প্রচ্ছদ রচনা―সাহিত্যকর্ম : আলোচনা : নন্দনতত্ত্ব ও ধোঁয়ার কুণ্ডলী : নাজিব তারেক

যেকোনও বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান কিংবা আইনের উদ্দেশ্য হচ্ছে ধোঁয়াশা বা অস্বচ্ছতা দূর করা। নন্দনতত্ত্বের বা শিল্পশাস্ত্র বা ব্যাকরণের উদ্দেশ্যও তাই।

এখন প্রশ্ন হলো নন্দনতত্ত্ব কী ?

শিল্পসূত্রসমূহ রচনা, পূর্বতন বা প্রচলিত শিল্পসূত্রের নিরিখে নতুন শিল্পসূত্রসমূহ রচনা ও ভবিষ্যৎ শিল্পসূত্র সমূহের সম্ভাবনা যাচাইয়ের সুযোগ তৈরি করাই নন্দনতত্ত্ব আলোচনার উদ্দেশ্য। তো এই রচনার কাজটি কে করেন বা কারা করেন ? শিল্পী, শিল্পাচার্য, শিল্প-ইতিহাসবিদ, শিল্প-সমালোচক : সূত্রসমূহকে টিকা টিপ্পনী সহযোগে লিপিভুক্ত করার কাজটি হয়ত শিল্প-ইতিহাসবিদ, শিল্প-সমালোচক করে থাকেন তবে সেখানে রসিক বা ভোক্তা মানে শিল্পকর্ম-ক্রেতা ও দর্শক, পাঠক-শ্রোতার মতামতের গুরুত্ব অসীম, যদিও শিল্পী ও শিল্পাচার্যের ভাবনাই মুখ্য। শিল্প-সমালোচক মূলত শিল্পী ও শিল্পাচার্যের ভাবনাকেই সূত্রাকারে লেখেন। শিল্পাচার্য নিজেও কখনও তাঁর ভাবনাসমূহকে নিজেই লিপিবদ্ধ করেন। যেমন―রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর, নন্দলাল বসু, বিনোদ বিহারী, বুদ্ধদেব বসু, বিমল মিত্র, এম এফ হুসেন, গণেশ পাইন করেছেন। বাংলাদেশে কামরুল হাসান তার ‘খেরোখাতা’য় লিখেছেন কিন্তু তা সম্পাদিত হয়ে প্রকাশিত হয়নি। সৈয়দ শামসুল হকের ‘হৃৎকলমের টানে’ও অনুরূপ রচনা। গল্পকার সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের অলস দিনের হাওয়া ছিল এক গল্পকারের সমকালীন ইউরোপীয় নন্দন ভাবনাকে বুঝবার প্রয়াস, যা ছিল আন্তরিক ও অনুসন্ধিৎসু এক রচনা। অলস দিনের হাওয়া ছিল সাহিত্যের নন্দন ভাবনা বিষয়ক রচনা। চিত্রকলা নিয়েও তার অজস্র লেখা আছে, দৈনিক পত্রিকার পাতায় ও বিভিন্ন শিল্পীর একক ও বিভিন্ন সংস্থা অয়োজিত দলবদ্ধ প্রদর্শনীর প্রকাশনায়। এক সময় এই প্রকাশনা-লেখায় তিনি ছিলেন একচ্ছত্র তথা জনপ্রিয়তম জন। চিত্রকলার ভোক্তা বা রসিক হিসেবে এবং তার লেখবার দক্ষতায় তিনি সকলেরই প্রিয় হয়ে উঠেছিলেন, বিশেষত এসব লেখায় যখন সমালোচনা কিংবা নন্দন-আলোচনার চেয়ে শংসালোচনা বেশি জরুরি। সে বিচারে বলা যেতে পারে সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম সময়ের সবচেয়ে বড় ‘আর্ট কপি-রাইটার’।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্যের অধ্যাপক সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম। তার নন্দন ভাবনার মধ্যে তাই শিক্ষকতার দায়টিও আছে। শিক্ষক বা আচার্য মাত্রেই তা থাকে, এখন প্রশ্ন হলো নন্দনতত্ত্ব আলোচনায় তিনি কেমন শিক্ষক ?

শিক্ষকতা পেশাটিতে জনপ্রিয় শিক্ষক হওয়া সহজ নয়। জনপ্রিয় হতে দু’টি পথেরে একটি পথ বেছে নিতে হয়।

১) জ্ঞান পথ ও ২) পাবলিক যা খায় পথ

জ্ঞান-পথ একটি সাধনার বিষয়, সাধারণত জ্ঞান-পথের পথিকেরা সেই সব উচ্চ বিদ্যালয় ও বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রপ্রিয় হয় যেসব উচ্চ বিদ্যালয় ও বিশ্ববিদ্যালয়ে জ্ঞানপিপাসু ছাত্ররা অবস্থান করে কিংবা ছাত্ররা বিদ্যালয় পাঠ শেষে যখন কর্মজীবনে প্রবেশ করে তখন সেই শিক্ষক তাদের অন্তরে প্রিয় হয়ে উঠতে থাকে। বাংলাদেশের সমাজ তথা ছাত্রসমাজ কতটা জ্ঞানপিপাসু সে নিয়ে আলোচনা করার জন্য এ রচনা নয়, তবে বিশ্ববিদ্যালয়-পাঠ্য একটি বই এর গুণমান বিচারেও বোঝা যায় সমাজ ও ছাত্র সমাজের রুচি পরিস্থিতি।

পাবলিক যা খায় পথটি হচ্ছে বুদ্ধিমান ও চতুর শিক্ষকদের পথ। যৌবন-স্বয়ং জ্ঞান, আর এখন যৌবন যার মিছিলে যাওয়ার তার শ্রেষ্ঠ সময়। তো যে শিক্ষক যৌবনকে মিছিলে যেতে উৎসাহিত করবে সে শিক্ষক স্বাভাবিকভাবেই জনপ্রিয় হয়ে উঠবে।

সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম কেমন শিক্ষক তা তার ছাত্ররা বলতে পারবেন। ব্যক্তি যোগাযোগে আমি তার ছাত্র নই, গণযোগাযোগে বা তার লেখালেখির সুবাদে আমি তার ছাত্র। চিত্রকলার ছাত্র হিসেবে আমার দুর্ভাগ্য যে সমকালে তিনি ছাড়া আর কোনও শিক্ষক ছিলেন না তাই তিনি মন্দের ভালো বা নাই মামার চেয়ে কানা মামা ভালো। আগেই বলেছি তিনি সমকালের শ্রেষ্ঠ তথা জনপ্রিয়তম ‘আর্ট কপি রাইটার’, কিন্তু নন্দন আলোচনায় তিনি কেমন তা নির্ধারিত নয়। তার নন্দনতত্ত্ব গ্রন্থটি আসলে আচার্য হিসেবে তার পরীক্ষা। যেটুকু শুনেছি এই গ্রন্থটি বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠ্য। সমকালীন বাংলাদেশে কেন কীভাবে একটি গ্রন্থ বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠ্য হয়, সে আলোচনায় না যাওয়াই ভালো, এমনকি এ গ্রন্থ বিশ্ববিদ্যালয়-পাঠ্য হওয়ার যোগ্য কি না তাও আমার আলোচনার বিষয় নয়। আমি শুধু আলোচনা করতে চাই পাঠক হিসেবে, চারুকলার ছাত্র হিসেবে, এ গ্রন্থ আমার কৌতূহল মেটাতে কতটা সক্ষম তা আলোচনায়।

একজন মানুষ যখন নিয়মিত পড়ালেখা করেন এবং তিনি যখন গবেষণার পত্র লিখবার কৌশলগুলো জানেন তখন তার প্রয়োগ ঘটিয়ে যেকোনো রচনা নির্মাণ করতে সক্ষম হবেন, সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম তা করে দেখিয়েছেন নন্দনতত্ত্ব গ্রন্থটি রচনা করে। না, সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম প্রথম ব্যক্তি নন বাংলাদেশে এমন রচনার, তবে নন্দনতত্ত্ব নিয়ে বাংলা ভাষায় গ্রন্থ সংখ্যার অভাব পূরণে তার এই কাজটি একটি প্রয়োজনীয় কাজ। এখন প্রয়োজন পূরণ করতে গিয়ে সৈয়দ মনজুর কি ভ্রান্তপথে হাঁটছেন ?

সাধারণ বা প্রথম পাঠকের কাছে আসলে কোনও পথ থাকে না, যে কোনও পথ রেখাই পথ। হ্যাঁ, ভুল পথে হাঁটা শুরু করলে সময় ও শ্রম নষ্ট হয় প্রচুর, তৃতীয় বিশ্বের তথা সামন্ত সমাজের এই সময় ও শ্রম ব্যয় বা অপচয়ই তার নিয়তি। বাংলা ভাষায় যাকে বলে গাধার খাটুনি তা মিছিলের যৌবন ব্যতীত আর কে খাটবে ?

তবে যৌবন স্বয়ং জ্ঞান বলেই কালের গর্ভে হারিয়ে যায় রথী-মহারথী জন। তাই যেকোনও রচনার কালে মহাজন হয়ে উঠতে ইচ্ছুকদের বিবিধ কৌশল নিতে হয়, অন্তত জীবদ্দশায় মহাজন হতে চাইলে। তিনি সে কৌশল জানেন। যে প্রতিভা এই কৌশল জানে না সে প্রতিভা ‘উপেক্ষার’ আক্ষেপে জীবন হারায়। সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম নন্দনতত্ত্বের এই গুঢ়তত্ত্ব তত্ত্বাকারে জানেন কি না তা আমার জানা নেই, তবে ব্যবহারিকে জানেন তা তার রচনার মধ্যেই প্রতিভাত।

গ্রন্থে লেখক লিখেছেন―শিল্পী যে সৌন্দর্য সৃষ্টি করেন তার প্রকৃত পরিচয় ও রূপ আবিষ্কার করাই এই শাস্ত্রের উদ্দেশ্য। কিন্তু তিনি কি সেই উদ্দেশ্য বজায় রেখে গ্রন্থটি রচনা করেছেন ? তার রচনা থেকেই আমরা সেটা বুঝি, তিনি শুরুতেই লিখেছেন―একজন নন্দনতাত্ত্বিক শিল্পকে কোনও বাঁধাধরা নিয়মে যাচাই করতে পারেন না। আবার তিনি বেশ কবার লিখেছেন―এতে কোনও সুনির্দিষ্ট বিচার বিবেচনা চলে না। উক্ত বাক্য ও উক্ত বাক্যের অনুরূপ বাক্য তিনি বহুবার লিখেছেন, যা এই লেখার শুরুতে ও গ্রন্থ-লেখকের নন্দন শাস্ত্রের উদ্দেশ্যকেই বাতিল করে বা ভণ্ডুল করে। এমন বৈপরীত্য পুরো গ্রন্থজুড়েই অছে, তবে বিভিন্ন জনের উদ্ধৃতি নন্দনতত্ত্বের বিভিন্ন ভাবনার সাথে আমাদের পরিচয় করিয়ে দেয়, সেটি সুশৃঙ্খল হলে বা উদ্ধৃতজন কোন কালের তা উল্লেখিত হলে ভালো হতো। আধুনিক নন্দনতত্ত্বালোচনার অন্যতম উপাদান মানব-ইতিহাসের কালপর্বগুলো নিয়েও আলোকপাত হতো। এতদসত্ত্বেও পুনরায় বলছি : নন্দনতত্ত্ব নিয়ে বাংলা ভাষায় গ্রন্থ সংখ্যার অভাব পূরণে তার এই কাজটি একটি প্রয়োজনীয় কাজ।

শিল্পকলার ছাত্র হিসেবে এ গ্রন্থ পাঠে কোনওটি ক্ল্যাসিক, কোনওটি আধুনিক, আধুনিক হলেও একটি কেন কিউবিস্ট অন্যটি কেন প্রকাশবাদী, একই সময়ের এক শিল্পী কেন আধুনিক, অন্যজন কেন উত্তর-আধুনিক অপরজন কেন ক্ল্যাসিক, কেনইবা একজন প্রাচ্য দেশীয়, আর কোনটি শিল্প বা চারুকর্ম কোনটি কারুকর্ম তা কেউ যদি বুঝতে চান তা হলে সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের নন্দনতত্ত্ব গ্রন্থটি সবচেয়ে ভালো গ্রন্থ নয়, তবে পঠক যখন কোথাও কোনও গ্রন্থ না পাবেন তখন এ গ্রন্থ অন্ধকারে দূর প্রদীপের আলোরেখা, যদিও আমরা ঘরে এলইডি আলো জ্বালিয়ে বসে আছি।

ব্যক্তি-আমার চাওয়া পুরণে এ গ্রন্থ হতাশ করলেও, আমি এটা বলতে পারি যে : সাধারণ বা প্রথম পাঠকের কাছে আসলে কোন পথ থাকে না, যে কোন পথ রেখাই পথ, নন্দনতত্ত্ব নিয়ে বাংলা ভাষায় গ্রন্থ সংখ্যার অভাব পূরণে তার এই কাজটি একটি প্রয়োজনীয় কাজ। সাধারণের জন্য লেখা হলে, যেকোনও গ্রন্থের সবচেয়ে জরুরি বিষয়―ভাষার পঠন গতি বা সহজপাঠ্য কি না, সে প্রশ্নে এ গ্রন্থ জিপিএ+।

 লেখক : চিত্রশিল্পী

Leave a Reply

Your email address will not be published.

shares