গল্প : কানাইপুরের সাবিনা : মিলা মাহফুজা

গত কয়েক বছর ধরে সারা দেশ ঘুরে বেড়াচ্ছি। বলা যায় চষে বেড়াচ্ছি। প্রথম যেদিন আমরা ঢাকা থেকে বেরিয়েছিলাম, সেদিন আমাদের কাছে কোথায় কোথায় যাওয়া হবে তার যে তালিকা ছিল তা এমন বেশি বড় ছিল না। ছয় মাসের মধ্যে কাজ শেষ করার পরিকল্পনা ছিল।

খুব সিম্পল প্ল্যান। চারজনের টিম। আমি দলের ম্যানেজার। ভার্সিটি থেকে বেরিয়ে চাকরির জন্যে কিছুদিন ফ্যা ফ্যা করে ঘুরে বেড়িয়ে, ইলেকট্রনিক মিডিয়ার রঙিন হাতছানিতে ক্যামেরা চালানো আর ভিডিও এডিটিং শিখলাম, একটা দৈনিক পত্রিকায় খ্যাপ লেখার টাকাগুলো দিয়ে। তাও কাজ জোটে না। যে চ্যানেল কেউ দেখে না, সেখানে হাত মকশ করব বলে নামমাত্র মাইনেতে ঢুকলাম। কিন্তু বারো হাত কাঁকড়ের তের হাত বিচি। মালিক লোকটার বিচিও মোটা ছিল। কাউকে সামান্য সম্মান করে কথা বলা জানতই না। রুমে ডেকে নিয়ে বাপ-মা তুলে গালাগাল করত। কারণ ছাড়াই। সবারই এক অবস্থা। অফিস ঠিকমতো চালাতে হলে এ রকমই করতে―জানে মানে সে। মাসখানেক কোনওমতে পার করে বেতন নিয়ে ফুটব ঠিক করেছিলাম। দুই মাস পরে এক মাসের বেতন পেয়ে আর ওমুখো হইনি।

আবার সেই টো টো করা। আজকাল পত্রিকায় চাকরির বিজ্ঞাপন প্রায় থাকে না বললেই চলে। সরকারি চাকরি ছাড়া। আবার কয়েক লাখ টাকা পকেটে না নিয়ে সরকারি চাকরির দিকে তাকানো উচিত না। আমার এক বন্ধুর বুদ্ধিমতো বিকেলটা কাটানোর জন্যে বাংলা একাডেমি, বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র, সংস্কৃতি বিকাশ কেন্দ্র, দীপনপুর, কবিতা ক্যাফে―এইসব জায়গাগুলো বেছে নিই। ভাগ্যে থাকলে ভাল কিছু কথা শোনা হয়। তেমনি ভাগ্য ভালো হলে বিকেলের চা-নাস্তাটাও হয়ে যায়। আজকাল অনুষ্ঠানে দর্শক-শ্রোতার বড় খরা। কেউ যদি আসে, কী উদ্দেশ্যে এসেছে তার খোঁজ কেউ নেয় না। একজন উপস্থিত মানে একটা সিট ভরবে। একটা সিট কম ফাঁকা থাকবে।

একদিন শিল্পকলা একাডেমিতে একটা ডকুমেন্ট্রির প্রদর্শনী ছিল। মৃৎ শিল্পের ওপর। আগ্রহ নিয়ে গিয়েছি।  দেখা হয়ে গেল আরেক তথ্যচিত্র নির্মাতা মইনুল হোসেনের সঙ্গে। তাঁর একটা ডকুমেন্ট্রি দেখে আগ বাড়িয়ে মন্তব্য করেছিলাম একদিন। শুনে খুশি হয়েছিলেন। ডকুমেন্ট্রি  প্রদর্শনের আগে অতিথি, বিশেষ অতিথি ইত্যাদিগণের বক্তৃতাপর্বে আমি গিয়েছি চা খেতে। পেছন থেকে বিশাল এক চাপড়া মেরে আমাকে তার দিকে ফেরালেন মইনুল হোসেন। জিজ্ঞেস করলেন, ‘ওই মিয়া অহন কি করতাছ ?’

 বেকার আছি বলতে ভালো লাগে না বলে উত্তর না দিয়ে উল্টো তাঁকেই প্রশ্ন করলাম, ‘আপনি আর কিছু করেছেন নাকি, মইনুল ভাই ?’

মাত্র একটাই প্রশ্ন, শুনে মইনুল হোসেন আমাকে হিড়হিড় করে টানতে টানতে বাইরে নিয়ে যেতে থাকলেন। আমি স্বেচ্ছায় যাচ্ছি ভাব করলেও অনেকেই সন্দেহের চোখে আমাকে দেখতে লাগল। একদম বাইরে রাস্তায় নিয়ে চায়ের অর্ডার দিয়ে বললেন, ‘ওই মিয়া আমরাও ভার্সিটিতে পড়ছি, হলে থাকছি। মুখ দেখলেই কইবার পারি কে কোন হালতে আছে।’

থতমত-আমার হাতে চায়ের কাপ ধরিয়ে দিয়ে বললেন, ‘কাম করবা ?

‘মানে ?’

‘আরে মিয়া তোমারে জিগাইতাছি কাম করবা কি না, আর তুমি মানে মানে করতাছ!’

               কোনওমতে ভেতরের অস্থিরতা নিয়ন্ত্রণে নিয়ে চায়ের কাপে পর পর দুটো চুমুক দিয়ে শান্ত হয়ে বললাম, ‘কী কাজ, মইনুল ভাই ?

‘আমি আর একখান ডকুমেন্ট্রি বানামু। তুমি আমার লগে কাম করবা।’

একটু সন্দেহ নিয়ে চুপ করে থাকি। কেউ সেঁধে যে কাজ দেয় তার পেমেন্ট খুব খারাপ হয়, কয়েকটা অভিজ্ঞতা আছে। কিন্তু একদম বেকার কতদিনই বা থাকা যায়!  কী বলব তাই ভাবতে সময় নিচ্ছিলাম, মইনুল ভাই দেরি সহ্য করেন না, বলেন, ‘ধুর মিয়া এত ভাবনের কী আছে ? আহো দেহো, কাম করো, পুষাইলে থাকবা, নাইলে থাকবা না। এত ভাবনের কাম কি ?’

‘মানে ঠিক কী কাজ ? কতদিন করতে হবে ? একটু তো বলবেন।’

‘কাইল আহো আমার অফিসে। সব কমুনে। তবে কাইল মানে কালই। হাতে সময় নাই। ম্যালা কাজ। তুমি যে ওই হালার পুতের কাম ছাইড়া দিছ সে আমি হুনছি। ওইহানে তুমি কাম করতে পারবা না জানতাম। কই নাইকা কিছু। নিজে অভিজ্ঞতা লওয়াই ভালো। আইচ্ছা লও এহন চলো ডকুমেন্ট্রিটা দেহি। ফয়সল ভালো কাজ করতাস হুনছি, দেখি নাই।’

পরদিনই গেলাম মইনুল ভাইয়ের অফিসে। তারপর তিন দিনের মধ্যে আমরা বেরিয়ে পড়লাম। উত্তরবঙ্গ দিয়ে শুরু হবে। স্ক্যানিয়া বাসে যাবতীয় লটবহর নিয়ে এক রাতে উঠে বসলাম। পকেটে মইনুল ভাইয়ের দেয়া অগ্রিম পাঁচ হাজার। মাসে পঞ্চাশ করে পাব। হাওয়ায় উড়তে উড়তে রংপুর পৌঁছে গেলাম।

পর্যটনের মোটেলে উঠলাম আমরা। মইনুল ভাই ঢাকা থেকে অনেকের সঙ্গে যোগাযোগ করেই এসেছেন। তাদের কেউ কেউ রাতেই দেখা করতে এলেন। মইনুল ভাই সবার কাছে ‘আমার সহকর্মী’ বলে আমাকে পরিচিত করালেন। দীর্ঘ রাত পর্যন্ত অনেক কথাবার্তা হলো। মইনুল ভাই যে আসে তার সঙ্গেই এমন আন্তরিকতার সঙ্গে হাত মেলান, এমন অন্তরঙ্গ স্বরে কথা বলেন, যেন মানুষটি তার খুব আপনজন। ব্যাপারটা আমি লক্ষ্য করি। মইনুল হোসেন এমনিতেই বেশ নামে পরিচিত মানুষ। তার ওপর এইরকম ব্যবহার দেখে মানুষজন একেবারে মুগ্ধ। কী করে তাকে সাহায্য করবে তার প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে যায় সকলের মধ্যে। মইনুল ভাই ঘন ঘন সিগারেটে টান দেন আর খুব মন দিয়ে কথা শোনেন। মাঝে মাঝে কোনও প্রসঙ্গে যুতসই রসিকতা করেন। এমনিতেই তার কথায় রসের ভিয়েন দেওয়াই থাকে। এর মাঝে মুখ উপরের দিকে তুলে জোরে হা হা করে হেসে ওঠেন। এই ভঙ্গিতে তাঁকে খুব ভালো দেখায়। অনেকে তার ছবি তোলে মোবাইলে।

এসবের মধ্যেই মইনুল ভাই পরের দিনের কাজের কথাও টুকটাক সেরে নেন। রংপুরের চিহ্নিত পনেরটা বধ্যভূমির মধ্যে ঘাঘট নদীতীরের বধ্যভূমি, আর টাউন হল বধ্যভূমি, আমাদের কাজের তালিকায় আছে। এই দুই বধ্যভূমি নিয়ে যারা সাক্ষাৎকার দেবেন তাদের সঙ্গে মোবাইলে কথা বলে নেন। সবাই বিদায় নেবার পর আমরা যখন শুতে গেলাম তখন রাত  পৌনে একটা। মইনুল ভাই আমাকে বললেন, ‘কি মিয়া, টায়ার্ড নাকি ?’

টায়ার্ড হয়েছি, কিন্তু স্বীকার করি না। ‘না, টায়ার্ড না, তবে ঘুম পাচ্ছে খুব। জার্নিতে আমি ঘুমাতে পারি না।’

‘আমার কথা কইলা ? কইতে পার। আমার হিসাব হইল খামাকা জাইগা না থাইকা ঘুমাইলে জার্নি টের পাইলাম না। আবার ঘুমটাও হইল। এহন কিছু কম ঘুমাইলে সমস্যা নাই। দাও কাগজগুলোরে আনো, কাইলকার প্রোগ্রামটা আরও একটু চেঞ্জ করতে হইব। যাও তুমি ঘুমাও। আমি কাজ শেষ কইরা ঘুমামু। সকাল সাতটায় আমরা গাড়িতে উঠুম, তার আগে যা যা লাগব তা গাড়িতে তুলছে কি না, চেক কইরা নিও।’

এভাবেই শুরু হয়েছিল। সেদিনের পর প্রায় দুই বছর পার হয়ে গেছে। আমাদের কাজ চলছেই। সারা বাংলাদেশে প্রায় হাজার খানেক বধ্যভূমি শনাক্ত হয়েছে। তার মধ্যে থেকে পঞ্চাশটার ওপর কাজ করব আমরা।

কিন্তু কাজে নেমে দেখা গেল, তালিকার বাইরেও কিছু গণকবর বা বধ্যভূমি রয়েছে যেগুলোর কথা তুলে না ধরলে বাঙালির প্রতি পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বর্বরতার ইতিহাস অসম্পূর্ণ থাকে। তাই মইনুল ভাই কিছুদিন পর পর স্ক্রিপ্ট চেঞ্জ করেন। আমাদের কাজের পরিধি বাড়ে। এই ভাবেই চলছে গত দুই বছর। আমি কয়েকবার তাঁকে নিবৃত্ত করার চেষ্টা করেছিলাম। মইনুল ভাই বলে, ‘কও তো মিয়া, তুমি নিজে-কানেই তো শুনতাছ, এইসব হিস্ট্রি ধইরা না রাখলে আমাগো ভবিষ্যৎ কী ? যারা চোক্ষের সামনে ওইসব দ্যাখছে তাগো বয়স হইয়া গেছে। কয়দিনই বা বাঁচব। এহনই অনেক কথা ভুইলা গ্যাছে। এহন ফালাইয়া গ্যালে আর ফিরে পাইবা না কিছুই।’

খুব গুছানো, খুব ঠাণ্ডা মাথার মইনুল হোসেন মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকবাহিনীর নৃশংসতার নতুন নতুন বিবরণ শুনে ভেতরে ভেতরে কাতর হয়ে পড়েন। আমাকে শক্ত হয়ে সামলাতে হচ্ছে। মাঝে মাঝে মইনুল ভাই আমাকে বলেন, ‘মিয়া, কাজ তো কিছু শিখলা, তোমাগো বয়স কম, টাকা কামানের ধান্দা না কইরা, চেষ্টা কইরো কিছু কাজ কইরা যাওনের। দেখতাছো না, বধ্যভূমির ওপর দালান উঠতাছে। মার্কেট বানানো হইতাছে।’

গণকবর কিংবা বধ্যভূমি সম্পর্কে প্রত্যক্ষদর্শীর কথা রেকর্ড করতে করতে আমার নিজের ভেতরটাও নড়ে গেছে। মইনুল ভাইকে কথা না দিলেও আমি নিজেকে নিজে কথা দিই। নিজের কাছে নিজে প্রতিজ্ঞা করি। সারা বাংলাদেশের সব বধ্যভূমির ইতিহাস রেকর্ড করতেই হবে।

মইনুল ভাই পরিকল্পনার চেয়ে অনেক বেশি শ্যুট করেন। অসংখ্য লোকের সাক্ষাৎকার নেন। নতুন গণকবরের সন্ধান পেলে খুব অসুবিধা না হলে সেখানে চলে যান। এক ঘণ্টার ডকুমেন্ট্রিতে এত ফুটেজ রাখতে পারবেন না। তবু ক্যামেরা বন্দি করছেন, কিছু ডকুমেন্ট রাখবেন আর্কাইভে।

এই করে আমাদের তিন মাস প্রায় দুই বছরে ঠেকেছে। আরও কতদিন যে যেত জানি না। হঠাৎ বিদেশি একটা সংস্থা মইনুল ভাইয়ের ডকুমেন্ট্রিটা প্রচার করতে চায় জানানোর পর কাজ গুটাতেই হলো। আমাদের ঢাকায় ফেরার পথে শেষ স্পট ছিল ফরিদপুর। ফরিদপুর শহর থেকে বত্রিশ কিলোমিটার দূরে চণ্ডীদাসদী গ্রামের এক বধ্যভূমি।

বিকেলের আগেই আমাদের কাজ শেষ করে আনলাম। খানিকটা সংক্ষেপই করা হলো। মইনুল ভাই বিশ্রাম নিতে গ্রামের সবচেয়ে পুরাতন পাকুড় গাছের নিচে চেয়ারে বসেছেন। কিন্তু তাঁর বিশ্রাম হচ্ছে না। প্রচুর মানুষ তাঁকে ঘিরে আছে। চারপাশের মানুষের কাছে নিজেকে আপনজন করে তোলার এক বিরল ক্ষমতা মইনুল ভাইয়ের আছে। সব জায়গায় ছেড়ে চলে আসার সময়টায় তাই তাকে বিদায় দিতে সবাই কেমন আর্দ্র হয়ে ওঠে। কেউ তাঁকে এত তাড়াতাড়ি ছাড়তে চায় না। তাঁর এই গুণের কারণে আমাদের কাজে কোনো জটিলতা দেখা দিলে দ্রুতই তার সমাধান হয়ে গেছে।

সব গুছিয়ে নেয়া শেষ। মইনুল ভাইকে উঠতে বলতে যাব তার আগে তিনিই এগিয়ে এলেন। হাতের সিগারেট মাটিতে ফেলে জুতোর নিচে পিষলেন কতক্ষণ। মনে হচ্ছে ভেতরের ক্রোধ সামলাচ্ছেন। একটু পরে গনগনে মুখে বললেন, ‘দেরি হইব, তাও চলো দেইখাই যাই।’

ফুরিয়ে আসা বিকেলের দিকে তাকিয়ে ইতস্তত করে বলি, ‘আবার কী দেখবেন ? ফিরতে দেরি হয়ে যাবে। আমাদের হাতে কাজটা শেষ করার জন্যে সময় মাত্র কয়েকদিন।’

মইনুল ভাই কিছু বললেন না। তার মানে যেতেই হবে।

আমরা যেখানে ছিলাম তার থেকে বেশি দূরে নয় জায়গাটা। দুই কিলোমিটার হবে। প্রধান সড়কটা যেখানে ‘এল শেপ’ উত্তরমুখী হয়েছে সেই তিনকোণায়। জায়গার নাম তেমাথা। সেখানে রাস্তার পাশে একটা ইটের বাড়ি। বহু পুরনো। আমাদের সঙ্গে প্রায় সারাক্ষণ সেঁটে থাকা হাওয়াই শার্ট লুঙ্গি পরা ঢ্যাঙ্গা ধরনের লোকটা আঙুল তুলে বলল, ‘এই ঘর। এখানেই পুড়িয়ে মেরেছিল ছেলেটাকে। কয়েকটা মেয়েছেলেও ছিল। হাড়সুদ্ধ পুড়ে ছাই হয়ে গিয়েছিল। কাউকেই চেনা উপায় ছিল না।’

ঘর দুটোর ছাদ নেই। বাইরে দেয়াল প্লাস্টার করা না হলেও ভেতরে প্লাস্টার করা হয়েছিল। ভেতরটা আগুনে পোড়ার কালো দাগ এখনও বোঝা যায়। লোকটা আমাদের জানায়, যুদ্ধের সময় তার মাত্র পাঁচ বছর বয়স ছিল। কোমরের ঘুনসিতে ঘণ্টি ঝুলিয়ে তার মা সংসারের কাজ করত। ঘণ্টির শব্দ শুনে বুঝত ছেলে কোথায় আছে। না শুনলে খুঁজে বের করত। মাঝে মাঝে ভুলেও যেত। একদিন সে বাড়ি থেকে বেরিয়ে দৌড়ে এই রাস্তার কাছে চলে আসে। রাস্তা দিয়ে যাওয়া বাস দেখতে ভাল লাগে তার। সেদিন বাসের বদলে অন্যরকম একটা গাড়ি আসে। অন্য রকম কয়েকটা লোক লাফিয়ে লাফিয়ে নামে। চারদিক ঘুরে ঘুরে দেখে এই ঘর দুটোর ভেতর ঢোকে। তাই দেখে ঘণ্টি পরা বজলু পেছন ফিরে দৌড়ে যায় আলি চাচার কাছে। আলি চাচাকে জানায় রাস্তার ধারে তার গুদামঘরে কারা যেন ঢুকেছে। মানুষের মতো আবার মানুষের মতোও নয়। তাদের পিঠে বন্দুক আছে।

বজলুর আলি চাচা চমকে ওঠে। মিলিটারি তার গুদোমে ঢুকল কেন? কিছু খড় ছাড়া আর কিছু নেই বলে ঘরের দরজার শেকলে তালা দেয়নি। ওই ঘরে কি মুক্তিরা লুকায় ছিল ? সাতপাঁচ চিন্তা করতে করতে গাছের আড়ালে আড়ালে এগিয়ে দেখে পুচকে বজলু ঠিকই বলেছে। মিলিটারি গাড়ি রাস্তার উপর দাঁড়িয়ে, আর দুই তিনজন মিলিটারি হাঁটাহাঁটি করছে। খবর পেয়ে একে একে গ্রামের আরও কয়েকজন আসে, কিন্তু কারও সাহস হয় না এগিয়ে যাওয়ার। আড়াল থেকেই তারা মিলিটারিদের ওপর নজর রাখে। সন্ধ্যার আগে, প্রায় দু’ঘণ্টা থাকার পর মিলিটারিরা হঠাৎই ট্রাকে চড়ে চলে যায়। তবু অন্ধকার ঘন না হওয়া পর্যন্ত তারা এগোয় না। পরে টর্চ লাঠি নিয়ে এসে দেখে ঘরের সামনে পোড়া সিগারেটের গোড়া পড়ে আছে।

অনেক ভেবেও তারা কেউই বুঝতে পারে না, মিলিটারি এখানে কেন এসেছিল। কিসের জন্যে অপেক্ষা করেছিল। সবচেয়ে দুঃশ্চিন্তার বিষয়―কাল আবার আসবে কি না ? গ্রামের এত কাছে মিলিটারি থাকলে সর্বনাশ। কী থেকে কী হবে কে জানে। একজন বলে ওঠে―ঘর দুটো ভেঙে দেওয়াই ভালো। ঘর না থাকলে মিলিটারি আর আসবে না।

অন্য একজন বলে―আর ঘর না দেখে যদি  গ্রামে ঢোকে, তখন?

পরদিন আবার তারা দুপুরের পরে গাছের আড়ালে দাঁড়িয়ে দেখে, মিলিটারি ট্রাক এসে সেই ঘরের কাছে দাঁড়িয়েছে। ট্রাক থেকে বেশ কয়েকজন মিলিটারি লাফিয়ে নেমে চারদিকে হাঁটাহাঁটি করে। সবার ঘাড়ে অস্ত্র। তারা বিশেষ করে উত্তর দিকে শহরমুখী রাস্তাটা ভাল করে নজর করে।

এভাবে কয়েকদিন যাওয়ার পর একদিন সকালেই মিলিটারিরা চলে আসে। আরও বেশি মিলিটারি। আর অন্য একটা ট্রাকে জিনিসপত্র। এবার সবাই বুঝে যায়, মিলিটারি ওখানে ঘাঁটি ফেলছে। তারা গ্রামে ফিরে পরিবারের মেয়ে, বউ আর জোয়ান ছেলেদের গ্রামের পিছন দিক দিয়ে দূরে পাঠিয়ে দেয়। দু’চার দিন সকাল থেকে সন্ধ্যে পর্যন্ত থেকে মিলিটারিরা চলে যায়। তারপর দেখা গেল তারা রাতেও থাকছে। এক সকালে মিলিটারিরা তাদের গ্রামে ঢুকে জানিয়ে আসে, তাদের জন্য দুপুর আর রাতের খাবার পাঠাতে।

এরপর যখন যেটা দরকার সেটাই তারা পাঠাতে হুকুম করে। যে জিনিস নিয়ে যায় তাকে দিয়ে নানা কাজ করিয়ে নেয়। গ্রামের লোক নীরবেই তা মেনে নিয়েছিল। উপায় কিছু ছিল না। তারপর একদিন রাতে মেয়েছেলের চিৎকারে তাদের কানে তুলো দিতে হয়। তারপর থেকে প্রতিদিন। কোথা থেকে মেয়েছেলেদের নিয়ে আসত তা জানত না। কয়েকদিন পর পর নুতন মেয়েছেলেকে দেখতে পেত যারা ফুটফরমাস খাটতে যেত। ঘরের ভেতর আটকে রাখত মেয়েছেলেদের। কখনও কখনও দিনেও তারা চিৎকার করত।

এদিকে দিনে দিনে মিলিটারিরা অনেক বড় বড় অস্ত্র নিয়ে এসেছে। বড় বড় গর্ত খুঁড়ে গাছের মোটা মোটা গুঁড়ি দিয়ে ঢেকে দিয়েছে গর্তের উপরটা। রাস্তা আর পাশের দু’দিকে বালির বস্তা সাজিয়ে রেখেছে। মাঝে মাঝেই ট্রাকে করে আরও অনেক মিলিটারি আসে। বড় রাস্তা দিয়ে জোরে ছুটে যায়। ট্রাকের দু’ধারে অস্ত্র হাতে বসে থাকে মিলিটারি। তখন খাবার পাঠানো নিষেধ হয়েছে। পালা করে তিন/চারজনকে যেতে হয় ফুটফরমাস খাটতে। আশেপাশের গ্রামে থেকেও লোক খাটতে আসে। কিন্তু তাদের কেউ কারও সাথে কথা বলতে পারত না। মিলিটারি অস্ত্র হাতে সবসময় তাদের চোখে চোখে রাখত।

তখন শীত চলে এসেছে। চারদিকে মুক্তিদের হামলার কথা শোনা যাচ্ছে। সে জন্যে মিলিটারিরা আরও সতর্ক হয়ে থাকে। একদিন ঘরের মালিক আলির বোবা ছেলে কাশেম গেছে ফরমাস খাটতে, রাত হয়ে গেলেও সে ফেরেনি, কিন্তু গ্রামের কেউই সাহস করে তার খোঁজে যেতে পারছে না। এমনকি আলি নিজেও না। ঠিক সেই রাতেই, ছেলের চিন্তায় অস্থির হয়েও আলি ঘুমিয়ে পড়েছিল একসময়, হঠাৎ কান ফাটানো আওয়াজ শুনে সবাই গ্রাম ছেড়ে পালাতে থাকে। কেবল আলি বাড়িতেই বসে ছিল। বোবা ছেলেটাকে ফেলে সে প্রাণ বাঁচিয়ে কী করবে ?

পরদিন বিকেলে গ্রামের মানুষ দেখে মিলিটারিরা কেউ নেই। ঘর দুটো পুড়ে ছাই। ঘরের ভেতরে মানুষ পোড়ার গন্ধ তখনও গা গুলিয়ে দিচ্ছে। ছাই গাদার ভেতর কয়েকটা জায়গা অন্য রকম দেখাচ্ছিল। পোড়া হাড়গোড় ছিল হয়ত তার ভেতর, সে আর কেউ বের করতে যায়নি।

               সেদিন থেকে আলি ঘরদুটো তার ছেলের কবর হিসেবে রেখে দিয়েছে। সময় ক্রমশ ঘর দুটোতে ক্ষয়ের থাবা বাড়িয়েছে। জীর্ণ দেয়ালগুলোর ইট খসে পড়েছে কোথাও কোথাও। আলি রোজ ঘরের সামনেটা নিজের হাতে ঝাট দিয়ে পরিষ্কার করে। তারপর দীর্ঘক্ষণ বসে থাকে, একা। চুপচাপ।

মইনুল ভাই ভাঙা গলায় আমাকে বলেন, ‘দেয়ালগুলোই ধরে রাখো।’ 

কথকের মুখ থেকে ক্যামেরা সরিয়ে ঘরের ভেতর ঢোকাই। এতকাল ধরে পরিত্যক্ত ঘরে কোনও চিহ্ন থাকার কথা নয়।  পোড়া দেয়ালে ক্যামেরা ঘোরাতে ঘোরাতে হঠাৎ থমকে যাই, খড়ের আগুনে পোড়া কালো দেয়ালে কালের শ্যাওলা আস্তর ফেলেছে তবু মনে হচ্ছে দেয়ালে কিছু লেখা আছে। প্লাস্টার খুঁচিয়ে লেখা।  হাত দিয়ে ঘষে শ্যাওলা পরিষ্কার করি। ধীরে ধীরে ফুটে ওঠে বড় বড় অক্ষরে লেখা- সাবিনা, কানাইপুর।

লেখাটা অস্পষ্ট হতে-হতেও হয়নি। ইতিহাসের মতোই।

সচিত্রকরণ : শতাব্দী জাহিদ

Leave a Reply

Your email address will not be published.

shares