সাহিত্য-আড্ডা : মুখোমুখি কবি মুহম্মদ নূরুল হুদা ও কথাশিল্পী সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম : দোহার : আহমাদ মোস্তফা কামাল

প্রচ্ছদ রচনা : কবি ও কথাশিল্পীর কথপোকথন

সম্পাদকের কথা : শব্দঘর-এর নবম বর্ষশুরু উপলক্ষে আজকের সাহিত্য-আড্ডায় আপনাদের স্বাগত জানাচ্ছি। আমরা চেয়েছি, শব্দঘরের নবম জন্মদিনে অর্থাৎ নবমবর্ষের প্রথম সংখ্যায় আড্ডার আয়োজন করতে। আপনারা রাজি হয়েছেন। সে জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ। এ আসরে কথাসাহিত্যিক আহমাদ মোস্তফা কামাল দোহারের ভূমিকা পালন করবেন।

আহমাদ মোস্তফা কামাল : হুদা ভাইয়ের জন্ম ১৯৪৯ সালে। তাই না ?

মুহম্মদ নূরুল  হুদা : হ্যাঁ, এটা স্বীকৃত।

আহমাদ মোস্তফা কামাল : মনজুর ভাইয়ের জন্ম ১৯৫১ সালে।

সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম : সার্টিফিকেট-স্বীকৃত।

আহমাদ মোস্তফা কামাল : কাছাকাছি সময়ে ধরে নিচ্ছি। আর আপনারা দুজনেই লিখতে শুরু করেছেন সত্তরের দশকে।

মুহম্মদ নূরুল হুদা : না, আমি ষাটের দশকে শুরু করেছিলাম। একেবারে শুরুর দিকে না। মূলত ১৯৬৮ সাল থেকে শুরু, বলা যায়। আমি ১৯৬৫ সালে ঢাকা শহরে আসি।

সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম : আমি আর হুদা ভাই একই বিশ্ববিদ্যালয়ে পাশাপাশি ছিলাম। বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকাকালীন কয়েকটি কবিতা লিখেছিলাম। হেলাল হাফিজ আর মাহমুদ মিলে একটা পত্রিকা বের করত। ওই সময় ২১ ফেব্রুয়ারি ঘিরে একটা ঢেউ উঠত। তো, প্রথমে কবিতা লিখেছি।

মুহম্মদ নূরুল  হুদা : ১৯৭০ সালের কথা। আমার একটি পত্রিকা, যেটির নাম ছিল ‘অধর এক’। ৩২ পৃষ্ঠার সেই পত্রিকায় ২৯ জন কবির কবিতা ছিল। শুরুতে সেলিম সারওয়ারের কবিতা ছিল। মাঝখানে আবু নাসের, হুমায়ূন আহমেদ, সৈয়দ মনজুরুল ইসলামদের কবিতা ছিল। চমকপ্রদ একটি কাহিনি আছে। বলা দরকার আছে। আমি তো ঢাকায় এসেছি ১৯৬৫ সালে। সেই তখন থেকেই আমার ছোটাছুটি শুরু। আমার একটি প্রবণতা ছিল―কিছু লিখলেই আমি তা লুকিয়ে রাখতাম। আমি মনে করতাম, এটা অমূল্য সম্পদ। পৃথিবীতে কেউ দেখেনি। দেখাতাম না কাউকে। ১৯৬৫ সালে ঢাকা কলেজে ভর্তি হওয়ার পর একজন শিক্ষক সবাইকে জিজ্ঞেস করলেন―কে কী হতে চাই জীবনে ? অনেকে অনেক কথা বলল এবং শেষে ছিলাম আমি। সবার চেয়ে ভালো রেজাল্ট ছিল আমার। আমার ক্ষেত্রে এসে বললেন, ওকে পরে জিজ্ঞেস করব। আমি তো চট্টগ্রাম থেকে আসা মানুষ। আরও দূরের চট্টগ্রাম। কক্সবাজার। আমি বললাম, আই এম হেয়ার টু বি ফয়েট।

তারপর একপর্যায়ে গাঢ় চশমা পরা একজন কাছে এসে বলল, আপনি কি কবি হতে চান, নাকি হয়ে গেছেন ?

আমি বললাম, আপনার নাম কী ? এত আস্তে কথা বলেন কেন ?

তারপর তিনি বললেন, আমার নাম আলতাফ হোসেন।

জিজ্ঞেস করলেন, আপনার কবিতা কোথাও কি প্রকাশ হয়েছে ? কোথাও প্রকাশ করেনি ?

তারপর তিনি আমাকে একটি কণ্ঠস্বর-এর কপি দিলেন।

তিনি আমাকে বললেন, আপনি কি এই কবিদের চেনেন ? এই সময়ের শ্রেষ্ঠ কবি কে, সবচে ভালো কবি কে ? নাম জানেন ? নাম জানালাম আমি।

বললাম, সব পড়েছি আমি।

তিনি পুনরায় জিজ্ঞেস করলেন, ‘জীবনানন্দ দাশ পড়েছেন ?’

বললাম, ‘পড়েছি’

তারপর তিনি বললেন, শামসুর রাহমানের কবিতা পড়েছেন ?

বললাম, শামসুর রাহমান নয়; শামসুর রহমান। আপনি ভুল বলছেন। আমার চাচার নাম শামসুর রহমান।

তিনি বললেন, ‘আচ্ছা। একজন কবিও আছেন এই নামে’

বুঝতে পারছেন আমার বিদ্যা কতটুকু ? (হাসি)

এরপর আমি বুঝলাম যে, যা লিখব, তা প্রকাশ করতে হবে। ওই দিন সারারাত জেগে ৩০টি কবিতা লিখলাম। তার পরদিন সকালেই দৈনিক সংবাদের অফিসে চলে গেলাম।

সেখানে ছিলেন শহীদুল্লাহ্ কায়সার। তিনি বললেন, এই তো, আমরা এই কবিতাই তো চাই। ওই দিনই দৌড়ে দৌড়ে আহসান হাবীবের কাছে গেলাম। তিনি দেখলেন, পড়লেন।

বললাম, দেখলেন, ছাপবেন না ?

তিনি বললেন, এক সপ্তাহ পরে।

আহসান হাবীব বললেন, অক্ষরবৃত্ত নামে কোনো কথা শুনেছ ? মাত্রাবৃত্ত ?

বললাম, না, শুনিনি।

তারপর আহসান হাবীব বললেন, দেখুন আপনার লেখা পড়ে যা বুঝলাম, কবিতার কিছু উপাদান আছে…

আমি কথা থামিয়ে বললাম, সবই আছে তো। ছন্দের মিল আছে।

তারপর তিনি হেসে বললেন, ‘বাংলা ছন্দের রূপরেখা’ নামে একটা বই আছে। আপনি বইটি কিনে ফেলেন।

আমি সেখান থেকে বের হয়েই সরাসরি বাংলাবাজার চলে যাই। গিয়েই মাহবুবুল আলমের ‘বাংলা ছন্দের রূপরেখা’ বইটি কিনে ফেলি। ওই বই পড়তে পড়তে মনে হলো―আমি তো আছি বটে কোনো এক অন্ধকার জগতে। এই তো আমার শুরুর গল্প।

সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম: আমার শুরুটা ১৯৭৩ সালে। বিচিত্রা পত্রিকা দিয়ে। আমার এক বন্ধু ছিল রেজা ঈ করিম। সে হলে থাকত। সে ছিল বিখ্যাত প্রদায়ক। সে একদিন আমাকে এসে বলল, তুমি তো গল্প-কবিতা লেখ। তুমি সেগুলো দাও আমাকে। তোমাকে আমি চা খাওয়াব, সিঙারা খাওয়াব, সকালে নাশতা খাওয়াব। (হাসি)

কারণ তার অফিসে নিজের দামটা দেখানোর প্রয়োজন ছিল। পরে সে আমেরিকা চলে যায়।

তো, এর মধ্যেই এক বন্ধুর বাবা অসুস্থ হয়ে যায়। আজিমপুরে থাকতেন। গিয়ে দেখি, সবাই আশা ছেড়ে দিয়েছে। বন্ধুর বাবা যেহেতু, আমারও খুব খারাপ লেগেছিল। উনাকে দেখতে গেলাম। গিয়ে দেখি, দেয়ালে একটি ঘড়ি টাঙানো ছিল। ঘড়িটি সরানো হচ্ছে। টিকটিক শব্দ হচ্ছে বলে সেটাকে সরানো হলো। সরানোর পর সেখানে গোল একটি দাগ রয়ে যায়। সেই দাগটা অনেকটা চাঁদের মতো দেখাচ্ছিল। যেন তাকিয়ে আছে। খুব অবাক লাগল।

কিছুদিন পর বন্ধুর বাবা মারা যান। খুব কষ্ট লাগল। তারপর বিশাল এক গল্প লিখলাম। ওই ঘটনাকে কেন্দ্র করেই। ওই চাঁদের মতো দেখতে পাওয়া গোল দাগ, বন্ধুর বাবা ভাবছেন যেন ওই দাগটা একটি গর্ত, অস্পষ্ট হয়ে যাচ্ছে ক্রমশ―এই ধরনের নানান চিন্তা দিয়ে ঠাঁসা সেই গল্প।

সেই গল্প বিচিত্রায় ছাপা হলো। বিচিত্রার শাহাদাত চৌধুরী খুব খুশি হলেন। একবার তাঁর সঙ্গে দেখা হতেই তিনি বললেন, ‘আপনি আরও লেখা আমাদের দেবেন না কেন ?’

তিনি নাশতার অফারও দিলেন। তখন আমার মাস্টার্স শুরু। তো, এইভাবেই আরকি আমার গল্পের শুরু। অনার্সের রেজাল্টের পর সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী স্যার ডেকে বললেন, থাকো। পরে ওই সময় অক্টোবর মাসে আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে জয়েন করলাম। তারপর পিএইচডির জন্য বাইরে গেলাম। পরে নানান ব্যস্ততায় আমার গল্প লেখাই বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। একসময় আমি ভুলেই গিয়েছিলাম যে আমার গল্প লেখার একটা বিষয় ছিল।

সব সময় আমার ওই বন্ধুর প্রণোদনা ও অনুরোধ ‘যুক্ত করে’ আমি গল্পকে একটা নির্বাসনে পাঠিয়ে দিয়েছিলাম। অনেক পরে সেটা ‘আবিষ্কার’ নামে একটা প্রকাশনা থেকে প্রকাশিত হয়। পরে পিয়াস মজিদ বাংলা একাডেমির সংগ্রহ থেকে খুঁজে বের করে আমাকে দিয়েছিলেন। সে জন্য আমি তাঁর কাছে কৃতজ্ঞ।

মুহম্মদ নূরুল  হুদা : এই তো শুরু হলো, আর শেষ হয়ে গেল…

মোহিত কামাল : নাহ, শেষ কেন হবে… (হাসি)

মুহম্মদ নূরুল  হুদা : তখন তো কণ্ঠস্বর ও স্বাক্ষর―এই দুইটা মিলে একটা গ্রুপ ছিল। আরও অনেক গ্রুপ ছিল, যারা বিভিন্ন ধরনের কবিতা পাঠের আসর আয়োজন করত। তৎকালীন ইসলামিক ফাউন্ডেশনে তফাজ্জল নামে একজন ছিলেন। তাঁর ছন্দ ছিল নিখুঁত। ওখানে তাঁর একটা আড্ডা ছিল।

রফিকুল হক দাদু ভাইয়ের সঙ্গে একটা গল্প আছে। সেটাও খুব চমকপ্রদ। ইতোমধ্যেই অক্ষরবৃত্ত ছন্দে লেখা শুরু করেছিলাম। জীবনানন্দ দাশকে একেবারে গিলে খেয়ে তাঁর মতো করেই লেখা শুরু করলাম।

মুজিবুর রহমান খান নামে এক সম্পাদক ছিলেন। ঢাকার বাসাবোতে তাঁর বাসায় প্রতি সপ্তাহে আড্ডা হতো। আমি একদিন সেখানে গেলাম, কবিতা পাঠ করলাম।

পরে তিনি সব সময় বলতেন, তোমার কবিতা শুনে আমরা সেদিন খুব মুগ্ধ হয়েছিলাম। তখন থেকেই মূলত আমাকে নিয়ে তাঁর মধ্যে ভালো ধারণা তৈরি হয়।

খেয়াল করলাম, তখন থেকেই কিন্তু কবিদের মধ্যে দলবাজি আছে। তিন থেকে চারটি দল আমি শনাক্ত করলাম। একটি দল ছিল আবু নাসেরের। আমি তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মুহসীন হলে একটি সিঙ্গেল রুম পেয়ে গেছি। একদিন দেখি, আবু নাসের এসে উপস্থিত। দেখতে শুনতে খুব স্মার্ট ছিলেন তিনি।

তিনি বললেন, আপনি কি নূরুল  হুদা নাকি ?

আমি বললাম, হ্যাঁ, আমি নূরুল  হুদা।

তিনি বললেন, আপনার কবিতা পড়েছি আমি। একটা ছোটো পত্রিকায়।

এভাবেই আড্ডা দিতে দিতে প্রায় রাত ৯টা-১০টা হয়ে গেল।

সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম : আমাদের আরেকটা জায়গা ছিল শরীফ মিয়ার ক্যান্টিন। মধুর ক্যান্টিনেও অনেক রাজনৈতিক নেতাদের সমাগম ছিল। যেতাম না তা না, তখন কিন্তু রাজনীতিতেই ছিলাম আমরা। আর শরীফ মিয়ার ক্যান্টিন ছিল পাবলিক লাইব্রেরির পেছনে, সুরক্ষিত জায়গায়।

মুহম্মদ নূরুল  হুদা : আফসার মিয়া, শরীফ মিয়া আর ওই দিকে হলো আমাদের রাজনীতির মধুর ক্যান্টিন।

সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম : আফসার মিয়াতেও অনেকে যেত। কিন্তু সাহিত্যের মানুষজন কম যেত। ব্র্যান্ডেড ছিল শরীফ মিয়ার আট আনার বিরিয়ানি। আট আনা দিয়ে একটা ফ্যান্টাস্টিক বিরিয়ানি পাওয়া যেত। মোস্টলি লাভ হতো যে সেখানে দেখতাম মহাদেব সাহা, আবুল হাসান, কায়েস আহমেদ আসছেন, মাহমুদুল হকও মাঝে মাঝে উঁকি মারতেন, আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদও যেতেন, মান্নান সৈয়দও যেতেন। মানে খুব কম মানুষই ছিলেন যাঁরা লিখতেন কিন্তু সেখানে যেতেন না।

মুহম্মদ নূরুল  হুদা : রফিক আজাদ কম যেতেন, তিনি বাইরে ছিলেন। তারপর যখন এলেন, তখন আবার দখল করে নিলেন।

সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম : ওইটা আমাদের জন্য একটা গুরুত্বপূর্ণ জায়গা ছিল। একটা ইন্সপিরেশন কাজ করত। আর কবিতা নিয়ে একটা দলাদলি ছিল, আবার ভালো কবিতা কেন জানি সবাই অ্যাপ্রেশিয়েট করত। একটা প্রতিযোগিতা ছিল। আমরা বলতাম, কাব্যিক ঈর্ষা। ইতিবাচক ঈর্ষা।

আহমাদ মোস্তফা কামাল : একটা পত্রিকা ছিল যেখানে বত্রিশটা পৃষ্ঠা। সেখানে নাম শুনলাম, হুমায়ূন আহমেদ, সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম। যাঁরা কথাসাহিত্যিক হিসেবে আমাদের দেশে পরিচিত। হুমায়ূন আহমেদকে তো জিজ্ঞেস করার সুযোগ নেই। আপনাকে জিজ্ঞেস করছি কবিতা যেহেতু লিখতেন… ?

সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম : যেহেতু সাহিত্যের ছাত্র ছিলাম, সেহেতু সাহিত্য সমালোচনা করতাম। আমাদের প্রথম বর্ষেই পড়ানো হয়েছিল ওয়ার্ডস্ওয়ার্থের প্রকৃতি নিয়ে বলতে।

আমি তখন বলেছিলাম ওয়ার্ডস্ওয়ার্থের প্রকৃতি তো হারিয়ে যাচ্ছে। রোমান্টিক সময়টা ছিল মাত্র কিছুদিন। অষ্টাদশ শতাব্দী আর ঊনবিংশ শতাব্দীর মাঝখানে চাপে পড়ে স্যান্ডউইচ ছিলেন উনি। এই যে আমি যে বলছি, এটা আমার সুচিন্তিত চিন্তাভাবনা থেকেই। সেজন্য আমার নিজের কবিতা কয়েকবার পড়ে আমার মনে হলো যে কবিতা থাকুক, হেলাল হাফিজদের জন্য থাকুক। আমার জন্য কবিতা না। আর একেবারে ভেতর থেকেই কখনও অনুপ্রেরণা পাইনি। হুদা ভাই একদিন আদেশ করলেন যে, মনজুর, একটা লিখ। অথবা একবার হেলাল হাফিজ বললেন যে তুমি শুধু আমার কবিতা কবিতা করো, তুমিও তো লিখতে পারো। তো লিখলাম তাঁকে সান্ত্বনা দেওয়ার জন্য।

একটা ছোট কাগজের সম্পাদক ছিলেন শান্তনু কায়সার। আব্দুর রাজ্জাক নামে একজন অসাধারণ সুন্দর গল্প লিখত। শান্তনু কায়সার একদিন আমাকে বলল যে, লেখ। তখন আমি গল্প লিখব বা সে আমার থেকে গল্প চাইবে সেটা একদম চিন্তার বাইরে ছিল। যদিও আমি ইতোমধ্যে একটা লেখা দিয়ে দিয়েছি। শান্তনু কায়সার বলল, যে একটা কবিতা তুমি লেখ। সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী ছিলেন পরিক্রমার সম্পাদক। তিনি করিডোরে আমাকে থামিয়ে বললেন, তুমি লেখ। আবার মান্নান ভাইও বললেন যে আপনি তো লিখছেন, তা হলে আমাদের কণ্ঠস্বরের জন্য লিখবেন না কেন! তো সেখানে কণ্ঠস্বরে আমার কবিতা ছাপা হলো, পরিক্রমাতেও হলো, কিন্তু আমি কখনও নিজেকে কবি হিসেবে দাবি করার ইচ্ছা করিনি। তখনই বাদ দিয়ে দিলাম। আস্তে করে কবিতাগুলো উধাও হয়ে গেল। পরিক্রমা-র কবিতা আছে, কণ্ঠস্বরেরটাও আছে, বাদ বাকি হারিয়ে গেছে।

মুহম্মদ নূরুল  হুদা : আমারটাও আছে, আমার পত্রিকারটাও। দুই একটা কবিতা দেখাব। আমি বললাম আপনার কবিতা দেখে পছন্দ হয়েছে পরিক্রমা-র। আপনি তো কবিতা লিখছেন, দেবেন না কেন ? আমার এটা বের করার আরেকটা কারণ আছে।

তখন তো ছিল দশকওয়ারি। আমাকে অনেকে এখনও সত্তরের দশক বলেন। আমি বলি আমি সত্তরের দশকের নই। আমি ষাটের দশকের দ্বিতীয়ার্ধে! আমি ৬৫ সালে ঢাকা ঢুকেছি এবং প্রথম দুই-তিন মাস থেকে আমি লিখতে শুরু করেছি। ৬৬ সাল থেকে আমার কবিতা প্রকাশিত হতে শুরু করেছে। আবুল হাসান একটু আগে থেকে প্রকাশিত হয়েছে। মহাদেব সাহা একটু পরে প্রকাশিত হয়। কারণ তিনি রাজশাহীতে থাকতেন। তাই এদিকে তাঁর লেখা প্রকাশিত হয়নি। তখন আমরা চেয়েছিলাম, আমাদের সময়ের হুমায়ূন কবির ছিল। হুমায়ূন কবির নিবেদিত কবিতাগুচ্ছ নামে একটা সংকলন বের করতেন, আমারটার সমান। আবু কায়সার ছিল। তখন সবাই বলল যে তুমি আমাদের নেতা হয়ে যাও, একটা পত্রিকা বের করো। আমি শিক্ষকতা করি, কিছু টাকা পকেটে আছে। তো একটা পত্রিকা তো বের করা যাবেই। আমি ওই পত্রিকাটা করলাম। তাতে এর আগের কোনও কবিতা নেই কিন্তু রফিক আজাদ, মান্নান সৈয়দ, এরা কেউ নেই। সেলিম সারোয়ার খুব ভালো কবিতা লিখতেন। তাঁর কবিতা ছিল কাভারের ওপরে।

সৌদি আরবে পড়াতে গিয়ে অনেক দিন কবিতা লেখা থেকে বিরত থেকেছেন, তবে ওখানে একটা কাজ করেছেন―সনেটের অনুবাদ। আমার তো মনে হয়, বাংলা ভাষার শ্রেষ্ঠ অনুবাদ।

মোহিত কামাল : এখানে আমি আপনাদের একটি প্রশ্ন ধরিয়ে দিই। আপনি যে বললেন দশকওয়ারি; কিন্তু আমরা যখন কালের গর্ভে হারিয়ে যাই তখন শতকের বিষয় আছে, দশক বিষয়টা থাকে না। এটা একটা দিক। আরেকটা দিক, আপনারা কি আপনাদের সময়ে বা এখন যে সিনিয়রিটি, সেটা কি দশকের হিসাবে করতেন, বয়স বিচারে বা কীসের ভিত্তিতে ?

সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম : আমি কখনও দশকে পড়িনি। যেহেতু আমি গল্প লিখেছি ৭২/৭৩… সালে, কিন্তু আমি নিজেকে কখনও সত্তরের দশকের লেখক ভাবিনি। আমি যখন গল্প ছাপাতে শুরু করেছি আশির দশকের একদম শেষে, সে-সময়ও আমি ভাবিনি যে আমি আশি বা নব্বইয়ের। আমি কখনও নিজেকে দশকের বিচারে ভাবিনি। এ হলো আমার অবস্থান।

মুহম্মদ নূরুল  হুদা : আবির্ভাবের মুহূর্তটা বুঝতে সুবিধা হওয়ার জন্যই দশক এসেছে। তারপরও দশক নিয়ে কোনও কিছু করা হয়নি।

সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম : আমি মনে করি দশকের প্রয়োজনীয়তা তখনই আসে যখন বিশেষ কোনও দশক বিশেষ কোনও কারণে গুরুত্বপূর্ণ। ষাটের দশকের বিষয়টা আমাদের দেশের জন্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ, সমস্ত পৃথিবীতে গুরুত্বপূর্ণ। ষাটের দশকটা একটা বৈশ্বিক মাত্রায় আমাদের নিয়ে গিয়েছিল।

মুহম্মদ নূরুল  হুদা : মান্নান সৈয়দের একটা প্রবন্ধ পত্রিকা ছিল। একদিন আমাকে হঠাৎ বললেন লেখা দিতে। আমি তো প্রবন্ধ লেখি না। আমি বললাম যে আমি তো প্রবন্ধ ওইভাবে লিখিনি, পরীক্ষায় পাস করার জন্য লিখেছি। পরীক্ষায় পাস করার মতো একটা প্রবন্ধ লিখতে পারি। প্রথম বাক্য লেখার পর মনে হলো আমি লিখতে পারব।

আহমাদ মোস্তফা কামাল : গদ্যের ব্যাপারটা কীভাবে এল ? আপনি প্রবন্ধ লিখেছেন তো বটেই কিন্তু উপন্যাসও লিখেছেন। সেটা কোন সময়ে ?

মুহম্মদ নূরুল  হুদা : উপন্যাস আমি শুরু করেছি একেবারে জীবনের শুরুতে, ঢাকাতে আসার আগে। আমার জীবনটাকে বর্ণনা করার। যে স্কুলে আমি পড়তাম সেখান থেকে আমাকে বিশাল একটা বিল পার হয়ে বাড়িতে যেতে হতো। বিল পার হওয়ার সময় ডোবা, শামুক অনেক কিছুর বর্ণনার কথা থাকত। কীভাবে গেলাম এসব। আরেকটা বিষয় বলতে চাই না আমি। আমাদের দক্ষিণ চট্টগ্রামে পুরুষে পুরুষে একটা প্রবল সম্পর্ক আছে। আমি সেটা জানার পরই কিছু লিখলাম। আমি জানি, সেটা প্রকাশ করা যাবে না। আমি যখন ‘জন্মজাতি’ লিখছি, সেখানে এই বিষয়গুলো প্রবলভাবে আছে। হাবশি সৈন্যরা স্থানীয় তরুণদের ট্রাকে তুলে নিয়ে তার প্রয়োজন মিটিয়ে ছেড়ে দিত। এর ফলে স্কুলের একজন দপ্তরি একেবারে পঙ্গু হয়ে যায়। পঙ্গুত্বকে নিয়ে সে দপ্তরির কাজ করতে শুরু করে। ওই ক্যারেকটারটা আমি ফুটিয়ে তুলতে চেয়েছিলাম। কেন আমি উপন্যাসটা লিখলাম ? আমাকে আহমাদ ছফা সত্যেন সেনের কাছে নিয়ে গিয়েছিলেন। তিনি বললেন, তোমার সব কথা তো অনেক শুনেছি। তুমি দক্ষিণ চট্টগ্রামের লোক। তুমি নিশ্চয়ই লবণ চাষ সম্পর্কে জানো। আমার আত্মীয়স্বজন তো সব লবণচাষি। ওদের নিয়ে কিছু লিখতে পারবে ? তার বহু পরে ৯০-এর দশকে একজন প্রকাশক আমাকে বলেন যে আপনি একটা উপন্যাস লেখেন। আপনি নিশ্চয়ই লবণ চাষ সম্পর্কে জানেন। আমার আত্মীয়স্বজন তো সব লবণচাষি। ওদের নিয়ে কিছু লিখতে পারবেন ? তখন আমি ওই জীবনের কাহিনি লিখি।

আহমাদ মোস্তফা কামাল : আমার একটা প্রশ্ন আছে। কবিতা ও গদ্যে একটি জিনিস কমন দেখা যায়। কবিরা গদ্য লেখেন, গল্প-উপন্যাস-প্রবন্ধ―প্রভৃতি সব লেখেন। কিন্তু যাঁরা গদ্যকার, অর্থাৎ, ঔপন্যাসিক বলুন কিংবা কথাসাহিত্যিক, তাঁরা সাধারণত কবিতা লেখেন না। এর কারণ কী ?

সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম : যখন আমি গল্প বা উপন্যাস লিখি, অনেক দীর্ঘ সময় নিয়ে পাঠকরা সেটা পড়বেন বলে আমি মনে করি। আমার বয়ানও দীর্ঘ হয়। বয়ানের ভেতর অনেক স্তর থাকবে। অনেক ব্যাপার থাকবে। মূলত এই বিস্তৃতিটি কবিতার সঙ্গে যায় না। মহাকাব্যে হয়তো যায়। যখন সনেট চলে এল, তখন কবিতাকে শৃঙ্খলার মধ্যে এনে ফেলা হলো। এটা একটা চ্যালেঞ্জ যে, চৌদ্দ লাইনের মধ্যে আমার সবকিছু লিখতে হবে। এইটা হলো এক ধরনের চর্চা, সংক্ষিপ্তভাবে সবকিছু প্রকাশ করার চর্চা। একটা দায়। সেক্ষেত্রে অনেক বড় বিস্তার থেকে এটি কবিকে রক্ষা করে।

আহমাদ মোস্তফা কামাল : গল্প লিখতে লিখতে কি মানসকাঠামোর কোনও পরিবর্তন ঘটে ? এমন কিছু কি হয় যে, তিনি আর কবিতায় ফিরতে পারেন না ?

সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম : না, এটা ঠিক নয়। তবে আমার মনে হয়, যখন আপনি একটি স্রোতের মধ্যে চলতে থাকবেন, সেভাবেই আপনার মানসিকতা তৈরি হবে। সেক্ষেত্রে অন্য একটি স্রোতে ভাসা কঠিন।

আহমাদ মোস্তফা কামাল : তবে কবিরা পারেন কীভাবে ?

সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম : কবিরা পারেন, কারণ তাঁরা অনেক বিস্তৃত বিষয়কে সংক্ষেপে ধরেন। যেমন―মহাকাব্যে সব আখ্যান। আখ্যানগুলোকে সংক্ষিপ্ত করে বিভিন্ন মাত্রায় সংঘবদ্ধ করে প্রকাশ করা হয়। সেক্ষেত্রে কবি বিস্তারটা ভালোভাবে জানেন বলেই সেটাকে সংক্ষিপ্ত করতে পারেন। তার জন্য যেমন একটা ছোটো জায়গা থেকে বাগানে যাওয়াটা আনন্দের। কিন্তু একজন গল্পকার যখন বাইরে বিচরণ করছেন, তাঁর কাছে কবিতা লেখাটা বদ্ধঘর মনে হবে।

আহমাদ মোস্তফা কামাল : বাংলা ভাষার প্রধান কবিদের মধ্যে কিছু কমন বৈশিষ্ট্য দেখা যায়। রবীন্দ্রনাথ কিংবা জীবনানন্দ দাশের মতো খ্যাতিমান কবিদের অনেক গল্প-উপন্যাস রয়েছে। কালের খেয়ায় কবি আল মাহমুদ চমৎকার গদ্য লিখতেন। কিন্তু বিপরীত চিত্র, অর্থাৎ গদ্যকার, গল্পকার কিংবা ঔপন্যাসিকদের কবিতা লিখতে দেখা যায় না। যেমন―সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, বিভূতিভূষণ বন্দোপাধ্যায় কিংবা হাসান আজিজুল হকের কবিতা আমরা দেখতে পাই না।

মুহম্মদ নূরুল  হুদা : গদ্যকার, গল্পকার কিংবা ঔপন্যাসিকদের কবিতা না লিখার বিষয়টি অন্যভাবেও আলোচনা করা যায়। প্রথমত, হাসান আজিজুল হকের আত্মজা ও একটি করবী গাছ গল্পটি পাঠ করে মুগ্ধ হয়েছিলাম। এর শুরুর কয়েক পৃষ্ঠা দীর্ঘদিন আমার মুখস্থ ছিল। তাঁর এ গল্প পাঠ করে আমার মনে হয়েছিল, এটি কবিতা বৈ আর কিছু নয়।

দ্বিতীয়ত, আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের প্রথম দিকের গল্পগুলো পড়ে আমার মনে হয়েছে এতে অসংখ্য কবিতা ছড়িয়ে আছে। মনে হয়েছিল ছোট ছোট অংশে বিভক্ত করলে প্রত্যেকটি অংশই যেন একটি কবিতা হবে। সুব্রত বড়ুয়ার লেখায় আমার মনে হয়েছে―গল্প আছে বটে, তবে কবিতা যতখানি আছে ততটা হয়ত নয়। এক্ষেত্রে কবিতা-কিন্তু কোনও না কোনও জায়গায় ছড়িয়ে আছে।

শরৎচন্দ্রের আঁধারের রূপ পড়লে ওই অংশটিকে কবিতা বলতে আমি দ্বিধাবোধ করি না, যদিও ওই অংশটি গদ্যে রচিত ছিল। তেমনিভাবে বঙ্কিম চন্দ্রের উপন্যাসের অংশবিশেষ বাছাই করলে কবিতা হিসেবেই মনে হবে। আমার মনে হয়, ছোটগল্প ও কবিতার মধ্যে দূরত্ব আসলেই অনেক কম। কবিতা লিখতে পারলে ছোটগল্প লিখা যায়, তেমনিভাবে ছোটগল্প লিখতে পারলে কবিতা লিখা যায়। আমি নিজেও প্রথম দিকে গদ্য লিখতাম। পরে আমি মনে করেছি আমার গদ্য নয়, বরং কবিতা লেখা উচিত।

সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম : কবিরা কিন্তু নির্মোহ গদ্য লিখতে পারেন, সাহিত্য সমালোচনা করতে পারেন। তাঁরা এর বিস্তার করেছেন একটি আলাদা মাত্রায়। সৃষ্টিশীল কাজ বাদ দিয়ে, অন্যের কাজ নিয়ে বা অন্য বিষয় নিয়ে চিন্তাভাবনা ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করেছেন। তার একটা আলাদা আনন্দ আছে। মানুষ সৃষ্টিশীল কাজের একটি স্তর থেকে আরেকটি স্তরে যেতে পারে। কবিরা এ কাজটি ভালো পারেন কারণ, তাঁদের সহায়তা করার মতো সবকিছু আছে। কেবল বিস্তার ঘটালেই তাঁর কাজটি সম্পন্ন হয়ে যায়।

মুহম্মদ নূরুল  হুদা : আপনি যে বিস্তারের কথা বললেন, কবিরা এ বিস্তার সহজে করতে চায় না। দ্রুত যা পায়, তা সংক্ষেপে নিয়ে আসে। একে বলে সংহতি। ঔপন্যাসিকের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও বেশি। তিনি জীবনটাকে দেখেন, বীক্ষণ করেন।

সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম : ছোটগল্পে আমি তুলনামূলকভাবে অধিকতর স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি। ছোটগল্পে এক ধরনের পরিমিতি থাকে। ছোটগল্পে একটা চমক দরকার হয়, যা উপন্যাসে ক্রমাগত হয়। উপন্যাস তো আমি ধারাবাহিকও লিখতে পারি। কবিতা তো ধারাবাহিক লেখা সম্ভব নয়। তেমনিভাবে ছোটগল্পও ধারাবাহিক লেখা যায় না। এটা হচ্ছে বিস্তারে, সংক্ষেপায়নে, সংহতির একটা গভীর স্তরে বিষয়কে নিয়ে যাওয়া। বিভিন্ন ধরনের চিন্তাভাবনার মধ্য দিয়ে একটা গল্প লেখা যায়। গল্পে স্থানের সঙ্গে সাদৃশ্যতায় আনা, ইতিহাস অর্থাৎ স্থানীয় ইতিহাসকে তুলে আনা গুরুত্বপূর্ণ। স্থানীয় ইতিহাসের প্রসঙ্গ আনার আনন্দ হলো এর মাধ্যমে লেখক নিজেকেও তুলে ধরেন। তার পরিচিত পরিবেশ অর্থাৎ নদী, গ্রাম আছে। প্রবাসের পরিবেশের সঙ্গে দেশের পরিবেশের টান এক রকম হবে না। এসব বিষয়গুলো ছোট গল্পকার খুব মন দিয়ে বুঝতে পারেন। একজন ঔপন্যাসিক দূরদৃষ্টি দিয়ে দেখেন, আর একজন কবি দেখেন অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে। রবীন্দ্রনাথ কিন্তু ঔপন্যাসিক ছিলেন না। তাঁর দু-একটি উপন্যাস ব্যতীত বাকি উপন্যাসগুলো পড়ে আমার মনে হয়েছে, তিনি কেবল শব্দের একটা চর্চা করে গেছেন, গল্পটা টেনে গেছেন মাত্র।

মুহম্মদ নূরুল  হুদা : শেষের কবিতা তো পুরোটাই কবিতা।

সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম : শেষের কবিতা পুরোটাই কবিতা এবং ছোটগল্পকে তিনি উপন্যাস করেছেন। হুমায়ূন আহমেদও ছোটগল্পকে বিস্তৃত করে উপন্যাস লিখেছেন। তাঁর ছোটগল্পগুলো উপন্যাস থেকে অনেক বেশি মূল্যবান। রবীন্দ্রনাথের ছোটগল্পগুলো তাঁর উপন্যাসের তুলনায় অনেক মূল্যবান। আমি এর সঙ্গে শতভাগ একমত, একজন কবির পক্ষে ছোটগল্প লেখা সহজ। আবার ছোট গল্পকারের জন্যও কবিতা লেখা সহজ হয়। উপন্যাস, কবিতা এবং ছোটগল্প যিনি লেখেন, দেখা যায়, তাঁর উপন্যাস সব সময় সেই মাত্রায় বিকশিত হয় না।

মুহম্মদ নূরুল  হুদা : কবিতার মধ্যে তো অনেক কিছু ধারণ করা যায়। যেমন―একজন কবি যদি তাঁর ইতিহাসচর্চা করেন, তাহলে দেখা যাবে একই কবিতায় পুরো ইতিহাসটা ধারণ করা হয়েছে।

সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম : আমি ষাটের দশকের শেষের দিকে আমার ছোটবেলার এক বন্ধুর সুবাদে লন্ডন থেকে আনা নেট শপিং ব্যাগ পাই। ব্যাগটির বৈশিষ্ট্য ছিল এটি অনেক ছোট হলেও বাজার অনেক ধরত। এ ব্যাগটি নিয়ে বাজারে যাওয়ার সময় মা অবাক হয়েছিলেন। তিনি হয়ত ভেবেছেন এত ছোট ব্যাগে বাজার আনব কীভাবে। আমি যত উপকরণ রাখছি, ব্যাগটিও তত প্রসারিত হচ্ছিল। এ কথাটি এজন্যই বললাম যে, কবিতাও ঠিক এমন। তেমনিভাবে বেলুনের কথাও বলা যায়। বেলুন ফোলানোর একটা পর্যায়ে না থামানো হলে, তা ফেটে যাবে। এটাকে আমরা বলছি, মোনালিসা মোমেন্ট। কবিতাকেও একটা জায়গায় চমকের মুহূর্তে এসে থামতে হয়। এজন্য আমি মোনালিসা মোমেন্ট-এর কথা সব সময় বলি।

মোহিত কামাল : পত্রিকা সম্পাদনা করতে গিয়ে কবি, প্রাবন্ধিক, গল্পকার, ঔপন্যাসিকদের জ্যেষ্ঠতা দশকওয়ারি, বয়স, নাকি বর্ণমালা―কীভাবে নির্ধারণ করলে ভালো হয় বলে মনে করেন আপনারা ?

মুহম্মদ নূরুল  হুদা : সম্পাদনা যিনি করবেন তাঁকে কোন পদ্ধতিতে সম্পাদনা করা হবে তার নীতিমালা ঠিক করতে হয়। আমার নিজের তা মনে হয়। আমি অনেক সংকলন গ্রন্থ করেছি। প্রথম পদ্ধতিটি হলো অক্ষরভিত্তিক। এখানে নামের বর্ণ-ক্রম অনুসরণ করা হয়। কার বয়স কত বা তার মেধা কেমন তা বিবেচনা করা হয় না। আরেকটি হলো হল বয়স। সবার সঠিক বয়স জানা গেলে বয়স অনুসারে সাজানো যায়। আরেকটি হলো এই দুই পদ্ধতির মিশেল। এ পদ্ধতিতে বয়স কিংবা অক্ষরের ভিত্তিতে নয়, বরং মূল্যায়নের ভিত্তিতে সাজানো হয়। এখন মূল্যায়ন করার সময় বয়সের পাশাপাশি পছন্দও গুরুত্বপূর্ণ। এখানে পছন্দ আসলে ব্যক্তিগত পছন্দ। তবে অধিকাংশ ভালো সম্পাদক এটি করেন না। বুদ্ধদেব বসু যখন তাঁর কবিতার সংকলন করছেন, তখন তাঁকে বয়সের দিকে লক্ষ্য রেখে ক্রম করতে দেখেছি।

দশকওয়ারি সম্পাদনার আরেকটি কারণ রয়েছে। বিংশ শতাব্দীতে ইংরেজি সাহিত্যে এক ধরনের প্রবণতা দেখা যায়। তা হলো কয়েকজন লেখক সংঘবদ্ধ হয়ে একরৈখিক বিষয়কে ধারণ করে পূর্ববর্তী রচনাসমূহ থেকে আলাদা হওয়ার চেষ্টা করছেন। ফলে তারা একটি গ্রুপ বা দলে পরিণত হয়েছেন। ধরা যাক, তাঁরা প্রথম দশকে এসেছেন। তাঁদের কাছে একটি একরৈখিক বিষয় ছিল প্রথম মহাযুদ্ধ। একে কেন্দ্র করে ‘ওয়ার পয়েট্রি’ তৈরি হয়। এরপর দ্বিতীয় দশকে যাঁরা এসেছেন তাঁরা আবার প্রথম দশকের প্রবণতার বাইরে গিয়ে নতুনভাবে আধুনিকতাকে নির্মাণ করার চেষ্টা করলেন। উদাহরণস্বরূপ বলা যায় টি এস এলিয়ট গ্রুপের কথা।

এ রকম সচেতনভাবে এ বিভাজনটি তৈরি হয়েছে। ষাটের দশকে এসে আমাদের কাছে এটি সাহিত্যের পরম্পরাকে বিচার করার একটি প্রক্রিয়া হিসেবে দেখা যায়। সংকলন করার সময় আমরা লক্ষ্য রাখি কে কখন আবির্ভূত হয়েছেন। আমি আমার পরিচিত খোন্দকার আশরাফের প্রসঙ্গ এক্ষেত্রে উল্লেখ করি। তিনি যখন কবিতা লিখতেন, তাঁর কবিতা আমি যোগাযোগ করে ছাপিয়েছি। কিন্তু তিনি প্রবলভাবে আবির্ভূত হয়েছেন আশির দশকে। ফলে তিনি আশির দশকের কবি হিসেবে পরিচিত হয়েছেন। এটি সাহিত্য আন্দোলনের ওপরও নির্ভর করে। লিটলম্যাগ শুরু হওয়ার পর এটি আরও বেশি দেখা যাচ্ছে। বাংলাদেশে লিটলম্যাগ শুরু হয়েছে ১৯৫০ সালের দিকে। কবিতা কিংবা সাহিত্য নিয়ে সচেতন বিভাজন যখন শুরু হয়েছে, তারপর থেকে সংকলন সম্পাদনা করার ক্ষেত্রে সম্পাদক নিজের মতো করে বিচার করেন।

সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম : আমাকে বাংলাদেশের ভেতর থেকে নির্বাচন করে সম্পাদনা করতে বলা হলে, আমি জন্ম সালকেই বেছে নেব। এটাই সবচেয়ে সহজ বলে আমি মনে করি। অক্ষর দিয়ে করলে যাঁদের নামে অ বা আ আছে তাঁরাই শুরুর দিকে থাকেন। তখন যদি কাউকে দোষারোপ করতে হয়, তবে পিতামাতাকেই করতে হবে। পাঠক যখন দেখবেন বর্ণ-ক্রমে সাজানো হয়েছে, তখন তিনি যাঁকে পড়তে চাইবেন তাঁকে খুঁজে পড়বেন। আমি মনে করি, এ স্বাধীনতা থাকুক। আর এমন তো নয় যে একটা গল্প পড়লে আরেকটা পড়া যাবে না।

আহমাদ মোস্তফা কামাল : আমিও মনে করি সংকলন সম্পাদনা করার সময় বয়সকেই বিবেচনা করা শ্রেয়। আমি যে কয়েকটি সংকলন সম্পাদনা করেছি, তাতে আমি বয়স ধরেই করেছি। বয়স বলতে আমি জন্ম সালকে বুঝিয়েছি। এক্ষেত্রে লেখক কোন সময়ে লেখালেখি শুরু করেছেন তা বিবেচনায় আনা হয় না। আর আমার গল্প যেখানে থাকুক, সমস্যা নেই। আমার গল্প যদি গল্প হয়, তবে পাঠকই তা খুঁজে নিবে।

মুহম্মদ নূরুল  হুদা : তবে আমি মনে করি, সবচেয়ে সাহসী সম্পাদনা হচ্ছে : সম্পাদক লেখা পড়বেন। পড়ার পর তিনি মূল্যায়ন করবেন। যেভাবে তিনি ভালো মনে করেন, সেভাবে ক্রম সাজাবেন।

সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম : সম্পাদক লেখা পড়ে মূল্যায়ন করে ক্রম সাজাবেন, এটি আমাদের দেশে অনেক কঠিন। বাইরের দেশগুলোতেও এটি কঠিন। তবে বাইরের দেশের সম্পাদকদের সে সাহস আছে। কিন্তু, আমাদের সম্পাদকদের লেখকদের ওপর নির্ভর করতে হয়। দেখা গেল, লেখক রাগান্বিত হলে লেখাই লিখবে না। বাংলাদেশে এ ধরনের সম্পাদনা করা সিকান্দার আবু জাফর বা আহসান হাবিবের মতো সম্পাদক ছাড়া কঠিন।

মুহম্মদ নূরুল  হুদা : আমি এ তালিকায় আরেকটি নামের কথা বলতে চাই। তিনি হলেন আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদ। তিনি যখন কণ্ঠস্বরের কবিতা সংখ্যা করলেন, তখন একটা ঘটনা ঘটে। বিষয়টি একটু ব্যক্তিগত বটে। সে সংখ্যায় প্রথম কবিতাটি ছিল আমার নিজের লেখা দূরে যাচ্ছো কবিতাটি। তখন তা দেখে আবদুল মান্নান সৈয়দ বললেন কবিতা খারাপ না, কিন্তু প্রথমে আসার কবিতা না। তার বয়সও কম, আমার চেয়ে কম, রফিক আজাদের চেয়ে কম। আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদ তখন বললেন, পড়ার পর সম্পাদকের যা মনে হয়েছে, সম্পাদক তা-ই করেছেন।

সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম : তবে কণ্ঠস্বরে এ নিয়ে তর্ক হতো না। কারণ কণ্ঠস্বরের চিন্তাটাই ছিল এমন যে আমরা উৎকর্ষতাই তুলে ধরব। আর আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদের সুবিধা ছিল তিনি বাংলার অধ্যাপক ছিলেন, পাণ্ডিত্য ছিল। তর্কে তাঁর সঙ্গে পারা মুশকিল। আর সাহিত্যবিচারে সিকান্দার আবু জাফরের নৈতিক একটা অধিকার জন্মেছিল। তিনি সব সময় সিদ্ধান্তে অটল থাকতেন। আর আজ কাউকে তুলে আনলেন, কাল ফেলে দিলেন, তিনি এমনটা করতেন না। আমাদের দেশের অনেক সম্পাদক এমনটা করে থাকেন। এখানে পত্রিকার মালিকেরও একটা প্রভাব থাকে। আমার এক বন্ধু রসিকতা করে বলেছিলেন, আমি একটা কবিতা লিখব তার নাম হবে ‘সিকান্দার আবু জাফরের ওয়েস্ট পেপার বাস্কেট’। ওখানে যত কবিতা স্থান পেয়েছে, তা নিয়ে একটা সংকলন করা যাবে। তাঁর একটা নিয়মই ছিল কবিতার কাগজ মুড়ে বাস্কেটে ফেলে দিতেন। সেখান থেকে তুলে পড়ে আবার ফেলে দিতেন।

মোহিত কামাল : বর্তমানে আমাদের তরুণরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে সাহিত্যচর্চা করছে। অনেক সময় আমরা মনে করি, তারা মাদক ছেড়ে সাহিত্যচর্চা করছে। তাদের বই প্রকাশ ও বিপণন নিয়ে আপনাদের মতামত বা তাদের উদ্দেশ্যে আপনাদের পরামর্শ জানতে চাই।

মুহম্মদ নূরুল  হুদা : নতুন প্রজন্মের উদ্দেশ্যে বলব, তারা যা লেখে তা প্রকাশ করার আগে সম্পাদনা করা প্রয়োজন, পড়া প্রয়োজন। পৃথিবীর যেকোনও প্রকাশক বই পড়ার আগে পাণ্ডুলিপি পড়েন। নিজে পড়তে না পারলেও তার একজন পরীক্ষককে দিয়ে পড়ান। টি এস এলিয়ট এ রকম একজন সম্পাদক ছিলেন। বাংলাদেশের প্রকাশনা জগতের বড় বিপর্যয় হচ্ছে, পুরুষ লেখকেরা যা-ই লেখেন নিজে অর্থ খরচ করে তা প্রকাশ করেন। এ সংস্কৃতি থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে। ভালো প্রকাশক বা সম্পাদক যাঁরা তাঁদের এগিয়ে আসতে হবে।

সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম : তরুণরা যা লিখছে, লেখুক। লেখার সঙ্গে সঙ্গে সহ-সম্পাদনার বিষয় থাকে। এটি আসে পড়াশোনার চর্চা থেকে। আমি কখনও বাংলা সাহিত্যের বড় বড় বইগুলো পড়লাম না, কিন্তু হঠাৎ করে লিখতে শুরু করলাম এবং এমন ভাব দেখালাম যে আমিই এ দেশের একমাত্র সাহিত্যিক। এ দৃষ্টিভঙ্গি থাকলে চলবে না। সব সময় বিনয়ের সঙ্গে নিজেকে উপস্থাপন করতে হবে। আমার চারপাশে যাঁরা লিখছেন, তাঁদের কাছ থেকে আমার অনেক কিছু জানার আছে।

যখন তার আত্মবিশ্বাস আসবে যে এখন আমি লেখা ছাপাতে পারি, তখন তিনি একজন ভালো প্রকাশকের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেন। আর সে প্রকাশনীতে যদি একজন ভালো সম্পাদক থাকেন বা ভালো সম্পাদককে দেখিয়ে প্রকাশ করলে সবচেয়ে ভালো হয়। আমাদের অনেক তরুণ ভালো লিখছেন। সমস্যা হচ্ছে, যাঁরা খুব ভালো লিখছেন বা যাঁরা খুব ভালো লিখছেন না, তাঁরা একই রকম ক্রিয়াশীল। তাঁদের মধ্যে মাত্রাগত পার্থক্য করার মতো পাঠক খুব কম পাওয়া যায়। পাঠকেরা খুব বেশি পড়েন না আজকাল।

পড়াশোনার চর্চাটা একেবারে কমে গেছে, সাহিত্যবোধ অস্পষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এটি আমার জন্য একটু কষ্টের বিষয়। কাউকে লেখা পাঠালে পড়ে গঠনমূলক সমালোচনা করে লেখককে জানানো উচিত। আমাকেও অনেক তরুণ লেখা পাঠিয়ে পড়ে দেখতে বলেন। আমি পড়ে দেখে পরামর্শ দিই, কোন কোন জায়গায় আরেকটু নজর দিতে হবে। আমি কাউকে সরাসরি উপদেশ দিই না, পরামর্শ দিই। আমি কলকাতায় বাংলা ভাষার যে অবস্থা দেখেছি, সে তুলনায় তরুণদের লেখায় আমি আশাবাদী।

আহমাদ মোস্তফা কামাল : আপনাদের বক্তব্যের সঙ্গে আমারও কোনো দ্বিমত নেই। আমি আপনাদের তুলনায় বয়সেও অনেক ছোট।

মুহম্মদ নূরুল  হুদা : শিল্প-সাহিত্যের আসলে কোনো বয়স নেই। দেখা যায়, একজন কবি ২৫-৩০ বছরের মধ্যেই তাঁর সবচেয়ে ভালো কবিতাটি লেখেন।

আহমাদ মোস্তফা কামাল : আমি বয়সের বিষয়টি এনেছি চর্চার বিষয়টি বোঝানোর জন্য। আপনারা যেভাবে চর্চা শুরু করেছেন লিটলম্যাগ দিয়ে, পত্রিকা দিয়ে। এ কাজটি কিন্তু আমরাও করেছি। লিটল ম্যাগ দিয়ে শুরু করে পত্র-পত্রিকায় লিখেছি। অনলাইনের ব্যবহার আমাদের সময় ছিল না। এখন ব্লগের মাধ্যমে লিখেই প্রকাশ করা যায়। এটি আমাদের সময়েও ছিল না। আমাদের লেখাও একজন সম্পাদকের হাত পেরিয়ে যেতে হতো। এ বিষয়টির কারণে আমি নিজেও অনেক উপকৃত হয়েছি। আমি যে পাণ্ডুলিপি জমা দিয়েছি এবং যে লেখা ছাপা হয়েছে তার তুলনা করে দেখতাম অনেক জায়গায় সম্পাদনা করা হয়েছে। আর এ সম্পাদনা অবশ্যই প্রয়োজন ছিল।

এ চর্চা না থাকায় একটা শব্দ নিয়েও কথা (সমালোচনা অর্থে) বলা যায় না। আমি শুধু বলতে চেয়েছি, অসহিষ্ণুতা আমার অপছন্দ। আরেকটি বিষয় হচ্ছে ফেসবুকসহ অনলাইনমাধ্যম অনেক গতিশীল। এ মাধ্যমে অনেক কিছুর মধ্যে দিয়ে যেতে হয়। অনেক লেখা আসে, অনেক মন্তব্য আসে। সেগুলো পড়া ও উত্তর দেওয়া মিলে এমন একটি জটিল অবস্থার সৃষ্টি হয়, যেখানে স্থিরভাবে চিন্তা করা বা সম্পাদনার কথা ভাবার চেয়ে তরুণরা তাৎক্ষণিকভাবে এটি প্রকাশ করায় আগ্রহ বোধ করে। এভাবে কতদূর যাওয়া যাবে, আমি জানি না। তরুণদের আমি প্রায়ই বলি ২৫ বছর লেগে থাকতে পারবে কি না। যদি পার, তাহলে এগোতে পারবে।

মুহম্মদ নূরুল  হুদা : অন্যকে সম্পাদনা করতে হবে কেন। নিজের লেখা নিজেকেই সম্পাদনা করতে হবে। একে আমরা বলছি স্ব-সম্পাদনা। স্ব-সম্পাদনা যত দিন একজন লেখকের আয়ত্তে না আসবে, তত দিন তিনি ভালো লেখক হয়ে উঠবেন না।

আমি লেখক, আমি প্রথম পাঠক, আবার আমিই প্রথম সম্পাদক। এ তিনটা জিনিস না হলে লেখাটা আত্মবিশ্বাস নিয়ে কাউকে দিতে পারব না।

মোহিত কামাল : আপনারা স্ব-সম্পাদনার কথা বলছেন। অনেকে বলছেন তুমি উপন্যাস লিখে ফেলে রাখো। প্রয়োজনে তিন মাস পর আবার পড়ো। এক বছর পর আবার পড়ো। তারপর ছাপানোর জন্য উদ্যোগ নাও। এটাকে আপনারা কীভাবে দেখছেন ?

সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম : এ প্রসঙ্গে আমি একটি উদাহরণ দিই। বাংলা একাডেমির তরুণ লেখক প্রকল্পে আমাকে বলা হলো আপনি এসে বক্তৃতা দেন। আমি বললাম আমি বক্তৃতা দিব না। আমি দেখব কে কি লিখছে। সবার পাণ্ডুলিপি দেখে আমি ক্লাসেই বলে দিয়েছি, কোথায় কোথায় কী কী সমস্যা আছে। তারা বিষয়গুলো নোট নিয়েছে। তারা বলেছে, এমনটা কোনও প্রকাশক বা কেউই তাদের বলেনি। কোনও সাহিত্যের অধ্যাপকের কাছে গেলে তিনিও সময় দিতে পারবেন না। কারণ সবাই ব্যস্ত থাকেন।

মোহিত কামাল : আড্ডায় অংশগ্রহণের জন্য সবাইকে ধন্যবাদ।

[আমরা একটা আনন্দের সংবাদ দিয়ে শেষ করতে চাই আজকের আড্ডা। তা হলো আমাদের এক তরুণ লেখক মাসউদ আহমাদের এক লক্ষ বত্রিশ হাজার শব্দের একটি উপন্যাস আসছে। এটি ধারাবাহিকভাবে দেশ পত্রিকায় প্রকাশিত হবে। উপন্যাসটির নাম কাঞ্চন ফুলের কবি। আমরা অভিনন্দন জানাচ্ছি এ তরুণ কথাসাহিত্যিককে। আড্ডার অতিথিবৃন্দও শুভেচ্ছা জানিয়েছেন, শুভকামনা জানিয়েছেন এ তরুণের জন্য।]

কথোপকথনটি অনুলিখন করেছেন :

রাহাতুল ইসলাম রাফি ও রেজাউল আলম

Leave a Reply

Your email address will not be published.

shares