অস্ত্র : সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম

আবার পড়ি : সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের গল্প

পনির আলি তার নাম নিয়ে বরাবরই খুব বিব্রত। তার বাবা কেন এই নামটি রাখল―পনিরের ধারণা নেই। জিজ্ঞেস করারও সুযোগ হয়নি। বাবা ইসলামপুরের কাটা কাপড়ের দোকানে কাজ করত, হঠাৎ তিন দিনের জ্বরে লোকটা মারা গেল। পনিরের বয়স তখন ১০ কি ১১, সুরিটোলা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ক্লাস ফাইভে পড়ে। কী হয়েছিল পনিরের বাবার ? খুব খারাপ রকমের নিউমোনিয়া; তবে তা পনির, তার মা অথবা পাড়ার ডাক্তার―কেউই জানত না। ডাক্তার ভেবেছে সর্দিজ্বর, সেমতো ওষুধপত্র দিয়েছে। অবাক কাণ্ড! তো পাড়ার ডাক্তারকে দোষ দিয়ে কী লাভ, বড় বড় ডাক্তাররাই তো কত এ রকম উল্টাপাল্টা চিকিৎসা করেন, গ্যাস্ট্রিকের রোগীকে বাইপাস করে টেবিলেই মেরে ফেলেন, কেননা গ্যাস বাড়লে হার্টে যখন চাপ পড়ে, মনে হতে পারে হার্ট অ্যাটাক হয়েছে। দেখেননি ?

পনিরের বাবার খবরটা আমরা জানলাম কী করে ? কেন, এসব জানাই তো আমাদের কাজ। লেখক হিসেবে ব্যাপারটা আমাদের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে যায়। না-হলে গল্প লিখব কী করে ?

পনির আলি জানে না, বাবা পনির ভালোবাসত কি না; বস্তুত কখনও পরিবারে একখণ্ড পনির দেখতে পায়নি সে, কেনার সামর্থ্য ছিল না। হয়ত পনির ভালোবাসত লোকটা, কে জানে। কিন্তু পনিরের একটা রাগ আছে বাবার ওপর―কেন তাকেই বেছে বেছে এই নাম দিতে হবে ? ছোট যে ভাইটা জন্মের পর তিন মাসের মাথায় মরে গেল, তার নাম পনির রাখলেই তো ল্যাঠা চুকে যেত। আসল পনিরের মতো সে-ও যে রকম দুষ্প্রাপ্য হয়ে থাকল সবার নাগালের বাইরে চলে গিয়ে।

মাকে জিজ্ঞেস করেও লাভ হয়নি। মা এসব প্রশ্নের উত্তর দিত না। অথবা হয়ত বলত, জানি না। একসময়, সংসারটা যখন টেনেটুনে কোনও রকম চলে যেত―যত দিন বাবা বেঁচে ছিল―মায়ের দু-এক কথা বলার সময় ছিল। কিন্তু বাবা মারা যাওয়ার পর সংসারের পুরো ভারটা নেমে আসে মায়ের কাঁধে। সারা দিন মাকে দেখতেই পেত না পনির, জিজ্ঞেস করবে কখন ? বাবার লাশ দাফন, কুলখানি―এসব করতে গিয়ে মায়ের শেষ সম্বল দুই গাছি সোনার চুড়ি বিক্রি করতে হয়েছে। আমাদের দেশে ভদ্র লাশদের সৎকারের জন্য আবার এক কাঁড়ি টাকা লাগে। গোরস্তানে জমির আকাল, পাঁচ-সাত হাজার খরচা হয়ে যায় উপজেলা-ধরনের শহরেই! পনিরের মায়ের জেদ ছিল, স্বামীকে ভদ্রলোকের মতো দাফন করবে। লোকটা যে ভদ্রলোক ছিল! অনেক ভদ্রলোকই ছেলের নাম পনির রাখেন। সেদিক থেকে দেখতে গেলেও পনিরের বাবার ভদ্রলোকের মতো সৎকার হওয়ার পথে কোনও বাধা থাকার কথা ছিল না।

পনিরের মা একদিন কাজ শেষে বাসায় ফিরে এসে পনিরকে বলেছে, আর তো পারি না, বাবা। পনির অসম্ভব অবাক হয়েছে। মা বংশালের চার-পাঁচ বাসায় এবং দুটো হোটেলে ছুটার কাজ করে। সকাল সাতটায় বেরোয়, সন্ধ্যায় ফেরে। আজ ফিরেছে তিনটের আগেই। অর্থাৎ বোগদাদীয়া হোটেলের কাজটা করেনি। এ বিষয়টা বাদ দিলেও, মা যে তার সঙ্গে আস্ত একটা বাক্য বিনিময় করেছে, তাতেই অবাক হয়েছে পনির। আর তৃতীয় অবাক হয়েছে মায়ের এই ঘোষণা শুনে।

পনিরের মা বলল, পড়াশোনা করে চাকরি পেতে পেতে সেই কবে। এত দিনে আমি কি চালাতে পারব ? ফুলি আর দুলি আছে, ওরাও বাড়ছে। তুই একটা চাকরি তালাশ কর।

তারপর মা কাঁথা মুড়ি দিয়ে শুয়ে পড়েছে। উঠেছে পাঁচ দিন পর। ভাইরাস আর সর্দিজ্বর। ভাগ্য ভালো, ডাক্তার সর্দিজ্বরের ওষুধই দিয়েছে, ফলে সে সেরে উঠেছে। কিন্তু নিউ ভাই ভাই হোটেলের চাকরিটা গেল, এক বাসার চাকরি গেল। কেন যাবে না ? গায়ের জোর কমেছে। পনিরের মা এখন অসহায় ও দিশাহারা।

ফলে পনির ধোলাইখালের একটা গ্যারেজে চাকরি নিয়েছে। পড়াশোনা ক্লাস এইট পাস। ফুলি এক বছরের বড়, দুলি দুই বছরের ছোট। তারা বাড়ছে, অর্থাৎ বিয়ের যোগ্য হচ্ছে।

বঙ্গদেশে গরিব মেয়ে মানুষ বিয়ের যোগ্য হলে ভারি বিপদ হয়।

পনির তার বইখাতাগুলো আঁকড়ে ধরে হাউমাউ করে কেঁদেছে। বুকে চেপে ধরে থরথর করে কেঁপেছে এবং কেঁদেছে, চোখের পানিতে ছেঁড়াখোঁড়া পাতাগুলো ভিজেছে। এ কথাগুলো একটাও বানানো নয়―সব নিখাদ সত্যি। পনির পড়াশোনাকে অসম্ভব ভালোবাসত। ভালো ছাত্রটাত্র ছিল না, অঙ্কে মাথাটা মোটাই ছিল। কিন্তু পড়াশোনা ব্যাপারটায় সে খুব মজা পেত। ব্যাগে বই ঝুলিয়ে স্কুলে যেতে ভালোবাসত পনির। পলিথিনের মচমচ শব্দ হতো এবং তার মনে হতো, সে দিগ্বিজয়ে বেরিয়েছে। তার এ রকমও মনে হতো―গোসল করে, মাথায় তেল মেখে চুল আঁচড়ে শার্ট-প্যান্ট এবং কেডসের জুতা পরে সে যখন ফিটফাট স্কুলে যেত―যেন মানুষজন তাকে চেয়ে চেয়ে দেখছে। কেন মানুষজন দেখবে ? মানুষজনের কি খেয়ে কাজ নেই ? না, তারা হতবাক হয়ে গেছে―এমন স্কুলযাত্রা তারা ইহজীবনে দেখেনি।

বস্তুত, স্কুলে যাওয়ার সময়টাই ছিল পনিরের জীবনের শ্রেষ্ঠ সময়।

ক্লাস সেভেনে পনির একটা দিনও স্কুল কামাই করেনি। পরীক্ষার ফল যেদিন বেরুল, স্কুলের প্রধান শিক্ষক তার হাতে প্রোগ্রেস রিপোর্টের সঙ্গে একটা পুরস্কার ধরিয়ে দিলেন। একটা বই, বরণীয় মানুষের স্মরণীয় বাণী, সংকলক প্রিন্সিপাল আজাদুর রহমান। পনির আগে কোনও দিন কোনও পুরস্কার পায়নি, সে বইটি পেয়ে অভিভূত হয়ে গেল। চোখ দিয়ে তার পানি পড়েছিল সেদিন। কাজেই, অবাক হওয়ার কিছু নেই যে বইটি অচিরেই পনিরের সবচেয়ে প্রিয় বস্তুতে পরিণত হলো। দিনে-রাতে অন্তত একবার সে বইটা পড়ত, কিছু না হলেও তিন-চারটা বাণী। পড়ে পড়ে প্রায় সব বাণী তার মুখস্থ হয়ে গেল। তবে বইটা খুলে অনেকক্ষণ সে প্রথম সাদা পৃষ্ঠার স্বর্গীয় হস্তাক্ষরের দিকে তাকিয়ে থাকত―ক্লাস শিক্ষক গোটা গোটা অক্ষরে লিখে দিয়েছিলেন, ‘মু. পনির আলিকে, তার সময়ানুবর্তিতার জন্য পুরস্কারস্বরূপ।’ সময়ানুবর্তিতা শব্দটির অর্থ পনির জানত না, কিন্তু তাতে কোনও ক্ষতিবৃদ্ধি হয়নি। বরং ক্লাস শিক্ষকের হাতে নিজের নামটা লেখা দেখে এই প্রথম পনির নামটি নিয়ে তার দুঃখ সে ভুলে গেল। তার মনে হলো, মু. পনির আলির মতো এত সুমিষ্ট নাম পৃথিবীতে আর নেই। পনির আলি হচ্ছে নিয়মানুবর্তিতার পরাকাষ্ঠা―কথাটির অর্থ যা-ই হোক। মনে মনে সে সময়ানুবর্তিতার প্রেমে পড়ে গেল।

মা যখন পনিরকে বলল, পড়াশোনা ছেড়ে তাকে কাজ দেখতে হবে, পনির জানল, এটিই ধ্রুব। মহামতি সিসেরো বলেছেন, ‘যাহা ধ্রুব তাহাই সত্য;’ কনফুসিয়াসও বলেছেন, ‘ধ্রুব সত্যই চূড়ান্ত সত্য।’ এসব কথা সে প্রাগুক্ত পুস্তক থেকে শিখেছে। আরও সে শিখেছে, ‘মাতৃ আদেশ অলঙ্ঘনীয়।’ প্রিন্সিপাল আজাদুর রহমানের মতে, এই বাণীটি হাজি মুহম্মদ মুহসীনের মুখনিঃসৃত। হতেও পারে। তবে পনির শুধু মায়ের বলা ধ্রুব সত্যটিই অনুধাবন করল না, সে জানল এর পেছনে আরও সত্য আছে। সংসারের অবস্থাটা সে দেখেছে: ফুলি-দুলি বড় হচ্ছে; তাদের গায়ের ছেঁড়া জামাও সে দেখেছে; দিনে দিনে পাতের খাবার যে কমছে এবং মায়ের শরীরটা যে ভাঙছে, এসবও তার চোখে না-পড়ার কথা নয়।

তারপরও ক্লাস এইটের পরীক্ষাটা দেওয়া পর্যন্ত সে সময় চেয়েছে। বৃত্তি পরীক্ষা দিয়েছিল, পায়নি। কিন্তু ক্লাস ফাইনাল পরীক্ষায় পাস করে নাইনে উঠল সে, অঙ্কেও ভালো নম্বর পেল। অতঃপর, এক শীতের সকালে গোসল সেরে মাথায় তেল মেখে চুল আঁচড়ে শার্ট-প্যান্ট কেডস জুতা পরে হাতে পলিথিনের ব্যাগ দুলিয়ে মচমচ শব্দে স্কুলে যাওয়ার পরিবর্তে অনেকটা নিঃশব্দে ―যেন সে কোনও নিশিকুটুম্ব, মধ্যরাতে বিড়ালের মতো সতর্ক পায়ে পাড়ায় বেরিয়েছে, সে রকম―হাঁটা দিল ধোলাইখালের নান্টু মিয়ার কার কিং গ্যারেজের উদ্দেশে। নান্টু মিয়া বোগদাদিয়া হোটেলে দুপুরের খাবার খায় দুপুর তিনটের পর। এটিই তার রুটিন। সেখানে পনিরের মা তাকে অনুরোধ জানিয়েছিল পনিরের জন্য একটা চাকরির। নান্টু মিয়া কম কথার মানুষ। বলেছিল, পাঠাইয়া দিবা, পছন্দ হইলে নিমু, নাইলে না। পছন্দ হলো। চটপটে ছেলে, পড়াশোনা জানে। তবে শুরুতেই নান্টু মিয়া দুটি নির্বাহী আদেশ জারি করেছে, বলেছে, কান্নাকাটি করা চলবে না। (পনিরের চোখে স্কুল হারানোর অশ্রু ছিল)। নান্টু মিয়ার মতে, কান্নাকাটি মেয়েমানুষের কাজ। কান্নাকাটিতে জীবনের মন গলে না। জীবনটা কঠিন―গ্যারেজের লোহালক্কড়, নাটবল্টুর মতো। তার দ্বিতীয় আদেশটি ছিল কেডস না পরে আসার জন্য। ‘বুঝলা পনির মিয়া,’ নান্টু বলেছে, ‘তুমি জুতা পরলে আমার কিছু কওনের নাই; তুমার জুতা তুমি পরবা। কিন্তু অন্য পোলাপানগুলার চক্ষে জিনিসডা ভালা লাগব না। তাগো তো জুতা নাই। সমস্যাডা তুমার হইব।’ পনির বুঝল। দুটো আদেশই সে মেনে নিল। কিছুদিন পর নান্টু মিয়া তৃতীয় একটা নির্বাহী নির্দেশ দিল। সে দেখেছে পনির একটা বই নিয়ে আসে কাজে; সেটি তার পলিথিনের ব্যাগে থাকে। ছেলেটি কাজের ফাঁকে ফাঁকে দু-একবার বইটা খুলে দেখে―পড়ার সময় পায় না, শুধু দু-একবার দেখে ব্যাগে রেখে দেয়, অন্য ছেলেরা আড়চোখে তাকায় আর হাসে। তবে নান্টু মিয়ার সমস্যাটা অন্য জায়গায়―পলিথিনের ব্যাগ নিয়ে কারও কাজে আসাটা সে পছন্দ করে না। গত বছর এক ছেলে ব্যাগে ভরে একটা কারবুরেটর পাচার করে দিয়েছে। পনিরকে সে সন্দেহ করে না, করার কোনও কারণও নেই, কিন্তু ব্যাগ জিনিসটা দেখলে তার অস্বস্তি হয়। সে পনিরকে বলল, ‘বুঝলা পনির মিয়া, বই জিনিসডা খুবই ভালা, কিন্তু এইডা পড়ার জায়গা এই গ্যারেজ না। ছেলেগুলা শুধু শুধু তুমারে নিয়া হাসব।’

পনির বুঝল। সে বলল, কাল থেকে বইটা/ব্যাগটা আর আনবে না।

নান্টু মিয়ার এ নির্বাহী আদেশটি দিতে খারাপ লেগেছে। নিজেকে দোষী মনে হয়েছে। যত যা-ই হোক, বই বলে কথা, বইয়ের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা! সে হেসে একটা ছড়া কাটল―তার ধারণা, ছড়াটা শুনে পনির আমোদ পাবে। ছড়াটা নিম্নরূপ:

বই চাইলে যাও বাংলাবাজার

লোহালক্কড়ের জন্য যাও ধোলাই পার॥

আপনাদের মধ্যে যদি কেউ জ্ঞানতাপস থাকেন, প্রচুর বই পড়েন এবং ঘরেতেও বই রাখেন এবং নিবাস হয় ধোলাইখাল এলাকাতে, তাহলে দয়া করে অপরাধ নেবেন না। ছড়াটি আমার নয়, নান্টু মিয়ার এবং নান্টু মিয়া এটি বানিয়েছে জীবনের রূঢ় আঘাতে বিপর্যস্ত একটি দুখী ছেলেকে ক্ষণিক আমোদ দেওয়ার জন্য।

কিঞ্চিৎ আমোদ যে পনির মিয়া পায়নি, তা নয়। কিন্তু তার থেকে বেশি পেয়েছে আঘাত। গ্যারেজের কাজ মানে পড়াশোনার পাট চুকিয়ে দেওয়া―সেটা সে জানত। কিন্তু তাই বলে বরণীয় মানুষের স্মরণীয় বাণী নিষিদ্ধ হয়ে যাওয়া ? তার প্রিয় সম্পত্তিটির সঙ্গে দিবাকালীন সম্পর্কচ্ছেদ ? নান্টু মিয়ার নির্দেশ শুনে তার মনে হয়েছিল, এর থেকে যদি তাকে একটা পা অথবা দুটি কান অথবা মগজটা বাসায় রেখে আসতে বলা হতো, তাহলেও সে এতটা দুঃখিত হতো না। সেদিন সন্ধ্যায় ঘরে ফেরার পথে পনির দুটি (দ্বিতীয়টি প্রথমটির বিকল্প) সিদ্ধান্ত নিয়েছিল―এক. বরণীয় মানুষের স্মরণীয় বাণীকে সে বংশাল রোডের মোড়ে ঢাকনা-খোলা ম্যানহোলটাতে ফেলে দেবে অথবা নিজেই লাফ দেবে ওই ম্যানহোলের ভেতরে। লাফ দেওয়ার চিন্তাটা মাথায় এলে সে একটা ট্রাকের কথাও ভাবল অথবা শেষ ভরসা হিসেবে গেন্ডারিয়ায় গিয়ে ট্রেনের নিচে ঝাঁপ দেওয়া। দ্বিতীয় সিদ্ধান্তটি পাকা করার আগেই সে বাতিল করেছে। মায়ের মুখটা মনে পড়েছে। কিছুদিন হলো মায়ের ঠোঁট ফেটে রক্ত পড়ছে। সে পরীক্ষা করতে গেলে মা হাত সরিয়ে দিয়েছে, বলেছে, নিজের কাজ কর। অর্থাৎ বাবা পনির, গরিব মানুষের ঠোঁট ফাটা, না-ফাটায় কী আসে-যায় ? তুমি এর কতটুকু আর মেরামত করবে ? তবু রক্ষা, ঠোঁটটা খসে পড়েনি। পনির ভেবেছে, প্রথম মাসের মাইনে দিয়ে মাকে একটা ঠোঁটের স্নো কিনে দেবে। ম্যানহোলে লাফ দেওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণের সময় ম্যানহোলটার কাছেই সে ছিল; সে গলা বাড়িয়ে দেখেছে ম্যানহোল থেকে মানুষের মল উপচে উঠছে। থিকথিক মল, সারা জায়গাজুড়ে দুর্গন্ধ। ওয়াক। বরণীয় মানুষের স্মরণীয় বাণীকে সে প্রাণে ধরে ওই বিবরে ফেলতে পারবে না। আর ট্রেনের ব্যাপারটা নিয়ে ভেবে সে দেখেছে, এতে হতাশাই শুধু বাড়বে। গেন্ডারিয়ার ট্রেনের লাইনে সে যদি সারা রাত ঘুমিয়েও থাকে, ট্রেনে কাটা পড়বে না। এ লাইনে যারা ঝাঁপ দিয়ে বা শুয়ে পড়ে আত্মহত্যা করতে চায়, তাদের জন্য সময়টা ভালো নয়। ট্রেনের আকাল চলছে।

পনির ভাবল, বইটা বরং সে কোথাও লুকিয়ে রেখে দেবে। আর পড়বে না। ফাঁকা রাস্তায় দাঁড়িয়ে তার কান্না পেল। অনেকক্ষণ নিঃশব্দে কাঁদল। তারপর ঘরে ফিরে বোনদের সঙ্গে ঝাঁজ দেখালো। রাতে কিছু খেল না।

কিন্তু তাতে কারও কিছু এসে গেল বলে মনে হলো না। কেউ তাকে খাওয়ার জন্য দ্বিতীয়বার অনুরোধ করল না।

একটা পলিথিনের ব্যাগে বরণীয় মানুষের স্মরণীয় বাণী পেঁচিয়ে সে চাল থেকে ঝোলানো কেরোসিনের খালি টিনটাতে রেখে দিল। টিনটি অবশ্য পুরো খালি নয়, এতে জমা হয়েছে তার স্কুলজীবনের কিছু টুকিটাকি স্মৃতি―কাঠপেনসিল। রাবার। মার্বেল। বইখাতা সে আগেই বিক্রি করে দিয়েছে পরীক্ষার পর, বরাবরের মতো।

টিনটি তার নিজস্ব সম্পত্তি। এই টিনে মা হাত দেয় না। ফুলি-দুলিও না।

মাকে না বলে সে পারল না, তার জীবনের সবচেয়ে দুঃখের কথাটি। মা চুপচাপ শুনল। কোনও মন্তব্য করল না, কোনও সহানুভূতি দেখালো না। আপনি-আমি হলে ছেলেকে কোলে নিয়ে হাউমাউ করে কাঁদতাম, আইসক্রিম পারলারে নিয়ে যেতাম, ক্রিকেট ব্যাট কিনে দিতাম। পনিরের মা সে রকম কিছুই করল না। শুধু পনিরের এলোমেলো চুলগুলো আঙুল দিয়ে সমান করে দিতে লাগল।

মায়ের এই নিস্পৃহ কাজটি তার চোখের জলের উৎস থেকে সব পাথর যেন সরিয়ে দিল।

পনিরের এই বুকফাটা কান্না শুনে আপনার মনে হতে পারে যে সে খুব নরম দিলের লাজুক ছেলে। আসলে কিন্তু তা নয়। লাজুক-টাজুক মোটেও সে নয়। কঠিনই বরং বলা যায়। তা না হলে, বছরখানেকের মধ্যে একটা কঠিন, প্রাপ্তবয়স্ক পৃথিবীতে সে নিজের জন্য একটা জায়গা করে নিল কী করে ? পনিরের কোনও কাজে কেউ একটু সহানুভূতি দেখানোরও সুযোগ পায়নি কখনও, এমনকি নান্টু মিয়াও না। নান্টু মিয়া ওই যে বলেছিল, কান্নাকাটি চলবে না, কান্নাকাটিতে জীবনের মন গলে না, তারপর সে একদিনও কাঁদেনি―বরং অন্যদের কাঁদিয়েছে। পনিরের মধ্যে―তার চালচলনে, চাহনিতে, কথাবার্তায়―এমন কিছু একটা আছে, যা দেখে মানুষের স্বস্তি চলে যায়। কথাবার্তা কম বলে, কাজে কোনও ফাঁকি নেই। কিন্তু নান্টু মিয়া দেখে, অন্যরা একটা ছোটখাটো দূরত্ব যেন বজায় রেখে চলে তার সঙ্গে―তার দু-তিন বন্ধু ছাড়া। কেন, এর কোনও উত্তর পায় না নান্টু মিয়া; ভাবে, পনিরের ব্যক্তিত্বটাই ওই রকম।

আমাদের ধারণা, সর্বাঙ্গে কালিঝুলি মাখা থাকায় পনিরের চেহারাট আরও কঠিন লাগে। গ্রিজ মাঙ্কিদের এটাও একটা সমস্যা। না না, গ্রিজ মাঙ্কি কোনও বাঁদর নয়। গ্রিজ মাঙ্কি মানে যারা গ্যারেজে কাজ করে, যেমন পনির।

পনিরের কান্নাকাটির কোনও প্রশ্নই ওঠে না, তবে দু-একবার তার চোখ ছলছল করেনি, তা নয়। প্রথমবার যখন নান্টু মিয়া তাকে ডেকে কিছু কথা বলেছিল। খুব নরম গলায়। নির্বাহী কোনও নির্দেশ নয়, কিছু হিতোপদেশ মাত্র। সুখ দুঃখের দু-একটি কথাবার্তা। কিছু প্রশ্ন, কিছু জিজ্ঞাসা। আর দ্বিতীয়বার, যখন পনিরের বেতন বাড়িয়ে দিয়ে নগদ চারশ টাকা তার হাতে গুঁজে দিয়েছিল নান্টু মিয়া, এক বছর চাকরি করার পর। দিয়ে বলেছিল, ‘মায়েরে কিছু একটা কিন্যা দিস, পনির মিয়া।’

চোখের জল চেপে পনির পাড়ার ফার্মেসি থেকে মায়ের জন্য ঠোঁটের ওষুধ কিনেছিল। ভ্যাসলিন ক্রিম। মায়ের ঠোঁট তখন চৈত্র মাসের ধেনো জমির মতো, পাকাপাকিভাবে ফাটা। মা দাম শুনে বিরক্ত হয়ে ফিরিয়েই দিয়েছিল প্রায় কৌটাটা। কিন্তু রাতে শুতে যাওয়ার আগে ঠোঁটে ভ্যাসলিন মেখে শুয়েছে।

এটা দেখে অবশ্য পনিরের কোনও প্রতিক্রিয়া হয়নি। মায়ের ছেলে তো, যাহোক!

আমার গল্পটা এতক্ষণ বেশ সরল পথেই চলছিল―যেন গুলিস্তান থেকে বংশাল রোড ধরে যাচ্ছিল। এবার একটু জটিল হবে : এবার এটি নবাবপুরের দিকে মোড় নেবে, তারপর আদালতপাড়া হয়ে ঘিঞ্জি রাস্তা ধরে পাটুয়াটুলীর দিকে যাবে। তারপর কোনও কানাগলিতে হারিয়েও যেতে পারে। অথবা কোনও ম্যানহোলে।

গেলে আর কী করার আছে!

ফুলি একদিন সকালে জানালো পনিরকে, ডিশ বইদ্যা তাকে খুব জ্বালাতন করছে, সে আর গার্মেন্টে যাবে না। ও, আপনাদের বলা হয়নি। ফুলি গার্মেন্টে চাকরি করছে বছর দেড়েক। না করে কী করবে, বলুন। ফুলিকে নিয়ে আমাদের―অর্থাৎ পনির, পনিরের মা এবং আমাদের সবারই―সমস্যা হচ্ছিল। ওকে বিয়ে দেওয়া যায় না―সেটা পনির বা তার মা পারে না (কারণ, তাদের পয়সা নেই, ফুলি দেখতে খারাপ নয়, আবার আহামরি কিছুও নয়)। আমরাও হঠাৎ করে তার বিয়ে দিতে পারি না। কে তাকে যেঁচে গ্রহণ করবে ? হয়ত বলতে পারেন, কেন, পাড়ার হ্যান্ডসাম যুবক, ধনী গার্মেন্ট-পতি হার্টথ্রব (তরুণীদের)―যে চোখে সানগ্লাস পরে মুখে একটা হাবানা চুরুট ঝুলিয়ে মেরুন রঙের নিশান পেট্রল গাড়ি চালায়―সে তো পারে। কিন্তু গল্পটা তাহলে যে আর গল্প থাকবে না, বাংলা সিনেমা হয়ে যাবে! তা ছাড়া ছেলেটা যে এ কাজ করবে, সে কি পাগল ? কাজেই, সব কূল রক্ষা করার জন্য ফুলিকে ওই যুবকের ‘পরী গার্মেন্টস অ্যান্ড অ্যাপারেলস’-এর একটা চাকরিতে ঢুকিয়ে দিতে পারি। তাতে আমাদের সমূহ সুবিধা। বলা বাহুল্য যুবকটি, যার নাম নওশাদ, ফুলিকে একবারও দেখেনি―সে ‘পরী গার্মেন্টস’-এ বসে না―তার এক সহকারী ম্যানেজারই সব করল। গার্মেন্টে লোকের দরকার ছিল। ফুলি যেহেতু লোক, সেহেতু তার চাকরি হয়ে গেল। ব্যস।

যদি নওশাদের খবর জানতে চান: নওশাদ ইতোমধ্যে বুকড হয়ে আছে। যাকে সে বিয়ে করবে, অর্থাৎ যার সঙ্গে তার লাইন চলছে, সে মেয়েটির নাম শাকিলা। অবসরপ্রাপ্ত আয়কর কমিশনার বদরুল হায়দার সাহেবের মেজ মেয়ে। বদরুল হায়দারের পাঁচতলা দালান আছে, আফসানা প্লাজা নামে বিশাল শপিং সেন্টার আছে। শাকিলা ইডেনে পড়ে, ইংরেজিতে; টেলিভিশনের মডেল-কন্যা হিসেবেও সে সুপরিচিত অথবা সুপরিচিতা।

কোথায় শাকিলা আর কোথায় ফুলি ? পাগল নাকি ? যাহোক, ফুলির একটা হিল্লে হওয়ায় আমরা সবাই খুশি হয়েছিলাম। কিন্তু মাঝখানে বাদ সাধল ডিশ বইদ্যা। ডিশ বইদ্যা বংশালে একটা ক্যাবল টেলিভিশন ফার্মে কাজ করে, ঘরে ঘরে ডিশের ভাড়া আদায় করে। পাড়ায় আরেকটা বইদ্যা আছে বলে তাকে সবাই ডিশ বইদ্যা ডাকে।

পনিরের বয়স, আমাদের হিসাবে, এখন সতেরো। ডিশ বইদ্যার পঁচিশ। কিন্তু তাতে কী। একদিন সন্ধ্যায় সে ডিশ বইদ্যাকে ধরল বোগদাদিয়া হোটেলের গলিতে। পনিরের সঙ্গে ছিল দেলোয়ার আর মোতালেব। গ্যারেজের বন্ধু। ডিশ বইদ্যাকে সঙ্গ দিচ্ছিল ন্যাটা বিকাশ। দুটোই বদ ছেলে। কিন্তু তাতে কী। পনির ডিশ বইদ্যাকে একটা প্লাস রেঞ্চ দিয়ে দমাদম কয়েক ঘা বসিয়ে দিল এবং ঘা বসানোর সঙ্গে পিলে কাঁপানো রণহুংকার। তার গলার এত জোর ছিল আমরা জানতাম না। সে নিজেও হয়ত না।

ঘটনাটা এতটা আকস্মিক ছিল যে বিকাশ প্রথম চোটেই পালিয়েছিল। এবার দিল ডিশ বইদ্যা নিজে। সে অবশ্য ইতোমধ্যে টের পেয়েছে কেন সে মার খাচ্ছে। কিন্তু বদ ছেলে হলেও সে তেমন মাস্তান টাইপের কিছু নয়, সাহসটাও তেমন নয়। ফলে সে দৌড়ে নিজের জীবন যেমন বাঁচালো, ফুলির জীবন থেকেও পালালো। পনিরের সাহস দেখে তার দুই বন্ধু হাঁ হয়ে গেল। তারা অবশ্য শুধু দর্শকই ছিল। কিন্তু গ্যারেজের ছেলে। গ্রিজ মাঙ্কি বলে কথা। স্বাভাবিক সময়ে দেখলেই ভিন্ন রকম লাগে। আর এই সন্ধ্যার আঁধারে, বোগদাদিয়ার লেনে।

এই ঘটনার প্রভাব হলো দ্বিমুখী। এক. বংশালের মাস্তানির ফার্স্ট ডিভিশন লিগে অভ্যুদয় ঘটল এক নতুন খেলোয়াড়ের, যার নাম পনির। সবাই জানল, একে ঘাঁটানো ঠিক হবে না। পনিরের ৎরঃব ড়ভ ঢ়ধংংধমব পূর্ণ হলো। সে এবার পুরোপুরি এক এডাল্ট মানুষ। এভাবেই সে গৃহীত হলো বংশাল এবং জগতের কাছে। দুই. তার মাথাটা খারাপ হয়ে গেল।

সে এক নিভৃত কিন্তু শিহরণ জাগানো আনন্দের সন্ধান পেল। ডিশ বইদ্যা একবার রুখে দাঁড়ালো না পর্যন্ত! হতে পারে, সতেরো বছর বয়সেই পনিরের হাত মাঙ্কি রেঞ্চের মতো কঠিন, তার মুঠোর শক্তি একটা ছোটখাটো গরিলার মতো। কিন্তু ডিশ বইদ্যাও তো কম নয়; ঘাড়ে-মাথায় পনিরের থেকে উঁচুই সে। তাহলে ?

আসলে ব্যাপারটা যত না শক্তির, তার থেকে বেশি সাহসের। আপনারা দেখবেন, ছোটখাটো একটা সাহসী মানুষ একটা তরতাজা পালোয়ানকেও কাবু করে ফেলতে পারে, যদি পালোয়ানটার সাহসের ঘরে থাকে শূন্য। আমাদের বোঁচকা নামে একটা কুকুর ছিল―সে এক রেগুলার চেহারার ষাঁড়কে একবার পাড়ার রাস্তায় নিয়ে গেল। ষাঁড়টার জিব দিয়ে ফেনা বেরোচ্ছিল, যেন হার্ট ফেল করবে। আর রণহুংকারের ব্যাপারটারও একটা অভিঘাত আছে। পনির আলি গ্যারেজে কাজ করতে গালিগালাজের একটা ডিকশনারিই হয়ে গেছে। তার মুখে কিছুই আটকায় না। ডিশ বইদ্যা আবার ভালো মানুষের পো, সে, বলা যায়, পনিরের গালিগালাজেই আধা পরাস্ত হয়েছে।

দুই বছর কেটে গেল এই ঘটনার পর। পনির এখন বংশালের একজন কেউকেটা। সরকারি দলের যুব সংগঠনের বংশাল শাখার প্রভাবশালী সদস্য। পনিরের অবশ্য একজন গডফাদার আছেন। তিনি পাড়ার হাসান ভাই। ফুচকা হাসান নামে তিনি সমধিক পরিচিত। কেন জানি, বংশালের লোকজন কারও পিতৃপ্রদত্ত নামটা নিয়ে সন্তুষ্ট থাকতে পারে না। একটা উপনাম অথবা টাইটেল তারা খুঁজে বের করবেই―বিশেষ করে যাদের পরিচয়-টরিচয় কিছু একটা আছে―এবং নামের সঙ্গে জুড়ে দেবে। ফুচকা হাসানের নাম কেন ফুচকা হাসান, এটা পনির জানে না; হাসান নিজেও হয়ত না, এমনকি আমরাও না। তবে জনশ্রুতি আছে, একসময় সে ফুচকা বিক্রি করত বোগদাদিয়ার মোড়ে। হাসান তা অস্বীকার করেন। তার প্রথম স্ত্রী অবশ্য করেন না। প্রথমা এখন তালাকপ্রাপ্তা। তিনি বলেছেন আমাদের, ব্যাপারটা সত্য। হাসানের পেছনে জীবনের অর্ধেকটা তিনি খরচ করেছেন―সেই দরিদ্র অর্ধেকটা, যখন হাসানকে বেঁচে থাকার জন্য ফুচকা বিক্রি করতে হতো, যে ফুচকা তিনি নিজে বানাতেন। এখন হাসান কোটিপতি। প্রথমাও কম যান না। তারও ফ্ল্যাটবাড়ি, দোকান, গাড়ি আছে; বিবাহবিচ্ছেদের কালে সেগুলো আদায় করেছেন। উপরন্তু তিনি বোগদাদিয়ার মালিক আমির খসরুর ছোট ভাই সানিকে বিয়ে করেছেন।

যাক সে কাহিনি। তবে ফুচকা হাসানের ক্ষেত্রে প্রথমার যে তিক্ততা থাকতে পারে, সেটা আমরা স্বীকার করি। অবশ্য পুরো ব্যাপারটা তিনি প্রতিহিংসা বা আক্রোশবশত বানাতেও পারেন। কে জানে। ফুচকা হাসান ওয়ার্ড কমিশনার। তার ওপর নান্টু মিয়ার তিনি ঘনিষ্ঠ বন্ধু। নান্টু মিয়ার কার কিং গ্যারেজে তিনি মাঝেমধ্যেই আড্ডা দিতে আসেন। পনির, বলা যায়, তার দৃষ্টিরেখায় পড়েছে ডিশ বইদ্যা প্রহৃত হওয়ার অব্যবহিত পরেই।

ডিশ বইদ্যা তার কাছে নালিশ করেছিল। তিনি বলেছিলেন, ব্যাপারটা দেখবেন। পনির কার কিংয়ে কাজ না করলে হয়ত তখনই লোক পাঠিয়ে ধরে আনাতেন এবং একটা বিহিত করতেন। কিন্তু কার কিং বন্ধু নান্টুর গ্যারেজ। তিনি সরেজমিন তদন্ত করতে গেলেন এবং পনিরকে দেখে এবং তার সঙ্গে কথা বলে, তিনি বইদ্যার মামলা নিষ্পত্তি করে ফেললেন। বইদ্যাকে ডেকে আনালেন। বইদ্যা হাসি হাসি মুখে সম্মুখবর্তী হতেই তিনি পায়ের চটি খুলে তার দিকে ছুড়ে মেরে বললেন, ‘হালার পুত, জাইন্যা, না জাইন্যা হগলের লগে মশকরা করতে যাও ? যা করছ, করছ―এবার পনির থাইক্যা তফাত থাইক্যো।’

ডিশ বইদ্যা এরপর হাওয়া হয়ে গেছে। শুনেছি মিরপুর ১০ নম্বরে একটা ডিশের দোকানে চাকরি নিয়েছে। এখন তার একটাই স্বপ্ন: ‘মিরপুর স্টেডিয়ামে মোহামেডানের খেলা অইব না ? পনির দেখতে আইব না ? হালারে তখন এই মিরপুরে রাইখ্যা দিমু। মিরপুরের মাটিতে তার কবর দিমু।’

সে এক অলীক স্বপ্ন, ভাই। শুধু ডিশ বইদ্যাই তা দেখতে পারে। দেখুক, যদি এই স্বপ্ন দেখে সে সুখ পায়।

ফুচকা হাসান এই গল্পে প্রবেশ করায় আমাদের দুটি লাভ হলো। প্রথমত, পনিরের ধীরে ধীরে সন্ত্রাসীতে পরিণত হওয়ার গল্পটা এতে যথেষ্ট বিশ্বাসযোগ্য হলো, কারণ পনিরের সন্ত্রাসী জীবনটাই এই গল্পের প্রধান বিষয় (তা না হলে এর শিরোনাম ‘অস্ত্র’ হবে কেন ?)। ফুচকা হাসান বীভৎস মানুষ, তার মতো নীরবে অথচ অত নিষ্ঠুরভাবে সন্ত্রাস করতে পারে কজন মানুষ ? শুনেছি বংশালের মায়েরা তার নামে ছড়া কেটে শিশুদের ঘুম পাড়ায়―ছেলে ঘুমালো পাড়া জুড়ালো, ফুচকা এল বংশালে। ইত্যাদি। ধোলাই খালের দিকে একটা বস্তি উচ্ছেদের ঘটনা আপনাদের মনে আছে ? সারা রাত ধরে মানুষকে মেরে-কেটে, অত্যাচার করে, ঘরে আগুন লাগিয়ে, মেয়েদের লাঞ্ছিত করে, বৃদ্ধদের ডোবায় ছুড়ে ফেলে এক বস্তির দখল নিল কিছু সন্ত্রাসী, আর পরদিন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী গিয়ে থানার ওসিকে সাসপেন্ড-টাসপেন্ড করে, বস্তিতে গিয়ে একটা মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে ফিরে চলে এলেন। তারপর কী হলো, জনাব ? কী আর হবে, যেখানে ফুচকা হাসান আছে ? সেই হাসানের প্রটেকশনে বড় হচ্ছে পনির, তার মাঙ্কি রেঞ্চের মতো হাত আর অসীম সাহস নিয়ে। সন্ত্রাসী না হয়ে সে কি বয়স্কাউট হবে ?

দ্বিতীয় যে উপকারটি আমাদের (পনির, পনিরের মা, ফুলি, দুলি এবং এই অধম গল্পকারের) ফুচকা হাসান করেছেন, সেটি হচ্ছে: তিনি ফুলির বিয়ের একটা ব্যবস্থা করেছেন এবং দুলিকে তার স্থলে গার্মেন্টে দিয়েছেন। গল্পটা হঠাৎ শেষ না-হয়ে গেলে দুলিকেও হয়ত একটা বিয়ে দিতেন হাসান এবং আমরা ভারমুক্ত হতাম। কিন্তু সেটি আর হলো না। সে জন্য আমাদের কিছুটা দুঃখ রয়ে গেল। যাহোক, গল্প তো আর জীবন নয় যে শেষ দেখার জন্য ৬৭ বছর বসে থাকতে হবে। কী বলেন ?

ফুলির বিয়ে হলো লাট্টু কন্ট্রাক্টরের সঙ্গে। লাট্টু ভাসতে ভাসতে বংশালে এসে ঠেকেছিল। তার পরিবার-পরিজন এখনও গন্ডগ্রামে, ডামুড্যার গহিন ভেতরে। লাট্টুর প্রাক্-উত্থান পর্বটি অন্ধকারে ঢাকা―কিছুটা উত্থিত হওয়ার পর সে আলোতে আসে। এই কিছুদিন আগেও সে বাসে-টেম্পোতে যাতায়াত করত, এখন একটা মোটরসাইকেল চালায়। গাড়ি কিনতে পারত, কিন্তু কিনছে না, কারণ, তার বাসা যে গলিতে, সেখানে গাড়ি ঢুকবে না। নগর ভবনেই তার বেশির ভাগ কাজ, আবার জেলা পরিষদেরও প্রচুর কাজ পায়। ফুচকা হাসানের প্রিয়পাত্র, যদিও সে সন্ত্রাসী নয়।

আমাদের অবাক করে দিয়ে লাট্টু-ফুলি বেশ সুখী, রোমান্টিক দম্পতি হিসেবে আবির্ভূত হলো। ফুলিকে হোন্ডায় নিজের পেছনে বসিয়ে লাট্টু মাঝেমধ্যে ক্রিসেন্ট লেক যায়, বিকেলবেলা। কন্ট্রাক্টর হলেও ছেলেটা জাত রোমান্টিক। শিক্ষা-দীক্ষা পেলে সংস্কৃতিকর্মী হতে পারত, নেহাত বৃন্দ আবৃত্তিকার। লেকের পাড়ে অস্তমিত সূর্যের লাল আলোয় বসে যখন সে ফুলির কাঁধে হাত রেখে অন্য হাতটা দিয়ে বাদাম ভেঙে ফুলির মুখে তুলে দেয়, তাকে দেখলে ফিল্মের ড্যাশিং হিরো ছাড়া অন্য কিছু ভাবা আপনাদের জন্য কঠিন হবে।

পনিরের সন্ত্রাসী হওয়ার সোজা হিসাবের সঙ্গে জীবনের দুটি বিষয় কিছুতেই যেন মেলে না। এক হচ্ছে নান্টু মিয়া, ফুচকা হাসানের বন্ধু, যদিও বন্ধুগত কোনও সাদৃশ্যই তাদের মধ্যে চোখে পড়ে না। পনির অল্প বয়সে বাবাকে হারিয়েছিল। মা-ও ঠিক প্রথাগত মায়ের ভূমিকা পালন করেনি―অর্থাৎ আদর-আহ্লাদ সে জীবনে কিছু পায়নি। যেটুকু পেয়েছে, তা এই নান্টু মিয়ার কাছে। নান্টু মিয়াকে সে পিতৃতুল্য জ্ঞান করে। নান্টু মিয়াও সেটা জানে। সে-ও, বলা যায়, পনিরকে পুত্রতুল্য ভাবে।

নান্টু মিয়া মাঝেমধ্যে বিষণ্ন মুখে পনিরকে বলে, ‘পনির মিয়া, তুমারে আমি যেমনটা ভাবছিলাম, তুমি তেমনটা না।’

জটিল ধাঁধা। কী ভেবেছিল সে ? কী হয়েছে পনির ? পনির বলে, ‘আমারে কী ভাবছিলেন, চাচা ? কী হওনের কথা ছিল আমার ?’

নান্টু মিয়া মাটির দিকে তাকিয়ে দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছেড়ে বলে, ‘হাউকাউটা কম করো। তুমার এত লাফানের দরকার কী ? হাসান হাসানের কাম করতাছে, তুমি কেন তার সঙ্গে ফাল পাড়তে যাও ?’

নান্টু মিয়া কম কথা বলে। ফলে সে প্রকৃত যা বলতে চায়, অর্থাৎ পনির যেন হাসান থেকে সরে আসে, সন্ত্রাস না করে, ভালো মানুষ হয়, সেটা গুছিয়ে বলতে পারে না। দুনিয়ার সবাই অবশ্য সব কথা পরিষ্কার বলতে পারে না এবং এই না-বলার জন্য কত যে সমস্যা হয়! নান্টু মিয়া বলতে পারে না, হাসানের সঙ্গ ত্যাগ করোÑহাসান যে তারই বন্ধু। কিন্তু নানাভাবে বলার চেষ্টা করেছে। সাধারণত সে একটা প্রশ্নের সাহায্যে তার বক্তব্য পেশ করে। যেমন, পাড়ায় কেন হাঙ্গামা করো ? ওই ছেলেটারে এ রকম পিটাইলা ক্যান ? আফতাব মিয়ার দোকানটা ভাঙচুর না-করলে চলত না তোমাগো ? কিন্তু এই প্রশ্নবোধক কথাবার্তা থেকে পনির বুঝতে পারেনি, নান্টু মিয়া ভেতরে-ভেতরে কতটা হতাশ, কতটা ব্যথাতুর। নান্টু মিয়া তার নিজের ছেলেমেয়ের সঙ্গেই গুছিয়ে কথা বলতে পারে না, পনিরের সঙ্গে কী বলবে; যদিও তাদের আলাদা করে দেখেনি সে।

পনিরের ভেতরে দ্বন্দ্বের সৃষ্টি হয়, তার বিভ্রম জাগে। গ্লানি হয়। কিন্তু সে কী করবে ? তা ছাড়া ওই ভালো লাগার শিহরণটা! সেকি ভোলা যায় ? টাকাপয়সা যে আসছে, মা সুস্থ হয়ে উঠেছে, ভালো খাবার খেতে পাচ্ছে, ভালো কাপড় পরতে পারছে, সন্ধ্যা থেকে বসে পনিরের কিনে দেওয়া টেলিভিশন (হোক না তা সাদাকালো) দেখতে পাচ্ছে―এসব কথা বাদ দিলেও শিহরণের ব্যাপারটা কীভাবে অবহেলা করা যায় ? আফতাব মিয়ার দোকান যখন সে ভাঙছিল, তার চিৎকার পনিরের ভেতরে আরেকবার সেই শিহরণ জাগিয়েছিল।

আফতাব মিয়া তার বন্ধু দেলোয়ারের ছোট ভাইটাকে সেই দিন সকালে অমানুষিক পিটিয়েছিল না ? প্রতিশোধ এমনই মধুর হয়। শিহরণ জাগায়।

তবু নান্টু মিয়ার কথাবার্তা পনিরের ভেতরটা নড়বড়ে করে দেয়। তার হঠাৎ মনে হয়, নান্টু যেন কোন বরণীয় ব্যক্তি― সিসেরোর মতো, এ মন্টি অথবা লুৎফর রহমান অথবা রামেন্দু সুন্দর ত্রিবেদীর মতো। এরা, এই বিখ্যাতজনেরা কারা, পনির বলতে পারে না। প্রিন্সিপাল আজাদুর রহমান (তিনিই-বা কে, কোথাকার প্রিন্সিপাল, তা-ও পনির জানতে পারে নি) যেভাবে, যে বানানে তাদের হাজির করেছেন, তেমনি তাদের সে জেনেছে এবং জেনে মুগ্ধ হয়েছে। নান্টু মিয়ার স্মরণীয় বাণী কী হতে পারে ? পনির ভাবে। চটজলদি মনে পড়ে না, কিন্তু সে জানে, নান্টু মিয়া বরণীয় ব্যক্তি হওয়ার জন্য জন্মগ্রহণ করেছে। অনেক ভেবে সে দুটি উক্তি বের করে। উক্তি হিসেবে অবশ্য মন্দ নয়। তবে ভাষাটা কথ্য। তাতে অবশ্য পনিরের কিছু আসে-যায় না, প্রিন্সিপাল আজাদুর রহমানের সমস্যা হলেও। উক্তি দুটি হলো :

১. অপরিষ্কার মানুষ আল্লাহর সামনে যাইতে পারবে না (এটা সে দিন শেষে কালিঝুলিমাখা প্রস্থানোদ্যত গ্রিজ মাঙ্কিদের বলে)

২. কুত্তার কুনু কাম নাই, (মগর) দৌড় ছাড়া চলন নাই (এটা সে প্রায়শই বলে, কারণ, সে অনাবশ্যক হুড়োহুড়ি পছন্দ করে না)।

এরপরও নান্টু মিয়ার তৃতীয় একটি উক্তি সে আবিষ্কার করে, যাতে গুলি-বন্দুকের ব্যাপার থাকায় পনির একটু দমে যায় এবং আমরাও দমে যাই উক্তিটির অন্তর্নিহিত আয়রনির কথা ভেবে। উক্তিটি এই :

৩. বন্দুক তো মানুষরে মারে না, মানুষই মানুষরে মারে। বন্দুক না-থাকলে লাঠি, লাঠি না-থাকলে ইট, ইট না-থাকলে হাত, কিল, ঘুষি [অথচ একটা বন্দুক আছে বইল্যা আমাগো হাসান হাঁটে আকাশ দিয়া। পা তার মাটিতে পড়ে না।]

বস্তুত, হাসানের সঙ্গে নান্টুর একটা নীরব বিবাদ চলছিল। নান্টু ফেরাতে চায় হাসানকে, তাকে বলেছে, ‘হাসান, তুমি আমার বন্ধু। ভালা হইয়া যাও।’

হাসান প্রথম প্রথম হাসত। পরে বিরক্ত হতো। আরও পরে রাগ হতো। একসময় এসব কথা শুনলে সে খেপে যেতে শুরু করে। প্রকাশ্যে ক্রোধও প্রদর্শন করেছে। নান্টু মিয়ার টেবিলের কাচ ঘুসি মেরে ভেঙে ফেলে বলেছে, নিজের চরকায় তেল দাও, নান্টু মিয়া। আমারে বুঝাইতে আইসো না। আমি এমপি সায়েবরে বুদ্ধি দেই। মিনিস্টার সায়েব আমার কথা শুনে আর তুমি কি না আমারে উল্টাপাল্টা কও।

হাসানের এই প্রকাশ্য ক্রোধ প্রদর্শনে আমাদের কিছুটা সুবিধা হয়েছে, গল্পটা তার (অভীষ্ট) পরিণতির দিকে এবার দ্রুত এগিয়ে যেতে পারবে।

ফুচকা হাসান যতই এমপি সায়েব, মিনিস্টার সায়েব করুক, সে একজন ওয়ার্ড কমিশনার বৈ তো নয়। থানার সঙ্গে তার দহরম-মহরম ভালো কিন্তু নগর পুলিশের বড় কর্তারা তাকে কেন পাত্তা দেবেন ?

১০

নান্টু মিয়ার গ্যারেজে হাসান তার টয়োটা স্প্রিন্টার নিয়ে এল, স্টার্টে সমস্যা হচ্ছে। নিজেই চালিয়ে এনেছে সে। দুপুরবেলা। নান্টুকে বলেছে, ঠিক কইরা রাখবা। বিকালে ড্রাইভার লইয়া যাইব।

এই বলে সে একটা রিকশা নিয়ে বাসায় গেছে ভাত খেতে। গোসল করে সে ভাত খেতে বসেছে, পুলিশ এসে হাজির। অ্যারেস্ট। ফুচকা হাসান বিস্ময়ে হতবাক। আমি অ্যারেস্ট ? আমি ? সে হইহই করে ওঠে। পাগল নাকি মিয়া, আমারে অ্যারেস্ট করেন ? সে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে মারে দারোগার দিকে। দারোগা বলে, পাগল না ভাইজান, চালাক। এখন আপনে অ্যারেস্ট। অ্যারেস্ট করার হুকুম আছে যে। কে হুকুম দিল ? কেন হুকুম দিল ? হুংকার করে ওঠে হাসান। দারোগা ওপরের দিকে হাত তুলে ইঙ্গিত করে, ওপরওয়ালারা। তারপর বলে, গাড়িতে আর্মস ছিল। অস্ত্র ছিল।

হাসান বুঝল, কোথাও একটা সমস্যা হয়েছে, ষড়যন্ত্র। শত্রুর চাল। বিষয়টা জটিল। সে এ-ও জানে, অস্ত্র মামলা কঠিন মামলা, ১৪ বছর পর্যন্ত জেল হতে পারে এই মামলায়। অর্থাৎ কেউ কোথাও তাকে নিয়ে খেলা শুরু করেছে।

হাসানের মাথাটা শীতল হয়। সে শীতল গলায় জিজ্ঞেস করে, আমার গাড়িতে অস্ত্র পাওয়া গেছে ?

দারোগা বলে, আকাশ থাইক্যা পড়লেন মনে হয় ? চলেন, থানায় চলেন।

পরদিন জামিন নিয়ে বাসায় ফিরল ফুচকা হাসান। ক্লান্ত, বিধ্বস্ত। মাঝখানে লাখখানেক টাকা খরচ। টেনশন, হেভি টেনশন। চোখ বুজে সোফায় গড়িয়ে পড়ল হাসান।

তারপর চোখ খুলল। সে চোখ দুটি লাল। গনগনে, আগুন-লাল। হাসানকে দারোগা বলেছে, নান্টু মিয়া অস্ত্র দেখিয়েছে গাড়ি খুলে। সিটের নিচে পাওয়া গেছে একটা পাকিস্তানি পিস্তল। এসির পাইপের ভেতর তাজা গুলি।

হাসান জানে, তার জ্ঞানমতো এই পিস্তল আর গুলি তার গাড়িতে আসার কথা নয়। সে এত কাঁচা কাজ করে না। এত শিশুতোষ সে নয়। এসি পাইপে তাজা গুলি ? হাসান হেসে ফেলে। কিন্তু কে তাকে ফাঁসাল ? তার মাথায় অনেকগুলো নাম আসে। এমপি সায়েব তাকে বলেছেন, খোঁজ নিয়ে দেখ তো হাসান, কারা কাণ্ডটা ঘটাল। বিষয়টা ভালো মনে হচ্ছে না। এমপিও উদ্বিগ্ন। হাসান হারিয়ে যাওয়া মানে একটা পিলার ধসে যাওয়া। সামনে নির্বাচন। হাসান যায় নান্টুর কাছে। নান্টু বলে, হ্যাঁ, আমি পুলিশকে দেখিয়েছি কোথায় অস্ত্র। কিন্তু হাসান, ব্যাপারটার ভালো দিকটা কি দেখতে পাচ্ছ না ? তোমার জন্য একটা শিক্ষা হলো। তুমি এখন অস্ত্র ছেড়ে দাও। ভালো হয়ে যাও।

হাসান উচ্চ স্বরে একটা খিস্তি আওড়ায়। তারপর বলে, চোখ পিটপিট করে―যেন সে খুব কৌতুককর একটা প্রশ্ন করছে নান্টু মিয়াকে―তুমি রাখছ নাকি, অস্ত্রগুলা, নান্টু মিয়া ? নান্টু প্রশ্ন শুনে স্তম্ভিত হয়ে যায়। সে ভাবে, হাসান তার সঙ্গে ভয়ানক ঠাট্টা করছে। এতই ভয়ানক যে শরীরের লোম খাড়া হয়ে যায়। সে-ও চোখ পিটপিট করে বলে―যেন সে-ও ধরতে পেরেছে ভয়ানক এই কৌতুকটির মর্ম―‘আমি না রাখলে আর কেডা রাখব ? গাড়ির চাবি তো তুমার কাছে ছিল না।’

বলে সে হাসে। হাসতে হাসতেই বলে, ‘অস্ত্রপাতি ছাইড়া দাও, হাসান। ওয়ার্ড কমিশনার ছাইড়া দাও। চলো, আরেকবার আমরা দুইজনে একটা ফুচকা দোকান খুইল্যা দেই।’

হা হা করে হাসে নান্টু। নান্টুকে এ রকম হাসতে দেখেনি গ্যারেজের ছেলেগুলো। তারা অবাক হয়ে তাকায়।

তাদের মধ্যে একজন পনির আলি। সে দেখে : হাসানের পিটপিট করা চোখ আগুন-লাল। সে চোখে হাসি নেই। শুধু ক্রোধ।

১১

যা-ই হোক, নান্টুকে হাসান একদিন শেষ করে দেয়। তার সন্দেহ গাঢ় হয়েছে। থানার দারোগা তাকে পরিষ্কার বলেছে, ‘নান্টু মিয়া আপনারে ফাঁসাইছে, কমিশনার সায়েব। অথচ আপনারই বন্ধু। ভালো বন্ধুই জুটাইছেন।’

দারোগার এ রকম হলফ করে বলার কারণ, হাসান যেন কোনওক্রমে সন্দেহ না করে, দারোগা এই কাজ করেছে। সে দেখেছে, হাসানের বড় বড় খুঁটি আছে : বড় বড় নেতারা থানায় এসেছেন তার জন্য। এই থানা থেকে সে বদলি হতে চায় না, এখনি। হাসানকে খুশি রাখতে হবে।

পনির জানল, তার ওস্তাদ তার পিতৃতুল্য মানুষটাকে খরচা করে ফেলেছে। কী তার দোষ, সে ভেবে পায় না। হাসানের মঙ্গল ছাড়া তো কিছু চায় নি নান্টু মিয়া। কিন্তু কেন এমন হলো ? সে কিছুতেই হিসাবটা মেলাতে পারে না।

১২

তিন রাত পনিরের ঘুম হলো না। নান্টু মিয়ার রক্তাক্ত মুখটা স্বপ্নে দেখেছে সে। নান্টু মিয়ার কপালে গুলি লেগেছিল। কাছ থেকে গুলি করেছিল ফুচকা হাসান। পনির জানে। যদিও পুলিশ যখন জিজ্ঞেস করেছে, সে বলেছে, কিছুই জানে না। ওই রাতে সে গ্যারেজের ধারেকাছে ছিল না। সে ছিল ফুলির বাসায় রাত এগারোটা পর্যন্ত। হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে রাত সাড়ে আটটা-নয়টায়। লাট্টু কন্ট্রাক্টর পনিরের বক্তব্য সমর্থন করেছে। লাট্টু কন্ট্রাক্টর থানায় নিয়মিত চাঁদা দেয়। তার কথা বিশ্বাস না-করে উপায় কী দারোগার ?

এই তিন রাত পনির স্বপ্নে দেখেছে, নান্টু মিয়া তাকে কিছু বাণী দিচ্ছে। সিসেরোর মতো, নাকি চার্চিলের মতো। চমকে ঘুম ভেঙে জেগে উঠেছে সে, হাত শক্ত হয়ে গেছে। যেন তার হাতটা একটা মাঙ্কি রেঞ্চ, ফুচকা হাসানের গলাটা নাগালে। এলে আর কিছুই আস্ত থাকবে না।

শেষমেশ আরেকটা বাণী পেল সে; না ঘুম-না জাগরণকালে, রাতের বেলায়। সেটা আমরা শুনতে পাইনি, শুধু পনির শুনেছে। অর্থাৎ তার মনে হয়েছে সে শুনেছে। ফলে সারা দিন সে উ™£ান্তের মতো ঘুরে বেরিয়েছে। সেই সোয়ারিঘাট পর্যন্ত। একটা নৌকা নিয়ে বুড়িগঙ্গায় চলে গেছে, শান্তির আশায়। শান্তি মেলেনি।

১৩

সন্ধ্যা হলো। পনির ভাবল, আজকের মতো দিনটা শেষ হলো। কিন্তু ভুল। বাসায় ফিরতে ফিরতে অন্ধকারে সে টের পেল, নান্টু মিয়ার গুলি খাওয়া আতঙ্কগ্রস্ত মুখটি যেন সব দেয়ালে লেপটে আছে। সে শুনল, আবারও তাকে একটা স্মরণীয় বাণী দিচ্ছে নান্টু মিয়া।

তড়িৎস্পৃষ্টের মতো সে ঘরে ঢুকল। মা ও দুলি টেলিভিশন দেখছে। টেলিভিশনে নাটক হচ্ছে। তাদের একাগ্রতা এখন গগনচুম্বী।

পনির নিজের ঘরে ঢুকল। এখন তার নিজের একটা ঘর হয়েছে। অন্য একটি ঘরে মা আর দুলি থাকে। যে ঘরটিতে মা আর দুলি টিভি দেখছে, সেখানে ফুলি এলে থাকে। লাট্টু থাকে মাঝেমধ্যে।

পনির নিঃশব্দে কেরোসিনের টিনটা বের করল। এটা এখন খাটের নিচে থাকে। এই টিনে পলিথিনে জড়িয়ে একটা ফাইভ স্টার পিস্তল রেখেছে সে কিছুদিন আগে। আজ রাতে এই পিস্তলটার প্রয়োজন হবে। সে সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

নিশিপাওয়া মানুষের নিশিপাওয়া সিদ্ধান্ত, কোনও নড়চড় নেই। সে তার নিশিপাওয়া হাত ঢুকাল টিনের বাক্সে। পিস্তলটার জন্য।

পলিথিনের একটা ব্যাগ উঠে এল তার হাতে। ঠিক আছে, আজ রাতেই যা হওয়ার হবে। একটা নির্ভার ভাব নিয়ে ব্যাগটা সে মেলে ধরল আলোর নিচে। কিন্তু পরক্ষণেই চমকে উঠল। কোথায় ফাইভ স্টার! এ যে সেই বই, বরণীয় মানুষের স্মরণীয় বাণী! কেন এই বই ? কেন ? ছুড়ে ফেলতে গিয়েও ফেলতে পারল না, অনেক দিন আগেও যেমন পারেনি। প্রিন্সিপাল আজাদুর রহমানের ভাগ্য বলতে হবে। দুবার একটা বই ছুড়তে গিয়ে ছোড়া হয়নি। আর কোনও বইয়ের ক্ষেত্রে এমন হয়েছে, আমরা শুনিনি।

আস্তে পলিথিনের মোড়কটা খুলল পনির। বাল্বের অনুজ্জ্বল আলোয় বেরিয়ে এল বহুদিন বহু জন্ম আগে পুরস্কার পাওয়া বইটা। সেই কোন বিস্মৃতির যুগে বইটা সে রেখেছিল এই টিনে। পাতাগুলো কেমন শুকিয়ে গেছে, যেন গরমে তেতে এঁকেবেঁকে গেছে।

কিন্তু বইটার মসৃণ ভাবটা যায়নি। গন্ধটা যায়নি। আর ওই তো, সেই প্রথম পৃষ্ঠা। সেই গোটা গোটা অক্ষর, মু. পনির আলিকে, তার সময়ানুবর্তিতার জন্য পুরস্কারস্বরূপ। তার চোখ আটকে গেল সেই পৃষ্ঠায়, সেই মায়াবী, চাঁদের আলোর মতন, হালিমার চোখের মতন (ও, আপনাদের বলা হয়নি। পনিরের মন কেড়েছে হালিমা নামক একটা মেয়ে, দুলির সঙ্গে যে গার্মেন্টে কাজ করে, যুগীনগরের দিকে থাকে এবং প্রতি রাতে, গ্যারেজ থেকে ফিরে যাকে পনির একবার দেখতে যায়, দু-একটা কথা বলে এবং চলে আসে, যার কাছে আজও যাওয়ার কথা ছিল তার), হালিমাদের ঘরের বেড়া ঘেঁষে বেড়ে ওঠা দোলনচাঁপার মতো সুন্দর সেই পৃষ্ঠাটি।

পনির ঘুরিয়ে ফিরিয়ে পৃষ্ঠাটি দেখল। দুইবার, তিনবার, অসংখ্যবার। পৃষ্ঠা উল্টে পড়ল, হাত দিয়ে অনুভব করল বইটির প্রায় স্তব্ধ হয়ে যাওয়া হৃৎস্পন্দনটি।

বরণীয় মানুষের স্মরণীয় বাণী থেকে বিড়বিড় করে কিছু বাণী পড়ল পনির, তার মনে হলো শ্রাবণের রাতে অন্ধকার প্রান্তরের ওপার থেকে কোনও হঠাৎ ঝরা বৃষ্টির ধারাপাত যেন তার ইন্দ্রিয়তে আঘাত করছে। হায়, এ বাণীগুলো এত দিন অনুচ্চারিতই রয়ে গেছে। এমনকি হালিমাকেও শোনানো হয়নি তার একটিও প্রিয় বাণী।

বন্ধ দরজার ওপর থেকে দুলি ডাকছে পনিরকে, ভাত খাওয়ার জন্য। টিভিতে আমরা তোমাদের ভুলব না হচ্ছে। দশটা বাজে। ‘আসছি’ বলল পনির এবং বইটা হাতে তুলে নিল। নয়টার সময় কোথায় জানি যাওয়ার কথা ছিল, তার যাওয়া হয়নি। একটা ঘণ্টা কোথা দিয়ে পার হয়ে গেল। বরণীয় মানুষের স্মরণীয় বাণী তাকে অধিকার করে ফেলেছিল; তার কৈশোর, তার মাথায় তেল মেখে চুল আঁচড়ে শার্ট-প্যান্ট-কেডস পরে মচমচ শব্দ তুলে ব্যাগ হাতে দিগি¦জয়ে বেরোনোর মুহূর্তগুলো তাকে অধিকার করে ফেলেছিল। তার খেয়াল হলো, তার চোখে পানি।

এক হাতে বরণীয় মানুষের স্মরণীয় বাণীর মচমচে প্যাকেট, অন্য হাতে পলিথিনে মোড়ানো ফাইভ স্টারের প্যাকেট হাতে ঘর থেকে বেরিয়ে এল পনির। রান্নাঘরের দরজার সামনে ‘মা একটু ঘুইর‌্যা আসি’ বলে কোনও উত্তরের সময় না-দিয়ে সে রাস্তায় বেরিয়ে এল। তারপর দ্রুত পায়ে বড় রাস্তায় উঠে এল।

বংশালের বড় রাস্তাটার মোড়ে এসে পনির দেখল সেই খোলা ম্যানহোলটা হাঁ করে চাঁদের দিকে তাকিয়ে আছে। আর বেচারা চাঁদ যথাসাধ্য চেষ্টা করছে তার উপচে ওঠা মনুষ্যবর্জ্যরে থিকথিক উদ্গিরণকে যথাসাধ্য একটা কোমল আলোয় ঢেকে দিতে।

ম্যানহোলের কাছে এসে একমুহূর্ত থামল পনির। তারপর পলিথিনের একটা প্যাকেট সে ছুড়ে ফেলে দিল মল উপচে ওঠা থিকথিক পাঁকের ভেতরে। সেটি তলিয়েও গেল তৎক্ষণাৎ।

অন্য প্যাকেটটা নিয়ে সে এখন তার গন্তব্যের দিকে যাবে।

সচিত্রকরণ : কাব্য কারিম

Leave a Reply

Your email address will not be published.

shares