গল্প : চেনা গন্ধের অপেক্ষায় : আব্দুল বারী

ঘরের বাতিটা নিভিয়ে দেয় বকুল। অন্ধকারই এখন তার কাছে ভালো, স্বস্তির। প্রথম প্রথম শুতে যাওয়ার আগে বাতিটা ঘরের এক কোণে জ্বালিয়ে রাখত। এখন বড় ঘেন্না হয়। যে-কাজে বাতি জ্বালিয়ে রাখা সে-কাজ শেষ। সব দেখা হয়ে গেছে তার।

অন্ধকারে দরজা ঠেলে ঘরে ঢোকে একটা ছায়া। পায়ে পায়ে পৌঁছে যায় ঠিক জায়গায়। বকুলের পাশ ঘেঁষে বসে। তারপর আস্তে আস্তে শুয়ে পড়ে বকুলের পাশে। অন্ধকারে বকুল ঠিক বুঝতে পারে এখন তার মুখের ওপর যে মুখ সেটা রহমত মোল্লার। প্রথম প্রথম চমকে যেত বকুল। বাতির আলোয় এসব মুখ তাকে চমকে দিত।

 বকুলের চমকের শেষ ছিল না বছর আগের সেই রাতগুলোতে। মুখে জর্দার বাসনা ছুটিয়ে আসত হাফিজ মিয়া। বলতে গেলে গাঁয়ের নব মোড়লদের হেড মোড়ল। আবার পঞ্চায়েত মেম্বারও। আর আতরের ফোয়ারা ছুটিয়ে আসত নুহু এমন-যে নাম। কিন্তু কাম  ? এখন আর বাতি লাগে না বকুলের। আঁধারেই চিনতে পারে কোন মুখটা খবিশের, কোনটা কুকুরের, কোনটা ছুঁচো, ইঁদুর, ইবলিস। বড় ঘেন্না হয় এসব মুখ দেখতে। বাতি নিভিয়ে তাই তার খানিক আরাম বোধ হয়।

চার বছর পূর্বে বকুল বউ হয়ে আসে এই গ্রামে। আঠারো বছরের বকুল। ডাগর চোখে আকাশ ভরা স্বপ্ন। বাতাসে আঁচল উড়িয়ে কাজ করে ছোট সংসারের। শুধু স্বামী আর সে। তার সঙ্গে দুটি ছাগল মুরগি। অভাবের সংসার হলেও এর মাঝে সুখ আর সোহাগ গা থেকে পিছলে পড়ে বকুলের। যৌবনের জোয়ারে মাতাল বুক। দেহের ভাঁজে ভাঁজে ঝরে পড়ে কাম। পথে দিয়ে যেতে যেতে বুড়োরা বাঁকা চোখে তাকায় তার বাড়ির দিকে। বকুলকে দেখে একজন আর একজনকে বলে ছুঁড়ির দেহের বাঁধনখানা খাসা। খাসি ছাগলের চিকন যেন ওর গায়ে।

সেবার খুব খরা। টানা তিন মাস একফোঁটা বৃষ্টি নাই। আগুনের আঁচ নামে আকাশ থেকে। মাঠঘাট শুকিয়ে কাঠ। মানুষ, গরু-ছাগল, পশুপক্ষী একবুদ পানির তরে কাতর। চারদিকে হাহাকার। গাঁয়ের বড় দিঘিটার তলায় একটুখানি তলানি। আর সব পুকুর শুকিয়ে চৈত মাসের ধান কাটা জমি। কলের মুখেও পানি নাই। ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নেমে গেছে অনেক। অধিকাংশ কল বিকল। সারাদিন টিপে টিপে যতটুকু ঘাম ঝরে, পানি ঝরে না ততটুকু। শুধু গোটা তিনেক কল এখনও সচল। এখনও জীবন্ত। চাপ দিলে একটুখানি শীতল পানি ছরাৎ করে ঝরে পড়ে। সারা দিন লাইন পড়ে থাকে কলপাড়ে। পানি নিয়ে কাড়াকাড়ি আর ঝগড়াঝাটি। সূর্য ওঠা আর অস্ত যাওয়া।

সেদিন দুপুরে মাঠ থেকে ফিরে পানি খেতে চায় নাজমুল। কলসির তলানি বাটিতে ঢেলে দিয়ে বকুল বলে আজ পানি আনা হয়নি। একটু বস পানি আনছি। নাজমুলের মনটা আয়রনমিশ্রিত পানির মতো ঘোলা হয়ে ওঠে। তবু সে কিছু বলে না।

বউটাই তো তার সব। ছোটবেলায় মা-বাবাকে হারিয়ে পরের দুয়ারে মানুষ হয়েছে সে। আর বউও তাকে ভালোবাসে উজাড় করে। সেও মা হারা মেয়ে। সৎ মায়ের ভারী সংসার। তাই বিয়ের পর সেখানেও তার যাওয়া চলে না। স্বামীর সংসার নিয়েই পড়ে থাকে।

বকুলের বুকেও অনেক মায়া। সেভাবে একলা মানুষ কত কষ্টই না পেয়েছে। রাঁধা ভাত ঠিকমতন হয়তো পায়নি কোনও দিন। তাই মায়া ভরা চোখে আর আদরে সে আগলে রাখতে চায় নাজমুলকে। যত্ন আর ভালোবাসায় গড়ে ওঠে ছোট্ট সংসার।

 বকুলের বাতাস করতে করতে রেখে যাওয়া পাখাটা তুলে নেয় নাজমুল। শরীর মন শীতল করতে চায় সে।

কলতলায় এসে বকুল দেখে কয়েকজন ছেলেমেয়ে হাঁড়ি-কলসি নিয়ে লাইন দিয়ে বসে আছে। পানি নিচ্ছে। এখন সাধারণত এই ১০-১২ বছরের ছেলে মেয়েরাই পানি নিতে আসে কলপাড়ে। বাড়িতে বড় মেয়ে, বউ-ঝিরা সংসারের কাজ করে। বকুল একটি মেয়েকে বলেকয়ে আগে পানি নিতে যায়। ঠিক তক্ষুনি পানি খেতে আসে মোড়লদের মেজো ছেলে। আরও দুজন বখাটে ছেলে নিয়ে বাগানে তাস পিটিয়ে এসে পানি খেতে চায় সে। বকুল দাঁড়িয়ে থাকে এক পাশে। অকারণ পানি খেতে সময় লাগায় ছেলেটা। মাঝে মাঝে তাকায় বকুলের দিকে। কেমন গা-গুলানো তাকানো। কি বিচ্ছিরি চাউনি।

বকুল বলে তাড়াতাড়ি করুন, পানি লিব। বাড়িতে পানি খাবে।

আমরাও তো পানি খেতি চাই—বলে মোড়লের ছেলে।

তা খান—বলে বকুল।

আহা! এত লোকের ছেমুতে কী তুমার পানি খাওয়া যায়। এসুনা আজ সাঁঝবেলায় বাগানের ওপাশটায়।

ভদ্রভাবে কথা বুলুন—বলে বকুল।

ভদ্রতা তো শিকতি চাই। ইকটু শিকিয়ে দাও না।

কলটা ছাড়ুন। অনেক হয়িছে। বলে একটু কলের দিকে এগিয়ে যায় বকুল। আর তখনই খপ করে বকুলের একটা হাত ধরে মোড়লের মেজো ছেলে। কাঁখ থেকে কলসি পড়ে যায়। কাঁদতে কাঁদতে বাড়ি ফেরে বকুল।

গ্রীষ্মের উত্তাপ তখনও নাজমুলের সারা শরীরজুড়ে। স্ত্রীর এই অপমান সে সহ্য করতে পারে না। ছুটে যায় কলতলায়। দু-একটা কথার পর হঠাৎ ঘুষি চালিয়ে দেয় নাজমুল। নাক ফাটে মোড়লের ছেলের। তারাও কম যায় না, তিনজন মিলে নাজমুলকে বেদম পেটাতে থাকে।

সন্ধ্যাবেলায় মজলিস বসে। বকুলকে ডাকা হয় সেখানে। সব কথা বকুল ঠিকমতো গুছিয়ে বলতে পারে না। শুধু পানি খাওয়ার কথা বলে। মজলিস হাসে। কী করে বলবে বকুল, তার পানি খেতে চেয়েছে মোড়লের বাচ্চা। নাজমুল কথাটা বলতে চায় মোড়লদের। বলেও খানিকটা। সবটা বলার সুযোগ হয় না। মাঝখানে আটকে দেয় মোড়লরা।

হাফিজ মিয়া বলে ওঠে তোর বউ এর চরিত্তিরটা একবার দেখিস নাজমুল। ছুঁড়ির তাকানুটা বড় কেমুন। চোক আর পা কুন দিকে চলে ঠাওর হয় না।

বলে, নুহু দোফরে আমবাগানে ছাগল আনতি যেয়ি পাড়ার ছুঁড়াদের সাথে গুজুর গুজুর ফুসুর ফুসুর করে। তার খবর কিছু আখিস। নাকি সারা দিন মাঠে পইড়ি থাকিস।

মজলিসের ভেতর থেকে একজন বলে ওঠে এসব কী কথা হচ্ছি চাচা, বকুল ভাবি তো তেমুন মেয়িই লয়।

এই চুপ কর ছুঁড়া। তুর চোখে তো ভালো লাগবিই। আমরা বুঝি কিছু বুঝিনি।

ছেলেটি আরও কিছু বলতে চায়। কিন্তু ধমক দিয়ে চুপ করিয়ে দেয় মোড়লরা।

রিয়াজউদ্দিন সাহেব মোড়লদের একজন। একটু শিক্ষিত, মাধ্যমিক পাস। তিনি বলেন, দিনদুপুরে নাজমুল মোড়লের ছেলেকে মেরেছে, মোড়লের ছেলেও নাজমুলকে মেরেছে। এর বিচার হোক। মেয়েটির চরিত্র নিয়ে এত ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ কী প্রয়োজন ? তা ছাড়া, বকুলের হাত ধরে টেনেছে মোড়লের ছেলে। চরিত্র নিয়ে কথা উঠলে তারটা ওঠাই দরকার। বকুলের চরিত্র নিয়ে কথা তোলার কী প্রয়োজন আছে ?

আছে রিয়াজ সাহেব আছে। আপুনি তো থ্যাকেন গাঁয়ের এক পাঁজরে। তা ছাড়া, আপুনার দুকান তো গাঁ থেকি দূরে ওই বাজারে। গাঁয়ের খবর তো কিছু আখেন না। ওই মেয়ি গাঁয়ের সব ছেলিদের কচি কচি মাথা চিবিয়ে চিবিয়ে খাবে, সে তো হতি দিয়া যায় না।’

চুপ করে যান রিয়াজ সাহেব। তিনি জানেন, এদের সঙ্গে কথা বলে লাভ নেই। এরা দলে ভারী। গ্রাম্য রাজনীতির শাসকদল। তিনি সে-বার কিছু মানুষের উৎসাহে ভোটে দাঁড়িয়ে এদের কাছে হেরেছেন। তাই তিনি কথা বাড়ালেন না।

 রহমত মোল্লা ছাগলের মতো দাড়ি নাড়িয়ে বলে আমরা মুরুব্বি মানুষ, তাও আমাদের দিকে কেমুন বেআড়া তাকায়। ইটা ভালো কথা লয় নাজমুল। আমরা বুলি সামলায়। ছুঁড়াদের পরানে যে আগুন লাগাবেরে। মোড়লের ছেলির আর দোষ কী ?

সত্যিই দোষ খুঁজে পায় না কেউ মোড়লের ছেলের। মোটা টাকা জরিমানা হয় নাজমুলের। ছুতোরের বল নরম কাঠে। সে তো আছেই। আরও একটা ব্যাপার হলো হাফিজ মিয়া নাজমুলকে গত ভোটে তাদের দলের মিছিল-মিটিংয়ে যেতে বলেছিল। নাজমুল মিটিং-মিছিলে যেতে পারেনি। কাজ নিয়েই ব্যস্ত ছিল। সে শুধু হাফিজ মিয়ার দলের মিটিং মিছিলে যেতে পারেনি তা নয়, কোনও দলের মিটিং-মিছিলেই সে যায়নি। তা বললে তো হয় না। হাফিজ মিয়ার আদেশ অমান্য করা ? কাজ দেখানো ? তখন থেকেই ভেতর ভেতর জ্বলেছিল হাফিজ মিয়া।

যতটা গর্জায় ততটা নাকি বর্ষায় না। কথাটা নাজমুলের ক্ষেত্রে খাটেনি। মোড়লরা যত গর্জেছিল, বর্ষেছিল তার চেয়েও বেশি। তাই ছাগল-মুরগি বেঁচেও জরিমানার টাকা শোধ হয় না নাজমুলের। আর সেদিন ভরা মজলিসে বকুলের অপমান তো ছিলই।

বর্ষা না নামলে মাঠে কাজ লাগবে না। খরায় মাঠ জ্বলে আছে। তাই জরিমানার টাকা মেটাতে আয়ের উদ্দেশে বিহারে ফেরি করতে যায় নাজমুল। এ তল্লাটের অনেক লোকই এখন বিহারে ফেরি করে। এখান থেকে কার্টনে ভর্তি করে শোনপাপড়ি, খেলনা নিয়ে যায়। সেখানে সাইকেলে বাঁ পায়ে হেঁটে গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে শোনপাপড়ি ফেরি করে। বিহারি ছোট ছোট শিশুরা মেয়েদের মাথার চুল, লোহাভাঙা, প্লাস্টিক, বিভিন্ন ভাঙড়ি জিনিসের বিনিময়ে শোনপাপড়ি খায়। ফেরিওয়ালার সব থেকে বেশি লাভ চুল পেলে। একটু শোনপাপড়ির বদলে যে চুল পাওয়া যায় তা শোনপাপড়ির দামের চেয়ে চার থেকে পাঁচ গুণ বেশি। নাজমুল এই লাভের আশায় কার্টন সাজিয়ে বিহার যায়। কিন্তু আর ফিরে না। লোকমুখে বকুল শুনে একদিন ফেরি করতে বেরিয়ে আর সন্ধ্যায় বাসায় ফেরেনি নাজমুল। বিহারের প্রত্যন্ত গ্রামে কেন নাজমুল গায়েব হয়, কে তাকে গায়েব করে, তা কেউ জানে না।

এদিকে জরিমানার টাকার তাগাদা আসে বারবার। অসহায় বকুল অনুরোধ, অনুনয় করে ফেরাতে থাকে তাদের। সময় চেয়ে নেয়।

রাতে দরজায় কারা যেন কড়ানাড়ে। দরজা খুলতে বলে। বকুল কোনও সাড়া দেয় না। চুপ মেরে থাক। প্রথমে মৃদু কড়া নাড়া আর দরজা খোলার অনুরোধ। তারপর চাপা গলায় শাসানি। ভয়ে ঘরের কোণে সেঁধিয়ে যায় বকুল। নিশ্বাসও ফেলতে পারে না ঠিকমতো। মনে হয়, বুকে যেন শ্বাস আটকে যাবে। অসাড় বসে থাকে, মশা তাড়াতেও হাত নড়ে না। কিছুক্ষণ কড়ানাড়া, দরজায় ধাক্কাধাক্কি আর শাসানির পর সব চুপচাপ হয়ে যায়। রাত জাগা পাখি ডেকে ডেকে ওঠে। সারা রাত ঘুমোতে পারে না বকুল। ঘরের এক কোণে বসে কাটিয়ে দেয় রাত। প্রায় রাতেই এখন দরজায় কড়া নাড়ে। কোনও দিন ঢিল পরে চালে। শাসানির মাত্রা বাড়ে। কোনও কোনও দিন দরজার বাইরে অপেক্ষার সময় দীর্ঘ হয়। একটা কাঠের দরজার আড়াল মাত্র। ক্ষুধার্ত নেকড়ে নখ দিয়ে আঁচড়ায় সেই আড়াল। প্রতিটি আঁচড়ে বুকের রক্ত হিম হয় বকুলের।

প্রথম দিকে দু-এক দিন দিনের বেলা পাশের বাড়ির মানুষের রাতের কড়ানাড়ার কথা বলে বকুল। বৃদ্ধা সোনাচাচি বলে খুব করি দরজা এঁটি শুয়ি থাকবি। হাজার ডাক দিলিও দরজা খুলবিনি। কিন্তু অন্যরা মুখ টিপে হাসে। ভাবি সম্পর্কের মেয়েরা মুখ টিপে হাসির সঙ্গে এ ওর গায়ে ঠেলা দিয়ে ফিসফিস করে কথা বলে। তাদের চোখ মুখ আর শরীরী ভঙ্গি ভালো লাগে না বকুলের। কেমন যেন রহস্যময়। দুষ্টু দুষ্টু ভাব। তারপর থেকে কাউকে কিছু বলতেও পারে না বকুল।

কিন্তু বকুল কিছু না বললে কী হবে পাড়ার লোকের তো আর মুখ বন্ধ নেই। তারা বদনাম রটায়। রাতে বকুলের বাড়িতে পুরুষ মানুষ ঢোকে, বের হয়। এ কথা একে অপরকে হেঁকে হেঁকে বলে আর হাসাহাসি করে।

মানুষ এমন দুর্বোধ্য জীব বকুল আগে জানত না। কিছুদিন আগে যারা বকুলের কত কাছের ছিল, মিষ্টি সুরে কথা বলত, আজ তারাই কেমন যেন দূরের, কেমন সব অচেনা, মুখরা।

একদিন দুপুরে লতিকা আসে। লতিকাকে দেখে বকুলের মনে কু ডাকে। সে জানে তাকে নিয়ে গাঁয়ে ঘরে নানা রটনা আছে। সে নাকি হাফিজ মিয়ার …

অনেকক্ষণ ধরে নানা ছাঁদে কথা তোলে লতিকা। কখনও নাজমুলের গুণ গায়, কখনও বকুলের। নাজমুলের নিরুদ্দেশ হওয়ায় খুব যেন সে কষ্ট পেয়েছে। বড় বড় শ্বাস ফেলে হা হুতাশ করে। একসময় দুটো ছাগল পালার কথা বলে। তাতে করে বকুলের সংসারের নাকি একটু সুরাহা হবে। বকুল বলে সে ছাগল পাবে কোথায়  ? ছাগল কেনার পয়সা কই  ? লতিকা একটু মিটিমিটি হেসে বলে সে ভার তার। বকুল রাজি থাকলে সে ঠিক ছাগল জোগাড় করে এনে দিতে পারে। বকুল না করে দেয়। জানায় এভাবে সে ছাগল পালতে পারবে না। তা ছাড়া, ঘাস-পাতা আনবে কে। চারদিকে যা শিয়ালের উৎপাত।

সে দিন চলে যায় লতিকা। পরদিন দুপুরে দুটো ছাগল নিয়ে বকুলের বাড়ি  ঢোকে। উঠোনের এক পাশে বেঁধে দেয়। তারপর হেঁকে হেঁকে বলতে থাকে এই লে বকুল, তুকে হাফিজ ভাই দুটো ছাগল পাঠিয়িছে। তুই বুলছিলি ছাগল পালবি, লে পাল। হাফিজ ভাই শুনিয় তো …

বকুল দেখে আশপাশের বাড়ির মানুষ উঁকি ঝুঁকি মারছে। উৎসুক চোখে তাকিয়ে আছে তার উঠোনে। মজা নিচ্ছে।

বকুল বলে তুমাকে কী ছাগল আনতি বুলিছি লতিকা। ক্যানে আনলি।

সব কথা কী মুখে বুলতি হয়। প্যাটে খিদি আর মুখে লজ্জা করতি নাই। হাফিজ ভাই তো …

এবার ঝাঁঝিয়ে উঠে বকুল। বারবার হাফিজ ভাই, হাফিজ ভাই করছু ক্যানে, কে তোমার হাফিজ ভাইয়ের কাছে ছাগল চেয়িছে। লিয়ি যাও ছাগল। সরাও আমার উঠুন থেকি।

লতিকা কিছু না বলে দুমদুম করে পা ফেলে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায়।

পাশের বাড়ি থেকে কথা উড়ে আসে—রাতভর লটরপটর আর দিনির বেলা সতীপনা। আমার যেন কিছু বুঝিনি। ভাত খায়নি। হাফিজ মেম্বর কী ছাগল মাগনা পাঠায়লু ?

পাশ থেকে একজন টিপ্পনী কাটে—কি যে বুলিস বুবু, মাগনা হবে ক্যানে, গায়ে গতরে উসুল করিলিবে। তাতে তো দুজুনারই লাভ। ভাতার ছাড়া মাগির হাউজের আগুনে ইকটু পানি পড়বি।

আর দাঁড়াতে পারে না বকুল। ছুটে ঘরে পালিয়ে যায়। সে বুঝতে পারে না কী কারণে তার ওপর এদের এত আক্রোশ। কিসের শত্রুতা তার সঙ্গে। কত আপন ভাবত সে এদের। আর তারাই আজ …।

ঘরে ঢুকে হিকে হিকে কাঁদতে থাকে বকুল‌। বাইরের উঠোনে বাঁধা অবলা দুটো জীব নতুন বাড়িতে এসে মানুষ দেখতে না পেয়ে ব্যা ব্যা করে চিৎকার করে। তাদের ব্যাব্যানির শব্দে পাশের বাড়ির সব কথা ঢাকা পড়ে যায়। আর কোন কথা কানে আসে না বকুলের।

রাত নামে। নাজমুল নিরুদ্দেশ হওয়ার পর থেকেই তো বকুলের জীবনে রাত হয়েই আছে। তবু আজকের রাত নতুন মাত্রা আনে তার জীবনে। সব এলোমেলো করে দেয়। মাঝ রাতে দরজায় কড়া। মৃদু ডাক। তারপর দরজায় ধাক্কাধাক্কি। ধাক্কাধাক্কিতে দরজা খুলে যায়। দুয়ারের পাশে বেঁধে রাখা ছাগল দুটো ব্যাবাতে থাকে। কে জানে কি বুঝে এই অবেলা জীব কাঁদে, আহাজারি করে।

তাতে হাফিজ মিয়ার লাভই হয়। গররাজি বকুলকে কব্জা করতে সুবিধা হয়। বকুলের গোঙানি অবলা জীবের কান্নার সঙ্গে মিশে যায়। ঘরের বাতাসও চোখের পানি আর জর্দার গন্ধে ভারী হয়ে আসে।

 তারপর থেকে আর ঘরে দরজা আঁটেনা বকুল। ঠেলে রাখে। ঘরে গন্ধ আসে। জর্দার, আতরের। আসে না শুধু ভালোবাসার গন্ধ; একটা চেনা মানুষের গন্ধ।

সচিত্রকরণ : শতাব্দী জাহিদ

Leave a Reply

Your email address will not be published.

shares