গল্প : রঙিন দরজা : সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম

সকাল দশটায় দোকানের ঝাঁপি ওঠে। দোকান-মালিক মোকসেদ আলি আসেন এগারোটায়। দুপুরে বাড়ি গিয়ে, খেয়ে, কিছুক্ষণ ভাত ঘুম দিয়ে, আবার দোকানে আসেন সাড়ে তিনটার দিকে। দোকান খোলা থাকার কথা পাঁচটা পর্যন্ত, কিন্তু প্রায়দিন পাঁচটার মধ্যেই তার কিছু বন্ধু এসে হাজির হন, আড্ডা জমে, সন্ধ্যা ঘনায়, অনেকটা সময় পার হয়ে যায়। বয়স যখন ষাটের ঘরে গড়ায়, অবসরটা তখন অনেকের জন্য পাকাপোক্ত হয়, বিশেষ করে একসময় যারা সরকারি চাকরিতে না-হয় ব্যাংকে কাজ করতেন, অথবা স্কুল কলেজে মাস্টারি করতেন। মোকসেদ আলি কোনও দিন চাকরি করেননি, তার কপালে অবসরও তাই জোটেনি। তিনি মাঝে মাঝে চোখ  বুজে ভাবেন, যদি অবসরের একটা জীবন তার থাকত, কীভাবে তিনি তা কাটাতেন। তিনি নিশ্চয় যৌবনের প্রিয় জায়গাগুলোতে ঘুরে বেড়াতেন, বাগান করতেন, মাঝে মধ্যে দুই মেয়ের কাছে গিয়ে থাকতেন। তার চিন্তাটা অবিশ্যি ওই পর্যন্ত যাওয়ার পরই খেই হারায়। দুই মেয়ের, বিশেষ করে ছোটটির, বাড়িতে তিনি কি খুব শান্তি নিয়ে ক’টা দিনও থাকতে পারতেন, অবসরে যে রকম শান্তি মানুষ চায় ?

              দুই মেয়ের কথা মনে পড়লে একটা যে ছেলে আছে তার, যে কলেজ পাস করেছে, তার কথাও তো মনে পড়া উচিত। কিন্তু ছেলেটিকে নিয়ে মোকসেদ আলি ভাবতে চান না। অনেক আশা নিয়ে তাকে তিনি পড়াশোনা করিয়েছেন, ঢাকাতে পর্যন্ত পাঠিয়েছেন, যাতে সে সুশিক্ষা পায়। কিন্তু যে চার বছর সে ঢাকা ছিল, শিক্ষার পথ থেকে যতটা দূর যাওয়া যায়, সে গিয়েছে। রাজনীতিতে নাম লিখিয়েছে, এক ছাত্রনেতার ডান হাত হয়েছে। তার সঙ্গে টেন্ডার বাণিজ্যে নেমেছে। তার হাতে কাঁচা টাকা আসতে শুরু করলে উচ্ছন্নে যাওয়ার যেটুকু বাকি ছিল, তা সে গেছে।

মোকসেদ আলি হতাশ হয়েছেন। অনেকবার ঢাকা গিয়ে ছেলেকে বুঝিয়েছেন। কিন্তু একদিন নিজেই বুঝলেন, ছেলের কাছে তার কোনও কথারই দাম নেই। ঢাকায় একটা ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়ে ছেলেটা থাকে। একটা মোটরসাইকেল কিনেছে। তার কথাবার্তা শুনে মনে হলো, একটা গাড়ি কেনার মতলবে আছে। ছেলে এখন আরেক মানুষ, যাকে তিনি চেনেন না।

ছেলের বে-পথে যাওয়াটা হয়ত কপালের লিখন বলে তিনি মেনে নিতেন, কিন্তু এরপর সে যা-করল তা শোনার জন্য তিনি প্রস্তুত ছিলেন না। মোকসেদ আলির দোকানের এক কর্মচারী, যার নাম রুমান, একদিন একটা খবরের কাগজ নিয়ে এসে তাকে দেখাল। ঢাকার কাগজ। সেখানে ভেতরের পৃষ্ঠায় ছেলের ছবি ছাপা হয়েছে। একটা মেয়েকে জোর করে তার ফ্ল্যাটে নিয়ে গিয়েছিল, সারারাত তাকে নিয়ে যা-তা করেছে, ভোরে বের করে দিয়ে বলেছে, বাড়ি যাও। মেয়ে বাড়ি না-গিয়ে সোজা গেছে থানায়। থানার পুলিশ এসে ছেলেকে ধরে নিয়ে গেছে। তারপর আদালতে তুলেছে। আদালত তাকে কাশিমপুর পাঠিয়ে দিয়েছে। খবরটা পড়ে মোকসেদ আলির যতটা না মন খারাপ হয়েছে, তার থেকে বেশি ঘেন্না লেগেছে―  ছেলের ওপর, অবশ্যই, কিন্তু তার থেকে বেশি নিজের ওপর। এমন ছেলেকে তিনি জন্ম দিয়েছেন ? এই ছেলেকে তিনি সুশিক্ষা দিতে চেয়েছেন ?

নিজের ওপর ঘেন্না হওয়ার আরেকটা কারণ, খবরের কাগজে তার নামটাও ছাপা হয়েছে। লেখা হয়েছে, মোশাররফ আলি ওরফে জুয়েল পাইকপাড়া আলমডাঙ্গার মোকসেদ আলির ছেলে। ভাগ্য ভালো কাগজে  জুয়েলের মা’র নাম ওঠেনি। যদি উঠত, এবং তার কানে যেত, তিনি নিশ্চয় কষ্টে-ঘৃণায় মারাই যেতেন।

জুয়েলের মা, মোকসেদ আলির স্ত্রী, আলেয়া, সাত আট বছর বিছানাবন্দি। পক্ষাঘাত। কীভাবে যে হলো, কেউ বুঝতেই পারল না। না তিনি নিজে, না ডাক্তার। মোকসেদ আলির কথা তো ওঠেই না। ডাক্তার শুধু বলেছে, স্নায়ুরোগ। এক বিরল ভাইরাস তার স্নায়ু ক্ষয় করেছে। ইত্যাদি। তরতাজা মানুষটা বছর দু’য়েকের মধ্যে হাঁটাচলা করার ক্ষমতা হারালেন। ভাগ্য ভালো, তার বড় ভাইয়ের এক মেয়ে আছে, বিয়ের তিন বছরেই একটি মেয়ে নিয়ে যে বিধবা হয়েছে। মেয়েটা কোনও রকমে শ^শুরবাড়িতে পড়ে ছিল, কিন্তু তার ওপর এক চাচাতো দেবরের দৃষ্টি পড়লে ওই বাড়িতে থাকাটা তার জন্য কষ্টের এবং বিপদের হয়ে পড়ল। খবর পেয়ে মোকসেদ আলি নিজে গিয়ে মেয়েটাকে নিয়ে এলেন। সেই থেকে সে তাদের সঙ্গে থাকে, দেখাশোনা করে। একজনের চরম দুর্ভাগ্য আরেকজনের স্বস্তি হয়ে দেখা দিল―এ কেমন বিচার এই দুনিয়ার, তিনি ভাবেন। একটা কাজের মেয়েও অবিশ্যি রাখা হয়েছে। আলেয়ার যতখানি যত্ন নেওয়া যায়, মোকসেদ আলি নেন, কিন্তু বাসায় বেশিক্ষণ থাকতে তার ইচ্ছে করে না।

আলমডাঙ্গার জুতাপট্টি রোডের দোকানটা তার একের ভেতরে দুই। একদিকে ইলেকট্রিক সামগ্রী, অন্যদিকে স্যানিটারির জিনিসপত্র। মাঝখানের দেয়ালটা কাচের। মোকসেদ আলি বসেন ইলেকট্রিক অংশের পেছনে। তার পেছনে দেয়াল। বাঁয়ে একটা একপাল্লার দরজা, যা দিয়ে গুদামঘরে যাওয়া যায়। এই দোকানটা ছিল তার বাবার, তিনি করতেন ঢেউটিনের ব্যবসা। বাবা মারা গেলে তিনি দোকানটার হাল ধরলেন। শুরুতে ব্যবসাটা তিনি করতেন তার স্ত্রী ও তার জন্য। ওই ব্যবসায় তিন চার শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী জুটলে ঢেউটিন ছেড়ে মোকসেদ আলি নতুন দুই সামগ্রীর দিকে ঝুঁকলেন। ছোট মেয়েটার জন্ম হলে তিনি ঢেউটিন বাদ দিয়ে ইলেকট্রিক সামগ্রীর ব্যবসা শুরু করলেন। মেয়েরা বড় হলে, ছেলে স্কুলে যাওয়া শুরু করলে, খুললেন স্যানিটারি অংশ। সৎ ব্যবসায়ী হিসেবে মোকসেদ আলির খ্যাতি আছে। দুই সামগ্রীতে তার ভালোই লাভ হতে থাকল। ব্যবসার পয়সায় তিনি দুই মেয়ের বিয়ে দিলেন, ছেলেকে ঢাকায় পাঠালেন। এখন তিনি দোকান চালাচ্ছেন―আবারও তার এবং তার স্ত্রীর জন্য। স্ত্রীর চিকিৎসায় অনেক টাকা গেছে। এখন চিকিৎসা তেমন নেই, তবে সেবা আছে। দোকানটা আগে সন্ধ্যার পরও ঘণ্টা দুয়েক খোলা থাকত, এখন বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা তেমন না-জমলে শীতের মাসগুলো ছাড়া তিনি বাড়ি ফেরেন সন্ধ্যার আগেই। তবে ব্যবসাটা ভালো। ফলে তার অভাব নেই, দায়-দেনা নেই।

তিনি চোখ বুজে অবসরের যে ছবি দেখেন, তাতে, আমরা উল্লেখ না-করলেও, আলেয়াও আছেন। আলেয়া সুস্থ থাকতে তাকে নিয়ে একবারই তিনি ঢাকা যেতে পেরেছিলেন। ঢাকা খুব পছন্দ হয়েছিল তার। তবে মোকসেদ আলি একা বেড়াতে গেছেন সিলেট-শ্রীমঙ্গলে এবং একবার কক্সবাজারে। আলেয়াকে সেসব জায়গাতেও নিয়ে যেতে তার ইচ্ছা করে। তিনি গেলে সঙ্গে তার ভাইঝি মিনাও নিশ্চয় যাবে, মিনার মেয়ে সুমনা, এবং সম্ভবত কাজের মেয়ে আছিয়াও। গত বছর আলেয়া ক’দিনের জন্য বাড়ির বাইরে যেতে ব্যাকুল হয়ে উঠলে মোকসেদ আলি তার ব্যবস্থা করেছিলেন। ছোট মেয়েকে বলেছিলেন, তার ওখানেই তারা যাবেন, যেহেতু সে থাকে চুয়াডাঙ্গা, যাত্রাটা লম্বা হবে না, সহনীয়ই হবে। একটা অ্যাম্বুলেন্স ভাড়া করে সকলে মিলে তারা গেলেনও। কিন্তু মোকসেদ আলি দু’দিন চুয়াডাঙ্গাতে থাকার পর ব্যবসা সামলাতে স্ত্রীকে রেখে চলে আসতে চাইলে তিনি জানালেন, তিনিও ফিরবেন। কেন, তার কোনও ব্যাখ্যা দিলেন না। মোকসেদ আলি ফেরার আয়োজন করলেন। আলেয়ার ভাতিজি মিনা একসময় আস্তে করে জানাল, নুরি, অর্থাৎ মোকসেদ আলির ছোট মেয়ে, তার মা-কে দু-একবার রাগের কথা শুনিয়েছে। পুরো একটা বাহিনী নিয়ে কেন তিনি হাজির হয়েছেন, তার জন্য। বলেছে, এজন্য তার স্বামী ভীষণ বিরক্ত।

বাড়ি ফিরে আবার বিছানায় গেলেন আলেয়া। মেয়ের সঙ্গে কথা বলা বন্ধ করে দিলেন। মেয়ে ফোনে মাফ চাওয়ার পর কথা এখন অবিশ্যি বলেন, তবে শুধু মেয়ে ফোন করলে। নিজ থেকে কখনও না।

মোকসেদ আলি দোকান চালান তার দুই কর্মচারীর জন্যও। তার একটি রুমান, অন্যটি বিপ্লব। দু’টোই ভালো ছেলে, করিৎকর্মাও। যত্ন করে কাজ করে, টাকা পয়সা, মালসামান নয় ছয় করে না। তাদের ওপর তিনি নির্ভর করতে পারেন। মোকসেদ আলির কিছু বাঁধা খদ্দের আছেন, যেমন ইম্পেরিয়াল হোটেলের ম্যানেজার ফুয়াদ মণ্ডল অথবা লতিফ বিল্ডার্স-এর মালিক মুসা মিয়া। তারাও ছেলে দুটিকে বখশিস দেন। বলেন, আলি সাহেব, আপনার মতো কর্মচারী-ভাগ্য থাকলে আরও অনেকদূর যেতাম।

বিকেল পাঁচটায় যেদিন তার তিন চার বন্ধু আসেন, দোকানের স্যানিটারি অংশে ঝাঁপ পড়ে। ইলেকট্রিক অংশের কাজ চলে, যা তিনি নিজেই দেখতে পারেন। ফলে দুটি ছেলেকে তিনি চলে যেতে বলেন, কিন্তু দুজনের একজনকে যে থাকতে হবে সাড়ে ছয়টা-পৌনে সাতটা পর্যন্ত, তা তারা বোঝে, তা না-হলে চায়ের যোগান কে দেবে ? চায়ের সঙ্গে পুরি-সমুচার ব্যবস্থা কে করবে ? বেশিরভাগ দিন বিপ্লবই থাকে, দোকানের সামনের দিকে যে কাউন্টার, তাতে বসে। মোকসেদ আলির বন্ধুদের একজন আবুল কালাম, যিনি আর্মিতে সার্জেন্ট ছিলেন, একটা ফিল্ড এক্সারসাইজে গিয়ে শরীরে আঘাত পেয়েছিলেন। আগেভাগেই সেজন্য অবসরে গেছেন। আরেক বন্ধু, জামালউদ্দিন, জাহাপুর হাইস্কুলের হেডমাস্টার ছিলেন। অবসরে যাওয়ার আগে পাইকপাড়াতেই জমি কিনে একটা একতলা বাড়ি বানিয়েছেন। তৃতীয় আরেক বন্ধু, হাশেম জোয়ার্দার, সরকারের শুল্ক ও আবগারি বিভাগে চাকরি করতেন। চতুর্থ এক বন্ধু আছেন মোকসেদ আলির, হরিপদ সেন, যিনি কুষ্টিয়া সিভিল সার্জনের অফিসে কাজ করতেন। তার প্রচুর অসুস্থতা। অসুস্থতাটা কমলে, হাঁটাচলার মতো অবস্থা হলে, আড্ডায় আসেন। না হলে বাড়িতেই থাকেন।

এরা সকলেই গোকুলখালি হাইস্কুলে পড়তেন। একই ক্লাসে। এসএসসি পাস করে বেরুলে তাদের ছাড়াছাড়ি হয়। মোকসেদ আলি কলেজে পড়েননি। বাকিরা পড়েছে, যার যার মতো পছন্দের কলেজে। কালাম চাকরি নিয়েছেন, বাকিরা কুষ্টিয়া অথবা খুলনায় গেছেন। অবসর পর্যন্ত আলমডাঙ্গায় তাদের যাওয়া-আসা ছিল। ছুটি-ছাটায় এলেও মোকসেদের দোকানে আড্ডাতে বসেছেন। কিন্তু এই এক দেড় বছর যেরকম নিয়ম মেনে প্রায় দিন বসা হয়, তেমন কখনও হতো না।

বিপ্লব বেশ অবাক হয়ে এই মানুষগুলোকে দেখে। বেশিরভাগ দিন সে যে নিজে থেকে রুমানকে বাড়ি যেতে দেয়, তার কারণ সে আলমডাঙ্গায় একা থাকে, রুমান থাকে তার বাবা মা’র সঙ্গে। তাদের ওকে দরকার হয়, রুমান আবার বাবা-মা’র জন্য খাটেও বেশ। দোকানের আড্ডার কথাবার্তা যেটুকু তার কানে আসে তাতে তার মনে হয়, লোকগুলো আসলেই অসুখী। মোকসেদ সাহেবের ছেলের বিষয়টা তো সবাই জানে, তার যে চার বছরের জেল হয়েছে, তা-ও সে কাগজে পড়েছে। আদালতে মামলা চলার সময় মোকসেদ সাহেব ঢাকা গিয়েছেন। কিন্তু প্রতিবারই ফিরেছেন চোখে মুখে কষ্ট নিয়ে। একদিন সে শুনেছে মোকসেদ সাহেব বলছেন কালাম সাহেবকে, ছেলেকে নিয়ে তিনি কথা বলতে চান না। কালাম সাহেবের জমিজমা তার ছোটভাই কীভাবে যেন দখল করে নিয়েছে। তিনি ক্রাচে ভর দিয়ে হাঁটেন, তার তিন সন্তানের তিনটিই মেয়ে। কে তাকে সাহায্য করবে ? জামাল সাহেবের অবস্থাটা ভালো, কিন্তু তার স্ত্রী মারা গেলে ছেলেমেয়েরা চাকরি নিয়ে, বিয়ের সুবাদে, ঢাকা চট্টগ্রাম চলে গেলে আলমডাঙ্গায় তেমন আসে না। কখনও এখানে এসে থাকবে, সেরকমও মনে হয় না। আর হাশেম সাহেবের সমস্যাটা হলো, তার নামে একটা মামলা ছিল, যে মামলা দেওয়া হয়েছিল তাকে ফাঁসানোর জন্য। সেজন্য তার চাকরিটাও গেল। মামলাটা এক সময় আদালতে টেকেনি। কিন্তু তা শেষ হতে হতে হাশেম সাহেবের জমানো টাকাও সব শেষ হয়ে গেছে। তারপর তিনি যে চাকরিটা ফিরে পাবেন, সেরকম কোনও উদ্যোগ কেউ নিল না। নিলেও কোনও লাভ হতো না, সে বয়সটা তার হাতে ছিল না। আদালত তাকে ক্ষতিপূরণ দিতে বলেছে, কিন্তু ক্ষতিপূরণের একটা টাকাও তার হাতে আসেনি।

মোকসেদ আলি বললেন কালামকে, তুমি আর্মিতে চাকরি করেও আপন ভাইটার জালিয়াতি ঠেকাতে পারলে না। তো হাশেম কি করে পারবে, বল ?

কালাম বললেন, ওসব কথা রাখো। খালি কষ্ট বাড়ায়।

মোকসেদ কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললেন, ছেলেটা আমাকে দেখে হাউমাউ করে কাঁদল। আমি একটা কথাও বললাম না। একসময় দেখলাম, মেয়েটা তার বিরুদ্ধে যে মামলা করেছে, তাতে শুধু শারীরিক নির্যাতনের কথা আছে, ইচ্ছার বিরুদ্ধে আটকে রাখার কথা আছে, কিন্তু মেয়েটার ইজ্জত যে সে নিল, তা চেপে যাওয়া হলো। হয়ত মেয়েটার ভবিষ্যৎ চিন্তা করে। তাতে অবিশ্যি ছেলেটা আরও অনেক বছর জেলের ভাত খাওয়া থেকে বেঁচে গেল। ওর মালিকানা আমার হাত থেকে যে লোকটা নিয়ে নিয়েছিল, সেই ছাত্রনেতা, সে তার জন্য ভালো উকিল রেখেছিল। মেয়েটা থানায় যাওয়ার ঘণ্টাখানেক পরে ছাত্রনেতাটাও সেখানে হাজির হয়েছিল। হয়ত তাকে ভয় টয় দেখিয়ে ইজ্জত নেওয়ার বিষয়টি মামলায় উল্লেখ করতে দেয়নি।

হরিপদ বললেন, ইজ্জত নেওয়ার মামলায় ডাক্তারি পরীক্ষার প্রয়োজন হয়। বেশি দেরি হয়ে গেলে এই মামলা টেকে না, যদি-না আপনি বিরাট ক্ষমতাধর কারও আত্মীয়-স্বজন হন। এ দেশে মামলা বেঁকে যায় টাকার খেলায়। ভয়ভীতিতে। মেয়েটাকে নিশ্চয় তোমার ছেলের মালিক প্রচুর ভয় দেখিয়েছিল।

হরিপদ সিভিল সার্জনের অফিসে কাজ করেছেন, অভিজ্ঞতার থলেটা ভারী। হতাশাটাও তীব্র।

কিছুটা সুস্থ বলে তিনি সেদিন আড্ডায় এসেছিলেন। হাশেম বললেন, অবসর নিয়ে অনেক স্বপ্ন ছিল। সব হাওয়া হয়ে গেছে। ভাগ্যিস তোমার দোকানটা ছিল।

জামালুদ্দিন বললেন, বাড়িটা এখন কবরের মতো সুনসান। তোমাদের সেখানে ডাকতে ইচ্ছা করে না, একলা থাকি, একলা বাড়িতে যেভাবেই হোক সহ্য করে নিই। কিন্তু তোমরা যদি যাও, অনেক গাল-গল্প করো, এক সময় তো ফিরে যাবে, তাই না ? বাড়িটা কেমন হবে তখন ? কবর থেকেও বেশি কবর, তাই না ?

বিপ্লব দেখল, লোকগুলো মাঝে মাঝে হাসেন, ঠাট্টাও করেন, খোঁচা মারেন একজন আরেকজনকে, কিন্তু তাদের সব হাসি-ঠাট্টার পেছনে কোথায় যেন একটা কান্নাও বাজে। জীবন তাদের অনেক দিয়েছে, তারা বলেন, কিন্তু হঠাৎ রেগে যেন ফিরিয়েও নিয়েছে সব। যা দিয়েছে, তার থেকেও বেশি।

তার কষ্ট হয়, মায়া হয় লোকগুলোর জন্য।

বিপ্লব ছবি আঁকে। ছবি এঁকে সে দুঃখ ভোলে, স্মৃতির কষ্ট সামলায়। অল্প বয়সে মাকে হারালে তার দুঃখ কষ্টগুলো যত দিন গেছে, বেড়েছে। একসময় তার মনে হয়েছে, এগুলোর ভারে সে মারাই পড়বে। কিন্তু তাকে বাঁচতে হবে। কিছু না হলেও একটি যে ছোট বোনকে জন্ম দিতে গিয়ে মা মারা গেলেন, সেই বোনটাকে বাঁচাতে হবে। সে মোকসেদ আলির বন্ধুদের দেখে আর মন খারাপ করে। কিন্তু এটাও সে জানে, তার মতো কষ্টের জীবন তাদের আগে কখনও ছিল না। সে ভাবে, সে আর মোকসেদ সাহেবের বন্ধুরা যেন উল্টো দুই পথে আসা দুই ট্রেনের মতো একটা স্টেশনে এসে দাঁড়িয়েছে, যেখানে সে এসেছে কষ্ট নামের অনেকখানি পথ পাড়ি দিয়ে। তারাও অবশ্য কিছুটা কষ্টের পথ পাড়ি দিয়ে এখানে এসেছেন, কিন্তু এখন তাদের যেতে হবে বিপ্লবের পাড়ি দেওয়া কষ্টের পথে, সে পথের শেষে, কোনও মন খারাপ করা স্টেশনে, দীর্ঘশ্বাসের হুইসিল বাজিয়ে, কে যে তাদের থামাবে, তারা তা জানেন না। আপাতত থেমে থাকা ট্রেনের মতোই তাদের সবার জীবন।

বিপ্লব তার কষ্টগুলো ভুলতে মায়ের ছবি আঁকত, ছোট্ট বোনটার ছবি আঁকত। ছোট বোনটাকে তার দিদিমা এসে নিয়ে গিয়েছিলেন। দিদিমার বাড়িতে আকাল লেগে আছে, সেখানেও কতদিন বোনটা টেকে, সে জানত না। কিন্তু সেখানে সে যদি মরেও যায়, কেউ বলতে পারবে না আদর ভালোবাসার অভাব সে জন্য দায়ী। ভাতের অভাব থাকলেও মায়া-ভালোবাসার অভাব তো আর ছোট মেয়েটির নেই।

বিপ্লবের আল্পনার হাতও অসাধারণ।

পূজা-পার্বণে গ্রামের অনেক বাড়িতে তার ডাক পড়ত। কুমারেরা সরস্বতী না-হয় দেবী দুর্গার মূর্তি গড়ে রং লাগানোর জন্য তাকে ডাকতেন। তাতে তার হাতে কিছু পয়সা আসত, যে পয়সার কিছু সে লুকিয়ে জমাত। বাকিটা বাবা নিয়ে নিতেন।

বিপ্লব জানে ছবির জগৎটা মানুষের মনকে কষ্ট দুঃখ থেকে ফেরাতে পারে। এক রাতে তাকে তার নতুন মা একটা চেলাকাঠ দিয়ে অনেক মারলে তার নাক ফেটে রক্ত বেরিয়েছিল। স্কুলের খাতা থেকে একটা পৃষ্ঠা ছিঁড়ে রাতের অন্ধকারে সেই রক্ত আঙুলে লাগিয়ে সে একটা ছবি এঁকেছিল। কি আঁকছিল, তার কিছুই তার চোখে পড়ছিল না, চোখটাতে যেহেতু বাষ্প জমেছিল। আর রাতের অন্ধকার তো ছিলই। সকালে উঠে সে দেখল, সাদা পাতাজুড়ে একজোড়া গভীর মায়াময় চোখ। চোখ দুটি যেন হাসছে। রংটা কালচে বাদামি, কিন্তু এই রংটাও যেন হাসিটাকে আরও মায়াবী করে তুলেছে।

ছবিটার দিকে তাকিয়ে একসময় বিপ্লব হেসেছিল। অনেকক্ষণ সেই হাসিটা তার বাজল। তারপর বালিশের নিচে ছবিটা রেখে দিল। গোয়ালঘরের পাশে একটুখানি একটা ঘর, কোনও রকমে একটা বিছানা পেতে শোয়া যায়। এই ঘরে কেউ কোনওদিন ঢোকে না, তার বাবাও না। ছবিটা নিরাপদ থাকবে।

পুকুরে মুখ ধুতে গিয়ে সে দেখল, পানিতে তার যে ছায়া পড়েছে, তাতে মুখের কোথাও আঘাতের চিহ্ন নেই। নাকটাতে যে ব্যথা ছিল, তাও নেই। মুখে হাত বুলিয়ে সে অনুভব করল, মুখটা তাজা।

অবাক!

পানিতে নিজের ছায়ার দিকে তাকাতে তাকাতে বিপ্লব জানল, এই জগতের বাইরে―অথবা এর গভীর ভেতরে―আরেকটা জগৎ আছে, যাতে ঢোকার জন্য, ঘুরে বেড়ানোর জন্য, কোনও কাঠখড় পোড়াতে হয় না। শুধু চোখ বুজে একটা ধ্যানে বসতে হয়। তখন সময় যত যায়, ঘড়ির কাঁটা সামনে এগোয়, না পেছনে, কে জানে, কিন্তু চোখের ভেতরে একটা নরম আলো ফোটে, আর সেই জগৎটা তার রঙিন দরজা খুলে দেয়।

মোকসেদ আলি শুক্রবার দোকানে আসেন না, দোকানটা বন্ধই রাখেন। তার বিশ্বাস একটা ব্যস্ত ব্যবসাকেও মাঝে মাঝে নিঃশ্বাস ফেলার সময় দিতে হয়। তিনি তার দুই কর্মচারীকে একদিন বললেন, দোকানটা কেমন যেন মরা মরা লাগে, যেন জীবন নাই। কেনরে ?

রুমান চুপ করে রইল। বিপ্লব বলল, স্যার, দোকানে রং নাই।

মোকসেদ রাগ করলেন, আমি কি এখন রং বিক্রি করব ? বার্জার পেইন্ট ? নাকি এই কাচের ওপর রং  লাগাবো ? রং মানে কি ?

ওই রং না স্যার, রংটা ভেতরের, বিপ্লব বলল।

মোকসেদ আলি চমকালেন। রুমানকে বললেন, শুনলি, ছেলেটা কি রকম চটং চটং কথা বলা শিখেছে ?  মাথাটা কি গেছে ?

রুমান বলল, স্যার, সামনের শুক্রবার আমরা দোকানটা ঝেড়ে মুছে পরিষ্কার করব।

তাই কর। কালিঝুলি বেড়েছে দোকানটাতে, মোকসেদ বললেন, কিন্তু বাড়ি যেতে যেতে বিপ্লবের কথাটা তাকে গভীর ভাবালো। এই যে একদিন, শুক্রবার, আড্ডা হয় না, যেমন ইচ্ছে থাকলেও মাঝে মধ্যে আড্ডার সুযোগ হয় না, তাতে তার বন্ধুরা খুব মন খারাপ করে। কেন ? কারণ কারও জীবনে রং নাই। রং যা কিছু ছিল ধুয়ে টুয়ে গেছে। কিছুদিন আগে কেনা তার গামছাটার মতো। যতবার গামছাটা ধোয়া হয়, রং যায়। আজ সকালে দেখলেন সেটা একটা ত্যানা হয়ে গেছে।

বিপ্লব ছেলেটার জন্য তার মায়া লাগে। কী একটা জীবন সে কাটাল। সেদিন বিপ্লব তাকে বলেছে, এখন সে হাসতে পারে। হাসার শক্তিটা পেয়েছে যেদিন তার বোনটা এইচএসসি পাস করল, সেদিন।

মোকসেদ আলির স্ত্রী বিপ্লবের বোনটাকে মাঝে মধ্যে টাকা পয়সা দিতেন, কাপড় কিনে দিতেন, কিন্তু পড়াশোনার খরচটা বিপ্লবই দিয়েছে। সব চাইতে বেশি যা সে দিয়েছে, তা হচ্ছে সাহস। মেয়েটার চোখে মুখে সাহস।

শুক্রবার সকাল সকাল দোকান খুলল রুমান আর বিপ্লব। এক ঘণ্টায় তারা অনেক ময়লা পরিষ্কার করল। এরপর বিপ্লব বলল রুমানকে, আমি এই দরজায় ছবি আঁকবো। বাকি ঝাড়ামোছার কাজটা তুমি করো।

রুমান অবাক হলো, ছবি আঁকবে ?

বিপ্লব হাসল। একটা চটের ব্যাগে সে রং নিয়ে এসেছে। কতগুলো ব্রাশও। এগুলো সে জোগাড় করেছে ইসমাইল পেইন্ট স্টোর থেকে। মাঝে মাঝে ইসমাইল সাহেব দোকানের ড্যামেজ হওয়া রঙের কৌটা-ব্রাশ বিপ্লবকে ডেকে দিয়ে দেন। তার ক্ষতি হয় না, ডিলাররা নতুন চালান দিয়ে যায়। কিন্তু ছেলেটা এক কৌটা রং পেলে যেরকম খুশি হয়, তাতে ইসমাইল সাহেব বিরাট কিছু সাহায্য দেওয়ার আনন্দ পান।

রুমানের ঝাড়া-মোছায় আপত্তি নেই। কিন্তু বিপ্লব যে রং দেওয়া শুরু করছে মোকসেদ সাহেবের টেবিলের পাশের একপাল্লার দরজায়, তাতে উনি কতটা রেগে যান, ভেবে সে উদ্বিগ্ন হলো। বলল, স্যার যদি রাগে ?

রাগবে না, একটা নিশ্চিন্তি নিয়ে বলল বিপ্লব। এরপর সে দরজাটার নিচে পুরোনো খবরের কাগজ বিছিয়ে আঁকতে শুরু করল। প্রথমে দরজার পুরো পাল্লাটা সাদা রং করে শুকাতে দিল। ঘণ্টা দুয়েক পর তাতে অন্যান্য রং চড়ানো শুরু করল। লাল, সবুজ, হলুদ, নীল। রুমান দেখল, বিপ্লব ছবি আঁকছে নাকি একটা ধ্যানে বসেছে বোঝা যাচ্ছে না। ডাকলে শোনে না, চা-শিঙাড়া নিয়ে এলেও খায় না।

চার পাঁচ ঘণ্টা পর দরজাটা হয়ে গেল একটা ঝকঝকে ছবি, যে ছবিতে একটা সবুজ জঙ্গলের ভেতর দিয়ে একটা সরু পথ এঁকে বেঁকে চলে গেছে। একটা পুকুরে ছায়া পড়েছে শান্ত কোনও বিকেলের। জঙ্গলের ওপরে হাল্কা নীল আকাশ, তাতে পাখি উড়ছে, মেঘ ভাসছে। রুমান কিছুক্ষণ ঘুমিয়ে ছিল। ভাত ঘুম। বিপ্লব খায়নি, সে ধ্যানে আছে। ঘুম ভেঙে রুমান অবাক চোখে ছবিটা দেখল। এ কি ছবি, নাকি আরেকটা জীবন! এই জঙ্গল, এই পথ, এগুলো তো কতই সে দেখেছে, কিন্তু বিপ্লবের ছবিতে কি অদ্ভুত একটা আকর্ষণ নিয়ে সেগুলো জীবন্ত-বাস্তব হয়ে উঠেছে। যেন বলছে, এসো, পা ফেলো। ঢুকে পড়ো।

তার মুখে কোনও কথা সরল না। সে শুধু তাকিয়েই থাকল।

শনিবার সকালে দোকানে ঢুকতে গিয়ে মোকসেদ আলি চমকে গেলেন। কি চকচকে তার দোকানটা। যেন কেউ রং দিয়ে সাজিয়েছে। তার চোখ ধাঁধিয়ে গেল। অথচ দুই কর্মচারী বলেছিল, দোকানটা শুধু ঝাড়া-মোছা করা হবে। এত রং তাহলে কোথা থেকে এল ?

দোকানে ঢুকতেই তার চোখ গেল দরজার দিকে, যাতে কাল সারাদিন বিপ্লব ছবি এঁকেছে। অনেকক্ষণ ধরে তিনি ছবিটা দেখলেন। তার মাথার ভেতর একটা অদ্ভুত শিহরণ বয়ে গেল। যেন দরজাটাতে কোনও ছবি নয়, তার ফেলে আসা জীবনটাই আঁকা, অথবা যে-জীবনটা তিনি চোখ বুজে মাঝে মাঝে ভাবেন, সেটি। রুমান খুব ভয়ে ছিল, স্যার কি বলেন, কি শাস্তি দেন, তা ভেবে। কিন্তু সে দেখল, স্যার চোখে এক নিবিড় ভাব ঢেলে ছবিটা দেখছেন, এবং তার মুখে একটা রঙিন আলো ফুটেছে।

সারাদিন যত খদ্দের এল গেল দোকানটাতে, অনেকের চোখেও সেই আলো ফুটল। কেউ কেউ অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে দেখল।

মোকসেদ আলি দুপুরে বাসায় গিয়ে আলেয়াকে বললেন, ভয়ের কিছু নেই। তোমাকে আমি হাত ধরে হাঁটাব একদিন। আলেয়া জানতে চাইলেন তার শরীর খারাপ হয়েছে কি না। মোকসেদ আলি হেসে বললেন, না, খারাপের উল্টা হয়েছে। তুমিও খারাপের উল্টা পথে হাঁটবে। আমি কালই তোমাকে দোকানে নিয়ে যাব। তারপর তুমি হাঁটবে।

আলেয়া হাসলেন। তার অসুস্থতা নিয়ে, তার ছেলেমেয়ে নিয়ে তার স্বামী প্রচুর হতাশ। তারপরও মাথাটা কি তার শেষ পর্যন্ত এরকম এলোমেলো হয়ে গেল ?

তার কষ্ট হলো। বললেন, আপনি যেখানে নিয়ে যাবেন, আমি যাব। তিনি খেয়াল করলেন, কথাটা তিনি বেশ হাসিখুশি গলাতেই  বলেছেন।

অবাক!

বিকেলে পাঁচটা বাজতে না বাজতেই চার বন্ধুই হাজির হলেন। আজ হরিপদও এসেছেন, যদিও তার শরীর ভালো নেই। দুপুরে শুয়ে শুয়ে তিনি ভেবেছেন, মরবই যখন, ভুগে ভুগে না মরে একদিন ধুম করে মরব। আজ আড্ডাটাতে যাবই।

চারজন দোকানে ঢুকেই দরজাটা দেখলেন, চারজনের চোখই দরজাতে আটকে গেল। অনেকক্ষণ, যেন পেরেক মেরে কেউ চোখগুলোকে দরজাটায় সেঁটে দিয়েছে। তাদের মুখে অদ্ভুত কিছু ভাব খেলল, যা রুমান কখনও দেখেনি। অনেক আলো একসঙ্গে জ্বললে, কাঁপতে থাকলে, যেমন হয়। ক্রাচে ভর দিয়ে কালাম প্রথমে গেলেন দরজার সামনে। তারপর দরজাটা খুললেন। তার পেছন পেছন সবাই গেলেন এবং দরজা ঠেলে গুদাম ঘরটাতে ঢুকে পড়লেন। রুমান অবাক হয়ে দেখল, দরজাটা খুললে একটা আলো দেখা গেল।  পর্যাপ্ত, কিন্তু শান্ত, চোখ জুড়ানো আলো। যেরকম আলো ভাদ্রের ভরা বিকেলে মাঝে মধ্যে দেখা যায়।

অথচ ছোট গুদামটাতে মাত্র একটা লাইট জ্বলে। অল্প পাওয়ারের। সে বিপ্লবকে জিজ্ঞেস করল, গুদাম ঘরে স্যার কি সোডিয়াম লাইট লাগিয়েছে ?

রুমানের প্রশ্ন শুনে বিপ্লব শুধু চোখ দিয়ে অল্পখানি হাসল।

মোকসেদ আলিও উঠলেন। তিনিও দরজা ঠেলে ঢুকে গেলেন। তাকে দেখে মনে হলো, কিছুটা সময় তিনি গুদামঘরে বন্ধুদের সঙ্গে কাটাবেন, যে গুদামঘরে এই ক’জন মানুষের পাশাপাশি দাঁড়াতে পারার কথা না, হাঁটাচলার প্রশ্নতো ওঠেই না।

রুমান তাকালো বিপ্লবের দিকে, বলল, আমরা কি বসে থাকব না বাড়ি যাব ?

বিপ্লব বলল, একটু দাঁড়াও, আমিও যাব। বাইরে থেকে দোকানের দরজাটা টেনে দিব, ভেতর থেকে স্যার যাতে খুলতে পারেন। বন্ধুদের নিয়ে স্যার কিছুক্ষণ পর গুদামঘর থেকে বেরিয়ে এসে চা খাবেন, তবে আজ কালাম স্যার সবার জন্য চা-কফি বানাবেন। আর হরিপদ কাকু বাবুল মিয়ার রেস্টুরেন্ট থেকে লুচি এনে তার বন্ধুদের খাওয়াবেন। লুচি খাওয়ার তার খুব শখ, কিন্তু এতদিন খেতে পারতেন না। আজ পারবেন। আর এজন্য আমাদের আর না থাকলেও চলবে।

যদি কারেন্ট চলে যায় ? চার্জার লাইটটা কি দরজার পাশে রেখে দিব ? রুমান বলল।

না, কারেন্ট গেলেও চার্জারের দরকার হবে না। ঘরে আলো থাকবে।

ঠিক আছে, রুমান বলল, তারপর একটু দ্বিধা নিয়ে জিজ্ঞেস করল, কাল কি আমি একটু গুদাম ঘরে যেতে পারব?

কাল কেন, যখন ইচ্ছা যাবে, কিন্তু তোমার যাবার দরকার নেই। দরকারটা যার, সে যাবে।

সচিত্রকরণ : শতাব্দী জাহিদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may have missed

shares