প্রচ্ছদ রচনা : মুখোমুখি কথাশিল্পী : সাহিত্য সম্পাদকদের উচিত ভালো লেখক খুঁজে বের করা : সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম

[বরেণ্য সাহিত্যিক, চিন্তাবিদ ও শিক্ষাবিদ সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম। জন্ম ১৯৫১ সালের ১৮ জানুয়ারি। দীর্ঘদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি সাহিত্যে অধ্যাপনা করেছেন। সাহিত্যের জন্য পেয়েছেন বাংলা একাডেমি পুরস্কার ও একুশে পদক। তিনি দেশে-বিদেশে একাধারে কথাসাহিত্যিক, প্রাবন্ধিক, শিল্প-সমালোচক ও সমাজচিন্তক হিসেবে সুপরিচিত। তাঁর উল্লেখযোগ্য বই : থাকা না-থাকার গল্প, প্রেম ও প্রার্থনার গল্প, একাত্তর ও অন্যান্য গল্প, কানাগলির মানুষেরা, তিন পর্বের জীবন, অলস দিনের হাওয়া, রবীন্দ্রনাথের জ্যামিতি ও অন্যান্য শিল্পপ্রসঙ্গ ইত্যাদি। শব্দঘর-এর পক্ষ থেকে তাঁর সঙ্গে কথাবার্তা বলেছেন সৈকত হাবিব।―সম্পাদক]

শব্দঘর : যদিও বিশ্বাসই হতে চাইছে না, তবু আপনার আয়ু সত্তর বছর হয়ে গেল! তো সত্তর পেরিয়ে জীবন সম্পর্কে বিশেষ কোনও অনুভব বা উপলব্ধি ?             

সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম : সত্তর পার হয়ে মনে হয়েছিল প্রবীণদের মধ্যেও প্রবীণ হয়ে গেলাম। তবে অবাক ব্যাপার, এখনও আমি বাংলাদেশের মানুষের গড় আয়ু থেকে দূরে। দিনান্তের দিকে হাঁটতে থাকলে দিনের পথিকের যেরকম লাগে―বিষণ্নতা নয়, অবসাদও নয়, বরং একটা প্রশান্তি, লম্বা এক পথ পাড়ি দেয়ার স্বস্তি―সেরকমই লাগছে।

শব্দঘর : একুশের (১৯৫২) সমান বয়সী আপনি―বাংলাভাষার একজন কথাশিল্পী হিসেবে আপনাকে কীভাবে তা আন্দোলিত করে ?

সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম : সমান বয়সী নয়, একুশকে আমি দেখেছি যখন হাঁটা শুরু করেছি, তখন। একুশ আমাদেরকে স্বাধীনতার দিকে নিয়ে গেছে, যখন তার বয়স কুড়ি। একুশের বয়স এ বছর সত্তর হয়ে গেল। এজন্য কি একুশকে আমরা ভুলতে বসেছি ? আমরা ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ভাষার ওপর বাংলা চাপিয়ে দিয়েছি, তাদের সংস্কৃতির প্রকাশগুলি রুদ্ধ করেছি, তাদের স্বাধীনতা সীমিত করে দিয়েছি। এগুলি একুশ চায়নি। আর বাংলাভাষা নিয়ে আমরা যাচ্ছেতাই করছি। এই ভাষায় উচ্চশিক্ষা এখনও আমরা দিতে পারি না। এ ভাষায় সাহিত্য লিখছি বটে কিন্তু সেই সাহিত্য মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে পারছি না। আমরা দৃশ্যমাধ্যমের দাবির কাছে বাংলা ও আমাদের সংস্কৃতিকে অধীন হতে দিয়েছি। আমাদের দেশের এক-চতুর্থাংশ মানুষ এখনও বাংলাভাষায় (এবং নানা নৃগোষ্ঠীর মাতৃভাষায়) নিজের নামটাও লিখতে পারে না।

একুশকে আমরা প্রবীণ নিবাসে পাঠিয়ে দিয়েছি।

শব্দঘর : স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার ৫০ বছর এবং একুশের ৭০ বছর পেরিয়ে যাচ্ছে। আপনার সৃষ্ট-চরিত্র পিতাম্বরের ‘স্বদেশ’ কিংবা আমাদের জাতীয় জীবনের অর্জন কী বলে মনে করেন ?

সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম : পিতাম্বরের স্বদেশ এখন অনেক বেশি সাম্প্রদায়িক। স্কুলশিক্ষার বইপত্রেও সেই সাম্প্রদায়িকতা ছড়িয়েছে। একুশের বাংলাদেশে ইংরেজি না জানলে বড় চাকরি পাওয়া যায় না। পঞ্চাশ বছরের বাংলাদেশের অর্জন অনেক―এর অর্থনীতি, শ্রমশক্তি, উদ্যোক্তাপ্রতিভা বিস্ময়কর। এ দেশে অনেক কাজ হয়েছে, এর কৃষিজ উৎপাদন অবিশ^াস্য, এর জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ অভাবিত। এ দেশে শিক্ষার বিস্তার ঘটেছে ব্যাপকহারে। শিক্ষায় মেয়েদের অংশগ্রহণও আশাব্যঞ্জক। কাজের নানা অঞ্চলে নারীদের অংশগ্রহণ রীতিমতো অবাক হওয়ার মতো।

এ দেশের এক বড় অর্জন তারুণ্যের শক্তিকে সামনে নিয়ে আসা। এটি সমাজ ও অর্থনীতির একটি যৌগক্রিয়া। এই তরুণরা সাহিত্যকে নিজেদের মতো নির্মাণ করছে। তবে এত অর্জনের বিপরীতে বৈষম্যও আকাশচুম্বি। কোটিপতি মানুষের সংখ্যা এক লক্ষ, আর দারিদ্র্যসীমার নীচে কয়েক কোটি।

শব্দঘর : আপনি দেশ-বিদেশে একজন বরেণ্য বুদ্ধিজীবী। বাংলাদেশের বাস্তবতায় এ দেশের লেখক-বুদ্ধিজীবীরা এলিট শ্রেণির। এই শ্রেণি-পরিচয় এবং তাদের ব্যক্তিস্বার্থ ও জাতীয় স্বার্থের দ্বন্দ্বটিকে কীভাবে বিবেচনা করেন ?

সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম : বাংলাদেশের লেখক-বুদ্ধিজীবীদের একটা ক্ষুদ্র অংশ মাত্র এলিট শ্রেণির, যে অর্থে এলিটরা হচ্ছেন কুলীন, সামাজিকভাবে সুরক্ষিত, উচ্চ-দক্ষতাসম্পন্ন, ক্ষমতাবান ইত্যাদি। লেখকদের এক বড় অংশ জীবনসংগ্রামে ব্যস্ত। বুদ্ধিজীবীরাও সবাই যে দক্ষতায় অন্যদের থেকে অনেক এগিয়ে, তা নয়। বরং বলা যায়, বুদ্ধিজীবীরা অনেকের চাইতে বেশি দৃশ্যমান। কাগজে, মিডিয়ায় নানা মঞ্চে এরা সক্রিয়।

লেখকরা নিজেদের স্বাধীনতা নিয়ে সতর্ক থাকলেও বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে রাজনৈতিক দলনির্ভরতা আছে। সেই অর্থে অনেক বুদ্ধিজীবী চিন্তার স্বাধীনতা নিজেরাই খর্ব করেছেন।

জাতীয় স্বার্থ অর্থাৎ গণমানুষের স্বার্থÑ আমি মনে করি এটি সবার আগে আসা উচিত। তবে নিজেদের স্বার্থ দেখাটা খারাপ কিছু নয়। লেখকদের একটি ক্ষুদ্র অংশ তাদের শ্রেণি-পরিচয়কে প্রাধান্য দেন, বুদ্ধিজীবীরা বরং তা বেশি মাত্রায় করেন। পৃথিবীর সব দেশেই এটি হয়। মোটা দাগে এটি বরং বলা যায় যে, আমাদের লেখক এবং সত্যিকার বুদ্ধিজীবীরা মানুষের সঙ্গেই থাকেন।

শব্দঘর : সাহিত্য-ইতিহাস-রাজনীতি দর্শনের গঁষঃরফরংপরঢ়ষরহধৎু ধঢ়ঢ়ৎড়ধপয নিয়ে আপনার বিবেচনা জানতে চাই। কারণ আপনি নিজেও এই বহুমাত্রিকতা ধারণ করেন ?

সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম : অল্প কথায় এত ব্যাপক বিষয়ে মন্তব্য করা কঠিন। সংক্ষেপেই বরং বলি। সাহিত্যকে আমি দেখি জীবনের প্রতিফলন হিসেবে, সময়ের সঙ্গে যার প্রকাশভঙ্গি পাল্টায়, কিন্তু মূল ভূমিটা একই থাকে। ইতিহাসটা আমার কাছে একটা দ্বান্দ্বিক প্রক্রিয়া। যাদের হাতে ক্ষমতা, তাদের অধিকারে থাকে লিখিত ইতিহাস। তবে অলিখিত কিন্তু প্রবলভাবে অনুভূত ইতিহাসটা থাকে গণমানুষের। এজন্য ইতিহাসের নামগুলিতে আমার বিশ^াস নেই; আছে ঘটনায়, ঘটনার ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ায়, নানা প্রবণতায়, আছে ইতিহাসের সত্যে। সত্যটা কঠিন, কিন্তু ইতিহাসের নানা ফাঁদ এড়িয়ে যেতে তা সাহায্য করে।

রাজনীতিতে যতদিন ‘রাজ’ শব্দটি থাকবে, ততদিন আমার কাছে এটি একটা বাস্তবতা মাত্র, এর বেশি কিছু নয়―শহরের ট্র্যাফিক বাতি অথবা ক্যালেন্ডারের দিন-তারিখের মতো, যার কাজ মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করে একটা শৃঙ্খলা তৈরি করে কিছু কাজ করে নেওয়া। সেসব কাজের সুফল বেশির ভাগ যায় ক্ষমতার পকেটে, অল্প কিছু মানুষের পাতে।

দর্শন হচ্ছে একটা বিষয় নিয়ে করা অংসখ্য প্রশ্ন, তাকে ঘিরে তৈরি হওয়া অনেক চিন্তা, কৌতূহল, ইত্যাদিকে একটা তাত্ত্বিক শৃঙ্খলায় এনে একটা ঘনবদ্ধ রূপ দেয়া। যে মন এই কাজটি করবে, তাকে সেই ক্ষমতা দেবে তার জ্ঞান ও প্রজ্ঞা, এবং সেই জ্ঞান ও প্রজ্ঞা থাকবে একাডেমিক স্তরের উপরে । এই সক্ষমতা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান দেবে তা নয়, এটি নিজের ভেতর থেকেও সৃষ্টি হতে পারে।

দর্শনের বাজার নেই, সনদ নেই, স্বীকৃতি নেই। এটি ব্যক্তির একান্ত সাধনার বিষয়। এজন্য দর্শনের চর্চা এ দেশে হয় খুব কম।

একটা গভীর তলে এ চার বিষয় জড়িত। রাজনীতির একটা দর্শন থাকে, তা আমাদের দেশে নেই; ইতিহাসের একটা রাজনীতি থাকে, তা সাধারণত ব্যক্তি, গোষ্ঠী ও দলনির্ভর হয়ে পড়ে; ফলে ইতিহাসের নানা সত্যের আলোকে এই রাজনীতি গতিশীল হতে পারে না। ইতিহাসের রাজনীতি ইতিহাসকে মানুষের পক্ষে রাখে।

শব্দঘর : বাংলাদেশের বর্তমান কথাসাহিত্যের গতিপ্রকৃতি নিয়ে আপনার বিশ্লেষণাত্মক দৃষ্টিভঙ্গিটি কী ধরনের ?

সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম: বাংলাদেশের বর্তমান কথাসাহিত্যের সব আমার পড়া হয়নি, তা সম্ভবও নয়। যেটুকু পড়েছি, বুঝতে পারছি, সাহিত্যে একটা মোড় ফেরার ঘটনা ঘটেছে। আমি উত্তরাধুনিক সাহিত্য পড়াই, যার আবির্ভাব পশ্চিমে গত শতাব্দীর মধ্যভাগেই। এই সাহিত্য আধুনিকতার নানা ধ্যান-ধারণা, বড় বড় বয়ান ও আদর্শচিন্তাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। আধুনিকতার ভাষা ও শৈলী, কাঠামোচিন্তা ও রূপকল্প যে উঁচু-নীচু, প্রমিত-অপ্রমিত, শুদ্ধবাদী-মিশ্র এরকম নানা দ্বিত্বতাচিন্তায় আকীর্ণ―এই সাহিত্য তা থেকে মুক্ত থাকে। আমাদের দেশেও তা ঘটছে। এখন যেসব তরুণ লিখছেন (এবং উঁচুমানের গল্প-উপন্যাসই লিখছেন) তারা আধুনিকতার ভাষা আর নির্মাণকাঠামো থেকে বেরিয়ে গেছেন, ব্যক্তি-প্রতিষ্ঠান-তত্ত্ব-সূত্র-চিন্তাকে প্রশ্ন করছেন, বিকল্প হাজির করছেন। এটি করতে গিয়ে অবশ্য কেউ কেউ আখ্যান থেকে বেরিয়ে যাচ্ছেন। তা তারা পারেন। কিন্তু বাংলা গল্পের কংকালটা আখ্যানের, যেহেতু এর আদি উৎস মানুষের মুখের বলা গল্প, যার শক্তি আখ্যান।

শব্দঘর : আন্তর্জাতিক বিচারে দক্ষিণ এশিয়ার কে কে নোবেল পুরস্কার পাওয়ার যোগ্য বলে মনে হয় আপনার ?

সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম: নোবেল পুরস্কার নিয়ে আমার কোনো আবেগ নেই, উচ্ছ্বাস তো দূরের কথা। নোবেলের ভুগোলচিন্তা আছে, জাত-পাত ও লিঙ্গ বিচার আছে; এতে পশ্চিমা ভাষার আধিপত্য আছে। ফলে পশ্চিমের এমন কবিও এই পুরস্কার পেয়েছেন, যারা জীবনানন্দ, শামসুর রাহমান বা আল মাহমুদের সঙ্গে এক টেবিলে বসে আহার সমাপনে দ্বিধা করবেন।

দক্ষিণ এশিয়া মানে আপাতত ভারত। কারণ ভারত পরাশক্তি হওয়ার পথে আছে। এটি আগামী দশ বছরে হয়ে যাবে। তখন নোবেলের ভুগোলে ভারত চলে আসবে। পঞ্চাশ বছর পর বাংলাদেশও আসবে, যদি না জলবায়ু পরিবর্তনের ঝাপটায় বঙ্গোপসাগর ঢাকা-টাঙ্গাইলে ঢুকে পড়ে।

শব্দঘর : বিশ্বসাহিত্যের তুলনামূলক পঠন-পাঠনের প্রশ্নে বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলির ভূমিকা নেই কেন ? এ ক্ষেত্রে আপনার আগ্রহ, পরামর্শ ও কার্যকর পদক্ষেপ কী ধরনের হতে পারে ?

সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম : বিশ^সাহিত্য যেহেতু বাজারের পছন্দের তালিকায় নেই, কেউ বিশ^সাহিত্যে একটা এম. এ. ডিগ্রি নিয়ে বেরুলে হয় সে ব্যাংকের নির্বাহী হবে, না হয় বিসিএস ক্যাডার হবে। এ বিষয়টি পড়ে ডিগ্রি নেওয়ার ব্যবস্থা থাকলে বরং ফলটা উল্টো হবে―অর্থাৎ অনেক বই পড়া হবে, কিন্তু পাঠ্যবই হিসেবেই। তাতে সাহিত্যবোধ তৈরি হবে, এমন কোনো কথা নেই। যা করা যেতে পারে, একটা বিশ^বিদ্যালয়ে বিশ^সাহিত্য চর্চা কেন্দ্র খোলা যায়, যেখানে যারা চাইবেন বিশ^সাহিত্য নিয়ে পড়াশোনা ও গবেষণা করতে পারবেন।

তবে, শেষ বিচারে বিশ^সাহিত্য হতে হবে একজন পাঠকের নিজের পছন্দের একটি বিষয়। যদি স্কুল থেকেই এ ব্যাপারে উৎসাহ দেওয়া হয়, তাহলে আগ্রহটা তৈরি হবে। নিজ থেকে দায়িত্ব নিয়ে একশজনও যদি বিশ^সাহিত্য পড়ে, তাহলে একহাজার বিশ^সাহিত্য ডিগ্রিধারী থেকেও তা বেশি কাক্সিক্ষত হবে। আর বিশ^সাহিত্য নিয়ে কোনো কাজ শুরু করার আগে হয় আমাদের শিক্ষার্থীদের অনেকগুলি ভাষা শেখাতে হবে, না হয় অতি-উত্তম অনুবাদে বিশ^সাহিত্যকে বাংলাদেশের পাঠকের কাছে পৌঁছে দিতে হবে। দুর্বল অনুবাদে যে কোনো বই বা লেখকের অবস্থানটাও দুর্বল হয়ে পড়ে।

শব্দঘর : বাংলাদেশের কথাশিল্পের ভবিষ্যৎ-নির্মিতি নিয়ে আপনার স্বপ্ন ও আকাক্সক্ষা বিষয়ে শুনতে চাই ?

সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম : বাংলাদেশের কথাসাহিত্যের ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল―এ কথা আমি জোর গলাতেই বলি। তার কারণ (আপাতত) তিনটি―প্রথমত, যে মোড় ফেরার কথা আমি লিখেছি, সময়ের বিবর্তনে এবং দৃশ্যমাধ্যম ও ইন্টারনেটের প্রাবল্যে যা অনিবার্য হয়ে পড়েছিল, তাতে একটা শক্তির সমাবেশ আমি দেখতে পাচ্ছি, যা গল্প বলার, ভাষার, প্রকাশের। কাঠামো, নির্মিতি ও গল্পের কলকব্জা নিয়ে নতুন উদ্যম আমার বেশ চোখে পড়ে। দ্বিতীয়ত, তরুণরা এখন ‘গুরুমুখী’ নন; তারা নিজেরাই উদ্যোক্তা, তাদের ভুবনে তারাই প্রধান। এই বিশ^াস নতুন সৃষ্টির পক্ষেই যায়। আর তৃতীয়, নিরীক্ষা, এডভেঞ্চার আর চমকের মধ্যেও এমন অনেক গল্প-উপন্যাস লেখা হচ্ছে, যেগুলো শেষ পর্যন্ত গল্পই হচ্ছে। পিকাসোকে নাকি এক আধুনিক চিত্রকর তার নানা নিরীক্ষাধর্মী, বিমূর্ত ছবি দেখাচ্ছিলেন, আর এক পর্যায়ে ধৈর্য হারিয়ে পিকাসো বলেছিলেন, একটা ঘোড়া এঁকে দেখুন তো মশাই।

এই তরুণরা ঘোড়াটাও আঁকছে।

শব্দঘর : পিছিয়ে পড়া ‘কালো’ আফ্রিকার গদ্যসাহিত্যও বিশ্বে এক সমুজ্জ্বল উপস্থিতি প্রমাণ করেছে―সে-বিচারে বাংলা সাহিত্যের অবস্থান কোথায়?

সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম : ‘কালো’ আফ্রিকা কথাটা উপনিবেশী বর্ণনার। যে অর্থে আফ্রিকাকে ঔপনিবেশিকেরা কালো বলত, তা ছিল ভীষণ নেতিবাচক―বর্বর, অসভ্য, যুক্তিহীন, ভয়ংকর। আফ্রিকার উপনিবেশমুক্তি হবে না, যদি না কালো-সাদার দ্বিত্বতা থেকে বের হয়ে মহাদেশটিকে দেখা হয়। এবং আফ্রিকা একটা দেশ তো নয়, যেমন এশিয়া নয়, অনেক দেশ নিয়ে মহাদেশটি। এখানে অসংখ্য ভাষা, অসংখ্য সংস্কৃতি, অনেক সাহিত্য। আফ্রিকাকে একক একটি ভূমিসত্তায় প্রতিষ্ঠা দেওয়া উপনিবেশী সামান্যিকরণ ও হোমোজেনাইশনের এক উদাহরণ। এজন্য আফ্রিকার নানা দেশের কথা আমাদের আলাদা করে বলা উচিত। তবে মনে রাখতে হবে গল্প বলাটা আফ্রিকার একটা অভিন্ন এবং পুরনো ঐতিহ্য। গল্পের শ্রোতারা হারিয়ে যায়নি। ফলে যারা পড়তে শিখেছে, তারা বই কিনে পড়ে। স্কুলে পাঠ্যবইয়ের বাইরের বই পড়াকে উৎসাহিত করা হয়। তাছাড়া দক্ষিণ আফ্রিকা, নাইজেরিয়া, কেনিয়া অথবা জিম্বাবুয়েতে ইংরেজিতেই অনেক লেখক লেখেন, যেহেতু যোগাযোগের প্রধান ভাষা ইংরেজি। সেই ভাষার মানও উঁচু। ইংরেজি ভাষার দক্ষতা থাকায় ভালো অনুবাদও হয়। এজন্য আফ্রিকার অনেক লেখক সারা বিশে^ পঠিত।

আফ্রিকার কোনও দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের মিল খুঁজে পাওয়াটা কঠিন―ওই উপনিবেশিকতার অভিন্নতা ছাড়া। সেজন্য সাহিত্যের তুলনাটাও কষ্টকর হবে।

শব্দঘর : বাংলাদেশের সাহিত্যের উন্নতির জন্য আমাদের সাহিত্যিকদের কী করা উচিত ? এক্ষেত্রে গণমাধ্যম, বিশেষত সাহিত্য পত্রিকার সম্পাদকদের করণীয় কী ?

সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম : এ সম্পর্কে আমি আগেই বলেছি। আমি আশাবাদী। তবে সাহিত্যপাঠের পরিসর বাড়াতে হবে। সারা দেশে গ্রন্থাগার স্থাপন করতে হবে, প্রতিটি স্কুলে গ্রন্থাগার চালু করতে হবে। যদি পাঠকসংখ্যা ব্যাপক হারে বাড়ে, সাহিত্যিকরা লিখেই জীবন নির্বাহ করতে পারেন, তাহলে সাহিত্যের মানও বাড়বে।

সাহিত্যিকদের কাজ ভালো কাজ করে যাওয়া। পুরস্কারের ফাঁদে পা না ফেলা। পাঠক সৃষ্টির চেষ্টা করা। সাহিত্য সম্পাদকদের উচিত ভালো লেখক খুঁজে বের করা। তবে সাহিত্য সম্পাদকদের জায়গাটাও যে সংকুচিত হয়ে আসছে, তাও মনে রাখা উচিত।

শব্দঘর : আপনি কেবল কলারসিকই নন, ব্যক্তিগতভাবেও খুব রসিক। আপনার এই গুণটির ক্ষেত্রে কি নানা সৈয়দ মুজতবা আলীর কোনো প্রভাব ?

সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম : সৈয়দ মুজতবা আলী অবশ্যই একজন অনুপ্রেরণার নাম। তবে রসবোধ (আমার কতটা আছে আমি জানি না) ব্যক্তিগত বিষয়। মুজতবা আলী বলতেন, সব মৌমাছিই মৌমাছি, ফুলে ফুলে সবাই ঘোরে, কিন্তু কেউ মধু বেশি সংগ্রহ করে, কেউ কম।

জীবনের সব ক্ষেত্রে তা-ই হয়তো ঘটে।

শব্দঘর : আপনার মা ও আপনি দুজনেই পেশাগতভাবে শিক্ষকÑ একজন স্কুলের, একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের। এ দুই জায়গা মিলিয়ে যদি বাংলাদেশের সার্বিক শিক্ষাব্যবস্থার তুলনা ও মূল্যায়ন করতে বলি…

সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম : আমার মা আমার প্রথম শিক্ষকও ছিলেন। তিনি মেয়েদের স্কুলে পড়িয়েছেন, আমার জন্মের অনেক আগে থেকে। আমার বাবাও শিক্ষা বিভাগে চাকরি থেকে অবসরে যাওয়ার আগে কয়েক বছর সিলেট সরকারি পাইলট স্কুলের প্রধান শিক্ষক ছিলেন। শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে অনেক কথাই বলা যায়। উন্নতি অনেক হয়েছে। শিক্ষার বিস্তার ঘটেছে। কিন্তু মানের ঘরে ঘাটতি থেকেই যাচ্ছে।

শব্দঘর : বাংলাদেশে আপনার শ্রেণির মানুষেরা নানাভাবে ক্ষমতায়িত হতে পছন্দ করেন। যেমন: বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি কিংবা বাংলা একাডেমির মতো প্রতিষ্ঠানের মহাপরিচালকের পদে থাকা। উভয় ক্ষেত্রেই সুযোগ থাকা সত্ত্বেও আপনি ব্যতিক্রমীভাবে অনীহা প্রকাশ করেছেন। এর নেপথ্যে কী কারণ ?

সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম : প্রতিষ্ঠান থাকলে প্রতিষ্ঠান প্রধানের পদ থাকবে, নানা উপ-পদ থাকবে। সেগুলিতে কেউ না কেউ যাবে। কিন্তু আমি ভেবেছি কোনো প্রতিষ্ঠানের বড় পদে বসার জন্য তো আমি তৈরি হইনি, সে যোগ্যতাও আমার নেই, আমি তৈরি হয়েছি শিক্ষক হওয়ার জন্য। শিক্ষকতা আমাকে যা দিয়েছে, কোনো বড় পদ তা দিতে পারত না।

এই সন্তুষ্টিটা, এই পছন্দটা আমার একান্তই ব্যক্তিগত।

শব্দঘর : ইংরেজি সাহিত্যের বরেণ্য অধ্যাপক হওয়া সত্ত্বেও আপনার লেখালেখির সিংহভাগই বাংলাভাষায়। অথচ আমাদের জাতীয় মানসিকতা হলো মাতৃভাষাকে সচেতন-অচেতনভাবে অবজ্ঞা করা। এ বিষয়ে আপনার দৃষ্টিভঙ্গিটা একটু শুনতে চাই ?

সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম : আমি ইংরেজিতে লিখেছি―সেসব লেখা একাডেমিক। ইংরেজিতে ক্লাস নিচ্ছি। আমার কিছু গল্প ইংরেজিতে অনুবাদ করে একটা সংকলনও ছাপিয়েছি। কিন্তু বাংলাভাষায় লিখে আমি আনন্দ পাই, আমার প্রাণটা যেহেতু বাংলাভাষায় পোতা। মাতৃভাষাকে কেন অবজ্ঞা করা হবে? যদি কেউ করে, তাহলে তার সম্পর্কে আবদুল হাকিম অনেক আগেই তো কিছু কথা লিখে গেছেন। তার পুনরাবৃত্তি প্রয়োজন নেই।

আমি ইংরেজিতে কথা বলি, যখন প্রয়োজন হয়। কিন্তু স্বপ্ন দেখি বাংলায় (এবং সিলেটি ভাষায়)। আমার সাহিত্য নিশ্চয় এই ভাষাতেই লিখলে ভালো (সিলেটি ভাষায় লিখতে পারি, কিন্তু তা হবে একটু বেশি পরিশ্রমের)। কিন্তু যিনি ইংরেজিতে স্বচ্ছন্দ, এতে দখলটা দারুণ, ধরুন দু-এক স্বপ্নও দেখেন ইংরেজিতে, তিনি সেই ভাষাতেই লিখতে স্বাচ্ছন্দ্য পাবেন।

লেখার ভাষাটা ব্যক্তিগত পছন্দের ব্যাপার। কিন্তু অবজ্ঞার বিষয়টা ভিন্ন―এতে জড়িত দৃষ্টিভঙ্গি, শ্রেণি অথবা ভঙ্গিগ্রহণের বিষয়।

শব্দঘর :  দীর্ঘ সৃষ্টিশীল, কর্মমুখর আর অভিজ্ঞতাঋদ্ধ জীবন পেরিয়ে এলেন আপনি। এই পথ হাঁটার কোনো নির্যাস যদি সংক্ষেপে শুনতে চাই… ?

সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম : পথ হাঁটার তো কোনো সংক্ষিপ্তসার হয় না, যা হয় তা যতির, দ্রুতির, স্থিতির আর পরিস্থিতির নানা বিবরণ। এগুলোর যোগফল হলো আত্মজীবনী। সেই চিন্তা আমার নেই।

অল্প কথায় বলি, পথটা বাংলাদেশের মেঠো পথের মতো―উঁচু নীচু, কিন্তু টেনে ধরে রাখে। এই পথের শেষে একটা ঠিকানা যদি থাকে, গন্তব্য শেষের, ভালো; না থাকলেও চলে। লাউয়াছড়ার বনে,  অনেক আগে, তরুণ বয়সে, দুই বন্ধুর সঙ্গে বেড়াতে গিয়ে পথের শেষে দেখেছিলাম অন্ধকার। সেই অন্ধকার তরল করে এক সময় অজস্র জোনাকি জ¦লল। জোনাকিদের নাচ দেখে মনে হয়েছিল, অন্ধকারও কত দ্যুতিময় হতে পারে।

আমার পথের শেষে হয়তো অন্ধকারই থাকবে, তাহলে কয়েকটা জোনাকি সেখানে আলো মেলে বসে থাকলেই চলবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published.

shares