গল্প : চরণ দুটি থেমে গেছে : হরিশংকর জলদাস

এই গল্পটা কমলকে নিয়ে। গল্পটা একটু পুরোনো। এই যে কমল, যাকে আপনারা গল্পটির প্রধান কুশীলব বলুন বা কেন্দ্রচরিত্র, সেও পুরোনো দিনের মানুষ। কমলের বয়স এখন সত্তর পেরোনো। আমার ঊনসত্তর।

হঠাৎ নিজেকে এ গল্পে টেনে আনলাম কেন জিজ্ঞেস করছেন ?

বলছি। আমি কমলের ক্লাসমেট ছিলাম। সিক্স থেকে টেন। আমার নাম-ধাম-পরিচয়Ñএগুলোরও তো সুলুকসন্ধান দেওয়া দরকার আপনাদের!

ধেত্তেরি! কী আবোল-তাবোল বকতে শুরু করলেন ? গল্পের প্রথমেই বললেন, গল্পটা কমলকে নিয়ে! তার কথা না-বলে নিজের রামায়ণ-কেত্তন শুরু করলেন! আসল বেত্তান্তটাই বলুন মশাই!

আপনাদের ওই এক ধাত, কাহিনিটাই বলে যেতে হবে, আশপাশটার কথা কিচ্ছুটি বলা যাবে না।

তাই তো মশাই, আপনারা গল্প লিখিয়েরা গল্পের শুরু থেকেই বড় ধানাইপানাই শুরু করেন! কেউ ভাষা নিয়ে কুস্তি লড়তে শুরু করেন, আবার কেউ কাহিনিটাকে এমন একটা ঘোরপ্যাঁচের মধ্যে ফেলে দেন যে পাঠক খাবি খেতে শুরু করে। তাতে শেষ পর্যন্ত হয় কী জানেন ?

জানি না তো! কী হয় ?

ভাষায় কুটিলতা আর বৃত্তান্তের ঘেরাটোপে বিরক্ত হয়ে গল্পটাই আর পড়ে না পাঠক।

না না, আপনি ওভাবে চটবেন না। প্রথমে বলে নেওয়া ভালোÑআমি কোনও গল্পকার নই। কথক মাত্র। আর আমার এ গল্পে কুস্তি নেই, কাহিনিকুহকও নেই। একটা বৃত্তান্ত আছে শুধু। এবং সোজাসাপটা ওটাই বলে যাব আপনাদের। ও হ্যাঁ, একটুখানি আমার কথা বলায়, আপনি চটেছিলেন। এখন থেকে সে ব্যাপারে খেয়াল রাখব আমি। তবে কমলের কাহিনির ফাঁকেফুঁকে আমার কথাও একটু-আধটু আসবে। নিজগুণে গোস্তাকি মাফ করবেন তখন।

কমলদের বাড়ি আর আমাদের বাড়ি একই মফস্সলের একই পাড়ায়। কমলদের পশ্চিম মাথায়, আমাদেরটা পূর্ব মাথায়। মফস্সলটির নাম কেশবপুর। একসময় গাঁ-ই ছিল এই কেশবপুর। পাশে হাড়িধোয়া নদী, খোলা মাঠ, মাঠে ফসল, মাথাল মাথায় কৃষকের কোমর ভেঙে মাটি কোপানো, মাঝে মাঝে বেসুরো গলায় ‘বন্ধু রে’ বলে রাখালি গানÑসব কিছুই ছিল কেশবপুরে। তারপর হঠাৎ একদিন শহুরে গরম হাওয়া লাগল কেশবপুরের গাঁয়ে। পাকা রাস্তা হলো গ্রাম চিরে। সেই রাস্তা দিয়ে শহর তার চাকচিক্য আর আবিলতা নিয়ে কেশবপুরে ঢুকে পড়ল। এখন কেশবপুর না-গ্রাম, না-শহর।

একই বছরে আমি আর কমল একই ক্লাসে ভর্তি হই, আশালতা হাই স্কুলে। প্রাইমারিটা কোন স্কুলে পড়েছিল কমল জানি না। তবে যে স্কুলেই পড়ুক, পড়ালেখায় বেশ দড় হয়েই সে হাই স্কুলে এসেছে, অল্পদিনের মধ্যে তা বোঝা গেল। নানাজন নানা প্রাইমারি স্কুল থেকে এসে ভর্তি হয়েছিল। ফলে কেউ কাউকে তেমন করে চেনে না। অনেক ছাত্র। চিনপরিচয় হতে হতে বেশ কিছুদিন লেগে গেল।

সামনের বেঞ্চে বসতে নবাগতদের মধ্যে কাড়াকাড়ি-পাড়াপাড়ি হতো। কমল কিন্তু ওসবে থাকত না। আগে এলেও পেছনবেঞ্চিতে গিয়ে বসত। বসে বড় বড় চোখ করে ক্লাসের এপ্রান্ত থেকে ওপ্রান্ত পর্যন্ত দেখে যেত। কী যে দেখত, সে-ই জানে। আমি ক্লাসে ঢুকতাম হাঁপাতে হাঁপাতে। ঘণ্টি বাজবার দু-চার মিনিট আগে। বাবা দোকানে আসতে প্রতিদিন দেরি করে ফেলত। বাবা এলেই বইয়ের ব্যাগটা নিয়ে দে ছুট। কিছু মনে করবেন না, নিজের কথা যে একটু বলতে হয় এখানে!

আমি দিনমণি শর্মা, বাবা চন্দ্রমণি। ভাইবোনের সংখ্যা কম নয় আমার। টানাটানির সংসার। বাড়িতে বাড়িতে পুজো-আচ্চা করে বাবার ক’টাকাই-বা ইনকাম! খাবি খাচ্ছিল বাবা। কে যেন পরামর্শ দিলÑদোকান দাও একটা, মুদির দোকান। গঞ্জের দিকে দোকানঘর ভাড়া পেলে ভালো, নইলে এখানেই দাও। তোমার বাড়ির উত্তর সীমানায় তো একটুকরো জায়গা খালি দেখছি। উপদেশটা কাজে লাগিয়েছিল বাবা। এধার-ওধার করে কিছু মূলধন জোগাড় করে বাড়ির পাশেই দোকানটি দিয়েছিল বাবা। নাম দিয়েছিলÑশর্মা স্টোর। একটা সময়ে দাঁড়িয়ে গেল দোকানটা। কর্মচারীও রাখল একজন, নরহরি। বাবা সকালে উঠে স্নান-টান সেরে মন্দিরে ঢোকে। তারপর লম্বা তন্ত্রমন্ত্র। ওদিকে যে সকাল সকাল দোকান খুলতে হয়! নরহরি এসে যে দাঁড়িয়ে থাকে! বাবা দোকানের দিকে আমাকে ঠেলে দিল। সকালে আমাকে দোকানে এসে বসতে হয়। সকালেই কাস্টমারের ভিড়। নরহরি মালপত্র দেয়, আমি টাকা গুনে নিই। বাবা আগে তাড়াতাড়ি এলেও ইদানীং দেরি করে আসে দোকানে। আমার তো আবার প্রাণ যায় যায় অবস্থা তখন। সিরাজ স্যার কড়া ধাঁচের। তিনি ক্লাসে ঢোকার পর কেউ ‘মে আই কাম ইন স্যার’ বললে মাথা গরম হয়ে যায় তাঁর। ওই ছাত্রের হাতে-পিঠে বেত ফালা ফালা করে তবেই তিনি শান্ত হন।

যাক, সকালে ওই দৌড়ের মধ্যে ক্লাসে ঢুকি আমি। কমলের পাশে গিয়ে বসি। তখন কমলের চোখ দুটি দেখে বেড়াচ্ছে।

জিজ্ঞেস করি, ‘ওরকম চোখ গোল গোল করে কী দেখ কমল ?’

কমল সংক্ষিপ্ত উত্তর দেয়, ‘কিছু না।’

‘কিছু তো দেখ! বল কী দেখ অমন করে ?’

‘ওদের দেখি। সামনের সিট নিয়ে কী রকম কাড়াকাড়ি করে ওরা! আচ্ছা, সামনের সিটে না বসলে পড়ালেখা হয় না ?’ বলে মুচকি একটু হাসে কমল।

আমি বলি, ‘সেটা তো ভেবে দেখিনি কখনও! সামনের দিকে বসলে বোধহয় ফার্স্ট হওয়া যায়।’

মোহন হাসিটা কমলের চোখেমুখে ছড়িয়ে পড়ে। বার্ষিক পরীক্ষায় কমল ফার্স্ট হয়। সকল শিক্ষকের নজর গিয়ে পড়ে কমলের ওপর। কমল নির্বিকার। পরের ক্লাসে শিক্ষকেরা তাকে সামনের বেঞ্চে বসতে বললেন। কমল পেছনবেঞ্চিতেই বসতে থাকল। টেনেটুনে পাস করা আমাকে তার পাশছাড়া করল না কমল।

ক্লাস এইটে যখন, এক ধর্মশিক্ষক জয়েন করলেন আমাদের স্কুলে। প্রথমদিনেই উপস্থিতখাতা থেকে মুখ তুলে বড় গলায় বললেন, ‘তোর নাম কমল আলি ? এ কেমন নাম! হিন্দু না মুছলমান রে তুই ?’

কমল সিট থেকে উঠে দাঁড়িয়েছিল ঠিক, কিন্তু স্যারের প্রশ্নের কোনও উত্তর দিল না। কোনও শিক্ষক তার সঙ্গে তুইতোকারি করেন না। এই জয়েনুদ্দিন স্যার করলেন। এতে হয়ত কমলের অভিমান হয়েছিল। স্যারের প্রশ্নের উত্তরটা তার জানা ছিল। কিন্তু অভিমানের কারণে উত্তরটা দিল না কমল। চুপ করে থাকল। স্যারও নাছোড়। উত্তর শুনবার জন্যে ক্লাসটাকে মাথায় করলেন। কিন্তু কমল যেই কে সেই। বোবা যেন সে! কিছুক্ষণ চেঁচামেচি করে ক্লাস ছেড়ে গেলেন জয়েনুদ্দিন স্যার। যাওয়ার আগে কমলের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘স্টুপিড কোথাকার।’ পরে পরে দেখেছি ধর্মশিক্ষকদের ইংরেজির দিকে নোলা বেশি।

‘তোর নামের জন্য স্যার তোকে গালি দিয়ে গেলেন! কিছু বললি না যে ?’ স্যার ক্লাস থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর জিজ্ঞেস করেছিলাম কমলকে। তখন আমরা ‘তুমি’ থেকে ‘তুই’-তে নেমে এসেছি।

টিফিনের ঘণ্টা বেজেছিল তখন। কমল আমার হাত ধরে পুকুরপাড়ে নিয়ে গেয়েছিল। তারপর তার উজ্জ্বল চোখ দুটি আমার মুখের ওপর রেখে বলেছিল, ‘প্রথম প্রথম বাবার উপর আমারও রাগ হতো খুব। এরকম নাম রাখল কেন আমার ?’

আমি বললাম, ‘তাই তো! কামাল আলি না রেখে কমল আলি নাম রাখলেন কেন ? তাজ্জবের ব্যাপারই তো!’

‘আমার ভাই-বোনের নাম কি জানিস ?’

‘না তো! কী নাম তাদের ?’

‘তপন আলি, আকাশ আলি, সন্ধ্যা খাতুন।’

‘কী বলছিস তুই!’

‘বাবা বলে, আমরা বাঙালি। বাংলা ভাষায় কথা বলি। বাংলা আমাদের মাতৃভাষা। স্বপ্নও দেখি বাংলাতে। বাংলা গানে বুকটা তৃপ্তিতে ভরে ওঠে। তো বাংলা নাম রাখলে অসুবিধা কোথায়! তাই তোদের অর্ধেক নাম বাংলায় রাখলাম। কমল, তপন, আকাশ, সন্ধ্যা। ভেবে দেখ, এসব নাম আমাদের জীবনের সঙ্গে একেবারে জড়িয়ে আছে। এইটুকু বলে বাবা হঠাৎ চুপ করে গিয়েছিল। বাবার কথা যে কতটুকু গভীর থেকে বলা, তখন না বুঝলেও এখন বুঝি দিনমণি। এই কথাগুলোর মর্মার্থ তো আর স্যার বুঝবেন না! তাই জয়েনুদ্দিন স্যারের প্রশ্নের উত্তর না-দিয়ে চুপ করে ছিলাম।’

সেই দুপুরে আর কথা বাড়াইনি। অবাক চোখে কমলের দিকে তাকিয়ে ছিলাম। আর ভাবছিলাম তার বাবার কথা।

কমলের বাবা মোত্তালেব মিঞা প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষক ছিলেন। শেষজীবনে হেডমাস্টার হয়েছিলেন। চাষির ঘরে জন্ম মোত্তালেব মিঞার। দুই বিয়ে ছিল মোত্তালেব মিঞার বাপের। বাপ মারা যাওয়ার পর সৎভাইয়েরা জন্মভিটে থেকে খেদিয়ে দিয়েছিল। তখন মোত্তালেব মিঞার ঘরে দুই ছেলে এক মেয়ে। ভাগ্যিস পড়াশোনাটা করেছিলেন। বিয়ের আগে সরকারি প্রইমারি স্কুলের চাকরিটা পেয়ে গিয়েছিলেন। মাসমাহিনা দিয়ে কমলের মা সংসারটা কীরকম কীরকম করে যেন চালিয়ে নিতেন। বিলাস-ব্যসনের তেমন কিছু সন্তানদের দিতে পারেননি মোত্তালেব মিঞা। তবে সন্তানদের জীবন সম্পর্কে স্বচ্ছ একটা ধারণা দেওয়ার চেষ্টা করে গেছেন তিনি। সব সন্তান যে তার ভাবনামতো মানুষ হয়েছে এমন নয়। মাঝপথ থেকে ছিটকে বেরিয়ে গেছে দুই ভাইÑতপন আলি, আর আকাশ আলি। কমলের চেয়ে বয়সে বড় তারা। একজন ড্রাইভিং শিখেছে, অন্যজন গ্যারেজে নাম লিখেয়েছে। সন্ধ্যা খাতুনকে বিয়ে দেওয়ার ব্যাপারে নিজের আদর্শকে প্রতিষ্ঠা দিতে পারেননি মোত্তালেব মিঞা। বউয়ের চাপে সামাজিক প্রথা মেনে চৌদ্দ-পনেরোতে সন্ধ্যাকে শ্বশুরবাড়ি পাঠাতে বাধ্য হয়েছিলেন।

সবেধন নীলমণি কমলের দিকে তাকিয়ে থাকতেন মোত্তালেব মিঞা। লেখাপড়া শিখে বাপের বুকের ভার কমাবে কমলÑএই ছিল বাপের বাসনা। বাবার মনের দুঃখের কথা কমল জানত কি না কে জানে, তবে পড়ালেখায় ভীষণ মনোযোগী ছিল সে। কম কথা বলত কমল। না-বললে নয় যেটা, সেটাই বলত শুধু। শিক্ষকরা স্বল্পবাক এই মেধাবী ছাত্রটিকে খুব ভালোবাসতেন।

আমরা নাইন ডিঙিয়ে টেনে উঠলাম।

দেশে ঊনসত্তরের গরম হাওয়া বইল। এই কেশবপুরের মতো মফস্সলেও ৬ দফা ১১ দফা, গণ-আন্দোলন, অসহযোগ আন্দোলন, নির্বাচনÑএসব শব্দ এসে পৌঁছাতে লাগল। তারপর শেখ মুজিব, মওলানা ভাসানী, তোমার আমার ঠিকানা পদ্মা মেঘনা যমুনাÑএরকম নাম-স্লোগান কেশবপুরের রাস্তায় এসে ঝাঁপিয়ে পড়ল।

এক দুপুরে অদ্ভুত এক কাণ্ড হয়ে গেল আমাদের ক্লাসে। আমাদের ক্লাসে না-বলে, আমাদের স্কুলে বললে ভালো হয়। কারণ কাণ্ডটাকে কেন্দ্র করে গোটা স্কুলটায় তোলপাড় হয়ে যায়।

সেদিন দুপুরে ক্লাস চলছিল যথারীতি। মোস্তাফিজ স্যার আমাদের ভূগোল ক্লাস নিচ্ছিলেন। যথা-অভ্যাসে কমল পেছনবেঞ্চিতে বসেছে। আমি তার পাশের সিটে। ওÑ, বলতে ভুলে গেছি, কেশবপুরের মূল রাস্তার একেবারে গা ঘেঁষেই আমাদের হাই স্কুলটি।

হঠাৎ বহুকণ্ঠের একটা স্লোগান আমাদের ক্লাসে ধাক্কা দিলÑদিকে দিকে এ কী শুনি, শেখ মুজিবের জয়ধ্বনি।

ধুম করে উঠে দাঁড়ালো কমল। তার চোখেমুখে অপূর্ব এক শিহরণ! কী রকম আনচান ভাব! সিট ছেড়ে উঠে দাঁড়ায় কমল। তার অস্থিরতা মোস্তাফিজ স্যার খেয়াল করেননি। পেছন ফিরে ব্লাকবোর্ডে চক দিয়ে এঁকে এঁকে তিনি মহাসাগরীয় স্রোতের গতিপথ বুঝিয়ে যাচ্ছিলেন।

কমলের অস্থির কণ্ঠের ডাকে তিনি পেছন ফিরেছিলেন। স্যারকে কোনও কিছু জিজ্ঞেস করার অবকাশ না দিয়ে কমল বলে উঠেছিল, ‘স্যার আমি যাব।’

অবাক চোখে স্যার জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘কোথায়! কোথায় যাবে তুমি ?’

অকুণ্ঠিত গলায় কমল বলেছিল, ‘মিছিলে।’

‘মিছিলে! মিছিলে গিয়ে কি করবে তুমি!’

কী রকম নেশাগ্রস্ত গলায় কমল বলে উঠেছিল, ‘স্লোগান দেব স্যার। পদ্মা মেঘনা, যমুনা …। ’ বলতে বলতে অবাধ্য ছাত্রের মতো সেদিন ক্লাস থেকে বেরিয়ে পড়েছিল কমল।

অল্পক্ষণের মধ্যে দেখা গিয়েছিলÑকমল মিছিলে মিশে গিয়ে আওয়াজ তুলছেÑআমাদের মুক্তির পথ কী, ৬ দফা ছাড়া আর কী।

আমাদের ভূগোল ক্লাসটা মোস্তাফিজ স্যার সেদিন আর করতে পারেননি। করতে পারেননি মানে করেননি। করবেন কী, তার চোখ তখন কোটর ছেড়ে বেরিয়ে আসার উপক্রম! এরকম শান্তশিষ্ট মেধাবী ছাত্র কমল, সে কিনা ক্লাস ছেড়ে মিছিলে গেল! তাও অনুমতি ছাড়া! অনুমতির তো তোয়াক্কাই করল না সে! মিছিলে যাব বলে বেরিয়ে গেল!

ব্যাপারটা ক্লাস টেনের শ্রেণিকক্ষে সীমাবদ্ধ থাকল না। অচিরেই হেডমাস্টারের কানে গিয়ে পৌঁছাল। হেডমাস্টার অবাক বিস্ময়ে মোস্তাফিজ স্যারের কথাগুলো শুনে গেলেন। তৎক্ষণাৎ কোনও প্রতিক্রিয়া দেখালেন না। বিচক্ষণ তিনি। মোস্তাফিজ স্যার দেশের পরিস্থিতির খোঁজ না-রাখলেও হেডস্যার রাখেন। দেশ যে এখন উত্তাল তরঙ্গময়!

পরদিন কমল স্কুলে এসেছিল। বসেছিলও তার সিটে। কিন্তু আমি সেদিনের কমলের মধ্যে পূর্বের কমলকে খুঁজে পেলাম না। কী রকম যেন অস্থির অস্থির! তার মনটি যেন ক্লাসে নেই! তার কান যেন উৎকর্ণ হয়ে আছে কিছু একটা শুনবার জন্য!

আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম, ‘কাল তুই অমন করে চলে গেলি কেন ? মোস্তাফিজ স্যার কিন্তু তোর ওপর ভীষণ রাগ করেছেন।’

আমার কথা শুনেও নিশ্চুপ থাকল কমল। আমি কিন্তু চুপ থাকলাম না। আমার এমন প্রিয় বন্ধু কমল, ভালো ছেলে হিসেবে যার যথেষ্ট সুনাম আছে, সে কি না স্যারকে উপেক্ষা করে মিছিলে গিয়ে শামিল হলো!

আমি আবার বললাম, ‘কী, কিছু বলছিস না যে ?’

কলম বলল, ‘কী বলব ?’

‘ওই যে কালকের ব্যাপারটা ? অনুমতি  না নিয়ে…।’

আমার কথা শেষ করতে দিল না কমল। বলল, ‘আমার ভেতরে কী হয়েছিল বলতে পারব না। স্লোগান শুনে কী রকম উথাল-পাথাল লেগেছিল আমার। কৃষ্ণের বাঁশি শুনে রাধার যেমন লেগেছিল বা সাপুড়ের সানাই শুনে সাপের যা হয়।’ পড়ার বই ছাড়াও কমলের তখন অনেক গল্প-উপন্যাস পড়া হয়ে গেছে।

কমলের কথাগুলো সেদিন আমি ভালো করে বুঝতে পারিনি। আমি তো সাধারণ একজন ছেলে। মুদির দোকানদারির ফাঁকে ফাঁকে পড়াশোনা করি। ঠেলেমেলে ক্লাসের বেড়া ডিঙাই। কমলের কথা বোঝার মতো মাথা আমার নেই। তাই চুপ করে থাকি। তবে মোস্তাফিজ স্যারসহ আরও দু-চারজন টিচার তার ওপর শোধ নিয়ে ছিলেন। ওই দিনের পর থেকে  কমলের সঙ্গে কথা বলা বন্ধ করে দিয়েছিলেন তাঁরা।

এসএসসি পাস করে কমল কলেজে ভর্তি হয়েছিল। আর আমি শর্মা স্টোরে চাল-ডাল-লবণ-তেলের হিসাব লিখছি খাতায়। আমরা দুজনে প্রায় বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলাম।

দেশে আগুন লাগলÑ২৫ মার্চের আগুন। তার আগে ৭ মার্চের কথার হুতাশনে বাঙালির বুক ফেটে চিড়চিড়। বাঙালি বুঝল দেশমাতৃকার মর্মযাতনা। এই মর্মযাতনা ভোলাবার মন্ত্রে উজ্জীবিত হলো পূর্ববঙ্গের সন্তানরা। ১৯৭১-এর মুক্তির যুদ্ধে সেই মন্ত্র আকাশে-বাতাসে-নদীতে-অরণ্যে-জনপদে-জলাশয়ে ছড়িয়ে দিতে ঝাঁপিয়ে পড়ল স্বাধীনতাকামী বাঙালিরা। পাকিস্তানকামীরাও হাতগুটিয়ে বসে থাকল না। তারাও ঘূর্ণি তুলল বাতাসে, আগুন দিল গাঁয়ে-গঞ্জে-শহরে। হত্যায় মাতল পাকুরা। সরি, কাব্য করে ফেললাম। কিছু মনে করবেন না। আসলে একাত্তরের কথা মনে পড়লে ভেতরে ঝড় ওঠে। সেই ঝড়ের তাণ্ডবে চারদিকটা লণ্ডভণ্ড করে দিতে ইচ্ছে করে। কিচ্ছু ভালো লাগে না তখন। এই যে মানুষগুলো, যারা আমার চারদিকে গায়ে হাওয়া লাগিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে, যাদের শরীরে স্বাধীনতার সুফলের সঘন উপস্থিতি, অথচ এরাই যুদ্ধের সময় আগোগোড়া স্বাধীনতার বিরোধিতা করে গেছে, স্বাধীনতাকামী আর সংখ্যালঘুদের বাড়ি-মহল্লা চিনিয়ে দিয়েছে পাকুদের, তাদের দেখলে বমি আসে আমার, হাত নিশপিশ করে জিঘাংসায়। কিন্তু বাস্তবে কিছু করতে পারি না আমি। ছদ্মবেশধারী এই দেশপ্রেমিকরাই যে আমাদের কর্তা সেজে বসে আছে। আবার ক্ষমা চাইছি আমি, আপনাদের কাছে, বড় বড় কথা বলবার জন্য। বড় বড় কথাই তো! একজন মুদির দোকানির মুখে এসব কথা সাজে কি ? এসব তো রাজনীতিকদেরই সাজে। যারা গিরগিটির মতো ক্ষণে ক্ষণে রং বদলায়।

কমলের কথায় ফিরে আসি। তার আগে আমার, মানে আমাদের কথা বলি একটু। একদিন হিন্দুপাড়ায় আগুন দিল ছাবের আহম্মদ। মুসলিম লীগ করত। ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ছিল। যুদ্ধের সময় শান্তিকমিটির চেয়ারম্যান বনে গেল। তো তারই প্ররোচনায় পাঞ্জাবিরা আমাদের পাড়ায় আগুন দিল এক বিকেলে। আগুন জ্বলল দাউ দাউ।

পালালাম আমরা। নদীর ওপাড়ে জলধিগ্রাম। পাহাড়ময়। দুর্গম। সেখানেই পাড়াসুদ্ধ মানুষ আশ্রয় নিলাম। কেশবপুরের ছুটকাছাটকা খবর মাঝেমধ্যে আমাদের কাছে পৌঁছায়।

একদিন শুনলাম, কমল মুক্তিযুদ্ধে নাম লিখেয়েছে। ততদিনে তার মা-বাবা মারা গেছেন। ভাইয়েরা বড় হয়ে গেছে।  সংসারটাও গুছিয়ে নিয়েছে যার যার মতো করে।

যুদ্ধের মাঝখানে কমলকে নাকি একবার কেশবপুরে দেখা গিয়েছিল। সারা মুখে দাড়িগোঁফ, ঝাঁকড়া চুল, একটু পাগলা পাগলা ধরন। সন্ধ্যার দিকে ছাবের আহম্মদের বাড়ির সামনে দিয়ে হেঁটে যেতে দেখেছিল কেউ কেউ। কে কে দেখেছিল, তা অবশ্য জানা যায়নি। তবে এটা জানা গেছে যে, পরদিন গলির মুখে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় পাওয়া গেছিল ছাবের আহম্মদকে।

যুদ্ধ শেষ হলে ফিরে এসেছিল কমল। দেখেছিলÑবাড়িটার অনেকটাই দখল হয়ে গেছে। তপন আর আকাশ মিলে বাস্তুভিটের সিংহভাগ নিজেদের এক্তিয়ারে নিয়ে নিয়েছে। না, কমলকে একেবারে ঠকায়নি তারা। দু’কামরার একটা ঘর তোলার মতো খালি জায়গা কমলের জন্য রেখে দিয়েছে তারা। মুক্তিযুদ্ধ থেকে তো সবাই ফিরে আসেনি, আসেও না। কমলও ফিরবে তার তো কোনও নিশ্চয়তা ছিল না! ফিরলে ভালো, না ফিরলে রেখে দেওয়া ওই একচিমটে জায়গাটুকু নিজেরা ভাগবাটোয়ারা করে নেবে, এই সিদ্ধান্ত নিয়ে রেখেছিল তপন আলি আর আকাশ আলি।

এ নিয়ে ভাইদের সঙ্গে কোনও উচ্চবাচ্য করেনি কমল। ওই জায়গাটিতে ঝুপড়িমতন একটা ঘর তুলেছিল। বেড়ার দেয়াল, ছনের ছাউনি। বড় ভাইয়েরা তেমন কোনও খোঁজখবরও রাখে না তার। যেন কমল সৎভাই, যেন সে ভাইদের বাড়া ভাতে ছাই দিয়েছে! সন্ধ্যা মাঝে মাঝে আসে। কমলদার পাশে বসে দু’ফোঁটা চোখের জল ফেলে। যে কদিন থাকে, দাদাকে ভালোমন্দ রেঁধে খাওয়ায়।

দাদাদের সংসার চলে রমরমিয়ে। কমলের ভিক্ষা করার অবস্থা। ওই সময় কমল মাঝেমধ্যে আমার কাছে আসত। এই যে আমার পাশে হাতলভাঙা চেয়ারটা দেখছেন, ওটাতেই বসাতাম তাকে। চেয়ারে বসে উদাস চোখে বাইরের দিকে তাকিয়ে থাকত সে। আমি কাস্টমার বিদায় করার ফাঁকে ফাঁকে আড়চোখে তার দিকে তাকাতাম। দেখতামÑউদাস চোখ দুটো ফেটে এখনই বুঝি জল গড়াবে কমলের।

অবসরে তার কাছে যুদ্ধের কথা শুনতে চাইতাম। সে হুঁ হ্যাঁ করে জবাব দিত। কোনওদিন খুলেমেলে কোনও কাহিনি বলত না সে। একদিন ছাবের আহম্মদের খুনের কথা জিজ্ঞেস করেছিলাম। চোখ দুটো তার দপ করে জ্বলে উঠেছিল হঠাৎ। ওইটুকু পর্যন্ত। দ্রুত নিস্পৃহতায় চোখ দুটো ঢাকা পড়েছিল কমলের। মুখে কিছু বলতে রাজি হয়নি সে, সেদিনও।

মাঝে মাঝে চাল-ডাল-লবণ-আলুর পোঁটলাটা আমি কমলের হাতে গুঁজে দিতাম। নিতে চাইত না সে। লজ্জায় মাথাটা মাটির সঙ্গে মিশে যেতে চাইত তখন তার। আমি কমলকে বুকের  একেবারে নিকটে টেনে নিতাম। চাপা গলায় বলতাম, ‘কমল রে, তুই যে আমার প্রাণের বন্ধু রে কমল! তুই যে মুক্তিযোদ্ধা রে কমল! তোর বিপদে আমি তোর পাশে না দাঁড়ালে যে আমার পাপ হবে রে কমল!’

১৯৭৫-এর ১৫ আগস্ট। বাংলাদেশে অমাবস্যা শুরু হলো। ঘনঘোর অন্ধকারে চারদিক ছেয়ে গেল। অনেকে রং পালটে ফেলল। প্রকৃত দেশপ্রেমিকেরা দিশা হারালো তখন। কী করবে ? কোথায় যাবে তারা ? আবার আবেগময় হয়ে উঠলাম আমি। ক্ষমা করে দেন আমায়। কী করব বলুন আমায়! ওই সময়ের কথা যখন মনে পড়ে, নিজেকে ধরে রাখতে পারি না। নিজের চুল নিজে ছিঁড়তে ইচ্ছে করে তখন।

ওই অমাবস্যাকালে এক দুপুরে কমল এসে উপস্থিত আমার দোকানে। দোকানটা আমার বললাম এজন্য যে বাবা তখন মারা গেছেন। অন্য ভাইয়েরা বেশ প্রতিষ্ঠা পেয়ে গেছে। এই দোকানের মালিকানা আমায় ছেড়ে দিতে ভাইয়েরা কার্পণ্য করেনি।

কমল বলল, ‘বিদেশ যাব।’

‘বিদেশ যাবি ? কোন দেশে ?’

‘ইরাকে।’

‘ইরাকে গিয়ে কী করবি ? কী চাকরি ?’

‘বলেছে তো ভালো চাকরি। বড় মার্কেটের দোকানে নাকি। সেলসম্যান।’

‘দোকানদারি করবি ?’

‘তুই যদি করতে পারিস, আমি কোন রাজা-সুলতান!’

আমি কথা পালটাই, ‘এসেছিস কেন ?’

‘টাকার দরকার।’

‘কত ?’

পশ্নের উত্তর না-দিয়ে কমল বলে, ‘প্লেনভাড়া ওরা দেবে। পরে বেতন থেকে কেটে নেবে। পাসপোর্ট করার টাকা নেই আমার কাছে।’

‘পাসপোর্ট করতে কত লাগবে ?’ বলি আমি।

‘দালালি খরচসহ হাজার তিনেক।’

টাকাটা বের করে দিই। খুশি মনে ফিরে যায় কমল।

যাওয়ার দিন এসেছিল কমল। বুকে জড়িয়ে ধরে বলেছিলাম, ‘শরীরের দিকে নজর রাখিস। ভালোয় ভালোয় ফিরে আসিস।’ একজন শুভানুধ্যায়ী যে কণ্ঠে বলে, সে কণ্ঠেই বলেছিলাম কথাগুলো।

দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে কমল বলেছিল, ‘এই দেশে থাকতে চেয়েছিলাম রে দিনমণি!’ জলে ভরে উঠেছিল চোখ দুটো তার।

বছরখানেক ধরে কমলের কোনও হদিস নেই। তার বড় ভাই আকাশের সঙ্গে দেখা করেছিলাম। ভেংচি কেটে বলেছিল, ‘আমি কী জানি কমলের খবর। কোথায় গেছে, কোথায় আছে, কিচ্ছু জানি না। তুমি তো প্রাণের বন্ধু। তোমারই তো জানার কথা!’

মন বেজার করে ফিরে এসেছিলাম।

একদিন কমলের চিঠি এল। সংক্ষিপ্ত চিঠি। লেখা :

প্রিয় কমল,

চাকরিটা খারাপ ছিল না। দোকানমালিক ভালোবাসত আমায়। হঠাৎ করে ইরাক-ইরান যুদ্ধটা লেগে গেল। যে শহরে কাজ করি বোমা পড়ল সেখানে। প্রাণের ভয়ে সবাই পালালো। আমিও পালালাম। শহর থেকে গ্রামের দিকে চলে এলাম। বেশ কিছুদিন কষ্টে কেটেছে। এখন একটা চাকরি পেয়েছি। রাখালের চাকরি। মরূদ্যানে ভেড়া চরানোর চাকরি। দেশে ফিরতে পারতাম। ফিরে কী করব ?

 তোর কমল।

ফিরে কমল এসেছিল। তবে তা বহু বছর পরে। খুব বেশি টাকাপয়সা কামাতে পারেনি সে। যুদ্ধবিধ্বস্ত ইরাকে মানুষের জীবন তখন বড় সঙ্কটাপন্ন। আমার টাকাটার কথা বলছেন ? ফেরার সঙ্গে সঙ্গেই ধার নেওয়া টাকাটা সে কড়ায়-গণ্ডায় শোধ করে দিয়েছিল।

ঘরটাও ভদ্রগোছের করে মেরামত করেছিল কমল। দুবেলা দুমুঠো খাওয়ার মতো টাকা সে নিয়ে এসেছিল ইরাক থেকে। 

বিয়ের কথা বলছেন ?

বিয়ে করবার জন্য অনেক সাধাসাধি করেছি। কমলের এককথাÑ‘আমার জীবনের কোনও ঠিকঠিকানা নেই। আরেকজনের জীবনকে এলোমেলো করা কেন ? এই-ই ভালো আছি।’

একসময় ক্ষান্ত হতে হলো আমায়। বিয়ের কথা তার সামনে আর তুলতাম না।

আমার কাছে আসে কি না জিজ্ঞেস করছেন ?

আসত তো! গতকাল পর্যন্ত এসেছে। আজ আসেনি।

কেন, কেন আজ আসেনি ?

পথফুরানোর দিন যে শেষ হয়ে গেছে কমলের! কাল রাতেই চরণ দুটি থেমে গেছে তার। আপনি আসার একটু আগেই কবরস্থান থেকে ফিরেছি।

সচিত্রকরণ : শতাব্দী জাহিদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may have missed

shares