টিফিন ক্যারিয়ার : আখতার হুসেন

শিশুসাহিত্য : কিশোর গল্প

‘এই মঞ্জু, মঞ্জু। দাঁড়া।’

পেছন থেকে ডাকটা কানে আসতেই মঞ্জু থমকে দাঁড়ায়। ভালো করে তাকাতেই দেখে, আর কেউ নয় ডাকছে সোনাল। ওর ক্লাসমেট। দুজন একসঙ্গে পড়ে―ক্লাস সেভেনে।

কাছাকাছি যেতেই সোনাল মঞ্জুর একটা হাত চেপে ধরে বলে, ‘কোথায় যাচ্ছিস ?’

‘বড় দাদার বাসায়,’ মঞ্জু বলে।

‘ও, তোর সেই পণ্ডিত দাদা! পাঁচ পাঁচটি ভাষা জানেন যিনি।’

‘হ্যাঁ, তাঁর কাছেই যাচ্ছি।’

‘আমাকে নিবি তোর সঙ্গে। তোর বড় দাদাকে আমার দেখার বড্ড শখ।’

‘চল।’

কথা শেষ করে দুজন পাশাপাশি পাল্লা দিয়ে হাঁটতে শুরু করে। লেক সার্কাস থেকে ধানমন্ডি দু নম্বর রোড। জোরে হাঁটলে বড়জোর পনেরো থেকে বিশ মিনিটের পথ।

অল্পক্ষণের মধ্যেই ওরা ধানমন্ডি দু নম্বরে পৌঁছে যায়। লেকের পাড় ঘেঁষা একতলা বাড়িটার গেটের সামনে এসে বাইরে থেকে বেল টেপে। বেরিয়ে আসে বছর পঞ্চাশেক বয়সের একজন লোক। তাকে দেখে মঞ্জু বলে, ‘দাদা বাড়িতে আছেন সবদুল ভাই ?’

‘আছেন। এসো, ভেতরে এসো।’

সবদুল হচ্ছেন বড় দাদার পালক ছেলে। দাদা তাকে পথ থেকে কুড়িয়ে এনেছিলেন দশ বছর বয়সে। লেখাপড়া শিখিয়েছেন। সাত কুলে তার কেউ নেই। এমএ পাস করেছেন সেই কবে। চাকরি-বাকরির ধান্ধা নেই। বড় দাদার সেবাতেই তার সময় চলে যায়। ঘরে ঢুকতেই ওরা দেখে দাদা একটা প্রশস্ত খাটে শুয়ে আছেন। বয়স প্রায় আশি ছুঁই ছুঁই। কিন্তু বুঝবার উপায় নেই।

‘কী মনে করে মঞ্জু’, দাদা তাকে দেখামাত্রই পাশ ফিরে জিজ্ঞেস করেন। ‘সঙ্গে ওটি কে ?’

‘আমার ক্লাসমেট সোনাল,’ জবাব দেয় মঞ্জু।

‘বসো,’ বড় দাদা বলেন। ওরা খাট সোজা সোফা সেটে বসে। পাশাপাশি।

মঞ্জু এবার একটু নড়েচড়ে বড় দাদার মুখের দিকে তাকায়, ‘মা বলছিল, তোমার ঘরে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি জড়ানো একটা ভয়ঙ্কর জিনিস আছে।’

‘তোর মা বলেছে ?’

‘হ্যাঁ, মা বলেছে।’

বড় দাদা প্রশ্নটা শোনার পর কিছুক্ষণ চুপ করে থাকেন। মঞ্জু আর সোনালও চুপ করে বসে থাকে। তবে চোখে-মুখে তাদের অপার কৌতূহল। দাদা হয়ত এক্ষুনি এমন কিছু বের করে দেখাবেন, যা দেখে তাদের বিস্ময়ের ঘোর সহজে কাটবে না।

‘সবদুল,’ দাদা ডেকে ওঠেন।

‘জি, আসছি বাবা,’ পাশের ঘর থেকে সাড়া দেন সবদুল ভাই। তারপর এ ঘরে সে আসতেই দাদা তাকে বলেন, ‘টিফিন ক্যারিয়ারটা নিয়ে আয় তো।’

টিফিন ক্যারিয়ারের কথা শুনে মঞ্জু আর সোনাল কেমন ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে যায়। চেহারায় কৌতূহলের পরিবর্তে ফুটে ওঠে কেমন একটা দোনোমোনো ভাব।

সবদুল ভাই নিয়ে আসেন মোটামুটি বড় সাইজের একটা টিফিন ক্যারিয়ার। ঝকমকে তকতকে। মনে হয় মাত্রই বুঝি পরিষ্কার করে আনা হয়েছে।

‘এই যে টিফিন ক্যারিয়ার দেখছ, এটাই মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি-জড়ানো ভয়ঙ্কর সেই জিনিস।’

‘তার মানে’, প্রশ্ন করে মঞ্জু। সোনাল একটু নড়েচড়ে বসে।

বড় দাদা বলে চলেন, ‘তুই তো জানিস, আমি বিয়ে থা করিনি। মুক্তিযুদ্ধের সময় আমার এ বাড়ি যেমন ছিল, এখনও তা-ই আছে। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার এক বছর আগে আমি সবদুলকে ঘরে তুলে আনি। ওর বয়স তখন মাত্র নয় কি দশ। ও-ই হয়ে ওঠে আমার পরম নির্ভর ডান কি বাম হাত। আর এই টিফিন ক্যারিয়ার হয়ে ওঠে আমাদের প্রাণ ভোমরা।’

‘কীভাবে’, আবার প্রশ্ন মঞ্জুর। এবার বড় বড় চোখে তাকায় সোনাল।

‘মুক্তিযুদ্ধের সময় তোর তো জš§ই হয়নি। তোর বড় মামা সাজ্জাদ তোদের লেক সার্কাসের বাসায় থেকে ঢাকা ভার্সিটিতে পড়াশোনা করত। রাজনীতির সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছিল গভীরভাবে। একাত্তরের সাতাশে মার্চ বাসা থেকে পালিয়ে বহু পথ ঘুরে ভারতে চলে যায়। অংশ নেয় মুক্তিযুদ্ধে। যত রকমের ঘোট তো পাকায় ওই-ই।’

‘কীভাবে’, আবারও প্রশ্ন করে মঞ্জু।

‘ঢাকা শহরের নানা গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় গেরিলা অপারেশন চালানোর দায়িত্ব নিয়ে ও একদিন আমার বাসায় এসে হাজির। আমি তো মহাখুশি। বুঝবার উপায় ছিল না যে, ও মুক্তিযোদ্ধা। কথায় কথায় ও আমাকে ওর উদ্দেশ্যের কথা জানায়। আমি একা মানুষ। আমার সংসার নেই। সংসার বলতে একমাত্র সবদুল। ওকে নিয়েই আমার সব। তাই আমার ভয়ের বালাই ছিল না। সরকারি চাকুরে। তোর মামাকে বলি, ও আমার কাছ থেকে যথাসাধ্য সমর্থন পাবে।’ বড় দাদার কথা ফুরোতে চায় না। ‘একদিন আমার এখানে থেকে ও কোথায় যেন চলে যায়। তখন তো রোববারে সরকারি ছুটির দিন ছিল। পরের হপ্তার ছুটির দিন ও আমার বাসায় আবারও আসে। সঙ্গে ওর দুপাশের কোমরে গোঁজা দুটো রিভলবার। অস্ত্র দুটো আমার কাছে জিম্মা রেখে বলে, কাউকে দিয়ে কৌশলে পৌঁছে দিতে হবে দুটো জায়গায়। নিজের হাতে ঠিকানা লিখে দেয়।’

‘তারপর’, ব্যগ্র জিজ্ঞাসা মঞ্জুর।

‘তারপর আর কি’, বড় দাদা বলতে থাকেন। ‘ওই যে টিফিন ক্যারিয়ারটা দেখছিস, ওর চারটা বাটির দুটোতে তরকারি ভরি। আর দুটোতে ভাত। ভাতের নিচে গোঁজা থাকে পলিথিনে মোড়ানো প্রথম দিন একটা রিভলবার আর কয়েকটা গুলি। পরের দিনও আরেকটা তোর বড় মামার ঠিকানা মতো পৌঁছে দেই আমি আর সবদুল। পৌঁছে দেই পুরোনো ঢাকার দুই এলাকার দুটো বাড়িতে। সেই পিস্তল দিয়ে নাকি দুজন মুক্তিযোদ্ধা সেপ্টেম্বর মাসের দিকে গুলি করে মেরেছিল দুজন রাজাকারকে। আমরা দুজন রিকশায় চেপে এমনভাবে যেতাম, মনে হতো, কোনও আত্মীয়ের বাড়িতে যাচ্ছি।’

এবার চোখ দুটো উজ্জ্বল হয়ে ওঠে মঞ্জু আর সোনালের। কোনও মতে শুধু বলে, ‘তারপর বড় দাদা, তারপর ?’

‘তারপরের তো শেষ নেই রে দাদু,’ ঠাণ্ডা গলায় বলতে থাকেন বড় দাদা। ‘তোর মামা সেই সেপ্টেম্বর মাসেরই শেষাশেষি তিনটা গ্রেনেড রেখে যায় আমার কাছে। ঠিকানাও দিয়ে যায়। পলিথিনে মুড়িয়ে একইভাবে ওই টিফিন ক্যারিয়ারে ভরে ফেলি প্রথম দিন দুটো গ্রেনেড, পরের দিন বাদবাকি গ্রেনেডটা। দুদিনে দুটো জায়গায় পৌঁছে দেই সেগুলো। এবার পৌঁছে দিতে হয় মালিবাগ আর খিলগাঁওয়ের দুটো ঠিকানায়। ওই গ্রেনেড চার্জ করে মুক্তিযোদ্ধারা ধ্বংস করে দিয়েছিল পাকিস্তানি মিলিটারিদের দুটো অস্থায়ী চেকপোস্ট। হতাহত হয়েছিল পাকিস্তানি সৈন্যসহ দশজন এ দেশীয় দালাল।’

বড় দাদা যখন কথাগুলো বলছিলেন, তার দু চোখ তখন আলো ছড়াচ্ছিল গর্বের এবং একটা আত্মতৃপ্তিরও। তাই দেখে মঞ্জু বলে, ‘দাদা, তোমার গর্ব হয় না ?’

‘হয়, হবে না কেন ? তবে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের জয়ে কতজন আরও কতভাবে অবদান রেখেছেন, কত বড় বড় আত্মত্যাগ করেছেন, সেসব কথা ভাবলে গলা রুদ্ধ হয়ে আসে। মুক্তিযুদ্ধে আমাদের সামান্য অবদানের কথা এই প্রথম তোমাদের বললাম।’

‘দাদা’, মঞ্জু বলে, ‘তোমার ওই টিফিন ক্যারিয়ারটা মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে দান করে দাও।’

‘নারে দাদু, ওটাকে আমি হাতছাড়া করব না। ওটা আজীবন আমার ব্যক্তিগত আলমারিতেই রাখা থাকবে।’ কথাটা বলেই তিনি হাঁক পাড়েন, ‘সবদুল।’

সবদুল এসে দাঁড়াতেই বড় দাদা তার হাতে তুলে দেন টিফিন ক্যারিয়ারটা। সেটা হাতে তুলে নিতেই সবদুলের মনে হলো, দাদু সেই একাত্তরের বয়সি হয়ে গেছেন। আর  সে নিজে যেন সেই বছর দশকের বালকটি মাত্র।

সচিত্রকরণ : তাইয়ারা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may have missed

shares