প্রবন্ধ : উপন্যাসের রূপশ্রেণি : মাহবুবুল হক

পর্ব-১

বিষয় ও প্রকরণগত বহুল সম্ভাবনার প্রেক্ষাপটে উপন্যাস অনেকগুলো রূপশ্রেণিতে বিভক্ত হতে পারে। আবার একই উপন্যাস একাধিক রূপশ্রেণির অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। এদের মধ্যেকার রূপশ্রেণিগত পার্থক্য নিরূপণে কয়েকটি মানদণ্ড ব্যবহার করা যেতে পারে। যেমন :

১.         গঠনরূপ অনুসারে : ১.১ পত্র-উপন্যাস, ১.২ কাব্যধর্মী উপন্যাস, ১.৩ মহাকাব্যিক উপন্যাস, ১.৪  আত্মজৈবনিক, ১.৫ নিরীক্ষামূলক, ১.৬ ত্রয়ী উপন্যাস ইত্যাদি।

২.         উদ্দেশ্য ও সাধারণ প্রবণতা অনুসারে : ২.১ ঐতিহাসিক উপন্যাস, ২.২ সামাজিক উপন্যাস, ২.৩. মনস্তাত্ত্বিক উপন্যাস, ২.৪. দার্শনিক উপন্যাস, ২.৫ রাজনৈতিক উপন্যাস, ২.৬ আঞ্চলিক উপন্যাস, ২.৭ কারা উপন্যাস, ২.৮ গথিক উপন্যাস, ২.৯ শিক্ষামূলক উপন্যাস, ২.১০ রূপক উপন্যাস, ২.১১ থিসিস উপন্যাস ইত্যাদি।

৩.        জনপ্রিয় বিনোদনমূলক বৈশিষ্ট্য অনুসারে ৩.১ রোমান্স উপন্যাস, ৩.২ কল্পবিজ্ঞান উপন্যাস, ৩.৩ গোয়েন্দা উপন্যাস, ৩.৪ গুপ্তচর উপন্যাস, ৩.৫ হাস্যরসাত্মক উপন্যাস, ৩.৬ আজগুবি উপন্যাস, ৩.৭ রোমহর্ষক উপন্যাস, ৩.৮ ওয়েস্টার্ন উপন্যাস ইত্যাদি।

১. উপন্যাসের গঠনরূপগত শ্রেণিবিভাগ

১.১. পত্র-উপন্যাস (Epistolary Novel)

পত্র-উন্যাসে কাহিনি বিবৃত হয় চরিত্রগুলোর লেখা পত্রের মাধ্যমে। এ ধরনের উপন্যাসে বর্ণিত ঘটনা ও তথ্য পত্রাকারে লেখা হয় অথবা পত্রের ভাষায় উপন্যাসের চরিত্র ও আখ্যানবস্তু বিকশিত হয়।

পত্র-উপন্যাসে নিজ নিজ পত্রের মাধ্যমে চরিত্রেরা তাদের ব্যক্তিগত মানসিক প্রতিক্রিয়া, আবেগ ও অনুভূতি, অভিজ্ঞতা ও উপলব্ধি, ধারণা ও দৃষ্টিভঙ্গি ইত্যাদি সরাসরি পাঠকের সামনে তুলে ধরে। ফলে চরিত্রের সমস্ত চিন্তা ও অনুভবের সঙ্গে পাঠকের নিবিড় যোগাযোগ ঘটে। পাঠক সহজেই উপন্যাসের চরিত্রগুলোর অন্তরকে স্পর্শ করতে পারে। এভাবে চরিত্র-চিত্রণই এ রূপবৈশিষ্ট্যের উপন্যাসের প্রধান বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। আর লেখকের পক্ষে অনেক বেশি নৈর্ব্যক্তিক ভূমিকায় থাকা সম্ভব হয়।

এ ধরনের উপন্যাসে কাহিনি ধারা ও অন্যান্য চরিত্র সম্পর্কে জানা যায় স্বয়ং পত্রলেখকের জবানিতে। এর বাইরে কিছু থাকলে তা পাঠককে কল্পনা করে নিতে হয়। প্রতিটি চরিত্র আপন বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী নিজস্ব ভঙ্গি ও ভাষায় আত্মকথনে মগ্ন থাকে বলে ঔপন্যাসিক পত্রের বিষয় ও রচনারীতিতে পার্থক্য ও বৈচিত্র্য প্রদর্শনের সুযোগ পান। তা উপন্যাসকে দেয় চমৎকার রসবৈচিত্র্য।

তবে পত্র-উপন্যাসের দুর্বলতার দিকও উপেক্ষণীয় নয়। এ ধরনের উপন্যাস পড়ে কখনও কখনও পাঠকের মনে হতে পারে যে, চরিত্রগুলো যেন চিঠি লেখার অসম্ভব বাতিকে ভুগছে। দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর পত্র কখনও কখনও উপন্যাসের ঐক্য ও সংহতিকে বিনষ্ট করে। কখনও একঘেয়েমির ভারে পাঠক ক্লান্ত হয়ে পড়ে। এমনটি দেখা যায় রিচার্ডসনের বেশ বড় পরিসরের পত্র-উপন্যাস স্যার চার্লস গ্র্যান্ডিসনে। এর নায়িকা হ্যারিয়েট বায়রন একই দিনে যথাক্রমে চৗদ্দ, ছয় ও বারো পৃষ্ঠার তিনটি চিঠি লেখেন। পরের দুদিনে লেখেন  মোট আটান্ন পৃষ্ঠার আরও চারটি পত্র। পরিমিতিবোধের অভাবে পত্র-উপন্যাস যে ক্লান্তিকর হয়ে উঠতে পারে এ উপন্যাস তার নিদর্শন।

আঠারো শতকের ইংরেজ ঔপন্যাসিক স্যামুয়েল রিচার্ডসন (১৬৮৯-১৭৬১) পত্র-উপন্যাস রচনার জনক।  তাঁর লেখা প্রথম পত্র-উপন্যাস হচ্ছে পামেলা (Pamela or Virtu Rewarded, ১৭৪০)। কিশোর বয়স থেকেই রিচার্ডসন নিরক্ষর পরিচারিকা, নারী শ্রমিক ও প্রতিবেশি মেয়েদের প্রেমপত্র লিখে দেওয়ার কাজে হাত পাকিয়েছিলেন। তাঁর সেই অভিজ্ঞতার ফসল এই পত্র-উপন্যাস। এ উপন্যাসে পত্রাকারে বর্ণিত হয়েছে সাধ্বী পরিচারিকা পামেলা অ্যান্ড্রুজের সঙ্গে তাঁর মনিবপুত্রের প্রণয়ঘটিত সম্পর্কের কাহিনি। ক্ল্যারিসা (Clarisa or the History of the Young Lady, ১৭৪৮) স্যামুয়েল রিচার্ডসনের দ্বিতীয় পত্র-উপন্যাস। বান্ধবী মিস হাওকে লেখা  সদ্বংশজাত তরুণী ক্ল্যারিসার পত্রাবলি এবং বন্ধু বেলফোর্ডকে লেখা লাভলেসের চিঠিপত্রের মধ্য দিয়ে নির্মিত হয়েছে এ উপন্যাসের আখ্যানভাগ।  রিচার্ডসনের তৃতীয় উপন্যাস স্যার চার্লস গ্রান্ডিসনও (১৭৫৪) পত্রাকারে লিখিত। বিত্তবান ও অভিজাত স্যার চার্লস ও হ্যারিয়েট বায়রনের প্রণয়কাহিনি এ উপন্যাসে বর্ণিত হয়েছে পারস্পরিক পত্র-বিনিময়ের মধ্য দিয়ে।

আঠারো শতকের ফরাসি দার্শনিক জাঁ জাক রুশো-র খধ ঘড়াঁবষষব ঐবষড়রংব (১৭৬১) উপন্যাস এই রীতির উদাহরণ। এই শতকে টোরিয়াস স্মোলেটের The Expedition of Humphry Clinker (১৭৭১) পাঁচটি মুখ্য চরিত্রের চিঠিপত্র আদান-প্রদানের রীতিতে লেখা। পরবর্তী দুশ বছরে বিচ্ছিন্নভাবে কিছু পত্র-উপন্যাস লেখা হয়েছে। উল্লেখযোগ্য হচ্ছে : রুশ কথাসাহিত্যিক ফিয়োদর দস্তইয়েভস্কি রচিত গরিব লোক (১৮৪৫); সুইনবার্নের Love’s Cross Currents (১৮৭৭); মার্ক হ্যারিসের Wake up, Stupid (১৯৫৯) ও জন বার্থের  Letters (১৯৭৯)।

বাংলা সাহিত্যে প্রথম পত্র-উপন্যাস নটেন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা বসন্তকুমারের পত্র (১৮৮২)। এছাড়া পত্র-উপন্যাস হিসেবে উল্লেখযোগ্য : কাজী নজরুল ইসলামের বাঁধনহারা (১৯২৭), মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের চিন্তামণি (১৯৪৬), বনফুলের কষ্টিপাথর (১৯৫১), নিমাই ভট্টাচার্যের প্রিয়বরেষু (১৯৮৭), মেমসাহেব (১৯৮৫), সন্তোষকুমার ঘোষের শ্রীচরণেষু মা-কে (১৯৭১) বুদ্ধদেব গুহর মহুয়ার চিঠি (১৯৬২), মহুল সুখার চিঠি (১৯৮৪), কেতকীকুশারী ডাইসনের নোটন নোটন পায়রাগুলি (১৯৮৩), প্রেমেন্দ্র মিত্রের প্রিয়তমাসু, শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়ের ক্রৌঞ্চমিথুন, অবরোহী ইত্যাদি। তরুণ কুমার ভাদুড়ীর  সন্ধ্যাদীপের শিখা অংশত পত্র-উপন্যাসরূপে গণ্য হওয়ার যোগ্য।

বাংলা সাহিত্যে পত্র-উপন্যাস রচনার দ্বারা নিজ স্বাতন্ত্র্য চিহ্নিত করেছেন বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায়। তাঁর  পোনুর চিঠি (১৯৫৪) হাস্যরসাত্মক কিশোর-রচনা। এতে পত্রাবলির মাধ্যমে বিবৃত কয়েকটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা ও অভিজ্ঞতা স্থান পেয়েছে।

১.২. কাব্যধর্মী উপন্যাস (Poetic Novel )

কাব্যধর্মী উপন্যাসে আখ্যানভাগ ও চরিত্রনির্মাণের চেয়ে লালিত্যময় ভাষার মাধ্যমে সৃষ্ট কাব্যমাধুর্য বেশি প্রাধান্য পেয়ে থাকে। প্রধান হয়ে ওঠে ঔপন্যাসিকের কবিত্বময় দৃষ্টিভঙ্গি। বাস্তবজীবনের প্রত্যক্ষ দ্বন্দ্ব-সংঘাতময় বহুমাত্রিক জটিলতার চেয়ে নিঃসঙ্গ মনোজগতের দ্বিধা-দ্বন্দ্ব-সংশয় ইত্যাদি কাব্যধর্মী উপন্যাসের বিষয়। তা মানবমনের গভীর গোপন সংবেদনগুলোকে উন্মোচন করে কাব্যময় ভাষার আশ্রয়ে। শুধু তাই নয়, ঘটনা বর্ণনায়, চরিত্রের চিত্রণে, প্রকৃতি ও পরিবেশের রূপচিত্র অঙ্কনে ব্যঞ্জনাময় কাব্যভাষা ব্যবহার কাব্যধর্মী উপন্যাসের সার্থকতার ভিত্তি।

এ ধরনের উপন্যাসে প্রায়শ বর্ণনার বিস্তারে ফুটে ওঠে প্রকৃতির অপার সৌন্দর্যের অন্তর্লীন রহস্যময়তা। তবে সে বর্ণনা হয় কাব্য-সুষমামণ্ডিত। কারণ, সে বর্ণনার ভাষা সমৃদ্ধ হয় অত্যন্ত কোমল রোমান্টিক আবেগ ও ছন্দোময় গীতিময়তায়। উচ্চাঙ্গের কল্পনামাধুর্য, অনুপম চিত্রকল্প, ব্যঞ্জনাময় অনুভূতি ইত্যাদির মাধ্যমে কাব্যধর্মিতার প্রকাশ ঘটানো হয়ে থাকে। তাতে আখ্যান বা প্লটের বিন্যাসের চেয়ে প্রাধান্য পায় চরিত্রনির্মাণ। আবার চরিত্র নির্মাণের ক্ষেত্রে বাইরের ক্রিয়া ও আচরণের চেয়ে গুরুত্ব দেওয়া হয় মানবমনের অন্তর্লোক উন্মোচনের ওপর।

উনিশ শতকের ইংরেজ ঔপন্যাসিক টমাস হার্ডি-র অধিকাংশ উপন্যাসই কাব্যধর্মী। এই শতকের বিখ্যাত রুশ লেখক ইভান তুর্গেনেভের উপন্যাসও এই শ্রেণির। উপন্যাসের বর্ণনা, চিত্রকল্প, শব্দের ব্যঞ্জনা যে কতটা কাব্যধর্মী হয়ে উঠতে পারে তার বিশিষ্ট  উদাহরণ ভার্জিনিয়া উলফ-এর দি ওয়েভ্স্ (The Waves, ১৯৩১) ।

বাংলা সাহিত্যে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের কপালকুণ্ডলা (১৮৬৬) ও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শেষের কবিতা (১৯২৮) কাব্যধর্মী উপন্যাসের উদাহরণ। কাব্যধর্মী উপন্যাসে বুদ্ধদেব বসু সমধিক স্বীকৃত নাম। তাঁর যেদিন ফুটল কমল (১৯৩৩) উপন্যাসটির কাব্যময় প্রতিবেশ পাঠকের মনে গীতিকাব্যের অনুরণন তোলে। এছাড়াও তাঁর রডোডেনড্রনগুচ্ছ (১৯৩৪), নির্জন স্বাক্ষর (১৯৫১) ও তিথিডোর (১৯৪৯) এ প্রসঙ্গে স্মরণীয়। বাংলা সাহিত্যে চিত্রকল্পনির্ভর, প্রতীকী ও রহস্যজটিল কাব্যধর্মী উপন্যাসের উদাহরণ কমলকুমার মজুমদারের অন্তর্জলী যাত্রা (১৯৫৮/১৯৫৯)। অন্যান্য কাব্যধর্মী উপন্যাসের মধ্যে উল্লেখযোগ্য : অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্তের ঊর্ণনাভ (১৯৩৩), আসমুদ্র (১৯৩৪) , রূপসী রাত্রি (১৯৫৯) ইত্যাদি।

১.৩ মহাকাব্যিক উপন্যাস  (Epic Novel)

এ ধরনের উপন্যাসে মহাকাব্যের মতো এক সুবিশাল প্রেক্ষাপট ও কালপরিসরে জীবনের চিত্রায়ণ ঘটে। মহাকাব্য ও মহাকাব্যিক উপন্যাসের মধ্যে কিছু পার্থক্য রয়েছে। যেমন : মহাকাব্যে অতিপ্রাকৃতের অস্তিত্ব থাকতে পারে, কিন্তু মহাকাব্যিক উপন্যাসে অতিপ্রাকৃত নয় বাস্তবতাই প্রত্যাশিত।

রুশ লেখক লেভ তলস্তয়ের সমর ও শান্তি (War and Peace) (১৮৬৩-৬৯/১৮৬৫-১৮৭২) উপন্যাসটি চিন্তা ও উপস্থাপনের দিক থেকে মহাকাব্যোপম। ইংরেজি সাহিত্যে জেমস জয়েসের লেখা ইউলিসিস (১৯২২), রুশ সাহিত্যে মিখাইল শলোকভের ক্লাসিক সৃষ্টি প্রশান্ত দন (১৯২৬-৪০), বরিস পাস্তেরনাকের ডক্টর জিভাগো (১৯৫৭) মহাকাব্যিক উপন্যাসের উল্লেখযোগ্য নিদর্শন। বাংলা সাহিত্যে মীর মশাররফ হোসেনের বিষাদ সিন্ধু (১৮৮৫) রবীন্দ্রনাথের গোরা (১৯১০), তারাশঙ্করের কালিন্দী (১৯৪০), অন্নদাশঙ্কর রায়ের সত্যাসত্য (১৯৩২-১৯৪২), বিমল মিত্রের কড়ি দিয়ে কিনলাম (১৯৬২), সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের সেই সময় (১৯৮১) প্রভৃতি এই শ্রেণির রচনা।

১.৪ আত্মজৈবনিক উপন্যাস (Autobiographical Novel )

ব্যক্তিগত ঘটনা ও অভিজ্ঞতা এবং অতীত-স্মৃতির আলোকে নিজের জীবন সম্পর্কে আলোকপাত করে রচিত উপন্যাসই হচ্ছে আত্মজৈবনিক উপন্যাস। তবে আত্মজৈবনিক উপন্যাসকে উপন্যাসশিল্পের শর্ত মেনে উপন্যাস হতে হয়, নিছক দিনলিপি বা ডায়েরিতে পর্যবসিত হলে চলে না।

কোনও কোনও আত্মজৈবনিক উপন্যাসে ঔপন্যাসিক আত্মজীবনীর ধাঁচে মূল চরিত্রের জবানিতে উপন্যাসের কাহিনি উপস্থাপন করেন। আত্মজীবনীমূলক উপন্যাসের এই রূপ লক্ষ করা যায়, ডানিয়েল ডিফোর রবিনসন ক্রুশো (১৭১৯), স্মলেটের রোডেরিক র‌্যানডম (১৭৪৮), গোল্ডস্মিথের ভিকার অব ওয়েকফিল্ড (Vicar of Wakefield, ১৭৬৬) প্রভৃতি উপন্যাসে। এসব উপন্যাসে কাহিনির বক্তা-চরিত্রের  সঙ্গে লেখককে  অভিন্ন করে দেখা চলে না।

অধিকাংশ আত্মজৈবনিক উপন্যাসে কাহিনির বক্তা চরিত্র ও লেখক বহুলাংশেই অভিন্ন। এ ক্ষেত্রে প্রধান চরিত্রের মধ্যে লেখকের ব্যক্তিজীবন ও মানসের সুস্পষ্ট প্রতিফলন লক্ষ করা যায়। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, চার্লস ডিকেন্সের ডেভিড কপারফিল্ড (১৮৫০) উপন্যাসের নায়ক ও কাহিনিকথক ডেভিড বহুলাংশে ডিকেন্সের নিজেরই প্রতিচ্ছবি, তার দুর্দশাতাড়িত ছেলেবেলার জীবনচিত্রে ডিকেন্সের বাল্যজীবনের  বাস্তব দুঃখকষ্টের সুস্পষ্ট ছায়াপাত লক্ষণীয়। উল্লেখ্য, এই উপন্যাসের মুখ্য চরিত্র ডেভিড কপারফিল্ড-এর নামের আদ্যক্ষরগুলি (D.C.) উল্টে দিলেই পাওয়া যায় গ্রন্থকার অর্থাৎ চার্লস ডিকেন্সের নামের প্রথম অক্ষর দুটি (C.D.)। এমনিভাবে শার্লট ব্রন্টির (Chorlotte Brontes) জেন আয়ার (Jane Eyre, ১৮৪৭) উপন্যাসের নায়িকার আত্মকথনে লেখিকার নিজের বাস্তব জীবনের আশা ও আকাক্সক্ষা, স্বপ্ন ও বাস্তবতা, বেদনা ও বিক্ষোভ ইত্যাদি রূপায়িত হয়েছে।

ইংরেজি সাহিত্যে আত্মজৈবনিক উপন্যাসের অন্যান্য উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হচ্ছে, মার্কিন লেখক অ্যালেক্স হ্যালির রুটস (১৯৭৬), ইংরেজ ঔপন্যাসিক জে জি বালোর্ড রচিত এম্পেয়ার অব দ্য সান (১৯৮৪), রুশ সাহিত্যে আত্মজীবনীমূলক উপন্যাসের মধ্যে রয়েছে ল্যেভ তলস্তয়ের আত্মজীবনীমূলক ত্রয়ী উপন্যাস শৈশব (১৮৫২), কৈশোর (১৮৫৪), যৌবন (১৮৫৭)। ঔপন্যাসিক ফিওদর দস্তয়েভস্কির জুয়াড়ি (১৮৬৭), মাক্সিম গৌর্কির আত্মজীবনীমূলক ত্রয়ী উপন্যাস আমার ছেলেবেলা (১৯১৩), পৃথিবীর পথে (১৯১৫); পৃথিবীর পঠশালায় (১৯২৩)।

বাংলা সাহিত্যে আত্মজৈবনিক উপন্যাসের উদাহরণ শরৎচন্দ্রের  শ্রীকান্ত (১ম খণ্ড ১৯১৭, ২য় খণ্ড ১৯১৮, ৩য় খণ্ড ১৯২৭, ৪র্থ খণ্ড ১৯৩৩)। এ উপন্যাসে আত্মকাহিনির কথক শ্রীকান্ত চরিত্রের জীবনবীক্ষা ও অভিজ্ঞতার মধ্যে শরৎচন্দ্রের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও জীবনদর্শনের প্রতিফলন সুস্পষ্ট। সতীনাথ ভাদুড়ীর জাগরী (১৯৪৬), প্রেমাঙ্কুর আতর্থীর মহাস্থবির জাতক-ও (১৯৪৪) এ ধরনের আত্মজৈবনিক উপন্যাস।

বাংলা সাহিত্যে আত্মজীবনীমূলক উপন্যাসের অন্যান্য উল্লেখযোগ্য উদাহরণ : তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের ধাত্রীদেবতা (১৯৩৯), রমাপদ চৌধুরীর প্রথম প্রহর (১৯৫৪-১৯৫৫), হুমায়ূন আহমেদের শঙ্খনীল কারাগার (১৯৭৩), মৈত্রেয়ী দেবীর ন হন্যতে (১৯৭৪), সমরেশ বসুর যুগ যুগ জীয়ে (১৯৮১) ইত্যাদি।

১. ৫ নিরীক্ষামূলক উপন্যাস (Experimental Novel)

নিরীক্ষামূলক উপন্যাস বলতে সেই ধরনের উপন্যাসকেই বোঝায় যেখানে লেখক শৈলীগত ও কলাকৌশলগত নতুনত্ব বা অভিনবত্বকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে থাকেন। নিরীক্ষামূলক উপন্যাস কখনও কখনও নিরানন্দময় হয়ে থাকে। এর কারণ তাতে অচিরাচরিত পন্থায় বাস্তবতাকে তুলে ধরা হয়। তবে এ ধরনের উপন্যাসে থাকে অনেক বৈচিত্র্যময় সম্ভাবনার শক্তি। চেক লেখক মিলান কুন্ডেরা নিরীক্ষামূলক এই যুক্তিতে উপন্যাসের পক্ষে গুরুত্ব আরোপ করেছেন যে, তা নিয়তই নিত্য নতুন রূপে নতুন নতুন জিজ্ঞাসা নিয়ে হাজির হতে পারে।

পাশ্চাত্যে প্রথম দিককার নিরীক্ষামূলক উপন্যাসের অন্যতম উদাহরণ হচ্ছে লরেন্স স্টার্নের (Laurence Sterne) ট্রিস্টান শ্যান্ডি (Tristan Shandy, ১৭৫৯-১৭৬৭)। এ উপন্যাসে কৌতুক বুঝে ওঠা ও উদ্ভট ব্যাপারে মজা পাওয়ার জন্যে পাঠককে অপেক্ষা করতে হয় প্রসঙ্গের পট পরিবর্তন হওয়া পর্যন্ত।

উনিশ শতকের উপন্যাসের মূল ধারা ছিল বাস্তবতাবাদ। এই ধারাতেও নিরীক্ষা-প্রয়াস দেখা যায়। উদাহরণ হচ্ছে রুশ লেখক ফিওদর দস্তয়েভস্কির ভূতলবাসীর কড়চা (জাপিস্কি ইজ পোদপোলনিয়া, ১৮৬৪)। এ উপন্যাসে লেখক পাঠককে বর্ণনাকারীর জটিল মনোকাঠামোয় নিমজ্জিত করেন।

আইরিশ লেখক জেমস জয়েসের ইউলিসিস (১৯২২) উপন্যাসে প্রতীতি, ইন্দ্রিয়ানুভূতি ও জ্ঞানের অভিক্ষেপ ঘটাতে লেখক প্রতিটি অধ্যায়ে নিজের ব্যবহৃত সাহিত্য রীতিতে পরিবর্তন ঘটিয়েছেন। তিনি নিরন্তর পাঠককে বাধ্য করেছেন কখনও প্যারোডি, কখনও চেতনাপ্রবাহ, কখনও নাট্যিক সংলাপ, কখনও স্বপ্নাবেশ, কখনও সাংবাদিক গদ্য, কখনও রাজনৈতিক বাগাড়ম্বর ইত্যাদির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে।

কোনও কোনও নিরীক্ষাধর্মী উপন্যাসে কাহিনিরেখাকে পুরেপুরি পরিহার করা হয়। এমনটি দেখা যায় আইরিশজাত লেখক সামুয়েল বেকেটের দি আননেইমেবল (১৯৫৩) উপন্যাসে। এটি পুরোপুরি খাঁটি মনোকথন এবং এই মনোকথন সম্পর্কিত ঘটনা থেকে বিচ্ছিন্ন। কলোম্বীয় লেখক গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কোজের ক্রোনিকা দে উনা মুয়ের্তে আনুনসিয়াদা (ক্রনিকল অফ এ ডেথ ফোরটোল্ড, ১৯৮১) উপন্যাসে একটি শহরের একজন অধিবাসীর আসন্ন খুনের ক্ষেত্রে শহরবাসীর দৃষ্টিভঙ্গি ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। উপন্যাসটি এ দিক থেকে নিরীক্ষামূলক যে, খুনিদের চিহ্নিত করা এর লক্ষ্য নয়, বরং খুনিরা কেন ও কীভাবে খুনের ঘটনায় অংশ নিল এবং শহরবাসী কী ধরনের নীরব ও নির্লিপ্ত দর্শকের ভূমিকা পালন করল উপন্যাসে সেসবই বিবৃত হয়েছে বর্ণনাকারীর স্মৃতি ও গবেষণায়।

০.৬ ত্রয়ী উপন্যাস (Trilogy)

ব্যাপক কাল-পরিসরে তিনটি খণ্ডে বা পর্বে লেখা কোনও লেখকের তিনটি আলাদা আলাদা উপন্যাসকে একসঙ্গে ত্রয়ী উপন্যাস হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এ ধরনের উপন্যাস সাধারণত ঐতিহাসিক, দার্শনিক, সামাজিক বা রাজনৈতিক পেক্ষাপটে রচিত হয়।

পাশ্চাত্য সাহিত্যে ত্রয়ী উপন্যাসের দৃষ্টান্ত ইংরেজ লেখক এভলিন ওয়াফ-এর সোর্ড অফ অনার  (১৯৬৫), আইরিশ ঔপন্যাসিক ও ন্যাট্যকার স্যামুয়েল বেকেটের Molloy (১৯৫০), ম্যালোন ডাইজ (১৯৫১) ও দি আননেমেবল (১৯৫২), মার্কিন লেখক উইলিয়াম ফকনারের দ্য হ্যামলেট (১৯৪০), দ্য টাউন (১৯৫৭) ও দ্য ম্যানসন (১৯৫৯) ইত্যাদি।

রুশ সাহিত্যে প্রথম দিককার ত্রয়ী উপন্যাসের উদাহরণ ইভান গন্চারভের সাধারণ ঘটনা (১৮৪৭), অরলোমভ্ (১৮৫৮-১৮৫৯) ও খাড়া পাড় (১৮৬৮-১৮৬৯)। বিখ্যাত রুশ সাহিত্যিক ল্যেভ তলস্তয় আত্মজীবনীমূলক ত্রয়ী উপন্যাস রচনার সূত্রপাত করেছেন শৈশব (১৮৫২), কৈশোর (১৮৫৪), ও যৌবন (১৮৫৭) লিখে। বিশ শতকে আত্মজীবনীমূলক ত্রয়ী উপন্যাস লেখেন মাক্সিম গোর্কি, উপন্যাস তিনটি হচ্ছে : আমার ছেলেবেলা (১৯১৩), পৃথিবীর পথে (১৯১৫), ও পৃথিবীর পাঠশালায় (১৯২৩)

বাংলা সাহিত্যে অনেকেই ত্রয়ী উপন্যাস লিখেছেন। ধুর্জটিপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের অন্তঃশীলা (১৯৩৫), আবর্ত (১৯৩৭) ও মোহনা (১৯৪৩) Ñ এই ত্রয়ী উপন্যাস আধুনিক নারী-পুরুষের সম্পর্ক ও ব্যক্তিত্বের সমস্যার মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণে ঋদ্ধ। গোপাল হালদারের একদা (১৯৩৯), অন্যদিন (১৯৫০) ও আর এক দিন (১৯৫১) চেতনাপ্রবাহরীতিতে লেখা আত্মজৈবনিক ত্রয়ী উপন্যাস। আশাপূর্ণা দেবী তাঁর ত্রয়ী উপন্যাস প্রথম প্রতিশ্রুতি (১৯৬৪), সুবর্ণলতা (১৯৬৬) ও বকুল কথা-য় (১৯৭৩) বাঙালি নারী সমাজের আশা-আকাক্সক্ষা ও দুঃখবেদনার দিক তুলে ধরেছেন। অন্যান্য উল্লেখযোগ্য ত্রয়ী উপন্যাস হলো : বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের পথের পাঁচালী (১৯২৯), অপরাজিত (প্রথম ১৯৩২) ও অপরাজিত (দ্বিতীয় ১৯৩২); তারাশঙ্করের ধাত্রীদেবতা (১৯৩৯), গণদেবতা (১৯৪২) ও পঞ্চগ্রাম (১৯৪৪); গজেন্দ্রকুমার মিত্রের কলকাতার কাছেই (১৯৫৮), উপকণ্ঠে (১৯৬০) ও পৌষ ফাগুনের পালা (১৯৬৪);  গৌরকিশোর ঘোষের জলপড়ে পাতা নড়ে (১৯৬০), প্রেম নেই (১৯৮১) ও প্রতিবেশী (১৯৯৫); শওকত আলীর দক্ষিণায়নের দিন (১৯৭৬), কুলায় কালস্রোত (১৯৭৭) ও পূর্বরাত্রি পূর্বদিন (১৯৭৮); সমরেশ মজুমদারের উত্তরাধিকার (১৯৭৯), কালবেলা (১৯৮৩) ও কালপুরুষ (১৯৮৫) ইত্যাদি।

২. সাধারণ প্রবণতামূলক উপন্যাস

১.১ ঐতিহাসিক উপন্যাস

(Historical Novel)

এ ধরনের উপন্যাসে লেখক অতীত ইতিহাসের বিশেষ ঘটনা, চরিত্রকে আশ্রয় করে অতীতাশ্রয়ী কল্পনায় জীবন ও পরিবেশকে ফুটিয়ে তুলতে চান। ইতিহাসের কালপটে উঁকি দিয়ে ঔপন্যাসিক কোনও বিশেষ যুগ ও তার কিছু নির্বাচিত ঘটনা অবলম্বন করে কোনও ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বের দ্বন্দ্ব-মধুর চিত্রকে ফুটিয়ে তোলেন। তিনি তা করেন নিজের কালিক ভাবনার প্রেক্ষাপটে।

ঐতিহাসিক উপন্যাসের প্রকৃতি অনুধাবন করতে হলে ইতিহাস ও উপন্যাসের স্বরূপ সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা থাকা দরকার। ইতিহাসকে হতে হয় প্রামাণিক তথ্যনির্ভর। ইতিহাসের লক্ষ্য প্রামাণ্য তথ্য-সত্য বিবৃত করা। পক্ষান্তরে উপন্যাসে প্রাধান্য পায় কল্পনা ও সৃজনশীলতা। তাই ইতিহাসকে উপন্যাসের বিষয় করা হলে তাতে ইতিহাসের তথ্যনির্ভর যান্ত্রিক কাহিনি ও নিছক বিবরণ প্রত্যাশিত নয়। ঐতিহাসিক উপন্যাসে ইতিহাসের তথ্যসত্যকে জারিত করে নিতে হয় সৃজনী কল্পনার বিচিত্র রসে।  ইতিহাসের তথ্য ও সাহিত্যের রসের মেলবন্ধন প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথের অর্থবহ মন্তব্যটি এখানে উল্লেখযোগ্য :

ইতিহাস পড়িব, না আইভানহো পড়িব ? ইহার উত্তর অতি সহজ।  দুই-ই পড়ো।  সত্যের জন্য ইতিহাস পড়ো, আনন্দের জন্য আইভান হো পড়ো ।  … কাব্যে যদি ভুল শিখি, ইতিহাসে  তাহা সংশোধন করিয়া লইব।

ঐতিহাসিক উপন্যাসের ইতিহাস হওয়াটা যতটা গুরুত্বপূর্ণ, ততটাই জরুরি হচ্ছে তার উপন্যাস হয়ে ওঠা।  তবে এ ধরনের উপন্যাসে ইতিহাসের তথ্য-সত্যকে লঙ্ঘন বা বিকৃত করা চলে না। ঐতিহাসিক উপন্যাসের বৈশিষ্ট্যগুলো সংক্ষেপে মোটামুটি এ রকম :

১.         সমসাময়িক জীবন ও বাস্তব চরিত্রের বদলে অতীত ইতিহাসের  ঘটনা, চরিত্র ও পরিবেশ উপন্যাসের বিষয় হিসেবে অন্বিষ্ট হয়।

২.         ঐতিহাসিক উপন্যাসের কাহিনি বর্ণনায় ঔপন্যাসিককে ঐতিহাসিক সত্যের ব্যাপারে বিশ্বস্ত থাকতে হয়। সেই সময়কালের রীতি-নীতি, আচার-ব্যবহার, বিশ্বাস-সংস্কার, পোশাক-পরিচ্ছদ ইত্যাদি যথাযথভাবে ফুটিয়ে তোলায় সচেষ্ট হতে হয় তাকে। ঐতিহাসিক বাস্তবতা লঙ্ঘন করলে তাঁকে ‘কালানৌচিত্য’  (anachronism) দোষের জন্যে দায়ী হতে হয়। তবে কালবিরোধগত দোষের আশঙ্কা থাকলেও শিল্পের তাগিদে ঔপন্যাসিক ইতিহাস, চরিত্র ও ঘটনার ক্ষেত্রে কল্পনার আশ্রয় নিয়ে কিছু কিছু উদ্ভাবন ও পরিবর্তন করতে পারেন।

৩.        ঐতিহাসিক উপন্যাসের নায়ক- নায়িকা বা প্রধান প্রধান চরিত্র নির্বাচন করতে হয় ইতিহাসের সুপরিচিত ব্যক্তিত্বদের মধ্য থেকে। এইসব চরিত্রের রূপায়ণে ঔপন্যাসিককে ইতিহাসের প্রতি যথাসম্ভব বিশ্বস্ত থাকতে হয়। তবে চরিত্রগুলোর ঐতিহাসিকতা যথাসম্ভব অক্ষুণ্ন রাখার পাশাপাশি তাদের জীবনভাবনা প্রকাশের উপযোগী ও প্রাণবন্ত করে তোলাও ঐতিহাসিক উপন্যাসকারের কাছ থেকে প্রত্যাশিত।

৪.         ঐতিহাসিক উপন্যাসে ঔপন্যাসিক ব্যাপৃত থাকেন ইতিহাসের বিশাল পভূমিতে আবর্তিত জীবনের উত্থান-পতন নিয়ে। ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে সামাজিক-রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব-সংঘাত, আবেগ-আলোড়ন এই জাতীয় উপন্যাসের চরিত্রগুলোকে দেয় বিস্তৃতি, বিশালতা ও ভাবসমুন্নতি। তারা স্থান ও কালের নির্দিষ্ট সীমা অতিক্রম করে পায় বিশ্বজনীন ব্যঞ্জনা।

৫.         ঐতিহাসিক উপন্যাসে থাকে মহাকাব্যিক বিস্তার। এ ধরনের উপন্যাসের চরিত্রগুলো জীবন ও আচরণে নিজেদের ব্যক্তিজীবনকে ছাপিয়ে ওঠে, বিস্তার পায় ইতিহাসের পাতায়।

৬.        মহাকাব্যের সঙ্গে ঐতিহাসিক উপন্যাসের হৃদ্যতার কারণেই তার ভাষাকে হতে হয় গম্ভীর ও ধ্রুপদী যাতে করে বিশেষ দেশকালের পরিপ্রেক্ষিত ছাড়িয়ে কল্পনার আবিশ্ব স্পন্দিত বিস্তার মন্দ্রিত হয়ে ওঠে।

উনিশ শতকে ইংরেজি সাহিত্যে প্রথম যথার্থ ঐতিহাসিক উপন্যাসের স্রষ্টা ওয়াল্টার স্কট। তাঁর প্রথম প্রকাশিত ঐতিহাসিক উপন্যাস ওয়েভারলে (Waverley, ১৮১৪)। তাঁর ওল্ড মর্টালিটি ১৮১৬), দি হার্ট অব মিডলোথিয়ান ১৮১৮)  ইত্যাদি  উপন্যাসগুচ্ছ   Waverley  পর্যায়ের সেরা ঐতিহাসিক উপন্যাস হিসেবে পরিচিত। এসব  উপন্যাসে স্কট ঐতিহাসিক কালের জীবনযাত্রা, সামাজিক পরিবেশ, রাজনৈতিক ও ধর্মীয় সংঘাত ইত্যাদির মধ্য দিয়ে সমকালীন ইতিহাসকে জীবন্ত করে তুলেছেন। স্কটের আদর্শে উনিশ শতকের বিখ্যাত ইতালীয় লেখক আলেসসানদ্রো ম্যানজনি (Alessandro Manzoni) তাঁর The Betrothed (I Promessi Spaosi, ১৮৪০) উপন্যাসে  ঐতিহাসিক পটভূমিতে বিভিন্ন চরিত্রে মনস্তাত্ত্বিক ঘাতপ্রতিঘাতের বৈশিষ্ট্য ফুটিয়ে তুলেছেন। বিশ্ব সাহিত্যে ঐতিহাসিক উপন্যাস হিসেবে বিশেষ উল্লেখযোগ্য ফরাসি সাহিত্যিক ভিকতর য়্যুগো’র (Hugo) নোতর দাম দ্য পারি (Notre Dame de Paris, ১৮৩১) ও গুস্তাব ফ্লবেয়ারের সালাঁবো (Salammbo, ১৮৬২), ইংরেজ ঔপন্যাসিক বুলওয়ার লিটনের The Last Days of Pompeii (১৮৩৪), উইলিয়াম ম্যাকপিস থ্যাকারের হেনরি এসমন্ড (Henry Esmond, ১৮৫২) ও চার্লস ডিকেন্সের এ টেল অব টু সিটিজ (১৮৫৯), মার্কিন সাহিত্যে কেনেথ রবার্টের North-West Passage (১৯৩৭), উইলিয়াম স্টাইরনের The Confessions of Net Turner (১৯৬৭) প্রভৃতি।

 (ভোইনা ই মির, ১৮৬২-১৮৬৯) রুশ সাহিত্যে প্রখ্যাত সাহিত্যিক) বিশিষ্ট ঐতিহাসিক উপন্যাস। এ উপন্যাসে বর্ণিত ৫৫০টি চরিত্রের মধ্যে ২২০টি ঐতিহাসিক চরিত্র।

বাংলা সাহিত্যে ঐতিহাসিক উপন্যাস রচনার প্রথম প্রয়াস ভূদেব মুখোপাধ্যায়ের রোমান্সধর্মী রচনা ঐতিহাসিক উপন্যাস (১৮৫৭)। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় বাংলা ঐতিহাসিক উপন্যাসের প্রথম সার্থক শিল্পী। তাঁর দুর্গেশনন্দিনী (১৮৬৫) উপন্যাস ষোলো শতকের শেষভাগে উড়িষ্যার অধিকার নিয়ে মোগল-পাঠানের সংগ্রামের ঐতিহাসিক পটভূমিতে রচিত হলেও তা ইতিহাসের সুদৃঢ় ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত নয়। তাঁর রাজসিংহ (১৮৮২) বাংলা সাহিত্যের অন্যতম সেরা ঐতিহাসিক উপন্যাস। এ উপন্যাসের কাহিনি- কাঠামো ঐতিহাসিক। মোগলদের সঙ্গে রাজপুতদের যুদ্ধের ঘটনাধারার প্রেক্ষাপটে এ উপন্যাসে ব্যক্তিচরিত্রে ইতিহাসের অনুবর্তন ঘটেছে। রবীন্দ্রনাথের রাজর্ষি (১৮৮৭) উপন্যাসের ভিত্তি ত্রিপুরার ইতিহাসের উপাদন হলেও ইতিহাসকে ছাপিয়ে উঠেছে প্রেম ও প্রতাপের দ্বন্দ্ব-আশ্রিত রোমান্টিকতা।  তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের ধাত্রীদেবতা (১৯৩৯), কালিন্দী (১৯৪০), গণদেবতা (১৯৪২), পঞ্চগ্রাম (১৯৪৪) ইত্যাদি উপন্যাসে বিধৃত হয়েছে বাংলার সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনের পালাবদলের ইতিহাস। বাংলা সাহিত্যে অন্যান্য ঐতিহাসিক উপন্যাসগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য : রমেশচন্দ্র সেনের মহারাষ্ট্র জীবন প্রভাত (১৮৭৮) ও রাজপুত জীবন সন্ধ্যা (১৮৭৯); অনুরূপা দেবীর রামগড় (১৯১৮) ও ত্রিবেণী (১৯২৮); প্রতাপচন্দ্র ঘোষের বঙ্গাধিপ-পরাজয় ( প্রথম খণ্ড ১৮৬৯, দ্বিতীয় খণ্ড ১৮৮৪); হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর কাঞ্চনমালা (১৯১৫); রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায়ের শশাঙ্ক (১৯১৪), ধর্মপাল (১৯১৫) ও ময়ূখ (১৯১৬); নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের উপনিবেশ (১৯৪৪); অমিয়ভূষণ মজুমদারের শ্রীগড়খণ্ড (১৯৫৭); শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের তুমি সন্ধ্যার মেঘ (১৯৫৮); প্রমথনাথ বিশীর লাল কেল্লা (১৯৫৭) ও কেরী সাহেবের মুন্সী (১৯৫৮); গজেন্দ্রকুমার মিত্রের বহ্নিকন্যা (১৯৫৯); বিমল  মিত্রের সাহেব বিবি-গোলাম (১৯৫৩) ও কড়ি দিয়ে বিনলাম (১৯৬২); অমিয়ভূষণ মজুমদারের নীল ভূঁইয়া (১৯৫৫), নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের পদসঞ্চার (১৯৪৯), সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের সেই সময় (প্রথম ১৯৮১, দ্বিতীয় ১৯৮২), সত্যেন সেনের আলবেরুনী (১৯৬৯) ইত্যাদি।

সূক্ষ্ম বিচারে ঐতিহাসিক উপন্যাসকে দুটি উপশ্রেণিতে ভাগ করা চলে : খাঁটি ঐতিহাসিক উপন্যাস ও মিশ্র ঐতিহাসিক উপন্যাস।  খাঁটি ঐতিহাসিক উপন্যাস পুরোপুরিভাবে ইতিহাস-নির্ভর হয়ে থাকে। রবীন্দ্রনাথ যাকে বলেছেন ‘ঐতিহাসিক রস’, সেই রসস্ফূর্তি ঔপন্যাসিকের প্রধান লক্ষ্য হয়। বঙ্কিমচন্দ্রের রাজসিংহ , রমেশচন্দ্র দত্তর মহারাষ্ট্র জীবনপ্রভাত, রাজপুত জীবনসন্ধ্যা প্রভৃতি এ ধরনের উপন্যাসের পর্যায়ে পড়ে। ইংরেজি সাহিত্যে কেনেথ রবার্টস্-এর নর্থওয়েস্ট প্যাসেজ ও রুশ সাহিত্যে তলস্তয়ের সমর ও শান্তি এ ক্ষেত্রে উল্লেখ্য।

পক্ষান্তরে মিশ্র ঐতিহাসিক উপন্যাসে ইতিহাসের পটভূমিতে রাজনৈতিক, সামাজিক বা অন্য কোনও প্রসঙ্গ প্রধান হয়ে ওঠে। এ ধরনের উপন্যাসকে ইতিহাস-আশ্রিত উপন্যাসও বলা চলে। এ ধরনের উপন্যাসের উদাহরণ রবীন্দ্রনাথের রাজর্ষি, হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর বেনের মেয়ে, রমাপদ চৌধুরীর লালবাঈ। পাশ্চাত্য সাহিত্যে মিশ্র ঐতিহাসিক উপন্যাস হিসেবে আনাতোল ফ্রাঁসের তাইস (১৮৮৯), থ্যাকারের হেনরি এসমন্ড (১৮৫২), ওয়াল্টার স্কটের আইভ্যানহো (১৮২০), কেনিলওয়ার্থ (১৮২১), জর্জ এলিয়টের রমলা  (১৮৬৩) প্রভৃতি উপন্যাসের নাম করা চলে।

২.২. সামাজিক উপন্যাস

(Social Novel)

বিভিন্ন স্তরের মানুষের সামাজিক ও পারিবারিক জীবনের ছবি বাস্তবমুখী হয়ে ফুটে ওঠে সামাজিক উপন্যাসে। এ ধরনের উপন্যাসে প্রাধান্য পায় সামাজিক প্রসঙ্গ ও সমাজমনস্কতা। তাতে সামাজিক-অর্থনৈতিক অবস্থা ও সমস্যার প্রেক্ষাপটে অঙ্কিত হয় ব্যক্তির জীবন ও চরিত্র। এক কথায় সামাজিক উপন্যাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো সমাজ-বাস্তবতা। তাতে ধরা পড়ে দেশ-কালের প্রেক্ষাপটে সমাজের নানা সমস্যা ও সমস্যা উত্তরণের চিত্র। গভীর তলে এ ধরনের উপন্যাসে লেখকের সমাজসংস্কারের বাসনাও কাজ করতে পারে। সে বাসনা থাকুক বা না থাকুক সামাজিক সমস্যার প্রতিফলন এ ধরনের উপন্যাসে অবশ্যই পরিলক্ষিত হয়। এ ধরনের উপন্যাসে রাজনৈতিক- অর্থনৈতিক ইত্যাদি প্রসঙ্গ আনুষঙ্গিকভাবে আসা অস্বাভাবিক নয়, কিন্তু  কোনও বিশেষ সামাজিক সমস্যাই এ ধরনের উপন্যাসের প্রধান উপজীব্য। উপন্যাসের প্রধান চরিত্রগুলি আলোড়িত বা তাড়িত হয় সামাজিক সংকট ও সমস্যার দ্বারা। লেখকের সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির স্বাতন্ত্র্য দ্বারাও চিহ্নিত হয় সামাজিক উপন্যাস। রোমান্স বা ঐতিহাসিক উপন্যাসের সঙ্গে এখানেই সামাজিক উপন্যাসের পার্থক্য। 

সামাজিক উপন্যাসের উদ্ভব উনিশ শতকে। তার সূচনা হয় নতুন জীবনবোধ নিয়ে। ইংরেজি সাহিত্যের সামাজিক উপন্যাসগুলিতে সমাজের অন্যায়- অবিচারের ছবি ফুটিয়ে তোলা হয়, স্বরূপ উদ্ঘাটন করা হয় নানা কুসংস্কার ও কুপ্রথার, প্রয়োজনীয়তা নির্দেশ করা হয় সমাজ-সংস্কারের ।

ইংল্যান্ডের ভিক্টোরিয়ান যুগের মহিলা ঔপন্যাসিক মিসেস গ্যাসকেল (Gaskell) সমাজ-সংস্কারের আদর্শ নিয়েই উপন্যাস রচনায় ব্রতী হয়েছিলেন। তাঁর মেরি বার্টন (১৮৪৮) ও নর্থ অ্যান্ড সাউথ  (১৮৫৫) উপন্যাসে শিল্পবিপ্লবোত্তর ইংল্যান্ডের শ্রমিকদের দুঃখদুর্দশা, বেকারত্ব ও অনাহার, পুঁজিপতিদের শাসন-শোষণ ইত্যাদি বাস্তবজীবন ও সমস্যার চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। লেখিকা সমাজ-সংস্কারের আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়েই সমসাময়িক ইংল্যান্ডের শ্রমিক-জীবনের এই বাস্তব চিত্র অঙ্কিত করেছেন।

ধর্মযাজক লেখক চার্লস কিংসলেও (Charles Kingsleys) উপন্যাস রচনা করেছিলেন সমাজ সংস্কারের প্রেরণা থেকে। তাঁর অ্যাল্টন লক (Alton Lock, ১৮৫০) উপন্যাসে একজন চার্টিস্ট শ্রমিকের কাল্পনিক আত্মজীবনীর অন্তরালে তৎকালীন লন্ডন শহরে শ্রমিক বসতির পঙ্কিল পরিবেশ, শ্রমিকদের অপরিসীম দারিদ্র্য, তাদের ওপর পুঁজিপতিদের নির্মম অত্যাচার, শ্রমিকদের শ্রেণি-সচেতনতা প্রভৃতির বাস্তব চিত্র পাওয়া যায়। অবশ্য কিংস্লের উপন্যাসে শেষ পর্যন্ত শ্রেণিসংগ্রামকে ছাপিয়ে উঠেছে খ্রিষ্টধর্মে বিশ্বাস ও আস্থা।

ইংরেজি সাহিত্যে ভিক্টোরীয় যুগের সবচেয়ে জনপ্রিয় ঔপন্যাসিক চার্লস ডিকেন্সের অধিকাংশ উপন্যাসেই সমাজজীবনের ছবি সজীব বাস্তবতায় অঙ্কিত হয়েছে। ডিকেন্স তাঁর বিখ্যাত অলিভার টুইস্ট (১৮৩৮) উপন্যাসে অনাথশালায় শিশুদের শোচনীয় দুর্গতি, নিকোলাস নিকোলবি (১৮৩৯) উপন্যাসে শিক্ষার নামে উৎপীড়ন ও শোষণ, ব্লিক হাউস (Bleak House, ১৮৫৩) উপন্যাসে আইনব্যবস্থার জটিলতা, মন্থরগতি এবং উকিলদের হাতে অসহায় মক্কেলদের শোষণ ও বঞ্চনা, লিটল ডরিট (Little Dorrit, ১৮৫৬) উপন্যাসে সরকারি আমলাতন্ত্রের নির্মম হৃদয়হীনতা ও অবিচার ইত্যাদি চিত্রিত করেছেন। এসব উপন্যাসে সমাজের দরিদ্র ও বঞ্চিত মানুষের প্রতি তাঁর গভীর মর্মবেদনা ও সহানুভূতি লক্ষ করা যায়। মার্কিন মহিলা ঔপন্যাসিক হেরিয়েট বিচার স্টো তাঁর বিখ্যাত আংকল টমস কেবিন (১৮৫২) উপন্যাসে ক্রীতদাস প্রথার নিষ্ঠুর চিত্র তুলে ধরে মার্কিন ডুক্তরাষ্ট্রে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছিলেন।

রুশ সাহিত্য মিখাইল র্লেমন্তভের আমাদের সময়কার নায়ক (১৮৪০) সামাজিক উপন্যাস রচনার প্রথম প্রয়াস। প্রথম যথার্থ সামাজিক উপন্যাস হচ্ছে, ইভান তুর্গেনেভের রুদিন (১৮৫৬)। রূশ সাহিত্যের আর একটি বিখ্যাত সামাজিক উপন্যাস হচ্ছে লেৎভ তলস্তয়ের আন্না কারেনিনা (১৮৭৫-১৮৭৭)। এর কয়েক বছর পর প্রকাশিত হয় ফিওদর দস্তয়েভস্কির বিখ্যাত সামাজিক উপন্যাস লাঞ্ছিত নিপীড়িত (১৮৬১)।

বাংলা সাহিত্যে ভবানীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের নববাবুবিলাসকে (১৮২৩) বলা যায় প্রথম বাংলা সামাজিক উপন্যাসের পূর্বাভাস। ব্যক্তিচরিত্র ফুটিয়ে তোলার চেয়ে সমাজ-প্রতিবেশের ছবি আঁকাতেই  লেখক বেশি মনোযোগী হয়েছিলেন। উপন্যাসের সেই প্রারম্ভিক পর্বে বাবু সমাজের চরম পরিণতি দেখিয়েছেন তিনি। এমনিভাবে বাবু সমাজের অমিতাচার, ভোগলিপ্সা ও ইংরেজিয়ানার রসায়িত চিত্র পাওয়া যায় প্যারীচাঁদ মিত্রের আলালের ঘরের দুলাল-এ (১৮৫৮)। 

সামাজিক উপন্যাস রচনায় পরবর্তীকালে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের অবদান অপরিসীম। রোমান্স রচনার মাধ্যমে উপন্যাস সৃষ্টির সূচনা করলেও তাঁর বিষবৃক্ষ (১৮৭৩), চন্দ্রশেখর (১৮৭৫) ও কৃষ্ণকান্তের উইল (১৮৭৮) পূর্ণাঙ্গ শিল্পসফল সামাজিক উপন্যাস হিসেবে গণ্য। কুন্দনন্দিনী নামে এক বালবিধবার রূপের মোহে আকৃষ্ট হয়ে ধনাঢ্য ভূস্বামী নগেন্দ্রনাথ সাধ্বী স্ত্রীকে উপেক্ষা করে কীভাবে সংসারে বিষবৃক্ষ  রচনা করে এবং সেই বিষবৃক্ষ থেকে কীভাবে প্রাণঘাতী বিষফল প্রসূত হয়, তারই চিত্র রূপায়িত হয়েছে বিষবৃক্ষ উপন্যাসে। এই বিষয়টিকেই আরও গভীরভাবে পরীক্ষা করা হয়েছে কৃষ্ণকান্তের উইল উপন্যাসে। আত্মসংযমে পুরুষের অনিচ্ছা এবং স্ত্রীকে পরিত্যাগ করে অন্য নারীতে মত্ত হওয়ার শোচনীয় পরিণাম দেখানও হয়েছে এ উপন্যাসের।

সামাজিক উপন্যাস রচনায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অবদানও যথেষ্ট। চোখের বালি (১৯০৩) উপন্যাসে তিনি শিক্ষিত বাঙালি মধ্যবিত্ত সমাজের প্রেমাশ্রিত মনস্তাত্ত্বিক সমস্যা নিরূপণে প্রয়াসী হয়েছেন। গোরা (১৯১০) উপন্যাসে রবীন্দ্রনাথ শিক্ষিত বাঙালি মধ্যবিত্ত জীবনের বিশেষ যুগের সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় চিন্তাধারা, যুক্তি ও বিশ্বাস, সম্প্রদায়-আচ্ছন্নতা ও সম্প্রদায়-নিরপেক্ষতা, জাতীয়তা ও বৈশ্বিক চেতনার নানা দিক তুলে ধরেছেন। রবীন্দ্রনাথের চতুরঙ্গ (১৯১৫) বাংলা সামাজিক উপন্যাসের ধারায় একটি মাইল ফলক। সামাজিক উপন্যাসের প্রচলিত ছক ও সংস্কারকে ভেঙে উপন্যাসের সীমাকে অনেক বেশি আধুনিক করে  তোলা হয়েছে এখানে।

শরৎচন্দ্রের সামাজিক উপন্যাস হিসেবে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য, বামুনের মেয়ে (১৯২০), পল্লীসমাজ (১৯১৬), গৃহদাহ (১৯২০), দেনাপাওনা (১৯২৩) ও শেষ প্রশ্ন (১৯৩১)। পল্লীসমাজ উপন্যাসে চিত্রিত হয়েছে ব্রাহ্মণ-আধিপত্যনির্ভর, জমিদার-শাসিত ও আচারসর্বস্ব বাঙালি হিন্দু সমাজে সাধারণ মানুষের জীবনের সংকট। গৃহদাহ উপন্যাসে সমাজের রীতিনীতির সঙ্গে প্রবৃত্তির দ্বন্দ্বকে ফুটিয়ে তুলেছেন শরৎচন্দ্র। এখানে সমাজ ও সময়ের প্রেক্ষাপটে সমাজ-অননুমোদিত প্রেমকে বিচার করা হয়েছে। দেনাপাওনা উপন্যাসে সমাজে শ্রেণিশোষণ ও শ্রেণিসাম্যের অভূতপূর্ব সমন্বয় ঘটানো হয়েছে। তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের গণদেবতা (১৯৪২) উপন্যাসে আঞ্চলিক পটভূমিতে সামন্তবাদী সমাজ থেকে পুঁজিবাদী সমাজে উত্তরণের চিত্র ধরা পড়েছে। সমাজের অন্ত্যজ শ্রেণির সামাজিক স্বীকৃতির বিষয়টি উত্থাপিত হয়েছে তাঁর বিখ্যাত কবি (১৯৪৪) উপন্যাসে। তাঁর হাঁসুলী বাঁকের উপকথা (১৯৪৭) উপন্যাসে কালিক পর্বান্তরের সন্ধিক্ষণে পাওয়া যায় অন্ত্যজ লোকসমাজের বিশ্বাস, সংস্কার ও জীবনচর্যার ছবি।

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাসে সামাজিক জীবনের ছবির সঙ্গে মিশেছে ফ্রয়েডীয় মনঃসমীক্ষণবাদের ধারণা। তাঁর পদ্মানদীর মাঝি (১৯৩৬) উপন্যাসটিতে পাওয়া যায় পদ্মা-তীরবর্তী জেলেজীবনের জীবনসংগ্রাম ও প্রেম-অপ্রেমের আলেখ্য। সমাজ ও সময়ের বাস্তব কঠিন রূপায়ণ ঘটেছে এ উপন্যাসে। তাঁর শহরতলি (প্রথম খণ্ড ১৯৪০, দ্বিতীয় খণ্ড ১৯৪১) উপন্যাসে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে পুঁজিপতি ও শ্রমিক শ্রেণির মধ্যেকার দ্বন্দ্বকে।

সতীনাথ ভাদুড়ীর ঢোঁড়াই চরিত মানস (প্রথম খণ্ড ১৮৪৬, দ্বিতীয় খণ্ড ১৯৫১) উপন্যাসে চিত্রিত হয়েছে বিহারের শ্রমজীবী মানুষের জীবনযাত্রা ও জীবন-যন্ত্রণার ছবি। অদ্বৈত মল্লবর্মণের তিতাস একটি নদীর নাম (১৯৫৬) উপন্যাসে বিধৃত হয়েছে তিতাস-তীরবর্তী মালো সমপ্রদায়ের জীবিকা ও সামাজিকতার ছন্দোময় জীবনরূপ।

বাংলা সাহিত্যে অন্যান্য উল্লেখযোগ্য সামাজিক উপন্যাসের মধ্যে রয়েছে : সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর লালসালু (১৯৪৮), আবু ইসহাকের সূর্যদীঘল বাড়ী (১৯৫৫), শওকত ওসমানের জননী (১৯৬১), কমলকুমার মজুমদারের অন্তর্জলী যাত্রা (১৯৬২), শহীদুল্লাহ কায়সারের সংশপ্তক (১৯৬৫), মহাশ্বেতা দেবীর হাজার চুরাশির মা (১৯৭৪), অরণ্যের অধিকার (১৯৭৭), দেবেশ রায়ের মফস্সলী বৃত্তান্ত (১৯৮০) ইত্যাদি।

সামাজিক উপন্যাস নানারকম হতে পারে। সমস্যামূলক উপন্যাসে (problem novel) কোনও বিশেষ সামাজিক সমস্যা গুরুত্ব পায়। যেমন হার্ডির jude the obscure। প্রচারমূলক উপন্যাসে  (propaganda novel) সামাজিক সমস্যাকে একটি বিশেষ আদর্শবাদের আলোকে উপস্থাপন করা হয়। যেমন সিনক্লেয়ারের The Jungle। এ ধরনের উপন্যাস উদ্দেশ্যমূলক উপন্যাস (purpose novel) নামেও অভিহিত। পাশ্চাত্য সামাজিক উপন্যাসগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য। মার্কিন বাস্তববাদী ঔপন্যাসিক স্টেইনবেক-এর Grapes of Wrath (১৯৩৯), ইংরেজি লেখক চার্লস ডিকেন্সের Hard Times (১৮৫৮) প্রভৃতি।

২.৩. মনস্তাত্ত্বিক উপন্যাস (Psychological Novel)

মনস্তাত্ত্বিক উপন্যাস আধুনিক উপন্যাসের একটি বিশিষ্ট শাখা। মানুষের মনের গতিবিধি বা মনোজাগতিক ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়াকে উপজীব্য করে এ ধরনের উপন্যাস লেখা হয়ে থাকে। এ ধরনের উপন্যাসে ‘প্লট’ বা আখ্যানভাগ বর্ণিত বহির্জগৎ, ঘটনা বা চরিত্রের আচরণকে প্রাধান্য না দিয়ে  লেখক অধিকতর মনোযোগী হন চরিত্রের মানসলোক (মন-মেজাজ, আবেগ- অনুভূতি ও মনের বিচিত্র গতিবিধি) বিশ্লেষণে ও উন্মোচনে।  এ ধরনের উপন্যাসে চরিত্রের বাহ্যিক ক্রিয়াকলাপের চেয়ে বাইরের ঘটনা, সম্পর্ক ইত্যাদি চরিত্রের অন্তর্লোকে যে ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া, সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম আলোড়ন সৃষ্টি করে তার পেছনকার মনস্তাত্ত্বিক কার্যকারণ উন্মোচন ও বিশ্লেষণের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়ে থাকে। আর সেসব ফুটিয়ে তুলতে গিয়ে ঔপন্যাসিক প্রতীক-সংকেত- অনুষঙ্গনির্ভর এক ইঙ্গিতময় ভাষা নির্মাণ করেন।

মনস্তাত্ত্বিক উপন্যাসে সাধারণত মনস্তত্ত্বই উপন্যাসের কেন্দ্রীয় শক্তি হিসেবে প্রতীয়মান হয়। উপন্যাসের সমস্ত জটিলতা ও ঘটনাবিবর্তনের নেপথ্য উৎস হিসেবে প্রধান হয়ে ওঠে মনস্তত্ত্বের ভূমিকা। উপন্যাসের প্রধান সমস্যাটিই মনস্তাত্ত্বিক সমস্যা কি না, তা নির্ধারণ করার উপায় হলো মনস্তত্ত্ব বর্জন করে উপন্যাসটি রচনা করা সম্ভব কি না, ভেবে দেখা। চরিত্রপ্রধান উপন্যাসে চরিত্রের মনস্তত্ত্ব প্রাধান্য পায়। সে দিক থেকে একই উপন্যাস একাধারে চরিত্রপ্রধান ও মনস্তত্ত্বমূলক হতে পারে।

ইংরেজি সাহিত্যে চরিত্রের মনস্তত্ত্ব নিয়ে প্রথম আগ্রহ দেখা যায় জেফরি চসার (Geoffery Chaucer) রচিত ট্রইলাস অ্যান্ড ক্রিসিডি (Troilus and Criseyde, আনু ১৩৮৬) মহাকাব্য কাহিনিতে। অনেকে একে কাব্যে রচিত মনস্তাত্ত্বিক উপন্যাস হিসেবেও গণ্য করেন।

চেতনাপ্রবাহ-পূর্ববর্তী মনস্তত্ত্বমূলক বেশ কিছু উপন্যাসে মানবমনের বিশ্লেষণ চোখে পড়ে। ইংরেজ লেখক স্যামুয়েল রিচার্ডসন পামেলা (১৭৪০), ক্ল্যারিসা (১৭৪৮) প্রভৃতি পত্রোপন্যাসে নর-নারীর অন্তরের আবেগ-অনুভূতিকে প্রকাশ করেছিলেন পত্রাকারে, সরাসরি মনের দুয়ার খুলে দিয়ে। আইরিশ ঔপন্যাসিক লরেন্স স্টার্ন র্তার ট্রিস্ট্র্যাম্  শ্যানডি (১৭৬০-১৭৬৭) উপন্যাসে চরিত্রের মানসিক জটিলতার স্বরূপ ফুটিয়ে তোলার জন্যে প্রথাগত পদ্ধতির ব্যত্যয় ঘটিয়েছিলেন।

তবে উনিশ শতকের আগে প্রকৃত আধুনিক মনস্তাত্ত্বিক উপন্যাস রচিত হয়নি। এ সময়ে মনস্তাত্ত্বিক উপন্যাস রচনায় এগিয়ে আসেন ইংরেজ ঔপন্যাসিক জর্জ এলিয়ট, এলিজাবেথ গ্যাসকেল, জর্জ মেরেডিথ ও পোলিশ-ব্রিটিশ লেখক জোসেফ কনরাড। এই ধারার স্বীকৃত সেরা ঔপন্যাসিক হলেন মার্কিন ব্রিটিশ লেখক হেনরি জেমস। তাঁর দ্য পোর্ট্রেট অব আ লেডি (The Portrait of a Lady, ১৮৮০) দ্য উইংগস অব দা ডাভ (The Wings of a Dove, ১৯০২) ও দ্য গোল্ডেন বাও (The Golden Bow, ১৯০৪) পরবর্তীকালের ঔপন্যাসিকদের সামনে মনস্তাত্ত্বিক উপন্যাসের একটা মান নির্ধারণ করে দেয়।

উনিশ শতকে জর্জ এলিয়ট, এমিলি ব্রন্টি প্রমুখ ইংরেজ মহিলা ঔপন্যাসিক মানবচরিত্র, বিশেষ করে নারীমনের গহনলোকে আলো ফেলেছিলেন। এমিলি ব্রন্টির উদারিং হাইটস (Wuthering Heights, ১৮৪৭) উপন্যাসের দুই প্রধান চরিত্র হিথক্লিফ্ ও ক্যাথেরিন মানবমনের দুর্নিবার আবেগ-আকাক্সক্ষার অভিনব উদাহরণ হয়ে আছে। জর্জ এলিয়টের অ্যাডাম বিড (Adam Bede, ১৮৫৯) উপন্যাসে চরিত্রের অন্তর্লোকে অনুসন্ধানী আলোকপাত আছে, আছে তাদের মনোগত আশা-আকাক্সক্ষার বিশ্লেষণ। উনিশ শতকের ইংরেজি সাহিত্যে মনস্তাত্ত্বিক উপন্যাসের ক্ষেত্রে আর একটি বিশেষ স্মরণীয় নাম জর্জ মেরেডিথ। তাঁর হাস্যবিষাদধর্মী দি ইগোইস্ট (The Egoist, ১৮৭৯) উপন্যাসে মানবমনের অনুপুঙ্খ ও বিশদ বিশ্লেষণ লক্ষ করা যায়।

রুশ সাহিত্য মিখাইল র্লেমন্তভের আমাদের সময়কার নায়ক (১৮৪০) মনস্তাত্ত্বিক উপন্যাস রচনার প্রথম প্রয়াস। রুশ সাহিত্যে বিখ্যাত মনস্তাত্ত্বিক উপন্যাস হচ্ছে ফিওদর দস্তয়েভস্কির অপরাধ ও শাস্তি (১৮৬৬)।

বাংলা সাহিত্যের প্রথম সার্থক উপন্যাসকার বঙ্কিমচন্দ্র মনের জটিল অন্তর্লোকে আলোকসম্পাতের ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছিলেন। নিজের উপন্যাসগুলোতে বাহ্যিক ঘটনার প্রখর পারম্পর্যের প্রতি যত্নবান হলেও চরিত্রের মনোজাগতিক প্রবণতাগুলিকে নানাভাবে উন্মোচন করায় সচেষ্ট ছিলেন তিনি। কপালকুণ্ডলা-র (১৮৬৬) মতো রোমান্সধর্মী রচনায়ও তাঁর মনস্তত্ত্ব বিশ্লেষণের কুশলতা লক্ষ্য করা যায়। তাঁর সামাজিক-পারিবারিক উপন্যাসগুলোতেও সূক্ষ্ম  মনস্তাত্ত্বিক  বিশ্লেষণের প্রয়াস চোখে পড়ে। বিষবৃক্ষ (১৮৭৩), রজনী (১৮৭৭) ও কৃষ্ণকান্তের উইল (১৮৭৮) উপন্যাসের কথা এ ক্ষেত্রে স্মরণীয়। বিশেষ করে কৃষ্ণকান্তের উইল  তাঁর  সেরা মনস্তাত্ত্বিক উপন্যাসের উদাহরণ হিসেবে বিবেচ্য।

বাংলা সাহিত্যে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের চোখের বালি (১৯০৩) প্রথম সার্থক মনস্তত্ত্বমূলক উপন্যাস হিসেবে গণ্য।  আধুনিক উপন্যাসে মানব মনের গূঢ় মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ বাস্তবতার যে নতুন মাত্রা পেয়েছে তা প্রথম লক্ষণীয় চোখের বালি-তে। স্বদেশি আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে রচিত ঘরে-বাইরে (১৯১৬) উপন্যাসেও মনোবিশ্লেষণে রবীন্দ্রনাথের কুশলতার পরিচয় পাওয়া যায়। বিমলা, নিখিলেশ ও সন্দীপের ত্রিকোণ সম্পর্কের মনোবর্ণনা এটিকে মনস্তাত্ত্বিক উপন্যাসের ধারায় বিশিষ্টতা দিয়েছে।

এ ধারায় শরৎচন্দ্রের গৃহদাহ (১৯২০) উপন্যাসটির নামও করা যায়। একদিকে শান্ত কঠিন ও নিরাবেগ মহিম অন্যদিকে উন্মত্ত ব্যাকুল সুরেশ―এ দুজনের মাঝখানে অচলার দ্বিধা-দ্বন্দ্ব-অনিশ্চয়তাময় হৃদয়দোলার মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ রয়েছে এ উপন্যাসে।

বাংলা মনস্তাত্ত্বিক উপন্যাসের ধারায় মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের নামও উল্লেখযোগ্য।  তাঁর দিবারাত্রির কাব্য (১৯৩৫) উপন্যাসে  চরিত্রগুলোর  আত্মবিশ্লেষণ ও মগ্নচৈতন্যের প্রকাশ চমকপ্রদ।  তাঁর চতুষ্কোণ (১৯৪২) উপন্যাসে মানুষের অবদমিত আকাক্সক্ষা ও অসুস্থ মনোবিকারের যে চিত্র ফুটে উঠেছে তা বাংলা সাহিত্যে দুঃসাহসিক ও অভিনব। তাতে ফ্রয়েডীয় অবচেতন- মানস-তত্ত্বের প্রভাব সুস্পষ্ট।

বাংলাদেশের সাহিত্যে মনস্তাত্ত্বিক উপন্যাস হিসেবে উল্লেখযোগ্য : সৈয়দ শামসুল হকের দেয়ালের দেশ (১৯৫৯), আলাউদ্দিন আল আজাদের তেইশ নম্বর তৈলচিত্র (১৯৬০), সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্র চাঁদের অমাবস্যা (১৯৬১) ও কাঁদো নদী কাঁদো (১৯৬৮) ইত্যাদি।

চেতনাপ্রবাহ রীতির উপন্যাস : উনিশ শতকের শেষভাগে ও বিশ শতকের শুরুতে মনস্তাত্ত্বিক উপন্যাসে অভিনব ও চমকপ্রদ পালাবদল ঘটে। পাশ্চাত্য সাহিত্যে প্রচলিত উপন্যাসে এর আগে কখনও কখনও ইস্ততত বিক্ষিপ্তভাবে মনের আনাচে-কানাচে আলোক সম্পাত করা হলেও মনোজগতের নিমজ্জিত ও অর্ধনিমজ্জিত স্তরগুলিকে উদ্ঘাটনের ব্যাপক প্রয়াস ঘটে। ঔপন্যাসিকেরা মনের গহনে বহমান ভাবনাচিন্তা ও মানসিক ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়াকে নিরবচ্ছিন্ন প্রবহমানতায় উপস্থাপনে প্রয়াসী হন। তা মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে নতুন ধরনের প্রকরণবিশিষ্ট্য ও ভাষাশৈলী গ্রহণ করে এবং উদ্ভব হয় আধুনিক ‘চেতনাপ্রবাহ’ রীতির। এর পটভূমি হিসেবে কাজ করেছিল মনস্তত্ত্ব, দর্শন ও বিজ্ঞানের কিছু যুগান্তকারী তত্ত্বভাবনা ও আবিষ্কার। বিশেষ করে বিখ্যাত মনস্তত্ত্ববিজ্ঞানী সিগ্মুন্ড ফ্রয়েডের মনস্তত্ত্ব-গবেষণা, বিশেষ করে অবচেতন মনের রহস্য-উদ্ঘাটন, কার্ল মার্কসের সমাজচিন্তা এবং আইনস্টাইন-প্লাঙ্ক প্রমুখ বিজ্ঞানীর অণু সংক্রান্ত ধারণা ও পদার্থবিদ্যাবিষয়ক আবিষ্কার ইত্যাদির এক সামগ্রিক অভিঘাত শিল্প-সাহিত্যের বিষয় ও প্রকরণে ব্যাপক পরিবর্তনের সূচনা করে।

বিশ শতকে যান্ত্রিক সভ্যতার প্রচণ্ড চাপে পারিবারিক জীবনে ভাঙন, সামাজিক জীবনে অবক্ষয়, ব্যক্তিজীবনে বিচ্ছিন্নতা ও নিঃসঙ্গতার বেদনা মানুষকে ক্রমেই অন্তর্মুখী করে তুলেছে। মানুষ হয়েছে  মানসিক চাপ ও জটিলতার মুখোমুখি। অন্যদিকে এই শতকে মনোবিজ্ঞান চর্চার বিপুল প্রসার, অস্ট্রীয় স্নায়ু চিকিৎসক  সিগমুন্ড ফ্রয়েড ও জার্মান মনস্তাস্তিক কার্ল গুস্তাফ ইয়ুং প্রমুখ মনোবিজ্ঞানীর মনস্তত্ত্ব বিশ্লেষণে সাফল্য মানুষের মনোজগতের প্রতি আগ্রহের সৃষ্টি করেছে। এভাবেই গড়ে উঠেছে আধুনিক মনস্তাত্ত্বিক উপন্যাসের পটভূমিকে। বিশেষ করে ফ্রয়েডের মনোবিকলন তত্ত্ব আধুনিক মনস্তাত্ত্বিক উপন্যাসকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে। এই প্রেক্ষাপটে বিশ শতকে মনস্তত্ত্বমূলক উপন্যাস বিকাশের শীর্ষবিন্দু স্পর্শ করে।

‘চেতনাপ্রবাহ’ বা ‘Stream of Consciousness’ শব্দবন্ধটি সাহিত্যে এসেছে মনোবিজ্ঞান থেকে। বিশিষ্ট মার্কিন দার্শনিক উইলিয়াম জেমস তাঁর প্রিন্সিপল্স্ অব সাইকোলোজি (১৮৯০) গ্রন্থে চেতনাকে দেখেছেন নদীর প্রবাহের মতো করে, যেখানে নানা স্মৃতি, নানা ভাবনা, নানা অনুভব ও আকস্মিক নানা অনুষঙ্গ নিরন্তর একে অন্যের সংস্পর্শে আসে এবং কোনও যুক্তি না মেনে পরস্পরের সঙ্গে মেশে। চেতনাপ্রবাহ হচ্ছে অন্তর্মনোকথনের (interior monologue) চূড়ান্ত রূপ, যার সঙ্গে বাস্তব পরিবেশের বস্তুনিষ্ঠ সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা কঠিন হয়ে পড়ে।

চেতনাপ্রবাহ রীতির উপন্যাসে মানবমনের গহনলোকের অনুভূতি ও স্মৃতির নিরন্তর প্রবাহকে তুলে ধরা হয়। মানুষের চেতন-অবচেতন মনের চিন্তন প্রক্রিয়ায় যেভাবে খণ্ড খণ্ড ছবি, টুকরো টুকরো ঘটনা, আবছা আবছা স্মৃতি পরম্পরাহীন ও অসংলগ্নভাবে মনের পর্দায় ভেসে ওঠে তাকে বর্ণনার মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করা হয় এ ধরনের উপন্যাসে। মানবমনের চিন্তন-প্রক্রিয়ার বৈশিষ্ট্যকে বলা হয় চেতনাপ্রবাহ বা চেতনাস্রোত। আর সাহিত্যে এই মানসক্রিয়ার প্রকাশরীতিকে বলা হয় অন্তর্লীন মনোকথন (interior monologue)।

ঘটনাবহুল বহির্জগৎ নয়, বরং মানব চরিত্রের চেতন-অবচেতনের জটিলতাময় অন্তর্জগৎ এ ধরনের উপন্যাসের মনোনিবেশ ও প্রকাশের বিষয়। লোকচক্ষুর অন্তরালে থাকা মানবমনের যে বহুবিচিত্র চিন্তা, অনুভব ও স্মৃতি ইত্যাদিকে পাঠকের সামনে তুলে ধরার জন্যে চরিত্রের অন্তর্লীন মনোকথনের ব্যবহার করেন। মানুষের চিন্তাধারা এলোমেলোভাবে প্রবাহিত হয় বলে অন্তর্লীন মনোকথনে যুক্তি-পরম্পরা বিঘ্নিত ও বিস্রস্ত হয়। শব্দ প্রয়োগে ও বাক্য গঠনে তাই শৃঙ্খলার ব্যত্যয় ঘটে।

চেতনাপ্রবাহরীতির উপন্যাসের প্রধান প্রধান বৈশিষ্ট্য হচ্ছে :

  • এ ধরনের উপন্যাসে অন্তর্জগতের ভাবনা, বিচিত্র অনুভব ও জটিল টানাপড়েনের নানা অনুষঙ্গের ওপর আলোকপাত করা হয়;
  • জমজমাট কাহিনি ও সুসংবদ্ধ আখ্যানের বদলে চরিত্রে ঘটনার ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া তুলে ধরার দিকেই থাকে লেখকের মনোযোগ;
  • এই রীতিতে চরিত্রের মানসিক বিষয় ও সেগুলো ব্যক্ত করার প্রক্রিয়াগুলি দেখাবার জন্য চরিত্রের অন্তর-মনোকথন গুরুত্ব পায়। প্রত্যক্ষ অন্তর-মনোকথনের মাধ্যমে চরিত্রের চিন্তা-চেতনার নিরবচ্ছিন্ন প্রবাহকে সরাসরি পাঠকের কাছে তুলে ধরা হয় বক্তা পক্ষ বা উত্তম পুরুষের জবানিতে। সে ক্ষেত্রে লেখকের উপস্থিতি বা মধ্যস্থতার প্রয়োজন পড়ে না। পক্ষান্তরে পরোক্ষ অন্তর্মনোকথনের বেলায় লেখক উপস্থিত হন চরিত্রের মন ও পাঠকের মাঝখানে। ব্যবহৃত হয় অন্য পক্ষ (প্রথম পুরুষ) বা শ্রোতাপক্ষের (মধ্যম পুরুষ) বর্ণনারীতি;
  • প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ অন্তর মনোকথন ছাড়াও চরিত্রের অন্তর্জীবন উন্মোচনে ব্যবহৃত হয় সর্বজ্ঞ বা সর্বদর্শী লেখকের বর্ণনারীতি ও স্বগতোক্তি (soliloquy);
  • যুক্তিযুক্ততা, কালানুক্রম ইত্যাদি পারম্পর্য রক্ষিত হয় না; অতীত-বর্তমান -ভবিষ্যৎ এলামেলোভাবে উঠে আসে কাহিনিতে। ফলে আপাত-অসংলগ্নতার জন্ম হয়;
  • চলচ্চিত্রে ব্যবহৃত সিনেমাটিক, মন্তাজ (montage), ফ্লাশ ব্যাক ইত্যাদির অনুসরণে এলামেলো চিন্তাস্রোতকে তুলে ধরা হয়;
  • কাহিনি বর্ণনায় অন্তর-মনোকথন, মুক্ত পরোক্ষ ব্যাখ্যান (free indirect discourse), মনোবর্ণন (psycho-narration) ইত্যাদি কৌশলের আশ্রয় নেওয়া হয়ে থাকে;
  • বক্তা পক্ষ বা উত্তম পুরুষে বর্ণনা পরিহার করা হয়;
  • আলংকারিক বর্ণনারীতি অনুসরণ করা হয়;
  • কাহিনি বর্ণনায় সর্বজ্ঞ বা সর্বদর্শী লেখকের প্রেক্ষণবিন্দু ব্যবহৃত হয়;
  • দীর্ঘ ও আন্তঃসম্পর্কিত বাক্যের সাহায্যে চিন্তার প্রবাহের প্রতিফলন ঘটানোর চেষ্টা থাকে;
  • অনানুষ্ঠানিক কথ্য ভাষা ব্যবহারের প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়;
  • বিরামচিহ্ন ব্যবহারের নিয়ম যথাযথভাবে রক্ষিত হয় না; প্রায়শ ছেদ বা বিরাম চিহ্ন বর্জন করে চেতনাপ্রবাহের নিরন্তরতাকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে ধরার চেষ্টা চলে;
  • ব্যাকরণসম্মত ভাষা প্রয়োগ, প্রথাগত বিন্যাস ও শৈলীগত রীতির মতো গতানুগতিকতা বা প্রথাবদ্ধতা পরিহার করা হয় ইত্যাদি।
  • চেতনাপ্রবাহরীতির পূর্বাভাস লক্ষ করা গেছে আঠারো শতকের ইংরেজ ঔপন্যাসিক লরেন্স স্টার্নের ট্রিস্ট্র্যাম শ্যানডি (১৭৬০-১৭৬৭) নামের মনস্তাত্ত্বিক উপন্যাসে। এ উপন্যাসে প্রচলিত রীতির রদবদল ঘটিয়েছিলেন তিনি। আঙ্গিক ও ভাষার প্রথাগত পথ অনুসরণ না করে নবতর কৌশলে স্টার্ন উন্মোচন করতে চেয়েছিলেন মানবমনের গূঢ় জটিল অপার রহস্য।

ইংরেজি উপন্যাসের ক্ষেত্রে চেতনাপ্রবাহরীতির প্রথম সচেতন শিল্পী হেনরি জেমস। বাইরের মানুষটিকে নয়, তিনি দেখতে চেয়েছিলেন ভেতরের মানুষটিকে। মানব মনের সূক্ষ্ম ও জটিল অনুভূতির চাঞ্চল্যকে প্রকাশ করার জন্য তিনি নতুনতর কলাকৌশল অবলম্বনের কথা বলেছিলেন তাঁর দি আর্ট অব ফিকশন (১৮৮৪) গ্রন্থে। রুশ ঔপন্যাসিক ফিওদর দস্তয়েভস্কিও স্বতন্ত্রভাবে তাঁর উপন্যাসে চেতনাপ্রবাহ রীতির অনুরূপ কৌশল অবলম্বন করেছিলেন। বিখ্যাত অপরাধ ও শাস্তি (১৮৬৬) উপন্যাসে তিনি মানুষের দুর্জ্ঞেয় মনোজগৎ ও তার বিচিত্র অভিপ্রায়, অভিসন্ধি ও লীলার সন্ধান করেছেন।

অন্তর্লোকের মনঃসংলাপের মাধ্যমে এবং চলচ্চিত্রের মন্তাজের রীতিতে চেতনাপ্রবাহ রীতির ব্যবহার করেন বিশ শতকের বিখ্যাত মনস্তাত্ত্বিক উপন্যাস রচয়িতা ফরাসি ঔপন্যাসিক মার্সেল প্রুস্ত, ব্রিটিশ লেখিকা ডরোথি রিচার্ডসন, আইরিশ ঔপন্যাসিক জেমস জয়েস, ইংরেজ লেখিকা ভার্জিনিয়া উল্ফ্ প্রমুখ। তাঁরা নতুন মনোবিশ্লেষণী কৌশল ব্যবহার করে চেতন-অবচেতন মনের জটিল, পরম্পরাহীন, বিস্রস্ত প্রবাহের রূপ তুলে ধরাতে প্রয়াসী হন এবং মানুষের চৈতন্যপ্রবাহ চিত্রণের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেন। মনস্তাত্ত্বিক উপন্যাস লেখিকা ইংরেজ লেখিকা ভার্জিনিয়া উলফ আধুনিক উপন্যাসের চরিত্রের চৈতন্য-চিত্রণের গুরুত্ব নির্দেশ করতে গিয়ে জানিয়েছেন, জীবনে চেতনার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত আমাদের জীবনকে অর্ধাচ্ছন্ন করে রাখে চিন্তা, অনুভূতি ও মনোভাব। এটাই জীবনের অন্তর্বাস্তবতা। আর ঔপন্যাসিকের করণীয় হচ্ছে, এই বাস্তবতাকে আবিষ্কার করা। মানুষের মনোজগৎ চিত্রণের এই বৈশিষ্ট্য মনস্তাত্ত্বিক বাস্তবতা (psychological realism) নামেও অভিহিত হয়েছে।

বিশ শতকের দশের দশকে ফরাসি ঔপন্যাসিক মার্সেল প্রুস্ত-এর হারানো দিনের সন্ধানে (A la recherche du temps perdu ১৯১৩-১৯২৭) উপন্যাসমালার প্রথম দুটি খণ্ড এবং ইংরেজ লেখক ডরোথি রিচার্ডসনের বারো খণ্ডের সুবৃহৎ আত্মজৈবনিক উপন্যাসমালা পিলগ্রিমেজ-এর (১৯১৫-১৯৬৭) প্রখম খণ্ড Pointed Roofs (১৯১৫) প্রকাশিত হলে পাশ্চাত্য উপন্যাস সাহিত্যে চেতনাপ্রবাহ রীতি ব্যবহারের সূচনা ঘটে। উভয় উপন্যাসেই সবচেয়ে বেশি মনোনিবেশ করা হয় ব্যক্তিমনের দিকে, লক্ষ্য হয় মানবমনের রহস্য উন্মোচন।

এর পরপরই উপন্যাসে অন্তর্লোকের মনোকথন ও চেতনাপ্রবাহ রীতি ব্যবহারে চমৎকার পারদর্শিতা দেখিয়েছেন জেমস জয়েস। এ ক্ষেত্রে বিশেষ উল্লেখযোগ্য তার আ পোর্ট্রটে অব দ্য আর্টিস্ট অ্যাজ এ ইয়ং ম্যান (১৯১৬) ও ইউলিসিস (১৯২২) উপন্যাস। জেম্স্ জয়েস তাঁর ইউলিসিস উপন্যাসে চেতনাপ্রবাহরীতিকে পূর্ণ বিকশিত করেন। ডাবলিন শহরের জনৈক লিওপোল্ড ব্লুমের মাত্র ষোলো ঘণ্টাব্যাপী জটিল ও অন্তর্লীন মানস পরিক্রমার জগৎ জয়েস উদ্ঘাটিত করেছিলেন এ উপন্যাসে। ঘটনা ও আখ্যান সন্নিবেশের চিরাচরিত পন্থা পরিহার করে এখানে তিনি চেতনাপ্রবাহরীতিতে মানব অভিজ্ঞতার বিশদ ও মননশীল প্রকাশ ঘটান। ইউলিসিস হচ্ছে চেতনাপ্রবাহ রীতিতে রচিত প্রধান ও কেন্দ্রীয় উপন্যাস।

এ উপন্যাসে বিধৃত হয়েছে জনৈক লিওপোল্ড ব্লুমের চিন্তা-ভাবনা আবেগ-অনুভূতি-ঋদ্ধ মানসভ্রমণের চিত্রকল্পময় বৃত্তান্ত। তাতে চিত্ররূপময় ও প্রতীকী ব্যঞ্জনায় ফুটে উঠেছে তাঁর ছায়াচ্ছন্ন ও অন্ধকার মনোলোকের প্রবহমান ছবি। উপন্যাসের শেষ অধ্যায়ে ৪,৩৯১ শব্দের একটি মাত্র বাক্যে বর্ণিত হয়েছে মলি ব্লুমের অন্তর-মনোকথন। ইউলিসিস উপন্যাসে পাঠক পরিচিত হন চেতনাপ্রবাহের আঙ্গিকে প্রকাশিত মানবমনের অচেতন-অর্ধচেতন অভিব্যক্তির সঙ্গে। তাতে পাওয়া যায় ফ্রয়েডীয় মনোবিকলন তত্ত্ব-প্রভাবিত  অবদমিত কামনা-বাসনার অনাবৃত রূপ। আর এর আনুষঙ্গিক বৈশিষ্ট্য হলো, চেতনাপ্রবাহের উপযোগী ব্যঞ্জনাময় শব্দচয়ন ও বাগ্বিন্যাস। এভাবে জয়েস ভাবানুষঙ্গ, সচেতন-অবচেতন মানস-ভাবনার মধ্য দিয়ে আধুনিক অবয়বহীন মানবমনের জটিল ও বিস্রস্ত অস্তিত্বের সমস্যাকে ফুটিয়ে তুলেছেন।

বিশ শতকের বিশের দশক থেকেই অনেক লেখক চেতনাপ্রবাহ রীতির দিকে ঝুঁকে পড়েন। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হলেন ভার্জিনিয়া উলফ ও মার্কিন লেখক উইলিয়াম ফকনার। ভার্জিনিয়া উলফের মিসেস ড্যালোওয়ে (১৯২৫) উপন্যাসে একদিনের ঘটনাপুঞ্জকে কেন্দ্র করে তার অনুষঙ্গ হিসেবে এসেছে অতীতের নানা স্মৃতি ও নানা গভীর অনুভূতি। একদিনের অভিজ্ঞতার মধ্যেই বিন্যস্ত হয়েছে গোটা জীবনের ইতিহাস। উইলিয়াম ফকনারের দ্য সাউন্ড অ্যান্ড দ্য ফিউরি (১৯২৯) উপন্যাসের চরিত্ররা বাহ্যত মুখে কথা বলে, তবে তাদের মন ব্যস্ত থাকে অতীত স্মৃতি রোমন্থনে। দুটি রচনাই চেতনাপ্রবাহ রীতির উপন্যাসের প্রতিনিধিত্বমূলক উদাহরণ। 

চেতনাপ্রবাহরীতির মনস্তাত্ত্বিক উপন্যাস হিসেবে চিহ্নিত করার মতো বাংলা উপন্যাসের সংখ্যা খুবই কম। এর বাস্তর কারণও রয়েছে। পাশ্চাত্যে পুঁজিবাদী যন্ত্র-সভ্যতার চাপে ব্যক্তির জীবন ও মানসে যে ধরনের জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে এ দেশে তেমনটি হয়নি। স্বভাবতই শিল্প-সাহিত্যে তার প্রতিফলন ঘটে নি। তা সত্ত্বেও পাশ্চাত্য উপন্যাসের প্রভাবে বাংলা উপন্যাসে চৈতন্যপ্রবাহ রীতির ব্যবহার মাঝে মাঝে লক্ষ করা যায়।

মনস্তত্ত্বমূলক উপন্যাসের অন্তর্ময় রীতিতে প্রথম বাংলা উপন্যাস লেখার প্রচেষ্টা লক্ষ করা যায় বুদ্ধদেব বসুর লাল মেঘ (১৯৩৪) গ্রন্থে। ধুর্জটিপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের অন্তঃশীলা (১৯৩৫), আবর্ত (১৯৩৭) ও মোহনা (১৯৪৩)― এই ত্রয়ী উপন্যাস আধুনিক নারী-পুরুষের জীবনে কামনা-বাসনা, প্রেম, পারস্পরিক সম্পর্ক ও ব্যক্তিত্বের সমস্যার গভীর ও তীব্র মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণে ঋদ্ধ। সঞ্জয় ভট্টাচার্যের বৃত্ত (১৯৪২) উপন্যাসে লক্ষণীয় আধুনিক মনের যৌনবাসনার বিকার ও অতৃপ্তির বিশ্লেষণ। বাংলা সাহিত্যে সতীনাথ ভাদুড়ীর জাগরী (১৯৪৬) চেতনাপ্রবাহ রীতির উল্লেখযোগ্য উপন্যাস হিসেবে স্বীকৃত। ১৯৪২ সালের আগস্ট আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে কারান্তরালের জীবন নিয়ে গড়ে উঠেছে এ উপন্যাসের কাহিনি। এতে ফাঁসির সেলে মৃত্যুর প্রতীক্ষারত বিলু, আপার ডিভিসনে কারাবন্দি তার বাবা, আওরাত কিতায় কারাবন্দি তার মা, এবং জেল গেটে অপেক্ষারত তার ছোট ভাই নীলু―এই চারটি চরিত্র আসন্ন একটি ভয়ঙ্কর পরিণতিকে সামনে রেখে চিন্তার গভীর প্রবাহে ক্রমশ লীন হয়েছে। দীপেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃতীয় ভুবন (১৯৫৮) উপন্যাসে বর্ণিত হয়েছে সকাল থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত সময়সীমায় নায়িকা জয়তীর জীবন-মানসের জটিল প্রবাহের চিত্র। এ ছাড়া বিমল করের ফানুসের আয়ু (১৯৫৮) উপন্যাসেও সীমিত কাল পরিসরে চেতন-অবচেতন মানসের অন্তমূুখীন বিশ্লেষণ পাওয়া যায়। বাংলাদেশের সাহিত্যে সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্র চাঁদের অমাবস্যা (১৯৬৪) ও কাঁদো নদী কাঁদো (১৯৬৮) এবং আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের চিলেকোঠার সেপাই (১৯৮৬) ও খোয়াবনামা (১৯৯৬) উপন্যাসে চেতনাপ্রবাহ রীতির সার্থক প্রয়োগ লক্ষ্য করা যায়।

(চলবে)

লেখক : প্রাবন্ধিক ও গবেষক

Leave a Reply

Your email address will not be published.

shares