প্রচ্ছদ রচনা

শহীদ কাদরীর কবিতায়

শরৎ  জন্মঋতু

কাজী জহিরুল ইসলাম

 

শহীদ কাদরী মূলত নাগরিক কবি। ব্রিটিশ ভারতে কলকাতা শহরে জন্ম এবং এই শহরেই কেটেছে প্রাক-  কৈশোরের কিছুটা সময়। দেশভাগের পর পূর্ব পাকিস্তানের রাজধানী ঢাকা শহরে অভিবাসন, তিন দশক এই শহরে অবস্থান, অতঃপর বার্লিন, লন্ডন, বোস্টন হয়ে নিউইয়র্কে বসবাস স্বভাবতই তাকে একজন পরিপূর্ণ নাগরিক কবি করে তোলে। প্রকৃতপক্ষে গ্রামীণ জীবনের স্বাদ গ্রহণ বা অভিজ্ঞতা অর্জনের কোনো সুযোগই তিনি পাননি। যে কারণে তার কাব্যভাষাটিও হয়ে উঠেছে শহুরে। তিনি নিজেই বলেছেন, ‘কাব্যভাষা তৈরির জন্য অভিজ্ঞতা লাগে,

বই পড়ে নিজস্ব কাব্যভাষা তৈরি হয় না। তাই তার কবিতায় শরৎ এসেছে নাগরিক দ্যোতনা নিয়ে। এযাবৎ প্রকাশিত শহীদ কাদরীর কাব্যগ্রন্থের সংখ্যা চারটি : উত্তরাধিকার, তোমাকে অভিবাদন প্রিয়তমা, কোথাও কোনো ক্রন্দন নেই এবং আমার চুম্বনগুলো পৌঁছে দাও। নিউইয়র্কে অবস্থানকালীন সময়ে প্রবাসে রচিত কবিতাগুলো নিয়ে প্রকাশিত হয় আমার চুম্বনগুলো পৌঁছে দাও। অন্য তিনটি গ্রন্থের কবিতাগুলো তিনি রচনা করেন দেশ ছাড়ার আগেই অর্থাৎ ১৯৭৮ সালের মধ্যেই। এই চারটি গ্রন্থে সন্নিবেশিত কবিতার সংখ্যা ১২২টি। এরপরে তিনি আরও চারটি কবিতা লেখেন। প্রথমটি ছাপা হয় প্রথমে কালি ও কলম-এ এবং পরে জেলখানাহীন পৃথিবীর আন্দোলন যারা করেন সেই স্বপ্নশিকারীদের সংকলন স্বপ্নজট-এ। এই কবিতাটি আমি পড়েছি। সম্প্রতি আরও দুটি কবিতা কালি ও কলম-এ এবং একটি কবিতা প্রথম আলো-র ঈদসংখ্যা ২০১৬-তে ছাপা হয়, যে তিনটি কবিতা আমার পড়া হয়নি। সব মিলিয়ে তার কবিতার সংখ্যা ১২৬টি, যার ১২৩টি আমি পড়েছি। এই ১২৩টি কবিতার মধ্যে সরাসরি শরৎ কথাটি তেমন আসেনি বললেই চলে। কিন্তু শরতের আবহ তিনি তৈরি করেছেন ১৯টি কবিতায়। এই রচনায় সেই ১৯টি কবিতা নিয়ে আলোচনা করব এবং খোঁজার চেষ্টা করব কবি শহীদ কাদরীর শরৎ ঋতুকে।

বাংলাদেশ ষড়ঋতুর দেশ। চারটি প্রধান ঋতু গ্রীষ্ম, শরৎ, শীত ও বসন্ত ছাড়া আমাদের আরও দুটি বাড়তি ঋতু আছে, বর্ষা ও হেমন্ত। প্রকৃতপক্ষে বর্ধিত গ্রীষ্মই বর্ষা এবং বর্ধিত শরৎই হেমন্ত। একত্রে শরৎ এবং হেমন্তের যেরূপ আমরা ষড়ঋতুর দেশে অবলোকন করি প্রায় সেই বৈশিষ্ট্যই যে সময়টাতে পরিলক্ষিত হয় পৃথিবীর অন্যান্য দেশে সেই সময়কালকে ইংলিশরা বলেন অটাম এবং আমেরিকানরা বলেন ফল। আমরা যখন কবিতায় ধবলজ্যোৎস্নার কথা বলি, শিশিরস্নাত শিউলির কথা বলি কিংবা পাতা ঝরার বর্ণনা পাঠ করি তখনি আমাদের চোখের সামনে ফল বা শরৎ-হেমন্ত ভেসে ওঠে। বিষয়টি নিয়ে কথা বলি কবি শহীদ কাদরীর সঙ্গে। জানতে চাই, শরৎ আপনার কবিতায় কিভাবে এসেছে? তিনি নিজের স্মৃতিশক্তির ওপর খানিকটা অভিমানসুলভ দোষ চাপিয়েই বলেন, আজকাল  তো আর কিছুই মনে থাকে না। তবে যতদূর মনে করতে পারি আমি সেই ভাবে শরৎ ঋতু নিয়ে কবিতা খুব একটা লিখিনি। হ্যাঁ, একটি কবিতার কথা মনে পড়ছে, বোধ, এই কবিতাটিতে আমি শরৎকে এনেছি। দেখা যাক, সেই কবিতাটিতে তিনি কি লিখেছেন :

“শালিক নাচে টেলিগ্রাফের তারে,/কাঁঠালগাছের হাতের মাপের পাতা/

পুকুরপাড়ে ঝোপের ওপর আলোর হেলাফেলা/ এই এলো আশ্বিন,/

আমার শূন্য হলো দিন/কেন শূন্য হলো দিন?/ মহাশ্বেতা মেঘের

ধারে-ধারে/ আকাশ আপন ইন্দ্রনীলে ঝলক পাঠায় কাকে?/ ছাদে-ছাদে

বাতাস ভাঙে রাঙাবৌ-এর খোঁপা/এই এলো আশ্বিন,/আমার শূন্য

হলো দিন/কেন শূন্য হলো দিন?/শিউলি কবে ঝরেছিল কাদের

আঙিনায়/ নওল-কিশোর ছেলেবেলার গন্ধ মনে আছে?/ তরুণ হাতের

বিলি করা নিষিদ্ধ সব ইস্তেহারের মতো/ ব্যতিব্যস্ত মস্ত শহরজুড়ে/

এই এলো আশ্বিন,/আমার শূন্য হলো দিন/ কেন শূন্য হলো দিন?”

(কবিতা : বোধ, কাব্যগ্রন্থ : কোথাও কোনো ক্রন্দন নেই)

 

বোধ কবিতাটি কবি শহীদ কাদরী সত্তরের দশকের অনুজপ্রতিম কবি মাহবুব হাসানকে উৎসর্গ করেছেন। এই কবিতায় আমরা একটি হতাশার চিত্র পাই, পাতাঝরা-কালের মতো, যা আমাদের অবশ্য ইশরতের কথা মনে করিয়ে দেয়। তিনি খুব সুস্পষ্টভাবেই কবিতায় একটি সুনির্দিষ্ট মাসের কথা উল্লেখ করেছেন যা শরৎকে প্রতিনিধিত্ব করে। এই কবিতায় কবি শহীদ কাদরী দিনশূন্য হবার কথা বলেছেন, দিন ফুরানোর ঘণ্টাধ্বনি তিনি শুনতে পাচ্ছেন, যেমনি করে শরৎ পাতা ঝরিয়ে দিয়ে বৃক্ষকে শূন্য করে ফেলে। উল্লেখ করার মতো হচ্ছে, ‘আমার শূন্য হলো দিন’ এই পঙ্ক্তিটির পরে প্রতিবারই তিনি আরও একটি প্রশ্নবোধক পঙ্ক্তি লিখেছেন, কেন শূন্য হলো দিন? ‘এই প্রশ্নের মধ্যে রয়েছে খেদ, ক্ষোভ, হতাশা।’ দিনফুরানো তিনি মেনে নিতে পারছেন না। কবি তো তখন যুবক ছিলেন। তাহলে ‘দিন ফুরানো’ নিয়ে তার এত আক্ষেপ কেন? প্রকৃতপক্ষে কবি অন্য এক ভবিতব্যের ঘণ্টাধ্বনি শুনতে পাচ্ছিলেন। দেশ ছাড়ার ঘণ্টাধ্বনি। আমার আম্মা একটি কথা সব সময় বলেন, ‘ছেড়ে যাওয়া আর মরে যাওয়া একই কথা’। আজকের উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থার প্রেক্ষাপটে হয়ত একথা সেইভাবে প্রযোজ্য নয়, তবে সত্তরের দশকের শেষে, তখনকার ঢাকা শহরের প্রেক্ষাপটে, ছেড়ে যাওয়া মৃত্যুর মতোই বেদনাবিধুর ছিল। এটিই কবি শহীদ কাদরীর কবিজীবনের প্রথমপর্বের সর্বশেষ বা প্রায় সর্বশেষ কবিতা। বিষয়টি তিনি আঁচ করতে পেরেছিলেন যে, তাঁর কবিজীবনের প্রায় যবনিকাপাত ঘটতে যাচ্ছে। এরপর দীর্ঘ বিরতি। প্রায় তিন দশক পরে মাত্র ৩৬টি কবিতা নিয়ে ২০০৯-এ প্রকাশিত হয় ‘আমার চুম্বনগুলো পৌঁছে দাও’। সেইদিক থেকে শুধু দেশ ছেড়ে যাওয়াই নয়, যেন তিনি বুঝতে পেরেছিলেন তার কবিজীবনের দিনও শূন্য হতে চলেছে। কবি শহীদ কাদরীর ব্যক্তিজীবন থেকে বের করে এনে এই কবিতাটি বিশ্লেষণ করলেও আমরা এটিকে একটি সার্থক এবং কালজয়ী কবিতা বলতে পারি। এই কবিতায় আশ্বিনের আবির্ভাব মানুষের দিন ফুরানোর ঘণ্টাধ্বনি হিসেবে পরিস্ফুট হয়েছে সার্থকভাবেই। প্রথম কাব্যগ্রন্থ উত্তরাধিকার-এর পাঁচটি কবিতায় আমরা শরতের আবহ দেখতে পাই। কবিতাগুলি হচ্ছে :

‘বৃষ্টি, বৃষ্টি, নশ্বর জ্যোৎস্নায়, ‘মৃত্যুর পরে’, ‘জানালা থেকে’, এবং ‘কবি-কিশোর’। কোনো এক ঘন বর্ষণের দিনে কবি ‘বৃষ্টি, বৃষ্টি’ কবিতাটি লিখেছেন। যে অবিরাম বর্ষণের কথা এই কবিতায় এসেছে তা কালবোশেখির বৃষ্টি নয়, এই বৃষ্টি বর্ষার শেষে বা শরতের শুরুতেই দেখা যায়, যার স্রোতধারায় ‘ভেসে যায় ঘুঙুরের মতো বেজে সিগারেট-টিন/ ভাঙা কাচ, সন্ধ্যার পত্রিকা আর রঙিন বেলুন/মসৃণ সিল্কের স্কার্ফ, ছেঁড়া তার, খাম, নীল চিঠি/ লন্ড্রির হলুদ বিল, প্রেসক্রিপসন, শাদা বাক্স ওষুধের/সৌখিন শার্টের ছিন্ন বোতাম ইত্যাদি সভ্যতার/ ভবিতব্যহীন নানাস্মৃতি আর রঙবেরঙের দিনগুলি।’

যদিও কবি শহীদ কাদরী আমাকে বলেছেন যে, তিনি বর্ষাকালের এক দুর্যোগপূর্ণ দিনে এই কবিতাটি রচনা করেছেন কিন্তু কবিতাটিতে আমরা ভাদ্রমাসের তুমুল বর্ষণের আওয়াজ পাই। এক বর্ষণমুখর সন্ধ্যা-রাতের বর্ণনা, যা অবধারিতভাবেই নাগরিক, প্রতিভাত হয়েছে এই কবিতায়। তুমুল এ-বর্ষণ একদিকে যেমন সন্ত্রাসীর মতো জিম্মি করে রেখেছে নগরবাসীকে, কেউ বেরুতে পারছে না, আবার অন্যদিকে চিরকালের নিয়ম ভেঙে এই বর্ষণরাত্রির শহর নিজেকে খুলে দিয়েছে তাদের জন্যে যারা এ শহরে কখনওই রাজত্ব করার সুযোগ পায় না। আজ এই রাজপথ, এ শহর শুধু তাদেরই দখলে। সামন্তবাদী চিন্তা এবং স্বৈরতান্ত্রিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে সাম্যবাদী বিপ্লবের, যেন আগ্রাসী, জয়গান এই কবিতায় দেখতে পাই :

‘রাজত্ব, রাজত্ব শুধু আজ রাতে, রাজপথে-পথে/ বাউন্ডুলে আর লক্ষ্মীছাড়াদের, উন্মুল, উদ্বাস্তু/ বালকের, আজীবন ভিক্ষুকের, চোর আর অর্ধ-উন্মাদের/ বৃষ্টিতে রাজত্ব আজ। রাজস্ব আদায় করে যারা,/ চিরকাল গুণে নিয়ে যায়, তারা সব অসহায়/পালিয়েছে ভয়ে।/বন্দনা ধরেছে গান গাইছে সহর্ষে/উৎফুল্ল আঁধার প্রেক্ষাগৃহে আর দেয়ালের মাতাল প্ল্যাকার্ড,/বাঁকা-চোরা টেলিফোন-পোল, দোল খাচ্ছে ওই উঁচু/ শিখরে আসীন, উড়ে-আসা বুড়োসুড়ো পুরোন সাইনবোর্ড/তাল দিচ্ছে শহরের বেশুমার খড়খড়ি/ কেননা সিপাই, সান্ত্রী আর রাজস্ব আদায়কারী ছিল যারা,/ পালিয়েছে ভয়ে।/পালিয়েছে মহাজ্ঞানী, মহাজন মোসাহেবসহ/ অন্তর্হিত,/বৃষ্টির বিপুল জলে ভ্রমণ-পথের চিহ্ন/ ধুয়ে গেছে, মুছে গেছে/কেবল করুণ কটা/ বিমর্ষ স্মৃতির ভার নিয়ে সহর্ষে সদলবলে/বয়ে চলে জল পৌরসমিতির মিছিলের মতো/ নর্দমার ফোয়ারার দিকে’।

(কবিতা : বৃষ্টি বৃষ্টি কাব্যগ্রন্থ : উত্তরাধিকার)

 

কবি শহীদ কাদরী ১৯৪২ সালের ১৪ আগস্ট জন্মগ্রহণ করেন কলকাতার পার্কসার্কাসে। সেটি ছিল শুক্রবার ১৩৪৯ বঙ্গাব্দের ১লা ভাদ্র। অর্থাৎ শরতের প্রথম দিন। ১০ বছর বয়সে চলে আসেন। ১৯৫৩ সালে, মাত্র এগার বছর বয়সেই, ‘পরিক্রমা’ শিরোনাম দিয়ে তিনি একটি কবিতা লিখে ফেলেন, যেটি ছাপা হয় মহিউদ্দিন আহমদ স¤পাদিত স্পন্দন পত্রিকায়। এরপর লেখেন, জলকন্যার জন্য। সেটিও স্পন্দনেই ছাপা হয়। এভাবেই শুরু। তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ উত্তরাধিকার বের হয় ১৯৬৭ সালে। তখন তাঁর বয়স ২৫ বছর। এই গ্রন্থে অবশ্য প্রথম রচিত কবিতা দুটি সন্নিবেশিত হয়নি। উত্তরাধিকার-এ সংকলিত কবিতাগুলো কৈশোর এবং প্রথম যৌবনে রচিত হলেও ম্যাচিউরিটির কোনো অভাব নেই তাতে। একজন কবির বয়স যে কোনো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নয় এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ কবি শহীদ কাদরী। এই গ্রন্থের কবিতাগুলোতে কোলকাতা এবং ঢাকা এই দুই নগর-জীবনের অভিজ্ঞতা বিধৃত হয়েছে। যে শরৎ আমরা পাই এ গ্রন্থের উল্লিখিত পাঁচটি কবিতায় তা এই দুই নগরের ৬৭-পূর্ব সময়কালকে প্রতিনিধিত্ব করে। কবিতাগুলোতে শরতের উপস্থিতি আছে, তবে শরৎঋতু-বৈশিষ্ট্যের আবহে অবস্থান করেই তা কখনও বিপ্লবী, কখনও মানবিক আবার কখনও স্বপ্নচারী হয়ে উঠেছে। ‘নশ^র জ্যোৎস্নায়’ কবিতায় তিনি একটি সময়ের কথা বলেছেন যে, সময় এখনও আসেনি। অর্থাৎ ভবিষ্যতের চিত্রকল্প। সেই ভবিষ্যৎ খুব দূরের নয়, ‘মধ্য বিশ শতকের।’ অর্থাৎ তাঁর কৈশোরকালেরই কোনো এক সময়। কবিতাটিতে তিনি যে-চিত্রকল্প নির্মাণ করেছেন তা বাংলার শরৎ ঋতুরই ছবি।

‘জ্যোৎস্নায় বিব্রত বাগানের ফুলগুলি,/অফুরন্ত হাওয়ার আশ্চর্য আবিষ্কার করে নিয়ে/চোখের বিষাদ আমি বদলেনিই /আর হতাশারে নিঃশব্দে বিছিয়ে রাখি বকুলতলায়/ সেখানে একাকী রাত্রে, বারান্দার পাশে/সোনালী জরির মতো/ জোনাকিরা নকশা জ্বেলে দেবে’,

এই পঙক্তিগুচ্ছে যে-চিত্রটি ভেসে ওঠে তা হলো, বিদ্যুৎহীন এক শহরতলী থেকে ফিরে গেছে বর্ষা। জলাশয়ের পাড়ে মাথাচারা দিয়ে জেগে উঠেছে আম-জাম-বকুলের শাখা, অন্ধকার বাঁশঝাড়। রাতের প্রথম প্রহর। একঝাঁক জোনাকি মেলে দিয়েছে আলোর পশরা।  যখন বলেন, ‘চোখের বিষাদ আমি বদলেনিই আর হতাশারে/নিঃশব্দে বিছিয়ে রাখি বকুলতলায়/সেখানে একাকী রাত্রে, বারান্দার পাশে/সোনালী জরির মতো জোনাকিরা নক্সা জ্বেলে দেবে, তখন মুহূর্তেই জ্বলে ওঠে প্রত্যাশার আলো। কবি আমাদের শোনান আশার বাণী :

‘টলটল করবে কেবল এই নক্ষত্রের আলো-জ্বলাজল/ অপ্সরার ওষ্ঠ থেকে খসে-পড়া চুম্বনের মতো/ তৃষ্ণা নেভানোর প্রতিশ্রুতিতে সজল/এই আটপৌরে পুকুরেই/শামুক সাজাবে তার আজীবন প্রতীক্ষিত পাড়।’

 

এই কবিতায় ‘পাতা ঝরানো’ বা দিন ফুরানোর হতাশা নয় বরং শরৎ এসেছে প্রত্যাশার নতুন সূর্যোদয়ের, এক রক্তিম ভোরের বার্তা নিয়ে। যেমন কবি ওয়াল্ট হুইটম্যান শরৎকে দেখেছেন ইতিবাচক ঋতু হিসেবে, আমাকে শরতের বাগান থেকে পাকা এবং রসালো ফল এনে দাও’- আমরা কবি শহীদ কাদরীকেও দেখি মূল্যবোধের সংস্কারকে পেছনে ফেলেন নতুন দিনের প্রত্যাশায় শারদীয় জ্যোৎস্নায় অবগাহন করতে কোনো এক শরৎ রাত্রির বারান্দায়।

‘পরিত্যক্ত মূল্যবোধ, নতুন ফুলের কৌটোগুলো/জ্বলজ্বলে মণির মতন সংখ্যাহীন জ্যোৎস্না ভরে নিয়ে/ নিঃশব্দে থাকবে ফুটে মধ্য-বিশ শতকের ক্লান্ত/ শিল্পের দিকে চেয়ে এই মতো নির্বোধ বিশ্বাস/ নিয়ে আমি বসে আছি আজ রাতে বারান্দার হাতল চেয়ারে জ্যোৎস্নায় হাওয়ায়।’

(কবিতা : নশ্বর জ্যোৎস্নায় কাব্যগ্রন্থ : উত্তরাধিকার)

 

ভাঙা বর্ষা অন্দর-গ্রামে, ফসলের মাঠে, দুয়ারে-উঠানে, ঝোপঝাড়ে জলবিহার শেষে বার্ধক্যের অমোঘ টানে ফিরে যায় নদীতে, সমুদ্রে। বর্ষার শবদেহের ওপর উত্তরে মিহি হাওয়ার টানে নেমে আসে বিষণœ শরৎ, টুপটাপ ঝরে পড়ে লাল-হলুদ পত্র-পল্লবরাজী। এই হলো চিরায়ত শরৎ, দুঃখ । ‘যেন আমার কবরে আমি জ্বলন্ত শেয়াল/ সন্তর্পণে নাকে শুঁকে রাত্রির নিঃশব্দ মখমলে/ আমার টাটকা শব ফেলে যেন আমারই দখলে।’ কবিতার নাম মৃত্যুর পরে। এই কবিতার হৃদস্পন্দনে বেজে ওঠে মৃত বর্ষার শেষকৃত্যানুষ্ঠানের বিউগল আর যেন সেই শোকসভায় খুব সন্তর্পণে আগমন ঘটে এক বিষণè শরতের। কবিতাটিতে কবি শহীদ কাদরী কিছুটা আঙ্গিক বদলের কাজ করেছেন। পয়ারে যোগ করেছেন অন্ত্যমিল :

‘রয়ে যাই ঐ গুল্মলতায়,

পরিত্যক্ত হাওয়ায়-ওড়ানো কোনো হলুদ পাতায়,

পুকুর পাড়ের গুগগুলে, এক ফোটা হন্তারক বিষে,

যদি কেউ তাকে পান করে ভুলে,

অথবা সুগন্ধি কোনো তেলের শিশিতে,

মহিলার চুলে, গোপনে লুকিয়ে থাকি যেন তার

ঘুমের নিশীথে অন্তত নিদেনপক্ষে এক লাফে পেরিয়ে

দেয়াল পৌঁছে যেতে পারি যেন আমার কবরে আমি

জ্বলন্ত শেয়াল সন্তর্পণে নাকে শুঁকে রাত্রির নিঃশব্দ মখমলে

আমার টাটকা শব ফেরে যেন আমারই দখলে।

বিঘœহীন, রক্তমাংসে হাড়গোড় চেটেপুটে সবই খাওয়া হয়

নিজেই বাঁচাতে যেন পারি ওহে, নিজেরই নেহাৎ

ব্যক্তিগত অপচয়।’

(কবিতা : মৃত্যুর পরে কাব্যগ্রন্থ : উত্তরাধিকার)

 

ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র বস্তুর মধ্যে, পুকুরের গুগগুলে, ঝরাপাতায়, যেখানে যেখানে মানুষ আঁকে তার পদচিহ্ন, বেঁচে থাকতে চায় মৃত্যুর পরেও। শুকিয়ে যাওয়া, ফিরে যাওয়া বর্ষার কথাই বারবার মনে পড়ে। শুকনো খালের তলানিতে কিছুই কি রয়ে যায় না মৃত বর্ষার, এই শরতে? নোবেল বিজয়ী কথাসাহিত্যিক আর্নেস্ট হেমিংওয়ে শরৎকে বিষাদের ঋতু হিসেবেই দেখেছেন, তার মতে, ‘এটাই স্বাভাবিক যে শরৎ-এ তুমি দুঃখভারানত হবে। প্রতি বছর জীবনের কিছু অংশ মরে যখন গাছেরা পাতা ঝরায় এবং তাদের শাখাগুলো নগ্ন হয়ে পড়ে। নগ্ন ডালের ওপর দিয়ে বয়ে যায় শৈত্যপ্রবাহ এবং তারা উন্মুখ হয়ে থাকে একফালি রোদের জন্য’। ত্রিশের দশকে বাংলা কবিতার অনুষঙ্গে যুক্ত হয় বুদ্ধিবৃত্তিক চিন্তা, কবিরা আঁকতে শুরু করেন এমন চিত্রকল্প যার আড়ালে লুকানো কবিতার প্রাণভ্রমর। আধুনিক কবিতা হয়ে ওঠে তালাবদ্ধ ঘরে আটকে রাখা এক সুন্দরী তরুণী, কিন্তু সেই ঘরের একমাত্র খোলা জানালা দিয়ে বিদ্যুচ্চমকের মতো চমকাচ্ছে তরুণীর রূপের ছটা। পাঠক চোখ রাখেন জানালায়, দেখেন, ‘আঘাটার অপ্সরীবৃন্দ অপেক্ষায় ¯পন্দিত হয়/ গল্পের হলদে পাতার বাগানে আর নেশা-পাওয়া হাওয়া/ আসে যেন ভ্রমরেরও আগে/ এবং বাউলের একতারার মত বেজে ওঠে চাঁদ,/অমাবস্যায় গোলাপঝাড়ের মতো পুঞ্জ পুঞ্জ জোনাকি/ ভয়ে রয় রাত্রির ময়দানগুলো জুড়ে;/ এবং যুগল পিদিমের মতো ‘মার চোখের আশ্বাসের আলোয়/ তরুণ ঘোড়ার পিঠে দ্রুত পেরিয়েছি শৈশব, কৈশোর’

(কবিতা  জানালা থেকে, কাব্যগ্রন্থ : উত্তরাধিকার)

 

‘কিন্তু দৃষ্টিহীন আকাশ ক্রমে নেমে এল বিস্বাদে পীতাভ

এবং গেঁথে রইল জানালার মরচে-পড়া সারি সারি শিকে

যেন আমার মৃত অশ্বের ছাল টানিয়েছে কেউ

অকরুণ রোদ্দুরে! আর আমি অপরিসর শয্যার চৌদিকে

অস্তিত্বের সীমা টেনে

দীর্ঘশ্বাসের কালো ফুলে সাজাবো স্মৃতির বাসর!

নিঃসঙ্গতাকে যৌবনের পরম সুহৃদ জেনে

তার সহোদরা কান্নার বাহুবন্ধে সঁপে দেবো

স্বপ্নের সত্য আর সত্তার সার

এবং আমার জানলা থেকে

নিরুপায় একজোড়া আহত পাখির মত চোখ

রাত্রিভর দেখবে শুধু

দূর দর-দালানের পারে

আবছা মাঠের পর নিঃশব্দ ছিন্ন ক’রে জোনাকির জাল

ছুটে গেল যেন এক ত্রস্ত ভীত ঘোড়ার কঙ্কাল।

 

‘জানালা থেকে নিস্তেজ, নিরুত্তাপ বর্ষার কঙ্কাল, করোটির ভেতর দিয়ে বয়ে যাওয়া শৈত্যপ্রবাহের মতো এক শীতল, শরৎ অবলোকন করি এই পঙক্তি গুচ্ছে। এক নিঃসঙ্গ পুরুষ উষ্ণতাহীন যৌবন গুটিয়ে পড়ে আছে অপরিসর শয্যায়। জানালায় আহত পাখির মতো একজোড়া চোখ। একই হতাশা কবি-কিশোর কবিতাটিতেও।

‘নিঃস্বপ্ন আকাশে জ্যোৎস্না-লাগা/মেঘের ঝুলন’ কিংবা চারদিকে কালো-মাথা তবু গোধূলিতে কী সুন্দর/ ওই সিন্ধুজল/ কেঁপে ওঠে, তরঙ্গ ছড়ায় পরীদের গন্ধবাহী/ মন্থর হাওয়ায় বিষণè শরতের কথা মনে করিয়ে দিলেও এই কবিতাটিতে একটি আক্ষেপের চিত্রকল্প রচিত হয়েছে। এক বিশ্বাসঘাতকের হাত থেকে বেঁচে যাওয়া কোনো এক বন্ধুকে উদ্দেশ্য করেই কবি বলছেন :

‘তুই শুধু বেঁচে গেলি বিভীষণ অন্যদের ছুঁলো

নীলিমার উষ্ণ জরায়নে তিলে-তিলে জমে-ওঠা

লালাভ স্পন্দন

দ্যাখে নি কোথাও কেউ, কোনো লোক, কোনো বোকা চোখ

বিশ শতকের শূন্য নিঃস্বপ্ন আকাশে জ্যোৎস্না-লাগা

মেঘের ঝুলনা,

অলীক, অদ্ভুত, হাস্যকর : এইমতো ঠাওরালো

সকলেই, সকলেই-

তুই শুধু বেঁচে গেলি  বিভীষণ অন্যদের ছুঁলো!

 

চারদিক কালো-মাথা তবু গোধূলিতে কী সুন্দর

ওই সিন্ধুজল

কেঁপে ওঠে, তরঙ্গ ছড়ায় পরীদের গন্ধবাহী

মন্থর হাওয়ায়

ক্ষীণায়ু মোমের মতো স্নান সূর্য-প্রয়াণের পর

ককায় অপেক্ষমাণ পড়ে-থাকা স্তব্ধ পটভূমি

স্বপ্নের উজ্জ্বল দাগে আকাক্সক্ষার কঠিন আঁচড়ে

ভরে গেলো

তুই শুধু বেঁচে গেলি,  বিভীষণ অন্যদের ছুঁলো।

 

দ্বিতীয়কাব্যগ্রন্থ

তোমাকে অভিবাদন প্রিয়তমা-র মাত্র তিনটি কবিতায় শরতের আবহ খুঁজে পাই। কবিতা তিনটি হচ্ছে ‘স্কিৎসোফ্রেনিয়া’, ‘আইখম্যান আমার ইমাম’ এবং ‘একবার দূরবাল্যকালে’। গ্রন্থটির প্রকাশকাল ১৯৭৪, রচনাকাল ১৯৬৭ থেকে প্রকাশকাল অবধি, তাই তার একটি কাব্যগ্রন্থের জন্য পাঠককে অপেক্ষা করতে হয়েছে অনেক সময়। এই গ্রন্থের রচনাকালের মধ্যেই সংগঠিত হয়েছে আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধ। স্বভাবতই কবিতাগুলোতে মুক্তিযুদ্ধের দৃশ্যকল্প উপস্থাপিত হয়েছে বিধৃত হয়েছে মুক্তিযুদ্ধের আবেগ, প্রত্যয় এবং ভয়াবহতা।

পৃথিবীর সবচেয়ে বড় উপন্যাস ওয়ার অ্যান্ড পিস-এর রচয়িতা লিও টলস্টয় শরৎকে বিষাদ, হতাশা ও অপ্রাপ্তির ঋতু হিসেবেই চিহ্নিত করেছেন। তিনি বলেন, কে পরিস্ফুট করে তোলার জন্য একজন চিত্রকরের যেমন আলো দরকার, ভেতরেও তেমনি আলো চাই যা আমি শরৎকালে যথেষ্ট পরিমাণ পাই না।’ শহীদ কাদরীকে বলতে শুনি, একবার পেয়েছিলাম দূর বাল্যকালে, কৈশোরে/ রাস্তার ফাটলে কিছু তরল জ্যোৎস্ন (কবিতা : একবার দূরবাল্যকালে, কাব্যগ্রন্থ- তোমাকে অভিবাদন প্রিয়তমা)। সেই জ্যোৎস্না কবিকে পথ দেখিয়ে কতদূর নিয়ে গিয়েছিল? তিনি কি সেই জ্যোৎস্না হারিয়ে ফেলেছিলেন? ‘জ্যোৎস্না জ্যোৎস্না বলে বারান্দায় দাঁড়ালে/ হুইসিল বাজিয়ে দৌড়ে আসবে পুলিশ, গর্জাবে খাকি জিপ!/ অথচ বদান্য তার অভাব নেই কোনো, জ্যোৎস্নার জ্বলজ্বলে লাবণ্য/  আজীবন খুচরোপয়সার মতো পার্কে, ঘাসের ফাঁকে ফাঁকে/ ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে থাকে।/শুধু যথার্থ হা-ঘরে যারা, বেকার, উপোসী, তারাই তাকে নির্বিকার, নোংরা আঙুলে, বারবার খুঁজে পায়।’ একজন প্রকৃত মার্ক্সবাদী কবির মতো তিনি এবারও উপোসী, বেকার কিংবা ভবঘুরেদেরই পাশেই দাঁড়ান। তিনি তবু দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে উচ্চারণ করেন, নির্বিকার, নোংরা আঙুলে তারাই বারবার জ্যোৎস্নাকে খুঁজে পায়। মুক্তিযুদ্ধোত্তর বাংলাদেশে আমাদের প্রত্যাশার জ্যোৎস্না যখন অমাবস্যার প্রগাঢ় অন্ধকারে নিমজ্জিত তখনও কবি প্রত্যাশার আলো জ্বেলে রাখেন। যেমন শরতের পাতাঝরা ন্যাড়া ডাল আবারও পত্রপুষ্প ভরে উঠবে এই প্রত্যাশায় অপেক্ষমাণ বসন্তের পাখিরা। এই কবিতাটিতে তিনি একটি নতুন শব্দ  ‘হা-ঘরে’ ব্যবহার করেছেন। ‘হা-ঘরে’ শব্দটি, এই কবিতা মহা-ভাতে-র অনুকরণে, যার ঘর নেই কিন্তু ঘরের আকাক্সক্ষায় বিভোর, হিসেবে এসেছে। আলজেরিয়ান-ফরাসি কবি আলবেয়ার কামুর কণ্ঠে আমরা শুনি আরও অপটিমিস্টিক উচ্চারণ, ‘শরৎ আসলে আরেক বসন্ত, প্রতিটি পাতাই তখন হয়ে ওঠে ফুল’।

“স্কিৎসোফ্রেনিয়া” কবিতায় তিনি ‘হেমন্তের বিবর্ণপাতার মতো ঝরে যাওয়া’ বর্ণমালাহীন শূন্যতায় বুনে যান মেটাফোরিক মুক্তিযুদ্ধ। এই কবিতায় টেবিলগুলো বিস্ফোরণ ঘটায়, টাইপরাইটারগুলো গর্জে ওঠে, মগজের মধ্যে ডুবে থাকে সাবমেরিনের সারি এবং সংবাদপত্রের শিরোনামগুলি ক্রমাগত বাজিয়ে চলে সাইরেন। সর্বত্রই তিনি শুনতে পান মুক্তিযুদ্ধের দামামা।

চারদিকে বিস্ফোরণ করছে টেবিল,

গর্জে উঠছে টাইপ রাইটার,

চঞ্চল, মসৃণ হাতে বিশ্বস্ত সেক্রেটারীরা

ডিক্টেশন নিতে গিয়ে ভুলে গেছে শব্দ-চিহ্ন,

জরুরি চিঠির মাঝামাঝি

জাহাঁবাজ ব্যাপারীর দীপ্ত জিহবা

হেমন্তের বিবর্ণ পাতার মতো ঝরে গেছে

বর্ণমালাহীন শূন্যতায়,-

 

পেটের ভেতরে যেন গর্জে উঠছে গ্রেনেড,

কার্বাইনের নলের মতো হলুদ গন্ধক ঠাসাশিরা,

গুনাগার হৃদয়ের মধ্যে ছদ্মবেশী গেরিলারা

খনন করছে গর্ত, ফাঁদ, দীর্ঘ কাঁটাবেড়া।

জানু বেয়ে উঠছে একরোখা ট্যাঙ্কের কাতার,

রক্তের ভেতর সাঁকো বেঁধে পার হলো

বিধ্বস্ত গোলন্দাজেরা,

প্রতারক কটা রংহীন সাব-মেরিনের সারি

মগজের মধ্যে ডুবে আছে,

 

সংবাদপত্রের শেষপৃষ্ঠা থেকে বেরিয়ে এসেছে

এক দীর্ঘ সাঁজোয়া-বাহিনী

এবং হেডলাইনগুলো অনবরত বাজিয়ে চলেছে সাইরেন।

 

একটি চুম্বনের মধ্যে সচীৎকার ঝলসে গেল কয়েকটা মুখ,

একটি নিবিড় আলিঙ্গনের আয়ুষ্কালে

৬০,০০,০০০ উদ্বাস্তুর উদ্বিগ্ন দঙ্গল

লাফিয়ে উঠলো এইটে বিলের পর;

বেয়োনেটে ছিঁড়ে যাওয়া নাড়ি-ভুঁড়ি চেপে,

বাম-হাতেরে ফ্রিজারেটর খুলে পানি খেলো

যে-লোকটা, তাকে আমি চিনি।

(কবিতা : স্কিৎসোফ্রেনিয়া, কাব্যগ্রন্থ- তোমাকে অভিবাদন প্রিয়তমা), নিপীড়িত, নির্যাতিত এক জনপদের জনরোষ ভরা বর্ষার মতো উত্তাল। এরপর আসে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ, অধিকার আদায়ের সশস্ত্র সংগ্রাম, মুক্তিযুদ্ধ। যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশ স্বভাবতই শরতের শান্ত, স্নিগ্ধরূপে আবির্ভূত হবে, ক্রমশ সমৃদ্ধির সোপানে পা রেখে এগিয়ে যাবে পত্রপুষ্পশোভিত বসন্তের দিকে। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধোত্তর বাংলাদেশের প্রকৃত চিত্র ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। আইখম্যানের মতো মুখ করে/ একজন ইমাম দাঁড়িয়েছেন মিনারের/

উঁচু মাইক্রোফোনে/ এবং চতুর্দিকে/ নক্ষত্রের মতো নিষ্পাপ ক্লাবগুলো/

কেবল ঝকঝক/ চকচক করছে/ অ-ন-ব-র-ত। প্রকৃত চিত্রটি ছিল, শ্রাবণে খরা,/

আষাঢ়েও বালি জ্বলছে,/ টলে পড়ছে পাতার জলের মতো/ গ্রামগুলো নদীর ভেতর/

তিন চার দিন হলো ঘুম নেই,/ রাতেও, হেঁটে বেড়াচ্ছি তবুও/

গুপ্তঘাতক-ভরা/ শহরের আনাচেকানাচে/তিন চার দিন হলো,/ একটা ছুরি খাওয়া কিশোর/

পুকুর-বসানো আংটির মতো পার্কে/ পড়েছিল (তিন চার দিন হলো)/ দেয়ালে নতুন পোস্টার/

শাসাচ্ছে সবাইকে-/ আমাকেও,/ মনে পড়লো/ মাথার ওপর বি-৫২ বিমানের/ দিকে তাকিয়ে

দৌড়াচ্ছে তিনজন কিশোর/ কিউবার একটা দুর্লভ কাগজে/ দেখেছিলাম হ্যানয়ের একটা ছবি/

মনে পড়লো/ যা পার জড়িয়ে ট্রেঞ্চে ছিলাম/ এইতো সেদিন ব্লাকআউটের রাত্রে-/ আমিও,/ মনে

পড়লো/ ক্রাচে ভর দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে/ একজন ফ্রিডম ফাইটার”

(কবিতা : আইখম্যান আমার ইমাম, কাব্যগ্রন্থ : তোমাকে অভিবাদন প্রিয়তমা)।

 

চার বছরের মধ্যেই, ১৯৭৮ সালে, শহীদ কাদরীর তৃতীয় কাব্যগ্রন্থ  কোথাও কোনো ক্রন্দন নেই বের হয়। ৩৫টি কবিতার মধ্যে আমরা শরতের আবহ খুঁজে পাই ৬টি কবিতায়। কবিতাগুলো হচ্ছে, ‘কেন যেতে চাই’, ‘কেন যেন বলছে’, ‘এবার আমি’, ‘যাই যাই’, ‘ধুসর জল থেকে’, এবং ‘বোধ’।

‘বোধ’ নিয়ে আগেই বিস্তারিত আলোচনা করেছি। এখানে অন্য ৫টি কবিতার ওপর আলোকপাত করব। ‘কেন যেতে চাই’ কবিতায় তিনি মানুষ যে আজন্ম স্বার্থপর, প্রকৃতির মতোই, তা তুলে ধরেছেন :

‘আমি তো তোমাদেরই দিকে যেতে চাই

ইন্দ্রনীল একটি মোহন আংটি

প্রেমিকের ক¤পমান হাত থেকে প্রেমিকার আঙুলে যেমন

উঠে যেতে চায়,

কিন্তু চাষাবাদ, বাণিজ্য এবং প্রতিযোগিতামূলক শিল্প

ইত্যাদি বিষয় নিয়ে

তোমরা ব্যস্ত, বড্ড বেশি ব্যস্ত।

 

হরিণ-হননকামী ব্যাধের মাংসল মুঠো থেকে ছুটে-যাওয়া

বল্লমের মতো তোমরা ব্যস্ত

চিরচেনা বৃক্ষরাজিকে পল্লবশূন্য করার জন্য শীতের জটিল

বিস্তারের মতো তোমরা ব্যস্ত

যাত্রী নিয়ে ঘর-ফেরা নৌকোগুলো হরণ করার জন্য চোরাস্রোতে

এবং ঘূর্ণিপাকের মতো তোমরা ব্যস্ত

 

তোমরা ব্যস্ত, তোমরা ব্যস্ত, তোমরা ব্যস্ত,

তোমরা বড্ড বেশি ব্যস্ত

অথচ আমি তো আজীবন তোমাদেরই দিকে যেতে চাই।

কেন যেতে চাই!

(কবিতা : কেন যেতে চাই, কাব্যগ্রন্থ : কোথাও কোনো ক্রদন নেই )

 

যখন বাংলাদেশের আকাশেবাতাসে শরতের উদারতা, এবং যখন কবি শহীদ কাদরী বলেন, আমিতো আজীবন তোমাদেরই দিকে যেতে চাই, তখন তারই বন্ধু, খুব কাছের মানুষ, কবি আল মাহমুদও প্রায় একই কথা বলেন ভিন্ন সুরে, ইচ্ছা হয় না ঘরের ভেতর বসে থাকি সারা দিন/ কিন্তু বাইরে যাওয়ার ইচ্ছা টান লাগে সারা বুকে/ মনে হয় যেন আমার বক্ষে কান পেতে আছে কেউ,/ আজ সারা দিন হাওয়ার মাতম বইছে বাঁধন ছিঁড়ে

(কবিতা : রূপকথা)।

 

কবি শহীদ কাদরীর এক কাজিন ডাক্তার শাহানু যোগ দিয়েছিলেন তৎকালীন পাকিস্তান আর্মিতে। একাত্তরে পাক-আর্মিরা তাকে গুলি করে মেরে ফেলে। রক্তাক্ত একাত্তরের শরতে যেন পড়ে আছে তার লাশ।

 

‘তোমার কালো চকচকে বুটের ভেতর

এতক্ষণে কয়েক ইঞ্চি শিশির জমেছে,

সর্বত্রগামী জ্যোৎস্নাকুণ্ডলী পাকিয়ে

শুয়ে আছে বুটের গহ্বরে,

ক্যাপ্টেন, তোমাকে ত্যাগ করে দূরে পড়ে আছে

তোমার বিহ্বল স্টেনগান, তার চৌদিকে ঘাস-পোকার গুঞ্জন                          …………………………………………………………

টুপটাপ করে ঝরে পড়ছে তোমার চারদিকে

শিশির, জ্যোৎস্না, টগর, চাঁপা আর বকুল

(কবিতা : কেন যেন বলছে, কাব্যগ্রন্থ : কোথাও কোনো ক্রন্দন নেই)

 

সামরিক অনুষঙ্গ শহীদ কাদরীর কবিতায় বারবারই এসেছে। এ বিষয়ে প্রশ্ন করলে কবি নস্টালজিক হয়ে পড়েন, ‘শাহানু ভাই খুব ভাল কেরাম খেলতে পারতেন। ওরা তাঁকে গুলি করে মেরে ফেলে। তাছাড়া মুক্তিযুদ্ধ  তো সব সময় মাথায় থাকেই। কিছু বন্ধু-বান্ধব এয়ার ফোর্সে ছিল, এইসব মিলিয়েই সামরিক অনুষঙ্গগুলো আমার মধ্যে ভীড় করে যা কবিতায় এসেছে।’

আজন্ম শহুরে এই কবি যদি হঠাৎ গ্রামে চলে যান তাহলে কি হবে? ফিরে এলে তার বন্ধুরা তাকে ফেরাতে পারবেনতো? আসলে এই প্রশ্নটি আরও তির্যক, এর লক্ষ্য আরও গভীরে। যখন শহীদ কাদরী নিজেই বলেন, ‘বুঝলা জহির, তখন এমন একটা সময় ছিল, একবার কেউ ঢাকার বাইরে গেলেই শেষ। কত কবি ঢাকার বাইরে চাকরি করতে গিয়ে হারিয়ে গেলো।’

‘তারা তো আমার মতো পাৎলুনের পকেটে হাত রেখে

অহঙ্কারের ভেতর হতশ্রী-হতচ্ছাড়া নয়। তাদের

সোনালি খড়ের ভিটে আছে, গভীর কুয়োতলা আছে

খররৌদ্রে জিরোনোর জন্যে পাথর এবং চত্বর আছে। বটচ্ছায়া?

সেতো আছেই, বদ্যিবুড়োর মতো আদ্যিকাল থেকে,

আর তাছাড়া সরপুঁটি, মৌরলা, ধপধপে চিতল-

এরাতো গ্রামেরই মানুষ!

একবার গ্রাম থেকে আমি পকেট ভর্তি শিউলি

এনেছিলাম (একা একা গন্ধ শুঁকেছি খুব ফিরতি ট্রেনে)। দ্যাখে নি,

না, কেউ দ্যাখে নি পুকুরের আড়াআড়ি

হাঁটতে গিয়ে আড়চোখে গোলমোরের ডাল- হ্যাঁ তা-ও দেখেছি,

‘ওসবে আমার কিছু আসে যায় না হে’

-এখন আর জোর গলায় তা বলতে পারি না।

 

আমি করাত কলের শব্দ শুনে মানুষ।

আমি জুতোর ভেতর মোজার ভেতর সেঁধিয়ে যাওয়া মানুষ

আমি এবার গাঁও গেরামে গিয়ে

যদি ট্রেন ভর্তি শিউলি নিয়ে ফিরি

হে লোহা তামা পিতল এবং পাথর

তোমরা আমায় চিনতে পারবে তো হে!

(কবিতা : এবার আমি, কাব্যগ্রন্থ : কোথাও কোনো ক্রন্দন নেই)

 

কবিতাটিতে আমরা এক খেয়ালি শহুরে যুবককে দেখি শরতের এক ভোরে একাকী ছুটে গেছে দূরের কোনো শিশিরস্নাত গ্রামে, শিউলির টানে। খেয়ালি যুবকের খানিকটা হেয়ালিও দেখি ক্রমান্বয়ে সভ্য হতে থাকা প্রস্তর, তাম্র ও লৌহযুগের উত্তরসূরিদের প্রতি, যখন তিনি ট্রেনভর্তি করে শিউলির মতো স্নিগ্ধ এবং শুভ্র স্বপ্ন নিয়ে ফিরে আসেন এই আটপৌরে শহরে। শারদীয় প্রভাবে শহীদ কাদরীকে আমরা প্রায়শই নস্টালজিক হয়ে পড়তে দেখি।

‘হাই তুলতে তুলতে যাই বটগ্রামে শিউলিতলায়

যেখানে দাঁড়িয়ে আমি কোনোদিন ফটোগ্রাফ তুলি নাই

হে আমার মোরগের চোখের মতন খুব ছেলেবেলা

…………………………………………………

সে কি শিমুলের মতো উড়ে

চলে গেছে শালবনে? কন্ঠ তার মহুয়ায়

মাদলের বোলে, জন্মে-জন্মে, অন্য কোনো জন্মান্তরে

জাগ্রত হবে না আর? যদি হয়, আজ তাই

যা কিছু এড়িয়ে গেছি, আড়ালে রেখেছি

আমার নিজের মধ্যে, কবিতার ক্লান্ত শব্দে, বারবার

ফিরিয়ে আনতে চাই। আজ আবার আমার

ইচ্ছে হলো যাই, এই রঙ-বেরঙের শার্টজামা-জুতো,

মাছ থেকে মাছের আঁশের মতো কৌশলে ছাড়াই…যাই…

একটি নতুন বীজ হয়ে, বকুল অথবা

চামেলির ছদ্মবেশে এক্কেবারে শব্দহীন চলে যাই।

(যাই যাই, কাব্যগ্রন্থ : কোথাও কোনো ক্রন্দন নেই)

 

হ্যারি পটার অ্যন্ড দি ডেথলি হ্যালোজ-এ সাড়া জাগানো কল্পকাহিনি লেখিকা জেকে রাওলিং তার কল্পরাজ্যে শরৎ-কে দেখেছেন ক্রিস্পি এবং সোনালি আপেল হিসেবে। তিনি বলেন, ‘সে বছর যেন হঠাৎই শরৎ এল। সেপ্টেম্বরের প্রথম সকালটি ছিল একটি ক্রিস্পি এবং সোনালি আপেল।’ আর শহীদ কাদরী দেখেন বটগ্রামে শিউলিতলায় মোরগের চোখের মতো ছেলেবেলার শরৎ ঋতুকে। এই শহর মাছের আঁশের মতো। আঁশ তো শরীরেরই অংশ। সেই আঁশ ছাড়িয়ে বকুল অথবা চামেলির ছদ্মবেশে এক্কেবারে শব্দহীন চলে যাওয়া যাবে কি? কবিতাটি পাঠকের মনে এইসব প্রশ্নের জন্ম দেয়।

১৯৭৮ সালে তিনি দেশ ছাড়েন। সিদ্ধান্ত হয়ে যাওয়ার পরে তৃতীয় কাব্যগ্রন্থ কোথাও কোনো ক্রন্দন নেই প্রকাশের চিন্তা করেন। শিরোনামটিই বলে দিচ্ছে ঈর্ষার আগুন জ্বলছিল আশপাশে। তার চলে যাওয়া নিয়ে তাই কোনো শোক নেই, ক্রন্দন নেই। এই গ্রন্থের কিছু কবিতা দেশ ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরে রচিত বলেই ধারণা করি। কেননা এই কবিতাগুলো তারই ইঙ্গিত দিচ্ছে। যখন তিনি বলেন, “কোথাও না কোথাও ঠিক আছে/ নিজস্ব শিউলি আর চন্দ্রমল্লিকার কাছে” তখন আমরা বুঝে ফেলি এই নিজস্ব শিউলি বা চন্দ্রমল্লিকা তার একান্ত স্বপ্নের রৌদ্রকরোজ্জ্বল দিন, যা তিনি কোথাও না কোথাও পাবেন এই প্রত্যাশায় পা বাড়ান স্বদেশের সীমান্তের বাইরে। অবশ্য পরবর্তী জীবনের কবিতাগুলোতে পরবাসকে তিনি নিষ্ঠুর নির্বাসন হিশেবেই চিহ্নিত করেছেন :

এই ভুবনেই জানাশোনা/ বিবসনা/কোথাও না কোথাও ঠিক আছে/

নিজস্ব শিউলি আর চন্দ্রমল্লিকার কাছে/ কোথাও না কোথাও ঠিক

আছে/নদীর ওপারে/ তার বাড়ি/ মধ্যে তার দারুণ ধূসর জল বয়ে

যায় আড়াআড়ি/ নদীর ওপারে/ তার বাড়ি/ পালের সঙ্গে তার আড়ি/

চারিদিকে মোহনা ও খাড়ি/ এভুবনেই/ সে যে আছে/ তাই আমার

খামার ফেলে আমি/ ধুসর এজলে এসে নামি/ রাঙা ঐ জলে যাবো

বলে/ ধূসর জল থেকে রাঙা জলে/ ধূসর জল থেকে রাঙাজলে।/

(ধূসর জল থেকে, কাব্য গ্রন্থ : কোথাও কোনো ক্রন্দন নেই)

 

এই কবিতাটিতে নির্বাসন বা মাইগ্রেশন যা-ই বলি না কেন তার সুস্পষ্ট ইঙ্গিত রয়েছে। ছেড়ে যাবার কষ্ট আছে, তার চেয়েও প্রবল স্বপ্ন, নতুন ভূখণ্ডের উজ্জ্বল প্রলোভন এবং তা রাঙা জলের মতো বর্ণিল। এই কবিতাতে তিনি বেশ কিছু অন্ত্যমিল ব্যবহার করেছেন যা পঞ্চাশের কবিরা পরিহার করবেন বলে পণ করেছিলেন। যদিও আল মাহমুদ প্রচুর অন্ত্যমিলের কবিতা লিখেছেন এবং এক পর্যায়ে শামসুর রাহমানও লিখেছেন।

২০০৯ সালে, সুদীর্ঘ ৩১ বছর পরে প্রকাশিত হয় আমার চুম্বনগুলো পৌঁছে দাও কাব্যগ্রন্থটি। কবি তখন নিউ ইয়র্কে, হুইলচেয়ারে। সপ্তাহে তিনদিন ডায়ালাইসিস তার প্রধান রুটিন। কথাশিল্পী জ্যোতিপ্রকাশ দত্তের জোরাজুরিতে বইটি প্রকাশে সম্মত হন তিনি। সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেন সাংবাদিক কৌশিক আহমেদ। এই গ্রন্থের ৩৬ টি কবিতার মধ্যে আমরা শরতের আবহ খুঁজে পাই ৬টি কবিতায়। কবিতাগুলো হচ্ছে ‘সেই সময়’, আমার চুম্বনগুলো পৌঁছে দাও, ‘কক্সবাজারে এক সন্ধ্যায়’, ‘নিষিদ্ধ পল্লীতে’, ‘প্রবাসের পঙক্তিমালা’, ও ‘মধ্যবয়স’।  সেই সময়’ কবিতাটি নস্টালজিক, কবি মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতির কথা মনে করছেন এভাবে :

শ্রাবণ তোমার/ শরীরে লিখেছে গল্প/ -তাঁর স্বাদ ভুলি নাই/

শত্রুসেনার সতর্ক চোখ এড়িয়ে/ তুমি এসেছিলে/ তিনটে

রাস্তা পেরিয়ে/ বৃষ্টিতে ভিজে ভিজে/ – ভুলি নাই/ সময়টা

ছিল যুদ্ধের/ কারফিউ চতুর্দিকে/বোকা, হাবা ও অবুঝদের/

দলে মিশে গিয়ে আমরা/ জ্ঞানী বুদ্ধের/ বাণীর বদলে বন্দুক/

নিয়েছি নির্দ্বিধায়/ – ভুলি নাই/ ক্রন্দন আর কল্লোল-ভরা/

এলো স্বাধীনতা, শান্তি/ এলো যুদ্ধশেষের ক্লান্তি/ তখন তোমাকে/

বলি নি কি ‘অপ্সরা/ সম্বল’ শুধু/ ‘তোমার মুখের কান্তি/ কিন্তু

তবুও দাও নি তো’ তুমি ধরা/ – ভুলি নাই

(সেই সময়, কাব্যগ্রন্থ : আমার চুম্বনগুলো পৌঁছে দাও)

 

অক্ষরমাত্রিক ছন্দের কাজ এই কবিতাটিতে দেখি। পয়ারের সাথে ছয় মাত্রার মাত্রাবৃত্তের মিশেলে দারুণ একটা রিদম তৈরি হয়েছে। কোথাও কোথাও আবার খানিক অন্ত্যমিল যেমন এড়িয়ে/পেরিয়ে দুলুনিটাকে আরও সুখকর করে তুলেছে। মধ্য ম্যানহাটনে শরতের উতল হাওয়ায় যখন খুলে যায় কোনো উর্বশীর চুল কবির তখন মনে পড়ে যায় বাংলার বৈশাখী ঝড়ের কথা। এতেই প্রমাণ হয় একটি মুহূর্তের জন্যেও আসলে এই চিরপরবাসীকবির মন তার দেশ ছেড়ে অন্য কোথাও থাকেনি। ‘তোমার জবার মতো চোখে রাঙা শ্রাবণের জল/ পালতোলা নৌকার মতন বাঁকাচোরা ঢেউয়ে ঢেউয়ে ক¤পমান/ তোমার বিপদগ্রস্ত স্তন/ আমি ভাবতে পারিনি কোনোদিন এতো অসাধারণ আগুন/ প্রলয় এবং ধ্বংস রয়েছে তোমার চুম্বনগুলিতে!/ হে নবীনা,/ আমার তামাটে তিক্ত ওষ্ঠের ও অবয়বের জন্যে/ যেসব চুম্বন জমে উঠবে সংগোপনে,/ তাদের ওপর থেকে আমার স্বত্বাধিকার আমি ফিরিয়ে নিলাম/আমাকে শীতের হাতে ছেড়ে দাও,/ স্বনির্বাচিত এই নির্বাসনে/ নেকড়ের দঙ্গলের মতো আমাকে ছিঁড়ে খাক বরফে জ্বলতে থাকা ঋতু/ শুধু তুমি,/আমার সংরক্ত চুম্বনের অন্তর্লীন আগুনগুলোকে/ পৌঁছে দাও শ্রাবনে আষাঢ়ে রোরুদ্যমান/ বিব্রত বাংলায়,/ বজ্রে বজ্রে বেজে উঠুক নতজানু স্বদেশ আমার। (আমার চুম্বনগুলো পৌঁছে দাও, কাব্যগ্রন্থ : আমার চুম্বনগুলো পৌঁছে দাও) জীবন স¤পর্কে বরাবরই হতাশ কবি শহীদ কাদরি, বিষণ্ণ শরতের মতোই।

তাইতো তিনি বলে ওঠেন, শূন্য সৈকতে তারা মাছের মৃত শরীরকে ধারণ করে/ অলৌকিক আভায় কী ভয়াবহ

সৌন্দর্যে ও শূন্যতায়/ ঝলমল করছে সোনালি বালি।/

আমরা পৌঁছে গেছি  এমন এক নতুন/

শতকেরদোরগোড়ায় যার ওপারে/

অচেনা সব রাজপথ, সমুদ্র সৈকত/

আর বালিয়াড়ি অপেক্ষা করছে/

কিন্তু আমি জানি, শামসুর রাহমান, আপনার কি আমার/

কিংবা ফজল বা/

আল মাহমুদের পদচিহ্ন পড়বে না সেখানে কোনোদিন।/ শুনুন/ আমার পিতা এই গ্রহের অরণ্যে এক দীর্ঘ দেবদারু,/

আমার মা কোনো এক উঠে যাওয়া বাগানের-/

শান্ত চন্দ্রমল্লিকা/ আর আমরা সবাই এখন শ্রাবন

রাত্রির হাওয়ার হাহাকার।/ আমরা কোথাও কেউ পৌঁছাব না।’ (কক্সবাজারে এক সন্ধ্যায়, কাব্যগ্রন্থ : আমার চুম্বনগুলো  পৌঁছে দাও)

 

রাষ্ট্র ব্যবস্থায় যখন সবকিছু নিষিদ্ধ হয়ে যায়, কবির মনের অবস্থাটা তখন কি দাঁড়ায়?

খাওয়া নয়। দাওয়া নয়। শোয়া নয়। বসা নয়।/ দেখা নয়। চিৎকার-চাঞ্চল্য নয়…

এমন কি/ ঝিঁঝিঁর  স্লোগান নয়, ছায়াচ্ছন্ন বৃক্ষলতার নিচে/ নিষিদ্ধ হয়েছে সমাবেশ শালিকের।

চলবে না/ দয়ালু মেঘের কাছে কোনো দাবী দাওয়া/ কেবল বৃষ্টির জন্যে। না, হাসি না,

হৈ বা হুল্লোড়?/ তা-ও না। হ্যাঁ, সব, সব, সব বন্ধ-হাঁটা, চলা,/ নড়া, চড়া কিংবা যখন-তখন,

যত্রতত্র হাওয়ার মতো/ স্বাধীন বোকামি নিয়ে বয়ে যাওয়া। নিষিদ্ধ, হ্যাঁ সব/

নিষিদ্ধ এখানে- গান, আজান, আহ্বান/ এমন কি দ¤পতি-রাত্রিতে

প্রেমিকের লিঙ্গের উত্থান।’ যেন কার্ফিউ জারি হয়েছে।

যে-সময়ে বা যে প্রেক্ষিতেই কবি লিখুন না কেন, সকল স্বৈরশাসকের গালেই এক মৃদু চপেটাঘাত এই কবিতা। কবি শহীদ কাদরীর প্রবাস জীবনের এক অনবদ্য কবিতা ‘প্রবাসের পঙক্তিমালা।’ পুরো কবিতাটিই এখানে উপস্থাপন করছি :

দ্যাখো, দ্যাখো কী চমৎকার একটা চড়–ই

কী দারুণ কিচিরমিচির করছে আজ মার্কিনী ভাষায় এই

মেঘভারানত

অন্তহীন দুপুরবেলায়! হে চড়ু্ই

আদলে গঠনে অবিকল তুমি দেখতে বাঙালি চড়ুইদের মতন

তোমার মুখে কি মানায় বন্ধু শ্বেতাঙ্গের এই বিবর্ণ,

বিদেশী ভাষা?

বরং এদিকে এসো, তোমাকে শেখাই

অ-আ-ক-খ

হে চড়ুই বলো, বাংলা বলো।

বাংলা, যার সব সোনা

গচ্ছিত রেখেছি আমি

নদীর জলের শব্দে, ছলছল বয়ে যাওয়া স্রোতে

ইলিশ ও রোহিতের চোখে, গীতবিতানের শ্লোকে শ্লোকে

আর বাতাসে  তরঙ্গ তোলা চিরচেনা মহিলার কালো চুলে,

চোখে ও চিবুকে।

হে কাক, হে কালো কাক! হঠাৎ কোত্থেকে তুমি এলে

এই বর্ণবাদী দেশে? তুমি জানো, এ রাজ্যে অশ্বেতাঙ্গের মূল্য

নেই কোনো;

এখানে কি? এ বিদেশে কেন?

যাও, যদি পারো, দাও উড়াল বাংলার দিকে

সেখানে মানাবে বেশ সিল্ক-মসৃণ তোমার কালো ডানা।

 

আফ্রিকাতে গেলেও আপত্তি নেই মোটে,

সে তো এশিয়ার সহোদর  আমাদেরই ভাই

কিন্তু এ কী শুরু করলে তুমি আমার কার্নিশে!

 

এ কেমন বেকায়দা বেঢপ ধরন? কেন এই চা-চা-চা,

টুইস্ট, হুপাহুপ নাচ।

কত্থক অথবা কথাকলি জানা নেই?

তাহলে মার্কিন নাগরিক তুমি? হে কাক। তুমিও?

অথচ দেখতে শুনতে তুমি হুবহু বাঙালী

কৈ এবং মাগুর মাছের মতো কালো।

 

হে মেঘ! পুঞ্জ পুঞ্জ মেঘ। তুমিও ঠকাবে নাকি

হে নিরুদ্দেশগামী?

কাউকে বিশ্বাস নেই আর এই বিরূপ বিদেশে।

তবু বলি : যদি পারো,

হে নন্দিত মেঘ তুমি নেমে এসো

ঘন ও নিবিড় হয়ে, করুণা ধারায় নেমে এসো

শ্রাবণে শ্রাবণে তুমি, হে বন্ধু স্পন্দিত করে দাও

এই অফুরান পরবাস।

 

এই কবিতায় কাক চড়ুই এবং মেঘের উপমায় তিনি পরবাসকে চিত্রিত করেছেন। কত্থক বা কথাকলির বদলে যখন কালো কাক টুইস্ট ও হুপাহুপ নাচে তখন আমরা একটি অস্তিত্বহীন, আইডেন্টিটি ক্রাইসিসে ভুগতে থাকা প্রজন্মকে চোখের সামনে দেখতে পাই। এটি সকল প্রবাসীর প্রতিদিনের দেখা দৃশ্য। তবুও হতাশ নন তিনি শেষ পর্যন্ত সপ্রেম দৃষ্টিতেই তাকিয়েছেন জীবন ও প্রবাসের দিকে, ও হে নন্দিত মেঘ তুমি নেমে এসো/ ঘন ও নিবিড় হয়ে, করুণা ধারায় নেমে এসো/ শ্রাবণে শ্রাবণে তুমি, হে বন্ধু স্পন্দিত করে দাও/ এই অফুরান পরবাস। পল্লীকবি জসীম উদদীনের শরতও বিরহী নারীর নয়নের জলে ভেজা। এখানেও আমরা বিচ্ছিন্নতা বা নির্বাসনের গন্ধ পাই। ‘গণিতে গণিতে শ্রাবণ কাটিল,/ আসিল ভাদ্র মাস,/ বিরহী নারীর নয়নের জলে/ ভিজিল বুকের বাস।’

মিডল এইজ ক্রাইসিস বলে ইংরেজিতে একটি কথা প্রচলিত আছে । এই সময়ের নানান টানাপড়েনের একটি হলো পরপারের ডাক শুনতে পাওয়া। কেবলই মনে হয়, হায়, বেলা বুঝি যায়, বুঝি ফুরিয়ে এসেছে দিন। দিন ফুরোনোর ঘণ্টাধ্বনি তিনিও বাজাতে চেয়েছেন “মধ্যবয়স” কবিতাটিতে। “সারাদিন বসে এসব কি ছাইপাঁশ,/ লেখালেখি করো তুমি!/ যদি পারো ভাই নতুন কবরখানায়/ কিনে রাখো কিছু ভূমি।”

কবি শহীদ কাদরী জন্মেছেন শরতের প্রথম দিনে। হয়ত সে কারণেই নিজের অজান্তেই তার কবিতায় শরতের বিষাদ ক্ষণে ক্ষণেই এসেছে। এই বিষাদের সুদীর্ঘ চাদর ফুঁড়ে প্রায়শই তারার ম্রিয়মাণ আলোর মতো ফুটে উঠেছে প্রত্যাশার প্রদীপ। সেই আলোয় আমরা সুস্পষ্টই দেখতে পাই শরতের স্নিগ্ধ মুখটি, যেমন ইংলিশ কবি জন ডান বলেছেন, ‘কোনো বসন্ত বা গ্রীষ্ম নয়, শরতের মুখ যেন ঈশ্বরের অপার অনুগ্রহ, অনিন্দ্য সুন্দর।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares