সাক্ষাৎকার : বাংলাদেশ স্বাধীন হলো, বিরাট এক সম্ভাবনা দেখা দিল : আসাদ চৌধুরী

সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেছেন : দিলারা হাফিজ

[দেশবরেণ্য কবি আসাদ চৌধুরী জন্ম নিয়েছিলেন বরিশালের মেহেন্দিগঞ্জ উপজেলার উলানিয়ায়।

সময়টা ছিল ১৯৪৩ সালের বাঙালির ভাষার মাস, ফেব্রুয়ারি ১১ তারিখ।

ষাটের প্রধান কবিদের অন্যতম একজন তিনি। সুবচনে, সুভাষণে, কবিতা-কথনে তিনি ভিন্ন কণ্ঠস্বরের এক জীবন্ত মিথস্ক্রিয়া। বাংলা কবিতার ধারায় যুক্ত করেছেন, দৈনন্দিন জীবনের সহজ ও অনায়াস লব্ধ শব্দমালার এক অনাড়ম্বর কাব্য-সংসার―যেখানে আজও সূর্য হলেন ঘড়ি। প্রথম কাব্যেই তবক দেয়া পান-এর আমন্ত্রণ জানিয়ে যিনি এ দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের অন্যতম এক কবি ও শিল্পী হয়ে উঠেছেন, তিনি কবি আসাদ চৌধুরী। সদানন্দ প্রকৃতির মতো নিরাভরণ এবং মরমিবাদের অনন্য এক কবিতা-সাধক। তাঁর কবিতার পরতে পরতে যেমন আছে ইতিহাস, দর্শন, সর্বোপরি মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের দীপাবলি।

নিসর্গের আলো-ছায়া, প্রেম ও প্রকৃতি মিলে কাব্যের শিল্পচিহ্ন মুদ্রিত হয়ে আছে তাঁর ভাষা-ছন্দে, উপমায় ও চিত্রকল্পে। স্বর্ণাভ মুদ্রার মতো কবিতায় ঝলসে ওঠে তাঁর সত্যসমূহ ও শব্দসমূহ। সভ্যতার অগ্রগতির পাশাপাশি মূল্যবোধের অবক্ষয় তাঁকে পীড়িত ও ব্যথিত করে। এসব ভাবনা ও বিষয়বস্তুর নানা বৈচিত্র্য নিয়েই ১৯৭৫ সালে প্রথম প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ তবক দেওয়া পান থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত প্রকাশিত হয়েছে তাঁর ১২টির অধিক কাব্যগ্রন্থ। এ ছাড়া প্রবন্ধ―গবেষণা, শিশুতোষ, জীবনীগ্রন্থ, অনুবাদ, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, সম্পাদনা গ্রন্থসহ বাংলা সাহিত্যে তাঁর অবদানের জন্য পেয়েছেন অসংখ্য পুরস্কার। তারমধ্যে উল্লেখযোগ্য―১৯৮৭ সালে বাংলা একাডেমি পুরস্কার এবং ২০১৩ সালে একুশে পদক লাভের ঘটনা দুটি একজন কবির কাব্যচর্চা পথের অনুপ্রেরণা এবং জাতীয় স্বীকৃতির অভিভাষণ বলেই মনে করি।

করোনা উজিয়ে ২০২১ সালে তিনি পূর্ণ করবেন ৭৮ বছর বয়স। পিতা, মোহাম্মদ আরিফ চৌধুরী, মা, সৈয়দা মাহমুদা বেগম।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের পাঠ চুকে যাওয়ার পর কলেজে অধ্যাপনার মধ্য দিয়ে আসাদ চৌধুরীর চাকরিজীবন শুরু। ব্রাহ্মণবাড়িয়া কলেজে তিনি ১৯৬৪ থেকে ১৯৭২ পর্যন্ত শিক্ষকতা করেন। ১৯৭২ সালে তিনি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কন্যা সাহানা বেগমকে দাম্পত্য সঙ্গী হিসেবে বেছে নেন।

১৯৭৩ সালে তিনি বাংলা একাডেমিতে যোগদান করেন এবং ঢাকায় স্থায়ীভাবে বসবাস করেন। ১৯৮৫ থেকে ১৯৮৮ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত তিনি লিয়েনে ভয়েজ অব জার্মানির বাংলাদেশ সংবাদদাতার দায়িত্ব পালন করেন। অতপর ঢাকায় ফিরে এসে বাংলা একাডেমিতে দীর্ঘকাল চাকরির পর তিনি পরিচালক হিসেবে অবসর গ্রহণ করেন। সুদীর্ঘ এই পথ চলায় বর্ণাঢ্য যে কবিজীবন তিনি যাপন করেছেন―তার সহায়ক শক্তি হিসেবে স্ত্রী সাহানা চৌধুরী ছিলেন অনুপ্রেরণার উৎসমুখ। কবির কাব্য সৃষ্টির নেপথ্যের সব বাধা-বিপত্তিকে তিনি সদা সর্বদা দুই হাতে সরিয়েছেন। একইভাবে তাঁদের সন্তানেরা কবি-পিতার প্রতি ততটাই উন্মুখ এবং কাব্যের নিরাপদ পরিবেশ সৃষ্টি করে রেখেছেন কবির জন্য।

দাম্পত্য জীবনে তাঁদের প্রথম পুত্রসন্তান আশিক ওয়াহেদ আসিফ। ২০০৪ সাল থেকে টরন্টোতে বাস করছে। কবি পিতার পুত্র হিসেবে প্রবাসে থেকেও বাংলা ভাষার চর্চায় নিবেদিত প্রাণ সে। আবৃত্তি সংগঠন ‘অন্যস্বর’ এবং ‘বাচনিক’-এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন। এ ছাড়া নাটকেও কাজ করছে ‘অন্য থিয়েটার’-এর সঙ্গে। গানের শিল্পী হিসেবে ছায়ানটের সঙ্গেও তাঁর গভীর সম্পৃক্ততা রয়েছে।

দ্বিতীয়, একমাত্র কন্যাসন্তান নুসরাত জাহান শাঁওলি, বৈবাহিক সূত্রে সেও ২০০৮ সাল থেকে টরন্টোতে বসবাস করছেন। দুই সন্তান ও স্বামী নাদিম ইকবালকে নিয়ে চমৎকার আনন্দিত সংসার তাঁর।

সর্ব কণিষ্ঠ পুত্র জারিফ চৌধুরী বর্তমানে সস্ত্রীক বাংলাদেশে বসবাস করছেন। সেও কিছুদিনের মধ্যে চলে আসবেন টরন্টোতে। কবি আসাদ চৌধুরী সস্ত্রীক পুত্র-কন্যার সান্নিধ্যে বসবাস করছেন টরন্টোর মতো মানবিক এই দেশটিতে।

একমাত্র কন্যা নুসরাত জাহান শাঁওলির স্বামী চলচ্চিত্রকার নাদিম ইকবাল ইতিমধ্যে কবি আসাদ চৌধুরী ও তাঁর কন্যা মিস্টিকে নিয়ে ‘মাদার টাং’ নামে চমৎকার একটি ডকুমেন্টারি তৈরি করেছেন। প্রবাসী বাঙালি প্রজন্মের মুখ থেকে আগামী দিনে বাংলাভাষা যেন হারিয়ে না যায়, সেই উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা ও বেদনাই যেন স্বল্পদৈর্ঘ্য এই কাহিনি ঘিরে প্রস্ফুটিত হয়ে উঠেছে।

এই ছবিতে প্রধান চরিত্রে নাদিম ও শাঁওলির একমাত্র কন্যা মিষ্টি আর তার নানাভাই কবি আসাদ চৌধুরীর সপ্রতিভ অভিনয় দর্শকদের মন কেড়েছে। বাংলা ভাষার ইতিহাস সমৃদ্ধ এই কাহিনিতে নানা-নাতনির এই বেদনাময় আখ্যান পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তের চল্লিশটিরও অধিক ফিল্ম ফেস্টিভাল থেকে স্বীকৃতি পেয়েছে এবং বিভিন্ন প্রতিযোগিতার সাতটিতেই বিজয়ী হয়েছে।

কবি আসাদ চৌধুরীকে নিয়ে নাদিমের তৃতীয় ছবি ‘স্পিকিং হোম’। এখানেও কবি স্বয়ং প্রধান চরিত্র হিসেবে উপস্থিত আছেন। এই ছবিটি নোভাস্কসিয়ার নকটার্ন ফিল্ম ফেস্টিভালে অনেক দিন ধরে দেখানো হচ্ছে।

নাদিম টরন্টোর সেনেকা কলেজ থেকে ফটোগ্রাফিতে ডিপ্লোমা আর ডকুমেন্টারি ফিল্ম মেকিংয়ে পোস্ট গ্র্যাজুয়েশন করেছে।

বাংলাদেশের লাঞ্ছিত, বঞ্চিত হিজরা জনগোষ্ঠী নিয়ে তাঁর একাধিক প্রামাণ্যচিত্র রয়েছে। যা ইতিমধ্যেই সাড়া ফেলেছে বাংলাশিল্প-সংস্কৃতি জগতে।

কবি আসাদ চৌধুরীর বর্ণাঢ্য জীবন উদ্যাপনের এই গোধূলি লগ্নে আমি কবির মুখোমুখি হয়েছিলাম―মুখোমুখি বলতে করোনাকালে ভার্চুয়ালি কিছু প্রশ্ন নিয়ে তাঁর সঙ্গে কথা বলেছি। অসামান্য এই কবিকে গভীরভাবে জানতে, তাঁর উত্তরগুলোই সহায়ক ভূমিকা পালন করবে বলে আমি বিশ্বাস করি।]

দিলারা হাফিজ  : ‘বারবারা বিডলারকে’ কবিতাটির পরিপ্রেক্ষিত জানতে চাই ?

আসাদ চৌধুরী : ১৯৫৫ থেকে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ ১৯ বছরের অধিক সময় ধরে আমেরিকার বিরুদ্ধে যে প্রতিরোধ যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছে ভিয়েতনামে, যা মূলত দ্বিতীয় ইন্দোচীন যুদ্ধ নামে পরিচিত ছিল। আমেরিকার অধিকাংশ জনগণও এই যুদ্ধের পক্ষে ছিল না।

যুদ্ধের একপর্যায়ে আমেরিকান এক তরুণী বারবারা বিডলার তার নিজ দেশের ভূমিকায় ক্ষুব্ধ ও ক্রুদ্ধ হয়ে লিখেছিল একটি কবিতা। সময়টা সম্ভবত ১৯৬৫ কিংবা ১৯৬৬ সালের দিকে হবে। সেই কবিতাটির অনুবাদ প্রকাশিত হয়েছিল ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে প্রকাশিত ভেলা নামের একটি লিটিল ম্যাগাজিনে।

১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে অক্টোবর মাসে

বেলাল মোহাম্মদ এবং শামসুল হুদা চৌধুরী স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্রে একটি কবিতা পাঠ করতে বলেছিলেন। তখন আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ওই মানসিকতাকে চিহ্নিত করতেই বারবারা বিডলারের প্রসঙ্গ টেনে তাৎক্ষণিকভাবে কবিতাটি আমি রচনা করেই পাঠ করেছিলাম।

১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত জয়বাংলা পত্রিকায় আমি লিডার রাইটার (সাংবাদিক) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছি। এখন মনে হয়, স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্রে কবিতাটি পড়েছিলাম বলে কবিতাটি রয়ে গেছে।

দিলারা হাফিজ  : আপনার বর্তমান নিবাস কানাডার এক তরুণী কবি রুপি কাউরের প্রথম কবিতার বই মিল্ক অ্যান্ড হানি ৫ লাখ কপি বিক্রি হয়েছে। এটি একটি ঘটনা বটে, কবিতার প্রতি পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করার ক্ষেত্রে এমন জনপ্রিয়তাকে আপনি কতটা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করেন ?

আসাদ চৌধুরী : কবিতা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সমাজ-ভাবনার পরিবর্তনে, ভাষার শক্তিমত্তায়, অনুভব ও আবেগের নতুনত্বকে আত্মস্থ করে এগিয়ে চলে। তবে জনপ্রিয়তাকে ব্যঙ্গ করার একটা ফ্যাশন আছে আমাদের।

কেন কবিতাটি ভালো লাগছে, তা বলা খুব শক্ত। তবে আমি মনে করি, জনপ্রিয়তা দোষের নয়, যে লেখা মানুষের বিশ্বাস, ভালোবাসা এবং আবেগকে সঙ্গে নিয়ে এগোয়, তাই জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। ইচ্ছে করলেই কেউ জনপ্রিয় হতে পারে না।

রুপি কাউরের অভিবাসী অভিজ্ঞতা এবং যৌন আঘাতের সন্ধানরত পঙ্ক্তিমালা পাঠক লুফে নিয়েছে। এসব বিষয়ে মানুষের আগ্রহের সীমা নেই। একজন ভারতীয় বংশোদ্ভূত কানাডিয়ান কবি, চিত্রকর এবং লেখক হিসেবে এটি তো তাঁর সাফল্য বটেই।

তবে, রাতারাতি খ্যাতি অর্জনের পেছনে আজকাল প্রযুক্তিরও অবদান রয়েছে। যতদূর জানি, সে তাঁর সংক্ষিপ্ত ভিজ্যুয়াল কবিতা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সবার কাছে ভাগ করার জন্য ইনস্টাগ্রাম এবং টাম্বলারেও খ্যাতি অর্জন করেছে। তাঁর প্রথম বই মিল্ক অ্যান্ড হানি (২০১৪) প্রকাশের পর ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে, তাই নয় শুধু। ২০১৭ সালে প্রকাশিত তাঁর দ্বিতীয় বই দ্য সান অ্যান্ড হার ফ্লাওয়ারস বইটির জন্য ২০১৩ সালে বিবিসির ১০০ মহিলাদের নামের মধ্যে একজন হয়েছিলেন। কাজেই একথা বলা খুব দুষ্কর যে, কেন ভালো লাগছে তাঁর লেখা।

দিলারা হাফিজ  : মানের দিক থেকে বাংলা কবিতার অবস্থান পৃথিবীতে কী পর্যায়ে আছে বলে আপনি মনে করেন ?

আসাদ চৌধুরী : অন্য দেশের কবিতার মতো বাংলা কবিতার একটি ইতিহাস আছে। প্রাচীন যুগ, মধ্যযুগ হয়ে, রবীন্দ্রনাথ থেকে নজরুল ইসলাম এবং জীবনানন্দ দাশ পর্যন্ত একটা ধারাবাহিক গতি লক্ষণীয়। তবে এখানে আমার নিজস্ব একটা ব্যাখ্যা আছে, সেজন্য একটু পেছনে ফিরতে হবে।

বাংলাদেশ! কখন হয়েছে বাংলাদেশ ?

বাঙালি যখন থেকে বাংলায় কথা বলতে শুরু করেছে―তখন থেকে না হয় বাঙালি ভাবা গেল, মানলাম।

কিন্তু বাংলাদেশ ?

বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশ, সেই প্রাচীন যুগ থেকে মধ্যযুগ, মধ্য থেকে নবাবী আমল শেষে ইংরেজ আমল শুরু, যাকে আমরা আধুনিক যুগ বলি। ভুল করে বলি অবশ্য, আধুনিক যুগ তারও আগে ছিল। তা যাই হোক।

স্বদেশ কোনটা ?

সিরাজ-উদ-দৌলার সময় পাটনায় অথবা কটকে যে জন্মগ্রহণ করেছে, সে কি বাঙালি নয় ?

সর্বশেষ ইংরেজ আমলের দেওয়া বাংলার মানচিত্র যেটা পাওয়া গেল, সেই মানচিত্রটাই কি বড় ?

এ রকম একটি প্রশ্ন আমাদের মনে জাগে।

ইংরেজ আমলের পরবর্তী সময়ে ১৯৪৭ এমন কী ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গে আসাম-বেঙ্গল নামে নতুন যে প্রদেশ গঠিত হয়। যার রাজধানী হলো ঢাকা। সেটা এক রকমের।

কিন্তু তারপর যখন রাজধানী কলকাতা থেকে দিল্লিতে যখন চলে গেল, তখন বাঙালির রাজনীতি, দিল্লিকেন্দ্রিক হিন্দু রাজনীতি (আমি হিন্দু শব্দটি এভাবে বলতে লজ্জিতবোধ করছি, কিন্তু না বলেও উপায় নেই। আবার মুসলিম শব্দটি ব্যবহার করতে একইভাবে মুশকিলে পড়ব আমি)।

অপরদিকে মুসলমান রাজনীতিকে হোসেন শহীদ সোহওয়ার্দী, শের-ই-বাংলা এ কে ফজলুল হক, আপ্রাণ চেষ্টা করেছিলেন বাঙালির মধ্যে রাখতে, কিন্তু পারেননি। এমন কি শেষ মুহূর্তে ১৯৪৭ সালে শরৎচন্দ্র বসু, আবুল হাশিম, যুক্ত বঙ্গ করতে শেষ চেষ্টা করেছিলেন।

এই সময়ে সর্দার বল্লভভাই পেটেল, নেহেরুজি একেবারে পরিষ্কার বললেন, পাঞ্জাব এবং বেঙ্গল ভাগ হতেই হবে, এতে যদি ভারতের স্বাধীনতা বিলম্বিত হয়, হোক।

এমন কী আমরা শ্যামা প্রসাদ মুখোপাধ্যায়কে দেখলাম তিনি অনশনের হুমকি দিচ্ছেন। তিনি আমৃত্যু অনশন করবেন যদি বেঙ্গল পার্টিশন না হয়।

এইটুকু তো বহু দিনের স্বপ্ন ছিল।

ইংরেজদের এই স্বপ্ন জিন্নাহ কীভাবে নিলেন এবং নেহেরু কীভাবে মানলেন, এটা আমার কাছে একেবারে অবিশ্বাস্য মনে হয়। ১৯০৫ সাল থেকে এই রাজনীতিটা অন্য রকমের হয়ে গেল। এর মাঝখানে আমাদের অত্যন্ত শ্রদ্ধেয় এক নেতার আবির্ভাব হয়েছিল চিত্তরঞ্জন দাশ, দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ। তিনি বেঙ্গল প্যাক্ট করেছিলেন, কিন্তু তাঁর মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে কংগ্রেস এটা অস্বীকার করল। বেঙ্গল প্যাক্ট মানি না। অথচ মতিলাল নেহেরুর বিরাট ভূমিকা ছিল এই বেঙ্গল প্যাক্টে।

আমরা কী করে বুঝি, বা কী করেই বা অস্বীকার করি নেতাজি সুভাষ বসু আমাদের দেশবন্ধুরই মানসপুত্র। এত বছর পর এখন ভারত সরকার সুভাষ বসুকে গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছে। যে প্রশ্নগুলো এসেছে―নেতাজি কি সাহসী দেশপ্রেমিক ? না সন্ত্রাসী ? লড়াই-টড়াই করেছে শুধু ? গান্ধীজি কি সঠিক কাজ করেছে ?

ইত্যাদি প্রশ্নগুলো ভারতে যেমন তোলপাড় করছে তেমনি বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবীরা চুপচাপ বসে নেই, তাঁদের মধ্যেও এই চিন্তা আলোড়ন তুলেছে।

আমারও মনে হয়েছে―এই চিত্তরঞ্জন দাশকে নিয়ে নজরুল ইসলাম এবং জীবনানন্দ দাশও লিখেছেন। বাঙালির নিজস্ব কবি বলতে আমি হয়তো এদের কথাই বলব রবীন্দ্রনাথকে বাদ দিয়ে, অথবা মাথায় রেখেই বলব নজরুল এবং জীবনানন্দ দাশ বাঙালির অনেক বেশি কাছাকাছি। তাঁর রূপসী বাংলা যেমন সত্যি তেমনি তাকে আরও বলতে হয়েছে, পৃথিবীর গভীর গভীরতর অসুখ এখন। জীবনানন্দ দাশকে তো বলতে হয়েছে, ‘আর কতদূর এগোলো মানুষ’, আল মাহমুদও বলেছে এ কথা।

আমার মনে হয়েছে, নজরুল ইসলাম এবং জীবনানন্দ দাশ―এই দুজনের ভেতর দিয়ে আমাদের সত্তাকে আবিষ্কার করতে হবে।

কোনও কোনও ক্ষেত্রে জীবনানন্দ দাশ রবীন্দ্রনাথকেও ছাড়িয়ে গেছেন। তিরিশের যুগের কবিরা মূলত ইংরেজি ভাষার কবিতা অনুবাদের মাধ্যমে সেই মানসিকতা পাঠকের সামনে তুলে ধরেছেন। জীবনানন্দ দাশের বড় বৈশিষ্ট্য প্রকৃতির কাছ থেকে শব্দ নিয়ে যেভাবে তিনি তার প্রয়োগ করেছেন―প্রাচীন ভারতের কবিতার সঙ্গে তার কোনও মিল নেই।

এজরা পাউন্ড (১৮৮৫-১৯৭২) সম্পর্কে জীবনানন্দ দাশ বলেছিলেন, এজরা পাউন্ড কত বড় কবি, এখনও পর্যন্ত আমরা কেউ কি ভালোভাবে তা অনুভব করতে পারছি ? আসলেই এজরা পাউন্ড কত বড় কবি ?

আমার নিজেরও সংশয় আছে। প্রথমত, তিনি ধনবাদী সমাজব্যবস্থা অসম্ভব ঘৃণা করতেন, একইসঙ্গে আবার কমিউনিস্টদেরও ঘৃণা করতেন। সেখানে বাকস্বাধীনতা নেই, চিন্তার স্বাধীনতা নেই ইত্যাদি। তিনি তাই মনে করতেন। হয়তো তিনি খুব স্বাভাবিকভাবে ভেবেছিলেন জাতীয়তাবাদী ভাবনার ভেতর দিয়ে এক ধরনের মধ্যে মুক্তি মিলবে। সেই জন্য মুসোলিনী বা হিটলারের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। কেন তা ভেবেছিলেন, আমি জানি না।

আমি আল মাহমুদের প্রসঙ্গেই বলতে চেয়েছি যে, তাঁর মধ্যেও প্রচণ্ড একটা বাঙালিয়ানা ছিল। তাঁর সোনালি কাবিন তো আকাশ থেকে পড়েনি। এমনি এমনি হয়নি।

তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ লোক লোকান্তর-এ কতদূর এগোল মানুষ ? এই যে মানব সভ্যতা নিয়ে প্রশ্ন করা, কম কথা নয়। এই জিজ্ঞাসাগুলো জীবনানন্দ দাশের মধ্যে প্রবলভাবে উপস্থিত ছিল।

অবশ্যই বাংলাদেশ বলতে আমি বেঙ্গলের কথা বোঝাচ্ছি। ১৯৪৭ সালের আগের যে বাংলাদেশ, সেই দেশের কথা বলছি। ‘রপসী বাংলা’ এর কবি জীবনানন্দ দাশ ইতিহাসের এই প্রেক্ষিতটিকে ধরতে পেরেছিলেন। পাঠেই তা টের পাওয়া যায়। তাঁর প্রথম কাব্য ঝরা পালক কাজী নজরুল ইসলামের প্রবল প্রভাবে আক্রান্ত ছিল। পরে অবশ্য নজরুল-ভাবনা থেকে বিশেষভাবে তাঁর মাত্রাবৃত্ত, স্বরবৃত্ত ছন্দ এবং মিলের ভাবনা থেকে মুক্ত হয়ে তিনি তাঁর কাব্যাদর্শকে বক্তব্য প্রধান কবিতার দিকে নিয়ে গেছেন খুব সফলভাবে। আর আল মাহমুদের ক্ষেত্রে কী হয়েছে ?

বাংলাদেশ স্বাধীন হলো, বিরাট এক সম্ভাবনা দেখা দিল। ক্ষমতার জন্যই সবকিছুতে এক বেপরোয়া ও উদ্ধতভাব এল। আল মাহমুদ নিজে জাসদের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলেন পত্রিকার সম্পাদক হওয়ার ফলেই কি না, জানি না। তার ফলে তাঁকে কিছুদিনের মধ্যেই জেলে যেতে হলো। জেলমুক্তির পর বঙ্গবন্ধু তাঁকে শিল্পকলা একাডেমিতে চাকরি দিলেন। তাঁর পড়াশোনা যা ছিল, তাতে তা সম্ভব ছিল না। এগুলো সবই সম্ভব হয়েছিল তাঁর কবি খ্যাতির জন্যই। এটি জানতেন তিনি।

পরবর্তী সময়ে তিনি জিয়াউর রহমান এবং এরশাদের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত হলেন। সবকিছু মিলিয়ে এরপর আস্তে আস্তে ধর্মের ভেতরে যেতে চেষ্টা করলেন, কতটুকু পেরেছেন, তা জানি না। আল মাহমুদের মধ্যে একই জিনিস ছিল ধনবাদী সমাজ পছন্দ করতেন না, কমিউনিস্টদের তো নয়। তবে এক সময় বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রে তিনি বিশ্বাসী ছিলেন।

কে কীভাবে নেবেন জানি না, আমার মূল্যায়নটা এভাবে। জীবনানন্দ দাশ এবং আল মাহমুদ তাঁরা দুজনই খুব বড় মাপের কবি।

আমার ভালো লাগে বলতে যে, আরও একজন কবিকে আমি বড় মাপের কবি মনে করি। তিনি নির্মেলেন্দু গুণ। আমি তাঁকে অনেক বড় কবি মনে করি, সাহসী কবি মনে করি। শব্দটি আমি খুব হিসেব করে, ভেবেচিন্তে বলেছি। কেন ? তা পাঠকও বুঝবেন।

এ জন্য যে, বিভিন্ন সময়ে জাতি যখন পিছিয়ে পড়েছে রাজনৈতিক নেতার মতো সামনে এসে দাঁড়িয়েছেন নির্মলেন্দু গুণ। এটি কম কথা নয়।

আমি এটুকু বলতে চেয়েছিলাম হয়তো আমার কথার মধ্যে কিছু রয়ে গেল।

পরিশেষে বলতেই হয়, সেই ১৯৪৭ সালের পরে ১৯৭৫, পঁচাত্তরের পর নব্বই তারপর আমরা যে এগোচ্ছি, কতটা এগোচ্ছি এটা আমারও একটা প্রশ্ন। যখন ধর্ম থেকে রাজনীতিকে এখনও আলাদা করা গেল না।

দিলারা হাফিজ  : কোনও জীবিত বাঙালি কবি কি নোবেল পুরস্কার পেতে পারেন ? নোবেল মানের বাঙালি কবি কাকে কাকে মনে হয়, কেন মনে হয় ?

আসাদ চৌধুরী : যাঁরা নোবেল পাওয়ার যোগ্য ছিলেন, তখন তো বাংলা ভাষার সেই সামাজিক, রাজনৈতিক মর্যাদা ছিল না।

অবশ্য ১৯১৩ সালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নোবেল প্রাপ্তি বাংলা ভাষার জন্য অনেকটা সম্মান ও সান্ত্বনার ছিল।

২০১১ সালে কলকাতা থেকে রাজধানী দিল্লিতে চলে গেল। এই পরিপ্রেক্ষিতে বলা যায়, সেই সময়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নোবেলপ্রাপ্তি স্বাভাবিকভাবেই বাংলাভাষা ও বাঙালির জন্য অনেকটা সান্ত্বনাই ছিল বটে।

কাজী নজরুল ইসলাম এবং জীবননান্দ দাশ অনেক বড় মাপের শক্তিশালী কবি ছিলেন। তাঁরা নোবেল পুরস্কার পাননি। তারপরে ?

এখন ? না।

আমার মনে হয় না।

তবে পশ্চিম বাংলায় ছিলেন অলোক রঞ্জন দাশগুপ্ত, কিছুদিন আগেই মারা গেলেন। জীবিতদের মধ্যে আছেন শঙ্ঘ ঘোষ। আমার আরও কয়েকজন প্রিয় কবি আছেন, কিন্তু প্রিয় হলেই তো হবে না। হ্যাঁ তবে, আমি শঙ্ঘ ঘোষের কথা বলতে পারি।

বাংলাদেশে মোহাম্মদ রফিক আছেন। অবশ্যই তাঁকে আমি বড় কবি মনে করি। তবে নোবেল প্রাইজ সম্পর্কে আমার তেমন ধারণাও নেই।

দিলারা হাফিজ  : এখন তো অনেকেই বলছেন ভালো কবিতার জন্য ছন্দ আর অপরিহার্য নয়। আপনিও কি তাই মনে করেন ?

আসাদ চৌধুরী : অপরিহার্য শব্দটি আমি ব্যবহার করব না। কোনও সভা-সমিতিতে মানুষ ভালো জামা-কাপড় পরে যায়। আবার যখন ঘুষাঘুষি করতে যায়, তখন ছোট প্যান্ট পরে। বিশেষভাবে কে কোন বিষয়ে কবিতা লিখছে তার ওপর নির্ভর করে ছন্দের গতি। গতিমানেই তাল বা ছন্দ। কবিতা যদি গতিময় হয়, তবে ছন্দ আসবেই।

দিলারা হাফিজ  : হাতের কলম ফেলে সরাসরি যেসব কবি অস্ত্র হাতে মহান মুক্তিযুদ্ধ অংশগ্রহণ করেছেন, তাঁদের কবিতা সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন কী ?

আসাদ চৌধুরী : সরাসরি অস্ত্র হাতে যোদ্ধা যে তিনজন কবিকে পাই, তাঁরা তিনজনই টাঙ্গাইলবাসী এবং টাঙ্গাইলের ১১ নম্বর সেক্টরের মুক্তিযোদ্ধা ও কবি। তাঁদের অন্যতম রফিক আজাদের কবিতায় মুক্তিযুদ্ধের অভিজ্ঞতার সরাসরি আলোকপাত না থাকলেও তাঁর কাব্যগ্রন্থের নামকরণ যেমন―সশস্ত্র সুন্দর কিংবা চুনিয়া আমার আর্কেডিয়ায় বরং নাম কবিতাটির মধ্যে যুদ্ধের বিরুদ্ধে শান্তির পক্ষের জয়গান পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে সবিশেষ। এটা সম্ভবত সরাসরি যুদ্ধক্ষেত্রের ভয়াবহ অভিজ্ঞতার ফসল। বুলবুলখান মাহবুবের একটি কাব্যগ্রন্থে সরাসরি যুদ্ধের কবিতা আছে। মাহবুব সাদিকের মধ্যেও সেভাবে মুক্তিযুদ্ধের চেতনালব্ধ কোনও উল্লেখযোগ্য কবিতার সন্ধান আমি পাইনি। তবে তাঁদের কাছে যা আশা করেছিলাম, আশানুরূপ তেমন কিছু পাইনি। অপরদিকে যুদ্ধক্ষেত্রে সরাসরি না গিয়েও শামসুর রাহমান মুক্তিযুদ্ধের ওপর চারটি কাব্যগ্রন্থ রচনা করেছেন। ‘ফিরিয়ে নাও ঘাতক কাঁটা, বন্দিশিবির থেকে’ আরও দুটোর নাম এই মুহূর্তে মনে করতে পারছি না।

দিলারা হাফিজ  : জীবনের এই প্রান্তে সন্তানদের সান্নিধ্য লাভের জন্য দেশ ছেড়ে আপনি টরন্টোতে বসবাসের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, এ বিষয়ে আপনার মনোভাব জানতে চাই।

আসাদ চৌধুরী : অন্য বাঙালির মতোই আমারও ভাবনা যে, শেষ বয়সে সন্তান ছাড়া কে করবে দেখভাল, তাই না ?

: জি। অবশ্যই।

Leave a Reply

Your email address will not be published.

shares