মুক্তগদ্য : ছিন্নগদ্য : আহমাদ মোস্তফা কামাল

কত কিছু নিয়ে যে লিখতে বসি নানা সময়, তার হিসেব নেই। কিন্তু বসলেই যে লেখা শেষ হবে এমন কোনও নিশ্চয়তা থাকে না কোথাও। হঠাৎ যদি এক লেখা লিখবার সময় অন্য কোনও লেখার বীজ ঢুকে পড়ে, অঙ্কুরোদগম হয়, জন্ম হয় সতেজ-সবুজ চারাগাছের এবং মনোযোগ চলে যায় নতুনটির দিকে, তখন চলতে থাকা লেখাটি থেমে যায়, অসম্পূর্ণ থেকে যায়। সব সময় যে অসম্পূর্ণই থাকে তা নয় অবশ্য, পরে কখনও হয়ত ফেরা হয় তার কাছে, সে পায় পূর্ণতা। আবার কখনও এমনও হয় যে, সেই লেখায় ফেরাই হলো না কিংবা ফিরতে গিয়ে দেখা গেল সুর আর ছন্দ কেটে গেছে। অথচ যেটুকু লেখা হয়েছিল সেটুকুর মধ্যেই ছিল গভীর কোনও চিন্তার বীজ, ছিল কোনও এক উজ্জ্বল আলোকরেখা। এই ধরনের লেখাগুলোকে আমি বলি ছিন্নগদ্য। যেন, কোনও এক সতেজ বৃক্ষ থেকে একটা সবুজ পাতা উড়ে এসে পড়েছিল আমার ঘরে, শুকিয়ে গেলেও যার ঘ্রাণ রয়ে গেছে। তেমনই কয়েকটি ছিন্নগদ্য রইল এই লেখায়। অবশ্য শেষেরটি, গোর্কি-তলস্তয়কে নিয়ে লেখাটিকে হয়ত প্রায় পূর্ণ লেখাই বলা যায়।  

১.

ফরাসি ঔপন্যাসিক সেলিনকে [Louis-Ferdinand Céline, 1894-1961] দ্য নিউ ইয়র্কারের একটা লেখায় আখ্যায়িত করা হয়েছিল ‘one of the great problems in twentieth-century literature’! আর হবেইবা না কেন ? তিনি অসুখের কথা লিখতেন, অন্ধকারের কথা লিখতেন, মনুষ্যসৃষ্ট সমাজ আর এর নিয়মকানুনের প্রতি তাঁর বিবমিষা লুকিয়ে রাখতেন না, ডার্ক কমেডি ছিল তাঁর রচনার অন্যতম লক্ষণ। খানিকটা আত্মজৈবনিক ঢঙে রচিত তাঁর অতি-বিখ্যাত উপন্যাস Journey to the End of the Night-এ তো এসবেরই জয়জয়কার। অথচ তাঁকে অস্বীকার করার কোনও উপায় নেই, কেউ অস্বীকার করেনও না।

এই ধরনের আপাদমস্তক নেতিবাচক লেখকদের আমার ঠিক ভালো লাগে না, তবু তাঁর এক সাক্ষাৎকার পড়ে চমৎকৃত হয়েছিলাম। কথাবার্তার একেবারে শুরুতেই সাক্ষাৎকার-গ্রহীতাকে বলে বসলেন তিনি―‘আপনাকে কী বলতে পারি আমি ? আপনার পাঠকদের কীভাবে খুশি করতে হয়, আমি জানি না। তারা এমন সব মানুষ যাদের সঙ্গে খুব মৃদু ভাষায় কথা বলতে হয়। খেয়াল রাখতে হয়, কোনওভাবেই যেন তারা আঘাত না পায়। তারা চায় কোনও রকম কটুকাটব্য না করে আমরা কেবল তাদের বিনোদন দিয়ে যাব।’ হ্যাঁ, তাই তো! এইসব তো পাঠকেরা সত্যিই চান। তারা আঘাত পেতে চান না, কেবল আরাম পেতে চান। মিথ্যে তো বলেননি সেলিন। আলাপচারিতার শেষদিকে ‘আপনি কি জীবনকে ঘৃণা করেন ?’ এই প্রশ্নে সেলিনের স্বগতোক্তির মতো উত্তর : ‘জীবনকে আমি ভালোবাসি―এই কথাটি ঠিক সহজে বলতে পারি না। জীবনকে আমি সহ্য করি মাত্র, এ ছাড়া আমার করার কিছু নেই কারণ আমি যে বেঁচে আছি, এবং আমার আবার কিছু দায়দায়িত্বও আছে। এটুকু বাদ দিলে আপনি আমাকে নৈরাশ্যবাদীদের দলে ফেলে দিতে পারেন। আমার হয়ত কিছু একটা নিয়ে আশা আছে, যেমন ধরুন, আমি একটা বেদনাহীন মৃত্যু চাই। একটা শান্তিপূর্ণ মৃত্যু।… আজকের দিনটির চেয়ে আগামীকালটি হবে আরও রূঢ়-রুক্ষ-কর্কশ, আরও অমসৃণ, আমি জানি। গত বছরের চেয়ে এ বছর কাজ করা অনেক বেশি বেদনাদায়ক হয়ে উঠেছে, আর আগামী বছর যে সেটি আরও দুঃসহ হয়ে উঠবে, তাও আমি জানি।’

একটা বেদনাহীন মৃত্যু হয়ত সর্বজন প্রত্যাশিত ব্যাপারই, কিন্তু যিনি কথাটি মুখ ফুটে বলেন, বুঝে নিতে হয়, তাঁর জীবন যন্ত্রণায় কাতর, বেদনায় জর্জরিত। মৃত্যুমুহূর্তের শান্তিটুকুই কেবল চাওয়ার বাকি আছে, আর কিছু নেই কোথাও, কিচ্ছু না।

 এসব কথাবার্তা পড়ে এই দুখী মানুষটিকে ভারি আপন মনে হতে থাকে।

২.

হবীবুল্লাহ বাহার ছিলেন সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর আত্মীয়। বাহার সাহেবকে নিয়ে তাঁর একট স্মৃতিচারণমূলক লেখা আছে। অনেক প্রসঙ্গ নিয়ে আলাপ করেছেন তিনি, কিন্তু একটা বিশেষ কথা আমার মনে দাগ কেটে আছে। কথাটি এরকম :

‘যাঁরা তাঁকে (হবীবুল্লাহ বাহারকে) জানতেন তাঁরা এ-কথা জানেন যে তিনি অনর্গল কথা বলতেন। সে-কথা মনে হলে কখনও কখনও ভাবী, মুসলমান সমাজের দীর্ঘ তমসার পর যাঁরা সর্বপ্রথম কথা বলতে শুরু করেন তাঁদের অন্যতম তিনি। … তিনি এত কথা বলতেন যে, যাদের হাতে সময় নেই তারা একবার তাঁর খপ্পরে পড়লে আর নিস্তার পাবেন না―এই ভয়ে তাঁকে এড়িয়ে যেতেন। ট্রামস্টপে ট্রাম ধরতে গিয়ে তাঁকে দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছি। একটার পর একটা ট্রাম চলে যাচ্ছে, তিনি ট্রাম ধরছেন না। কারণ, ট্রাম ধরতে যারা আসছে তাদের সঙ্গে গল্পগুজব শুরু করেছেন। ট্রামস্টপ এমন একটি জায়গা যেখানে লোকের সঙ্গে দেখা হয়ই। কে জানে, হয়ত সেজন্যেই তিনি ট্রামস্টপে হাজির হতেন। সত্যিই যদি কোথাও যাওয়ার ছিল তবে এমনভাবে পাশ দিয়ে ট্রামের পর ট্রাম চলে যেত কি ? … তিনি অনর্গল এত কথা বলতেন কিন্তু নিজের সম্বন্ধে বিশেষ কিছু বলতেন না। … যে-বিশ্বাসের ওপর তাঁর নবীন জীবন গড়ে উঠেছিল, সে বিশ্বাসের ক্ষেত্র ছিল সমাজ জাতি দেশ, নিজের ব্যক্তিগত জীবন নয়।’

যে সময়টির বর্ণনা দিয়েছেন সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ সেটি ছিল ব্রিটিশ আমল। ভারতবর্ষের স্বাধীনতা তখনও আসেনি। হাবীবুল্লাহ বাহার ছিলেন দারুণ প্রজ্ঞাবান, বাকপটু এবং সমাজ-জাতি-দেশের প্রতি দায়বদ্ধ মানুষ। কিন্তু তাঁর কথাগুলো তিনি বলবেন কাকে ? সেজন্যই অনির্দিষ্ট শ্রোতার খোঁজে তিনি দাঁড়িয়ে থাকতেন ট্রামস্টপে, নিজে কোথাও যেতেন না, চলমান ট্রামযাত্রীদের সঙ্গে অনর্গল কথা বলে যেতেন।

কী অদ্ভুত এক দায়বোধ!

পিছিয়ে থাকা সমাজে এ রকম কিছু কিছু মানুষের জন্ম হয় যাঁরা দায়বোধ করেন কিছু করার জন্য, কিছু পরিবর্তন আনার জন্য। তাঁরা অনর্গল কথা বলেন। তাঁদের কথা শুনতে চাইলে শুনুন, আর বিরক্ত হলে এড়িয়ে যান, তবু তাঁদেরকে কথা বলতে দিন। তাঁদের টুঁটি চেপে ধরবেন না দয়া করে। তাতে ক্ষতি হবে আপনার সমাজের, জাতির, দেশের।

৩.

ফিলিপ রথের সঙ্গে মিলান কুন্দেরার একটা আলাপচারিতা পড়ছিলাম বসে বসে। চমকে উঠলাম একটা কথা পড়ে। নিজের ‘Book of Laughter and Forgetting’ সম্পর্কে বলতে গিয়ে কুন্দেরা যখন ‘ Forgetting’-এর প্রসঙ্গে এলেন, বললেন―‘বইটির অন্য থিমটির কথা ধরুন : বিস্মৃতি। মানুষের এ এক গভীর ব্যক্তিগত সমস্যা : মৃত্যু হলো আত্মবিনাশেরই একটা রূপ। কিন্তু এই ‘আত্ম’ ব্যাপারটা কী ? এটা হলো আমরা যা মনে রাখি তার সমষ্টি। মৃত্যু নিয়ে আমাদের ভেতরে সর্বদা ভীতি কাজ করে যে সে আমাদের অতীতকে মুছে ফেলবে, ব্যপারটা আসলে সেরকম নয়। বিস্মৃতির রূপে মৃত্যু সর্বদা আমাদের জীবনের মধ্যে বিদ্যমান।’ আমাদের মনে রাখা অথবা মনে থাকা ঘটনাবলির সমষ্টিকে কুন্দেরা ংবষভ বা আত্ম হিসেবে সংজ্ঞায়িত করেছেন, আর ভুলে যাওয়া বা বিস্মৃতিকে দেখেছেন মৃত্যু হিসেবে। অদ্ভুত না ব্যাখ্যাটা ?

আমরা  প্রতিদিন ভুলে যাই, ভুলে যেতে হয়, বিস্মৃতি আমাদের বেঁচে থাকার প্রধান হাতিয়ার, নইলে স্মৃতির পাহাড় জমে তার তলে চাপা পড়ে মরে যেতাম আমরা। অথচ ওই বিস্মৃতির মাধ্যমেও আমরা একটু একটু করে মরে যাই প্রতিদিন। স্মৃতি বা বিস্মৃতি―কোনটা যে আমাদের মৃত্যুকে ত্বরান্বিত করে, বোঝা কি যাচ্ছে ?

ওই বিস্মৃতির কথাটা আমাকে খুব ভাবাচ্ছে। এই যে অজস্র ঘটনা ঘটছে, আমরা দুদিনের জন্য প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করছি, তারপর ভুলে যাচ্ছি, ও কি আমাদের মৃত্যু-চিহ্নিত আচরণ নয় ? ভুলে যাওয়ার মতো নয় এমন অনেক ঘটনাও কেন ভুলে যাচ্ছি আমরা ? কুন্দেরা ব্যাপারটাকে কেবল ব্যক্তিগত পর্যায়েই রাখেননি, এর পরপরই তিনি বলেছেন বিস্মৃতি রাজনীতিরও এক বিরাট সমস্যা। যখন একটা মহাশক্তিধর দেশ অন্য কোনও দুর্বল ও ছোট দেশকে তার অধিকার থেকে বঞ্চিত করতে চায়, চায় শোষণ করতে বা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে, তখন তারা সংগঠিত বিস্মৃতির (organized forgetting) পদ্ধতি প্রয়োগ করে, চেষ্টা করে ওই জাতির অতীতকে ভুলিয়ে দিতে। আর একটা জাতি অতীতকে ভুলে যায়, ইতিহাসকে ভুলে যায়, ঐতিহ্যকে ভুলে যায়, ধীরে ধীরে সেই জাতি নিজেদেরকেই হারিয়ে ফেলে।’

মনে কি হচ্ছে না, ওই ‘ organized forgetting’ ব্যাপারটা এদেশেও ঘটে চলেছে প্রতিনিয়ত ?

তিনি বিস্মৃতির ব্যাপারটাকে কেবল ব্যক্তিগত পর্যায়েই রাখেননি, একটা জাতিকে কীভাবে বিস্মৃতির অতলে ডুবিয়ে দিয়ে প্রকারান্তরে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়া হয় তারও উদাহরণ দিয়েছেন।

একজন লেখকের চিন্তা কত সুদূরপ্রসারী আর গভীর বিস্তারি হতে পারে, ভেবে অবাক লাগে। 

৪.

‘এই মানুষটি যতদিন পৃথিবীতে থাকবেন, ততদিন আমি অনাথ হব না।’―এই কথা লিখেছিলেন ম্যাক্সিম গোর্কি, লিও তলস্তয় সম্পর্কে তাঁর স্মৃতিকথায়। রুশ সাহিত্যের, বিশ্বসাহিত্যেরও বটে, দুই দিকপাল তলস্তয় ও গোর্কি―চিন্তা ও দর্শনের দিক থেকে, বিষয় ও প্রকরণ ও নির্মাণকৌশলের দিক থেকে, সামাজিক অবস্থান ও প্রতিপত্তির দিক থেকে দুই বিপরীত মেরুর বাসিন্দা―অথচ অনুজ গোর্কি নির্মোহ চোখে অগ্রজ তলস্তয়ের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে হঠাৎ করেই  কখনও-বা আবেগে ভেসে যাচ্ছেন, কখনও কেঁদেও ফেলছেন। অজস্র টুকরো স্মৃতি, অসামান্য সুন্দর বর্ণনা, লেখাটিও ঠিক গোর্কি ধাঁচের নয়। নির্মোহভাবে দেখতে চেয়েছেন বটে, এমন অনেক কথাই লিখেছেন তলস্তয় সম্পর্কে যা আর কেউ কখনও লেখেননি, কিন্তু আবেগও প্রকাশ করেছেন তীব্রভাবে, এতটা আবেগ গোর্কির অন্য কোনও লেখায় খুঁজে পাওয়া যায় না। পড়তে কী যে ভালো লাগে! মনে হয় যেন ভিন্ন এক জগতে ভ্রমণ করে এলাম, সে জগৎ পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের, মায়ার, ভালোবাসার, আবেগের।

Reminiscences of Leo Nikolaevich Tolstoy শিরোনামের এই বইটির প্রকাশকাল ১৯২০, তার মানে তলস্তয়ের মৃত্যুর দশ বছর পর, যদিও এই টুকরো স্মৃতিগুলো গোর্কি লিপিবদ্ধ করেছিলেন তলস্তয়ের জীবদ্দশাতেই। বইয়ের একেবারে শুরুতেই গোর্কি জানাচ্ছেন টুকরো টুকরো কাগজে বিচ্ছিন্নভাবে এই নোটগুলো টুকে রেখেছিলেন তিনি, ভেবেছিলেন হারিয়েই ফেলেছেন, কিন্তু সম্প্রতি সেগুলো খুঁজে পেয়েছেন। তবে এই লেখাগুলোর সঙ্গে একটি অসমাপ্ত চিঠিও জুড়ে দিচ্ছেন, একটি শব্দও পরিবর্তন না করেই, যেটি তিনি তলস্তয়ের মৃত্যুসংবাদ পাওয়ার পর তাৎক্ষণিকভাবেই লিখেছিলেন, এবং যে-কোনও কারণেই হোক তিনি সেটি শেষ করতে পারেননি, বা করা সম্ভব ছিল না। এই ভূমিকা থেকেই বোঝা যায়, বই প্রকাশের উদ্দেশ্য নিয়ে তিনি আদৌ স্মৃতিগুলো টুকে রাখেননি, কিন্তু পরবর্তীকালের পাঠকের জন্য সেগুলোই হয়ে ওঠে এক গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ। তলস্তয়কে যে তিনি কতটা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেছেন, কতটা গভীরভাবে ভেবেছেন তাঁর বলা কথাগুলো নিয়ে তার প্রমাণ পাওয়া যায় প্রতিটি অুনচ্ছেদে। সমসাময়িক লেখকদের সম্পর্কে তলস্তয়ের নানা মন্তব্য, জীবন ও জগৎ সম্পর্কে নানা মতামত, তুচ্ছ ও ক্ষুদ্র বিষয়ে নানা সরস আলোচনা; তলস্তয়ের মুখভঙ্গি, বসে থাকার ভঙ্গি, কথা বলার ভঙ্গি―কত কিছু নিয়ে যে লিখেছেন গোর্কি! যেমন, তলস্তয়ের হাতগুলো দেখতে কেমন ছিল আর কথা বলার সময় তিনি সেগুলোকে নিয়ে কী করতেন, তার এক চমৎকার বর্ণনা দিয়েছেন এক জায়গায়―‘তাঁর অপূর্ব দুটো হাত ছিল। দেখতে খুব সুন্দর নয়, বরং শিরাগুলো ফুলে উঠেছে বলে একটু বিসদৃশই, কিন্তু অনন্য অভিব্যক্তিতে পূর্ণ, সৃজনশীলতার ক্ষমতায় পূর্ণ দুটো হাত। সম্ভবত লিওনার্দো দা ভিঞ্চির এই ধরনের হাত ছিল। এই ধরনের হাত থাকলে একজনের পক্ষে যে-কোনও কিছু করা সম্ভব। কখনও কখনও কথা বলার সময় তিনি তাঁর আঙুলগুলো নাড়াতেন, প্রথমে ধীরে ধীরে সেগুলোকে এক জায়গায় জড়ো করে হঠাৎ করে খুলে দিতেন এবং দারুণ আকর্ষণীয় কোনও মন্তব্য করতেন।’ আবার মেয়েদের সম্পর্কে তলস্তয়ের অদ্ভুত মন্তব্যটিও খুব যত্ন করে লিপিবদ্ধ করে রেখেছেন গোর্কি এভাবে―‘এক পা কবরে রাখার পরই কেবল মেয়েদের সম্পর্কে সত্যি কথাটি বলব, বলে ঢাকনা ফেলে দেব!’

এই ধরনের নানা কটু মন্তব্যে গোর্কি যে আহত হয়েছেন তা মোটেই গোপন করেননি, আবার যখন নিবিড়ভাবে তাঁকে দেখেছেন তখন যে বিপুল আবেগে আক্রান্ত হয়েছেন তাও আড়াল করেননি। একদিনের কথা বলেছেন গোর্কি, যে, ওই দিন তিনি যে রূপে দেখেছিলেন তলস্তয়কে, সে-রূপে বোধ হয় আর কেউ কখনও দেখেননি। কী রকম ?― ‘(সমুদ্র তীরে) তিনি করতলে মাথা রেখে বসেছিলেন। বাতাস এসে তাঁর রূপালি চুলগুলো নিয়ে খেলছিল, তিনি তাকিয়েছিলেন সমুদ্রের দিকে মুখ ফিরিয়ে, দৃষ্টি ছিল সুদূরে নিবদ্ধ। আর ছোট ছোট ঢেউগুলো এসে তাঁর পায়ের কাছে অনুগতের মতো এমনভাবে লুটিয়ে পড়ছিল যেন তারা এই বুড়ো জাদুকরের কাছে নিজের সম্পর্কে না-বলা কথাগুলো বলছিল। সূর্য আর মেঘের মধ্যে চলছিল লুকোচুরি খেলা, পাথরের ওপর আছড়ে পড়া রৌদ্র-ছায়ার মায়ায় কখনও তাঁকে লাগছিল উজ্জ্বল, কখনও ছায়াছন্ন। তাঁকেও আমার জীবন্ত হয়ে ওঠা এক বুড়ো পাথরের মতো মনে হয়, যিনি সবকিছুর আদি ও অন্ত জানেন, শুরু ও শেষ জানেন। তিনি জানেন কখন এবং কীভাবে পাথরগুলোর অন্তিমদশা উপস্থিত হবে, কিংবা পৃথিবীর ঘাষগুলোর অথবা সমুদ্রের পানিগুলোর। অথবা এই মহাবিশ্বের―নুড়ি পাথর থেকে শুরু করে গ্রহ-সূর্য-নক্ষত্র পর্যন্ত― সব-সবকিছুর অন্তিম পরিণতি তিনি জানেন।… হঠাৎ আমার মনে হলো, আচ্ছা, এমন কি হতে পারে যে তিনি এখন উঠে দাঁড়িয়ে তাঁর হাত দুটো ঢেউয়ের মতো প্রসারিত করবেন আর সঙ্গে সঙ্গে সমুদ্রটি পরিণত হবে স্ফটিকের মতো এক স্বচ্ছ-কঠিন পদার্থে, পাথরগুলো চলতে শুরু করবে, হাসবে-কাঁদবে; তাঁর চারপাশে যা কিছু আছে, এই জড়জগৎ, সবকিছু লাভ করবে সংবেদন, লাভ করবে জীবন, পাবে কণ্ঠস্বর এবং তাঁর কাছে ভিন্ন ভিন্ন কণ্ঠে তারা বলবে তাদের নিজেদের কথা, যা কোনও দিন কাউকে বলতে পারেনি তারা! সত্যি বলতে কি, আমার পক্ষে এই অনুভূতিটি ভাষায় প্রকাশ করা অসম্ভব। আমার মনে একইসঙ্গে খেলা করছিল উচ্ছ্বাস ও ভয়, আর সবকিছু মিলে শেষ পর্যন্ত একটা ভারি সুখী-আনন্দময় ভাবনায় আচ্ছন্ন হয়ে উঠেছিল মন―এই মানুষটি যতদিন পৃথিবীতে থাকবেন, আমি অনাথ হবো না।’

গোর্কি যখন এই কথাটি বলেন তখন এর একটি গভীর ব্যঞ্জনা পায়, কারণ তিনি আক্ষরিক অর্থেই অনাথ ছিলেন, বাবা-মা ছিল না তাঁর, বড়ো করুণ দারিদ্র্যের ভেতরে পিতামহীর কাছে বড় হয়ে উঠেছিলেন তিনি।

বইয়ের শেষে গোর্কি যুক্ত করেছেন অসমাপ্ত চিঠিটিকে, যেখানে কেবল স্মৃতিতর্পণই নয়, রয়েছে তলস্তয় সম্পর্কে তাঁর নিজস্ব মতামত ও বিশ্লেষণ। এই অংশটুকুও প্রায় পরস্পরবিরোধী আবেগে ভরা। তাঁর নিজের ভাষায়  ‘আমি তাঁর সম্পর্কে যা কিছু বলতে চাই তা হয়তো বিভ্রান্তিকর মনে হবে, এমনকি কর্কশ ও অস্থির মস্তিষ্কজাতও মনে হতে পারে।’ এবং তার পরপরই বলেছেন― ‘অন্যদের মতো আমিও জানি, তাঁর মতো অসামান্য গুণসম্পন্ন প্রতিভাবান  মানুষ আর কেউ নেই, ছিল না; তার মতো জটিলও কেউ ছিল না; জটিল-স্ববিরোধী এবং সর্বার্থে মহত্তম প্রতিভা আর কেউ ছিল না। এই মহত্ত্ব দুর্বোধ্য, বিস্তৃততর, যা ভাষায় সংজ্ঞায়িত করা কঠিন।’

তো চিঠির একেবারে শেষের দিকে, বইয়েরও শেষ এখানে, গোর্কি এক অভাবনীয় প্রসঙ্গের বর্ণনা দিয়েছেন। তিনি নিজে অবিশ্বাসী ছিলেন, আর তলস্তয় ছিলেন গভীরভাবে ঈশ্বরে বিশ্বাসী। কিন্তু এ নিয়ে কোনও দিন তাঁদের ভেতরে আলাপ হয়নি। হঠাৎই একদিন এ সম্পর্কে আলাপ শুরু করেন তলস্তয়, আর তারই অনবদ্য বিবরণ এই শেষের পৃষ্ঠাটিতে―

‘হঠাৎ করে তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, যেন বাজিয়েই দেখতে চাইলেন : তুমি ঈশ্বরে বিশ্বাস করো না কেন ?

: তাঁর ওপর আমার কোনও আস্থা নেই, লিও।

: এটা সত্য নয়। প্রকৃতিগতভাবেই তুমি বিশ্বাসী এবং ঈশ্বর ছাড়া তুমি বেঁচে থাকতে পারো না। কোনও একদিন তুমি তা নিশ্চয়ই উপলব্ধি করবে। তোমার অবিশ্বাস এসেছে একটা বদ্ধমূল অনুমান থেকে, কারণ তুমি আঘাত পেয়েছ; তুমি জগৎকে যেভাবে দেখতে চাও সেটি যে আসলে সেরকম নয়, এই অনুভব তোমাকে আঘাত দিয়েছে। জগতে এমন আরও কিছু লোক আছে যারা স্রেফ লজ্জা বা ভীরুতার জন্য বিশ্বাস করে না। এমনটি সাধারণত তরুণদের ক্ষেত্রে ঘটে থাকে। তারা হয়ত কোনও নারীকে গভীরভাবে ভালোবাসে, কিন্তু মেয়েটি হয়ত  বুঝতে পারবে না এই ভয় থেকে তারা ভালোবাসার প্রকাশই করতে চায় না। তাদের সাহসের অভাব আছে। বিশ্বাস কিংবা আস্থা প্রেমের মতোই মনোবল এবং দুঃসাহস চায়। নিজেকে নিজেই বলতে হয়―আমি বিশ্বাস করি―এবং সবকিছুই তখন ঠিকঠাক হয়ে আসে, সবকিছুই তোমার মনের মতো করে হতে থাকে, সে নিজেই তোমার কাছে ধরা দেয়, নিজেকে নিজেই ব্যাখ্যা করে এবং তোমাকে আকর্ষণ করে। তুমি তো খুব ভালোবাসতে জানো, তোমাকে আরও বেশি ভালোবাসতে হবে এবং কেবলমাত্র তখনই তোমার ভালোবাসা বিশ্বাসে রূপান্তরিত হবে, কারণ গভীরতম ভালোবাসারই আরেক নাম বিশ্বাস। যখন কোনও পুরুষ একজন নারীকে ভালোবাসে তখন প্রশ্নহীনভাবে তাকে জগতের শ্রেষ্ঠ নারী বলে মনে করে, এবং প্রত্যেক পুরুষের কাছে তার প্রেমিকাই পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ নারী। এবং এটাই হলো বিশ্বাস, এটাকেই বলে আস্থা। একজন অবিশ্বাসী ভালোবাসতে জানে না, আজকে সে একজনের প্রেমে পড়ে তো কালকে আরেকজনের। এই ধরনের মানুষের আত্মা হলো ভবঘুরে, উষর মরুভূমির মতো। এটা তো ভালো কোনও ব্যাপার নয়। তুমি জন্মেছ বিশ্বাসী হয়ে এবং এটা প্রতিহত করার কোনও মানেই হয় না। তুমি হয়তো ঈশ্বরের বদলে প্রকৃতির সৌন্দর্যের কথা বলতে পার। কিন্তু সৌন্দর্য ব্যাপারটা কী ? সর্বোচ্চ নিখুঁত সুন্দর হলেন ঈশ্বর।

এই বিষয়ে তিনি এর আগে খুব কমই কথা বলেছেন আমার সঙ্গে। কিন্তু আজকে এতটা সিরিয়াসনেস এবং দুঃখ নিয়ে কথাগুলো বললেন যে আমি একেবারে অভিভূত ও বিধ্বস্ত হয়ে গেলাম। নীরব হয়ে রইলাম আমি।

তিনি একটা কোচে বসেছিলেন, একটু হাসলেন, আঙুল নাচালেন আমার দিকে এবং বললেন―তুমি নীরব থেকে  এ বিষয় থেকে বেরোতে পারবে না। উঁহু, সম্ভব নয়।

এবং আমি, যে কি না আদৌ ঈশ্বরে বিশ্বাস করে না, তাঁর দিকে তাকিয়ে রইলাম, সাবধানে, খানিকটা ভীরু চোখে। তাকিয়ে থাকতে থাকতে আমার মনে হলো―এই মানুষটি ঈশ্বরের মতো।’

বিশ্বাসের দিক থেকে বিপরীত মেরুর দুজন মানুষ পরস্পরের প্রতি কী গভীর ভালোবাসা, মমতা ও শ্রদ্ধা লালন করতে পারেন, ভেবে অবাক হয়ে যাই। এই হিংসা ও বিদ্বেষের সময়ে দাঁড়িয়ে, এই হানাহানি-কাটাকাটির সময়ে দাঁড়িয়ে, এই বিপন্ন-বিমূঢ় সময়ে সময়ে দঁড়িয়ে, বইটি পড়তে পড়তে তাঁদের দুজনকে বড় আপন আর কাছের মানুষ বলে মনে হতে থাকে আমার।

সচিত্রকরণ : ধ্রুব এষ

Leave a Reply

Your email address will not be published.

shares