গল্প : মায়া মরীচিকা : জয়দীপ দে

জানুয়ারি ১৯৫০, ঢাকা।

রাতে বালিশে মাথা দিলেই রাজ্যের চিন্তা এসে ভর করে। বাড়ির কথা মনে পড়ে। বৃদ্ধ আব্বা-আম্মা। নীরবে সব মেনে নেয়া রেণু। ছোট্ট টুনটুনি পাখি হাছিনা…ছোট্ট কামাল…

এতটুকু ভাবতেই দীর্ঘশ^াস আসে। আর চিন্তা অগ্রসর হয় না। নিজেকে অপরাধী লাগে। ঊনত্রিশ বছর বয়সেও বাবার টাকায় চলতে হয়। বাড়ি গেলে রেণুর জমানো টাকাগুলো নিয়ে ফিরতে হয় ঢাকায়। একটা সুস্থির স্বাভাবিক জীবন তো তার হওয়ার কথা ছিল। স্বপ্নের পাকিস্তান হয়েছে। শোষণমুক্ত ন্যায্যতার ভিত্তিতে একটা সমাজ হবে। কিন্তু এত ব্রিটিশের চেয়েও খারাপ। মানুষের খাদ্য নেই। কথা বলার স্বাধীনতা নেই। বিরোধী শক্তিকে দমনে সহিংস হয়ে উঠেছে লিয়াকত আলি। কায়েদে আজম নেই। তাকে দমাবারও কেউ নেই। নামকাওয়াস্তে মাথার ওপর বসে আছেন গভর্নর জেনারেল খাজা নাজিমুদ্দিন। যে কর্মীরা পাকিস্তান আন্দোলনের জন্য রাতদিন খেটেছে তারা কারাগারে। যে সোহরাওয়ার্দী সাহেবের নেতৃত্বে বাংলায় মুসলিম লীগের জয়, সেই সোহরাওয়ার্দী সাহেবের দুই বাংলায় ঢোকা নিষেধ। কিছুদিন আগে মুজিব লাহোর থেকে ঘুরে এসেছে। দেখেছে কী কঠিন সংকটের মধ্য দিয়ে দিন কাটাচ্ছেন কলকাতা বারের তেজস্বী ব্যারিস্টারটি। লাহোর-করাচি হাইকোর্টে তাঁর প্রবেশাধিকার মিলেনি। মন্টোগোমারি জজ কোর্টে কাজ নিয়েছেন। তাও হয়তো পেতেন না। পেয়েছেন মামদুতের নবাব ইফতেখার হুসাইন মামদুতের কল্যাণে। কিছুদিন আগেও তিনি পাঞ্জাবের প্রিমিয়ার ছিলেন। গত জানুয়ারিতে দুর্নীতির দায়ে তাঁকে সরিয়ে দেয়া হয়েছে। তাঁর হয়ে মামলা লড়ছেন সোহরাওয়ার্দী সাহেব। মুজিব একমাস লাহোর ছিল। দেখে এসেছে সবকিছু। ফিরেই গ্রেপ্তার হলো।

পাকিস্তান হওয়ার পর এই নিয়ে তিনবার জেলে আসতে হলো। বন্দিদের একটা বড় অংশ নিরাপত্তা আইনে আটক। এদের বেশির ভাগই কমিউনিস্ট পার্টির। তারা জানে না তাদের ভবিষ্যৎ কী। নতুন রাষ্ট্র তাদের জন্য কী ভেবে রেখেছে। তারা রণদিভ পলিসিতে মজে আছে। কথায় কথায় সেøাগান তোলে : এ আজাদি ঝুটা হ্যায়, লাখ ইনসান ভুখা হ্যায়। যেখানেই পারো প্রতিরোধ গড়ো। প্রতিরোধেই মুক্তি। তারা অবশ্য ছাত্রদের আন্দোলন নিয়ে খুব একটা আশাবাদী নয়। পুরো সিস্টেম চেঞ্জ করতে না পারলে ছোটখাটো প্রতিরোধে কোনো কাজ হবে না। এ লক্ষ্য নিয়ে মার্চ মাস থেকে একের পর এক হাঙ্গার স্ট্রাইক করে যাচ্ছে তারা। এতে যে কোনো সুফল মিলেছে, তা নয়। ব্রিটিশ নিরাপত্তা আইনে আটকদের বিশেষ মর্যাদা ও সুযোগসুবিধা দেয়া হতো। সে অনুসারে নিরাপত্তা বন্দি হিসেবে খাট-লেপ-তোষকসহ দ্বিতীয় শ্রেণির বন্দির সকল প্রকার সুযোগসুবিধা পেত। অনশন শুরু হওয়ার পর খাটগুলো তাদের ওয়ার্ড থেকে বের করে নেয়া হয়। তৃতীয় শ্রেণির বন্দিদের মতো ‘থালা-বাটি-কম্বল এই হলো সম্বল’ এখন। মুজিব এপ্রিলে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের ফোর্থ ক্লাস স্টাফদের জন্য আন্দোলন করতে গিয়ে জেলে এসেছিল। তখন সে দেখেছে সেসব কাণ্ড। বছরের শেষ দিনে আবার তাকে জেলে আসতে হলো। মুজিব উঠেছে ৫ নম্বর ওয়ার্ডে। পাশের ওয়ার্ডে কুষ্টিয়ার শিবেন রায় কিছুদিন আগে অনশন করতে গিয়ে মারা গেছেন। অবশ্য তাদের সহবিপ্লবীদের বক্তব্য তাঁকে হত্যা করা হয়েছে। কিন্তু বন্দিরা বলছে জোর করে নাক দিয়ে পাইপ ঢুকিয়ে দুধ খাওয়ানোর জন্য চেপে ধরার সময় অতিরিক্ত চাপে দুর্বল শিবেনের ফুসফুস ফেটে যায়। অবশ্য জেল কর্তৃপক্ষের ভাষ্য ভিন্ন। তারা বলছে দুধের পাইপ ফুসফুসে ঢুকে যাওয়ায় শিবেন রায় মারা গেছেন। কমিউনিস্টরা যত সহিংস হয়ে উঠেছে রাষ্ট্রও তত রুদ্র রূপ নিয়েছে। কমিউনিস্টরা এখন দুর্বল হয়ে পড়েছে। বেশির ভাগ সদস্যের শরীর ভেঙে গেছে। কারও কারও হয়েছে কঠিন যক্ষ্মা। কারও নিয়মিত পেটের পীড়া।

ভাগ্যিস, মুজিবের ডিভিশন মিলেছে। গাদাগাদি করে বারোটা খাট একসঙ্গে রাখা। তাও শান্তি। এর ওপর জেল সুপারিনটেনডেন্ট আমির হোসেন সাহেব মুজিবকে বিশেষ সমীহ করেন। এসব ভাবতে ভাবতে যখন চোখ ভারী হয়ে আসে ঘুমে, তখনই জিকিরের আওয়াজে পাশ ফিরে তাকাতে হয়। হুট করে মাথায় এলো দুপুরে করা কমিটমেন্টের কথা।

তার পাশের খাটে শামসুল হক। আওয়ামী মুসলিম লীগের সেক্রেটারি হক, মুজিব জয়েন্ট সেক্রেটারি। গ্রেপ্তারের মাত্র দেড় মাস আগে বিয়ে হয়েছে হকের। বউ সুন্দরী ও বিদূষী। ইডেন কলেজের ইংরেজির লেকচারার। প্রেমের বিয়ে। হকের ব্যক্তিত্ব ও বুদ্ধিদীপ্ত কথায় মুগ্ধ হয়ে ঘনিষ্ঠ হয়েছিল আফিয়া খাতুন। সেপ্টেম্বরের ১৯ তারিখে ড. শহীদুল্লাহর নারিন্দার বাড়িতে বিয়ে হয়।

শামসুল হকের ধারণা তাকে আর পাকিস্তান সরকার মুক্তি দেবে না। এর আগে ৪৮-এর মার্চে একবার গ্রেপ্তার হয়েছিল। সেবার অবশ্য স্বেচ্ছায়। এবার নতুন স্ত্রীকে ফেলে সে জেলে আসতে চায়নি। আতঙ্ক থেকে ঘন ঘন অজু করে আর নামাজ পড়ে। রাত হলেই শুরু হয় জিকির। রাতভর চলে।

আজ দুপুরে খাবার পর হকের কাছে গিয়ে বসেছিল মুজিব, ‘এভাবে চলবে কেমন করে? রাতে ঘুমাতে না পারলে শরীরটা তো নষ্ট হয়ে যাবে।’ মুজিব বেশ আন্তরিকতা নিয়ে কথাটা বলল।

হক ক্ষেপে উঠল। দুহাত ছড়িয়ে বলতে লাগল, ‘আমার জিকির করতে হবে যা ইচ্ছা করো। সমস্যা হলে এখান থেকে অন্য কোথাও চলে যাও।’

মুজিব চুপ মেরে গেল। ধ্যানস্থের মতো কিছুক্ষণ ভাবল। তারপর সে জ¦লে উঠল, ‘ঠিকআছে, রাতে যখন আবার জিকির শুরু করবেন, তখন আপনার মাথায় আমি পানি ঢেলে দেব। যা হবার হবে।’

এবার শামসুল হক নরম হলো। গলা নামিয়ে মুজিবের আরও ঘনিষ্ঠ হয়ে বলল, ‘বুঝতে পারছ না, আমি সাধনা করছি, এর ফল শীঘ্রই পাবা।’

ইচ্ছে হচ্ছিল তড়াক করে উঠে গিয়ে বালতি ভর্তি পানি তার মাথায় ঢেলে দিতে। কিন্তু মায়া হলো। মানুষটা এমন ছিল না। ভয়ে আতঙ্কে এমন হয়ে গেছে। যেদিন কোর্টে তার স্ত্রী তার সঙ্গে দেখা করতে আসে, তাকে আর সামলানো যায় না। বড় নরম মন। বউয়ের প্রতি অন্ধ অনুরাগ। মুজিব একটা ছোট্ট বাগান করেছে। সেখানে এখন ফুল ফোটে। সেই ফুল দিয়ে তোড়া বানিয়ে মুজিব নিয়ে যায় আফিয়ার জন্য। ফুল পেলে সে খুব খুশি হয়। মুজিবের জন্য প্রায় বই নিয়ে আসে। এসব ভেবে আর পানি ঢালল না। ঘাড় ফিরিয়ে দেখে ভাসানী সাহেবও বিছানায় বসে আছেন। মাথা ঝুঁকিয়ে আপনমনে তসবিহ জপছেন।

‘হুজুর ঘুম আসে না?’

‘উপায় আছে?’

‘হুঁ।’

লোকটা আবার মাথা ঝুঁকিয়ে তসবিহ জপা শুরু করে। মুজিব নিঃশব্দে ভাসানী সাহেবকে দেখে। অল্প শিক্ষিত মানুষ; কিন্তু সাংঘাতিক স্মরণশক্তি আর উপস্থিত বুদ্ধি। সাংগঠনিক শক্তিও দুর্দান্ত। যে কোনো মানুষকে অল্পে আপন করে নিতে পারেন। সোহরাওয়ার্দী সাহেব মানুষ চিনতে ভুল করেন না। অন্তত লিডারশিপের ব্যাপারে। সোহরাওয়ার্দী সাহেব চাইছেন দুই পাকিস্তান মিলে এক রাজনৈতিক দল গড়তে। সে জন্য মিয়া ইফতেখারউদ্দিনকে নিয়ে ৪৮-এর মে-তে এসেছিলেন। তাঁদের সঙ্গে মানকি শরিফের পিরসাহেবও যুক্ত হবেন। কিন্তু পূর্ববাংলায় হাল ধরার লোক কই? কেউ মন্ত্রী কেউ অ্যাম্বাসেডর কেউ বা স্পিকার হয়ে বশ্যতা শিকার করে নিয়েছে খাজা নাজিমুদ্দিনের। আর যারা আছে তারা হাটে-মাঠে রাজনীতি করার মতো নয়। তাই তিনি বেছে নিলেন এই নিম্নবর্গ থেকে উঠে-আসা মানুষটিকে। যদিও তাঁর রাজনীতির উত্থান আসামে। সেখানে বিপুল জনপ্রিয়তা ছিল মুসলমানদের মধ্যে। বিশেষ করে লাইন প্রথার বিরুদ্ধে আন্দোলন করতে গিয়ে। হয়েছিলেন আসাম মুসলিম লীগের সভাপতি। ঢাকা এসে অল্পদিনেই তিনি জনপ্রিয় হয়ে উঠেছেন সকলের কাছে।

‘হুজুর।’

‘কিছু বলবা?’

‘হকসাহবের ব্যাপারে কী করা যায়?’

‘আমিও ভাবছি।’

‘লোকটা বউয়ের জন্য পাগল হয়ে যাচ্ছে।’

‘সব দোষ বউয়ের ওপর দেও কেন? এইখানে ফিলসফিরও একটা ব্যাপার আছে। ৪৮-এ হক বর্ধমান গেল। তখন আবুল হাশিম সাহেব নাকি তারে কিছু ব্যাপারে মোটিভেট করছেন। সেটার অ্যাকশনও হইতে পারে।’

‘সে তো তাঁর বৈপ্লবিক দৃষ্টিভঙ্গিতে ইসলাম বইটাতে তুলে ধরছেন। তাঁরা খেলাফতে রাব্বানি প্রতিষ্ঠা করতে চান।’

‘হুঁ। বিষয়টা খারাপ না। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে কতটা বাস্তবসংগত সেইটাও ভাবতে হবে। কল্পনার জগতে থাকলে হবে না মুজিব। অনেক ধাক্কা খাইয়া পাক্কা হইছি। কমিউনিস্টরাও আছে কল্পনার দুনিয়ায়।’

‘কথা খারাপ বলেন না হুজুর।’

‘পাগলা জিকির থামাইছে, যাও তুমিও ঘুমাও গিয়া। আল্লাহ সকল বান্দারে ভালো রাইখো।’

‘ঘুম আইব না হুজুর। আসামের গল্প বলেন।’

মানুষটা সুন্দর হেসে ওঠে, ‘সব মায়া মরীচিকা। তোমার লগে পাকিস্তানের জেলে বইয়া আসামের গল্প করমু জীবনেও ভাবি নাই। ভাবছিলাম পাকিস্তান হইলে তো আর দুঃখকষ্ট কিছু থাকব না। সুখ আর সুখ। সেই সুখের দুইন্যায় জেল থাকব কি না সেইটা অবশ্য ভাবি নাই মুজিব।’

তারপর দুজনেই হো হো হেসে ওঠে। তাদের হাসির দমকে ঘুমন্ত বন্দিরা সচকিত হয়ে ওঠে। কেউ কেউ মনে বলে, ‘সবগুলা একলগে পাগল অইছে।’

সচিত্রকরণ : রাজীব দত্ত

Leave a Reply

Your email address will not be published.

shares