লিটল ম্যাগ : লোকবৃত্ত : লোকসাহিত্য ও সংস্কৃতির ছোট কাগজ : মোজাম্মেল হক নিয়োগী

লোকসাহিত্য ও সংস্কৃতির একটি সমৃদ্ধ ছোট কাগজ লোকবৃত্ত, স্বপন নাথের সম্পাদনায় ও মোস্তাফিজ কারিগরের নান্দনিক প্রচ্ছদের মোড়কে বত্রিশজন লেখকের বিশ্লেষণমুখী লেখা নিয়ে ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে ৩৮২ পৃষ্ঠার প্রথম সংখ্যা আত্মপ্রকাশ করে। প্রতিটি প্রবন্ধই প্রবন্ধকারের যত্নের কাজ বলে প্রতীয়মান হয়, সম্পাদনার কাজেও দক্ষতার প্রমাণ পাওয়া যায়। অঞ্জন সেনের ছোট পরিসরের প্রথম প্রবন্ধ ‘১৯৪৭ উত্তর লোকসংস্কৃতি’, প্রবন্ধের শুরুতেই, মুহম্মদ সুফী রচিত দোকড়ি চৌধুরীর কণ্ঠের রাজশাহীর লোকসঙ্গীত গম্ভীরার উদ্ধৃতি দিয়ে শুরু হয়েছে। এই গানের মাধ্যমে স্বাধীনতাপরবর্তী সময়ে নিম্নশ্রেণির মানুষের অন্তর্দহনের আভাস পাওয়া যায়। প্রবন্ধটিতে শুধু গম্ভীরা গানের বিষয়আশয়ই অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি বরং রাঢ়ভূমির মানুষের দেশপ্রেম, প্রকৃতি, পরিবেশ ও জীবনাচারের উল্লেখ রয়েছে। বাংলার লোকসঙ্গীত ও লোকাচারে পশ্চিমা সঙ্গীতের অনুপ্রবেশ ও প্রভাবের ফলে, নাগরিক জীবনের আগ্রাসনে লোকসঙ্গীতের বিকাশ বিঘ্নিত হওয়ার দিকেও লেখক নির্মোহ আভাস দিয়েছেন। এই প্রবন্ধে ছৌ, গম্ভীরা ও রায়বেশ নৃত্যের উল্লেখ রয়েছে।

               আবদুল খালিক বিরচিত দ্বিতীয় প্রবন্ধে মূলত ফকির ইয়াছিন শাহ-র ভাবজগৎ তথা তাঁর শিল্পসত্তা ও কীর্তির উন্মোচন করা হয়েছে। তিনি বিভিন্ন গানের উদ্ধৃতি দিয়েছেন, যে গানে রয়েছে আধ্যাত্মিকতা, নৈতিক জীবনাচার, মাটি ও মানুষের প্রাণের কথার সঞ্চরণ। তাঁর গানে উপমা ও রূপকের ব্যবহার উল্লেখযোগ্য। আবুল ফতেহ ফাত্তাহ সিলেটের লোকপ্রবাদ নিয়ে সমৃদ্ধ প্রবন্ধ লিখেছেন। সিলেটের প্রবাদ ও লোকসঙ্গীত বাংলাদেশের লোকসঙ্গীত ও লোকসংস্কৃতিতে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য যা এই প্রবন্ধে প্রতিফলিত হয়েছে। ওয়াহিদ রোকনের প্রবন্ধে মহান ক্বারি আমির উদ্দিন বাউলের সঙ্গে পাঠকের পরিচয় ঘটে। তাঁর জীবন ও সঙ্গীত সম্পর্কে সাধারণ মানুষের খুব জানা পরিচয় নেই, তিনি লোকসংগীতের একজন কীর্তিমান পুরুষ। লেখকের ভাষায়, ‘আসলে মানবধর্মই হয়ে গেছে বাউলধর্ম। ক্বারি আমির উদ্দিনের একটি গানকে বিবেচনায় আনলে দেখতে পাই, তিনি মুসলিম ধর্মাবলম্বী গীতিকবি হয়েও বাউলতন্ত্রের বৈষ্ণব প্রতীকী আশ্রয়ে গিয়ে বন্ধুকে অনুনয় করেছেন।’ বাউল ধর্ম বা বাউল দর্শন নিয়ে এই সংখ্যায় তথ্যবহুল সমৃদ্ধ প্রবন্ধ ‘বাউল দর্শন, গান ও সাধনা’ শিরোনামে লিখেছেন কে এম রব্বানী। এই প্রবন্ধে বাউল দর্শনের শিকড়ের কথা উল্লেখ করে বাঁক বদলের ইঙ্গিত দিয়েছেন। লেখকের ভাষায়, ‘বৈষ্ণবগণের বিশ^াস শ্রীচৈতন্য মৃত্যুবরণ করেননি। ১৫৩৩ সালে তার “অন্তর্ধান” হয়েছে। এর প্রায় দুশ বছর পরে আউলচাঁদ (১৬৯৪-১৭৭০) নামে একজন সন্যাসীর আবির্ভাব হয়। তিনি বাইশ জনকে দর্শন ধারণা দেন। এদের বাইশ ফকির বলা হয়। তাঁদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন রামশরণ পাল এবং তার স্ত্রী সরস্বতী। তাঁর শিষ্যগণ মনে করতেন রাধা-কৃষ্ণের যুগলরূপ শ্রীচৈতন্য অন্তর্ধানের দুশ বছর পরে তিনি আবার ফিরে এসে তাঁর না বলা কথাগুলো নতুন শিষ্যদের বলে গেছেন। আউলচাঁদের অনেক শিথিল সুফিবাদী মুসলিম সুফি ফকির বা দরবেশ। এই বাইশ ফকিরের পারিভাষিক অনেক শব্দ এবং আচার ইসলামি পরিভাষার শব্দ এবং আচার হতে নেওয়া হয়েছে।’

               গৌতম চন্দ্র দাশ দীর্ঘ প্রবন্ধ লিখেছেন হবিগঞ্জ জেলার বানিয়াচং উপজেলার কাঁঠালিয়া গ্রামে ঊনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ের লোককবি রামজয় দাসের জীবন ও কর্ম নিয়ে। ১৫ বছর বয়সে পিতৃহারা লোককবি রামজয় দাস অতি দরিদ্র পরিবারের মানুষ। ভাবাদর্শগত দিক থেকে তিনি বৈষ্ণব অনুসারী ছিলেন এবং নিজেই গান রচনা করে নিজে গাইতেন। তাঁর গানেও রয়েছে আধ্যাত্মিকতা, শ্রীচৈতন্য, কৃষ্ণ ও রাধার প্রভাব। রামচন্দ্র দাসের গান প্রার্থনাসঙ্গীত হিসেবেও সিলেট এলাকায় গীত হতো। কোনও কবির জন্য এই প্রাপ্তি দুর্লভ বললেও কম বলা হয়। লেখকের ভাষায়, ‘রামজয় দাসের রচনার মধ্যে শ্রীকৃষ্ণের জন্ম, বাল্যলীলা, গোষ্ঠযাত্রা, সুবল মিলন, ফিরাগোষ্ঠ প্রভৃতি গানগুলো বহুল প্রচারিত। মাঘ মাসের প্রতি রবিবারে এলাকার সূর্যব্রত বা ঠাকুরব্রত নামক অনুষ্ঠানে রামজয় দাস রচিত এ গানগুলো সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত মহিলারা গেয়ে থাকেন। তাই কবি এ গানগুলোকে একটি বিশেষ সুরে গাওয়ার উপযোগী করে রচনা করেছিলেন।’ কবির ত্যাগ, মগ্নতা ও সাধনার পরিচয় পাওয়া তার গানে। প্রবন্ধের শেষে কবির আরও এক বিশেষ কীর্তির সন্ধান পাওয়া যায়। লেখকের ভাষায়, ‘এ অঞ্চলে রাধা-কৃষ্ণ বিষয়ক পদ রচনাকারী একাধিক গুণী কবি থাকলেও কৃষ্ণের জন্ম হতে ধারাবাহিকভাবে মথুরা গমন পর্যন্ত গীত রচনাকারী কবির সন্ধান পাওয়া দুষ্কর। এক্ষেত্রে ভাবগত ও অন্যান্য বৈষ্ণবশাস্ত্রকে আদর্শ করে পূর্ণাঙ্গ গীতিকবি হিসেবে রামজয় দাস বিশেষ স্বীকৃতির দাবিদার।’

               খুলনা এলাকার প্রখ্যাত কবিয়াল বা চারণকবি বা লোককবি বিজয় সরকারকে নিয়ে রচিত তিনটি প্রবন্ধ স্থান পেয়েছে লোকবৃত্তের এই সংখ্যায়। এই প্রবন্ধগুলো লিখেছেন জীবনকুমার কর্মকার, মো. রওশন আলী ও মো. রবিউল ইসলাম। জীবনকুমার কর্মকার বিজয় সরকারের গানকে বিজয়গীতি হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন, যদিও বিজয়গীতি হিসেবে কোনও প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি আছে কিনা আমাদের জানা নেই। তবে লেখক উল্লেখ করেছেন যে, তাঁর মরমি গানগুলোই বিজয় বিচ্ছেদ, বিজয় ধুয়া বা বিজয়গীতি নামে সঙ্গীত প্রিয় শ্রোতা-ভক্তদের কাছে পরিচিত। গবেষণালব্ধ এই প্রবন্ধে লেখক কবির জীবনাচার ও সঙ্গীত সম্পর্কে নৈর্ব্যক্তিক আলোচনা করেছেন যেখানে কবি বিজয় সরকারের প্রতিভার প্রৌজ্জ্বল্য উদ্ভাসিত হয়েছে। কবি বিজয় সরকারের সব গান সংরক্ষণ করা সম্ভব হয়নি যা শুধু কবির একার জন্যই নয় বরং বলা যায় বাংলাদেশের লোকসঙ্গীতের এক অপূরণীয় ক্ষতি ও বেদনার কারণ। লেখকের ভাষায়, ‘কবিভক্তদের কারও কারও মতে, এক হাজার আটশতের অধিক গান তিনি রচনা করেছেন এবং চার হাজারের বেশি কবিগানের আসরে তিনি গান পরিবেশন করেছেন। ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় কবির সামান্য মূল্যবান জিনিসপত্রের সঙ্গে গানের খাতাগুলো লুণ্ঠিত হয়। আবার কিছু গান স্বাভাবিকভাবেই সংগৃহীত হয়নি।’ প্রবন্ধকারের ভাষ্যমতে ৪০০টি গানের বিশ্লেষণ করে তাঁর গানের ১২ ধরনের বৈশিষ্ট্য উল্লেখ পাওয়া যায়। এর মধ্যে রয়েছে, আধ্যাত্মবাদ, বিচ্ছেদ-বেদনা, নিসর্গপ্রীতি, দেশাত্মবোধ, মানবতাবোধ, ইসলাম-মাহাত্ম্য, মৃত্যুভাবনা, শোকস্মৃতি, শ্রদ্ধানিবেদন, আত্মশুদ্ধি, নীতিবাদ ও ঈশ^রানুসন্ধান। তিনি তাঁর গানে কিছু উদ্ধৃত্তও করেছেন। তাঁর সাধনাও ছিল ব্যাপক। প্রধান প্রধান ধর্মগ্রন্থগুলো তিনি পাঠ করেছেন এবং সেই অনুভূতির উত্তাপ ছড়িয়েছেন তাঁর সঙ্গীতে।

               দ্বিতীয় প্রবন্ধেও বিজয় সরকারের জীবনাচারসহ সঙ্গীতচর্চা ও সংগীত রচনার দিকগুলো উন্মোচিত হয়েছে। প্রবন্ধকার মো. রওশন আলী কবির দেশপ্রেমের বিষয় উল্লেখ করে দুটি গানের অংশ বিশেষ উল্লেখ করেছেন, যেখানে একুশে ফেব্রুয়ারি ও ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধকে উপলক্ষ করে লেখা হয়। যেমন :

‘বাংলাদেশের মানুষে, ফেব্রুয়ারি একুশে,

ভুলিতে পারবে না জীবনে,

ভাষা আন্দোলনের জন্য, জনসমাজ হলো বিপন্ন,

কুখ্যাত সরকারের শাসনে…’

মুক্তিযুদ্ধের গানটি ছিল :

‘মহিমায় যার মুখরিত রাষ্ট্রপুঞ্জ অবধি,

জাতির জনক বঙ্গবন্ধু দীন দরিদ্রের দরদি

সে যে স্বাধীনচেতা শ্রেষ্ঠ নেতা, নহে অদৃষ্টবাদী ॥…’

মো. রবিউল ইসলামের প্রবন্ধের প্রতিপাদ্য কবির মানবতা, গ্রাম-বাংলার লোকজ সংস্কৃতির সাধক হিসেবে। তবে জীবনীভিত্তিক প্রবন্ধের জন্য অবশ্যই জীবনাচার গৌরচন্দ্রিকা হিসেবে থাকা বাঞ্ছনীয়। প্রবন্ধকার এখানে কবির জীবনের কয়েকটি বিষয় উল্লেখ করেছেন।

               প্রবন্ধকার জেসমিন বুলি বাংলাদেশের অন্যতম জনপ্রিয় গান ভাওয়াইয়ার গানের রূপ-রস-আনন্দ-বেদনার চিত্র ফুটিয়ে তুলেছেন। তিনি কোনও কোনও গানের প্রেক্ষাপট, গীতিকার, সুরকার ও শিল্পীর নাম উল্লেখ করেছেন। গানে বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ ও বিজয়ের বিষয়গুলো পরিবেশিত হয়েছে। পঁচাত্তরের কালো রাত্রির ঘটনায় প্রেক্ষাপটে কথা, সুর ও শিল্পী রবীন্দ্রনাথ রায়ের একটি গানের কথার অংশ বিশেষের উল্লেখ পাওয়া যায়। যেমন :

১৯৭৫ সালে ঐ নিদারুণ

ঐ নিদারুণ আগস্ট মাসে

১৫ই তারিখে রাত্রি শেষে

কি কলংক হইল সেই দিন

জাতির ইতিহাসে-২॥

ভাওয়াইয়া গান মানেই মনকাড়া ও প্রাণ দোলানো সুরের টান যা বাংলাভাষাভাষী আপামর গণমানুষের বড়ো চেনা এবং মগ্ন হয়ে শোনার গান বলে সর্বজনবিদিত। এক সময় বেতারে এই গান শোনার জন্য মানুষ তীর্থের কাকের মতো অপেক্ষা করত। গ্রাম কিংবা শহরের বলে কোনও কথা নেই, প্রায় সব মানুষই ছিল এই গানের ভক্ত। বর্তমানে যদিও বিদেশি পপ গানের ফরমেটে বিভিন্ন ব্র্যান্ডের গান, হিন্দি গান ও আকাশসংস্কৃতির কারণে এই গানের কদর কিছুটা কমলেও এর আবেদন হারায়নি, কখনও হারাবে না। জাতীয়তাবাদ, বাংলার সংস্কৃত ও জীবনধারা কল্পচিত্র যেন এই গানের মধ্যে ফুটে ওঠে। প্রবন্ধকার এই গানের ক্রমবিকাশের একটি সংক্ষিপ্ত রূপ দিয়েছেন, কিংবদন্তি গায়ক ও গীতিকারদের নামোল্লেখ করেছেন এবং সর্বোপরি এই গান যে মানুষের জীবনের কথা বলে, হৃদয়ে অনুরণিত হয় সেই সত্যই উন্মোচিত করেছেন।

               নাসির উদ্দিন হায়দার বিরচিত ‘চাটগাইয়া সঙ্গীতের দিকপাল আবদুল গফুর হালী’র সংগীত ভুবনের প্রবন্ধটি পাঠকের দৃষ্টি কাড়ে। এই মহান লোকশিল্পীর নাম সাধারণ মানুষ হয়ত জানেই না এবং তার জীবন ও গানের সম্পর্কে কোনও ধারণা নেই। লোকশিল্পী, গবেষক ও চট্টগ্রামবাসীদের কাছে আবদুল গফুর হালী পরিচিত থাকলে থাকতেও পারেন কিন্তু সারা দেশের মানুষের কাছে তার পরিচিতি এত নেই। প্রবন্ধকার নাসির উদ্দিন হায়দার যত্নসহকারে এই শিল্পীর কীর্তিময় বিস্তৃত ভুবনের কথা তুলে এনেছেন। তাঁর গান নিয়ে বিভিন্ন গবেষণার কথাও প্রবন্ধে স্থান পেয়েছে। বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে রয়েছে তাঁর একটি এবং এই গানের কিছু অংশ কথাকার উল্লেখ করেছেন :

‘নৌকা চলে নৌকা চলে

নৌকা চলে হেলেদুলে

এই নৌকা চালায় মুজিবরে’

গীতিকাররা প্রকৃত অর্থেই হারিয়ে যান এবং কেবল সঙ্গীতের সঙ্গে জড়িত কিছু মানুষ বা গবেষক তাঁদের নাম জানেন বা মনে রাখেন এই পর্যন্তই। এই করুণ দশা ঘটেছে হালীর জীবনেও। ন যাইও ন যাইও/আঁরে ফেলাই বাপের বাড়িত ন যাইও (ছেলে) গানটি বেতারে প্রচারিত হওয়ার পর আলোড়ন সৃষ্টি করলেও এটি কণ্ঠশিল্পী শ্যামসুন্দর বৈষ্ণব ও শেফালী ঘোষের নামেই প্রচার পায় কিন্তু গীতিকারের নামগন্ধই পাওয়া যায়নি। মাইজভান্ডারি, মেটোপথের গান, আঞ্চলিক নাটকেও তাঁর অসামান্য কীর্তির বিষয়গুলো এই প্রবন্ধে উল্লেখ রয়েছে।

               কালের স্রোতে হারিয়ে যাওয়ার শেষ প্রান্তে নেত্রকোনা জেলায় কেন্দুয়া উপজেলার সাজিউড়া গ্রামে ১৩১০ বঙ্গাব্দে জন্মগ্রহণকারী সাধক দীন শরৎ সম্পর্কিত প্রবন্ধটি লিখেছেন পার্থ তালুকদার। শৈশবে তিনি দৃষ্টিশক্তি হারিয়েছেন এবং তিনটি বই রচনা করেছেন যার ইতিহাস নিজ এলাকার মানুষের কাছেই হারানোর পথে। তিনি লিখেছেন অসংখ ধামাইল, মনঃশিক্ষা এবং গুরু-শিষ্যের প্রশ্ন-উত্তর দিয়ে দেহতত্ত্বের গান। চিন্তা হইতে চিতা ভালো, চিতায় মরা মানুষ পুড়ে/এগো জিয়ন্তে পুড়াইয়া মারে, চিন্তায় যারে ধরে/… এই গানের মধ্যে তিনি মনস্তাত্ত্বিক বিষয়ই ফুটিয়ে তুলেছেন। প্রবন্ধকারের ভাষ্য অনুযায়ী বলা যায় এই গান হৃদয়ে ঝড় তোলে, বড়ো আপন মনে হয় গান। যেহেতু তিনি গ্রামের নিবিড় পরিবেশে বড়ো হয়েছেন তাই তাঁর গানের মধ্যে গ্রামীণ জীবনের ছায়া থাকবে এটাই স্বাভাবিক সত্য।

               গুরুপদ গুপ্ত কালের স্রোতে প্রায় হারিয়ে যাওয়া আরেকজন লোকগানের গীতিকারের নাম এই সংখ্যায় জানা যায়। এ কথা অনস্বীকার্য যে তার অনেক গান লোকগানের রসপিয়াসীদের মুখে মুখে থাকলেও হয়ত তার নাম জানা নেই। প্রবন্ধকার বিকাশ রায়ের সংক্ষিপ্ত প্রবন্ধে গুরুপদ গুপ্তের কয়েকটি গানের পরিচয় পাওয়া যায়।

‘আজকালকার পোলাপান

বাপের কয়, “হুক্কা আন”

মায়েরে কয়, “কুটনি বুড়ি”

বৌরে কয়, “সোনার চান”।’

এ-রকম আরও মানুষের মুখে মুখে শোনা যায় গুরুপদ গুপ্তের গান।

সিলেট বিয়ানীবাজারের আরেকজন প্রথিতযশা বাউল শিল্পী ওয়াহিদুর রহমানের গান ও ভাষাবোধ নিয়ে প্রবন্ধ লিখেছেন বিজিৎ দেব। তাঁর গানে দেহতত্ত্ব, আধ্যাত্মিকতা ও দর্শন স্থান পেয়েছে।

               বিভূতিভূষণ মণ্ডলের ‘খুলনার লোকসংস্কৃতি’ প্রবন্ধে খুলনা অঞ্চলের সংস্কৃতির বিভিন্ন উপাদান-উপকরণের রূপ-প্রকৃতি ও বিশ্লেষণ। এই প্রবন্ধে চারটি ভাগে ভাগ করে এগুলো আলোচনা করা হয়েছে; যেমন- বস্তুগত, মানসসঞ্জাত, অনুষ্ঠানমূলক ও প্রদর্শনমূলক। এই দীর্ঘ প্রবন্ধে লেখক খুঁটিনাটি অনেক বিষয়কে অত্যন্ত যত্নসহকারে তুলে এনেছেন।

               মহি মুহাম্মদের ‘চট্টগ্রামের আঞ্চলিক গান ও নিভৃতচারী লোকশিল্পী এসকান্দার’; মোস্তাক আহমাদ দীনের ‘শফিকুনুর ও তাঁর গান’; মিহির কান্তি চৌধুরীর ‘রাধাকৃষ্ণের বিচ্ছেদ প্রসঙ্গ ও শাহ আবদুল করিম’; সঞ্জয় সরকারের ‘ঐতিহ্যবাহী ঘাটু গান : প্রেক্ষিত নেত্রকোনা’; সমীর আহমেদের ‘রজ্জব আলি দেওয়ানের বিচ্ছেদ গান’; সাইদ হাফিজের ‘কবিয়াল অমেদ আলি সরদার : সাকিম গঙ্গানন্দপুর’, সাইমন জাকারিয়ার ‘বাংলাদেশের ভাটিয়ালি গান প্রসঙ্গে’; সুবাস উদ্দীনের সঙ্গীতসাহিত্য : জলযান ও জলজীবিতার বিচিত্র উপাখ্যান, সুরঞ্জন রায়ের প্রফুল্লরঞ্জন বিশ^াসের তত্ত্বগান, হরিশংকর জলদাসের লোকবাদক বিনয়বাঁশী; হোসনে আরা কামালীর ‘সিলেটের দুটি লোকগান’ : জনপ্রিয়তা ও সমকালের সাতকান, আজাদ বুলবুলের ‘পার্বত্য চট্টগ্রামের চাকমা, মারমা ও ত্রিপুরা নৃগোষ্ঠীর খাদ্য সংস্কৃতি; এ কে শেরামের ‘মণিপুরী লোকসংস্কৃতি : লোকাচার ও লোকবিদ্যা; পরিমল সিং বাড়াইকের ‘বাংলাদেশের চা জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতি, মিঠুন রাকসামের গারো জাতিসত্তার লোকনৃত্য ও লোকসঙ্গীত, সামসন হাঁসদার ‘সান্তাল জীবনের অবয়ব’; সালেক খোকনের ‘ভিন্ন জাতির লোকজ উৎসব। উল্লেখ্য যে, আদিবাসী ও চা-বাগানের সমাজ ও সংস্কৃতি নিয়ে মোট ছয়টি তথ্যবহুল প্রবন্ধ এই সংখ্যায় স্থান দেওয়া হয়েছে। আদিবাসীদের সংস্কৃতি বিশেষভাবে পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করে এবং সমতলভূমির বাসিন্দা যারা পার্বত্য এলাকার সঙ্গে খুব বেশি পরিচিত নয় তাদের জানার জন্য এই ছয়টি প্রবন্ধ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। লোকসংস্কৃতির প্রচলিত ও পরিচিত বিষয় ছাড়া সুবাস উদ্দীনের ‘গীতসাহিত্য   : জলযান ও জলজীবিতার বিচিত্র উপাখ্যান একটি ব্যতিক্রমধর্মী প্রবন্ধ এখানে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এই প্রবন্ধে সুনামগঞ্জের হাওড়ের মানুষের জীবনজীবিকায় নৌকা বা জলযানের সংস্কৃতি সন্নিবেশিত হয়েছে।

               সাইমন জাকারিয়ার ‘বাংলাদেশের ভাটিয়ালি গানে’র প্রবন্ধটি পাঠককে আকৃষ্ট করে। ভাটিয়ালি বলতেই পাঠকের মনে হয় ভাটি এলাকার গান। বাস্তবেই তাই। ভাটি এলাকা তথা হাওড়ের জীবনের সঙ্গে মানুষের আবেগের যে সুর লহরি বয়ে বেড়ায় সেগুলোর মধ্যে ভাটিয়ালি গান অন্যতম। প্রবন্ধকার এই প্রবন্ধে ভাটিয়ালি গানের বিভিন্ন দিক দরদ ও যত্নসহকারে চিত্রিত করেছেন। তিনি এলাকার সীমানা চিহ্নিত করেছেন বৃহত্তর ময়মনসিং, হবিগঞ্জ ও সুনামগঞ্জকে। বাংলাদেশের খ্যাতনামা শিল্পী উকিল মুন্সির বিখ্যাত গান, ‘পুবালি বাতাসে আষাঢ় মাসের ভাসা পাানি রে… গানটির কথাও তিনি উল্লেখ করেছেন। এই গান যে শুধু হাওড় এলাকার মানুষের ব্যাকুলতা প্রকাশ করে তা নয় বরং তা নাগরিক মানুষের মনকেই স্পর্শ করে। তিনি ভাওয়াইয়া ও ভাটিয়ালি গানের মধ্যে একটি যোগসূত্র স্থাপন করে তুলনামূলক আলোচনাও করেছেন।

               হরিশংকর জলদাসের ‘লোকবাদক বিনয়বাঁশী’ প্রবন্ধের মূল নায়ক হলেন বিনয়বাঁশী। জন্মগতভাবে তাঁর পদবি হওয়ার কথা জলদাস। লেখক বলেছেন, সম্প্রদায়ভুক্ত এই শিল্পীর জলের দাসত্ব করার কথা থাকলেও তিনি জলের দাসত্ব করেননি। তিনি করেছেন ঢোলের দাসত্ব অর্থাৎ তিনি যে একজন ঢোলের কুশীলব ছিলেন প্রবন্ধকার তারই ইঙ্গিত করেছেন। দীর্ঘ এই প্রবন্ধে তিনি বিনয়বাঁশীর ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও সম্প্রদায়ের বিভিন্ন দিক চিত্রিত করে তঁাঁর শিল্পীসত্তাকে আলোচনার মূল প্রতিপাদ্য করেছেন। এই প্রবন্ধের মাধ্যমে পাঠক একজন গুণী শিল্পীর পরিচয় পাবেন।

               সর্বোপরি এই ছোটো কাগজটি লোকসংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ অনেক বিষয়কে ধারণ করেছে। আমাদের লোকাচারই আমাদের জীবনের শিকড়, আমাদের অস্তিত্বের বন্ধন। এই শিকড় সম্পর্কে না জানা মানেই আমরা শিকড়ছেঁড়া মানুষ হয়ে যাওয়া। একটি বিষয় দৃষ্টিগোচরে এসেছে যে, এই ম্যাগাজিনে বাংলাদেশে অনেক নারী বাউল বা লোকগানের শিল্পী থাকলেও তাঁদের নিয়ে কোনও প্রবন্ধ স্থান পায়নি। ভবিষ্যতে কোনো সংখ্যা তিনি শুধু নারী লোকশিল্পী বা লোকসংস্কৃতির কীর্তিমান নারীদের নিয়ে একটি সংখ্যা করতে পারেন। লোকসংস্কৃতিতে তাদের অবদান খাটো করে দেখার সুযোগ নেই বিধায় তাদের মর্যাদা দেওয়া লোকগবেষকদের দায়িত্ব বলে আমাদের ধারণা। আমরা আশা করি লোকবৃত্ত আরও আরও কাজের মাধ্যমে আমাদের লোকসংস্কৃতি ও লোকসাহিত্যের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। সবশেষে বলা কর্তব্য মনে করছি যে, প্রবন্ধগুলোতে কিছু বানান বিভ্রাট রয়েছে। এগুলোর প্রতি আরও যত্নবান হওয়া আবশ্যক।

 লেখক : কথাসাহিত্যিক

Leave a Reply

Your email address will not be published.

shares