প্রচ্ছদ রচনা―সাহিত্যকর্ম : আলোচনা : সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের উপন্যাস-জগৎ : হামিদ কায়সার

পাঠমাত্রই ছবি ভাসে। সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের উপন্যাসের ছত্রে ছত্রে তৈরি হয় অসংখ্য ইমেজারি। দেখতে পাই তিনি যা বলছেন, যার কথা শোনাচ্ছেন অথবা যে সময়টুকুর চিত্র তুলে ধরতে চাইছেন, সব স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে চোখের সামনে। সম্প্রতি তাঁর তিনটি উপন্যাস কানাগলির মানুষেরা, তিন পর্বের জীবন এবং আজগুবি রাত পড়ার অভিজ্ঞতা থেকে আমার এ উপলব্ধি―তাঁর বর্ণনা একের পর এক দৃশ্যপটের অবতারণা করে।

একটি চমৎকার চিত্রনাট্যের চলচ্চিত্র যেমন টান টান উত্তেজনায় আড়াই কী তিন ঘণ্টা সম্পূর্ণভাবে ধরে রাখে, বসিয়ে রাখে স্ক্রিনের সামনে, এ তিনটি উপন্যাসও তেমনি বহুস্তর ঘটনা আর চলচ্ছবির মাধ্যমে আমাকে মগ্ন রাখল, ভিজিয়ে দিল মন, দাঁড় করিয়ে দিল সমকালীন জীবন বাস্তবতার অনেকগুলো গল্পের সামনে।

হ্যাঁ, গল্প। সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের তিনটি উপন্যাসেই গল্প আছে! তিনটি উপন্যাসই হয়ত প্লট, পটভূমি, লেখার স্টাইলের দিক থেকে আলাদা, ভিন্ন বৈশিষ্ট্যপূর্ণ, কিন্তু তিনটি উপন্যাসই গল্প-প্রধান! মোটেই ন্যারেটিভ নয়, একটি বিষয়কে খুঁড়ে খুঁড়ে দেখার বিস্তৃত বয়ান নয়, যাকে বলে ছবির পর ছবি দিয়ে সাজানো, একগুচ্ছ শব্দছবি! জীবন্তগাথা।

আমি উপন্যাসে ন্যারেটিভধর্মিতার বিরুদ্ধে বলছি না, যা কিছু মস্তিষ্কজাত, তা তো অবশ্যই চিন্তার উদ্রেক করে, নবতর ভাবনার প্রেক্ষিতে নিয়ে দাঁড় করায়; তাছাড়া উপন্যাস যেখানে সমগ্রতাসন্ধানকে গুরুত্ব দেয়, সেখানে বিশ্লেষণই তো গভীর জীবনবোধকে বাঙ্ময় করে তোলে! বিশ্লেষণে বিশ্লেষণে চরিত্রের ভেতর-বাহির যেমন বেরিয়ে আসে, উপন্যাসও ত্রিকাল সময়কে ইতিহাসের প্রচ্ছায়ায় নৃতত্ত্বের ধূলিকণায় নিজের অজান্তেই খুঁজে পায় বৈচিত্র্যের জাদু। সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম হয়ত প্রচলিত অর্থের সেই বিশ্লেষণের পথে পা বাড়াননি; কিন্তু বহুস্তর আখ্যানের পর আখ্যানের বিস্তৃতি ঘটিয়ে আমাদেরকে শেষমেষ একটি মানবিক জায়গায় পৌঁছে দেন, পৌঁছে দিতে সক্ষম হন। তাঁর তিনটি উপন্যাসই সে সত্যকে তুলে ধরে!

কানাগলির মানুষেরা উপন্যাসের কথাই যদি বলি, এটা আসলে যতটা না মানুষের গল্প, তারচেয়ে বলব মেসের কাহিনি। উল্লাস মেসের। মেসটা ঢাকার আরামবাগে। ঔপন্যাসিক যে শুধু চেয়ারে বসে কল্পনার ওপর ভর করে এ উপন্যাস লেখেননি, জরিপ করেটরে নিজে দেখেশুনে জেনেবুঝে লিখেছেন, তা তাঁর বর্ণনা পড়েই বোঝা যায়, ‘সারা দেশের মধ্যে প্রতি বর্গ-বিঘায় সবচেয়ে বেশি মেস হচ্ছে আরামবাগে। আর আরামবাগ যদি হয় মেসের দেশ, তাহলে সাহেব আলি লেন হচ্ছে তার রাজধানী।’

তো, এই সাহেব আলি লেনের এক আড়াইতলা বিল্ডিংয়ের মেস-জীবনের সঙ্গে ঘটনাক্রমে জড়িয়ে যান বিশ্ববিদ্যালয়ের এক অধ্যাপক। জড়িয়ে যান তার গ্রামের বাড়ি বানিয়াচংয়ের চাচাত ভাই আলি মর্তুজার এক মোবাইল ফোনের কারণে। মর্তুজা জানায় যে, তার ছেলে মুকিত উল্লাস মেসে অসুস্থ হয়ে পড়ে আছে, দেখার কেউ নাই। মনজুর যেন তাকে দেখে আসে এবং যদি চিকিৎসার ব্যবস্থা করাতে হয়, সেটাও যেন করে দেয়। দায়িত্বশীলতার জায়গা থেকেই মনজুর উপস্থিত হন উল্লাস মেসে! তারপর ঘটনা থেকে ঘটনা পরম্পরায় তিনি আর সে-মেসের গণ্ডি থেকে বিযুক্ত হতে পারেন না। সত্য আর মিথ্যার খেলায় জড়িয়ে মুকিতের মাধ্যমে সম্পৃক্ত হন সে মেস-রুমের মোকসেদ আলি, পলাশ, রিয়াদ, জন রোজারিও সাহেব তো বটেই, মেস-বিল্ডিংয়ের বাইরে রেস্তোরাঁ মালিক নাজু মিয়া, পাশের বাসার রুনা, রুনার বাবা মাজহার সাহেবের সঙ্গে!

এরপর অধ্যাপক সাহেবের দৃষ্টিকোণ থেকে আমরা এসব চরিত্রের মনোদৈহিক জগতে ঢুকে আরও-আরও সব চরিত্র এবং সময়ের উল্লম্ফন চিত্রের দেখা পাই। মুকিতের বানিয়াচং থেকে ঢাকা শহরে আসার পটভূমি, অতীত ফেলে আসা জীবনের সঙ্গে শহরে চাকরির সুবাদে কীভাবে সে কুরিয়ার সার্ভিসের চাকরির আড়ালে জড়িয়ে পড়ল মাদক ব্যবসার নেটওয়ার্কে, তা যেমন একটি পরিব্যাপ্ত কাহিনি, তেমনি পলাশের সঙ্গে রুনার প্রেম এবং সে প্রেমকে ঘিরে বাবার সঙ্গে দ্বন্দ্বের ভেতর দিয়ে যেমন মানুষের চিরাচরিত ইগোর নতুন প্রেক্ষিত উঠে এসেছে, তেমনি আধুনিক মানুষ যে খানিকটা মানসিক ভারসাম্যহীনতারও শিকার তারও প্রামাণ্য চরিত্র যেন রুনা। তবে লেখক খুব সার্থকভাবে দেখাতে পেরেছেন, প্রত্যক্ষভাবে না-হলেও, মানুষের এসব মানসিক টানাপড়েনের জন্য অর্থনৈতিক অবস্থাই মূল নিয়ামকের ভূমিকা পালন করে। পলাশ যখন ঘটনাক্রমে আরব্যরজনীর কাহিনির মতোই মালেক মিয়া আর ফরিদ আলির পার্টনারশিপের গণ্ডগোলে রাতারাতি গার্মেন্টসের একজন অংশীদার মালিক বনে যায়, তখন বাবা মাজহারকে ফেলে বাড়ি থেকে রুনার মা-সুদ্ধ বেরিয়ে আসতে সময় লাগে না। আবার পলাশ যখন রাতারাতি সেই মালিকানা থেকে নাটকীয়ভাবে বাদ পড়ে, নতুন করে রুনার মানসিক বিকারের শিকার হয় খোদ পলাশই।

রিয়াদ এ মেসে এসেছে সাপাহার থেকে। ওকে এ শহরে পাঠিয়েছে ওর এক খালু। খালু ওকে বোনের মেয়ের সঙ্গে বিয়ে দিতে চায়। তার আগে চায় ট্রেনিং নিয়ে একটা চাকরিবাকরি ধরে স্বাবলম্বী হোক। কিন্তু রিয়াদের ইচ্ছা মধ্যপ্রাচ্যের এক স্বপ্নের দেশে পাড়ি দেওয়ার। কিন্তু এর মধ্যেই আমরা দেখব যে রানি নামের এক মেয়ের কারণে সাদামাটা রিয়াদের জীবনটা কীভাবে চরম বিপন্ন হয়ে উঠল! সে বিদেশের চাকরিতেও যেমন টিকতে পারল না, দেশে ফিরেও প্রতারণা আর প্রবঞ্চনার শিকার হলো প্রভূত।

মোকসেদ আলির জীবনও নারীর কারণেই বিপর্যস্ত। সে স্ত্রী টুম্পার হৃদয়হীন আমানবিক আচরণের শিকার। মোকসেদ চাকরি করে ট্র্যাভেল এজেন্সিতে। ওর বউ টুম্পা যেন এই অর্থ-সর্বস্ব কর্পোরেট যুগের শেষ বলি। অর্থ-নিয়ন্ত্রিত জীবন অবকাঠামোর কারণেই জড়িয়ে পড়ে পরকীয়া প্রেমে। সে মোকসেদকে ত্যাগ করে প্রেমিক জয়নুলের সঙ্গে বাসা থেকে বেরিয়ে যায়। বিপন্ন এক মানসিক অবসাদে ভুগতে থাকে মোকসেদ।

জন রোজারিওর জীবনটা অবশ্য ওদের তিনজনের তুলনায় অপেক্ষাকৃত সুন্দর, নির্ভেজাল। মানিকগঞ্জের জন রোজারিও চাকরি করে হোটেল পূর্বাণীতে। তবে পূর্বাণীর পেস্ট্রি খাইয়ে খাইয়ে এক কর্পোরেট অফিসের নারী কেয়ার সঙ্গে নিজের জীবনকে খানিকটা জড়িয়ে ফেলে। সে অন্য জটিলতা। প্রথম ডেটে এসেই কেয়া তার এক ক্ষমতাবান ঊর্ধ্বতনের সঙ্গে আর এক জটিল সম্পর্কের বয়ান শুনিয়ে একটা ভ্যাবাচ্যাকা পরিস্থিতি তৈরি করে!

মুকিত তো বটেই, এই মোকসেদ আলী-টুম্পা, রিয়াদ-রানি, পলাশ-রুনা এবং জন রোজারিও―প্রতিটি মানুষের জীবনের এসব গল্পের সঙ্গে কোনও না কোনওভাবে জড়িয়ে থাকেন অধ্যাপক মনজুর। তার মাধ্যমে গল্পগুলো একই সূত্র পেয়ে উপন্যাসে ব্যক্ত করে মেস জীবনকে ঘিরে কয়েকজন মানুষের জীবনগাথা। আর অধ্যাপক মনজুর কখনও দার্শনিক উপলব্ধি দিয়ে কখনও বা বাস্তবতার নিরেট যুক্তি খুঁড়ে ঘটনাগুলো বিবৃত করে যান। জীবনসত্তাকে নতুন দৃষ্টিকোণ থেকে উন্মোচনের প্রয়াস পান। ব্যাপারটা আরেকটু খোলাসা হবে, অধ্যাপক মনজুরের বয়ান থেকেই, ‘উল্লাস মেসের একটা দার্শনিক চরিত্র আছে, এবং সেটি আমি প্রথমে না বুঝলেও এখন চোখের সামনে পরিষ্কার হচ্ছে। এ মেসের যে চারজন মানুষকে আমি চিনি, তারা এসেছে বাংলাদেশের চার জায়গা থেকে। তাদের পেছনের ইতিহাসে খুব একটা হেরফের নেই। মুকিত নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলে। পলাশও। রিয়াদের অবস্থা এদের থেকেও খারাপ। আবার মোকসেদ যে খুব ভালো অবস্থানে, তাও নয়। কিন্তু এখানে ঘটনাচক্রে চারজন একত্র হয়ে একটা কিছু করতে চাইছে। গেলাস তুলে চুমুক দেওয়ার আগে জীবনকে বলতে চাইছে, উল্লাস!’

ঔপন্যাসিক হিসেবে সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের যে বৈশিষ্ট্যটি আমার কাছে ধরা পড়েছে তা হলো, তিনি শুধু চরিত্রগুলোকে নিয়ে নয়, পাঠকের সঙ্গেও এক ধরনের খেলায় মেতে ওঠেন। এই যেমন রুনা-পলাশের অংশটুকু নিয়েই যদি বলি, একটা সময় উপন্যাসের পাঠ নিতে নিতে হয়ত পাঠক আর নিতে চাচ্ছেন না বিষয়টা যে, কীভাবে পলাশ রাতারাতি কপর্দকশূন্য অবস্থা থেকে গার্মেন্টসের মালিক বনে গেল, কীভাবে সম্ভব হলো সেটা ? এটা কি রদ্দিমার্কা বাংলা সিনেমা ? সে সংশয় নিয়েই একটা অজানা কৌতূহলের তাড়নায় এবং সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের বর্ণনার চৌম্বকীয় টানে কতকদূর এগোলেই অবিলম্বে সেই বাস্তব সত্যের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে দেখতে পাওয়া যায় যে, নাহ, বাস্তবিকই তা সম্ভবপর নয়। পলাশ তো শেষাবধি সেই কপর্দকশূন্য অবস্থাতেই ফিরে এল। তা হলে মাঝখানের জায়গাগুলোতে কি হলো ? সেটা কি পলাশ-রুনার অবচেতন মনকে লেখক সাজিয়েছেন, অর্থাৎ ওরা যেমন একটি স্বপ্নময় সচ্ছল জীবন প্রত্যাশা করে; নাকি আমাদের প্রত্যেকের মনের ভেতর যে দুর্লভ স্বপ্ন জিইয়ে থাকে, তাকেই শব্দের আঙিনায় বোনা ? বাস্তব আর স্বপ্নকে ঘিরে হতে পারে এ এক অন্য রকম ইলুউশন অথবা বিভ্রম! তবে এত নিখুঁতভাবে এর উপস্থাপনা যে, তা কাহিনির সঙ্গে যৌক্তিকভাবে মিশে যায়। এমন উপস্থাপন কৌশল আর চরিত্র এবং পাঠকের নার্ভ নিয়ে লীলাখেলা আমি আগে আর কারও উপন্যাসে লক্ষ করিনি। এমন নাটকীয়তা বা স্বপ্নকে পাশ কাটিয়ে বাস্তবকে আবার বাস্তবের জায়গাতেই ফিরিয়ে আনার ব্যাপারটা রিয়াদ-রানি, মোকসেদ আলি-টুম্পা, জন রোজারিও-কেয়ার ক্ষেত্রেও লক্ষণীয়; তবে সুতীক্ষè এবং নিখুঁত চালে। 

সচেতন পাঠকপাঠিকামাত্রই লক্ষ্য করবেন, যে তিনটি নারী চরিত্র উপন্যাসে এসেছে, পলাশের জীবনে রুনা, রিয়াদের জীবনে রানি, মোকসেদ আলির জীবনে টুম্পা, এরা কেউই ইতিবাচক মানসিকতাকে ধারণ করে না, চরিত্রে। রুনা চরিত্রের যতই প্রস্ফুটন ঘটে, আমরা দেখতে পাই, পলাশকে পাওয়ার জন্য ও নির্দয়ভাবে তার বাবাকে পরিত্যাগ করেছে, ঘুম থেকে মাঝে মধ্যেই দুঃস্বপ্নের তাড়ায় সে জেগে ওঠে, বাবা নাকি ওকে নাকেমুখে বালিশ গুঁজে মেরে ফেলতে চাইছে! এরপর যখন সে পলাশের জীবনে এল, পলাশ যখন আবার গার্মেন্টসের মালিকানা হারিয়ে ফেলল, তখন ওর একই দুঃস্বপ্ন, পলাশ ওকে নাকে-মুখে বালিশ চেপে মেরে ফেলতে চাইছে! সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের সুতীক্ষè কলম দেখিয়েছে, বর্তমান আধুনিক সমাজে যে স্বার্থান্ধ বেঁচে থাকার মানসিক বিকার উপস্থিত হয়েছে, রুনা যেন সেই সত্তারই প্রতিভু। সাপাহারের রানি শুধুমাত্র কলেজ জীবনে রিয়াদ কেন ওকে উপেক্ষা করেছিল, সেই প্রতিশোধ নিতে রিয়াদের সঙ্গে মিথ্যে প্রেমের অভিনয় করে, একসঙ্গে জীবন শুরুর স্বপ্ন দেখিয়ে হঠাৎ নির্মমভাবেই জানিয়ে দেয়, আরেকটি ছেলেকে সে বিয়ে করতে যাচ্ছে, তখন সেই যন্ত্রণা শুধু রিয়াদকেই মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয় না, পাঠককেও এক নির্মম বোধে আচ্ছন্ন করে, আমরা তাহলে ভালোবাসাহীন এক কর্কশ পৃথিবীর দিকে এগিয়ে চলেছি! এ তো সমাজের এক ভয়াবহ ক্ষত!

টুম্পা তো এদের দুজনের চেয়ে আরও ভয়ংকর! ‘মোকসেদের সঙ্গে দুই রকমের বোঝাপড়া আছে টুম্পার। প্রথম টাকা পয়সা নিয়ে, দ্বিতীয়টা সম্পর্ক নিয়ে। ব্যাপারটা এই রকম : টুম্পার সঙ্গে বিয়ের পর মোকসেদের খুব ভালো সময় কাটে দেড় বছর। তারপর তাদের সম্পর্কের টানাপড়েন শুরু হয়। টুম্পার ধারণা ছিল জীবন নিয়ে মোকসেদ উচ্চাশায় আছে, ওপরে ওঠার আগ্রহ আছে। কিন্তু সে দেখল, একটা ব্যাংকে ছোটখাটো চাকরি নিয়েই সে সন্তুষ্ট। এতে টুম্পা বিরক্ত হয়েছে। মোকসেদের সঙ্গে অনেক রাগ দেখিয়েছে। ব্যাংকের চাকরিটা ছাড়তে হবে, এ রকম ঘোষণা দিয়ে মোকসেদের পেছনে লেগেছে। মোকসেদ এরপর বাধ্য হয়েছে চাকরিটা ছেড়ে দিতে।’ এরপর মোকসেদকে একটা ব্যাংকের লোন নিয়ে শুরু করতে হয়েছে ব্যবসা। ব্যবসা করতে গিয়ে সে ধরা খেয়েছে, টুম্পার সঙ্গেও বিচ্ছেদ অনিবার্য হয়েছে, টুম্পা উচ্চাশার ডাকে জয়নুল নামের আরেক পুরুষের সঙ্গে সম্পর্কে জড়িয়েছে। মোকসেদকে ত্যাগ করে চলে গেছে উত্তরার আলাদা বাসায়।

এই তিনটি নারী চরিত্রকে নেতিবাচক মানসিকতার বলায়, যদি কোনও নারীবাদী পাঠিকা উষ্মা প্রকাশ করেন, অবাক হব না। তিনি হয়ত এভাবেও যুক্তি দিতে পারেন, গতানুগতিক ধারা থেকে বেরিয়ে নারীরা যেমন নিজের পায়ে দাঁড়াতে শিখেছে, তেমনি নিজের জীবনের ভালোমন্দের স্বার্থে নিরাবেগ বোঝাপড়ায় অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে। তাই হয়ত তাদের আচরণকে খানিকটা নির্মম হৃদয়হীন মনে হচ্ছে। কিন্তু ভুললে চলবে না, এরা নতুন সময়ের নারী। হ্যাঁ, সৈয়দ মনজুরুল ইসলামও বোধ হয় এ ব্যাপারে দারুণ সচেতন! তিনি প্রতিটি চরিত্রকে নতুন সময়ের সঙ্গে মানিয়ে চলার আলোক নির্দেশনা জুগিয়ে চলেন। তার নারীরা যেমন নিজের জীবনকে সস্তা আবেগ থেকে বাঁচিয়ে রাখে, পুরুষ চরিত্রগুলোও সে প্রকৃতির। অধ্যাপক মনজুর তিনজনকেই নতুন যুগের প্রেক্ষিতে নিরাবেগ এবং যুক্তিবাদী হতে উদ্বুদ্ধ করেন। ফলে রিয়াদ আত্মহত্যার পর্যায় থেকে রানির প্রবঞ্চনাকে দলেমুচড়ে নতুন আশায় উঠে দাঁড়ায়। মোকসেদ টুম্পাকে ঢিলের বদলে পাটকেল নিক্ষেপ করে কুপোকাত করতে থাকে! পাঠকও নতুন সময়ের চরিত্র এবং দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গি খুঁজে পায়।

গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজ বলেছেন, একটি উপন্যাসে সব কিছুই থাকতে হবে : মতবিশ্বাস, আচ্ছন্নতা, ঐতিহ্য, কিংবদন্তি, পুরাণ।’ তবে মার্কেজের পর আরও অনেক উপন্যাস-তাত্ত্বিকেরই আগমন ঘটেছে। উপন্যাসের ফর্ম নিয়েও অনেক কথাবার্তা হচ্ছে। সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম হয়ত সেদিক থেকে আরও আপডেট, তিনি ইংরেজি সাহিত্যের ডাকসাইটে অধ্যাপক; ব্যাপক পড়াশোনা আছে! তবে মার্কেজের শর্ত অনুযায়ী মতবিশ্বাস এবং আচ্ছন্নতার প্রতিফলন কানাগলির মানুষেরা উপন্যাসে রয়েছে। কোনও একটি চরিত্রের ভেতর দিয়ে যদি, ধরা যাক যার পূর্ব পুরুষেরা আরামবাগ এলাকায় দাপুটে জীবন কাটিয়েছে এখন তারা মেসের ভাড়ায় দিন চালাচ্ছে বা এ ধরনের অন্য কোনও চালের ভেতর দিয়ে আরামবাগের মেস অঞ্চল হওয়ার ইতিহাস বা নৃতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ সামান্যভাবেও আসত উপন্যাসের প্লট আরও বেশি ঋজু ও সংহত হতে পারত বলেই আমার বিশ্বাস।  

তিন পর্বের জীবন উপন্যাসের নাদিরা যেন কানাগলির মানুষেরা উপন্যাসের টুম্পারই সম্প্রসারিত রূপ। এ উপন্যাসটিও বয়ান হয় অধ্যাপক মনজুরের জবানিতে। এটুকু প্রকরণগত মিল ছাড়া উপন্যাসের বিষয় কানাগলির মানুষেরা থেকে উপস্থাপনা ও আঙ্গিকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। কানাগলির মানুষেরা-তে যেমন একটি মেসকে ঘিরে ক’জন মানুষের নিদারুণ জীবনকাহিনিকে তুলে ধরা হয়েছে, তিন পর্বের জীবন-এ বিবৃত হয়েছে শুধুমাত্র শাহীন আর নাদিরার দাম্পত্য জীবনের উত্থান-পতনের কাহিনি। তবে উপন্যাসে মূল ফোকাসটা যেন শাহীনের ওপরই বেশি পড়েছে।

শাহীন একটি রাজনৈতিক চরিত্র। না, মূলধারার কোনও রাজনৈতিক দলের নেতা নয় সে। একটি বাম দলের ঢাকা মহানগর কমিটির সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক। আমাদের এ উপন্যাসের কাহিনি যিনি বয়ান করছেন সেই অধ্যাপক মহোদয়ও বাম রাজনীতির আদর্শে বিশ্বাসী। কিন্তু তিনি রাজনীতি করেন না। কেন করেন না, তা শোনা যাক তার নিজেরই জবানিতে, ‘আমিও সমাজতন্ত্রে আস্থা খুঁজি; কিন্তু এর আদর্শে আমার যতটা বিশ্বাস, আদর্শটা যারা কাজে মেলাবেন, তাঁদের ওপর বিশ্বাসটা ততই কম। স্বাধীনতার পর এক সমাজতন্ত্রী ছাত্রনেতা একটি মার্সিডিজ বেঞ্চ গাড়ি দখল করে যেদিন থেকে চড়তে শুরু করলেন, জনগণের সম্পত্তি জনগণের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হচ্ছে―এই ঘোষণা দিয়ে, সেদিন থেকে এই বিশ্বাসে চিড় ধরেছিল।’ আমার মনে হয়, আমাদের দেশের অনেক মানুষই রাজনীতি-সচেতন হয়েও কেন রাজনীতির সঙ্গে নিজেকে জড়ান না, এখানে তার উত্তর আছে। এবং রাজনীতি করতে গিয়ে ভালো মানুষের কী অবস্থা হয় খারাপ মানুষের দাপটে, এ উপন্যাসের শাহীনের পরিণতিই সে কথার প্রমাণ।

যা হোক, রাজনীতি শাহীনের ফ্যাশন হলেও সে পেশায় একজন সাংবাদিক। আর সাংবাদিকতা করে বাম রাজনৈতিক আদর্শধারী দৈনিক প্রতিদিন-এ। সেই সূত্রে অধ্যাপকের সঙ্গে শাহীনের পরিচয়। অধ্যাপক সাহেব মাঝে মধ্যে দৈনিক প্রতিদিন-এ কলাম লিখে থাকেন। পত্রিকা অফিসে হাজিরও হন।

 তো, এই রাজনীতি করার কারণেই একদিন শাহীন প্রাসাদ ষড়যন্ত্রের শিকার হলো। সেটা ছিল ১৯৮৭ সালের ২২ সেপ্টেম্বর। সেদিন অফিস শেষে সন্ধ্যায় পার্টি অফিসে ঢুকতেই কয়েকজন সহ-রাজনৈতিক কর্মী ও নেতা ওকে ধরে বসল যে, আজ সবাই মিলে মদ্য পান করবে এবং শাহীনকেই টাকার জোগান দিতে হবে। শাহীন সবার সঙ্গে আনন্দময় মুহূর্ত কাটাতে এক কথায় রাজি হয়ে গেল। এবং ঘোর নেশাগ্রস্ত অবস্থায় জড়িয়ে পড়ল দিশেহীন এক বাকবিতণ্ডায়। সেখানে কীভাবে একটি ছুরির আবির্ভাব ঘটল, কীভাবে ওর হাতটা সুখেন্দুর পেটে ঢুকে গেল ছুরিসমেত, কিছুই ঠাহর করতে পারল না নেশার ঘোরে। যখন ঘটনা ঘটে গেছে, সুখেন্দুর মৃতদেহ পড়ে আছে তার হাতের ছুরিকাঘাতে, তখনই ফিরল হুঁশ। তখন থেকেই মানসিক বিকারগ্রস্ততার শিকার শাহীন। তারপর এ ঘটনার প্রত্যাঘাত যে কতটা সুদূর ও কী প্রবল বিষাদময় হতে পারে, তারই চিত্র ধীরে ধীরে উন্মোচিত হয়েছে উপন্যাসে। ব্যক্তিসত্তার নিঃসঙ্গতা যে কত তীব্র কত যন্ত্রণাময়, তারই যেন বাস্তবিক ছবি ফুটিয়ে তুলেছেন সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম। বিচারে যাবজ্জীবন হলো শাহীনের। ধীরে ধীরে স্ত্রী নাদিরার জীবনে এল আমেরিকা প্রবাসী আরেক পুরুষ বাদল। জেলখানায় বসে ছোটভাই জাহিনের কাছ থেকে এসব শুনে-শুনে শাহীনের প্রায় উন্মাদ হওয়ার অবস্থা। একদিন যখন মেয়ে সামিয়া আর ছেলে ইমরান ওকে দেখতে গেল কুমিল্লা জেলখানায়, উন্মাদনার তোড়ে নিজের সন্তানদের দিকে আক্রমণের ভঙ্গিতে ছুটে এল শাহীন। তারপর থেকেই নাদিরা তো নাদিরা, সন্তানরা পর্যন্ত ওর কাছ থেকে ক্রমাগত দূরে সরে গেল! এবং আমরা পরে দেখব এসব ঘটনা সামিয়া এবং ইমরানের জীবনেও কী তীব্র বিষাদময়তা ছড়িয়েছে!

সতেরো বছর পর জেল থেকে ছাড়া পেয়ে শাহীন এক নিঃসঙ্গ নিষ্ঠুর পৃথিবীর সামনে দাঁড়াল! তার যাওয়ার কোনও জায়গা নেই! স্ত্রী নাদিরা বাদলের সঙ্গে সরল নিপাট নতুন জীবন শুরু করেছে! সেখানে ওর কোনও প্রবেশাধিকার নেই!  ছোট ভাই জাহিন বউ নিয়ে পাড়ি দিয়েছে কানাডা। এমনকি ঢাকার কোনও পরিচিত বন্ধুবান্ধবের কাছেও যেতে ইচ্ছে করল না। এক রকম বাধ্য হয়ে সে এক হোটেলে শুরু করল তার দিশেহীন জীবন। কী হৃদয়বিদারক এই বেঁচে থাকা। একবার যখন ফোন করল নাদিরাকে, তখন অনুরণন তৈরি হলো সেই জীবনের সুখদুঃখে জড়ানো মানুষটি কত বেশি পর হয়ে গেছে! একদিন সন্তানের টানে নাদিরা-বাদলের দাম্পত্য সংসারে হাজির হলো, ছেলের কাছেও নিষ্ঠুরভাবে প্রত্যাখ্যাত হলো। প্রিয় খাবারের পরিবর্তে শাহীন সবচেয়ে যে খাবারটি অপছন্দ করে, সেটাই নাদিরা ওকে খেতে দিল অবশ্য অসচেতনভাবে। মেয়ে সামিয়া থাকে আমেরিকা। ওর খোঁজ নিতে গিয়েও ইমেইলে পেল মেয়ের চরম শীতল ব্যবহার! শাহীন যত বেশি নিষ্ঠুরতার শিকার হতে লাগল, ততই ধীরে ধীরে উপন্যাসে এ আভাস ফুটে উঠতে লাগল যে, আসলে খুনটি সেদিন শাহীন করেনি, মদের ঘোরে ওর হাতটাকে সুকৌশলে ব্যবহার করা হয়েছিল। সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের কৃতিত্ব এটাই যে, এ সত্যটি তিনি মোটা দাগে পাঠককে জানান না! উপন্যাসের কাহিনি এগিয়ে যাওয়ার ভেতর দিয়ে সে সত্য আপসেই দিনের আলোর মতো পরিস্ফুটিত হতে থাকে! কিন্তু তাতে আর লাভ কি ? ততদিনে তো সতেরো বছর জেল খাটা হয়ে গেছে! সংসার ভেঙে হয়েছে খান খান, এমনকি সন্তানরা ত্যাগ করেছে ওকে, নিজেরা মানসিক ভারসাম্যহীনতার শিকার হয়ে! এমন নিষ্ঠুর এক কঠিন পৃথিবী তৈরি করে ঔপন্যাসিক সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম যেন এবার পাঠককে আশ্বস্ত করতে চান, নিষ্ঠুরতার ভেতরেও বেঁচে থাকার অবলম্বন আছে! সে কারণে শাহীনের জীবনে আসে মনসুরের মতো এক সংবাদকর্মী, আরও পরে আসে রায়হানার মতো পরহিতৈষী বিশুদ্ধ ভালোবাসার এক নারী! রায়হানা চরিত্র নির্মাণের ভেতর দিয়ে ঔপন্যাসিক যেন আমাদের আশ্বস্ত করতে চান, শেষ পর্যন্ত নারী নারীই, নারীত্বের মহীয়ান গুণে সে হয়ে ওঠে পুরুষ তো পুরুষ, মানুষেরও পরম আশ্রয়! রায়হানা চরিত্রটির উপস্থিতি আমাদের আশ্বস্ত করে, নারী শুধু সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের উপন্যাসে নেতিবাচক বৈশিষ্ট্য নিয়ে আসে না, স্বমহিমায় তার উপযুক্ত মর্যাদাসমেত উদ্ভাসিত হয়।

এই মনসুর কর্মহীন উদভ্রান্ত দিকহারা শাহীনকে জোর করেই তার সম্পাদিত সাপ্তাহিক পত্রিকায় চাকরিতে নিয়োগ দেয়। ধীরে ধীরে কর্মের মধ্য দিয়ে সহজ জীবনে ফিরে আসার যেন ভিত পেল শাহীন। আর তারপরই সুখেন্দুর জন্য মায়া পরিতাপ যাই-ই বলি ওকে এমনভাবে তাড়াগ্রস্ত করতে লাগল যে, সে একরকম ভূতগ্রস্ত হয়ে ছুটে গেল রাজশাহীতে। কিন্তু সেখানে গিয়ে আরেক বিপদ। হিন্দু সম্পত্তি লুণ্ঠনকারীরা ওর অস্তিত্বে সন্দিহান হয়ে ওকে সর্বহারা দলের লোক সাব্যস্ত করে হত্যার প্রয়াস চালাল। ঘটনাক্রমে পুলিশ ওকে উদ্ধার করে নিয়ে গেল থানায়। আর সেখানে খানিকটা নাটকীয়ভাবেই রায়হানার অনুপ্রবেশ। সে পুলিশ এবং স্বার্থান্ধদের হাত থেকে উদ্ধার করে শাহীনকে নিয়ে এল ঢাকায়। এরপর থেকে রায়হানা হয়ে উঠল শাহীনের এক রকম মানস-আশ্রয়। কিন্তু রায়হানারও তো আছে স্বামী-সংসার। সংসার ভাঙার যে কী তীব্র যন্ত্রণা তা তো ভালো করেই জানা আছে শাহীনের। শূন্যতার হাহাকারে সে একদিন এ জঞ্জাল শহর ছেড়ে রওনা দেয় বান্দরবানে! ওর অভীপ্সা, বাকি জীবনটা কাটিয়ে দেবে সেখানেই, একাকী!

হ্যাঁ, শেষ পর্যন্ত শাহীন এ শহর থেকে পালিয়ে বাঁচতে চেয়েছে! এ শহরে রাজনীতির নামে চলে কুচক্রীপনা, এ শহরে কোনও-কোনও স্ত্রী ভালোবেসে প্রতীক্ষা করতে জানে না, স্বার্থপরের মতো নিজের কামনা বাসনা চরিতার্থ করতে বেছে নেয় সম্পন্ন সম্পদশালী পুরুষ, এ শহরের সন্তানগণও পিতৃমাতৃ স্বার্থের চেয়ে আপন স্বার্থকেই অধিক গুরুত্ব দেয়! এ নিষ্ঠুর সত্যটিকেই উন্মোচন করেছেন সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম। তাই এ শহরের বিরুদ্ধে ভেতরে ভেতরে ক্ষোভ-অসন্তোষ কিংবা শুধুই অভিমান জমতেই পারে শাহীনের হৃদয়ে! শাহীন যেন এ সময়ের সেই ভাগ্যবঞ্চিত মানুষের প্রতিনিধি, খবরের কাগজে মাঝে মধ্যেই যারা সংবাদ হয়, ভুল বিচারের কারণে অহেতুক বছরের পর বছর জেলবন্দি হয়ে কাটায়, কিংবা বলি হয় কোনও অশুভ দাপুটে ক্ষমতাচক্রের ক্রীড়নকে! শাহীন যেন এই সময়ের সেইসব মানুষের ব্যর্থতার হাহাকার আর আত্মার করুণ রোদন। তাই অনিবার্যভাবেই আমি উপন্যাসটি পাঠের পর বেদনাহত হই, নিজের দিকে অসহায় চোখে তাকাই। আমরা তা হলে এই শহরে বসবাস করছি ? যে কোনও সময়ই তো যে কেউই হতে পারি কুচক্রীদের হাতের পুতুল বা বলি। সত্যিই তিন পর্বের জীবন পাঠকের চোখ খুলে দেয়, আচ্ছন্ন করে রাখে, মনে-মননে গভীর সংবেদনা তৈরি করে। এ উপন্যাসটি কানাগলির মানুষেরা থেকে অনেক পরিণত, গতিশীল, পূর্ণাঙ্গ। তবে রায়হানা চরিত্রটির আবির্ভাব আরও খানিকটা বিশ্বস্ত এবং যৌক্তিকভাবে আসতে পারত। চরিত্রটি অনন্য সন্দেহ নেই, কিন্তু ভিত কিঞ্চিৎ শিথিল।

স্বীকার করুন আর নাই করুন, পড়ার ব্যাপারটা সারা পৃথিবী থেকেই ধীরে ধীরে কমে আসছে বা ইতোমধ্যে অনেকটাই কমে গিয়েছে! বিশেষ করে কবিতা কী গল্প বা ফিকশন বা উপন্যাস, আগের মতো কেউ আর পড়ে না বা পড়তে চায় না। কেননা, পড়ার চেয়ে মানুষের সময় কাটানোর জন্যই বলুন আর জ্ঞানার্জনের জন্য, এমন সব উপাদান হাতের নাগালে এসে গেছে যে, ওসবের প্রতিই এখন সবার ঝোঁক। মানুষ এখন দেখতেই বেশি অভ্যস্ত। যা দেখা যায় এবং শোনা যায়, তা তো পাঠের চেয়ে বেশি কমিউনিকেট করে। তো, এমন বাস্তব প্রেক্ষিতকে মেনে নিয়ে যদি কোনও ঔপন্যাসিক তার উপন্যাসের ভাষাকে সহজ সরল এবং চলচ্ছবিময় করতে প্রয়াসী হন, সেটার মধ্যে অবশ্যই যৌক্তিকতা আছে, আর যদি তা স্বতঃস্ফূর্তভাবেই হয়, তাহলে তো সোনায় সোহাগা।

কানাগলির মানুষেরা এবং তিন পর্বের জীবন উপন্যাস দুটি পাঠের অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের উপন্যাসের ভাষা সহজ এবং সরল। কোনও উপমা, অলংকারের গালিচা বিছানো নেই। আর্নেস্ট হেমিংওয়েও এ ধাতের। সরল উপস্থাপনার ভেতর দিয়ে শেষাবধি সেটি একটি জায়গায় পৌঁছোয়। শিল্পিত অবয়ব পায় ভালোমতোই। সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম সে জাতের লেখক। তবে তাঁর আজগুবি রাত পূর্বোক্ত উপন্যাস দুটোর সম্পূর্ণ বিপরীত। এ উপন্যাসে প্রতীকীর যেমন জাদুকরী প্রয়োগ ঘটেছে, মুহুর্মুহু তার বিস্তারও রয়েছে, উপমা এবং অলংকারেরও শেষ নেই।

শুরুতেই চমক, একেবারে প্রথম লাইনেই, ‘বলেশ্বর দিয়ে ভাসতে ভাসতে নূর বানুর কাটা হাত পাথরঘাটার খেয়াঘাটে এসে ঠেকল।’ একজন নারীর কাটা হাত কি পানিতে ভাসে, না-কি ভাসতে পারে ? এটা কি সম্ভব ? হ্যাঁ, সম্ভব! এমন কোনও ঘটনা ঘটলে তা তো বাতাসের বেগেই ছড়ায়। কান থেকে কানে পৌঁছে এবং কোনও না কোনও প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়। লেখক সেই তীব্র জনশ্রুতিকে উপজীব্য করে কাটা হাতটাকে প্রতীকায়িত করেছেন এবং যারা যারা প্রতিক্রিয়ার শিকার হয়েছেন, তাদের মর্মলোকে ঢুকে বিভিন্ন সত্তার ভেতর-বাহিরকে খুঁড়ে বের করে আনার অভিনব শিল্পরীতির ব্যবহার ঘটিয়েছেন। আমরা দেখব এসব চরিত্রের ভেতর দিয়ে সময়ের ছবি এবং মানুষের প্রবণতাগুলো কী নিখুঁতভাবে উন্মোচিত।

নূর বানুর কাটা হাতটা বলেশ্বর নদীতে প্রথম ভাসতে দেখেছিল চন্দ্রপাড়ার তোশারফ আলি। সে মাঝির ছেলেকে দিয়ে হাতটা পানি থেকে তুলে যখন খেয়াঘাটে উপস্থিত হয়, বড়সড় ভিড় জমে যায়। লোকজনের মধ্যে গবেষণা শুরু হলো, হাতটা কার ? কোথা থেকে এল ? সজ্জন বলে একজন বেশ চিন্তাভাবনা করে অভিমত প্রকাশ করল, প্রস্টিটিউট!

প্রায় সবাই মাথা ঝুঁকিয়ে বলতে থাকে, প্রস্টুট-প্রস্টিট-প্রস্টিটিউট! এ চিন্তার ভিত হলো পাথরঘাটার কিছুটা উজানে বালুচরে কয়েক সপ্তাহ ধরে একদল ভাসমান প্রস্টিটিউট থানা গেড়েছে। তারা খুলনার বানিশান্তা থেকে বিতাড়িত। তোশারফ আলি কাটা হাতটা থানায় নিয়ে আসেন। সেই সজ্জন তার পিছু পিছু আসে। থানায় এসে দেখে ভীষণ ভিড়। ভিড়ের কারণ ? হাল আমলের সবচেয়ে জনপ্রিয় চিত্রনায়ক লাকি খান থানায় এসে ওসির সামনে বসে আছে! পুলিশকে বলছে, ‘পুরো ইউনিট পাথরঘাটায়। আশপাশে শুটিং করবে তিন দিন। নিরাপত্তা চাই।’

ওসির মুখে আনন্দের হাসি― বিগলিত আনন্দের। ‘স্যার আপনাদের জন্য পুরো থানা প্রস্তুত। অ্যাট ইওর সার্ভিস।’ তখনই কাটা হাত নিয়ে ওসির সামনে তোশারফ আলি হাজির। কাটা হাত যেমন ওসিকে তাড়িত করে লাকি খানের মনেও আবেগের ঢেউ বইয়ে দেয়। ‘লাকি খান কাটা হাতটা নিয়ে বসে থাকলেন। লাল চোখ দিয়ে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে হাতটা দেখতে থাকলেন। হাতটার স্পর্শ কেন জানি তাকে উদাসী করেছে। এ রকম স্পর্শ ছিল টিনার। সেই শুরুর দিকে। লাভ ইন রাঙামাটিতে টিনার হাতে প্রথম হাত রেখেছিলেন লাকি, বুকে বুক, গালে গাল। হায়, কেন চলে গেল টিনা!’ লাকি খান ওসির কাছে মিনতি জানালেন, ‘বডিটা পেলেন কি না আমাকে জানাবেন। কেন জানি লাকি খানের মাথায় ঢুকেছে বডির বিষয়টা। শরীর না, লাশ না, বডি।’

আমার এ লেখাটা যারা পড়ছেন, এতক্ষণে নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন, কী রকম স্যাটায়ারের পর স্যাটায়ার আসছে উপন্যাসের ছত্রে ছত্রে। হ্যাঁ, একদিকে পরাবাস্তবের সফল প্রয়োগ, আরেকদিকে স্যাটায়ারের ভেতর দিয়ে আধুনিক এবং সঞ্চরণশীল মানুষগুলোর ভেতরের চেহারার তীব্র প্রকাশ। ঘটনারও অভিনব বিস্তার। এর মধ্যেই আবহাওয়ার সতর্ক সংকেত বিপদ সংকেতে পৌঁছে গিয়েছে। সিডরের থেকেও বড় ঝড় হবে বলে মনে করা হচ্ছে। এ ঝড়ের নাম সারিকা। হঠাৎ উদ্ভূত পরিস্থিতিতে কতজনের যে বিপদ হয়েছে! পাথরঘাটায় শ্বশুরের কুলখানিতে এসে আটকা পড়েছে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিষয়ক সচিব। সে কারণেও ওসি ব্যতিব্যস্ত। দুর্যোগ প্রতিমন্ত্রী আট নম্বর বিপদ সংকেতের পরিপ্রেক্ষিতে ওসি ইউএনও সবাইকে ঝাড়ছেন। ঝড়ের কারণে পাথরঘাটায় উপকূলীয় বনায়নের ওপর প্রতিবেদন করতে আসা সোনার বাংলা টিভি চ্যানেলের সাংবাদিক সাবরিনা, ইকবাল, আসলামরাও আটকা পড়েছে। তারাও ওসির কাছে ফোন করছে থাকার ব্যবস্থা করে দিতে। নানামুখী চাপে ওসির বেসামাল অবস্থা। তার মধ্যে আছে ওই কাটা হাত! কার হাত, কোথা থেকে এল, দায়ের কোপে হাত খসেছে না কুড়ালের আঘাতে―এসব তো খুঁজে বের করতে হবে। খুঁজে বের করা দরকার! ওদিকে কাটা হাতটা সবার মস্তিষ্কেই ঢুকে যাচ্ছে। ওসির টেবিলে কাটা হাতটাকে দেখে দুর্যোগ সচিব ‘নিজের অজান্তে আঙুল চালাচ্ছেন হাতটার ওপর। কী মসৃণ চামড়াটা, খোসা ছাড়ানো একটা সিদ্ধ ডিমের মতো।’

উপমাটা লক্ষ্য করুন! সচিবের কাছে মনে হচ্ছে সিদ্ধ ডিমের মতো! নিশ্চয়ই তুলনাটার তাৎপর্য বুঝতে পারছেন! আবার সোনার বাংলা টিভি চ্যানেলের সাংবাদিক সাবরিনাকে কাটা হাতটা সংক্রমিত করছে ভিন্ন অর্থে। ‘মেন্দিটা কি এই হাতের মালিক শবে বরাতের রাতে লাগিয়েছিল ?’

যত সময় গড়াচ্ছে ঝড়ের প্রাদুর্ভাব বাড়ছে। ঝড়ো বৃষ্টি চলছে। এর মধ্যেই কয়েকটি চরিত্রের মনোবিশ্লেষণ, কাটা হাতকে ঘিরে কাহিনির বিস্তার। বাদ যাচ্ছে না সোনার বাংলা টিভি চ্যানেলের আসলামও। চ্যানেলের সংবাদকর্মী হিসেবে যে অবৈধ লেনদেন হয়, সে বিষয়কে ঘিরে ওর মনস্তাপ। সাবরিনার কাছে বলে খালাস হতে চায় অপরাবোধ থেকে। আর যার কাটা হাত, সেই নূর বানুর জীবনচারিতাও কিন্তু পাশাপাশি দিয়ে যাচ্ছেন লেখক অধ্যায়ে-অধ্যায়ে। এ দেশের নারীরা যে কমবেশি আপন ঘরেই সবচেয়ে বেশি শোষিত হয়, বঞ্চিত হয় ভালোবাসা মায়া থেকে, নিজের অধিকার থেকে, নূর বানুর জীবন যেন তারই চরম দৃষ্টান্ত। কী তীব্র অবহেলা ওর প্রতি স্বামীর, রইসুর বয়ানে বয়ানে তার মর্মান্তিক চিত্র যে কোনও সংবেদনশীল মানুষকে স্পর্শ করবে। বিয়ের পরে অবহেলিত জীবনে নূর বানু  মাঝে মধ্যেই স্বামীর হাতে মার খায়। মেয়ের বাড়িতে বেড়াতে এসে ইরফান মোল্লার লালচ-চোখ পড়েছে নূর বানুর ওপর। ইরফান মোল্লা নূর বানুর দিকে পাপ-হাত বাড়াতেই অকস্মাৎ হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে মারা যায়। ঔপন্যাসিক এ বিষয়টিকে ঘিরে গ্রামের প্রচলিত গল্প বা সংস্কারকে কাজে লাগিয়েছেন সার্থকভাবে। ইরফান মোল্লার মৃৃত্যু যেমন একদিকে নূর বানুর ইজ্জত রক্ষা করতে ভূমিকা রাখে, অন্য দিকে ওর সত্তাকে কলঙ্কিতও করে রেখে যায়। বাতাসে মিথ্যেই বদনাম ছড়িয়ে বেড়ায়, নূর বানু কুলটা। এর মধ্যে একমাত্র ছেলেটি মারা যায় উঠোনের বিশাল পাত্রে পড়ে। এভাবেই কাহিনির একটি ধারায় নূর বানুর বিবর্ণ জীবনের বয়ান হতে থাকে, আর একটি ধারায় নূর বানুর কাটা হাতকে ঘিরে সারিকা নামের ঝড়ের মুখে নানা কর্মের ঘনঘটাকে স্যাটায়ারের মাধ্যমে তুলে ধরা হচ্ছে। বানিশান্তা থেকে বিতাড়িত ‘প্রস্টুট-প্রস্টিট-প্রস্টিটিউট’রাও চরিত্র হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছে। শেষে কাহিনির দুটো ধারা মিলে গিয়ে উন্মোচন করে কীভাবে নূর বানুর দেহ থেকে ওর ডান হাতটা বিচ্ছন্ন হলো, কীভাবে ওটা গিয়ে পড়ল নদীতে! যুগপৎ কৌতূহলের নিরসন এবং পাঠককে তীব্র এক জিজ্ঞাসার ভেতর ছেড়ে দিয়ে উপন্যাসটি শেষ হয়।

যেভাবে একটি কাটা হাতকে ঘিরে উপন্যাসটি শুরু হয়েছে, বিভিন্ন শ্রেণির চরিত্রগুলোকে দোলায়িত করেছে, একজন উপকূলীয় অঞ্চলের নারীর জীবনের বঞ্চনাকে তুলে ধরেছে, স্থানীয় লৌকিক গল্পকে সার্থকভাবে কাহিনির সঙ্গে সমন্বিত করেছে, সব মিলিয়ে আজগুবি রাতকে আমি পরাবাস্তবধর্মী উপন্যাসই বলব। সেই সঙ্গে এই বিস্ময়ও ব্যক্ত করব যে, কত সহজ ও সরল বর্ণনা ও উপস্থাপনা সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের, পরাবাস্তবতার নামে সামান্যও দুর্বোধ্যতা নেই। সচেতন পাঠকমাত্রই এর রস যেমন উপভোগ করতে পারবেন, স্যাটায়ার আর করুণ রসের ব্যঞ্জনায় চরিত্র এবং কাহিনির সঙ্গে নিজের যাপিত জীবনকেও মেলাতে পারবেন। আমি মনে করি, একটি সার্থক উপন্যাসের এটাই বড় গুণ যে, তা পাঠকের চিন্তার জগৎকে ঘোর আচ্ছন্ন রাখতে পারে।

উপন্যাসের অভিনব আঙ্গিক, কাঠামো, ভাষার আলংকারিক সৌন্দর্য সব মিলিয়ে আজগুবি রাত একটি সার্থক সৃষ্টি তো বটেই, অপ্রচলিত রীতির প্রয়োগে একেবারে নতুনতম সংযোজন, অন্তত বাংলাদেশের কথাসাহিত্যে। ‘আজগুবি রাত’ বহু বছরই বেঁচে থাকবে বলেই মনে করি।

সবশেষে ধন্যবাদ জানাচ্ছি উপন্যাস ত্রয়ীর প্রকাশক পাঞ্জেরীকে। তিনটি উপন্যাসকে একসঙ্গে পড়ার সুযোগ করিয়ে দিয়েছেন। তবে তাদের বিরুদ্ধে আমার অভিযোগও আছে! এত বানান ভুল কেন ? খুবই পীড়াদায়ক। আর খানিকটা সম্পাদিতও হতে পারত। মাঝে মধ্যেই ‘একটি’ শব্দের ব্যবহার অতিরিক্ত মনে হয়েছে। এসব ছোটখাটো সংশোধন সম্পাদকের কাজ। লেখক একটা ঘোরের ভেতর তার লেখাটি সম্পন্ন করে যান বলে ছোটখাটো ব্যাপারগুলো চোখ এড়িয়ে যায়। যে কোনও গুরুত্বপূর্ণ বই ভালো প্রুফ রিডার এবং সম্পাদকের আদর বা যত্ন আশা করে। আমাদের দেশে এদিকটি বড়ই উপেক্ষিত। প্রুফ রিডার বা সম্পাদকের সম্মানীও বাড়ানো উচিত, তাহলে এ ক্ষেত্রটি সমৃদ্ধ হবে বলে নিশ্চিত বিশ্বাস।

 লেখক : কথাশিল্পী

Leave a Reply

Your email address will not be published.

shares