প্রবন্ধ : ফয়জুল লতিফ চৌধুরী সম্পাদিত বাংলার ত্রস্ত নীলিমা : সম্পাদনা সম্পর্কিত নিমকথন : কাবেদুল ইসলাম

সম্প্রতি প্রকাশিত বাংলার ত্রস্ত নীলিমা নিয়ে এখানে আমরা দু-চার কথা বলার চেষ্টা করব। তার আগে জানিয়ে রাখা দরকার যে, এখানে যা বলা বা আলোচনার্থ তুলে ধরা হবে, তা অবশ্যই হবে মন্ময় (subjective) অর্থাৎ আত্মমুখী ভাবনাচরিত, কাজেই লেখাটির পুরোপুরি তন্ময় (objective) বা বস্তুনিষ্ঠ হওয়ার সম্ভাবনা নেই বললে চলে। উল্টো, এতে আমাদের এ সম্পর্কিত সামান্য পাঠাভিজ্ঞতা ও সাহিত্যজ্ঞান প্রতিফলিত হওয়ায় তা অধিকাংশের কাছেই বিশেষত বোদ্ধাজনের অপাঠ্য হলেও আশ্চর্য হব না। যা-ই হোক, কথা আর না বাড়িয়ে শুরুতেই দৃক্পাত করে নিই, দেশের অন্যতম প্রকাশনা সংস্থা ‘পাঠক সমাবেশ’ কর্তৃক প্রকাশিত (মার্চ ২০২১) আলোচ্য গ্রন্থটির চমৎকার দৃষ্টিনন্দন প্রচ্ছদের প্রতি, যাতে লিপিকৃত হয়েছে এ কথাগুলো: “বাংলার ত্রস্ত নীলিমা/ ‘রূপসী বাংলা’ কাব্যের মূল পরিকল্পিত পাণ্ডুলিপি/ জীবনানন্দ দাশ/ সম্পাদনা: ফয়জুল লতিফ চৌধুরী”।

শুরুতেই জেনে নেওয়া যাক, আলোচ্য গ্রন্থটির সম্পাদক তদীয় ‘সম্পাদকের কৈফিয়ৎ’ শীর্ষক অংশে যা বলেছেন, ইতস্তত চয়িত তার দু-একটি অংশ; তিনি সুস্পষ্টভাবে লিখেছেন: ‘বাংলার ত্রস্ত নীলিমা’ গ্রন্থটিকে কবিতা সংকলনের পরিবর্তে একটি কাব্য হিসেবে পাঠ করা যেতে পারে, যাতে ৬২টি পর্ব রয়েছে।…/জীবনানন্দ দাশ কোনও কবিতার শিরোনাম দেওয়ার প্রয়োজন বোধ করেননি: ১ থেকে ৭৩ পর্যন্ত সংখ্যা ব্যবহার করেছেন। ব্যতিক্রম চারটি কবিতা যেগুলোর শুরুতে শিরোনাম লিখেছিলেন জীবনানন্দ।” [ঐ, পৃষ্ঠা ২২]। প্রায় একই রকম তথ্য-ভাষ্য লভ্য এর অন্যত্রও; যেমন―“জীবনানন্দের পাণ্ডুলিপির অধিকাংশ কবিতার ক্ষেত্রে লক্ষ্য করা যায় রচনাকালে খুব কম কবিতারই শিরোনাম রেখেছেন জীবনানন্দ দাশ। শিরোনামের প্রশ্নটি এসেছে কোনও সাহিত্যপত্রে বা গ্রন্থে কবিতা প্রকাশকালে। তবে এই গ্রন্থে ৬২টি চতুর্দশপদীর জন্য শিরোনাম ব্যবহার করা হয়েছে। শিরোনাম নির্বাচনে প্রথম চরণ অবলম্বন করা হয়েছে; হয় সম্পূর্ণ প্রথম চরণটি ব্যবহার করা হয়েছে কিংবা প্রথম চরণের উপযুক্ত অংশবিশেষ ব্যবহার করা হয়েছে। এতে ভবিষ্যতে পাঠক কারও কাছে উল্লেখ করার সময় একটি হাতল পেয়ে যাবেন।” [ঐ, পৃষ্ঠা ২৩]।

চমৎকার সাধু বক্তব্য। তবে তাঁর উপর্যুক্ত বক্তব্য খুবই সরলীকৃত, ফলত অগ্রহণযোগ্য ও অপ্রয়োজনীয়। এক্ষেত্রে প্রথমেই যেটা বলার তা হলো, আলোচ্য কবিতা বা চতুর্দশপদীগুলোর রচয়িতা স্বয়ং যেখানে সেগুলোর কোনও নাম দেওয়ার প্রয়োজন বোধ করেননি, পরবর্তীকালে অনেক সুপ্রতিষ্ঠিত ও প্রথিতযশা পণ্ডিত-সংকলক (আমি এক্ষেত্রে ‘সম্পাদক’ শব্দটি ব্যবহারে বোধগম্য কারণেই কিছুটা অনুদার-প্রাণ) সেখানে সম্পাদক- সংকলকগণই বা সে দায়িত্ব অযাচিতভাবে তুলে নেন বা নিতে চান কেন, সে প্রশ্ন থেকেই যায় বা করার সঙ্গত সুযোগ রয়েছে। এবং সেক্ষেত্রে নামকরণের যে সহজ সরল ‘প্রযুক্তি-প্রকরণ’ ব্যবহৃত বা অনুসৃত হয়েছে তা আগেই উদ্ধৃত―‘হয় সম্পূর্ণ প্রথম চরণটি ব্যবহার করা হয়েছে কিংবা প্রথম চরণের উপযুক্ত অংশবিশেষ ব্যবহার করা হয়েছে।’ আদতে কবিরা (সনেটিয়ারও তো শেষ পর্যন্ত কবিই) কি এভাবে নামকরণ করে থাকেন ? অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি (যেহেতু নিজেও সামান্য কবিতা লিখি বা লেখার মকশো করি!), এটা ক্বচিৎ ঘটে, বরং কবিতার বা অন্য কোনও সাহিত্য-আঙ্গিকের নামকরণের অন্যবিধ কারণ ও যুক্তি রয়েছে। তবে এখানে অতিসরলীকৃত ব্যাপার যেটি কথিত, তা হলো―‘সম্পূর্ণ প্রথম চরণটি ব্যবহার করা হয়েছে’। এটা যে করা অনুচিত তার পক্ষে সবচেয়ে বড়ো যুক্তি হচ্ছে, জীবনানন্দের এই সনেট ও সনেট-প্রতিম রচনাগুলোর কোনও কোনওটির প্রথম চরণ বা পঙ্ক্তির (অতঃপর ‘পঙ্ক্তি’ ও ‘চরণ’ একার্থে প্রযুক্ত) দৈর্ঘ্য ২৬-অক্ষরের (মূলত ৮+৮+৮+২ মাত্রার বা চালের)। ফলে এটি পুরো নামকরণে আনা অযৌক্তিক ও অসমর্থনীয়ই শুধু নয়, পরন্তু অনুচিত, হাস্যকর ও বালখিল্যের পরিচায়কও বটে। তবে সত্য এটাই যে, বর্তমান সম্পাদক গ্রন্থিত একটি রচনার ক্ষেত্রেও তা করেননি। ফলে তাঁর নিজের ভাষ্যই অর্থাৎ ‘সম্পূর্ণ প্রথম চরণটি ব্যবহার করা হয়েছে’―এ প্রতিশ্রুতি রক্ষিত হয়নি (তাঁর কথিত নামকরণ-রীতি একটি সনেটেও সম্পাদক বাস্তবায়িত বা প্রতিফলিত করেননি, আর না করে ভালোই করেছেন বলব)।

প্রসঙ্গত এখানে জানিয়ে রাখা যেতে পারে যে, এরূপ নামকরণের অনর্থক প্রচেষ্টা আরও কোনও কোনও সম্পাদক, সংকলক করেছেন বা করবার চেষ্টা করেছেন। যেমন―আবদুল মান্নান সৈয়দ [দেখুন, তাঁর সম্পাদিত, প্রকাশিত-অপ্রকাশিত কবিতাসমগ্র জীবনানন্দ দাশ, অবসর, ঢাকা, প্রথম প্রকাশ ১৯৯৪]। আবার কলকাতার বেঙ্গল পাবলিশার্স (প্রা.) লিমিটেড কর্তৃক দু-খণ্ডে প্রকাশিত (প্রথম প্রকাশ বৈশাখ ১৩৭৭; নতুন মুদ্রণ অগ্রহায়ণ ১৪১৯) জীবনানন্দ দাশের কাব্যগ্রন্থ [প্রথম খণ্ড] শীর্ষক পুস্তকেও অনুরূপ প্রচেষ্টা লক্ষ্য করা যায়। বলাবাহুল্য, আমরা এই প্রচেষ্টাকে নিতান্ত অনাবশ্যক এবং অকারণ জটিলতা-উৎপাদক বলে মনে করে তা মোটেও সমর্থন করি না। উল্টো আমরা দেবেশ রায়, ড. ক্ষেত্রগুপ্ত (জীবনানন্দ দাশের কাব্যসমগ্র, ভারবি, কলকাতা, প্রথম ২০০১; এটিতেও অবশ্য অন্যবিধ নানা অসঙ্গতি রয়েছে) প্রমুখ যেভাবে সংখ্যাচিহ্নিত করে মূলানুগ সংকলন/গ্রন্থন করেছেন, সেটিরই সমর্থক ও পক্ষপাতী।

যা হোক, এ পর্যায়ে আমরা আরও কিছু বিষয় উল্লেখ করতে চাই।

এক. সত্য যে, জীবনানন্দ দাশ (জন্ম ১৭ই ফেব্রুয়ারি ১৮৯৯) আলোচ্য সনেট (Sonnet) ও সনেট-প্রতিম রচনাগুলো লিখেছেন একান্ত নিভৃতে, সৃষ্টিশীলতার টানা মৌতাতে মজে, রুলটানা এক্সাসাইজ খাতায়, এবং জীবদ্দশায় এগুলোর কয়েকটি ছাড়া অধিকাংশই তিনি প্রকাশ করেননি বা প্রকাশে আগ্রহ দেখাননি, অথচ এসব রচনার (১৯৩৪) পরও তিনি প্রায় ২০ বছর সম্পূর্ণ সুস্থ, সবল দেহে বেঁচে ছিলেন (কলকাতায় ট্রাম দুর্ঘটনায় মারাত্মকভাবে আহত হওয়ার পর হাসপাতালে চিকিৎসারত অবস্থায় তাঁর অকাল মৃত্যু হয় ১৯৫৪ সালের ২২শে অক্টোবর)। মৃত্যুর পরবর্তী সময়ে (আগস্ট ১৯৫৭) ভূমেন্দ্র গুহ সম্পাদিত ও জীবনানন্দানুজ অশোকানন্দ কর্তৃক লিখিত ভূমিকা- সংবলিত বাংলা কাব্যবিশ্বের সুবিপুল জনপ্রিয় ও সুপ্রচুর প্রশংসিত এই রচনাগুলো কেন যে তিনি (কবি) জীবদ্দশায় প্রকাশ করেননি, তার কারণ আজও অজ্ঞাত ও রহস্যমণ্ডিত এবং শুধু সেটিই নয়, গ্রন্থটি অর্থাৎ রূপসী বাংলা নামে প্রকাশিত কাব্যটি আপামর পাঠক, সমালোচক ও জীবনানন্দ গবেষকদের কাছে আজও প্রবল বিস্ময়ের বস্তু হয়ে রয়েছে বললে অত্যুক্তি হয় না, যার কারণ হয়তো কোনও দিনই আর উদ্ঘাটিত হবে না। অন্য দিকে এটাও সত্য যে, রচনাগুলোর যে দু-চারটি কবি জীবদ্দশায় প্রকাশ করেছিলেন, সেগুলোতে তিনি স্বাভাবিকভাবে নাম সংযোজন করেছিলেন। তবে এর চেয়েও বড় কথা ও পুনরুক্তি হলেও বলা দরকার যে, এগুলোর অধিকাংশেরই কোনও নাম তিনি দেননি, আর না দেওয়ার কারণও কোথাও বলেছেন বা লিখেছেন, তেমনটা জানা যায় না।

দুই. আমরা জানি যে, জীবনানন্দ দাশ ইংরেজি সাহিত্যের ছাত্র ছিলেন এবং যে কিছুকাল ইতস্তত অধ্যাপনায় জীবন অতিবাহিত করেছেন, সেটিও ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্যের শিক্ষক হিসেবে। কাজেই ইংরেজি সাহিত্যের ছাত্র ও শিক্ষক হিসেবে তিনি এটা খুবই ভালো করে জানতেন যে, সনেট বা সনেট-পরম্পরা রচনা করলেই যে সেগুলোর প্রতিটির সুনির্দিষ্ট নাম লিপিবদ্ধ করতে হবে, তা মোটেও জরুরি ও অত্যাবশ্যক নয়। আর এর সবচেয়ে বড় প্রমাণ জগদ্বিখ্যাত ইংরেজ নাট্যকার ও সনেটিয়ার-কবি উইলিয়াম শেক্সপিয়ার (১৫৬৪-১৬১৬)। এবং এটি শিক্ষিতজন মাত্রেরই সুবিদিত যে, শেক্সপিয়ারের বিখ্যাত ১৫৪টি সনেট-পরম্পরায় কোনওটির কোনও সুনির্দিষ্ট একক নামকরণ নেই, বরং সেগুলোর প্রত্যেকটিই সংখ্যা দ্বারা শিরোনামকৃত। কাজেই জীবনানন্দ দাশও যে ইংরেজি ভাষা-সাহিত্যের একনিষ্ঠ ছাত্র ও নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষক হিসেবে উক্ত অর্থাৎ শেক্সপিয়রীয় প্রবণতায় বা রীতিতে উদ্বুদ্ধ হয়ে স্বীয় সনেট ও সনেট-প্রতিম রচনাগুলোর কোনও নামকরণ করেননি, অন্যকথায় জেনে-বুঝেই যে তা করবার প্রয়োজন বোধ করেননি, তারই বা নিশ্চয়তা কী ? আর প্রকৃতার্থে সেটিই যদি হয়ে থাকে তাহলে আমাদের ‘তথাকথিত’ সম্পাদকগণ কেন তাঁর ক্ষেত্রে সেই গুরুদায়িত্ব(!) স্বেচ্ছায় কাঁধে তুলে নেন বা নিতে চান, তা আমাদের আদৌ বোধগম্য নয়। স্মর্তব্য, শেক্সপিয়ারের কথিত সনেটগুলোর নামকরণের ক্ষেত্রে এমনটা কদাচিৎ ঘটেছে অর্থাৎ কোনও সম্পাদক আজ পর্যন্ত তা করেছেন, তেমনটা আমাদের জানা নেই। প্রসঙ্গত মনে রাখতে হবে যে, ইংরেজি ভাষা-সাহিত্যে এজাতীয় অর্থাৎ নামকরণের ন্যায় ‘সামান্য’ কাজ করার জন্য উপযুক্ত তাবড় তাবড় বাঘা সম্পাদকের কোনও অভাব ছিল বা আছে বলে জানি না। কিন্তু তাঁরা কেউ তা করেননি, করবার কথা স্বপ্নেও ভাবেননি।

কাজেই নিঃসন্দেহে বলব, পূর্ব নজির যেখানে খোদ বিশ্ব তথা ইংরেজি সাহিত্যেই রয়েছে এবং ইংরেজি ভাষা-সাহিত্যের ছাত্র ও শিক্ষক কবি জীবনানন্দ দাশ যদি স্বীয় রচনায় সেই নজিরেরই আরেকটি স্বাক্ষর রাখেন বা রাখতে চান, তাহলে কেন আমাদের সম্পাদকবৃন্দের তাঁর সেই রীতি বা ইচ্ছাবিরোধী প্রবণতা ?―সে প্রশ্ন থেকেই যায়। বস্তুত জীবনানন্দ দাশের পাণ্ডুলিপি দৃষ্টে স্পষ্ট জানা যায় বা প্রতীয়মান হয়, তিনি এগুলোর প্রতিটির শীর্ষদেশে সংখ্যায়ন করেছেন, ফলে এগুলোর সংখ্যা (তাঁর কৃত বা প্রদত্ত সংখ্যা) দিয়ে পরিচিত হওয়ার কোনও জটিলতা দেখি না। বরং তা না করে ‘তথাকথিত’ সম্পাদক (সংকলক বলতে পারলে খুশি হতাম, কিন্তু তাঁরা তো নিজেদের সম্পাদক দাবি করেছেন; আর কী সম্পাদনা করেছেন তা যথাস্থানে প্রকাশিত!) যখন এগুলোতে নাম সংযুক্ত করেন, করতে যান, তখন দেখা যায়, তাতে বিভ্রান্তিই বরং বাড়ে, বেড়েছে, কেননা ইতিমধ্যে এই কাজটি যাঁরা করেছেন তাঁদের প্রদত্ত/প্রযুক্ত নামে অনেক ক্ষেত্রেই একজনের সঙ্গে অন্যজনের প্রদত্ত/প্রস্তাবিত নামে মিল বা সাদৃশ্য নেই। যেমন―পাণ্ডুলিপির ২৪-সংখ্যক কবিতার নামকরণ আবদুল মান্নান সৈয়দ যেখানে করেছেন―‘পাড়াগাঁর দু’পহর’ [প্রকাশিত- অপ্রকাশিত কবিতাসমগ্র জীবনানন্দ দাশ, পৃষ্ঠা ১৩১], সেখানে ফয়জুল লতীফ চৌধুরী করেছেন―‘পাড়াগাঁর রৌদ্রে যেন গন্ধ লেগে আছে’ [ঐ, পৃষ্ঠা ৭৫]। একইভাবে পাণ্ডুলিপির ৪৩-সংখ্যক কবিতার নামকরণ মান্নান সৈয়দ করেছেন―‘ঘাসের বুকের থেকে’ [প্রকাশিত-অপ্রকাশিত কবিতাসমগ্র জীবনানন্দ দাশ, পৃষ্ঠা ১৪০], ফয়জুল লতীফ করেছেন―‘ঘাসের বুকের থেকে পেয়েছি যে আমার শরীর’ [ঐ, পৃষ্ঠা ১১৩], পাণ্ডুলিপির ৪৯-সংখ্যক কবিতার সৈয়দ করেছেন―‘আমাদের রূঢ় কথা’ [প্রকাশিত-অপ্রকাশিত কবিতাসমগ্র জীবনানন্দ দাশ, পৃষ্ঠা ১৪৩], ফয়জুল লতীফ করেছেন―‘আমাদের রূঢ় কথা শুনে তুমি স’রে যাও’ [ঐ, পৃষ্ঠা ১২৫] ইত্যাদি। বস্তুত ‘সম্পাদক’দের যেচে দায়িত্ব নেওয়া এই প্রবণতায় কী বিপুল বিভ্রান্তি (নাকি নৈরাজ্য ?) বাড়ায় তার জ্বাজল্য প্রমাণ লভ্য হবে বেঙ্গল পাবলিশার্স (প্রা.) লিমিটেড, কলকাতা থেকে প্রকাশিত জীবনানন্দ দাশের কাব্যগ্রন্থ, প্রথম খণ্ডে বর্ণিত কবিতাগুলোর নামকরণ থেকে, যাতে সব ক্ষেত্রে হুবহু প্রথম চরণ বা পঙ্ক্তিটিই তুলে দেওয়া হয়েছে। যথা―‘পাড়াগাঁর দু’পহর ভালোবাসি―রৌদ্রে যেন গন্ধ লেগে আছে’ [ঐ, পৃষ্ঠা ১৫০], ‘ঘাসের বুকের থেকে কবে আমি পেয়েছি যে আমার শরীর’ [ঐ, পৃষ্ঠা ১৫৮], ‘আমাদের রূঢ় কথা শুনে তুমি স’রে যাও আরও দূরে বুঝি নীলাকাশ’ [ঐ, পৃষ্ঠা ১৬১] ইত্যাদি।

আবার লক্ষ্যগোচর হয় কোনও কোনও সম্পাদক কবির এই রচনাগুলোয় এতটাই তীক্ষè ছুরি-কাঁচি চালানোর চেষ্টা করেছেন যে, সেটিকে যথেচ্ছাচার বললেও কম বলা হবে। এখানে একটি মাত্র উদাহরণ টানা যাক, শ্রীদেবীপ্রসাদ বন্দ্যোপাধ্যায় (এঁ অবশ্য জীবনানন্দ দাশকে নিয়ে প্রশংসনীয় ভালো কাজ করেছেন) সম্পাদিত জীবনানন্দ দাশের কাব্যসমগ্র শীর্ষকগ্রন্থ [দে’জ পাবলিশিং, কলকাতা, প্রথম প্রকাশ নভেম্বর ২০১৫, অগ্রহায়ণ ১৪২২] থেকে; এটিতে পাণ্ডুলিপির ২৪-সংখ্যক সনেট হয়েছে ২৬-সংখ্যক; মূল কবিতার সজ্জায় বিশেষত চরণে, বানানে, বিরামচিহ্ন প্রভৃতি সংস্থাপনে কোনও রূপ ব্যত্যয় বা ভুল না থাকলেও সম্পাদক (শ্রীপ্রসাদ) মূল সনেটটির একাধিক পরিবর্তন ঘটিয়েছেন। যেমন―অষ্টকে―‘দু পহর’ (মূলে অর্থাৎ পাণ্ডুলিপিতে স্পষ্ট দৃষ্ট মতে এটি একশব্দ, ‘দুপহর’), ‘স্বপনের―কোন্ গল্প, কী কাহিনী, কী স্বপ্ন’ (মূল: ‘স্বপনের;-কোন্ গল্প, কি কাহিনী, কি স্বপ্ন’; ‘’ি-র স্থলে ‘ী’ সংযোজনসহ বিরামচিহ্ন পরিবর্তন), ‘কেউ তাহা জানে নাকো’ (মূল: ‘কেউ তাহা জানে নাক’; ‘নাক’-কে ‘নাকো’ করণ), ‘যেন এ-জনমে নয়’ (মূল: ‘যেন এ জনমে নয়’; ‘-’ হাইফেনেটেড করা), ‘শালিখের স্বর,’ (মূল: ‘শালিখের স্বর’; ‘,’ সংযোজন), ‘নক্শাপেড়ে শাড়িখানা’ (মূল: ‘নক্সাপেড়ে শাড়ীখানা’; অযৌক্তিকভাবে বানান পরিবর্তন), ‘হলুদ পাতার মতো স’রে যায়’ (মূল: ‘হলুদ পাতার মত স’রে যায়,’; ‘মত’ নির্ভুল বানান হওয়া সত্ত্বেও অপ্রয়োজনীয় ‘মতো’ করা); ষটকে―‘শাখাগুনো নুয়ে আছে’ (মূল: ‘শাখাগুলো নুয়ে আছে’, অর্থাৎ পূর্ববঙ্গে জন্ম ও বেড়ে ওঠা জীবনানন্দের স্বাভাবিক ও চলিত রীতির শব্দ প্রয়োগকে পশ্চিমবঙ্গীয় আঞ্চলিক প্রয়োগে রূপান্তরিত করা হয়েছে), ‘কার জলে,’ (মূল: ‘কার জলে’; ‘,’ সংযোজন), ‘ঝাঁঝরা ফোঁপরা, আহা, ডিঙিটিরে’ (মূল: ‘ঝাঝরা ফোঁপ্রা আহা ডিঙিটিরে’) ইত্যাদি। অর্থাৎ সম্পাদক এক্ষেত্রে স্বেচ্ছাচারের চূড়ান্ত দেখিয়েছেন। উল্লেখ্য, সংস্কৃত শব্দ ‘ঝর্ঝর’ থেকে উদ্ভূত ‘ঝাঝরা’ বানানটিকে ‘ঝাঁঝরা/ ঝাঁজরা’ অর্থাৎ দু-রকম করবার সুযোগ থাকলেও আমরা বলব না যে, জীবনানন্দের লিখিত বানান-রূপটি ভুল। কেননা মূলে এখানে চন্দ্রবিন্দু নেই, এবং বানানে চন্দ্রবিন্দু যোগের যে নিয়ম তাতে করে এখানে তা না হলেও চলে। কাজেই জীবনানন্দ দাশের প্রযুক্ত বানানরূপই এক্ষেত্রে রক্ষা করা উচিত। যা-ই হোক, এসম্বন্ধে আমাদের স্পষ্ট মত হচ্ছে, ‘তথাকথিত’ সম্পাদকদের এজাতীয় অহেতুক প্রবণতায় একদিকে যেমন কোমলমতি পাঠকদের বিভ্রান্তি বাড়ে, অন্যদিকে তেমনি কবির ওপর তাঁদের ‘খোদকারি’র প্রবল প্রচেষ্টাও অপ্রচ্ছন্ন থাকে না, যা কোনও মতেই সমর্থনীয় হতে পারে না।

এবার আরও কতিপয় বিষয় দেখি।

যেমন বর্তমান সম্পাদক লিখেছেন, ‘গ্রন্থর্ভূত কবিতার পাঠ মূলানুগ রাখার চেষ্টা করা হয়েছে। তবে পাণ্ডুলিপিতে এমন কিছু শব্দ, শব্দবন্ধ এবং বাক্যাংশ রয়েছে যা জীবনানন্দের হাতের লেখা নয়। সেগুলো নির্দ্বিধায় উপেক্ষা করা হয়েছে।’ [ঐ, পৃষ্ঠা ২৩]। অতীব ভালো কথা, সম্পাদক হিসেবে এ সাধুু বচনের জন্য তিনি সাধুবাদ পাওয়ার যোগ্য। কিন্তু তার আগে যাচাই করে দেখা দরকার যে, সম্পাদকের এই ‘কবিতার পাঠ মূলানুগ রাখার চেষ্টা’ কতটুকু বা কতখানি বাস্তবে অর্থাৎ প্রকাশিত গ্রন্থে ফলবতী হয়েছে।

এক্ষেত্রে প্রথমেই যেটা বলব তা হলো, সম্পাদক জীবনানন্দ দাশকৃত বা রক্ষিত শব্দের সমরূপ বা একরূপ যেমন অনেক ক্ষেত্রেই রক্ষা করেননি, অন্যকথায় কবি যেক্ষেত্রে চরণে বা পঙ্ক্তিতে শব্দকে বিন্যস্ত করেছেন, সম্পাদক অনাবশ্যকভাবে তাকে খণ্ডিত বা পৃথক করেছেন। যেমন―পাণ্ডুলিপিতে যেক্ষেত্রে ‘যতদিন’, ‘একদিন’, ‘চারিদিকে’, ‘সারারাত’, ‘কতকাল’ প্রভৃতি শব্দ/শব্দবন্ধ পৃথক না লিখে কবি একত্র গ্রন্থিত করেছেন বা লিখেছেন, বর্তমান গ্রন্থে তার সবই পৃথক অর্থাৎ দুটি শব্দ হিসেবে লিপিবদ্ধ করা হয়েছে, যেমন―‘যত দিন’, ‘এক দিন’, ‘চারি দিকে’, ‘সারা রাত’, ‘কত কাল’। সম্পাদকের এ প্রবণতা অগ্রহণযোগ্য ও অসমর্থনীয়। কেননা কবির উক্ত রূপ শব্দবিন্যাস ভুল বা অপ্রচলিত নয়, বরং সংশ্লিষ্ট চরণে সেটিই যথার্থ প্রয়োগ। প্রসঙ্গত স্মর্তব্য যে, দেবেশ রায় সম্পাদিত ও কলকাতার প্রতিক্ষণ প্রকাশিত ‘জীবনানন্দ দাশ/ রূপসী বাংলা/ প্রকাশিত-অপ্রকাশিত/ পাণ্ডুলিপি ও পাঠান্তর সংস্করণ’ শীর্ষক গ্রন্থে এটি করা হয়নি। বরং কবির পাণ্ডুলিপিতে বিন্যস্ত পাঠই যথাযথ রক্ষিত হয়েছে, এবং সেটিই যথার্থ ও প্রার্থনীয়। কেননা কবি তো ভুলভাবে কথিত শব্দসমূহের বিন্যাস ঘটাননি, যে, সম্পাদককে সেসব সংশোধনের দায়িত্ব নিতে হবে।

দ্বিতীয়ত ক্রিয়াপদে ঊর্ধ্ব (’) কমার প্রয়োগ। আগেই জানিয়ে রাখি যে, এটি করা হয় মূলত সাধু ক্রিয়াপদের চলিত রূপে (যেমন, ‘হইতে’ থেকে ‘হ’তে’ অর্থাৎ একটি অক্ষর লোপ বোঝাতে), অসমাপিকা ক্রিয়াপদের অর্থাৎ দৃশ্যত ‘অ’-যুক্ত উচ্চারণবিশিষ্ট শব্দের বা পদের ‘ও’-যুক্ত উচ্চারণ নির্দেশের ক্ষেত্রে। যেমন―‘চড়ে’ থেকে ‘চ’ড়ে’, ‘সয়ে’ থেকে ‘স’য়ে’ প্রভৃতি। কিন্তু বর্তমানে অপ্রয়োজনীয় গণ্যে এজাতীয় ব্যবহার নিরুৎসাহিত করা হয় (অবশ্য কবি যেক্ষেত্রে তা করেছেন, তা অবশ্যই রক্ষণীয়)। কেননা বাক্যে এজাতীয় ক্রিয়াপদের ব্যবহার-স্থলই সেগুলোর উচ্চারণের ভিন্নতা তৈরি করে দেয়। কাজেই এক্ষেত্রে ঊর্ধ্ব কমার এখন আর প্রয়োজন তেমন নেই। যেমন―বাংলা একাডেমি প্রণীত ব্যবহারিক বাংলা অভিধান (অষ্টাদশ পুনর্মুদ্রণ, জানুয়ারি ২০১৫)-এর এ বিষয়ে স্পষ্ট নির্দেশনা পাচ্ছি: ‘ঊর্ধ্ব-কমা যথাসম্ভব বর্জন করা হবে।’ [ঐ, পৃষ্ঠা ১২২৩]। তবে এর চেয়েও বড় কথা, স্বয়ং কবি জীবনানন্দ দাশ যেক্ষেত্রে তাঁর পাণ্ডুলিপিতে এজাতীয় ঊর্ধ্বকমার প্রয়োগ করেননি, সেক্ষেত্রে সম্পাদক-সংকলক কেন সেই দায়িত্ব নিতে চান বা চাচ্ছেন ? তবে কী তিনি (বর্তমান সম্পাদক) মনে করছেন, কবির উক্ত রূপ প্রয়োগ যথাযথ নয় অর্থাৎ ভ্রমাত্মক ? আবারও জানাই, দেবেশ রায় এটি করেননি এবং সম্পাদক হিসেবে তিনি (শ্রীরায়) যথা-কর্মই নিষ্পন্ন করেছেন। তৃতীয়ত, এবং এটি বর্তমান আলোচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ বলে আমরা মনে করি। আর তা হলো, পাণ্ডুলিপিতে কবি পঙক্তি বা চরণাবদ্ধ শব্দের ঈষৎ ওপরে অর্থাৎ সংশ্লিষ্ট/উদ্দিষ্ট শব্দের মাথায় বিকল্প শব্দ/পাঠ দিয়েছেন বটে, তবে এক্ষেত্রে যেটা অবশ্যই স্মরণীয় ও লক্ষণীয়, তা হলো কবি মূল চরণসারিতে প্রযুক্ত শব্দটি কাটেননি বা কেটে দেননি। ফলে এক্ষেত্রে স্পষ্ট করে বলার সুযোগ নেই বা বলা যাচ্ছে না যে, কবি উক্ত অর্থাৎ প্রথম ব্যবহৃত শব্দটি বাতিল করেছেন আর ওপরে সন্নিবেশিত শব্দটিই গ্রহণ করেছেন। এক্ষেত্রে সত্যি কথা বলতে পাণ্ডুলিপি পাঠক ও সম্পাদকদের অতিঅবশ্যই একটি ধন্দে বা ধাঁধায় পড়তে হয়। কিন্তু কিছু করারও নেই। পরন্তু কবি যেহেতু জীবদ্দশায় সেগুলো প্রকাশ করেননি (যেগুলো করেছেন সেগুলোর কথা ভিন্ন) এবং তাঁর উদ্দিষ্ট প্রবণতা বা ইচ্ছা নিশ্চিতভাবে জানা যাচ্ছে না, সেহেতু দুটি পাঠকেই রেখে দেওয়া সঙ্গত। যেমনটা আগেই বলেছি যে, দেবেশ রায় করেছেন। অন্যদিকে বর্তমান সম্পাদক ‘গ্রন্থর্ভূত কবিতার পাঠ মূলানুগ রাখার চেষ্টা করা হয়েছে।’―এ উক্তি ও অঙ্গীকার করেও সেটি রক্ষা করেননি। উল্টো এক্ষেত্রে যা ঘটেছে, তা ক্ষেত্রত শুধু মারাত্মক বলেই আমাদের কাছে প্রতীয়মান হয়নি, উপরন্তু বর্তমান সম্পাদক ব্যক্তিগত পছন্দেও একটি পাঠ (শব্দ/শব্দবন্ধ)-কে প্রাধান্য দিতে গিয়ে বরং কবির ওপর ‘খোদকারি’ই করেছেন, এবং একইসঙ্গে সেটি করতে গিয়ে অপেক্ষাকৃত ‘উপযুক্ত’ (সর্বকালের কবিতার জন্য একটি আপ্তবাক্য এক্ষেত্রে মনে রাখতে হবে, ‘Best words in best order’, যেটি সম্পাদকের কৃত্যে রক্ষিত হয়নি)। উদাহরণত, ৪৫-সংখ্যক কবিতার পাণ্ডুলিপিভুক্ত মূল ৭ম চরণে লভ্য: “ধূসর কড়ির মত হাতগুলো―ভিজে হাত সন্ধ্যার বাতাসে’। একইসঙ্গে পাণ্ডুলিপিতে লভ্য হয় ‘ভিজে’ শব্দে নিম্নরেখ দিয়ে সেটির ওপরে ‘নগ্ন/ক্লান্ত’ শব্দযুগল। অর্থাৎ কবির উদ্দিষ্ট এখানে স্পষ্ট বোঝা যায়, যদি ‘ভিজে’ শব্দের স্থানচ্যুতি ঘটে তবে সেটি হবে হয় ‘নগ্ন’ নতুবা ‘ক্লান্ত’। তবে এখানে লক্ষণীয় ব্যাপার, কবি যেহেতু ‘ভিজে’ শব্দটিকে একেবারে কেটে দেননি বা মুছে ফেলার কোনও ইঙ্গিতও পাণ্ডুলিপিতে অলভ্য, সেহেতু এখানে সম্পাদকের ব্যক্তিগত ইচ্ছের প্রতিফলন ঘটানোর সুযোগ খুবই কম তথা একেবারেই নেই বলে মনে করি। বরং যথাযথ রক্ষণই প্রত্যাশিত। যেটি দেবেশ রায় করেছেন। কিন্তু বর্তমান সম্পাদক এক্ষেত্রে ‘ক্লান্ত’ শব্দটিকে প্রাধান্য দিয়ে তথা একক গণ্যে গ্রহণ করেছেন। আর এর ফলে যেটি হয়েছে তা হলো, তিনি অপেক্ষাকৃত অর্থবহ শব্দটিকেই গ্রহণ করেননি। যদিও আবারও বলি যে, এটি তাঁর না করাই উচিত ছিল। দেখা যাক, ব্যাপারটা। বস্তুত প্রোক্ত চরণ এবং এর অব্যবহিত পরের চরণের প্রথম শব্দযুগলের প্রতি যদি দৃক্পাত করি তাহলে সেখানে অতিরিক্ত পাব―‘দেখা যায়’। সব মিলিয়ে বাক্বন্ধটি দাঁড়ায় এরকম―‘ধূসর কড়ির মত হাতগুলো―ভিজে হাত সন্ধ্যার বাতাসে/ দেখা যায়’ এবং ভিন্ন পাঠে―এক. ‘ধূসর কড়ির মত হাতগুলো―নগ্ন হাত সন্ধ্যার বাতাসে/ দেখা যায়’ এবং দুই. ‘ধূসর কড়ির মত হাতগুলো―ক্লান্ত হাত সন্ধ্যার বাতাসে/ দেখা যায়’। এখন চিন্ত্যনীয় ব্যাপার এবং পাঠকের কাছে গ্রহণীয় ও সহজবোধ্য কোনটি হওয়া উচিত সেই বিচারে প্রশ্ন ওঠে―‘ভেজা হাত’, নাকি ‘নগ্ন হাত’, নাকি ‘ক্লান্ত হাত’ সন্ধ্যার বাতাসে দেখা যায় বা দেখা সম্ভব ? বলাবাহুল্য, ‘ক্লান্ত’ পদবন্ধ অনেকটা abstract জাতীয়, ক্লান্ত মুখ বা বদন, কপাল যতটা সহজে দৃশ্যমান ও বোধ্য (ঘর্মবিন্দু এর একটি অন্যতম স্মারক, ক্লান্তির ছাপ অন্যভাবেও দৃশ্যমান হতে পারে), ক্লান্ত হাত তা মোটেও নয়। কার্যত হাত ক্লান্ত হয়েছে এটা দেখানো-বোঝানো খুবই কঠিন ব্যাপার। অন্যদিকে ‘ভেজা হাত’ বা ‘নগ্ন হাত’ অপেক্ষাকৃত সহজবোধ্য ও দৃশ্যমানভাবে ব্যাখ্যাযোগ্য। কাজেই তিনটির মধ্যে যদি কোনও একটিকে গ্রহণ করতেই হয় (কবি স্বয়ং যেহেতু করেননি, ফলে সে সুযোগ কম বা নেই), তবে সেক্ষেত্রে অর্থবহ গণ্যে ‘নগ্ন’-কেই গ্রহণ করা উচিত, আর বিকল্পে ‘ভেজা’ তো আছেই। তা ছাড়া কবির এখানে যে প্রেক্ষণবিন্দু, সেখান থেকে হাতের ক্লান্তি অবলোকনের তুলনায় অন্য দুটিই সহজে দর্শনযোগ্য।

অন্য আরও যেসব বিষয়ে সম্পাদক মন্তব্য করেছেন, তার একটি এরকম: “এ ছাড়া পাণ্ডুলিপিতে বন্ধনীভুক্ত শব্দ বা পঙ্ক্তি সম্পূর্ণ বর্জন করা হয়েছে। যেমন―‘আমাদের রূঢ় কথা শুনে তুমি স’রে যাও’ শিরোনামীয় ৪৯ সংখ্যক কবিতার একাদশ পঙ্ক্তিতে বন্ধনীভুক্ত ‘শুধু’ শব্দটি বর্জন করা হয়েছে। ৬২ সংখ্যক কবিতার প্রারম্ভে ‘এই সব ভালো লাগে’ শব্দপুঞ্জ বন্ধনীভুক্ত হওয়ায় তা-ও বর্জন করা হয়েছে।” [ঐ, পৃষ্ঠা ২৪]।

এ বিষয়ে আগেই জানিয়ে রাখি যে, সম্পাদকের কথিত বা প্রতিশ্রুত ‘বন্ধনীভুক্ত শব্দ বা পঙ্ক্তি সম্পূর্ণ বর্জন করা হয়েছে’―এটি যে মোটেও ঠিক নয়, তা তাঁর এমত বচন থেকেই প্রমাণিত হয়। তিনি লিখেছেন, “তবে ব্যতিক্রমও করা হয়েছে: ‘পৃথিবীর পথে আমি’ শিরোনামীয় ৪৬ সংখ্যক কবিতার শেষ পঙ্ক্তিটি। এ পঙ্ক্তিটি বন্ধনীভুক্ত থাকলেও সনেটের চতুর্দশ পঙ্ক্তি বিধায় গ্রহণ করা হয়েছে। অনুমিত হয়, জীবনানন্দ প্রতিস্থাপনের কথা ভাবলেও বিকল্প ভেবে উঠতে পারেননি;―বিকল্পটি অলিখিতই রয়ে গেছে।” [ঐ, পৃষ্ঠা ২৪]। লক্ষণীয়, সম্পাদক যদি তাঁর প্রথম কথায় ‘সম্পূর্ণ’-এর বদলে ‘মূলত’ বা ‘প্রধানত’ জাতীয় শব্দ ব্যবহার করতেন, তাহলে তাঁকে এ স্ববিরোধী বক্তব্যের বেড়াজালে আটকাতে হতো না। যাই হোক, এখন দেখা যাক, কবির রচনা ও সম্পাদকের ছুরি-চালনার পক্ষে কী যুক্তি উপস্থাপন করা যেতে পারে।

প্রথমেই জানিয়ে রাখি যে, কবিতায় এক বা একাধিক চরণ বা পঙ্ক্তি বন্ধনীভুক্ত করার যেমন প্রতিষ্ঠিত চল ও স্বীকৃত রীতি রয়েছে, তেমনি কবিতার চরণে বা পঙ্ক্তির এক বা একাধিক শব্দও বন্ধনীভুক্ত করার নজির দেশ-বিদেশের কাব্যসাহিত্যে ভূরি ভূরি রয়েছে। কাজেই কবি যা করেননি, অন্যকথায় জীবনানন্দের ন্যায় প্রাজ্ঞ ও বহুপাঠী কবি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ও প্রচলিত এজাতীয় দৃষ্টান্ত মেনে যেখানে স্বীয় কাব্যাংশ বন্ধনীভুক্ত করেছেন, সেখানে সম্পাদক সেটি কোনও অবস্থায়ই বাদ দিতে পারেন না। অন্যদিকে তাঁর এ অযাচিত কর্মের ফলে অপ্রত্যাশিতভাবে যেটা ঘটেছে তা হলো সংশ্লিষ্ট পঙ্ক্তির মাত্রাসংখ্যার লোপ বা ঘাটতি। এটা ঠিক যে, জীবনানন্দের আলোচ্য সনেট ও সনেট-প্রতিম রচনাগুলোর কোনও কোনওটিতে প্রথাসিদ্ধ সনেটীয় নিয়মে মাত্রাসংখ্যা কম রয়েছে। কবি কেন সেটি করেছেন, তা তিনিই সম্যক অবহিত। তবে সনেট যেহেতু একটি কঠিন রীত্যাবদ্ধ কাব্যপ্রকরণ, সেহেতু এতে অন্য অনেক কিছুর ন্যায় মাত্রায় ঘাটতি বা কমতিও গ্রহণীয় নয়। ফলে বর্তমান সম্পাদক যখন বন্ধনীভুক্ত বলে ‘(এইসব ভালো লাগে)’ পদবন্ধ বাদ দিয়ে দেন বা কর্তন করেন, তখন স্বাভাবিকভাবে সংশ্লিষ্ট পঙ্ক্তির মাত্রাসংখ্যা ৮টি লোপ পেয়ে একে অত্যন্ত খর্ব বা খণ্ডিত করে দেয়। তা ছাড়া এই বন্ধনীভুক্ত পদবন্ধের যে ব্যঞ্জনা, যা দ্বারা কবি বা কথক তাঁর মানসিক অনুভূতি তথা ভালো লাগার বোধটি পাঠকসঞ্চারী করছেন, সেটিও সহৃদয় সমাজের অনুপলব্ধ থেকে যায়। এখানে আরও স্মরণীয় যে, এই ‘অষ্টক’ (Octave) -এর চরণের বা পঙ্ক্তির মূল চাল মূলত ২৬-মাত্রার, ব্যতিক্রম রয়েছে ২য় পঙ্ক্তি (২৮-মাত্রা) ও ৮ম পঙ্ক্তি (২২-মাত্রা) দুটিতে। অথচ সম্পাদক মূল চালের ৮-মাত্রা বর্জন করায় ১ম পঙ্ক্তির দৈর্ঘ্য দাঁড়িয়েছে মাত্রই ২০-মাত্রার, গোটা কবিতাশরীরের সঙ্গে যা মোটেও মানানসই নয়। কাজেই সম্পাদকের অনধিকার চর্চা ঘটেছে এখানে তা অবশ্যই স্বীকার্য। দ্বিতীয়ত, তিনি ৪৯-সংখ্যক কবিতার বন্ধনীভুক্ত বলে ‘শুধু’ শব্দটি বর্জন করেছেন। কিন্তু এখানে প্রথমেই কহতব্য এই যে, এটি ‘বন্ধনীভুক্ত’ নয়। বাংলায় ও ইংরেজিতে প্রচলিত ‘তিন’ বন্ধনীর (প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয়, যথা―‘()’, ‘{}’ ও ‘[]’) কোনওটিই পাণ্ডুলিপির ছাপচিত্রে দৃশ্যমান নয়। বরং এখানে ‘শুধু’ শব্দটি গোলাকৃত দাগাঙ্কিত, তাও অস্পষ্ট। তবে তাতে কোনও কর্তন বা বর্জনের চিহ্ন নেই। ফলে এটি সম্পাদকের গ্রহণ না-করার পক্ষে মনগড়া যুক্তি ছাড়া অন্য কিছুই দেখি না। অধিকন্তু শব্দটি প্রত্যাহৃত হওয়ায় অপ্রত্যাশিতভাবে চরণের মাত্রাসংখ্যাও লোপ পেয়েছে। তবে এর চেয়েও মারাত্মক যেটি ঘটেছে তা হলো, অন্তর্নিহিত অর্থেরও বিপর্যাস ঘটেছে। আর এটি বুঝতে বা অনুধাবন করতে মূল অর্থাৎ পাণ্ডুলিপিভুক্ত চরণ বা পঙ্ক্তিটির প্রতি একনজর দেওয়া যাক। এখানে পরপর দুটি চরণে পাই―“যেই শান্তি মৃত জননীর মত শুধু চেয়ে থাকে ― কয় নাক’ কথা/ যেই স্বপ্ন বারবার নষ্ট হয় আমাদের এই সত্য রক্তের জগতে”। স্পষ্টতই বোঝা যাচ্ছে, মৃত জননীর পক্ষে শুধু চেয়ে থাকাই সম্ভব; যদিও সে চোখ প্রাণহীন, দৃষ্টিশক্তির প্রশ্ন সেখানে নেই, তবে কবির ভাবনার নির্গলিতার্থ এখানে কাব্যিক তাৎপর্যে গ্রহণীয়। কাজেই এ চরণ থেকে ‘শুধু’ প্রত্যাহার শুধু চরণের মাত্রাজনিত অঙ্গহানিই ঘটায় না, বরং তা গভীর তাৎপর্যবাহী হতেও পাঠকের বোধে অহেতুক বাধা সৃষ্টি করে। কাজেই সম্পাদকের তা প্রত্যাহার অগ্রহণযোগ্য ও অসমর্থনীয়। এখানে প্রসঙ্গত বলে রাখি যে, এজাতীয় একটি ব্যত্যয় বা সম্পাদকীয় অকারণ ছুরি-চালনা দেবেশ রায়ের সম্পাদনার ক্ষেত্রে কোথাও ঘটেনি। এবং সেটিই যথার্থ ও প্রার্থনীয়।

আবার ৪৬-সংখ্যক সনেট-প্রতিম রচনার চতুর্দশ পঙ্ক্তির ক্ষেত্রে সম্পাদক যখন নির্দ্বিধায় বলেন যে, ‘এ পঙ্ক্তিটি বন্ধনীভুক্ত থাকলেও সনেটের চতুর্দশ পঙ্ক্তি বিধায় গ্রহণ করা হয়েছে।’―তখন এ বক্তব্যে সম্পাদকের বালখিল্যতারই পরিচয় ঘটে। কেননা, প্রথমত আগেই দেখিয়েছি ও জানিয়েছি যে, কবিতার এক বা একাধিক চরণ ও চরণের অংশবিশেষ (এক বা একাধিক পদ বা শব্দ) বন্ধনীভুক্ত করাটা কবিতার আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ও বহুলপ্রচলিত একটি রীতি, ফলে এটি সম্পাদকের না রাখবার পক্ষে কোনও যুক্তিই নেই। এবং এর চেয়েও বড় ও মারাত্মক কথা সম্পাদক যখন নিঃসঙ্কোচে উচ্চারণ করেন, ‘অনুমিত হয়, জীবনানন্দ প্রতিস্থাপনের কথা ভাবলেও বিকল্প ভেবে উঠতে পারেননি;―বিকল্পটি অলিখিতই রয়ে গেছে।’―এটি আরও ভয়াবহ ও আরোপিত সিদ্ধান্ত হয়ে দাঁড়ায় এ জন্য যে, প্রথমত, এটি এই সনেট-প্রতিম রচনার ‘ষটক’ (Sestet)-বন্ধ (যদিও এখানে মূলত ৭টি পঙ্ক্তি লভ্য), যার বিন্যাস বা রীতি এ রকম―‘গঘগঘগঘগ’। ফলে বন্ধনীভুক্ত বলে যদি সম্পাদক এটি প্রত্যাহার করেন (সে সুযোগ তাঁর ছিল), কিন্তু কবি স্বয়ং যেহেতু তা করেননি বা ইচ্ছে থাকলেও করে যেতে পারেননি (!), সেহেতু তাঁরও অর্থাৎ সম্পাদকের তা করবার দরকার কী ? স্মর্তব্য, শ্রীদেবীপ্রসাদ বন্দ্যোপাধ্যায় লিখেছেন, “অনেক দিন, প্রায় সাতাশ বছর পরে প্রতিক্ষণ যখন ‘রূপসী বাংলা প্রকাশিত-অপ্রকাশিত’ নাম দিয়ে রূপসী বাংলার ব’লে চিহ্নিত পুরো ৬ নম্বর খাতাখানি ফোটোচিত্রসহ প্রকাশ করলেন, দেখা গেল…সর্বোপরি তার বহুতর শব্দ বা শব্দগুচ্ছের নীচে সংশয়সূচক অধোরেখা দেওয়া অথবা ওপরে বিকল্প বসানো।…হয়তো পরে সময়মতো কখনও খাতার রেখা পরিমার্জনা ক’রে, নির্বাচন ক’রে প্রকাশযোগ্য করে তুলবেন বা প্রকাশ করবেন।’ [জীবনানন্দ দাশের কাব্যসমগ্র, সম্পাদনা দেবীপ্রসাদ বন্দ্যোপাধ্যায়, দে’জ পাবলিশিং, কলকাতা, প্রথম প্রকাশ নভেম্বর ২০১৫, অগ্রহায়ণ ১৪২২, পৃষ্ঠা ৩২-৩৩।]। কবি তা করেননি। আর যদি সম্পাদকদের তা করবার একান্তই ইচ্ছা ও পক্ষে প্রবল বা যথেষ্ট যুক্তি থাকেও, সেক্ষেত্রে প্রশ্ন উঠবে আলোচ্যক্ষেত্রে ৭-পঙ্ক্তির কোনটিকে তিনি গ্রহণ-বর্জন করবেন ? পঞ্চদশ পঙ্ক্তিটিকে করলে এর ষটকের যে বিন্যাস (গঘগঘগঘ) দাঁড়াবে, চতুর্দশকে করলে সে বিন্যাস (গঘগঘগগ বা গঘগঘঙঙ) সম্পূর্ণ উল্টে যাবে। তার আগে এখানে অবশ্যই মনে রাখতে হবে যে, রূপসী বাংলার অধিকাংশ সনেট ও সনেট-কল্প রচনার অষ্টক-বন্ধ হলো পেত্রার্কীয় (Petrarchan) বা ইতালীয় (Italian) ফর্মের এবং ষটক বা ষষ্টক প্রায়শ পেত্রার্কীয় বা ইতালীয় ফর্মের এবং ক্বচিৎ মিশ্র বা আরও নির্দিষ্ট করে বললে শেষ দু-চরণ বা পঙ্ক্তি শেক্সপিয়রীয় ঢঙের, যা পেত্রার্কীয় বা ইতালীয় ফর্মবিরোধী, অন্যকথায় জীবনানন্দের ষটক বা ষষ্টক-বন্ধ মিশ্ররীতির। ফলত আলোচ্য রচনার (৪৬-সংখ্যক) প্রথম ১৪-পঙ্ক্তি (১৫শ পঙ্ক্তি সেক্ষেত্রে বাদ দিতে হবে) যদি হুবহু গ্রহণ করা হয়, তাহলে মিলবিন্যাসে এটি দাঁড়াবে নিখুঁত পেত্রার্কীয় বা ইতালীয়, অন্যদিকে ১৪শ পঙ্ক্তি যদি বাদ দেওয়া হয় (যেমনটা ফয়জুল লতীফ করেছেন) তাহলে এটি হবে মিশ্ররীতির অর্থাৎ পেত্রার্কীয়-শেক্সপিয়রীয় তথা ইতালীয়- ইংরেজির সংমিশ্রণ। কাজেই সম্পাদককে যদি ছুরি-কাঁচি চালাতেই হয় তাহলে ১৫শ পঙ্ক্তিতেই তা চালানো উচিত (এরও অসঙ্গতি আগে দেখানো হয়েছে), তাতে করে এটি একটি একক রীতি (পেত্রার্কীয়/ইতালীয়) অনুগামী হবে, যা সনেটিয়ার কবিদের কাছে অধিক প্রত্যাশিত।

অন্যদিকে তার চেয়েও বড় কথা দাঁড়াবে, রচনাটির ১৩শ [সম্পাদক Orijinal বা পূরণবাচক সংখ্যা ত্রয়োদশ/১৩শ-কে একটি স্থানে ‘১৩তম’ লিখেছেন; ঐ, পৃষ্ঠা ২৩। এটি ভুল, হবে ‘১৩শ’; ‘তম’ শুরু হয় ১৯ থেকে। দেখুন, চলন্তিকা, রাজশেখর বসু, পরিশিষ্ট, পৃষ্ঠা ৪৫; বাঙ্গালা ব্যাকরণ, ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, প্রভিন্সিয়াল লাইব্রেরি, ঢাকা ১৩৭৩, পৃষ্ঠা ৪৭।] ও ১৫শ পঙ্ক্তি বা চরণ দুটিতে সপ্রাণ ও নিষ্প্রাণ প্রকৃতিপুঞ্জের যে আশ্চর্য সমাবেশ ঘটেছে, সেটির চমৎকার ও হৃদ্য ব্যঞ্জনালাভ থেকে সহৃদয় পাঠক বঞ্চিত হবেন। ফলত তার রসনিবৃত্তির জন্য দেখা যাক প্রোক্ত পঙ্ক্তি বা চরণ দুটির সজ্জা, যা এরকম: “পড়ে আছে; নলখাগ্ড়ার বনে ব্যাং ডাকে কেন যেন ― থামিতে কি পারে/… (আবার পাখ্না নাড়ে―কাকের করুণ ডিম পিছলায়ে প’ড়ে যায় শ্যাওড়ার ঝাড়ে)”। উল্লেখ্য যে, ‘ষটক’ (আগেই বলেছি ৭টি পঙ্ক্তি আছে এখানে) অংশটি এই কবিতার প্রকৃতই একটি দুরূহ সংকট তৈরি করে যদি এর সম্পাদক-কথিত বা কৃত বিন্যাস রক্ষা করা হয়। কেননা তিনি যদি ‘ষটকে’র ৩য় ও ৪র্থ এবং কবিতার ১১শ ও ১২শ) পঙ্ক্তি দুটির অংশবিশেষের প্রতি গভীরভাবে দৃষ্টিনিবদ্ধ করেন তাহলে লক্ষ করবেন সেখানে লভ্য, ‘…কুয়াশায় একাকী মাঠের ধারে/ কে যেন দাঁড়ায়ে আছে;’ এবং পাণ্ডুলিপির প্রকৃত ১৪শ চরণে (সম্পাদক যেটি প্রত্যাহার করেছেন) আছে―‘তুমি কেন এইখানে’ ‘তুমি কেন এইখানে’ শরের বনের থেকে দেয় সে উত্তর”―এখানে বাক্বন্ধে বক্তা-কবি ছাড়াও দ্বিতীয় যে জনের অদৃশ্য উপস্থিতি বর্তমান, এবং সংলাপে বা কথোপকথনে যে রসাত্মক নাটকীয়তা সৃষ্টি হয়েছে, সম্পাদকের ১৪শ চরণ কর্তন করায় ১১শ ও ১২শ চরণ তাতে অর্থহীন হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাহলে এর সমাধান কী ? সেটি কবিই দিতে পারতেন। তবে তিনি যেহেতু জীবদ্দশায় সে দায়িত্ব নেননি, সেহেতু সম্পাদকগণেরও সে দায়িত্ব যেচে গ্রহণ না করাই উচিত ও সঙ্গত বলে মনে করি। যেমনটা দেবেশ রায় এবং আরও কেউ কেউ করেছেন। স্মর্তব্য, জীবনানন্দ দাশকে যিনি নবরূপে আবিষ্কার এবং প্রায় একক প্রচেষ্টায় সুবিপুলভাবে জনসমক্ষে তথা পাঠকসমীপে হাজির ও নন্দিত করেছেন, সেই স্বনামধন্য ভূমেন্দ্র গুহ, তিনিও গোটা ১৫-চরণই অকর্তিত রেখে দিয়েছেন। [দেখুন, পাণ্ডুলিপির কবিতা ১, জীবনানন্দ দাশ, সম্পাদনা ভূমেন্দ্র গুহ ও গৌতম মিত্র, প্রতিক্ষণ, কলকাতা, ২০০৫, পৃষ্ঠা ২২২]।

তা ছাড়া, এটাও বলে রাখা দরকার যে, বিশ্বসাহিত্যে যদিও সনেট বলতে ১৪-পঙ্ক্তিবিশিষ্ট তন্ময় (Subjective) কবিতাই বোঝানো হয়ে থাকে, তবে ইংরেজি সাহিত্যে ১৩ লাইনবিশিষ্ট ‘তথাকথিত’ সনেটও কোনও কোনও কবি (যেমন, Marcy Jarvis) লিখেছেন। কাজেই জীবনানন্দ দাশ যদি এক চরণ বাড়িয়ে এক্ষেত্রে তা করে থাকেন (বলছি না যে, তিনি তা করেছেন, কার্যত আমরা জানি না; তবে তেমনটা হলে অর্থাৎ ১৪ পঙ্ক্তির কম-বেশি হলে সেটিকে আমরা সনেট বলবার আদৌ পক্ষপাতী নই), তাহলেও আশ্চর্য হব না। মনে রাখতে হবে, সৃষ্টিশীল কবিরা কখনও কখনও প্রচলিত রীতিনীতির বাইরে চলে যেতে দ্বিধা করেন না। অন্যদিক দিয়ে বিবেচনা করলে বলব, এতে যদি ১৫-পঙ্ক্তিই থাকে, তাহলে এটি রীতিসিদ্ধ সনেট হবে না সত্য, তাই বলে এর কবিতা হতে তো কোনও দোষ বা ব্যত্যয় নেই, তাহলে সম্পাদক কেন সেটির চরণ ছেদনে ছুরি চালাবেন ? স্মর্তব্য, এ গ্রন্থে সনেট ও সনেট-কল্প রচনা ছাড়াও অন্যবিধ কবিতা রয়েছে। এটিও না হয় সেই গোত্রীয় হতো!

আলোচ্যগ্রন্থে অনুসৃত বা ব্যবহৃত বানান সম্পর্কে বর্তমান সম্পাদক লিখেছেন, “বানানের ক্ষেত্রে এ গ্রন্থে জীবনান্দীয় [জীবনানন্দীয়] রীতির ব্যত্যয় ঘটানো হয়নি। প্রাচীন রীতি ব’লে জীবনানন্দের বানান রীতি বর্জন করা হয়নি। যেমন―জীবনানন্দ দাশ সব সময় ‘সাদা’ না লিখে ‘শাদা’ লিখতেন। এ গ্রন্থে ‘শাদা’ বানানটিই গ্রহণ করা হয়েছে। জীবনানন্দ দাশ রেফ্-এর পরে দ্বিত্ব বর্জন করেননি [,] যেমন―‘কার্ত্তিক’। ‘সূর্য্য’ বানানের ক্ষেত্রেও একই কথা। এ গ্রন্থে মূলানুগত্য বজায় রাখা হয়েছে।” [ঐ, পৃষ্ঠা ২৪]। এ গ্রন্থে মূলানুগত্য কতটুকু বজায় রাখা হয়েছে, তার কিছু কিছু ইতিমধ্যে দেখানো হয়েছে, ফলে সম্পাদকের এ উক্তির যথার্থ্য বিজ্ঞ পাঠকের বিবেচ্য। এখন জানাই সম্পাদকের প্রোক্ত বক্তব্যের বিষয়ে। সত্য যে, শ্বেত, শুভ্র বা সফেদ অর্থব্যঞ্জক ফারসিশব্দ প্রচলিত ‘সাদা’ ব্যবহারের বদলে জীবনানন্দ দাশ ‘শাদা’ বানান-রূপ ব্যবহার করতেন। প্রথমটি অধিক প্রচলিত হলেও দ্বিতীয়টিও নির্ভুল, প্রচলিত ও গ্রাহ্য। ‘সূর্য্য’ বানানটির ক্ষেত্রে সম্পাদকের সুযোগ ছিল বানানে ব্যঞ্জনবর্ণের দ্বিত্ব বর্জনসংক্রান্ত কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বানানের নিয়ম (১৯৩৬; সংশোধিত ১৯৩৭), বাংলাদেশ জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (১৯৮৮), বাংলা একাডেমী/মি (প্রমিত বাংলা বানানের নিয়ম, ১৯৯২), পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি (১৯৯৭), আনন্দ পাবলিশার্স (কী লিখবেন কেন লিখবেন; ১৯৯১/২০১২), প্রথম  আলো (ভাষারীতি; ২০০৬) প্রভৃতির সূত্রে ‘সূর্য’ লেখার। উল্লেখ্য, জীবনানন্দ দাশের ব্যবহৃত বানান-রূপ নির্ভুল থাকাসত্ত্বেও বর্তমান সম্পাদক যেহেতু অন্য অনেক অপ্রয়োজনীয় ক্ষেত্রেই তা সংশোধনের চেষ্টা করেছেন, সেহেতু বাংলা বানানরীতির সর্বশেষ নিয়মে (উভয় বাংলায়) এই অন্তত একটি প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে তিনি তা করতে পারতেন। তবে না করলেও আমরা দোষের কিছু দেখি না। কেননা, সেকালে প্রচলিত বানান-রূপটি কবি এখানে প্রয়োগ করেছেন। অন্যদিকে পৌরাণিক দেবতা ‘কার্ত্তিক’-এর নাম থেকে জাত বাংলা বছরের সপ্তম মাসটির বানান ‘কার্ত্তিক’ হবে কি ‘কার্তিক’Ñ সেবিষয়ে বিশেষজ্ঞ ও আধুনিক বানানবিদদের মধ্যে যথেষ্ট বিতর্ক রয়েছে। তা ছাড়া জীবনানন্দ দাশও তো মূল সংস্কৃত তথা তৎসম বানান-রূপটিই প্রয়োগ করেছেন। তবে আমাদের বিস্ময় জাগে সম্পাদক কেন ‘বর্জ্জন’ বানান লিখলেন, ব্যঞ্জনের দ্বিত্ব বর্জনের সূত্রে ‘বর্জন’ না লিখে (নাকি এটি গ্রন্থে বিধৃত বানান ভুল)? অবশ্য এ গ্রন্থে এজাতীয় ইতস্তত কিছু বানান ভুল বা মুদ্রণপ্রমাদ রয়েছে।

আবার সম্পাদক যখন লেখেন, “তবে লেখার তোড়ে জীবনানন্দ কখনো কখনো একটি-দুটি ভুল বানান লিখেছিলেন। সেগুলো সংশোধিত আকারে গ্রহণ করা হয়েছে [,] যেমন ‘ইঁট’। পাণ্ডুলিপির ইঁটের পরিবর্তে এ গ্রন্থে ‘ইট’ ব্যবহার করা হয়েছে। একইভাবে লেখার তোড়ে জীবনানন্দ কোনও কোনও ক্ষেত্রে স্বীয় বানান রীতিতে ছাড় দিয়েছিলেন। সেগুলোর ক্ষেত্রেও জীবনান্দীয় [জীবনানন্দীয়] রীতি পরিগ্রহণ করা হয়েছে। যেমন-সংশ্লিষ্ট পাণ্ডুলিপিতে ‘নাকো’ থাকলেও জীবনানন্দীয় রীতির কথা স্মরণে রেখে এ গ্রন্থে “না ক’” [যথাপ্রাপ্ত] পরিগ্রহণ করা হয়েছে।” [ঐ, পৃষ্ঠা ২৪]। সম্পাদকের এজাতীয় বক্তব্যের বিষয়ে আমাদের বেশ কিছু কথা বলার রয়েছে। এক. ‘লেখার তোড়ে জীবনানন্দ কখনও কখনও একটি-দুটি ভুল বানান লিখেছিলেন।’― এখানে ‘লেখার তোড়ে’ বললে আমরা সম্পাদকের সে-কথার সঙ্গে একমত হতে আদৌ পারি না। কেননা আমরা জানি, জীবনানন্দ খসড়া রচনার পর সেটিকে অত্যন্ত ধীরে, সুস্থে পাণ্ডুলিপির খাতাভুক্ত করতেন, যে-কারণে তাঁর পাণ্ডুলিপিতে (বিশেষ করে ‘রূপসী বাংলা’র) কাটাছেঁড়া, ঘষামাজা প্রায় নেই বললে চলে, যেটি দৃশ্যমান তা হলো শব্দ প্রতিস্থাপনের নজির স্বরূপ চরণের সংশ্লিষ্ট শব্দের ওপরে/মাথায় বিকল্প শব্দ/শব্দগুচ্ছ লেখার প্রবণতা। এর বহুল প্রমাণ লভ্য, সম্পাদক তা আমাদের চেয়েও বেশি জানেন। তবে অসতর্কভাবে প্রযুক্ত বা সমকালীন রীত্যানুযায়ী প্রকৃতই (!) ভুল বানান রূপসী বাংলার পাণ্ডুলিপিতে যে মোটেও নেই, তা বলা অনুচিত হবে। এরূপ একটি বানান-রূপ হলো ‘ধূলো’ (কবিপ্রযুক্ত, সনেটসংখ্যা ২৩)। বর্তমানে এবং অনেক কাল আগে থেকেই এটির সাধু বানানরূপ হলো ‘ধূলা’ এবং চলিত ‘ধুলো’। তবে এই প্রচলিত নিয়ম-সিদ্ধান্তকেও স্বতঃসিদ্ধ বলা ঝুঁকিপূর্ণ হয় যখন বাংলাভাষার শ্রেষ্ঠ দুই ভাষাবিদ-পণ্ডিতের একজন (অপরজন ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ) ড. সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় এমত স্থির মত দেন (তাঁর ভাষায়): ‘বাঙ্গালা উচ্চারণে হ্রস্ব-দীর্ঘের এই পার্থক্য রক্ষিত না হওয়ার কারণে, বাঙ্গালা বানানেও এ বিষয়ে বাঁধাবাঁধি নিয়ম নাই; যথা,.. হাতি-হাতী;..চুন-চূন; সুতা-সূতা…।’ [ভাষা-প্রকাশ বাঙ্গালা ব্যাকরণ, রূপা, ১৩৯৬, পৃষ্ঠা ৩৭।]। কাজেই স্বনামধন্য ভাষাবিদের উক্ত মন্তব্য থেকে নিঃসঙ্কোচে বলব, জীবনানন্দ ‘ধূলো’ লিখে ভুল করেননি। তারপরও গ্রন্থে (পাণ্ডুলিপিতে) যদি কোনও প্রকৃতই ভুল বানান পরিলক্ষিত হয়, তবে সেটির শুদ্ধ রূপ মূল বানানের পাশে ‘বন্ধনী’ভুক্ত করে লিপিবদ্ধ করাই অধিক অনুসৃত সম্পাদকীয় রীতি। সেটিই সম্পাদকগণের পক্ষে বিধেয়। শব্দটি একেবারে বর্জন করে নয়, তাতে করে তো আর মূল রক্ষণের অঙ্গীকার প্রতিপালিত হয় না। অন্যদিকে ‘ইঁট’ বানানের বিষয়ে আমাদের কথন শুধু এটুকুই যে, তবে এক্ষেত্রে জীবনানন্দ দাশ কি পশ্চিমবঙ্গীয় উচ্চারণরীতি অনুসরণ করেছেন? বস্তুতপক্ষে আমরা জানি যে, বাংলা বানানের কিছু কিছু শব্দের পূর্ববঙ্গীয় ও পশ্চিমবঙ্গীয় উচ্চারণরীতির (ব্যাকরণগত দুষ্টতা যাই থাক না কেন) অনুসরণে বানানের প্রচলিত ও দৃশ্যমান রূপেও ভিন্নতা পরিলক্ষিত হয়। আবার তিনি (সম্পাদক) যখন বলেন, ‘পাণ্ডুলিপিতে ‘নাকো’ থাকলেও জীবনানন্দীয় রীতির কথা স্মরণে রেখে এ গ্রন্থে “না ক’ ” [যথাপ্রাপ্ত] পরিগ্রহণ করা হয়েছে’Ñতখন প্রকৃতই জানতে ইচ্ছে করে রূপসী বাংলার কোন কবিতায় বা রচনায় সেটি বিদ্যমান। আদতে কি একটিও আছে? বস্তুত প্রাপ্ত পাণ্ডুলিপির সূক্ষ্ম ও সতর্ক অবলোকন থেকে স্পষ্ট প্রতীয়মান হয়, কবি সর্বত্র “-নাক’-” রূপে লিখেছেন (দেবেশ রায়ও সেই বিন্যাস গ্রহণ করেছেন)। বর্তমান সম্পাদকের ন্যায় “-“না ক’ ”-/-“না ক”-” রূপে নয়। আবার তিনি (সম্পাদক) যখন স্পষ্টত লেখেন, “একইভাবে লেখার তোড়ে জীবনানন্দ কোনও কোনও ক্ষেত্রে স্বীয় বানান রীতিতে ছাড় দিয়েছিলেন।”Ñতখন এটি প্রকৃতই জীবনানন্দ দাশের প্রতি সম্পাদকের আরোপিত একটি অহেতুক ও অমর্যাদাকর উক্তি হয়ে ওঠে। কেননা জীবনানন্দ দাশের ন্যায় বহুপাঠী, একনিষ্ঠ ও অতিসচেতন ছাত্র, শিক্ষক ও কবির ‘লেখার তোড়ে’ ‘স্বীয় বানান রীতিতে ছাড়’ দেবেন, এটা যথার্থ নয়। এক্ষেত্রে সচরাচর ও প্রমাণিতভাবে যেটা অধিকাংশ নামজাদা কবি-সাহিত্যিকের পক্ষে ঘটে/ঘটেছে, তা হলো তাঁরা তাঁদের আগের লিখিত বানান-রূপ বা অভ্যাস থেকে সচেতনভাবেই পরেরটিতে সরে আসেন বা থিতু হন। অন্যভাবে বললে, আগের শুদ্ধ বানান-রূপটির বদলে নতুন আরেকটি শুদ্ধ বানান-রূপ গ্রহণ করেন। বাংলাসাহিত্যে এর ভূরি ভূরি দৃষ্টান্ত বর্তমান (অনেক সময় কবি-লেখকগণ নিজেদের নামের বানানোর ক্ষেত্রেও তা করেন, এরও বহু নজির রয়েছে)। এবং সেটিই স্বাভাবিক ও সচেতন জনের কাছ থেকে প্রত্যাশিত।

তা ছাড়া এটাও বিশেষভাবে স্মরণে রাখতে হবে বলে মনে করি যে, জীবনানন্দ দাশের কবিতায় তাঁর ব্যবহৃত দাড়ি-কমা প্রভৃতি বিরামচিহ্ন কবির ব্যবহার অনুযায়ী যথাযথ রাখার গুরুত্ব অপরিসীম; সেটি বোঝা যাবে যদি কবি বুদ্ধদেব বসুর এ অত্যন্ত মূল্যবান উক্তিটি মনে রাখা হয়। তাঁর ভাষায়, “এর (জীবনানন্দ দাশের কবিতার) ছন্দ নামে অসমচ্ছন্দ হলেও ‘বলাকা’র ছন্দের সঙ্গে এর পার্থক্য কানেই ধরা পড়ে; ― ‘বলাকা’র চঞ্চলতা, উদ্দাম জলস্রোতের মতো তোড়ের নেই;―এ যেন উপলাহত মন্থর স্রোতস্বিনীÑথেমে-থেমে, অজস্র ড্যাশ্ ও কমার বাঁধে ঠেকে-ঠেকে উদাস, অলস গতিতে বয়ে’ চলেছে। এর প্রচুর উৎসাহের তাড়া নেই, আছে একটি মধুর অবসাদের ক্লান্তি। এই সুর যেন বহুদূর থেকে আমাদের কানে ভেসে আসছে।” [দেখুন, ‘মাসিকী’। প্রগতি, আশ্বিন ১৩৩৫, তথ্য সংগৃহীত, জীবনানন্দ দাশ বিকাশÑপ্রতিষ্ঠার ইতিবৃত্ত, দেবীপ্রসাদ বন্দ্যোপাধ্যায়, ভারত বুক এজেন্সি, কলিকাতা, ১৯৯৭, পৃষ্ঠা ৪০-৪১।] কাজেই জীবনানন্দের সমগ্র কাব্যে এবং বিশেষত রূপসী বাংলায় কবির প্রযুক্ত বিরামচিহ্নাদি কেন অক্ষুণ্ন বা যথাপ্রযুক্ত রাখতে হবে, তার কারণ উদ্ধৃত মনীষীবাক্যে নিশ্চয়ই বিঘোষিত হলো।

উল্লেখ্য, বর্তমান ‘সম্পাদক’ একটি সনেট (‘অপ্রকাশিত ৫১’) সম্পূর্ণটাই উদ্ধৃত করে লিখেছেন, “এই সনেটে জীবনানন্দ অষ্টক-ষষ্টকের বিভাজন রক্ষা করেছেন। অষ্টকে চরণান্তিক মিলের ক্ষেত্রে তিনি ক-খ-ক-খ-খ-গ-খ-গ মিলবিন্যাস অনুসরণ করেছেন। ষষ্টকের দেখা যাচ্ছে জীবনানন্দ ঘ-ঙ-ঘ-ঙ-ক-ক এমতরূপ [এমত রূপ?] চরণান্তিক মিলবিন্যাস অবলম্বন করেছেন।” [ঐ, পৃষ্ঠা ২৭]। এখানে আমাদের বলবার কথা দুটো। প্রথমত, আলোচ্য স্থানে (তাঁর ভূমিকায় অন্যত্র এসম্বন্ধে আর কোনও কথা বা বক্তব্য নেই) একটি মাত্র সনেট বা সনেটপ্রতিম রচনা উল্লেখ করে যেমন মিলবিন্যাস দেখানো ঠিক হয়নি, কেননা এতে করে পাঠকসমীপে ভুল বার্তা যাওয়া অসম্ভব নয় যে, তিনি (জীবনানন্দ) বুঝি আগাগোড়াই অর্থাৎ সমগ্র রূপসী বাংলা কাব্যে (সনেট বা সনেটকল্প রচনাগুলোর বেলায়) এই একটি মাত্র মিলবিন্যাস বা রীতি অনুসরণ করেছেন। ফলত এটা যে মোটেও ঠিক নয়, তা নিম্নস্বাক্ষরকারী প্রণীত জীবনানন্দ দাশের রূপসী বাংলা বহুমাত্রিক বিশ্লেষণ [মাওলা ব্রাদার্স, ঢাকা ২০১৮] শীর্ষক গ্রন্থ দেখলেই বোঝা যাবে, যাতে স্পষ্ট পরিলক্ষিত হবে যে কত বিচিত্র রকমের মিলবিন্যাস জীবনানন্দ তাঁর সুবিখ্যাত কাব্যগ্রন্থটিতে প্রয়োগ করেছেন। দ্বিতীয়ত, সম্পাদকের বর্ণিত এই সনেটের মিলবিন্যাস ব্যাখ্যার সবচেয়ে ভয়াবহ ব্যাপার হলো, তিনি লক্ষ করেননি যে এটি মূলত শেক্সপিয়রীয় রীতির সনেট। যে কারণে তিনি যেভাবে এটির মিলবিন্যাস ব্যাখ্যা করেছেন সেটি জোর করে বা একরকম দৃষ্টিকোণে চালানো গেলেও আদতে এটির মিলবিন্যাস বা জযুসব Rhyme pattern হচ্ছে-কখকখগঘগঘঙচঙচছছ। বলাবাহুল্য, শেক্সপিয়রীয় সনেটে যেহেতু অষ্টক-ষটক বন্ধ ইতালীয় ঢঙে রক্ষা করা হয় না, বরং টানা রচনা করা হয় এবং শেষ দুটি পঙ্ক্তি বা চরণ (Line) যুগ্মক (Couplet) গঠন করে (সনেটের মূল চরণসজ্জায় শেষ দু-চরণকে মার্জিন থেকে সামান্য ডানে সরিয়ে স্থাপন করে [নমুনাস্বরূপ দেখা যেতে পারে, No Fear Shakespeare Sonnets, John Crowther, Spark Publishing, New York, 2004.]; যদিও এরূপ বিন্যাস এজাতীয় সনেট-রচনায় জরুরি নয়), সেহেতু একমাত্র এভাবেই তাঁর বর্ণিত বা উদ্ধৃত সনেটটির মিলবিন্যাস বিশ্লেষণ করতে হবে। এখানে কবি-প্রযুক্ত অন্ত্যমিল, যথাÑ ‘ধ’রে-ভ’রে’ (২য়-৪র্থ পঙ্ক্তি) এবং ‘কাপড়ে-পড়ে’ (৫ম-৭ম) ―এ ৪-পঙ্ক্তির শেষোক্ত ‘র’ ও ‘ড়’-কে দুটির উচ্চারণের সামান্য হেরফেরের কারণে এক গোত্রীয় ভাবার কোনও সুযোগ নেই। তবে হ্যাঁ, যদি পেত্রার্কীয় তথা ইতালীয় রীতির সনেট হতো, তাহলে বাংলাভাষায় বর্ণিত ছাড় সম্পাদক কিছু হলেও নিতে পারতেন। বরং প্রশ্ন হচ্ছে, তিনি কেন শেষ দুই পঙ্ক্তি অর্থাৎ যুগ্মকের মিলবিন্যাস ‘ক-ক’ দেখালেন, তা আদৌ বোধগম্য নয়। ফলত ‘ক’ তো তিনি আগেই দেখিয়েছেন, এখন এটিকে, অন্যকথায় পরবর্তী সব চরণের অন্ত্যমিলকে ইংরেজি (abab প্রভৃতি) বা বাংলায় (কখকখ প্রভৃতি) দুই ক্ষেত্রে (যদি পেত্রার্কীয় বা ইতালীয় অষ্টক-বন্ধ না হয়) পরবর্তী ভিন্ন বর্ণ দিয়েই ব্যাখ্যা করা হয়ে থাকে, ঈষৎ বা পূর্ববর্তী কোনও পঙ্ক্তি বা চরণ শেষে যদি সেই অক্ষরের অন্ত্যমিল বা অন্বয়-সাদৃশ্য থাকেও। 

পরিশেষে আরেকটু বলে বর্তমান আলোচনা শেষ করব।

সম্পাদক তদীয় আলোচনার একেবারে শেষ দুই অনুচ্ছেদের অব্যবহিত আগের অনুচ্ছেদে লিখেছেন, “এ গ্রন্থ কেবল কবি পরিকল্পিত বাংলার ত্রস্ত নীলিমা কাব্যের প্রকাশ নয়; ডান পাশের পৃষ্ঠায় পাণ্ডুলিপি-চিত্র সংস্থাপন করার কারণে এ গ্রন্থ বিশেষ কৌতূহলময় আবেদন সৃষ্টি করবে। এর ফলে জীবনান্দের [জীবনানন্দের] হস্তাক্ষরের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার দুর্লভ সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।” [ঐ, পৃষ্ঠা ২৮]।

বিদগ্ধ সম্পাদক যথার্থই বলেছেন যে, ‘পাণ্ডুলিপি-চিত্র সংস্থাপন’ করায় কৌতূহলী ও জীবনানন্দপ্রেমিক পাঠকের কবির ‘হস্তাক্ষরের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার দুর্লভ সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে’। এ উক্তি বাংলাদেশের পাঠকের জন্য খানিকটা সত্য, পশ্চিমবঙ্গের পাঠককুলের জন্য নয়, কেননা এটি সেখানে আগেই ‘প্রতিক্ষণ’ প্রকাশ করে দেখিয়েছে। এ জন্য অবশ্যই উক্ত (প্রতিক্ষণ) প্রতিষ্ঠানটির প্রতি আপামর বাংলাভাষাভাষী পাঠককুল চিরকৃতজ্ঞ না হয়ে পারে না। প্রতিক্ষণ প্রকাশিত উক্ত গ্রন্থ বাংলাদেশেও একেবারে অপ্রাপ্য/অলভ্য নয়, তবে কিছুটা দুর্লভ। কাজেই ‘দুর্লভ সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে’ বলা বোধ হয় যায়। তবে দুর্লভ হোক কী সুলভÑঅবশ্যই একটি সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে বটে। বর্তমান গ্রন্থটি প্রকাশে আরও যেটা ঘটেছে, তা হলো পাণ্ডুলিপি-চিত্র সংযোজনের ফলে বিচক্ষণ পাঠকের পক্ষে সবচেয়ে সুবিধের হচ্ছে বর্তমান সম্পাদক এবং বাংলাদেশ-সহ পশ্চিমবঙ্গেও এজাতীয় প্রকাশনায় কবির ওপর ‘তথাকথিত’ কতিপয় সম্পাদক যে কী নির্বিচার-স্বেচ্ছাচার চালিয়েছেন (স্মর্তব্য, জীবনানন্দের সেই বহুলোদ্ধৃত বিদ্রƒপপূর্ণ কবিতার অংশবিশেষ: ‘বরং নিজেই তুমি লিখো নাক’ একটি কবিতা…কবিদের মাংস কৃমি খুঁটি..’ (সমারূঢ়) সেটি পাঠককুল চাক্ষুষ করবেন (বর্তমান গ্রন্থে)। এবং তার চেয়েও বড় কথা, জীবনানন্দ দাশ তাঁর এই সুবিখ্যাত কাব্যগ্রন্থটির কোনও নাম জীবদ্দশায় দিয়ে যাননি বা দিতে পারেননি (প্রকাশই তো করেননি)। ফলত যে-নামে (রূপসী বাংলা) তাঁর মৃত্যুর পরে এটি প্রকাশিত, সেটি এতই সুবিদিত ও পাঠকনন্দিত হয়েছে যে, এখন নতুন করে কবি কী দিতে চেয়েছিলেন বা দেওয়া উচিত সেসব প্রশ্ন তুলে অর্থাৎ প্রচলিত ‘রূপসী বাংলা’কে কেউ আর ‘বাংলার ত্রস্ত নীলিমা’ নামে গ্রন্থন করবে কি? (প্রসঙ্গত স্মরণীয়, জীবনানন্দ-পরবর্তী বাংলাভাষার আরেক বিখ্যাত আধুনিক কবি শামসুর রাহমানের বিধ্বস্ত নীলিমা শীর্ষক কাব্যগ্রন্থের নাম)। বর্তমান সম্পাদক লিখেছেন, “জীবনানন্দ দাশ এ খাতার কবিতাগুলো বাংলার ত্রস্ত নীলিমা নাম দিয়ে কাব্যাকারে প্রকাশ করার কথা ভেবেছিলেন।” [ঐ, পৃষ্ঠা ১৬]। এ ভাবনাটির কোনও তথ্যসূত্র সম্পাদক উল্লেখ করেননি (যা করাটা বিধেয় ও জরুরি ছিল)। আবার তিনি (সম্পাদক) যখন এও লেখেন, ‘অনেক ভাবনার মতো এ ভাবনাটিও জীবনানন্দ বাস্তবায়ন করেননি।‘ [ঐ, পৃষ্ঠা ১৬।]―তখন অত্যন্ত সঙ্গত কারণেই প্রশ্ন তোলা যায়, কবি নিজেই যখন ‘বাস্তবায়ন করেননি’ (বাস্তবায়ন করে যাননি বললে অবশ্য তিনি কিছু ছাড় পেতেন), তখন তিনিই বা অযাচিতভাবে সেটি বাস্তবায়নের দায়িত্ব নিচ্ছেন?

কাজেই নামকরণের বিষয়ে আমাদের সুস্থির মত এই যে, বহুলশ্রুত, পাঠকনন্দিত রূপসী বাংলা নামের বদলে সম্পাদকের প্রস্তাবিত/লিপিকৃত বাংলার ত্রস্ত নীলিমা আখ্যায় কাব্যটিকে নামকরণের চেষ্টায় বিভ্রান্তি বাড়াবে বৈ কমাবে না, উপরন্তু নতুন কোনও সুফল উৎপাদকও হবে না! কেননা, মনে রাখতে হবে যে, মানবেতিহাসের ন্যায় কাব্যের ইতিহাসেও ‘যদি-কিন্তু’ প্রভৃতি দিয়ে কাজ চলে না, সেখানে যা আছে, যা ঘটেছে তাকে নিয়েই আলোচনা-সমালোচনা কেন্দ্রীভূত রাখতে হয়, রাখা নিয়ম।

আরেকটি ব্যাপার এখানে না উল্লেখ করলেই নয়, আর তা হলো ‘রূপসী বাংলা’য় আসলে কতটি কবিতা (সনেট, সনেট-প্রতিম ও অন্যান্য মিলিয়ে) ছিল, রয়েছে বা অন্তর্ভূত―তা নিয়ে একেক জন সম্পাদক-সংকলক একেক রকম সংখ্যায় (যাঁরা সংখ্যায়ন করেননি তাঁদের সংকলন মতে) কবিতা প্রকাশ বা গ্রন্থভুক্ত করে আমাদের ন্যায় সাধারণের পাঠকের বিভ্রান্তিকে চূড়ান্তে নিয়ে ছেড়েছেন বললেও কম বলা হয়। যেমন, বর্তমান সম্পাদক স্বীয় সংকলনে অন্তর্ভুক্ত করেছেনÑ৬২টি, অথচ ক্ষেত্র গুপ্ত, দেবীপ্রসাদ বন্দ্যোপাধ্যায় ও আবদুল মান্নান সৈয়দ―এঁদের ভিন্ন ভিন্ন গ্রন্থনায় লভ্য ৬১টি করে। অন্য দিকে দেবেশ রায়ের পূর্ববর্ণিত রূপসী বাংলা প্রকাশিত-অপ্রকাশিত পাণ্ডুলিপি ও পাঠান্তর সংস্করণ-এ পাই ৭৩টি [ফাঁকে বলে রাখি যে, মূল রচনা বা পাণ্ডুলিপি আমরা চাক্ষুষ করিনি, ফলে দেবেশ রায়ের গ্রন্থভুক্ত ছাপচিত্রটিকেই গ্রাহ্য করছি, কেননা এটিতেই সর্বাধিক সংখ্যক কবিতা মুদ্রিত]। ফলে সম্পাদক-সংকলকদের কৃপায় এক্ষেত্রে পাঠকের সংখ্যাতাত্ত্বিক বিড়ম্বনায় না পড়ে উপায় নেই। যাই হোক, এ বিষয়ে আমাদের বলবার কথা একটাই, আর তা হলো, মূল পাণ্ডুলিপির দোহাই যাঁরা দেবেন বা পাড়বেন, তাঁদের ৭৩টি কবিতাই গ্রন্থভুক্ত করতে হবে (আকারে-প্রকারে যাই হোক এবং অন্তর্নিহিত ব্যাপার-স্যাপার যাই থাক না কেন)।

অন্তিমে জীবনানন্দ-অনুরাগী এবং তাঁর কিছু পরবর্তীকালে কবি সঞ্জয় ভট্টাচার্যের একদা কৃত একটি আক্ষেপ উৎকলন করে বক্ষ্যমাণ আলোচনার ইতি টানতে চাই। তাঁর ভাষায়, “জীবিত অবস্থায় প্রার্থনায়ও যিনি পাঁচ শ’ টাকা পাননি, মৃত্যুর পর তাঁর নামে পাঁচ হাজার টাকার পুরস্কার ঘোষণার আর বিড়ম্বনা কেন?” [কবি জীবনানন্দ দাশ, সঞ্জয় ভট্টাচার্য, কবি প্রকাশনী, ঢাকা ২০১৬, পৃষ্ঠা ১২২।] আমরাও অসঙ্কোচে বলতে চাই, জীবনানন্দ দাশের অভূতপূর্ব কাব্যগ্রন্থ রূপসী বাংলা, যদিও স্বীকার্য যে তিনি এটি তাঁর জীবদ্দশায় প্রকাশ করেননি তথা অজ্ঞাত কারণে সেটি প্রকাশে তিনি আশ্চর্য রকমভাবে বিরত ছিলেন, কিন্তু সেটির যে পাণ্ডুলিপি তিনি আমাদের জন্য রেখে গেছেন, সেটিতে তো সম্পাদনার খুব একটা কিছু নেই, তাহলে কেন আমাদের কোনও কোনও ‘তথাকথিত’ সম্পাদকেরা (এঁরা নিজেদের সংকলক ও টীকা-ভাষ্যকার বলে দাবি করলেই জুতসই হতো নাকি!) তাঁর সেই অনন্য কাব্যগ্রন্থটির ওপর ক্ষণে ক্ষণে নতুন প্রকাশনার নামে অনাবশ্যক ছুরি-কাঁচি চালানোর চেষ্টা করেন? আশা করি, সহৃদয় ও বোদ্ধা পাঠকসমাজই এর সমুচিত জবাব দিতে পারবেন, আমরা অপারগ।

 লেখক : কবি ও গবেষক

Leave a Reply

Your email address will not be published.

shares