প্রচ্ছদ রচনা―সাহিত্যকর্ম : আলোচনা : মুহম্মদ নূরুল হুদা জাতিসত্তার কবি, কবে থেকে : তপন বাগচী

‘ইতিহাসের সর্বশেষ ধাপে/বিকশিত হবে সম্পূর্ণ মানুষ/তার হাতে’ উৎসর্গ করা হয়েছিল মুহম্মদ নূরুল হুদার প্রথম কাব্য শোণিতে সমুদ্রপাত (১৯৭২), তখনও তাঁর ‘জাতিসত্তার কবিতা’ অভিধা চাউর হয়নি, তখনও তিনি ষাটের দশকের শেষপাদে আবির্ভূত হওয়া সুদর্শন মেধাবী কবিমাত্র। এই মেধা কেবল কবিতা রচনার মেধা নয়, প্রাতিষ্ঠানিক বিচারেও, শিক্ষা বোর্ডের স্টান্ড করা শিক্ষার্থীদের তালিকায় নাম থাকা মেধা বটে! উৎসর্গবাক্য বিশ্লেষণ করেই বোঝা যায় যে, ইতিহাসচেতনায় তিনি যুক্তিবাদী ও আধুনিক। তাঁর ইতিহাসচেতনায় অতীত চারণার ভিত্তির ওপর দণ্ডায়মান ভবিষ্যতের সভ্যতা নির্মাণের স্বপ্নদর্শন প্রতিভাত। দ্রাবিড়া, যে শ্যামাঙ্গী কিশোরী, সে-ই কবির অগ্নিময়ী মৃন্ময়ী, পরবর্তীকালে তিনি শত নামে বিস্তৃত হলেও প্রকৃত বাঙালি জাতিসত্তায় মিশে আছেন অঙ্গাঙ্গী হয়ে। আর দ্রাবিড়ার খোঁজে মত্ত হয়ে মুহম্মদ নূরুল হুদা হয়ে উঠলেন বাঙালির ‘জাতিসত্তার কবি’। কিংবা মৃন্ময়ীর সাধনায় তিনি প্রতিষ্ঠা পেলেন ‘জাতিসত্তার কবি’ হিসেবে। দ্রাবিড়ার মধ্যে জাতিগত প্রত্ন-ইতিহাসের প্রকল্প যুক্ত রয়েছে, আর মৃৎ+ময়+ঈ= মৃন্ময়ী তো এই মাটিরই স্নিগ্ধ প্রতিমা। এই মৃন্ময়ী তো শাশ^ত বাংলার প্রাণপ্রতিমা। এই দুটি শব্দ ও শব্দের আধারে লুকিয়ে থাকা নারীপ্রতিমার ভেতরেও আমরা কবি মুহম্মদ নূরুল হুদার জাতিতত্ত্বের বীজ উপ্ত হতে দেখি!

একদা আত্মপক্ষ প্রচার করতে গিয়ে তিনি জানিয়েছেন এই সুবিশাল জনপদে দ্রাবিড়ার দেখা তিনি পেয়েছেন বহুবার, কিন্তু স্পর্শাতীত রয়ে গেছে সেই দর্শন। সেই দ্রাবিড়াই হয়ে ওঠে আগুনে পোড়া এক মোহান্ধ মৃন্ময়ী। মানসপ্রতিমার এই যে রূপান্তর কবি লক্ষ্য করেন, তাঁর মধ্য দিয়ে সংকর বাঙালি তামাটে জাতির অস্তিত্ব প্রমাণিত হয়। কবির দর্শন ‘মিলনই সত্য, মিলনই ধ্রুব’ জেনেও কবি অমিলনের আগুনে পুড়ছেন। আর তাই তাঁর হাতে ফুটে চলছে কবিতার অদৃশ্য বাগান। কবি বিশ^াস করেন অজস্্র তামাটে মানুষের উত্থানে। কবির আরও বিশ^াস ‘মানবতা একদিন সম-স্বার্থে সমুত্থিত হবেই’। এভাবে জাতিসত্তার কবি হয়ে ওঠেন, বাঙালির জাতিসত্তার কবি, সর্বজাতিসত্তার কবি, তথা সর্বমানবতার কবি।

নির্বাচিত কবিতার (১৯৮৪) প্রথম কবিতা থেকেই আমরা লক্ষ্য করি জাতিসত্তার স্বরূপের প্রতি কবির অভীপ্সা ও সন্ধিৎসা। কবি যখন বলেন ‘বাজিয়ে শঙ্খের চুড়ি হাওয়ায় এলিয়ে দিয়ে কালো কেশদাম/ ঘূর্ণিনৃত্যে মেতে দূরে যাচ্ছ,/ দূরে যাচ্ছ তুমিও উর্বশী’ (পৃ. ০৯)। কে এই উর্বশী ? সে তো স্বর্গের নৃত্যশিল্পী! দেবীরূপা। হাতে তাঁর শাঁখা, মানে সধবার প্রতীক; কালো কেশদাম, মানে যৌবনের প্রতীক; ঘূর্ণিনৃত্য মানে চলমান উদ্দামতার প্রতীক। যে দ্রাবিড়া শেষতক কবির মানসপ্রতিমা, তিনি কি তবে শোণিতে সমুদ্রপাতেও দেখা দিয়েছিলেন ? এই উর্বশী কেবল সমুদ্রে নয়, পাহাড়েও আছে, সজল সড়কেও আছে। কখনও যে রূপসী, কখনও সে রোদসী। এই রোদসী হতে পারে রোদের মতো উজ্জ্বল, হতে পারে রোদনের মতো করুণ প্রজ্ঞাময়! কবির অনুসন্ধান এভাবে অব্যাহতই থাকে। তৃষ্ণার্ত কবির আন্তরিক আবাহন ধ্বনিত হয় :

ফিরে এসো সুতনুকা, এইখানে সুকঠোর হাতের মুঠোয়

              জলের মগ্নতা থেকে ফিরে পাবে পুনর্বার হৃদয় তোমার

পুনর্বার সাইক্লোন হবে, সমুদ্রমন্থন জেনো হবে পুনর্বার। (পৃ. ১০)

এই যে সমুদ্রমন্থনের কথা শোনার সঙ্গেই আমাদের মন ছুটে যায় পৌরাণিক যুগে। কবি যে সেই পৌরাণিক প্রত্নবাংলায় খুঁজে পেতে চান মানসপ্রতিমাকে, এই তিন চরণেও তার সাক্ষ্য মেলে। দ্রাবিড়া, মৃন্ময়ীর পাশে যুক্ত হয় আরও এক সত্তা―সুতনুকা! এবার কবি চোখ ফেরালেন তনুর দিকে, মানে দেহাবয়বের দিক। শরীর তো জাতিসত্তারই ধারা বহন করে। এই শরীর দেখেই আমরা চিনে নিতে পারি, কে বাঙালি, কে পাঠান, কে সিংহলী, কে গারো, কে চাকমা, কে সাঁওতাল। এমনকি জাতিগত সংকরায়ণের আগে সনাতনীদের মধ্যে কে ব্রাহ্মণ, কে ক্ষত্রিয়, কে বৈশ্য, কে শূদ্র তা চিহ্নিত করা যেত শারীরিক গঠন দেখে। এখন অবশ্য সেসব হয়ে গেছে কেবলই ইতিহাসের উপকরণ। এখন সব হিন্দু, সব মুসলিম হয়ে গেছে একাকার বাঙালি। কবি মুহম্মদ নূরুল হুদা জাতি-ধর্মের ঊর্ধ্বে উঠেই খুঁজে বেড়ান একজন ‘সুতনুকা’কে। জাতিসত্তার সঙ্গে সংস্কৃতির যোগ রয়েছে। রাষ্ট্রীয় কিংবা ধর্মীয় সত্তাও মানুষ ধারণ করতে পারে। রাষ্ট্রীয় পরিচয়ে কেউ ভারতীয়, কেউ পাকিস্তানি, কেউ বাংলাদেশি পরিচয় রয়েছে। ধর্মীয় পরিচয়েও কেউ হিন্দু, মুসলিম, খ্রিস্টান হতে পারেন। কিন্তু এসবের ঊর্ধ্বে উঠে কবি মুহম্মদ নূরুল হুদা সংস্কৃতি-উদ্ভূত জাতিসত্তার সন্ধান করেছেন। ভারতীয় হয়েও পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা, আসামের হিন্দু-মুসলিম-খ্রিস্টান বাঙালি রয়েছেন। তেমনি বাংলাদেশি হয়েও আদিবাসী বাদে সকলেই বাঙালি। কবি সেই জাতিসত্তার সন্ধান করেছে, যেখানে ধর্মীয় সংকীর্ণতা নেই। এই জাতিসত্তা সন্ধানী কিছু চরণ আমরা উদ্ধার করতে পারি :

১)           ভাগ্যরেখা পাল্টে যায় উদয়াস্ত সময়ের মতো

শিথানে বালিশ থেকে উড়ে যায় পেঁজা পেঁজা তুলো।

                                    (বিশাল বিদায়, পৃ. ১০)

২)          তাকালো সে, যেন বৃদ্ধ সফোক্লিস

গ্রিসীয় খাড়ির মতো ক্লান্ত, ভারি পাপড়ি জড়িয়ে

আজিয়ান তীরে এসে দাঁড়াল হঠাৎ; আর

প্রবল তিমির মতো দ্যুতিময় লোহিত সাগর

জ¦লন্ত গর্জন নিয়ে তাড়া করে এসে

দাঁড়াল সে অচঞ্চল,

              হাড়-মাংস-শিরহীন নির্ভেজাল শোণিত শরীর।

                                   (মেটামরফোসিস, পৃ. ১১)

৩)          প্রত্নতাত্ত্বিকের মতো অনিবার্য প্রয়োজন তাই

আদিগন্ত শবাধার খুঁড়ি; আর

দুহাতে কুড়িয়ে নিয়ে বিশ^াসের আদিম ফসিল

              ইতিহাস ইতিহাস বলে রাখছি প্রমাণ;

                                 (শিরস্ত্রাণ, পৃ. ২৩)

এই যে তিনটি কবিতাংশ, এ থেকেই কবির যাত্রা শুরুর ইঙ্গিত পাওয়া যায়। ভাগ্যরেখা, শিথানে বালিশ এই বাঙালির চিরায়ত বিশ^াস ও গেরস্থালির প্রতীক। সফোক্লিস, গ্রিস, আজিয়ান প্রভৃতি শব্দে কবি বিশ^সভ্যতার পথ ধরে স্থির হয় নিজের দ্রাঘিমায়। আর প্রত্নতত্ত্ব, ফসিল, ইতিহাস প্রভৃতি শব্দে কবি অস্তিত্বের সন্ধানে অতীতচারিতার কথা বলেছেন। জাতিসত্তার সন্ধানে মুহম্মদ নূরুল হুদার কাব্য-এষণা তাই শেকড়ে ফেরার প্রবল তাগিদ। নিজের অজান্তেই যে যাত্রা তিনি শুরু করেছেন, আজ সত্তর পেরিয়েও সেই যাত্রা অব্যাহত। সমকালীন প্রায় সকল কবিকে পাশ কাটিয়ে তিনি হয়ে উঠেছেন জাতিসত্তার সন্ধানে নির্ভীক পথদ্রষ্টা।

কবিতার নাম যদি হয় ‘খাদ্যান্বেষণ, খ্রিস্টপূর্ব ৪৫০৭’ তখন পাঠকের কি বুঝতে বাকি থাকে যে কবি এক গভীর ও গুরুতর প্রশ্নের দিকে দৃষ্টি ফেরাতে চান। দারুণ এক রহস্যঘেরা কবির চরণে আমরা সুপ্রাচীনকালের তরুণের কণ্ঠে নেকড়ে হত্যা করে রক্ত ও কলিজা খাওয়ার প্রসঙ্গ শুনি। জবাবে তরুণী বলে এতসব বোঝার পরেও আমরা মিলিত হয়ে জনসংখ্যা বাড়িয়ে চলছি। জনসংখ্যা বিস্ফোরণের বিরুদ্ধে এ এক শিল্পিীত প্রতিবাদী কবিতা। এর সঙ্গেও কি জাতিসত্তার সংযোগ নেই ? একটু এগিয়ে কবিকে বলতে শুনি :

পর্যটন শেষ হলে সুনিশ্চিত দেখা হয়ে যায়,

যে রকম দেখা পাই আমিও তোমার

হাজার হাজার লক্ষ কোটি বর্ষ প্রতীক্ষার পরে

কোনও শীতে হিমাদ্রির নিশীথে।

                             (দেখা হবে, পৃ. ২৯)

এই যে ‘হাজার হাজার লক্ষ কোটি বর্ষ প্রতীক্ষা’র মধ্য দিয়ে লেখক ফিরে গেল সুদূর অতীতে। এই অতীতচারণ তো ঐতিহ্যচারণ, তারই হাত ধরে জাতিসত্তার সন্ধান।

‘শোভাযাত্রা দ্রাবিড়ার প্রতি’ কবিতা কবির সবচেয়ে আলোচিত কবিতার মধ্যে একটি। এটি যতটা মুখে মুখে আলোচিত, ততটা বিশ্লেষিত ও ব্যাখ্যাত হয়নি। ১৭টি অনুচ্ছেদে রচিত কবিতার শেষ অনুচ্ছেদে রয়েছে ১৩টি চরণ। বাকি ১৬টিতে ৮টি করে চরণ রয়েছে। অক্ষরবৃত্ত ছন্দের প্রধানত ২২ মাত্রায়। পর্বের আকার ৮+৮+৬। মহাপয়ার বলা যেতে পারে। এ রকম শুদ্ধ মহাপয়ারের মধ্য দিয়ে মুহম্মদ নূরুল হুদা বাংলা কবিতার স্বাভাবিক কাঠামোকে রক্ষা করেছেন। এই কবিতার কিছু শব্দবন্ধ দারুণ উজ্জ্বল :

১. কে এক পাপিষ্ঠা যায় বিষাক্ত সংসার বেঁধে তার নগ্ন পায়

২. ঐশ^র্য গর্জে ওঠে উজ্জ্বল সকালে আর গোধূলির রক্তিম বিস্তার

৩. সবে তো শত্রুর শেষ বিচ্ছিন্ন মুণ্ডুর মতো ছত্রখান গ্রথিত জনতা।

৪. ধানসিঁড়ি জেগে ওঠে কল্লোলিত জীবনের লোহিত প্লাবন।

৫. তুমিও ভুলেছ কবে বাস্তুভিটা, সংসারের সঠিক দ্রাঘিমা।

এই সব চিত্রময় শব্দবন্ধ প্রায় প্রতিটি স্তবকেই আছে। কবিতাজীবনের শুরুতেই মুহম্মদ নূরুল হুদা যে স্বকীয়তার স্বাক্ষর রেখেছেন এই সব পঙ্ক্তিই তার প্রমাণ বহন করে চলছে।

‘শোভাযাত্রা দ্রাবিড়ার প্রতি’ কবিতাটি মুহম্মদ নূরুল হুদার শ্রেষ্ঠ কবিতার একটি তো বটেই, ষাটের দশকের কবিতার মধ্যেও এটি বিশিষ্টতার দাবি রাখে। শিষ্ট কবিতা বলেই এটি বিশিষ্ট হয়ে উঠেছে। সেই বিশিষ্ট হওয়ার বৈশিষ্ট্য কী ?  কবি এই কবিতায় :

১. চিরায়ত বাঙালি ঐতিহ্যের উপাসনা করেছেন।

২. আধুনিক কবিতার স্বাভাবিক ছন্দ অক্ষরবৃত্তকে নিষ্ঠার সঙ্গে মান্য করেছেন।

৩. পর্ববিন্যাস মূলত ৮+৮+৬= ২২ মাত্রা ধরে রেখেছেন।

৪. আবেগের তীব্রতাকে রক্ষা করতে কখনও ২৬ মাত্রাকেও অঙ্গীকার করেছেন।

৫. নতুন কয়েকটি উপমার সৃষ্টি করেছেন।

৬. কবিতার প্রয়োজনে স্বতঃস্ফূর্ত চলনে নতুন শব্দবন্ধ সৃষ্টির প্রয়াস করেছেন।

৭. পুরাণের যথাযথ প্রয়োগে কবিতাকে উজ্জ্বল করেছেন।

৮. পুরাণের নবরূপায়ণ ঘটিয়ে তিনি কাব্যভাবনাকে প্রসার করেছেন।

৯. খণ্ড খণ্ড কবিতার সমবায়ে অখণ্ড ভাবসত্তাকে তুলে ধরে ধরার কৌশল তৈরি করেছেন।

১০. মানসপ্রতিমাকে কাব্যপ্রতিমা হিসেবে প্রতিষ্ঠা দিয়েছেন।

আমার এই অনুসন্ধানের পক্ষে নমুনা ও যুক্তি তুলে না ধরা হলেও পাঠক বুঝতে পারবেন কবির সৃজনীপ্রতিভার শক্তি। কারণ মুহম্মদ নূরুল হুদার কবিতা বহুল পঠিত। এবং বলা যেতে পারে সার্বক্ষণিক সৃজনপ্রক্রিয়ার মধ্যেই তার নিরন্তর অবগাহন।

দ্রাবিড়া কবির মানসপ্রতিমা। কিন্তু তার প্রতি তিনি শোভাযাত্রার কথা বলেছেন। এই শোভাযাত্রার শেষ হতে না হতেই তিনি নাগাল পান এক প্রতীক মানুষের। পাবলো নেরুদাকে নিবেদিত এই কবিতার আয়তন ২০ পৃষ্ঠা। প্রায় ৬ শ চরণের এ রকম দীর্ঘ কবিতা  লেখার দম খুব কম কবিরই থাকে। কবিতাও তো এক দমের খেলা। এই কবি সেই খেলায়ও উত্তীর্ণ।  অক্ষরবৃত্তের নিখুঁত চালে তিনি যে প্রতীক মানুষের সন্ধান করেছেন, সে তো জাতিসত্তারই ধারক। কবিকণ্ঠেই শোনা যাক সেই সন্ধানবাণী :

কোনও এক দ্রাবিড় শহরে, মহেঞ্জোদারোতে কিংবা

হরপ্পায়, তাকেই কি দেখেছি একদা ?

হাজার বছর ধরে অনন্তর শোভাযাত্রা, তাহারি উদ্দেশে।

আজ এই নগরীতে, অশ্রুতপূর্ব এই জনসমাবেশে

তাকে যদি পাই আমি, তাহলে মৃন্ময়ী

দ্বিধা হয়ো; তোমার বিশাল গর্ভে

তা হলে ধারণ করো আশিশ্ন আমায়; যেমন

অতিকায় বনস্পতি পেয়েছে জীবন,

তেমনি তোমার গর্ভে সহস্র বৎসর আমি যাপি-এ-যৌবন।

                                                    (পৃ. ৭৭)

এই দ্রাবিড়া থেকে প্রতীক মানুষের হাত ধরে তিনি মৃন্ময়ীর সন্ধানে ব্যাপৃত হন। এবং পরবর্তী কাব্যের নাম হয় ‘অগ্নিময়ী হে  মৃন্ময়ী’। এটিও ৫০টি পর্বে বিভাজিত একটি সম্পূর্ণ কাব্য। বলা যেতে পারে, একটি ‘মৃন্ময়ী’ প্রতীকের ওপর দাঁড়িয়ে গেছে একটি পূর্ণায়ত কাব্য। এ রকম দম রাখার ক্ষমতা আধুনিক কবিদের পক্ষে খুব কমই দেখা যায়। একাধিক কবিতায় এই দমের খেলা তিনি দেখিয়েছেন। তিনি মৃন্ময়ীর ভিন্ন এক চিত্রকল্প এঁকেছেন :

পারি না, পারি না

মুসার মোজেজা নিয়ে এ-আগুন নেভাতে পারি না;

শর্মিন্দা শরীর সখি কোথায় লুকাই।

অগ্নিময়ী, তুমি তো মৃন্ময়ী

জেগে আছে। বাহুভঙ্গে ভ্রƒণ থেকে ভ্রƒণে

আগুনে নির্মিত তনু, ওই তনু পোড়ে না আগুনে।

                   (‘অগ্নিময়ী হে  মৃন্ময়ী’, পৃ. ১০৯)

মৃন্ময়ীর এই পরিচয়, এই যে অগ্নিসূত্র, তা থেকেও মুহম্মদ নূরুল হুদার জাতিসত্তা অন্বেষণের বিস্তৃত পরিচয় উন্মোচিত হয়।

আমরা তামাটে জাতি কাব্যে মুহম্মদ নূরুল হুদা বাঙালির শারীরবৃত্তীয় পরিচয় সন্ধান পেয়েছেন। বাঙালি সাদা নয়, কালো নয়, তামাটে রঙের শরীর ধারণ করে। জাতিসত্তা সন্ধানে তিনি বাঙালির বয়স খুঁজতে গেছেন।  তিনি বলেছেন :

‘বলুন বয়স কত, আমার বয়স ?’

তাম্রবর্ণ একজন বিনীত বৃদ্ধকে

অবশেষে শুধাই এ কথা।

একজোড়া ভূমণ্ডল দুই চোখে তাঁর

মেতে ওঠে ঘূর্ণিনৃত্যে আলোকের বেগে

আমার কপাল ফুঁড়ে মস্তিষ্কের উষ্ণাধার জুড়ে

ঝরে ঘাম অবিরাম ফোঁটায় ফোঁটায়

অযুত-সহস্র-লক্ষ অণুবোমা ফেটে যায় যেন মৃত্তিকায়

ওরে এ ভীষণ রঙ্গালয়ে

সহসা পড়েছি আমি এস যাদুবলে, যেখানে

আমরই স্কন্ধ হেনে খড়্গ তাক করেছেন আমার জনক।

তবে কি শৈশবহীন তবে কি যৌবনহীন বার্ধক্যবিহীন

আমি এক নচিকেতা পুনর্জন্মহীন ?

                                           (পৃ. ১১০-১১১)

পুনর্জন্মহীন নচিকেতার বংশধর কি আমরা ? এই প্রশ্ন কবির। ‘আমার মা কৃষাণী’ এই পরিচয় দিয়ে কবি নিজেকে কৃষকপুত্র হিসেবে পরিচয় দিতে চান। কবি বলেন ‘তামাটে এক দ্রাবিড় গ্রিয়ট/ গল্পগুলো চালিয়ে দিলাম’। আবার এই কবিই যখন বলেন ‘বাঙালির জন্মতিথি রক্তেলেখা ষোলই ডিসেম্বর’, তখন আমরা ভিন্ন এক স্বাধীন জাতিসত্তার সন্ধান পাই। তিনি লালনের একতারাতেও খোঁজেন বাঙালির পরিচয় :

‘এইভাবে জড় হয় কত-কেউ বিষণ্ন বিদেশি

মাঠের বাউল বাউল তুই, এ বুকে খুঁজিস আজ কোন এলোকেশী।’

(পৃ. ১২১)

কবি বাঙালির পরিচয় খুঁজেছেন লোকবাংলার বিস্তীর্ণ প্রান্তরে। তিনি বলেন :

রাজধর্ম পিছে ফেলে, পিছে ফেলে গোত্রের আরতি

লোকধর্মে লোকসংঘে সুদীক্ষা নিয়েছি

আমরা তামাটে জাতি, আমরা এসেছি।

                                (পৃ. ১৩৪)

মহাকবি কালিদাস ও ঈশ^রচন্দ্রের বিদ্যাসাগরের হাত ধরে কবি নির্মাণ করেছেন শুক্লা শকুন্তলা কাব্য।  এই কাব্যেও কবির চিরায়ত প্রশ্ন :

‘আপনি তো প্রিয় কবি, আমাদের প্রিয় কালিদাস;

ঐতিহ্য অমরাবতী, আমরা কি ঐতিহ্যের দাস ?’

(পৃ. ১৫৭)

ঐতিহ্যের দাস মানে মানুষ তো পরম্পরার ধারক। এই পরম্পরা ফিরে ফিরে সম্মিলিত হয় ‘বঙ্গবন্ধু-মোহনা’য়। ১৯৮৪ সালে তাই দুঃসহ সময়ে যখন ‘বঙ্গবন্ধু’র নাম নেওয়া বারণ, তখন কবি রচনা প্রকাশ করেন ১৯৭৫-পরবর্তী কবিতার সংকলন ‘যিসাস মুজিব’। মুজিবই তো বাঙালির জাতির পরিচয়তিলক এঁকে দিয়েছেন। কবি তাই গৌরবের সঙ্গে উচ্চারণ করেন :

ফুরাবে না গঙ্গাধারা, ফুরাবে না বঙ্গভাষী কবিদের নিব

ফুরাবে না এই রক্ত, পিতা তুমি যিসাস মুজিব।

                                 (যিসাস মুজিব, পৃ. ১৭৪)

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে কবি খুঁজেছেন রাজনৈতিক অভীপ্সা থেকে নয়, বাঙালির আত্মপরিচয় তথা জাতিসত্তা সন্ধানের প্রয়োজনে। এমন কোনও বাঙালি কবি নেই, তার কবিতায় জাতিসত্তার উপকরণ নেই। কিন্তু মুহম্মদ নূরুল হুদা সেই বিরল ব্যতিক্রম, যিনি কবি হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার আগে থেকে আজকে ভোরে যে কবিতটি লিখেছেন, সেখানে জাতিসত্তা-সন্ধানের প্রবল আর্তি ফুটে রয়েছে। পল্লিবিষয়ক কবিতা কুমুদরঞ্জন মল্লিক, বন্দে আলী মিয়া, কালিদাস রায়, যতীন্দ্রমোহন বাগচী লিখলেও, পল্লিকবি বলতে জসীমউদদীনকেই বুঝি। মাইকেল মধুসূদন দত্ত, সুকান্ত ভট্টাচার্য, সুভাষ মুখোপাধ্যায়, বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, নির্মলেন্দু গুণ বিদ্রোহের কবিতা লিখলেও বিদ্রোহী কবি বলতে নজরুলকেই বুঝি। সমর সেন, অরুণ মিত্র, আহসান হাবীব, সানাউল হক, আবুল হোসেন, মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান, আবু হেনা মোস্তফা কামালের কবিতায় নাগরিক  অনুষঙ্গ তীব্রভাবে ফুটে উঠলেও ‘নাগরিক কবি’ বলতে আমরা শামসুর রাহমানকে বুঝি। নির্জনতার বাণী কি বিষ্ণু দে, অমিয় চক্রবর্তীর কবিতায় নেই ? তবু ‘নির্জনতার কবি’ বলতে জীবনানন্দ দাশকেই বুঝি। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, অক্ষয় কুমার বড়াল, সৈয়দ শামসুল হক, আল মাহমুদ, আবুল হাসান, মহাদেব সাহা, রফিক আজাদ, রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহর কবিতায় জাতিসত্তার সন্ধানী পরিচয় খুঁজে পাওয়া গেলেও ‘জাতিসত্তার কবি’ বলতে মুহম্মদ নূরুল হুদাকেই বুঝি। তার প্রথম কয়েকটি কাব্য থেকে মোটা দাগে জাতিসত্তা বিষয়ক কবিতাগুলোর একটি সংকলন বেরিয়েছিল ‘জাতিসত্তার কবিতা’ নামে। সেই সংকলনের পাঠক এবং সৈকত আসগর-সহ কয়েকজন সমালোচক মুহম্মদ নূরুল হুদাকে ‘জাতিসত্তার কবি’ অভিধায় চিহ্নিত করেন। সেই থেকে তিনি আমাদের জাতিসত্তার কবি।

 লেখক : কবি ও গবেষক

Leave a Reply

Your email address will not be published.

shares