প্রচ্ছদ রচনা : মুখোমুখি কবি : পৃথিবীর সব কবিই মূলত স্বভাব কবি : মুহম্মদ নূরুল হুদা

[মুহম্মদ নূরুল হুদা (জন্ম : ৩০ সেপ্টেম্বর, ১৯৪৯)। ষাট দশকের শেষপাদের উত্তাল রাজনৈতিক আন্দোলনের মধ্যেও তাঁর কবিতা জ্যোৎস্নালোকের আবেশে স্নিগ্ধ, লাবণ্যময় ও নান্দনিক। যুগধর্মের কারণে সহযাত্রী কবিদের কবিতায় যে উচ্চকণ্ঠ ও স্লোগানমুখরতা, হুদা সেখানে তাঁর কবিতায় সৌন্দর্যসঞ্চারী। তাই, সমকালে সহযাত্রী কবিদের থেকে তিনি স্বতন্ত্র, যদিও তার পথ অভিন্ন। সময়ের দাবি পূরণ করেই তিনি স্বতন্ত্র পথে হেঁটেছেন―নিজস্ব প্রকরণে; জাতিসত্তার কবি হিসাবেও তিনি পরিচিত। একইসঙ্গে তিনি একজন ঔপন্যাসিক ও সাহিত্য-সমালোচক। শিশুসাহিত্য, অনুবাদ সাহিত্যে তার স্বতঃস্ফূর্ত বিচরণ। নজরুল গবেষক হিসাবে রয়েছে দেশে-বিদেশে তাঁর পরিচয়ের ব্যাপ্তি। জন্মেছেন কক্সবাজার জেলার দরিয়ানগরে। তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা শতাধিক। ১৯৮৮ খ্রি. বাংলা কবিতায় উল্লেখযোগ্য অবদানের জন্য তাকে বাংলা একাডেমি পুরস্কার এবং ২০১৫ সালে একুশে পদক প্রদান করা হয়। ১২ জুলাই ২০২১ থেকে মুহম্মদ নূরুল হুদা-কে বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক নিযুক্ত করা হয়। শব্দঘর-এর পক্ষে সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ করেছেন ৯০ দশকের কবি রনজু রাইম।―সম্পাদক]

রনজু রাইম : প্রিয়কবি, শুভেচ্ছা নিন। আপনি কবিতাভ্রমণের দীর্ঘ পথ অতিক্রম করে গন্তব্য থেকে গন্তব্যহীনতার দিকে অগ্রসর হচ্ছেন। আপনার এই কাব্যযাত্রার শুরুটা কেমন ছিল ?

মুহম্মদ নূরুল হুদা :  প্রস্তুতি বলতে কিছু ছিল না। শুধু স্মৃতি। জন্মের পর মায়ের কোলে, মায়ের স্তন্য পান করার কিছু স্মৃতি আছে। কখনও কখনও একটি মশারির ভেতর রুগ্ণ আমাকে মা পরিচর্যা করেছেন, সেই স্মৃতি আছে। কখনও কখনও আমার বাড়ির পাশে ছোট্ট একটা নদী, যাকে আমরা  চাটগাঁইয়া ভাষায় বলি ‘চরান’, সেই নদীতে শীত-সকালে জলে নামা, ঠাণ্ডায় কাবু হয়ে তবু দাঁড়িয়ে থাকা―সেই স্মৃতি আছে। মাকে দেখেছি একগলা জলে নেমে স্নান করে সকালে নামাজ পড়ছেন, সেই স্মৃতি আছে।

রনজু রাইম : এরকম স্মৃতি গ্রাম-বাংলার অনেকেরই আছে―কিন্তু আপনার কবিতার সঙ্গে এইসব স্মৃতির মেলবন্ধন ঘটালেন কখন, কীভাবে  ?

মুহম্মদ নূরুল হুদা : তাই তো বলেছিলাম। তবে এই স্মৃতির ভেতরে যে গাছ আছে, পাখি আছে, মাঠ আছে, মাঠের ভেতরে হেঁটে যাওয়া আছে, স্কুলে যাওয়া আছে, ডাংগুলি খেলা আছে, এই সমস্ত স্মৃতি আছে। ঘরের মধ্যে দাদি ছিলেন, দাদি রাতে কিস্সা-কাহিনি বলতেন, সেগুলোর স্মৃতি আছে। আব্বা ছোট ব্যবসা করতেন, বিলের জমিতে চাষ করতেন, সেই স্মৃতি আছে। আমার দাদি সকালে কোরআন শরিফ পড়তেন―‘ফাবি আইয়ে আলা বাব্বি কুমা তুকাজজিবান’। তার পাশে আবার আরেক দাদি ছিলেন, দাদির বোন দাদি―তিনি আমির হামজার পুঁথি পড়তেন, সেই স্মৃতি আছে। এইসব স্মৃতির মধ্যে বেড়ে উঠতে উঠতে যখন স্কুলে যাচ্ছি―তখন দেখলাম রাতে মাঠের মধ্যে হাডুডু খেলা হচ্ছে, পূর্ণ চাঁদের নিচে। একদিন দেখলাম স্কুলমাঠে মঞ্চের মতো করা হলো, তাতে দুইজন কবিয়ালগিরি করবেন। কবি রমেশ শীল তাঁর শিষ্য ইকবাল উঠেই কবিয়ালগিরি শুরু করলেন।

রনজু রাইম : কবির লড়াই …

মুহম্মদ নূরুল হুদা : হ্যাঁ, কবির লড়াই। দেখতে দেখতে একবার মনে হলো আমিও তো পারি, মঞ্চে উঠে পড়ি।

রনজু রাইম : এটাই প্রথম প্রেরণা …

মুহম্মদ নূরুল হুদা : এটাই প্রথম প্রেরণা বলা যায়। তারপর প্রাইমারি শিক্ষক ছিলেন  এস. আবুল কাসেম। আরেকজন পরে এলেন, এস কে আবুল কাসেম। দুজনেই―একজন কুমিল্লা থেকে এসেছিলেন, আরেকজন কক্সবাজারের চকরিয়া থেকে। দুজনেই কবিতা লিখতেন। কবিতা লেখার মানুষ তো বইয়ে শুয়ে থাকে, বইয়ের ভেতরে দেখতাম কবি, আর তখন সামনাসামনি দেখলাম।

রনজু রাইম :  এই যে কবি ও কবিতার প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা নিয়ে কবিতার জগতে ঢুকে পড়া; তা কি মধ্যযুগের কবিদের মতো স্বভাবজাত না কি জীবনানন্দ দাশের ‘কেউ কেউ কবি’র মতো কাব্যশুদ্ধতায় আধুনিক ?

মুহম্মদ নূরুল হুদা : না, তেমন কিছু না জেনেই। স্মৃতি ছাড়া তেমন কিছু আমি জানতামই না। স্মৃতির মধ্যে যে জিনিসগুলো কীভাবে কবিতার উপকরণ হয়ে গেল, কবিতার মধ্যে ঢুকে গেল―আমি এই কথাটিই বলতে চাচ্ছি। একজন মানুষ কবি হতে পারে―স্মৃতি হয়ে এল। ভাবলাম, আমিও তো কবি হতে পারি, আমিও তো কবিতা লিখতে পারি। মিথ্যা কথা বলার ফল, ‘বাঘ আসবে বলেই’, আমার প্রথমে কবিতা লেখা হলো। আমার সঙ্গে যেসব ছেলেমেয়েরা পড়ত, এক শ্যামাঙ্গী সুন্দর কিশোরী ছিল―তার দিকে তাকিয়ে থাকতে ইচ্ছা হতো।

রনজু রাইম : কৃষ্ণকলি …

মুহম্মদ নূরুল হুদা : কৃষ্ণকলি, শ্যামাঙ্গী … যাই বলি … স্লেটের একপাশে লিখলাম, ‘আমি তোমাকে ডট ডট। সে উত্তর দিল, আমিও তোমাকে ডট ডট। এই তো শুরু হয়ে গেল। এরই মধ্যে স্কুলপাঠ্য কবিতাগুলোর মধ্যে কেমন মিল আছে, সুর আছে, ছন্দ আছে―এটা পেয়ে গেলাম। এরপর কবিতা কখন লিখতে শিখেছি সেটা একেবারে অদ্ভুত ব্যাপার। পাঠ্য বইয়ে যে কবিতাগুলো পড়েছি, ক্লাস ওয়ান থেকে ক্লাস ফাইভ পর্যন্ত, তখন আমাদের বাড়ি স্কুল থেকে দূরে সরে গেছে। মানে বন্যার কবল থেকে নিরাপদ জায়গায়, এক মাইল দূরে চলে গেছে আমাদের বাড়ি। মাঝে বিল, বিলে দুপুরে যখন হাঁটতাম, বিলের মাঝে ডোবা ছিল, ডোবার মধ্যে শামুক থাকত। গ্রীষ্মকালে ও শীতকালে শামুক আস্তে আস্তে হেঁটে বেড়াত, দেখা যেত রেখা। একটা মজার খেলা, শামুকের গায়ে হাত দিলে শামুক কিন্তু নড়বে না। মানুষ যতক্ষণ না নড়ে, শামুক আর নড়বে না, সে বুঝে ফেলেছে এখানে শত্রু আছে। সে নিজের ভেতর গুটিয়ে গেল। তাকে ধরলে সে আর নড়ে না, কিন্তু ভাঙতে আর ইচ্ছা করে না। কেমন জানি আবরণ দিয়ে আছে। এভাবে দেখতে দেখতে কীভাবে আমার মন থেকে যেন এসে গেল (কবিতা কীভাবে লেখা হলো তা বলছি) ওই সময় যা লেখা হুবহু এখনও তাই আছে, আমার বইয়ে আছে, আমার শ্রেষ্ঠ কবিতাতেও আছে :

‘গুটিয়ে যাও গুটিয়ে গেলেই সুখ

রোদ দুপুরে পুড়বে না আর বুক

বুকের তলে হৃদয় নামক আঁখি

টের পাবে না তীর শিকারি পাখি।

গুটিয়ে যাও গুটিয়ে গেলেই ভালো

গভীর সুখে জ্বলবে জ্বলুক আলো।’

 রনজু রাইম : বাহ্ বাহ্

মুহম্মদ নূরুল হুদা : ‘বাহ্ বাহ্’, এই যে বাহ্ বাহ্, এই কবিতা কখন কীভাবে যে হয়েছিল, সেটা আমার মনে নেই। কিন্তু হয়ে গেছে। হয়ে যাওয়ার পর আমার মনে হলো, এই যে ছন্দটা আমি বললাম, এই ছন্দ কীভাবে তৈরি হলো, আমি জানি না। এজন্যই বললাম প্রকৃতি থেকে পাওয়া …

রনজু রাইম : তার মানে বলতে চাচ্ছেন কবিতার ছন্দেও যে বিষয়-আশয়, তা প্রকৃতির মধ্যেই আছে, নেচারের মধ্যেই আছে।

মুহম্মদ নূরুল হুদা : প্রকৃতির মধ্যে আছে, লোককবি রমেশ শীলের মধ্যে আছে, রমেশ শীলের গানের মধ্যে আছে, আমার শিক্ষক দুই কাসেম, কবি, তাদের কবিতার ভেতর আছে। অনেকক্ষণ যদি একটা কবিতা পাঠ করা হয়, ‘আমাদের ছোট নদী চলে বাঁকে বাঁকে/বৈশাখ মাসে তার হাঁটুজল থাকে।’এতে কেমন যেন মাত্রা এসে যায়। পুঁথি শুনেছি, পবিত্র কোরআন শরিফ শুনেছি। সুরের বিভিন্ন ভিন্নতা, ছন্দের জাদু কানের ভেতরে ঢুকে যায়। আগে কানের  ভেতর তো যেতে হবে। কানের ভেতর দিয়ে মরমে পশতে হবে। এভাবেই যখন হয়ে গেছে, ছন্দ দোদুলা যে মেয়েটি সে রাতে আমি দেখছিলাম/স্বপ্না তাহার নাম/কবিতার মতো … এই যে শুরু হলো―আমি দেখলাম মাসখানেকের মধ্যে প্রায় চল্লিশ লাইনের কবিতা লিখে ফেললাম। এটা কবিতা হলো কি হলো না, তা জানি না, কিন্তু কবিতা লেখার জন্য যে শব্দ, যে তরঙ্গ, যে বক্তব্য―এটা কিন্তু আসতে শুরু করল। আমার কবি-শিক্ষক সম্পর্কে বলব, যারা পল্লিগান গায় তারা। আমাদের পাড়ারই একজন পল্লিকবি ছিলেন। আমাদের পাড়াতেই একজন গায়েন ছিলেন, বড়কাঁথা গায়েন। বড়কাঁথা গায়ে দিয়ে পালাগান করতেন রাতের বেলায়। উনি, লেখাপড়া কিছু জানতেন না, আমার দাদার মতো।

রনজু রাইম : মধ্যযুগের কাব্যে যে পয়ার, অক্ষরবৃত্তকেই যার পরিশীলিত রূপ বলা হয়―এবং বলা হয়ে থাকে যে, পয়ারের সঙ্গে গদ্যের অমিল সামান্যই। কবিতায় এই যে ভাষা-ছন্দের ব্যাপার, গদ্যের মধ্যেও এগুলো থাকতে পারে। গদ্যকে নাকি অক্ষরবৃত্তের পর্বে পর্বে বিন্যস্ত করা কঠিন কিছু নয়। যদি তাই হয়―তা হলে কবিতা ও গদ্যকে আলাদা করবেন কীভাবে ?

মুহম্মদ নূরুল হুদা : এ ব্যাপারে আসছি। তার আগে একটু বলে নিই। ক্লাস ফাইভ পাস করার পর যখন ক্লাস সিক্সে ভর্তি হয়ে হাইস্কুলে গেলাম―তখন দেখলাম বাড়িতে পুঁথি ছিল কিন্তু স্কুলে বিরাট বইয়ের লাইব্রেরি আছে। বিপুলসংখ্যক বইয়ের সমাহার। তৎকালে হাজার  দুই-তিনেক বই তো হবেই। এটা কিন্তু একটা হাইস্কুলের জন্য যথেষ্ট, সেখান থেকে যে উপন্যাসগুলো পড়তে শুরু করলাম, সেটা দেখে মনে হয়েছে যে আরেক জিনিস।

রনজু রাইম : আমি আরেকটা বিষয় জানতে চাচ্ছিলাম। পয়ার থেকে যে গদ্যের চলনটা এসেছে―মানে গদ্যের মধ্যেও পদ্যের বা কবিতার ছন্দের আবেশ আছে―তাতে, গদ্য-পদ্যের ভাষাকে পার্থক্য করবেন কীভাবে ?

মুহম্মদ নূরুল হুদা : আমি এই কথাটাই বলতে চাচ্ছিলাম। আগে তো কবিতার মধ্যে ছিলাম। পদ্য বা কবিতা যা-ই বলি না কেন। আমার দেশ, আমার জন্ম ইত্যাদি যা কিছু আছে―এর সঙ্গে কবিতার কোনও পার্থক্য আমি দেখি না। কোনটা কীভাবে হলো আমি জানি না। বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের পথের পাঁচালী উপন্যাস যখন পড়লাম তখন এই বই-ই আমাকে গদ্য ও কবিতার পার্থক্য বুঝাতে সাহায্য করল। কিন্তু কবিতায় যে মিল বা সমতা আছে, এটা আমি দেখি যে আলাদা। পথের পাঁচালী উপন্যাসের শরীরজুড়ে কবিতার আবহ আছে। যদিও চলমানতা আছে, প্রবহমানতা আছে তা সত্ত্বেও মাপ জোকের মধ্যে নেই―তাই একে কবিতা বলা যাবে না। গদ্য-পদ্য আলাদা, তখন আমার শিক্ষকেরাই বললেন যে, কবিতায় তোমাকে মিল রাখতে হবে। পঙ্ক্তিগুলো সমান রাখতে হবে।

রনজু রাইম : অর্থাৎ এলিটারেশনও থাকতে হবে …

মুহম্মদ নূরুল হুদা : এলিটারেশন না, ১৪ বা ১৮ মাত্রার যে মিল বিন্যাস, সেটা দেখাতে হবে।

রনজু রাইম : মাত্রার মিল ?

মুহম্মদ নূরুল হুদা :  হ্যাঁ, মাত্রার মিল।

রনজু রাইম : কিন্তু মাত্রার গাণিতিক হিসাবটা তো তখনও আপনি জানেন না। কান বা শ্রুতিনির্ভর।

মুহম্মদ নূরুল হুদা : হ্যাঁ, কান বলে দিচ্ছে কয়-মাত্রা, বা মিলবিন্যাস ঠিক আছে কি-না। এটাকে আমরা বলতাম কানের পথে কবিতা, শোনার পথে কবিতা, গোনার পথে কবিতা।

রনজু রাইম : হ্যাঁ, কবিতার ছন্দের-গাণিতিক হিসাবটা তো তখনও আপনি বুঝে উঠতে পারেননি, কবিতা লেখার প্রস্তুতিপর্বে যেমন অনেককেই ছন্দের ব্যাপারে কানের ওপরই নির্ভর করতে হয়।

মুহম্মদ নূরুল হুদা : ছন্দ যে অঙ্ক, সেটা জানলাম বহুদিন পরে। আমি যখন এসএসসি পাস করে ঢাকায় এলাম। তারপর আমি গুনতে শিখলাম।

রনজু রাইম :  গণনায় ভুলও হতে পারে, কিন্তু কান তো ভুল করে না।

 মুহম্মদ নূরুল হুদা : তার জন্য আমাকে ছন্দের যিনি প্রশিক্ষণ দিলেন, তিনি আমাদের সময়ের একজন উল্লেখযোগ্য কবি। তিনি বললেন, তোমার কবিতা হচ্ছে, কিন্তু ছন্দের ব্যাপারটা একটু শিখে নিতে হবে। বললাম, কী ছন্দ নাই, মন্দের সঙ্গে দ্বন্দ্বের তো মিল আছে। তিনি বললেন, এটা তো অনুপ্রাস, ছন্দ গণিতের একটি হিসাব। এই কবির নাম আহসান হাবীব। ১৯৬৬ সালে তিনি এটা আমাকে বলেছিলেন। তিনি তখন বললেন, তুমি তো ভালো ছাত্র, খারাপ ছাত্র হলেও পারবা, যেহেতু কবিতা লেখ। মাহবুবুল আলমের বাংলা ছন্দের রূপরেখা বইটা পড়। দুইরাত জাগরণহীনভাবে এই বইটা পাঠ করার পর আমি নিজেই লজ্জা পেলাম। কিন্তু এটাও দেখলাম যে, গাণিতিক হিসাবে অক্ষর কবিতা ঠিক আছে।

রনজু রাইম : কান তো বিট্রে করে না।

মুহম্মদ নূরুল হুদা : হ্যাঁ, কান কখনও বিট্রে করে না। আগে কানের পথে কবিতা, পরে ধ্যানের পথে কবিতা।

রনজু রাইম : আমরা সারাদিন এই যে, কথা বলি―এর যে প্রবহমানতা, এর মধ্যে কি অক্ষরবৃত্তের চালটা নেই। এই কথাকে কি অক্ষরবৃত্তের পর্বে পর্বে ভাগ করা যাবে না ?

মুহম্মদ নূরুল হুদা : হ্যাঁ, অক্ষরবৃত্ত পাব এবং অক্ষরবৃত্তের সঙ্গে সঙ্গে ‘কথন ছন্দ’ পাব।

রনজু রাইম : ‘কথন ছন্দ’, খুব সুন্দর বলেছেন। একটু বিশদে বলবেন ?

মুহম্মদ নূরুল হুদা : ‘কথন ছন্দ’ মানে অক্ষরবৃত্ত ও গদ্যছন্দের মাঝখানে। অক্ষরবৃত্তও হচ্ছে না, আবার গদ্যছন্দও হচ্ছে না, কিন্তু পাঠ করলে মনে হবে এক ধরনের সাবলীলতা আছে। অর্থাৎ অক্ষরবৃত্তে তো আমাকে সর্বসমতা রাখতে হবে, পঙ্ক্তি সমতা রক্ষা করতে, মাত্রাসমতা রক্ষা করতে হবে। কথন ছন্দে এটা রক্ষা না করলেও চলে। আমি বলার মতো ভঙ্গি করে বললাম, ‘আমাকে তুই আনলি কেন, ফিরিয়ে নে।’ গদ্যে বলতে শুরু করলাম, কিন্তু এই গদ্যেও একটি পর্ব আটমাত্রা, একটা পর্ব দশমাত্রা, আর একটা পর্ব সাতমাত্রা হলেও প্রবহমানতার কোনও অসুবিধা হয় না। এটা হচ্ছে একজন কবি দীর্ঘদিন কবিতা লেখার পর, অক্ষরবৃত্ত ও মাত্রাবৃত্তের মধ্যে সংযোজন করার ক্ষমতা। অক্ষরবৃত্ত, স্বরবৃত্ত, মাত্রাবৃত্ত না-জেনে আমি বিভিন্ন স্বরের ভেতরে মিশ্রণ ঘটাতে পারব না।

রনজু রাইম :  শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের বিখ্যাত কবিতা ‘জরাসন্ধ’ কী অবলীলায় বললেন। ‘ছন্দভাঙার আগে ছন্দ জানা অতি বাঞ্ছনীয়’―আপনি সমর্থন করেন কি ?

মুহম্মদ নূরুল হুদা : এ কথা আমি না-বলে, আমি অভিজ্ঞতার কথা বলে ছন্দের দিকে আসছি। আগে ছন্দের বিষয়টাকে টানছি না। আগে অভিজ্ঞতা বলে, সেই অভিজ্ঞতা থেকে তত্ত্বের দিকে যেতে চাচ্ছি।

রনজু রাইম : সবার ক্ষেত্রে তো এমনটিই ঘটে, যখন কবিতা লিখতে প্রস্তুতি নেন, একেবারে লেখালেখির শুরুর দিকে, প্রকৃতি বা কোনও কিছুকে ভালোলাগা বা কারও প্রতি প্রণয়াসক্ত হওয়া…

মুহম্মদ নূরুল হুদা : অর্থাৎ বিষয়টা ওখান থেকেই আসে। কোনও কিছুর প্রতি ভালোলাগা থেকে আসে। অর্থাৎ যে বিষয়টা তোমাকে আকৃষ্ট করছে।

রনজু রাইম : বিষয় ও প্রকরণ কি পরস্পর শর্তবন্দি ?

মুহম্মদ নূরুল হুদা : অবশ্যই। আছে।

রনজু রাইম : সব বিষয় কি কবিতায় নিয়ে আসা যায়।

মুহম্মদ নূরুল হুদা : অবশ্যই। ঞযবৎব রং ঢ়ড়বঃৎু রহ বাবৎুঃযরহম ধহফ ঃযধঃ রং ঃযব মৎবধঃবংঃ ধৎমঁসবহঃ রহ ভধাধঁৎ ড়ভ ঢ়ড়বঃৎু. পৃথিবীর যেকোনও বিষয়ে। ফুল, পাখি, তরুলতা শুধু নয়, ঝংকার শুধু নয়। প্রেমের কথা বললে ভালো হবে তা নয়, ধ্বংসের কথা, আগুনের কথা বললেও কবিতা হবে। বিষয়ের সঙ্গে, বিষয়ের ভেতরে যে বক্তব্য তার সঙ্গে একাত্ম হতে পারার পরই কারও পক্ষে কবিতা লেখা সম্ভব।

রনজু রাইম : বিষয় তো অনেক, কোন বিষয়কে কোন ছন্দে বাঁধতে হবে তার কি বাঁধাধরা কোনও নিয়ম আছে ?

মুহম্মদ নূরুল হুদা : আমার ধারণা, এর বাঁধাধরা কোনও নিয়ম নেই। তিনটি ছন্দ, কিন্তু মূল ছন্দ আরও বেশি হতে পারে। বাংলা ভাষায় সবটাকে মিলিয়ে তিনটা ছন্দে বিভাজন করে রেখেছে। স্বরবৃত্ত, অক্ষরবৃত্ত, মাত্রাবৃত্ত, তানপ্রধান, স্বরপ্রধান এসব নাম দিয়ে রেখেছে। আমরা বাংলাদেশে স্বরবৃত্ত, অক্ষরবৃত্ত, মাত্রাবৃত্ত বলি। এর ভেতর সহজতম ছন্দ, লোকছন্দ হচ্ছে স্বরবৃত্ত। এক সিলেবল একমাত্রা। এর আর কোনও পার্থক্য নাই। কিন্তু অক্ষরবৃত্ত মাত্রাবৃত্তে আমরা দেখেছি এক সিলেবল কখনও কখনও একমাত্রা, আবার কখনও দুই মাত্রা। একমাত্রা, দুইমাত্রা হিসাবে ছন্দের পার্থক্যটাও বুঝতে হবে …

রনজু রাইম : লয়-এর দিকটাও তো খেয়াল রাখতে হবে।

মুহম্মদ নূরুল হুদা : হ্যাঁ, অক্ষরবৃত্ত ধীর প্রবাহিত নদীর মতো চলে যাচ্ছে। মাত্রাবৃত্ত টুংটাং টুংটাং নাচতে নাচতে পিংপং বলের মতো চলে যাচ্ছে। আর স্বরবৃত্ত শ্বাসাঘাত দিতে দিতে চলে যাচ্ছে। বিদজ্জনেরা এই তিন প্রকারের ছন্দকে নীতিমালায় নিয়ে আসেন। ব্যাকরণের যেমন রীতি আছে, ছন্দকেও তেমনি রীতিতে বেঁধে ফেলেন। কবিতা লেখার আগে যদি এই ছন্দটা রপ্ত করেন এবং তারপর যদি তিনি কবি হন―‘কবি হন’ শব্দটা কিন্তু আলাদা। সব মানুষ কিন্তু কবি হতে পারে না।

রনজু রাইম : তার মানে, আপনি বলতে চাচ্ছেন, কবি হওয়াটা খুবই স্বতঃস্ফূর্ত একটা ব্যাপার―নাকি ঐশ্বরিক ?

মুহম্মদ নূরুল হুদা : ওপর থেকে আসুক, ডুবুরি হয়ে আসুক, মাঝ থেকে আসুক―কবি হওয়ার জন্য যে বিষয়টা তোমার কাছে আসবে, সেই বিষয়টার সঙ্গে একেবারে মিশে যেতে হবে। বোধের স্বতঃস্ফূর্ত অনুভূতি হয়ে এটাকে প্রজ্বলিত হতে হবে। এটা হলো কাব্যতা।

রনজু রাইম : অর্থাৎ কবিতা নির্মাণ-বিনির্মাণের কোনও ব্যাপার নাই ?

মুহম্মদ নূরুল হুদা : না, নির্মাণ অনেক পরে। প্রথম উক্তিটা যখন বেরুল, যখন ভাবলে যে এটা এভাবে নয়, ওভাবে করা যেতে পারে―তখন তুমি সজ্ঞানে নির্মাণ করলে। কিন্তু উৎসটা স্বতঃস্ফূর্ত।

রনজু রাইম : প্রথম স্বতঃস্ফূর্ত উৎসটাকে যখন নির্মাণে-বিনির্মাণের মাধ্যমে―নতুন কবিতা সৃষ্টি করলেন―সেটা কি আর আগের কবিতা থাকল নাকি অন্য কোনও কবিতা হয়ে গেল।

মুহম্মদ নূরুল হুদা : আলাদা হয়ে গেল। একেবারে স্বতঃস্ফূর্তভাবে যেটা আসে সেটা এমনভাবে আসে যেমন ধরো―‘গুটিয়ে যাও গুটিয়ে গেলে সুখ’ একেবারে স্বতঃস্ফূর্তভাবে এসে যাচ্ছে। এই সমস্ত কবিতার এডিটিং লাগে না।

রনজু রাইম : তা হলে কি আধুনিক কবিতায় নিরীক্ষাধর্মিতা, নির্মাণে- বিনির্মাণের চেয়ে মধ্যযুগের স্বভাব কবিত্বের প্রতি আপনার পক্ষপাত বেশি ?

মুহম্মদ নূরুল হুদা : আমি বলতে চাচ্ছি, পৃথিবীর সব কবিই মূলত স্বভাব কবি। তারপর সেই স্বভাব কবি থেকেই সে অন্য কবি হয়। আধুনিক কবি হয়, আধুনিক কবিরও কিন্তু বিচিত্র ধরন। কেউ হচ্ছে বয়ানের কবি কেউ হচ্ছে শ্লোকের কবি …

রনজু রাইম : প্রকৃতির বরপুত্র হয়ে স্বভাবজাতভাবে কবিতার জগতে আপনার প্রবেশ। একটু আগে এই কথোপকথনে আপনি বলেছেন যে, চাইলেই সবাই কবি হতে পারে না। আপনি বর্তমানে বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক। এই প্রতিষ্ঠানে কর্মরত অবস্থায় আপনি ইতোপূর্বে তরুণ লেখক প্রকল্পের পরিচালক ছিলেন। আপনার কথামতো, চাইলেই কেউ কবি হতে না পারলেও, ‘কবি’ বানানোর প্রকল্পটি আপনার তত্ত্বাবধানে ছিল। বিষয়টি স্ববিরোধী নয় কি ?

মুহম্মদ নূরুল হুদা : প্রশিক্ষণ ছাড়া পৃথিবীতে কিছুই হয় না। প্রশিক্ষণ দুই ধরনের―একটা ‘স্ব-প্রশিক্ষণ’, আরেকটা আলাদা প্রশিক্ষক দ্বারা প্রশিক্ষণ।

রনজু রাইম : কবিতা লিখতে এসে শেখা আর শিখে কবিতা লেখা,―দুটোর মধ্যে বিস্তর পার্থক্য নয় কি ?

মুহম্মদ নূরুল হুদা :  তুমি তো তরুণ লেখক প্রকল্পে ছিলে   ?

রনজু রাইম : না, আমি ছিলাম না।

মুহম্মদ নূরুল হুদা : তা হলে তোমাকে বলি। তরুণ লেখক প্রকল্পে যারা প্রশিক্ষণ নিয়েছে―তারা কবি হয়েছে কি-না, গল্পকার হয়েছে কি-না, প্রাবন্ধিক হয়েছে কি-না, সেটা বাছাই করার পর তাদের তরুণ লেখক প্রকল্পে প্রশিক্ষণের জন্য নির্বাচন করা হয়েছে। তারা স্বপ্রশিক্ষণের মাধ্যমে কবি হয়ে থাকলেই কেবল তাদের প্রশিক্ষণে আনা হয়েছে―যাতে তারা আরও পরিশীলিতভাবে কবিতা রচনা করতে সক্ষম হয়। বিশ শতকের শুরু থেকেই পৃথিবীতে এই পদ্ধতি শুরু হয়েছে। সৃষ্টিশীলতার জন্য মানুষকে প্রশিক্ষণ দেওয়া যায়। ক্রিকেটের জন্য যখন প্রশিক্ষণ দেওয়া যায়―ভালো ব্যাটিং যে করে, যার হাতে ভালো ব্যাটিং করার শক্তি আছে―টেকনিক আছে। কোচ তাকে কৌশলগুলো শিখিয়ে দেন, কখন কীভাবে ব্যাট করতে হবে। সৃষ্টিশীলতার ক্ষেত্রেও এই টেকনিকগুলো আছে। অক্ষরবৃত্তে কবিতা লিখেছে―কিন্তু একমাত্রা, দুইমাত্রা গণনা যদি ঠিকমতো শিখতে পারো তাহলে ছন্দে ভুল হবে না। ফলে এটাতে শিখন দরকার, প্রশিক্ষণ দরকার। স্কুল-কলেজে শিখে আসতে পার, না-শিখে থাকলে আবার শিখ, অনুশীলন কর। অনুশীলনের নামও কিন্তু প্রশিক্ষণ।

রনজু রাইম : আপনি স্ব-শিক্ষণ ও প্রশিক্ষণ সম্পর্কে বলছিলেন।

মুহম্মদ নূরুল হুদা : স্ব-শিক্ষণ দিয়ে মানুষ কবি হয়―প্রশিক্ষণ দিয়ে আরও ভালো কবি হয়।

রনজু রাইম : তাহলে স্বশিক্ষিত মধ্যযুগের কবিরা কিংবা গোবিন্দ দাসের মতো স্বভাব কবিদের আপনি ‘ভালো’ বললেও ‘আরও ভালো’ কবি বলবেন―নাকি  ?

 মুহম্মদ নূরুল হুদা : অবশ্যই বলব। কত ভালো কবি এটারও একটা নিয়ম আছে। বড় কবি হওয়ার দুটি শর্ত ১. প্রথমত, নিজের কবি হওয়ার ক্ষমতা আছে কি-না ২. নিজের কবিতাকে কতখানি ধারণ করার ক্ষমতা তার আছে। এটা যারা মহৎ কবি, যাদের কবিতাকে আর বিশ্লেষণ করা যায় না, আদি কবিদের মধ্যে যেমন―বাল্মিকী, হোমার, তাদের ভেতর এই দুই সত্তাই সমানভাবে ছিল। ছিল বলেই তারা নিজেরা কবিতা লিখেছেন এবং কবিতার যে সকল উপকরণ সেগুলো একত্র করে একটা এবহৎব তৈরি করেছেন। যেমন : পয়ার কবিতা। মহাকাব্যের ভেতর একসঙ্গে কবিতা ও উপন্যাস ওতপ্রোতভাবে মিশে আছে। তাদের কথা সম্পূর্ণ আলাদা। আর মৌখিকভাবে যারা অসম্ভব বড় কবি―হাজার প্রশিক্ষণ দিয়েও যাকে আর বড় কবি করা যাবে না―তেমন একজন বড় কবি লালন। তিনি বড় কবি, তার সঙ্গে স্ব-শিক্ষণ প্রশিক্ষণ নিয়ে বড় কবি হয়েছেন রবীন্দ্রনাথ, এই প্রশিক্ষণ যদি রবীন্দ্রনাথের না থাকত, মাইকেলের না থাকত, নজরুলের স্বর ও শ্রুতির প্রশিক্ষণ যদি না থাকত তা হলে তারা স্বভাব কবির দলে থেকে যেতেন। বিশ শতকের পরে যারা কবিতা লিখতে এসেছেন তাদের কলা-কৌশল, নান্দনিকতা, ইত্যাদি জেনে কবিতা লিখতে হবে।

রনজু রাইম : পৃথিবীতে অনেক লিটারেরি মুভমেন্ট হয়েছে―সোস্যাল বা অন্যান্য মুভমেন্টকে আশ্রয় করে কবিতা ও সাহিত্য সৃষ্টি হয়েছে। আমাদের দেশেও হয়েছে। এ নিয়ে বিস্তর তর্ক-বিতর্ক আছে। আমি ‘তর্কে বহুদূর’ না বলে যদি বলি, কবিতা ‘তত্ত্বে বহুদূর’। তাহলে এই বিষয়টাকে আপনি কীভাবে নেবেন। এর নান্দনিকতা কতটুকু অটুট থাকবে বলে আপনি মনে করেন।

মুহম্মদ নূরুল হুদা : সর্বাংশে সবটুকু নান্দনিকতা অটুট থাকবে বলে মনে করি। কবিতার ইতিহাসের দিকে যদি যাই―প্রাচ্যের ইতিহাস, পাশ্চাত্যের ইতিহাস যা-ই হোক না কেন―কবিতার পাশাপাশি তারা কলা-কৌশলগুলোকে শনাক্ত করেছেন। চড়বঃরপং বলে একটা গ্রন্থ আছে এরিস্টটলের―এটা হচ্ছে, আদিকালে কবিতা লেখার জন্য যেসব শর্ত ছিল, সক্রেটিস যা বলেছিলেন, প্লেটো যা বলেছিলেন―তারই একটা বাণীরূপ। তার ভেতর আমরা সাহিত্যের প্রথম তত্ত্বগুলো পেয়ে যাই। কবিতার পাশাপাশি কবিতার তত্ত্ব। আর গ্রিক জগতে এসে আমরা হোরেস, লুঙ্গিনাস―তারা তো কবি নয়। কবিদের পাশাপাশি তারা কাব্যতাত্ত্বিক, আলংকারিক। আদি সংস্কৃত সাহিত্যে শ্লোক আছে―কাহিনি আছে―তার পাশাপাশি দর্শন আছে। কবিতার তত্ত্ব আছে।

রনজু রাইম : রস বিচারের ব্যাপার আছে।

মুহম্মদ নূরুল হুদা : রস বিচারের ব্যাপার আছে। ১০টা রস। তাদের হাতে তৈরি হয়েছে ছন্দ। ফলে তত্ত্ব ও কবিতা পাশাপাশি আছে। সচেতন পাঠক ও বিশ্লেষকরা এটা করেছেন, শুদ্ধধারাকে তৈরি করে ব্যাকরণ করেছেন, ছন্দের ব্যাকরণ করেছেন। কোন লেখা কবিতা, কোন লেখা শ্লোক, কোন লেখা কাহিনি―এটা বুঝতে সহায়তা করে তত্ত্ব।

রনজু রাইম : গদ্য কবিতা লেখা হচ্ছে, গদ্য ছন্দও আছে―তবে কেউ যদি মনে করেন ছন্দ জানব না, কবিতা লিখব―তাহলে সেটাকে আপনি কবিতা বলবেন কি ?

মুহম্মদ নূরুল হুদা : যদি সে না-জেনে নিজের ভেতর থেকে কবিতার মতো কিছু একটা বের করে আনতে পারে―তাহলে অবশ্যই তাকে আমি কবিতা বলব।

রনজু রাইম : যদি ছন্দ না থাকে―যদি তত্ত্ব না থাকে ?

মুহম্মদ নূরুল হুদা : ছন্দ কী ? ছন্দ তো ব্যাকরণ, ছান্দসিক যে সংজ্ঞা দিয়েছেন―সেটা একটা ছন্দ― অক্ষরবৃত্ত, স্বরবৃত্ত, মাত্রাবৃত্ত ছন্দ যেমন : আমি তো বলেছি, তার বাইরেও ছন্দ আছে। তার বাইরের ছন্দ জানতে হলে, নিরীক্ষা করে বের করতে হলে, এই ছন্দগুলো জানতে হবে। তবে যিনি এসব জানেন না, তার মধ্যে যদি পাঠের স্বতঃস্ফূর্ততা থাকে―তা হলে তিনি স্বয়ংক্রিয়ভাবে এগুলো বানিয়ে ফেলতে পারবেন। এ ধরনের কবির সংখ্যা পৃথিবীতে অসংখ্য―আবার কম। কম মানে, এভাবে সবাই কবিতা লেখে―তবে যারা এর মধ্যে থেকে সচেতন হয়ে পরিমার্জন করে তারা উল্লেখযোগ্য কবি হয়ে ওঠে। যেজন্য আমরা সম্পাদনার ওপর গুরুত্ব দিই। একটা স্বসম্পাদনা, আরেকটা বহিঃসম্পাদনা। যেকোনও ভালো লেখক, চিত্রশিল্পী একইসঙ্গে লেখক বা চিত্রশিল্পী, আবার একইসঙ্গে সম্পাদক।

রনজু রাইম : লেখার ভালোত্ব-মন্দত্ব বা মেজর পোয়েট, মাইনর পোয়েট―এই বিতর্কের মীমাংসা করবেন কীভাবে ?

মুহম্মদ নূরুল হুদা : কবিতাটা ভালো কি মন্দ এটা তোমাকে বুঝতে হবে। মেজর-মাইনরের কথা বাদ দাও।

 রনজু রাইম : কবিতাটি কি ভালো কি মন্দ―এটা কে নির্ধারণ করবে সমালোচক না পাঠক ?

মুহম্মদ নূরুল হুদা : পপুলার কবি কে―এটা নির্ধারণ করবে বৃহত্তম পাঠকসমাজ। আমাদের সমাজে দেখছি একদল সহজ সরলভাবে কবিতা লিখছে―মানুষকে মেসেজ দিচ্ছে― তাদের কেউ  কেউ পপুলার। এর পাশাপাশি আরেকদল আছে―সমস্ত কলাকৌশল জেনে বুঝে তারা কবিতা লিখছে―সাধারণ পাঠকের ভেতরে একটা খুব বেশি যাচ্ছে না। কিন্তু বোধসম্পন্ন পাঠক যখন পড়ছে― কলাকৈবল্যবাদের বিষয় শনাক্ত করছে― তখন সেই পাঠক মুগ্ধ হয়ে যাচ্ছে।

রনজু রাইম : কবিতার পাঠক কম কেন ? বাংলা কবিতার কথাই যদি বলি―বিশেষ করে কথাসাহিত্যের তুলনায় ?

মুহম্মদ নূরুল হুদা :  কবিতার পাঠক কম না। আমি যদি বলি…

রনজু রাইম : আপনি বাংলা একাডেমির মহাপরিচালকের দায়িত্বে আছেন। কিছুদিন পরে অমর একুশে বইমেলার আয়োজন করবেন। বইমেলা সামনে রেখে প্রকাশকেরা গল্প-উপন্যাস বা প্রবন্ধের বই প্রকাশের প্রস্তুতি নিলেও কবিতার বই প্রকাশে একেবারেই নারাজ। নবীন কবিদের কথা বাদ দিলেও, প্রতিষ্ঠিত প্রবীণদের বইও প্রকাশকেরা প্রকাশ করতে চান না।

মুহম্মদ নূরুল হুদা : নবীনদের মধ্যে নতুন আজগুবি কথা যারা বলতে পারে―এবং তাকে কবিতাবাচ্য করে যারা তুলতে পারে, তাদেরটা পড়ে। আর যদি না পড়ে―আমি বলব, যারা কবিতা লেখে―তারা অনেকেই কবিতা লেখে না―কবিতার মতো অ-কবিতা লেখে।

রনজু রাইম : প্রশ্নটা অন্য জায়গায়। কবিতার কদর কম কেন প্রকাশকদের কাছে―পাঠকের কাছে। বিশেষ করে কথাসাহিত্যের তুলনায়।

মুহম্মদ নূরুল হুদা : প্রথম কথা হলো, যৌন উত্তেজক রগরগে লেখা প্রকাশকেরা ছাপাতে বেশি আগ্রহী―কারণ এসব লেখার সাহিত্যমূল্য না থাকলেও পাঠক-আবেদন আছে। তা কবিতাই হোক বা উপন্যাসই হোক। পাঠক সহজ পাঠের দিকে যেতে চায়। গল্প-উপন্যাসে যে সহজ বিষয় আছে―কবিতায়ও আছে। কিন্তু কিছু কবিতা সহজ নয়। তা বুঝতে হলে কবিতার ভেতর ডুব দিতে হবে। ‘বল বীর/বল উন্নত মম শির/ শির নেহারি/ আমারি নত শির/ ওই শিখর হিমাদ্রির।’ অনেকে মনে করে সহজ, বুঝে ফেলেছে―কিন্তু বোঝা অত সহজ নয়।

রনজু রাইম : আমাদের দেশের সাহিত্যের মানদণ্ডে যে শিল্পরুচির প্রশ্ন―তাতে লেখক-পাঠকের বিস্তর ফারাক―আবার বৈচিত্রমণ্ডিতও। আবার কোনও সমকাল-রুচিও তৈরি হয়নি আমাদের সাহিত্যে। এই বিষয়টা সমর্থন করবেন কি ?

মুহম্মদ নূরুল হুদা : শক্তিমান লেখকেরা নিজের লেখার অবয়ব তৈরি করে পাঠককে তাতে টেনে নিয়ে যাবেন। সেই রুচিটা তাকে তৈরি করতে হবে। যেমন, একটা উদাহরণ―যত খারাপ বল না কেন―হুমায়ূন আহমেদ একটা পাঠক-রুচি তৈরি করেছেন।

রনজু রাইম : কারও কারও উপলব্ধি―হুমায়ূন আহমেদ পাঠকের রুচি নষ্ট করেছেন।

মুহম্মদ নূরুল হুদা : নষ্ট করেছেন বলব না। অন্য কারও নাম বলে ছোট করব না। ঢ ণ ত, তাদের বছরে যদি পাঁচশ উপন্যাস বিক্রি হয়, হুমায়ূন আহমেদের পাঁচ হাজার বিক্রি হচ্ছে। পার্থক্য হচ্ছে তিনি রুচির পাঠক তৈরি করতে পেরেছেন―আর আমি কঠিন লেখা লেখি―আমি আমার রুচির পাঠক তৈরি করতে পারিনি। এটা সবসময়ই কিন্তু তা-ই। রেনল বলে ইংরেজি সাহিত্যে একজন লেখক ছিলেন―তার বই হাজার হাজার কপি বিক্রি হতো, কই ডিকেন্সের বই তো হাজার হাজার কপি বিক্রি হয়নি।

রনজু রাইম : ডিকেন্সের বইও প্রচুর  বিক্রি হতো।

মুহম্মদ নূরুল হুদা : ওভার দ্য ইয়ার হতো, কিন্তু রেনলের মতো না। বাংলাদেশের আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের কথা ধরা যাক, তাঁর বই সারা বছর ধরে এখন অনেক বিক্রি হয়। এখন সায়েন্স ফিকশন যারা লিখেছেন―তাদের মতো কি বিক্রি হচ্ছে ?

রনজু রাইম : অনুবাদগ্রন্থও প্রচুর বিক্রি হচ্ছে।

মুহম্মদ নূরুল হুদা : হ্যাঁ, অনুবাদ বিক্রি হচ্ছে। ভালো অনুবাদ―খারাপ অনুবাদ নয়।

রনজু রাইম : অনুবাদের প্রসঙ্গ যেহেতু এসেছে তো বলি―বলা হয়ে থাকে যে, ‘চড়বঃৎু রং যিধঃ রং ষড়ংঃ রহ ঃৎধহংষধঃরড়হ …

মুহম্মদ নূরুল হুদা : তুমি তো আমার কবিতা নিয়ে, আমাকে নিয়ে একটা কথাও জানতে চাইলে না ?

রনজু রাইম : সেদিকেই যাচ্ছি। দু’-একটা বিষয় জানবার আছে― তারপর আপনার কবিতায় ঢুকব। কবিতা কি আসলেই অনুবাদে হারিয়ে যায় ?

মুহম্মদ নূরুল হুদা : তাত্ত্বিকেরা অনেক তত্ত্ব তৈরি করে কবিতাকে বিশ্লিষ্ট করতেন। এটা এরকমই একটা তত্ত্ব। কবিতা যদি অনুবাদেই হারিয়ে যাবে, তাহলে আমরা কেন অনুবাদ করছি। যিনি বলেছেন, তাকে কবিতার অনুবাদ করার অধিকার দিচ্ছেন কেন ? কবিতা অনুবাদ নয়―কবিতা এক মাধ্যম থেকে আরেক মাধ্যমে গেলে তার একটা পরিবর্তন ঘটে যায়―বাংলা ভাষা একটা মাধ্যম, ইংরেজি ভাষা আরেকটা মাধ্যম। কাজেই কবিতার অনুবাদ করার কোনও প্রয়োজন নেই। তুমি যদি গ্রিক কবিতা পড়তে চাও গ্রিক ভাষা শিখে নাও। সেটা যেহেতু সম্ভব হচ্ছে না। দুধের স্বাদ ঘোলে মেটাতে হবে।

রনজু রাইম : কবিতার কথা যদি বাদ দিই―বিশ্বসাহিত্যের অনেক কিছুই এদেশে বেসরকারিভাবে অনুবাদ হচ্ছে―বেস্টসেলার বইগুলো, কনটেম্পোরারি লিটারেচার―অনেক অনুবাদ হচ্ছে। পাঠকের চাহিদাও আছে―কাটতিও ভালো। বাংলা একাডেমি এক্ষেত্রে অনেক পিছিয়ে―বলব, নিয়মের বেড়াজালে আটকে আছে। অথচ প্রাতিষ্ঠানটির অনুবাদ-সাহিত্য বিভাগ অনেক গুরুদায়িত্ব পালন করতে পারে। এ ব্যাপারে আপনার কোনও পরিকল্পনা আছে কি ?

মুহম্মদ নূরুল হুদা : বাংলা একাডেমির ইতিহাসটা আমরা ভুলে গেছি। বাংলা একাডেমি যখন তৈরি হয়েছিল―প্রথম তিন-চারটা প্রকাশিত বই ইংরেজি ছিল এবং বৃহৎ প্রতিষ্ঠান হিসাবে গড়ে ওঠার আগে তৎকালে সবচেয়ে বেশি বই প্রকাশ করেছে বাংলা একাডেমি। তখন কিন্তু আমরা দেখেছি, পাঁচ শতাধিক বই―যা আমরা আগেই অনুবাদ করে ফেলেছি। পূর্ব পাকিস্তানের কোথাও কিন্তু এমনটা ছিল না। এর মধ্যে জরথুস্ত্র এর মতো বই আছে। দর্শন এবং বিচিত্র বিষয়, পাশ্চাত্য পুরান, গ্রিক মিথোলজি আছে। আরব্য রজনীর গল্পগুলো আছে। এসব বাংলা একাডেমি থেকে অনুবাদ হয়েছে।

রনজু রাইম : এটা কি পাকিস্তান পিরিয়ডের কথা বলছেন।

মুহম্মদ নূরুল হুদা : পাকিস্তান আমল থেকে শুরু করে বাংলাদেশের আমলে শুরুর দিকে পৃথিবীর ক্লাসিক গ্রন্থগুলো অনুবাদ করে নিয়ে আসা হয়েছে।

রনজু রাইম  : অনুবাদের সেই গতিটা এখন স্তিমিত কেন ?

মুহম্মদ নূরুল হুদা : গতি থাকবে না। গতি না থাকার অনেকগুলো কারণ আছে। শাহনামা কে অনুবাদ করেছিলেন ?

রনজুু রাইম : মনির উদ্দিন ইউসুফ।

মুহম্মদ নূরুল হুদা : সতেরো বছর ধরে তিনি এই অনুবাদ কর্মটি করেছিলেন। এই কাজগুলো তারা করে অনুবাদ বিভাগটিকে প্রতিষ্ঠিত করে গিয়েছেন। অনুবাদ করার যোগ্যতা সেই সময় এদের সকলের ছিল।

রনজু রাইম :  এখন কারও নাই বলতে চাচ্ছেন ?

মুহম্মদ নূরুল হুদা : কথা শোনো। মনির উদ্দিন ইউসুফ, তিনি আরবি জানতেন, ফারসি জানতেন। অনুবাদ করতে হলে তো মূলভাষাটা ভালোভাবে জানতে হবে, সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী ইংরেজি ভালো জানেন, গ্রিক ফরাসি জানলে হয়তো সামান্য জানেন। এছাড়া বাংলা গদ্যটাও তারা ভালো জানতেন। বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের পর বাংলা একাডেমির পাশাপাশি বাংলাবাজারের প্রকাশকেরা অনুবাদের বই প্রকাশ করতে শুরু করল। আমি চ্যালেঞ্জ দিয়ে বলছি, বাংলাবাজারের যে অনুবাদের বইগুলো―সেগুলো হয়তো কলকাতা থেকে প্রকাশিত অনূদিত বইয়ের নকল, নয়তো একেবারে ভুল গদ্যে ভুলবাক্যে প্রকাশ করা। তখন আমরা বলতাম ‘বাংরেজি’। বাংলা একাডেমিতেও আছে, বাংলা একাডেমিতে পরবর্তী পর্যায়ে যেসব অনুবাদগ্রন্থ প্রকাশিত হতে শুরু করল, সেখানে দেখা গেল বাংলা বাক্য আর ইংরেজি বাক্য এক নয়। অর্থ বোঝা গেলেও তা মূল ইংরেজি বাক্য বা গ্রিক বাক্যের অনুসরণে তৈরি হয়নি।

রনজু রাইম : বাংলা একাডেমি ভালো অনুবাদক অনুসন্ধান না-করে নিশ্চয় যাকে তাকে দিয়ে অনুবাদ করিয়েছে।

মুহম্মদ নূরুল হুদা : এখনও পর্যন্ত বাংলা একাডেমিতে অনুবাদ চলছে―কিন্তু সেটা প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে। যদি তুমি ধ্রুপদী লেখকের বই অনুবাদ কর, শেক্সপিয়ারের বই অনুবাদ করলে তোমার কোনও পারমিশন লাগবে না। কিন্তু যখনই বর্তমান সময়ের বড় কোনও লেখকের এর বই অনুবাদ করতে যাবে, তখনই লেখকের এবং পাবলিশারের পারমিশন লাগবে। বাকি যারা করছে―তারা নিয়ম বহির্ভূতভাবে, কপিরাইট আইন না মেনে করছে―আমি চ্যালেঞ্জ করছি।

রনজু রাইম : তার মানে বাংলাবাজারের প্রকাশকেরা কপিরাইট আইন লঙ্ঘন করে বই অনুবাদ করতে পারলেও বাংলা একাডেমি পারে না―এটা সত্য। অনুমতি নিয়ে অনুবাদ করতে বাংলা একাডেমির অসুবিধা কোথায় ?

মুহম্মদ নূরুল হুদা : বাংলা একাডেমির পাঠ্যপুস্তক বিভাগ মূল লেখক ও প্রকাশকের সঙ্গে চুক্তি করে এরকম কিছু বই প্রকাশ করেছে।

রনজু রাইম : কিন্তু তা অপ্রতুল―যথেষ্ট নয়।

মুহম্মদ নূরুল হুদা : যথেষ্ট তো কখনও হবে না। একটা প্রতিষ্ঠানের পক্ষে কাজ করা কখনও সম্ভব হবে না। বাংলা একাডেমির বই যথেষ্ট না হলে যথেষ্ট আর কে করেছে। বাংলা একাডেমি তো শুধু অনুবাদ করবে না, অন্য কাজও করবে। আমি বলছি, অনুবাদ করতে গিয়ে বাংলা একাডেমির অপূর্ণতা সীমাবদ্ধতা, বহুকিছু আছে।

রনজু রাইম : গত পাঁচ বছরে বাংলা একাডেমি উল্লেখযোগ্য কী কী অনুবাদ করেছে―যখন সত্যিকার অর্থে অনুবাদ সাহিত্যের প্রতি দেশের পাঠকদের বিস্তর আগ্রহ। এও সত্য যে, সব পাঠক তো আর বিদেশি ভাষা শিখে সেই ভাষায় সাহিত্য পাঠ করতে পারবে না। কনটেম্পোরারি লেখকদের কী কী বেস্টসেলার বই গত পাঁচ বছরে বাংলা একাডেমি অনুবাদ করেছে।

মুহম্মদ নূরুল হুদা : কনটেম্পোরারি বই অনুবাদ করা যাবে না। বাংলাদেশে কপিরাইট আইন মারাত্মকভাবে অনুসরণ করা হচ্ছে। বাংলা একাডেমি কপিরাইট মানে বলেই বিদেশি বই অনুবাদ ও প্রকাশে সতর্ক ও দায়িত্বশীল। এটা থেকে উঠে আসতে হলে, অনুবাদ সেল, অনুবাদ একাডেমি না হোক, অনুবাদ ইনস্টিটিউট গঠন করতে হবে। যে ইনস্টিটিউট শুধু এই কাজটি করবে―অন্য কাজ করবে না।

রনজু রাইম : বাংলা একাডেমি বইমেলা আয়োজন করে। মেলায় অংশগ্রহণে প্রকাশকেরা বাংলা একাডেমির শর্তবন্দি। আপনার কি মনে হয় যে, প্রকাশক অভ্যন্তরীণভাবে কপিরাইট আইন যথাযথভাবে মানছে―বিশেষভাবে লেখক-প্রকাশকের চুক্তির বিষয়ে। নাকি শুধু কাগজেই আছে।

মুহম্মদ নূরুল হুদা : আগে কাগজেও ছিল না। আদি প্রকাশনা সংস্থা―‘মুক্তধারা’র চিত্তরঞ্জন সাহা, যত বই প্রকাশিত হয়েছে―সবগুলোর চুক্তি সম্পাদিত হয়েছে। আহমদ পাবলিশিংও করেছে। ইউপিএল চুক্তিপত্রের মাধ্যমে বই প্রকাশ করত। ১৯৯৯ সালে সরকারিভাবে লেখকদের বই কেনা শুরু হয়। বই কেনা কমিটিতে আমিও ছিলাম। বললাম, লেখকদের বই কিনতে হলে লেখকদের সঙ্গে প্রকাশকদের চুক্তি থাকতে হবে। সেই থেকে এই চুক্তি করার প্রক্রিয়াটা চালু হয়েছে। কিন্তু আমি তোমার সঙ্গে একমত এই চুক্তিটা আসলে কাগজে-কলমে চুক্তি হয়ে থাকছে। এখনও পর্যন্ত এটাকে বাস্তবায়ন করা যায়নি।

রনজু রাইম : বইমেলায় অংশগ্রহণকারী প্রকাশকেরা তো এক ধরনের বাধ্যবাধকতার মধ্যে আছে―যেহেতু শর্তবন্দি হয়ে তাদের মেলায় অংশগ্রহণ করতে হয়। বইমেলার আয়োজক প্রতিষ্ঠান হিসেবে কি বাংলা একাডেমি কপিরাইট আইনের বাস্তবায়নে চাপ প্রয়োগ করতে পারে না ?

মুহম্মদ নূরুল হুদা : কপিরাইট বোর্ডকে দায়িত্ব দেওয়া আছে যে বইমেলায় যেসব প্রতিষ্ঠান অংশ নিচ্ছে, সেইসব  প্রতিষ্ঠান থেকে প্রকাশিত বইগুলো কপিরাইট আইনের আলোকে প্রকাশিত হচ্ছে কি-না। অধিকাংশ বই তো প্রকাশক বের করে না―লেখক নিজেই বের করে। আবার অধিকাংশ বই তো কবিতার বই, যে বইগুলো লেখক প্রশান্তির জন্য বের করেন, নিজের পয়সা খরচ করে―প্রকাশক বের করেন না।

রনজু রাইম : এটা আলাদা বিষয়…

মুহম্মদ নূরুল হুদা : আলাদা বিষয় না। এটার সঙ্গে যুক্ত তাদের স্বার্থ। তাই কপিরাইট লঙ্ঘন হচ্ছে কি হচ্ছে না, এটা তাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ নয়।

রনজু রাইম  : লেখক গাঁটের পয়সা খরচ করে বই প্রকাশ করছে নাকি প্রকাশক লেখককে বাধ্য করছে পয়সা খরচ করে বই প্রকাশ করতে।

মুহম্মদ নূরুল হুদা : প্রকাশক বাধ্য করেনি, প্রকাশক লেখককে বলছে―টাকা দিলে বই ছাপব, না দিলে ছাপব না।

রনজু রাইম : এই কথা বলার এক্তিয়ার প্রকাশকের আছে কি-না ?

মুহম্মদ নূরুল হুদা :  হ্যাঁ, আছে। কারণ লেখকের সঙ্গে প্রকাশকের যে চুক্তি হবে―সেই চুক্তির শর্ত কী হবে কপিরাইট আইনে কিন্তু বলা নাই। কপিরাইট আইন বলছে, লেখক-প্রকাশক মিলে চুক্তি করবে, সেই চুক্তিতে এটা চলবে। আর লেখক বলছে আমি পয়সা দেব, তুমি বই ছেপে বিক্রি করবে, আমি কোনও পয়সা নেব না।

রনজু রাইম : যদি এই ধরনের প্রবণতা অব্যাহত থাকে, তা হলে এটা কি প্রকাশনা শিল্পের জন্য ভালো না খারাপ ?

মুহম্মদ নূরুল হুদা : একেবারে খারাপ। বাংলাদেশের প্রকাশনা শিল্প এজন্যই তো দাঁড়াচ্ছে না। প্রকাশনা শিল্পের দুরবস্থার জন্য সমস্ত বাংলাদেশ দায়ী,  লেখক-প্রকাশকেরা দায়ী, বাংলা একাডেমি দায়ী না।

রনজু রাইম : প্রকাশনাকে আপনি শিল্প বলছেন―এটা কি এখন পর্যন্ত শিল্প হয়ে উঠেছে?

মুহম্মদ নূরুল হুদা : প্রকাশনাকে শিল্পে রূপান্তর করতে হবে। তা না হলে প্রকাশনা শিল্পের দুরবস্থা ঘুচবে না।

রনজু রাইম : প্রকাশনাকে শিল্পে রূপান্তর করতে হলে আর কী কী শর্ত আরোপ করতে হবে ?

মুহম্মদ নূরুল হুদা : শিল্প হতে হলে বৈধতার ভেতর চলে আসতে হবে। আনুষ্ঠানিকতা এবং পেশাদারিত্বের ভেতরে যেতে হবে। যে কোনো প্রকাশনী থেকে বই প্রকাশ হোক না কেন, আগে দেখতে হবে বইটা প্রকাশযোগ্য কি-না।

রনজু রাইম : বা, অন্য কোনও বই থেকে কাটপেস্ট কি-না…  নকল কি-না …

মুহম্মদ নূরুল হুদা : হ্যাঁ, নকল কি-না, এটা নিশ্চিত করতে হবে। বাংলাদেশের কোনও প্রকাশক এটা করেছে ?

রনজু রাইম : কোনও এডিটিং বা এডিটরিয়াল বোর্ডও তো নেই।

মুহম্মদ নূরুল হুদা : না, নেই। আছে, বাংলা একাডেমি, শিশু একাডেমি, জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, শিল্পকলা একাডেমিসহ কিছু প্রতিষ্ঠানের।

রনজু রাইম : রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলি যেখানে এসব নীতিমালা নিশ্চিত করছে―সেখানে রাষ্ট্রের মধ্যে থেকে প্রকাশকদের মনিটরিং এর মধ্যে আনা যাচ্ছে না কেন ?

মুহম্মদ নূরুল হুদা : নীতিমালার বাস্তবায়ন দরকার। আমাদের কিন্তু অনেক আছে―আইনের বাস্তবায়ন নেই। কপিরাইট আইন আছে―কপিরাইট আইনের ওইভাবে প্রয়োগ নাই। আর বইনীতি দরকার। বইনীতি বহুবার হয়েছে, কিন্তু ওভাবে বাস্তবায়ন করেনি।

রনজু রাইম : আপনি ষাট দশকের কবি। ষাটের কবিরা আর্লি ষাট, লেট ষাট এই দুই অংশে পরিচিত। আপনি কোন অংশের। যদ্দুর জানি, আপনার প্রথম কাব্যগ্রন্থ, শোণিতে সমুদ্রপাত প্রকাশিত হয় ১৯৭২ সালে। তা হলে আপনি ষাটের কবি হলেন কী করে ?

মুহম্মদ নূরুল হুদা : কবিতার বই কখন প্রকাশিত হলো সেটা বড় কথা না, বড় কথা হলো তুমি কবি হিসাবে কখন শনাক্ত হলে।

রনজু রাইম : প্রথম প্রকাশিত বই ছাড়া, আপনি নিজেকে আপনার সময়ে কীভাবে শনাক্ত করবেন একজন কবি হিসাবে। আপনি যে ষাটের দশকের কবি সেটা দৃশ্যমান হয়েছে কীভাবে ?

মুহম্মদ নূরুল হুদা : দৃশ্যমান হয়েছে, পঞ্চাশ বা ষাটের দশকের কবি যখন বলি, তখন দেখি সেই সময়ে একজন কবির শনাক্তযোগ্য কবিতা প্রকাশিত হয়েছে কি-না। আগে তো সাহিত্যের জন্য সাহিত্য পত্রিকাগুলো একটা মাপকাঠি ছিল। এখন তো আর সেরকম নেই। সাহিত্য পত্রিকার মান নেই, আবার ফেসবুক লেখা প্রকাশের মাধ্যম হয়েছে। এগুলো এখন আর শনাক্তযোগ্য শক্তিশালী মাধ্যম নয়। কিন্তু আমি ১৯৬৫ সালে ঢাকায় আসি, ১৯৬৬ সালে আমার কবিতা সংবাদ সাহিত্য সাময়িকীতে প্রথম প্রকাশিত হয়। সংবাদ সাহিত্য সমায়িকীতে তখন কিন্তু একটা কবিতা প্রকাশিত হওয়া বিরাট ব্যাপার।

রনজু রাইম : ঐতিহ্যবাহী একটি পত্রিকা।

মুহম্মদ নূরুল হুদা : আরেকটি ব্যাপার, তুমি তো জানো না―তখন সাহিত্য-পাতার সম্পাদক কে ছিলেন ?

রনজু রাইম : জানি,  রণেশ দাশগুপ্ত।

মুহম্মদ নূরুল হুদা : হ্যাঁ, রণেশ দাশগুপ্ত ও শহীদুল্লাহ কায়সার, দুজনে মিলে সাহিত্য পাতা সম্পাদনা করতেন। আর দৈনিক পাকিস্তান ছিল, পরবর্তীকালে দৈনিক বাংলা নামে প্রকাশিত হয়েছিল। তার সম্পাদক ছিলেন আহসান হাবীব। আহসান হাবীব তার সম্পাদিত দৈনিক বাংলা সাহিত্য সাময়িকীতে আমার কবিতা ছাপালেন সেই সময়। আহসান হাবীব কারও কবিতা ছাপলে বলা হতো, তিনি ভালো মানের কবিতা লেখেন। ষাটের দশকে আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের সম্পাদনায় কণ্ঠস্বর প্রকাশিত হতো। সেই পত্রিকার প্রথম সংখ্যার প্রথম কবির নাম মুহম্মদ নূরুল হুদা। ফলে আমাকে আর পিছনে ফিরে তাকাতে হলো না। এইভাবে মহাদেব সাহা, নির্মলেন্দু গুণ শনাক্তকরণের মাধ্যমে ষাটের দশকে অবস্থান সুদৃঢ় করলেন। তা ছাড়া, ষাটের দশকের অধিকাংশ কবির বই কিন্তু সত্তর দশকে এসে প্রকাশিত হয়েছে। সত্তর মানে একাত্তরের পরবর্তীকালে। ১৯৭০ থেকে সত্তর শুরু, ১৯৬৯ পর্যন্ত ষাট। ১৯৬৯ পর্যন্ত আমার অজস্র কবিতা প্রকাশিত হয়েছে। সেই সময় বিভিন্ন পত্রিকায় আমরা কবিতা লিখতাম। আরেকটি কথা বলি, আমার সময়ের কবি ছিলেন খোন্দকার আশরাফ হোসেন, কিন্তু তার কবিতা অনেক পরে প্রকাশিত হয়, আশির দশকের মাঝামাঝি অর্থাৎ আশির দশকে তিনি নিজেকে শনাক্ত করতে পেরেছেন তাই তাকে আশির দশকের কবি বলা হয়।

রনজু রাইম : তা হলে আপনি বলছেন, নানাভাবে শনাক্ত হওয়া যায়। খোন্দকার আশরাফ হোসেন তার বই দিয়ে শনাক্ত হয়েছেন। আর আপনি আপনার প্রকাশিত কবিতা দিয়ে শনাক্ত হয়েছেন।

মুহম্মদ নূরুল হুদা : বই প্রকাশিত হওয়ার পর শনাক্ত হতে তিন, চার, পাঁচ, দশ বছর সময় লাগে। রফিক আজাদ কিন্তু প্রথম ষাটের কবি। তার প্রথম বই প্রকাশিত হয় আমার বই প্রকাশিত হওয়ার অনেক পরে। ১৯৭৫ সালে। আমার তো বাহাত্তর সালে প্রথম বই প্রকাশিত হয়েছে। পঁচাত্তরের মধ্যে আমার তিন-চারটা কবিতার বই প্রকাশিত হয়েছে।

রনজু রাইম : পঁচাত্তর সালে তো আপনার কবিতার বই আমার সশ্রস্ত্র শব্দেরা, শুভযাত্রা দ্রাবিড়ার প্রতি প্রকাশিত হয়েছে।

মুহম্মদ নূরুল হুদা : হ্যাঁ, এই বইগুলো বেরিয়েছে সেই সময়।

রনজু রাইম : সময়কে যদি আপনি আলাদা না করবেন, তবে দশককে আলাদা করছেন কী কারণে ?

মুহম্মদ নূরুল হুদা : দশককে আলাদা করছি, আমরা যেমন জায়গাকে আলাদা করি, ঘরকে আলাদা করি, দেশকে আলাদা করি, দেশকে ভাগ করার দরকার কি, পৃথিবী।

রনজু রাইম : আপনি যেটা, আপনার কবিতায় বলেছেন―‘যতদূর বাংলা ভাষা, ততদূর এই বাংলাদেশ।’ ‘দারিয়ানগরে জন্ম, পৃথিবীর সব প্রান্ত আমার স্বদেশ।’

মুহম্মদ নূরুল হুদা : আমি দারিয়ানগরে জন্ম নিয়েছি। পৃথিবীর সব প্রান্ত আমার স্বদেশ।

রনজু রাইম : আপনি তো আলেকজান্ডারের মতো বলছেন …

মুহম্মদ নূরুল হুদা : হ্যাঁ, মানুষ তো আলেকজান্ডার। মানুষ তো বিশ্বজয়ী। নিজেকে স্বীকার করবে পৃথিবীর সব জায়গায় নিজের অস্তিত্ব ঘোষণা করবে।

রনজু রাইম : তাহলে কাঁটাতার কেন, ভৌগোলিক সীমারেখা কেন ?

মুহম্মদ নূরুল হুদা : প্রয়োজন নেই। সীমানা ছিল, সীমানা আছে, সীমানা গেল কোথায় ? সীমানা গেল মাথায়। আমরা মাথা দিয়ে সীমানা তৈরি করি।

রনজু রাইম : একাত্তরে রক্ত দিলাম আমরা, স্বাধীনতা সার্বভৌমত্বের জন্য―সীমানা যদি না-ই থাকবে তাহলে এতকিছু কেন ?

মুহম্মদ নূরুল হুদা : একাত্তরে রক্ত দিয়েছিলাম, কারণ আমাদের অস্তিত্বকে অস্বীকার করা হয়েছিল। আমি যে আমি, এই আমিত্বকে অস্বীকার করা হয়েছিল। বলা হয়েছিল যে, তুমি তুমি নও। এক এবং সমষ্টি ধারণ করি, তুমি পাঠান কি আর্য-অনার্য যা-ই হও, এটা বড় কিছু না। আমি দ্রাবিড় হই, দ্রাবিড় তো আর্যের ভেতরে আছে, আর্য দ্রাবিড়ের ভেতরে আছে। গঙ্গা, ইয়াংসিতে পার্থক্য কী ? এটা কাব্যিক বলব না, একটা সামষ্টিক ঐক্যের কথা আমরা ভাবতে পারি, বিশেষ করে একবিংশ শতাব্দীতে এসে। আমি তো পৃথিবী-রাষ্ট্রের কথা বলি। জাতিরাষ্ট্র হওয়ার পরে বিশ্বরাষ্ট্র হয়ে যাক।

রনজু রাইম : বিশ্বগ্রাম, ভুবনডাঙ্গা, গ্লোবালাইজেশন যা-ই বলি না কেন―কথা একই। এটা কি শুধু চেতনা বা ভাবনায় নাকি বাস্তবে রূপ নেবে কখনও।

মুহম্মদ নূরুল হুদা :  হ্যাঁ, নেবে। যেমন বাস্তবে রূপ নিয়েছিল বাংলাদেশ।

রনজু রাইম : তাহলে আমাদের এত ডিসক্রিমিনেশন কেন, বিশেষ করে উন্নত দেশগুলোর সঙ্গে… এসডিজি, এমডিজি আমাদের অর্জন করতে হচ্ছে। আপনার কথামতো আমরা যদি এক বিশ্বরাষ্ট্রের বাসিন্দা হই, তা হলে সবকিছুর প্রাপ্তি এত কষ্টকর কেন ?

মুহম্মদ নূরুল হুদা : এটা এত সহজ নয়। এসডিজি আমরা যে সময় পাচ্ছি, আমরা ক্যালকুলেটিভ ওয়েতে যাচ্ছি বলেই পাচ্ছি। তা না হলে আরও অনেক সময় লেগে যেত। আমরা এখন যে অবস্থায় আছি আমাদের পূর্বপুরুষেরা এই উন্নয়ন দেখে যেতে পারেননি। আমরাও থাকব না। একশ কি দেড়শ বছর পরে বাংলাদেশ পৃথিবীর সব রাষ্ট্রের সঙ্গে মিলে ঐক্যবদ্ধভাবে একটা বিশ্বরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে পারে।

রনজু রাইম : এটা কি আদৌ সম্ভব ?

মুহম্মদ নূরুল হুদা : এটা কবির চিত্তেই সম্ভব। ‘মেলাবে মিলিবে যাবে না ফিরে/এই ভারতের মহামানবের সাগরতীরে।’ এই বাংলার মহামানবের সাগরতীরে। ধরা যাক, মিশরের মহামানবের সাগরতীরে। এই ঐক্য তৈরি হতে পারে। মানুষকে যদি মানুষ হিসাবে বেঁচে থাকতে হয়, তাহলে ঐক্যের শক্তিতেই বেঁচে থাকতে হবে।

রনজু রাইম : এত সংঘাত, এত বিভেদ কেন―মানুষে-মানুষে, রাষ্ট্রে- রাষ্ট্রে, ধর্মে-ধর্মে ?

মুহম্মদ নূরুল হুদা : ক্ষমতা ও সম্পদ আহরণের কারণে এই বিভেদ তৈরি হচ্ছে। আগে মানুষ আলেকজান্ডারের কথা বলত। এখন কৃষকের ভেতরেও এই দ্বন্দ্বটা আছে। আমি বড় কৃষক তুমি ছোট কৃষক। গুড আর্থ উপন্যাসে ‘ওয়াং উ’ এর চরিত্র দেখলেই বোঝা যাবে, সে কোথা থেকে এসে কী হয়ে গেল। এটা মানুষের একটা প্রবণতা। মানুষকে এই বিধ্বংসী অবস্থা থেকে বেরিয়ে এসে প্রাণের সাম্য প্রতিষ্ঠা করতে হবে। গরু এবং গাধা থেকে নিজেদের আলাদা করতে হবে।

রনজু রাইম : ষাটের দশকে যে উত্তাল সময়ে আপনি বাংলা কবিতার ভুবনে আত্ম-উন্মোচন করেছিলেন―সেই সময়ের রাজনীতি, স্বাধিকার ও স্বাধীনতা আন্দোলনের কারণে কবিতায় যে দ্রোহ, প্রতিবাদ, উচ্চস্বর ও স্লোগান-মুখরতা লক্ষ্য করা যায়―আপনার কবিতা ঠিক সে রকম নয়। আপনার কবিতা স্নিগ্ধ, নিটোল ও নান্দনিক আবহে পরিপূর্ণ―ঠিক যেন সন্তের মতো নিভৃতচারী। ষাট দশক যদি একটা উত্তাল নদী হয়―তাহলে আর সবাই একপাড়ে দাঁড়িয়ে, কিন্তু আপনি অন্য পাড়ে। ফলে আপনাকে খুব সহজেই চেনা যায় আপনার সমকাল দিয়ে―এই নির্লিপ্ততার নেপথ্য কারণ কী  ?

মুহম্মদ নূরুল হুদা : কবিতাকে আমি কখনও জোছনা থেকে আলাদা করি না। নদীর হিমশীতল প্রবাহ, বিকেলের স্নিগ্ধ আলো থেকে আলাদা করি না। ফলে যে কাব্যিক স্নিগ্ধতা―তা আমার শরীরে ও মনে সতত বিরাজমান―কবিতায় তো বটেই। পাশাপাশি, যে সমাজে আমি বাস করছি উথাল-পাথাল অবস্থার সঙ্গে আমি ঐক্য গড়ে নিয়েছি। ফলে এক ধরনের যৌগিক কবিসত্তা আমার মধ্যে তৈরি হয়েছিল। এই বিষয়টা আমি সচেতনভাবে উপলব্ধি করেছি। যা বলব, তা যে ভালো করে সুন্দর করে মানুষের মনের ভেতরে গেঁথে যায়―কবিতায় এমন করে বলা উচিত। যদি চিৎকার করি, চিৎকারেরও একটা নান্দনিক ভাষা থাকতে পারে। তার ভেতরে অর্থেরও একাধিক অর্থ প্রদান করা যেতে পারে। যেটাকে আমরা বলি অবংঃযবঃরপ উরাবৎংরঃু অর্থাৎ নান্দনিক বৈচিত্র্য। এর জন্য আমরা প্রথমে কবিতার বই থেকে এ পর্যন্ত সকল বইতে তুমি দেখবে, ছন্দ, অলঙ্কার, নান্দনিকতা, কলাকৈবল্যবাদ জযবঃড়ৎরপং এর ব্যাপারগুলো, এমনকী কিংবদন্তি ও মিথের ব্যবহার রয়েছে। এ কারণে, তুমি যেটা বলছ, আমার কবিতায় স্নিগ্ধতা আছে।

রনজু রাইম : সময় কবিতাকে কিংবা কবিতা সময়কে পরিপূর্ণভাবে আন্দোলিত করে―কিন্তু আপনার কবিতায় এই বিষয়টা খুব দৃশ্যমান না হলেও যে বিষয়টা স্পষ্ট তা হলো চড়ংংরঃরাবহবংং, সবসময় আপনার সব কবিতার বেলায় এই বিষয়টা লক্ষ্য করা যায়। কোনও ঘবমধঃরারঃু নাই, এমনটা কি করে সম্ভব হলো―

মুহম্মদ নূরুল হুদা : তোমার এই প্রশ্নের উত্তরে আমি বলব, মানুষ অনেক কিছু হারিয়েছে―কিন্তু অর্জন করেছে সভ্যতার অগ্রযাত্রা। শেষ পর্যন্ত মানুষকে টিকে থাকতে হবে। ট্র্যাজিক জীবনযাপন করেও একটি ইতিবাচকতার মধ্যে মানুষ চলছে। হাজার বছর ধরে আমি পথ হাঁটছি―কিন্তু আমি তো একা হাঁটছি না, আমার সঙ্গে সবাই হাঁটছে। কাজেই একটা ট্র্যাজিক সেন্স সত্ত্বেও মানুষের মধ্যে একটা ইতিবাচকতা সবসময় আছে।

রনজু রাইম : পঁচাত্তরে আপনার দুটি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে―আমার সশস্ত্র শব্দবাহিনী। আমার সশস্ত্র শব্দবাহিনী তে কিছু ননসেন্স কবিতা আছে। ধনাত্মক কবিতা আছে। ওই সময়ে এই ধরনের কবিতা রচনার বিশেষ কোনও কারণ আছে কি ?

মুহম্মদ নূরুল হুদা : আমরা না জেনেই অনেক সময় অনেক কিছু করি। তারপর যখন বুঝে ফেলি তখন সেখান থেকে আমরা শিক্ষা নিই। যেমন তুমি ননসেন্স কবিতার কথা বললে।

রনজু রাইম : সুকুমার রায়ের ‘আবোল তাবোল’ ঠিক যেমন …

মুহম্মদ নূরুল হুদা : হ্যাঁ। যেমন আমি লিখেছি ‘হৈ হৈ  হৈ হৈ  হৈ হৈ/গ্রহ থেকে উপগ্রহ গলগ্রহ মই/ ল্যাংমারে তৈমুরেরা, ক্রাচ গেল কই।’Ñএইসবের মধ্যে ঝংকার আছে। উদ্ভট চিন্তা যেমন আছে―আবার সমাধানও আছে। ল্যাং মারার সঙ্গে অবলম্বন ‘ক্রাচ’ এর কথা বলেছি। আমি মানে কবি যে, সভ্যতার অগ্রগতির মানেই সভ্যতার ইতিবাচকতা। কবিতার অগ্রগতি মানেই, কবিতার ইতিবাচকতা।

রনজু রাইম : পঁচাত্তর পরবর্তীকালে চড়াই-উতরাই, ইতিহাস বিকৃতি, সামরিক শাসনকালে আবদ্ধ সময়―আমাদের প্রাপ্তির চেয়ে অপ্রাপ্তি অনেক বেশি―সেই সময় আমাদের সর্বপ্রকার স্বাধীনতা খর্ব হয়েছে। ১৯৮২ সালে প্রকাশিত, শুক্লাশকুন্তলা কাব্যে আপনি পুরাণে ডুব দিয়েছেন। এই কাব্যের সনেটে পুরাণ আশ্রয়ী হতে গেলেন কেন―কোনও বিশেষ কারণ আছে কি ?

মুহম্মদ নূরুল হুদা : তখন আধুনিকতা পেরিয়ে উত্তরাধুনিকতার দিকে যাচ্ছে বাংলা কবিতা। এখন আর এই তত্ত্বের আলোকে কবিতা লেখা হয় না। এখন মৌলাধুনিকতার কথা বলি। এরপর আরও অনেক আধুনিকতা সুরত পাল্টাবে। আগের যে সত্য সেটা একালেও সত্য বলে অবির্ভূত হতে পারে। এটা বলা হয়ে থাকে যে, জবারঃধৎরুধঃরড়হ ড়ভ গুঃয আমি যদি লোকজ অস্তিত্বের ভেতর যাই―তবে আমাকে আগের কথা বলতে হবে, তাকে এনে এই সময়ে প্রাসঙ্গিক করতে হবে। ‘দেখা হলে দক্ষিণের কণ¦ তপোবনে/ তুমি কি দুষ্মন্ত তবে, নাকি দুশমন।’ আমি পুরাণকে নতুন করে নির্মাণ করে আমার সময়ের কথা বলছি। এটা শকুন্তলা না, এর নাম ‘শুক্লাশকুন্তলা’, শুক্লা মানে আলোকিত পূর্ণিমায় উদ্ভাসিত। শুক্লা নামে এক মহিলার সঙ্গে আমার পরিচয় হয়েছিল। ‘এ দেশে শ্যামল রং রমণীর সুনাম শুনেছি।’ Ñওমর আলী। এরকম এক রমণীকে আমি দেখে তাকিয়ে আছি―বলেছি, আমি তো  দুষ্মন্ত হয়ে এসেছি―তুমি কি দুশমন মনে করছ ? দুষ্মন্ত-শকুন্তলার কাহিনি যেমন, ঠিক তেমনি ‘শুক্লা-শকুন্তলা’র কাহিনি এক হাজার দেড় হাজার বছর পরে সংগঠিত হচ্ছে। বোধের ব্যাপারে এক, প্রকরণ আরেক। এই বইয়ে আমি লিখেছি―‘বিনাশ্রমে লব্ধ ধন আদপেই চুরি।’ অর্থাৎ ক্যাসিনো, ঘুষ-দুর্নীতি―যে সমাজকে কুলষিত করছে, তুমি সেখান থেকে বেরিয়ে আস। মিথের নবায়ন―আধুনিকতার নিরিখে।

রনজু রাইম :  ‘আমরা তামাটে জাতি’ এই কাব্য কবিতার জন্য আপনাকে জাতিসত্তার কবি বলা হয়। বিষয়টাকে বিশদে বলবেন কি ?

মুহম্মদ নূরুল হুদা : সত্তা একজন কবির কাছ থেকে পেয়েছি। সত্তা মানে ঊংংবহপব তুমি আমি যে বসে আছি―এই বসে থাকা যে সত্য―এটাই সত্তা। জাতিসত্তা মানে একটা জাতির থাকা। জাতি, পরিবার, ব্যক্তির থাকার মধ্যে জাতিসত্তা নিহিত। সমরূপতার নিরিখে জাতিসত্তা নির্ণীত হয়। উপজাতি বা আদিবাসীও আছে। ষাটের দশকের উত্তাল সময়ে যে আন্দোলন―সেটাকে আমরা সমরূপ মানুষের আন্দোলন বলি, সেটা হচ্ছে―বাঙালির আন্দোলন। গায়ের রং শ্যামলা, আমি তামাটেই বলি। কালো মানুষের পিঠে রোদ পড়লে তামাটে দেখায়। এটা সুলতানও দেখেছিল।

রনজু রাইম : আমরা বাঙালিরা ‘হিউম্যান বিয়িং’ আমরা কতখানি ‘বিয়িং হিউম্যান’। কবিতায় কী মেসেজ দিতে চাই আমরা ?

মুহম্মদ নূরুল হুদা : কবিতায় বলতে চাই―আমি আছি। অস্তিত্বের জানান দিতে চাই। তুমিও আছ। ঝবষভ ধহফ ড়ঃযবৎ এ দুটোর কম্বিনেশনে। জাতিসত্তা না থাকলে আন্তর্জাতিকতা ‘সোনার পাথর বাটি’।

রনজু রাইম : প্রথম  কাব্য থেকে এ পর্যন্ত―সবসময় সচল একজন কবি আপনি, এটাই আমার পর্যবেক্ষণ। আপনার দীর্ঘ কাব্যযাত্রার কোথায় কোথায় বাঁক নিয়েছে বলে আপনি মনে করেন ?

মুহম্মদ নূরুল হুদা : কাব্যযাত্রার বোধে বাঁক নিয়েছে। নদীর মতো মানুষ সবসময় বাঁক নেয়। পৃথিবীর কোনও রেখাই সরল নয়। মানুষ বাঁক নেয়, তার চিন্তাও বাঁক নেয়। এটাই ডায়লেক্ট। সচল মানুষ দ্বান্দ্বিকভাবে এগিয়ে যায়। অতীতকে অস্বীকার না করেই বর্তমানকে তৈরি করে।

রনজু রাইম : শিশুসাহিত্যে আপনার বিস্তর কাজ। রবীন্দ্র, নজরুল, মধুসূদন, রোকেয়ার জীবনী লিখেছেন। রবীন্দ্র-নজরুল চর্চা এ দেশে কখনও কখনও পক্ষপাতদুষ্ট মনে হয় আমরা দেখেছি। আপনার কী মনে হয়, রবীন্দ্র-নজরুল চর্চায় আমরা সেক্যুলার, বা রাষ্ট্র কীভাবে দেখছে ?

মুহম্মদ নূরুল হুদা : নজরুল ও রবীন্দ্রনাথ আমাদের রাষ্ট্রীয় কাঠামোর সঙ্গে অভিন্নভাবে মিশে আছেন। নজরুলের অসাম্প্রদায়িক ও সাম্যবাদী ভাবনার কারণেই তো বঙ্গবন্ধুর মতো মহান নেতার আবির্ভাব। আর রবীন্দ্রনাথের সোনার বাংলা’র স্বপ্ন তো আমাদের হৃদয়জুড়ে।

রনজু রাইম : আপনি নজরুল গবেষকও। বাংলাদেশে অসাম্প্রদায়িক সাম্যবাদী নজরুলকে ফররুখ আহমদের মতো সাম্প্রদায়িক হিসাবে চালিয়ে দিতে চায় কেউ কেউ―নজরুল গবেষক হিসাবে এ বিষয়ে আপনার মত কি ?

মুহম্মদ নূরুল হুদা : এটা যার যার দেখার ধরন। কাজী নজরুল ইসলাম আগাগোড়া একজন অসাম্প্রদায়িক মানুষ ছিলেন। ‘আমার সুন্দর’ প্রবন্ধে তিনি বলেছেন―‘অভেদ সুন্দর’ সব ধর্মের নান্দনিক সৌন্দর্যের কথা তিনি বলেছেন।

রনজু রাইম : আপনি কুরআন কাব্য লিখেছেন এর উদ্দেশ্য-বিধেয় সম্পর্ক বলবেন কি ?

মুহম্মদ নূরুল হুদা : আত্ম নয়, আমি ‘আত্মা’তে বিশ্বাস করি। আমি জন্মের পর আহ্বান শুনেছি―আমার মনে নাই কিন্তু। আচারগুলো ইসলামের আচার। এই গ্রন্থ পাঠ করলে বোধের বাইরে যেতে পারি না। বিশ্বব্রহ্মাণ্ড পবিত্র কোরআন শরিফের মূল উপজীব্য। ইকরা, মানে পাঠ করে মর্ম উদ্ধার করতে চেয়েছি।

রনজু রাইম : কুরআন কাব্য লিখতে গিয়ে ধর্মীয় অলৌকিকতা নাকি সাহিত্যিক মূল্যের ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছেন আপনি ?

মুহম্মদ নূরুল হুদা : বোধের জায়গায়, সাহিত্যমূল্যটাকে হেয় করতে চাইনি। অসম্ভব সাহিত্যমূল্য আছে। ছন্দে, রূপক, বীজতত্ত্বে।

রনজু রাইম : কবির মঞ্চ―খাতা, ল্যাপটপ নাকি অন্যকিছু ?

মুহম্মদ নূরুল হুদা : মন হলো কবির মঞ্চ।

রনজু রাইম : তা হলে কবি কেন মঞ্চে ওঠে ?

মুহম্মদ নূরুল হুদা :  মঞ্চ মূর্ত রূপ, আর বিমূর্ততম রূপ কবির মন।

রনজু রাইম : সাহিত্যে পদক-পুরস্কার মানেই তিরস্কার―আপনার কি মনে হয় ?

মুহম্মদ নূরুল হুদা :  একেবারে পুরস্কারও না, আবার তিরস্কারও না। তবে এখন এমনটাই হয়ে গেছে।

রনজু রাইম : এখন তো নোবেল পুরস্কার পেলেও অনেকে আনন্দিত হয় না।

মুহম্মদ নূরুল হুদা : এবার যিনি সাহিত্যে নোবেল পেলেন―তিনি বললেন, আমাকে কেন এই পুরস্কার দেওয়া হয়েছে।

রনজু রাইম : বাংলা একাডেমি পুরস্কারের গুরুত্ব কতটুকু ?

মুহম্মদ নূরুল হুদা : বাংলা একাডেমি পুরস্কারের গুরুত্ব বাংলাদেশে সর্বাধিক। কারণ এ পুরস্কার একটা পদ্ধতির মধ্য দিয়ে যায়।

রনজু রাইম : এই যে বিস্তর লেখালেখি―গোলটা কী ?

মুহম্মদ নূরুল হুদা : নিজেকে টিকিয়ে রাখা।

রনজু রাইম : কোথায় ?

মুহম্মদ নূরুল হুদা : নিজের মধ্যে। বাল্মীকি যা লিখেছিল―জন্ম-জন্মান্তর ধরে টিকে আছে। আমি না পড়লেও বাল্মীকিকে মনে রেখেছি। তিনি নিজের মধ্যে নিজেকে টিকিয়ে রেখেছেন।

রনজু রাইম : ইহলৌকিকতা, পারলৌকিকতা কনসেপ্ট দুটোকে কীভাবে দেখেন।

মুহম্মদ নূরুল হুদা : পাশাপাশি আছে।

রনজু রাইম : প্রেমের কবিতাগুলো মহার্ঘ কেন ?

মুহম্মদ নূরুল হুদা : আমি যে প্রেম চাই সেটা পাই না―তাই।

রনজু রাইম : প্রেমের কি কোনও ডাইমেনশন আছে ?

মুহম্মদ নূরুল হুদা :  ডাইমেনশন তো আছে। আমি যা চাই সেটা আমার, তুমি যা চাও সেটা তোমার।

রনজু রাইম : কোন প্রেম মহার্ঘ―ইন্দ্রিয় প্রেম, না অতীন্দ্রিয় প্রেম।

মুহম্মদ নূরুল হুদা :  দুটোই, শিশ্নানন্দ ইন্দ্রিয় সংযোগ প্রথমেই কিন্তু হয় না। শিশ্নানন্দ চরম মুহূর্তে―মনে হবে পৃথিবীর সবচেয়ে সুখটা তুমি পেয়ে গেছ। এর আগে যে শৃঙ্গার দীর্ঘসময় ধরে―এটাই ইন্দ্রিয়বাদ।

Leave a Reply

Your email address will not be published.

shares