অনুবাদ নাটক : ক্র্যাপের শেষ টেপ : স্যামুয়েল বেকেট : অনুবাদ : মুম রহমান

নাট্যকার প্রসঙ্গে :

[স্যামুয়েল বার্কলে বেকেট সারা বিশ্বে স্যামুয়েল বেকেট নামেই পরিচিত এবং মূলত নাট্যকার হিসেবে অধিক পরিচিত। আইরিশ এই লেখক জীবনের বেশিরভাগ সময় কাটিয়েছেন প্যারিসে। লিখতেন ইংরেজি এবং ফরাসি ভাষাতে। কখনও নিজের লেখা নাটক ফরাসি থেকে ইংরেজিতে অনুবাদ করতেন, উল্টোটাও করতেন কখনও। আপাত-ভীষণ রকমের দুর্বোধ্য, একঘেঁয়ে তার রচনাশৈলী। নাট্যকার হিসেবে পরিচিত হলেও তার কাজের ক্ষেত্র ব্যাপক বিস্তৃত। উপন্যাস, কবিতা, সাহিত্য সমালোচনা থেকে শুরু করে মঞ্চ নাটক, টিভি নাটক, রেডিও নাটক, চলচ্চিত্র নির্মাণও করেছেন। তার ওয়েটিং ফর গডো নাটকটি বিশ্ব নাটকে কিংবদন্তি হিসেবে পরিচিতি পায়। অথচ প্রথম রজনীতে আঙুলে গোনা কয়েকজন দর্শক শেষ পর্যন্ত নাটকটি দেখেছে। আজকের পৃথিবীতে বিশ্বব্যাপী বহুদেশে আর ভাষায় এটি অনূদিত ও মঞ্চস্থ হয়েছে। এমনকি বাংলাদেশে, বাংলা ভাষাতেও এ নাটকের একাধিক অনুবাদ ও মঞ্চায়ন হয়েছে। জর্জ বার্নার্ড শ, অস্কার ওয়াইল্ড, ইয়েটস, জেমস জয়েসের মতো আইরিশ কবি-সাহিত্যিকদের সঙ্গে বেকেটের নামও উচ্চারিত হয়। তার সাহিত্যভাবনা থেকেই বিশ্ব সাহিত্যে এবসার্ড নাট্যতত্ত্ব তৈরি হয়েছে। মূলত আপাত উদ্ভট, খামখেয়ালিপনা এ সাহিত্যের লক্ষণ। বেকেটের নাটকে একই কথার পুনরাবৃত্তি, একঘেঁয়ে আর উদ্ভট-আচার আচরণ পাওয়া যায়। আদতে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর মানুষের জীবনের অর্থহীনতা তাকে আলোড়িত করে। এই যে এত আয়োজন, অর্থ সঞ্চয়ন, জীবনে জ্ঞান অর্জন সব কিছুই মুহূর্তে অর্থহীন করে দিতে পারে বিমান থেকে ফেলা একটা বোমা। সাজানো একটা জীবন, একটা পরিবার এমনকি একটা দেশও মুহূর্তে তছনছ হয়ে যায়। মানুষের জীবন ও কর্মকাণ্ডের অর্থহীনতা তাকে ব্যথিত করে। তবে তিনি সরস কৌতুক আর উদ্ভূত ভঙ্গিমার মাধ্যমেই অর্থহীনতাকে তুলে ধরেন। এখানে যে নাটকটি আছে ক্র্যাপ’স লাস্ট টেপ সেই নাটকটিকে আজকের দিনের করোনা প্রেক্ষিতে পাঠ করা যেতে পারে। বেকেটের অন্যান্য নাটকের মতো এখানেও পৃথিবীর সমাপ্তি বা ধ্বংস হয়ে যাওয়ার পরের কথা আছে। তবে বেকেট শেষ পর্যন্ত কেবল বিষাদ, বেদনার কথা বলেন না। বরং তার লেখায় কোথায়-জানি মানবসভ্যতার নির্বুদ্ধিতার পাশাপাশি মানবের জয়গানও আছে। আপাত জটিল, কুটিল, দুর্বোধ্য বেকেটীয় নাটক মনোযোগ দিয়ে পাঠ করলে পাঠক, দর্শক উপকৃতই হন। বেকেটের নাটক উপভোগে লাগে বাড়তি মনোযোগ।]

ভবিষ্যতের কোনও এক শেষ বিকাল।

ক্র্যাপের কুঠুরি।

সামনে কেন্দ্রে একটা ছোট্ট টেবিল, যার দুটো ড্রয়ারই দর্শকদের দিকে খোলে।

টেবিলে বসে আছে, সামনের দিকে মুখ দিয়ে, যেন ড্রয়ারের অপর প্রান্তে, এক ক্লান্ত বৃদ্ধ : ক্র্যাপ।

জরাজীর্ণ কালো ট্রাউজার পরে আছে যা তার জন্যে খুব ছোট। জীর্ণ কালো হাতাবিহীন ওয়েস্টকোট, চারটা প্রশস্ত পকেট। ভারী রূপার ঘড়ি আর চেইন। নোংরা সাদা শার্ট গলার কাছে খোলা, কলার নেই। বিস্ময়কর এক জোড়া নোংরা সাদা বুট, কমপক্ষে ১০ সাইজের, ভীষণ সরু আর চোখা মুখ।

সাদা মুখ। বেগুনি নাক। অগোছালো ধূসর চুল। না-কামানো দাড়ি।

কাছের জিনিস দেখতে পায় না (চশমা ছাড়া)। কানেও প্রায় শোনে না।

কণ্ঠস্বর ভাঙা। বৈশিষ্ট্যমূলক স্বরভঙ্গি।

কষ্ট করে হাঁটে।

টেবিলের ওপর একটা টেপ-রেকর্ডার সঙ্গে মাইক্রোফোন এবং একাধিক কার্ডবোর্ডের বাক্স ভর্তি রেকর্ড করা টেপ।

টেবিল এবং একেবারে তার নিকটবর্তী অংশতে তীব্র সাদা আলো। বাকি মঞ্চ অন্ধকার।

এক মুহূর্তে ক্র্যাপ নিথর, বিশাল একটা দীর্ঘশ্বাস নেয়, তার ঘড়িতে তাকায়, পকেট হাতড়ায়, একটা খাম বের করে আনে, এটিকে আবার আগের জায়গায় রাখে, হাতড়ায়, ছোট একগোছা চাবি বের করে, চোখের সামনে তুলে ধরে, একটা চাবি বেছে নেয়, ওঠে  এবং সামনের টেবিলের দিকে যেতে থাকে। সে থামে, প্রথম ড্রয়ারটার তালা খোলে, এর ভেতরে উঁকি মারে, এর ভেতরটায় হাত দেয়, এক রিল টেপ বের করে এর মধ্যে উঁকি দেয়, ফিরিয়ে রাখে, ড্রয়ারে তালা মারে, দ্বিতীয় ড্রয়ারের তালা খুলে তাতে উঁকি দেয়, এর ভেতরটায় হাত দেয়, একটা বড় কলা বের করে আনে, সেটাকে উঁকি দিয়ে দেখে, ড্রয়ারে তালা দেয়, চাবি পকেটে ঢুকিয়ে রাখে। সে ঘোরে, মঞ্চের প্রান্তের দিকে আগায়, থামে, কলাটায় টোকা দেয়, কলা ছিলে ফেলে, ছালটা পায়ের কাছে ফেলে, পুরো কলাটার মাথাটা মুখে পোরে এবং নিথর হয়ে যায়, তার সামনের দিকে ভাবলেশহীন তাকিয়ে থাকে। শেষ পর্যন্ত কলার শেষটায় কামড় দেয়, একপাশে ঘোরে এবং মঞ্চের প্রান্তের দিকে পায়ে পায়ে আগু-পিছু করতে থাকে, আলোর দিকে, তবে চার-পাঁচ পা-এর বেশি কোনও দিকেই নয়, ধ্যানীর মতো কলা খেতে থাকে। কলার খোসায় পা ফেলে, প্রায় পড়েই যায়, নিজেকে সামলে নেয়, থামে এবং কলার খোসাটায় উঁকি দেয় এবং শেষে এটা ঠেলে দেয়, এখনও ঝুঁকে আছে, পা সামনে দিয়ে মঞ্চের প্রান্ত থেকে খাদের দিকে আসতে থাকে। সে দুলতে থাকে, কলাটা শেষ করে, টেবিলে ফিরে আসে, বসে, এক মুহূর্ত নিথর হয়ে থাকে, একটা বড় দীর্ঘশ্বাস নেয়, পকেট থেকে চাবি বের করে, সেগুলোকে চোখের সামনে ধরে, চাবি বেছে নেয়, ওঠে এবং সামনের টেবিলে যায়, দ্বিতীয় ড্রয়ারের তালা খোলে, আরেকটা বড় কলা বের করে, সেটাতে তাকিয়ে থাকে, ড্রয়ারে তালা দেয়, চাবি পকেটে রেখে দেয়, ঘোরে, মঞ্চের প্রান্তের দিকে আগায়, থামে, কলায় টোকা দেয়, ছিলে ফেলে, খাদের দিকে ছাল উড়িয়ে মারে, কলার শুরুটা মুখের মধ্যে পোরে এবং নিথর হয়ে থাকে, এবং তার সামনের দিকে ভাবলেশহীন তাকিয়ে থাকে। 

শেষতক সে একটা বুদ্ধি খুঁজে পায়, তার ওয়েস্টকোটের পকেটে কলা রাখে, শেষ প্রান্তটা বেরিয়ে থাকে এবং সে তার পক্ষে যতটা দ্রুত সম্ভব তত দ্রুত মঞ্চের পেছনে অন্ধকারে যায়। দশ সেকেন্ড। সজোরে একটা ছিপি খোলার শব্দ। পনের সেকেন্ড। সে একটা পুরনো খেরোখাতা নিয়ে আলোতে ফিরে আসে এবং টেবিলে বসে। সে টেবিলে খেরো খাতাটা রাখে, নিজের মুখ মোছে, তার ওয়েস্টকোটের সামনে নিজের হাতগুলোও মোছে, হাতগুলো বেশ চৌকসভাবে একত্র করে এবং ঘষে।

ক্র্যাপ :

(কর্মচঞ্চলভাবে) আহ! (সে খেরোখাতার দিকে ঝোঁকে, পাতা উল্টায়, তার কাক্সিক্ষত পাতাটি উল্টায়, পড়ে) বাক্স … তিইন … তিন… স্পুল… পাঁচ। (সে মাথা তোলে, সামনের দিকে দেখে, তৃপ্তির সঙ্গে) স্পুল! (বিরতি) স্পুউউল! (সুখের হাসি। বিরতি। সে টেবিলের সামনে ঝোঁকে, উঁকি দেয় এবং বাক্সগুলোতে খোঁচা দেয়।) বাক্স … তিইন … তিন… চার … দুই …. (বিস্ময়ের সঙ্গে) নয়! হা খোদা! …সাত … আহ্! ক্ষুদে বদমাইশ! (সে বাক্সটা তোলে, এর ভেতরে উঁকি দেয়।) বাক্স তিন। (সে এটাকে টেবিলের ওপর রাখে, খোলে এবং ভেতরের স্পুলে উঁকি দেয়।) স্পুল। (সে খেরোখাতায় উঁকি দেয়।) …পাঁচ… পাঁচ … আহ! ক্ষুদে বদমাইশ! (সে একটা স্পুল বের করে, সেটার দিকে উঁকি দেয়।) স্পুল পাঁচ। (সে এটাকে টেবিলের ওপর রাখে, বাক্স তিন বন্ধ করে, এটাকে অন্যগুলার সঙ্গে সরিয়ে রাখে, স্পুলটা হাতে নেয়।) বাক্স তিন, স্পুল পাঁচ। (সে মেশিনের ওপর দিয়ে ঝোঁকে, ওপরে দেখে। তৃপ্তির সঙ্গে।) স্পুউউল! (সুখের হাসি। সে ঝোঁকে, মেশিনে স্পুল ভরে, নিজের হাত ঘষে।) আহ! (সে খেরোখাতায় উঁকি দেয়, পাতার নীচের দিকে পড়ে।) শেষ পর্যন্ত মা শান্তি শয্যায় … হু, … কালো বল … (সে মাথা উঠায়, শূন্য দৃষ্টিতে সামনে তাকায়। বিভ্রান্ত) ব্ল্যাক বল ? … (সে আবার খেরোখাতায় উঁকি দেয়, পড়ে।) কালো সেবিকা… (সে মাথা উঠায়, চিন্তিত, আবার খেরোখাতায় উঁকি দেয়, পড়ে।) পরিপাকের সামান্য উন্নতি … হুম … স্মরণীয়… কী ? (সে আরও কাছে উঁকি দেয়।) সম দিনরাত্রি, স্মরণীয় সম দিনরাত্রি। (সে মাথা উঠায়, শূন্য দৃষ্টিতে সামনে তাকায়। বিভ্রান্ত) সম দিনরাত্রি, স্মরণীয় সম দিনরাত্রি ? … (বিরতি। সে কাঁধ ঝাঁকায়, আবার খেরোখাতায় উঁকি দেয়, পড়ে।) বিদায় তোমাকে―(সে পৃষ্ঠা উল্টায়)―ভালোবাসা।

সে মাথা তোলে, চিন্তিত, মেশিনের উপর ঝোঁকে, মেশিন চালু করে এবং শোনার ভঙ্গিতে থাকে, যেমন সামনে ঝুঁকে থাকে, টেবিলে কনুই, মেশিনের পাশে কান পাতে, মুখ সামনে।

টেপ :

(দৃঢ় কণ্ঠ, বরং সুর্নিদিষ্ট, পরিষ্কারভাবে ক্রেপারেরই আরও অনেক আগের কণ্ঠস্বর)। আজ উনচল্লিশ, শব্দটা যেন … (নিজেকে আরও আরামদায়ক অবস্থায় নিয়ে বসে, সে টেবিলের একটা বাক্সে টোকা দেয়, অভিসম্পাত করে, সুইচ বন্ধ করে, বাক্সগুলোকে অদলবদল করে, আবেগপূর্ণভাবে মেঝেতে হিসাব করে, টেপের ফিতাকে আগের জায়গায় নিয়ে যায়, সুইচ দেয়, আগের ভঙ্গিতে ফিরে যায়।) আজ উনচল্লিশ, এক ঘণ্টার মতো শোনা যায়, আমার পুরনো দুর্বলতাগুলো ছাড়া, বুদ্ধিগতভাবে আমার এখন যথেষ্ট কারণ আছে সন্দেহ করার … (দ্বিধান্বিত)… ঢেউয়ের চূড়া … কিংবা কাছাকাছি কিছু। উদযাপন করে সেই ভয়াবহ উৎসব, যেমন সাম্প্রতিক বছরগুলোতে, শান্তভাবে পানশালায়। আত্মা নয় কোনও। আগুনের সামনে বসেছিল চোখ বন্ধ করে, তুষ থেকে আলাদা করছিল শস্য দানা। কিছু মন্তব্য লিখে রাখছিল, একটা ইনভেলপের পেছনে। উত্তম ছিল আমার নিজের কুঠুরিতে নিজের ছেঁড়া কাপড়ের কাছে ফিরে আসা। বলতে খেদ হয় যে আমি তিনখানা কলা খেয়ে ফেলেছিলাম আর চার নাম্বারটির ক্ষেত্রে সংযত করে ছিলাম নিজেকে। আমার অবস্থানের লোকের জন্যে এটা মারণঘাতী। (তীব্রভাবে।) ওদের কেটে ফেলো। (নীরবতা।) টেবিলের উপর নতুন আলোটা যথেষ্ট উন্নতির চিহ্ন। চারপাশের এই সব অন্ধকার নিয়ে আমি কম নিঃসঙ্গ বোধ করি। (নীরবতা।) এক অর্থে। (নীরবতা।) আমি ভালোবাসি উঠে দাঁড়াতে আর এর মধ্যে ঘুরতে, তারপর আবার এখানে ফিরে আসতে … দ্বিধান্বিত) … আমি। (নীরবতা।)  ক্র্যাপ।      

(নীরবতা।)

শস্য, এখন আমি তাদের দ্বারা কী বোঝাতে চাই, আমি বলতে চাই, আমি বোঝাতে চাই… (দ্বিধায় পড়ে) … আমি ধারণা করি আমার মনে হয় যখন সেই সব জিনিসগুলো আছে তারা মূল্যবান যখন সবই ধূলো হয়ে আছে―যখন আমার সমস্ত ধূলিকণারা স্থির  হয়ে আছে। আমি আমার চোখ বন্ধ করি আর চেষ্টা করি আর তাদেরকে কল্পনা করি।

(নীরবতা)।

(ক্র্যাপ তার চোখ একটু বন্ধ করে।)

এই সন্ধ্যায় ব্যতিক্রমী নীরবতা, আমি কান পেতে রই কিন্তু কোন শব্দ শুনি না। বুড়ি মিস ম্যাকগ্লোম সদাই এই সময়টায় গান গায়। কিন্তু আজ রাতে নয়। তার মেয়েবেলার গান, সে বলত। তাকে মেয়ে হিসাবে ভাবা খুব কঠিন। অসাধারণ নারী, যদিও সে। কন্নাট (ঈড়হহধঁমযঃ)১ আমি কল্পনা করি। (নীরবতা।) যখন আমি তাঁর বয়সে যাব তখন কি আমিও গান গাইব, যদি কখনও সে বয়সে পৌঁছাই ? না। (নীরবতা।) আমি কি একটা বালকের মতো করে গাইব ? না। (নীরবতা।) আমি কি কখনও গাইব ? না।

(নীরবতা।)

নেহাত একটা পুরনো বছরের কথা শুনছিলাম, এলোমেলো অধ্যায় পাঠ। আমি বই দেখি নাই, কিন্তু এটা নিশ্চয়ই ১০ কিংবা ১২ বছর আগের কথা। মনে হয় সেই সময়ের কথা যখন আমি কেদার স্ট্রিটে বিয়ানকার সঙ্গে মাঝে-সাঝে থাকতাম। বেশ, তার বাইরে, উহ যিশু! আশাহীন কাজকর্ম। (বিরতি) তার সম্পর্কে বেশি কিছু বলার নেই কেবল তার চোখদুটোর প্রতি শ্রদ্ধা। দারুণ উষ্ণ ছিল। আমি আকস্মিক সেখানে ছিলাম। (নীরবতা)। অতুলনীয়! (বিরতি) আহ … বেশ… (বিরতি) এইসব পুরনো পি.এম.গণ জঘন্য, কিন্তু আমি প্রায়শই তাদের পাই… (ক্র্যাপ সুইচ বন্ধ করে, গভীরভাবে ভাবে, সুইচ দেয়) নতুন কাজে ঝাঁপিয়ে পড়ার আগে একটু সাহায্য … (দ্বিধান্বিত)… অতীত রোমন্থন। বিশ্বাস করতে কষ্ট হয় আমি কখনও অতটা তরুণ শাবক ছিলাম। কণ্ঠস্বরটি! যিশু! আর সেই শ্বাসাঘাত! (সংক্ষিপ্ত হাসি যে হাসিতে ক্র্যাপও যোগ দেয়) আর সেই প্রত্যয়! (সংক্ষিপ্ত হাসি যে হাসিতে ক্র্যাপও যোগ দেয়) বিশেষ করে কম পান করার প্রত্যয়। (ক্র্যাপের একক সংক্ষিপ্ত হাসি) পরিসংখ্যান। সতেরশ ঘণ্টা, পূর্ববর্তী আট হাজার বেমানান ঘণ্টা, পান করে গেছে লাইসেন্স প্রাপ্ত স্থানে একাই। ২০ শতাংশ কিংবা বলা যায় ৪০ শতাংশ তার বেঁচে থাকার, জেগে থাকার সময় জুড়ে। (বিরতি) কমের জন্যে পরিকল্পনা করা… (দ্বিধান্বিত) … মনোরম যৌন জীবন। তার বাবার শেষ অসুস্থতা। সুখের পতাকার খোঁজে। অসাধ্য মল ত্যাগ। সে যেটাকে তারুণ্য বলে তার প্রতি তাচ্ছিল্য আর ঈশ্বরকে ধন্যবাদ যে সেটা কেটে গেছে (নীরবতা)। আজারাই ঘণ্টা বাজে (নীরবতা)। বিরাট কর্মের ছায়া… সাহিত্য কর্ম। সমাপ্তি ঘটে একটা … (সংক্ষিপ্ত হাসি) … দৈবের উপর তীক্ষè চিৎকার। (দীর্ঘ হাসি যেটার সঙ্গে ক্র্যাপও যোগ দেয়)। সেই সব দুর্দশার আর কীইবা বাকি আছে ? জীর্ণ সবুজ কোট পরে একটি মেয়ে রেলস্টেশনের প্লাটফর্মে ? না ? (নীরবতা)।

যখন আমি তাকাই …

ক্র্যাপ সুইচ বন্ধ করে, চিন্তিত, তার ঘড়ি দেখে, ওঠে, মঞ্চের পেছনে অন্ধকারে যায়। দশ সেকেন্ড। বোতলের কর্ক খোলার শব্দ হয়। দশ সেকেন্ড। দ্বিতীয় কর্ক খোলার শব্দ। দশ সেকেন্ড। তৃতীয় কর্ক খোলার শব্দ। দশ সেকেন্ড। সংক্ষিপ্ত হেড়ে গলার গান।

ক্র্যাপ (গায়) :

এখন দিন হয়ে গেছে পার

রাত্রি আঁকছে রাত্র…ই,

ছায়ারা…

আকস্মিক কাশি দিতে থাকে। সে আবার আলোতে ফিরে আসে, বসে, মুখ মোছে, সুইচ দেয়, আবার শোনার জন্য প্রস্তুত হয়।

টেপ :

… ফিরে আসি সেইসব বছরগুলোতে যেগুলো চলে গেছে, আমি যা আশা করি হয়ত তা পুরনো চোখের ঝিলিক, অবশ্যই সেখানে খালের পাড়ে বাড়িটি ছিল যেখানে মা শুয়ে আছে … মারা যাচ্ছে … হেমন্তের কালে … তার দীর্ঘ বৈধব্যের পর (ক্র্যাপ আবার টেপটা শুরু করতে নেয়) আর তারপ… (ক্র্যাপ সুইচ বন্ধ করে দেয়, টেপটাকে আরেকটু পেছনে টেনে দেয়, তার কানটাকে রেকর্ডারের আরও কাছে আনে, সুইচ অন করে) … আ … মৃত্যু, তার দীর্ঘ বৈধব্যের পর আর তারপর …

ক্র্যাপ সুইচ বন্ধ করে, তার মাথা তোলে, নিজের সামনের দিকে শূন্য চোখে তাকায়। তার ঠোঁট নড়ে ‘বৈধব্য’ কথাটির সাথে। কোন শব্দ করে না। সে ওঠে, মঞ্চের পেছনে অন্ধকারে যায়, ফিরে আসে বিশাল একটা অভিধান হাতে নিয়ে, ওটাকে টেবিলের ওপর শোয়ায়, বসে আর শব্দ খুঁজতে থাকে।

ক্র্যাপ :

(অভিধান থেকে পড়তে থাকে) স্বামী হারানোর অবস্থা, বিধবাকাল, বিধবা হওয়ার পর … বৈধব্য (ওপরে থাকায়, তাকে বিভ্রান্ত মনে হয়) অবস্থা নাকি কাল ? নাকি ? … (নীরবতা। আবার কুটিল চোখে অভিধান দেখে) ‘গভীর শোক বৈধব্যের কারণে’… প্রাণীকুলেও, বিশেষত পক্ষীকুলে… বিদুয়া, বিধু, য়া, পাখি… কালো পাখি… (সে মজা পায়) বিদুয়া নামে পাখি আছে, ইংরেজিতে… কালো পুরুষ পাখি… (বিরতি) সে অভিধান বন্ধ করে, সুইচ বন্ধ করে, আবার শোনার ভঙ্গিতে তৈরি হয়।

টেপ :

বাঁধের পাশে বসে থাকি যেখান থেকে তার জানালা দেখতে পাই। ওইখানে আমি বসেছিলাম, কনকনে বাতাসের কামড়ে, আশা করছিলাম, সে চলে গেছে। (বিরতি) কদাচ একটা প্রাণের খোঁজ পাই, সবই গতানুগতিক প্রাণ, সেবিকা, বৃদ্ধ, কুকুর। আমি তাদের সবাইকে বেশ চিনতে পারি―ওহ, মানে চেহারায় আর কি! এক কৃষ্ণ কালো সুন্দরী. বিশেষ করে আমার মনে পড়ছে পুরোটা মাড় দেওয়া সাদা পোশাক, অতুলনীয় বুক, একটা বড় কালো ঢাকনাঅলা পেরামবুলেটর সহ, সবচেয়ে শোকাবহ তা। যখনই আমি তার দিকে তাকিয়েছি দেখেছি সে আমার দিকেই চোখ রেখেছে। আর তবু যখন আমি যথেষ্ট দৃঢ় ছিলাম তার সাথে কথা বলার মতো তখনও পরিচিতি হয়নি―সে পুলিশ ডাকার হুমকি দিয়েছিল। ভাবটা এমন যে আমি তার সতীত্ব নষ্ট করার নকশা করছি।      

(হাসি। নিরবতা) যে চেহারা তার ছিল! চোখগুলো! যেন … (ইতস্তত করে)… সবুজ গোমেদ পাথর! (বিরতি) আহ বেশ… (বিরতি) আমি সেখানে ছিলাম যখন… (ক্র্যাপ সুইচ বন্ধ করে, গভীর ধ্যান করে, আবার সুইচ দেয়)―অন্ধটি নিচে নেমে গিয়েছিলো, সেই সব নোংরা বাদামি পর্দার ফলাফল, ছোট্ট সাদা কুকুরটি একটু বল ছুড়ে দিয়েছিল, যে মুহূর্তেই সুযোগ পেয়েছে। আমি ঘটনাক্রমে তাকিয়ে দেখলাম ওইখানে এইসব ঘটছে। সব হয়েছে গেলে, শেষতক। আমি কয়েক মুহূর্তের জন্য বসে বল হাতে বল নিয়ে বসে ছিলাম আর কুকুরটা আমার দিকে ঘেউ ঘেউ করছিল আর থাবা মেরে আসছিলো। (বিরতি) মুহূর্ত। তার মুহূর্ত, আমার মুহূর্ত। (বিরতি) কুকুরের মুহূর্ত। (বিরতি) শেষে আমি এটা ওর কাছ থেকে নিলাম আর ওর মুখে গুজে দিলাম, ধীরে, ধীরে। একটা ছোট্ট, পুরনো, কালো, শক্ত রাবারের বল। (বিরতি) আমার মৃত্যুর আগ পর্যন্ত আমি হয়ত এটাকে আমার হাতের মুঠিতে অনুভব করব। কিন্তু আমি এটা কুকুরটাকে দিয়েছিলাম।

(বিরতি)

আহ বেশ …

(বিরতি) আধ্যাত্মিকভাবে একটা নিগূঢ় অন্ধকারে বছর এবং ক্ষমা মিলল মার্চের শেষে এসে জেটির শেষপ্রান্তে, আর্তনাদময় বাতাসে, কখনও ভুলবার নয়, যখন আমি আকস্মিক পুরো জিনিসটা দেখেছিলাম। অবশেষে, দৃষ্টিখানি। এই বিলাসের কথা আমি মূলত আজ সন্ধ্যায় রেকর্ড করছি, দিনের শেষে যখন আমরা কাজ শেষ হয়ে গেছে আর হয়ত আমার স্মৃতি আর কোন জায়গা নেই, ঠাণ্ডা কিংবা গরম, সেই অলৌকিকের জন্যে … (ইতস্তত করে) সেই আগুন যা সব কিছুকে ঠিকঠাক করে দিয়েছিল। তখন অকস্মাৎ আমি যা দেখেছিলাম তা হলো, যে বিশ্বাস নিয়ে আমি আমার সারাজীবন পার করছিলাম, যেমন―(ক্র্যাপ অস্থিরভাবে টেপটা বন্ধ করে দেয়, টেপটাকে সামনে টানে, আবার সুইচ দেয়)―বিশাল গ্রানাইট পাথরে বাড়ি খেয়ে ঢেউয়ের ফেনা উড়ছিল বাতিঘরের আলোতে আর বাতাস ঘুরপাক খাচ্ছিলো একটা প্রপেলারের মতো, আমার কাছে অবশেষে পরিষ্কার হলো যে আমি সবসময় অন্ধকারকে অভ্যন্তরে চাপা রাখতে চেয়েছি তা বাস্তবের আড়ালেই আছে―(ক্যাপ অভিশাপ দেয়, সুইচ বন্ধ করে, টেপকে সামনে টানে, আবার সুইচ দেয়)―ভঙ্গুরহীন চক্র ততক্ষণ পর্যন্ত যতক্ষণ না আমি ভেঙে পড়ছি ঝরে আর উপলব্ধির আলোতে জেগে ওঠা রাত আর আগুনের উপলব্ধি। (ক্র্যাপ জোরে অভিশাপ দেয়, সুইচ বন্ধ করে, টেপকে সামনে টানে, আবার সুইচ দেয়)―আমার মুখখানি তার বুকে আর আমার হাত তার শরীরে। আমরা শেখানে শুয়েছিলাম, কোনও নাড়াচাড়ি করিনি। কিন্তু আমাদের নিচে সবকিছু নড়ছিল, ধীরে, ওপরে আর নীচে, একপাশ থেকে আরেক পাশে।

(নীরবতা)

মধ্যরাত পার হয়ে গেলো। এমন নিস্তব্ধতা কখনও দেখিনি আগে। পৃথিবী নিশ্চয়ই বসতিহীন হয়ে গেছে। 

(বিরতি)

এইখানে আমি শেষ করি।

(ক্র্যাপ সুইচ বন্ধ করে, টেপকে পেছনে টানে, আবার সুইচ দেয়)

লেকের ওপরে, সেই ছোট্ট লগি-বাওয়া নৌকাসহ, তীরে স্নান বন্ধ, তারপর স্রোতে চলে যায় আর ভাসতে থাকে। সে নৌকার পাটাতনে শুয়ে আছে হাতদুটো মাথার নীচে রাখা আর চোখ বন্ধ। সূর্য নিচে জ্বলজ্বলে, মৃদু বাতাস আর জল ছিল শান্ত আর প্রাণবন্ত। আমি তার ঊরুতে একটা দাগ দেখলাম, ওকে জিজ্ঞাস করলাম, কেমন করে ওটা হলো। বড়ই তুলতে গিয়ে, সে বলল। আমি আবার বললাম, এটা নিশ্চয় আশাহীন আর ভালো কিছু ঘটেনি আর সে মেনে নিলো, তার চোখ না-খুলেই। (বিরতি) আমি ওকে আমার দিকে তাকাতে বললাম, আর কয়েক মুহূর্ত পর (বিরতি) আর কয়েক মুহূর্ত পর সে তাকালো, তবে চোখগুলো কোনও রকম পিটপিট করল কারণ সূর্যের ঝলমলে আলো। আমি ওর উপর ঝুঁকে এলাম যেন সূর্যের আলো চোখে না পড়ে, ছায়া পড়ে আর সে চোখ খুলল (বিরতি) আমাকে আসতে দাও। (বিরতি) আমরা পতাকাগুলোর মাঝখান দিয়ে ভাসলাম আর আটকে গেলাম। যেভাবে তারা নীচে চলে গেল, দীর্ঘশ্বাস ছাড়তে ছাড়তে যেন বোটা থেকে খসে গেল। (বিরতি) আমি তার ওপর শুয়ে ছিলাম, আমার মুখ ছিল তার বুকে আর হাত ছিল শরীরে। আমরা কোন নড়াচড়া না-করেই সেখানে শুয়ে ছিলাম। সেখানে কোন রকম  কিন্তু আমাদের নিচে সবকিছু নড়ছিল, ধীরে, ওপরে আর নীচে, একপাশ থেকে আরেকপাশে।

(বিরতি)

মাঝরাত পার হয়ে গেছে। কখনও জানতে পারিনি―

(ক্র্যাপ সুইচ নেভায়, ধ্যান করে। অবশেষে তার পকেট হাতড়ায়, একটা কলার সাক্ষাৎ পায়, ওটাকে বের করে, ওর দিকে কুটিলভাবে তাকায়, আবার ওটাকে ফিরিয়ে রাখে, তালগোল পাকিয়ে যায় যেন, একটা খাম বের করে আনে, আবার তালগোল হারানোর মতো করে হাতড়ায়, খামটা ফিরিয়ে রাখে, তার ঘড়ির দিকে দেখে, ওঠে। মঞ্চের পেছনে অন্ধকারে চলে যায়। দশ সেকেন্ড। বোতল আর গ্লাসের টুংটাং শব্দ। তারপর সংক্ষিপ্ত পানি ঢালার শব্দ। দশ সেকেন্ড। সে ফিরে আসে আলোতে, সামান্য টলমল করছে, টেবিলের সামনে যায়, চাবি বের করে, ওগুলোকে চোখের সামনে ধরে, চাবি বাছাই করে, প্রথম ড্রয়ারটা খোলে, ওর ভেতরে তাকায়, ভেতরটা অনুভব করার চেষ্টা করে, রিল বের করে, সেটার দিকে তাকায়, ড্রয়ার বন্ধ করে, চাবিগুলো তার পকেটে রাখে, গিয়ে বসে, রিলে চালানোর মেশিনটা নেয়, ওটাকে ডিকশনারির উপর রাখে, নতুন রিল ভরে, পকেট থেকে খামটা বের করে, খামের পেছনটা পড়ে, ওটাকে টেবিলে রাখে, সুইচ অন করে, গলা পরিষ্কার করে এবং রেকর্ড করা শুরু করে।)

ক্র্যাপ :

এই আহাম্মক জারজটার কথা শুনতে শুনতে আমি নিজেকে তিরিশ বছর আগের জায়গায় নিয়ে গেছে, বিশ্বাস করাও কঠিন আমি সবসময়ই এমন খারাপ ছিলাম।  ঈশ্বরকে ধন্যবাদ, শেষতক সবকিছু হলো। (বিরতি) যে চোখ তার ছিলো! (ধ্যান করে, অনুধাবন করে সে রেকর্ড করছে, সুইচ বন্ধ করে, ধ্যান করে। অবশেষে বলে) সবকিছু সেইখানে, সবকিছু―সকল―(অনুধাবন করে সে রেকর্ড বাটন চাপেনি, সুইচ দেয়) সবকিছু সেখানে, সবকিছুই যেন এই পুরনো কাদার গোলকে২, সব আলো আর অন্ধকার আর দুর্ভিক্ষ আর ভোজ উৎসব … (ইতস্তত করে) … বয়সগুলো! (চিৎকার করে) হ্যাঁ! (বিরতি) ওটাকে যেতে দাও! যিশু! ওর মনকে হোমওয়ার্ক থেকে সরিয়ে দাও! যিশু! (নীরবতা। দুশ্চিন্তাগ্রস্ত) আহ, বেশ, হয়ত সে ঠিক বলেছিল। (ধ্যানস্থ। অনুধাবন করে। সুইচ বন্ধ করে। খামটা দেখে) হাহ্্! (এটাকে কুচকে ভাঁজ করে আর দূরে ছুড়ে মারে। ধ্যানস্থ। সুইচ দেয়)। কিচ্ছু বলার নেই, সামান্য কিচিরমিচিরও করা নেই। এটা কোন্ সাল ? তেতো জাবর আর শক্ত মল। (বিরতি) স্পুল শব্দের মধ্যেই রয়েছে উল্লাস। (তৃপ্তির সঙ্গে) স্পুল!!! বিগত লক্ষ লক্ষ মুহূর্তের সুখীতম সময়। (বিরতি) সতেরখানা কপি বিক্রি হয়েছে, তারমধ্যে এগারটা আবার বিনা পয়সায় বিদেশের লাইব্রেরির জন্যে পাইকারি মূল্যে। (বিরতি) এক পাউন্ড আর ছয়, কিংবা আটের মতো কোনও পেনি মূল্যে, আমি নিশ্চিত নই। (বিরতি) একবার কিংবা দুইবার সামার আরও ঠাণ্ডা হওয়ার আগেই হামাগুড়ি দিয়ে বের হওয়া। পার্কে বসে কাঁপা, স্বপ্নে নিমজ্জিত হওয়া আর জ্বালাপোড়া শেষ হয়ে যাওয়া। কোন প্রাণ নেই। (বিরতি) শেষ শখ। (প্রকটভাবে) ওদের দাবিয়ে রাখো! (বিরতি) চোখের মণি বেরিয়ে আসতে চায় একেকদিন এফিকে পড়তে পড়তে আবার, দিনে একটা পাতা, আবার চোখে কান্না। এফি … (বিরতি) সেই মেয়েকে নিয়ে হয়তো সুখী হতে পারতাম, বাল্টিকে পারে, পাইন বনের ধারে, আর সেই সব বালিয়াড়ি। (বিরতি) পারতাম আমি ? (বিরতি) আর সে ? (বিরতি) পুৎ! (বিরতি) ফেনি দুয়েকবার আসত। আর বনি, পুরনো পতিতা প্রেতাত্মা যেন। বেশি কিছু করতে পারত না, কিন্তু আমার মনে হয়, ক্রাচে লাথি দেওয়ার চেয়ে ওটুকু ভালো ছিল। শেষবারেরটা অত মন্দ ছিল না। তুমি কেমনে সামলাও, এই বয়সেও, সে জিজ্ঞেস করেছিল। আমি বলেছিলাম, তোমার জন্যই সারা জীবন ধরে এই যৌবন জমিয়ে রেখেছিলাম সখি। (বিরতি) একবার ভেসপারের কাছেও গিয়েছিলাম, যেমন খাটো ট্রাউজার পরেছিলাম একবার।

(বিরতি। গান গায়)

এখন দিনগুলো চলে গেছে

রাত্রি টানছে ক্রমশ কাছে

ছায়াগুলো আছে …

(কাশে। তারপর প্রায় শোনা যায় না এমন করে কথা বলে)

সন্ধ্যা চুরি করে রাত্রির আকাশ।

(হাপায়)

ঘুমাতে গিয়েছিলাম আর গির্জার বেঞ্চ থেকে পড়ে গিয়েছিলাম। (বিরতি) মাঝে মাঝে আমি ভাবি রাত্রিরে একটা শেষ চেষ্টা―(বিরতি) আহ তোমার খাঁচা ভাঙো আর বিছানায় যাও। এই সব বাতুলতা আবার সকালে শুরু কোরো। কিংবা এইটা বাদই দাও। (বিরতি) বাদ দাও এটা। (বিরতি) অন্ধকারে শুয়ে থাকো―আর ঘোরাফেরা করো। আবার উপত্যকায় এসো ক্রিসমাসের সন্ধ্যায়, সংগ্রহ করো রসালো হোলি’র লাল ফল। (বিরতি) আবার এসো ক্রোগানে রবিবারের সকালে, কুয়াশায়, সৈকতে, থেম আর শুনো সেই ঘণ্টা ধ্বনি। (বিরতি) আর এইসব। (বিরতি) আবার এসো, এসো আবার। (বিরতি) সেই সব পুরনো দুর্দশা। (বিরতি) সেই একবারই তো তোমার জন্য যথেষ্ট নয়। (বিরতি) আবার সেই নারীর পাশে শুয়ে থাকো।

দীর্ঘ বিরতি। সে আকস্মিক মেশিনটার উপর ঝুঁকে আসে, সুইচ বন্ধ করে, টেপটা মুচড়ে দেয়, দূরে ছুড়ে মারে, আরেকটা টেপ বসায়, সেটাকে সামনে টানে, তার কাক্সিক্ষত অনুচ্ছেদে নিয়ে যায়, সুইচ দেয়, সামনের দিকে তাকিয়ে শুনতে থাকে।

টেপের কণ্ঠ : বুনো বড়ই, সে বলেছিল। আমি আবার বললাম, এটা নিশ্চয় আশাহীন আর ভালো কিছু ঘটেনি আর সে মেনে নিলো, তার চোখ না-খুলেই। (বিরতি) আমি ওকে আমার দিকে তাকাতে বললাম, আর কয়েক মুহূর্ত পর (বিরতি) আর কয়েক মুহূর্ত পর সে তাকালো, তবে চোখগুলো কোনও রকম পিটপিট করল কারণ সূর্যের ঝলমলে আলো। আমি ওর উপর ঝুঁকে এলাম যেন সূর্যের আলো চোখে না পড়ে, ছায়া পড়ে আর সে চোখ খুলল (বিরতি) আমাকে আসতে দাও। (বিরতি) আমরা পতাকাগুলোর মাঝখান দিয়ে ভাসলাম আর আটকে গেলাম। যেভাবে তারা নিচে চলে গেল, দীর্ঘশ্বাস ছাড়তে ছাড়তে যেন বোটা থেকে খসে গেল। (বিরতি) আমি তার ওপর শুয়ে ছিলাম, আমার মুখ ছিলো তার বুকে আর হাত ছিল শরীরে। আমরা কোন নড়াচড়া না-করেই সেখানে শুয়ে ছিলাম। সেখানে কোন রকম  কিন্তু আমাদের নিচে সবকিছু নড়ছিলো, ধীরে, উপরে আর নীচে, একপাশ থেকে আরেকপাশে।

(বিরতি)

ক্র্যাপের ঠোঁট নড়ে। কিন্তু কোনও শব্দ হয় না।

মাঝরাত পেরিয়ে গেছে। কখনও এমন নীরবতা দেখিনি। পৃথিবী হয়ত বসবাসের অযোগ্য হয়ে গেছে।

(বিরতি)

এইখানে আমার এই রিল শেষ হলো। বাক্স―(নীরবতা)Ñতিন, স্পুল―(নীরবতা)―পাঁচ (বিরতি) হয়ত আমার সেরা বছরগুলো পার হয়ে গেছে। যখন একটু সুখের সুযোগ ছিল। কিন্তু আমি তাদের ফেরত চাই না। যে আগুন আমার মধ্যে আছে তা নিয়ে ফেরত চাই না এখন। না, আমি তাদের ফেরত চাইতাম না।

ক্র্যাপ তার সামনের দিকে স্থবির তাকিয়ে থাকে। টেপ নীরবে বাজতে থাকে।

পর্দা।

পাদটীকা

১ কন্নাট আয়ারল্যান্ডের একটি প্রদেশ। এখানে স্মরণে রাখতে হবে বেকেট একজন আইরিশ ছিলেন। তবে এখানে কেন কন্নাটের নাম এলো তা অনুধাবন করা একটু কঠিন। ধারণা করা যায়, যে মিস ম্যাকগ্লোম হয়তো কন্নাটের নারীদের মতো কিংবা তিনি কন্নাটেরই অধিবাসী।

২ muckball

 লেখক : নাট্যকার

Leave a Reply

Your email address will not be published.

shares