সম্পাদকীয় : আমি সেই দিন হব শান্ত

নবম বর্ষ   দ্বিতীয় সংখ্যা   ফেব্রুয়ারি ২০২২

সৃজনশীল প্রতিচ্ছবি তৈরি করা বা নির্মাণ করার ক্ষমতা বা ধারণাই কল্পনাশক্তির গুরুত্বপূর্ণ অনুষদ। এই কল্পনার আলো মেধারই একটি উদাহরণ। আর মেধা হচ্ছে মনস্তত্ত্বের ভেতরের আলো, বাইরেরও। সাহিত্যসৃজনে এ অনুষদ স্বতঃস্ফূর্ত ঢঙে ব্যবহার করে থাকেন সৃজনশীল কবি ও কথাসাহিত্যিকগণ।

দেহের সংবেদনশীল পঞ্চ ইন্দ্রিয় বা মনের পাঁচটি জানালা দিয়ে নানা তথ্য ঢোকে ব্রেনে। তা মানুষের অভিজ্ঞতাকে সমৃদ্ধ করে এবং সচেতন ভাবনা-জগৎ বা কগনিটিভ ওয়ার্ল্ড কিংবা ‘কনশাস স্ট্রিম অব থটস’ আলোড়িত করে, আবেগে পরিবর্তন ঘটায়, আচরণেও। আবার ইন্দ্রিয়-অনুভূতির বাইর থেকেও অনুভব করা যায় ঠিক দেখা-শোনার সরাসরি মনের একই রকম অনুভবের মতো। এটাই সৃষ্টিশীল কল্পনা বা ‘ক্রিয়েটিভ ইমাজিনেশন’। এর ওপর ভর করে সৃষ্ট বিপুল-বিস্তৃত অথচ লক্ষ্যমুখি যাত্রার এক মনস্তাত্ত্বিক ঝড়ো-অনুভবের শব্দজোয়ার আমরা দেখতে পাই ‘বিদ্রোহী’ কবিতায় যা বাংলা কাব্যভুবনে অন্যতম একটি রাজপথ নির্মাণ করে দিয়েছে।

 বিদ্রোহী কবিতার ‘আমি’ কেবলই নজরুলের আত্মশক্তির একক ‘আমি-সত্তা’ নয়। এই ‘আমি’ সর্বযুগের, সর্বকালের বিশ্বের প্রত্যেক অঞ্চলের নির্যাতিত-নিপীড়িত মানুষের ‘আমি’; সচেতন করে তোলা গণসমুদ্রের ‘আমি’; আর নজরুল কেবল আবেগের ঝড়ে তাঁর কাব্যে ‘আমি-সত্তা’ উড়িয়ে দেননি; এই ঝড়ের মধ্যে তাঁর মনস্তত্ত্বের সৃষ্টিশীল কল্পনা তথা মেধা ও জীবনবোধের উজ্জ্বল, অনন্য ‘নজরুল-সত্তা’রও উদগিরণ ঘটে গেছে। একইসঙ্গে তাঁর সাহিত্যে সংযোগ ঘটেছে বিভিন্ন সাহিত্য-মতবাদ ও মনস্তাত্ত্বিক-মতবাদেরও। আর এ-কারণে বিদ্রোহী কবিতা শিল্পগুণে অসাধারণ; ভারতবর্ষের ‘আত্মার স্বর’ হিসেবে চিহ্নিত, মূল্যায়িত, প্রশংসিত হলেও মূলত এই কবিতা যুগে-যুগে, সর্বকালের, সব দেশের, সব সমাজের নিপীড়িত পরাধীন মানুষের মুক্তির সনদ হিসেবে প্রাসঙ্গিক থাকবে।

এই আয়োজনে প্রচ্ছদ রচনায় কবি মুহম্মদ নূরুল হুদার কলমে ‘বিদ্রোহী’ কবিতা এবং  টি. এস. এলিয়টের ‘দি ওয়েস্ট ল্যান্ড’ কবিতার একটি তুলনামূলক বিশ্লেষণ এবং ‘নষ্ট জমি’ শিরোনামে কবিতাটির বাংলা অনুবাদও পড়ার সুযোগ পাবেন পাঠক। শতবর্ষে অন্য আলোয় ‘বিদ্রোহী কবিতা’ নিয়ে আরও লিখেছেন মাহবুবুল হক, আবিদ আনোয়ার, বিশ্বজিৎ ঘোষ, মোহিত কামাল, শাহীনুর রেজা এবং কলকাতা থেকে অংশগ্রহণ করেছেন বিনোদ ঘোষাল।

স্মরণাঞ্জলি বিভাগে বিশেষ ক্রোড়পত্রে থাকছে সম্প্রতি প্রয়াত জাতীয় অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম ও কথাসাহিত্যিক হাসান আজিজুল হকের যথাক্রমে মননশীল ও সৃজনশীল জগতের উন্মোচন। আর এই শ্রমসাধ্য অনুসন্ধানে অংশগ্রহণ করেছেন পবিত্র সরকার, মোজাম্মেল হক নিয়োগী, আহমেদ মাওলা, আনন্দময়ী মজুমদার, জাকিয়া রহমান ও সালমা আক্তার।

সাক্ষাৎকার বিভাগে থাকছে দিলারা হাফিজের নেওয়া কবি আসাদ চৌধুরীর অনন্য কথোপকথন।

আর বিশ্বসাহিত্য বিভাগে বরেণ্য সাহিত্যিকদের ধারাবাহিক সাক্ষাৎকারে এবারে থাকছেন মিলান কুন্ডেরা―ক্রিশ্চিয়ান স্যালমানের নেওয়া সাক্ষাৎকারটি অনুবাদ করেছেন নৃপেন্দ্রনাথ সরকার। 

থাকছে অন্যান্য নিয়মিত বিভাগ ও ধারাবাহিকদ্বয়।

 এ সংখ্যার জন্য কবি নজরুলের পাঁচটি প্রতিকৃতি এঁকেছেন শিল্পী আলপ্তগীন তুষার। এর মধ্য থেকে একটি প্রতিকৃতি দিয়ে প্রচ্ছদ সাজিয়েছেন। এ ছাড়া শিল্পী শেখ আফজালের আঁকা একটি প্রতিকৃতিও ব্যবহার করা হয়েছে। অলঙ্করণে আরও অংশ নিয়েছেন শিল্পী ধ্রুব এষ, নাজিব তারেক, শতাব্দী জাহিদ ও রাজীব দত্ত।

অংশগ্রহণকারী সবার জন্য ভালোবাসা, পাঠকদের জন্যও।

Leave a Reply

Your email address will not be published.

shares