘরকুনো একাকিত্ব ও অসহায় দশা প্রকটভাবে মূর্ত করে তুলেছিল। একদিকে মহামারিতে সব মানুষের মনে কমবেশি জেগেছিল মৃত্যুভীতি, অন্যদিকে ভাইরাস দ্রুতগতির বিশ^ায়নের সঙ্গে এ দেশেরই এক  কবির কবিতাকে গানের মতো গেয়েছে : জগৎ ভ্রমিয়া দেখিলাম সব একই মায়ের পুত। করোনাভাইরাসের বিশ^ায়ন নতুন করে প্রমাণিত করেছে মানুষের চিরন্তন সত্য পরিচয়টি। আর তা হলো জাতি, বর্ণ, ধর্ম, সংস্কৃতি ও ভৌগোলিক সীমানার খোপে আবদ্ধ মানুষ আসলে বিশ^জুড়ে এক এবং অভিন্ন, বৃহত্তর মানবপ্রজাতির অংশ। একই রকম টিকা ও সেবা―শুশ্রƒষা দিয়ে করোনা মহামারি থেকে বিশ^মানবকে রক্ষা করার চেষ্টা চলছে প্রতিটি দেশে।

অবশ্য করোনাভাইরাসের আগেও, শিল্পবিপ্লবের পর বিশ^ায়নের গতি বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে অভিন্ন মানবজাতির বিশ^জনীন ভোগবাদী চাহিদার খবর ভালোভাবেই জানত এক শ্রেণির মানুষ। এদের বলা যায়  শিল্পপতি, উদ্যোক্তা, পুঁজিপতি ও মুনাফা-সন্ধানী ব্যবসায়ী শ্রেণি।  চাহিদা সৃষ্টি ও চাহিদা পূরণের কৃতকৌশল কাজে লাগিয়ে বহুজাতিক কর্পোরেট প্রতিষ্ঠান ও বৃহৎ পুঁজিপতি হিসেবে রাষ্ট্রক্ষমতাকেও প্রভাবিত করেছে তারা। ক্রমে বিশ^ব্যাপী মানবসমাজের ওপর পরোক্ষ নিয়ন্ত্রণ-ক্ষমতা কায়েম করেছে। ইন্টারনেট ও তথ্যপ্রযুক্তির বৈপ্লবিক ভূমিকাকে বলা হচ্ছে চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের যুগ। গোটা বিশ^কে হাতের মুঠোয় ধরিয়ে দিয়ে নিয়ন্ত্রণের কাজটি সহজ হয়েছে শাসক-শোষকদের জন্য। অন্যদিকে মানুষের তথ্যচাহিদা জোগানোর দায় নিয়ে গোটা বিশ^কে হাতের মুঠোয় ধরিয়ে দিতে সবাইকে টেক্কা দিয়ে গড়ে উঠেছে কিছু জায়ান্ট টেক-কোম্পানি। অল্প সময়ে অর্জিত অগাধ অর্থবিত্ত ও ক্ষমতাবলে তারা এখন অনেকের কাছে তথ্য সাম্রাজ্যবাদী শক্তি হিসেবেও অভিহিত। একদা বিশে^ উপনিবেশ ও সাম্রাজ্য বিস্তারকারী শক্তি কিছু কিছু দেশ নানা জাতির অসংখ্য মানুষকে প্রজার মতো নিয়ন্ত্রণে রেখে যেভাবে নিজেদের স্বার্থ উদ্ধার করেছে, তথ্য-সাম্রাজ্যবাদী কোম্পানিগুলোও সেভাবে গোটা বিশ^কে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে এনেছে যেন। পুঁজিবাদী বিশ্বে নগদ মুনাফা লোটার বাজার-ব্যবস্থা একদিকে ভাইরাসের মতোই মানুষকে আতঙ্ক-উদ্বেগে একা ও বিচ্ছিন্ন করতে তৎপর। অন্যদিকে এই ব্যবস্থাবলেই সৃষ্ট এবং ফুলেফেঁপে ওঠা টেক কোম্পানিগুলো মানুষের অসহায় অবস্থা ও মানসিক চাহিদার সুযোগ নিয়ে তাদের প্লাটফরমে জড়ো করেছে কোটি কোটি ভোক্তা কিংবা ব্যবহারকারীকে। গৃহকোণে একা হয়েও চোখের সামনে নিজের  ইলেকট্রনিক ডিভাইসের পর্দায় ধরিয়ে দেওয়া ভার্চুয়াল বিশ^ ও মানব-সমাজকে হাপুস নয়নে গিলছে  কোটি কোটি বিচ্ছিন্ন মানুষ। এসব ভার্চুয়াল জগৎ-স্রষ্টা ও মানব-কারবারির মধ্যে মার্ক জাকারবার্গ এবং তার ফেসবুক এখন অন্যতম। ফেসবুক নেটওয়ার্ক ব্যবহার করতেও কোনও ফি দিতে হয় না। বরং তাৎক্ষণিক লাভের দিকটি বহুমুখী।

মনে পড়ে, ইন্টারনেট আসার আগে গত শতাব্দীর নব্বইয়ের দশকেও নাগরিক জীবনে নিঃসঙ্গতা ও কিছু ভালো না লাগার অস্থিরতা  থেকে বন্ধুসঙ্গ খুঁজতাম। সমমনাদের সঙ্গে আড্ডাতেও কাটত অনেকটা সময়।  দেশে, বিশেষ করে নগরে জনসংখ্যা এবং নগরে পুঁজিবাদী উন্নয়ন যত বেড়েছে, নিজের একাকিত্বও যেন তত বেড়েছে। আড্ডার পরিবেশ ও সময়-সুযোগও সংকুচিত হয়েছে। কিন্তু অ্যানালগ যুগের বন্ধুসঙ্গের তৃষ্ণাটা ডিজিটাল যুগে কমেনি বলে ভার্চুয়াল জগতেও বন্ধু ও সমমনাদের খুঁজতে শুরু করেছিলাম। নিজের সত্য পরিচয় দিয়ে ফেসবুক একাউন্ট খুলেছিলাম অন্তত চৌদ্দ/পনের বছর আগে। এরমধ্যে ফেসবুক তার ভোক্তাদের জন্য সুযোগ-সুবিধা বাড়িয়েছে। সংখ্যা বৃদ্ধির মাধ্যমে  ফেবু বন্ধুদের জগৎও প্রসারিত ও বৈচিত্র্যময় হয়ে চলেছে। তথ্যপ্রযুক্তির উন্নয়ন-গতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে নিজের দক্ষতা বাড়েনি। তারপরও দেখছি, অনিয়মিত ব্যবহার ও আপগ্রেডের মাধ্যমে আমার ফেবু বন্ধুসংখ্যা দাঁড়িয়েছে প্রায় পাঁচ হাজার। বন্ধু হবার রিকোয়েস্ট পাঠিয়ে অপেক্ষায় আছে আরও প্রায় হাজারখানেক। ফেসবুক কর্তৃপক্ষ একজনের একাউন্টে এখন পাঁচ হাজার বন্ধুর সঙ্গে তাৎক্ষণিক যোগাযোগ ও লেনদেনের সুযোগ দেয়। প্রতিদিন নিজের স্মার্টফোন খুলে ফেবু পাতা উল্টালেই দেখি কতটা নোটিশ বা মেসেজ এসেছে। বন্ধুদের উদ্দেশে আমি যে পোস্টটি দিয়েছিলাম, তাতে কতটি লাইক পড়েছে, ক’জন শেয়ার করেছে এবং কে কী মন্তব্য করেছে এবং সঙ্গ দেওয়ার জন্য কোন বন্ধু কী বার্তা নিয়ে অপেক্ষা করছে। একজনের একটি পোস্ট দেখে পছন্দের বাটনে চাপ দেওয়ার পরই দেখি ম্যাসেঞ্জারে সে ফোনকল করছে। ফোনে কথা বলে বুঝি আমেরিকা-প্রবাসী সে। তার মানে সামান্য লাইক বাটনটিও তার হৃদয়ে বেশ ধাক্কা দিয়েছে। নিজে অনলাইনে বা ফেসবুকে উপস্থিত আছি জানলেও অনেক অচেনা বন্ধুদের কাছ থেকে ফোন পাই,  মেসেজ পাই। অচেনা হলেও এদের মধ্যে বিপরীত লিঙ্গের আকর্ষণীয় মুখও থাকে। ফেবু বন্ধুদের সঙ্গে তাৎক্ষণিক সম্পর্কে জড়িয়ে সময় কাটানোর জন্য কর্তৃপক্ষ কত রকম সুযোগ-সুবিধা দিয়ে যাচ্ছে!

ডিজিটাল যুগের বর্তমান সুযোগ-সুবিধা দ্বারা সহজ প্রাপ্তির দিকটা তুচ্ছ করে অ্যানালগ যুগের বন্ধুত্ব ও সামাজিকতা থেকে চাওয়া-পাওয়ার স্মৃতিগুলো বেশি গুরুত্ব পায় কেন ? জানি, বয়স বাড়লে সব মানুষই অধিক স্মৃতিকাতর হয়। কিন্তু আমার স্মৃতিকাতরতার একটা বড় কারণ হলো দুই যুগের প্রাপ্তি ও অপ্রাপ্তির দিকগুলো খতিয়ে দেখতে চাওয়া। স্বীকার করি, বিগত সিকি শতাব্দীর মধ্যেই তথ্য-প্রযুক্তির বিপ্লব যে স্তরে এসে উঠেছে, ভোক্তা ও ব্যবহারকারী হিসেবে নিজের চাহিদা ও দক্ষতা সেভাবে বিকশিত হয়নি। প্রকৃতির কোল থেকে কোনও আদিবাসীকে যন্ত্রনির্ভর শহর-সভ্যতায় এনে ছেড়ে দিলে তার যেমন অবস্থা হয়, আমার সেকেলে স্বভাব ও টেকনো-আনাড়িপনাও অনেকটা সেই স্তরে রয়ে গেছে এখনও। দেখ  দেখ করে  মোবাইল  ফোনগুলো কী রকম বিস্ময়কর ও স্মার্ট হয়ে উঠেছে! এখন শুনি, রোবট গাড়ি চালাবে, ক্ষেতে-কারখানায়, এমনকি হাসপাতালেও মানুষের বদলে রোবটই নিখুঁত ও বিরামহীনভাবে কাজ করবে। সেক্সি নারী-পুরুষের মতো রোবোট মানুষের যৌনক্ষুধাও মেটাতে পারবে। আর বেড়ানোর আনন্দ খুঁজতে মানুষ রকেটে চড়ে এখন মহাশূন্যে গিয়ে ভেসে বেড়াবে। এসব প্রাপ্তির আনন্দ তুচ্ছ করে আমার এখনও পায়ে হেঁটে প্রকৃতি দেখা এবং  প্রকৃতির সঙ্গে একাত্মতা বোধ করতে পারলেই বরং অধিক আনন্দ হয়। সামাজিক যোগাযোগের ক্ষেত্রেও এখনও এসএমএস-এর বদলে চিঠি লেখা, স্মার্টফোনের বদলে ল্যান্ডফোন ও ইন্টারনেটবিহীন মোবাইল ফোন ব্যবহারেই অধিক স্বস্তি বোধ করি। তাই বলে গতির নেশা এবং বিশ^কে হাতের মুঠোয় ধরার তৃষ্ণা যে মোটেও তুচ্ছ নয়, সেটা চোখ বুজে নিজের স্মৃতি-কল্পনার দিকে তাকালেও টের পাই। অ্যানালগ যুগের সামাজিকতা ও বন্ধুত্ব এবং বর্তমানের ফেসবুকের সামাজাকিতার কয়েকটা উদাহরণ দিলে বিষয়টা  আরও স্পষ্ট হবে।

বালক বয়সে গ্রামের পরিবার, প্রকৃতি ও স্বজন-সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন করে আমাকে শহরের এক আত্মীয়ের বাসায় রাখা হয়েছিল ভালো স্কুলে পড়ানোর জন্য। প্রথম শহরে এসে এত একা বোধ করেছিলাম। বইয়ের দিকে তাকিয়ে, এমনকি ঘুমিয়েও স্বপ্নে মায়ের মুখ দেখতাম। গ্রামে তখনও শহর-সভ্যতা থেকে বিস্তর দূরে, আদিভৌতিক অন্ধকরে ঢাকা ছিল। তবে বিচ্ছিন্নতা ঘোচানোর জন্য কাঁচা রাস্তা ছাড়াও একটি পোস্ট অফিস ছিল আমাদের গ্রামে। শহরে এসে চৌরাস্তার মোড়ে প্রথম দেখলাম চিঠি পোস্ট করার একটি লালরঙা লেটার বক্স। মা ও ছোট ভাইটির সঙ্গে যোগাযোগের আকুল তৃষ্ণা নিয়ে চিঠি লিখলাম। নিজেই একটি খাম বানিয়ে একদিন একটি চিঠি ফেলে দিলাম লাল লেটারবক্সে। চিঠিখানা সুড়ুৎ করে তালাবদ্ধ বক্সের নিচে পড়ে গেল। কীভাবে সেটা মায়ের হাতে পৌঁছবে ভেবে কূল পাই না। কয়েকদিন পর জেনেছিলাম, বেয়ারিং চিঠিখানা পরিচিত পিয়ন চাঁদ মিয়া ঠিকই বাড়িতে পৌঁছে দিয়েছিল। এরপরেও ডাকবিভাগের মাধ্যমে প্রিয়জনদের সঙ্গে পত্র যোগাযোগ, বিশেষ করে  প্রেমিকাকে প্রেমপত্র দেওয়া ও পাওয়ার আনন্দ-স্মৃতি মনে পড়লে এখনও শিহরণ জাগে।

ডাক বিভাগের পর যোগাযোগ মাধ্যম হিসেবে টেলিফোন, টেলিগ্রামের অভিজ্ঞতাও ছিল বেশ উত্তেজনাপূর্ণ। আর দেশ-বিদেশ ও সমাজিক যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে রেডিও ও মুদ্রিত সংবাদপত্র এবং শেষে টেলিভিশন দৈনন্দিন জীবনযাপনের অপরিহার্য উপাদান হয়ে উঠলে, এসবকেও স্বাভাবিকভাবে মেনে নিয়েছি। তবে এতসব যোগাযোগ মাধ্যমের মধ্যে অপর মানুষের সঙ্গে সহমর্মিতার সম্পর্ক গড়া এবং বিশ^-মানবতাবোধসমৃদ্ধ করার জন্য সাহিত্য যে সবচেয়ে কার্যকর মাধ্যম, সেটাও উপলব্ধি করেছি দেশবিদেশের সাহিত্যগ্রন্থ পাঠ করেই।

ইন্টারনেট গতিশীল ও সহজলভ্য হওয়ায় সবরকম সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমকে টপকে কিংবা সবগুলোকে সমন্বয় করে ফেসবুক হয়ে উঠেছে বিশ^সেরা সোসাল মিডিয়া। গৃহকোণে কিংবা ব্যস্ত মানুষের ভিড়ে একা ব্যক্তিটিও যে সামাজিক জীব, সেটার লাগসই প্রমাণ দেয়ার জন্য হাতে স্মার্টফোনে ফেসবুকই এখন সবচেয়ে বড় ভরসা। আমার দৃঢ় বিশ^াস, স্মার্টফোন বা কম্পিউটার যাদের নিত্যসঙ্গী, তারা প্রতিদিনই আঙুলের ছোঁয়ায় ফেসবুক ওপেন করেন একাধিকবার। আমিও করি। এতে কার কী প্রাপ্তিযোগ ঘটে জানি না, তবে নিজের ক্ষেত্রে লক্ষ্য করছি, দেখেশুনে ফেসবুকের প্রতি বিরাগ-বিরক্তির পরিমাণ যেন বাড়ছে। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার নিরিখে কারণগুলো খতিয়ে দেখা যাক।

প্রকৃত বন্ধুর সংখ্যা মানুষের জীবনে তো খুব বেশি হয় না। তবে সমাজে চলতে গেলে লেনদেনের সম্পর্ক ঘটে অনেকের সঙ্গে। এটা জেনেও ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট এলেই অন্ধ উদারতায় গ্রহণ করেছি সবাইকে, কারও কাছে কোনও বিশেষ প্রত্যাশা ছিল না। তবে শুরু থেকেই কৌতূহল ছিল। দেখা যাক শেষে কী ঘটে ভার্চুয়াল বন্ধুর জগতে ? সমমনা না হলে কিংবা মনের প্রত্যাশা পূরণ না হলে  কোনও সম্পর্কই বেশিদূর যায় না। স্বজন-বন্ধুদের ভালোবাসা, সহানুভূতি ও সমর্থন  সামাজিক মানুষ মাত্রই কামনা করে। এই কামনা পূরণের ক্ষেত্রে ফেসবুকের জাকারবার্গীয় নিয়ম-নীতি বেশ উদার। নানা বর্ণের ভালোবাসার চিহ্নসংবলিত লাইক, শেয়ার বা কমেন্টস-এর ঘরে নিজের মনের কথা লিখে মৃদু ক্লিক কি টাচ দিলেই হলো।  ফেবু এআই তৎপক্ষণাৎ বন্ধুর কাছে পৌঁছে দেয়। ফলে কোনও পোস্ট দিলেই স্বভাবতই আশা ও কৌতূহল জাগে, কতজন বন্ধুর হৃদয়ে টোকা দিতে পারলাম ? মন্তব্যের ঘরে কতজন কে কী দিল ? সংখ্যা যত বাড়ে, পুলকও তত বাড়ে। আর ফেসবুকে নেগেটিভ ইমোশন, তথা অপছন্দ বা ঘৃণা প্রকাশের কোনও বাটন রাখা হয়নি। কেউ যদি কোনও বিষয়ে অপছন্দ বা ঘৃণা প্রকাশের কমেন্ট দেয়, সেটাও পছন্দ বা শেয়ার করে সহমত হতে পারে যে কেউ। আর এ দেশে কারও ঘৃণা বা অপছন্দ যদি সরাসরি ধর্ম, নবী-রসুল ও জাতির পিতার বিরুদ্ধে যায়, সরকার তাদের দমন করার জন্য বিশেষ ডিজিটাল আইন করেছে, সরকারের বিশেষ ডিজিটাল গোয়েন্দাও আছে। কিন্তু ফেসবুক প্রতিষ্ঠাতা জাকারবার্গ ব্যক্তির গণতান্ত্রিক অধিকার ও মত প্রকাশের স্বাধীনতায় বিশ^াসী। ফলে এই প্লাটফরমে ব্যক্তি তার একান্ত ব্যক্তিগত, নিজের সমাজ-সম্প্রদায় থেকে শুরু করে বিশ^ব্রহ্মাণ্ডের যে কোনও বিষয়ে মতামত ও ছবি প্রকাশ করতে পারে। এভাবে স্বল্প-সময়ে সহজে শত কোটি মানুষ ফেসবুকে স্বীয় অস্তিত্ব জাহির করছে প্রতিদিন। সামাজিক কি মানবিক দায়িত্ব পালনেও সোচ্চার  হতে দেখি সচেতন সমাজকর্মীদের। আর যার সমাজ-সভ্যতা বিষয়ে তেমন মাথাব্যথা নেই, সে অন্তত নিজের সেলফি ও ব্যক্তিগত তুচ্ছাতিতুচ্ছ খবর, জ্ঞাতিগোষ্ঠীর ছবি, বন্ধুদের মনোযোগ আকর্ষণ করতে কেউ-বা অকারণ হাঁচি-কাশি কি ভুয়া খবর দিয়েও  ফেসবুকে নিজের উপস্থিতি ঘোষণা করছে। দেখেশুনে আমার মধ্যে শুরুর কৌতূহলটা বড় প্রশ্ন হয়ে উঠছে। ফেসবুকের এই ব্যক্তিস্বাধীনতা এবং বন্ধুত্বের সীমাহীন প্লাটফরম মানবসমাজ ও সভ্যতাকে কোন কল্যাণের দিকে ধাবিত করছে আসলে ?

জানি, ডিজিটাল যুগের মানবসমাজ ও ভার্চুয়াল জগতের গতি-প্রকৃতি ও ইতি-নেতি দিক নিয়ে বিশেষজ্ঞরা নানা দৃষ্টিকোণ থেকে অনুসন্ধান ও ব্যাখা-বিশ্লেষণ করবেন। ইতিমধ্যে অনেকে করেছেনও। ব্যবহারকারীও অভিজ্ঞতার আলোকে লাভ-ক্ষতি সম্পর্কে সচেতন হবেন। আমিও নিজের বাস্তব-জীবনের অভিজ্ঞতা ও চাহিদার নিরিখেই ফেসবুকের সঙ্গে সম্পর্কজাত প্রাপ্তি ও অপ্রাপ্তি  এবং বিরক্তির দিকটি বোঝার চেষ্টা করছি মাত্র।

আগের এক নিবন্ধে উল্লেখ করেছি, প্রচলিত সমাজ-ব্যবস্থা এবং রাষ্ট্র-নিয়ন্ত্রক ক্ষমতার সঙ্গে বিরোধের সম্পর্ক তীব্র হয়ে উঠেছিল যৌবনের শুরুতে। ১৯৭১-এ মুক্তিকামী বাঙালি জাতির সঙ্গে স্বাধীনতা সংগ্রামের সঙ্গে একাত্ম হতে পেরেছিলাম বলে মৃত্যুঝুঁকির মধ্যেও  নিজের একাকিত্ব ও অসহায় দশা টের পাইনি। স্বাধীনতার পরও একা ও অসহায়  বোধ করার কথা নয়। কারণ স্বাধীন দেশেও স্বাধীনতার সুফলবঞ্চিত মানুষেরাই সংখ্যাগরিষ্ঠ এবং অব্যাহত আছে তাদের মুক্তির লড়াই। কিন্তু মুক্তিকামী জনতার সঙ্গে একাত্ম থেকে প্রত্যক্ষভাবে কোনও রাজনৈতিক লড়াইয়ে যুক্ত হইনি। পরিবার হওয়ার পর ছা-পোষা নিম্ন-মধ্যবিত্ত হিসেবে যেটুকু সমাজিকতা না করলে নয়, ততটুকু সামাজিক থাকাও সম্ভব হয়নি। এর প্রধান কারণ অবশ্য নিজের লেখক-সত্তা। লেখার কাজটি আপনমনে একা গৃহকোণে চুপচাপ করতে হয়। ফলে আপাতদৃষ্টিতে লেখককে একা, আত্মকেন্দ্রিক ও অসামাজিক মানুষ মনে হতে পারে। কিন্তু  লেখকের কাজ তো  আসলে মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়েই। এই সম্পর্কের ভাল-মন্দ বুঝতে  লেখায় মানবসমাজ আসবেই। গৃহকোণে একা হয়েও বৃহত্তর মানবসমাজের সঙ্গে সম্পর্কিত সে। তাছাড়া যত ঘরকুনো কি আত্মকেন্দ্রিক হোক, অপরের ভালবাসা, সহানুভূতি ও বন্ধুসঙ্গ-তৃষ্ণা থাকে সব মানুষেরই।

মনে পড়ে, ইন্টারনেট আসার আগে নাগরিক জীবনে নিঃসঙ্গতা ও কিছু ভালো না লাগার অস্থিরতা  থেকে বন্ধুসঙ্গ খুঁজতাম। সমমনাদের সঙ্গে আড্ডাতেও কাটত অনেকটা সময়। দেশে জনসংখ্যা, উন্নয়নের গতি ও প্রতিযোগিতা যত বাড়ছে, মানুষ ততই যেন বিচ্ছিন্ন ও একা হয়ে পড়ছে। আড্ডার পরিবেশ ও সময়-সুযোগও সংকুচিত হয়েছে। কিন্তু অ্যানালগ যুগের বন্ধুসঙ্গের তৃষ্ণাটা ডিজিটাল যুগে কমেনি বলে ভার্চুয়াল জগতেও বন্ধু ও সমমনাদের খুঁজতে শুরু করেছিলাম। নিজের সত্য পরিচয় দিয়ে ফেসবুক একাউন্টটি খুলেছিলাম অন্তত চৌদ্দ/পনের বছর আগে। এরমধ্যে জাকারবার্গ তার ভোক্তাদের জন্য সুযোগ-সুবিধা বাড়িয়েছে। সংখ্যা বৃদ্ধির মাধ্যমে ফেবু বন্ধুদের জগতও প্রসারিত ও বৈচিত্র্যময় হয়ে চলেছে। কিন্তু তথ্যপ্রযুক্তির উন্নয়ন-গতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে দক্ষতা বাড়েনি নিজের। তারপরও দেখছি,  কৌতূহলে অনিয়মিত ব্যবহার ও আপগ্রেডের মাধ্যমে আমার ফেবু বন্ধু সংখ্যা দাঁড়িয়েছে প্রায় পাঁচ হাজার। বন্ধু হবার রিকোয়েস্ট পাঠিয়ে অপেক্ষায় আছে আরও প্রায় ১০০০ জন।  ফেসবুক কর্তৃপক্ষ একজনের জন্য এখন পাঁচ হাজার বন্ধুর সঙ্গে একত্রে তাৎক্ষণিক  যোগাযোগ ও বিনিময়ের সুযোগ দেয়। ফিজিকালি ঘনিষ্ঠ বন্ধুর সঙ্গে একান্তে কিংবা আড্ডায় মন খুলে যেভাবে নিজের কথা বলতাম,  ফেসবুকের চেনা-অচেনা বন্ধুদের নিজের কথা বলার উৎসাহ পাই না। ব্যক্তিগত কিংবা পারিবারিক সুখবর কি শোকসংবাদ এসব বন্ধুদের জানিয়ে লাভ কী ?

বাসে-ট্রেনে-হাটের নানারকম ভিড়ে দেখেছি, যে কোনও সংকটে একা কি বিপন্ন বোধ করলে বিপদগ্রস্ত ব্যক্তি সহভিড়ের সমর্থন পাওয়ার চেষ্টা করে। সমর্থন পেয়েও যায়। সামাজিক  মানুষ একা হলেই অসহায় ও বিপন্ন বোধ করে। এ কারণেই কি ফেসবুকে সেল্ফি, নানা পোজের ছবি ও ব্যক্তিগত ভালোমন্দের খবর  পোস্ট দিয়ে ব্যক্তিমানুষ তার সামাজিক সত্তাকে উপভোগ করে। পোস্ট দেওয়ার পর  কতজন ভালোবাসার চিহ্নসহ লাইক দিল, মন্তব্যের ঘরে কে কী লিখল এসব জানার জন্য উতলা হয় সবাই। লাইকের সংখ্যা যত বাড়ে, আনন্দও কি তত বাড়ে তাদের। সামাজিক অনুষ্ঠান করে এসব পেতে গেলে খরচ ও হাঙ্গামা হয় নানারকম, অন্যদিকে বিনা খরচায় চটজলদি এরকম প্রাপ্তিযোগে কার কী উপকার, মন ভরে কতটা ঠিক জানি না।

জনসমর্থন যাদের জন্য খুব জরুরি বিষয়, তারা সকলেই সব রকম মিডিয়াসহ  সোসাল মিডিয়াতেও বেশ তৎপর। এই তৎপরতায় আমেরিকার মতো ধনী দেশের প্রেসিডেন্ট  থেকে শুরু করে  ছোট-বড় রাজনীতিক, সমাজকর্মী যেমন আছেন, তেমনি সমাজের নানা ক্ষেত্রের বিখ্যাত সেলিব্রিটিরাও আছেন। আবার  ভোক্তা ও খদ্দের সন্ধানী নানারকম কারবারিও আছেন। নানা কায়দায় এরা ফেসবুকে নিজ পণ্যের বিজ্ঞাপন দেন। এদের যার যত বেশি ভক্ত-ফলোয়ার বাড়ে, তার তত খ্যাতি-প্রতিপত্তি ও মুনাফা বাড়ে। সমাজের প্রভাবশালী ব্যক্তি কি প্রতিষ্ঠানের ফেসবুক ব্যবহারের ধান্ধাবাজিটা পরিষ্কার, সবাই বোাঝে।

কিন্তু যারা আমার মতো সাধারণ মানুষ, নিজেদের পণ্য কি ইমেজের ব্যাপক প্রচার এবং লক্ষ লক্ষ মানুষের  জনসমর্থন যাদের নিষ্প্রয়োজন, তারাও আটেচারে তুচ্ছাতিতুচ্ছ বিষয়ে পোস্ট বা সেলফি দিয়ে ফেসবুকে আপন অস্তিত্ব জাহির করেন কেন ? জাকারবার্গ প্রদত্ত ব্যক্তিস্বাধীনতা উপভোগ, দুর্বল ও বিপন্ন ব্যক্তির সামাজিক অস্তিত্ব জাহির এবং সামাজিক সমর্থন-ভালোবাসা লাভের তৃষ্ণাটাই কি তবে  ফেসবুকের মূল চালিকাশক্তি ? নাকি সমাজ-রাষ্ট্র-বিশে^র ভালোমন্দ ঘটনায় নিজের প্রতিক্রিয়া জানিয়েই অনেকের চটজলদি দায়মুক্ত হওয়ার সহজ পদ্ধতি ?

বলেছি যে, একাকিত্ব বোধ থেকে মুক্তি পেতে ভাললাগা ও ভালোবাসাময় সম্পর্কের তৃষ্ণা এবং অনুসন্ধিৎসা নিয়ে ফেসবুক প্লাটফরমে যোগ দিয়েছিলাম একদিন।  কিন্তু  দেখেশুনে কোটি কোটি মানুষের এই সামাজিকতার ভিড়ে নিজের একাকিত্ব এবং সমাজবিরোধী চরিত্র আবার প্রকট হয়ে উঠছে যেন। কারও প্রোফাইল ও পরিচয় খতিয়ে দেখে নিজের একাউন্টে বাছবিচার না করে, শুধু ছবি ও নাম দেখেই বন্ধুত্বের রিকোয়েস্ট গ্রহণ করতে শুরু করেছিলাম। এখন দেখছি বন্ধুদের মাঝে কিছু হারিয়ে যাওয়া বন্ধু-স্বজন, নিকট আত্মীয়-স্বজন থেকে শুরু করে ১১ বছরের নাতিও  বন্ধু হয়েছে। তবে অজানা-অচেনারাই সংখ্যাগরিষ্ঠ। দীর্ঘকাল ধরে―লেখালেখি করি এবং লেখক হিসেবে কিছুটা খ্যাতি-প্রতিষ্ঠা আছে বলেই সম্ভবত, বন্ধু-তালিকায় চেনা―অচেনা নবীন লেখক ও সাহিত্যানুরাগীদের সংখ্যাই বেশি। কয়েকজন ভক্ত―পাঠকেরও সন্ধান পেয়েছি। তবে লেখক হিসেবে আমাকে না চিনলেও নবীন কবি-লেখকরাও বন্ধু হয়েছে অনেকেই। এদের সৃজনকর্মের নমুনা ও খবর, বিশেষ করে  নতুন কবিতা দেখি প্রায়ই। সামাজিক নানা ইস্যুতে বন্ধুদের নানারকম মতামতও পড়ি। দেশে মুক্ত সংবাদপত্র ও মান সম্পন্ন মুদ্রিত সাহিত্যপত্রিকার সংকট পূরণের দায় নিয়ে ফেসবুক কখনওবা সাহসী সংবাদপত্র, কখনওবা রম্য সাহিত্য পত্রিকা হিসেবেও কাজ করছে। এ পত্রিকায়  যেহেতু সম্পদক নেই, লেখা অমনোনীত হওয়ার ভয় নেই, সরকারি কিছু বিধিনিষেধের কথা স্মরণ রেখে সবাই স্বাধীনভাবে যা খুশি লিখে প্রতিভার প্রকাশ ঘটায়, কেউ-বা সামাজিক দায় পালন করে এবং কমবেশি নগদ ফিডব্যাকও পায় সবাই। ফেবু-সদস্যদের নগদ ফিডব্যাক, লেনদেন ও পারস্পরিক পিঠচাপড়ানোর মাধ্যমে  দেখি নানা গ্রুপের তৎপরতাও। আত্মপ্রচারণার পোস্ট বা পণ্যটির সঙ্গে নিজেকেও  সেরা সামাজিক পণ্য করে তোলার প্রতিযোগিতায় ফেসবুকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সবাই মুখে গুঁজে আছে। 

দেখেশুনে আমার বিরাগ-বিতৃষ্ণা বাড়ছে ভারচুয়াল এ প্লাটফরমের প্রতি। ব্যক্তিগত কি পারিবারিক খবর কিংবা  সেল্ফি-ছবি পোস্ট দিয়ে  ফেবু-সমর্থকদের সংখ্যাবৃদ্ধি কিংবা প্রীতি-শুভেচ্ছার পাল্লাভারী করার ইচ্ছে জাগেনি কখনও। কারণ বিশ^াস করি. যারা প্রকৃত বন্ধু ও স্বজন, ব্যক্তিগত সুখে-দুঃখে আনন্দে-সংকটে তাদের সঙ্গে সংযুক্ত থাকার পুরানো সামাজিক পথগুলো খোলা আছে এখনও। ডিজিটালি তারা চটজলদি সামাজিক দায় পালনের বদলে অনেক বেশি আন্তরিকতা ও  দায়বোধ নিয়ে  ফিজিকালি পাশে দাঁড়াবেন,  নিদেনপক্ষে টেলিফোন করবেন। সামাজিক ও রাজনৈতিক নানা ইস্যুতে নবীন-প্রবীন পলিটিশিয়ান ও স্যোশাল অ্যাকটিভিস্টগণ  ফেসবুকের মাধ্যমে দায়িত্ব পালনের চেষ্টা করছেন। তাতে সমাজ-সভ্যতার অগ্রগতিতে ফেসবুকের মতো স্যোসাল মিডিয়া কতটা এবং কীভাবে ইতিবাচক কি নেতিবাচক ভূমিকা রাখছে, গবেষকগণ তা নিশ্চয় তার মুল্যায়ন করবেন। আমি ফেসবুকে গভীরভাবে আসক্ত নই বলে স্মার্টফোনটি হাতে থাকে না সর্বদা। অনিয়মিত পাঠক হিসেবে লক্ষ্য করি, ফেসবুকে  গভীর দায়িত্ববোধ, সাহিত্যবোধ ও চিন্তাশীলতার প্রকাশ ঘটায় ক্বচিৎ। কোনও পোস্ট ভালো লাগলে লাইক বাটনে চাপ দেয়া ছাড়াও মন্তব্য বা শেয়ার করে প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করি কখনও-বা। কিন্তু নিজে সামাজিক কোনও গরম ইস্যুতে পোস্ট দিয়ে সস্তা সামাজিক দায় পালনের চেষ্টা করি না। কারণ রাজনীতিক বা সমাজকর্মী নেই। কোনও দলেও নেই। সামান্য এক সৃজনশীল লেখক আমি। লেখক হিসেবে আমার সামাজিক দায়, রজনীতি, মানবিকতার বোধ, ভালবাসা―সবকিছুই নিজের সাহিত্যসৃষ্টির ভেতর দিয়ে প্রকাশ ঘটবে। আর সাহিত্য সৃষ্টির দায় বা আনন্দ চটজলদি  ফিডব্যাক-নির্ভর নয় বলে, সব ধরনের সামাজিক প্লাটফরম ও কোলাহল এড়িয়ে নিভৃতে একা নিজের কাজটি নিয়ে ব্যস্ত থাকতে চেষ্টা করি। আমার পাঠক সংখ্যা অতি সীমিত বলে প্রকাশক ও কিছু তরুণ ফেসবুকার বন্ধুর পরামর্শে নিজের নতুন বই ও লেখলেখি বিষয়ে পোস্ট দিয়েছিলাম কয়েকবার। হয়তো-বা আগামীতেও দেব। যদিও অভিজ্ঞতা থেকে ইতোমধ্যে নিশ্চিত হয়েছি, ফেসবুকের আত্মপ্রচারণায়  লেখক হিসেবে নিজের সাফল্য কিংবা সামাজিক অবস্থানের বড় একটা হেরফের ঘটবে না।

জানি আমার মতো অসমাজিক ও অজনপ্রিয় ঘরকুনো একজন মানুষ ফেসবুক ব্যবহার না করলেও ডিজিটাল প্লাটফরমের মালিক-নিয়ন্ত্রকদের কিছুমাত্র যায় আসবে না। অন্যদিকে নিজেও যদি এসব ভার্চুয়াল প্লাটফরম ও ডিজিটাল সামাজিকতা পুরোপুরি এড়িয়ে চলি, তবে নিজেও কি বিশ^প্রকৃতি ও মানবসমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে সম্পূর্ণ নেই হয়ে যাব ?  অবশ্যই না। আমার লেখা ও আমি অন্তত বাস্তব জগতের পরিচিত কিছু স্বজন-বন্ধু এবং   ফেসবুক-বিমুখ কিছু পাঠকের স্মৃতিতে বেঁচে থাকব নিশ্চিত।

সচিত্রকরণ : ধ্রুব এষ

Leave a Reply

Your email address will not be published.

shares