প্রচ্ছদ রচনা

আল মাহমুদের শরৎ অন্বেষণ

বাতাসে গড়িয়ে পড়ে বিদায়ের বিষণ্ণ নির্যাস

রাসেল রায়হান

 

মধ্যযুগের মৈথিলি কোকিল বিদ্যাপতি রাধার হয়ে বলেছিলেন, এ সখি হামারি দুখের নাহি ওর। এ ভরা বাদর মাহ ভাদর, শূন্য মন্দির মোর। রাধার এই হাহাকার নিয়েই যেন শরতের শুরু। ভাদ্র এসেছে মানেই শরৎ এসেছে, মাত্র বর্ষাকাল শেষ হলো, হারিয়ে যেতে যেতে সে তার পালক ফেলে গেছে। আর সেই বরষায়ন শেষে কোনো নারী যেন অনুশোচনা করছে, কেন উঠে এল পানি থেকে? তার ওপরে শরীর ভেজা থাকার লজ্জা!

আকাশে অকালপক্ক বৃদ্ধ মেঘেরা তীব্র লোভে সেই দৃশ্য দেখার জন্য উঁকিঝুঁকি মারতে থাকে। তাদের অতিরিক্ত ঘোরাঘুরিতে আকাশ বিরক্ত হয়ে ওঠে, আর প্রকৃতি লজ্জায় কুঁকড়ে যায়। সেই অনুশোচনা এবং লজ্জা থেকে নদীর তীরে তীরে জন্মাতে থাকে হাজার হাজার কাশফুল। দখিনা সুঘ্রাণা হাওয়ায় তারা নুয়ে পড়ে, আবার জেগে ওঠে। হাসনাহেনা, দোলনচাঁপা,  জারুল, শিউলি, কামিনী, কচুরি, বেলি,  ছাতিম,  রঙ্গন, টগর, মধুমঞ্জরি, মল্লিকা, মাধবী, শ্বেতকাঞ্চন, রাধাচূড়া, নয়নতারা, স্থলপদ্ম, সন্ধ্যামণি, ঝিঙে, জয়ন্তীর ঘ্রাণে ম ম করে চারপাশ। আকাশ ঝকঝকে, নির্মল, গাঢ় নীল । রাতে উজ্জ্বল জ্যোৎস্না। এর মধ্যে আবার ওড়াউড়ি করে লক্ষ লক্ষ জোনাকি।

দখিনা হাওয়ায় শিমুলের তুলোর মতো ভেসে আসে ধবধবে শাদা মেঘ। উজ্জ্বল রোদের মধ্য দিয়ে ভেসে আসে পাখির মহাকলরব। ভোরবেলা তাদের আনাগোনা বেড়ে যায়। গান, বন্দনায় তারাও মেতে ওঠে। ডাহুকের বাচ্চা দেওয়ার সময় হয়ে আসছে। প্রসারিত ডানা তাদের উড়িয়ে নিয়ে যায় উজ্জ্বল নীলিমার প্রান্ত ছুঁয়ে। নদীতে পাল তোলা হাজার নৌকা। ভাদ্র আর আশ্বিনের দুটি মাস শরতের এই সব রূপের ডালি নিয়ে আসে আমাদের সামনে। দূঃখের বিষয় হলো বাংলাসাহিত্যে খুব বেশি কবিসাহিত্যিক শরৎ-বন্দনায় মাতেননি। তুলনামূলকভাবে অন্যান্য ঋতুর চেয়ে তারা অবহেলা করেছেন শরৎকে। কদাচিতই তারা শরতের প্রেমে মজেছেন, লিখেছেন প্রেমপঙ্ক্তি, কদাচিতই গেয়েছেন বিষাদগীতি। বাংলার ঋতুবৈচিত্র্য এমনিতেই ছলনাময়ী রমণীর মতো, ক্ষণে ক্ষণে রূপ পালটায়। এই হাসছে তো এই কাঁদছে, এই আপনাকে দাঁড় করিয়ে দিচ্ছে খাঁ খাঁ শূন্যতার সামনে, এই দাঁড় করাচ্ছে ভরা ঐশ্বর্যের সামনে। আর কবিরা সেই ছলনাময়ী এক এক রূপ নিয়ে লিখছেন ঋতুগাথা। শুধু যেন শরৎই এড়িয়ে গেছে তাঁদের দৃষ্টি থেকে। তার মধ্যেও মাঝে মাঝে সৌভাগ্য নিয়ে তাঁদের কলমে এসেছে শরৎ। বাংলাসাহিত্যের অন্যতম প্রধান কবি আল মাহমুদের কবিতায়ও এসেছে সে, তাও খুব কমই বলা যায়। এক্ষেত্রে তার বিখ্যাত কবিতা তিতাস পাঠ করা যায় :

এ আমার শৈশবের নদী, এই জলের প্রহর

সারাদিন তীর ভাঙে, পাক খায়, ঘোলা স্রোত টানে

যৌবনের প্রতীকের মতো অসংখ্য নৌকার পালে

গতির প্রবাহ হানে। মাটির কলসে জল ভরে

ঘরে ফিরে সলিমের বউ তার ভিজে দুটি পায়।

অদূরের বিল থেকে পানকৌড়ি, মাছরাঙা, বক

পাখায় জলের ফোঁটা ফেলে দিয়ে উড়ে যায় দূরে;

জনপদে কী অধীর কোলাহল মায়াবী এ নদী

এনেছে স্রোতের মতো, আমি তার খুঁজিনি কিছুই।

কিছুই খুঁজিনি আমি, যতবার এসেছি এ তীরে

নীরব তৃপ্তির জন্য আনমনে বসে থেকে ঘাসে

নির্মল বাতাস টেনে বহুক্ষণ ভরেছি এ বুক।

একটি কাশের ফুল তারপর আঙুলে আমার

ছিঁড়ে নিয়ে এই পথে হেঁটে চলে গেছি। শহরের

শেষপ্রান্তে যেখানে আমার ঘর, নরম বিছানা,

সেখানে রেখেছি দেহ। অবসাদে ঘুম নেমে এলে

আবার দেখেছি সেই ঝিকিমিকি শবরী তিতাস

কী গভীর জলধারা ছড়াল সে হৃদয়ে আমার।

সোনার বৈঠার ঘায়ে পবনের নাও যেন আমি

বেয়ে নিয়ে চলি একা অলৌকিক যৌবনের দেশে।

 

একটু মনোযোগ দিয়ে কবিতাটি পাঠ করলে সহজেই বোঝা যায়, শৈশবের এই তিতাস শরতেরই নদী। অদূরের বিল থেকে পাখায় জলের ফোঁটা ফেলে দিয়ে দূরে উড়ে যাচ্ছে পানকৌড়ি, মাছরাঙা, বক। মায়াবী তিতাস জনপদে স্রোতের মতো নিয়ে আসছে অধীর কোলাহল । একটি কাশের ফুল আঙুলে ছিঁড়ে নিয়ে নিজের ঘর, নরম বিছানার দিকে হেঁটে যাচ্ছেন। সোনার বৈঠার ঘায়ে পবনের নাও বেয়ে চলছেন অলৌকিক যৌবনের দেশে। আল মাহমুদের এই কবিতাতে শরৎ শব্দের কোনো উচ্চারণই নেই, কিন্তু শরৎই উঠে এসেছে, আল মাহমুদিয় ঢঙে। এই কবিতাটিতে পাওয়া যাবে আমাদের পরিচিত সেই গ্রামীণ শরৎ। আমরা যেভাবে শরতের রূপ জেনে এসেছি। যে রূপ আমাদের পরিচিত জগতের মধ্যে বিরাজমান। হয়ত মূল উপজীব্য তাঁর শরৎ ছিল না, কিন্তু অবচেতনভাবেই শরৎ একটা বড় জায়গা নিতে পেরেছে তিতাস কবিতায়।

আল মাহমুদের সাক্ষাৎকারের একটি অংশ এখানে প্রাসঙ্গিকভাবেই উল্লেখ করা যায় : আমি কবি হবার জন্যই শহরে এসেছিলাম। তার মানে এই নয়, একজন কবি শহরে আসার সঙ্গে সঙ্গে পকেটে করে গ্রামকে শহরে নিয়ে আসতে পারেন। লেখায়, কবিতায় গ্রামের বিষয়-আশয় ছিল, তাছাড়া আবহমান বাংলা ও বাঙালির ঐতিহ্যের রূপদান করার চেষ্টা করেছি। আর বায়ান্নের ভাষা আন্দোলনের সময় কৈশোরে যে ঘর ছেড়েছি, সেই যে পলায়ন আর ঘরে ফেরা হয়নি। ফলে কবি না হয়ে আমার উপায় ছিল না। এক সময় চলে এলাম ঢাকায়। একটা টিনের সুটকেস ভর্তি বই নিয়ে ঢাকার স্টেশনে এসে নেমেছি। আমার বদমাশ বন্ধুরা বলে ভাঙা সুটকেস…সেই সুটকেসের  ভেতর তো বাংলাদেশ ছিল।

গ্রামদেশের মাঠ-ঘাট, বন-বাঁদাড়, নদী-নালা ডিঙিয়ে একদিন আল মাহমুদ এসেছিলেন ঢাকা নগরীতে। তারপর জীবনভর তিনি কবিতার খাতা-ভর্তি করেছেন বাংলাদেশ, বাঙালি আর বাঙালিয়ানার ছবি দিয়ে। তার কবিতায় বিভিন্ন ঋতুই এসেছে স¤পূর্ণ নতুন এবং মৌলিক একটি ঢঙে। তিনি যে একটি ফুলপাতা আঁকা সুটকেস নিয়ে রাজধানীতে পা রেখেছিলেন, প্রতীকী অর্থে এটাকেই গ্রামকে শহরে নিয়ে আসা হিসেবে দেখা যেতে পারে, অন্তত আমি এমনভাবেই দেখতে চাই। আলাদিনের প্রদীপের ভূমিকা নিয়েছিল যেন ঐ সুটকেস।  দেখতে একটি প্রদীপ হলেও ওর মধ্যে লুকায়িত ছিল একটি ইচ্ছাপূরণকারী দৈত্য। আল মাহমুদ যা চেয়েছেন, দৈত্য তাঁকে কি তাই দেয়নি? হ্যাঁ, আক্ষরিক অর্থেও যেন গ্রামকে তিনি শহরে নিয়ে এসেছিলেন। তাঁর লেখার ভঙ্গি, ভাষা, শব্দ ব্যবহার এবং অন্যান্য অনুষঙ্গের মাহমুদিয় ব্যবহার- এ কথার সপক্ষে বারবার প্রমাণ উপস্থাপন করে। সেই প্রমাণ কেমন? একটি নমুনা পেশ করি:

ঋতুর অতীত আমি। কে জিজ্ঞাসে এটা কোন মাস?

বাতাসে গড়িয়ে পড়ে বিদায়ের বিষণ্ণ নির্যাস।

শ্রবণেরও শক্তি নেই। কিন্তু ভারি কোলাহল আছে

প্রতিটা বাড়ির রন্ধ্রে, ইটে ইটে, আনাচে-কানাচে।

এটা কি শরৎ সন্ধ্যা? বাংলাদেশ? কাশফুলে ছেয়ে গেছে চর?

উদাম আকাশে তবে এখনও কি মাথার ওপর?

এমন নির্গন্ধ বায়ু কোনোকালে ছিল কি এদেশে?

আমার পঙ্ক্তি শুনে, কারা হাসে? প্রেতের আদেশে

মনে হয় মরে গেছে শরতের সন্ধ্যার শহর।

আর কোনো স্মৃতি নেই, ভীতি নেই, নীতি নেই কাঁপে থরথর

অস্তিত্বের কাঠামোখানি, হাড়গোড় রক্তের নহর।

এভাবেই কাব্য হয় তর্কে তর্কে কেঁপে ওঠে কবির অধর।

[একটি শরৎ সন্ধ্যা ]

 

বর্ষা বাদে অন্য সব ঋতুর ক্ষেত্রেই অন্যান্য কবিরা সাধারণত গ্রামের বর্ণনা টেনে আনেন। আল মাহমুদ এখানে, এ কবিতায় বলেছেন তাঁর দেখা শহরের শরতের কথা। বাতাসে গড়িয়ে পড়ছে বিদায়ের নির্যাস। কার বিদায়? বর্ষার? নাকি প্রেয়সীর? আল মাহমুদও শরতকে দেখছেন বিদায়ের মাস হিসেবেই। শরৎ তাঁকেও এক ধরনের হাহাকার দিয়ে যায়। প্রতিটি বাড়ির রন্ধ্রে, ইটে, আনাচে কানাচে তিনি কোলাহল শুনতে পাচ্ছেন তা কিন্তু নয়। তিনি ভাবছেন এই কোলাহলের কথা। আর বিভ্রান্ত কিংবা কৌতূহলী হচ্ছেন, এটা কি বাংলাদেশের শরতেরই কোনো সন্ধ্যা! এই কৌতূহলী প্রশ্ন বলে দেয় তিনি শরতের সন্ধ্যার এই নীরব নিষ্পন্দ দৃশ্যে অভ্যস্ত ছিলেন না, অন্তত বাংলাদেশে।

তার মানে শরৎকে তিনি কোলাহলমুখরতায় দেখতেই অভ্যস্ত ছিলেন। ঘ্রাণময় বায়ু টের পেতে  ছিলেন অভ্যস্ত। অথচ এখন কোনো প্রেতের আদেশে সেই শহর মরে গেছে। চারপাশে নির্গন্ধ বায়ু।

এখন স্মৃতি, ভীতি আর নীতিহীন অস্তিত্বের কাঠামো নিয়ে শহর কাঁপছে থরথর করে। হাড়গোড় রক্তের নহর নিয়ে। আর তিনি ক্রমশ ঋতুর অতীত হয়ে যাচ্ছেন। মাহমুদ শরতের কেমন রূপ দেখতে অভ্যস্ত, বোঝা যাবে কবির এই কবিতাটি পাঠ করলেই। তাঁর আরেকটি কবিতা পাঠ করা যাক এবার :

বাংলাদেশের আকাশে বাতাসে শরতের উদারতা

মেঘ ভেসে যায় মাথার ওপরে বৃষ্টির ছোঁয়া দিয়ে

ইচ্ছা হয় না ঘরের ভেতর বসে থাকি সারা দিন

কিন্তু বাইরে যাওয়ার ইচ্ছা টান লাগে সারা বুকে

মনে হয় যেন আমার যেন কান পেতে আছে কেউ

আজ সারা দিন হাওয়ার মাতম বইছে বাঁধন ছিঁড়ে।

শরতের চিরায়ত রূপ এখানেও আছে। আকাশেবাতাসে শরতের উদারতা আর মেঘ ভেসে বেড়াচ্ছে, বৃষ্টি আলতো বয়ে যাচ্ছে, আর কবি সারাক্ষণই টের পাচ্ছেন বাইরে যাওয়ার একটি নির্মোঘ টান। হাওয়া এবং হৃদয়ের মাতম এক সাথেই যেন তিনি টের পাচ্ছেন শরতে। মাহমুদের অন্য কিছু কবিতাতেও শারদীয় মহিমা ফুটে উঠেছে ; কখনও পূর্ণ রূপ নিয়ে, কখনও হয়তো টুকরো অনুষঙ্গ হয়ে।  কখনওবা সামান্য ছোঁয়ায়, টেরই পাওয়া যায় না এমনভাবে। তেমনই একটি কবিতা সদ্য, শরতে লেখা পদ্য :

হারিয়ে যাবার ইচ্ছা ছিলো; হারাইনি তো

দূরে যাবার কিচ্ছা শুনে-পা দু’খানি বাড়াইনি তো

তবু আমার পায়ের কথায় কাঁপছে মাটি

কোন দিকে যে আছে তোমার শীতল পাটি!

 

ঘুমে কেবল চোখের পাতা কাঁপছে দেখি

কাঁপছে আমার হাত দু’খানি, কাব্য লেখি

যে কবিতায় আছে তোমার চোখের কাজল

ভিজিয়ে নামে গালের ওপর অশ্রু বা জল।

 

অনেক দূরে জলের আওয়াজ শুনছি আমি

শুনতে কি পাও কাজলরেখা। দিবসযামী?

 

কোথায় যাব, নাম লিখেছি অস্তাচলে

এখন তোমার নামের ধ্বনি বুকের তলে।

 

সরাসরি শরতের কোনো বর্ণনা নেই কবিতাটিতে, কেবল সদ্য, শরতে লেখা পদ্য শিরোনামের মধ্যেই মাথা উঁচিয়ে আছে যেন শারদীয় মেঘ আর কাশফুল। গোটা কবিতায় দূরে জলের আওয়াজ পাওয়া ছাড়া আর কোনো বর্ণনা নেই প্রকৃতির, তবু এই কবিতাটিকে এড়িয়ে যাওয়ার কোনো উপায়ও নেই আমাদের। শরৎ মানে শুধু শরতের আকাশ, ফুল, মেঘ আর পাখিই তো নয়, এর পাশাপাশি কবির অনুভূতির ভেতরবাড়িতে যে শারদ-হাওয়া দোল খায়, তাকে আমরা উপেক্ষা করব কীভাবে!

এবার পাঠ করা যাক  সোনালি কাবিন থেকে, যা আল মাহমুদকে রাতারাতি বিখ্যাত করে তুলেছিল :

বৃষ্টির দোহাই বিবি, তিলবর্ণ ধানের দোহাই

দোহাই মাছ-মাংস দুগ্ধবতী হালাল পশুর,

লাঙল জোয়াল কাস্তে বায়ুভরা পালের দোহাই

হৃদয়ের ধর্ম নিয়ে কোন কবি করে না কসুর ।

কথার খেলাপ করে আমি যদি জবান নাপাক

কোনদিন করি তবে হয়ো তুমি বিদ্যুতের ফলা,

এ-বক্ষ বিদীর্ণ করে নামে যেন তোমার তালাক

নাদানের রোজগারে না উঠিও আমিষের নলা ।

রাতের নদীতে ভাসা পানিউড়ী পাখির ছতরে,

শিষ্ট ঢেউয়ের পাল যে কিসিমে ভাঙে ছল ছল

আমার চুম্বন রাশি ক্রমাগত তোমার গতরে

ঢেলে দেবো চিরদিন মুক্ত করে লজ্জার আগল

এর ব্যতিক্রমে বানু এ-মস্তকে নামুক লানত

ভাষার শপথ আর প্রেমময় কাব্যের শপথ ।

 

পাঠক, এখানেও কি শরতেরই আমেজ খুঁজে পান না আপনি?  খেয়াল করুন, এ কবিতায় বর্ণিত বর্ষার ফেলে যাওয়া পালকই যেন এই বৃষ্টি; তিলবর্ণ ধান রোপিত হচ্ছে, লাঙল, জোঁয়াল, কাস্তে আর বায়ুভরা পালও হয়তো শরতেরই অনুষঙ্গ। আর রাতের নদীতে ভাসা পানিউড়ি পাখি; শান্ত ঢেউয়ের পাল ভাঙছে এও তো শরতেরই। আমরা যদি কবিতাটির পুরো দৃশ্যপটকে এভাবে বিশ্লেষণ করি, খুব ক্ষতি হবে কি?

আবারও পুরনো একটি প্রসঙ্গ টেনে আনছি। গ্রামকে শহরে নিয়ে আসার কথা বলেছিলেন আল মাহমুদ । গ্রামীণ অনুষঙ্গের ব্যবহারই যদি এই কথার ভিত্তি হয়, যদি গ্রামকে শহরে নিয়ে আসা মানে হয় গ্রামের বর্ণনা শহরের মানুষের কাছে পৌঁছানো, তাহলে আমরা বলতেই পারি, জসীম উদ্দীনও গ্রামকে নিয়ে এসেছেন শহরে। এনেছেন জীবনানন্দও। কিন্তু এখানে আমরা ব্যাপারটিকে এভাবে না দেখার পক্ষপাতি। তাহলে কীভাবে দেখা যাবে? আমরা বরং এভাবে দেখতে পারি যে কীভাবে গ্রামের একটি বিকল্প ছায়া শহর পর্যন্ত দীর্ঘ করা যায়। সেক্ষেত্রে, একটি শরৎ সন্ধ্যাই সবচেয়ে উজ্জ্বল উদাহরণ। এটি পাঠ করলে হাতেনাতে প্রমাণ পাওয়া যায় কীভাবে গ্রামের ছায়াকে আল মাহমুদ দীর্ঘতর করে টেনে এনেছেন শহরের রাস্তায়।

শুরুতেই বলেছি, আবারও বলি : শরৎ সম্ভবত বাংলা সাহিত্যে সবচেয়ে অবহেলিত ঋতু। দুঃখ এবং বিরহের প্রতীক হিসেবে বর্ষা উঠে এসেছে বিবিধ ব্যঞ্জনায়, গ্রীষ্ম রুক্ষতার প্রতীক, আর হেমন্তকে তো জীবনানন্দ দাশ আমাদেরকে প্রায় মুখস্থ করিয়ে ছেড়েছেন। কবিদের কবিতায় শীতও এসেছে নানাভাবে; কখনও শূন্যতারিক্ততার প্রতীক হিসেবে, কখনও প্রেমের আবহে। আর বসন্ত মানেই তো প্রেম। এর মধ্যে এত অবহেলায়ও শরৎ তার সৌন্দর্যের উরু খুলে দিয়েছে ক্রীত রক্ষিতার মতন। কেউ কেউ- কোনো কোনো- কবি কিঞ্চিৎ অনুগ্রহে যেন প্রবেশ করেছে সেই প্রান্তরে। এ পর্যায়ে নিজের একটি অভিমতের কথা বলি : আমার কাছে মনে হয়, অবহেলিত শরৎ ঋতু ধৈর্যের প্রতীক। তার মতো ধৈর্যশীল রূপবতী রমণী আর দ্বিতীয়টি নেই। পুরুষ প্রতিদিন বাইরে থেকে এসে তাদের পেটাবে, তাও সে হাসতে হাসতে তারই শয্যাসঙ্গিনী হবে, পানীয় আর বাদাম পরিবেশন করবে। এত অবহেলার মাঝে শরৎ নিয়ে সব থেকে বেশি উচ্চারিত পঙক্তিটি বিদ্যাপতিরই : এ ভরা বাদর মাহ ভাদর, শূন্য মন্দির মোর। সেখানেও শরতের কোনো বন্দনা নেই। শরৎ এখানে স্রেফ শূন্যতারিক্ততার উপমাচিত্রকল্পে অনুরণিত হয়। যদিও আলোচ্য পঙ্ক্তিমধ্যে মূল আলোটি কিন্তু ফেলা হয়েছে রাধার শূন্য মনমন্দিরকে কেন্দ্র করেই। অর্থাৎ শরৎপ্রতিমা এখানেও পেয়েছে কেবল বঞ্চনা, অবহেলা।

তবু শরৎ আসে, শরৎ যায়। স্বীয় রমণীর মতো পেতে দেবে উরু। তখন আমাদের আল মাহমুদের মতো অন্য কোনো কবি হয়তো শরৎ নিয়ে লিখবেন নিজস্ব ঢঙেই। তখন কি অন্য সুষমায় শরৎকে দেখতে পাব আমরা? এখন বরং আপাতত সেই আশাতেই থাকি। আর পাঠ করি আল মাহমুদের শারদমাখা কবিতা :

একটি কাশের ফুল তারপর আঙুলে আমার

ছিঁড়ে নিয়ে এই পথে হেঁটে চলে গেছি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may have missed

shares