গল্প : সমমনা দোসরের সন্ধান : মঈনুস সুলতান

 রেলওয়ে স্টেশনটির ওয়েটিংরুমের পেছনে স্কেচখাতা হাতে কৃষ্ণচূড়ার ছায়ায় একাকী দাঁড়িয়ে রেহনাজ ওরফে রেণুকা চোখের জল মোছে। কিন্তু পাঁজরের ভেতর অনিশ্চয়তার দারুণ অশান্তিকে প্রশমিত করতে পারে না। স্কেচ করার অজুহাতে একটু আগে বেরিয়ে এসেছে সে ওয়েটিংরুম থেকে। তার সামনে শত বছরের পুরনো একটি হাজামজা দীঘি। তাতে ঝেঁপে এসেছে কচুরিপানার নীলচে-বেগুনি ফুল। সংস্কারের অভাবে পানার পুরু স্তরে গজাচ্ছে ঘাস। তাতে বসে অনেকগুলো শে^তশুভ্র বক নিমগ্ন হয়ে আছে ধ্যানে। কোনও কোনও জায়গায় শ্যাওলাদাম সরে গিয়ে বেরিয়ে পড়েছে কালচে-সবুজ জলের বিস্তার, প্রতিফলিত হচ্ছে মেঘভাসা আকাশ। ঢাকা আর্ট কলেজের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী রেণুকা ল্যান্ডস্কেপ করতে ভালোবাসে। তার কিছু ল্যান্ডস্কেপ বিক্রিও হয়েছে। এ মুহূর্তে চোখের সামনের দৃশ্যপটও দারুণভাবে আকর্ষণীয়। কিন্তু পেন্সিল দিয়ে সামান্য আঁকিবুকি করতেও ইচ্ছা হয় না তার।

রেণুকা পার্স থেকে হাত-আয়না বের করে মুখ দেখে। মাসকারা ও মেকাপ গলে বিতিকিচ্ছিরি হয়ে আছে। সে চায় না ক্লাসমেট বন্ধুরা তার এ বেহাল অবস্থা চাক্ষুষ করুক। মাঠ-পর্যায়ে ছবি আঁকার এক্সকারসন উপলক্ষে রেণুকা আর্ট কলেজের ছাত্রছাত্রীদের একটি দলের সঙ্গে পুরো এক সপ্তাহ ধুরইলছড়া চা-বাগানে কাটিয়ে আজকের দুপুরের ট্রেনে চলে যাচ্ছে সিলেটের দিকে। এ দলে আছে সাতটি ছেলে, রেণুকাকে নিয়ে তিনটি মেয়ে, এবং আর্ট কলেজের দুজন স্বনামধন্য শিক্ষক। দলটি জাফলঙে একদিন কাটিয়ে, আরও কিছু আঁকাজোকা করে রাতের মেল-ট্রেনে ফিরে যাবে ঢাকায়। সিলেট যাওয়ার  লোকাল ট্রেন আসতে দেরি হচ্ছে, তাই তারা ছোট্ট এ রেলওয়ে স্টেশনটিতে সময় কাটাচ্ছে। আর্ট কলেজের শিক্ষক দুজন বসে আছেন টি স্টলের নিরিবিলিতে। একজন চশমা চোখে পড়ছেন পেপারব্যাক উপন্যাস, অন্যজন আনমনে ফুঁকছেন সিগ্রেট।

ছেলেরা একটু আগে চাপলিশে পান করেছে চা-বাগান থেকে নিয়ে আসা হাঁড়িয়া। এরা এখন গোল হয়ে দোহাতি চা-শ্রমিকদের কাছ থেকে মদের পাট্টায় শেখা নৃত্যগীতের কসরত করছে। তারা গোল হয়ে দাঁড়িয়ে হাত ধরাধরি করে নাচতে নাচতে গাইছে―‘ফু ফা ফারা ফা..।’ অন্য ছেলেরা হাততালি দিয়ে তাদের উৎসাহিত করছে। রেণুকার সহপাঠী রওশনও তাদের সঙ্গে আছে। সে নীরবে স্কেচ করছে ছেলেদের সদ্যশেখা নৃত্যকলা। দলের অন্য মেয়ে স্বপ্না ওয়েটিংরুমে বসে তার বয়ফ্রেন্ডের কাছে লিখছে দীর্ঘ চিঠি।

রেণুকা এদের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েছে ইচ্ছা করেই। তার ভেতরে নিভৃতে যা ঘটে চলছে, তা এদের সামনে প্রকাশ করতে চায় না। সমস্যাটি তার একার, তাই কষ্টও ভোগ করছে সে নীরবে। রওশন ও স্বপ্না বিষয়টি সম্পর্কে অবহিত, কিন্তু তারা নির্লিপ্তি বজায় রাখছে। ছেলেরাও তার সঙ্গে ধুরইল ছড়া চা-বাগানের তরুণ ম্যানেজার শাহরিয়ারের বন্ধুত্ব গড়ে ওঠা সম্পর্কে কম-বেশি জানে, কিন্তু তারা আসলে পাত্তাই দেয় না, তারা কেউ কোনও আগ্রহ দেখাচ্ছে না। বিষয়টা কারও সঙ্গে একটু আলাপ করতে পারলে রেণুকার মন নির্ভার হতো। কিন্ত তার ভেতরে যা ঘটে চলছে―কার কাছে সে তা খুলে বলবে ?

রেণুকা মেয়ে হিসেবে অসামাজিক প্রকৃতির না হলেও সে সকলের সঙ্গে সহজে মিশতে পারে না। অনেক চেষ্টা করেও সে আজ অবদি কোনও মেয়ে বা ছেলের সঙ্গে বন্ধুত্ব গড়ে তুলতে পারেনি। এর কারণ বোধ করি―এভ্যারেজ বাঙালিদের তুলনায় তার ব্যাকগ্রাউন্ড একটু ভিন্ন রকমের বলে। ঢাকা শহরে জন্ম, ভিখারুন্নেসায় পড়াশোনা, একুশে ফেব্রুয়ারির রাতে সড়কে আল্পনা এঁকে বা বাংলা একাডেমির বইমেলায় ঘুরেফিরে বড় হলেও― নৃতাত্ত্বিক পরিচয়ে তাকে হান্ড্রেড পারসেন্ট বাঙালি বলা চলে না। তার বাবা সাব্বির আহমেদ নিজেকে বরিশালের ‘পিওর বাঙ্গাল’ বলে পরিচয় দিতে ভালোবাসেন, তবে মা বেহেনাজ সেকেজি ইরানের মারকাজি প্রদেশের ফারমাইন শহরের নারী। জন্মের পর মায়ের দেওয়া নাম রেহনাজ সেকেজির ঠিক মাঝখানে তার বাবা ‘আহমেদ’ জুড়ে দেন। স্কুলকলেজের খাতাপত্রে তার আসল নাম রেহনাজ আহমেদ সেকেজি হলেও সে বাবার দেওয়া রেণুকা ডাকনামে সর্বত্র পরিচিত। তার দেহে বাঙালি নারীর কমনীয়তার সঙ্গে মিশেছে পারস্য-দুহিতার উজ্জ্বল গাত্রবর্ণের গোলাপি আভা। রেণুকার চোখ দুটি ডাগর, তাতে আছে হাল্কা সবুজাভ রোশনাই। কথাবার্তায় নিখুঁত বাংলা বলে সে। কিন্তু ঘরে মায়ের সঙ্গে ফার্সিতে কথা বলে থাকে।

রেণুকার মতো তার মা বেহনাজ সেকেজিও বালিকা বয়সে ছবি আঁকতেন। তবে তাঁর স্বদেশ ইরানে আয়াতুল্লা রুহুল্লা খোমেনির নেতৃত্বে ইসলামি বিপ্লব হলে আঁকাজোকার ব্যাপারটা স্রেফ না-জায়েজ ঘোষিত হয়। কিশোরী বেহনাজ তারপরও ছবি আঁকার অভ্যাস বহাল রাখেন। যুক্ত হন মেয়েদের চিত্রাঙ্কন, বই পড়া ও কবিতা লেখার গোপন সমিতিতে। নারীদের নৈতিকতা রক্ষার দায়িত্বে নিযুক্ত রাষ্ট্রীয় পুলিশ তাদের মিলিত হওয়ার গোপন স্থানের সন্ধান পেয়ে ওখানে রেইড করে। আরও কয়েকটি উঠতি বয়সের মেয়েদের সঙ্গে বেহনাজ সেকেজিও গ্রেফতার হন। তাদের আঁকাজোকায় নারী দেহের আকৃতি স্পষ্ট হয়ে ফুটেছে, এবং তাদের রচিত কবিতায় প্রণয়ের উল্লেখ থাকার ফলে আদালতের হাকিম মেয়েদের কুমারীত্ব পরীক্ষার হুকুম দেন। এ ঘটনায় মানসিকভাবে অত্যন্ত আহত বোধ করেন বেহনাজ। মন থেকে অপমানকে মুছে ফেলতে পারেন না কিছুতেই। কারাগার থেকে খালাস পাওয়ার পর তিনি  মোল্লা-শাসিত ইরান থেকে বের হয়ে যাওয়ার উপায় খুঁজতে থাকেন। বছর দেড়েক পর অতঃপর বেহনাজ বিয়ে করেন রেণুকার বাবা সাব্বির আহমেদকে।

বাঙ্গালী পুরুষ জনাব সাব্বির ফারমাইনের একটি ওয়েল রিফাইনারিতে ফোরম্যানের পদে কাজ করছিলেন। শহর হিসেবে ফারমাইন খুবই ছোট্ট জায়গা। সাব্বির সাহেব সেকেজি পরিবারের বাসায় একটি কামরা সাবলেট নিয়ে বাস করতেন। বেহনাজের দৈহিক সৌন্দর্যে তিনি মুগ্ধ হন। বেহনাজের পরিবারও চাচ্ছিল মেয়ে যেন দেশের বাইরে―সম্ভব হলে ইউরোপ বা আমেরিকার সামাজিকভাবে উদার আবহে বাস করে। তো সাব্বির বাংলাদেশে ফিরে বেহনাজকে নিয়ে অতঃপর আমেরিকায় ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে যাবেন ওয়াদা করলে, বেহনাজের মা-বাবা উৎসাহের সঙ্গে তাঁদের নিকাহের বন্দোবস্ত করেন।

ঢাকায় ফেরার পর কিছু ঘটনা দ্রুত ঘটে। মেয়ে রেহনাজ বা রেণুকার জন্মের সময় প্রচুর রক্তপাতের কমপ্লিকেশনে বেহনাজ মারাত্মকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েন। আমেরিকার একাধিক বিশ^বিদ্যালয়ে ভর্তি হতে সমর্থ হলেও যথাযথ স্পন্সরশিপের অভাবে সাব্বির সাহেবের ভিসার আবেদন য়ুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাসে ডিনাই হয়। দেশেও তাঁর কোনও চাকুরি-বাকরি জোটে না। উল্টা তিনি বন্ধুবান্ধদের পাল্লায় পড়ে ড্রিংক করতে শুরু করেন।

রেণুকার বয়স যখন পাঁচ, সাব্বির সাহেবের আর্থিক হালত করুণ হয়ে পড়ে। তিনি চিন্তাভাবনা না করে সাউথ সুদানে চাকরি নিয়ে চলে যান বছর চারেকের জন্য। এ সময় ছোট্ট মেয়েটিকে নিয়ে বেহনাজ বাস করেন তাঁর শ^শুরশাশুড়ির সংসারে। নানা কারণে রেণুকার বাবার পরিবারের সঙ্গে মা বেহনাজের বনিবনা হয় না। সাউথ সুদানে গৃহযুদ্ধের সূত্রপাত হলে সাব্বির সাহেব ফিরে আসেন দেশে। ততদিনে বেহনাজের সঙ্গে বেড়েছে তার মনের দূরত্ব। ঢাকায় তাঁর কর্মসংস্থান দুরূহ হয়ে উঠেছে। বছর তিনেক বেকার থেকে অতঃপর চাকুরি নিয়ে তিনি চলে যান চট্টগ্রামে।

ওখানেই আছেন সাব্বির সাহেব আজ অবধি। তাঁর ড্রিংকিংয়ের মাত্রা বেড়েছে। চট্টগ্রামের এক নারীর প্রতিও আসক্ত হয়েছেন। ঢাকায় মা-মেয়ের খোঁজ নিতে আসেন বছরে দুই বার। রেণুকার কলেজের খরচটা অনিয়মিতভাবে দেন। পরিবারের খরচ পুরো না হলেও খানিকটা জোগান। কিন্তু সংসারের অন্য কিছুতে আর লিপ্ত হন না একেবারে।

মেয়েকে আর্ট কলেজে পাঠিয়েছেন, কিন্তু রেণুকার মা নিজে আর আঁকেন না। তিনি  মেয়েদের পোশাকের একটি ফ্যাশোনেব্ল্ বুটিকের জন্য ঘরে বসে এম্ব্রডারির কাজ করে দেন। তাতে কিছু উপার্জন হয় বটে, কিন্তু অনটন সম্পূর্ণ ঘোচে না। প্রতিবেশী মধ্যবিত্ত বাঙ্গালি পরিবারদের মতো সচ্ছলতা তাদের পরিবারে নেই, বিষয়টি রেণুকাকে পীড়া দেয়। তাই সে চেষ্টা করে কিছু ছবি বিক্রি করতে। আঁকাজোকার সঙ্গে সঙ্গে যৎসামান্য উপার্জনের ধান্দা সে মাথা থেকে সরাতে পারে না। আর উপার্জনের ফিকির করতে গিয়ে সে শিকার হয় কখনও নানাবিধ অমর্যাদাকর কটুকাটব্যের।  মেয়ে হিসেবে তার কোন বন্ধু নেই, বাবার পরিবারের আত্মীয় স্বজনদের সঙ্গে তার যোগাযোগ খুবই কম, নিজের অহেতুক নিগ্রহের বিষয়টি কাউকে বলতে পারে না সে, তাই, তার মন হামেশা ভারাক্রান্ত হয়ে থাকে।

চা-বাগানে আঁকাজোকার এক্সকারশনে এসে রেণুকার একটি বন্ধু জোটে। এতে মনে হয়েছিল―তার মনে জমে আছে যত বলা কথা, তা তার সঙ্গে শেয়ার করা যায়। ছেলেটির নাম শাহরিয়ার। সম্পর্কে বাগানের প্রয়াত মালিক কমিশনার সাহেবের নাতি সে। আজ সকালে বাগান ছেড়ে আসার সময় রেণুকা তাকে গুডবাই বলার জন্য খুব আগ্রহ নিয়ে সাজগোঁজ করে। কিন্তু মোটরবাইক হাঁকিয়ে শাহরিয়ার না আসাতে তার উদ্বেগ হচ্ছিল। ভাবছিল, খোঁজ নিতে হেঁটে চলে যাবে তার ম্যানেজারের বাংলোতে। ঠিক তখনই খবর আসে। বাগানের কেরানি-বাবু এসে জানান যে―শেষরাতে শাহরিয়ার মারাত্মকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়ে। তার নাক দিয়ে রক্তক্ষরণ হচ্ছিল। ভোরে অজ্ঞানাবস্থায় তাকে বাগানের জিপ দিয়ে পাঠানো হয়েছে সিলেট শহরের হাসপাতালে। কথা ছিল, বাগানের একমাত্র জিপ দুই কিস্তিতে আর্ট কলেজের সবাইকে রেলওয়ে স্টেশনে পৌঁছে দেবে। কিন্তু তা আনএভাইলেবোল হলে, তাদের সবাইকে ট্রাকটারের ট্রেইলারে চড়ে আসতে হয় স্টেশনে।

রেণুকা কৃষ্ণচূড়ার ছায়ায় পায়চারি করতে করতে শাহরিয়ারের অসুস্থতা নিয়ে ভাবতে চায়। কিন্তু কেন জানি―তার নিজের পরিবারের, বিশেষ করে মায়ের কথা ফিরে ফিরে আসে মনে। এ বিষয়টা স্পষ্ট যে―বাবা আকৃষ্ট হয়েছিলেন মায়ের দৈহিক সৌন্দর্যে, কিন্তু তাঁর অন্তস্তলে প্রকৃত ভালোবাসা ছিল না। মা বেহনাজও কী ভালোবেসেছিলেন সাব্বির সাহেবকে ? তিনি হয়তো তাঁকে হিল্লা ধরে চেষ্টা করছিলেন ইরানের ঘোরতর মোল্লাতান্ত্রিক আবহ থেকে বেরিয়ে আসতে। এ ধরনের ভালোবাসাহীন সম্পর্কে সে কোন পুরুষের সঙ্গে জড়াতে চায় না। শাহরিয়ারের সঙ্গে গেল এক সপ্তাহে গড়ে ওঠা গাঢ় বন্ধুত্বে সে অনুভব করে ছিল বিরল এক ভালোবাসাময় সম্পর্কের সম্ভাবনা। হঠাৎ করে আজ তার অসুস্থতার সংবাদে মনে হচ্ছে, তার মন-পবনের নাওটি আটকে গেছে বালুচরে।

আর্ট কলেজের শিক্ষকদের সঙ্গে জানাশোনার সুবাদে শাহরিয়ার এক্সকারশনের দলটিকে ধুরইলছড়া চা-বাগানে এক সপ্তাহ কাটিয়ে যাওয়ার আমন্ত্রণ জানায়। বাগানের গুদাম-বাবু বা স্টোর ক্লার্ক ছুটিতে আছেন, তার খালি বাসায় তাদের থাকার ব্যবস্থা হয়। শাহরিয়ার মোটরবাইক হাঁকিয়ে ছোটাছুটি করে সবাইকে চা-বাগানের নানা লোকেশনে দাঁড়িয়ে ছবি আঁকার বন্দোবস্ত করে দেয়। জলের ঝিরিঝিরি একটি ঝোরার পাশে দাঁড়িয়ে রেণুকা স্কেচ করছিল। মোটরবাইক খানিকটা দূরে দাড় করিয়ে শাহরিয়ার হেঁটে আসে তার কাছে।

স্টোন ওয়াশড্ জিন্সের সঙ্গে ধবধবে সাদা গাল্ফ শার্ট পরা তরুণটিকে কেন জানি শরীরিকভাবে আঘাত পেয়ে খেলা ছেড়ে দেয়া ক্রিকেটারের মতো বিষণ্ন দেখায়। রেণুকার কাছে এসে সে তার আঁকাজোকা সম্পর্কে আগ্রহ নিয়ে খোঁজখবর নেয়। দু-তিন দিনের না কামানো দাড়িতে ছেলেটির চেহারায় এসেছে চিন্তামগ্ন ভাব। কীভাবে যেন সে বুঝতে পারে লোকেশনটি রেণুকার ঠিক পছন্দ হয়নি। তাই সাবলীলভাবে প্রস্তাব করে,‘ আই সি সামথিং ইজ নট ওয়ার্কিং ফর ইউ হিয়ার, তোমাকে কী অন্য একটা লোকেশনে নিয়ে যেতে পারি ?’

লাজুকভাবে হেসে রেণুকা জবাব দেয়,‘দিস লকেশন হ্যাজ ইটস্ অউন বিউটি উইথ দিস গার্গলিং স্ট্রিম। কিন্তু আমি ল্যান্ডস্কেপে শুধু নিসর্গকে ফোটাতে চাই না, প্রকৃতির সঙ্গে একটু ঘরবাড়িও আঁকতে চাই।’ শুনে শাহরিয়ার তাকে আহ্বান করে বলে, ‘কাম উইথ মি রেহনাজ, তোমাকে হাঁটতে হবে একটু। অন্য একটা লোকেশনে নিয়ে যাই। আই গেস, ইউ উড লাইক আপ দেওয়ার।’ হাঁটতে হাঁটতে তাদের মাঝে যৎসামান্য কথাবার্তা হয়।

রেণুকা জানতে পারে, শাহরিয়ার এক সময় ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ে ইংরিজি বিভাগের ছাত্র ছিল। কবিতা সে ভালোবাসে। ‘বর্ণনা’ নামে একটি লিটল ম্যাগাজিনের সম্পাদক ছিল সে। চিত্রকলার প্রতিও আছে তার সহজাত আকর্ষণ। কাগজটিতে সে নিয়মিত চিত্রবিষয়ক আর্টিকেল ছাপতো। এস এম সুলতানের চিত্রপটে নরনারী এবং শামীম শিকদারের ভাস্কর্য নিয়ে তার লেখা নিবন্ধ পত্রিকায় মুদ্রিত হয়। আর্ট কলেজের একজন শিক্ষকের সাথে তার ঘনিষ্ঠতা হয় অনেক বছর আগে অনুষ্ঠিত হওয়া তাঁর চিত্রকর্মের প্রদর্শনীকে কেন্দ্র করে। শাহরিয়ার এ শিক্ষকের প্রদর্শনীর একটি রিভিউ পত্রিকায় লিখেছিলো। স্বাস্থ্যগত সমস্যার জন্য সে আর পড়াশুনা করেনি। আবহাওয়া দূষণের কারণে তার এলার্জি হচ্ছিল, হামেশা ভুগছিল শ^াসকষ্টে। তাই, মহানগর ছেড়ে অনেক দূরে, পাহাড়ের পাদদেশে, একান্নবর্তী পরিবারের চা-বাগানে সে ম্যানেজার হিসাবে কাজ করছে।

কথা বলতে বলতে তারা উঠে আসে টিলার  বেশ উঁচুতে। ওখান থেকে দেখা যাচ্ছে, দিগন্তে গাছপালার মাথায় মেঘভাসা পাহাড়ের সারি। টিলার নিচে খানিক দূরে একটি ঝিল। তার পাড়ে বস্তির মানুষজনের ছন ও বাঁশ-বেতের ঘরবাড়ি। পুরনো চাপালিশ গাছের ছায়ায় কাটা-বাঁশে তৈরি একটি বেঞ্চ। শাহরিয়ার তা দেখিয়ে রেণুকাকে বলে,‘দিস ইজ মাই মডেস্ট লুক-আউট। চা-বাগানের দিনযাপনে একাকিত্ব প্রখর হয়ে উঠলে, আমি এ বেঞ্চটিতে বসে তাকিয়ে থাকি তাল-জারুল ও শিরিষের ছায়াময় দিগন্তের দিকে।’ হেঁটে এসে খানিক ক্লান্ত হয়েছে, তো তারা বসে পড়ে ওখানে। রেণুকা স্কেচখাতায় আঁকাবুকি করতে করতে শাহরিয়ারকে একটি-দুটি প্রশ্ন করে। তার কৌতূহল যেন মিটতে চায় না। শাহরিয়ারেরও ফিরে যাওয়ার কোন তাড়া নেই। তাদের মাঝে জমে ওঠে রীতিমতো গল্প।

 লোকেশনটি রেণুকার খুব ভালো লাগে। তবে ওই দিন আঁকাজোকা তেমন একটা হয় না। ঘন্টা দুয়েক পর শাহরিয়ারের সঙ্গে হেঁটে সে ফিরে আসে গুদাম-বাবুর বাসায়। শাহরিয়ার বিদায় নিতেই রেণুকার মনে হয়, তার মধ্যে এসে যাচ্ছে ছবি আঁকার অজস্র আইডিয়া। ভালো লাগার তীব্র অনুভূতি নিয়ে বারান্দায় একটি চেয়ারে সে একাকী বসে। মার কাছ থেকে শুনে শুনে শেখা একটি ফার্সি গানের কলি গুঞ্জরিত হয়ে ওঠে―‘আগার তু রা জোইয়াম/ হাদিসে দিল গোইয়াম’ বা ‘যদি তোমাকে খুঁজে পাই খুলে বলা হৃদয়ের কথা’। তার সহপাঠী ছেলেমেয়েরা এখনও নানা লোকেশনে ছবি আঁকছে। গুদাম-বাবুর বাসায় লাঞ্চ করতে কেউ ফিরে আসেনি। পরিবেশের নির্জনতা উপভোগ করতে করতে, সে শাহরিয়ারের জীবনের সঙ্গে তার দিনযাপনের এক ধরনের মিলের কথা ভেবে অবাক হয়!

শাহরিয়ার মানুষ হিসেবে আপাদমস্তক বাঙালি হলেও তার মা নেপালের মহিলা। সেও তার মায়ের সঙ্গে ঘরে নেপালি ভাষায় কথা বলে। শাহরিয়ারের প্রয়াত পিতা ভালোবাসতেন বনে-জঙ্গলে ঘুরে বেড়ানো ও শিকার। অনেক বছর আগে তিনি নেপালের তরাই অঞ্চলে যান শিকার করতে। তখন ভূমিধসে শহরের হোটেলে ফেরার সড়ক বন্ধ হয়ে গেলে, তাঁকে জঙ্গল-গাইডের বাড়িতে কাটাতে হয় দিন চারেক। তখন পরিচয় হয় নেপালি-দুহিতা সুষমা বালার সঙ্গে। তাঁকে নিয়ে নানা ঝঞ্ঝাটের ভেতর ইলোপ করে, কলকাতায় ফিরে তিনি অবশেষে বিয়ে করেন সুষমা বালাকে। শাহরিয়ারের একান্নবর্তী পরিবারের সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর অসিলায় সুষমা বালা কলেমা পড়ে গ্রহণ করেন ইসলাম ধর্ম।

আজ চাপালিশ গাছের ছায়ায় বেঞ্চে বসে গল্প করতে করতে এক পর্যায়ে শাহরিয়ার জানায় যে, মাঝেমধ্যে তার খুব মন খারাপ হয়, বিষণ্নতা তীব্র হয়ে উঠলে, বাগানের বাংলোতে একা বসে বসে বই পড়তে বা ক্যাসেট রেকর্ডারে গান শোনা কিছুই ভালো লাগে না। তখন সে তার দাদা প্রয়াত কমিশনার সাহেবের ওয়াকিং স্টিকটি হাতে নিয়ে একা হেঁটে এসে ওঠে এই টিলার ওপর। তারপর বেঞ্চটিতে বসে চুপচাপ তাকিয়ে থাকে, গোধূলির মুছে যাওয়া আলোর দিকে। সন্ধ্যার পর রূপকথার রকমারি চরিত্রের মতো ফুটে ওঠা নক্ষত্রে তৈরি হয় রাশিমণ্ডলের নকশা। তার বাংলোতে ফিরে যেতে ইচ্ছা হয় না। সে নিবিড় রাতে চুপচাপ বসে ঝিল্লির কান ঝালাপালা করা ধ্বনি শুনতে শুনতে ধূমপান করে। শাহরিয়ারের কথায় এমন কিছু ইমোশন ছিল―যা বেনোজলের মতো; এবং নদীর বহতা প্লাবন যে রকম কাশবনকে জলমগ্ন করে দেয়, সে রকম তার জীবনের গল্প রেণুকাকে ভাসিয়ে নেয় মারাত্মকভাবে।

সে আগ বাড়িয়ে মাত্র পরিচয় হওয়া তরুণটির হাত স্পর্শ করে বলে, ‘জাস্ট টেল মি ট্রুথফুলি, এখানে রাতের বেলা একা বসে কার কথা তোমার সবচেয়ে বেশি মনে পড়ে ?’ কোনও চিন্তা-ভাবনা না করেই শাহরিয়ার জবাব দেয়,‘ইটস্ মাই মাদার, পুওর নেপালি ওয়োম্যান সুষমা বালা। আমার বাবা তাঁকে ভালোবেসে বিয়ে করেছিলেন, কিন্তু অভিজাত বংশজাত তাঁর একান্নবর্তী পরিবার কখনও তাঁকে পুত্রবধূ হিসেবে স্বীকার করে নেয়নি। আমার চাচিরা আড়ালে আবডালে তাঁকে তাচ্ছিল্য করে নেপালি আয়া সম্বোধন করে। বাবার হঠাৎ করে হার্ট অ্যাটাকে মৃত্যুর পর এ গঞ্জনার মাত্রা আরও বেড়ে যায়।’ 

এ তথ্যের প্রতিক্রিয়ায় তার ফার্সি ভাষাভাষি মায়ের কষ্টের কথা শাহরিয়ারকে বলতে রেণুকার কোন দ্বিধা থাকে না। তার বাবার পরিবার তার মাকে শিয়া মাজহাবের প্রতির আনুগত্যের জন্য গঞ্জনা দেয় হামেশা। তার বাবা যখন সাউথ সুদানে কাজ করছিলেন, তখন মহরমের সময় মা বেহনাজ তাকে নিয়ে গিয়েছিলেন ঢাকার হোসেনি দালানে আশুরা উদযাপন করতে। রেণুকার দাদা তার মা-কে রূঢ়ভাবে বলেছিলেন,আশুরার মিছিল দেখতে যাওয়া শিরিকির নামান্তর। তার নাতনিকে যদি এ ধরনের কুফুরি মাজহাবের শিক্ষা দেয়া হয়, তাহলে তাকে তিনি বেহনাজের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন করে বিহিত ব্যবস্থা নেবেন। পরের বছর মহরমের সময় বেহনাজ হোসেনি দালানে যাননি, তবে রঙিন কাগজ দিয়ে একটি তাজিয়া তৈরি করে তা তাজিমের সঙ্গে তাঁর কামরায় রেখেছিলেন ছোট্ট একটি ফরাশের ওপর। রেণুকার বড়-ফুফু তা তুলে নিয়ে ছিড়ে ফেলতে ফেলতে, তাজিয়া তৈরির মতো বেদাতি কাজ করার জন্য তার মা-কে ‘শিয়া বেটির কোনও কাণ্ডজ্ঞান নেই’ বলে গঞ্জনা দিয়েছিলেন।

রেণুকা তার বাবার পরিবারের ধর্মীয় বিশ^াস সুন্ন মাজহাবের প্রতি অনুগত। তবে সে মায়ের না-হক গঞ্জনাকে মেনে নিতে পারে না। এ বিষয়টা শাহরিয়ারকে অকপটে বলতে গিয়ে তার সবুজাভ আভা ছড়ানো চোখ আর্দ্র হয়ে ওঠে। কুঁকড়ানো চুলের গুচ্ছ কপালে নেমে এসে নতমুখি রেণুকার দৃষ্টি আড়াল করে দিলে―শাহরিয়ার তা সরিয়ে দিয়ে তাকায় তার মুখে দিকে।

ওই দিন তাদের কথাবার্তা আর বিশেষ আগায় না। তবে চোখের নীরব দৃষ্টিপাতে অন্তরঙ্গতা বাড়ে ব্যাপকভাবে। গুদাম-বাবুর বাসায় পথ দেখিয়ে নিয়ে এসে শাহরিয়ার বিদায় নিলে, রেণুকা বারান্দায় একাকী বসে শুনে দুপুরের নির্জনতায় চিড় ধরিয়ে দেয়া পিউ কাঁহা পাখির ডাক। আঁকাজোকা সেরে স্বপ্না, রওশন ও আর্ট কলেজের আরও দুটি ছেলে ফিরে আসলে তার খেয়াল হয় যে, সে স্কেচ-প্যাড জুড়ে এঁকেছে শাহরিয়ারের মুখ, তরুণটির চোখের অভিব্যক্তিতে―যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও টিমে খেলার সুযোগ না পাওয়া স্পোর্টসম্যানের ডিসএপোয়েন্টেড হওয়ার  ম্লান ছায়া। সে দ্রুত স্কেচখাতা বন্ধ করে ‘হ্যালো এভরিবডি’ বলে ফিরে আসা সতীর্থদের সম্ভাষণ জানায়।

পরদিন তাদের আবার দেখা হয়। রেণুকা অন্য একটি টিলার উপর দাঁড়িয়ে দেখছিল, উপত্যকার ঢালে সমান করে ছাটা চায়ের ঝোপে চা-শ্রমিক নারীদের কুঁড়ি তোলার দৃশ্য। খাকি শর্টস এর সঙ্গে ধবধবে সাদা টিসার্ট ও বেইসবল হ্যাট পরা শাহরিয়ার পাতা তোলা পরিদর্শন করতে আসলে তাকে স্পট করে রেণুকা হাত নাড়ে। একটু পর টিলার উপর উঠে আসে সে। তারা কোন কথা না বলে হেঁটে যায় টিলার অন্য দিকে। শ্রমিক-মেয়েদের দৃষ্টির আড়ালে চলে যাওয়ার পর সুদর্শন নীলচে বেগুনি ফুলে ভরা একটি গাছের নিচে দাঁড়িয়ে শাহরিয়ার বলে,‘ দ্যা নেম অব দিস ট্রি ইজ দেবকাঞ্চন। সারা বাগানের মাঝে এটা আমার সবচেয়ে প্রিয় গাছ। লুক অ্যট দিস ট্রি,   দেবকাঞ্চনে কীরকম ঝেঁপে ফুল ফুটেছে, আমরা যদি লাকি হই, তবে আজ তোমাকে জোড়া বি-ইটার পাখি দেখাব।’

রেণুকা ফুলের সুঘ্রাণ নিতে গেলে, তার চোখের সামনে উড়ে আসে আলো ঝলসানো সবুজ ছায়া। পাখি দুটির সুঁচালো ঠোঁটের দিকে তাকিয়ে সে এক্সাইটমেন্টে,‘ও ডিয়ার, দে আর সো কালারফুল’ বলে মুঠো করে ধরে শাহরিয়ারের হাত। উড়ে উড়ে রঙের সবুজাভ মায়া ছড়ানো বি-ইটার দুটি যেন ছোবল মেরে মেরে ঠোঁটে তুলে নিচ্ছে গুঞ্জনরত মৌমাছিদের। এ দৃশ্যে আনমনা হয় রেণুকা। কিন্তু তার দিকে তীব্র মনযোগ দিয়ে তাকিয়ে শাহরিয়ার চুমো খায় তাকে। গণ্ডদেশ থেকে পুরুষালি ঠোঁটের বাষ্প মুছতে মুছতে, খানিক লাজরক্তিম হয়ে ওঠা রেণুকা নাটকীয়ভাবে শাহরিয়ারের দীর্ঘ চুল ঝাপটে ধরে, মাথা টেনে এনে ঠোঁটে ঠোঁট রাখে।

অতঃপর তারা দেবকাঞ্চন গাছের কাছেই, অন্য একটি শেডট্রির ছায়ায় বড়সড় শিলাপাথরের বিশাল বোল্ডারে বসে পড়ে। একটু চিন্তা করে শাহরিয়ার বলে,‘রেণুকা, লেটস্ নট টক এবাউট এনিথিং স্যাড টুডে?’ ম্লান হেসে সে জবাব দেয়,‘ ও- কে, বাট আই অ্যাম ইন্টারেস্টেড আবাউট ইয়োর মাদার’স ল্যাঙ্গুয়েজ। নেপালী ভাষাটি শুনতে কি রকম লাগে―আমার কোনও ধারণা নেই। সো, কুড ইউ টেল মি সামথিং নাইস ইন নেপালি ?’ শাহরিয়ার জবাব দেয়,‘ইউ হ্যাভ টু লিসেন কেয়ারফুলি, মা তিমি লেই মায়া গারছু।’ রেণুকা উচ্চারিত নেপালি বাক্যটির অর্থ জানতে চায়,‘সাউন্ডস্ ইন্টারেস্টিং, হোয়াট ডাজ ইট মিনস্ শাহরিয়ার ?’ সে হেসে জবাব দেয়,‘ দিস ইজ দ্যা ওয়ে ওয়ান সেজ আই লাভ ইউ ইন নেপালি।’

এপ্রোচের প্রত্যক্ষতায় আড়ষ্ট হয় না রেণুকা। সে কৌতুক-ভরা কন্ঠে জবাব দেয়,‘ নাউ ইটস্ মাই টার্ন, আমি আমার মায়ের ভাষা ফর্সিতে বলছি, নাসকান দিলামো, এর অর্থ হচ্ছে, ডোন্ট ব্রেক মাই হার্ট।’ শাহরিয়ার তার হাত নিজের মুঠোয় তুলে নিয়ে বলে,‘রেণুকা, আই প্রমিজ নট টু ডু দিস, ট্রাস্ট মি।’ গুদাম-বাবুর বাসায় পথ দেখিয়ে ফিরিয়ে আনার সময়, শাহরিয়ার ওয়াকিং স্টিকে ঝোপঝাড় সরিয়ে, লতানো ঘন জঙ্গলের ভেতরে পায়ে-চলা সংকীর্ণ ট্রেইল ধরে তাকে নিয়ে হাঁটে। আর নির্জনতার সুযোগে তারা শরীরিকভাবে অন্তরঙ্গ হয় একাধিক বার।

স্বপ্না ছুটে এসে চেঁচিয়ে বলে,‘রেণুকা, কী করছ, গাড়ি, এসে যাচ্ছে যে।’ ঝমঝমিয়ে প্ল্যাটফর্মের দিকে ছুটে আসা একটি  ট্রেনের আওয়াজ শোনা যায়। উঠতে হয় রেণুকাকে। ভারী ব্যাগটি টেনে কাঁধে তুলতে তুলতে শাহরিয়ারের স্বাস্থ্যসংক্রান্ত একটি ক্রিটিক্যাল তথ্য মনে মনে তর্পণ করে । তার পা আর সামনে বাড়ে না।

শাহরিয়ার তাকে মিথ্যা কোন প্রতিশ্রুতি দেয়নি। বরং সততার সঙ্গে পরিচয়ের চতুর্থ দিনে তার যে হঠাৎ করে ব্রেনস্ট্রোক হতে পারে, এ সম্ভাবনার কথা জানিয়ে সত্যিই অবাক করে দিয়েছে! বন্ধুত্ব করতে সে আগ্রহ দেখিয়েছে বটে, তবে কখনও যে সে বিয়ের পিড়িতে বসতে পারবে না, এ বিষয়টা পরিষ্কারভাবে খুলেই বলেছে। কারণ, হিসাবে মস্তিষ্কে টিউমারের বিষয়টি গোপান করেনি। বোম্বের একটি হাসপাতালে সফল অস্ত্রোপচার হলেও, ডাক্তাররা তার দীর্ঘ জীবনের নিশ্চয়তা দিতে পারেনি। কারও সঙ্গে বিয়েশাদির মাধ্যমে জোড় বাঁধার ব্যাপারেও তারা তাকে সতর্ক করে দিয়েছেন। টিউমারের ফিরে আসার সম্ভাবনা প্রচুর। ক্রমাগত মাথা ধরা এবং নাক দিয়ে রক্তপাত―ধরনের আলামত দেখা দিলে, সে যেন তৎক্ষণাৎ হাসপাতালের আশ্রয় নেয়।

স্বপ্না ছুটে এসে রেণুকার কাঁধে হাত রেখে বলে,‘ রেণুকা, তুমি ট্রেন মিস করবে তো, তাড়াতাড়ি করো, চল।’ অনিচ্ছায় ব্যাগটি কাঁধে রেণুকা পা বাড়ায়। ট্রেনের দিকে যেতে যেতে কেবলই মনে হয়, বরাত জোরে তার সমমনা একটি দোসর জুটেছিল, কিন্তু অদৃষ্টের অকারণ ফ্যারে তা হয়ত হারাবে সে। গার্ড হুইসেল বাজিয়ে সবুজ পতাকা দোলায়। ট্রেনের সিঁড়িতে পা দিয়ে মনে হয়, হৃদয়টি বনতলী একটি ছোট্ট চা-বাগানে ফেলে রেখে, রেণুকা আজ ফিরে যাচ্ছে ঢাকা নগরীতে।

সচিত্রকরণ : রাজীব দত্ত

Leave a Reply

Your email address will not be published.

shares