ভ্রমণ : লাভা-হ্রদের পাড়ে এক অবিস্মরণীয় রাত : মঈনুস সুলতান

এখনও ইথিওপিয়ার প্রত্যন্ত অঞ্চলে আছে ‘অ্যারতে-আলে’ নামে লাভা উৎক্ষেপণে প্রজ¦লন্ত একটি আগ্নেয়গিরি। আমরা―বেশ কয়েকজন পর্যটক আজ জোট বেঁধে, একটি ট্যুর কোম্পানির গাইডের তত্ত্বাবধানে ওই আগ্নেয়গিরির পাশের একটি লাভা-হ্রদের পাড়ে ক্যাম্পিং করার উদ্যোগ নিয়েছি। ওখানে যেতে হলে, প্রথমে একটি বেস-ক্যাম্পে এসে প্রস্তুতি নিয়ে ট্র্যাক করতে হয় ঘণ্টা কয়েক। বেস-ক্যাম্পে পৌঁছানোও ঝকমারি বিশেষ, আমরা ঘণ্টা কয়েক ল্যান্ডরোবারে প্রায়-দুর্গম এক মরুভূমি অতিক্রম করি। অতঃপর লাভালিপ্ত প্রান্তরের ওপর দিয়ে পায়ে হেঁটে এসে পৌঁছেছি বেস-ক্যাম্পে।

বেস-ক্যাম্পে ভরপেট ডিনারের তামাদি হতেই শুরু হয়ে যায় গ্রুপিং এর পালা। ট্র্যাভেল কোম্পানির লোকজন দক্ষতার সঙ্গে দ্রুত আমাদের ছোট ছোট দলে বিভক্ত করেন। যাদের হরেক এলিভেশনে ট্র্যাকিংয়ের অভিজ্ঞতা আছে, তাদের গ্রুপগুলো রওনা হবে প্রথমে।

তারপর যাবে যারা দৈহিকভাবে সক্ষম, তবে লাভা লেপ্টান পাথুরে টেরেইনে হাঁটার অভিজ্ঞতা কম―তারা। তৃতীয় দলে পড়েন স্লো ওয়াকাররা। যাদের পায়ে ইনজুরি আছে, বা ভুগছেন নানা ধরনের রোগশোকে তাদের ক্যাটাগরিতে পড়ি আমি, আমার সঙ্গে খুশবাস হালতে এসে জোটেন, ইসরাইল থেকে আগত বয়োজ্যে ‘পর্যটক-জুটি মিস্টার ইয়াকেব ইহোনাথান ও মিসেস এলিশেবা ইহোনাথান।

শোনা যায় পরপর আরও কিছু ঘোষণা। বেস-ক্যাম্প থেকে মোল্টেন লাভা-লেইকের দূরত্ব মাত্র নয় কিলোমিটার, তবে কোন কোন জায়গায় ঝামাপাথরের বোল্ডার মাড়িয়ে অতিক্রম করতে হবে উতরাই, তাই পথপরিক্রমা হবে বেজায় চ্যালেঞ্জিং। চলতে হবে সাবধানে―ধীর লয়ে। ঘণ্টা চারেক লেগে যাওয়া বিচিত্র কিছু না।

যাত্রাপথের মাঝামাঝি ঘনিয়ে আসবে অন্ধকার। তাই কপালে যেন হামেহাল স্ট্র্যাপ দিয়ে আটকানো থাকে হেডল্যাম্প। পথে-প্রান্তরে―খানিক দূরে দূরে, দু-চার জন সৈনিকের দেখাসাক্ষাৎও মিলবে। এদের ভয় পাওয়ার কিছু নেই, কারণ সৈন্যরা দায়িত্ব নিয়েছে নিরাপত্তাবিধানের।

অন্ধকারে পথ হারানো নিয়ে উদবিগ্ন হওয়ারও কিছু নেই, দিগন্তে আগ্নেয়গিরির লালচে আভা স্পষ্ট হয়ে উঠবে, এমনকি উৎক্ষিপ্ত স্ফুলিঙ্গও দেখা যেতে পারে। তদুপরি বেশ কয়েকজন গাইড সারাক্ষণ হাঁটাচলা করে যাত্রার তদারকি করবেন … ‘সো নো প্রবলেম … প্লিজ বি রেডি ফর দি মেসমেরাইজিং রোড ট্রিপ।’ ট্র্যাকাররা পিঠে ব্যাকপ্যাক ঝুলিয়ে, কপালে কিংবদন্তির দৈত্যের তৃতীয় চক্ষুর মতো হেডল্যাম্পের স্ট্র্যাপটি বেঁধে, টেনেটুনে বুটজুতার ফিতা অ্যাডজাস্ট করে প্রস্তুত হয়ে ওঠে।

ট্র্যাভেল কোম্পানির মোয়াল্লিম বা ট্র্যাক-মাস্টার নাভির ওপর লুঙ্গিটি কষে বাঁধতে বাঁধতে বাজখাঁই গলায় আওয়াজ দেন, ‘ইয়াল্লা ইসতাদু.. ইয়াল্লা .. ইয়াল্লা.. গেট রেডি অল..রাইট নাউ।’ উটগুলো হাঁটু ভেঙে উঠে দাঁড়ায়, তাদের গলায় টুংটাং করে বাজে ঘণ্টা।

ট্র্যাক-মাস্টার ফের চেঁচিয়ে কথা বলেন, ‘ইয়াবদাউ মাসারি জামালি..’, বাক্যটি আরবি, পাশ থেকে মিস্টার ইয়াকেব আমার জন্য তর্জমা করেন, ‘স্টার্ট দ্য ক্যামেল ট্র্যাক নাউ।’ উটের পিটে চাবুকের বাড়ি পড়ে।

শক্তপোক্ত ট্র্যাক করনেওয়ালাদের সঙ্গে বেশ খানিকটা দূরত্ব বজায় রেখে―খিন্ন মনে―আমি, ইয়াকেব ও এলিশেবা যাত্রা শুরু করি। বেশ কিছুক্ষণ নীরবে হাঁটি আমরা। যেতে যেতে মিসেস এলিশেবা কেবলই পিছিয়ে পড়ছেন। মনে হয়, মহিলা পায়ের মাসোল ওয়ার্ম-আপ না করেই রওনা হয়েছেন।

স্তম্ভের মতো জগদ্দল পাথরখণ্ডের সামনে আমরা একটু দাঁড়াই। মিস্টার ইয়াকেব তাঁকে দেখিয়ে দেন, কীভাবে পাথরে হাতের ঠেকা দিয়ে, শরীর স্ট্রেচ্্ করে উষ্ণ করে নিতে হয় পায়ের মাস্ল্। খানিক জিরিয়ে এলিশেবা একটু ধাতস্থ হতেই আমরা আবার হাঁটতে শুরু করি। ল্যান্ডস্কেপের প্রকৃতিতে সামান্য পরিবর্তন আসে। একটি-দুটি মরুচারী বৃক্ষেরও দেখা-সাক্ষাৎ পাওয়া যায়। এদিকে লাভাস্তরকে যেন বুলডোজার দিয়ে ভেঙেচুরে গুঁড়া করে তৈরি করা হয়েছে সরণি। মেট্রেসের বোঝা পিঠে খটখটিয়ে হেঁটে যায় নাকে দড়ি-বাঁধা কয়েকটি উট।

দেখতে দেখতে লাভাস্তরে হাল্কাচালে পা ফেলে হেঁটে যায় স্লো ওয়াকারদের এলোমেলো একটি গ্রুপ। একজন চেনা ওয়াকার যেতে যেতে আমার দিকে ঘাড় ফিরিয়ে বলেন, ‘কাম-অন, লেটস্ মার্চ টু দি লাভা লেক …।’ আমরা ফের হাঁটতে শুরু করি, একজন গাইড ছুটে এসে একটু জোরে কদম ফেলার অনুরোধ করেন। পথচলার গতি বাড়াতে আমরা চেষ্টা করি, প্রতি পদক্ষেপে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে নুড়িপাথর ও বালুকার সঙ্গে মিশে থাকা আগ্নেয়গিরি ধূসর ছাইকণা।

খানিকটা সমতল চাতালে উঠে আমরা পাথরের বিশাল একটি চাকলায় বসে পড়ে মিনিট পাঁচেক চুপচাপ শ্বাস-প্রশ্বাসের তোড় সামলাই। পাশ থেকে গাইড চিনুয়া মিনমিনিয়ে অনুরোধ করে, ‘প্লিজ টার্ন অ্যারাউন্ড এন্ড লুক অ্যাট দ্য ভিউ।’ ঘাড় ফেরাতেই দেখি―আকাশের দিকে উৎক্ষিপ্ত হচ্ছে বিরাট একগুচ্ছ টকটকে লাল শিমুল, আগুনের এ আশ্চর্য স্তবক বিস্ফোরিত হয় স্ফুলিঙ্গের ফুলঝুরিতে।

এক্সাইটমেন্টে আমরা উঠে দাঁড়াই, খানিক দূরে, বেশ নিচুতে সম্পূর্ণ লোহিত বর্ণের লাভা-হ্রদটি দৃশ্যমান হয়। ইয়াকেব ও এলিশেবা হিব্রু ভাষায় ‘লা খায়েম … লা খায়েম’ বলে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন। তৎক্ষণাৎ সেলিব্রেশনের জুতসই কোন শব্দ খুঁজে না পেয়ে আমি আওয়াজ দিই, ‘চিয়ার্স, উই মেড ইট, উই আর রাইট অন দ্য বার্নিং ভলকান অ্যারতে-আলে।’

এলিশেবা আমার উচ্ছ্বাসের সঙ্গে সহমত প্রকাশ করে বলেন, ‘ইয়েস, উই মেড অল দ্যা ওয়ে টু দি রিম অব দি লাভা-লেক।’ ইয়াকেব এইমাত্র যেন পিনাল্টি কিকে গোলটি করেছেন, এ রকম উত্তেজনায় দুহাত বাতাসে প্রসারিত করেন, আমি তাঁর বাড়িয়ে দেয়া হাত জাপটে ধরে তাঁকে আলিঙ্গন করি।

চিনুয়া আমাদের নিয়ে ক্যাম্পিংলট এর দিকে হাঁটে। আধো-অন্ধকারে চলছে ট্র্যাকারদের টুকটাক তৎপরতা, তাতে অ্যারতে-আলের পাথুরে রিম গুলজার হয়ে আছে। কোথাও বাতির কোন বন্দোবস্ত নেই। তবে জ্বলন্ত লাভা লেকের আভায় তাবৎ পরিসর কেমন যেন লালচে উঠেছে। মাঝে মাঝে দেখা যাচ্ছে, কপালে স্ট্র্যাপ দিয়ে আটকান হেডল্যাম্পের রুপালি-সবুজাভ আলো ও মোমবাতির মৃদু শিখা।

কানে ভেসে আসে পোলিশ, সোয়াহিলি ও জার্মান ভাষায় উচ্চারিত কথাবার্তা। ভূতুড়ে ছায়ার মতো টুংটাং ঘণ্টা বাজিয়ে হাঁটছে একটি-দুটি উট। আমাদের দাঁড় করিয়ে চিনুয়া ছুটে যায় ট্র্যাক-মাস্টারের খোঁজে। চোখে অন্ধকার সয়ে আসলে, এদিক-ওদিক তাকিয়ে ক্যাম্পিংলটের আলাদা আলাদা প্রাইভেট পরিসরগুলোর একটা আন্দাজ পাই। বোল্ডার জড়ো করে, ফুট খানেকের মতো দেয়াল তুলে বর্গাকৃতিতে তৈরি করা হয়েছে খোপ খোপ মতো এক-একটি ক্যাম্পিংলট। একটির দেয়ালে আমরা হেলান দিয়ে বসে পড়ে জিরানোর চেষ্টা করি।

মিনিট সাতেকের ভেতর ফিরে আসে চিনুয়া। সে আমাদের নিয়ে যায় পাশাপাশি দুটি ক্যাম্পিংলটে। ওখানে অলরেডি মেট্রেস পাতা দেখতে পেয়ে স্বস্তি পাই। সটান শুয়ে পড়তে ইচ্ছা হয়। বিছানার পাশেই ফেলে রাখা গোলাকার একটি পাথর, তাতে জোড়া মোমবাতি ও ম্যাচ। পাথরটির পাশে পানির বোতল ও ফ্রুট জুসের প্যাকেট পোরা আমার ব্যাকপ্যাকটিও পড়ে আছে।

বুঝতে পারি, এটি উটবাহিত হয়ে আমার আগেই পৌঁছে গেছে ক্যাম্পিংলটে। পুরো আয়োজনে এত খুশি হই যে, হার্শির পুরো একটি চকোলেট বার আমি চিনুয়াকে অফার করি। সে আমাদের রেস্ট নিতে উপদেশ দিয়ে, পনেরো-বিশ মিনিট পর ফিরে আসার ওয়াদা করে স্রেফ হাওয়া হয়ে যায়।

নাইট ইজ স্টিল ভেরি ইয়াং, সামনে মাঝরাত অবধি ওঠা-নামা ও লাভা-হ্রদের পাড়ে ঘোরাফরার ব্যাপার আছে। পায়ের মাসোলগুলোকে সামান্য রেস্ট দিতে পারলে আখেরে সময় ভালো কাটবে। আমি রিল্যাক্সড্ হয়ে চোখ বন্ধ করি।

চুপচাপÑঅন্তর্গত তর্পণে পৃথিবীর হরেক দেশে―নানাবিধ বাসস্থান, গেস্টহাউস ও ক্যাম্পগ্রাউন্ডে বসবাসের তালিকায় অ্যারতে-আলের রিমে বোল্ডারের দেয়াল দেওয়া ক্যাম্পিং-লটটি এ্যাড করি। একবার ভাবি, উঠে পড়ে এ অনুভূতিটিকে নোটবুকে টুকে নেব, কিন্তু দৈহিক আলস্যকে হার মানাতে পারি না।

পাশের লট থেকে এলিশেবা খিলখিলিয়ে হেসে বলে ওঠেন, ‘লুক অ্যাট দিস ওসোম ক্লাউড ফর্মেশন, দালানের ছাদটির মতো মেঘমালা ঠিক যেন মাথার ওপর দিয়ে ভেসে যাচ্ছে, ওহ … মাই … মাই … স্টারস্ পাপিং আপ জাস্ট লাইক পপকর্নস্ ইন অ্যা মাইক্রোওয়েভ।’

চোখ মেলে আমিও তাকাই, দেখি সত্যিই―মেঘের ভাসমান ফ্রাইপ্যানে তপ্ত বালুকাতে যেন ফটাফট ফুটছে নক্ষত্রের খই। এলিশেবা আদুরে গলায় জানতে চান, ‘হানি, হাউ মেনি স্টারস্ আর আউট, হোয়াট ডু ইউ থিংক ?’ ইয়াকেব পরিসংখ্যানবিদের ভঙ্গিতে জবাব দেন, ‘আই থিংক.. অ্যাবাউট থ্রি হানড্রেড নাইটি ফাইভ স্টারস্ আর আপ দেয়ার।’

এলিশেবা অনুনাসিক স্বরে অনুযোগ করেন, ‘ইউ আর নট রাইট, হান্নি, আই থিংক দে আর অভার থাউজেন্ড স্টারস্ নাউ।’ তিনি নক্ষত্র বিষয়ে আর বিশেষ কিছু বলার সুযোগ পান না, চকাস চকাস করে পর পর দুটি শব্দ হয়, আমি ভাবি, এ যাত্রায় মওকা মিললে, ইয়াকেবের কাছ থেকে জেনে নিতে হয় ‘চুম্বন’ শব্দটির হিব্রু প্রতিশব্দ।

ফিরে আসে চিনুয়া, উঠে পড়ে আমি ব্যাকপ্যাকে ভরে নিই―ট্র্যাভেল ডকুমেন্টস্, জলের এক্সট্রা বোতল ও ফ্রুট জুসের প্যাকেটগুলি। হেডল্যাম্প জে¦লে আমরা অতঃপর রওয়ানা হই । রিমের প্রান্তিকে এসে থেমে পড়ে চিনুয়া টর্চ জে¦লে দেখিয়ে দেয়, লাভাস্তরে ধাপে ধাপে নেমে যাওয়ার সংকীর্ণ সিঁড়ির মতো এবড়োখেবড়ো একটি ট্রেইল।

তার তলায়, বেশ নিচে, কুচকুচে কালোপনা মাঠ, দু-পা এগিয়ে যেতেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে অ্যারতে-আলের পার্মানেন্ট লাভা লেক। ইয়াকেব এক্সাইটেড ভাবে বলে ওঠেন, ‘লুক অ্যাট দ্যা ড্রামাটিক অ্যাকশন অব দি বয়লিং লাভা।’ চুপচাপ আমরা দেখি―লোহিত বর্ণের সরোবরে বলকাচ্ছে তরল অগ্নি, মাঝেসাজে উত্থিত হচ্ছে ফোয়ারার মতো ধারাপ্রবাহ, ছড়িয়ে পড়ছে স্ফুলিঙ্গ।

সাবধানে নামতে শুরু করি আমরা। প্রাকৃতিকভাবে তৈরি সোপানগুলোকে সিঁড়ি না বলে, বরং বলা উচিত নরম লাভায় তৈরি গাছের শিকড়ের আকৃতি, তাতে পা আটকাতে গিয়ে লাভাখণ্ড ভেঙে হুমড়ি খান এলিশেবা। চিনুয়া বোধ করি প্রস্তুত ছিল, সে তাঁকে জাপটে ধরে পরিস্থিতি সামাল দেয়। ভালোয় ভালোয় আমরা নেমে আসি নিচের লেয়ারে।

কুচকুচে কালো মাঠের ওপর দিয়ে হাঁটতে গিয়ে তৈরি হয় আরেক ধরনের মুসিবত। পড়ো জমিটিতে মনে হয়, সর্বত্র দলা পাকিয়ে, লেপ্টে, নানা আকৃতিতে দলামচা হয়ে পড়ে আছে থোকা থোকা লাভা। কিছু লাভা এখানে বোধ করি পতিত হয়েছে দিন দুয়েক আগে, জমে এখনও দানা বাঁধেনি জুতমতো। এসব নরম স্তরে পা দেওয়া মাত্র, বুটজুতা দেবে যায়, কোথাও কোথাও জুতার সৌলে জড়িয়ে যায় চিটাগুড়ের মতো চটচটে লাভা। আরেকটু এগিয়ে যেতে―হেডল্যাম্পের আলোয় মাঠটি রুপালি হয়ে ওঠে। জানতে পারি, ফ্রেশ ছাই উড়ে এসে মাঠজুড়ে ছড়িয়ে বসেছে। পদতলে তা মুচমুচে পাঁপড়ের মতো ভাঙচুর হতে থাকে।

প্রচণ্ড গরমে আমরা হাঁপিয়ে ওঠি। আমাদের হেডল্যাম্পের আলোয়―খানিক দূরে উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে, শোলার হ্যাট মাথায় পাইপমুখে একটি ছায়ামূর্তি। চেনাজানা এ পর্যটকের নাম রবিন স্প্রিংহিল। মেকেলে শহরে হোটেল-বাসের দিনগুলিতে তাঁর সঙ্গে ইয়াকেবের জানপহচান দোস্তি হয়। জিম্বাবুয়ের শে^তাঙ্গ এক চা-করের সন্তান স্প্রিংহিল নাকি এক সময় ওখানকার একটি অ্যাংলিকান চার্চে ধর্মযাজকের কাজে নিয়োগ পেয়েছিলেন। তাঁর প্রেমে পড়ার স্বভাব আছে, সঙ্গোপনে একাধিক নারীর সঙ্গে পরকীয়ার ব্যাপারটি জানাজানি হলে তাঁকে ‘এক্সকমিউনিকেট’ বা চার্চ-ভিত্তিক খ্রিস্টীয় সমাজ থেকে বহিষ্কার করা হয়।

স্প্রিংহিল সাহেব এ নিয়ে গালগল্প করতে পছন্দ করেন। অবসরে হোটেল-লবিতে বসে, লজ্জাশরমের নিকুচি করে, প্লেবয় পত্রিকার পৃষ্ঠায় অবলোকন করতেন নগ্ন নারীদেহ। দেশছাড়া হয়ে এ শে^তাঙ্গ-সন্তান বর্তমানে কোনিয়াতে ছোট্ট একটি চা-বাগান করেছেন। লাভাস্তর ডিঙিয়ে আমরা চলে আসি তাঁর কাছাকাছি। দেখি, জলের বোতল থেকে তালুতে সামান্য পানি নিয়ে ইনি ঘাড়ে-গলায় ঘষছেন। বিরক্ত হয়ে বলেন, ‘হ্যালো দেয়ার, ইজন্ট ইট ভেরি হট ?’

ইয়াকেব প্রতিক্রিয়ায় বলেন, ‘ইটস্ ফিলস্ লাইক ওয়াকিং টুয়ার্ডস্ অ্যা বার্নিং হেল।’ মুখ থেকে পাইপটি সরিয়ে তিনি বিদ্রƒপ করে বলেন, ‘ইয়াকেব, ডে অব জাজমেন্টের দিন অলমাইটি গডের দরবারে বিচারের সময়, মেক শিওর টু মেনশন ইউ ভিজিটেড অ্যারতে-আলে।’

এলিশেবা জানতে চান, ‘আমরা অ্যারতে-আলেতে এসেছি, এটা ঈশ^রকে জানালে কী আলাদা কোন কনসেনশন পাওয়া যাবে ?’ বাঁকা হাসিটি ফের ফুটে ওঠে স্প্রিংহিলের ঠোঁটে, তিনি বলেন, ‘তোমরা এ দুর্বিষহ গরমে অ্যারতে-আলেতে এসেছ, এটা জনাতে পারলে, সর্বশক্তিমান তৎক্ষণাৎ ডিউটিরত দেবদূতকে নির্দেশ দেবেন, তোমাদের জাহান্নামে না পাঠানোর। বলবেন, ওরা তো অ্যারতে-আলের দোজখ অলরেডি ভিজিট করেছে, নো নিড টু সেন্ড দেম টু হেল এগেইন।’

আমরা ফের আগাই। যেতে যেতে আমি ভাবি, হাস্যরস ও হরেক রকমের হিউমারে ভরপুর স্প্রিংহিল সম্পর্কে আমার মনে বিরাজ করছে এক ধরনের বিরূপভাব। নগ্ন নারী দেহের চিত্রপ্রিয় মানুষটি আসলেই কী খারাপ ? অনেক পুরুষই তো নীলছবি সঙ্গোপনে অবলোকন করেন, এদের সঙ্গে স্প্রিংহিলের তফাৎ হচ্ছে, তিনি কাজটি করছেন কোন রকমের আড়াল আবডাল না রেখে। তাঁর চরিত্রের নৈতিকতা বিচারের দায়িত্ব আমার নয়।

অবশেষে এসে দাঁড়াই লাভা-হ্রদের পাড়ে। উত্তাপ ও বিবিধ বর্ণের আলোর বিচ্ছুরণে ভ্যবাচ্যাকা লেগে যাওয়ার উপক্রম হয়। দেখতে দেখতে সামনের আধো-অন্ধকার পরিসরে ছড়িয়ে পড়ে সোনালি আবির। তার আলোয় দেখতে পাই, তুমুল গরম উপেক্ষা করে বেশ কতজন পর্যটক দাঁড়িয়েছেন অগ্নিকুণ্ডের প্রান্ত ঘেঁষে।

আমরা পা টিপে টিপে আরেকটু আগাই, কিছুক্ষণ ধুন ধরে চেয়ে থাকি, নিচে লোহিত রঙের থিক থিকে তরল অগ্নিতে থেকে থেকে খেলে যাওয়া সম্পূর্ণ সোনালি রেখার দিকে। চোখের পলক পড়ার সঙ্গে সঙ্গে এ রেখা বিবর্তিত হয় দেবদূতের কল্পিত ডানায়, তাতে যুক্ত হয় নীলচে-বেগুনি পালক।

সম্মোহিতের মতো আমরা তাকিয়ে থাকি, প্রতি মুহূর্তে বদলে যাওয়া সোনা ঝরান জ্যামিতিক নকশার দিকে, আমি নোটবুক খুলে এ ইমেজটি টুকে নিতে চাই, তাতে কলমের নিব ছোঁয়ানোর আগেই দৃশ্যটি বদলে গিয়ে তৈরি করে―জ্যোতির্বিজ্ঞানের বইতে আঁকা নক্ষত্রমণ্ডলের চিত্র। লু হাওয়া বয়ে আনে হরেক কিসিমের খনিজদ্রব্য একত্রে পোড়ানোর পানজেন্ট গন্ধ। আমাদের নিশ^াস-প্রশ^াসে তার প্রভাব পড়ে।

দেখি, পাশে দাঁড়িয়ে এলিশেবা নাভিশ^াস ফেলার মতো তোড়েজোড়ে হাঁপাচ্ছেন। আমি একটি সার্জিক্যাল মাস্ক তাঁর দিকে বাড়িয়ে দিয়ে নিজেও একটি পরে নেই। এলিশেবা ও ইয়াকেব তা কানের লতিতে জড়িয়ে সরোবরের প্রান্তঘেঁষা পাড় থেকে সরে যান পিছন দিকে।

আমি নোটবুকটি বন্ধ করে আরেকটু সময় চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকি, বুঝতে পারি, আগুনের বিরাট এ দিঘিকে আগ্নেয়গিরি পরিদর্শনের পরিভাষায় বলা হয়ে থাকে ‘পিট ক্রেইটার’। জলন্ত এ হ্রদটি আকৃতিতে সাব-সার্কুলার বা কিছুটা বৃত্তাকৃতির, অনুমান করা হয়―এ গহ্বরের গভীরতা ২০০ মিটার, ব্যাস কোনও কোনও জায়গায় ৩৫০ মিটারের মতো।

হ্রদ-পাড় ছেড়ে চিনুয়া এলিশেবা ও ইয়াকেবকে নিয়ে চলে যাচ্ছে পেছন দিকে। এতদূর পর্যন্ত যখন এসেছি, প্রাণভরে লাভা সরোবরটি না দেখে আমি নড়ছি না। প্রান্ত ঘেঁষে রওনা হই, উত্তর দিকের অপেক্ষাকৃত ছোট ক্রেইটার পিট নিশানা করে।

বলকে উঠে ফের লাভা-সরোবরের তরল আগুন। তার আভায় দেখি, চৌকস চেহারার এক তরুণী আগুনহ্রদের হাশিয়ায় দাঁড়িয়ে, সেলফিস্টিক বাগিয়ে তুলে নিচ্ছেন নিজস্ব তসবির। তাকে ছাড়িয়ে আরেকটু সামনে বাড়ি।

দূর থেকে দেখতে পাই, ঠিক ক্রেইটার পিটের পাড়ে দাঁড়িয়ে কেমন যেন মশগুল হয়ে ক্যামেরায় ক্রমাগত ছবি তুলছেন সাউথ আফ্রিকার আলোকচিত্রী গুন্থার শোয়াংকি। কমলালেবু রঙের আশ্চর্য আভায় অচ্ছন্ন ধূসর চুলদাড়িওয়ালা মানুষটিকে রীতিমতো ধ্যানস্থ দেখায়।

কেপটাউনের ফটোগ্রাফার শোয়াংকি নাম করেছেন মূলত আন্ডারওয়াটার ফটোগ্রাফি করে। তিনি রঙিন ছবির প্লেটওয়ালা দুটি ভারী পুস্তকও ছাপিয়েছেন। তাঁর ছবিগুলোতে চমৎকারভাবে ফুটে উঠেছে জলতলে অক্টোপাসের দিনযাপনের ডিটেল।

পেশা হিসাবে শোয়াংকি স্কুবা ডাইভিং এর ইন্সট্রাকটার হিসাবে কাজ করেন। তিনি পারিশ্রমিকের বিনিময়ে পর্যটকদের জলতলে নিয়ে যান। তাঁর অক্টোপাসপ্রীতি অবসেশনের পর্যায়ে পৌঁচেছে। জালে ধৃত আহত এক অক্টেপাস নাকি তাঁর বৈঠকখানার সংলগ্ন এক্যুরিয়মে বাস করছে। জলতলে একটি সংবেদনশীল অক্টোপাসের সঙ্গে তাঁর সখ্য হয়েছে বলেও তিনি দাবি করেন।

ইথিওপিয়ার লালিবেলা শহরে সপ্তাহ-দেড়েক আগে, আমরা একটি গেস্টহাউসে পাশাপাশি কামরায় ছিলাম, সে সুবাদে অন্তরঙ্গতা। লালিবেলার পাহাড়-চূড়ায়―অবজারবেশনের টাওয়ারের কায়দায় নির্মিত একটি রেস্তোরাঁয় আমরা তথা পর্যটকবৃন্দ বিকালবেলা সূর্যাস্ত দেখতে যেতাম। ওখানকার ঝুলন্ত ব্যালকনিতে শোয়াংকি পানীয়ের গেলাস হাতে একা বসেছিলেন। আমি কাছে গিয়ে তাঁকে হ্যালো বললে বাতচিত জমে ওঠে।

আইপ্যাডে সংরক্ষিত তাঁর তোলা আন্ডারওয়াটার ছবিগুলো তিনি দেখান। শোয়াংকি সাহেবের এক্যুরিয়মে পোষা অক্টোপাসটির নাম ‘প্রফেসার এক্স’। আমি অধ্যাপক এক্স এর হরেক ভঙ্গিতে তোলা ছবিগুলো দেখে অ্যায়সা মুগ্ধ হই যে, বলি, ‘মি. শোয়াংকি, প্লিজ টেল মি মোর আবাউট প্রফেসার এক্স। ভাবছি, তাকে নিয়ে একটি শিশুতোষ গল্প লিখব।’ এতে উৎসাহিত হয়ে তিনি আমাকে সমুদ্রতলে নিয়ে যাওয়ার প্রস্তাব দেন।

তখন জানতে পারি, দরিয়ার তলদেশে আরেকটি অক্টোপাস, যাকে তিনি নামকরণ করেছেন ‘স্কুবা ডু’ নামে, তার সঙ্গে শোয়াংকি সাহেব দোস্তি পাতিয়েছেন। স্কুবা ডু নাকি তাঁকে চিনতে পারে, তিনি কাছে গেলে তিন-চারটি হাত-পা একত্রে বাড়িয়ে তাঁকে আদরও করে।

শুনে প্রতিক্রিয়ায় আমি বলি, ‘স্কুবা ডু সাউন্ডস্ সো ইন্টারেস্টিং।’ এতে উৎসাহিত হয়ে তিনি প্রস্তাব করেন, ‘সুলতান, কেপ টাউনে আসলে আমাকে অবশ্যই রিং করবে। আমি তোমাকে স্কুবা ডাইভিংয়ে সমুদ্রতলে নিয়ে যাব। ইউ ডোন্ট হ্যাভ টু পে দ্য ফুল প্রাইস। ফিফটি পার্সেন্ট ছাড়ে আমি তোমাকে দরিয়ার নিচে নিয়ে যাব। ইউ মাস্ট মিট স্কুবা ডু।’

প্রফেসার এক্স বা স্কুবা ডু’র সঙ্গে মায়-মোলাকাত হলে লিখতে সুবিধা হয়, কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, আমি অক্সিজেন সিলিন্ডার পিঠে বেঁধে সমুদ্রতলে ডোবাডুবি করতে সাহস পাই না। আমার আতঙ্ককে শোয়াংকি আমলে না এনে আওয়াজ দেন, ‘কাম-অন ম্যান … আই উইল টিচ ইউ হাউ টু ডাইভ আন্ডার ওয়াটার।’

ভীষণ ধ্যান ধরে শোয়াংকি ছবি তুলছেন, হঠাৎ করে আমাকে দেখতে পেয়ে আওয়াজ দেন, ‘হ্যালো দেয়ার …।’ জানতে চাই, ‘হাউ ইজ ইয়োর ফটোগ্রাফি বিজনেস গোয়িং ?’ জবাবে তিনি কনফিডেন্টলি বলেন, ‘আই গট সেভারেল গুড স্ন্যাপশটস্, মনে হয়, পত্রিকায় ছাপানোর মতো একটি-দুটি ছবি পেয়ে যাব।’ অতঃপর জলের বোতলে সাবধানে ঠোঁট ভিজিয়ে তিনি বলে ওঠেন, ‘আরতে-অ্যালেতে আসার ট্র্যাজিডি হচ্ছে, পানির ফোঁটাও এখানে হিসাব করে মুখে তুলতে হয়।’

আমি ব্যাকপ্যাক থেকে বের করে তাঁর দিকে বাড়িয়ে দিই দুটি জলের বোতল। তিনি একটি হাতে নিয়ে বলেন, ‘কেপ টাউনে আসলে অবশ্যই রিং করবে, স্কুবা ডাইভিং এর জন্য তোমাকে কিছু পে করতে হবে না।’ আমি তাঁকে থ্যাংক-ইউ বলে আগ বাড়তে চাই। হাত তুলে আমাকে থামিয়ে তিনি প্রশ্ন করেন, ‘আর ইউ রিয়েলি রাইটিং অ্যা স্টোরি আবাউট মাই অক্টোপাস প্রফেসার এক্স অর স্কুবা ডু ? হাউ সিরিয়াস আর ইউ ?’ আমি মিনমিনিয়ে বলি, ‘আই উইল থিংক আবাউট ইট।’

সহজে ছাড়েন না তিনি, বলেন, ‘মেক শিওর টু রাইট ইট ইন ইংলিশ, আন্ডারওয়াটার ফটোগ্রাফি ক্লাবের নিউজলেটারে তা ছাপিয়ে দেয়া যাবে।’ আমি ‘সোলং’ বলে আগ বাড়ি। যেতে যেতে ভাবি, লাভাহ্রদের পাড়ে দাঁড়িয়ে অগ্নিসাক্ষী করে গল্প লেখার যে প্রতিশ্রুতি দিলাম, তা রাখা সম্ভব হবে কী ?

মাস্ক ছাপিয়ে নাসারন্ধ্রে এসে লাগছে আগুনে-পোড়া খনিজ গন্ধ, হঠাৎ করে লাভা-হ্রদটি অসংখ্য ঊর্মির তীব্র লোহিত তাড়নে লাইভলি হয়ে ওঠে। পরিষ্কার শুনতে পাই, অনেকটা সুড়ঙ্গে আটকে পড়া ঘূর্ণিঝড়ের মতো আগ্নেয়গিরির উত্থাল শব্দ।

আরও কয়েক পা সামনে বাড়ি। ঝড়ো আওয়াজ একটু প্রশমিত হতেই কানে আসে বৌদ্ধ ঘরানার চ্যানিটং এর সুরেলা শব্দ। বুঝতে পারি, লালিবেলা শহরে ইনার সঙ্গেও আমি একত্রে দুটি ইন্টারেস্টিং স্পটে বেড়াতে গিয়েছিলাম। খ্রিস্টান মিশনারি থেকে বৌদ্ধ ধর্মে কানভার্ট হওয়া আমেরিকান এ সাঙ্গাতের নাম কোডি মিলৎজ্, মনে হয়, কাছে-পিটেই আছেন কোডি। ধূমকেতুর মতো ধোঁয়ার একটি আস্তরণ উড়ে এসে পরিসরকে করে তোলে অস্বচ্ছ ধূসর। বার বার উচ্চারিত ‘বৌদ্ধনং শরণং গচ্ছামি’ বাক্যটি প্রতিধ্বনিতে ভেঙেচুরে খান খান হয়ে ছড়িয়ে যাচ্ছে আবছা হয়ে আসা চরাচরে।

আমি কপালে গাঁথা হেডল্যাম্প জে¦লে সাবধানে অতিক্রম করি ধোঁয়ার ধূসরিম পর্দা। হ্রদের একদম পাড় ঘেঁষে হন্টনরত কোডি মিলৎজের ছায়ামূর্তিটিকে পরিষ্কারভাবে শনাক্ত করতে পারি। তিনি লাভাহ্রদের অগ্নিময় আঁচ সম্পূর্ণ ইগনোর করে আস্তে-ধীরে ঘোরাচ্ছেন প্রেয়ার হুইল বা প্রার্থনাচক্র। তাঁর হলকুম থেকে বেরিয়ে আসছে ‘বৌদ্ধনং শরণং গচ্ছামি … ’ ধ্বনি।

এখানে তো জলন্ত লাভায় থিক থিকে বিশাল একটি সরোবর ছাড়া অন্য কোনও উল্লেখযোগ্য গন্তব্য নেই, ঠিক বুঝতে পারি না, বাছাধন কোথায় ‘গচ্ছাতে’ বা ‘গমন’ করতে চাচ্ছেন ? আওয়াজ দিই, ‘হেই কোডি, হোয়াট দ্যা হেল ইজ গোয়িং অন ?’ তিনি দাঁড়িয়ে পড়ে বলকান লাভাকুণ্ডের দিকে ইশারা করে বলেন, ‘লুক অ্যাট দিস ডিভাইন অ্যকশন।’

গরমের তজল্লায় গেরুয়া উত্তরীয়টি খুলে কোডি তা কোমরে পেচিয়েছেন। তাঁর সারা অঙ্গে উল্কিতে আঁকা ছত্র, শঙ্খ ও ধ্বজা প্রভৃতি প্রতীক তপ্ত আঁচে গ্রিলে ঝলসান কাঁকড়ার মতো লালচে হয়ে উঠছে। তিনি আপসোস করে বলেন, ‘দিস ইজ জাস্ট লাইক দি ডেসক্রিপশন অব রৌরব হেল, ডু ইউ নো হোয়াট দ্য নারকা রৌরব মিনস্ ?’

ভারতীয় পুরাণে বর্ণিত নরক রৌরব সম্পর্কে আমি সম্যক অবগত, এ বিষয়ে কোডির কাছ থেকে বিশদভাবে জানার কোন জরুরত নেই, তবে উপদেশ দেয়ার সুযোগটি ছাড়ি না, বলি, ‘জাস্ট ট্রাই নট টু গো টু রৌরব।’ কোডি হাসতে গিয়ে খুকখুকিয়ে কাশেন। আমি তার দিকে ম্যাংগো জুসের একটি প্যাকেট বাড়িয়ে দিই। কোডি হাঁটু গেড়ে বসে জোড় হাতে আমাকে প্রণাম করে প্যাকেট গ্রহণ করেন।

গরমের তুমুল আঁচে বেশিক্ষণ টিকতে পারি না হ্রদপাড়ে। সরে আসি ক্যাম্প সাইটের দিকে। এদিকে লেপ্টানো লাভায় তৈরি হয়েছে সমতল চাতাল। উত্তাপ বাঁচিয়ে পর্যটকদের আনেকেই জড়ো হয়ে রীতিমতো মচ্ছব করছেন। মাঝেসাজে লু হাওয়া উড়িয়ে আনছে ধূসর ছাই।

আচানক একটি দৃশ্য চোখে পড়ে। জনাকতক শে^তাঙ্গ নওজোয়ান চার হাত-পায়ে ঘোড়া সেজেছে। তাদের পিঠে পা দিয়ে দুজন তরুণ উপরে উঠে পড়ে বয়েজ স্কাউটের কায়দায় তৈরি করে পিরামিড। তৃতীয় স্তরে উঠে সটান দাঁড়ায় পাটা-পুতার মতো গাব্দগোব্দা একটি যুবক। লিকলিকে দেহটিকে বাইম মাছের মতো বাঁকিয়ে একটি তরুণী বেয়ে উঠে বসে পড়ে নাদুসনুদুস জওয়ানটির ঘাড়ে।

অবস্থাদৃষ্টে মনে হয়, স্ক্যান্ডিনেভিয়ার কোনও দেশ থেকে সার্কাস কোম্পানির পুরো এক্রোবেটিক ট্রুপ এসে হাজির হয়েছে এখানে। কাঁধে বসে পা ঝুলান মেয়েটি এবার ঊর্ধ্বে তুলে ধরে আইফোনটি। কিছু একটা ঘটে যায়। তামেশগিররা হাততালি দেয়, বুঝতে পারি, মেয়েটি তালাশ পেয়েছে নেটওয়ার্কের। সে ‘নখটে-মখটে’ শব্দে অদৃশ্য কার সঙ্গে শুরু করে ফোনালাপ।

আমি নেটওয়ার্ক সন্ধানীদের পিরামিডটি ছাড়িয়ে আগ বাড়তে বাড়তে ভাবি, এক জামানায় খাবার ও বাসস্থানকে মনে করা হতো মানুষের মৌলিক দুটি চাহিদা, আজকাল মনে হয়, বেসিক নিড কনসেপ্টের বদল হয়েছে, মৌলিক চাহিদা হয়ে দাঁড়িয়েছে আইফোন ও ওয়াইফাই কানেকশন।

একটু সামনে যেতেই দেখা মেলে জানাশোনা জনাকতক পর্যটক। তীব্র গরমে লবেজান হয়ে এদের কেউ কেউ এমন ভঙ্গিতে আমাকে হাই-হ্যালো বলেন যে, তাঁদের গলার আওয়াজে মনে হয়, অ্যারতে-আলেতে এসে জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল করে বসেছেন।

খানিক দূরে আমোরা নামে এক মেক্সিকান-আমেরিকান যুবতীকে ঘিরে স্তাবকেরা রীতিমতো ব্যূহ রচনা করেছে। আমি উত্তাপে নাস্তানাবুদ হওয়া ট্র্যাকারদের হাতে জলের বোতল বা ম্যাংগো জুসের প্যাকেট দিতে দিতে আড়চোখে আমোরাকে ঘিরে দাঁড়ানো বৃত্তটিকে নজর করি। চোখমুখের এক্সাইটমেন্ট দেখে মনে হয়, কিছু একটা ঘটতে যাচ্ছে।

লালিবেলা শহরের একটি গেস্টহাউসে কাছাকাছি কটেজে বাস করেছি আমরা সপ্তাহ দিন, একই রেস্তোরাঁয় আহার-বিহার করার অসিলায় আমোরার সঙ্গে যৎসামান্য চেনাজানাও আছে। মেয়েটি লাস ভেগাসের ট্রেজার আইল্যান্ড নামক একটি ক্যাসিনোতে পৌল ড্যান্সার হিসেবে কাজ করে। বছর খানেক ধরে সে এ ক্যারিয়ারে থিতু হওয়ার চেষ্টা করছে। তার আগে আমোরা স্ট্রিপার গার্ল হিসেবে ব্যাচেলর পার্টিগুলোতে বিবস্ত্র হয়ে পারফর্ম করত। মেয়েটির ড্রামাটিক আচরণ করার স্বভাব আছে।

একবার রিসোর্টের সুইমিংপুলে আমোরা নগ্নবক্ষা হয়ে সূর্যস্নান করে বয়োবৃদ্ধ পর্যটকদের হৃৎপিণ্ডে সেনসেশনের সৃষ্টি করেছিল। স্তাবকেরা এ মুহূর্তে সরে গিয়ে তাকে জায়গা করে দিচ্ছে। স্লিভলেস টপের সঙ্গে নাভির নিচে নামিয়ে হটপ্যান্ট পরা আমোরা ঘুরে দাঁড়িয়ে আমাকে ওয়েভ করে। তার কোমরে মোচড় পড়তেই নাভিমূলে গাঁথা বেলিবাটন রিংয়ে ঝিলমিল করে উঠে তানজানাইট পাথর।

লাভাহ্রদ থেকে লম্ফ দিয়ে ওঠে আগুনের ফুলকি ছড়ান চিকন একটি স্তম্ভ। স্তাবকদের মধ্যে থেকে উত্থিত হয় উৎসাহের ‘ইয়াহু’ ধ্বনি। আমরা তার হাত দুটিতে ভর দিয়ে, দু-পা সুদর্শনভাবে বাতাসে ছড়িয়ে শূন্যে ঝুলে থাকি কিছুক্ষণ। কটিতে জড়ান ত্রিকোণা একটি স্কার্ফ খুলে পড়ে―ভিজিব্ল প্যান্টি-লাইন ছাপিয়ে উছলে ওঠে তার ভরাট নিতম্ব।

স্তাবকেরা এ পরফরম্যান্সে হতবাক হয়ে পড়ল কী―ঠিক বুঝতে পারি না। তাদের মুখ থেকে চু-রা জাতীয় ধ্বনিও বের হচ্ছে না, তবে ম্যাগনেটের দিকে ধেয়ে সেঁটে যাওয়া পেপার ক্লিপের মতো জোড়া জোড়া চোখ গেঁথে যায় পৌল ড্যান্সার মেয়েটির শরীরে। আমোরা অসামান্য দক্ষতায় উপস্থাপন করে কার্টহুইল নামে অ্যাক্রোব্যাটদের প্রিয় একটি ফিজিক্যাল ম্যানুভার। তুমুল হাততালি পড়ে।

মাথা ঝুঁকিয়ে বাও করে উঠে দাঁড়িয়ে মেয়েটি যুগলবক্ষ স্ফুরিত করে কিছুক্ষণ হাঁপায়। আমি ব্যাকপ্যাকের বাকি কয়েকটি বোতল এখানে বিতরণ করি। আমোরা এগিয়ে এসে শুকনা ঠোঁটে জিবের অগ্রভাগ বুলিয়ে কপট অভিমানের ভঙ্গিতে জানতে চায়, ‘ডু আই নট ডিজার্ভ অ্যা ড্রিংক ?’ আমি তার দিকে একটি ম্যাংগো জুসের প্যাকেট বাড়িয়ে দেই। সে ফিক করে হেসে বলে, ‘ফ্রম নাউ অন ইউ আর দ্য বেস্ট পার্সন অব দি হৌল ওয়ার্ল্ড।’

উত্তাপ ফের বাড়ে, পরিস্থিতিও কেমন গোলমেলে হয়ে ওঠে। দু-একজন হিপি গোছের পর্যটক বাঁশরি বা মাউথ অর্গান ফুঁকে। বেজায় বেসুরোভাবে বেজে ওঠে একটি গিটার। কেউ কেউ আমার দিকে উৎসুক নজরে তাকাচ্ছে। এরা আমাকে ভারতেবর্ষের মানুষ বিবেচনা করে যদি-বা ভরতনাট্যম উপস্থাপনের অনুরোধ করে বসে, আতঙ্কে আমি সরে আসি।

একজন গাইড মেগাফোন দিয়ে এনাউন্স করেন, ঘণ্টা খানেকের ভেতর চাঁদ উঠতে শুরু করবে। ভরা জোৎস্নায় লাভাহ্রদটির উথলে উঠার স্বভাব আছে। তিনি সকলকে আধঘন্টার ভেতর ক্যাম্পিংলটে ফিরে গিয়ে বিশ্রাম নিতে অনুরোধ করেন।

কিন্তু কারও মধ্যে ফিরে যাওয়ার কোনও উদ্যম দেখা যায় না। মেগাফোনওয়ালা ফের সকলকে পানীয়জল হিসাবে খরচ করতে বলে আশ^াস দেন―বেস-ক্যাম্প থেকে ব্রেকফাস্ট হিসেবে মিষ্টি রুটি, পানি ও ফ্রুট জুসের প্যাকেট প্রভৃতি নিয়ে উটগুলো রওনা হচ্ছে। সকাল সাড়ে ছয়টা নাগাদ তা বিতরণ করা হবে।

ক্যাম্পিংলটে ফিরতে হয়, কিন্তু কোথাও গাইড চিনুয়াকে লকেট করতে পারি না। তো মেগাফোনওয়ালাকে পাকড়াই, তিনি আমতা আমতা করে জানান, চিনুয়া হয়তো ইয়াকেব ও এলিশেবাকে পৌঁছে দিতে ক্যাম্পিংলটের দিকে গেছে। খোঁজাখুঁজি করে তিনি আমাকে একজন সৈনিকের হাওলা করে দেন।

আমরা হেঁটে সরে আসি হ্রদ-পাড় থেকে বেশ দূরে। হেডল্যাম্পের আলোয় ছড়ান ছিটান লাভাস্তূপ ছাড়া তেমন কিছু দেখা যায় যায় না। ঠিক বুঝতে পারি না, এদিকে ক্যাম্পিংলটে উঠে যাওয়ার জন্য নির্দ্দিষ্ট কোন ট্রেইল আছে কি না। জুতা কেবলই জড়িয়ে যাচ্ছে চিটচিটে লাভায়।

সৈনিকটি পেছনে পেছন হাঁটছে কেন ? আমাকে পথ দেখাবে না ? তাকে সামনে যেতে বলি, কিন্তু বন্দুকওয়ালা ইংরেজি, ফরাসি বা স্প্যানিশ কিছুই বুঝে না ? আমার প্রশ্নের জবাবে রোবটের মতো খ্যাকখ্যাকিয়ে হাসে।

এসে পড়ি, পাপড়ের মতো নরোম লাভাস্তরের ওপর। তা মুড়মুড়িয়ে ভেঙে যেতে থাকে। হেডল্যাম্পের আলোয় উড়ে রূপালি আভার ছাইকণা। মুচমুচে একটি স্তর পায়ের তলায় হুড়মুড়িয়ে ভেঙে গেলে, আমি কোনও ক্রমে শরীর বাঁকিয়ে সাঁতরে এসে ঘাটের পৈঠা জাপটে ধরার মতো হাত বাড়িয়ে ব্যালেন্স রক্ষা করি।

আমার নাজেহাল হালত দেখে সৈনিকটির হেলদোল কিছু হয় না। বিলা হয়ে চীৎকার করে আরবি জবানে জানতে চাই, ‘আইননা তারিকু বা হাঁটা-পথটি কোথায় ?’ চেঁচানোর শব্দে সে হাত তুলে আকাশের দিকে ইশারা করে। আমার গন্তব্য নক্ষত্রলোক নয়, যেতে চাচ্ছি খানিক উপরের ক্যাম্পগ্রাউন্ডে, এ সত্য লড়াইবিড়াই করনেওয়ালা নওজোওয়ানকে বোঝাই কীভাবে ? চুপচাপ আগ বাড়ি, আর ভাবিÑইথিওপিয়ায় মনে হয়, রাজ্যের চুকুমবুদাইদের ধরে ধরে আর্মিতে রিক্রুট করা হয়।

হেঁটে যেতে যেতে খেয়াল করি―খানিক দূরে গোয়েন্দাগল্পের ছায়ামূর্তিটির মতো নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে আমেরিকান আর্মি থেকে সদ্য খালাস পাওয়া লেফটেনেন্ট ন্যুনেস। লাভাহ্রদ থেকে ফিনকি দিয়ে চতুর্দিকের শূন্যতায় ছড়াচ্ছে নীলচে লোহিত স্ফুলিংগ। তার আভায় দেখি, ন্যুনেস যেন কল্পিত এক ক্যানভাসে ইশারায় এঁকে চলছেন চিত্র।

তাঁর দিকে নজর করে হাঁটছিলাম, ফসকে পড়ি গাড্ডায়, ডান পা ঢুকে পড়ে চোরাবালির মতো নরোম লাভার গর্তে। তুলে আনতে যুঝাযুঝি করি, তাতে কীরকম তেড়াবেঁকা হয়ে আরও ভেতরে ঢুকে পড়তেই আমার মুখ থেকে বেরিয়ে আসে যন্ত্রণার আওয়াজ। সৈনিকটি এবার আর নির্লিপ্ত থাকে না। টর্চলাইট জে¦লে, ব্যাটন দিয়ে খুঁচিয়ে, চাড় দিয়ে, অতঃপর গর্তটি সামান্য বড় করে সে আমাকে উদ্ধার করে।

আমি লাভা-গহ্বর থেকে রেহাই পেয়ে নানা ভাষায় তাকে ধন্যবাদ জানাই। ওসবে সাড়া না দিয়ে সে মোনাজাতের ভঙ্গিতে হাত-জোড়া আসমানের দিকে তুলে দেখায়। আন্দাজ করি, সে আমাকে ইষ্টনাম জপ করার ইশারা দিচ্ছে।

আমি ফের হাঁটতে হাঁটতে লেফটেন্যান্ট ন্যুনেসের কথা ভাবি। আমরা তথা পর্যটককুলের সঙ্গে তিনি লালিবেলা শহরের একই গেস্টহাউসে সপ্তাহ দিন ছিলেন। মানুষটি কথা বলেন কম। তাঁর ছবি আঁকার ধাত আছে। বছর দুয়েক আর্ট ¯ু‹লের ছাত্রও ছিলেন। ডিগ্রি-ডিপ্লোমা পাওয়ার আগেই ড্রপ-আউট হয়ে সেনাবাহিনিতে সামিল হন।

ইরাকে ডিপ্লোয়েড ছিলেন তিন বার। তিকরিত শহরে টহলদারির দায়িত্বে থাকার সময় ন্যুনেসের হামভি গাড়িটি রোডসাইড বোমায় বিধ্বস্ত হয়। সঙ্গী-সাথী গানাররা মারা গেলেও জ¦ালাপোড়া শরীরে একাধিক অস্ত্রোপচারের কল্যাণে তিনি রিকভার করেন। বেশ কতগুলো প্লাস্টিক সার্জারি করে চেহারা-সুরতে ব্যাপক মেরামতি করিয়েছেন। তাঁর মাথার খুলি জ¦লেপুড়ে চামড়া কুঁচকে যাওয়ায় ন্যুনেস হামেশা আফ্রো স্টাইলের বিরাট একটি পরচুলা পরে থাকেন।

কাছাকাছি এসে আমি আওয়াজ দিই, ‘হেই লেফটেনেন্ট, ওয়ানা ওয়াক ব্যাক টু ক্যাম্পিংলট। কামঅন অভার ম্যান, লেটস্ ওয়াক টুগেদার।’ আপত্তি জানান না ন্যুনেস, তবে জানতে চান, ভোরে ব্রেকফাস্ট কিছু দেবে কি না ? উটের পিটে চেপে রুটি-ফুটি আসছে বলে আমি তাঁকে আশ^স্ত করি।

হাঁটতে হাঁটতে আরেকটা বিষয় খেয়াল করি, ন্যুনেস ওপরের দিকে ঘাড় বাঁকিয়ে হাঁটছেন। তাঁকে সাবধান করে দিতে বলি, ‘দিস প্লেস ইজ ভেরি ট্রিকি, প্লিজ ওয়াচ ইয়োর স্টেপস্, লেফটেন্যান্ট।’ তিনি কিছু বলেন না, তবে কাঁধ শ্রাগ করে যেন বোঝাতে চান, এ রকম দুর্গমগিরি কান্তার মরু তো ইরাকে আকসার ট্র্যাক করেছি।

এবার মনে হয়, ন্যুনেস আকাশের দিকে তাকিয়ে তারকামণ্ডলে স্যাটেলাইটের তালাশ করছেন। ঘটনাটি তখন ঘটে। পায়ের নিচে কড়মড়িয়ে কিছু একটা কলাপ্স করে, হুড়মুড়িয়ে পড়েন তিনি গাড্ডায়, ‘ফাক দ্য ব্লাডি হেল’ আওয়াজ দিয়ে, শূন্যতায় রীতিমতো ধস্তাধস্তি করে তিনি ফের উঠে দাঁড়ান, কিন্তু বেশিক্ষণ স্থির হয়ে দাঁড়তে পারেন না। এক পা এগুতেই ফের ব্যালান্স হারান।

একটু আগে পা ফসকে আমি ব্যথা পেয়েছি, ঝুঁকি নিয়ে তাঁকে উদ্ধার করতে সাহস পাই না। কিন্তু সৈনিক জ্বলন্ত টর্চলাইটটি আমার হাতে দিয়ে এগিয়ে যায়। অবাক হই, নওজোয়ানটির গায়ে তুমুল তাকদ দেখে। দুহাতে জাপটে ধরে, টেনেহিঁচড়ে সে ন্যুনেসকে তুলে নিয়ে আসে। হেডল্যাম্পের আলোয় আমি লেফটেন্যান্টের মুখের দিকে তাকাই। তিনি বুঝদারের মতো হেসে সৈনিকের দিকে ইশারা দিয়ে বলেন, ‘সৌলজারস্ ডু নট লিভ দেয়ার ফলেন কমরেডস্ বিহাইন্ড।’ খোঁচাটা আমি হজম করে কিছু না বলে ফের আগ বাড়ি।

নানা হাঙ্গামার ভেতর দিয়ে কোনও ক্রমে উঠে আসি ক্যাম্পিং এরিয়ায়। ন্যুনেসের লটটি সহজে পাওয়া যায়। তিনিও সৈনিক―পরস্পরকে বারতিনেক বুট জুতার খটাখট আওয়াজ তুলে স্যালুট দিয়ে বিদায় জানান। তাদের মধ্যে ভাষাগত সমস্যার কারণে বাতচিত কিছু হয়নি, তবে বিদায় সম্ভাষণের বহর দেখে আন্দাজ করি, রতনে ঠিকই চিনেছে রতন।

আমার নিজস্ব ক্যাম্পিংলটে এসে দেখি, পাশের লটে ম্যাট্রেসের ওপর জানু ভিড়িয়ে চুপচাপ বসে আছেন ইয়াকেব। বলেন, ‘উই আর ওয়েটিং ফর ইউ, সুলতান।’ আমি তাঁর সঙ্গে যোগ দিয়ে ম্যাট্রেসে বসি, কিন্তু এলিশেবাকে কোথাও দেখতে পাই না। এদিক ওদিক তাকাতেই ইয়াকেব আঙ্গুল দিয়ে ইশারা করেন। দেখি, বেশ দূরে, শালে কাঁধ-মাথা ঢেকে, নিরিবিলিতে একাকী দাঁড়িয়ে এলিশেবা দুলছেন।

কিছু জিজ্ঞেস করতে হয় না, ইয়াকেব নিজে থেকে ব্যাখ্যা দেন, ‘এলিশেবা প্রার্থনা করছে, প্রতিদিন ঘুমাতে যাওয়ার আগে সে একবার তার অপঘাতে মৃত পূর্বপুরুষের স্মরণ করে পবিত্র গ্রন্থ তোরাহ পাঠ করে, তারপর বেশ খানিকটা সময় নিয়ে প্রার্থনা করে।’

কথাবার্তায় জানতে পারি, এলিশেবা বছর তিরিশেক আগে তাঁর জনম-দেশ পোলান্ড ছেড়ে ইসরাইলে এসে অভিবাসী হন। দ্বিতীয় বিশ^যুদ্ধের সময় জার্মানির দখলদার নাৎসি বাহিনী পোলান্ডে বাসরত ইহুদি সম্প্রদায়কে বন্দি করে পাঠিয়েছিল আস্চউইট্স্ কনসেনট্রেশন ক্যাম্পে। ওখানকার গ্যাসচেম্বারে নির্মমভাবে খুন হয়েছিলেন এলিশেবার পিতামহের-প্রায় পুরোপরিবার, যার অন্তর্ভুক্ত ছিলেন দাদা-দাদিসহ কিশোর বয়সি দুই চাচা ও এক খালা। তাঁর পিতার বয়স ছিল মাত্র চার, অজ্ঞাত কারণে শিশুটিকে জার্মানরা গ্যাসচেম্বারে পাঠায়নি। কিছুদিন পর সোভিয়েত ইউনিয়নের রেড আর্মি নাৎসিদের পরাজিত করে কনসেনট্রেশন ক্যাম্পে বন্দি হালতে বেঁচে থাকা বাদবাকি ইহুদিদের উদ্ধার করে। তাঁর পিতা বেড়ে উঠেছিলেন ওয়ারশো শহরের একটি এতিমখানায়।

ধন্যবাদ দিয়ে আমি উঠতে যাই। হাতের ইশারায় ইয়াকেব আমাকে থামিয়ে দিয়ে আস্তে করে বলেন, ‘ওয়েট অ্যা বিট, মিসেস হ্যাজ সামথিং টু শেয়ার উইথ ইউ।’ ঠিক ধরতে পারি না, এলিশেবার অভিপ্রায় কী ?

প্রার্থনা সেরে ফিরে আসতেও তিনি প্রচুর সময় নিচ্ছেন। এ সুযোগ আমার একটি কৌতূহল নিয়ে আমি কথা বলি। এক সঙ্গে গাড়িতে চড়ার সময় খেয়াল করেছি, এলিশেবা বিড়বিড় করে কী যেন প্রার্থনা করছেন। কোনও দ্বিধা না করে ইয়াকেব একটি ইহুদি ট্র্যাডিশনকে ব্যাখ্যা করেন। হাজার বছর ধরে ইহুদি সম্প্রদায় ভ্রমণ করছে, অভিবাসী হচ্ছে এক দেশ থেকে আরেক দেশে। মুসা নবীর (দ.) তত্ত্বাবধানে মিসর ছেড়ে সিনাই উপত্যকার দিকে যাওয়ার সময় তারা মরুভূমিতে হাঁটু গেড়ে বসে সদাপ্রভুর দরবারে সফল সফরের জন্য প্রার্থনা করেছিল।

হিব্রু ভাষায় ভ্রমণের প্রার্থনাটি ‘ফিলাত হাদেরে’ নামে পরিচিত। সে জামানা থেকে ফিলাত হাদেরে ইহুদি সম্প্রদায়ের সফরের পবিত্র মন্ত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমি প্রার্থনাটি হিব্রু ভাষায় শুনতে চাই, তিনি জবানি থেকে বলে যান, ‘ইহি রাতজন মিলফানেচা আ-ডোনোই ই-ল অহিনু …,’ সঙ্গে সঙ্গে আমার অনুধাবনের সুবিধার জন্য ইংরেজিতে তর্জমাও করেন, ‘মে ইট বি ইয়োর উইল লর্ড, আওয়ার গড এন্ড দ্যা গড অব আওয়ার এনসেসটরস্, দ্যাট ইউ লিড আস টুয়ার্ডস পিস, অ্যান্ড গাইড আওয়ার ফুটস্টেপস্ টুয়ার্ড পিস..।’ অর্থাৎ ‘প্রভ … আমাদের পূর্বপুরুষের হে সদাপ্রভু, সব কিছু ঘটে কিন্তু তোমার ইচ্ছায়, দেখাও আমাদের পথ, তোমার তত্ত্বাবধানে আমাদের পদযাত্রা যেন ব্রতী হয় শান্তির সন্ধানে।’

ক্যাম্পিংলটে ফিরে এসে ‘শালুম শালুম’ বলে হিব্রু কেতায় শান্তি কামনা করে এলিশেবা আমাকে শুভেচ্ছা জানান। তিনি ব্যাকপ্যাকের জিপার টেনে―খুলে কী একটা খোঁজাখুঁজি করছেন। মোমবাতির মৃদু আলোয় আমি তাঁর মুখের দিকে তাকাই, মনে হয়, মহিলা একটু আগে প্রার্থনার সময় দুলে দুলে অঝোরে কেঁদেছেন। তিনি গ্র্যান্ড মারিনার নামে একটি ফরাসি লিক্যুরের শিশি বের করে বলেন, ‘প্যারিসের চার্লস দ্যাগল এয়ারপোর্টে আমাদের ঘণ্টা কয়েকের জন্য যাত্রাবিরতি ছিল। তখন ছোট্ট বোতলটি কিনি এ ট্রিপে সুন্দর কিছু ঘটলে তা সেলিব্রেট করার জন্য।’

ইয়াকেব দ্রুত প্লাস্টিকের শটগ্লাসে তা ঢালেন। এলিশেবা একটি গ্লাস তুলে নিয়ে টোস্ট করার ভঙ্গিতে―ক্রমশ ফুটে ওঠা ছায়াপথের দিকে ইশারা করে বলেন, ‘দিস ইজ ইনডিড এন আনফরগেটেবোল নাইট।’ আমি আকাশের বেশ কতগুলো নক্ষত্রে তৈরি ক্যাসিওপিয়ার রানির সিংহাসনের দিকে তাকিয়ে ইয়াকেবের বাড়িয়ে দেওয়া হাত থেকে শটগ্লাসটি তুলে নিই। ‘শালুম শালুম’ বা ‘শান্তি শান্তি’ ধ্বনি তুলে আমরা অতঃপর কমলালেবুর ফ্লেভার ছড়ান পানীয়তে ঠোঁট ছোঁয়াই।

চুমুক দিয়ে এলিশেবা মৃদুস্বরে বলেন, ‘এই যে তোমার সঙ্গে একত্রে ট্র্যাভেল করে আমরা বন্ধু হয়ে উঠেছি, এ বিষয়টি কিন্তু আমাদের মনে থাকবে।’ শুনে আমি নীরবে তাঁর মুখের দিকে তাকাই। তিনি বাড়িয়ে দেন তাঁর শিরা ভাসা শীর্ণকায় হাতটি, আমি তাতে চুমো খাই। ইয়াকেব পাত্রের সম্পূর্ণ তরল খালাস করে দিয়ে বলেন, ‘রিমেমবার, উই আর ফ্রেন্ডস্ নাউ।’ সারাদিনে ধকল তো কম যায়নি। এ দম্পতির ঘুমানোর প্রয়োজন আছে। তো ‘গুডনাইট মাই ফ্রেন্ডস্’ বলে আমি বিদায় নিয়ে ফিরে আসি আমার ক্যাম্পিংলটে।

আসমানের তলায় গায়ে লেফ-চাদর কিছু ছাড়া ঘুমানোর চেষ্টা করি। আকাশগঙ্গা পরিষ্কারভাবে ফুটে উঠেছে। চেষ্টা করি, নক্ষত্রের নকশায় তৈরি তারকামণ্ডলগুলোর নাম মনে করতে। বোধ করি চাঁদ উঠছে, কারও প্রতি পূর্বরাগের নিবিড় অনুভূতির মতো ভাসমান কিছু বিচ্ছিন্ন মেঘদল রঙিন হয়ে উঠে ছড়াচ্ছে অপার্থিব আলো।

 লেখক : ভ্রমণসাহিত্যিক

Leave a Reply

Your email address will not be published.

shares