দীর্ঘকবিতা : সীতা সংহিতা : মুহম্মদ নূরুল হুদা

নিমতিতা আর নিশিন্দা তিতা বুকে ধরে

সীতার হরণ শুরু বিমানব রাবণের ঘরে।

সীতা, তুমি না বনের, না রাজপ্রাসাদের;

চিরকাল রাণী তুমি মনোসাম্রাজ্যের।

না, তোমাকে নিয়ে যুদ্ধটাও নয় শুধু আমাদের।

গুলঞ্চ লতার বুক শুঁকে শুঁকে সীতা

নিজেই নিজের ঘরে যদি অপহৃতা

পাখিরা সন্ত্রস্ত চোখে মুখ তুলে চায়

হানাদার বাহিনীর চোখ ঠুকরে খায়

ভেষজের পাহারায় সীতা নবনীতা

পঞ্চবট পঞ্চবৃক্ষ স্তম্ভ পঞ্চদিক

অনন্ত অতন্দ্র তারা বনে দশদিক

মাঝখানে সুরক্ষিত বেদি বারোহাত

পঞ্চবটী বনে নামে ত্রিলোক-প্রপাত

সতীত্ব সতীর অস্ত্র, সতীত্ব করাত

নয় নির্বাসন, এই বন পুণ্যবতী সতীর আশ্রম;

অশ্বত্থ সটান পুবে, পশ্চিমেও বট সমাগম;

উত্তরে শ্রীফল বিল্ব, আমলকি প্রহরী দক্ষিণে;

অগ্নিকোণে দাঁড়ায় অশোক; মাঝে বেদি নাও চিনে;

সীতা তুমি, সতী তুমি; তুমি নিজে কয়েদি সশ্রম।

দেহের দেয়ালে বন্দি, বন্দি তুমি স্নায়ুর শেকলে;

ডুবে ভেসে জেগে থাকো আসমুদ্র শরীরী শোণিতে;

তোমাকে দেখে না কেউ, দেখে শুধু তোমার বাকল;

কে তোমাকে বেঁধে রাখে সীমানায় হিতে বিপরীতে ?

রাম-রাবণের যুদ্ধ চলে, দেহত্যাগী চলে দলে দলে!

অনন্তমানব আমি, তুমি যদি হতে চাও অনন্তমানবী।

অনন্তমানবী তুমি, আমি যদি হতে চাই অনন্তমানব।

পররাজ্য পরনারী অধিকারে কেন তবে অটল অটবী ?

শরীরের শৌর্য্য নিয়ে বিনা তর্কে কেন তবে দাহন খাণ্ডব ?

লেজে লেজে সেতু পার, হনুমানও পরবিত্ত-লোভী।

পঞ্চকর্মে দীক্ষাহীনা ?―তুমি তো আরোগ্যহীন তবে চিরদিন।

বিরেচন বা বমন, নস্য বা নিরুহ : আসলে অনুবাসনাধীন।

সশাস্ত্র চিকিৎসা নাও; রাজা হও, রাণী হও, মানব-মানবী;

পাহাড়-সাগর-দ্বীপ-সমতলে নভোতলে তুমি আর নও অর্বাচীন।

তা না-হলে আবাসনে-নির্বাসনে মানুষ তো দানব-দানবী।

তোমার ভেতরে তুমি সাজাও সংসার

বিমূর্তের তুলি দিয়ে মূর্তের আকার

ক্রমেই ভেতরে চলো, অধিক ভেতরে

যা আছে এ চরাচরে নিয়ে আসো ঘরে

পঞ্চবটী বন শুধু সতীকেই ধরে

একা নও একা নও একা নও একা

তোমার ভেতরে তুমি পেয়ে যাবে দেখা

জলাঙ্গীর সরোবরে বাঘিনী হরিণী

এক ঘাটে কেলি করে তরঙ্গ তটিনী

তোমাকে পাহারা দেয় কুহু আর কেকা

১০

রচনা করেছ তুমি তোমার কুণ্ডলী

ধূলিশয্যা আলো করে সপ্তর্ষিমণ্ডলী

পত্রপল্লবেরা সুখে বাজায় কাঁসর

ত্রিলোক যাপন করে সতীত্ব বাসর

তোমাকে সুরক্ষা দেয় জোনাকির কলি

১১

পুরুষ রসনাজীবী কামনাবিলাসী

নৃপতি মুখোশ পরে পালে দাসদাসী

রাজ্যলোভী নারীলোভী লোভী পরকীয়া

রাণীর বশ্যতা মাগে, পতিত্বে স্বকীয়া

সতত স্বাধীন সীতা, সতী অবিনাশী

১২

না-পুরুষ না-রমণী না-রাম-রাবণ

মানুষ আপন মিত্র, আপন বিধান

নিজের ভিতরে করে নিজেকে ধারণ

দশ দিক চেনে, চেনে আপন শিথান

অমানুষ খোঁজে শুধু শত্রু অকারণ

১৩

দেবতার ছায়া থেকে মানুষের কায়া

দেবলোকে মর্ত্যলোকে যুগলাঙ্গ মায়া

মূর্ত-বিমূর্তের রজ্জু সে কি আবছায়া ?

দেবসিদ্ধি অনন্তের,―মুহূর্তে মানব।

রূপবদলের দৃশ্যে শুধু আসা-যাওয়া।

১৪

লঙকায় রাক্ষসরাজ রাবণ যখন

প্রচণ্ড প্রতাপে করে ভুবন শাসন,

যেহেতু ব্রহ্মার বরে অমর তখন;

সুমাত্রার গর্ভে বিষ্ণু মানবস্বরূপ

জন্ম নিলো; লক্ষ্য তার রাবণ-হনন।

১৫

শোধ নয়, প্রতিশোধ নেয় অযাচারী,

ক্ষমতা ও ছলনার ষড়যন্ত্রধারী;

মানবের গর্ভে তার জন্ম হয় বটে,

মুখে তবু বর্ণহর মুখোশ বাহারি:

রাক্ষসের সেই রাজা মনুষ্য-আহারী।

১৬

জনক তখন রাজা ছিল মিথিলার

লাঙল-রেখায় লাভ সুকন্যা সীতার

চাষের কর্ষণ রেখা : সীতা নাম তার;

আসলে তো বিষ্ণুপত্নী, লক্ষ্মী সত্যবতী;

রামসীতা বিষ্ণুলক্ষ্মী অনন্ত-সংসার।

১৭

ঋষ্যশৃঙ্গ যজ্ঞ করে স্বর্গমর্ত্যময়

জননের ঊর্বরতা সুফলা সময়

সর্বচাষে ফলনের নামুক অভয়;

জল, মাটি, অগ্নি আর বায়ুর প্রবাহ;

চেতনায় দ্যুতি জ্বালো, জীবজন্মময়।

১৮

সতী যদি ব্রতবতী আছে তারও ভাগ

সতিনও স্নেহের অংশী, নেই তার রাগ;

অর্ধফল দুই ভাগ করে দুই জনা―

সতিনে সতিনে সখ্য, ভগ্নী অনুরাগ;

কৌশল্যা সুমাত্রা রচে সংসার-সংরাগ।

১৯

মাটির মানুষ গড়ে ভিটেমাটিঘর

আপন সীমানা গড়ে আপন মাটিতে

সংসার বাঁশের বেড়া, সোনাদিয়াচর

পাশাপাশি শুয়ে-থাকা বালিতে পাটিতে

সংসারী সংসারসুখী দুধের বাটিতে

২০

নিজেকে নিজের মধ্যে যতদিন ধরো

ততদিন চাষ করো সতীর ফসলে

গুহাবাসে দূরতম গ্রহের নিবাসে

আমাদের আত্ম-সজ্জা অর্জুন বল্কলে

আত্মার আরোগ্যশুদ্ধি ভেষজ অনলে

২১

ধনুকের মতো বাঁকা ত্রিভঙ্গ শরীর

একবার ছুড়ে দিলে ফেরে না তো আর,

তোমার সন্ধানে যায় বিবরে বিবরে

আকাশে সমুদ্রে দ্বীপে সাকার শিকার

বনবাসে মনবাসে নিজ পারাপার

২২

যেখানে রয়েছ জেগে সেখানেই থাকো

অথবা ঘুমিয়ে থাকো চাঁদ-পাহারায়

আমরা আসব ঘুরে সাত আসমান

আমাদের সঙ্গে সঙ্গে স্বর্গমর্ত্য যায়

নাইয়রি নাইয়র যায় মান্দাস ভেলায়

২৩

কাছে গেলে দূরে যাও, দূরে গেলে কাছে

এ সংসারে ঘরে ঘরে পঞ্চবটী আছে

দেয়ালে দেয়াল নেই, আঁকা লতাপাতা

হনুমান লাফ দেয় গাছ থেকে গাছে

দরোজা খোলাই আছে, আছেন বিধাতা

২৪

সঙ্গদোষে অঙ্গদোষ এ বঙ্গ ভাণ্ডারে

ফরাসিনী সীতা এসে হাসে আড়েঠারে

মধুবনে মধুকবি সাজায় বাসর

প্যারিস মুম্বাই ছেড়ে বনে ও বাদাড়ে

ঘর ছেড়ে ঘর গড়ে, পঞ্চ মধু-ঘর

২৫

সতীত্বের সংজ্ঞা তবে বলো মহাকবি।

মন দিলে মন শুদ্ধ; দেহ কি করবী ?

দেহ ও মনের মিলে মেলে সদাচার।

কাদম্বিনী বুকে পোষে কোন গীতিকবি ?

জোরেই মুল্লুক যার : লুট অনাচার।

২৬

সীতা আর হেলেনের দেখা হয়নি কি ?

রাবণে-প্যারিসে মিল নাই কিন্তু সিকি।

ধন চায় মন চায় দুই মহাবীর:

সমিলের এই কথা আজ শুধু লিখি:

সে ধন রাজ্যের নয় : সুসতী নারীর।

২৭

তারপর শুরু তার বধ-কাব্য-মহা

আছেন সঙ্গিনী তিনি নারী সর্বংসহা

কে যে বীর কে যে খলনায়ক আসল

সময় এলেই যাবে শুধু ঠিক কহা :

দেহপ্রেম দেশপ্রেম কে কার নকল!

২৮

একবার দেহ ছেড়ে পেয়ে গেছে ফিরে,

এমন প্রাণের বীজ যমুনার তীরে

রাধাও কি বুনেছিল কৃষ্ণের শরীরে ?

উত্তর জানে না রাম, রাবণ বা সীতা।

কেবল পিপাসা বাড়ে, জলের গভীরে।

২৯

জোনাকিবাহিনী এসে জ্বালায় প্রদীপ

সপ্তর্ষি কপালে তার দিয়ে যায় টিপ

লুটেরা বাহিনী এসে যখন জরিপ

করে তার রক্ষাব্যূহ গগনে ও বনে

কুণ্ডলী পাহারা দেয় বাঘ সরীসৃপ

৩০

নিশীথিনী চুপচাপ সব দেখে যায়

নিশির শিশিরে তার পিপাসা মেটায়

মানে না মানে না কেউ লুটেরা অন্যায়

চিরকাল সতী নারী সীতা সমাচার

জগতে কে নেবে বলো হরণের দায় ?

৩১

নিশিকুটুম্বের দল আসে ছায়া-ছায়া

প্রদীপের জন্য তার নাই কোনও মায়া

আঁধারের জামা গায়ে তারা বহুপায়া

অলক্ষ্যে রেখেছে পেতে ষড়যন্ত্র জাল

ফাঁদ আছে, উড়ে গেছে শিকার সকায়া

৩২

যদিও আগুন আছে, গিরি আছে, আছে গিরিমুখ

তরঙ্গে তরঙ্গে সিঁড়ি, মৎস্যকন্যা, সাঁতারের সুখ

এ দ্বীপের জলেস্থলে ভ্রমণীরা উদয়াস্ত যদিও উন্মুখ

আদিমাতা আদিপিতা নিজগৃহে ছিলেন সংসারী

গৃহিণী গৃহেই সুখী, সংসারী কখনও নয় সংসার-বিমুখ

৩৩

ভিনগ্রহ থেকে যারা অভিবাসী এই ধরার ধূলায়

নির্দিষ্ট মিশন শেষে যারা ফিরে যায় আপন কুলায়

যেতে যেতে কিছুটা কুড়ায়, আর কিছু রেখে যায়,

গ্রহ ছেড়ে গৃহে যায়, যায় ফিরে আপন আসনে;

তুমি কি যাবে না ফিরে চিরগৃহে, চির অমরায় ?

৩৪

যদি যাও, যাওয়ার প্রস্তুতি নাও, চারপাশে দেখো

কার সাথে কতদিন, কতভাবে, শুধু মনে রেখো

তোমার সম্পর্ক তুমি স্মৃতির ইজেলে এঁকে শেখো

যে বিরহ অহরহ সে বিরহে দেখে নাও মিলনের মুখ

বনেমনে মিলনবিরহ সূত্রে নিশর্ত কাবিননামা লেখো

৩৫

বিজয় সিংহের কালে জলেস্থলে দ্বীপরাজ্যে ভ্রমণ-সাঁতার

মানুষ ঘুমায় সুখে মানুষের বুকে, ভেদহীন আকারপ্রকার;

জন্ম যার সমতলে, সে যায় অরণ্যে; ফলমূলবাকল আহার;

সুবর্ণ দ্বীপের দিকে যেতে যেতে পালে তার মানব নিশান;

নেই জয় পরাজয়, অতিথি আক্রান্ত নয়; খোলা দ্বীপ-দ্বার।

৩৬

সঙ্গে যায় বঙ্গনারী, সঙ্গে যায় দাঁড়ি মাঝি হাজার সোয়ারি

সঙ্গে যায় সদাগর, ময়ূরপঙ্খীর খোলে মশলা বাহারি

সতীও নাইয়র যায়, সঙ্গে যায় দইচিড়া মিষ্টান্নের হাঁড়ি

সোনালি শস্যের বীজ, ধানকাউনের জাউ, স্মৃতি, সরসিজ

হামাম দিস্তার সঙ্গে কবিরাজ, নিদানিক ভেষজের সারি

৩৭

যতই ভেষজ থাক যাত্রাপথে তোমার সঞ্চয়ে

তোমার ভেষজ যদি তুমি নিজে নিতে পারো বয়ে

নিজের মশাল জ্বেলে নিজ অঙ্গে অহিংস অভয়ে

কে আছে জগতে বলো অজাচারী পাপিষ্ঠ লুটেরা

হাত যার পুড়বে না স্পর্শমাত্র, সহিংস বিলয়ে?

৩৮

তরঙ্গ পেরিয়ে যদি দূরে যায় তরঙ্গ তোমার

তোমাকে পাহারা দেবে দ্বীপে-দ্বীপে অজস্র হোমার,

মসিকে বানাবে অসি, অস্ত্র যার কবিতার ধার

হরণতস্কর সব লেজ তুলে পালাবে গুহায়

সর্বত্র অযোধ্যা আছে, দেশে দেশে তুমি অযোধ্যার

৩৯

পাশাপাশি বয়ে যায় নির্বাসিত নদীর পিপাসা

ঢেউয়ের আড়ালে ঢেউ ঘুরে আসে দূর উত্তমাশা

সপ্তবর্ণ পাল তুলে উড়ে যায় ডানা ভালোবাসা

সংসারী নারীর হাত অন্ন তোলে সংসারের মুখে

রাণী তুমি মাতা তুমি তুমি বধূ : হৃদয়ের ভাষা

৪০

কোশল রাজ্যের রাজা নাম দশরথ

ত্রিরাজ্যের গণপতি নিলেন শপথ

তিন রাজকুমারীর নেই ভিন্নমত

তিন রাণী তিন গর্ভ রাজার সংসার

ঔরস সন্তানহীন, স্তব্ধ রাজপথ

৪১

কৌশল্যা কোশলকন্যা মহিষী প্রধানা

কেকয়ী কেকয়কন্যা, দ্বিতীয়া সে জানা

সুমিত্রা সিংহলকন্যা, কনিষ্ঠার ডানা

শুকপাখি খাঁচা ছেড়ে আকাশের নীলে

অথচ অজানা আজও সুখের ঠিকানা

৪২

মুনির নির্দেশে তাই যজ্ঞ আয়োজন

পুত্রেষ্টি যজ্ঞের জন্য ন্যস্ত রাজ্যধন

যজ্ঞ-মুনি ঋষ্যশৃঙ্গ ছেড়ে তপোবন

জনতামঙ্গল মন্ত্র শোনালেন তিনি

পুণ্যবীজ পুণ্যগর্ভে প্রারম্ভে বপন

৪৩

পুণ্যধ্যানে পুণ্যফল হয় যদি লাভ

নিরসন হবে তবে রাজ্যের অভাব

ঋষির যজ্ঞের কৃষি ফলায় ফসল

বিনিদ্র রাজার চোখে সুখের খোয়াব

ধ্যানী হাতে মানী মুনি পেলো জ্ঞানী ফল

৪৪

অশ্বমেধ যজ্ঞ শেষে আসে লব-কুশ;

বাল্মীকির বুকে-মুখে কবিতা-অঙ্কুশ;

অগ্নির পরীক্ষা যদি নিতে চায় পতি,

মাতাধরিত্রীর বুকে যায় সীতা চিরসতী;

লব-কুশ দুই পুত্র, নতুন নৃপতি।

৪৫

নিজবৃক্ষে নিজফল চেনে না যে-জন,

ভাগ্যহত সে-জনার তপস্যা-বর্জন;

থাক যত অস্ত্রশস্ত্র ত্রিভুবন জুড়ে

যে যার মতন যায় ঘর থেকে দূরে,

যেহেতু সহজ নয় অভীষ্ট অর্জন।

৪৬

সরযূ নদীতে আত্মবিজসর্জন দিয়ে

রাম শেষ শয্যা পাতে দেবালয়ে গিয়ে;

পৃথিবীর কর্ম শেষ অবতার রূপে,

যুগলে অনঙ্গযাত্রী রূপে ও অরূপে;

সীতা শুভ্র ডানা মেলে ধূপ থেকে ধূপে।

৪৭

ঘুমের আড়ালে ঘুম, ঘুম শুধু ঘুম;

সতীর নিষঙ্গ জুড়ে নীলিমা নিঝুম;

শাসন ত্রাসন শেষে তবু ভালোবাসা

জয় করে ত্রিলোকের আশা ও দুরাশা;

ক্ষমতা মমতা মোহে বোনে ভালোবাসা।

৪৮

এইভাবে শুরু-শেষ আদি রামায়ণ

আদি কাব্য শুরু করে আদিকবি মন;

তারপর বদলে যায় পৃথিবী-প্রকৃতি,

বদলে যায় লোকগীতি, স্মৃতি ও বিস্মৃতি;

পুরাণে পরণকথা স্বজ্ঞার সৃকৃতি।

৪৯

সত্যযুগ পার হয়ে দ্বাপর ও ত্রাতা,

প্রাচীন অচিনপাখি, মধ্যযুগ ভ্রাতা,

আধুনিক পার হয়ে অধুনা-উত্তর,

কালে কালে সব কাল বাঁধে কালঘর

কালের বন্যায় ভাসে চর স্বয়ম্বর।

৫০

সে চরে যখন শুরু নতুন বসতি,

নতুন বাসরঘরে নবকনেসতী,

ডুবে ডুবে সাঁতরায় পলিবেনোজলে,

পরোয়া করে না কোনো মর্ত্য-হলাহলে;

পুরুষ তবু করে ভীমের আরতি।

৫১

রতির সারথি যদি সকল জাতক,

কেউ কেউ বীরশ্রেষ্ঠ, কেউ-বা পাতক;

যমুনার জলে স্নান করে নারীমাতা,

আকাশ মাথায় তার ধরে নীল ছাতা;

ত্রিভুবনে মাতৃত্বের শুদ্ধাসন পাতা।

৫২

কলিযুগে নারী নয় শুধু ফুলকলি,

যদিও পুজায় তার নর দেয় বলি

জগতের সব ধন, বিনাবাক্যব্যয়ে,

যতই আহত অতি আপন হৃদয়ে;

প্রেমধর্মে পরস্পর খেলে জলাঞ্জলি।

৫৩

যুদ্ধে যুদ্ধে যায় বেলা, হনুমান সেনা

দ্বীপদেশে অগ্নিপণ্য করে লেনাদেনা,

সিদ্ধ নয় বিনা শ্রমে কোনও বেচাকেনা;

রাবণের বন্ধু নয়, মিত্র সে রামের;

শরীর অধীর অতি, বন্ধু নিষ্কামের।

৫৪

কলি থেকে কলি হয়, অলি থেকে অলি,

কলিতে অলিতে যদি হয় গলাগলি,

বিবর্তনে সিদ্ধকাম সীতাকে হারায়,

অরণ্যে আকাশপথে উত্তুঙ্গ চূড়ায় :

বিরহ মিলনে তবু দুবাহু বাড়ায়।

৫৫

কেউ কারও জন্ম-মৃত্যু করে না বীক্ষণ,

স্বশিক্ষণ শেষে শেখে প্রত্ন প্রশিক্ষণ;

সময় সচল ডানা, স্থির উড়ে যায়,

অনন্ত মুহূর্তে এসে মুহূর্তে হারায়;

বনমাসে মনবাস ধরা-অধরায়।

৫৬

অনন্তর নর গড়ে রমণীর ঘর;

অনন্তর নারী চির নরের দোসর

চরাচরে পরস্পর সংসারের চর।

নর যদি পরিণত, নারী পরিণীতা,

সোনার সংসার লেখে সীতার সংহিতা।।

সোনার সংসার লেখে সীতার সংহিতা।।।

সোনার সংসার লেখে সীতার সংহিতা।।।।

[১৬.০৬.২০১৯ থেকে ১১-০৯.১২.২০২১]

পুনশ্চ:

ভিখারি

কলঙ্কে কলঙ্ক গেঁথে পরেছি গলায়,

কবিতা কলঙ্ক যদি নন্দন-কলায়।

তোমাকে লিখেছি আমি অমর কবিতা,

আমার কবিতা আজো মনবাসী সীতা।

অনন্তযৌবনা তুমি, হে বয়সহীনা;

তোমার প্রতিমা চিনি, তোমাকে চিনি না।

আমার হৃদয় এক মুগ্ধ কারাগার,

যে আছে সে কারাগারে, মুক্তি নাই তার।

চাবি নাই, তালা নাই, নাই কোনও দ্বারী,

বাণিজ্যে বসতি লক্ষ্মী, পতি কারবারী।

সতী যদি সরস্বতী, এক অঙ্গে বাস,

কবি তার অঙ্গরক্ষী, খাস ক্রীতদাস।

নিষ্কলঙ্ক নর নাই, আছে এক নারী,

কবি যার পাণিপ্রার্থী, আজন্ম ভিখারি।

Leave a Reply

Your email address will not be published.

shares