ক্রোড়পত্র : কাজী নজরুল ইসলাম : জীবন ও সৃজন-এর আলোকে সমাজচৈতন্যে নজরুল মানস : সালমা আক্তার

বাংলাদেশের তথা বাংলাভাষী অঞ্চলের স্বাধীনতা আন্দোলনে কাজী নজরুল ইসলামের আগমন অন্ধকারে-প্রজ্বল নক্ষত্রের মতো। বাংলা সাহিত্যের অন্যতম যুগস্রষ্টা কবি এবং সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক নবজাগরণের বাণীবাহক ও বিদ্রোহী চেতনার অনন্যসাধারণ এক রূপকার কাজী নজরুল ইসলাম। মূলত শক্তি ও মুক্তির উত্থান এবং বিকাশমান মানবপ্রত্যয় নিয়ে যুগ-যন্ত্রণায় দগ্ধ, রুষ্ট, দ্রোহী কবি নজরুলের আত্মপ্রকাশ। পরাধীন দেশের নাগরিক হিসেবে শোষণে-পীড়নে জর্জরিত কবির প্রাণ উছলে উঠেছিল হুতাশনে। কবি সমস্ত অন্যায়, অবিচার, শোষণ, দুঃশাসন ও অমানবিকতার বিরুদ্ধে নিঃশঙ্ক বিদ্রোহ ঘোষণা করেছেন। পরাধীন ভারতবর্ষে যখন শৃঙ্খলিত মানবতা, সমাজ কাঠামো বিবিমিষায় সমাচ্ছন্ন, স্বদেশ ও জাতির জন্য অশনি সংকেত তখন সর্ববাদী ব্যক্তিনিরপেক্ষ, মুক্তিকামী স্বাধীনচেতা যুদ্ধফেরত তরুণ কবি দেশ-জাতিকে শৃঙ্খলমুক্ত করতে শক্তি ও প্রত্যয়ে দীপ্ত হয়ে উঠলেন। গাইলেন জাগরণী গান নবপ্রাণের উল্লাসে।

সাহিত্য ও চিন্তাজগতে একহাতে বাঁকা বাঁশের বাঁশরী আর হাতে রণতূর্য নিয়ে ধূমকেতুর ন্যায় আবির্ভূত হয়েছিলেন বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম। সমগ্র জীবন তিনি জাতির তথা মানবতার মুক্তির পথ অনুসন্ধান করেছেন। তাঁর কাব্যসৃষ্টি, সঙ্গীতসৃষ্টি, জীবনভাবনা সবকিছুর মধ্য দিয়ে তিনি সর্বোপরি একজন মুক্তিকামী মহাপুরুষ। সাম্য-মৈত্রীর গান তাঁর মতো করে আগে আর কেউ গেয়ে ওঠেনি। এমন প্রভাবশালী বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিবাদ-প্রতিরোধের মুখে ব্রিটিশ শাসনকে আগে আর পড়তে হয়নি; নজরুল ইসলাম ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে ছিলেন আজীবন খড়গহস্ত। কায়মনোবাক্যে মুক্তিকামী এ মহান শিল্পী বাংলার জনসাধারণকে তাঁর ওজস্বী সাহিত্যকর্মের মাধ্যমে ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে সচেতন করে তুলেছিলেন। তাঁর ব্রিটিশবিরোধী লেখা প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গেই শাসকমহল সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের সুসংরক্ষিত সিংহাসন যেন টলে ওঠে বিদ্রোহীর প্রলয়ঝঞ্ঝায়।

আর তাইতো যুগে যুগে তাঁর এই বিদ্রোহী সত্তা বা জীবনী নিয়ে অনেকেই অনেক গবেষণামূলক প্রবন্ধ লিখেছেন এবং লিখছেন। সমাজচৈতন্যে নজরুল মানস এর গভীরতার অতলস্পর্শ করে বাংলা সাহিত্যের গবেষকগণ গবেষণালব্ধ বহুমাত্রিক তথ্য উপস্থাপন করে কাজী নজরুলের জীবন ও মানসলোকের সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম বিশ্লেষণ করে অনেক গবেষক নানা গবেষণালব্ধ প্রবন্ধ রচনা করেছেন। নজরুল গবেষক অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম তাঁদের মধ্যে একজন এবং অন্যতম। তিনি কাজী নজরুল ইসলামের জীবন ও সৃষ্টিকর্ম নিয়ে গত পাঁচ দশকের অধিককাল ধরে চর্চা করেছিলেন। বাংলাদেশের বিশিষ্ট মননশীল লেখক, ভাষাতত্ত্ববিদ ও নজরুল বিশেষজ্ঞ জাতীয় অধ্যাপক ড. রফিকুল ইসলাম। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের প্রথম নজরুল অধ্যাপক এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নজরুল-গবেষণা কেন্দ্রের প্রথম পরিচালক।

তাঁর নজরুল চর্চার প্রথম উদ্যম নজরুলের রচনাসমগ্রের কালানুক্রমিক ও বর্ণনাক্রমিক রচনাপঞ্জী ‘নজরুল- নির্দেশিকা’। তাঁর গবেষণার একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ নজরুলের জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত জীবনকথা এবং রচনা বা প্রকাশের ক্রম ধরে নজরুলের মৌলিক কবিতাবলির সামগ্রিক মূল্যায়ন কাজী নজরুল ইসলাম : জীবন ও সৃজন। তাঁর গবেষণা কর্মের জন্য তাঁকে কবিতীর্থ চুরুলিয়া ‘নজরুল একাডেমি পুরস্কার’, ‘বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার’ এবং ‘নজরুল ইন্সটিটিউট নজরুল-স্মৃতি পুরস্কার’ এবং রাষ্ট্রীয় সম্মাননা ‘একুশে পদক’ প্রদান করা হয়।

কাজী নজরুল ইসলাম: জীবন ও সৃজন বইটি নজরুল ইনস্টিটিউট থেকে প্রকাশিত হয়। বইটির এ পর্যন্ত তিনবার সংস্করণ হয়েছে ২০১২, ২০১৬ এবং ২০১৮ সালে। এ বইটি নজরুল গবেষক অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম তাঁর বাবা, মা এবং ভাই যাঁরা পরলোকগত তাঁদের অম্লান স্মৃতির উদ্দেশে উৎসর্গ করেছেন।

কাজী নজরুল ইসলাম : জীবন ও সৃজন গ্রন্থের প্রথম ভাগেই আমরা দেখতে পাই, নজরুল-জীবনী কালানুক্রমিক ও ধারাবাহিকভাবে (কাজী নজরুল : জীবনকথা―প্রথম অধ্যায় : বাল্য ও কৈশোর কাল থেকে অষ্টাদশ অধ্যায় : জীবনের শেষ দিনগুলো পর্যন্ত) বর্ণনা করা হয়েছে। এরপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে নজরুলের সাহিত্যিক জীবনের ওপরে। এই গ্রন্থের দ্বিতীয় ভাগে রয়েছে নজরুলের মৌলিক কবিতাবলির রচনা বা প্রকাশের কালানুক্রমিক, বিষয়ভিত্তিক (প্রথম অধ্যায় : সমকালীন বাংলা কবিতা থেকে ত্রয়োদশ অধ্যায় : নজরুল কাব্য পর্যন্ত) সামগ্রিক বিশ্লেষণ। গ্রন্থের তৃতীয় ভাগে নজরুলের গদ্য রচনার ( কাজী নজরুল ইসলামের প্রবন্ধ, গল্প, উপন্যাস, নাটক ও সঙ্গীত―প্রথম অধ্যায় : নজরুলের প্রবন্ধ থেকে নজরুল গ্রন্থপঞ্জী, নজরুল-জীবনী উপাদান সম্বলিত গ্রন্থপঞ্জী) পর্যালোচনা বা উল্লেখ করা হয়েছে। গ্রন্থের প্রথম ভাগে নজরুল-জীবনী পুনর্গঠনের মাধ্যমে কাজী নজরুল ইসলামকে কিংবদন্তির রাজ্য থেকে উদ্ধার করে তথ্যভিত্তিক পেক্ষাপটে স্থাপন করার চেষ্টা করা হয়েছে। দ্বিতীয় ও তৃতীয় ভাগে অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গিতে নজরুল সাহিত্য ও সঙ্গীতের মূল্যায়ন করেছেন। এ ছাড়া পরিশিষ্টতে রয়েছে সমসাময়িককালে নজরুলের মূল্যায়ন।

৭৬০ পৃষ্ঠার এই সুবৃহৎ বইটির মধ্যে থেকে আমি রফিকুল ইসলামের তৃতীয় ভাগের কাজী নজরুল ইসলামের প্রবন্ধ, গল্প, উপন্যাস, নাটক ও সঙ্গীত এর প্রথম অধ্যায় : ‘নজরুলের প্রবন্ধ’ অংশটুকু নিয়ে আলোচনা করার চেষ্টা করেছি। অনেকটা বিন্দুর মাঝে সিন্ধুর উচ্ছ্বাস জাগানো বা ক্ষুদ্রের মাঝে বৃহতের প্রকাশ ঘটানোর চেষ্টা করেছি।

কাজী নজরুল নবযুগ, ধূমকেতু, গণবাণী ও লাঙল পত্রিকায় যেসব সম্পাদকীয় প্রবন্ধ প্রকাশ করেন, মূলত সেগুলোই পরবর্তীকালে পরিমার্জন করে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়। নজরুলের পাঁচটি প্রবন্ধ গ্রন্থ পাওয়া যায়। এগুলো হচ্ছে : যুগবাণী (১৯২২), রাজবন্দির জবানবন্দি (১৯২৩), দুর্দিনের যাত্রী (১৯২৬) রুদ্র-মঙ্গল (১৯২৬) এবং ধূমকেতু (১৯৬১)। ১৯২০ সালের খেলাফত ও অসহযোগ আন্দোলন তীব্র আকার ধারণ করলে তৎকালীন ভারতের হিন্দু-মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের মধ্যে রাজনৈতিক চেতনার উন্মেষ ঘটে। সাধারণের মধ্যেও তীব্র হতে থাকে ইংরেজ বিরোধী অবস্থান। এই উত্তপ্ত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে আন্দোলনের চেতনা গভীরভাবে উঠে আসে নজরুলের প্রবন্ধে। তাঁর প্রবন্ধ পাঠে সাধারণ জনমানসের মাঝে বিপ্লবী চেতনা সঞ্চারিত হওয়ার প্রয়াস লক্ষ্য করা যায়।

আলোচ্য গ্রন্থের প্রথমেই ‘তুর্ক মহিলার ঘোমটা খোলা’ প্রবন্ধ সম্পর্কে বলা হয়েছে। নজরুলের প্রকাশিত প্রথম প্রবন্ধ হচ্ছে ‘তুর্ক মহিলার ঘোমটা খোলা’ এটা সওগাত কার্তিক ১৩২৬ বঙ্গাব্দে করাচি সেনানিবাসে রচিত এবং কলকাতায় প্রকাশিত হয়।

১৩২৬ সালের ভাদ্র সংখ্যা ‘ভারতবর্ষে’ সুলেখক হেমেন্দ্রেবাবু ‘সঞ্চয়ে’ New York Herald নামক আমেরিকান সংবাদপত্রের অচিন লেখকের তুর্কদের সম্বন্ধে অভিজ্ঞতা ভিত্তি করে অনেকটা পরের মুখে ঝাল খেয়ে বলেছিলেন, ‘তুর্কী রমণীরা একেবারেই সুন্দরী নয়।’ কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর প্রবন্ধে ওই বক্তব্যের অসারতা প্রমাণ করার জন্যই মূলত লিখেছিলেন ‘তুর্ক মহিলার ঘোমটা খোলা’ প্রবন্ধটি এবং তুর্কী রমণীর অপরূপ সৌন্দর্য সম্বন্ধে নিজস্ব ধারণা তুলে ধরেছিলেন সেখানে। সুতরাং বলা যায়, নজরুলের প্রথম প্রকাশিত প্রবন্ধ একটি প্রতিক্রিয়াজাত রচনা।

এর পরে আমরা দেখতে পাই, বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকা থেকে ১৩২৭ বঙ্গাব্দে ‘জননীদের প্রতি’, ‘পশুর খুঁটিনাটি বিশেষত্ব’ ও ‘জীবন বিজ্ঞান’ নামে প্রকাশিত হয় তিনটি রচনার ভাবানুবাদ। এ ছাড়া মোসলেম ভারত পত্রিকার ১৩২৭ জ্যৈষ্ঠ সংখ্যায় প্রকাশিত হয় ‘শাত-ইল-আরবের পরিচিতি টাইগ্রিস’ ও ইউফ্রেটিস বা দজলা ও ফোরাত নদীর মিলিত প্রবাহের চিত্র পরিচিতি। কিন্তু নজরুলের প্রথম প্রকাশিত মৌলিক প্রবন্ধ হলো ‘উদ্বোধন’। পরে এই প্রবন্ধটি ‘জাগরণী’ নামে যুগবাণী গ্রন্থে সংকলিত হয়। ‘উদ্বোধন’ বা ‘জাগরণী’ অনাদৃতা বকুল ফুল নিয়ে ছোট্ট একটি আবেগপ্রবণ রচনা। এ প্রবন্ধটি শুরু হয়েছিল বকুল ফুল ফোটাতে। তা শাশ্বত বাঙালির প্রাণ এবং যৌবনকে জয়যুক্ত করার, জাগ্রত করার জন্য প্রমথ চৌধুরীর আহ্বান ‘যৌবনে দাও জয়টিকা’ আর সঙ্গে সঙ্গে তা প্রাবন্ধিক নজরুলের প্রবন্ধাবলির মৌল আবেগকে চিহ্নিত করে।

যুগবাণী নজরুলের প্রথম প্রবন্ধ সংকলন হলেও প্রাবন্ধিক হিসেবে তাঁর প্রতিভা এবং রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ধ্যান-ধারণা, মূল্যবোধ ও দৃষ্টিভঙ্গির পরিচয় পাওয়া যায় নজরুলের সাংবাদিক হওয়ার পর থেকে। সান্ধ্য দৈনিক নবযুগ (১৯২০), অর্ধ সাপ্তাহিক ধূমকেতু (১৯২২), সাপ্তাহিক লাঙল (১৯২৫-২৬) এবং সাপ্তাহিক গণবাণী (১৯২৬), তে সমকালীন দেশকাল ও আন্তর্জাতিক বিশ্বের ঘটনাবলি নিয়ে প্রকাশিত নজরুলের রচনা বা নিবন্ধে। এ ছাড়া আমরা এ বইটিতে দেখতে পাই, সাহিত্য ও সংগীত বিষয়ে তাঁর উজ্জ্বল রচনা বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল। ১৯২০ খ্রিস্টাব্দের মে মাসে মুজফ্ফর আহমদ ও কাজী নজরুল ইসলাম দৈনিক নবযুগ পত্রিকা প্রকাশ করেছিলেন এ কে ফজলুল হকের পৃষ্ঠপোষকতায়। প্রথম মহাযুদ্ধের কালে বিশের দশকে ভারতে অসহযোগ ও খিলাফত আন্দোলনের ফলে যে উত্তপ্ত রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল তার প্রতিফলনের জন্য বাঙালি মুসলমান সমাজের কোনও মুখপাত্র ছিল না, নবযুগ সে অভাব পূরণ করে। নবযুগ-এ প্রকাশিত কিছু সম্পাদকীয় প্রবন্ধ নিয়ে প্রকাশিত হয় নজরুলের প্রথম প্রবন্ধ সংকলন যুগবাণী ১৯২২ খ্রিস্টাব্দে। পরবর্তীকালে সে গ্রন্থখানি বাজেয়াপ্ত হয়েছিল। এই বইটিতে সমস্ত বিষয়ের পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনা করেছেন রফিকুল ইসলাম। যুগবাণী গ্রন্থে ২১টি প্রবন্ধ নিয়েই আলোচনা করেছেন। প্রবন্ধগুলোতে পরাধীনতার গ্লানি দূর করার প্রত্যক্ষ চেতনা ও প্রতিরোধের প্রবল সুর স্পন্দিত হয়েছে।

যুগবাণী গ্রন্থের প্রথম প্রবন্ধ ‘নবযুগ’ লিখিত হয়েছিল নবযুগ পত্রিকা প্রকাশ উপলক্ষেই, কিন্তু তার মধ্য দিয়ে পরাধীন দেশসমূহ বিশেষত ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলন যে নব যুগের সৃষ্টি করেছিল তার উজ্জ্বল চিত্র অঙ্কিত হয়েছে। বিশের দশকে ভারত ও পৃথিবীর অন্যান্য দেশের মুক্তিকামী সংগ্রামী মানুষের উন্মাদনার এক বিশ্বস্ত দলিল এই ‘নবযুগ’। প্রবন্ধটিতে নজরুল ইসলামের সমাজসচেতনতা-বিশ্বসচেতনতা এবং যুগচেতনার পরিচয় সুস্পষ্টভাবে প্রকাশিত হয়েছে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধোত্তর সময়ে ভারতবর্ষসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে পরাধীনতার শৃঙ্খল ভাঙতে যে আন্দোলনের উত্তাল তরঙ্গ দেখা দেয় তারই সুস্পষ্ট আভাস প্রবন্ধে উচ্চকিত হয়েছে।

‘নবযুগ’ প্রবন্ধে নজরুল রুশ বিপ্লব, আয়ারল্যান্ডের স্বাধীনতার সংগ্রাম, সামন্ততান্ত্রিক শৃঙ্খলামুক্ত নতুন তুরস্ক এবং পরাধীন ভারতের মুক্তিসংগ্রামকে একই সূত্রে গ্রথিত করেছেন। বিশের দশকে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী অসহযোগ ও খিলাফত আন্দোলনের মধ্য দিয়ে ভারতে যে রাজনৈতিক জাগরণ ও সচেতনতা সৃষ্টি হয়েছিল এবং তার ওপর বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মুক্তিসংগ্রামের যে প্রভাব পড়েছিল সে তথ্য পাওয়া যায় ‘নবযুগ’ প্রবন্ধ থেকে। আর এ প্রবন্ধ থেকেই নজরুলের সাহিত্যিক সাংবাদিক জীবনের শুরু স্বদেশীয় ও আন্তর্জাতিক সচেতনতার পরিচয় পাওয়া যায়।

ব্রিটিশ পরাধীনতার শৃঙ্খল থেকে মুক্তির জন্য কাক্সিক্ষত বিপ্লবে ধর্ম-বর্ণনির্বিশেষ ভারতীয় সব নাগরিকের সমান অংশগ্রহণ তিনি প্রত্যাশা করেছেন। তাই অন্তরে মানবতার মশাল জ্বালিয়ে সব সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠে সম্মিলিত প্রতিরোধের আহ্বান জানিয়েছেন তিনি এ প্রবন্ধে।

ভারতবর্ষের স্বাধীনতা হারিয়ে ভারতবাসী যখন আত্মশক্তিতে আস্থা হারিয়ে কেবলই কান্নাজুড়ে দিয়েছে তখন কবি ডি এল রায় ভারতবাসীকে আশার বাণী শুনিয়েছেন তাঁর এক সংগীতে―‘গেছে দেশ দুঃখ নাই, আবার তোরা মানুষ হ’। স্বাধীনচেতা তারুণ্যদীপ্ত নবযুগের বাণীবাহক কবি কাজী নজরুল ইসলাম এই পঙ্ক্তিটিকেই শিরোনাম রূপে ব্যবহার করে সমকালীন মানুষের হতাশা দূর করার জন্য ‘গেছে দেশ দুঃখ নাই, আবার তোরা মানুষ হ’ প্রবন্ধটি রচনা করেছিলেন। পরাধীন মানুষ যখন হতাশা থেকে উদ্ভূত অনিশ্চয়তায় দৈবনির্ভর হয়ে পড়েছিল সেই মুহূর্তে নজরুলের প্রবন্ধ হতাশার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। প্রবন্ধের শুরুতেই তিনি লিখেছেন :

‘স্বাধীনতা হারাইয়া আমরা যখন আত্মশক্তিতে অবিশ্বাসী হইয়া পড়িলাম এবং আকাশ-মুখো হইয়া কোনও অজানা পাষাণ দেবতাকে লক্ষ্য করিয়া কেবলই কান্না জুড়িয়া দিলাম, তখন কবির কণ্ঠে আশার বাণী দৈববাণীর মতোই দিকে দিকে বিঘোষিত হইল, ‘গেছে দেশ দুঃখ নাই, আবার তোরা মানুষ হ’!” [ কাজী নজরুল ইসলাম: জীবন ও সৃজন: প্রবন্ধ, পৃ: ( ৬৩২ ) ]

 আলোচ্য বইয়ে যেমন নজরুলের আন্তর্জাতিক চেতনার পরিচয় পাওয়া যায় তেমনি দাসত্ব, মনুষ্যত্বহীনতা, আত্মমর্যাদাবোধ শূন্য কাপুরুষতার প্রতি তাঁর গভীর ঘৃণার পরিচয় ফুটে ওঠে। এ শৃঙ্খলমোচন কে করবে ? সে প্রশ্নের উত্তরও তিনি দেন, ‘আমরা’ কীভাবে তারও পথনির্দেশ, ‘ত্যাগ, বিসর্জন, উৎসর্গ বলিদান ছাড়া কী কখনও কোনও দেশ উদ্ধার হইয়াছে, না হইতে পারে ?’ নজরুল আলোচ্য প্রবন্ধে এই দুঃখ-কষ্টকে বাইরের ব্যাপার বলেছেন। তিনি সত্য মহান পবিত্র কার্যে সে আত্মতৃপ্তির ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। আর রফিকুল ইসলাম এ বিষয়গুলোই আলোচ্য গ্রন্থে সুন্দরভাবে তুলে ধরেছেন।

‘ডায়ারের স্মৃতিস্তম্ভ’ প্রবন্ধে নজরুলের বক্তব্য পরিহাসচ্ছলে প্রকাশিত হলেও তার মধ্যে একটা রূঢ় সত্য লুকায়িত রয়েছে। রফিকুল ইসলাম সে বিষয়গুলো এখানে তুলে ধরেছেন। তিনি স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন, মানুষের, জাতির, দেশের চরম অবনতির সময় ডায়ারের মতো নরপিশাচ জালিমের আবির্ভাব অত্যাবশ্যক হয়ে পড়ে। মানুষ যখন তার অধিকারের কথা বিস্মৃত হয়, জীবনের গতিচাঞ্চল্য বিসর্জন দেয়, মান-অপমান জ্ঞান ভুলে যায়। ভৃত্যজীবনকে পরম পাওয়া মনে করে তখন তাদের আঘাতের প্রয়োজন যা শত্রুর কাছ থেকেও আসতে পারে।

তাঁর মতে, ডায়ারের প্রতি নজরুল কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন আরও একটি কারণে। সেই জালিয়ানওয়ালাবাগের হতভাগাদের রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে হিন্দু-মুসলমান দুই ভাই গালাগালি করে কেঁদেছে। দুঃখের দিনেই প্রাণের মিলন সত্যিকারের মিলন হয়। এই মিলনের দৃশ্য বর্ণনায় তিনি আবার কবির কবিতায় আশ্রয় গ্রহণ করেছেন, ‘আমরা মিলেছি আজ মায়ের ডাকে’, নজরুল জালিয়ানওয়ালাবাগের হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে ভারতের দুটি প্রধান সম্প্রদায় হিন্দু ও মুসলমানের মিলনে মিলনে স্বপ্ন দেখেছেন। তিনি বলেছেন : ‘এস ভাই হিন্দু! এস ভাই মুসলমান! তোমার আমার ওপর অনেক দুঃখ-ক্লেশ, অনেক ব্যথা-বেদনার ঝড় বহিয়া গিয়াছে; আমাদের এ বাঞ্ছিত মিলন বড় কষ্টের ভাই! … আমাদের প্রীতি-বন্ধন অক্ষয় হোক। আমাদের এ মহামিলন চিরন্তন হোক।’ [কাজী নজরুল ইসলাম: জীবন ও সৃজন: প্রবন্ধ, পৃ: ( ৬৩৫ )]

সান্ধ্য দৈনিক নবযুগ পত্রিকায় কেবল পরাধীনতার বিরুদ্ধেই নজরুল সম্পাদকীয় প্রতিবেদন লেখেননি, কৃষক শ্রমিক শ্রেণির সমস্যা ও আন্দোলনের সমর্থনেও তিনি লিখেছেন। বাংলার কৃষকের দুরবস্থা সম্পর্কে ‘ধর্মঘট’ প্রবন্ধে তিনি লিখেছেন :

‘চাষি সমস্ত বৎসর ধরিয়া হাড়ভাঙা মেহনত করিয়া মাথার ঘাম পায়ে ফেলিয়াও দুই বেলা পেট ভরিয়া মাড়ভাত খাইতে পায় না; হাঁটুর ওপর পর্যন্ত একটা তেনা বা নেঙটা ছাড়া তাহার আর ভালো কাপড় পিরান পরা সারা জীবনেও ঘটিয়া ওঠে না, ছেলেমেয়েদের সাধ-আরমান মিটাইতে পায় না, অথচ তাহারই ধান-চাল লইয়া মহাজনেরা পায়ের ওপর পা দিয়া ১২ মাসে ৩৩ পার্বণ করিয়া নওয়াবী চালে দিন কাটাইয়া দেন!’ [কাজী নজরুল ইসলাম: জীবন ও সৃজন: প্রবন্ধ, পৃ: ( ৬৩৫ )]

এই উদ্ধৃতি থেকে বোঝা যায়, নজরুল শুধু বিদেশি শাসনের বিরুদ্ধেই নয় স্বদেশি শোষণের বিরুদ্ধেও সোচ্চার ছিলেন। শ্রমিকদের বিশেষত : কয়লাখনির মজুরদের অমানবিক জীবন সম্পর্কেও তিনি লিখেছেন, যাদের তিনি রানীগঞ্জ কয়লাখনি অঞ্চলে দেখেছেন, প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা থেকে কয়লাখনি শ্রমিকদের অবস্থা তিনি তুলে ধরেছেন।

নজরুল কয়লাখনি শ্রমিকদের বাস্তবচিত্র অঙ্কন করে তাদের ধর্মঘটের সমর্থনে ব্যুরোক্র্যাসি বা আমলাতন্ত্রের বিরুদ্ধে লিখেছেন, তিনি শ্রমজীবীদের সংগ্রাম ও গণতন্ত্রের সংগ্রামকে একসূত্রে গ্রথিত দেখতে চেয়েছেন। রফিকুল ইসলাম বলেছেন, আমলাতন্ত্রের দুঃশাসনের বিরুদ্ধে শ্রেণিসংগ্রাম ও গণতান্ত্রিক সংগ্রামকে অভিন্নরূপে প্রত্যক্ষ করার সংকল্প নজরুলের আগে বাংলা সাহিত্যে অপর কোনও লেখকের লেখায় প্রকাশিত হয়েছে কি না, জানা নেই। নজরুলের রাজনৈতিক ও শ্রেণিসচেতনতা যে কতটা অগ্রসরমান ছিল ‘ধর্মঘট’ প্রবন্ধে তার পরিচয় বিধৃত। যুক্তিযুক্ত ধর্মঘটের পক্ষে সমর্থন দিয়ে মেহনতি মানুষের দরদি কবি কাজী নজরুল ইসলাম ‘ধর্মঘট’ প্রবন্ধে এ ধর্মঘটের কারণ ও অভিপ্রায় ব্যাখ্যা করেছেন।

‘লোকমান্য তিলকের মৃত্যুতে বেদনাতুর কলিকাতার দৃশ্য’ প্রবন্ধে স্মৃতিচারণে প্রাধান্য পেয়েছে একজন জনপ্রিয় রাজনৈতিক নেতার প্রয়াণে শোকাতুর মানুষের মিলনের দৃশ্য। শোকাতুর হিন্দু, মুসলমান, মাড়োয়ারি, বাঙালি হিন্দুস্তানিরা যে তাদের ভেদাভেদ, জাতবিচার ভুলে এক হয়ে গিয়েছিল সেটাই নজরুলকে অনুপ্রাণিত করেছে সর্বাধিক।

হিন্দু-মুসলমানের মিলন কামনা নজরুলের বিশ্বাসের অঙ্গ ছিল, লোকমান্য তিলকের মৃত্যুতে শোকাতুর জনতার মধ্যে তা প্রত্যক্ষ করে নজরুল ওই সাময়িক মিলনকে চিরন্তন দেখতে চেয়েছিলেন। মহারাষ্ট্রের রাজনৈতিক নেতা লোকমান্য তিলক ধর্ম ও রাজনীতির মধ্যে পার্থক্য বা সীমারেখা টানতেন না, তাঁকে ধর্মনিরপেক্ষ রাজনীতিবিদও বলা চলে না, কিন্তু তাঁর মৃত্যুতে বিভিন্ন ধর্মসম্প্রদায়ের মিলনের দৃশ্য নজরুলের হৃদয়ে গভীর দাগ কেটেছিল আর সে জন্যই আলোচ্য প্রবন্ধে নজরুলের অনুরূপ আবেগের প্রকাশ ঘটে। সে বিষয়গুলো রফিকুল ইসলাম আলোচ্য গ্রন্থে তুলে ধরেছেন।

‘মুহাজিরীন হত্যার জন্য দায়ী কে ?’ প্রবন্ধে দেখতে পাই, বিশের দশকে খেলাফত আন্দোলনের ফলে ভারতীয় মুসলমানদের মধ্যে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া হয়েছিল তার একটি ছিল, বহু ভারতীয় মুসলমানের কাছে আর ভারতবর্ষ বাসযোগ্য বলে বিবেচিত থাকেনি। ফলে দেশত্যাগ শুরু করে। ইতোপূর্বে ১৯১৯ খ্রিস্টাব্দের মে মাসের তৃতীয় ব্রিটিশ-আফগান যুদ্ধের মাধ্যমে আফগানিস্তান স্বাধীন রাষ্ট্রের স্বীকৃতি লাভ করে। আফগান বাদশাহ আমানুল্লাহ ভারতীয় মুসলমানদের দেশ ত্যাগে উৎসাহ দেন। ১৯২০ খ্রিস্টাব্দের মে মাস থেকে ভারতীয় মুসলমানদের দেশত্যাগ শুরু হয় এবং সিন্ধু, সীমান্ত প্রদেশ, পাঞ্জাব ও ভারতের অন্যান্য স্থান থেকে প্রায় ১৮ হাজার মুসলমান ওই সময় দেশত্যাগ করে আফগানিস্তানের পথে চলে যান। ভারতীয় মুহাজিরদের প্রথম দলটি মে মাসে কাবুল পৌঁছান। তাঁদের একাংশের উদ্দেশ্য ছিল আফগানিস্তানে বসবাস করা কিন্তু বেশির ভাগ মুহাজিরের লক্ষ্য ছিল আনাতোলিয়ায় গিয়ে তুরস্কের পক্ষে যুদ্ধ করা। নজরুল সান্ধ্য দৈনিক নবযুগ পত্রিকায় ভারত ত্যাগ করার সময় ওই মুহাজিরিনরা কীভাবে নির্যাতিত হয়েছিলেন তা লিখেছিলেন এই প্রবন্ধে। আলোচ্য প্রবন্ধে মুহাজিরদের ট্র্যাজেডি জ্বলন্তভাবে রূপায়িত হয়।

নবযুগ পত্রিকায় প্রকাশিত এবং যুগবাণী গ্রন্থে সংকলিত ‘বাংলা সাহিত্যে মুসলমান’ প্রবন্ধে নজরুলের সাহিত্যচিন্তার পরিচয় পাওয়া যায়। নজরুল কলকাতায় তাঁর সাহিত্যিক জীবনের শুরুতেই এই প্রবন্ধ লিখেছিলেন। সুতরাং এই লেখায় তরুণ ‘সাহিত্যিক’ নজরুলের ধ্যান-ধারণার পরিচয় মেলে। এটি একটি সাহিত্য-সমালোচনাবিষয়ক প্রবন্ধ। প্রবন্ধের শুরুতেই নজরুল বাঙালি মুসলমান সমাজ বাংলা ভাষাকে মাতৃভাষারূপে স্বীকার করে নেওয়ায় আনন্দ প্রকাশ করেছেন। বাংলা সাহিত্যে স্থায়ী আসন লাভের জন্য তরুণ বাঙালি মুসলমান লেখকদের সাধনা নজরুলকে আশাবাদী করে তোলে। নজরুল এ প্রবন্ধে বলেছেন :

 ‘এখন আমাদের বাংলা সাহিত্যে স্থায়ী প্রভাব বিস্তার করিতে হইলে সর্বপ্রথম আমাদের লেখার জড়তা দূর করিয়া তাহাতে ঝর্ণার মতো ঢেউভরা চপলতা ও সহজ মুক্তি আনিতে হইবে। যে সাহিত্য জড়, যার প্রাণ নাই, সে নির্জীব সাহিত্য দিয়া আমাদের কোনও উপকার হইবে না, আর তাহা স্থায়ী সাহিত্যও হইতে পারে না। বাংলা সাহিত্যে রবীন্দ্রনাথ ছাড়া খুব কম লেখকেরই লেখায় মুক্তির জন্য উদ্দাম আকাক্সক্ষা ফুটিতে দেখা যায়।’ [কাজী নজরুল ইসলাম: জীবন ও সৃজন: প্রবন্ধ, পৃ: (৬৩৮-৬৩৯)]

নজরুল মতে, সাহিত্যে প্রাণের অভাব রয়েছে। আমাদের জীবন ভয়ানক একঘেয়ে, বৈচিত্র্যহীন, সৌন্দর্যহীন এবং জন্ম থেকেই দার্শনিক গম্ভীর প্রকৃতির।

ফলে আমাদের সাহিত্যিকদের লেখার মধ্যে তারুণ্যের বা প্রাণশক্তির অভাব রয়েছে। তদুপরি আমাদের যুবকেরা অল্প বয়সেই দার্শনিক হয়ে ওঠে, ফলে চলনে-বলনে গাম্ভীর্য চলে আসে। এই গাম্ভীর্যের অপর নাম অচেতন। চলার আনন্দ বঞ্চিত হয়ে জড়ের মতো পড়ে থাকায় প্রাণশক্তি মারা পড়ে। তাই সাহিত্যের মুক্তধারায় প্রত্যাশিত চলার আনন্দ, স্রোতের বেগবানতা ও ঢেউয়ের চঞ্চলতা আমাদের তরুণ লেখকদের লেখায় খুঁজে পাওয়া যায় না। রফিকুল ইসলাম নজরুলের এই বক্তব্যের মাঝে প্রমথ চৌধুরীর সাহিত্যচিন্তার অনুরণন খুঁজে পান। প্রমথ চৌধুরী যেমন তাঁর একটি প্রবন্ধে যৌবনে রাজটিকা প্রদানের অর্থাৎ যৌবন শক্তিকে জাগ্রত করার কথা বলেছিলেন, নজরুলও তেমনি আলোচ্য প্রবন্ধে তরুণ সম্প্রদায়কে জরামুক্ত হতে বলেছেন। তিনি লিখেছেন :

‘অনেক যুবকের লেখা দেখিয়া মনে হয়, ইহা যেন কোনও এক জরাগ্রস্ত বুড়োর লেখা; তাহাতে না আছে প্রাণ, না আছে চিন্তাশক্তি, না আছে ভাব,―শুধু আবর্জনা, কঙ্কাল আর জড়তা।’ [কাজী নজরুল ইসলাম: জীবন ও সৃজন: প্রবন্ধ, পৃ: ( ৬৩৯ )]

নজরুলের এই পর্যালোচনা থেকে নজরুলের আগে অর্থাৎ ২০ শতকের প্রথম দুই দশকের তরুণ মুসলমান সাহিত্যিকদের সাহিত্যচর্চার চিত্র ফুটে উঠেছে। বলাবাহুল্য যে নজরুলের প্রথম বাঙালি সাহিত্যিক যে শুধু বাঙালি মুসলমান সমাজের নয় বরং সমগ্র বাঙালি জাতির জীবন ও সাহিত্যকে জরামুক্ত করেন, যৌবনে রাজটিকা দেন, জাতির জীবনে বসন্তের রং লাগান আর সে জন্যই রবীন্দ্রনাথ তাঁকে ‘বসন্ত’ গীতিনাট্য উৎসর্গ করেছিলেন। নজরুল আলোচ্য প্রবন্ধে সমকালীন সাহিত্যের সংকীর্ণতা, ভণ্ডামি, অসত্য ও ব্যাধির সমালোচনা করেছেন। তাঁর কাছে সাহিত্য, লেখকের প্রাণের সত্য অভিব্যক্তি, তাঁর মতে লেখকের প্রাণ হবে আকাশের মতো উন্মুক্ত উদার, তাতে কোনও ধর্মবিদ্বেষ, জাতিবিদ্বেষ, বড়-ছোট ভেদাভেদ থাকবে না। নজরুলের ওই কথাগুলোর মধ্যে নজরুলের সাহিত্যিক আদর্শের পরিচয় স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। নজরুল একই প্রবন্ধে বিশ্বসাহিত্যের কথাও লিখেছেন, তাঁর ধারণায় সাহিত্য হচ্ছে বিশ্বের, সাহিত্য একজনের হতে পারে না, নজরুল সাহিত্যের জন্য অপরিহার্য সার্বজনীনতার ওপরও গুরুত্ব প্রদান করেছেন।

‘রবীন্দ্রনাথের জগৎজোড়া খ্যাতির কারণ হিসেবে নজরুল বিশ্ব সাহিত্য সৃষ্টিতে রবীন্দ্রনাথের সফলতাকে নির্দেশ করেছেন। প্রসঙ্গক্রমে তিনি লিখেছেন, যা বিশ্বসাহিত্যে স্থান পায় না, তা স্থায়ী সাহিত্য নয়। তিনি অবশ্য নিজের দেশীয় ও জাতীয় বৈশিষ্ট্যকে বিসর্জন না দিয়ে সার্বজনীন সাহিত্য সৃষ্টির কথা বলেছেন এবং এ বিষয়ে সৃষ্টিশীল সাহিত্যিক বিশেষত ঔপন্যাসিক, কবি ও ছোটগল্পকারদের দায়িত্বের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। যদিও প্রবন্ধের শুরুতে নজরুলের বক্তব্য ছিল বাঙালি মুসলমান তরুণ সাহিত্যিকদের উদ্দেশে কিন্তু উপসংহারে তিনি বলেছেন, “এসব কথা আমরা শুধু কোনও বিশেষ লেখক সম্প্রদায়কে উল্লেখ করিয়া বলিতেছি না।’ প্রবন্ধের শেষে তিনি সাহিত্য থেকে আর্টে প্রবেশ করেছেন এবং বলেছেন ‘আর্ট-এর অর্থ সত্যের প্রকাশ এবং সত্য মাত্রেই সুন্দর, সত্য চিরমঙ্গলময়।’ এই প্রবন্ধটি নজরুলের সাহিত্যিক ও নন্দনতাত্ত্বিক চেতনার পরিচয়ের জন্য উল্লেখযোগ্য।” [কাজী নজরুল ইসলাম: জীবন ও সৃজন: প্রবন্ধ, পৃ: (৬৩৯- ৬৪০)]

নজরুল ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছেন অসংখ্য লেখায়। তিনি ভারতবর্ষে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠায় সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়েছেন। হিন্দু-মুসলমানের বিরোধ দূর করতে ছিলেন সদা তৎপর। তাঁর কাব্যভাবনার বিশাল অংশজুড়ে রয়েছে হিন্দু-মুসলমান মিলনকামনা। আধুনিক বাংলা কাব্যে নজরুলই একমাত্র কবি, যিনি একইসঙ্গে হিন্দু ও মুসলমান উভয় ঐতিহ্যকে দক্ষতার সঙ্গে ব্যবহার করেছেন। ঐতিহাসিকভাবে দেখলে হিন্দু-মুসলিম বাঙালির ধর্মীয় আবদ্ধতা ও গোঁড়ামি এবং চিন্তা-চেতনার সীমাবদ্ধতা ও নিশ্চলতার মধ্যে প্রায় এককভাবে জাগৃতিক বেগ ও ব্যাপকতা এনেছিলেন নজরুল। গোটা বাঙালি জাতিকে তিনি জাগিয়ে দিতে চেয়েছিলেন ওই চেতনার প্রজ্জ্বল শিখায়।

প্রাবন্ধিক দেখিয়েছেন ‘ছুৎমার্গ’ প্রবন্ধে কাজী নজরুল ইসলাম জাতিভেদ প্রথা সম্বন্ধে লিখতে গিয়ে ওই প্রথাকে তিনি হিন্দু-মুসলমান সাম্প্রদায়িক সমস্যার প্রধান কারণ হিসেবে নির্দেশ করেছেন।

‘রাজনীতির দিক দিয়ে হিন্দু-মুসলমানে প্রাণের মিলনের চেষ্টা করাটাকে হাস্যস্পদ ব্যর্থ বলে আখ্যায়িত করেন। সত্যিকারের মিলন আর স্বার্থের চেয়ে আসমান-জমিন তফাৎ তিনি তার উল্লেখ করে লিখেছিলেন, প্রাণে প্রাণে পরিচয় হইয়া যখন প্রাণ মানুষের গড়া সমস্ত বাজে বন্ধনের ভয়ভীতি দূরে সরাইয়া সহজ সংকোচে মিশিতে পারে, তখনই সে মিলন সত্যিকারের হয়; আর যে-মিলন সত্যিকার, তাহাই চিরস্থায়ী, চিরন্তন।’ [কাজী নজরুল ইসলাম : জীবন ও সৃজন: প্রবন্ধ, পৃ: (৬৪০)]

ধর্মান্ধতা নিয়ে রবীন্দ্রনাথও গভীরভাবে চিন্তিত ছিলেন, যার পরিচয় তাঁর ঘরে-বাইরে উপন্যাস এবং কালান্তর প্রবন্ধ সংকলনে পাওয়া যায়। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ বা নজরুলের মতো কোনও রাজনৈতিক নেতা সমস্যার গভীরে প্রবেশ করেননি বা করতে চাননি।

উপেক্ষিত শক্তির উদ্বোধন

সাম্প্রদায়িকতা শুধু ধর্মীয় বা সামাজিক নয় অর্থনৈতিকও বটে ‘উপেক্ষিত শক্তির উদ্বোধন’ প্রবন্ধে নজরুলের এ উপলব্ধিরই প্রকাশ ঘটেছে। এ প্রবন্ধের ওপরে রবীন্দ্রনাথের দুটি বিখ্যাত পঙ্ক্তি উদ্ধৃত, ‘হে মোর দুর্ভাগা দেশ! যাদের করেছ অপমান, অপমানে হবে তাদের সবার সমান।’ নজরুল দেশের মহাজাগরণের দিনে দেশের তথাকথিত ‘ছোটলোক সম্প্রদায়’-এর কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন, অভিজাত গর্বিত সম্প্রদায় ওই হতভাগ্যদের অনুরূপ নামকরণ করেছে। কিন্তু নজরুলের মতে ওই তথাকথিত ‘ছোটলোক’-এর অন্তর কাচের ন্যায় স্বচ্ছ আর ওই আভিজাত্য গর্বিত ‘ভদ্রলোকের’ অন্তরমসিময় অন্ধকার। ভদ্রলোক ও ছোটলোক অর্থাৎ সমাজের উঁচু ও নিচু শ্রেণির মানুষ। ‘ছুঁৎমার্গ’ প্রবন্ধে তিনি জাতিভেদ প্রথার সমালোচনা করেছিলেন আর আলোচ্য প্রবন্ধে অর্থনৈতিক শ্রেণিবিভক্ত সমাজব্যবস্থার বিরুদ্ধে তিনি সমালোচনা করেছেন। নজরুলের মতো সমাজের নিচের তলার মানুষকে অবহেলার কারণেই আজ সমাজের এই অধঃপতন আর এ জন্যই দেশে জনশক্তি বা গণতন্ত্র গঠিত হতে পারছে না। তিনি মহাত্মা গান্ধীর রাজনৈতিক সফলতার কারণরূপে ওই অবহেলিত শ্রেণির সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক স্থাপনকে নির্দেশ করেছেন। এই প্রক্রিয়াকে নজরুল ‘উপেক্ষিত শক্তির উদ্বোধন’ বলেছেন। তাঁর মতে ভারতবাসীর শোচনীয় অধঃপতনের কারণ আত্মার অবমাননা। তাই প্রবন্ধের উপসংহারে তিনি লিখেছেন :

‘এই আত্মার অপমানে যে অনাদি অনন্ত মহা-আত্মারই অপমান করা হয়। … খোদার সৃষ্ট―তাহার আনন্দের বিকাশস্বরূপ এই মানুষকে ঘৃণা করিবার অধিকার তোমাকে কে দিয়াছে ? তোমাকেই বা বড় হইবার অধিকার কে দিয়াছে ? তুমি কিসের জন্য ভদ্র বলিয়া মনে কর ? এসব যে তোমারই নিজের সৃষ্টি, খোদার ওপর খোদকারী। এ মহা অপরাধের মহাশাস্তি হইতে তোমার রক্ষা নাই,―রক্ষা নাই!’ [কাজী নজরুল ইসলাম: জীবন ও সৃজন: প্রবন্ধ, পৃ: (৬৪২ )]

রফিকুল ইসলাম বলেছেন, নজরুল এই প্রবন্ধে সমাজের ব্রাত্য বা পতিতদের প্রতি যে সমবেদনার প্রকাশ করেছেন তার মধ্যে শ্রেণি-সচেতনতা প্রচ্ছন্ন। যে চেতনা এখানে মুখ্য তা হলো মানবিক মূল্যবোধ বা শাশ্বত মানবধর্মের বাণী।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধোত্তর বিশ্বের দেশে দেশে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রচণ্ড উত্তপ্ত অবস্থা বিরাজ করছিল। নিপীড়িত-নির্যাতিত পরাধীন জাতিসমূহের মধ্যে জেগে ওঠে স্বাজাত্যবোধ এবং গণজাগরণ। রাশিয়ার সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব এবং শ্রমিক শ্রেণির ক্ষমতা দখল বিশ্বের পরাধীন মানুষের বুকে আশার সঞ্চার করেছে। ভারতবর্ষের মানুষের চৈতন্যে এ ঢেউ এসে লেগেছে। তারা নানাভাবে আমলাতন্ত্রের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে উঠেছে, আমলারা তখন গণজাগরণের মুখে দিশেহারা―এমনই পেক্ষাপটে জনগণকে দাবিয়ে রাখতে তাদের মুখ বন্ধ করতে প্রয়াস পেয়েছে। এমন পেক্ষাপটে আমলাতন্ত্রকে শ্লেষবিদ্ধ বা ব্যঙ্গ করে নজরুল ইসলাম লিখেছেন ‘মুখবন্ধ প্রবন্ধটি’।

‘রোজ কেয়ামত বা প্রলয় দিন’ প্রবন্ধটি একজন বহুদর্শী বিজ্ঞ বৈজ্ঞানিকের পৃথিবী ধ্বংসের দিন সম্পর্কে বক্তব্যের জবাবে লিখিত একটি তথ্যবহুল বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধ।

‘বাঙালির ব্যবসাদারি’ প্রবন্ধটিও ব্যঙ্গাত্মক । বাঙালি হিন্দু-মুসলমানের ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রতি ঝোঁক দেখে তিনি লিখেছেন, ‘বাণিজ্যে বসতি লক্ষ্মী’। শিল্প-বাণিজ্যে উন্নতি করতে না পারলে জাতির পতন অবশ্যম্ভাবী, সত্যের ওপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত না করলে বাণিজ্যেরও পতন তেমনি অবশ্যম্ভাবী। এই সতর্কবাণী উচ্চারণ করেছেন কাজী নজরুল ইসলাম।

নজরুল বাঙালির মনুষ্যত্বহীনতা ভণ্ডামি, অসত্য, ভীরুতা ও কাপুরুষতার কারণ নির্দেশ করেছেন তাঁর ‘আমাদের শক্তি স্থায়ী হয় না কেন ?’ প্রবন্ধে। তাঁর মতে, বাঙালি অধীন ও চাকরিজীবী এবং ওই পেশাই বাঙালির দুর্বলতার কারণ। চাকরির পেশাকে তিনি দাসত্ব বলেছেন, যে জাতির মধ্যে ব্যবসা-বাণিজ্য কৃষিশিল্প যত বেশি, সে জাতির মধ্যেই স্বাধীনচিত্ত লোকের সংখ্যা তত বেশি, আর যে জাতির জনসংঘের অধিকাংশের চিত্ত স্বাধীন, সে জাতি বড় না হয়ে পারে না।

‘কালা আদমিকে গুলি মারা’ এ প্রবন্ধে রফিকুল ইসলাম নজরুলের দুঃখকে চিহ্নিত করেছেন। নজরুল লিখেছেন, ‘একটা কুকুরকে গুলি মারার সময় সাদা আদমিরা একটু একটু ভয় পায় কিন্তু এই কালা আদমিকে গুলি করার সময় সাদা আদমিদের সে ভয়ও থাকে না।’ অর্থাৎ সাদা আদমির চোখে কালা আদমি পশুর চেয়েও অধম। জালিয়ানওয়ালাবাগ, কালিকট প্রভৃতি স্থানে নিরস্ত্র জনতার ওপর গোরাদের নির্বিচার গুলিবর্ষণের কথা উল্লেখ করে নজরুল ওই বর্বরতার জন্য খোদ কর্তা বা সরকারকে দায়ী করেছেন। প্রবন্ধের উপসংহারে তিনি এইসব নির্মম হত্যাকাণ্ডের প্রতিক্রিয়ায় দেশবাসীর জাগরণের কথা বলেছেন।

‘শ্যাম রাখি না কুল রাখি’ এ প্রবন্ধ একটি ব্যঙ্গ রচনা। অসহযোগ আন্দোলনে বিহারের গভর্নর লর্ড সিংহের অবস্থা এই প্রবন্ধে বর্ণিত আছে। ইংরেজ আমলে একজন ‘নেটিভ’ ভারতের বড়লাট বা গভর্নর জেনারেল হলেও তিনি ক্ষমতাহীন কারণ তার চামড়া কালো। এই বাস্তব অবস্থা প্রবন্ধে তুলে ধরা হয়েছে।

‘লাট-প্রেমিক আলি ইমাম’ এ প্রবন্ধটিও ‘শ্যাম রাখি না কুল রাখি’ অনুরূপ রচনা। ব্রিটিশ আশ্রিত রাজ্য হায়দ্রাবাদের নিজামের প্রধানমন্ত্রী স্যার আলী ইমাম লাট বা গভর্নর হওয়ার বাসনায় বিলাতে ভারতের নবনিযুক্ত গভর্নর জেনারেল লর্ড এবং লেডি রিডিংয়ের সম্মানার্থে ভোজসভায় এক তৈলসিক্ত ভাষণ দিয়েছিলেন। কিন্তু লর্ড রিডিং তার প্রত্যুত্তরে যা বলেছিলেন তা স্যার আলী ইমামের জন্য খুব অপ্রীতিকর ছিল। ওই ঘটনার উল্লেখে কাজী নজরুল ইসলাম আলোচ্য প্রবন্ধে ইংরেজ প্রভুর চাটুকারদের চরিত্রের স্বরূপ উদ্ঘাটন করেছেন।

এ ছাড়া নবযুগ পত্রিকায় প্রকাশিত এবং যুগবাণী গ্রন্থে সংকলিত বাকি প্রবন্ধগুলো যেমন―‘ভাব ও কাজ’, ‘সত্য-শিক্ষা’, ‘জাতীয়-শিক্ষা’, ‘জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়’ এই প্রবন্ধগুলো শিক্ষামূলক প্রবন্ধ।

ধূমকেতু (১৯২২) পত্রিকায় নজরুলের সম্পাদকীয় নিবন্ধ বা প্রতিবেদনসমূহের অধিকাংশ পরবর্তীতে প্রকাশিত তিনটি প্রবন্ধ সংকলন দুর্দিনের যাত্রী (১৯২৬), রুদ্রমঙ্গল( ১৯২৭ ) এবং ধূমকেতু গ্রন্থে সংকলিত হয়। এই পর্বের বেশ কয়েকটি প্রবন্ধে ‘ধূমকেতু’ সারথী নজরুল ইসলাম ধূমকেতু পত্রিকার উদ্দেশ্য, আদর্শ ও লক্ষ্য বর্ণনা করেছেন। এ ছাড়া ‘রুদ্রমঙ্গল’ প্রবন্ধে বিশের দশকের প্রথমার্ধে অসহযোগ-খিলাফত পরবর্তী যুগে দেশে যে নৈরাশ্যজনক পরিস্থিতি বিরাজ করেছিল তার পরিচয় পাওয়া যায় রূপকধর্মী এ রচনায়।

দুর্দিনের যাত্রী  তে জাতীয় জীবনের দুর্দিনে অনেকটা ধূমকেতুর মতো নজরুলের আগমন ঘটে। নজরুল পরাধীন মানুষের মনে তীব্র আঘাত হেনে তার মূলসুদ্ধ নাড়া দিতে চেয়েছেন। কাজী নজরুল ইসলাম বিদ্রোহ করেছেন পরাধীনতা, দাসত্ব ও জীর্ণ সমাজব্যবস্থার বিরুদ্ধে। অন্যায়ের বিরুদ্ধে, অত্যাচারের বিরুদ্ধে, মিথ্যার বিরুদ্ধে নজরুলের ইসলামের তরবারি ঝলসে উঠেছে। কাজী নজরুল ইসলাম : জীবন ও সৃজন বইটিতে রফিকুল ইসলাম এ প্রবন্ধগ্রন্থের সাতটি প্রবন্ধ সম্পর্কেই আলোচনা করেছেন।

‘আমরা লক্ষ্মীছাড়ার দল’  প্রবন্ধে জাতিকে জাগাতে কালভৈরবের প্রলয় তূর্য বাজিয়েছেন। ধূমকেতুর অগ্নি নিশান উড়িয়েছেন, ধ্বংস নাচন নেচেছেন। তাঁর এ ধ্বংস নৃত্য নবসৃষ্টির পূর্ব সূচনা। নজরুল অনাগত মহারুদ্রের তীব্র আহ্বান শুনেছেন, তাঁর রক্তআঁখির ইঙ্গিত পেয়ে পেয়ে হয়ে উঠেছেন সত্য রক্ষার, ন্যায় উদ্ধারের প্রলয় বাহিনীর লাল সৈনিক। নির্যাতিত লোহাকে মণিকাঞ্চনে পরিণত করার দায়িত্ব নজরুল নিয়েছেন। তাই তিনি ধ্বংসের লীলাকারী যুবকদের লক্ষীছাড়ার দল বলে আহ্বান জানিয়েছেন। আকাশ ভাঙা আকুল ধারার মাঝে নাঙ্গাশিরে আদুল গায়ে পথের সাথীদের পথে নামতে বলেছেন। জাতির এ দুর্দিনে দয়া-মায়া, স্নেহ বিস্মৃত হয়ে ঝড়-বাদলের উতল হাওয়া আর মাটির মায়ের সিক্ত কোলে ঝাঁপিয়ে পড়তে বলেছেন। প্রলয় ও ধ্বংসের মাঝে নবসৃষ্টির তপস্যা নজরুলের মূলমন্ত্র, সেই তপস্যার স্বপ্ন বাস্তবায়নে নজরুল সে বিপ্লবীদের তাঁর ‘ধূমকেতু’র সওয়ার করেছিলেন। রফিকুল ইসলাম বলেছেন, তাঁদের কথা লিখতে গিয়ে নজরুলের আবেগ পরিণত হয়েছে উচ্ছ্বাসে এতে কোনও সন্দেহ নেই।

‘তুবড়ী বাঁশির ডাক’ প্রবন্ধের আবেগও ‘আমরা লক্ষ্মীছাড়ার দল’ প্রবন্ধের অনুরূপ। কিন্তু এ প্রবন্ধে নজরুল রূপকের আশ্রয় গ্রহণ করেছেন। সশস্ত্র বিপ্লবীদের এখানে সাপুড়ের তুবড়ী বাঁশির ডাকে বেরিয়ে আসা বিষধর কাল কেউটের দল রূপে অঙ্কিত করা হয়েছে। দৃশ্যটি এরূপ, আদিমাতা অগ্নিনাগিনী আজ গগনতলে বেরিয়ে এসেছে, তার পুচ্ছে কোটি কোটি নাগ-শিশু খেলা করছে, তার ডাক ঘনঘন শোনা যাচ্ছে আর ভেসে আসছে সাপুড়ের গভীর গুরুগুরু ডম্বরু রব। সেই রবে বিপুল উল্লাসে পুচ্ছ সাপটি উঠেছে দিকে দিকে নাগপুরে-নাগ-নাগিনী, অধীরে আবেগে বাসুকীর ফণা দুলে দুলে উঠেছে―বিসুরিয়াসের বিপুল রন্ধ্র দিয়ে তার নাসার বিষ-ফুৎকার শুরু হয়েছে। নজরুল ঐসব নাগ-নাগিনীর বিষ জরজর পুচ্ছকে চাবুক হানতে বলেছেন এই মরা নিখিলবাসীরা বুকে মুখে। তিনি কামনা করেছেন অগ্নিগিরির বিশ্ব-ধ্বংসী অগ্নিস্রাব যাতে এই অরাজক বিশ্ব ভগ্নস্তূপে পরিণত হয়, ভগবান তাঁর ভুল শোধরায়। এই খেয়ালের সৃষ্টিতে, অত্যাচারকে ধ্বংস করতে নাগ-নাগিনীর কোটি কোটি ফণা দিয়ে তিনি ভগবানের সিংহাসনকে ঘিরে ফেলতে বলেছেন এবং তাদের জ্বালা দিয়ে এই জ্বালাময় বিধি ও অনিয়মকে জ্বালিয়ে দেবার আহ্বান জানিয়েছেন। এ প্রবন্ধ বিপ্লবীদের রূপক। রফিকুল ইসলাম নজরুলের বিষের বাঁশি কাব্যগ্রন্থের উৎসর্গ কবিতার সঙ্গে ‘তুবড়ী বাঁশির ডাক’ প্রবন্ধের ভাব-সাদৃশ্য যে লক্ষুীয় তা বেশ পারঙ্গমতায় তুলে ধরেছেন।

‘মোরা সবাই স্বাধীন মোরা সবাই রাজা’ প্রবন্ধটি মূলত বিশের দশকের ‘স্বরাজ’ আন্দোলন এবং ‘বিদ্রোহী’ শিরোপার তাৎপর্য ব্যাখ্যার কারণে উল্লেখযোগ্য। স্বরাজের রাজনৈতিক তাৎপর্য ছিল স্বায়ত্তশাসন কিন্তু নজরুলে তার ব্যাখ্যা অনেক সম্প্রসারিত। নজরুলের কাছে ‘স্বরাজ’ অর্থ হচ্ছে স্বাধীনতা কিন্তু তা শুধু রাজনৈতিক স্বাধীনতা নয়। শুধু বাহ্যিক স্বাধীনতা নয়, তা আত্মিক স্বাধীনতা। এ প্রবন্ধে নজরুলের ‘বিদ্রোহী’, ‘ধূমকেতু’, আজ সৃষ্টি-সুখের উল্লাসে প্রভৃতি কবিতায় যে আবেগ তার ব্যাখ্যাও পাওয়া যায় আলোচ্য গ্রন্থে।

প্রবন্ধটি একটি রূপক প্রবন্ধ। দেশমাতৃকাকে এ নিবন্ধে পাগলি মা রূপে দেখানো হয়েছে। যার শুধু একটি কান্না, ‘মেয় ভুখা হুঁ’। যার চেহারা নজরুলের ভাষায়, “এলোকেশে জীর্ণা শীর্ণা ক্ষুধাতুর মেয়ে কেঁদে চলেছে ‘মেয় ভুখা হুঁ’।” তার এক চোখে অশ্রু আর চোখে অগ্নি। দ্বারে দ্বারে ভুখারিনী কর হানে আর বলে, ‘মেয় ভুখা হুঁ’!

রবীন্দ্রনাথের ‘বিসর্জন’ নাটকে পুরোহিত রঘুপতি যেমন তার অস্তিত্ব-ক্ষমতা-শক্তিকে অটুট রাখতে রাজা গোবিন্দমাণিক্যের রক্ত চেয়েছিল, দেশমাতাও তার অস্তিত্বের বা মুক্তির জন্য বীর সন্তানের রক্ত চায়। এক সাগর রক্তের বিনিময়েই কেবল সে মুক্তি পাবে। অসুর নিধনে মা কালি যেমন রক্তপান করেছে, তেমনি দেশমাতাও পরাধীনতার নিগড়মুক্ত হতে বীর সন্তানের রক্ত চায়।

‘পথিক তুমি পথ হারাইয়াছ’  প্রবন্ধে প্রাবন্ধিকের প্রত্যাশা যে, বাঙালির ইতিহাস রক্তদানের ইতিহাস, রক্তের পথ হারাবার নয়, আমাদের এ পথ চিরচেনা। ক্ষুদিরাম-সূর্যসেনের মতো তেজোদীপ্ত তরুণেরা যে পথ চিনিয়ে দিয়ে গেছে সে পথ হারানোর নয়। শিব-সত্য ও সুন্দরের পাওয়ার পথ, রক্তদানের পথ। কবির প্রত্যাশা দেশ-জাতির জন্য জীবন উৎসর্গীকৃত অগ্রজের দেখানো পথে বাঙালি তরুণ এগিয়ে চলবে হর্ষিত মনে। সুতরাং তারা রক্তের বিনিময়ে পথহারা জাতিকে সঠিক পথে চালিত করবে। দেশপ্রেমিক নজরুল ইসলাম দেশ-জাতির পরাধীনতায় বিক্ষুব্ধ, বেদনার্ত। দেশমাতৃকাকে পরাধীনতার শৃঙ্খলমুক্ত করতে নজরুল ইসলাম জীবন উৎসর্গের আহ্বান জানিয়েছেন উপর্যুক্ত প্রবন্ধে। এ প্রবন্ধ সম্পর্কে নজরুল গবেষক রফিকুল ইসলাম তাঁর কাজী নজরুল ইসলাম : জীবন ও সৃজন গ্রন্থে বলেছেন :

‘পথিক! তুমি পথ হারাইয়াছ’ বঙ্কিমচন্দ্রের কপালকুণ্ডলা উপন্যাসে নবকুমারের প্রতি কপালকুণ্ডলার জিজ্ঞাসাকে অবলম্বন করে নজরুল দেশের দুর্দিনে তরুণ সম্প্রদায়ের প্রতি একই প্রশ্ন রেখেছেন। তিনি তাদের বলেছেন, “উত্তর দাও, হে আমার তরুণ পথ-যাত্রী দল। ওরে আমার রক্ত-যজ্ঞের পূজারি ভায়েরা … উত্তর দে মায়ের পূজার বলির নির্ভিক শিশু! বল, “মাভৈঃ। আমরা পথ হারাই না! আমাদের পথ কখনও হারায় না।’ এ প্রবন্ধে তিনি দেশমাতৃকার জন্য উৎসর্গীকৃত তরুণ বিপ্লবীদের চিত্র পৌরাণিক রূপকে অঙ্কিত করেছেন।” [ কাজী নজরুল ইসলাম: জীবন ও সৃজন: প্রবন্ধ, পৃ: ( ৬৫৪ ) ]

দুর্দিনের যাত্রী প্রবন্ধগ্রন্থের শেষ প্রবন্ধ ‘আমি সৈনিক’ প্রবন্ধটিতে প্রবন্ধকার সৈনিকের উপর্যুক্ত প্রয়োজনীয় প্রেক্ষাপটের আলোকে একজন আদর্শ সৈনিকের কার্যাবলী বিধিত করেছেন। দেশপ্রাণ সেবকরা দেশে সৈনিকের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। দেশ যেহেতু পরাধীন, ফলে দেশে এখন সেই তরুণ সেবকের প্রয়োজন যে সৈনিক হতে পারবে। দেশ এখন নারীর ভালোবাসা, করুণা, মমতা বা চোখের জল চায় না। দেশ চায় আঘাত আর বিদ্রোহ। দেশে এখন প্রয়োজন সেই পুরুষকে যার ভালোবাসায় আঘাত ও বিদ্রোহ আছে। সেই সেবক এখন দেশে প্রয়োজন, যে কেবল ভালবাসতেই পারে না প্রয়োজনে আঘাত করবে। প্রতিঘাত বুক পেতে মেনে নেবে। বিদ্রোহ করবে। আঘাত করার মধ্যকার পশুত্ব বা অসুরত্বের বদনাম যে গলার মালা করতে পারবে―সেই পুরুষ, সেই সৈনিকই এখন দেশের জন্য প্রয়োজন। নজরুল এ প্রবন্ধে স্বাধীনতা যুদ্ধে সৈনিকের প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব প্রদান করেছেন। নজরুল ‘আমি সৈনিক’ প্রবন্ধে স্পষ্ট করে বলেছেন :

‘এখন দেশে সেই সেবকের দরকার যে সেবক সৈনিক হ’তে পারবে। … দেশ এখন চায় মহাপুরুষ নয়। দেশ চায় সেই পুরুষ যার ভালোবাসায় আঘাত আছে বিদ্রোহ আছে। যে দেশকে ভালোবেসে শুধু চোখের জলই ফেলবে না, সে দরকার হ’লে আঘাতও করবে, প্রতিঘাতও বুক পেতে নেবে, বিদ্রোহ করবে। … রবীন্দ্রনাথ, অরবিন্দ, প্রফুল্ল বাঙলার দেবতা, তাঁদের পূজার জন্য বাঙলার চোখের জল চির-নিবেদিত থাকবে। কিন্তু সেনাপতি কই ? সৈনিক কোথায় ? কোথায় আঘাতের দেবতা, প্রলয়ের মহারুদ্র ? সে-পুরুষ এসেছিল বিবেকানন্দ, সে সেনাপতির পৌরুষ হুংকার গর্জে উঠেছিল বিবেকানন্দের কণ্ঠে।’ [ কাজী নজরুল ইসলাম: জীবন ও সৃজন: প্রবন্ধ, পৃ: ( ৬৫৭-৬৫৮ ) ]

স্বামী বিবেকানন্দের প্রতি নজরুলের শ্রদ্ধা আরও একটি প্রবন্ধে প্রকাশিত হয়েছিল। তাতে বোঝা যায় স্বামী বিবেকানন্দকে নজরুল সেনাপতির আসনে বসিয়েছেন আর সৈনিকের আসন নিয়েছেন তিনি নিজে। এ প্রবন্ধে তাঁর সৈনিক সত্তারই শুধু নয় বিদ্রোহী সত্তারও স্বরূপ তুলে ধরেছেন। এ ছাড়া নজরুল ভারতের পূর্ণ স্বাধীনতার সংগ্রামে মহাপুরুষ অপেক্ষা সৈনিকের প্রয়োজনের ওপর অধিক গুরুত্ব প্রদান করেছেন।

রফিকুল ইসলাম ‘আমি সৈনিক’ প্রবন্ধের উপসংহারে নজরুলের ‘বিদ্রোহী’ কবিতার প্রতিধ্বনি খুঁজে পেয়েছেন। ‘বিদ্রোহী’ কবিতার সঙ্গে ‘আমি সৈনিক’ প্রবন্ধের বক্তব্যর মধ্যে পার্থক্য এই যে, ‘বিদ্রোহী’তে প্রতিটি কথা ইতিবাচক কিন্তু ‘আমি সৈনিক’ প্রবন্ধে তা তীর্যক। ‘বিদ্রোহী’তে তিনি বলেছেন তিনি কী, ‘আমি সৈনিক’ প্রবন্ধে তিনি বলেছেন তিনি কী নন।

রুদ্র-মঙ্গল শিরোনামে নবযুগের ১ম বর্ষ, ৩য় সংখ্যায় সম্পাদকীয় নিবন্ধে তিনি ভারতভূমির অপমানের কথা তুলে ধরে বলেছিলেন, ভারত মাতাকে যে বিদেশি শক্তি শাসন করছে সে একদিকে যেমন দানব নয়, অন্যদিকে তেমনি দেবতাও নয়, রক্ত-মাংসের মানুষ। যারা এই রূপ রক্ত-মাংসের মানুষের দ্বারা মায়ের অপমান নীরবে অবলোকন করে, প্রতিবাদ করে না তাদের আঘাত করার জন্য আঘাতের দেবতার সন্ধান তিনি করেছিলেন। অতঃপর নবযুগ এর জামিনে এক হাজার টাকা বাজেয়াপ্ত করা হয়।

কিন্তু এর কিছুদিন পর আবার দুই হাজার টাকা দিয়ে পত্রিকাটির বের করতে হয়। কিন্তু এ কে ফজলুল হকের সাথে মতভেদ দেখা দিলে ১৯২০ সালের ডিসেম্বর নজরুল নবযুগ ছেড়ে চলে যান। নজরুল মাত্র আট মাসকাল নবযুগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছিলেন। এর এক মাস পর নবযুগ বন্ধ হয়ে যায়। নজরুলের সাংবাদিকতা ছিল নেশা। সকল স্বার্থের ঊর্ধ্বে জাতিকে জাগানোই ছিল তার সাংবাদিকতার মহৎ লক্ষ্য। এর প্রমাণস্বরূপ দেখা যায়, নবযুগ বন্ধ হওয়ার পর নজরুল উৎপীড়িত লাঞ্ছিত জাতিকে জাগাবার উদ্দেশ্যে স্বাধীনভাবে মতো প্রকাশের জন্য নিজ খরচে ‘ধূমকেতু’ নামক একটি অর্ধ-সাপ্তাহিক পত্রিকা বের করেন।

সম্পাদক এবং স্বত্বাধিকারী ছিলেন তিনি নিজেই। ধূমকেতুকে আর্শীবাদ জানিয়েছিলেন বিপ্লবী বারীন্দ্র কুমার ঘোষ, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় এবং কবিগুরু রবীন্দ্রনাথসহ আরও অনেকে। রবীন্দ্রনাথের আশীর্বাণী ছিল―আয় চলে আয়, রে ধূমকেতু,/আঁধারে বাঁধ অগ্নিসেতু,/দুর্দিনের এই দুর্গ শিরে/উড়িয়ে দে তোর বিজয় কেতন।/অলক্ষণের তিলক রেখা/রাতের ভালো হোক না লেখা/জাগিয়ে দে রে চমক মেরে,/আছে যারা অর্ধচেতন।

এ প্রবন্ধ গ্রন্থে ইংরেজ শাসকের অত্যাচারে উৎপীড়িত জনগণকে রুখে দাঁড়ানোর আহ্বান এবং সর্বহারা মানুষের অধিকার চেতনার নানদিক তুলে ধরা হয়েছে। অধিকাংশ প্রবন্ধ অসহযোগ আন্দোলন ও খিলাফত আন্দোলনের ব্যর্থতার পরবর্তী প্রেক্ষাপটে লেখা। কাজী নজরুল ইসলাম : জীবন ও সৃজন এ রুদ্রমঙ্গল প্রবন্ধগ্রন্থের আটটি প্রবন্ধই আলোচনা করা হয়েছে।

রুদ্রমঙ্গল গদ্যগ্রন্থের প্রথম গদ্যটির নাম ‘রুদ্রমঙ্গল’। রুদ্রমঙ্গল নজরুলের বাজেয়াপ্ত-হওয়া অপর গদ্যগ্রন্থ। এতেও আবার সত্য আর আত্মশক্তিতে বিশ্বাসের প্রসঙ্গ এসেছে। এসেছে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির কথা।

রুদ্র-মঙ্গল গ্রন্থে সংকলিত ধূমকেতু পত্রিকার সম্পাদকীয় নিবন্ধ ‘আমার পথ’ প্রবন্ধে নজরুলের ধূমকেতু পত্রিকার আদর্শ ও উদ্দেশ্য বর্ণিত হয়েছে:

“মাভৈঃ বাণীর ভরসা নিয়ে, “জয় প্রলয়ঙ্কর” বলে ধূমকেতুকে রথ করে আমার আজ নতুন যাত্রা শুরু হ’ল। আমার কর্ণধার আমি। আমায় পথ দেখাবে আমার সত্য। আমার যাত্রা শুরুর আগে আমি সালাম জানাচ্ছি¬―নমস্কার ক’রছি আমার সত্যকে। যে-পথ আমার সত্যের বিরোধী, সে পথ ছাড়া আর কোনও পথই আমার বিপথ নয়। রাজভয়-লোকভয় কোনও ভয়ই আমায় বিপথে নিয়ে যাবে না।” [ কাজী নজরুল ইসলাম: জীবন ও সৃজন: প্রবন্ধ, পৃ: (৬৫৪) ]

এই প্রবন্ধে তিনি গান্ধীজীর একটি শিক্ষার উল্লেখ করেছেন, নিজেকে চিনলে, নিজের সত্যকেই নিজের কর্ণধার মনে জানলে, নিজের শক্তির উপর অটুট বিশ্বাস আসে। এই সাবলম্বন ও নিজের ওপর অটুট বিশ্বাসকে নজরুল মাহাত্মা গান্ধীর শিক্ষা বলেছেন। হিন্দু- মুসলমানেরা মিলনের অন্তরায় বা ফাঁকি কোনখানে তা দেখিয়ে দিয়ে এর গলদ দূর করা ছিল এ প্রবন্ধের অন্যতম উদ্দেশ্য।

‘মোহররম’ প্রবন্ধে মাতম-অভিনয়কে ধিক্কার দিয়ে সত্যের পক্ষ নিয়ে নির্যাতনের প্রতিবাদে রক্ত দেবার আহ্বান জানিয়েছেন নজরুল। প্রথার অন্তরে নিহিত সত্যের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করছেন বাস্তবিক। এসব সময়ে নজরুল ধর্মীয় বা সামাজিক প্রথার নিহিত তাৎপর্য খুঁজছেন। যে জন্য ‘মোহররম’ তাঁর কাছে নির্যাতনের প্রতিবাদে রক্তদানের প্রতীক হয়ে উঠেছে। একইভাবে ‘ধূমকেতুর পথ’ লেখাতে তিনি বলছেন ‘পূজা মানে দেবতাকে সত্যি করে চিনে তাঁকে শ্রদ্ধাঞ্জলি দেওয়া। যাকে আমি সত্য করে বুঝতে পারিনি, তাঁকে পূজা করতে যাওয়া তাঁর অপমান করা’। আরও বলছেন, না-বুঝে না-চিনে গান্ধী, রবীন্দ্রনাথ, অরবিন্দকে ভক্তি দিতে গেলে তাঁদের বরং অপমানই করা হবে। এতে নজরুলের আধুনিক চিন্তার প্রতিফলন লক্ষ্য করছি।

ধূমকেতু পত্রিকায় প্রকাশিত এবং রুদ্র-মঙ্গল গ্রন্থে সংকলিত বিষ-বাণী প্রবন্ধে নজরুল পূর্বালোচিত “‘তুবড়ী বাঁশীর ডাক’ প্রবন্ধের মতো বিপ্লবীদের নাগ-নাগিনীপুঞ্জের রূপকে তাদের দিয়ে বলেছেন :

‘মাভৈঃ! মাভৈঃ! ভয় নাই, ভয় নাই― ওগো আমার বিষ-মুখ অগ্নি-নাগ- নাগিনীপুঞ্জ!’ [ কাজী নজরুল ইসলাম: জীবন ও সৃজন: প্রবন্ধ, পৃ: ( ৬৫৫ ) ]

ধূমকেতু পত্রিকায় প্রকাশিত ও রুদ্র-মঙ্গল গ্রন্থে সংকলিত ‘ক্ষুদিরামের মা’ বিপ্লবী শহিদ ক্ষুদিরামকে নিয়ে লেখা। ক্ষুদিরামের ফাঁসি নিয়ে যে সব গান রচিত হয়েছিল তার একটির বাণীতে কথা ছিল, ‘আঠার মাসের পরে জন্ম নেব মাসির ঘরে, মা গো, চিনতে যদি না পারো মা দেখবে গলায় ফাঁসি’ গানের ওই পঙ্ক্তি কয়েকটি উদ্ধৃত করে নজরুল বাংলার মাতৃকুলের প্রতি বলেছেন।

ধূমকেতুর ১ম বর্ষ, ১০ম সংখ্যায় নজরুল ‘ক্ষুদিরামের মা’ নামক আরেকটি নিবন্ধে ভারত মাতার সন্তানদের ক্ষুদিরামের সঙ্গে তুলনা করে এই আহ্বান জানিয়েছিলেন যে, এক ক্ষুদিরাম দেশের জন্য আত্মবলিদান হলেও ঘরে ঘরে সে জন্ম নিয়ে এসেছে ক্ষুদিরাম হয়ে।

এই আপন সন্তানদের ঘরে আটকিয়ে না রেখে দেশমুক্তির প্রয়োজনে সন্তানদের আত্মবলিদানে অনুপ্রাণিত করার আহ্বান তিনি জানান সব মায়েদের উদ্দেশ্যে। ওই সম্পাদকীয়তে তিনি দেশের স্বাধীনতার জন্য আত্মত্যাগের আহ্বান জানানোর সঙ্গে সঙ্গে তরুণ সমাজের উদ্দেশ্যে প্রশ্ন রেখেছিলেন―‘কোথায় ভাই ক্ষুদিরাম। আঠার মাসের পর আসবে বলে গেছ, এসেছে প্রতি ঘরে ঘরে।’

কিন্তু আঠার বছর যে কেটে গেল ভাই, সাড়া দাও, সাড়া দেও আবার, যেমন যুগে যুগে সাড়া দিয়েছ ওই ফাঁসির মণ্ডপে রক্তমঞ্চে দাঁড়িয়ে। নজরুল ইসলাম ধূমকেতু পত্রিকাই সর্বপ্রথম ভারতের পূর্ণস্বাধীনতার বার্তা জোরালো ভাষায় প্রকাশ করেন। সম্পাদকীয়তে দ্ব্যর্থহীন ভাষায় ঘোষণা করেন : ‘সর্বপ্রথম ধূমকেতু ভারতের পূর্ণ স্বাধীনতা চায়। স্বরাজ-টরাজ বুঝি না, কেননা এ কথাটার মানে এক এক মহারথী এক এক রকম করে থাকেন।’

ক্ষুদিরাম এক বিপ্লবী যিনি দেশমাতৃকার আহ্বানে সাড়া দিয়ে নিজেকে উৎসর্গ করেছিলেন এবং এই অমর শহীদ বিপ্লবীর প্রতি নজরুলের শ্রদ্ধা ‘ক্ষুদিরামের মা’ একটি হৃদয়স্পর্শী রচনা। এখানে রফিকুল ইসলাম দেখিয়েছেন যেমন নজরুল রূপকের আশ্রয়ে দেশের তরুণ সন্তানদের দেশমাতৃকার সংগ্রামে নিজেদের প্রাণকে উৎসর্গ করার আহ্বান জানিয়েছিলেন। ‘মেয় ভুখা হুঁ’ প্রবন্ধে রূপকের মাধ্যমে তিনি বলেছিলেন, দেশমাতৃকা তাঁর মুক্তির জন্য তাঁর সন্তানদের রক্ত চান। ঠিক তেমনি তিনি ‘ক্ষুদিরামের মা’ প্রবন্ধেও দেশমাতৃকার আহ্বানে সাড়া দিয়ে জীবনকে উৎসর্গ করার কথা বলেছিলেন এবং শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেছেন। ভারতের পূর্ণ স্বাধীনতার দাবিতে ‘ধূমকেতুর পথ’, ‘মন্দির ও মসজিদ, ও ‘হিন্দু-মুসলমান’, প্রবন্ধে দুই সম্প্রদায়ের  সম্প্রীতির ডাক দিয়েছেন নজরুল।

‘মন্দির ও মসজিদ’ এবং ‘হিন্দু ও মুসলমান’ নামে গণবাণী-তে প্রকাশিত ও রুদ্র-মঙ্গল গ্রন্থে সংকলিত দুটি প্রবন্ধে নজরুল সাম্প্রদায়িকতার তীব্র সমালোচনা করেছেন। রফিকুল ইসলামের মতে, বাংলা সাহিত্যে অপর কোনও সাহিত্যিক নজরুলের মতো সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে অমন বলিষ্ঠভাবে সোচ্চার ছিলেন না। এ ছাড়া ‘মন্দির ও মসজিদ’ প্রবন্ধে পরাধীন ভারতে, অবিভক্ত বাংলায় হিন্দু- মুসলমানের দৃশ্য ব্যঙ্গ ও পরিহাসের সঙ্গে বর্ণনা করেছেন।

রাজবন্দির জবানবন্দি সত্য ও ন্যায়ের দলিল। সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে থাকায় কবি রাজবন্দি আখ্যা পান এবং রাজনিগ্রহ ভোগ করেন। কিন্তু কোনও রোষ, কোনও ভীতি, কোনও লোভ তাঁকে সত্য ও ন্যায়ের পথ থেকে বিচ্যুত করতে পারেনি। কারণ কবির মতে স্বয়ং ঈশ্বর সত্যের পূজারি। ঈশ্বরই তাঁকে এ দায়িত্ব পালনের ভার দিয়েছেন। কোনও রক্তআঁখির ক্ষমতা নেই সত্যবিচ্যুত করা। যে বীণায় চিরসত্যের সুর ধ্বনিত হয়, কবি সেই ভগবানের হাতের বীণা। মরণশীল ক্ষুদ্র রাজা সে বীণার সুর স্তব্ধ করতে পারবে না। তাই ভারতের পূর্ণ স্বাধীনতার দাবি উত্থাপন করতে গিয়ে কাজী নজরুল ইসলামকে রাজদ্রোহীতার অভিযোগে বিচার করা হয়। রাজবন্দির জবানবন্দি তারই ফলে সংযোজিত হয় বাংলা সাহিত্যে। যে জবানবন্দির শুরুতেই নজরুল বলেছিলেন :

‘আমার ওপর অভিযোগ, আমি রাজদ্রোহী! তাই আমি আজ রাজ-কারাগারে বন্দি এবং রাজদ্বারে অভিযুক্ত। একাধারে রাজার মুকুট; আর একাধারে ধূমকেতুর শিখা। একজন রাজা, হাতে রাজদণ্ড, আর জন সত্য, হাতে ন্যায়দণ্ড। আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে নজরুল যে জবানবন্দি দিয়েছিলেন সেই রাজবন্দির জবানবন্দিতেও ভারতের পরাধীনতার জন্য ক্ষোভ ও স্বাধীনতার অকুণ্ঠ দাবি ছিল অত্যন্ত জোরালো।’ [কাজী নজরুল ইসলাম : জীবন ও সৃজন: প্রবন্ধ, পৃ: (৬৫৯)]

তবে ইংরেজ বিচারকের কাছে ওই জবানবন্দির কোনও মূল্য ছিল না তাই নজরুলের এক বছর সশ্রম কারাদণ্ড হয়েছিল কিন্তু ওই জবানবন্দি সাহিত্যের মর্যাদা পেয়ে বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে স্থান পেয়েছিল।

রাজনৈতিক ও সামাজিক সমস্যা নিয়ে লেখা প্রবন্ধের বাইরে নজরুলের প্রবন্ধ কম। রফিকুল ইসলামের মতে, যার মধ্যে তিনটি উল্লেখযোগ্য প্রবন্ধ পর্যালোচনার দাবি রাখে।

‘বড়র পিরীতি বালির বাঁধ’ (১৯২৭ ); ‘বর্তমান বিশ্ব-সাহিত্য’ (১৯৩৩) এবংসংগীতবিষয়ক ‘সুর ও শ্রতি’।

‘বড়র পিরীতি বালির বাঁধ’ প্রবন্ধটি শব্দ ব্যবহার নিয়ে একটি বিতর্কজনিত রচনা। কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর ‘কাণ্ডারি হুঁশিয়ার’ গানে লিখেছিলেন, ‘কাণ্ডারি! তব সম্মুখে ঐ পলাশীর প্রান্তর বাঙালির খুনে লাল হল যেথা ক্লাইভের খঞ্জর।’

এদিকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সওগাত পত্রিকার প্রতিবেদনে বলেছিলেন, “আধুনিক কবি রক্তের মতো চিরন্তন শব্দের স্থানে মাঝে মাঝে ‘খুন’ শব্দ ব্যবহার করেছেন।” স্বাভাবিকভাবেই নজরুলের পক্ষে এমন ধারণা হওয়া সমীচীন নয় যে রবীন্দ্রনাথের ওই মন্তব্য তাঁর রচনাকে উপলক্ষ করেই করা হয়েছিল। রবীন্দ্রনাথের মন্তব্য আদৌ নজরুলের উদ্দেশ্যে ছিল কি না, তা অবশ্যই স্পষ্ট নয়, কারণ রবীন্দ্রনাথ এই বিতর্কে অংশগ্রহণ করেননি। তবে এ বিতর্কের অবসানের জন্য প্রমথ চৌধুরী লিখেছিলেন ‘বঙ্গ সাহিত্যে খুনের মামলা’।

বাংলা সাহিত্যে ‘খুন’ শব্দের ব্যবহার সম্পর্কে বিতর্ক থেকে আরবি-ফার্সি শব্দের ব্যবহার সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ, নজরুল ও প্রথম চৌধুরীর ধারণার পরিচয় মেলে।

‘বর্তমান বিশ্ব সাহিত্য’ প্রবন্ধে আধুনিককালের বিশ্বসাহিত্য সম্পর্কে নজরুলের ধারণার পরিচয় পাওয়া যায়। নজরুল বিশ্বসাহিত্যের দুটি রূপের কথা বলেছেন, একটি শেলির স্কাইলার্কের ধূলি-মলিন পৃথিবীর ঊর্ধ্বে স্বর্গের অনুসন্ধানকারী রূপ অপরটি মাটির পৃথিবীর অপার মমতার রূপ। একদিকে নেগুচি, ইয়েটস, রবীন্দ্রনাথ প্রমুখ স্বপ্নচারী অন্যদিকে গোর্কি, জোহান বোয়ার, বার্নার্ডশ, বেনাভাঁতে প্রভৃতি। এই দুই শ্রেণির লেখকদের মধ্যে রয়েছেন লিওনিঁদ, আঁদ্রিভ, হামসুন, ওয়াদিশ্ল, রেমঁদ প্রমুখ। সাহিত্যিকদের মধ্যে যাঁরা ধ্বংসব্রতী তাঁদের উদ্দেশ্য সম্পর্কে নজরুল লিখেছেন :

“… যাঁরা ধ্বংসব্রতী―তাঁরা ভৃগুর মতো বিদ্রোহী। তাঁরা বলেন: এ দুঃখ এ বেদনার একটা কিনারা হোক। এর রিফর্ম হবে ইভোলিউশন দিয়ে নয়, একেবারে রক্তমাখা রিভোলিউশন দিয়ে। এর খোল―নলচে দুই বদলে একেবারে নতুন ক’রে সৃষ্টি করব। আমাদের সাধনা দিয়ে নতুন সৃষ্টি নতুন স্রষ্টা সৃজন করব।” [কাজী নজরুল ইসলাম: জীবন ও সৃজন: প্রবন্ধ, পৃ: (৬৬৪) ]

নজরুল কীটসকে স্বপ্নচারী এবং হুইটম্যানকে মাটির মানুষ বলেছেন। এ ছাড়া এ প্রবন্ধের উপসংহারে নজরুল স্ক্যান্ডেনেভিয়াসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশের সাহিত্যের মর্মকথাও তুলে ধরেছেন।

নজরুলের ‘সুর ও শ্রুতি’ নবাব আলী চৌধুরীর ‘মারিফুন নাগমাত’ অবলম্বনে রচিত। রফিকুল ইসলামের মতে, সম্ভবত নজরুল ত্রিশের দশকের শেষার্ধে কলকাতা বেতার কেন্দ্রে রাগ-রাগিণী নিয়ে যে নিরীক্ষাধর্মী অনুষ্ঠান করতেন এটি সে সময়ের রচনা। এই মূল্যবান রচনাটি থেকে নজরুলের গভীর সংগীত জ্ঞানের পরিচয় পাওয়া যায়। 

কাজী নজরুল ইসলামের শেষ উল্লেখযোগ্য রাজনৈতিক প্রবন্ধ ‘বাঙালীর বাঙলা’। যা প্রকাশিত হয়েছিল দৈনিক নবযুগ পত্রিকায়। ‘বাঙালীর বাঙলা’ প্রবন্ধে কাজী নজরুল ইসলাম বাঙালিকে যে মন্ত্র শিখিয়েছিলেন ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে বাঙালি তার যথার্থতা প্রমাণ করেছিল স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে।

বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে নজরুলই প্রথম কবি, যিনি গণমানুষের পক্ষে এবং শাসক শ্রেণির বিরুদ্ধে লেখার জন্য কারাবরণ করেছেন। তাঁর গ্রন্থ বাজেয়াপ্ত হয়েছে, পত্রিকা বন্ধ করা হয়েছে। বিদেশি শাসন-শোষণের বিরুদ্ধে তাঁর দ্রোহ ছিল বুকের গহিন গভীর থেকে উৎসারিত। তাঁর প্রতিবাদী কণ্ঠ পৌঁছে গিয়েছিল পরাধীন ভারতবর্ষের স্বাধীনতাকামী সকল মানুষের চিত্তে ও চেতনায়।

বাংলা ও বাঙালির প্রগতিশীল চিন্তা ও চেতনার অন্যতম প্রধান কবি কাজী নজরুল ইসলাম। তাঁর কবিতা, গান, প্রবন্ধ, গল্প, উপন্যাস-সহ সকল সৃষ্টিকর্মে আছে দ্রোহ, আছে দেশপ্রেম, আছে মানবপ্রেম, মানবিকতা ও অসাম্প্রদায়িকতা। তাঁর ক্ষুরধার লেখনী ও বক্তৃতা-বিবৃতি’র মূল বিষয়বস্তু মানুষ ও মানবতার জয়গান, স্বাধীনতা ও মুক্তির চেতনায় দেদীপ্যমান। কবিতা ও গানের তুলনায় তাঁর প্রবন্ধ-সংখ্যা কম হলেও এসব প্রবন্ধে প্রত্যক্ষ করা যায় তৎকালীন ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ সময়ের চিত্র এবং সমাজচৈতন্যে নজরুল মানসে তার অভিঘাতের পরম্পরা।

নজরুল গবেষক রফিকুল ইসলাম এই গ্রন্থটিতে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টপ্যাধায় প্রমথ চৌধুরীর, ডিএল রায় এর চিন্তাধারার সঙ্গে কাজী নজরুল ইসলামের চিন্তাধারার তুলনা করেছেন বা তাদের মতের এবং রচনা (ঘরে বাইরে, কালান্তর, কপালকুণ্ডলা) সাদৃশ্য বৈসাদৃশ্য দেখিয়েছেন। আবার কখনও গদ্যের মাঝে তাঁর বহু কবিতার সাদৃশ্য তুলে ধরেছেন যেমন, ‘বিদ্রোহী’, ‘বিষের বাঁশি’, ‘রণভেরী’, ‘ধূমকেতু’, ‘আজ সৃষ্টি সুখের উল্লাসে’, ‘আনোয়ার’, ‘কামাল পাশা’ সর্বহারা গ্রন্থের ফরিয়াদ কবিতা ইত্যাদি। এ ছাড়া এক প্রবন্ধের সঙ্গে অন্য প্রবন্ধের বিষয়ভাবনার তুলনায় এ গ্রন্থটি বেশ তথ্যসমৃদ্ধ।

তাই বলা যায়, নজরুলের জীবন থেকে শুরু করে সৃজন পর্যন্ত নানা বিষয়ভাবনাকে নজরুল গবেষক রফিকুল ইসলাম পাঠকের সম্মুখে উপস্থাপন করেছেন এক ব্যতিক্রমধর্মী সৃজনের মাধ্যমে। কাজী নজরুল ইসলাম: জীবন ও সৃজন গ্রন্থটি তথ্য-উপাত্তে অনন্য এক গবেষণাগ্রন্থ। নজরুল সম্পর্কিত যাবতীয় উৎস সন্ধানে গ্রন্থটি সুপরিকল্পিত দিকনির্দেশনার স্মারক স্বরূপ। আশা করা যায় কাজী নজরুল ইসলাম: জীবন ও সৃজন গ্রন্থটি বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে নজরুলের জীবন এবং সৃষ্টির যথার্থ মূল্যায়নের অভাব অনেকটা দূর করতে সক্ষম হবে।

লেখক : সহকারী অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ, এমফিল গবেষক, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

প্রাবন্ধিক ও সাহিত্যবিশ্লেষক

Leave a Reply

Your email address will not be published.

shares