মাকিদ হায়দার

রবিবার, ১০ এপ্রিল, ১৯৭১

স্পষ্ট থেকে স্পষ্টতর হচ্ছে আমার একাত্তর।

হরিতলার দীনেশ মণ্ডল, ব্রজনাথ পুরের

নিমাই বসাক, গোলাম রসুল

নির্মমভাবে নিহত হলেন,

আজ রবিবার

এপ্রিলের দশ তারিখ

একাত্তরের দুপুর বেলায়।

ঝোঁপ ঝাড়ে পালিয়ে থেকে নিজ জীবন বাঁচলেও

বাঁচল না দোহার পাড়ার উজ্জ্বল শেখ,

নববধূ নুরু বয়াতির,

তুলে নিয়ে গেল ঘাতকের দল।

আটঘড়িয়ার পুরোনো ইটের

গির্জায় মহাপ্রভূ যিশুর নামে প্রার্থনার আগেই

ঘাতকের আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দিল বাড়িঘর।

প্রাচীন গির্জা, খ্রিস্টান পল্লি।

পাদরি গোমেজ, গোমেজ পরিবার

বাঁচল না কেউ।

সারাদিন উড়ল আকাশে বোমারু বিমান

ঘুরপাক দিতে দিতে

পুড়ল শহর

চোখের নিমেষে।

দিন দুই পরে দুপুর বেলায় ‘কারফিউ’

কিছুটা শিথিল হলে

দেখলাম,

হাজার মানুষের ছিন্ন ভিন্ন দেহ, তখনও জ্বলছে নিভুনিভু আগুন,

পোড়াগন্ধ

চারদিকে।

কালাচাঁদ পাড়ার হোমিও ডাক্তার শিশির ভৌমিক,

এল. এম. এফ আবুল হোসেন শুয়ে আছেন রাজপথে

মাছি ভন ভন

চারপাশে।

পাবনা শহরের নূতন ব্রিজের নিচে

নারী-পুরুষের বাঁধা দুই হাত

কালো কাপড়ে বাঁধা চোখ

হাতে পায়ে শত আঘাত।

কারও মাথা নেই, হয়তোবা খেয়েছে শেয়ালে

অথবা কুকুরে।

চারদিকে সুনসান, নিশ্চুপ।

নামছে আঁধার

যেন ঘুমিয়েছে আমর শহর।

তখুনি শুনলাম,

কে যেন বলল আমাকে পালাও

পালিয়ে যাও তরুণ,

একটু পরেই ঈশ্বরদী থেকে আসছে রুম্মান কসাই

সঙ্গে আসবে শখানেক তরুণ বিহারি।

ওরা পাকিস্তান জিন্দাবাদ ধ্বনি দিয়ে

নামল বাঙালি নিধনে।

সেই রাতে কসাই ঘাতকের সাথে মিলাল হাত

বিশাল নেতা টিপু বিশ্বাস

রাধানগরের নুরু খোন্দকার,

ক্যাপ্টেন জায়েদির নির্মম নির্দেশে রাজপথ ভেসে গেল

শোণিত ধারায়।

অপরাধ

শেখ সাহেবের ডাকে কেন দিয়েছিল সাড়া,

বেইমান বাঙালির দল।

নকশাল আর পাঞ্জাবিদের সাথে জুটে গেল মুসলিম লিগ।

জামাতের সুবহান-নিজামির মতো তরুণ পাপিরা।

চারদিকে ধ্বনিত হলো

পাকিস্তান জিন্দাবাদ।

দীর্ঘজীবী হোক ইয়াহিয়া, ভুট্টো, দীর্ঘজীবী হোক

নিয়াজি রাও ফরমান আলি, টিক্কা খান।

সেই স্থানে

ছুটে এল আরিপপুরের নরপিশাচ ঘাতক

আলিমুদ্দি আকন্দ।

রক্তগঙ্গায়

ডুবে গেল হিন্দু অধ্যুষিত ঝলিদহ

হরিতলা ব্রজনাথপুর।

এল চাটমোহর থেকে ডাকাত

সোনাই মল্লিকের ছেলে সাবান মল্লিক

জলপাই জিপে।

সাবান মল্লিক কাঁধে স্টেনগান নিয়ে ঘুরছে শহরে

খুঁজছে মুক্তিযোদ্ধা

সাথে আরেক নকশাল, চোখ কটা নুরুর ছেলে

কিলার মাসুদ।

শহরের বলাকা মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের মালিক কোবাদ আলি শেখ

নিরীহ সুজন

নিহত হলেন গতরাতে সাধুপাড়ার বাসভবনে লোকটির দুই ছেলে, শহিদুল্লা আর মাসুদ।

অপরাধ ছিল

কেন তার দুই ছেলে

শহিদুল্লা আর হাবিবুল্লাহ

কেন গিয়েছে মুক্তিযুদ্ধে।

যুদ্ধ শেষে নিবাসভূমে ফিরল হাজার মানুষ।

বিধ্বস্ত বিরান জন্মভূমি, এল না ফিরে বয়াতির বউ।

মাধপুরের বাদল, কেষ্টপুরের রিদ্দিক, দাপুনিয়ার

আলি আক্কাস,

চেনা জানা প্রিয় মুখগুলো।

আজকাল

যখন তাকাই পেছনের দিকে

পিছু ডাকেন

আমার জনক।

ভালো থাকিস শেখ মুজিবের সোনার বাংলায়।


মুহম্মদ নূরুল হুদা

বৃত্তস্বাধীনতা

আমি কোনওদিন স্বাধীন নই

আমি চিরদিন তোমার অধীন

তুমি কোনওদিন স্বাধীন নও

তুমি চিরদিন আমার অধীন

এসো, তাহলে বিনিময় করি

স্বাধীনতা তোমার আমার

ব্যক্তি থেকে গোষ্ঠী,

গোষ্ঠী থেকে জাতি,

জাতি থেকে মানবতা

এসো  আমরা

উদযাপন করি বৃত্তস্বাধীনতা

জলেস্থলে নভোতলে

সরোবর থেকে

কৃষ্ণবিবরে শ্বেতবিবরে

ঘরে ঘরে চরে চরে

এক জীবন ছেড়ে অন্যজীবনে

নীলনবঘনে

বৃত্তস্বাধীনতা

বলো, তোমার আমার

অভিন্ন শর্ত স্বাধীনতা

বলো, স্বাধীনতার অপর নাম

প্রাণে প্রাণে মর্মরতা

প্রাণে প্রাণে

প্রাণসাম্য

রচনা সবার

স্বাধীনতা,

তুমিই তো চরম সত্য

বৈপরীত্যে বর্বরতার

হে কবি, হে কর্ণধার,

স্বাধীনতা কক্ষনও নয়

কবির একার

দিন আসছে দিন আসছে

দিন কবিতার

দিন বিন্দু থেকে বৃত্তে

সতত নৃত্যপর

বৃত্তস্বাধীনতার


অসীম সাহা

বত্রিশ নম্বরের বাড়ি

আমি জীবনে কখনও বত্রিশ নম্বর রোডের বাড়িতে যাইনি।

অথচ ঐ বত্রিশ নম্বরের বাড়িটি আমার কতদিনের চেনা।

বাঙালির ঘরে যার জন্ম

সে কি কখনও বত্রিশ নম্বরের বাড়িটিকে না-চিনে পারে ?

অথচ কী আশ্চর্য

কতদিন হয়ে গেল, এ-নগরীর বুকের ভেতরে

হৃৎপিণ্ডের মতো বেঁচে আছি

কতদিন বত্রিশ নম্বর সড়কের পাশ দিয়ে চলে গেছি অন্য কোথাও

কিন্তু ভুলেও কখনও একবারের জন্যেও

আমি যাইনি বত্রিশ নম্বরে বাড়িটিতে!

কেমন দেখতে ঐ অবিস্মরণীয় প্রাসাদ ?

স্বপ্নের ভেতরে সোনালি নক্ষত্রখচিত কারুকার্যময় খিলান

আর স্তম্ভিত সিংহদরোজায় ঘেরা

কোনও অলৌকিক স্বপ্নের নামই কি তবে বত্রিশ নম্বরের বাড়ি ?

একদিন কে ওখানে বাস করতেন ?

ওর রহস্যময় অন্দরমহলে কি বাস করতেন

মৌর্যযুগের কোনও দুর্বিনীত রাজা ?

নাকি মোঘল আমলের কোনও দুঃসাহসী সম্রাট তার শেষ আক্রমণের

লক্ষ্য স্থির করতে নিমগ্ন হয়ে অপেক্ষা করছিলেন

ঐ বত্রিশ নম্বরের বাড়িকেই ?

ঐ বত্রিশ নম্বরের বাড়ি থেকেই কি কোনও পরাজিত, ব্যর্থ ও অসহায় কবির

সব কটি পাণ্ডুলিপি বেদনার অশ্রুজলে ভেসে গিয়েছিল ?

আজও আমার কাছে এ-প্রাসাদটি সত্যি অত্যন্ত রহস্যময়!

আমার কিছুতেই বিশ্বাস হতে চায় না

ঐ একটিমাত্র প্রাসাদ বাংলার প্রতিটি মানুষের মনের ভেতরে

এরকম উত্তাল তরঙ্গ সৃষ্টি করতে পারে!

ঐ একটিমাত্র প্রাসাদ সাড়ে সাত কোটি মানুষের

আকাক্সক্ষার সবটুকু সবুজ আর লাল রং একত্রিত করে নিয়ে

পৃথিবীর ক্যানভাসে এরকম অবিশ্বাস্য দৃশ্যখানি এঁকে দিতে পারে!

আমি চোখ বুজলেই দেখতে পাই, একটি অখণ্ড সামুদ্রিক ঢেউ

আছ্ড়ে পড়ছে দু’টিমাত্র শব্দের ওপর

আমি কান পাতলেই দেখতে পাই দূরান্তের গ্রাম থেকে

বাংলাদেশ ছুটে আসছে শহরের দিকে-

যেন ঐ রহস্যময় দু’টি শব্দ বিস্তৃত হতে হতে

                             একদিন পূর্ণ এক বাংলাদেশে পরিণত হবে!

অথচ সেই আশ্চর্য অলৌকিক প্রাসাদটিতে আমার কখনও যাওয়া হয়নি;

আমি শুধু তার কথা শুনেছি।

আমার কখনও কেন যে মনেই হয়নি, ঐ প্রাসাদটি আমার দেখা প্রয়োজন!

কেননা, অনেক অনেক দিন-হাজার, লক্ষ, কোটি বছর ধরে

আমি আমার মনের ভেতরে যে চিরস্থায়ী প্রাসাদ গড়ে নিয়েছি

                                           তার তো একটিই নাম : বত্রিশ নম্বরের বাড়ি!


কাজী রোজী

বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ

সেই কাল রাত্রি আজও ভোলা যায়নি

মেঝেতে লাল রক্তের দাগ আজও মোছা যায়নি

সিঁড়িতে জাতির পিতার ঝাঁজরা বুকের ছাতি আজও ভোলা যায়নি

সেদিন ছিল উনিশশো পঁচাত্তর সালের পনেরো আগস্ট

সেজন্যই তুমি বঙ্গবন্ধু সেজন্যই তুমি বাংলাদেশ

এ মাটির ধূলিকণা যাঁর হাতে হয়েছিল সোনা

যাঁর ডাকে এসেছিল একাত্তুরে স্বাধীনতার জন্মের দিন

সেই কথা সেই পতাকা সেই মানুষের কথা আজও চিরদিন ঋণ হয়ে আছে

তাঁর দুটি চোখ হাসিনা ও রেহানার মুখ

তাঁর সেই বুক বাংলার উদার আকাশ

তাই তুমি বঙ্গবন্ধু তাই তুমি বাংলাদেশ।


আবিদ আনোয়ার

ভ্রান্তি

হতে পারলে না পরমহংস

পানি থেকে ছেনে দুধটুকু খাবে, আর

সত্যের শত জঞ্জাল ঘেঁটে

দেখাতে পারোনি প্রকৃত সারাৎসার ?

মহাকাশজুড়ে ভেজাল তারকা

আলোছায়াময় ভাঙাচোরা কালো রাত;

পাথরখণ্ড অমিত ঝলকে

জ¦লে ওঠে দূরে দেখিয়ে উল্কাপাত।

দেবির ভেতরে খড়ের কাঠামো

প্রতিমা পূজারি প্রলেপে মুগ্ধ তাই

ভক্তের গড়া মনো-অভিধানে

মুখ ও মুখোশে কোনওই প্রভেদ নাই!


শিহাব সরকার

যুদ্ধদিনের চিঠি

বাঙ্কারে বসে লেখা চিঠিগুলো

কখনও কি যায় ডাকঘরে

আমার চিঠির তাড়া আমার দেরাজে,

খুলে পড়ি প্রতি মার্চে, ডিসেম্বরে

ভুলে গেছি কত মুখ, কত নাম

সহযোদ্ধার শেষ স্বগতোক্তি।

অনন্তের শীতে জমে যাওয়া

মুক্তিসেনাদের এইসব চিঠির

অক্ষর মুছে গেছে অশ্রু আর রক্তের ফোঁটায়

অচেনা পাহাড়প্রান্তরে, বনে, নদীতীরে

হাওয়া আর বুনো কবুতরের বেশে

পত্রদূতেরা ছিল অফুরান।

চিঠি উড়েছে  বাতাসে পায়রার ঠোঁটে

তোমাকে লেখা আমার যুদ্ধদিনের

আগুন আর রক্তে রক্তিম-কালো চিঠিগুলো

তোমার জানালায় মাথা কুটেছে

শূূন্য বাড়ি। স্তব্ধ বাড়ি। মৃত্যুর বাড়ি।

বাঙ্কারে বসে লেখা চিঠিগুলো―

ছিল পকেটে, গামছায় বাঁধা

আমার দেরাজে বন্দি চিঠিগুলো

কবে পাঠাবো দিগন্তপারে

হাওয়া নেই, মরা পাতা ঝরে রাত্রিদিন

ডানাভাঙা পায়রা ঝিমায় নিমডালে।


নাসির আহমেদ

সময়ের সেই ট্রেনে যেতে যেতে

ট্রেন এসে হয়তবা থামবে এখানেই অগ্নির জংশনে

স্মৃতিকণা থেকে জল ঝরবে তখনও মনে মনে।

ট্রেন যায় সময়ের ধারাবাহিকতা লাইন ধরে

অগ্নি আর রক্তেভেজা সেই দিনগুলো মনে পড়ে।

আমরা পেরিয়ে যাই এইভাবে ইতিহাস-ভূগোলের সীমা

একাত্তর জেগে থাকে রক্তস্নাত স্মৃতির নীলিমা!

উপনিবেশের কালো চাবুকের নিচে ক্রোধ আর্তনাদ করে

তেইশটি বছর পরে ‘সাহস’ শব্দটি লিখি রক্তের অক্ষরে।

ট্রেন আসে ট্রেন যায় স্মৃতির জংশনে নামে রাত

রাত্রি শেষে ভোর হবে, আমাদের রক্তে জ্বলে মুষ্টিবদ্ধ হাত।

আলোর প্রপাত চোখে অন্ধকার ঠেলে যাই দূরে

দেবদূতের মতো পিতা সহসা ওঠেন জেগে অন্ধকার ফুঁড়ে।

তাঁর সাথে পথে নামি, তাঁরই ইশারায় পথ চলি

সেই তো প্রথম আমি আর বাংলাদেশ প্রতিজ্ঞায় জ্বলি।

জ্বলে ওঠে দাউদাউ সাহসের তীব্র শিখা এই লোকালয়ে একটি আঙুল উঠে যায় আকাশের দিকে অসীম প্রত্যয়!

সেই মহাসময়ের জনসমুদ্রেই শুনি বজ্রকণ্ঠস্বর

স্বাধিকার হয়ে যায় কী নির্ভয়ে স্বাধীনতা-যুদ্ধজয়ী ঝড়!

অগ্নির দেবতা যেন পুড়ে দেন দুঃস্বপ্নের যত আবর্জনা

শত্রুর বিরুদ্ধে তুলি একযোগে ছোবলের সাতকোটি ফণা।

পঞ্চাশ বছর পরে আজ দেখি সময়ে তীব্র ঝড় শেষে অপমান-লাঞ্ছনার গ্লানি পার হয়ে মহাগৌরবের দেশে

দাঁড়িয়েছে মাতৃভাষা আর স্বাধীনতা এই রূপসী বাংলায়, বিস্ময়ে পৃথিবী দেখে একই ট্রেনে বঙ্গবন্ধু, রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে বাংলাদেশ যায়!

রক্তস্নাত অগ্নিদগ্ধ সেই যে চরম স্মৃতিমাখা দুঃসময়

সে-সময় পাড়ি দিয়ে আমরা গর্বিত আজ প্রত্যয়ী নির্ভয়।


কামাল চৌধুরী

মহাবিজয়ের মহানায়ক

সেদিন আকাশে ছিল না সূর্যতারা

কালো মেঘে ঢাকা পড়েছিল মহাকাশ

হানাদার এসে ছোবল দিয়েছে দেশে

সব নদীজলে রক্তের ধারা মেশে

খাঁচায় বন্দি  তোমাকে করতে পারে!

তোমার স্বপ্ন কে পারে ছিনিয়ে নিতে ?

যে সাহসে তুমি উঁচু রাখো তর্জনী

সেখানে পদ্মা গঙ্গার প্রতিধ্বনি।

অস্ত্রটা আমি তুলেছি তোমার ডাকে

এর চেয়ে বড় ডাক আমি শুনি নাই

রক্তের দাগ শুকাতে দাওনি তুমি

রক্তআখরে লিখেছ জন্মভূমি।

হাজার বছর পেরিয়ে এসেও দেখি

এই ইতিহাস লেখা আছে ধমনিতে

বাঙালি রক্তে আমাদের পরিচয়

শৃঙ্খল ভেঙে এসেছ জ্যোতির্ময়।

মধুমতি থেকে পেরিয়ে এসেছি পথ

পতাকার নিচে জেগে থাকি সন্তান

মহাবিজয়ের মহানায়কের নাম

বঙ্গবন্ধু মুজিবুর রহমান।

২৯/১০/২০২১


রেজাউদ্দিন স্টালিন

বিক্ষত পদাবলি

মুক্তিযুদ্ধে বিক্ষত এ দেশ দেখলে মনে হতো পা কেটে ফেলা কোনও অশত্থ

এলেন গিন্সবার্গ বলেছিলেন―

জমাটবাঁধা কান্নার পাহাড়

সেই কান্নার পাহাড় আরও উঁচু হয়েছে

পঞ্চাশ বছর ধরে

সেই কান্নার পাহাড় থেকে এখন চুঁইয়ে নামছে আর্তনাদ

আর গল গল করে উঠছে মৃতদের অভিশাপ

কারা তৈরি করে দেয় বিভেদের বিভীষিকা

পীরগঞ্জের মাঝি পাড়ায় দুঃখে

দুমড়ে গেছে বৈঠা

রামুর মন্দিরে বেদনায় বোবা হয়ে গেছে সান্ধ্য ঘণ্টা

রক্তে আরও পিছল হয়েছে

দীঘির পাড়

চোখ বাঁধা মানুষের দীর্ঘ সারি

পাথরের পথে দাঁড়ানো হতবিহ্বল

এখনও কি আমরা―সেপ্টেম্বর অন

যশোর রোড

এখনও কি অসাম্প্রদায়িক হয়ে

ওঠেনি সংবিধান

যারা বাতাস নিংড়ে তৈরি করে সম্প্রীতি

বিশ্বাস থেকে ছড়ায় আজান

কথা ছেঁকে তৈরি করে স্তোত্র

তাদেরই আত্মায় জ্বলে উঠল অশনি

হাজার-পাঁচ শ

এক শ কিংবা পঞ্চাশ বছর

আমাদের খেরো খাতায় লেখা পদাবলি আজ ধর্মান্ধতার বলি

শয়তানের ফাঁসির রজ্জুতে ঝুলছে

আমাদের আত্মত্যাগ

——————————–

মারুফুল ইসলাম

একাত্তর

শ্যামল বনানী যখন বিধ্বস্ত হয়ে যায় কোনও তাণ্ডবে

তখন আকাশের নীল আরও গাঢ় হয়ে ওঠে

নদীর স্বচ্ছ জল যখন রক্তলাল হয়ে যায় জিঘাংসায়

তখন বাতাসের গন্ধ বয়ে আনে মুক্তির বার্তা

মানবিক গৃহস্থালি যখন অগ্নিকাণ্ডে খাক হয়ে যায়

তখন ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইলে ওড়ে পতপত প্রাণের পতাকা

এখানে সবুজ শুধু সবুজ নয়

এ আমাদের ভালোবাসার বিজয় কেতন

এখানে লাল শুধু লাল নয়

এ আমাদের আকাক্সক্ষায় আরক্তিম

এখানে সোনালি শুধু সোনালি নয়

এ আমাদের অনুভবে হিরণ¥য়

মানুষের গল্প থেকে জন্ম নেয় রূপকথা

হঠাৎ আলোর ঝলকানিতে পরিরা ডানা মেলে অবিশ্রান্ত দিগন্তে

পাখি আর পারিজাতের সমারোহে

বসন্ত নৃত্য করে শীতের মঞ্চে ও নেপথ্যে

আমরা তখন কথা বলি সে ভাষায়

যে ভাষায় মা আমাদের বুকের স্পন্দন ব্যাখ্যা করে

আমরা তখন বেঁচে থাকি সে মৃত্তিকায়

যে মাটিতে আমরা মৃত্যুতেও জয় করি অমরত্ব

আমরা তখন ভালোবাসি সে সম্ভাবনায়

যার টানে অনিত্যও নিত্য হয়ে ওঠে

কাগজে কলমে কত রং কত রেখা

মাতৃভূমির মানচিত্র আঁকার জন্য

তবু দরকার একটি একাত্তর

যে একাত্তর মার্চ থেকে ডিসেম্বরে

সগৌরব ঘোষণা করে

সবার উপরে মানুষ সত্য

তাহার উপরে নাই


সচিত্রকরণ : নাজিব তারেক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may have missed

shares