গল্প : হুইলচেয়ারের চাকা : মোহিত কামাল

রিকশায় বসে ট্রাফিক সিগন্যালের দিকে তাকিয়ে আছে নিলয়। পালাক্রমে জ্বলে ওঠা লাল ও সবুজ বাতি দেখছে সে। পাশে আছে ছোট বোন দিঘি। চৌ-রাস্তার মোড় পেরিয়ে এপার থেকে ওপারে যেতে পারছে না রিকশা। বসে আছে তো আছেই। সবুজ সিগন্যাল জ্বললেও এদিকের গাড়ি নড়াচড়ার আভাস দেখা যাচ্ছে  না।  রাস্তার সব গাড়ি পেটে পুরে নিয়ে যেন এঁকেবেঁকে সড়কের ওপর নিশ্চিন্তে শুয়ে আছে শান্তশিষ্ট আর তৃপ্ত বিশাল এক অজগর।

সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে ঢোকার আগে মিরপুর-রোডের এ অবস্থা! কড়া রোদ মাথায় নিয়ে শত শত গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে তো আছেই। হাতঘড়ি দেখে নিল নিলয়। এখন বেলা দুটো ত্রিশ। এ সময় সবাই ঘরে ফেরে। ফেরার পথ আরামের হয় না। এ নিরানন্দময় যাতনার যাত্রায় অসহায় মানুষ বসে আছে বিভিন্ন ধরনের যানে। শীততাপ নিয়ন্ত্রিত গাড়ির যাত্রীদের কষ্টও কম নয়। বাসে দাঁড়ানো যাত্রীদের অবস্থা আরও করুণ। রিকশায় বসা নিলয় দূর থেকে দেখছে যাত্রীদের দুর্দশা। একই সঙ্গে দেখছে এ-সি গাড়ির যাত্রীদের উদ্বেগও। সময়মতো ঘরে ফেরার তাড়া সবার ভেতর সমান।

মোহাম্মদপুরে গজনবী রোড পেরিয়ে মিরপুর-রোড পার হওয়ার জন্য বসে আছে ওরা।

দিঘি বলল, ‘ভাইয়া হুডটা ফেলে দাও না।’

‘না, হুড ফেলো না, গরম। আগুনঝরা গরম।’

‘আমার দম বন্ধ হয়ে আসছে। কিছুক্ষণের জন্য হুডটা ফেলে দাও। গরম হোক, অসুবিধা কী ? দেখছ না, ওই যে রাস্তার পাশে হুইলচেয়ারে বসা পঙ্গুলোকটা খোলা আকাশের নিচে বসে আছে। রোদে পুড়ে যাচ্ছে। ঘামছে। আমরাও না হয় ঘামলাম, অসুবিধে কী!’

দিঘির কথা শুনে বাঁয়ে তাকাল নিলয়। সেখানে ‘যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা রোগমুক্তি বিশ্রামাগার’-এর বিশাল বিল্ডিং গড়ে উঠেছে। বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্ট এ বিশ্রামাগার তত্ত্বাবধান করে। স্বাধীনতার পরপর যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য এটি নির্মাণ করা হয়। সারাদেশ থেকে যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধারা চিকিৎসার জন্য ঢাকায় এলে এখানে ওঠেন। জানা আছে নিলয়ের।

ও দেখে চিনতে পারল, হুইল-চেয়ারে বসে আছেন একজন মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার, দুরন্ত সাহসী শামসুদ্দিন। তাঁর বীরত্বের কথা শুনেছে ও। এখন বিশ্রামাগারের মূল ফটক পেরিয়ে সড়কের পাশে অপেক্ষায় আছেন তিনি। দেখে বোঝা যাচ্ছে চেষ্টা করছেন রাস্তা পারাপারের জন্য। পারছেন না। ঘামছেন।

নিলয় বলল, ‘শোনো দিঘি, উনি একজন মুক্তিযোদ্ধা। দেশ স্বাধীন করার জন্য এ মহান যোদ্ধা নিজের দেহের মূল্যবান অঙ্গ উৎসর্গ করেছেন। রক্ত দিয়েছেন, অনেক বড় কাজ করেছেন দেশের জন্য! ওনাকে পঙ্গুলোক বলা কি ঠিক ?’

দিঘি চিৎকার করে উঠল, ‘উনি মুক্তিযোদ্ধা!’

‘হ্যাঁ, মুক্তিযোদ্ধা, যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা। উনি পঙ্গু নন, ওনাকে পঙ্গু বলা অন্যায়। যে মানুষটি বীরত্বের সঙ্গে যুদ্ধ করে দেশের স্বাধীনতায় ভূমিকা রেখেছেন, তিনি তো অচল হতে পারেন না। সচল দেশের সচল নাগরিক তিনি। মহান নাগরিক। জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান।’

‘ভাইয়া, তুমি ঠিকই বলেছ। সরি, উনি পঙ্গু নন, উনি অচল নয়, হুইলচেয়ারে বসে থাকলেও উনি সচল।’

‘হ্যাঁ দিঘি, আমরা ওনাদের নামের আগে “পঙ্গু” শব্দটা ব্যবহার করব না। যারা শব্দটা ব্যবহার করে, ভুল করে। আমরা ভুল করব না। ওনাদের সম্মান করে কথা বলব।’

‘ঠিক আছে ভাইয়া, ঠিক আছে। আমরা গ্রেড সেভেনে উড়াল বালক নামে একটা কিশোর উপন্যাস পড়েছি। সেখানে মুক্তিযুদ্ধে হাত উৎসর্গ করা এক কিশোরের মুক্তিযোদ্ধা-দাদাকে পঙ্গু বলায় খুব কষ্ট পেয়েছে সে। তাঁর সেই কষ্ট পাঠক হিসেবে আমাদের মন ছুঁয়ে গেছে। ম্যাম বলেছেন, “আমরা যেন যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের পঙ্গু না বলি”।’

দিঘির কথা শুনে খুশি হয়ে গেল নিলয়। চোখ চলে গেল সিগন্যাল-বারের দিকে, সবুজ বাতি নিভে হলুদ বাতি জ্বলে উঠেছে। মুহূর্তের ব্যবধানে জ্বলে উঠল লাল সিগন্যালও।

না, গাড়ি চলবে বলে মনে হচ্ছে না। ধৈর্য হারিয়ে যাচ্ছে। লাগাতার লাল-সবুজ সিগন্যাল দেখতে দেখতে অধৈর্য হলেও, বিরক্তি জাগল না নিলয়ের। মনে হলো, নিজেদের পতাকার রঙও লাল-সবুজ। সঙ্গে সঙ্গেই আবার মনে হলো ওই পতাকার জন্যই মুক্তিযোদ্ধারা জীবনবাজি রেখে লড়েছিলেন। বিনিময়ে আমরা পেয়েছি স্বাধীন দেশ, বাংলাদেশ!

দিঘি বলল, ‘ভাইয়া, চলো ওনাকে রাস্তা পার হতে হেলপ করি।’

‘ঠিকই বলেছ।’ বলেই রিকশা থেকে নেমে এল নিলয়, দিঘিও নেমে গেল সঙ্গে সঙ্গে।

‘রিকশা ভাড়া দিলে না যে ?’

দিঘির প্রশ্ন শুনে নিলয় বলল, ‘তুমি বসো। আমি যাচ্ছি।’

‘না,না আমিও যাব।’ দাঁড়িয়ে না-থেকে পেছন পেছন দিঘিও এগোতে লাগল। ওকে বাঁধা দিল না ওর ভাইয়া।

হুইল-চেয়ারের কাছে এসে নিলয় বলল, ‘আপনাকে সাহায্য করতে পারি ?’

মাথা ঘুরিয়ে তাকালেন কমান্ডার শামসুদ্দিন, যুদ্ধের ময়দানে সাহসী যোদ্ধা। নিলয়ের প্রশ্নের জবাব না-দিয়ে প্রশ্ন করলেন, ‘আমাকে অচল মনে  হচ্ছে ? হেলপ লাগবে কেন আমার ?’

দিঘি পাশ থেকে বলে উঠল, ‘না, আপনি মোটেই অচল নন। আপনার চারপাশে যারা আছে তারা সচল হলেও অচল। এ ধরনের অচল মানুষেরা অন্যের অসুবিধে করে। আপনারও অসুবিধে হচ্ছে। ঘামছেন। রোদে পুড়ে যাচ্ছেন। আপনার কিছু করতে পারলে আমরা খুশি হব।’

শামসুদ্দিন মুগ্ধ চোখে তাকালেন দিঘির দিকে। দেখলেন নিলয়কেও। দিঘির কথা শোনার সঙ্গে সঙ্গে মনে পড়ে গেল সহযোদ্ধা জব্বারের কথা। একই বাংকারে পজিশন নিয়েছিল ওরা দুজন। সামনে দুর্র্ধষ পাকিস্তানি হানাদার সৈন্য এগিয়ে আসছে। ওরা দুজন ফ্রন্ট ফিল্ডে প্রতিরোধ করছে। শামসু’র মন উড়ে চলে গেল একাত্তরের রণক্ষেত্রে :

জব্বার বলল, ‘ভয় পাসনে, শামসু। ওদের অচল করে দেব আমরা। একদম ভয় পাবি না।’

শামসু বলল, ‘ভয় পাচ্ছি না। ভয় পাব কেন ? হয় মৃত্যু, নয়তো জয়। দুটোই হাতের মুঠোয়।’

জব্বার বলল, ‘শাবাশ!’

একটু পরে শাঁ শাঁ করে কানের পাশ দিয়ে ছুটে গেল বুলেট।

শামসুর হাতের রাইফেলও গর্জে ওঠে। জব্বারও সমান তালে গুলি ছুড়তে থাকে। গুলির বিনিময়ে চলছে গুলি। বাংকারের ভেতর একজনের দেহ লেগে আছে অন্যের সঙ্গে। একে অন্যের স্পর্শ পাচ্ছে। দেহের স্পর্শে মনে উদ্দীপনা তৈরি হচ্ছে।

জব্বারের দেহ বলছে, ‘চালা, গুলি চালা। ডোন্ট স্টপ।

শামসু’র দেহ বলছে, ডোন্ট স্টপ।’

ওদের মুখে কথা নেই। চোখ স্থির হয়ে আছে শত্রুর সীমানায়।

কত সময় গেছে টের পায়নি শামসু। শত্রুরা প্রতিরোধ পেয়ে পিছু হটে গেছে মনে হলো। হয়তো এ কারণে এগোতে সাহস পায়নি। গোলাগুলি বন্ধ করে মুক্তিযোদ্ধাদের শক্তি কতটুকু বোঝার চেষ্টা করছে হানাদাররা।

শামসু বলল, ‘তুই ঠিকই বলেছিস, অচল হয়ে গেছে হানাদার বাহিনী।’

জব্বার কথা বলছে না। ওর দেহ ঠেস দিয়ে আছে শামসুর দেহের সঙ্গে।

শামসু বলল, ‘কথা বলছিস না কেন ? ওরা তো দমে গেছে, কথা বল।’

জব্বার কথা বলছে না, সাড়া নেই ওর।

শামসুর চোখ এখনও সামনে। বাংকারের চারপাশে গাছের আগডাল পুঁতে রেখেছিল, সামনে থেকে বোঝা যাবে না যে এখানে হানাদারদের যমদূত হয়ে বসে আছে দুই মুক্তিযোদ্ধা। সবুজ ডালের সবুজ পাতার ফাঁক দিয়ে ও দেখছে সবুজ বাংলাদেশের স্বপ্ন। দেখছে সোনার বাংলার স্বপ্ন। ডালের হলুদ পাতাগুলো ঝরে গেছে, শুকনো পাতাগুলো খসে পড়ে আছে চারপাশে। কেবল কচি সবুজপাতা এখনও সতেজ আছে। কতদিন বাংকারে থাকতে হবে, কতদিন সবুজ পাতা সতেজ থাকবে! সবুজ পাতা মলিন হলে শত্রুরা বাংকারের অবস্থান টের পেয়ে যাবে। তার আগেই ওদের খতম করে দিতে হবে। এসব কথা ভাবতে ভাবতে শামসু উৎসাহী হয়ে ওঠে। দেহ না সরিয়ে, নিজের মাথাটা উপরের দিকে তোলে ও। অনেক দূর দেখা যাচ্ছে। মনে হচ্ছে শত্রুরা অ্যাটাক তুলে পালিয়েছে। আরও উৎসাহী হয়ে ওঠে শামসু। গলার ভেতর থেকে আনন্দধ্বনি বেরিয়ে আসে, ‘জব্বার! গ্রেট সাকসেস!’

কথা শেষ করে বাঁ হাত দিয়ে জব্বারের দেহে ধাক্কা দেয় শামসু। আকস্মিক ভয়ে জমে যায় ও। বাঁ দিকে তাকানোর সঙ্গে সঙ্গে শামসু’র পুরো পৃথিবী নড়ে ওঠে। একদম ভোঁতা হয়ে যায়। অবাক চোখে তাকিয়ে দেখে, জব্বারের মাথার খুলি নেই, মগজ উড়ে গেছে! কেবল দেহটা ওর দেহের সঙ্গে লেগে আছে।

আগরতলার সোনার বাংলা ট্রেনিং ক্যাম্পে প্রশিক্ষণ নিয়েছিল ওরা দুই বন্ধু। বাড়ি গফরগাঁও। একই কলেজে পড়ত। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর অত্যাচারের নির্মম দৃশ্য সইতে পারেনি তরুণ জব্বার, তরুণ শামসু। মা-বোনদের ওপর অত্যাচার নিজ চোখে দেখেছে ওরা। জব্বারের বড় বোন তখন ভার্সিটিতে ভর্তি হয়েছে। বড় বোনকে তুলে নিয়ে গিয়েছিল হানাদার এক ক্যাপ্টেন। বোনের সন্ধান পায়নি আর। এলাকার সমমনা তরুণেরা সংঘবদ্ধ হয়। কুমিল্লা হয়ে ২৭ জনের একটি দল বর্ডার পার হয়, আগরতলায় চলে আসে। মুক্তিযুদ্ধে গেরিলা বাহিনীতে নাম লেখায়। ক্যাম্পে প্রশিক্ষণ নেয়। এবারের অপারেশনে আসার আগে জব্বার বলেছিল, ‘হানাদারমুক্ত করা পর্যন্ত জীবন-মরণ লড়ে যাব আমরা। দেশকে সচল করে ছাড়বই। স্বাধীন করবই। অন্যায়-অবিচার, শোষণ-নির্যাতন এবং জ্বালাও-পোড়াও হত্যাযজ্ঞের প্রতিশোধ নেবই আমরা। মনে রাখিস।’

জব্বারের প্রত্যয়ী কণ্ঠের সঙ্গে তাল মিলিয়ে শামসু বলেছিল, জীবন বাজি রেখেই লড়ব, মরতে হলে মরব।

মরার কথাটা তার চেতনায় মুক্তির বারুদ ছড়িয়ে দিল। নিজেকে সংশোধন করে আবার বলেছিল, ‘মরার প্রশ্নই ওঠে না, মেরে যাব আমরা, একটা একটা করে শত্রু শেষ করে যাব।’

জব্বার হেসে উঠে বলেছিল, ‘ঠিকই বলেছিস। মরার প্রশ্নই ওঠে না। জয় আমাদের হবেই।’

জব্বারের কথা কানে বাজতে লাগল, ‘জয় আমাদের হবেই।’ আর তখনই বদলে যায় শামসু’র মন। নির্মম দৃশ্য দেখার পরও দমে যায়নি সে। বাংকার থেকে বেরিয়ে চারপাশ দেখে বুঝেছে, এখন বিপদ নেই। জব্বারের মরদেহ ফেলে যেতে পারবে না ও। ওর দেহ টেনে নেওয়ার পরিকল্পনা করে। কোমরের গামছা খুলে উড়ে যাওয়া মাথার বাকি অংশটা বেঁধে নেয়। তারপর দেহটা কাঁধে তোলার চেষ্টা করে শামসু।

এ সময় আবার গুলি আসতে শুরু করে। শত্রু বাহিনী পালিয়ে যায়নি এখনও। ওত পেতে আছে।

গুলির শব্দ পেয়ে সঙ্গে সঙ্গে মাটিতে শুয়ে পড়ে শামসু। ধানক্ষেতের উঁচু আলের কিনারা বরাবর খাদের মাঝে লম্বালম্বি শুইয়ে দেয় জব্বারকে। নিজেও শুয়ে প্রতিরোধের জন্য কাঁধের এল.এম.জি আল বরাবর বসিয়ে পজিশন নেয়। পেছনের প্রোটেকশন বাহিনীকে সংকেত পাঠায় ।

জব্বারের পা ওর বাঁ পাশের পেটের তলায় চাপা পড়েছে। বুঝতে পেরে একটু সরে আসে শামসু। সঙ্গে সঙ্গে কথা ভেসে আছে। দূর থেকে জব্বার বলছে, ‘তুই পালিয়ে যা।’

  শামসু চিৎকার করে ওঠে, ‘বেঁচে আছিস তুই!’

‘আমি মরিনি, মরব কেন, আমার রক্ত দেশের মাটিতে মিশে গেছে। ওই মাটিতে জেগে উঠবে সবুজ বাংলা, সোনার বাংলা। তুই নিজেকে চরম মুহূর্ত থেকে রক্ষা কর। আমাকে রেখে চলে যা। তুই না বাঁচলে আবার আক্রমণে আসবি কীভাবে ? শত্রুদের মারতে হবে না ? যা, নিজেকে রক্ষা কর।’

শামসু বলল, ‘না, তোকে রেখে যাব না।’

‘আমি তোকে কমান্ড করছি। এ মুহূর্তে আমার কমান্ড তোকে মানতে হবে, তুই নিজেকে বাঁচা, আমার দেহ রেখে পালিয়ে যা!’

‘তুই বেঁচে আছিস ? তোর তো মাথার খুলি নেই, মগজ নেই!’

‘আমি বাংলার মাটিতে মিশে গেছি, আমি তোর অন্তরে ঢুকে গেছি। তোর অন্তরের ভেতর থেকে কথা বলছি। তুই পালা। তুই পালালে আমিও বাঁচব। ইতিহাস আমাদের কথা বলবে, আমাকে বাঁচাতে হলে তোকে বাঁচতে হবে। যুদ্ধজয় পর্যন্ত সচল রাখতে হবে নিজেদের।’

‘আমি বাঁচতে চাই না’, শামসু চিৎকার দিয়ে প্রতিবাদ জানায়।

‘আমি তোকে ফাইনাল কমান্ড করছি, গো ব্যাক। কাম ব্যাক এগেইন উইথ মোর ফ্রিডম ফাইটার্স, দেন ফাইট এগেইন।’

সঙ্গে সঙ্গে শামসু নরম হয়ে যায়। মনের মধ্যে আণবিক শক্তি টের পায়, সেই শক্তি তাঁকে জব্বারের কণ্ঠ শুনিয়ে দিয়েছে, সত্যি সেই কথা। মিথ্যা নয় মোটেই।

ক্রলিং করে আলের খাদ বরাবর এগিয়ে যেতে লাগল শামসু। প্রতিটি জমি পার হতে হলে মাথা সামান্য উঁচুতে তুলতে হয়। আল পার হতে হয়। প্রথম আলটি পার হওয়ার মুহূর্তে কী যেন লাগে পায়ে। একটু পরই দেখতে পায় রক্তে ভিজে যাচ্ছে বাঁ পা, গুলি লেগেছে হাঁটুর কাছে। হাঁটুর নিচের অংশ ছিন্নভিন্ন হয়ে গেছে, স্রোতের মতো রক্ত ঝরছে। কোনো ব্যথা নেই!

অলৌকিক শক্তি আবার জেগে ওঠে, আবার কথা ভেসে ওঠে, জব্বার তাগাদা দেয়, ‘গেঞ্জি খুলে হাঁটু বেঁধে ফেল।’

শামসু গেঞ্জি খুলে হাঁটু বেঁধে নেয়।

‘যা, এগিয়ে যা। আবার জব্বারের অলৌকিক কথা শুনতে পায় শামসু।’

‘এগোতে থাকে সে।’

একবার পেছনে তাকায়। জব্বার মরেনি, অন্তরের ভেতরে পুরে নিয়ে এসেছে, এগিয়ে যেতে হবে। নিজেদের বাঁচাতে হবে, দেশ বাঁচাতে হবে। স্বাধীন করতে হবে এ ভূমি―ভাবে শামসু।

হঠাৎ দেখে পেছন থেকে মুক্তিবাহিনীর একটা দল ‘ভি’ অ্যাংগেলে এগিয়ে আসছে।

ওদের দেখেই চোখ বন্ধ করে শামসু, বাঁ হাতের তর্জনী দিয়ে দেখিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে জব্বারের দেহ। তারপরই জ্ঞান হারিয়ে ফেলে ও।

॥ দুই ॥

একাত্তর থেকে বর্তমানে ফিরে এলেন শামসু। দিঘির দিকে চোখ তুলে তাকালেন। এ প্রজন্মের টিনএজাররা মুক্তিযুদ্ধের ভাষায় কথা বলছে। মন ভরে গেল খুশিতে। কিশোরীটি ‘সচল’ ‘অচল’ শব্দ ব্যবহার করছে। এ শব্দগুলো মগজে ‘কিউ’ হিসেবে কাজ করেছে তখন, সঙ্গে সঙ্গে পুরো অতীত বর্তমান হয়ে জেগে উঠেছে। একাত্তর এসে হাজির হয়েছে বর্তমানে। একাত্তর মরে যায়নি, একাত্তর হারিয়ে যায়নি! এখনও জীবন্ত বর্তমান, দখল করে আছে শামসুর মগজ। এ প্রজন্মের কেউ কেউ তাঁকে সম্মান করতে চায়! বিপদে সহযোগিতা করতে চায়!

শামসুদের মনে হতো, মুক্তিযোদ্ধাদের মূল্য নেই; কেউ খোঁজ নেয় না ওঁদের। মনে হতো, মুক্তিযোদ্ধা পরিচয়টা গ্লানিকর। এখন মনে হচ্ছে, না, ভুল বুঝেছেন। এ প্রজন্মের ছেলেমেয়েদের ভুল বুঝেছেন তাঁরা। কেউ না কেউ মুক্তিযুদ্ধের কথা মনে রাখবে, একাত্তরের বীরত্বগাথা নিয়ে গৌরব বোধ করবে। এ গৌরব তো অনেক বড়। অনেক মহান। এ বোধ চাঙা করে তুলল শামসুর মন।

শামসু প্রশ্ন করল, ‘তোমার নাম কী, মা ?’

মাথা নামিয়ে নরম ভাষায় ও জবাব দিল, আমার ডাকনাম দিঘি। ভালো নাম জাকিয়া রহমান। আপনার সঙ্গে পরিচিত হয়ে গৌরব বোধ করছি। আপনি একজন যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা, যুদ্ধে পা হারিয়েছেন। ভাইয়া বলেছে এ কথা। আমাদের ইস্কুলের এক ম্যামও বলেছেন আপনাদের কথা। তাই আপনার কাছে এসেছি।

শামসু খুশি হলেন, সবাই তাঁদের পঙ্গু বলে তাচ্ছিল্য করে। আর এ মেয়ে কী সম্মান দিয়ে কথা বলছে! মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে থাকেন তিনি।

নিলয় বলল, ‘আপনাকে পার করে দিই ?’

শামসু হাসলেন, ‘তোমাদের ভালোবাসা দেখে ভালো লাগছে। ধন্যবাদ তোমাদের। আমি একাই পার হব। রাস্তার যানজট কমে যাবে। তখন পেরোতে পারব।’

নিলয় প্রত্যয়ী উচ্চারণে স্পষ্ট গলায় বলল, আপনারা যুদ্ধ করেছিলেন বলে আমরা একটা স্বাধীন দেশ পেয়েছি। মুক্ত বাতাস পেয়েছি। মায়ের ভাষায় কথা বলতে পারি। আপনারা দেশের শ্রেষ্ঠ সন্তান―সে কথা আমরা ভুলিনি। কেউ কেউ হয়তো এ ইতিহাস ভুলে যাবে, সবাই ভুলে যাবে না! আমরাও ভুলব না।

শামসু এবার চোখ তুলে তাকালেন নিলয়ের দিকে।

আনন্দ জাগে মনে। বিস্ময়ও। তিনি ভেবেছিলেন এ প্রজন্ম ইতিহাস মনে রাখেনি! ভুলে গেছে অতীতের বীরত্বগাথা। ভুল বুঝেছিলেন। ভুল ভেঙে গেছে। ভুলের দেয়াল সরে গিয়ে মনের চোখে জেগে উঠল লাল-সবুজ পতাকা। সামনে সুদিনের আলো দেখতে পেলেন তিনি। আনন্দে তার চোখ ভরে উঠল উষ্ণ জ্বলে।

এ সময় হঠাৎ সবাই দেখল যানজট কেটে গেছে। সবুজ বাতি জ্বলে উঠেছে, অজগরের পেট থেকে বেরিয়ে গাড়িগুলো চলতে শুরু করেছে।

দিঘি এগিয়ে এসে বলল, ‘আপনার হাত দিয়ে আমার মাথাটা ছুঁয়ে দেবেন ?’

এবার শামসুর চোখ গড়িয়ে পানি নেমে এল। 

মাথায় হাত দিয়ে শামসু বললেন, ‘বড় হও, মা।’

দিঘি বলল, ‘এ হাতে যুদ্ধ করেছেন আপনি। এ হাতে আমার মাথা ছুঁয়েছেন। আমরা এ প্রজন্ম কথা দিচ্ছি, এই হাতের মর্যাদা রাখব, আমরা মাথা উঁচিয়ে এগিয়ে যাব সামনে।’

সিগন্যালে এখনও আছে সবুজ বাতি!

শামসু দেখছেন, সচল বাংলাদেশ। দেখছেন গতিশীল বাংলাদেশ। এ দেশ অবশ্যই একদিন করবে জয়―দুর্নীতির সব জঞ্জাল দূর করে এগিয়ে যাবে। এমন  প্রত্যয় নিয়ে হুইলচেয়ারের চাকা ঘোরাতে লাগলেন তিনি।

একজন মুক্তিযোদ্ধার হাতের ছোঁয়া নিয়ে ফিরে যাচ্ছে দিঘি। মাথায় এখনও টের পাচ্ছে সেই নরম ছোঁয়া। অন্য রকম শিহরণ জাগছে। মনে হচ্ছে ও বর্তমানে নেই, মনে হচ্ছে ও এখন আছে একাত্তরে। অতীত-বর্তমান; উনিশ শ একাত্তর আর একুশ শতকের একুশ মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে, একাকার সময়ে সেও মুক্তিযুদ্ধের একজন অংশীদার। বিজয়ের ৫০তম বছরের গৌরবের মুকুট ঝলমল করছে ওর  মাথায়ও।

রিকশায় ফিরে এসে আবার সামনে তাকাল নিলয়।

দেখল, ঘুরছে, হুইল চেয়ারের চাকা ঘুরছে বাধাহীন, জড়তাহীন; অজগরের পেট ফুড়ে এগিয়ে যাচ্ছে সামনে। যেন সব অপশক্তি আর জঞ্জাল দুরন্ত গতির চাকার তলে পিষে বিজয়ের গৌরব মাথায় তুলে এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ!

সচিত্রকরণ : শতাব্দী জাহিদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may have missed

shares