syed-shamsul-hoque-kobita1

প্রচ্ছদ রচনা

‘অনন্তকাল মুঠোর ভেতরে বন্দি’

সৈয়দ শামসুল হকের কবিতাগুচ্ছ

 

১ ॥ আর দ্যাখো! এর মধ্যেই

 

অনন্তকাল মুঠোর ভেতরে বন্দি

এই বীতশ্রদ্ধ পান্ডুর বৃক্ষবিতানের ভেতর দিয়ে

এই নিয়ে এখন হাঁটছি তো হাঁটছিই

কোনো ছাড়ান বা বিরাম নেই।

আর দ্যাখো! এর মধ্যেই

পঙক্তির পর পঙক্তি!

আসছে তো আসছেই।

করতলে ভোমরার কামড়, কিন্তু কানের ভেতর দিয়ে

মরমে তার অবিরাম গুঞ্জনের ধ্বনি।

তার মনে এর ভেতরেই কি চিরকালের সেই অমরত্ব? –

যার প্রার্থনার সেই কিশোরকাল থেকে

মাইকেল ও রবীন্দ্রনাথ হয়েÑ না থামছি না,

আমি পর্যপ্ত। আমি!

তাকিয়ে দেখি জীবন তো সামান্যই, নৌকাটি বৃহৎ!

ও পঙক্তি! ও ভোমরা! ও তোমার কামড়! ও কবিতা!

পান্ডুর গাছগুলোকে সবুজ করে দাও,

যদি শব্দের সেই শক্তি থাকে

তবে একটি জগৎ তোমাকে সৃষ্টি করতে বলছি না

একটি মাত্র ফুৎকারে-

এই সবুজতার ভেতরে সামান্য মানুষকে তুমি

পাতার মুকুট পরিয়ে দাও-

এই মাত্র! আর কিছু নয়!

আমার স্তিমিত টেবিল-বাতিতে একটুখানি উজ্জ্বলতা,

আর, কামড় সহনের ওষুধরূপে

কয়েকটি পঙক্তি-

আর কিছু নয়! মুঠোর ভেতরে অনন্তকাল হাঁটা-

ইতিহাসে আমারও থাকুক

সামান্যই একটি ওঙ্কার ॥

 

২৬ শে জুন ২০১৬ লন্ডন

 

syed-shamsul-hoque-kobita2-edit

 

২ ॥ ওই আয়নায় অস্তিত্বের বিজলি চমকায়

 

ভালোবাসা কী? শিমুলগাছের তলায়

আটকে আছে আয়না ভাঙা- বৃষ্টি হয়েছিলো।

প্রশ্নটার উত্তর তো ছিলো

যখন গান রবীন্দ্রনাথ তুলে দিচ্ছেন গলায়!

ভৈরবী সে, মালকোষেতেও পাই-

শিমুল ফুলের লাল ছায়াটি পড়েছে ভাঙা আয়নায়-

ইমনকল্যাণের সুরে সেই তো ভালোবাসাই!

ওই আয়নায় অস্তিত্বের বিজলি চমকায়।

মঞ্জু, তুমি প্রশ্ন করো ভালোবেসেছি কিনা!

আমার এই অঘোরকালে কে দেবে উত্তর?

যে-রাতে মোর দুয়ারগুলি

গাইছি ভাঙা গলায়!

 

২৮ শে জুন ২০১৬ লন্ডন

 

৩ ॥ প্রচ- চাপের মুখে সব আজ অতল গহ্বরে

 

চল্লিশ কদম মাত্র, তারপর সংযোগ বিচ্যুত।

সদ্য এই কবরের বুকে কিছু কোদালের দাগ।

এই যে লোকটি- ছিলো কতটাই কাল উপদ্রুত!-

সে সব এখন নয়, নীরবতা আঁকড়ে ধরে থাক।

তার জন্য এখন না হয় করি দান-খয়রাত-

ভিখিরির ভিক্ষা নয়, তাকে দিই প্রশংসা ও স্তুতি

যা তার প্রকৃত প্রাপ্য, কিম্বা তাও নয়, অকস্মাৎ

এসব বদান্য ঝরে পড়ে যায় যেনবা বিভূতি।

লোকটিকে খুব ভালো রেখে আসা গিয়েছে কবরে।

বন্ধুরা নিবিড় হয়ে গোরস্তানে করেছিলো ভীড়-

এখানে আকাশে দুটি পাথরের কবুতর ওড়ে,

আমাদেরও বিষণ্নতা- ছিল, নেই!- আমাদেরও নীড়।

প্রচ- চাপের মুখে সব আজ অতল গহ্বরে,

লেখার টেবিলে দেখি- আরে!- আমিও কী করে

পৃথিবীর সব শোক দুঃখ দ্যাখো মধ্যরাতে আছি পড়ে ॥

 

২৮ শে জুলাই ২০১৬ লন্ডন

 

৪ ॥ শব হবে না মরে গেলেও

 

একটি দুটি আঁচড় মাত্র

তার বেশি তো নয়!

আজও তারই জ্বলন এত        এই দেহটি সয়।

ভার বেশি তো নয়!

সেই আঁচড়ে ফুটেছিলো যে   তাতেই বুঝি হয়।

আজও এই শাদা খাতায়

পদ্য লিখে চলা,

গুটি কয়েক শব্দ, কটি           আঁচড়ে বুক জ্বলা।

সজল তো এইটুকুনই

এতেই পরাভব!

মৃত্যু ওঠে চোখ রাঙিয়ে

হবেই না সে শব!

শব হবে না মরে গেলেও থাকবে সে জীবন্ত-

বাংলাভাষার বুকে থাকবে উচ্চারণের সন্ত ॥

 

৫ই আগস্ট ২০১৬ লন্ডন

 

syed-shamsul-hoque-kobita3

৫  ॥ একেই কী বলে কথা বলা

 

সবার ভেতরেই নিঃসঙ্গ একটি প্রণালী আছে,

শব্দহীন বহে যায় তার জল,

তাকেই শব্দিত করা-

একেই কী বলে কথা বলা!

নাকি এই জলের পরিণতিই এই-

যুক্ত হবে সে অন্য কোনো প্রণালীর জলে।

কে জানে! এই ভাবে বহে যেতে যেতে

নিজেদের নিঃসঙ্গ ভেতরে-

সিন্ধুচিল ওপর দিয়ে উড়ে যেতে দেখি;

দেখি, তার ডানার তলায়

স্বর্গের থেকে উড়ে আসা নাছোড় একটি ছবি-

রোগবৃক্ষের সবুজ শব্দ শাখায়

এখনো ঝুলে আছে সূর্য-

অস্ত সে যাবে না কিছুতে।       আমি তার আলোয়

ঝটিকা খাচ্ছি লাল সবুজ আর নীল-

আর এই কবিতাটি লিখছি অন্ধকারে

আঙুলে কেবল অনুমান করে-

এই হচ্ছে ল’ আর এই হচ্ছে শ’,

কিন্তু লাশ এখনো নয় : যেমন নয় সূর্যাস্ত এখনো  ॥

 

৫ই জুলাই ২০১৬ লন্ডন

 

 

 

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares