ইস্কুলের কাছে এলেই তার বাপের নামের কথা মনে হয়। কিংবা তার সামনে দিয়ে ছেলেরা যখন ইস্কুলে যায়।

‘বাপের নাম-পরিচয় যে কত দরকার’।

দুলাল অবশ্য পরে বুঝেছে, ইস্কুলে ভর্তি ছাড়া আর কোনও কাজেই বাপের নাম লাগে না। তার অন্তত লাগেনি। সে দিব্যি লোকমানের দোকানে কাজ করছে, খাচ্ছে-দাচ্ছে-ঘুমাচ্ছে।

ইস্কুলে ভর্তি হওয়া তার আর হয়নি।

মাস্টারের কথা শুনে কী জানি কেন মায়ের মুখটা কালো হয়ে গিয়েছিল। হাত ধরে টানতে টানতে নিয়ে এসেছিল ছেলেকে বাড়িতে ফিরিয়ে।

দুলাল অবশ্য ইস্কুলে ভর্তি হবার জন্য মোটেই ব্যাকুল ছিল না। মায়েরই বরং ইচ্ছেটা ছিল তীব্র। ছেলে মানুষ হোক।

ইস্কুলে ভর্তি হওয়া হয়নি। কিন্তু তখন থেকেই বাপের নাম জানার একটা প্রবল ইচ্ছা শিকড় গেড়েছে দুলালের বুকে। মাকে জিজ্ঞেস করা হয়নি। মায়ের মুখে গনগনে চণ্ড রাগ দেখে সেই বয়সেই বুঝে গিয়েছিল মাকে সেকথা জিজ্ঞেস করা যাবে না। নানা অর্থাৎ ফকির মিয়াকে জিজ্ঞেস করেছিল সে, তার বাপের নাম জানে কি না।

নানা জানে না। জানবে কী করে ? সে তো মায়ের জন্মদাতা নানা নয়। দেশ স্বাধীনের আগে ফকির নানা চিনতই না তার মাকে। দেশ তখন কেবল স্বাধীন হয়েছে। দেশজুড়ে তখনও কান্না, ওলটপালট। কার স্বজন ছিটকে কোথায় গেছে তার ঠিক নেই। মানুষের শরীরে তখন পাকিস্তানি সৈন্যদের অত্যাচারের জখমের দাগ। মানুষের মনে তখন খানসেনা-রাজাকারদের নখচেরা দগদগে ঘা। ছেলে ফিরে আসেনি বলে রাতের বাতাসে আহাজারি তুলে বিলাপ করে লক্ষ লক্ষ মা। বোন হারিয়ে গেছে বলে কলজে থাপড়ে হাহাকার করে ভাই। গাছ পোঁতার জন্য মাটিতে কোদালের কোপ বসালেই উঠে আসে মানুষের আধপচা শরীর, হাড়-গোড়। যুদ্ধফেরত মানুষ বাড়ি ফিরে দেখে ঘর নেই, আছে শুধু মুঠো মুঠো ছাই। সেই রকম সময়ে এক সন্ধ্যায় ফকির আলি ভিক্ষে করে তার ঘরে ফিরে দ্যাখে বাঁশের খুঁটিতে হেলান দিয়ে বসে আছে এক পাগলি। কোনও কথার উত্তর দেয় না। নিজের মনেই বিড়বিড় করে। কেঁদে ওঠে হাউমাউ করে। হেসে ওঠে খলখলিয়ে। খেতে বললে খায় না। খেতে দিলে খানিক খায় খানিক ছড়ায়। কিন্তু পাগলির গা-জুড়ে মাতৃত্বের গন্ধ। যুদ্ধের বিজয়ে তখন সবার মনই নরম। ফকির আলির তো চিরকালই। মাতৃগন্ধ তাকে আরও উদ্বেল করে। ফকির আলি হাত ধরে ঘরে ঠাঁই দিল পাগলিকে। গাঁ হাতড়ে ডেকে আনল দাই, আনল মধু, তেল, মালসা ভর্তি আগুন। সারারাত নির্ঘুম তিনটি প্রাণী।

‘ভোর বেলাত তুই হলু। কান্দে উঠলু নাড়ি কাটার সাথ সাথ।’

আর আশ্চর্য, যেমনি বাচ্চাকে কোলের কাছে শোয়ানো হলো, আর মুখে গুঁজে দেওয়া হলো মাই―তখন থেকে, সেই মুহূর্ত থেকেই পাগলি একেবারে সুস্থ। যেন মুহূর্তের মধ্যে কেটে গেল দুষ্ট জিনের আছর।

‘তখন থাকেই তো তুমি, হামি আর হামাগোর মা একসাথত আছি। কুনোদিন জিজ্ঞাসা করি নাই তোর বাপ আছে নাকি মরি গেছে ? নাম কী তার ? হামি কিছুই জিজ্ঞাসা করি নাই। তুইও জিজ্ঞাসা করিবেন না ভাই। তোর মা কইতে চায় না।’

সে জিজ্ঞেস না-করলে কী হবে, গাঁয়ের লোকে জিজ্ঞেস করতে শুরু করল। এতদিন করেনি। এতদিন তারা মিশে ছিল গাঁয়ের স্বাভাবিক প্রবাহে। গাঁয়ে-গঞ্জে পথের পাশে কয়টা আগাছা জন্ম নিচ্ছে বা বেড়ে উঠছে কেউ তা খেয়াল করে না যেমন, তেমনি। কিন্তু গাঁয়ের লোকের সামনে প্রশ্নটাকে খাড়া করে দিল ইস্কুলের মাস্টার। সব প্রাইমারি ইস্কুলের মাস্টাররা যেমন হয়, সবলের সামনে মিউ মিউ, দুর্বলের সামনে হালুম; ওপর-ওপর গম্ভীর, কম কথা বলা কিন্তু আসলে কুটনি বুড়ির মতো পেট পাতলা সে-ও। নিজে নোংরামি করার সাহস বা উপায় কোনওটাই নেই, তাই অন্যের নোংরা ঘাঁটতে খুবই উৎসাহী এরা। মাস্টারের মুখ থেকে দপ্তরি-পিয়ন, তার বউ থেকে পাড়ার বউ-ঝি এবং এক সময় গোটা গাঁয়ের প্রশ্ন―তাই তো, ছোঁড়ার বাপ কে বটে! এবং তখনই সবার খেয়াল হয়, ছোঁড়ার চোখ তো কালো নয়, পিঙলা, যাকে বলে ‘কটাসে’। আর গায়ের রঙও কালো বা তামাটে নয়―ফ্যাকাসে সাদা―‘কুত্তার বমির নাহাল ফ্যাকসা’। তার মায়ের এই গাঁয়ে পদার্পণ এবং তার জন্মের সময় নিয়ে গবেষণা করতে করতেই এক সময় মানুষ আবিষ্কারের আনন্দে সিদ্ধান্ত নিল―ও, মানে দুলাল আসলে খানের পোলা। খান মানে খানসেনা অর্থাৎ পাকিস্তানের সৈন্য। একাত্তরে যারা এসেছিল।

হঠাৎ একদিন গাঁ-জুড়ে চাপা থমথমে আবহাওয়া। কয়েকজন মিলিটারি নাকি মেরে ফেলেছে জাতির পিতাকে। মিলিটারি! সেই খানসেনাদের মতোই ওরা! যেহেতু এ গাঁয়ের মানুষ খানসেনা ছাড়া আর কোনও মিলিটারি চোখে দ্যাখেনি, বাঙালি মিলিটারি যে থাকতে পারে, তা তাদের জানা নেই। মিলিটারি যখন ‘শ্যাখের পুয়াক মারি ফালাছে, তাহলে দেশটা নিশ্চয়ই এখন আবার পাকিস্তান।’ গর্ত থেকে বেরিয়ে আসা তিনপ্রহরের শেয়ালের মতো সে রাতে গাঁয়ে আওয়াজ উঠল―‘পাকিস্তান জিন্দাবাদ।’

পরদিন সকালে দেখা গেল গাঁয়ের বুড়ো আমগাছে গলায় শাড়ির পাড় পেঁচিয়ে ঝুলছে দুলালের মা।

বানে আর কয়টা মানুষ ভেসে যায়! তার চেয়ে ঢের ঢের মানুষ বিনা বানে ভেসে বেড়াচ্ছে সারাদেশে।

দুলালও।

মা মরার দুই বছরের মধ্যেই মরে গেল ফকির আলিও।

দুলালকে কিছু করতে হয়নি। কিছু করার বুদ্ধি বা ক্ষমতাও ছিল না তার। গাঁয়ের লোকজনই চাঁদা তুলে দাফন-কাফন করল। মসজিদে সিন্নি পর্যন্ত দেওয়া হলো। কালাম চেয়ারম্যান ছিল আগে আগে। বেঁচে থাকতে কেউ না-দেখলেও মরা মানুষকে কবরে ঠেসে দেবার লোকের অভাব এ দেশে হয় না। আর যেখানে স্বয়ং চেয়ারম্যান এগিয়ে এসেছে। কেন তা কে জানে ?

জানা গেল কয়েকদিন পরেই।

ফকির আলির ভিটে নাকি আসলে কালাম চেয়ারম্যানেরই। সে থাকতে দিয়েছিল বেচারা ভিখিরিকে। কিন্তু এখন সে বেঁচে নেই। বাপের নাম-পরিচয়হীন একটা ছেলের জন্যে তো আর কালাম চেয়ারম্যান ভিটেটা ফেলে রাখতে পারে না। কেউই দলিল দেখতে চায়নি। সন্দেহ হলেও। প্রতিবাদ করা কী জিনিস তা কোনওদিন শেখায়নি কেউ দুলালকে। দয়া চাওয়াও না। শুধু সাড়ে সাত বছরের বালক, তাকে যখন ঘর থেকে চলে যেতে হলো, ভাষাহীন চোখে চেয়ে থাকল কিছুক্ষণ চেয়ারম্যানের দিকে। বলল―হামি কোন ঠিয়ে থাকমো!

আল্লার ঘর সবার জন্য খোলা। দুনিয়ার সব দরজা বন্ধ হলেও তাঁর ঘরের দরজা কারও মুখের ওপর বন্ধ হয় না। আর খাদ্য! মুখ দিয়েছেন যিনি, আহার দেবেন তিনি। নোয়াখালির আঞ্চলিক ভাষায় এইসব কথা বলে পরম স্নেহে দুলালকে বুকে জড়িয়ে গাঁয়ের মসজিদে নিয়ে গেলেন ইমাম হুজুর। নিজের ভাগ থেকে ভাত খাওয়ালেন। শুতে দিলেন নিজের হুজরায়। দুলালের মনে মায়ের শোক বেশিদিন থাকেনি। ফকির আলির শোকও না। ঘর হারানোর শোক তো উপলব্ধিতেই আসেনি। খেতে পেয়ে এবং শুতে পেয়ে আর কী চাই! এবার ঘুম।

তারপরে আর সেই ঘরে যায়নি কখনও দুলাল। কাউকে বলেনি সে কথা। ঝটপট ভুলে যাবার অভ্যেস আছে তার। কিন্তু এই ব্যাপারটা ভুলতে বহুদিন লেগেছিল। ঘা ফুটেছিল পায়খানার রাস্তা ফেটে যাওয়ায়। পায়খানা করতে গেলে চোখে পানি এসে যেত ব্যথায়। হাঁটতে হতো কানিবকের মতো ঠ্যাং ফাঁক করে।

তারপর থেকে দুলাল লোকমান মিয়ার দোকানে।

অনেক বছর কাটল তার এই দোকানে। সাড়ে সাত বছরের কিশোর থেকে বাইশ বছরের তরুণ। খুব অশক্ত তরুণ। গায়ের চামড়া আর সাদা নেই। ঘাম, আগুনের তাপ আর ময়লার আস্তরণ পড়তে পড়তে কালচে হয়ে গেছে চামড়া। কটাশে চোখের মণি অবশ্য ঠিকই আছে। কিন্তু চোখের সাদা জমিন ঘোলাটে জন্ডিস রঙা হয়ে আবছা করে দিয়েছে পিঙলাকে।

ভাবনা-চিন্তা-দুঃখ কিছুই নেই দুলালের। সারাদিন হোটেলের কাজ করে। ভোরে উঠে চুলায় আগুন দেয়, খদ্দেরের সামনে এগিয়ে দেয় চা-লুচি-শিঙাড়া, এঁটো কাপ-প্লেট ধোয়। তিনবেলা খাওয়া হোটেলেই। আবার রাতে ঘুমানোও। তাকে কোনওদিন বেতন-কড়ি দেয়নি লোকমান। সে-ও চায়নি। তবে লুঙ্গি-গামছা-সেকেন্ডহ্যান্ড মার্কেটের গরম কাপড়, খদ্দরের চাদর দিয়েছে লোকমান। অর্থাৎ দুলাল কাজ করে চলে নীরবে, বিনিময়ে ভরণ-পোষণের দায়িত্ব পুরোটাই তার মতো করে পালন করে লোকমান।

এভাবেই বেঁচে আছে একজন দুলাল। তার কোনও উচ্চাকাক্সক্ষা নেই। তারুণ্য বা যৌবনের কোনও চাহিদা নেই। তার শৈশবের কোনও সুখস্মৃতি নেই। তার ভবিষ্যতের কোনও ভাবনা নেই। কোনও স্বপ্ন নেই। স্বপ্নভঙ্গের কোনও আতঙ্কও নেই।

তবে তার একটা ভীতি আছে। কালাম চেয়ারম্যান।

কেন কে জানে, চেয়ারম্যান পিছু ছাড়েনি দুলালের।

চেয়ারম্যান তাকে ফকির আলি নানার ভিটে থেকে খেদিয়েছে, এ নিয়ে তার কোনও ক্ষোভ নেই। কোথাও সে কোনও অনুযোগও করেনি। আসলে অনুযোগ জিনিসটাই তার ধাতে নেই। প্রাকৃতিকভাবে সে বুঝে গেছে, ক্ষোভ-অনুযোগ-অনুরোধ জানানোর মতো কোনও জায়গা তার নেই। সবকিছু যেভাবে চলছে, সেভাবে মেনে নিয়েই জীবনযাপন করতে চায় সে। কিন্তু হঠাৎ হঠাৎ চেয়ারম্যান এসে একটা করে ঝড় তোলে তার প্রায় অর্থহীন জীবনে।

ঘর থেকে তাড়িয়ে দেবার বেশ কয়েক বছর পরে তাকে প্রথম ডেকে পাঠিয়েছিল চেয়ারম্যান। চামচা মোজাম্মেল ওরফে মোজা মেম্বার এসেছিল লোকমানের দোকানে তাকে ডাকতে। লোকমান জিজ্ঞেস করেছিল, কী দরকার। মোজা মেম্বার বলতে চায়নি। কিন্তু চায়ের আপ্যায়ন একসময় ফস করে তার মুখ আলগা করে দিয়েছিল।

বিদেশ থেকে নাকি সাহায্য এসেছে বিহারিদের জন্য। জেনেভা না চীন কোত্থেকে যেন। বিহারিদের প্রত্যেককে দেওয়া হবে একটা করে রেশন কার্ড। সেই কার্ড দেখিয়ে মাসে মাসে তারা পাবে চাল, গম, কাপড় আর টাকা। দুলালকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে তার নামে একটা রেশন কার্ড বরাদ্দ করানোর জন্য।

কিন্তু দুলাল তো বিহারি নয়!

ছ্যাবলা হেসে মোজা মেম্বার বলেছিল, ঐ একই কথা। বিহারি না হলেও বিহারির পোলা তো বটেই। আরে খান সেনার পোলা আর বিহারির পোলা তো একই কথা।

দুলাল গেল চেয়ারম্যানের অফিসে। টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে টিপসই দিল কাগজে। তারপর চলে এল। কিন্তু আজ পর্যন্ত কার্ড পায়নি দুলাল।

লোকে বলে, কার্ড আছে চেয়ারম্যানের কাছে। রেশন যায় তারই ঘরে। যাবেই তো। কার্ড যার হাতে, বিদেশি সাহায্য তার ঘরেই তো যাবে!

দুলাল অবশ্য এ নিয়ে মোটেই ভাবেনি। চেয়ারম্যানকে তার ভীষণ ভয়। একটা অশুভ শক্তির মতো চেয়ারম্যানকে এড়িয়ে চলতে চায় সে। সামনে হাজির হয়ে যা তাকে করতে বলা হয়েছে, সে তা করে গেছে বিনা প্রশ্নে। কার্ড পাবে কী পাবে না এ ব্যাপারে কোনও চিন্তাই সে করেনি। তার তো লোকমানের দোকান আছেই।

কয়েক বছর পরে আবার ডাকল তাকে চেয়ারম্যান। তখন এই ‘জেলারই পুয়া’ নাকি ‘দ্যাশের আজা’। সেই রাজা নাকি গরব―ভূমিহীনদের খাস জমি দিচ্ছে। শুধু জমিই নয়, জমিতে ঘর তুলেও দেওয়া হচ্ছে ভূমিহীনদের জন্য সরকারি টাকায়। ধন্য রাজা ধন্য।

চেয়ারম্যানের ঘরের সামনে আরও অনেক ভূমিহীন। সবাই জমি চায়। ভিড়ের দেয়াল চিরে মোজা চামচা তাকে সোজা নিয়ে গেল চেয়ারম্যানের খাস কামরায়। চেয়ারম্যানের সঙ্গে দুজন সায়েব। তার মুখে অভয়দানের হাসি। দুলালকে দেখিয়ে সায়েবদের বলল―‘এই পুয়া হামাগোর গাঁয়ের এক লম্বর ভূমিহীন। আত্মীয়-স্বজন নাই। হাট-বাজারত পড়ি থাকে। হামরা অ্যানা না দেখিলে একখান যুবকের জীবন ধ্বংস হয়া যাইবে। অথচ যুবশক্তিই হলো দ্যাশের ভবিষ্যৎ!’

বটেই তো। মাথা নাড়লেন দুই সায়েব।

‘টিপসই দাও!’

নকশা কাটা একটা কাগজ বের করল মোজা মেম্বার। খোপ খোপ দাগে ভর্তি ঝকঝকে কাগজ। তার নাম ম্যাপ। আঙুল দিয়ে দেখাল এক জায়গায়―‘এই হইল তোর ঘর। দশ হাত বাই বারো হাত। আর কী চিন্তা বাহে! এইবার অ্যানা বিয়া করি ফালাও।’

হেসে উঠল ঘরের সবাই।

লজ্জা পাওয়ার কথা। কিন্তু ভয়ে কুঁকড়ে গেল দুলাল।

চেয়ারম্যানের হাসি হাঙরের মতো।

চেয়ারম্যান এখন আর জোয়ান নেই। দাঁত ঝরে পড়ে গাল ঢুকে গেছে মাঢ়ির ফাঁকে ফাঁকে। পেচ্ছাপে চিনি। শরীর মাঝখান থেকে দুইভাঁজ। হাসলে বুড়ো হায়নার মতো দেখায়। চেয়ারম্যানের হাসি মানেই তার দুর্গতি।

টিপসই দিয়ে চলে এল দুলাল। সে এখন পুরো একটা ঘরের মালিক।

লোকমান জিজ্ঞেস করে―‘কী বলিল চেয়ারম্যান?’

‘ঘর দিল।’

‘ঘর! তুমাক ?’

‘হ্যাঁ বাহে।’

‘কুন ঠিয়ে ?’

মাথা চুলকায় দুলাল, কাগজের ঠিক কোন জায়গাটা যে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছিল মোজা মেম্বার, তা আর মনে নেই তার। হো হো করে হেসে ওঠে লোকমান―‘কাগজের মধ্যে ঘর! কাগজের ঘর!’

কাগজের ঘর আর চোখে দেখেনি দুলাল।

শোনা যায় গুচ্ছগ্রামে উঠেছিল কিছু ঘর। কিন্তু সব এখন চেয়ারম্যানের দখলে। চেয়ারম্যানের মুনিষ-কিষাণ থাকে। লোকমান একদিন মোজা মেম্বারকে জিজ্ঞেস করেছিল দুলালের ঘরের কথা। মোজা গম্ভীর গলায় বলেছিল―‘চেষ্টা তো হামরা কম করলাম না বাহে, কিন্তু বাতিল হইয়া গেল। বুঝলা না, যার বাপের নাম সে নিজেই জানে না, তাকে কী করিয়া গরমেন্ট জমি দিবার পারে!’

লোকমান দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে।

কিন্তু দুলাল নির্বিকার। চেয়ারম্যান ডেকেছিল, সে গিয়েছে। টিপসই দিতে বলেছে, দিয়েছে। চেয়ারম্যান যে তাকে ধরে কাঁচা চিবিয়ে খায়নি, এতেই সে খুশি। আর সে ঘর নিয়ে করবেই বা কি! লোকমান তো আর তাকে তাড়িয়ে দেয়নি। দোকানের মেঝেতে চাটাই বিছিয়ে তার রাত কেটে যায়। শীতে পিঠের নিচে একটু খড়-পোয়াল পেলেই হলো। দিব্যি ঘুম হয় তার।

কিন্তু সেই ঘুমেও একদিন বাধা পড়ল।

দোকান বন্ধ করে লোকমান চলে গেছে বাড়িতে। মেঝেতে চাটাই বিছিয়ে কেবল ঘুমের আয়োজন। শুতেই যা দেরি। সঙ্গে সঙ্গেই ঘুম নেমে আসবে তার চোখে। হঠাৎ ধাক্কা পড়ল দোকানের ঝাঁপে। অসহিষ্ণু ধাক্কা। চাপা গলায় কেউ ডাকল―‘এই দুলাল! এই খানের বাচ্চা!’

দুলাল অন্ধকারের মধ্যেই চোখ বড় করে তাকায়―‘কে বাহে?’

‘তোর বাপ! ঝাঁপ খুলেক হারামজাদা!’

ঝাঁপ খুলতেই হুড়মুড়িয়ে ঢোকে তিনজন। চেনা। চেয়ারম্যানের ছেলে এবং তার দুই সাঙাত। চেয়ারম্যানের ছেলে আবছা অন্ধকারে পরখ করে দোকান ঘরটা। সমঝদারের ভঙ্গিতে মাথা নাড়ে। তার কাজ চলার মতো জায়গা। অন্য দুইজন আগেই সেকথা বলেছে। চেয়ারম্যানের ছেলে বিছানো চাটাইয়ে বসে জুৎ হয়। সিগারেট ধরায়। দুলাল দাঁড়িয়ে থাকে একপাশে। ওরা ভ্রƒক্ষেপ করে না। একজন বাংলামদ ঢালে। অন্যজন ঘুগনি, রুটি-মাংস বিছায়। তারপর বেরিয়ে যায় দুজনেই। গেলাস গলায় খালি করে চেয়ারম্যানের ছেলে দুলালকে উদ্দেশ্য করে বলে―‘যা দেখিবার পাবু তা কিন্তু মুখ ফাঁক করিয়া কাউরে কইবি না, বুঝলু ?’

উত্তর দেয় না দুলাল।

এবার ধমকে ওঠে চেয়ারম্যানের ছেলে―‘কী কইলাম, কানে গেছে ?’

‘হ্যাঁ। কবো না বাহে!’

প্রসাধনীর গন্ধ ভেসে ওঠে দোকানের গুমোট বাতাসে। সস্তা। তবু রমণীসুলভ। দুলাল চমকে ওঠে। চাপা নারীকণ্ঠ ভেসে ওঠে। নারী অনুযোগ করে অন্ধকারে কিছু দেখতে না পাওয়ার, কবরের মতো অন্ধকারে তাকে এনে ঢুকানোয়। একজন উত্তর দেয়, এসব কাজের জন্য অন্ধকারই তো দরকার। নারী কোলঘেঁষে বসে চেয়ারম্যানের ছেলের। মুখ দেখতে পায় না দুলাল। কিন্তু খুব চেনা মনে হয় তাকে। মনে করতে পারে না। মনে করার চেষ্টাও তেমন করে না।

চেয়ারম্যানের ছেলে চমসম করে কামড়-চুমো খায় মেয়েটাকে। সাঙাত দুইজন বাইরে গিয়ে দাঁড়ায়। ঝাঁপ ভিড়িয়ে দেয়। নারীর চোখে পড়ে ঘরের এককোণে খুঁটির মতো দাঁড়িয়ে থাকা দুলালের দিকে। অনুযোগ করে। চেয়ারম্যানের ছেলে কড়া ধমক লাগায়―‘দাঁড়ায় দাঁড়ায় কী দেখিস হারামজাদা! যা ভাগ, বাইরোত দাঁড়া!’

মেয়েটা বোধ হয় একটু লজ্জা পায়। আবার আদুরে অনুযোগ করে, অজানা একটা লোককে সাক্ষী রেখে এসব করাটা একটু লজ্জারই। বিপদেরও।

ঝাঁপ আলগোছে আলগা করে বাইরে যেতে যেতে দুলাল শুনতে পায়, চেয়ারম্যানের ছেলে বলছে, ‘ধুস ঐ শালা কী একখান মানুষ! ঐ খানের বাচ্চা এগুলান কিছুই বুঝে না। শালার মাথাও নাই, ঐডাও নাই, আছে অ্যাকনা প্যাট।’

একটু অন্যরকম উষ্ণতা আসে গাঁয়ে। কিছু মানুষ নিয়ে আসে উষ্ণতা। গাঁয়ে দেখা যায়, পায়জামা-পাঞ্জাবির ওপর কালো বগল-কাটা সোয়েটারের মতো একটা কাপড় পরে বেড়াচ্ছে কয়েকজন মানুষ। এতদিন নাকি এই গাঁয়ে অলিখিতভাবে নিষিদ্ধ ছিল এই কাপড় পরা। পঞ্চাশ-ষাটজন জোয়ান ছেলে আর প্রৌঢ় মিছিল বের করে। মুখ বাঁকায় মোজা মেম্বার আর তাদের লোকেরা। লোকমানের দোকানে চা খেতে খেতে ফিসফিস করে প্রৌঢ় মানুষেরা। তাদের চোখে উত্তেজনার ঝিলিক। কেউ কেউ বলে―আবার ফিরে এসেছে মুজিব কোট। আবার জেগে উঠেছে শেখ মুজিব। লোকমান সাগ্রহে তাকিয়ে থাকে তাদের দিকে।

হাটের ঠিক মাঝখানে এক সকালে শামিয়ানা টাঙানো মঞ্চ ওঠে। মাইকে গমগম করে বেজে চলে একটা বজ্রগম্ভীর কণ্ঠ। দুলাল, যার কি না কোনও কিছুতেই কোনও প্রতিক্রিয়া হয় না, সেই দুলাল পর্যন্ত কী জানি কেন ছটফট করে সেই কণ্ঠ শুনে। কী যেন একটা ঘটছে তার ভেতরে। রক্তের মধ্যে কীসের যেন ফল্গুস্রোত কলকলিয়ে উঠতে চায়। তাকে শনাক্ত করতে পারে না দুলাল। তার ছটফটানির মাত্রা আরও বেড়ে যায়।

দেয়ালে দেয়ালে পোস্টার পড়ে। লোকমানের দোকানেও পোস্টার সেঁটে যায় খুব দৃঢ় চোয়ালের একদল যুবক। বড় সাইজের পোস্টার। মাঝখানে একজন বিশালদেহী মানুষের ছবি। তর্জনি তার উঁচু করা অসীমের দিকে। দুলালের খুব চেনা মনে হয় তাকে। কাজের ফাঁকে ফাঁকে বারবার তাকায় ছবির শালপ্রাংশু মানুষটার দিকে। লোকমান বলে―‘শ্যাখ মজিব, শ্যাখের পো! আহাহা, এমন অ্যাকনা মানুষেক মারে ফালাইলো।’

দুলালের বুকের মধ্যে ঝলকে উঠল কৈশোর। মারে ফালাইল শ্যাখের পোক। তার পরদিন তো মা-ও গলাত দড়ি দিয়া মরিল!

ওদিকে অন্য মাইকে বাজছে চেয়ারম্যানের ঘোষণা। পরিবার পরিকল্পনা সপ্তাহ চলছে দেশজুড়ে। দেশে নাকি পিলপিল করছে মানুষ। তাই কমাতে হবে মানুষের বাচ্চা বিয়ানো। দুলাল ঐ মাইকে কান দেয় না। দেবার দরকারও তার নেই। চেয়ারম্যান থেকে শত হাত দূরে থাকার আপ্রাণ চেষ্টা তার।

কিন্তু আবার ডাকতে এল মোজা মেম্বার।

চেয়ারম্যানের মুখ গম্ভীর। তাই সঙ্গী-সাথীরাও নিশ্চুপ। দুলাল দাঁড়ায়ে রইল। এমনিতেই কথা থাকে না তার মুখে। চেয়ারম্যানের সামনে এলে আরও অসার হয়ে যায় তার হাত-পা।

টেবিলে দুম করে কিল বসাল চেয়ারম্যান। চমকে উঠল ঘরের সবাই। থরথরিয়ে কেঁপে উঠল  টেবিল। রাগে ফ্যাঁসফেঁসে শোনাচ্ছে চেয়ারম্যানের গলা―‘তোমরা কি সব ঘাস চিবাও ? এতগুলান মানুষ তোমরা, আর আমার ক্যাম্পে লাইগেশন নাই, ভ্যাসেক্টমি নাই। ছয় ছয়টা দিন চলি গেল। একখানও অপারেশন নাই। মনতিরি ভাইয়ের সামোনে আমি মুখ দেখাইব কী করিয়া ? মনতিরি তো হামার চেয়ারম্যানগিরি খতম করি ফালাইবে। যাও, যেটি থেক্যা পারিস অপারেশনের মানুষ খুঁজি আন। না পাইলে আমি তোমারে সব গুলানোক খাসি বানায় ফালাইব।’

‘হামি আনিছি একজনাক’―কাঁপা গলায় আঙুল তুলে মোজা মেম্বার দেখাল দুলালকে।

অণ্ডকোষের পাশে তীব্র ব্যথা। দুলাল চিত হয়ে পড়ে আছে চাটাই-এর ওপর। পাশে নতুন লুঙ্গি। হাতের মুঠোয় ভাঁজের পর ভাঁজ হওয়া একশো টাকার দুটো নোট। নড়তে গেলেই তীব্র হুলের মতো টাটিয়ে উঠছে অপারেশনের ব্যথা। দুলালের বুকের ভেতর আঁকুপাকু করছে। কী যেন হারিয়েছে সে! এই অন্ধকারে শুয়ে শুয়ে কাটা অণ্ডকোষের তড়পানির মধ্যেও দুলাল ধীরে ধীরে বুঝতে পারছে, সারাজীবন ধরে শুধু হারিয়েই চলেছে সে। অন্ধকার আরও ঝেঁপে এল। দুলাল ভাবতে পারছে। ব্যথা নিয়েও। এভাবে কেন ক্রমাগত হেরে যাওয়া, হারিয়ে যাওয়ার দলে চলে যাচ্ছে সে ? দুলাল কারণ খুঁজতে থাকে। চকিতে সেই কথা মনে পড়ে দুলালের, যা এত বয়স পর্যন্ত কোনোদিন মনে পড়েনি―হামার বাপ নাই তো! তাই।

অদেখা বাপের জন্য হাহাকার করে ওঠে দুলালের বুক। অজানা অভিমান শ্লেষ্মা হয়ে জমে আটকে রাখে কণ্ঠনালি। কষ্টের দলা কফ হয়ে জমে থাকে বুক গলার সংযোগস্থলে―বাপরে হামি আর সইতে পারি না!

তৎক্ষণাৎ দুলালের মাথায় স্নেহস্পর্শ ঘটে। শিউরে ওঠে সে। সমস্ত শরীরের লোম কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়ে যায়। পুরো ঘরজুড়ে নেমে আসে এক অপার্থিব জ্যোতি। দুলাল টের পায়―কেউ একজন কোলে তুলে নিয়েছে তার জ্বরতপ্ত মাথাটিকে। ঝাপসা চোখের পাতা খুলে দুলাল দেখে, সে শুয়ে আছে সেই শালপ্রাংশু পুরুষসিংহের কোলে। দেয়ালের পোস্টার থেকে নেমে এসেছেন তিনি। ঋজু কোলে মুখ লুকিয়ে ডুকরে কেঁদে ওঠে দুলাল―‘হামাক সকলে ছিঁড়া খায়, সকলে টুকরা টুকরা করে। হামার যে বাপ নাই! হামার বাপ নাই।’

সান্ত্বনা দিতে আরও মোলায়েম হয়ে ওঠে তার চুলে খেলে বেড়ানো আঙুল। গলা থেকে ঝরে পড়ে থোকা থোকা স্নেহ―‘কে বলে তোমার বাবা নেই। এই তো আমি!’

দুলালের মনে ঝিকমিকিয়ে নামে সকালের রোদ―‘তুমি হামার বাপ ? তুমিই হামাক জমমো দিছেন ?’

‘হ্যাঁ রে বাপ!’

‘তাইলে অ্যাদ্দিন তুমি কুণ্ঠে আছিলেন ? হামার যে বড় কষ্ট।’

‘আমার যে অনেক সন্তান দুলাল। কোটি কোটি সন্তান। তাদের সবার কাছেই যে আমাকে যেতে হয়। তারাও যে অসহায়।’

যে দুলাল কোন কথার কী অর্থ তা ধরতে পারে না, বাক্যের অন্তর্নিহিত ব্যঞ্জনা কোনওদিনও পাঠোদ্ধারে সক্ষম হয়নি যে, সেই দুলালও কীভাবে যেন ধরে ফেলে তাঁর এই কথার অর্থ। আকুল হয়ে জিজ্ঞেস করে―‘তাহলে তুমি ফির চলি যাবেন হামাক ছাড়ে।’

‘নারে দুলাল। আর তোকে ছেড়ে যাব না। তোকে আমি বুকে করে নিয়ে যাব। আমার সব সন্তানকে আমি বুকে করে রাখব।’

দুলাল বলতে চাইল এত এত সন্তানের জায়গা এক বুকে হয় কী করে। কিন্তু বলল না।

তিনি যেন অন্তর্যামী। স্মিত হাসলেন―‘বাপের বুকে সব সন্তানের জন্য জায়গা থাকে রে দুলাল। দ্যাখ, আমার বুকের দিকে চেয়ে দ্যাখ।’

দুলাল দেখল।

বুক ভরা চাপ চাপ রক্ত।

সচিত্রকরণ : শতাব্দী জাহিদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may have missed

shares