ক্রোড়পত্র : ফিরে যাই, ফিরে আসি যাঁর কাছে : আনন্দময়ী মজুমদার

যে  আশ্রমে বড়ো হয়ে উঠেছি, সে আশ্রমে তিনি আমার জন্মের অনেক বছর আগে থেকেই আছেন। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে। সেই সূত্রে তাঁকে দেখেছি। বেশ কাছ থেকে দেখা বলা যায় হয়তো। দুটি পরিবারের নানা সুখ-দুঃখের অভিজ্ঞতা ভাগ করে নেওয়ার মধ্য দিয়ে নানা সৃষ্টিশীল আন্তরিক বিষয় নিয়ে যেভাবে পরিবারের মধ্যে আত্মীয়তা তৈরি হয়, সেভাবে। আলাদা করতে পারিনি। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ছিল এক আশ্চর্য স্থান, আর চাচার মতো কিছু মানুষ ছিলেন তার জীবনীশক্তির কেন্দ্রবিন্দু। তাই চাচাকে চেনেন না, দেখেননি এমন কোনও মানুষ এই ক্যাম্পাসে স্বভাবত নেই। মনোজ মিত্রের একটা নাটক মনে পড়ছে―বাঞ্ছারামের বাগান। চাচা সেই নাটকে ভূতের পার্টে অভিনয় করেছিলেন। অধিকাংশ মানুষ যারা চাচাকে চিনতেন তাঁর নাটকে অভিনয় ক্ষমতা দেখেছেন। দীর্ঘদিন নাটকের সঙ্গে যুক্ত থাকা মানুদের বলতে শুনেছি বাংলাদেশে যে কজন অভিনয়শিল্পী খুব উঁচু মানের অর্থাৎ বিশ্বমানের অভিনয় করেন, তিনি তাঁদের একজন। অর্থাৎ তিনি নাটকে জাত অভিনেতার কাজ করতেন―সেইসঙ্গে মিলিয়ে নিতেন অনেক অভিনয়শিল্পীদের নাটকের মঞ্চে, যারা সকলেই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ছিলেন। আমার অভিজ্ঞতায় একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকদের নিয়মিত নাটকের মঞ্চে অভিনয় করতে দেখা সুলভ নয়―এমনতর বিষয় আমি আর কোথাও দেখেছি বলে মনে করতে পারছি না। এতে শিক্ষক মহল খুব নন্দিত ছিলেন, আর সেই সব নাটকের দিকে আমরাও প্রবল তৃষ্ণা নিয়ে তাকিয়ে থাকতাম। মনোজ মিত্রের নাটক যারা দেখেছেন বা বাঞ্ছারামের বাগান টিভিতে দেখেছেন, তারা জানেন এই গল্পটি অন্তর্ভেদী আর অসাধারণ সব রসবোধে ভরা। এই রসবোধের বিষয়টাতে চাচা সহজাত ছিলেন। একটা চরিত্রকে সম্পূর্ণ আয়ত্ত করে সেটিকে রসবোধে মাতিয়ে তোলার মতো অভিনয় তিনি করতেন। আমি তখন এত ছোট্ট যে বাবার কাঁধে চড়ে নাটক দেখতে গেছি। অভিনয় এত স্পর্শ করেছে যে অভিনয়ের শেষে ভূতের পার্টে কালি-মাখা হাসান চাচার মুখ ছুঁয়ে দেখছি। সত্যি ভূত, নাকি মানুষ তিনি! গল্পটা হাসান চাচা করতেন।

ব্যক্তিগত স্মৃতিচারণের মধ্যে দিয়ে এত বড় মাপের মানুষটিকে আমরা কাছের মানুষ করে দেখতে পেয়েছিলাম। সেটা তাঁর গুণে। তাঁর পরিবারের সাদামাঠা আন্তরিক আচরণের কারণে। তিনি আমাদের কাছে টেনেছেন বরাবর। কোনও উঁচু অভ্রভেদী আসন তৈরি করেননি তো তাঁরা। এটাই আশ্চর্য লাগে আবার স্বাভাবিকও মনে হয়। আমার মা তাঁকে ‘দাদা’ বলে ডাকতেন, ভাইফোঁটা দিতেন। আমার মা-কে বিশেষ স্নেহ করতেন চাচারা সকলে, মঞ্জুচাচি তো বটেই। বিয়ের আগে থেকেই তো যশোরে আমার মাসির সূত্রে তারা পরিচিত ছিলেন। অন্যদিকে চাচার পড়াশোনো ও হাসান আজিজুল হক হিসেবে প্রতিষ্ঠা যে খুলনা ব্রজলাল কলেজে, সেই কলেজে তো আমার ঠাকুর্দা সেই সময় পড়াতেন, সেই এক কলেজে ছাত্র ছিলেন আমার বাবাও। তাই লতাপাতা দিয়ে নানাভাবেই জড়ানো সেই সব স্মৃতি। আর উত্তরাধিকার সূত্রে সেই মধু যে আপনা আপনি আমাদের প্রজন্মে ও পরের প্রজন্মে রসবিস্তার করবে, সেটা হয়তো স্বাভাবিক মনে হয়। আমরা অন্তত তা কখনও প্রশ্ন করিনি। সুখে দুঃখে মেনে নিয়েছি। এসব মধু আমাদের সম্ভবত একটা সাদামাঠা অসাধারণ আনন্দের সুরে বেঁধে রাখে বহু বহু বছর। ছেলেমেয়ে অর্থাৎ সন্তানদের ও তার পরের প্রজন্ম পর্যন্ত সেই সখ্য ছড়ায়।

চাচাকে লেখক হিসেবে আবিষ্কার করি, সেটা আমার কিশোরবেলায়। স্কুলে রচনা লেখা ছিল দস্তুর, আর বিষয়ের মধ্যে ‘বাংলার কৃষক’ সিলেবাসে প্রায়ই থাকত। আমার মনে হলো, আমি একটু অন্য রকম লিখতে চাই। বাংলার কৃষকের ব্যাপারে আমাদের শহুরে জীবনে তেমন কোনও অভিজ্ঞতা নেই, সব ধার-করা। তাই অন্তত যারা বাংলার কৃষককে কাছ থেকে দেখেছেন, তেমন লেখকদের লেখা পড়ে দেখব বলে মনে করলাম। রবীন্দ্রনাথ থেকে পড়লাম। মূলত গল্পগুচ্ছের গল্পগুলো। তারপর পড়তে শুরু করলাম হাসান আজিজুল হকের গল্প, মূলত যেটা আমাকে বিস্মিত করল সেটা তাঁর চালচিত্রের খুঁটিনাটি। এখানে তিনি বাংলার যে-কৃষকের চিত্র তুলে ধরেছেন তা আমি এর আগে কখনও কোথাও পড়িনি, কেউ লিখেছে বলেও জানতাম না। যা হোক, সেই লেখা পড়ে মনে হলো, যেমন কিশোরবেলায় মনে হওয়া সহজাত, যে সেই হীরক রাজার দেশেতে বাঘা বাইনের সংলাপের মতো : কিছুই দেখা হয় নাই!

এমন না যে সেই সময় আমি শিশু-সাহিত্য পড়ি না বা ভালোবাসি না। কিন্তু এমন, যে আমার কান ও চোখকে তৈরি করতে গেলে খাটতে হবে, এবং সেটার সত্যি কোনও বিকল্প নেই। হাসান চাচার লেখা পড়তে গেলে একটু যে সাহস লাগে সেটা না বললেই না। যা শুনে অভ্যস্ত, পড়ে অভ্যস্ত ছিলাম, তার সঙ্গে মিল হলো না। বিষয় ও প্রতিপাদ্য আলাদা করে ফেলল। এমন না যে আমি তার আগে পল্লি নিয়ে পড়িনি। রবীন্দ্রনাথ পড়েছি, শরৎচন্দ্র পড়েছি, বিভূতিভূষণ পড়া হয়েছে কিছু, কিন্তু সমকালীন বাংলা সাহিত্য তখনও বিশেষ পড়িনি। বিষয়, বিষয়ের গভীরে চলে যাবার সততা, আর যে-প্যাশন নিয়ে তার লেখাগুলো লেখা সেটা আমাদের ‘কান টেনে’ পড়তে বাধ্য করে। ‘কান টেনে’ পড়তে বাধ্য করার উপমাটি পরে মহাশ্বেতা দেবীর মুখে শুনেছি। তিনি হাসান চাচাদের বাসায় এসেছিলেন, ১৯৯৬ সালে।

এর পর চাচাদের বাসায় প্রায় প্রায় হাজিরা দিতে থাকি, আর গান আড্ডা ইত্যাদির মধ্যে কিছু বই এনে পড়তে থাকি নিয়মিত। অন্তত আমার তরুণ বয়সের এমন একটা বিষয় ছিল, যে হাসান চাচার সব লেখাই আমি পড়তে চাই। বয়সকালে এই সুযোগ আমি চাকরি জীবনে বের করতে পেরেছি কি না, সন্দেহ কিন্তু তাঁর মূল রচনাগুলো ও সাক্ষাৎকারগুলো পেলে কখনও ছাড়িনি। লেখাগুলো আমার কাছে এক বিশাল অবকাশের মতো। আমাদের জীবন আর আমাদের কাছে অদৃশ্য যে নানা জীবন এত কাছের, অথচ এত দূরে, সেই জীবনগুলো প্রত্যক্ষ করা, সেই জীবনগুলো চেনার জন্য সাহিত্যের দরজা বলতে হাসান আজিজুল হকের গল্প উপন্যাস আর প্রবন্ধ সাক্ষাৎকার এসব আমি বুঝি।

ছোটগল্পে অভিঘাত খুব বেশি হয়। হাসান চাচা এই অভিঘাত তৈরি করেন। তিনি নাড়া দেন। একজন নাড়া-খাওয়া শিল্পীকে এভাবেই লিখতে হবে বিশ্বাস করি। সব সৎ সৃষ্টির শিকড়ে এই অদৃশ্য জীবনীশক্তি আছে, যা সেই সৃষ্টির প্রকাশের বেদনাকে সামনে আনে।

ব্যক্তিগত আলাপে হাসান আজিজুল হক যতটা ভাবালুতা এড়িয়ে চলেন, তাঁর লেখাতেও তেমনি তিনি ভাবালুতা দেখান না। ব্যক্তিগত জীবনে আড্ডায় অবশ্য হাসান চাচার মতো রসবোধের মানুষ কম আছেন। তাঁর বর্ণনা আড্ডাকে প্রাণবন্ত করে তোলে।

কিন্তু গল্পে ওই অর্থে মাতিয়ে রাখার কোনও উপাদান নেই। একটা টলটলে ধ্যানমগ্ন বর্ণনা, যেন তিনি তৃতীয় ব্যক্তি হয়ে দেখে যাচ্ছেন, যেমন হচ্ছে তেমনটা লিখছেন।

হাসান আজিজুল হকের অনেক বিখ্যাত লেখকের মধ্যে আর্নেস্ট হেমিংওয়ের কথাটা বারবার শুনেছি। হেমিংওয়ের লেখার সঙ্গে হাসান চাচার লেখার কোথাও আমি মিল পাই। ভাষা, আঙ্গিক আর বিষয় আমাদের এক তানে নিবদ্ধ রাখে, খুব ভালো সিনেমার মতো, একই সঙ্গে আমাদের কোথাও একটা আহ্বান করে। এই দুই লেখকের মধ্যেই ভাষা একদম ঝকঝকে প্রখর আর স্বচ্ছ। এই দুই লেখক পড়ার সময় আমার অনুভূতিটা হয় এমন :

আপন হতে বাহির হয়ে বাইরে দাঁড়া,

 বুকের মাঝে বিশ্বলোকের পাবি সাড়া ॥

এই-যে বিপুল ঢেউ লেগেছে তোর মাঝেতে উঠুক নেচে,

সকল পরান দিক-না নাড়া ॥

বোস্-না ভ্রমর, এই নীলিমায় আসন লয়ে

 অরুণ-আলোর স্বর্ণরেণু মাখা হয়ে।

যেখানেতে অগাধ ছুটি মেল সেথা তোর ডানা দুটি,

 সবার মাঝে পাবি ছাড়া ॥

অর্থাৎ লেখার গদ্যের মধ্যে আঙ্গিকের মধ্যে তিনি গীতিময়তা বা একান্ত আবেগময় দৃষ্টিভঙ্গী সযত্নে এড়িয়ে গেলেও, বাণীর মধ্যে, দর্শনের মধ্যে কোথাও থাকে এই বিশ্বভুবনজুড়ে বেজে ওঠা, প্রকৃতি-মানুষ সব অস্তিত্ব নিয়ে সুর হয়ে ওঠা এক ব্যাপার হয়ত―একেই বলে বিশ্বজনীন সাহিত্য। একান্ত আমার অনুভূতি কি না, জানি না। তবু যেন বিপুল বিশ্বের সঙ্গে একটা যোগসূত্র তৈরি হয় একটা সামান্য লেখা থেকে। রবীন্দ্রনাথ নিয়ে তাঁর যে পর্যবেক্ষণ, পড়তে পড়তে আমার মনে হয়েছে, হাসান আজিজুল হক বা হেমিংওয়ে নিয়েও আমাদের এমনটা মনে হয় :

তিনি বিশেষ প্রকৃতির পটে নির্বিশেষ মানুষকে স্থাপন করতে পেরেছিলেন বলেই ‘রবীন্দ্রনাথের গল্প প্রকৃতির নির্দিষ্ট রূপ এবং দৈনন্দিন জীবনের দৈনন্দিন আচরণ এবং কর্ম অবলম্বন করেও প্রকৃতির এবং সমাজের নির্দিষ্টতা অতিক্রম করতে পারে। রবীন্দ্রনাথ প্রকৃতির আর মানুষের নির্যাস দিয়ে তাঁর গল্পগুলো সিক্ত করার চেষ্টা করেছিলেন। সে জন্যই তাঁর গল্পগুলো মৃত্যুহীন। তাঁর গল্পগুলো বিশেষ থেকে নির্বিশেষের দিকে যাত্রা বলাই সঙ্গত। এক দিক থেকে সবই বিশেষ বিশেষ গ্রাম, বিশেষ প্রকৃতি, বিশেষ মানুষ, বিশেষ ঘটনা―অন্যদিকে কিছুই বিশেষ নয়।’

হাসান আজিজুল হকের লেখাও আমাদের কাছে তাই―বিশেষ দেখা, বিশেষ সময়, সমকালের গণ্ডিতে তাঁকে পড়া, বিশেষ সমালোচনা ও পর্যালোচনা এবং প্রশংসা বা স্তুতির মধ্যে তাঁকে পাওয়া, ব্যক্তিগত ও সামাজিক এক নির্দিষ্ট আধারে, কিন্তু পাঠের অভিজ্ঞতা আমাদের বরাবর কোনও এক নির্বিশেষে মৃত্যুহীন চিরন্তন বোধ আর উন্মোচনের দিশা দেখায়।

মাঝেমাঝে গিয়ে বসে থাকতাম। সুমন আপা, শুচি আপা তোতন আর মৌলির সঙ্গে গল্প, আড্ডা, গান হতো। চাচির হাসি বরাবর উজ্জ্বল ছিল। ওই এক হাসি যথেষ্ট ছিল আমাদের সেই বাড়িটিকে আপন করে তুলতে। কোনও কোনও দিন চাচার সঙ্গে দেখা হতো, কোনও দিন বা হতো না। তিনি উত্তরমুখী একটা ছোট্ট স্টাডিতে বসে লিখতেন। নয়ত পড়তেন। এসব চাচা অধ্যাপনারজীবনের কথা। তাঁর স্টাডিতে মাটি থেকে ছাদ পর্যন্ত বইয়ের উঁচু কাঠের আলমারিগুলো সবই বইয়ে ঠাসা। ব্যবহৃত লাইব্রেরির একটা আবহ আছে। এ ছাড়া একটা টেবিল। চাচা নিচু হয়ে লিখছেন। সব সময় ফাউনটেন পেনে লিখতেন। পার্কার কলম। বাবার কাছে শুনেছি তাদের সময় খাগের কলম চলত, চাচাও নিঃসন্দেহে লিখেছেন। এই পার্কার কলমের নিব ছিল রাবার বলের মতো মসৃণ। একটু বয়স হওয়ার পর জানতে পেরেছি অনুকূল পরিবেশ অনুঘটক হিসেবে কাজ করে। তবে চাচা সব অবস্থায় লিখতে পারতেন এ ব্যাপারে আমার কোনও সন্দেহের অবকাশ নেই। তবু বলতে চাই, এই পরিবেশ আমরা ভুলতে পারিনি। যেমন ভুলতে পারিনি জানালাটি―জানালার বাইরে একটি দীর্ঘিকা, সামনে একটি ডুমুর গাছে পাতার জাল, বাতাস বইলে যেন টুংটাং ঘণ্টা শুনতে পাওয়া যাবে।

মনে হয়েছে, একজন লেখকের এই ‘ৎড়ড়স ড়ভ ড়হব’ং ড়হি’―খুব প্রয়োজন। যদিও এই উপমা কিছুটা একঘেয়ে তবু সৃজনের বিষয়টার মধ্যে একটা প্রাইভেসি আছে। একটা নির্জনতা আছে। চাচার ‘উজান’ বাড়িটিতে এই নির্জনতা ছিল। চাচার টেবিলের কাছেই একটি বকুল গাছ। গাছটি মঞ্জু চাচি পুঁতেছিলেন। গাছটি বিশালকায় হয়ে উঠেছে, আর মৌসুমে ফুলের অভাব হয় না।

চাচার কাছে অনেক অন্য মানুষ আসা যাওয়া করতেন। ছাত্র শিক্ষক, সাংস্কৃতিক কর্মী, আবৃত্তিকার, নাট্যকর্মী, সাংবাদিক, রাজনীতিবিদ, লেখক, কবি, বন্ধু-পরিজন তো আছেনই। চাচার লেখার নির্জনতার সময়ের বাইরে তিনি প্রকাণ্ড এক সংসারের সঙ্গে যুক্ত বলে মনে হতো। লেখকরা, সংস্কৃতিকর্মীরা তাঁর বাসায় এসে উঠত। অনেক পত্রিকার সম্পাদক, কবি, লেখককে দেখেছি। মহাশ্বেতা দেবীর কথাটা বিশেষভাবে মনে আছে।

তিনি এসেছিলেন আহূত হয়ে ১৯৯৬ সালে। বাংলাদেশ-ভারত মৈত্রী উপলক্ষে একটা সাংস্কৃতিক আদানপ্রদান চলছিল, রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে। সেই সূত্রে। অনেক জায়গায় গিয়েছিলেন, বয়েস তখন সম্ভবত ৭০ এর কাছাকাছি। তাঁর কিশোরীসুলভ জীবনীশক্তি আর রসবোধে সকলে মেতে উঠেছিল। সাঁওতালপল্লিতে তাঁকে নিয়ে যাওয়া হয়, চাচারাও গিয়েছিলেন। সুমন অপার জায়গা হবে না দেখে তিনি তরুণী সুমন আপাকে কোলে করেই নিয়ে গিয়েছিলেন! এসে এক হাতে ইনসুুলিন পুশ করছেন (ডায়াবেটিস ছিল তাঁর) আর অন্য দিকে সাক্ষাৎকার দিচ্ছেন। প্রখ্যাত নাট্যসংগঠক, নাট্যকার, লেখক, অধ্যাপক মলয় ভৌমিক কাকা তাঁর একটা সাক্ষাৎকার নিচ্ছিলেন। হাসান চাচা ছাড়া সেই ঘরে তখন আমি আর আমার বাবা ছিলেন। সাক্ষাৎকারটি পরে আমাকে শ্রুতিলিখন করার অনুরোধ করা হয়, তাই সাক্ষাৎকারটি আমি বহুবার শোনার সুযোগ পাই। পরে সেটি সংবাদ-এ প্রকাশিত হয়। মহাশ্বেতা দেবী সেখানে হাসান চাচার লেখার কথা বলেছিলেন, দুই কান ধরে যাঁরা পড়িয়ে নেন, তাদের মধ্যে একজন।

সেখানে মহাশ্বেতা দেবীর হাজার চুরাশির মা নিয়ে আলোচনা হয়েছিল। আমার ব্যক্তিগত স্মৃতিচারণে মনে পড়ে আমার প্রিয় শিল্পী লাইসা আহমেদ লিসা আপা এই বইটি আমাকে আমার জন্মদিনে উপহার দিয়েছিলেন। বইটি সে সময় আমাদের প্রজন্মে বা ক্যাম্পাসে কিশোর-কিশোরী বা তরুণ-তরুণী এমন কেউ নেই যে পড়েনি। মহাশ্বেতা দেবী বলছিলেন, বইটির প্রতি সবার এই বিশেষ পক্ষপাত তিনি বুঝতে পারেন না। হাসান চাচা বলেছিলেন ‘কারণ এখানে একজন মা আছে।’

আগুনপাখি, প্রথম আলো পুরস্কার, আনন্দ পুরস্কার পাওয়ার আগে পড়েছিলাম। পুরস্কার পাবার পর মঞ্জুচাচির খুশি মনে পড়ে। তিনি ঝলমল করছিলেন। বলেছিলেন, ‘মা-কে নিয়ে লেখা তো, তাঁর আশীর্বাদ আছে।’

তাঁর আরেকটি লেখা আর মূল্যায়ন এই প্রসঙ্গে আমার মনে পড়ে যাচ্ছে। এটি অনেক আগে লেখা তার গোরা উপন্যাসটি নিয়ে লেখা মূল্যায়ন। এই মূল্যায়ন যারা রবীন্দ্রনাথ পড়েন, তাদের পড়ার মতো, না পড়লেও পড়ার মতো। চাচার সাহিত্য সমালোচনা নিয়ে আমার একটু দুঃখ ছিল। হয়তো মনে হয়েছিল, তিনি চাইলে এক একটা বই নিয়ে, উপন্যাস নিয়ে, ক্লাসিক নিয়ে, লেখক নিয়ে এক একটা পাণ্ডুলিপি রচনা করতে পারতেন, কিন্তু তা করেননি। কেন দুঃখ ছিল, সেটা গোরা-র মূল্যায়ন পড়লে বোঝা যায়। এমন পূর্ণাঙ্গ লেখা আমার আরও পেতে ইচ্ছে করেছে। এখানে প্রত্যেকটি চরিত্র নিয়ে আলাদা করে গভীর আলোচনা আছে, আর গোরার মা আনন্দময়ী সম্পর্কে তাঁর মূল্যায়ন। গোরার মা আনন্দময়ী রবীন্দ্রনাথের এক মহত্তম সৃষ্টি, এ কথা হাসান আজিজুল হক এই সমালোচনায় লক্ষ্য করেছেন।

মহাশ্বেতা দেবীর সঙ্গে নেওয়া সেই সাক্ষাৎকারটিতে হাসান চাচা ছিলেন, তাই এখানে অধ্যাপক মলয় ভৌমিক ও তাঁরা মিলে একটি সেতু তৈরি হয়েছিল, যেটির কথোপকথন ও বিনিময় আমাদের সমৃদ্ধ করছিল। এখানে কতগুলো কথা আমার মনে আছে এখনও, যদিও এর মধ্যে ২৫ বছর কেটে গেছে। মহাশ্বেতা দেবী বলছিলেন, ‘আমাদের রৎৎবাবৎবহঃ হতে হবে বলেই এত ৎবাবৎবহঃ হতে হয়’, সাহিত্যসৃষ্টির ব্যাপারে বলছিলেন। আমার মনে হয়েছিল তিনি বলছেন খুব নিষ্ঠা নিয়ে সাহিত্য পড়তে হয়, সেই বলয়কে আবার অতিক্রম করে নতুন আঙ্গিক ও দৃষ্টিকোণ থেকে লেখার জন্যই। অর্থাৎ একজন সৃষ্টিশীল সম্ভাবনাময় লেখক সাহিত্যের যে সিঁড়ি অতিক্রম করে আসেন, সেই সিঁড়িগুলোকে ভালো করে চিনতে হয়, আরেকটু এগিয়ে যাওয়ার জন্য। চাচা ও তাঁর নিজের লেখার মধ্যে এই ব্যাপারটা আছে বলেই তিনি উল্লেখ করেছিলেন। এ ছাড়া বলেছিলেন, কোনও নির্দিষ্ট ভাষার ওপর অসাধারণ দখল আরেকটি ভাষার ওপর দখল তৈরি করার জন্য জরুরি। যেমন ধরা যাক, যিনি বাংলায় ভালো তিনি ইংরেজি বা স্প্যানিশ বা ফরাসি বা ফার্সি বা উর্দুতে ভালো হতে পারবেন অনায়াসে। তাই একটি ভাষা অন্তত ভালো করে শেখা চাই। হাসান চাচাও এ কথায় সহমত ছিলেন। তখনও শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে বুদ্ধিজীবীদের চিন্তাভাবনা যেমন ছিল, তাতে তারা মনে করতেন, বাংলা ভাষা খুব ভালো করে শিখলে আমাদের আর অন্য ভাষার ব্যাপারে দুশ্চিন্তা করতে হবে না। এমনিতেই শিখতে পারবে। কথাটা আমি ব্যক্তিগত জায়গা থেকে না মেনে পারিনি, কারণ ভাষা শেখার নিজস্ব আনন্দ আমিও পেয়েছি ছোটবেলা থেকে।

হাসান চাচা আমাদের দুটি বই সেই সময় পড়তে দিয়েছিলেন বিশেষ করে। একটি পাবলো নেরুদার ‘মেমোয়ার্স’ যা আমাকে তিনি সেই সময় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রকাশিত ত্রৈমাসিক পত্রিকা প্রাকৃত-তে অনুবাদ করতে অনুরোধ করেন (আসলে, একদিন এসে জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘বইটার অনুবাদ আমাদের প্রাকৃত-তে দেব ভাবছি।’ বলে, আমার দিকে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালেন। ‘আনন্দ করবে ?’) বইটি আমাকে নানা দিক থেকে ল্যাটিন আমেরিকার সাহিত্যের দরজা খুলতে সাহায্য করেছিল, আরেকটি ইজাবেল আয়েন্দের পলা। এ ছাড়া তার বাসা থেকে অসংখ্য বই আমি নিজে এনে পড়েছি। প্রাকৃত নামের ত্রৈমাসিক পত্রিকাটির কাণ্ডারি হাসান চাচা ছিলেন। এতে তখনকার উঠতি লেখক শহীদুল জহির ছাড়াও অনেক গুণী লেখক আর অসাধারণ মানুষের মনীষার সমন্বয় ঘটেছিল।

হাসান চাচার কাছে আমার কবিতার খাতা নিয়ে যাওয়া ছিল আমার একটা আশ্রয়ের জায়গা, একজন পনেরো-ষোলো বছরের কিশোরী হলেও তিনি যে সময় করে কবিতাগুলো মাঝেমাঝে সত্যি দেখতেন তার কিছু প্রমাণ আমি পেয়েছি। যিনি লেখেন, বা জন্মগত বাতিক যাদের লেখা, অল্প বয়সে একজন এই মাপের সাহিত্যিকের প্রশ্রয় পাওয়া তার জীবনে কত বড়ো ব্যাপার হতে পারে সেটা খানিকটা অনুমান করা যায়!

চিলির নোবেল বিজয়ী কবি পাবলো নেরুদার কবিতা, তাঁর জাদুময় গদ্য যা স্প্যানিশ থেকে ইংরেজিতে অনুবাদের পরও আশ্চর্য বোধ হয়, রাষ্ট্রদূত আর কবি হিসেবে তাঁর জীবনের ব্যাপ্তি ও গভীরতা, এসব আমাদের অনেক কিছু দিয়েছে ও এখনও দেয় নিশ্চয়ই। এভাবেই আমাদের কাছে হাসান চাচা কবিতাপ্রীতি আর একজন বিশ্বমানের কবির সমৃদ্ধ জীবনপ্রাচুর্যকে মিলিয়েছেন।

মহাশ্বেতা দেবীর কথায় ফিরি। সেবার তিনি বলেছিলেন, তোমরা কেউ ‘উজান’ নামটা ব্যবহার করো না কেন ? এবার কেউ জন্মালে তার নাম ‘উজান’ রেখো। বিহাসে চাচাদের আবাসিক বাড়িটির নাম রাখা হয়েছিল, ‘উজান’ আর তার নাতনির নাম রাখা হয়েছিল ‘উজানী’। এমনভাবে অনেকগুলো অভিজ্ঞতা আমাদের নাড়া দিতে থাকে।

হাসান চাচার বাড়িতে বহুবার যাওয়ার সুবাদে কখনও কখনও তাঁর একান্ত সান্নিধ্য ও সময় হয়তো বা পেয়েছি সেই তরুণ বয়েসে। তিনি যখন কথা বলতেন আমরা শুনতাম আর অনেক সময় এটা-ওটা প্রশ্নের মাধ্যমে হয়তো আলোচনা আরও ডালপালা মেলে ছড়িয়ে যেত। তবে উনি এসব আলোচনা রোজ রোজ করতেন না। ওঁর অনুসন্ধান আর পড়াশোনা তো বহুদিকেই ছিল, বাড়িতে চার-পাঁচটি পত্রিকাই আসত রোজ। এ ছাড়া মাসিক বা ত্রৈমাসিক সাহিত্য পত্রিকা সম্ভবত সব কটি আসত। গ্রন্থাগারের কথা আগেই উল্লেখ করেছি। এর মধ্যে থেকে নৃতত্ত্বের ওপর একটি বই একবার দিয়েছিলেন। মানুষের জিনের ওপর নির্ভর করে মানুষের আদি-পরিচয় উদ্ঘাটন করে যে মিল পাওয়া যায় সে-সম্পর্কে বলেছিলেন। এই যে মানুষের মধ্যে মৌলিক নৃতাত্ত্বিক আর আণবিক মিলটুকু, জীবন-মৃত্যুর মধ্যে নানা বৈচিত্র্যে বাঁধা নানা পরিচয় ও অভিজ্ঞতার পরও স্বচ্ছ চিন্তা দিয়ে ফেলতে পারি না সেই জৈবিক মিলটুকু, সেই নিয়ে তাঁর আলোচনা তখন শুনেছি। পরে, বেশ অনেক পরে, এখন সোশ্যাল মিডিয়া ও ইন্টারনেটের সূত্রে এসব তথ্য হাতের কাছে পৌঁছে গেছে। জেনেটিক দিক থেকে মানুষকে দেখলে দুই মানুষের মধ্যে ৯৯.৯%-এর মতো অভিন্নতা দেখা যায়, এই কথাটা জানার পর ‘এই দুনিয়ায় এক জাতি আছে/ সে জাতির নাম মানব-জাতি’ কথাটা আর আপ্ত-বাক্য মনে হয় না। আর চাচা তো সাহিত্যে নানা ধরনের বিচিত্র মানুষের নানা ধরনকে এক ছাতার তলায় আনেন, আমরা সবকিছুই মানবিক বিষয় বলে দেখি। আর স্মরণ করি ‘ঘড়ঃযরহম যঁসধহ রং ধষরবহ ঃড় সব,’ কার্ল মার্কসের সেই উক্তিকে।

অন্যদিকে চাচার বর্ষীয়ান জীবনে তিনি শুধু লিখেছেন তা তো নয়। আমাদের মধ্যে অনেকেই তাঁকে বক্তা হিসেবে চিনি। এমন বক্তব্য―যা হাটেমাঠে সকলেই শুনতে পারে, হাঁ হয়ে দাঁড়িয়ে পড়তে পারে। যেসব দশক চাচারা পেরিয়ে এসেছেন সেখানে শিক্ষকরা মানুষের সংগ্রামে সহজাতভাবে পাশে থাকবেন আর গণতান্ত্রিক সমাবেশে, সভায়, সেমিনারে, আলোচনায় তাঁরা কথা বলবেন এটাই স্বাভাবিক বলে মনে হয়েছে। চাচার কথাগুলো যেমন পরিষ্কার, তেমনি শক্তিদায়ী। আমাদের রক্তে তিনি স্বচ্ছতা আর টানটান ধনুকের একাগ্রতা দিতেন। এই হিসেবে তাঁর বক্তব্য যারা না শুনেছে, তারা অনেকটা মিস করেছে।

সাম্প্রদায়িকতা আমাদের দেশে নানাভাবে ছড়িয়ে আছে আর হাসান আজিজুল হক―বারবার মনে করিয়ে দিয়েছেন দেশের কথা, দশের কথা, একাত্মতার কথা, আমাদের মুক্তিযুদ্ধের কথা, রবীন্দ্রনাথের কথা, নজরুলের কথা। কোথাও তাঁর বক্তব্য সুর থেকে চ্যুত হয় না―মনে হয় এক বিশাল অর্কেস্ট্রা শোনার মহিমা আমাদের হৃদয় স্পর্শ করছে, কারণ তা তো আমাদের বোধকে নানাভাবে জাগরিত করে। সাম্প্রদায়িক হানাহানি বিষয়টা জটিল আর চাচাকেও আমি এর কোনও সরল সমাধান বা সরল ব্যাখ্যা দিতে দেখিনি। কিন্তু তিনি চিনিয়ে দিতেন আমাদের ভেতরের সুপ্ত চেতনার বীজটি, যেন সে নিজেই উন্মীল হয়, নিজেই আলোর দিকে এগিয়ে যায়। চাচার সব কর্মকাণ্ডে এই আলোর অভিসার আমাদের চোখে পড়ে।

সাম্প্রদায়িক, সংকীর্ণ, নারীবিদ্বেষী সব ঘটনা―তাই তিনি তাঁর মৌখিক আর লিখিত প্রতিবাদ জানিয়েছেন, শেষ জীবন পর্যন্ত। তিনি বলতেন, ‘আমি তো একা একা ভালো থাকতে চাই না। সবাইকে নিয়ে ভালো থাকতে চাই।’ এই ‘সবাইকে নিয়ে ভালো থাকা’ কাকে বলে তার ছোট ছোট মডেল আমরা আমাদের জীবনে নানাভাবেই দেখার সুযোগ পেয়েছি। এখানে অবশ্যই নারীরা থাকেন, তরুণরা থাকেন, থাকে শিশুরা, থাকে সর্বস্তরের মানুষ। এই সবাইকে নিয়ে ভালো থাকার মধ্যে বিভেদ হানাহানি এসে পড়ে না―যদি না আমরা মনে রাখি, ‘ইউনাইটেড উই রাইজ, ডিভাইডেড উই ফল।’ আর শেষ জীবন পর্যন্ত ‘ইউনাইটেড’ থাকার কথা তাঁর সর্বশেষ পাবলিক বক্তব্যেও জানিয়ে গেছেন।

সমাজে নানা সময়ে প্রচলিত সাম্প্রদায়িকতার সুতোয় জড়ানো রবীন্দ্রবিদ্বেষ নিয়ে অনেক বলেছেন, কিন্তু আবার তাঁর সুর অন্ধকারের সামনে দাঁড়িয়েও আঁধারগ্রস্ত হয়নি। তিনি জানেন আঁধারকে আঁধার দিয়ে কাটানো যায় না। জানতেন সব রকম বীজ নিয়েই দেশ কাল মানুষ―তাই হয়তো বিধবাদের কথার মতো এমন অসাধারণ গল্প লিখেছিলেন। একটি দেশের মধ্যে হানাহানি যখন পরিবারের দুটি ছিন্ন সত্তার মতো কিছুতেই মিলতে চায় না, তার মতো কষ্টের কী আছে। এই কষ্টটাকে তিনি সরলীকরণ করতে চান না, বুঝতে চান। এই বোঝার জায়গা থেকেই, হয়তো আসে উত্তরণ। চাচাকে এখনও আমাদের বোঝার অনেক বাকি। আমার ধারণা তাঁকে নিষ্ঠা নিয়ে পাঠ করলেই একমাত্র সেইটা সম্ভব।

রবীন্দ্রনাথের গান নিয়ে হাসান চাচার কিছু লেখা আছে। সেগুলো যারা রবীন্দ্রনাথের গান করেন বা শোনেন, তারা পড়ে দেখতে পারেন। চাচা ঘরোয়া ভঙ্গিতে রবীন্দ্রনাথের কথা লেখেন, কিন্তু সেখানে রবীন্দ্রনাথকে কাছে পাই, খুব কাছের মানুষ মনে হয়। তেমনি মনে হয়, হাসান আজিজুল হককেও। সারা জীবন তিনি রবীন্দ্রনাথ পড়েছেন, কেমন বিবর্তন ঘটেছে সেই পাঠের, এই প্রশ্ন থাকলেও পরিষ্কার উত্তর তিনি রেখে যাননি। তবে ‘আমার রবীন্দ্রযাপন’-এর লেখাগুলো থেকে কিছুটা জানা যায়। প্রকাশক আর সম্পাদককে সাধুবাদ জানাই। আর অনুরোধ রাখি, যেন পরবর্তী সংস্করণে আশা করি সব লেখার তারিখ, স্থান, তাঁরা আমাদের দিতে পারেন।

চাচার লেখায় যা পাইনি, তার হিসেব মেলাতে নয়, তবু এই প্রসঙ্গে উল্লেখ করে রাখছি। কেন তিনি রবীন্দ্রনাথের কবিতার কথা তেমন একটা উল্লেখ করেননি, নাটক, গীতিনাটক, নৃত্যনাট্য আর রাজর্ষি উপন্যাসটি নিয়ে লেখেননি, বা বিশেষ কিছু বলেননি, বলে থাকলে, আমার জানা নেই। বিজ্ঞাপনপর্ব বলে একটি পত্রিকায় তাঁর বিশেষ দীর্ঘ সাক্ষাৎকার ছাপা হয়েছিল, সেখানে দেখেছি বলে মনে করতে পারি না। আগেই বলেছি, চাচার কাছে হাজার দুয়ারী উন্মোচনের জন্য আমাদের তৃষ্ণা বরাবর ছিল। তাই এই বিষয়গুলোতে তিনি কী ভেবেছিলেন, তা জানতে খুব আগ্রহ হয়!

আমার রবীন্দ্রযাপন-এ দেখেছি তিনি শেষের কবিতা নিয়ে মন্তব্য করেছেন লেখাটি তাঁর কাছে হীরক-দ্যুতি বলে মনে হয় না, উনি ফটিকের আলোর কথা লিখেছেন। এতটুকু কথার মধ্যে অনেক না-বলা আলোচনা আছে―শেষের কবিতা উপন্যাস হিসেবে ড়াবৎৎধঃবফ এটা তিনি হয়তো বলতে চেয়েছেন কিন্তু আমার সহজাত প্রশ্ন, হালফিল এই লেখাটির কালজয়ী জনপ্রিয়তা এতটা বেশি কেন। কিছু মতামত আছে আমার এই উপন্যাস নিয়ে, রবীন্দ্রনাথের পরিণত জীবনে, নর-নারীর সম্পর্ককে খুব উজ্জ্বল বোধের লেন্স দিয়ে দেখতে কেমন লাগতে পারে, সেই নিয়ে। লেখাটি আধুনিক, এবং শুধু আঙ্গিকের কারণে নয়, বিষয় ও দৃষ্টিকোণের কারণেও, এমন আমার মনে হয়। দৈনন্দিন গ্লানিকর জীবন থেকে মুক্ত উজ্জ্বল মানুষ যদি একটা ভুবন রচনা করে বাঁচতে পারে―যেটা খুব অকল্পনীয় কিছু না (আমি তেমন একজন মানুষের দৃষ্টান্ত হিসেবে রবীন্দ্রনাথের স্নেহভাজন লেখক রাণী চন্দ, লীলা মজুমদার অথবা মৈত্রেয়ী দেবীর কথা ভাবি, বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন, নবনীতা দেবসেন, বেগম সুফিয়া কামাল, গৌরী আয়ূব বা এ রকম আরও শ্রদ্ধাভাজন নারী আছেন যাদের কথা এই প্রসঙ্গে মনে পড়ে), তাঁরা সংখ্যাগুরু না হলেও তাঁদের মতো মানুষের জীবনদর্শন একটি উপন্যাসের উপজীব্য হতেই পারে। যেহেতু সংসার, বিবাহ, ভালোবাসা, বন্ধুত্ব, এসব থিম কখনও পুরনো হয় না, তাই অন্তত বোদ্ধা সমাজে এই উপন্যাসটি নিয়ে বোধ ও বুদ্ধিদীপ্ত আলোচনা-ডায়ালগ কখনও শেষ হওয়ার নয়।

আমার রবীন্দ্রযাপন বইটিতে রবীন্দ্রনাথের উপন্যাস, গল্পগুচ্ছ আর ছিন্নপত্র নিয়ে চাচার মূলত লেখা আছে। এ ছাড়া গান নিয়ে লেখা আছে। চাচাকে রবীন্দ্রনাথের গান শোনার সময় দেখতাম চোখ বন্ধ করে, হাতের তালুতে কপাল রেখে চিন্তা করার ভঙ্গিতে গান শুনছেন। মনে হয় তিনি শুধু সুর শুনছেন না, বাণীর মধ্যে তলিয়ে যাচ্ছেন। রবীন্দ্রনাথের গানের কোনও ধহধষুংরং চলে না, সেই অমূর্তকে যে-বাণী ও সুর সৃষ্টি করে, তাকেই তিনি কীভাবে পেয়েছেন তার বর্ণনা করেছেন। আর তখন পড়তে পড়তে মনে হবে, যে হাসান আজিজুল হক সেন্টিমেন্টাল আঙ্গিক ছেঁটে ফেলে মানুষের গল্প লেখেন, আমাদের বিমূঢ় করেন, সেই হাসান আজিজুল হকের রসাস্বাদন কী অসম্ভব প্রখর আর মধুর! চাইলে তিনি রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে কবিতা লিখতে পারতেন, গদ্য এমন জাদুময় :

ভালোই জানি, কেবল বাণী দিয়ে রবীন্দ্রনাথের গান নয়। সুরে ছন্দে লয়ে শব্দবন্ধে ধ্বনি-সংগঠনে বাণী কতটা আশ্রয় নেয়, নির্ভর করে, প্রস্ফুটিত হয়ে ওঠে, সৌগন্ধে সুষমায় প্রকাশের দৃঢ়তায় কোমলতায় বাণী কতটা অচেনা হয়ে ওঠে, ভাষার দৈনন্দিনতা অতিক্রম করে যায় সেসব অবশ্যই দেখার বিষয়। বাংলা সব গানের ক্ষেত্রেও তাই : অতুলপ্রসাদ, ডি এল রায়, রজনীকান্ত, নজরুল, কেউই বাণীসর্বস্ব নয়। রবীন্দ্রনাথও নন। তবু আমি রবীন্দ্রনাথের গানের ভাষা বা বাণীর দিকেই কথাটা নিয়ে যাব। যে অতুলনীয়, অভাবনীয় অভিজ্ঞতা আমার হয়েছে, শুধু সেটুকু বলার জন্যই।

তারপর তিনি ভাষার কথাটা বলছেন এইভাবে :

ভাষা আমাদের সব দেয়। ৃজীবনে মানুষের পক্ষে ভাষা অপরিত্যাজ্য, সুনির্দিষ্ট, নিশ্চিত নির্দেশক। সর্বকর্ম পারদর্শী নিত্যদিনের অন্নজল। আবার তরল আকারধারী, অনিশ্চিত, দ্বিধাগ্রস্ত, আলোছায়াময় দুর্জ্ঞেয়তায় ঘেরা। সে যতটা মূর্তকে নির্দেশ করতে পারে, ঠিক ততটাই কিংবা তারও বেশি অমূর্তকে প্রকাশের ইঙ্গিত করতে সক্ষম। … ভাষা দিয়ে আমরা কাজ করি, আদেশ মানি, আদেশ করি, ব্যাকুলতা জানাই, আক্রোশ, ক্রোধ, ঘৃণা ও স্বার্থপরতা প্রকাশ করি―আর কি ভাষা দিয়ে কিছুই করি না ? এইখানেই শেষ ? … আমার ধারণা আমরা মানুষের ভাষা সামান্যই ব্যবহার করি। …শিল্পের কাছে এলে এই বোধ আমার মধ্যে প্রবল হয়ে ওঠে আর রবীন্দ্রনাথের গানের কাছে এলে বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে যাই। এত অনিঃশেষ এই সম্ভাবনা ? এত অতল, এত গভীর, এত অনির্দেশ্য, এত মন কেমন করা ? এত বহুস্তরা অনুভব, এত সূক্ষ্ম মানবিক বোধ, এতটা সর্বগ্রাসী ? তখন যে আর ‘ভাষা’ শব্দটা আর চলল না। ‘বাণী’ না বললে প্রকাশটা যেন সম্পূর্ণ হচ্ছে না। … রবীন্দ্রনাথের এরকম শত শত গানের নগদ ছাঁকা অর্থ কিছু নেই। … অতল দীঘির ঠিক মাঝখানে ফুটে-থাকা পদ্মের মতো তাঁর কত কত গানের ভেতরে এরকম ফুটে থাকা পদ্ম ছড়িয়ে আছে। কী করে তৈরি এসব গান ? ‘ভাষা’ দিয়ে ? বাণী দিয়ে ? এরা নীরবে জানাচ্ছে, অর্থ খুঁজো না।

এ তো সামান্য একটুখানি উদ্ধৃতি। মূল লেখার সঙ্গে আলাদা করে কতটুকু বা বোঝা সম্ভব ? হাসান আজিজুল হক যখন ছোট গল্প আর উপন্যাস লেখেন তখন বিষয়ের আধার হিসেবে রপ্ত করে নেন সেই অঞ্চলের মুখের ভাষা। তা চাঁচাছোলা নিপাট, অবিকল। আবার যখন রবীন্দ্রনাথের গান নিয়ে লেখেন, বা রবীন্দ্রনাথ নিয়েই লেখেন তিনি, তখন তাঁর শ্রুতি আর পাঠের নিবিড় অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে আমরা পাই এই অসাধারণ কবি-সত্তাকে। হাসান চাচা প্রথম জীবনে কবিতা লিখতেন। শামুক ও একাত্তর: করতলে ছিন্ন মাথাতে একটি লেখায় তাঁর একদম প্রথম দিককার গদ্যের মায়াবী সুর আমরা দেখেছি। তার অনুভবের রসে সিক্ত। সেটা তিনি প্রকট করতেন না পরের দিকে। গদ্যকে তৈরি করে নিয়েছিলেন অন্যভাবে। আগুনপাখিতে অবশ্য আবার নতুন গদ্য তৈরি করেছেন। আর রবীন্দ্রনাথ নিয়ে সারা জীবন পড়ে, শুনে, গেয়ে তারপরও হাসান চাচার একটি লেখা থেকে যেন হাজারটি দরজা খুলে যায়।

হাসান চাচা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রিটায়ার করার পর দুইটি অসামান্য উপন্যাস লিখেছেন, আগুনপাখি, সাবিত্রী উপাখ্যান, লিখেছেন তাঁর শৈশব-কৈশোর আর উঠতি তরুণবেলা নিয়ে তিনটি খণ্ডে ছড়ানো স্মৃতিকথন। এই স্মৃতিকথনে তিনি যে-বাংলাকে প্রকৃতি-মানুষ-ইতিহাসের চালচিত্রে রেখে আমাদের চিনিয়ে দেন, তা আমাদের চোখের সামনে এখন আর নেই। আমি অন্তত ধ্যানস্থ আনন্দের পূর্ণতা পাই তার এই লেখায়―কারণ কোথাও একটা তা সম্পূর্ণ বোধের আলোয় উজ্জ্বল, শিশুর মতো সত্য, সহজ আর পেলব, আর সামগ্রিক। আমি জানি না কোথাও আঠারটি বছরকে এতটা লহমায় লিপিবদ্ধ (ইংরেজিতে যে লেখাকে বলা যায় ‘ৎিরঃঃবহ রহ ৎবধষ ঃরসব’) কেউ করেছেন কিনা আগে, আমার কাছে এই স্মৃতিকথন চাচার লেখাকে এবং বাংলার চিত্রকে বোঝার জন্য খুব জরুরি মনে হয়―একাডেমিক কারণ ছাড়াও, লেখাগুলো অসামান্য। এতে নাটকীয়তা নেই, সম্পূর্ণ নিবেদন আছে স্মৃতির কাছে। বিভূতিভূষণের লেখাপড়ার মতো এপিক পাঠের অভিজ্ঞতা হয়তোবা। নিজের কথা লিখতে তিনি লেখেননি, লিখেছেন একটা সময়কে ধরার জন্য, যেটি এভাবে আর কারও পক্ষে ধরা সম্ভব ছিল না।

লেখা প্রসঙ্গে একবার বলেছিলেন, ‘যা লিখতে চাও, তা মোক্ষম তীরের মতো পেড়ে আনতে হবে’। পরে নেরুদার অনুবাদ হাতে পেয়ে বলেছিলেন, ‘একটা নিজস্ব গদ্য তৈরি করে ফেলেছ’। লেখা নিয়ে আরও বলতেন কোনও কিছু যেন ‘ভুঁই-হারা’ না হয়। ‘ভুঁই’ তো নানা-মাত্রিক। প্রথমে নিজের মানবিক, বৈশ্বিক সত্তা আছে, এইটা আমার কাছে ভুঁই। এই ভুঁই না খুঁজে পেলে স্থির হওয়া যায় না। আবার দেশ-কাল-সময় সমকাল, সমবেত সামগ্রিক অস্তিত্ব―যেখান থেকে খাদ্য আসে, জল আসে, পুষ্টি আসে, হৃদয়ের সূর্যালোক আসে, সেই সবই আমাদের ভুঁই। আবার একজন লেখকের কাছে সত্য আর বাস্তবকে সহজেই ধরতে পারা, নিজের সঙ্গে সৎ থাকা, এই সব বিষয়গুলো আছে। উনি কী বুঝিয়েছিলেন তা তিনি কখনও ব্যাখ্যা করেননি। উনি রেশটুকু তৈরি করে দিতেন। আমাদের মতো করে আমাদের সেটা বুঝে নিতে হতো। আজকের বোধবুদ্ধি দিয়ে যখন ফিরে তাকাই, মনে হতে পারে, কোনও কিছুর উৎপত্তি নিজের মাথার মধ্যে শুধু প্রভাব বিস্তার করে থেকে গেলে তা ভুঁই-হারা। যখন এমন কোনও বোধ থাকে যা মানবিক-রসে ভারাক্রান্ত, যা মানুষের কাছ থেকে উৎসারিত হয়, তার প্রয়োজনে লাগে হয়তো সেই সব উপাদানকে তিনি বুঝিয়েছিলেন। আমি যা বুঝি―যিনি বাংলা পড়েন, বাংলা পড়ে আনন্দ পান, বাংলা যাঁকে মাতায়, হাসায়, কাঁদায়, ভরসা দেয়, তাকে সম্ভবত কোনও না কোনওভাবে হাসান আজিজুল হকের কাছে আসতে হবে।

 লেখক : প্রাবন্ধিক

Leave a Reply

Your email address will not be published.

shares