গল্প : মাংস-মীমাংসার বর্ণনা : ডেট লাইন চুকনগর : মামুন হুসাইন

এবার বর্ষা তাড়াতাড়ি এসে গেল/ তোমার রংটা তামাটে হয়ে যাচ্ছে/ তুমি কি নিশ্চিত যে দুধ চা খবে না/ … এই প্রকার বাক্য বিনিময় করতে করতে আমরা একদা টানা কয়েক মাস গর্বিত হই, বিদীর্ণ হই এবং সদ্যমৃত নবজাতকের ঠোঁটে চুমু দিয়ে ফুঁপিয়ে উঠি অথবা ধীরে ধীরে আয়ত্ত করি মেঘ, বৃক্ষ ও নৈঃশব্দ্যের ভাষা। আমরা বলি সকল মৃত্যুই অসময়োচিত, আর তোমাদের শহরের প্রতিটি জানালা থেকে মৃত্যুর অপলক দৃষ্টি ঝরে পড়ছে। জনগণ সারি সারি হেঁটে চলেছে। যুবকেরাও হেঁটে চলেছে বিবিধ আলোর ঝলকানিতে উদ্ভাসিত পুকুরের জল ঘেঁষে। যুবকেরা পঞ্চাশের মন্বন্তরে চার্চিলের ষড়যন্ত্র পাঠ করে, দুর্ভিক্ষের সাক্ষী খোঁজে, সমাজতন্ত্র সম্পর্কিত পুনর্ভাবনার ইশারা পায় এবং কতিপয় বান্ধবীর পরীক্ষা নেয়া গেছে, এই ভঙ্গিতে ঘনিষ্ঠ হয়Ñ… (কেন আমার হৃদয় সাড়া দেয় না তোমার হাতের স্পর্শে ?)—‘কামনা আর যৌনতাকে তুমি কি প্রেমের ক্ষেত্রে আবশ্যিক বলে মনে করো ? … হ্যাঁ কিংবা না বলো’ … তোমাকে কী এই কথাটা বলব ?—নারী স্বাধীনতা-নারী মুক্তি— ইত্যাদি প্রপঞ্চের অভিঘাতে আমাদের যৌন-অক্ষমতা ইদানীং বেড়ে গেছে ব্যাপক— এরকম একটি বাক্য— কোথাও পড়েছি আমি।

যুবকেরা তাদের নামকরণ করেÑআরিফ, চিন্ময়, সৈকত, সুমন, ইউসুফ, শঙ্কর, ব্যাঙ, শেখর, কালাচাঁদ ও কর্নেল। আর যুবতীরা তাদের নামের খাতায় লেখে শেফালি, আসমা, মধুশ্রী, জেরিন, সুরভি ও হুসনেয়ারা। যুবক-যুবতী ভাব আদান প্রদানের জন্য রাস্তায়-মাঠে হঠাৎ-হঠাৎ সঙ্গীতের মূর্ছনা ছড়ায়। কখনও তারা আকার-ইঙ্গিতে বলে—আমার গৃহ অভিশপ্ত। কখনও চোখ তুলে নিষ্ঠুর নিয়তির দিকে তাকায় এবং কেউ ফিরে আসেনি ভালোবাসার শপথ রাখতে—এই ভঙ্গিতে অভিমানী হতে হতেই আবার হাসি বিনিময় করে। চায়ের কাপে ঝড় তুলতে তুলতে তারা অন্তহীন বেদনাকে স্বাগত জানায়, অন্ধকার বাড়িতে মোমের আলো জ¦লতে দেখে—খানিক সময় নিষ্প্রাণ হয়, অসাড় হয় এবং বাঁ হাতের দস্তানা ডান হাতে পরিধান করায়, বিহ্বলতায় আক্রান্ত হয় চকিতে। আমি যাদের ভালোবাসি তাদের আত্মাসমূহ এখন উঁচু নক্ষত্রে। (কি আসে যায় যদি আমাদের বাড়িগুলো ধ্বংস হয়ে যায়Ñকি আসে যায় যদি আমাদের মৃতদেহ ভিড় করে থাকে একটার পর একটা।)

নবীন শতাব্দীর শীতল তরুশালায় বেড়াতে-বেড়াতে আমাদের অনুভব হয়—সাহসের সময় এটা; অনুভব হয়, দিগন্ত ছুঁয়ে বাতাস বয়ে চলেছে সঙ্গীতের। আমাদের এবং সবার ছায়া উঠে আসছে অতীত থেকে। আমরা কী সান্ত্বনা বা সুসংবাদ পাওয়ার দাবিদার হতে সক্ষম ? আমি, আরিফ, সৈকত, জেরিন, সুরভি এবং অন্যরা নদীর পাড়ে জল ছুঁই ছুঁই গাছ দেখতে-দেখতে, ডালপালায় ঝোলানো বাঁশি দেখতে-দেখতে বাক্য আওড়াই—আমরা যাদের ভালোবাসতাম একদা, এখন তাদের আত্মাসমূহ উঁচু নক্ষত্রে। সৈকত, মধুশ্রী, উদয় এবং আরেফিন অপর বন্ধুদের অসাড় শীতল চোখ পরখ করার ফাঁকে, ল্যান্ডিংয়ে ভালোবাসায় মেতে ওঠা দু-পাঁচজন সদ্য কিশোর-কিশোরীর প্রচ্ছায়া সম্পর্কে উদ্দেশ্যহীন প্রশস্তি রচনা করে এবং আমাদের অন্তর্গত ইচ্ছাশক্তির উদ্বোধন ঘটায়। এবার পতিত আয়নায় প্রতিফলিত আয়নার-বারান্দা দেখে আমরা যেন-বা সামান্য জর্জরিত হই, উন্মোচিত হই এবং উদ্দেশ্যহীন ভ্রমণ বৃত্তান্ত রচনার পঙ্ক্তি খুঁজতে বসি।

হয়ত এরকম এক পতন ও পুনরুদ্ধারের কালে সুন্দরবন দেখার পরিকল্পনা হয়, অথবা মুক্তিযুদ্ধে সুন্দরবন বিষয়ে গ্রন্থ তৈরির প্রণোদনা আসে, আর অচিরেই পুরোনো ফোটোগ্রাফের দিকে তাকিয়ে থাকা লোকসমূহের জিজ্ঞাসা বিষয়ে ব্যাখ্যাতীত এক নৈঃশব্দ্যের ভাষা রচিত হতে থাকে। অতঃপর ঘরবাড়ির প্রতারণা, নিষ্ঠুর জগৎ এবং যে ঈশ^র আমাদের সহসা রক্ষা করেননি—সেইসব খণ্ডিত চিত্র সম্পর্কে পৃথক ও শাশ^ত চিন্তার ক্ষণস্থায়ী সুযোগ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে আমরা পিতৃভূমির গহ্বরে অবশেষে ধীরে ধীরে নিমজ্জিত হই ও নির্মিত হই।

আমাদের সমর্পণ, আমাদের উত্তোলিত বাহুর ঘূর্ণি, বিস্তৃত ধৈর্য এবং অতিশুদ্ধ অপরিমেয় উষ্ণতা আমাদের সম্পর্ককে ক্রমশ স্বচ্ছল করে এবং আমদের নিঃশব্দ অনুভূতিতে অথবা পারস্পরিক সম্পর্কের গভীরে প্রশান্ত এক ঘনিষ্ঠতার প্রশ্রয় ছড়িয়ে দেয় সর্বক্ষণ। এই পরিচিত কয়েক ঘর মানবমণ্ডলী এবার বিবিধ ভ্রমণের সচিত্র গাইড আঁকে, জলাধার দেখে, পাথর দেখে, তৃণভূমিতে হাওয়া বয়ে যাওয়ার জন্য মূক হয় এবং হারানো-শৈশব গন্ধ-লাবণ্যে ভরে তোলার জন্য অক্ষম শিক্ষক হয় কখনও। কখনও তারা জলাধার থেকে জল পান করে—হয়ত তৃষ্ণা নিবারণ হয়, আর দৈনন্দিনের প্রাপ্য কোলাহল এড়ানোর জন্য—তারা এমনকি গোবৎসের গলার ঘণ্টি স্তব্ধ করতে চায়, অধিকতর নিঃশব্দ-অনুভূতির খোঁজে। নিঃশব্দ ঈশ^র, তার লুকানো স্থান থেকে অনুমতি পাঠায়—ফলে তারা ক্ষুধার্ত হয় এবং ধর্মান্তরিত বালকের মতো ঈষৎ চঞ্চলতায় ভক্তির কয়েক প্রকার অর্ঘ্য ছড়াতে থাকে। আরেফিন, জেরিন ও মুস্তাফিজ ঘি দিয়ে যখন গরম ধোঁয়া ওঠা ভাতের সুগন্ধি ছড়ায়—পৃষ্ঠাজুড়ে-চোখজুড়ে তখন গাওয়া ঘি, নালিতা শাক ও মৌরলা মাছের ঝোল গড়িয়ে পড়ে যেন। দোকান ঘুরে ঘুরে রেজালা, বিরিয়ানি ও বোরহানি চেনার অনুষ্ঠান হয়। রুই মাছ দিয়ে পলতার আগা, কই মাছ দিয়ে মরিচের ঝোল, মাগুর মাছ দিয়ে গিমা শাক—এ সব মনসামঙ্গলে উল্লেখিত আছে … কিন্তু আমরা খাইনি কেন, এই ভেবে শঙ্কর ও উদয় নিজের সঙ্গে নিঃশব্দে তর্ক করে। ঘর গেরস্থির মানুষেরা উদাস হয় এবং চঞ্চলতায় আবারও রসনা তৃপ্তিতে দ্রবীভূত হয়। ঢাকার রোগীরা ভীম নাগের সন্দেশ ভিটামিনের পরিবর্তে গ্রহণ করত—এই প্রকার মতামত আসে কখনও। একদিন জানা গেল, শ্রদ্ধেয় মুজতবা নাকি বলতেন—বেহেস্তে ইলিশের বর্ণনা নেই, অতএব তিনি বেহেস্তে যাবেন না! ভ্রমণ সঙ্গীরা ধীরে ধীরে বর্ণনা করে বোঁদে, জিলাপি, নেহারি, হালিম, পুরি, হালুয়া, তেহারি, পাতলা খিঁচুড়ি, আলুর দম, দৈ বড়া, লস্যি, ফ্রুটকেক, … মিষ্টির রস, কচুর লতি, হাঁস দিয়ে বাঁশ রান্নার বর্ণনা অথবা উদ্বোধিত হয় সিলেটী বর্ণনায় আশ্চর্য সেই ‘ছুট আলুর চচ্চড়ি’—ছুট আলু ভালা করিয়া ধইয়া সিদ্ধ করইন। শইস্য আর কাঁচা মরিচ পালিশ করিয়া বাটিয়া রাখইন। ইবার আলুরে দুই হাতর তালুর মাঝে রাখিয়া চেপ্টা করইন। … ইবার কড়াইতে তেল গরম করিয়া বাটা শইস্য-কাঁচা মরিচ বাটা …।

আলু চচ্চড়ির বর্ণনা কৃত্তিম জলপ্রপাতের মতো দীর্ঘ হয়, ছন্দময় হয় অথবা ক্ষণিক বিরতির মুহূর্তে অজান্তে কতিপয় শক্তিশালী মানুষের দৃঢ় আবেগে রসনা বর্ণনা ক্রমশ: পেশিবহুল হয়—বলা যায় তাদের অভিব্যক্তিতে মফস্সলের আকাশজুড়ে মাংস বর্ণনার একটি সরল জাজিম তৈরি হয় : … আমরা প্রায়শ এত রেডমিট খাই কেন ?  … হোয়াই সেক্স অ্যাসোসিয়েটেড উইথ ইটিং মিট ?  … গরুর মাংস কেন বিফ, আর শূকরের মাংস পর্ক ? নিজেরাই আবার জবাব খুঁজি— আমি এবং আমরা হয়ত মাংসের জন্য ক্ষুধার্ত ছিলাম অনন্তকাল। রক্তহীন মাংস, যেমন মুরগি এবং মাছ আমাদের খাদ্যপ্রেমী তথা ভ্রমণপ্রেমীদের কাছে নিম্নমানের। ডিম এবং পনির— ক্ষমতা বিবেচনায় আমরা বলি, আরও নিচে। খাদ্য একদা যা ছিল নিতান্তই প্রাকৃতিক, আগুন এসে সেই খাদ্যকে সাংস্কৃতিক চিহ্ন হিসেবে দেখতে শেখায়। আমরা শিখি : খাদ্য আমার প্রতিপত্তি ও শক্তি বর্ণনা করে। খাদ্য দিয়ে আমরা বন্ধুত্ব, আনন্দ, ভয়, ঝুঁকি ও আতিথেয়তা বর্ণনা করি; খাদ্য শক্তি, স্বাস্থ্য, স্মৃতিকাতরতা, ঘরে ফেরা, এবং নিজের স্বাতন্ত্র্য প্রকাশ। খাদ্য কখনও রোগীদের জন্য, খাদ্য কখনও যৌন-শক্তিবর্ধক, খাদ্য কখনও উৎসবের, উপাসনার এবং কখনও যাদুর মতো। সকল মাংসের কেন্দ্রবিন্দুতে যুক্ত হয় লাগাতার রক্তপাত (ভাজা কলিজা নিন, এই পাশে মগজের কাটলেট, সাদা মাংস, মাংসের সালাদ, মিট ফ্রাই, গোলাশ, মিট লোফ, বিফ ভিন্ডালু। আপনি নিতে পারেন খাসির মাংসের কলিজা, খাসির ডালচা এবং গরুর ঠাণ্ডা জিহ্বায় তৈরি স্যান্ডউইচ।)

মুস্তাফিজ, শঙ্কর, আরেফিন এবং অপর বন্ধুরা মাংসের বিবিধ স্বাদ গ্রহণের পাশাপাশি কখনও উদ্যান, বনাঞ্চল ও অভয়ারণ্যের হদিস লিপিবদ্ধ করে তাদের ভ্রমণ বৃত্তান্তে। মগজের কাটলেট চিবুতে চিবুতে আমরা জয়ন্তিকা-উপবন ট্রেনের সময়সূচি খেয়াল করি। এই ছবি রাতারগুলের—কোথাও পানি ২৫ ফুটের মতো, পানকৌড়ি তো বটেই, দেখা পাওয়া যায় মেছোবাঘ, উদবিড়াল এবং সবুজ বোড়া সাপের।

যুবকেরা বন্য হাতির কথা বলে এবং লাউয়াছড়া যাওয়ার সহজ উপায় খোঁজে। পর্যটক বন্ধুদের সঙ্গে কথা বলে তারা মধুপুর বনের সেরা কটেজের নাম ও বুকিং পদ্ধতি শেখে। তারা দ্রষ্টব্য স্থান চিহ্নিত করে—টেংরাগিরি, চর কুকরি-মুকরি, আলতাদিঘি, বুড়িগোয়ালিনী, কোকিলমনি, হাড়বাড়িয়া, সাতছড়ি, লাউয়াছড়া ও বাঁশখালি। গরান গাছ ও কেওড়া গাছ চিহ্নিত করার প্রতিযোগিতা হয়। রাসমেলার ছবি দেখে ইউটিউবে। বনের ভেতর কাঠের ট্রেইল পাড়ি দেয়। বানর দেখার জন্য বনকর্মীরদের সাহায্যে খাবার ছড়ায়। জালের মতো ছড়ানো খাল দেখে ভয় এবং উত্তেজনা হয়। দূর থেকে বন্য শূকর এবং গুইসাপ কখনও চোখে ভাসে। যুবকেরা বনভ্রমণ শেষে কোনও দিন রাজা রামনাথের খননকৃত দিঘি দেখার বন্দোবস্ত নেয়। ধ্বংসপ্রাপ্ত মন্দির এবং ছড়ানো ছিটানো টিলা। বন মোরগ দৌড়ে যায় কোথাও, কোথাও বসন্তবৌরি, শকুন, চিল ও মাছরাঙ্গা। পর্যটক বন্ধুরা চম্পারায় বাগানের গল্প শোনায় এবং চশমা হনুমান ও মুখপোড়া হনুমানের ফোটোগ্রাফ নেয়।

অথবা তারা ট্রেকিং’এর ফাঁকে বার্ড ওয়াচার হওয়ার প্রস্তুতি নিতে-নিতে আবার কখনও খাবারের গল্পে জড়িয়ে যায়। গল্পের ভেতর মোচা কুচোনোর আওয়াজ প্রতিষ্ঠা পায়। পেঁয়াজ-রসুন কুচোনো চলে। ডুবো তেলে মোচার চ্যাপ্টা বল উত্তপ্ত হওয়ার শব্দ আসে। শব্দ হয় গোটা জিরে এবং শুকনা মরিচ ফোঁড়নের। কর্নফ্লাওয়ার, মৌরির গুঁড়ো, জায়ফল ও গোল মরিচ ছড়িয়ে গেছে যৎসামান্য। লেবুর রস অথবা সস খোঁজার আয়োজন হয়। খাদ্যের ঘ্রাণ ও শব্দ যুবক-যুবতীদের মন ও শরীর উজ্জীবিত করে। দর্পণের ভেতর নিজেদের ছবি আসে। দৃষ্টি বিনিময় হয়। রান্নার নাতিদীর্ঘ আড়াল ও সুঘ্রাণে পরস্পরের হস্তরেখা বিচার হয় এবং অন্যতর এক ভারসাম্য খুঁজতে যেয়ে তারা শরীরের ভেতর নিঃস্ব আত্মপ্রতিকৃতি খুঁজতে বসে। তুমি কি এখন কাঁদতে পারো ? সম্পন্ন শরীর এবং অবসন্ন শরীর নিজেদের উৎপাদিত ঘাম-বিন্দু মোছে, নিজেদের সন্ত্রস্ত করে এবং গভীর পরিপূর্ণতায় একপ্রকার মিষ্টি স্বাদ আনে পরস্পরের ওষ্ঠ যুগলে। খাদ্যের ঘ্রাণে এবং হঠাৎ তৈরি ধাতব শব্দের সুরে পুরুষ এবং নারী নিজেদেরকে অভিযুক্ত করে, নিজেরা অনুশোচনা করে, বিলাপ করে, নারী ভাবাপন্ন হয়, আর্তনাদরত হয় এবং অবশেষে প্রসাধন-অলংকার ও কেশবিন্যাস স্থগিত রেখে নিত্যদিনের পৃথিবীতে ফিরে আসে পুনরায়। তাদের ডুয়াল হয়—ইজ সেক্স আ কালচারাল অবজেক্ট ? হোয়াই সেক্স ইজ অ্যাসোসিয়েটেড উইথ ইটিং মিট ? মাংসের সঙ্গে আমাদের একবার ধারণা হয়, রক্তপাতের ইতিহাস সংযুক্ত। রক্তের লাল এইভাবে আমাদের মধ্যে ক্ষমতা, বিপদ এবং বিদ্রোহের ইশারা নির্মাণ করে। উইমেন আর কল্ড মিট … আপনি জানেন কি ? আপনাকে গান শোনাব—মিট ইজ মার্ডার, স্মিথ পপ গ্রুপের। (একবার আমাদের কেউ কসাইয়ের দোকানে ফেইন্ট হয়ে পড়ে—রক্তপাত এবং হত্যা হয়ে যাওয়া ছাগ শিশুর ক্রন্দনে আমি ক্রমশ অবসন্ন হয়ে পড়ি।) আসল মানুষেরা ভয় পায় না। আসল মানুষ চিপ্স এবং স্টেক নেয়। মাখন, সাদা রুটি এবং চিনিতে এরা কদাচিৎ ভয় পায়। ওরা জানে—সব যথার্থ খাদ্য মাংস কেন্দ্রিক। ভেজিটেরিয়ান হওয়ার জন্য বন্ধুরা ক্লাসে আমাকে বুলিং করে … আই মাস্ট বি গে। বন্ধুদের সাহায্যে তারপর শব্দ-ভাণ্ডার দীর্ঘ হয়—ইন্টারকোর্স, ভ্যাজাইনা, প্রসটিটিউট এবং ব্রোথেল বোঝাতে বন্ধুরা মিট’ এর নানান ব্যবহার ঘটায়—কখনও তা হয় ‘বিট অফ মিট’, ‘ফ্রেস মিট’, ‘হট মিট’, ‘মিট মার্কেট’ অথবা ‘মিট হাউজ’! বন্ধুদের হাত ধরে শিখি : বীর্য ধারণে মেধা বাড়ে, মাংস গরম খাবার, আর বীর্য পতন মানে শরীর পতন! লক্ষ্য করি—উপাখ্যানজুড়ে দেবতাদের সঞ্চিত বীর্যের গল্প—দেবতাদের বীর্য ফুলের গায়ে পড়লেও নতুন প্রাণী উৎপন্ন হয়। যেমন শীবের বীর্য পদ্মফুলে পড়ে মনসা হয়েছে। (ছড়া শুনি আমরা—আকাশে পড়িলে বীর্য খেচরেতে খায়, জলেতে পড়িলে বীর্য পুঁটি মাছে খায়।) আরিফ, শেফালী, আসমা, কালাচাঁদ, কর্নেল, হুনেয়ারা ও শঙ্কর ছড়া শুনতে শুনতে নিষিদ্ধ এক কারুবাসনা অনুভব করে। তারা যুবক-যুবতীর আদলে পরস্পর গল্প নির্মাণ করে—

‘ তোমার কপাল তো খুব গরম।’

              কোনও উত্তর দিল না।

              ‘আচ্ছা তোমার বুকটা একটু দেখতে দেবে ?’

              আবার ঠোঁট কামড়ে কান্না।

              ‘বুক দেখতে চেয়েছিলে না ?’

              মাথা হেঁট করে—‘থাক’।

              ‘কেন ?’ দেখো, তুমি তো আমার স্বামী, দেখাবই বা না কেন ?

              কয়েক মুহূর্ত কেটে গেল।

              ‘ভালো কথা, দেখা তো হলো, এখন সেফটিপিনটা আটকে দি ?’

              ‘দাও’

              ‘ না আমার আর প্রবৃত্তি নেই’

বলা যায়—আমাদের চেনা যুবক-যুবতীরা, বিবিধ মাছ-মাংস চিবুতে চিবুতে, নকল প্রেমে জর্জরিত এই প্রকার দুঃখের অভ্যাসে একদিন ও প্রতিদিন ছিন্নবিচ্ছিন্ন হয় অথবা মহত্ত্বের চূড়ায় আরোহণ করে। তারা নিজের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে এবং মুখমণ্ডলে ধারণ করে ছায়াপথ। তারা নগ্ন হয়, নিসর্গের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়। ভাগ্য পরিক্রমায় পড়ে এবং প্রশ্নকাতর হয়—কেন তাকে দাঁড়িয়ে থাকতে হবে মিথ্যেবাদী রাখালের মতো :

কেন মাংসের সঙ্গেই সেক্স সম্পর্কিত— … হোয়াই ইজ সেক্স অ্যাসোসিয়েটেড উইথ ইটিং মিট ? যুবকেরা প্রেমের পূর্ণ বিস্তারে ও অন্তরের স্বাধীনতায় প্রিয় যুবতীদের সঙ্গে মাংসের সালাদ এবং ঠাণ্ডা জিহ্বা গ্রহণের জন্য আবার কোনও নতুন রেস্তোরাঁয় যায়। আবার খাদ্য সন্দর্শনে রক্তের ভেতর কেউ অপ্রতিরোধ্য-অবশ্য করণীয় কর্তব্যে বাধ্য করে কথা বলতে—রন্ধন প্রক্রিয়া, আমরা বলি—যেন বা যুদ্ধযাত্রা, যখন রেস্তোরাঁ নামক যুদ্ধ-ট্যাংক, আমাদের পুরোনো সকল খাদ্যাভ্যাসকে নিশ্চিহ্ন করে। আর টেক-অ্যাওয়ে হলো রান্নার গেরিলা! লোকেরা খানিক্ষণ নিজেদের নিজের আয়ত্তে রাখে; তারপর মৃত হয়, অথবা আমরা মৃতদের মধ্যেই থাকি বিক্ষেপহীন, যখন আমাদের আত্মাসমূহে অনুনাদী হয় আমাদের কণ্ঠনিঃসৃত অগভীর শব্দ-তরঙ্গ। … প্রিয় মহোদয় বিষয়টি আপনার কাছে গুরুত্বপূর্ণ নাও হতে পারে, কিন্তু মাংস গ্রহণের এই আপাত সহজ ঘটনাটি আমাকে বলতেই হবে। আপনাদের মতো আমরাও এই মাংসের অংশবিশেষ ক্রয় করি সপ্তাহ শেষের একদিন আগে। সপ্তাহের উইক এন্ডে আমরা রাতভর টেলিভিশন-ফিল্ম দেখি, কিন্তু পরদিন মাংস ভক্ষণের সম্ভাব্য ছবিটি আমরা কোনওভাবেই এড়াতে পারিনি। ছুটির দিন সারা সকাল-দুপুর রান্নার ঘ্রাণ আমাদেরকে আমোদিত করে। আর টেবিলে বসা দ্রুত উবুড় হয়ে পড়া মাংসের বাটিতে মাত্র সপ্তাহের সমস্ত ক্লান্তি দূর হয়ে যায় মুহূর্তে।

মাংস আমাদের কাছে, অতএব কেবল খাদ্য গ্রহণ নয়, এটি একপ্রকার জীবন প্রণালি বটে। বিফ, ল্যাম্ব, মাটন, চিকেন ও টার্কি মিলিয়ে আমরা খাদ্য তালিকা পুনঃনির্মাণ করি : শক্তি সঞ্চয়ে, আপনাকে বলি মশাই— কাঁচা মাংস সবচেয়ে বিশিষ্ট, রেডমিট-চিকেন-মাছ অবশ্যই শক্তিশালী, ডিম-দুধ অপেক্ষাকৃত কম শক্তিশালী, আর ফল-সবজি সবচেয়ে দুর্বল। লোকসকল এইপ্রকার যুক্তি তর্কে অনুভব করে তাদের ‘মাংস-ক্ষুধা’ কখনও আবার পরাক্রমশালী হয়। প্রিয় বান্ধবীকে ইঙ্গিতে বলে—তুমি কী এখনও এখানে, গৃহকোণে কোথাও দাঁড়িয়ে ? আপন অস্তিত্বের সরু পথে হাঁটতে-হাঁটতে নীল-চোখ রমণীকে দেখে তারা ভেতরে-ভেতরে নির্জন দ্বীপ, এলোকেশ, অবাঞ্ছিত চুম্বন ও শিশু তৃণের ঘ্রাণ প্রতিষ্ঠা করে। রেস্তোরাঁয় টেবিলে তখন কিমা পালং রোলের অবশিষ্ট বিলাপ। তারা আত্মস্থ হয়, অনন্ত প্রশান্তির রহস্যে ডানা ঝাপটায় এবং সহসা প্রশ্ন করতে শিখে—ক্যান বয়েজ বি সেক্সচুয়ালি অ্যাবিউজড ? বাবা মা, অন্যের বাড়িতে যাওয়ার সময় সাবধান করে কেন ? আমাদের কালে অপশান কী কী ?—স্পার্মব্যাংক ও শিশুলাভ/সন্তান অ্যাডপ্ট করা/বিয়ে না করে সন্তান ধারণ/বিয়ে করা এবং সন্তান অ্যাভয়েড করা/ বিবাহ করা এবং সন্তান লাভ। তুমি বলতে পারবে ?— উত্তম চকোলেট, গোলাপ, ফ্যান্সি হোটেল রুম এবং ডায়মন্ড—আমাদের বিয়ে কী তাতে সুখি হয় ? আমাদের কারণেই কি তবে আমাদের সন্তানেরা নিঃসঙ্গ হয় ? তুমি একদিন ক্লাসে আমাদের কাছে রাবার চাইলে। রাবার অর্থ কন্ডম, বুঝেছি আমরা—আসলে বলা উচিত ছিল ইরেজার। আমরা তোমাকে বুলিং করি এবং অবাক হয়ে শিখি—এক একবার অর্গাজমে ২৫০ মিলিগ্রাম স্পার্ম নির্গত হয়, কিন্তু ফ্যালোপিয়ান টিউবে পৌঁছায় মাত্র ২০০টি। স্পর্শহীন স্পার্ম আবারও মাংস-ক্ষুধা অনুভব করে। জনপদ, নক্ষত্রের নিস্তব্ধ আকাশ, সূর্য ও বিকলাঙ্গ মানুষের ভিড় এড়িয়ে এবার তারা শহরের জিরো পয়েন্টে সমবেত হয় ও নতুন ভ্রমণসূচির বিলাপ ছড়ায়। ক্রিকেটার মানজারুল ইসলাম রানা এই হোটেল থেকে মাংস খেয়ে ফেরার পথে রোড ট্রাফিক অ্যাক্সিডেন্টের শিকার হয়। চুকনগরের এই হোটেলে তুমি খুলনা অথবা যশোর থেকে আসতে পার। জিপিএস’এ আব্বাস হোটেল ২২º ৫০′ ২৬.১৯″ , ৮৯º ১৭′ ৪৫.১৫″ — চুঁই ঝালে তৈরি খাসির মাংস পাবে এখানে। চুঁই এক ধরণের লতানো গাছ—এই লতা বেশ ঝাল; বলা যায় লঙ্কা-গোলমরিচের মাঝামাঝি। আরিফ, চিন্ময়, সুমন, শেফালী, মধুশ্রী ও কর্নেল অন্তর্জালে আব্বাস হোটেলের ঠিকানা এবং মাংস পরিবেশনার ছবি দেখে। প্রতি টুকরা মাংসের দাম তারা জানতে পারে। ছবির ভেতর চুকনগর এবং চুকনগরের কতিপয় বাবুর্চির রন্ধন শৈলী ভেসে বেড়ায়। যুবক-যুবতীরা ব্যাকপ্যাক গোছায়, পরিবর্তিত হয় এবং সমর্পিত হয় দ্রুত। হয়ত গান হবে চলতি গাড়িতে, এজন্য সঙ্গীত-নির্বাচনকারীকে তারা আশ্চর্য হয়ে প্রশংসা করবে—এরকম ভাবল। মনে মনে শেফালী বা মধুশ্রীকে নিয়ে ভাবি—অতি ধীরে ঘন হয়ে উঠছে তোমার ভুরু। দুষ্টু পাখি, পুষ্ট ফল, এবং মাটির নিচের হিংসুটে কীট—আমরা যারা কেবলই ছায়া, তাদের ভেতর পরিপক্বতা ছড়ায়। জন্মদিনে পাওয়া বহু-ব্যবহারে জীর্ণ পুতুল আমাদের শাসন করে, ক্ষমা করে এবং শাস্তি দেয়। ক্ষমার আবেগে শেফালীর ঠোঁটের কোণে যখন গর্বের হাসি, তখন চতুর্দিকের দীপ্তি আমাদের বিহ্বল করে। আর তরুণীদের এই ধীর-শান্ত-উষ্ণ নিঃশ^াসে অপর এক নিখুঁত সংকল্প আমাদের অধিকার করে নিঃশব্দে। আর শুদ্ধ-বিস্তৃত খোলা গৃহদ্বারের মতো উন্মুখ হৃদয়ে সে ও আমরা প্রবেশ করি অন্যভাবে। যেন ছুটি পেয়ে পৃথিবী অতি আনন্দে খেলায় মেতেছে শিশুদের সঙ্গে। উড়ে চলার গোপন প্রশিক্ষণে, অতএব দূরত্ব হয় নিকট। অতএব সকলে মৃত্যুবরণ করে, অতি দেরিতে অথবা অতি আগে; এভরি লাভস্টোরি ইজ আ পোটেনসিয়াল গ্রিফ স্টোরি। এখন আপনি এই যে তীর্থস্নানে চলেছেন, এখানে প্রসাদ হিসাবে লুট দেয়ার জন্য বাতাসা এবং নকুলদানা কিনতে হবে বিশম্ভরপুরে গ্রামের জাকির হোসেনের ঘর থেকে। গাঙ্গের পানি রে, নদীর পানি রে/ কল কলাইয়া তুমি ভাটির দেশে যাও রে …  আপনাকে ‘মছরু পাগলার গান’ শোনালাম এক পঙ্ক্তি; কুলফি মালাই নিন। জামুকাটা নদী কোন্ ডিস্ট্রিক্টে, মনে করতে পারলাম না। আপনি এত ঘোরেন কেন ? … জানি না, মাউলায় আমাকে ঘোরায়। এরা ঘোরায় বলে ঘুরি। মাবুদে না ঘোরালে কিছু নাই। রসুলে না ঘোরালে কিছু নাই। ঈশ^র ঘোরায় তাই ঘুরি। আপনি দেখলেন—ত্রিমূলে সিঙ্গা, মহিশের সিং, … একপাশে মা কালীর বাঁধানো ছবি, শিব লিঙ্গ, প্লাস্টিকের সাপ এবং আশীর্বাদের লাল সুতো। কাপড়ের লাল সুতো বুক পকেটে রেখে কেউ নকুলদানা চিবোয় এবং দূরের এক সাধন সঙ্গিনীর শারীরিক ভাষায় জীবনের উপলব্ধি খোঁজার প্রয়াস পায়। আপনাকে বলি— ‘বেশি মদ খাবেন না, তাতে সরকারের ট্যাক্স লাভ হয়। আসুন অন্য দৃশ্যাবলি দেখি : সবে নেমে আসা সন্ধ্যার ছাদ থেকে দেখতে পাচ্ছেন জিলিপি, ডাবওয়ালার ক্ষুরধার দা, শিঙাড়া, কফিশপের ফুটন্ত জল, সাইকেল মেরামতির দোকান ও গরম তাওয়া থেকে ঝরে পড়া উষ্ণ নুডলস্। কিছু মানুষ দেখবেন—গাঢ়-খড় চোখ, স্মার্ট, কিছুটা বেঁটে, ঠোঁটের ভাঁজে প্রচ্ছন্ন চালাকি ও আপাত অবিন্যস্ত চুল। একজন হয়ত সবুজ রহস্যময় আত্মাসহ রেলিঙ্গে নুয়ে আছে। আপনি দেখলেন ট্রেন থেমে আছে আম-নিম-ঝাওয়ের জগতে, আর মানুষ দৌড়াদৌড়ি করছে। আপনি বললেন—জলের মতো সহজ একটি কথা; আমাদের তর্ক হল—জল কী আসলেই সহজ ? তর্ক হলো—হোমিওপ্যাথির মতো করুণানির্ভর দুখানি চোখ নিয়ে। তর্ক হলো—পুরোনো রাজবাড়ির মতো ম্লান এক শহর নিয়ে। তর্ক হলো—বরাহনগর, হুগলি, বর্ধমান, নদীয়া, কুমারখালির কথা, পতিসর ও কুষ্টিয়া শহর নিয়ে। তর্ক হলো—শঙ্খবাবুর বাড়িতে রোববারের আড্ডা নিয়ে; তর্ক হলো—রাস্তার প্রতিটি বাঁক নিয়ে, রাস্তার ভালোবাসা নিয়ে, ভালোবাসার রাস্তা নিয়ে, পাপ-পুণ্য নিয়ে, ঠাকুরপুকুর ক্যান্সার হাসপাতাল নিয়ে, লুই ফিলিপের শার্ট নিয়ে আর ষাটের দশকে দেখা তাঁতের শাড়ির সেই মহিলাকে নিয়ে; আর একটি মেয়েকে ঘিরে চার-পাঁচজন বসে থাকা কফিশপের সেই টেবিলটি নিয়ে।

বলা যায়—এই সব বিবিধ তর্কে, আর উড়ে চলার গোপন প্রশিক্ষণে একসময় দূরত্ব হয় নিকট। জিপিএস’এ  আব্বাস হোটেল চিত্রিত হয় আবার, আর দেখা দেয় হঠাৎ সেই চুকনগর গণহত্যার নামফলক। শেফালী, আরিফ, কালাচাঁদ, কর্নেল, মধুশ্রী ও সৈকত—মাংস, চুঁইঝাল পোস্তদানা, কাঁচামরিচ ও এলাচ-দারুচিনি মিলিয়ে মাংসের সম্ভাব্য উর্বর-সংঘর্ষ আন্দাজ করে, আর বিড়বিড় করে—পথিক কোথাও পথ নেই, পথ তৈরি হয় চলতে-চলতে!  তাদের মোটর দৌড়ায়—মোটরের সঙ্গে রেলের উজ্জ্বল লাইন, ঝোপঝাড়, নদীপাড়, ঘাসজমি, শেয়ালকাঁটা, গ্রামের বাড়ি, ঘুমন্ত চাদর, পুরোনো চামড়ার ব্যাগ ও সকালের কুয়াশা দ্রুত পলায়ন করে। পলায়ন অর্থ অন্য এক আর্দ্র-শীতল গ্রামে প্রবিষ্ট হওয়া ও পুনরাবৃত্তির আঘাত। বছরের বিবিধ চক্রে আমরা এইভাবে লাগাতার স্বপ্ন দেখি মাংসের ও ধ্যান মগ্ন হই নিরন্তর। লড়াই করি একঘেয়েমির সঙ্গে, ঘড়ির সঙ্গে, হৃদস্পন্দের সঙ্গে, আর সবান্ধব ভ্রমণের সঙ্গে। আমাদের ধ্যান হয়—আব্বাস হোটেলে মাংস মীমাংসার আগে, আমরা আসুন আপাত শান্ত শীতল এই গ্রামের ভেতর, বিগতকালের এক ভ্রমণবৃত্তান্তের প্রাচুর্য ছড়াই। আমাদের সবান্ধব ভ্রমণে মানুষ ও পাখির যুগপৎ শিষ ভাসে, আর যাদের মৃত্যু এসে একদিন আমাদেরকে ছিন্ন করে, আমরা তাদের শুষ্ক-হৃদয় বুঝবার জন্য মনে-মনে সুখি হই। বাংলা সাহিত্যের নিয়মিত ছাত্র, তরুণ এক পর্যটক ‘মাংস মীমাংসা’ বুঝবার জন্য চট্টগ্রামের হামিদুল্লাহ খান (১৮০৯Ñ১৮৮০)’ এর রচনাকর্ম পর্যবেক্ষণ করার প্রয়াশ পায় আন্তর্জালে—গো জাতিতে বাছুর ভালো অস্থি সে নরম/ স্বাদে পাকে ভালো আরও, দোষ তাতে কম!  হামিদুল্লাহ খান নামক জমিদার-লেখককে সহজে চেনা যায় না। বাংলা সাহিত্যের তরুণ ছাত্র তার অধ্যাপকের সঙ্গে কথা বলার ইচ্ছা করে—আর তার ব্যাকপ্যাক ও হৃদয় ক্লান্ত হয়, একা হয় এবং শুষ্ক হয়। মৃত্যু নামক ঠাণ্ডা হাত আমাদের সবান্ধব ভ্রমণের সুখ ম্রীয়মাণকরে। আমরা দরিদ্র হই—এত দরিদ্র হই যে, আমি এবং আমরা নিজেই নিজের সঙ্গে  থাকি না; জানি না, নিজের সঙ্গে একা বেড়াতে যাচ্ছি কি না। মাংস ক্ষুধা সামান্য ধূসর হয় এবং আমাদের যুক্তি ও ক্ষেপামির কাছে অনুগত হয়। মাংস অর্থ শক্তি-পুনর্জন্ম-ক্ষমতা ও যৌন আনন্দ! অতএব, নিজেরা সুপ্রচুর মাংস ভক্ষণ করতে যাই এবং প্রিয় পুরোনো বান্ধবীকে সুপ্রচুর খাইয়ে অর্গাজিমিক প্লেজার প্রতিষ্ঠা করতে চাই তৎক্ষণাৎ; অথবা প্রচুর মাংস ভক্ষণ করে অনুশোচনায় আমরা চুকনগরের রাস্তা ঘাটে বমনপর্বের ধারাবাহিকতা প্রতিষ্ঠা করতে পারি; অথবা সকল সমস্যা নিয়ে, ধোঁকা নিয়ে, লজ্জা নিয়ে আত্মা এবং বাতাসজুড়ে আমরা হতে পারি সর্বদা জীবন্ত পলায়মান। আমাদের বিশ^াসপ্রবণ হৃদয় ঝঞ্ঝাক্ষুব্ধ হয়, আমাদের দুখী চোখ তিক্ত প্রার্থনা ছড়ায় এবং দ্রুত স্পর্শাতুর হয় সাবান ফেনার মতো। 

অতঃপর আমরা নিজের সঙ্গে একা হয়ে, ক্লান্তিতে উত্তেজনার এক দীর্ঘস্থায়ী বিগতকালের ভ্রমণ বৃত্তান্তে ওজনহীন ও চলনশীল হই। আর আব্বাস হোটেলে মাংস মীমাংসা হওয়ার আগেই শরীরজুড়ে কাঁপন হয় এবং প্রাচীন এক ধ্বংসযজ্ঞের রঙ ছড়িয়ে যায় পুণ্যময় ঈশ^রের বধির ঐশীগৃহ ও লোকপরিসরে। চুকনগরের মাংসবিজ্ঞান এবং চুকনগরের ঠাণ্ডা কুয়াশায় ঘরবাড়ি দেখতে-দেখতে আমরা স্থির হই—পথিক কোথাও পথ নেই/পথ তৈরি হয় চলতে গিয়ে। এইসব বিশ্রামপ্রবণ বৃক্ষ লতাপাতার ভেতর, পথিক আসুন, আমরা চুঁইঝালের মাংস খাওয়ার আগে চলনশীল হই, আর সুযোগের সকল ফাটল দাগকে ভুল পথ হিসেবে চিহ্নিত করি। হলোকাস্ট বনাম জেনোসাইড—আমরা গুগল করি। আমাদের সবান্ধব ভ্রমণবৃত্তান্তে সৈকত, শেফালী অথবা আরেফিন অথবা কর্নেল দ্রুত একা হয় : ঈশ^র সেদিন কোথায় ছিলেন ? ২০ মে ১৯৭১—ঈশ^র এখানেই ছিলেন, চুকনগর গাঁয়ে, তাঁর আপন মহিমা নিয়ে, তিনি ছিলেন বেদনার্ত। সুন্দর ঈশ^র তাঁর পুণ্যবান বধির দুর্গের ওপর থেকে অন্তত দশ হাজার নারী-পুরুষের রক্তপাত দেখেন, যা সূর্য এবং ফসলকে যুগপৎ রঙিন করে। এই রং চলনশীল হয় এবং মানুষের স্মৃতিতে বিবিধ প্রবচন ও গানমালা নির্মাণ করে ক্রমাগত। চুকনগরের মাংস গলাধঃকরণের আগে আমাদের শেফালী অথবা জোছনা অথবা সুব্রত তাদের অকাল হত্যা হয়ে যাওয়া পিসিমা অথবা ঠাকুমার ছায়া প্রতিষ্ঠার জন্য ম্লান মুখজুড়ে রুগ্ন মুগ্ধতা ছড়ায়। অনুভব হয়—২০ মে ১৯৭১, আমাদের পিসিমা-ঠাকুমা আরও দশ হাজার উদ্বাস্তু মানুষের রক্তস্রোতে নিজেদেরকে সফলভাবে অন্তর্ভুক্ত করে। চুকনগরের ঘাস এবং মাটির ভেতর ডুবে যাওয়া মানুষের সাহসী-অনড়-সুউচ্চ মাংসের স্তূপ তাদেরকে দুখী করে, তীক্ষè করে এবং বিবমিষার প্রাচুর্য দেয়। তারা ভ্রমণবৃত্তান্তে অংশগ্রহণ করে বটে, কিন্তু হৃদয় তাদের নিয়ে যায় প্রাচীন সেই জনতা ও জরাগ্রস্ত গ্রামের ঝাঁঝালো গোপন বিষাদভূমির দিকে। কুয়াশার ভেতর ফুটে ওঠা সবুজ উঠোন ঘেঁষে, সামান্য দূরে ম্লান বীজতলা—মোটরগাড়ি এমনি এক জায়গায় এবার থামে। মেঘের ভেতর মেঘ, কুয়াশা, বৃষ্টি-ভেজা বাতাস, হঠাৎ-হঠাৎ তীব্রতম বেগুনি-নীল আকাশ আর ছড়ানো বাড়িঘর। শেফালী, সুব্রত, শঙ্কর, জোছনা, সৈকত, আহসান—জলপূর্ণ রাস্তার খানাখন্দ পেরিয়ে ম্লান-ধূসর মেঘের মতো দলবদ্ধ হয়, পৃথক হয় এবং ফোটোসেশানের অজুহাতে ক্রমে-ক্রমে ঝাপসা হয় ও উজ্জ্বল হয়। দূরের মেঘে হলুদ—দুর্বল বিদ্যুৎ এঁকে বেঁকে যায়, গির্জাঘর থেকে সুন্দরী—তরুণী-সন্ন্যাসী বেরিয়ে যায়, বুনো ফুলের শান্ত সৌষ্ঠব ভাসে—আমরা রকমারি বুনো লতা-পাতার স্বাদ নিই, ভূতের মতো পায়চারি করি, আর সরু জলের নালা পার হই। জল প্রবাহিত হচ্ছিল স্বচ্ছ, আর শব্দ হচ্ছিল অনবরত, যেন গল্প শোনাবে তৎক্ষণাৎ—এক হাজার বার বলা কথা আরও হাজার লক্ষবার পুনরুৎপত্তি হবে এমন গল্প।

 গল্পসমূহ বলা যায়, এইভাবে পূর্ণ হয়, পূর্বগামী হয়, পুরোগামী হয় এবং পুনঃপাঠের কালে হয় অন্তরঙ্গ ও গভীর নির্জন। তখন অন্তর্গূঢ় সেই অন্বেষণে যাওয়া মাঠের ভেতর বয়ে যাওয়া জলের একঘেয়েমি চুকনগরের কুয়াশা ও ঊর্ধ্বতম নীল আকাশজুড়ে একদা ২০ মে ১৯৭১-এর উদাসী দুপুর-বিকেল যন্ত্রণা ছড়ায়। আব্বাস-হোটেলে প্রবেশের আগে দেখি, অন্তত দশ হাজার মানুষ ছায়াময় ঘাস পেরিয়ে ইচ্ছার বিরুদ্ধে তখন দুখী, ক্লান্ত, চিন্তিত ও বৃদ্ধ—ঈশ^র, তুমি পুনর্বার শোনো আমাদের হৃদয়ের ডাক। ২০ মে ১৯৭১ : হৃদয় এইবেলা কাঁপে, হৃদয় ধুলোমাখা হয়, স্বপ্ন হয় এবং একা-সমুদ্র হয়। ২০ মে ১৯৭১ : ঐ ভ্রমণে অজস্র মানুষ, অন্তত দশ হাজার মানুষ—কিন্তু সবার মুখের ছায়া এক এবং অদ্বিতীয়; একই রঙ, সব রঙকে ছাপিয়ে অদ্ভুত এক রাত্রির রঙ—মৃত্যু অভিমুখী অনিঃশেষ পথ হাঁটা, দূর থেকে কেবল কালো মাথা, … নিতান্ত কালো চিহ্ন। ২০ মে ১৯৭১ : যখন কাছে পৌঁছেছি, এইসব কালো চিহ্ন দ্বিগুণ-চতুর্গুণ হতে-হতে এবার হয় মানুষের অগুণতি শরীর, সামান্য পচে যাওয়া মাংসপিণ্ড এবং অনর্গল মৃতদেহ। এখন তীব্র যুদ্ধবিরতি এবং ঈশ^রের আশীর্বাদ পুষ্ট শান্ত নীরবতা। ২০ মে ১৯৭১ : একটি পাখির আওয়াজও পাওয়া গেল না। নীরবতা এবং ধূসর শূন্যতা। এই জনপদ খানিক আগেও যা ছিল জনসমুদ্র, এখন হৃদস্পন্দনহীন, অনিশ্চিত, মুক্ত ও মৌলিক মৃত-মাংসের খামারবাড়ি। মাটি থেকে, ঘাসের আড়াল থেকে, বীজতলার ফাটল থেকে আমরা কয়েক খণ্ড প্রাচীন অনিশ্চিত রক্তভুক মাটি ও পাথরখণ্ড কুড়িয়ে স্যুভেনির করি। ২০ মে ১৯৭১ : মাত্র এক সকালেই অন্তত দশহাজার মানুষ—প্রতি মুহর্তে ভেবেছে বেঁচে উঠব, কিন্তু মুহূর্তেই মৃত্যুর সৃষ্টিশীলতায় সকল চৈতন্যের তথ্য নদীর ক্ষুব্ধ জলে বিসর্জন দিতে বাধ্য হয়। ধরা যাক, কেউ কেউ ঐ মুহূর্তে  চিঠি লিখে উড়োজাহাজের মতো, নৌকার মতো চুকনগরের ঘাস পাতার ভেতর ভাসিয়ে দেয়। সেই চিঠি বহুকাল বাদে আমরা পাই, আমরা পাই না; চিঠি উদ্ভিদ হয়, শুকোয়, লীন হয়, অথবা আগুনে ছাই ভষ্ম হয়ে আঁধার আকাশে নিশ্চিহ্ন হয়। শেফালী, সুব্রত, জোছনা—এরা ঠাকুমা-পিসিমার শেষ চিহ্ন দেখার জন্য কাউকে খুঁজে বের করে—কে জানে ঈশ^র হয়ত হতদরিদ্র রক্তপাতের প্রতিশোধ নিবে একদিন! যেন একটি বন্দুক তাক করা। আমি আমার চোখ মাটিতে নিবদ্ধ করি এবং ওপরে তাকাবো না বলে প্রতিজ্ঞা করি। আমার ভেতর দ্বিতীয় এক চিন্তা দৌড়ায়—তুমি অবশ্যই তাকাবে; বুকের ভেতর সাহস এনে তোমার তাকান উচিত সরাসরি বন্দুকের ব্যারেলে!

 আর হঠাৎ আমাদের অনুভব হয়—এই ভূমিতে আমরা ইতঃপূর্বে এসেছিলাম কখনও। কিন্তু তা ছিল অসম্ভব। অবশ্যই আমি এখানে ছিলাম না। কিন্তু সব চিনতে পারছি সহজে—চুকনগর মিউজিয়ামের কিউরেটর, অফিস রুম, ফ্লোর প্লান, ম্যাপ এবং স্ট্যাটিসটিক্যাল ডেটা দেখতে-দেখতে আমরা আবার ম্লান বীজতলা ও জীবিত-মুমূর্ষু-মৃত নরমাংসের ঘ্রাণ-চিহ্ন আবিষ্কার করি লুকানো গলার স্বরে। মৃদুমন্দ ফোঁপানি স্থির হয়, শান্ত হয় ও জীবন্ত হয়। পিঁপড়ের সেনাদল সার বেঁধে আমাদের শরীরে উঠে এবং শরীরের ফাঁকফোকরে ধূসর তাঁত বুনতে শুরু করে মাকড়সা। আমাদের জানা হয়—২০ মে ১৯৭১ : অনেকদিন অনেকবার আমরা এই পথপ্রান্তের বাসিন্দা ছিলাম; কথাটি হয়ত সঠিক নয়। কিন্তু আমাদের শতবর্ষী বুকের ভেতর গলার উচ্ছ্বাস ও চিৎকার সঞ্চয়  হয়—এই পিঁপড়ের সেনাদল, গরু গাড়ির অংশবিশেষ, এই পাথর, এই পরিষ্কার জল, এই স্বচ্ছ মূক জল …, আমাদের অনন্ত মুহূর্তের প্রতিধ্বনি, আমাদের স্মৃতি, আমাদের হৃদয় ও আত্মার পতিত প্রান্তর।

রোগা মুখে দুটি চোখ জ¦লছে, লোকটি এবার গরিব মাঠক্ষেত থেকে উঠে আসে চুকনগর স্মৃতিসৌধের সিঁড়িতে, লোকটির হাতে-বুকে-চোখের পাতায় গরিব দুখী মাটি—এত দুখী যে ওর আত্মা আছে বলে আমরা নিশ্চিত নই। সামান্য স্থির হয়ে লোকটি কথা বলে : ডুমুরিয়া থানার আটালিয়া ইউনিয়নের চুকনগর বাজারটি তখনও বেশ পরিচিত ছিল। খুলনা টাউন থেকে প্রায় এক কিলোমিটার দূরে ভদ্রা নদীর তীরে অবস্থিত। বটিয়াঘাটা, দাকোপ, সাতক্ষীরা, বাগেরহাট থেকে দলে দলে হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ এখানে জমা হয়। আমাদের খেয়াঘাটে একজন  বিহারি খান-এর সঙ্গে বচসা হয় এবং সে-ই খবর দেয় হানাদারদের। সবাই ভেবেছিল ১০-১১টার দিকে খেয়ে রওনা দিবে বর্ডারের দিকে। কিন্তু সাতক্ষীরা রোড ধরে মিলিটারি চলে আসে। বর্তমান চুকনগর কলেজ, তখন কলেজ ছিল না—কলেজের পশ্চিম পাশে ঝাউতলায় এসে পৌঁছল মিলিটারির গাড়ি। তারপর গুলি, মুহূর্তে সবাই লাশ হয়ে যায়। ভদ্রা নদী হয়ে যায় লাশের নদী। গুলি ফুরিয়ে গেলে বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করে। বৃষ্টির মতো গুলি হচ্ছিল, গাছে উঠে, পানিতে ডুব দিয়েও বহু মানুষ প্রাণ বাঁচাতে পারেনি। বরাহি গ্রামের পুষ্পরাণী কিম্বা সরস্বতী—এত দিনে বেঁচে আছে কি না জানি না। এরা লুকিয়ে ছিল পুকুরে, মাঝে মাঝে মাথা তুলতে হচ্ছিল নিঃশ^াস নেওয়ার জন্য। মাথা ভাসালেই গুলি। শিশুরাও ছিল। ওদের কান্না থামানোর জন্য পানিতে মুখ-মাথা চেপে রাখতে যেয়ে শ^াসরুদ্ধ হয়ে অনেক শিশু মরে যায়। চকরাখালীর গুরুদাসীর বাড়ি যাওয়া যায় … কী বলব, এসব কথা; … স্বামী বলিল, ছেলেমেয়ে নিয়ে এখানে আর থাকা যাবে না। আমরা চুকনগর গেলাম নৌকায়, সেখানে আমার ভাই বলরামের বউ পরবাসীর প্রসব বেদনা ওঠে। কাপড় দিয়ে ঘিরে, মেয়েবাচ্চার প্রসব হল। কাপড় ছিঁড়ে নাড়ি বাঁধলাম, বাচ্চা নিয়ে উঠলাম কালীঘরে। কিন্তু গোলাগুলির মধ্যে বাচ্চা গেল হাতছাড়া হয়ে। দশদিন পর কোনওভাবে বেইচে বাচ্চা পালাম। নাম রাখলাম জোছনা। আপনারা স্মৃতিস্তম্ভে যাওয়ার আগে, গাড়ি আছে যখন, আরও-আরও জায়গায় যাতি পারবেন—আউশখালী, কাঞ্চননগর, পুটিমারি, খড়িবুনিয়া, কাটিয়ানাংলা, হোদলবুনিয়া, বাঙ্গিমারি, শিবনগর, মাইগমারা, পরমাওয়াখালী, … কয়ডার নাম বলব ? সেদিন ছিল ২০ মে ১৯৭১, বৃহস্পতি অথবা শুক্রবার। রান্না চড়িয়েছি, পাকসেনার দুইডা গাড়ি এল। লোকজন ভয়ে ছুটোছুটি করে পুকুরে ঝাঁপায়ে পড়ে। ডুব দেয় আর মাথা ভাসায়। মাথা নজরে পড়া মানেই তক্ষণ গুলি, … আমাদের দেহের খোলে  কতখানি ব্যথা যে, অতুল সমুদ্রে ভাইসে বেড়াচ্ছি বাচ্চা কয়ডা নিয়ে তা ভগবান জানে। এরই মধ্যে অন্য এক ঘটনা ঘটিল—… তিনারা বলতেন কমিউনিস্ট দল—একরাতে পুলিনবাবু, দয়ালবাবু, ও বিষ্ণুবাবুকে কমিউনিস্টদের বিপ্লবী দলবল এদের মেরে ফেলে। তখন সবাই সিদ্ধান্ত নেয়—ঘরে-বাইরে এ কি যন্ত্রণা, এবার পালানো ছাড়া গত্যন্তর নাই। আমাদের সবার মাতায় একটা একটা বোঝা। … আমাদের বাবার একটা দোনলা বন্দুক ছিল। এই বন্দুক নেয়ার জন্য রাজাকাররা আমাদের দু’ভাইকে বাঁধে—মারতি মারতি জানতি চায়, বন্দুক কোথায় ? সব কী জানতাম ? আপনার পেশা ? তখন ছিল মুদির দোকান। আমরা পালালাম। গুলির দুমদুমা চলছিল। আমার ছত্রিশ হাজার টাকা দিয়ে কেনা নৌকাটা পুড়ে গেল। আমরা দুইভাই মিলে ২০০ লাশ নদীতে ফেলি। ঐ মরা ফেলে আমি একটা বিরাট ভয় পালাম। আবার গুলি। মা জল আনতি গেছে, আসতি আসতি দেখে ফের গুলি—গুলিতে তিনার স্বামী ও বাবার মাথার খুলি উড়ে গেছে। ওহাব মেম্বার বলি—লাশ যদি না ফেলাস তবে তোমরাই গন্ধে মরবা। …  এই শ্যাষে ফেলায়ে ঠেলায়ে পরে দেখা গেল চার হাজার বিয়াল্লিশের মতো লাশ গাঙে ফ্যাললাম। কত মানুষের বাঁশঝাড় পুইড়ে যায়। নারকেল গাছ পোড়ে। পলায়ে পলায়ে সন্ধ্যা-সন্ধ্যা বাড়ি আসলাম। বাবারে নাইড়িয়ে দেখলাম সে শক্ত হইয়ে গেছে। আমার পরিবারের কাউরে পালাম না। কেডা কোথায় গেছে তার কোনও নির্ণয় নাই। ঐ ভাবে রাতে গিয়ে থাকলাম পাশের গিরামে। কান্দাও নিষেধ। তুই যদি কান্দিস তাইলে পাকবাহিনী গুলি করবে, … আমরা তো সব মারা যাব …!

 গল্প এইভাবে বর্ণনায়-বর্ণনায় ক্লান্ত হয় ও লোকায়ত হয়—তেজি বাতাসের ঝাপটা আসে তখন—আর ঈষৎ লাল হলুদ সকাল দেখতে দেখতে দু-পাঁচটি বক চুকনগর বাজার পাড়ি দিয়ে চুকনগর স্মৃতিস্তম্ভের মাথায় রোদ পোহানোর আয়োজন নেয়। ভ্রমণবৃত্তান্তের মানবমণ্ডলী সমবেত শব্দগুচ্ছের অনুরণন আন্দাজ করে— … হে শব্দ গুচ্ছ, আমাদের বিবিধ শব্দরাজ্য, তোমাদের সঙ্গে একা কথা বলতে চাই। … আবার এটিও সত্য, তোমাদের এক্ষুণি সব কথা বলা যাবে না! এই শোন জগদীশ, সন্তোষ—কাঁদবি না, যদি কাঁন্দিস তাইলে পাকসেনারা গুষ্টি ধরে গুলি চালাবে। আমাদের পরাণে আর পানি থাকল না। আর্মির গাড়ি আসতিছে। শুধু লাশ। বাগানের ভেতর লাশের জন্য পা ফেলার জায়গা নাই। একনজরে দেখি—জল, জল এরুম করতিছে। আমি গামছা ভিজায়ে জল দি, তখনি সে মারা যায়। একজনও বাঁচতি পারেনি, সবাই লাশ হয়ে পড়েছিল। লাশ দড়ি দিয় বাঁশে বেঁধে নদীতে ফেলি। বান্দিছি আর ফেলাইছি। ভয়ে কেউ নদীতে নৌকা চালাতি পারে না। চারদিকে শুধু রক্তের গন্ধ। রক্তের গন্ধ, মাংসের গন্ধ—লাশের গভীর উপত্যকাজুড়ে এবার অন্য এক ভ্রমণবৃত্তান্ত উদ্বোধন করে; অথবা ভ্রমণপ্রেমী অথবা খাদ্যপ্রেমীদের ব্যক্তিগত ব্যাগপ্যাক ও হৃদয়জুড়ে প্রতিষ্ঠা পায় কেবল শুষ্কতা ও সন্তপ্রতিম একাকিত্ব : নদীর গর্তে ২০ মে, ১৯৭১, যদিও মানুষ গুলিবিদ্ধ হওয়ার ভয়ে লুকোয়, তখন দিন জ্যৈষ্ঠ মাস আর জ্যৈষ্ঠ মাসে লোনার সময়ে কুমীর আসার সম্ভাবনা হয়। এই কুমীর-সম্ভাব্য নদীতে মৃতদেহ শ্যাওলার মতো ভাসে—এই ছবিটি জানা থাকলেও লাশ এখানে জোয়ার-ভাটার গোনে কেবলই দিন-রাত ঘুরে-ঘুরে বেড়ায়। ভ্রমণশীল লাশ অন্য এক আশীর্বাদ, অন্য এক প্রস্ফুটন, অন্য এক স্থাপত্য তৈরি করে নদীর জলে। ডুবন্ত মানুষের পরিধেয় বস্ত্র জলে ভেসে যায়। জলে ভেতর রক্ত সঞ্চয় হয় এবং জল হয় রক্তাক্ত। যখন গুলি হয়, তখন চুলায় ভাত প্রায় শেষের দিকে। ভাত পুড়ে যায় অথবা নিভু-নিভু আগুনে ক্ষয় হয়ে ভাতের ওম বেঁচে থাকে আত্মার ভেতর। আত্মার ভেতর মানুষের শব্দ এবং মৃত মাংসের শেষ নিঃশ^াস ঘণ্টাধ্বনি হয়—ওরে ভাইরে, আমার এই নাড়িটা ভিতরে ঢুকায়ে দেও। দৃশ্য এমন হয়—লোকটি জলের ভেতর ঘুরে-ঘুরে অবশেষে সূর্যের শুদ্ধতম আলোর দিকে মুখ ফিরিয়ে নিশ্চিন্ত হয়। একটি লোক এমন হয়—যেন জীবিত, বেড়ার গায়ে হেলান দিয়ে, কিন্তু গায়ে হাত দেওয়ামাত্র খোলামকুচির মতো শরীর গুঁড়িয়ে যায়।

দৃশ্য এমন হয় যে,—মরার ওপর দিয়ে হাঁটি আসলাম। শিশুরা কানলি গুলি করবে সেজন্য বাচ্চারে কোলেরতে ছাইড়ে দিছে জলে। ছটফট কইরে ডুবে গেছে তারা। দৃশ্য এমন হয়—আমি যখন জল খাচ্ছিলাম তখন একটা কিছু আমার সামনে এসে পড়ল, আমি মনে করলাম কি জিনিস, এইটা তুলে দেখি নোড়ার মতো গুলিটা। বলা যায়—এইভাবে মৃতেরা অবশেষে মারা যায়, মৃতেরা বোবা হয়, ঘণ্টাধ্বনি হয় এবং ছায়ার ভেতর স্বচ্ছ পথ আঁকে। মৃতেরা এই পথ বেয়ে হয় রসবালা গাইন, রুহিদাস চন্দ্র রায়, মুকুন্দ বিহারি, চাঁদরাণী দাস, আয়নামতি, গোলাপজান, সঞ্জিব গাইন, নরেন্দ্রনাথ গাইন ও জগন্নাথ বালা; আর নদীর জলে ভেসে বেড়ানো তাদের হাজার-লক্ষ লাশ-মাংস, রক্ত অবশেষে, সন্তপ্রতিম সুখি মানুষদের আত্মায় এমন এক স্বপ্নচারী জ্ঞান ছড়ায়—যেন মৃত্যুর তীব্র লাল গন্ধ কদাচিৎ ক্ষমাশীল হয়। স্বপ্নচারী জ্ঞান আমাদেরকে প্রেমময় করে, স্বচ্ছ করে, ধৈর্যশীল করে এবং স্বাধীন-পলাতক করে। স্বপ্নচারী জ্ঞান আমাদের আকাশ ও পৃথিবী অভিমুখী করে, এবং ভদ্রা নদীতে গভীর জলে বেঁচে থাকা মাংসভূক মাছ সম্পর্কে বিবমিষা জাগায়।

আমাদের ক্ষুধামন্দা ক্রমে-ক্রমে নদী তটের শামুকের গন্ধের মতো আরও বহুদূর পর্যন্ত ছড়ায়। আমাদের জীবন ভারহীন হয় এবং আমাদের আত্মা ভাবে প্রজাপতির কথা। চুকনগর বাজারের মাংসে দাঁত বসে, চুঁইঝালে জিহ্বা-দাঁত উষ্ণ-চঞ্চল হয় এবং দ্রুত বিক্ষিপ্ত হয়। সুপ্রচুর মাংস গ্রহণের প্রতিজ্ঞা সত্ত্বেও ম্লান হলুদ এক তিক্ততা আমাদের আত্মাকে ধূসর করে। আকাশের তলার রাস্তা, চুকনগরের বিস্তীর্ণ শূন্য চৌরাস্তা এবং হোটেল সংলগ্ন ধুলোভরা পাতিলেবুর গাছ—শরীরে প্রবিষ্ট মাংসের এই তীব্র গন্ধ কোনওভাবেই জব্দ করতে পারে না। শব্দময় ঘড়-ঘড়ে ট্রেন যাত্রার মতো বিচ্ছিন্ন, ছায়াময় বিগতকালের এক বৃত্তান্তে তারা হয় দুখী ও নির্বাপিত। আর চুকনগর হোটেলের মাংস বিষয়ক প্রেম-মধু ও সঙ্গীতময়তার ফোটোগ্রাফ নেওয়ার ইচ্ছা তারা কপালের ভাঁজে সঞ্চয় করে নিজস্ব সজাগ পবিত্র খোলসে।

 মাংস মীমাংসার অভিজ্ঞান, বলা যায়, এইভাবে একদিন প্রতিষ্ঠা করে, গভীর-নির্জন এক স্বীকারোক্তি—আজ দুঃসময়; কিন্তু আগামীকাল, … সে আমার গরিব-কুশ্রী-কুৎসিত মাংসপিণ্ডের সামাজিক-অর্থনীতি এবং চুইয়ে নামা ক্ষতের রক্ত আমাদের সজাগ ও স্বচ্ছ করে। আমাদের মৃতেরা মারা যায় এবং ছায়ারাজ্য সরে যায়। আমাদের গেলাসেরা পান করবার কাজে লাগে, কিন্তু তৃষ্ণা কিসের কাজে লাগে ? বলছ তুমি—কিছুই খোয়া যায় না, সম্ভবত ঠিকই বলছ; কিন্তু আমরা সবই হারাই, আর সবাই হারায় আমাদের। সবকিছু চলে যায়, সব কিছু থাকে। কিন্তু আমাদের শুধু যাওয়া—ফিরে যাওয়ার রাস্তা তৈরি করতে-করতে আমরা এবং আমাদের পূর্বপুরুষেরা এইভাবে একদিন জীবাশ্ম হয়, একদিন নোঙর হয়, একদিন ঈশ^র হয়, একদিন নিদ্রামগ্ন হয়, একদিন চিৎকার করে স্বপ্নে, একদিন বেপরোয়া হয় এবং আর্শিহীন হয়। ঈশ^রের সঙ্গে কথা বলতে বলতে দেখি—প্রথম আঘাতেই আমার মৃত্যু। পাথুরে মাটির ভেতর আমার শবদেহ। বড় কাক ও শকুন বাবা মাকে শেখাল, কী করতে হবে ? আমার পরিবার যদি খ্যাতিমান হয় কখনও, সেই গৌরব আমি পাই না, আমার ভাই আমাকে খুন করার পদ্ধতি আবিষ্কার করে। আমার পিতামাতা আবিষ্কার করে শোক প্রকাশের নিয়মনীতি। আমি আবিষ্কার করি নীরবতা ও নৈঃশব্দ। অবশেষে একদিন এইসব নিয়ম-পদ্ধতি একের পর এক কার্যকরী হতে শুরু করে, আর আমাদের আবিষ্কারসমূহ পথ খুঁজে পায়। একজন সুনিপুণ পদ্ধতিতে হত্যা করল, আর অপরজন গভীর নিষ্ঠায় নিজের পদ্ধতিতে শোক প্রকাশ করল। সবার নাম আমি বললাম না। তুমি মারা যেতে পার, একবার, দু’বার, হয়ত পর পর। কিন্তু হাজারবার নিশ্চয় নয়। ২০ মে ১৯৭১, আমি ও আমরা মারা যাই হাজার-লক্ষবার। আমার ভূগর্ভস্থ কোষ এখন নিদ্রামগ্ন ঈশ^রের পৃথিবী ও আকাশের সর্বত্র। পথিক অতএব কোথাও পথ নেই, পথ তৈরি হয় চলতে গিয়ে, চলতে গিয়ে তৈরি হয় পথ … পথিক তোমার পথ শুধু চিহ্নমাত্র। আর এই ভাবেই আমাদের সকল যুদ্ধ শেষ হয়—একবার স্বপ্নে ঈশ^রের সঙ্গে, আর একবার জেগে সমুদ্রের সঙ্গে, আমাদের বিস্তর যুদ্ধ হয়েছিল একদিন, যখন সকল ইতিহাস ও রক্তমাংসের আঁশ আমরা গলাধঃকরণ করি অজান্তে অবলীলায়।

সচিত্রকরণ : শতাব্দী জাহিদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may have missed

shares