ক্রোড়পত্র : রফিক ভাই : পবিত্র সরকার

এই পঁচাশির কাছাকাছি পৌঁছে বুঝি যে এটাই স্বাভাবিক কথা যে, আমারই যখন প্রাপ্যের বেশি যাপনকাল জুটেছে, তখন আমার চেয়ে বেশি বয়স যাঁদের তাঁদের হারানোর কষ্ট আমাকে সহ্য করতেই হবে। মৃত্যু কোনও জীবিত সত্তা নয়, তাঁর ইচ্ছা-অনিচ্ছা বলে কিছু নেই, তবু রূপক অর্থে তার ওপর কর্তৃত্ব আরোপ করে বলি যে, সে আমাদের ওপর দয়া করে এত দিন আমাদের বাঁচতে দিয়েছে। নাও দিতে পারত। আমাদের চেয়ে কত কত ছোট কত ছেলেমেয়ে, কাছের, দূরের মানুষ চলে গেছে। আবার সেই একই ভুল করে বলি যে মৃত্যুর নিষ্ঠুরতা যেন আরও দুর্দমনীয় হয়ে উঠেছে এই গত দুই বছরে, এই অতিমারির কালে। যাঁরা আমাদের চেয়েও অনেক বেশিদিন বেঁচে আছেন, এমনও অনেক আছেন বলে জানি, তাঁদের বেঁচে-থাকার আনন্দময় ঘটনাও এই মৃত্যুর সন্ত্রাসে আড়ালে পড়ে যায়।

রফিক ভাই, বাংলাদেশের জাতীয় অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম গত ৩০ নভেম্বর, ২০২১ বেলা সাড়ে তিনটে নাগাদ চলে গেছেন। জন্মের তারিখ ১ জানুয়ারি, ১৯৩৪। আবার ভ্রান্ত অলংকার প্রয়োগ করে মৃত্যুর অবিবেচনাকে দায়ী করে বলতে পারি না যে, এটা অকালপ্রয়াণ। রফিক ভাই মাঝখানে অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে গিয়েছিলেন, বাড়িতে ফিরেও এসেছিলেন, শুনে স্বস্তি পেয়েছিলাম। সপ্তাহ তিনেক আগে কথা হলো আমার সঙ্গে। কণ্ঠস্বর ক্ষীণ, কিন্তু ভালোবাসাময়। শেষ দিকে একটু ঝুঁকে চলতেন মাথা উচু করে চলা মানুষটি, সম্ভবত মনেও একটু দুর্বল হয়ে পড়েছিলেন। তা হোক, তবু দেখতাম জীবন সম্বন্ধে তাঁর ইতিবাচক মনোভাব কখনও নষ্ট হয়নি। তাই অকালপ্রয়াণ না হোক, এমন বহু-উৎকর্ষধারী মানুষের মৃত্যুর জন্য পৃথিবী কখনওই সম্পূর্ণ প্রস্তুত থাকে না। গত বছর একইভাবে চলে গেলেন আনিস ভাই, অধ্যাপক আনিসুজ্জামান ; তার পর থেকে যেন দুই দেশেই বিদ্যা আর সংস্কৃতি জগতে মৃত্যুর মিছিল চলেছে। ভাষাসৈনিক (বাহান্নর ভাষা আন্দোলনের পথঘাটের মিছিল, প্রতিবাদ, শহিদ মিনার নির্মাণের বহু ঐতিহাসিক ফোটোগ্রাফ শুধু তাঁরই ক্যামেরায় তোলা হয়েছিল), ভাষাতাত্ত্বিক, নজরুল-বিশেষজ্ঞ ও নজরুল একাডেমির আজীবন সভাপতি, সেই সঙ্গে রবীন্দ্রসঙ্গীতপ্রেমী (এটা পারিবারিক অভিমুখ, কারণ তাঁর স্ত্রী আমাদের বন্ধু জুবিলি ছিলেন ঢাকা রেডিও আর টেলিভিশনের প্রসিদ্ধ রবীন্দ্রসঙ্গীতশিল্পী, আর স্বাগতালক্ষ্মী দাশগুপ্তের পুরো ‘গীতবিতান’-এর গানের সিডির রফিক ভাই একজন প্রথম ক্রেতা), ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা আর ভাষাবিজ্ঞান বিভাগের প্রসিদ্ধ ও জনপ্রিয় অধ্যাপক, পরে ইউল্যাব বা ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস নামক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, এবং একই সঙ্গে জীবন সম্বন্ধে তাঁর অগাধ আস্থা তাঁর শেষ পর্যন্ত অবিচল ছিল। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাক্ষাৎ শিক্ষকও ছিলেন তিনি, তিনি রফিক ভাইয়ের ওপরই শেখ মুজিবুর রহমানের শতবর্ষ উদ্যাপনের সব পরিকল্পনা আর নির্দেশনার দায়িত্ব দিয়েছিলেন। ফুলব্রাইট বৃত্তি পেয়ে তিনি কর্নেল আর ইয়েল ইউনিভার্সিটি থেকে ভাষাবিজ্ঞান আর সাংস্কৃতিক নৃবিজ্ঞানে দুটি এম এ করেছিলেন। ডক্টরেট ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের, নজরুলের ওপর। ১৯৫৬ সালে বাংলায় এম এর এই উজ্জ্বল ছাত্র পরের বছরই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক হয়েছিলেন, পরে ভাষাবিজ্ঞান বিভাগেও দীর্ঘদিন পড়িয়েছিলেন। আমার মনে হয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগে ভাষাবিজ্ঞানের যে একটি সমৃদ্ধ ঐতিহ্য গড়ে উঠেছিল, হরপ্রসাদ শাস্ত্রী আর ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর গবেষণায়, পরে ড. মুহাম্মদ আবদুল হাই আর মুনীর চৌধুরীর যোগদানে। তাতে ব্রিটিশ ও মার্কিন দেশের আধুনিক বর্ণনামূলক ভাষাবিজ্ঞানের উভয় মাত্রা যুক্ত হয়েছিল। এতে মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী, হুমায়ুন আজাদ প্রভৃতিরাও উল্লেখযোগ্য ভূমিকা নির্মাণ করেছেন এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা ভাষাকেন্দ্রিক ভাষাবিজ্ঞানচর্চার একটি শক্তিশালী ঐতিহ্যের সূত্রপাত হয়েছে। পরে ভাষাবিজ্ঞান বিভাগে সেই ধারা আরও বিস্তার লাভ করেছে। বাংলা ভাষার প্রতি রফিক ভাইয়ের ভালোবাসা এমনই ছিল যে, যেখানে অধিকাংশ বাংলাদেশি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় বাংলা শেখাতে খুব আগ্রহী নয়, সেখানে তিনি বাংলাকে স্নাতক স্তরে একটি আবশ্যিক বিষয় করেছিলেন ইউল্যাবে। আর বাংলাভাষার প্রতি তাঁর ভালোবাসা আমি স্বতঃসিদ্ধ এবং অন্যদের চেয়ে গভীরতর হবে তা ধরে নিতেই পারি, কারণ তিনি ছিলেন তৎকালীন পূর্বপাকিস্তানের ভাষা আন্দোলনের এক সৈনিক এবং চিত্রে ও স্মৃতিতে তার অতি মূল্যবান এক নথিরক্ষক। ভাষা-আন্দোলন উপলক্ষে তোলা তাঁর ছবিগুলো বাংলাদেশের নির্মাণ-ইতিহাসের এক দুর্লভ দলিল। যার জন্য শুধু বাংলাদেশ নয়, সারা পৃথিবীর সাংস্কৃতিক মহাফেজ রক্ষকদের তাঁর কাছে কৃতজ্ঞ থাকা উচিত।

২.

আমার সঙ্গে তাঁর প্রথম আলাপ সেই ১৯৭৮ সালে। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে হ্যালেডের ব্যাকরণ প্রকাশের ২০০ বছর উদ্যাপিত হবে, বাংলাদেশের শিক্ষা দপ্তরে চিঠি লিখেছিলাম কয়েকজন বিশেষজ্ঞের একটি প্রতিনিধিদল পাঠানোর জন্য। অধ্যাপক রফিকুল ইসলামের নেতৃত্বে চলে এলেন অধ্যাপক আবদুল কাইয়ুম, জাহাঙ্গীর নগরের মুস্তাফা নুরুল ইসলাম, আবুল কালাম মন্জুর মোরশেদ এবং সম্ভবত মন্সুর মুসা―এই পাঁচজনের একটি দল। তাঁরা হই হই করে আমাদের সামান্য আতিথ্য নিলেন (বাংলাদেশের মতো আপ্যায়ন আমাদের অসাধ্য), শ্রীমান পঙ্কজ সাহার আমন্ত্রণে এখানকার দূরদর্শনে একটি হৃদয়গ্রাহী অনুষ্ঠান করে দর্শকদের বাংলাদেশ সম্বন্ধে নতুন করে সচেতন আর শ্রদ্ধাশীল করে তুললেন। সে অনুষ্ঠানটি দর্শকদের দ্বারা খুবই প্রশংসিত হয়েছিল, পঙ্কজের কাছে দর্শকদের অজস্র টেলিফোন এসেছিল। যাদবপুরের সেমিনারেও তাঁর উপস্থিতি ছিল উজ্জ্বল। মনে হয়, রফিক ভাই ছিলেন সেই সেমিনারের সবচেয়ে জনপ্রিয় বক্তা।

ঠিক ১০ বছর পর, এ লেখা যে লিখছে সেই ব্যক্তির কাছে আমন্ত্রণ এসে পৌঁছাল, বাংলাদেশে কম্পিউটার আর বাংলাভাষা সম্বন্ধে একটি আলোচনাচক্র অনুষ্ঠিত হবে জাতীয় জাদুঘরে, সেখানে উপস্থিতি চাই। বোঝা গেল রফিক ভাই আমাকে ভোলেননি। সেই আমার বাংলাদেশে প্রথম যাওয়া। জন্মভূমির দেশ, স্বাধীন হওয়ার পর আর যাওয়া হয়নি। সপরিবার গেলাম আর মহানন্দে দিন-দশেক কাটিয়ে ফিরলাম। মহানন্দে, স্মৃতিমেদুরতায় স্নাত হয়ে। কারণ রফিক ভাইয়ের উদ্যোগেই বন্ধুবর জামিল চৌধুরী তাঁর গাড়িতে আমাদের সপরিবারে আমার জন্মগ্রাম দেখিয়ে আনলেন, আমি সেখানকার মাটি তুলে আনার সুযোগ পেলাম। ছিলাম তাঁরই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসগৃহে, শহীদ মিনার দেখা যেত জানালা দিয়ে। ওখানেই প্রথম বাংলাদেশের মানুষের প্রাণঘাতী আপ্যায়নের সঙ্গে পরিচিত হই। বলবেন, ‘অহন ত কিসু পাওয়া যায় না, কী খাওয়ামু আপনেগো’ বলে উনিশ রকমের পদ টেবিলে সাজিয়ে দেবেন, এবং প্রত্যেকটি খাওয়ার জন্য ঝুলোঝুলি করবেন। তাঁর পত্নী, বহুগুণান্বিতা জুবিলি ওই উপলক্ষেই আমাদের আজীবন বন্ধু হয়ে ওঠেন। ওই বারই আলাপ হলো বহু মানুষের সঙ্গে, কারণ রফিক ভাইয়ের বাসায় সবাই আসতেন। রবীন্দ্রসঙ্গীতপ্রেমী ওয়াহিদুল হক থেকে শুরু করে আরও কত মানুষ। রফিক ভাই আর জুবিলিকে আমি ঢাকা থেকে প্রকাশিত ‘বানান-বোধিনী’ বইটিকে উৎসর্গ করতে পেরে কৃতার্থ হয়েছি। তাতে অবশ্য তাঁর কাছে আমার যে ঋণ তার সামান্যই স্বীকার করা গেছে।

ওই সময়ে এক সন্ধ্যায় তাঁর বসার ঘরে বসে টেলিভিশনে খবর দেখার সময় একটি চমকপ্রদ ঘটনার কথা স্মৃতি থেকে মুছে যায়নি। হঠাৎ খবরে এল যে, পাকিস্তানের সামরিক শাসক জিয়াউল হক একটি প্লেন-দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন। রফিক ভাই উল্লাসে চিৎকার করে বললেন, ‘ইয়া আল্লাহ্! আমাগোডারে কবে নিবা!’

বাংলাদেশের ইতিহাসের ওপর নজর-রাখা মানুষের আশা করি এর পটভূমি বোঝানোর দরকার হবে না।

তার পর কত বার, কত উপলক্ষে যে দেখা হয়েছে তার সীমাসংখ্যা নেই। তাঁর ‘ভাষাতত্ত্ব’, ‘ভাষাতাত্ত্বিক প্রবন্ধাবলী’, ওহঃৎড়ফঁপঃরড়হ ঃড় ইবহমধষর, বাংলা ব্যাকরণের ওপর বই, নজরুল জীবনী, জীবনানন্দ দাশের কবিতা-সংগ্রহ ইত্যাদি বহু বই আমাকে দিয়েছেন, আমি তাঁকে আমার বই দিয়েছি। কিন্তু সব চেয়ে স্থায়ী আর ঘনিষ্ঠ যোগ ঘটল তাঁর সঙ্গে প্রমিত বাংলা ভাষার ব্যাকরণ সম্পাদনের সূত্রে, ২০১০ থেকে ২০১৩―এই চার বছর। তারই মধ্যে নজরুল একাডেমিতেও আমাকে নিয়ে গেছেন এবং ‘বিদ্রোহী’ কবিতার নব্বই বছরে আমাকে দিয়ে একটি প্রবন্ধ লিখিয়ে নিয়েছেন ইংরেজিতে, নজরুলের কাব্যশৈলীর ওপরে।

বলছিলাম ২০১০ থেকে ২০১৩ সালের কথা। প্রমিত বাংলা ভাষার ব্যাকরণ ঢাকার বাংলা একাডেমির একটি প্রকল্প। সম্ভবত রফিক ভাই-ই এই প্রকল্পটিতে উদ্বুদ্ধ করেছিলেন একাডেমির তখনকার মহাপরিচালক শামসুজ্জামান খানকে। জামান ভাই এক কথার মানুষ, সঙ্গে সঙ্গে প্রচণ্ড উৎসাহ নিয়ে নেমে পড়লেন, এবং পশ্চিমবঙ্গ বাংলা একাডেমির সঙ্গে যুক্তভাবে ব্যাপারটা করে তুলবেন বলে ঝাঁপালেন। আনিস ভাই, রফিক ভাই আর জামান ভাই সদলবলে কলকাতায় চলে এলেন, কলকাতার বাংলা আকাদেমির সঙ্গে চমৎকার বৈঠক হলো, আমি রইলাম মাঝখানের ঘুঁটি হিসেবে। স্থির হলো রফিক ভাই আর আমি দুজনে প্রধানভাবে সম্পাদনা করব বইটি। কলকাতার বাংলা আকাদেমি সরকার বদলের ফলে এ বিষয়টিতে আর তেমন করে যুক্ত রইল না, কিন্তু আমাকে রফিক ভাই ছাড়লেন না। তখন বছরে চার-পাঁচবার দু-তিন সপ্তাহ করে আমাকে ঢাকায় গিয়ে থাকতে হতো, এবং সপ্তাহে সাত দিনই একাডেমির মহাপরিচালকের সভাকক্ষে ব্যাকরণ নির্মাণের খবরদারি করতে হতো। রোজ সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৫টা তো বটেই, কখনও কখনও ৭টা-৮টাও হয়ে যেত। আমরা বলতাম ব্যাকরণের কারখানা চলছে। লেখক-লেখিকা নির্বাচন হলো, তাঁদের বিষয় নির্ধারণ করে দেওয়া হলো। তার পর তাঁদের লেখা আসতে লাগল এবং আর সম্পাদনা চলতে লাগল। সম্পাদক দুজন আর চার সহকারী সম্পাদক―চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের মাহবুবুল হক (পরে কুমিল্লা ইঞ্জিনিয়ারিং বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য), ঢাকার জীনাত ইমতিয়াজ আলী (পরে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক), স্বরোচিষ সরকার (রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, পরে ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব বেঙ্গল স্টাডিজের মহাপরিচালক), এবং সম্পাদনা সহযোগী রাজীব চক্রবর্তী, বাংলা একাডেমির দুটি কন্যা―রুমানা আর শায়রা এবং কম্পিউটার-জাদুকর আল আমীনকে নিয়ে একটি জমজমাট দল। রফিক ভাই রোজ আসতেন, কারণ তিনি আর আমি তো যুগ্ম সম্পাদক। লেখকদের লেখা আসছে, সম্পাদনা চলছে, কম্পিউটারে কম্পোজ করা হচ্ছে, মাঝে মাঝে নানা সূত্রে এসে উঁকি দিয়ে এসে বসে যাচ্ছেন মন্ত্রীবর্গ থেকে শুরু করে কবীর চৌধুরী, হাসান আজিজুল হক, সৈয়দ শামসুল হক, আনোয়ারা হক, রামেন্দু মজুমদার, নাসিরুদ্দীন ইউসুফ বাচ্চু, কে নয়! সৈয়দ শামসুল হক তো ব্যাকরণের এই দুই সম্পাদকের নাম তাঁর নতুন কবিতার বই ‘দগ্ধ দেহে চাঁদের নবনী’ উৎসর্গই করে ফেললেন। এইভাবে তিন বছরে খাড়া হয়ে গেল দুই খণ্ডের এক বাংলা ব্যাকরণ―প্রায় ১২০০ পৃষ্ঠার, আর সেই সঙ্গে একটি স্কুলপাঠ্য সংস্করণ―সেও প্রায় ৫০০ পৃষ্ঠার। বাংলাদেশে সে সব বইয়ের খুব কদর হলো।

৩.

আমি লক্ষ্য করেছি, তাঁর সঙ্গে নানা ব্যাপারে আমার মানসিকতার বেশ খানিকটা মিল তৈরি হয়েছিল। না, ফুলব্রাইট ইত্যাদি বহিরঙ্গে নয়, মেজাজ এবং সামাজিক ভূমিকাতেও। ভাষাবিজ্ঞানে তিনি যথেষ্ট কাজ করেছেন, অন্তত ৭-৮টি বই ভাষা আর ভাষা আন্দোলন নিয়ে রচনা করেছেন, কিন্তু ভাষাবিজ্ঞানীদের হয়তো হতাশ করেছেন এই কারণে যে, তিন পুরোদস্তুর ভাষাবিজ্ঞানে নিজেকে আবদ্ধ রাখেননি। নজরুল বিষয়ে প্রামাণিক গবেষণা তাঁর একটি উজ্জ্বল দিক, এবং নানা প্রাতিষ্ঠানিক প্রশাসনের দায়িত্বও তাঁর ওপর বর্তেছিল। এ ছাড়া রেডিও-টেলিভিশন ও অন্যান্য মিডিয়াতে তাঁর উপস্থিতি বিশেষ মর্যাদা ও জনপ্রিয়তা পেয়েছিল। বিশেষজ্ঞতামুখীরা যাই বলুন, নানা কারণে এক-একজনের ব্যক্তিত্ব আর সামাজিক অভিমুখ তাঁদের নিছক বিশেষজ্ঞতার বাইরে যেতে বাধ্য করে যেমন, তেমনই ওই সব ক্ষেত্রে তাঁদের নানাবিধ শক্তিরও প্রকাশ ঘটে। তা গোষ্ঠীর সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধই করে। তবে এ কথাও ঠিক যে, তাঁর ‘ভাষাতত্ত্ব’ বইটি মার্কিনি বর্ণনাপন্থার দ্বারা প্রভাবিত হলেও বাংলায় সুনীতিকুমার, শহীদুল্লাহ্ আর সুকুমার সেনের ঐতিহাসিক ভাষাবিজ্ঞানের চর্চার বাইরে তখনকার হিসেবে আধুনিক ভাষাবিজ্ঞানের একটি প্রথম পাঠ বাংলাভাষায়, যে কারণে এটির জনপ্রিয়তা এখনও অব্যাহত।

 রফিক ভাই যেমন চমৎকার কথা বলতেন, তেমনই তাঁর ছিল গল্পের অফুরন্ত ভাণ্ডার। আমরা তাঁর সরস কথাবার্তা, আমেরিকা ও পাকিস্তান পর্বের খোশগল্প, পাকিস্তানি সেনাপতিদের বা ধর্মান্ধদের নিয়ে হাসিঠাট্টা, ভাষা আন্দোলনের স্মৃতি, বিদ্যায়তনিক আলোচনা সবকিছু মুগ্ধ হয়ে শুনতাম। রেডিও আর টেলিভিশনে তিনি ছিলেন নিয়মিত সাহিত্য-সংস্কৃতিবিষয়ক অনুষ্ঠানের পরিচালক, সেগুলোও খুব জনপ্রিয় ছিল। আর ছিলেন অসাধারণ খাদ্যরসিক। বাংলা আকাদেমিতে আমাদের সকালে দুবার, বিকেলে আর বিদায়কালীন চা ও খাদ্য, এবং দুপুরের খাওয়াতে যাতে নিত্যনতুন আস্বাদন থাকে সে ব্যাপারে দৃষ্টি রাখতেন। চা ও খাদ্যের সঙ্গে চলত তাঁর গল্পের রসায়ন।

তারপরও তাঁর সঙ্গে বছর বছরই আমার দেখা হতো, কারণ ঢাকা যাওয়ায় আমার বিরাম ছিল না। একুশের বইমেলা, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটের অনুষ্ঠান―কোনওটাই তাঁকে ছাড়া চলত না, আর আমিও প্রত্যেকবার ডাক পেতাম। তাঁর পরিবারের সঙ্গে আমার পরিবারেরও যেন বন্ধুত্ব তৈরি হয়ে গিয়েছিল। আরও একবার তাঁকে আমি এনেছিলাম, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় আর এশিয়াটিক সোসাইটির দক্ষিণ ও দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার ভাষা আন্দোলনসংক্রান্ত এক আলোচনা চক্রে, এই ২০১৯-এ। তাতে আর প্রায় সবাই ছিল স্কলার। রফিক ভাই-ই একমাত্র, যিনি একই সঙ্গে স্কলার এবং ভাষা আন্দোলনের সৈনিক। সে এক দুর্লভ যোগাযোগ।

এর মধ্যে একাধিক ওয়েবিনার করেছি তাঁর সঙ্গে।

এখন সবই, না ‘অলীক’ নয়। তিনি আমার জীবনের এক অত্যন্ত মূল্যবান স্মৃতি।

 লেখক : ভাষাতত্ত্ববিদ, সাবেক উপাচার্য

রবীন্দ্র ভারতী বিশ্ববিদ্যালয়

Leave a Reply

Your email address will not be published.

shares