গল্প : মর্মলোকের হত্যাকাণ্ড : ইমতিয়ার শামীম

শহরে যেদিন শুধু গোলাগুলি আর গোলাগুলিই হলো, ধরলা তিস্তা ত্রিমোহনী সতী-স্বর্ণামতি-ভাটেশ্বরী আর রত্নাইয়ের ঢেউ উজিয়ে নির্ঘুম রাত্রিদিন জুড়ে আমি আর মা একজন আরেকজনকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে মিশে থাকলাম রেললাইনের পাশে ছোট ঝুপড়ির মধ্যে, চিৎকার, চেঁচামেচি আর কান্নাকাটি করে লোকজন  পালাতে লাগল দিকশূন্য কোনওখানে, কোত্থেকে যেন বানের পানির মতো পাকিস্তানি সৈন্য এসে ভরে ফেলল সব গলি পথ বাড়ি, আর এতদিন ধরে কোনখানে কোন ডেরায় লুকিয়ে থাকা বিহারিরা সবাই রাস্তায় নেমে এসে সবুজ চানতারা মার্কা পতাকা দোলাতে দোলাতে স্লোগান দিতে লাগল, ‘পাকিস্তানের শত্রুরা, হুঁশিয়ার সাবধান’, এর কয়দিন পরই আমি বুঝতে পারলাম, বেশ্যাদের কাজটা আসলে কী!

বেশ্যাদের কাজকর্ম নিয়ে বিস্তর আগ্রহ ছিল আমার। আর তার কারণও ছিল। লোকজন চুপেচাপে আড়েঠারে বললেও আমি শুনতে পেরেছিলাম, আমার মা একটা বেবুশ্যা―বেশ্যামাগি; মানে লোকজন সেরকমই বলাবলি করত। বাপে মারা যাওয়ার পর আর চাচারা ঘরবাড়ি থেকে নামিয়ে দেওয়ার পর আমরা যে পাড়াতে গেলাম, সেটা আমার শুরু থেকেই ছিল ভারি অপছন্দের। ছনের ছাউনি দেওয়া ছোট একখান ঘর, পেছনে একটা ডোবা, সেখান থেকে সারাদিন বিশ্রী গন্ধ আসে, কেননা এ বাড়ি ও বাড়ি থেকে রাজ্যের মল এসে পড়ে সেইখানে। আমি তখন প্রতিদিনই কাঁদতাম। কিন্তু মায়ের সহ্য হয়ে গিয়েছিল সেই কান্না। আমার ঠিক মনে নেই, প্রথমদিকে সে ধুপধাপ কিলগুড়ি থাপ্পর বসাত কি না; কিন্তু এখন শুধু আমার নিজের একা-একা কাঁদবার কথাটাই মনে আছে। আর মনে আছে, ভীষণ খুশি হয়েছিলাম, যেদিন পাড়াটার ময়মুরব্বি থেকে শুরু করে ছোট ছোট পোলাপান পর্যন্ত মাকে ‘বেশ্যামাগি’ ‘বেশ্যামাগি’ বলতে বলতে ঘরের বাইরে দাঁড়িয়ে হুকুম দিয়ে গিয়েছিল, সন্ধ্যার আগেই পাড়া ছেড়ে চলে যেতে। আমি খুব ভয় পেয়েছিলাম। কিন্তু খুশিও হয়েছিলাম। বুঝতে পারছিলাম না, মায়ের ওপর এইসব লোকজন এত রেগে গেছে কেন। মা তো কারও কিছু চুরি করেনি। মা তো কারও বাড়িতে রান্নাবান্না করতে গিয়ে কাচের থালাবাসনও ভেঙে ফেলেনি; এমনও নয় যে, তরকারি ঠিকমতো রাঁধতে পারেনি। তা হলে এভাবে রাগবার কোনও মানে আছে ? তবে খানিকক্ষণের মধ্যেই ভয় কেটে গিয়েছিল আর খুশি হয়ে উঠেছিলাম ভীষণ, কেননা লোকগুলোর কথায় মা রাজি হয়ে গিয়েছিলÑবলেছিল, চলে যাবে সন্ধ্যার মধ্যেই।

এইভাবে ঘরবাড়িতে হুমড়ি খেয়ে পড়া সব লোকজনের কাছ থেকে আমি জানতে পারি, মা একটা বেশ্যামাগি। যদিও তার কাজটা যে আসলে কী, তা ঠিক বুঝতে পারতাম না। আমরা নতুন করে থাকতে শুরু করলাম রেলস্টেশনের কাছে―রেলপথের ধারে। অবশ্য প্রথম কয়দিন আমাদের কোনও বাড়িঘর ছিল না। তখন তো আমি অনেক ছোট, শরীরটাতে কেবল ফ্রক-প্যান্ট পরতে আর রাখতে শিখেছি। তবে অবাক হতে হয় যে আমি কত আগে শিখেছি, তা ঠিকমতো বলতে পারব না। রেললাইনটা ভীষণ উঁচু। তার দু’পাশ কী সুন্দর ঢালু আর মাইলের পর মাইলে বিন্ন্যার ঝোপ সেই ঢালুজুড়ে। ওরই মধ্যে মা নির্বিকারভাবে তার একটা শাড়ি বিছিয়ে দিয়ে বলেছিল আমাকে, ‘নে, এখানে শুয়ে পড়।’ ওইভাবে শুতে আমার ভালোই লেগেছিল। শোয়ার সঙ্গে সঙ্গে চোখে পড়েছিল―কী সুন্দর একটা আকাশ, তারায় তারায় ঢাকা, কাছের শিমুল গাছে কোনও এক পাখি খুব করে ডানা ঝাপটাচ্ছে। বোধহয় ওটাকেও বাড়িঘর থেকে অন্য সব পাখি বের করে দিয়েছে। দু দিন পরে সকালে ঘুম ভাঙার পর আমি দেখতে পেয়েছিলাম, দুইটা লোক কোত্থেকে কোদাল, খুন্তি, হাতুড়ি, বাঁশ, ছন, নলখাগড়া এইসব নিয়ে এসেছে। মায়ের সঙ্গে খুবই হাসাহাসি করছিল তারা। হাসাহাসি করতে করতে তারা মাকে একটা ঝুপড়ি তুলে দিয়ে গিয়েছিল। মাটি খুঁড়ে উনুনও বানিয়ে দিয়েছিল ভালো একটা।

তা থাকগে, ওইসব পুরোনো কাসুন্দি। তারপরও বহুদিন আমি টের পাইনি, বেশ্যাদের কাজটা আসলে কী। তাড়িয়ে দেওয়ার সময় লোকজন যেভাবে কথাবার্তা বলেছিল, তাতে শুধু বুঝতে পেরেছিলাম, কাজটা বোধহয় তত ভালো না, যেজন্যে লোকজনের এত রাগ মায়ের ওপর; কাজটা বোধহয়, আমার যেমন যখন-তখন নাকের মধ্যে আঙুল দিয়ে ময়লা খুঁটতে ভীষণ ভালো লাগে, অথচ মার চোখে পড়লে এইজন্যে দুমদাম কিল বসায়, তেমন একটা কিছু আরকি।

অবশ্য খারাপ হোক আর ভালো হোক, ওইসব নিয়ে আমার তেমন কোনও চিন্তাও ছিল না। আর চিন্তা করার মতো সময়ও ছিল না। শহর তখন ভীষণ গরম। ভোট হয়ে গেছে, আমার মায়েও সেই ভোট দিয়ে এসেছে আর তাতে নৌকাই জিতেছে। বেশ কিছুদিন হলো সকালে বিহারিদের হইহই রইরই করতে দেখে আমরা লুকিয়ে পড়ি, দুপুরে আবার দেখি ঊর্ধ্বশ্বাসে পালাচ্ছে বিহারির দল। এইভাবে চলল বেশ কয়েকদিন, নাকি অনেকÑঅনেকদিন। তারপর শহরে একদিন ভয়ানক যুদ্ধ হলো, কয়েকদিনের মধ্যেই পাকিস্তানি সৈন্যরা চলে এল এবং কিছু ভেবে দেখার আগেই আমি সচক্ষে বুঝে নিলাম বেশ্যামাগির কাজটা আসলে কী, কেনই বা সে কথা বলা যায় না।

মা অবশ্য একবার চিন্তা করেছিল, শহর ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার। কিন্তু পালিয়ে আমরা যাব কোনখানে! এইভাবে যাব কি যাব না-করতে করতে লালমনিরহাট রেলস্টেশনের পাশেই আমরা পড়ে থাকলাম। এই জায়গায় থাকার একটা আলাদা মজাও আছে। চাইলে খানিকক্ষণের মধ্যেই টাউনের মধ্যে ঢুকে পড়া যায়, আবার চাইলে অনায়াসেই এমনভাবে থাকা যায়, যাতে মনে হয়, ধারেকাছে শহর বলতে কোনও কিছুই নেই। তবে এরই মধ্যে একটা অদ্ভুত ঘটনা ঘটে গেল। একদিন সন্ধ্যায় একটা শিয়াল আমাদের ছাপড়ার পাশ দিয়ে খেউ খেউ করে চলে গেল অনেক দূরে। কিন্তু দূরে চলে যাওয়ার পরও তার চিৎকার থামল না কিছুতেই। একে গরমের দিন, তার ওপর এরকম ঘটনা―ভয়ে আমি দরদরিয়ে ঘামতে লাগলাম। মা-ও ভীষণ ভয় পেয়েছিল বোধহয়। এদিকে অন্ধকারে কিছুই দেখা যাচ্ছে না ঝুপড়ির মধ্যে। বাইরে শেয়ালটা এখন করুণকণ্ঠে চিৎকার করছে, তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে ততক্ষণে ডাকাডাকি শুরু করেছে আরও অজস্র শেয়াল। অন্ধকার থাকলেও আমাদের খুব একটা চিন্তা করতে হয় না সেটা নিয়ে। এত বেশি জোনাকি পোকা এইখানে দলবেঁধে থাকে যে, অন্ধকারও পালিয়ে যায় এইখান থেকে। কিন্তু কী কারণে যেন যুদ্ধ লাগার পর ওইসব জোনাকিও কমে গিয়েছে। এখন রাতবিরেতে আলোর জন্যে ভরসা বলতে কেবল ওই আকাশের তারা। কিন্তু আজ আকাশে কোনও তারা আছে কি না, আলো জ্বেলেছে কি না, কে বলবে! বাইরে যেতে পারলেই না কেবল ওটা বোঝা সম্ভব। তবে এখন এই পরিস্থিতিতে বাইরে যাবে কে!

হঠাৎ করেই মা অন্ধকারে আমার হাতটা শক্ত করে ধরে বলল, ‘চল তো দেখে আসি, শেয়াল ডাকছে কেন!’

তখনই মনে হলো, আমাদের ঝুপড়ির বেড়াটায় বোধহয় কিছু একটা ঘসটে গেল। ঘসটাতে ঘসটাতে সেটা ঝাঁপির কাছে এসে থমকে গেল। আমি মাকে খুব শক্ত করে জড়িয়ে ধরলাম আর মা-ও তখন এত শক্ত করে আমাকে সাপটে ধরল যে বুঝতে আমার সমস্যা হলো না যে, সেও খুব ভয় পেয়েছে।

ভয় পেয়ে, চমকে উঠে একেবারে নিঃসাড় হয়ে পড়ার আগে শেষবারের মতো মা চিৎকার করে উঠল, ‘কে ? কে ওখানে ?’

কিন্তু কোনও উত্তর এল না। শুধু একটা কিছু ধপ করে পড়ে গেল ঘরের আশপাশের ভাটগাছ, কচুগাছ আর রাজ্যের বুনো গাছের ডালপালার ওপর, আর শক্ত কিছু একটা এসে সজোরে বাড়ি খেল ছাপরার বাঁশের খুঁটির গায়ে। ঝিঁঝিঁর ডাক থেমে গেল মুহূর্তের জন্যে, কিন্তু তা আর কতক্ষণ! মুহূর্তক্ষণ পরেই আবারও ডাকতে শুরু করল আগের মতোই।

আরও কিছুক্ষণ অপেক্ষা করল আমার মা। শক্ত করে তার হাতটা ধরে আরও কিছুক্ষণ অপেক্ষা করলাম আমি। তারপর মা হাতটা ছাড়িয়ে নিল আর উঁকি দিল ঝুপড়ির ঝাঁপি তুলে। ঝাঁপিটা তুলতেই কী যেন একটা আবারও গড়িয়ে পড়ল মাটির ওপর। তবে এবার বলতে গেলে অনেকটা নিস্তব্ধে। আমি আবারও কেঁপে উঠলাম, সঙ্গে সঙ্গে মা-ও। তা ছাড়া স্পষ্টই দেখতে পাচ্ছিলাম, ঝুপড়ির সামনে পড়ে আছে কিছু একটা। গাছের ডাল নয়, কুকুর-বিড়াল নয়, ঝাড়ু কিংবা ঝাটাও নয়―কিন্তু নিশ্চয়ই কিছু একটা পড়ে আছে বলে, জায়গাটা যেন একটু বেশি বেশি অন্ধকার। মা সাহস করে এগিয়ে যায়, উবু হয় এবং হয়ত বা সে চমকে ওঠার আগেই চমকে উঠি আমি। কেননা আমি বুঝতে পারি, একটা লোক আমাদের সামনে পড়ে আছে; হয়ত সে এখনও বেঁচে আছে, কিংবা মরে গেছে; হয়ত সে অজ্ঞান হয়ে গেছে, কিংবা আহত ভীষণ; হয়ত সে বিহারি কিংবা আমাদের মতোই একজন বাঙালি।

পড়ে থাকা লোকটা বিড়বিড়িয়ে কী যেন বলে অথবা বলতে গিয়েও বলতে পারে না। কিন্তু যা-ই বলুক না কেন, মা’র বোধহয় মনে হয়, ভয়ঙ্কর ক্লান্ত এই লোকটা নিশ্চয়ই পানি চাইছে। কিংবা পানি পানের দরকার তার থাকুক বা না-থাকুক, তাকে আগে ঝুপড়ির মধ্যে নিয়ে যাওয়া দরকার। মা তাই লোকটার দুই বগলের নিচ দিয়ে দু’হাত দিয়ে তাকে টেনে তোলার চেষ্টা করে, তাতে সে কাতরে ওঠে, কিন্তু মা তার কথায় কোনও কান না-দিয়ে টানতেই থাকে; যেমন করে মাঝেমধ্যে আমাকে নারকেল পাতায় বসিয়ে সে টানে নৌকার গুণ টানার মতো করে। লোকটাও কেন যেন হাঁপাতে হাঁপাতে পায়ে-পাছায় কেঁচোর মতো ঢেউ তুলে ঝুপড়ির মধ্যে ঢুকে পড়ে আর গায়ের সমস্ত শক্তি জড়ো করে বলে ওঠে, ‘বন্দুকটা নিয়ে আসেন।’

বাঁশের খুঁটির সঙ্গে ঠোক্কর খাওয়া জিনিসটা তাহলে রাইফেল! সেইটা নিয়ে লোকটা কোনও মতে পালিয়ে এসেছে! হয়ত থানা থেকে, হয়ত রেলস্টেশন থেকে অথবা হতে পারে দূরের রংপুর শহর থেকে। হয়ত সে চায়, তাড়াতাড়ি কয়েক মাইল দূরের বর্ডার পাড়ি দিয়ে ভারতে চলে যেতে। কাল রাতেই তো একবার বলেছিল মা, এই লালমনিরহাটে এখন আর খুব বেশি বাঙালি নেই। আমার মা না-হয় বেবুশ্যা, কিন্তু এ লোকেরই বা কী দরকার এখানে থাকার। যুদ্ধ শুরুর পাঁচ-ছয় দিনের মধ্যেই এখানে পাকিস্তানি বাহিনী চলে এসেছে। থানার বাঙালি বড়বাবু মারা গেছে প্রথম দিনেই, আপাতত তার দায়িত্ব পেয়েছে বিহারি ছোট বাবু এবং তারপর থেকে পাকিস্তানিদের পোটলা বয়ে বেড়ান, বাঙালিগুলোর মুখও নাকি কেমন চুপসে গেছে; কতটুকু দালালি করলে কতটুকু বিশ্বস্ততা অর্জন করা যায়, কে তা জানে!

এদিকে ঝুপড়ির মধ্যে ঢুকতেই একরাশ আরও গভীর অন্ধকার আমাদের জাপটে ধরেছে। কিন্তু ওর মধ্যেই মা ঠিলা থেকে খানিকটা পানি ঢেলে লোকটাকে খাওয়ানোর চেষ্টা চালাচ্ছে ঢোকসায় করে। এইভাবে পানি-টানি খাওয়ানো ঠিক হচ্ছে কি না, আমি তা ঠিক বুঝতে পারি না। পানি পাওয়া এখন খুবই কষ্টের ব্যাপার। রেলস্টেশনটায় একটা টিউবওয়েল আছে, ইঁদারাও আছে―কিন্তু ওইখানে যাওয়ার উপায় নেই আমাদের। কিন্তু পানি তো জোগাড় করতে হয় এই আমাকেই। এত ছোট মানুষ আমি যে, খুব বেশি ঝামেলার জায়গা না-হলে আমার দিকে কেউ খেয়ালই করে না। রেলস্টেশন পাওয়ার আগে মসজিদটার কাছেও একটা ইঁদারা আছে। ওখান থেকে অনায়াসে পানি নিয়ে আসতে পারি আমি। যদিও খুব বেশি পানি আনতে পারি না আর বার দুই পানি নিয়ে এলেই হাঁফিয়ে উঠি। অত কষ্ট করে নিয়ে আসা পানি এইভাবে এই লোকটাকে দিয়ে শেষ করে ফেলবে! ভীষণ উদ্বিগ্ন হয়ে উঠি আমি। কিন্তু তার পরেই নতুন এক উদ্বেগ আমাকে ভীত করে তোলে। কেননা লোকটা হাঁপাতে হঁপাতে বলে, ‘আমি মনে হয়, বেশিক্ষণ আর বাঁচব না। হাতের ডানায় গুলি লেগেছে। অনেক রক্ত পড়েছে।’

‘আগে বলবেন না!’―মায়ের কণ্ঠে নিরাসক্তি নাকি উদ্বেগ, সেটা আর ধরতে পারি না। অথবা এর কোনওটাই নয়, শান্ত থাকার চেষ্টা করছে আসলে সে। আর তাই কথা বলে খুব ধীর গলাতে, আগে পানিটুকু খেয়ে নেন।’

পানি খাইয়ে আমাকে ঘরেই থাকতে বলে মা কোথায় যেন বেরিয়ে পড়ে। অন্ধকারেই অনুভব করি, নেতিয়ে পড়ছে লোকটা, কখনও বা হাঁফাচ্ছে। একবার গায়ে হাত দিয়েই চমকে উঠি, ঘামে ভিজে একেবারে সপসপ করছে, কেমন ভীষণ ঠাণ্ডা হয়ে উঠেছে। প্রতিদিন এই সময়ে একটা শকুন এসে রেললাইনের ধারে কড়ুই গাছে বসে। ঝিম মেরে বসে থাকে। আবার মাঝেমধ্যে ভীষণ জোরে ডানা ঝাপটাতে থাকে। আমি সেই শকুনটার কথা চিন্তা করার চেষ্টা করি। চিন্তা করতে করতে কখন যে ঘরের ঠাণ্ডা মাটির ওপরেই ঘুমিয়ে পড়ি, নিজেও তা আর টের পাই না।

সকালে উঠে চোখ খোলার আগেই আমার লোকটার কথা মনে হয়। সঙ্গে সঙ্গে ধড়মড়িয়ে উঠে বসি অথবা চোখটা খুলি অথবা দুটোর কোনটা যে আগে ঘটে সেটা টের পাই না; তার আগেই দেখি, না মা, না সেই লোকটা―কেউই নেই ঘরের ভেতর। ঘরের বাইরে এসে দেখি, বান্দরের লাঠি গাছটা কেন যেন খুশিতে ঝলমল করছে আর মা উনুন লেপতে বসেছে।

আমি ছাপরার ডোয়া ঘেঁষে পড়ে থাকা এক্কাদোক্কা খেলার খাপরাগুলোর দিকে তাকাতে তাকাতেই মায়ের দিকে ফিরি, ‘লোকটা কোথায় মা ?’

মাটির হাঁড়ির ঢাকনার নিচ থেকে বেরিয়ে একরাশ ধোঁয়া আকাশের দিকে উঠে যাচ্ছে রশির মতো শরীর পাকিয়ে। মা সেই ধোঁয়াকে ফুঁ দিয়ে সরিয়ে দেয়। বলে, ‘কোন লোকটা ?’

তারপরই আশপাশে যেন কত লোকজন, এমনভাবে ফিসফিসিয়ে বলে, ‘কেউ যে আসছিল―কাউকে বলিস না।’

এহ্, মনে হয় লোকজন আমাদের এইসব জিজ্ঞেস করতে ঘুর ঘুর করছে! দিনের বেলায়ই কেউ এই রাস্তায় পা ফেলে না; তার ওপর আমি একটা বেশ্যার মেয়ে, আর মা তো বেশ্যামাগি … লোকজন এইসব শুনলেই লাফ দিয়ে ১৫ হাত দূরে চলে যায়; তা হলে কী এমন ঠ্যাকা পড়েছে কারও আমাদের সঙ্গে কথাবার্তা বলার। আসার মধ্যে আসেই তো ওইসব লোকজন, তারা কী করে তাও তো ঠিক জানি না আমি। মা এখনও তাদের কাউকে ঘরের মধ্যে তোলেনি। তেমন কেউ এলে তাকে নিয়ে চলে যায় ঝোপঝাড়ের দিকে। অথবা রেল স্টেশনের পরিত্যক্ত ওয়াগনগুলোর দিকে। আমার খুবই ইচ্ছে করে, কী করে দেখার। কিন্তু আবার ইচ্ছেও করে না। দু-একজন লোক এর মধ্যে আমার দিকেও এমনভাবে তাকিয়েছে যে, মনে হয়, ওজন করছে আর কয়দিন পর আমাকেও লাইনে নেওয়া যাবে! মাঝে মধ্যেই ভীষণ রাগ হয় আমার এসব ভেবে। রাগে আমার শরীর থেকে ভাপ উঠতে থাকে, রাগে আমার শরীর কেমন হিম হয়ে যেতে থাকে … আমি একটা বেশ্যার মেয়ে, দুই-এক বছরের মধ্যে হয়ত আমিও বেশ্যাই হয়ে যাব। কিন্তু তার কাজটা যে কী, সেইটাই ঠিক বুঝতে পারছি না এখনও। মাঝেমধ্যে ভাবি, মায়ের কাছে জিজ্ঞেস করি। কিন্তু কেন যেন মায়ের দিকে তাকিয়েই শরীরটা হিম হয়ে আসে। লোকজন কত কিছু করে, কিন্তু মা কেন যে বেছে বেছে বেশ্যা হতে গেল, কে জানে!

হঠাৎ করেই মাথায় বিদ্যুৎ খেলে যায়―তা হলে লোকটা যে এসেছিল, সঙ্গে বন্দুকও ছিল, গুলি লেগেছিল, কাতরাচ্ছিল। সে তা হলে নিশ্চয়ই মুক্তিযোদ্ধা হবে। ভাবতে ভাবতে আমি এলোমেলো এগোই, কোত্থেকে একটা লাগসই কঞ্চি আমার হাতের মুঠোয় চলে আসে, সেটা দিয়ে নির্দয়ের মতো ভাটফুল গাছগুলোকে পেটাতে পেটাতে এগিয়ে চলি। এইখানে তো মানুষজন থাকে না, থাকে সাপখোপ, থাকে বেজি-বাগডাশ, থাকে সজারু। অতএব কিছু একটা দিয়ে শব্দ করতে করতে এগোলে লাভ ছাড়া লোকসান হয় না। কিন্তু তেমন বেশি দূর যেতে হয় না, চিৎকার করে উল্টো দিকে দৌড়াতে থাকি আমি।

‘কী―কী হলো রে ?’

মাও চুলার ধার থেকে ছিটকে উঠে দাঁড়িয়ে প্রায় দৌড়ে এগিয়ে আসে। আমি কিছু বলার আগেই তার দুই হাঁটুর মধ্যে গুঁজে দেই মুখটা। আর মা উদ্বেগ নিয়ে আবারও বলে, ‘কী―কী হইছে ?’

আমি হাত উঁচু করে সেই পথকে দেখাই, যেটা আদৌ কোনও পথ নয়; কিন্তু পথ না-হলেও যেখান দিয়ে কেউ না কেউ হাঁটে, হয়ত কোনও দায়ে পড়া মানুষ, হয়ত কোনও জন্তু-জানোয়ার আর হয়ত সেই অর্থে সেটিও নিশ্চয়ই পথ―যেরকম পথ দিয়ে আমরা দু জন―মেয়ে আর মা―সব সময় হাঁটি, যেরকম পথ দিয়ে এইখানে আমাদের ছাপরার কাছে চুপি চুপি কেউ আসে, যেরকম পথ দিয়ে কাল রাতে লোকটাও এসেছিল। কিন্তু লোকটা যে কোনখান দিয়ে এসেছিল, তা স্পষ্টই বোঝা যাচ্ছে, কেননা মাঝেমধ্যেই রক্তের দাগ পড়েছে, হয়ত গাছের পাতায়, হয়ত মাটির ওপর, হয়ত কোথাও তা মিলিয়ে গেছে, কোথাও তা মাটিতে শুকিয়ে বিবর্ণ হয়ে গেছে, কোথাও আবার দু-একটা ফোঁটা শুকাতে চাইছে―কিন্তু শুকাতে পারছে না। মা সন্ত্রস্ত চোখেমুখে পা দিয়ে মাড়িয়ে মাড়িয়ে, হাত দিয়ে ছড়িয়ে ছড়িয়ে অদৃশ্য করে ফেলতে চায় সেগুলোকে … কিন্তু তা কি অতই সোজা! এইভাবে এই দাগ মুছতে মুছতে কত দূরই বা যেতে পারব আমরা দু জন ? কত দূর থেকেই বা এসেছে এই দাগ ? অর্থহীন লাগে আমার, ক্লান্তিকরও লাগে। কিন্তু কিসের নেশায় যেন মা সেটাই করতে থাকে। মা বুঝতেই চায় না, দাগ মুছে ফেললেও নতুন এক দাগ তৈরি হয়, নতুন সে দাগ আরও অনেক প্রশ্ন তৈরি করে।

অবশ্য সেই লোকগুলোর চোখমুখে কোনও প্রশ্নই ছিল না―মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যেই যাদের সঙ্গে দেখা হলো আমাদের। রাতে তারা তাদের শিকার ছেড়ে দিয়েছিল, কিন্তু সকালে বোধহয় রক্তের ছিটেফোঁটা চোখে পড়ায় মনে পড়ে গিয়েছে। তাই বেরিয়েছে সন্ধান করতে। বিহারিটা মুহূর্তের মধ্যে ধূর্ত শিয়ালচোখা হয়ে উঠল আর সঙ্গে থাকা রাইফেল-বেয়নেটওয়ালা পাঞ্জাবি দু জনের দিকে তাকিয়ে ফিক ফিক করে হাসতে লাগল, ‘এইগুলা চিড়িয়া―চিড়িয়া, ঝোপঝাড়েÑছাপরার মধ্যে থাকে, জিনিস খারাপ না …’

পাঞ্জাবি দুটোর মুখ অদ্ভুত নরম কিন্তু হিংস্র হয়ে উঠতে লাগল। তারা জেরা করতে লাগল মাকে, অবশ্য প্রশ্নের উত্তর পেতে নয়, নতুন তরতাজা শিকারটাকে কব্জা করতে।

‘দেখেছিস তুই! লুকিয়ে রেখেছিস! সবগুলো গাদ্দার―কাফের―’

বলে পাঞ্জাবিদের একজন একটু এগিয়ে কড়া একটা চড় বসিয়েই জাপটে ধরল মাকে। শরীর ভেঙে মা গড়িয়ে পড়ল ভাটফুল গাছগুলোর ওপর। সঙ্গী পাঞ্জাবিটা কড়া ধমক দিল আমাকে। সেটা আমার বয়স একেবারেই কম হওয়ার কারণে নাকি এখনও এখানে দাঁড়িয়ে আছি বলে, তা ঠিক বুঝতে পারলাম না। কিন্তু ভয়ে আতঙ্কে দৌড়াতে লাগলাম। কানে ভেসে এলো বিহারিটার গলা, ‘আরে মাগী! আবার না-না-করিস! … বেশ্যামাগি, তাও শুতে চায় না!’

আমার পা শ্লথ হয়ে আসে। কিন্তু ভয় যায় না। তবুও উঁচু বড় বড় নলখাগড়ার আড়ালে দাঁড়িয়ে উঁকি দিয়ে দেখার চেষ্টা করি কী হচ্ছে। মনে হয়, বেশ্যারা যা করে, শুয়ে থেকে করে! … নইলে বিহারিটা বলল কেন, ‘বেশ্যামাগি, তাও শুতে চায় না! …’ তাই আমি দাঁড়িয়ে থাকি, হাঁপাতে থাকি, কিন্তু দেখতে থাকি। বেশ্যারা কী করে, তা এখন নিশ্চয়ই দেখা যাবে। কিন্তু কিছুই বুঝতে পারি না। ঝোপঝাড়ের মধ্যে একটা পাঞ্জাবির শরীরটা বেহুদাই অস্থির হয়ে কেমন একটা কেঁচোর মতো ওঠানামা করে এবং হঠাৎ করেই স্থির হয়ে পড়ে থাকে। সামান্য দূরে দাঁড়িয়ে থেকে সেসব দেখতে দেখতে অস্থির হয়ে ওঠা পাঞ্জাবিটা কী যে বলে, সে তখন উঠে দাঁড়িয়ে তার খুলে রাখা প্যান্টটা পরতে থাকে; এইবার আরেকটা পাঞ্জাবি তার উর্দি খুলতে থাকে রাইফেলটা একপাশে নামিয়ে। একেবারে উদোম হয়ে সে ঝাঁপিয়ে পড়ে মায়ের ওপর।

বেশ খানিক পরে সে-ও উঠে দাঁড়ায়। প্যান্টটা পরতে পরতে হাসতে হাসতে বলে, ‘জিনিস খারাপ না। নিয়া চল।’

বলেই মায়ের দিকে তাকিয়ে বলে, ‘চল মাগীÑআমাদের সাথে চল।’ এই বলে অযথাই সে রাইফেলটার গোড়াটা দিয়ে খোঁচা মারে মাকে আর মা তীব্র ব্যথায় কঁকিয়ে ওঠে।

মায়ের থাকার নতুন জায়গা হলো রেলস্টেশন ছেড়ে পালিয়ে যাওয়া এক কর্মচারীর লালরঙা বাড়িতে। অবশ্য এমনও হতে পারে, মরে গেছে লোকটা এবারের এই ঝড়ে। হয়ত আগে থেকেই তার ওপর রাগ ছিল বিহারিদের। সুযোগ আসার সঙ্গে সঙ্গে তাই একেবারে পিষে ফেলেছে। ঘরদোর দেখে সেরকমই মনে হয় আমাদের। বিছানাপত্র, জামাকাপড়, থালাবাসন সব কিছু এমনভাবে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে যে, মনে হয় চাকরি কিংবা বাজার করতে গেছে, খানিকক্ষণের মধ্যেই ফিরে এসে চুলা জ্বালাতে যাবে রান্নাঘরে। বসবাস করা দূরে থাক―এরকম সুন্দর বাড়িই বোধহয় আমি কোনওদিন দেখিনি। এখানে জানালা দিয়ে তাকালে কী সুন্দর ট্রেন আসতে দেখা যায়! গরম লাগলে আমি ঘর থেকে বেরিয়ে এসে বারান্দায় বসতে পারি। তখন বাড়ির উঠানে থাকা গাছের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে মনে হয়, এইবার আমরা শান্তিমতো দুই-চারটা আম-কাঁঠালও খেতে পারব। আমার কোনও সই-টই নেই, আমার সঙ্গে কারও খেলতে আসার প্রশ্নই ওঠে না, আর কেন জানি আমিও কখনও দৌড়াদৌড়ি করে গিয়ে কারও সঙ্গে কথাবার্তা বলতে পারি না ভালো করে; অতএব শিমুল গাছে কখন ফুল ফুটল আর রাস্তার ধারে কোনখানে কী ফুল ফুটে আছে, কোনখানে অনেক বেজি আছে কিংবা সারাদিনই কোনখানে খাট্টাসের গন্ধ পাওয়া যায়, কোনখানে জালালি কবুতর বাসা বেঁধেছে, এই সব খোঁজখবর রাখা ছাড়া কোনও কাজকর্মই নেই এখন আমার। অবশ্য আরও একটি কাজ আছে আমার―পাঞ্জাবিদের দেখলেই একটু দূরে কেটে পড়া। ওই বিহারিটা তো একদমই চায়নি আমি মায়ের সঙ্গে আসি। এখন যদিও এসেছি, তবু না আসার মতোই। লোকজন আসছে দেখলেই সরে যেতে হয় আশপাশ থেকে। তা ছাড়া রাতে আমি চলে যাই আমাদের পুরোনা ঝুপড়িতে। রান্নাঘরের মাটিতে একটা চাটাই বিছিয়ে অনায়াসে থাকা যায়। তবু আমি যাই। মা না চাইলেও যাই। কারণ এখন তো আমি ভালো করেই জানি, বেশ্যারা আসলে কী করে। আর মা-ও এই লালঘরে আসার পর থেকে দেখছি যে, আমাকে খুব মায়া করে। আগেও হয়ত করেছে, কিন্তু বুঝতে পারতাম না, কিন্তু আজকাল বড় বেশি টের পাই। সুযোগ পেলেই অনেক কথা বলে আমাকে। হয়ত বলে, ‘জীবনে বাঁচতে পারাটাই সবচেয়ে বড় ব্যাপার রে!’ হয়ত বলে, ‘জীবনের স্বাদ নিতে জানতে হয়। যদি জানতে পারিস, তা হলে কষ্ট হলেও দেখবি, ঘুমটা খুব ভালো হচ্ছে।’ এইসব বলার সময় মায়ের চোখ দু’টো কেমন জলে ভরে ওঠে। আমি বুঝি না, চোখ যার জলে ভরে উঠতে পারে, লোকে কেন তাকে বেশ্যা বলে। এখন কখনও কখনও মা তার ছোটবেলার কথাও বলে। হয়ত বলে ওঠে তার মা-বাবার কথা, এমনকি স্কুলে যাওয়ার কথা। আমার ইচ্ছে হয়, প্রশ্ন করি, ‘তুমি তাহলে বেশ্যা হলে কেন মা ?’ কিন্তু সাহস পাই না।

এদিকে দিন গড়াচ্ছে। রেলগাড়ির আসা-যাওয়া স্বাভাবিক হয়ে উঠছে। কিন্তু লোকজন নেই তাতে। টাউনেও তেমন কেউই আর নেই বোধহয়, যে কি না ‘জয় বাংলা’ বলে স্লোগান দিয়ে বিহারি কিংবা পাঞ্জাবিগুলোকে ভড়কে দেবে; তারপরও গোলাগুলি থেমে নেই, মাঝেমধ্যেই পাঞ্জাবি আর বিহারিরা একনাগাড়ে গুলি ছুড়ে জানিয়ে দিচ্ছে, তারা বেশ ভালোই আছে। একদিন তো বিকট শব্দে বোমাও ফাটল বেশ কয়েকটা, তাও ঠিক বিকেলের দিকে। কারা যে ফাটালো, কে জানে! সেদিন খুব বেশি দূরে যাওয়া হয়নি আমার―শুয়ে ছিলাম রেলওয়াগনের নিচেই, ধড়মড়িয়ে উঠে বসতে না-বসতেই দেখলাম, লালঘর থেকে একটা খানসেনা ন্যাংটা অবস্থাতেই দৌড়াচ্ছে রেলস্টেশনে তাদের ক্যাম্পের দিকে।

মুশকিল হলো, পাকিস্তানি হারামজাদাগুলোর আসা-যাওয়ার কোনও ঠিক-ঠিকানা ছিল না। এদিকে ভাও বুঝে বিহারি আর রাজাকারগুলোও ফাও-ফাও আসতে লাগল। ঘাড়ের ওপর রাইফেল নিয়ে আসে, গাছের ডালে পাখি দেখলেও গুলি করে বসে। এইসব দেখে আমার ভয়ই করে। এমনিতেই সারা দিন এই জায়গাটা কেমন থ’ মেরে থাকে। তার ওপর এখন মনে হয় নতুন করে যুদ্ধ লেগেছে―এখন আর তত শান্তিতে নেই পাকিস্তানি, বিহারি আর রাজাকারগুলো। যতই গলা উঁচিয়ে কথা বলুক না কেন, তারাও কেমন শিয়াল, বেজি আর খাট্টাসগুলোর মতো কান উঁচু করে থাকে সব সময়। কেমন যেন তব্দা মেরে গেছে সব কিছু; কিছুতেই ঠিক হচ্ছে না আর। দিনে-রাতে শব্দ বলতে ওই মিলিটারিদের গাড়ি আর দু’চারটা ট্রেন চলার আওয়াজ। এত বড় একটা রেলস্টেশন, কিন্তু এখন মানুষও চমকে ওঠে সেইখানে মানুষের দেখা পেলে।

একদিন অনেক রাতে একটা পেঁচা এসে কেবল বসেছে আমাদের ঝুপড়ির কাছে ছাতিম গাছের ডালে―ঠিক তখনই কিসের ধাক্কায় হুড়মুড়িয়ে উঠে বসি আমি। আর টের পাই, ভয়ের কিছুই নাই, মা এসে ধাক্কা দিচ্ছে আমাকে। কিন্তু মা কেন ধাক্কায় আমাকে ? এত রাতে ?

‘চল―তাড়াতাড়ি চল―ইন্ডিয়া যাব।’

ইন্ডিয়া যাওয়ার কথা এর আগেও একদিন বলেছিল মা। হাত-পা বেঁধে না রাখুক, খুব বেশি চাপের মধ্যে রেখেছে তাকে ক্যাম্পের পাঞ্জাবিগুলো। তাদের আবদারের ইয়ত্তা নেই। তাদের শরীর ঠাণ্ডা হতে না-হতেই গরম হয়ে ওঠে। সর্দিগর্মির হাত থেকে বাঁচতে ভারি ব্যতিব্যস্ত তারা। আরও কত মেয়েকে যে তারা এনে রেখেছে অন্য কোনও লালঘরে কিংবা অন্য কোনওখানে, তাও নাকি গুনে শেষ করা যাবে না। কিন্তু তাতে কীÑখানসেনাও তো একেবারে কম নেই। মা তাই হন্যে হয়ে উপায় খুঁজছিল পালিয়ে যাওয়ার। কিন্তু পালানো কি অতই সোজা! আমি ঠিক টের পাই না, কী করে মা এত তাড়াতাড়িই সেই উপায় করে ফেলেছে।

সঙ্গে নিয়ে যাওয়ার মতো তেমন কিছুই নেই―মায়ের একটা শাড়ি দিয়ে আরেকটা শাড়ি আর আমার দুই-একটা জামাকাপড় যা আছে পেঁচিয়ে নিই আমরা। ঝুপড়ি থেকে বেরিয়ে দেখি, একটা লোকও আছে বাইরে দাঁড়িয়ে। জ্যোৎস্নায় লম্বা হয়ে গড়িয়ে পড়া গাছের ছায়া পড়েছে তার গায়ে। মুখ বোঝা যায় না। বুঝলেও আমি তো চিনতে পারতাম না। তবু কৌতূহলের তো শেষ নেই মানুষের। আমি তাই যেতে যেতে ফিসফিসিয়ে প্রশ্ন করি মায়ের কাছে, ‘কে―লোকটা কে মা ?’

খুব দ্রুত হাঁটছে মানুষটা। সামনে কোনখান থেকে আরও কয়েকজনকে নাকি নিতে হবে তাকে। রেললাইনের গড়ান বেয়ে নিচের দিকে হুড়মুড়িয়ে নামতে নামতে মা-ও আমাকে ফিসফিসিয়ে বলে, ‘ওই যে সেই রাতে একটা মানুষ আসছিল না, যুদ্ধে গেছে ? এ-ও তাদের সাথেকার। খুব ভালো। রাস্তাঘাট চেনে―বর্ডার পার করে দেয়।’

তা হলে তো ভালোই, কিন্তু হাঁটতে এখন ভয়ঙ্কর কষ্ট হচ্ছে আমার। সারাদিন তো হাঁটার ওপরেই থাকতে হতো―একবার লালঘরের দিকে, সেখান থেকে আবার ঝুপড়ির দিকে, ভালো না-লাগলে সেখান থেকে বেরিয়ে আবার রেলওয়াগনের দিকে। নেহাৎ বয়সটা কম, তাই লোকজন তাকিয়ে তাকিয়ে একটু দেখেটেখেই ছাড় দেয় আমাকে; কিন্তু এত যে হাঁটি, হাঁটতে পারি, তার পরও এই রাতে পা ফেলতে আর ভালো লাগে না আমার।

শেষ রাতের দিকে বিরান এক ক্ষেতের মধ্যে ঝুপড়ির সামনে এসে দাঁড়ায় সে লোকটা। তার পায়ের শব্দ শুনে কে যেন বেরিয়ে আসে ভেতর থেকে। লোকটা গলগলিয়ে কথা বলতে থাকে আমাদের, ‘আজ সারাদিন আপনারা এইখানে থাকবেন। বুঝলেন তো ? সন্ধ্যার পর আমি আবারও আসব। তারপর ধরলার ধারে নিয়ে যাব। সেখান থেকে নৌকায় করে ওইপাড়ে―’

‘খাওয়াদাওয়ার ব্যবস্থা কী ?’―কে যেন বলে ঝুপড়ির মধ্যে থেকে।

‘যুদ্ধ কইরতে আসছেন, ট্রেনিং নিতে যাইতেছেন, আবার খাওয়াদাওয়ার চিন্তাও করতেছেন ? যুদ্ধে যাওয়ার দরকার কী আপনের ?’

বলেই লোকটা হনহনিয়ে হাঁটতে থাকে আলপথ বেয়ে। আমরা ঝুপড়ির মধ্যে ঢুকে পড়ি। শোয়ার উপায় নেই। ঠাসাঠাসি, গাদাগাদি করে বসে আছে মানুষজন। তাও মাটির ওপর। ভোরের আলো ফুটতে শুরু করলে আমরা স্পষ্ট বুঝতে পারি, আমাদের মতো মানুষজন যাতে খানিকক্ষণ কোনওমতে বসে থাকতে পারে, সেজন্যেই ঝুপড়িটা কোনওমতে দাঁড় করান হয়েছে এইখানে। বর্ষাকাল শুরু হবে অচিরেই, মাটি তাই আপনাআপনিই কেমন স্যাঁতসেঁতে হয়ে উঠেছে মাথার ওপর খানিকটা ছাউনি থাকায়। পোকামাকড়ও আছে, ঘোরাফেরা করছে একদল কালো পিঁপড়া। তাও ভালো কোনও লাল পিঁপড়া নেই মাটিতে। ক্ষুধায় পেট চোঁ চোঁ করছে আমার। কিন্তু মা খালি বলছে, চোখ বুজে থাক, সারা রাত ফের হাঁটতে হবে। তা আমি না হয় এমন ঝুপড়ির মধ্যে চোখ বুজে মটকা মেরে বসে থাকতে পারি; কিন্তু সবাই কি আর পারে ? এইখানে মনে হয় বেশির ভাগই ছাত্র মানুষজন, যুদ্ধে যাচ্ছে তারা, কিন্তু ভারি উশখুশ করছে এভাবে বসে থাকতে হচ্ছে বলে, লোকটা এইভাবে কোনও খাবারদাবারের ব্যবস্থা না-করেই বসিয়ে রেখে গেছে বলে, একবার একটা কালো পিঁপড়া তো আরেকবার আরেকটা লাল কেন্নো ঘোরাফেরা করছে বলে।

সন্ধ্যার পর লোকটা আসে। সঙ্গে করে আরও কয়েকজনকে নিয়ে এসেছে সে। ভাগ্য ভালো, খানিকটা মুড়িও আনতে পেরেছে সে কোথাও থেকে। তা মুখে দিতে না-দিতেই শেষ হয়ে যায়Ñতাও ভালো লাগে। আবারও হাঁটতে থাকি আমরা আলপথ দিয়ে। লোকটা আমাদের নিয়ে আসে ধরলার পাড়ে। এইখানে এসে আমরা দুইভাগে ভাগ হয়ে যাই। এক নৌকায় ওঠে তারা সবাই, যারা ট্রেনিং নিতে যাবে। আরেক নৌকায় উঠি আমরা, যারা নাকি উঠব শরণার্থী শিবিরে। নৌকা চলতে শুরু করলে আমরা একটু হাঁপ ছেড়ে বাঁচি। মুখে কথাবার্তাও ফুটতে থাকে। আপনার বাড়ি কই, কোনখানে থাকেন, ওপারে কেউ আছে নাকি―এত কথাও বলতে পারে মানুষজন! এদিকে বর্ষা আসবে, ধরলাও প্রাণ পাচ্ছে, স্রোতে ভারি টান তার। নৌকা এগোয় না কিছুতেই। লোকটাকে আমাদের নৌকায় দেখি না। তবে অন্য নৌকায় নিশ্চয়ই আছে।

মাঝনদীতে কী যেন কী হয়, আমরা তাই একটা চরে নাও ঠেকাই। মাঝি আমাদের বলে চুপচাপ থাকতে আর স্থির চোখে তাকিয়ে থাকে নদীর দিকে। তখন লোকটার আবারও দেখা পাই আমরা। গভীর রাত হলেও বেশ ভালো করেই বুঝি বিশাল, বিরাট চর―রাতের অন্ধকারে নদীর স্রোতের শব্দ আমার সারা শরীরে ঘুম নামিয়ে দেয়। আমি বুঝতেই পারি না, পেটটা একেবারে ঠনঠনে খালি হলেও কখন যেন পোটলাটা মাথার নিচে দিয়ে ঘাস-বালির ওপরেই ঘুমিয়ে পড়েছি। কখন, কতক্ষণ পর নাকি তখনই ফের ঘুম ভেঙে যায় টের পাই না, কিন্তু কোথায় যেন একটা পাখি ডেকে ওঠে। আমি অভ্যাসবশে মাকে খুঁজি হাত বাড়িয়ে, কিন্তু কানে সেই লোকটার কণ্ঠস্বর ভেসে ওঠে, ‘আহা, ধাক্কা মারো ক্যান ?’

‘ধাক্কা মারি ক্যান ?’―মার কণ্ঠ তীব্র রাগে হিসহিসিয়ে ওঠে―‘ধাক্কা মারি ক্যান ? বললাম না, পারব না ?’

‘আহা, সারাদিন সারারাত আমার এত দৌড়াদৌড়িÑতুমি যদি শরীরটা আবার তাজা কইরা দ্যাও, সেইটা ভালো হয় না ? এক দিনেই সাধু হয়া গেছ, না ?’

‘বলছি তো, পারব না। যান তো―’

‘তোমাদের উদ্ধার করলাম, রাস্তা চেনায়ে নিয়ে আসলাম, নাওয়ে ওঠার ভাড়াও নিলাম―তার পরও এই ব্যবহার ? ওই হিন্দুগুলা গয়না পর্যন্ত দিছে, জানো ? … ঠিক আছে,―দেখি, কাল নাও ভাড়া না দিয়া বর্ডার পাড়ি দ্যাও কেমনে।’

তারপর আর কোনো কথা শোনা যায় না। না সাপের হিসহিসানি, না শকুনের চিৎকার। লোকটা কেবলই গোঙাতে থাকে, গোঙাতে গোঙাতে বলে চলে, ‘কোনও চিন্তা কইর না, দেশ স্বাধীন হইলে কারও কোনও কষ্ট থাকব না, তোমারও এইসব করতে হইব না―’

‘আমার চিন্তা আপনার করা লাগবে না। আপনি যা করতেছেন, করেন। ও আমি খুব ভালো করেই জানি, আমি একটা ঢেঁকি, সারাজীবন আমার ধানই ভাঙা লাগবে …’

আমি কান পেতে থাকি, ভালো করে বোঝার চেষ্টা করি, মা কী বলছে, কী করছে; আমাকেও তো এই সবই করতে হবে।

মাঝখান থেকে খালি খালি এত দৌড়াদৌড়ি! কোনও মানে হয়!

সচিত্রকরণ : ধ্রুব এষ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may have missed

shares