গল্প : তর্জনীর দিনকাল : জাহিদ হায়দার

পণ্ডিতগণ, বিশেষ করে ভাষা ও সামাজিক কথোপকথনের রহস্যসন্ধানী বিজ্ঞানীরা বলেন : একটি প্রবাদ একদিনে তৈরি হয় না, মানুষের অনেক দিনের অভিজ্ঞতায় অর্জিত, বাস্তবতার দ্বান্দ্বিক ভিত্তিতে তৈরি হয় প্রবাদ। এবং প্রতিটি প্রবাদ মাত্র কয়েকটি শব্দে তৈরি একটি ছোট বাক্যে মানুষের, সমাজের ও রাষ্ট্রের কর্মকাণ্ডের সত্যরূপ বলে।

চেয়ারম্যান আলাউদ্দিন মণ্ডল (বিএ.এল.এল.বি) পুকুরঘাটের প্রথম সিঁড়িতে বসে বুকে, হাতে, গলায় আর নাকের বড়ো দুই গর্তে, নিজ খেতের সরিষার, ঘানিতে ভাঙানো, তেল দিতে দিতে ভাবছিলেন, ‘সোজা আঙুলে ঘি ওঠে না।’

ওই প্রবাদে বাঁকা শব্দটি ব্যবহার করা হয়নি। সোজা ও বাঁকার দ্বন্দ্ব জগৎবিধানের সত্য। দুটো অবস্থারই আছে অস্তিত্বরক্ষার যুক্তি। একটি সোজা পথ পাবার জন্যই নাকি মানুষের সব যুদ্ধ, সংগ্রাম। ‘সোজার বিপরীত কি ?’ বললে সাধারণ বুদ্ধির একজন শিশুও বলবে, ‘বাঁকা’।

প্রবাদে বলা হয়নি, দুই হাতের দশটি আঙুলের কোন আঙুলটি ঘি তোলার জন্য ব্যবহার করতে হবে। হাতের দশটি আঙুলের মধ্যে মধ্যমাকে নিয়ে মানুষ কোনও কথা বলে না। বুড়ো আঙুল অনেক রকম ইঙ্গিত দেখায়। খাড়া করে উপরের দিকে তুললে অর্থ কখনও এক শ ভাগ সঠিক, কখনও অন্যকে করা অবজ্ঞা এবং মাটির দিকে করলে রোমান নৃপতিরা বোঝাতেন মৃত্যুদণ্ড। যদিও আদালতে মানুষের আইডেনটিটির সঠিক চিহ্ন হিসেবে এই বুড়ো আঙুলের ছাপ নেওয়া হয়। অনামিকা বিবাহ বা প্রেমের আংটি ধারণ করে। কোনও কোনও অঞ্চলে কেনি আঙুল সোজা করে, চারটি আঙুল তখন মুঠি, মুখ ভেংচি করে কাউকে দেখালে সে মনে করে : অশ্লীল ইঙ্গিত।

‘এবং তর্জনী’  মনে হতেই মণ্ডল চেয়ারম্যানের ঠোঁট বিড়বিড়-ভঙ্গিতে নড়ে : তর্জনীর ইংরেজি হচ্ছে দ্য ইনডেক্স ফিঙ্গার, কিন্তু ইনডেক্সের বাংলা অর্থ সূচক, দেশক ও নির্দেশক। তর্জনীকে হাতের অন্য আঙুলেরা ভয় পায়। রাশিচক্রের হিসাবে গ্রহ বৃহস্পতির মেজাজমর্জি ধারণ করে এই আঙুল। একটা কথা আছে, ‘তুঙ্গে বৃহস্পতি’। শিকারের সময় বন্দুকের ট্রিগারে, মানুষ বা পশুপাখি যার প্রতিই তাক করা হোক না কেন, চাপ দেয় তর্জনীর অগ্রভাগ।’

দুবার লাইসেন্স করা রিভলভারের ট্রিগারে, প্রায় ষাট বছরের জীবনে মণ্ডল-চেয়ারম্যানকে দু’বার চাপ দিতে হয়েছিল। পড়েছিল দুটি লাশ। একটি মধ্যরাতে নিজের বাড়ি থেকে কুড়ি মাইল দূরে পদ্মার চরে। অন্যটি পাশের ইউনিয়নের বাঁশবাগানে। নিজেকে বারবার যা বলেন, লাশ পড়বার পরও বলেছিলেন, ‘আমার ইতিহাস-জ্ঞান বলে, প্রতিদ্বন্দ্বীকে সুযোগ দিতে নেই।’  

দেখা গেছে, ডান হাতের তর্জনী তুলে, ন্যাটা হলে বাম হাতের, সামনের জনতার উদ্দেশে নেতা বক্তৃতা না দিলে একদিকে জনতা যেমন উদ্বুদ্ধ হয় না, উত্তেজিত হয় না, অন্যদিকে নেতাও হয়ত মনে করেন, তাঁর বক্তৃতার বিষয়ের গুরুত্ব জনতা বুঝতে পারবে না। বক্তৃতার বিশেষ বিশেষ বাক্য বা শব্দের সঙ্গে তর্জনীর ওঠানামার ছন্দ যে নেতা যথাসময়ে মেলাতে পারেন না, তার বক্তৃতা জনতা পছন্দ করে না।

মণ্ডল-চেয়ারম্যান কখনও কখনও মাদবরদের বলেন, ‘জনতা হচ্ছে একরকম চিড়িয়া। পুষে রাখার কায়দা লাগে। কখন খাঁচার মুখ খুলতি হয় আর কখন জনতারে খাঁচায় রাখতি হয় যে-নেতা এই কায়দা না জানে সে-নেতা হ্যবের পারে না।’ 

‘কার মুখ থেকে সোজা আঙুলে ঘি ওঠে না প্রবাদটি প্রথম বের হয়?’ চেয়ারম্যান নিজেকে প্রশ্ন করেন এবং উত্তর না পেয়ে হতাশ হন না। হতে পারে, প্রবাদটি প্রথমে কোনও গোয়ালার মুখ থেকে হঠাৎ বের হয়েছিল। ঘি তৈরি করবার পর, স্বাদ ও গন্ধ কেমন হলো, তা বোঝার জন্য গোয়ালা, গ্রামের বড়ো কর্তার বাড়িতে ঘি দেবার আগে, তর্জনী সোজা করে ঘি তুলতে গিয়ে দেখে, ঘি আঙুল বেয়ে পড়ে যাচ্ছে। তখন পাত্র থেকে ঘি তোলার সময় তর্জনী বাঁকা করেছিল। এবং হঠাৎ মুখ থেকে কথাটি বের হয়, ‘সোজা আঙুলে ঘি ওঠে না।’ একবার ঘি জ¦ালাবার কড়াইয়ের দিকে, একবার অদূরে গাভীর দিকে তাকায় গোয়ালা। হাসে। কথাটি মনে ধরে। হয়ত গোয়ালিনীকে বলে। এবং গোয়ালিনী, শ্রীকৃষ্ণের রাধা নয়, গ্রামের অন্য মহিলাদের বলে। অন্য মহিলারা তাদের স্বামীদের এবং স্বামীরা অন্যদের বলে। এবং একদিন কথাটি কানে যায় বড়ো কর্তার।

বড়ো কর্তা চোখ সরু করে ডাব গাছে বসা চিলটার দিকে তাকান, কর্তারা বাজ ও চিল বেশি দেখেন, বোঝেন কথাটি মূল্যবান। এই কথার মধ্যে অনেক ব্যবস্থার কঠিন হিসাব আছে। তিন দিন পর, গ্রামের সালিশে বড়ো কর্তা, অপরাধীকে ধমক দিয়ে বলেন, ‘সত্যি কথা ক’ বাছুর চুরি ক্যইরে বিক্রি করিছিস কি না, যদি না কইস, আমি জানি, ক্যেমনি কইরে কথা বাইর করা লাগে, সুজা আঙুলে ঘি ওঠে না।’ সালিশে উপস্থিত অন্যরা দেখেছিল বড়ো কর্তা তর্জনী বাঁকা ক’রে, চোরের চোখের সামনে তুলে বলছিলেন,  ‘সুজা আঙুলে ঘি ওঠে না।’  

২.

বাংলাদেশের কোনও এক জেলার কোনও এক ইউনিয়নের বিএ এবং এল.এল.বি পাস করা চেয়ারম্যান আলাউদ্দিন মণ্ডল উপরের কথাগুলো, বিষয়গুলো তাঁর তিন বিঘার পুকুরের ঘাটে বসে, দুপুরে, গোসলের আগে, দুই পা পানিতে তখন, ভাবছিলেন।

ঐ প্রবাদ বললেই কিছু বুদ্ধি থাকা মানুষ বোঝে, আঙুলটি তর্জনী। বোঝে, যে মানুষ প্রবাদটি বলে, তার কথা একজন বা বহুজন শুনছে না। নির্দেশ মানছে না। শক্তির থাবার ছায়ায় বা প্রখর রৌদ্রে সাধারণ মানুষের চলার কথা, চলছে না। চলছে গণতন্ত্র থেকে কী সব বড়ো বড়ো কথা শেখা, সেই মতো। এবং অর্জন করছে অন্যরকম শক্তি। তাকে বা তাদের দেখাতে হবে চামচ দিয়ে নয়, তর্জনী দিয়ে ঘি তোলার নিয়ম এবং কৌশল।

মণ্ডল-চেয়ারম্যানের পায়ে দু’তিনটি চেলা মাছ ঠোকর দিল। স্বচ্ছ পানিতে, হালকা ঢেউয়ে দুলে দুলে ভেসে ওঠে তাঁর বড়ো আকারের মুখের হাসি। ঘাটের চার নম্বর সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে নাভিতে, ঘাড়ে তিনবার পানি দেন। তিনবার কুলি করবার সময় পুকুরের চারদিকে মাঝারি আকারের কটা চোখ দুটি ঘোরান। কেন তিনবার ? তার মীন রাশি ও জন্মতারিখ গণনা করে কোন জ্যোতিষী নাকি বলেছে, ‘চেয়ারম্যানের শুভ সংখ্যা তিন। মাসের তিন, ছয়, নয়, বারো, পনেরো, আঠারো, একুশ, চব্বিশ, সাতাশ এবং তিরিশ তারিখগুলো তার জীবনের জন্য শুভ। তারিখগুলো তিন দিয়ে বিভাজ্য।’ 

পুকুরের পূর্বপাড়ে দশটি কলাগাছে কলাগুলো এখন পোক্ত। উত্তরের লিচুগাছে এবার ফলন ভালো হয়নি। পশ্চিমের আটটি নারকেল গাছ জোড়াতে হবে। উত্তর-পূর্ব কোণ, ঈশানে একটি বাঁকা খেজুর গাছের ডালে একটি বাজপাখি বসে দেখছে, অপেক্ষা করছে, কখন একটি মাছ পানির উপরিতলে আসে।

কোনও কোনও দিন পানির দিকে এক বিশেষ গতিতে বাজপাখির নেমে আসার দৃশ্য চেয়ারম্যানকে আনন্দ দেয়। মাছের দিকে নেমে আসবার সময় পাখিটা দুটি ডানা শরীরে জড়ায়, দু’টি পা রাখে লেজের নিচে, গলা করে লম্বা, চঞ্চু সোজা। নিঃশব্দে শিকারের দিকে ধেয়ে আসে এক তির। চেয়ারম্যানের মুখ থেকে বের হয়, ‘ছোঁ’।

ভাবতে ভাবতে, দেখতে দেখতে অঞ্জলি ভরে পানি নিয়ে তিনবার চেয়ারম্যান মুখ ধুয়ে নেন। এই কাজগুলো গোসল করবার সময় তার আব্বারও রুটিন ছিল। নাভি ও ঘাড়ে পানি দিলে শরীর ঠাণ্ডা হয়। আব্বার কাছে শোনা। 

আলাউদ্দিন মণ্ডলের কপালের ডান ও বাম পাশের ওপরে কিছু চুলে এবং জুলফিতে অল্প পাক ধরেছে। দুই মেয়ে ও দুই ছেলের বাপ। সাত মাস আগে বড়ো ছেলে সালাউদ্দিন মণ্ডল, ঢাকায় বিদ্যুৎ অফিস ডিপিডিসির চাকুরে, ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার, তার বিয়ের সময়, শালীর অনুরোধে চুলে, দাড়িতে চেয়ারম্যানকে কালো কলপ দিতে হয়েছিল। বয়স আর একটু বাড়লে নিয়মিত কলপ দেবেন। এখনও একটা বউ। ইউনিয়নে শত্রুরা গোপনে বলে বেড়ায়, ঢাকায় দুইজন মেয়েমানুষ পোষে। ‘পোষে’ কথাটি যখন তারা বলে, মনে রাখে না পশুপাখিকে মানুষ পোষে।

              গ্রামের কেউ কেউ দেখেছে, চেয়ারম্যান গোসলে নেমে প্রায় দশ মিনিট সাঁতার কাটার পর ঘাটে ফিরে এসে পরপর তিনটি, দুইকানে আঙুল ঢুকিয়ে, ডুব দেন। আজকে সাঁতার কেটে আসবার পর ডুব না দিয়ে পানিতে থাপ্পড় মেরে ঢেউ দিলেন। ঢেউয়ের মধ্যে ডান হাতের তর্জনী তিন-চারবার বাঁকা ও সোজা করে ডোবালেন এবং তার চোখে দেখা গেল হঠাৎ পাওয়া বুদ্ধির হাসি।  

৩.

বিকাল। চেয়ারম্যান আসরের নামাজ পড়ে কাচারি ঘরের বারান্দায় সেগুন কাঠের হাতলঅলা চেয়ারে, চেয়ারের মাথায় দুটো ময়ূরের মুখোমুখি বসে থাকা নকশি, বসে সামনে খয়েরি রঙের প্লাস্টিকের চেয়ারে বসা মাতবর জহির আলির সঙ্গে কথা বলছেন।

জমি, সার, সরকারি গম, হাটের ইজারা, সরকারের হাবভাব, বিরোধীদলের মিটিংমিছিল, এনজিও’র কাজকর্ম, নতুন ইউএনও, আমেরেকিার ইলেকশন, ট্রাম্প আর আমেরিকান ডলারের এপিঠ-ওপিঠ, কথা ও আলাপের বিষয়। মাতবর বলছে কম। শুনছে বেশি। চেয়ারম্যান নিজেরই কোনও কোনও মন্তব্যে নিজেই হাসছেন। ‘ট্রাম্পের বউটারে দেখছ, মিয়েলোকটা কিন্তু আমিরেকার না।’ হা হা হা।

              মাতবর জানে যেদিন চেয়ারম্যান অনেক বিষয়ে, একটা প্রসঙ্গের সঙ্গে আর একটার সম্পর্ক নেই, কথা বলেন, কথার আড়ালে থাকে অন্য পরিকল্পনা। কথা চলছিল। চেয়ারম্যানের বাড়ির কাজের লোক একটা স্বচ্ছ কাচের ছোটো গ্লাসের গলা পর্যন্ত ঘি এনে বলল, ‘চাচি তো দিবেরই চায় না।’

হাতের ইশারায়, ক্ষমতাশালীরা সবার সঙ্গে বেশি কথা বলেন না, ইশারা ও ইঙ্গিত ব্যবহার করেন, কাজের লোককে তিনি বোঝান, তুই চলে যা। ইশারার সময় তার বাম হাতের তিনটি আঙুলে লাল, সবুজ ও হলুদ পাথরের আঙটিতে পড়ন্ত বিকালের রৌদ্রচ্ছটা ঝিলিক দিল। জ্যোতিষী তার হাত দেখা ও রাশি গোনার এক সপ্তাহ পর তিনটি আঙটির জন্য নিয়েছিল তিরিশ হাজার টাকা। লাল পাথরের আঙটিতে শনি দূর, সবুজে ভাগ্য প্রসন্ন এবং হলুদে শত্রু কাবু হবে।  

গত পনেরো বছরের মধ্যে এই প্রথমবার চেয়ারম্যান হওয়া আলাউদ্দিন মণ্ডলের অনেক ইশারার অর্থ, অনেক কাজের ভালোমন্দ, কোন কথার মধ্যে শয়তান আর সাধুর বসবাস, সব মাতবর জহির আলি তার বুদ্ধির মাপকাঠি দিয়ে মাপতে পারে কিন্তু গ্লাসের ঘি-র দিকে তাকিয়ে তার অভিজ্ঞতা হোঁচট খায়। ‘ঘি দিয়ে কি ক্যরবেন’ প্রশ্ন করে।

‘সামনের কল তেন হাত ধুয়ে আসো।’

‘কী প্রশ্নের কী উত্তর।’ জহির আলি ভাবতে ভাবতে কলের দিকে যায়। চেয়ারম্যান বলেন, ‘মাদবর আবদুল্লার আসার কথা না ?’

‘ঐ যে আসতেছে।’ জহির আলি তর্জনী তুলে দেখায়।

‘ওরেও হাত ধুতে কইও।’

চেয়ারম্যান হুলুদ ঘি-র দিকে কটা চোখে তাকান। গ্লাসের কানায় দুটি মাছি বসে। ‘ঘি খাবের গেলি মাছি ঘির মদ্দি আইটকে পড়বিনি আর উড়বের পারবিনানে। মরার আগে পাখা ছটফট করবিনি। কিডা যে কী ভাবে মরে।’ চেয়ারম্যানের আনন্দ-হাসি কেউ দেখল না।

              ‘জহির, আবদুল্লাহ এই গামছা দিয়ে হাত মোছ।’ চেয়ারের হাতলের উপর থেকে লাল হলুদ চেকের গামছা তুলে তাদের দিকে এগিয়ে দিয়ে বললেন চেয়ারম্যান।

দুজন হাত মুছে ঘি-র গ্লাসের দিকে তাকায়। আবদুল্লাহ জিজ্ঞেস করে, ‘ঘি দিয়ে মুড়ি মাখাইয়া আইজ খাওয়াইবেন।’ কথার কোনও উত্তর না দিয়ে চেয়ারম্যান নিজের তর্জনী সোজা করে দেখিয়ে বলেন, ‘জহির ঘি-র মধ্যে তর্জনী দাও।’

কথা শুনে দুজন হাসে। জহির বলে, ‘ভাই আসল ব্যাপার কী ? কি কন ?’

‘যা ক্যলেম, করো।’ চেয়ারম্যানের কথা প্রায় আদেশের। আবদুল্লাহর চোখেমুখে চিন্তার রেখা পড়ে। কোনও একটা ফন্দি চেয়ারম্যানের মাথার মধ্যে ঘুরছে। এবার যে কে খুন হয়।

              জহির তর্জনী সোজা করে গ্লাসের মুখের ওপর রাখে। মাছিরা উড়ে যায়। বেঁচে যায়। জহির অপেক্ষা করে। ইতস্তত করে।

‘কি, দাও!’ চেয়ারম্যান বলবার সঙ্গে সঙ্গে আবদুল্লাহ বলে, ‘সত্যি দেওয়া লাগবি ?’

‘হ্যাঁ দেওয়া লাগবি, জহির দাও।’ চেয়ারম্যানের ‘জহির দাও’ কথাটি কণ্ঠের ভেতর থেকে ঘষে ঘষে বের হলো। অর্থাৎ হুকুম।

জহিরের তর্জনী সোজা হয়ে ঘি-র মধ্যে যায়। যেন আঙুলটির নিয়ন্ত্রণ তার হাতে নেই। জহির ঘিতে আঙুলের অর্ধেক ডোবায়। তোলে। এবং গ্লাসের মুখের ওপর তর্জনী সোজা করে ধরে রাখে। তিন-চার ফোঁটা ঘি গ্লাসের মধ্যে পড়ল। আবদুল্লাহ কিছু বলছে না। চেয়ারম্যান হাসলেন।

‘এবার আবদুল্লাহ তুমি তর্জনী দাও।’ চেয়ারম্যানের স্বর গম্ভীর। মাতবর আবদুল্লাহ তর্জনী বাঁকা করে ঘি তুলল। আঙুল গ্লাসের মুখের ওপর। ঘি এক ফোঁটাও পড়ল না।

‘কি বুঝলা ?’ প্রশ্ন চেয়াম্যানের। জহির হেসে বলে, ‘সোজা আঙুলে ঘি ওঠে না।’

‘এই সগির, এই সগির, শুনতেছিস, এদিক আয়’, চেয়ারম্যানের গলার রগ ডাক দেবার সময় ফুলে গেছে। বাড়ির গেইটের সামনে হালকাপাতলা গড়নের সগিরকে দেখা গেল। প্রায় দৌড়ে এল।

‘ঘি লিয়ে যা। মুড়ি দিয়ে মাখায়ে দিবের কবু। একটু চিনি দিবের কবু। তিনডে চামুচ আনিস।’ বলে চেয়ারম্যান হাসলেন। ‘দেখলা জহির আবদুল্লার বুদ্ধি বেশি।’ তাঁর কথা শুনে দুজন হাসল। আবদুল্লাহ’র মনে হলো, ‘শালার মতলব কী।’

৪.

মণ্ডল চেয়ারম্যানের কাছে কাছে কয়টি মোরগমুরগি ঘুরছে। দুইজন মাদবর জানে, এই সময় চেয়ারম্যান মোরগমুরগিকে কখনও মুড়ি, কখনও খুদ, কখনও গম ভাঙা নিজ হাতে খাওয়ায়। দানাগুলো যখন ছিটায়, মোরগমুরগি কে কার আগে দানা খাবে তার যুদ্ধং প্রতিযোগিতা চেয়ারম্যানের চোখমুখে একরকম তৃপ্তির ঝলক আনে। খুশিভাব আনে।

দু’টি বড়ো মোরগ তাঁর খুব প্রিয়। লাল ঝুঁটি দুলিয়ে, কালো আর লাল বড়ো লেজ দুলিয়ে যখন দৌড়ায় কোনও মুরগির পেছনে তখন চেয়ারম্যান ঠোঁট কামড়ে হাসে। কখনও কখনও মোরগ দুটি, দেখা গেছে, চেয়ারম্যানের হাত থেকে দানা খায়। মোরগ দুটির নামও আছে। ভোরবেলা মোরগের ডাক শুনে মণ্ডল চেয়ারম্যান বোঝে কে ডাকছে, কৃষ্ণ না মদন। যে-মোরগটার পাখা ও লেজের পালক ঘন শ্যাম, নীল আর লাল চেয়ারম্যান তার নাম দিয়েছেন কৃষ্ণ, অন্যটির পালকের রং বেশ লাল ও হলুদ, নাম মদন।

৫.

গ্রাম থেকে ইউনিয়নে, ইউনিয়ন থেকে থানায় এবং থানা থেকে শহরের সদরে মণ্ডল চেয়ারম্যানের  কাচারি ঘরের বারান্দায় তর্জনীতে ঘি তোলার ঘটনা অনেক রকম ভাষ্যে ছড়িয়ে পড়ে। এবং একসময় ডিসি ও এসপির কান পর্যন্ত যায়।

আঞ্চলিক কাগজে খবরের শিরোনাম, ‘বলুন, সোজা না বাঁকা আঙুলে ঘি ওঠে ?’ বিশেষ সংবাদদাতার লেখা খবর : ‘তখন বিকাল। চেয়ারম্যান আলাউদ্দিন মণ্ডলের পরনে ছিল দামি সিল্কের নীল পাঞ্জাবি আর নীল রঙের চিকন পাড়ের শাদা লুঙ্গি। সঙ্গে ছিল দুই মাদবর। তিনি দুই মাদবরকে গ্লাসে রাখা ঘি তর্জনী দিয়ে তুলতে বলেন। দুই মাদবর প্রথমে তুলতে রাজি হন না। ইতস্তত করেন। চেয়ারম্যানের হুকুমে তারা তর্জনী দিয়ে ঘি তুলতে বাধ্য হন। তবে একজন তোলেন আঙুল সোজা করে এবং অন্যজন বাঁকা করে। ঘি তোলার পর মণ্ডল চেয়ারম্যান খুব জোরে জোরে হাসেন। ঘি ছিল গাওয়া। এক কেজির দাম পনেরো শ টাকা। পরে গ্লাসের ঐ ঘি ও চিনি দিয়ে মুড়ি মাখানো হয়। তিনজন চামচ দিয়ে মুড়ি খান। চেয়ারম্যানের চামচটা ছিল বড়ো। কাঁসার। অন্য দুজনের চামচ ছিল স্টেনলেস স্টিলের। তর্জনী দিয়ে ঘি তোলার ব্যাপারটি জনমনে অনেক প্রশ্ন তুলেছে। পেছনে কী রহস্য আছে ?’ 

খবর বের হওয়ার পর শহরের ফুটপাতের চায়ের দোকানে, হোটেলের চায়ের টেবিলে মানুষেরা হাসে এবং যারা নিজেদের বুদ্ধিমান মনে করে, বলে, ‘মণ্ডল চেয়ারম্যান আসলে কোনও ফন্দি আঁটতেছে। আগে দুডে খুন করিছিলে, কয়মাস জেলও খাটিছিলে, শালা এক নেতার জোরে বাইর হয়ছে। এখন কেস মনে হয় ঢিসমিস। শালার অনেক ট্যাকা গ্যেছে।’

ঢাকা থেকে বড়ো ছেলে সালাউদ্দিনের ফোন। ‘আব্বা আপনে নাকি জহির আর আবদুল্লাহ চাচারে দিয়ে কাচারি ঘরে বসে তর্জনী দিয়ে ঘি তোলাইছেন। তারপর ঐ ঘি দিয়ে মুড়ি মাখায়ে খাইছেন ?’ চেয়ারম্যানের স্বর গম্ভীর, ‘হ্যাঁ, তোর অসুবিধা কি ?’ সালাউদ্দিন  বোঝে, এ-নিয়ে কথা বলা ঠিক হবে না। তার আব্বা খুব রাগি মানুষ।

  কলেজ থেকে ছোটো মেয়ে শাকিলা বাড়িতে এসে, টেবিলে বই রেখে, কাপড় না বদলেই সোজা তার আব্বার ঘরে যায়। ‘আব্বা আপনের ঘি তোলার কাজ লিয়ে, আমারে লিয়ে কলেজের বন্ধুরা এমনকি স্যারেরা কথা ক্যলে, হাইসলে, কী লজ্জার ব্যাপার।’

আদরের ছোটো মেয়েকে শান্ত গলায় তর্জনী দেখিয়ে বললেন, ‘আর একটু বড়ো হ্যলে ব্যুঝবে, এই আঙুল দিয়ে ঘি তোলার মধ্যি কি আছে। লোকের কথা গায় মাইখো না। লোকরা সব সুময় বেশি কথা কয়।’

শাকিলার মা নিচু স্বরে, ভয় মেশানো স্বরে বলল, ‘কাজটা ঠিক করেন নাই।’ 

চেয়ারম্যানের ধমক শুনে মহিলা তাঁর সামনে থেকে চলে যাবার সময় শুনল, ‘মিয়েলোকের বেশি বুঝা ঠিক না।’

এসপি চেয়ারম্যানের বাড়িতে এসে এ-কথা সে-কথার পর বলেছিলেন, ‘এদিক দিয়ে যাচ্ছিলাম, মনে হলো আপনার সাথে একটু দেখা করে যাই।’ চেয়ারম্যান জানেন, জেলার এসপি যাই বলুক, তার অন্য উদ্দেশ্য ছাড়া এখানে আসবার কথা নয়।

যাবার আগে এসপি হেসে, ‘আমারও কৌতূহল, আচ্ছা ঘি তোলার ব্যাপারটা কি ?’ মণ্ডল চেয়ারম্যান হাসতে হাসতে জানান, ‘গোসল করতে করতে প্রবাদটা মনে পড়ল। মাদবরদের নিয়ে একটু মজা করলাম। ঘরে বানানো দুধের ক্ষীর দিয়া পাটিসাপটা, খান।’ এসপি হেসে, পাটিসাপটায় কামড় দিলেন। যাবার সময় বললেন, ‘মিডিয়া কিন্তু আপনাকে নজরে রাখছে।’ ‘তোমরাও আমারে নজরে রাখছ, আমি কি শালার পুলিশরে চিনিনে। রাজনীতি করা আর আইন পড়া লোক আমি।’ মনে মনে নিজেকে বললেন চেয়ারম্যান।

৬.

স্থানীয় সরকারের মন্ত্রীর সঙ্গে ঢাকায় চেয়ারম্যানদের জরুরি মিটিং। সারাদেশ থেকে সব চেয়ারম্যানের গাড়ি ঢাকামুখী। মিটিঙের দু’দিন আগেই আলাউদ্দিন চেয়ারম্যান ঢাকায় উপস্থিত।

যখনই ঢাকায় বিভিন্ন কাজে আলাউদ্দিন চেয়ারম্যান আসেন, ওঠেন ছেলের ফ্ল্যাটে। সালাউদ্দিনের বিয়ের পর চেয়ারম্যান ফ্ল্যাটটি কিনেছেন। ফ্ল্যাট নিজের নামে। আগে উঠতেন নিজের ব্যবস্থা মতো জায়গায়। সামরিক শাসক আইয়ুব খানের বেসিক ডেমোক্রেসিকে (বিডি) ঠিক পথে চালাবার জন্য তার নিয়োজিত মেম্বাররা, তাদের বলা হতো বিডি মেম্বার, যখন ঢাকায় আসতেন তখন তাদের থাকবার ব্যবস্থা ছিল তৎকালীন শাহবাগ হোটেলের সামনে পাকা ঘরে, এখন যেখানে সারিবদ্ধ ওষুধের দোকান, সেখানে।

দু’দিন আগে আসবার কারণ, গত মাস থেকে হঠাৎ হঠাৎ চেয়ারম্যান মণ্ডলের বুকে একটা চিনচিন ব্যথা হচ্ছে। তার শহরের ডাক্তারের পরামর্শ : যখন ঢাকায় যাবেন একটা থরো চেকআপ করাবেন। ভয়ের কিছু নেই।

চেয়ারম্যানের বন্ধুর বড়ো মেয়ে বেসরকারি হাসপাতালের ডাক্তার। অধ্যাপক। থরো চেকআপ করে ভয় পাবার মতো কিছু পাননি। ‘চাচা রেড মিট অ্যাভোয়েড করবেন। মাখনঅলা দুধ খাবেন না। কুসুম ছাড়া ডিম খাবেন।’ এইসব পরামর্শের সঙ্গে আরও কিছু পরামর্শ দিয়ে, চাচিমা আর বাড়ির সবার খোঁজখবর নিলেন ডাক্তার। ‘গোস্তর মধ্যে গরুডাই খাই এখন আল্লাহ তা-ও উঠায়ে লিলে।’ আফসোস্ শুনে বন্ধুর মেয়ে হাসল। 

স্থানীয় সরকারমন্ত্রী বিশেষ বিশেষ কাজের নির্দেশনা দিয়ে বললেন, ‘কাজ যেন ঠিকমতো হয়, কোনও কথা উঠলে বরদাস্ত করা হবে না, এখন কোন গ্রামে কারে সাপে কাটল তার খবর পর্যন্ত টিভি-স্ক্রলে দেখায়। আজকাল সাপে কাটাও ন্যাশনাল নিউজ। আশা করি আমি কি বলতে চাইছি, আপনারা বুঝতে পারছেন। দুর্নীতিকে জিরো টলারেন্সে দেখা হচ্ছে, কথাটা মনে রাখবেন।’

মিটিঙের সময় সব চেয়ারম্যানের স্মার্টফোন বন্ধ ছিল। ‘আপনারা ভালো থাকবেন। লাঞ্চ করে যাবেন, আমার জরুরি মিটিং আছে, যেতে হবে, আপনাদের সাথে লাঞ্চ করতে পারব না।’ বলে মাননীয় মন্ত্রী মহোদয় চলে যাবার পর মণ্ডল চেয়ারম্যান ফোন অন করলেন। স্ক্রিনে একজন পুরুষের নাম। আসলে ওই নামের আড়ালে আছে একজন সুন্দরী নারী। টেক্সট : ‘কতদিন তোমাকে দেখি না।’

‘এবার সময় হবে না। খুব ব্যস্ত। দশ হাজার পাঠাব।’ লিখিত উত্তর গেল।

৭.

চেয়ারম্যান গাড়িতে উঠতে যাবেন, ফোন এল। ঘন নীল রঙের পাজোরো জিপের সামনের বাম দিকের দরজা খোলা। পাশে দাঁড়িয়ে, বাম কানে ফোন, কথা বলছেন। বাতাসে দুলছে শাদা পাঞ্জাবির ঝুল। দরোজার বি-পিলারের ওপরে হাত। দৃষ্টি কিছু দূরে দাঁড়ানো অন্য চেয়ারম্যানদের ওপর। স্বর নিচু। হঠাৎ দমকা বাতাস। পাল্লায় বাতাসের ধাক্কা। হাত থেকে মোবাইল ফোন পড়ে গেল। চেয়ারম্যান মণ্ডলের ‘আ আ’ আর্তনাদ শুনে অদূরে আলাপরত তিনজন চেয়ারম্যান তার কাছে দৌড়ে এলেন।

‘কি হইল ?’ মণ্ডল চেয়ারম্যানের ডান হাতের তর্জনী থেঁতলে গেছে। রক্ত পড়ছে। পাঞ্জাবিতে রক্ত। বাম হাত দিয়ে তর্জনী চেপে ধরে, নিচের ঠোঁট কামড়ে, ‘আ আ’ করছেন। যন্ত্রণায় চোখমুখ লাল হয়ে গেছে। কে একজন কোথাও থেকে এক বোতল ঠাণ্ডা পানি এনে তর্জনীতে দিতে বলল। মণ্ডল চেয়ারম্যান নিজেকে বললেন, ‘শালীকে বললাম আজ ব্যস্ত থাকব। আবার ফোন। তার আরও টাকা চাই। শপিঙে যাবে।’ একজন মোবাইলটা তুলে তার পকেটে দিলেন।  

পঙ্গু হাসপাতালের ডাক্তারের হাতে এক্সরেপ্লেট। দেখছেন : তর্জনীর ওপরের ও মাঝের প্রায় সব হাড়ে তিনটে বড়ো ফাটল। দুটো কড় আলাদা। অন্য আঙুলগুলো কম ইনজিওর্ড।

‘কী গাড়ির দরজা ?’ ডাক্তারের প্রশ্নে শুনলেন,‘পাজেরো।’

‘পাজেরোর দরজা তো হেভি।’

চেয়ারম্যানকে আরও বলা হলো, ‘মনে হচ্ছে ইনডেক্সটা অ্যামপিউটেশন করতে হবে।’ ‘অ্যামপিউটেশন মানে আমি জানি না ?’ ভদ্রকণ্ঠ চেয়ারম্যানের।

‘অপারেশন করে কাটা’ বললেন ডাক্তার।

হাসপাতালের কেবিনে শুয়ে আছেন চেয়ারম্যান আলাউদ্দিন মণ্ডল। গায়ে অল্প জ¦র। চোখে হতাশা। কড়া ডোজের ইনজেকশন দেওয়া হয়েছে। ডান হাতের তর্জনীতে মোটা ব্যান্ডেজ। যেন দুটো তর্জনী একসঙ্গে শাদা গজ দিয়ে বাঁধা হয়েছে। বাঁকা করবার উপায় নেই। বাম হাতের তর্জনী দিয়ে চেয়ারম্যান স্মার্টফোন অন করলেন। দুর্ঘটনার সময় যে নারীর সঙ্গে কথা বলছিলেন তার টেক্সট ডিলিট করা হলো।

 ছেলে সালাউদ্দিন মণ্ডল বিছানার পাশে চুপচাপ বসে আছে। তার বউ রুকসানা কমলা ছিলছে। ‘বউমা তুমি একটু বাইরে যাও।’ শ^শুরের কথা শুনে রুকসানা একবার তার স্বামী, একবার শ^শুরের দিকে তাকায়। সালাউদ্দিন মাথা নাড়ে। অর্থাৎ বাইরে যাও। থালার ওপর অর্ধ ছোলা কমলায় মাছি বসল।

‘শোন্ আমার এই আঙুল যে থেঁতলে গ্যেছে, মনে হয় কাইটে ফেলা লাগবিনি, এই কথা কেউ যেনি না জানবের পারে, আচ্ছা তোর বউরে ডাক, তাকও কচ্ছি।’ প্রায় ফিসফিস স্বরে বললেন চেয়ারম্যান।

৮.

শেষ পর্যন্ত তর্জনী কেটেই ফেলতে হলো। কাটবার আগে ডাক্তারকে চেয়ারম্যান মণ্ডল বলেছিলেন, ‘কোনওভাবেই কি আঙুলটা রাখা যায় না ?’ 

তর্জনীর গোড়ার সংযোগের সামান্য ওপর থেকে কাটবার সময় ডাক্তার ও তার সহযোগী, হতে পারে রোগীকে অন্যমনস্ক রাখতে, মাঝেমধ্যে এ-কথা সে-কথা বলছিলেন, ‘ব্যথা পেলে বলবেন। যদিও অ্যানেসথেশিয়া দেওয়া হয়েছে।’ চেয়ারম্যানের পাশে ছিল তার ছেলে। বলল, ‘আব্বা খুব শক্ত মানুষ। ব্যথা লাগলেও বলবেন না।’

‘জানেন তো চেয়ারম্যান সাহেব, অ্যাকসিডেন্টে কারও পা, হাত, কাঁধ, কোমর ভাঙে, কত যে ক্ষতি হয়, প্রতিদিন আমরা অপারেশন করছি। কত মানুষ যে পঙ্গু হচ্ছে। মরে যাচ্ছে। ব্যথা পাচ্ছেন না তো ? পেলে বলবেন। গতকাল টিভিতে মহাভারত দেখতেছিলাম। একলব্য নামের এক কিশোরের তর্জনী দ্রোণাচার্য নামের এক অস্ত্রপ্রশিক্ষক গুরু চালাকি করে কেটে নিল। ব্যাটা একটা শয়তান। তার প্রিয় শিষ্য অর্জুনের থেকে ঐ ছেলেটা, ঐ একলব্য অনেক ভালো তিরন্দাজ হয়েছিল। অন্য কারণ, একলব্যর জাতি নিচ।’ চেয়ারম্যান বাম হাত তুলে ডাক্তারকে থামালেন। ‘আমি এ-গল্প জানি। তাড়াতাড়ি কাজ করে আমাকে ছেড়ে দেন। আঙুলটা কাচের একটা বয়মে দিতে পারবেন ?’ দুই ডাক্তার পরস্পরের দিকে তাকান। একজন বলেন, ‘আচ্ছা। মেডিসিন দিয়ে দেব। বুঝেছি মানুষকে দেখাবেন।’ 

৯.

চেয়ারম্যানকে চারদিন হাসপাতালে থাকতে হলো। রিলিজের দিন ডাক্তার বললেন, ‘পাঁচ দিন পর আসবেন, আপনার তো ডায়াবেটিস নেই। আশা করি তখন শুকিয়ে যাবে। আবার ড্রেসিং করতে হবে।’

গাড়ির ভেতর বসে ছেলে, ছেলের বউ আর ড্রাইভারকে বেশ কড়া গলায় চেয়ারম্যান বললেন, ‘মন দিয়ে শোনো, আবার বলছি, কেউ যেনি না জানে আমার তর্জনী নাই। যদি এই খবর কেউ জানে তা হলি তুমারে তিনজনরেই আমি হিসেব লেব। হিসেব মানে তো বোঝো। কথাটা জেনি মনে থাকে।’  

সালাউদ্দিনের ফ্ল্যাটের গেইটের কাছাকাছি গাড়ি, চেয়ারম্যান বললেন, ‘কাচের বয়েমটা দেখি।’ সালাউদ্দিন তার আব্বার চোখের সামনে বয়েমটা তুলে ধরল। লালচে পানির মধ্যে  ফেটে যাওয়া হাড়ের তর্জনী বয়েমের তলায় শুয়ে আছে। গুরুতর আহত, মৃত, একটু ফোলা, ভাঙা হাড়ের টুকরো দৃশ্যমান, যেন রক্ত খাওয়া একটি জোঁক। মণ্ডল চেয়ারম্যান বাম হাতে বয়মটা নিয়ে দু’তিনবার ঘোরালেন। বিকালের পড়ন্ত রৌদ্রের আলোয় লালচে পানির ভেতর তর্জনীটা একটু নড়ে বয়েমের ভেতরে শুয়ে শুয়ে এদিক-ওদিক গড়াল। সালাউদ্দিন এই প্রথম তার আব্বার চোখে দেখল ভয়। 

ফ্ল্যাটে পৌঁছে, সোফায় বসে, চেয়ারম্যান বাড়িতে মেয়ে শাকিলাকে ফোন করলেন। ‘তোর মাক ডাক দে।’ বলে বয়মটা রুকসানার হাতে দিলেন। কোথাও যত্নে রাখতে হবে।

১০.

বাড়ির সবাই এবং মাদবর জহির ও আবদুল্লাহ জানল চেয়ারম্যান খুব জরুরি কাজে ঢাকায় আটকে গেছে। আবদুল্লাহ গ্রামের দোকানে চা খেতে খেতে বলল, ‘মনে হয় প্রধানমন্ত্রীর সাথে মিটিং হবি। যার জন্যি মণ্ডল ভাই ঢাকায় র‌্যয়ে গেল। সামনের বার ভাই এমপির নমিনেশন পাবের পারে।’

একজন মুরব্বি, একসময় প্রাইমারি স্কুলের প্রধান শিক্ষক ছিলেন, হাতে চা, সবার মুখের উপর, যা মনে হয়, নির্ভীকভাবে বলেন, ‘এত চুুরচামারির পরও তারে এমপির নমিনেশন দিবি ?’ দুই মাদবর চুপ। দোকানে বসা কারও কারও মাথা স্বাভাবিকভাবে উঁচু নিচু হয়ে শিক্ষকের কথায় সায় দেয়।

১১.

তর্জনীর ব্যান্ডেজ পাঁচ দিন পর খোলা হলো। গোড়ার দিকের চামড়া শুকিয়ে গেছে। সেলাই দেখা যাচ্ছে না। অল্প ব্যথা আছে। চিন্তার কিছু নেই। ডাক্তারের সামনেই চেয়ারম্যান বাম হাতের তর্জনী দিয়ে ডান হাতের কেটে ফেলা তর্জনীর কাটা চিহ্নে একটু আদর করলেন।

মণ্ডল চেয়ারম্যান খুব চিন্তিত। ক’দিন রাতে ঘুম হয়নি। ডাক্তারকে বলেছিলেন, ‘নকল তর্জনী লাগানো যাবে কি না।’

‘যাবে। তবে সিঙ্গাপুরে কিংবা ব্যাংককে গিয়ে যদি লাগানো যায়, তা হলে কেউ বুঝতেই পারবে না, তর্জনী আসল না নকল। ওখানকার অর্থোপেডিস্ট-রা সুন্দর তর্জনী বানিয়ে ধাপে ধাপে মিলিয়ে দেবে। কেউ বুঝতেই পারবে না যে ওটা নকল তর্জনী।’ ডাক্তারের পরামর্শ।

১২.

সকালে খাবার টেবিলে সালাউদ্দিনকে চেয়ারম্যান বললেন, ‘সিঙ্গাপুর যাব। একাই যাব।’ ছেলে আর রুকসানা বুঝল, কেন যেতে হবে।

‘আবদুল্লাহ, আবদুল্লাহ শুনতে পাচ্ছ ? শোনো একটা জরুরি কাজে মন্ত্রীর সাথে সিঙ্গাপুর যাওয়া লাগবি। আমি প্রথমে রাজি হইনি। ক্যলেম অনেক কাম আছে। গম যাবি, নাম লিস্ট করা লাগবি। মন্ত্রী সাহেব ক্যলেন মেম্বারদের লিস্টি করতে বলে দেন। বুঝলা। আমারে আর টাঙ্গাইলের মহেড়ার চেয়ারম্যানরে লিয়ে যাবি। জহিররে ক্যবে। নতুন ইউএনওরে কওয়ার দরকার নেই।’

রুকসানা আর সালাউদ্দিন পরস্পরের দিকে তাকায়। চেয়ারম্যান ফোন বন্ধ করে তাদের মুখ দেখে যতটুকু হাসবার হাসলেন। শব্দ নেই। ‘বউমা কমলার জুস দিও’ বলে তার ঘরের দিকে যেতে যেতে শ^শুর আরও বললেন, ‘আত্মীয়রা কেউ যেনি না জানে। তোর মাকে যা কওয়ার আমি কবোনে।’

১৩.

সিঙ্গাপুর থেকে ছয়দিন পর ঢাকায় ফিরলেন চেয়ারম্যান আলাউদ্দিন মণ্ডল। মেজাজ স্ফূর্তিতে দুলছে। কথায় কথায় ঠোঁটে, চোখে হাসির তোড়। রুকসানা, সালাউদ্দিন, তাদের বাড়ির কাজের মেয়ে পরি, দুই মাদবর আর বাড়ির সবার জন্য তিনি ভালো চকলেট এনেছেন।

তর্জনী দেখে বোঝার উপায় নেই ওটা আসল না নকল। চেয়ারম্যানের বাম হাতের তর্জনীর সমান, তার চামড়ার তামাটে রঙের মিল, সাদাটে নখ, কড়ের ভাঁজ, টিপসই দিলে যে-সব বৃত্ত হয় তার চিহ্ন ইত্যাদি ডান হাতের তর্জনীতে শোভা পাচ্ছে।

সালাউদ্দিন ও রুকসানা বলল, ‘আব্বা আঙুলটা বাঁকা বাঁকা লাগতেছে।’

দুজনই শুনল, ‘তর্জনী লাগাবার আগে সিঙ্গাপুরের ডাক্তার সোজা, অল্প বাঁকা, বেশি বাঁকা, কোনওটা হিটলারের, কোনওটা আমেরিকার প্রেসিডেন্ট রিগানের মতো, সবরকম তর্জনীর ছবি চেয়ারম্যানকে দেখায়, ডাক্তারকে বলা হয়, মাঝখানের কড় থেকে ওপরের দিকে যেন অল্প বাঁকা থাকে।’

ডাক্তার দু’বার চেয়ারম্যানের দিকে তাকিয়ে জানতে চেয়েছিলেন, চেয়ারম্যান যা বলছেন, নিশ্চিত হয়ে বলছেন কি না। তর্জনী লাগাবার সময় ডাক্তারের চোখ ছিল স্থির। মৃদু হেসেছিলেন।

 প্রেসক্রিপশনে দ্য ইনডেক্স ফিঙ্গারের সেবাযত্ন কীভাবে করতে হবে তার জন্য জরুরি কিছু পরামর্শ ছিল।

১. যেখানে ফলস্ তর্জনী লাগানো হয়েছে ঐ জয়েন্টে হালকাভাবে মলমটা এক মাস সকালে ও রাতে ব্যবহার করতে হবে।

২. তর্জনীর গোড়ায় আঘাত যেন জোরে না লাগে।

৩. ভারী কিছু তুলতে এই আঙুল ব্যবহার করা যাবে না।

৪. মিষ্টি জাতীয় কিছু খেলে ভালো করে ধুতে হবে। রাতে পিঁপড়ে কামড়াতে পারে। নকল চামড়ার ক্ষতি হতে পারে।

১৪.

ইউনিয়নে ফিরে মণ্ডল চেয়ারম্যান পাঞ্জাবির পকেটে দু’দিন ডান হাত রেখে ঘুরলেন। কেউ যখন তার দিকে আসতে থাকে, পকেটে হাত দ্রুত ঢোকান। দু’জন মাদবর ব্যাপারটা খেয়াল করল। কিছু বলল না। আগেও পকেটে হাত দিয়ে তিনি কথা বলেছেন। বাড়ির কাজের লোকজন ছাড়া, চেয়ারম্যানের বউ, মেয়ে ও ছেলে জেনে গেছে তর্জনী নকল। খুব নজর দিয়ে কেউ না-দেখলে বুঝতেই পারবে না, ওটা আসল নয়। বাড়ির কেউ যেন, কড়া নির্দেশ দেওয়া আছে, কখনও কাউকে না বলে, চেয়ারম্যানের ডান হাতের তর্জনী নকল।

গতকাল সকালে তর্জনী দিয়ে, গোপনে, ঘি তুলেছেন চেয়ারম্যান। শাকিলার মা দেখেছিল। ভয়ে ঘরে আসেনি। মুখ টিপে হেসেছিল। দ্রুত আড়ালে চলে যায়।

১৫.

বিকাল। মোরগমুরগি মণ্ডল চেয়ারম্যানের পাশে ঘুরছে। এক ডালায় খুদ। অন্য ডালায় ভাঙা গম। এক ডালায় মুড়ি। দানা ছিটাচ্ছেন বাম হাতে। ডান হাত দিয়ে ডালা থেকে মুড়ি তোলার সময় তর্জনীতে কোনও অনুভূতি হলো না। কী ভেবে ডালায় মুড়ি রেখে তর্জনীতে হালকা কামড় দিলেন দু’বার। দ্বিতীয়বার দেবার কারণ, ওপরের পাটির ডান দিকের সামনের একটি দাঁত সোনার পাতে বাঁধানো, তার মনে হলো, কামড়ের সময় সোনার দাঁতের কামড় পড়েছিল। ফলে অনুভূতি হয়নি।

মোরগমুরগি দানা খাচ্ছে। প্রায় শেষ। কৃষ্ণ নামের মোরগটা লাফ দিয়ে চেয়ারম্যানের ডান হাতের ওপর বসল। হাতে মুড়ি। ঠোকর দিল। পড়ল তর্জনীতে। পরপর দুবার ঠোকর দিল। ‘আহ্’ একটা আওয়াজ বের হলো চেয়ারম্যানের মুখ থেকে। কৃষ্ণ’র লালকালো চঞ্চুতে তর্জনী। বড়ো খাবার পেয়ে কৃষ্ণ অন্য মোরগমুরগির ভিড়ে গেল না। একটু দূরে উড়ে গেল।

মণ্ডল চেয়ারম্যান পা টিপে টিপে কৃষ্ণের কাছে গিয়ে, স্বর মধুর, কাতর, বাম হাতে একমুঠ মুড়ি, ডানহাত তুলে, ‘কৃষ্ণ আয়, আয় কৃষ্ণ’ ডাকতে থাকেন। তাকান এদিক-ওদিক। 

কৃষ্ণের সামনে, পেছনে হাতের সব মুড়ি ছিটালেন। বিকালের রৌদ্রে এক আঙুল ছাড়া হাতের ছায়া পড়ে মাটিতে। কৃষ্ণ’র আরও কাছে যান চেয়ারম্যান। বিনয়ী স্বর, ‘আয়, বাবা কৃষ্ণ আয়।’

অন্য সব মোরগমুরগির কড়কড়, চিঁচিঁ ডাকের মধ্যে, খাওয়ার উৎসবের মধ্যে কৃষ্ণ ডাক শুনছে না। মালিকের দিকে একবার তাকিয়েই এক উড়ালে গাছের ডালে উঠল। চঞ্চুতে তর্জনী। ‘হুস, হুস, হারামজাদা, একবার হাতে পাই, শুয়েরের বাচ্চা।’ দাঁতে দাঁত কামড়াবার শব্দ হলো। ডান হাত শূন্যে দুলছে। কৃষ্ণ মাঠের দিকে উড়ে গেল।

মাঠের শুকনো মাটির মধ্যে কৃষ্ণর পেছনে চেয়ারম্যান দৌড়াচ্ছেন। মোরগ থামল। চেয়ারম্যান কাছে যেতেই কৃষ্ণ মালিকের দিকে চোখ রেখে ঘুরে ঘুরে জায়গা বদলাচ্ছে। লাল ঝুঁটি আর বাঁকা লেজের রংধনু দুলতে থাকে। এক নৃত্যভঙ্গি। চেয়ারম্যান শরীর সামনের দিকে ঝুঁকিয়ে, দুই হাত কৃষ্ণের দিকে বাড়ানো, ঘুরছেন। তারও নৃত্যভঙ্গি। মানুষের বড়ো ছায়া, ছোট প্রাণীর ছায়া ঘুরছে। কৃষ্ণ অন্যদিকে দৌড় দিল। চঞ্চুতে তর্জনী।

 চেয়ারম্যান আলাউদ্দিন মণ্ডল (বিএ,এল.এল.বি) কৃষ্ণর পেছনে দৌড়াচ্ছেন। পড়ছে গরম শ^াস। হাঁপ বাড়ছে। চোখমুখ লাল। তৃষ্ণায় বুক কাঠফাটা। দৌড়াচ্ছেন। ডান হাতের তর্জনীর গোড়ায় রক্ত। 

‘হারামজাদা। নিমকহারাম। তোক একবার পাই।’ মাঠের বাতাসে কথাগুলো উড়ছে।

সচিত্রকরণ : শতাব্দী জাহিদ

Leave a Reply

Your email address will not be published.

shares