আশ্চর্য এক কুয়াশার গল্প : লুৎফর রহমান রিটন

শিশুসাহিত্য : কিশোর গল্প

১৯৭১।

মার্চের মাঝামাঝি সময়ে বাবার নেতৃত্বে আমরা পুরো ফ্যামিলি দলবেঁধে আমাদের গ্রামের বাড়িতে গিয়েছিলাম। আমাদের সেই গ্রামযাত্রার পেছনে একটা পৈশাচিক পরিকল্পনা ছিল বাবার। আর সেটি ছিল আমাকে কেন্দ্র করে। মূল উদ্দেশ্য আমাকে মুসলমান বানানো। অর্থাৎ কি না মুসলমানি। এই কাজে শহরের কোনও সার্জন নয়, বাবার পছন্দ ছিল গ্রামের এক্সপার্ট হাজাম। যিনি এই কাজে খুর বা ধারালো ছুরি ব্যবহার না-করে ব্যবহার করেন কাঁচা বাঁশের শার্প চল্টা। ওই চল্টার সামান্য ছোঁয়াতেই নাকি কেল্লা ফতে! বাবার মতে মুসলমানির কাজে গ্রামের হাজাম হচ্ছেন পৃথিবীর সেরা সার্জন। আমার কাটাকাটির কাজটা বিখ্যাত সেই হাজামই করবেন।

শুনে তো দিশেহারা হয়ে পড়লাম। আমার ‘মুসলমানি’ করানোর বীভৎস পরিকল্পনাটা সবাইকে আনন্দিত করছিল কিন্তু আমি ছিলাম ভয়ার্ত। একজন কিশোরের ইয়ে কাটা নিয়ে এ রকম পৈশাচিক আনন্দে মেতে ওঠা মানুষগুলোকে আমার মনে হচ্ছিল পৃথিবীর নিষ্ঠুরতম মানুষদের প্রতিনিধি। একটি বালকের প্রতি ভয়াবহ নিষ্ঠুরতা চালানো উপলক্ষে আত্মীয়পরিজনসমেত এলাকার মানুষদের মিষ্টিমুখ করানোসহ দ্বিপ্রাহরিক একটা ভোজেরও পরিকল্পনা ফাইনাল করা হয়েছিল। আমার প্রতি সংঘটিতব্য নৃশংসতাকে সেলিব্রেট করতেই আমাদের সেই গ্রামযাত্রা।

কী আর করা। সংসারে ছোট্ট একটা বালকের কোনও ক্ষমতাই থাকে না বড়দের ‘ভুল সিদ্ধান্ত’কে প্রতিরোধের বা প্রতিহতের। সুতরাং বলির পাঁঠা হিসেবে বাবা-মায়ের বাক্স-পেট্রার সঙ্গে এক সকালে আমিও রওনা হলাম গ্রাম অভিমুখে।

সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালে পৌঁছে মনটা প্রফুল্ল হয়ে উঠল।

বিশেষ করে লঞ্চে ওঠার পর এবং লঞ্চটা আমাদের নিয়ে যাত্রা শুরু করার পর স্নিগ্ধ সকালের ফুরফুরে হাওয়ায় নিজেকে বলির পাঁঠা ভাববার ফুরসত পেলাম না আর। বিরতিহীনভাবে কিছুক্ষণ ভেঁপু বাজিয়ে লঞ্চ স্টার্ট নিল। গাড়ির মতোই প্রথমে ব্যাক গিয়ারে গিয়ে তারপর ডানদিকে চলতে শুরু করল লঞ্চটা। লঞ্চটা যিনি চালাচ্ছেন তিনি কোনও ড্রাইভার নন। তিনি ‘সারেঙ’। লঞ্চ-স্টিমার-জাহাজের চালকেরা কেউই ড্রাইভার নন। সবাই তাঁরা সারেঙ। লঞ্চ এগিয়ে যাচ্ছে বুড়িগঙ্গা নদীর জলসমুদ্র কেটে কেটে। গন্তব্য আমাদের কুমিল্লার বাঞ্ছারামপুর।

দারুণ অভিজ্ঞতা হলো লঞ্চে।

দোতলা লঞ্চ। অপেক্ষাকৃত গরিব যাত্রীরা যাচ্ছে নিচতলায়, গাদাগাদি করে বসে। সিট না-পেয়ে ফ্লোরে কাপড় বিছিয়েও বসে পড়েছে অনেকে। ওপর তলায় আলাদা আলাদা কেবিন না-থাকলেও বেশ বড়সড় গণকেবিন আছে একটা। এখানে খানিকটা আরামদায়ক ফোম আর রেক্সিনের টানা লম্বা সিট। খুব সুবিধেমতো কর্ণারে আমাদের সিটগুলোর দখল নেওয়া হলো।

লজেন্স চানাচুর ঝালমুড়ি চিনেবাদাম সেদ্ধ ডিম আর আচারওয়ালারা কিছুক্ষণ পর পর হাঁক দিচ্ছিল কেবিনের দরোজা আর জানালার সামনে এসে। আমার বয়েসি একটা ছেলে বার বার আমার জানালার কাছে এসে আমার কাছে খুব কমদামি কিছু লজেন্স বিক্রি করতে চাইছিল। আমাদের সঙ্গে খানাখাদ্য ছিল প্রচুর। তাছাড়া সেই বয়সে একটা টাকাও ছিল না পকেটে। সুতরাং আমার বয়েসি ছেলেটার কাছ থেকে লজেন্স কেনার কোনও সুযোগ আমার ছিল না। কোনও রকম মন খারাপ না-করেই অবশ্য ছেলেটা আমার কাছ থেকে চলে গিয়েছিল অন্য কাস্টমারের খোঁজে।

বাবার অনুমতি নিয়ে ‘সাবধান থাকার শর্তে’ কেবিন থেকে বেরিয়ে মনটা আমার খুশিতে ভরে গেল। কী সুন্দর বাতাস! আমার মাথার চুলগুলো বাতাসে এলোমেলো হয়ে গেল। এই এলোমেলো হয়ে যাওয়াকে আসলে বলা উচিত আউলাঝাউলা হয়ে যাওয়া। আমি আমার আউলাঝাউলা চুল কিছুতেই সামাল দিতে পারছিলাম না।

এগিয়ে গেলাম সামনের দিকে। এই দিকটায় বাতাসের দাপট আরও বেশি। লঞ্চ যাচ্ছে নদীর প্রায় মাঝখান দিয়ে। দু’পাশে মোটা ব্রাসে টানা সবুজ রঙের দুটো স্ট্রোকের মতো গ্রামের গাছগুলো দেখা যাচ্ছে। কোনও কারণ ছাড়াই লঞ্চের সারেঙ ভেঁপু বাজালেনÑভুঁউউউউ। আমি খানিকটা চমকে পেছনে তাকালাম। চালকের আসনে বসা সারেঙ আমার দিকে হাত নাড়ালেন। জবাবে আমিও নাড়ালাম। সারেঙ লোকটাকে ইন্টারেস্টিং মনে হচ্ছে। আমাকে চমকে দিতেই রসিক সাড়েং ভেঁপুটা বাজিয়েছেন।

লঞ্চটা দোতলা বলা হলেও আসলে দেড়তলা। মন চাইল একটু নিচের ফ্লোরটা ঘুরে আসি।

দোতলা থেকে নিচতলায় যেতে হলে ছয়-সাত স্টেপের ছোট্ট একটা সিঁড়ি ভাঙতে হয়। সিঁড়িটা একটু খাঁড়া। তবে ডানদিকে হাতল আছে। ওটা ঠিকমতো ধরে স্টেপ নিলেই নামাটা বিপজ্জনক নয়। এই সিঁড়ির ডানদিকে জায়গা খুব বেশি প্রশস্ত নয়। তাছাড়া কোনও রেলিঙও নেই এখানটায়। বড়জোর ফুটখানেক উঁচু টানা একটা সীমানাপ্রাচীর আছে। নিয়মিত লঞ্চে আসা-যাওয়া করেন এমন লোকজন ওখান দিয়ে চলাচল করতে পারেন অনায়াসে কিন্তু আমার মতো পেসেঞ্জার হলে খবর আছে।

প্রথমে নামলাম দোতলা আর নিচতলার খুদে করিডোরে। ওখান থেকে এবাউট টার্ন হয়ে আরেকটা আট দশ স্টেপ সিঁড়ি ভাঙতে হলো। তবে এখানে কোনও বিপদ নেই। আর এটা তেমন খাঁড়াও না।

নিচ তলাটা ইঞ্জিনের শব্দ বাতাসের শব্দ আর জলের শব্দ মিলেমিশে এমন একটা শব্দময় এলাকা যে এখানে কথা বলতে হয় চিৎকার করে। তা না-হলে কোনও কথাই শোনা যায় না। ইঞ্জিন বাতাস আর জলের শব্দের সঙ্গে মানুষের উচ্চকণ্ঠের কথাবার্তার মিশ্রণে একটা অদ্ভুত পরিবেশ এখানে। লঞ্চের দুপাশেই টানা লম্বা দীর্ঘ বেঞ্চি। সেই বেঞ্চিতে এক ইঞ্চি ফাঁক নেই এমন ঠাঁসাঠাঁসি করে লোকজন বসেছে। আর যারা বেঞ্চিতে চান্স পায়নি তারা বসেছে ফ্লোরে চাদর কিংবা মাদুর পেতে। মানুষের হাঁটাচলার জন্যে দু’পাশেই খানিকটা স্পেস অবশ্য ছেড়ে দেওয়ার নিয়ম কিন্তু সবাই সেই নিয়ম মানছে না। ‘এই যে ভাই একটু যাইতে দ্যান প্লিজ’ কিংবা ‘এই যে ভাই একটু সইরা বসেন’ বলতে বলতে এগোতে হয়। এই জায়গাটায় শব্দ এত বেশি যে ছুঁয়ে দেওয়া দূরত্বে থাকা মানুষটার কথাও বোঝা মুশকিল। ফেরিওয়ালারা ওপর তলা থেকে নিচ তলায় বেশি তৎপর। এখানেই ওদের বিক্রি বেশি। বেশ খানিকটা দূরে লজেন্স বিক্রেতা ছেলেটাকেও দেখলাম মহা উৎসাহে লজেন্স বিক্রির চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। আমার চোখে চোখ পড়তেই এত মিষ্টি করে হাসল ছেলেটা! আমিও হাসলাম।

চলে এলাম লঞ্চের একদম পেছনটায়। এখানে দুটো টয়লেট আছে পাশাপাশি। তুলিতে শাদা রঙে একটায় লেখা ‘পুরুষ’ অন্যটায় ‘মহিলা’। খুবই ছোট্ট একটা করিডোরের মতো জায়গা আছে এখানটায়। করিডোরের দুদিকেই হাট করে খোলা। কোনও দরোজা বা দেয়াল নেই ওখানে। লোহার মোটামুটি লম্বা একটা শেকল দিয়ে বাঁধা একটা ছোট বালতি আছে একপাশের খোলা অংশে। একজনকে দেখলাম শেকলবাঁধা বালতিটাকে নদীতে ছুড়ে ফেলে দিয়ে অপূর্ব দক্ষতায় পানিভর্তি বালতিটাকে টেনে তুলে এনে একটা অ্যালুমিনিয়ামের বদনায় সেই পানি ভরলেন। তারপর ‘পুরুষ’ লেখা টয়লেটে ঢুকলেন আমাদের দিকে মুচকি হেসে।

পৃথিবীতে একটা বিরাট আবিষ্কার হচ্ছে এই বদনা। অথচ এর আবিষ্কারকের নাম কোথাও লেখা নেই। এ রকম ইউজফুল একটা জিনিসের আবিষ্কারকের প্রতি আধুনিক শিক্ষিত লোকজন খুব অবজ্ঞা প্রদর্শন করেছে। অথচ এই বদনা ছাড়া মানুষের চলে না।

এই করিডোর দিয়েও ওপরে ওঠার ব্যবস্থা আছে। তবে সিঁড়ি নেই। পেটসমান উঁচু একটা লেভেলে জানালা টাইপের খোলা একটা ফোকরের ওপারেই লঞ্চের ওপরতলার প্যাসেজ। লোকজন অদ্ভুত দক্ষতায় দু’হাতে সেই ফোকরের দুপাশের কাঠের পাটাতনের ওপর শরীরের ভর রেখে শরীরে শিম্পাঞ্জির মতো একটা দুলুনি টাইপের ঢেউ তুলে সাঁই করে ওপরে উঠে যায়।

এবার ওপর তলায় যাব। এক ভদ্রলোক দুহাতে উঁচু করে ধরে সেই ফোঁকর দিয়ে ওপর তলায় ঠেলে তুলে দিলেন আমাকে। তারপর শিম্পাঞ্জির মতো ছন্দময় ঢেউ তুলে নিজেও উঠে এলেন!

ওপর তলার একদম পেছন দিকটায় একটা উঁচু জায়গা। ছোট্ট রেলিঙ ঘেরা। এটা হচ্ছে নিচ তলার টয়লেট এবং টয়লেট-লাগোয়া ছোট্ট করিডোরের ছাদের অংশ। এখানে একটা বড় ড্রামের মতো জিনিস আছে। ওটা দিয়ে ধোঁয়া বেরোয়। ইঞ্জিনের ধোঁয়া। ড্রামের মধ্যে খুব মোটা আর বড় হরফে লেখা ‘নামাজের স্থান’। এখানে কয়েকজন লোক নামাজ পড়ছেন। নামাজ পড়তে হয় পশ্চিম দিকে সেজদা দিয়ে। তাঁরা পশ্চিম দিকে সেজদা ঠিক করেই নামাজ শুরু করেছিলেন। কিন্তু কিছুক্ষণ পরেই লঞ্চ একটু ডানে বাঁক নিতেই তাঁদের সেজদার দিক গেল পালটে! যাঁরা নামাজ পড়ছিলেন তাঁরা কিন্তু দিক না-পাল্টেই নামাজ বহাল রাখলেন।

দোতলার যাত্রীদের কেউ কেউ কেবিনের পেছনের বিশাল ফাঁকা জায়গাটায় চাদর এবং টাওয়েল পেতে বসেছেন বাইরের বিশুদ্ধ হাওয়া খাওয়ার জন্যে। ওখানে কিছুক্ষণ বিশুদ্ধ বায়ুসেবন করে ফিরে এলাম কেবিনে।

কেবিনের যাত্রীরা দিনদুনিয়ার নানান বিষয়ে বিশেষজ্ঞ মত দিচ্ছেন যে যার মতো। এখন টিভিতে যেমন টক শো হয় তেমনি কিছু সবজান্তা লোক অবিরাম তর্ক করছিল। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি কারেন্ট নেই বিশুদ্ধ পানি নেই টাইপের টপিকে মেতে ছিল লোকগুলো। তাদের সঙ্গে বিপুল উদ্যমে অংশ নিচ্ছিলেন সরকারি চাকুরে আমার বাবাও। আলোচকরা প্রশ্ন ছুড়ে দিচ্ছিলেন সবজান্তাদের উদ্দেশে―বলুন তো জিনিসপত্রের দাম যেভাবে বাড়ছে, বাস ভাড়া ট্রেন ভাড়া লঞ্চ ভাড়া বাড়ছে তো বাড়ছেই, ওয়াশার কলে পানি নেই, পথে ঘাটে বেওয়ারিশ কুকুরের উৎপাত, মানুষের জীবনের কোনও নিরাপত্তা নেই, এমন দেশে কি বসবাস করা যায় ? বলুন যায় ? দেশটা রসাতলে যাচ্ছে হেহ্‌ হেহ্‌ হেহ্‌ …।

যেন দেশ রসাতলে যাওয়াটা বিরাট একটা আনন্দের ব্যাপার!

সারেঙ-এর কাছে গেলাম পায়ে পায়ে। সারেঙ-এর রুমটা লম্বাটে সরু আর চ্যাপ্টা মতোন। লঞ্চের স্টিয়ারিংটা ঠিক গাড়ির স্টিয়ারিং-এর মতো না-হলেও মিল আছে বেশ। লঞ্চটা চালাতে হয় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে। আর সে কারণেই পেছনে একটা টানা লম্বা বেঞ্চির ব্যবস্থা থাকার পরেও সরু লম্বা এবং খাড়া একটা টুলও আছে স্টিয়ারিং বরাবর। পায়ে ঝিঁঝিঁ লাগলে এই টুলে বসেও সারেঙ লঞ্চটা চালান।

আমাকে অনেক সম্মান দেখালেন তিনি।

সারেঙ চাচা আমাকে―‘কিছুক্ষণ লঞ্চটা চালাইতে চাও নাকি ভাতিজা ?’ জিজ্ঞেস করলে আমি তো খুশিতে লাফিয়ে উঠলাম―চাই চাই। দেবেন আমাকে চালাতে ? আমি কি পারব চাচা ?

পারবা পারবা আসো লঞ্চ চালান খুব সোজা। দুনিয়াতে সবথিকা সোজা হইলো গিয়া লঞ্চ চালানি। হেহ হেহ হে…।

সারেঙ চাচা আমাকে তাঁর পাশে দাঁড় করিয়ে আমার হাতে স্টিয়ারিং ধরিয়ে দিলেন―ইঞ্জিন যদিও পানি কাইট্টা কাইট্টা লঞ্চটারে চালাইয়া নিবো সামনের দিকে কিন্তু বাতাস আর গাঙ্গের স্রোত তোমার লঞ্চটারে খালি ডাইনে বামে কান্নি খাওয়াইতে চাইবো। সারেঙ হিসেবে তোমার দায়িত্ব হইল গাঙ্গের পানির স্রোত আর বাতাসের লগে দীর্ঘমেয়াদি লড়াইটা চালাইয়া যাওয়া। বাতাস আর গাঙ্গের পানির লগে হাইরা যাওনের অর্থ হইল নিগ্‌ঘাত লঞ্চডুবি।

মিনিট খানেকেরও কম সময়ের মধ্যে আমি স্টিয়ারিংটা সারেঙ চাচাকে ফেরত দিলাম। বাপ রে বাপ কী যে শক্তি লাগে সারেঙ হতে হলে! আমার তো ভয়ই করছিল রীতিমতো―এই বুঝি লঞ্চটা ডানদিকে ছুটে গেল। এই বুঝি হেলে পড়ল বাম দিকে।

স্টিয়ারিং-এ নিজের দখল নিয়ে সারেঙ চাচা বললেন―‘ভাতিজা মনে হয় ইট্টু ডরাইছ ? আমি যে খুব গুপনে আগে থিকাই লঞ্চের স্পিড দিছি কমাইয়া হেইডা খেয়াল করো নাই!’ বলতে বলতে স্পিড বাড়াতে থাকলেন সারেঙ চাচা। সারেঙ চাচার স্টিয়ারিং-এর ডানপাশে একটা দড়ি। দড়িটা একটা গোলাকার ফোঁকর গলে নিচের তলায় চলে গেছে। এই দড়িটা টান দিলে নিচে একটা ঘণ্টার মতো কিছু একটা বেজে ওঠে। এটা তার বিশেষ কোনও সিগন্যাল বলে মনে হলো। এর মাধ্যমে তিনি বোধ হয় কোনও মেসেজ পাঠান নিচ তলার সহকর্মীদের কাছে।

ষাট সেকেণ্ডের কম সময়ের জন্যে হলেও এই লঞ্চ চালানোর অভিজ্ঞতাটা আমার জীবনে বিরাট একটা এডভেঞ্চারের স্মৃতি হয়ে থাকল।

মাঝে মধ্যেই নদীতে ভুস করে ভেসে উঠছিল বিশাল আকারের কালো একটা মাছ। মাছটা একটা ঢেউ খেলানো ভঙ্গিতে কয়েকটা ডিগবাজি খায় তারপর ডুবে যায় পানিতে। লঞ্চ থেকে মোটামুটি নিরাপদ দূরত্বেই চলে ওদের ডিগবাজি ডিগবাজি খেলা। লঞ্চের খুব কাছে ওরা আসে না। জানলাম, এটা শুশুক। কেউ কেউ বললেন―ওটা শিশু। শুশুক বা শিশুকে তাঁরা মাছই বললেন। তখনও জানা হয়নি আমার―শুশুক নামের এই প্রাণীটা ডলফিন গোত্রের।

বিকেলে বাঞ্ছারামপুর ঘাটে আমাদের লঞ্চ ভিড়ল। অধিকাংশ যাত্রী এখানেই নামবে। মাঝে হোমনা, রামকৃষ্ণপুর আর দড়িকান্দি নামের কয়েকটি ঘাটেও লঞ্চ ভিড়েছিল। অল্প ক’জন যাত্রী ঘাট তিনটায় ওঠানামা করেছে। বুঝতে পারলাম বাঞ্ছারামপুরই হচ্ছে মেইন স্টপেজ মানে মূল ঘাট।

লঞ্চ থেকে কাঠের একটা সিঁড়ি ঘাটের সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হলো। খুব রিস্কি। পা ফেলতে সামান্য হেরফের হলেই ঝুপ করে পানিতে পড়ে যাবার সম্ভাবনা। কিন্তু অবাক কাণ্ড কেউ পড়ে যাচ্ছে না। যাত্রীরা অভ্যস্ত। কিন্তু আমি তো ভয় পেয়ে গেলাম। এই রকম নড়বড়ে খাড়া হাতলছাড়া একটা সিঁড়িতে জিমন্যাস্টিকস করতে পারব না আমি।

মুহূর্তেই বিকল্প ব্যবস্থা করে ফেললেন বাবা। আমরা নিচ তলায় নেমে এলাম। নিচ তলার জানালার কাছে একটা নৌকো বাঁধা হলো। এরপর বাবা অন্যান্য ভাইবোনের সঙ্গে আমাকে জানালা দিয়ে গলিয়ে দিলেন নৌকোর পাটাতনের ওপর দাঁড়ানো মাঝির হাতে। মাঝি আমাকে নিপুণ কায়দায় নৌকোর মধ্যে তুলে নিলেন। নৌকোটা দুলছে। আমি বসেছি পাটাতনের ওপর। আমাদের লাগেজগুলো বাবাকে রিসিভ করতে আসা লোকজন মাথায় করে সেই বিপজ্জনক সিঁড়ি দিয়েই বলতে গেলে নাচতে নাচতে নেমে গেল!

লঞ্চ থেকে নেমে হাঁটাপথে যাচ্ছি আমাদের গ্রামের দিকে। হাঁটছি আমরা উঁচু সড়ক ধরে। সড়কটা পাকা নয়। সড়কের দু’দিকই নিচু হয়ে নেমে মিশে গেছে হয় কোনও বাড়ির আঙিনায় কিংবা বিস্তীর্ণ ধানের ক্ষেতের সঙ্গে। ধানের ক্ষেতের পরেই ছোট্ট একটা নদী। নদীর ওপারে বাবার জন্মগ্রাম। বাবার সঙ্গে অনুসরণকারী হিসেবে পেছনে আছে ছোটোখাটো একটা মিছিল। সেই মিছিল ক্রমশ বড় হচ্ছে। একজন দু জন করে একটু পরপর মিছিলে যুক্ত হচ্ছে নতুন নতুন উৎসাহী মুখ। ফলে মিছিলটা দীর্ঘ হচ্ছে আস্তে ধীরে।

সড়কে আমাদের বিপরীত দিক থেকে আসা লোকজন অবাক হয়ে বাবাকে দেখছে। কেউ কেউ লম্বা সালাম বিনিময় করছে। কেউ কেউ আবার জুড়ে দিচ্ছে প্রচুর অহেতুক খুচরো আলাপ। একটুও বিরক্ত না-হয়ে বাবা প্রায় সবার সঙ্গেই হাসিমুখে শামিল হচ্ছেন। এই দরিদ্র মানুষগুলো ছুঁয়ে দেওয়া দূরত্বে বাবার সঙ্গে হাঁটছে, কথা বলছে।

নদীর ঘাটে আসা অবধি মিছিলটা আমাদের ফলো করল। চারদিক উন্মুক্ত, কোনও ছাউনি নেই, এমন দুটি ছোট্ট নৌকায় আমরা উঠেছি। এই ধরনের নৌকোকে বলে কোশা নৌকা। নৌকা দুটো ঘাটেই বাঁধা ছিল। নৌকার মাঝির আসনে লগি হাতে প্রস্তুত হয়ে আছেন চালক অর্থাৎ মাঝি।

নদীটা ছোট। মনে হলো খুব বেশি গভীরও নয়। কারণ লগিটা নদীর তলানিতে পৌঁছেও পাঁচ-ছয় ফুট বাড়তি আছে। কিছুক্ষণ পরেই বুঝতে পারলাম আমার ধারণা সঠিক নয়। নদীটা অনেক গভীর। কারণ নদীর মাঝখানটায় এসে মাঝি লগি দিয়ে আর নদীর তলানি মানে মাটি ছুঁতে পারছিল না। লগিটা লম্বালম্বি নৌকোর ওপর রেখে একটা বৈঠা দিয়ে মাঝি নৌকোটা চালাতে শুরু করলেন।

নদীর মাঝখানে একটা অদ্ভুত জিনিস দেখলাম। কয়েকটা বাঁশের সাহায্যে আড়াআড়ি করে একটা উন্মুক্ত মাচার মতো জায়গায় দাঁড়িয়ে রোদেপোড়া কালো কুচকুচে চেহারার একটা লোক মাছ ধরছেন। তাঁর মাছ ধরার কায়দাটা বিস্ময়কর। একটা বাঁশের খানিকটা অংশ লোকটার পায়ের কাছে উবু হয়ে আছে। বাঁশের বাকি অংশ লোকটার সামনের দিকে পানির ভেতরে সেঁধিয়ে আছে। লোকটা আড়াআড়িভাবে থাকা একটা বাঁশকে বাঁ হাত দিয়ে ধরে রেখে আরেকটা বাঁশের সঙ্গে ঝুলে থাকা মোটা দড়িটা ডান হাতে ধরে পায়ের কাছে উবু হয়ে থাকা বাঁশের ওপর দাঁড়িয়ে পড়লেন। তারপর শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে একটা ঢেউ খেলানো দোল দিলেন। নিম্নমুখী দোল। লোকটার শরীরের ভার আর দোলের শক্তির চাপে উবু হওয়া বাঁশের অংশটা ধীরে ধীরে একটা সমান্তরাল অবস্থানে উঠে এল আর লোকটার সামনে ক্রমশ দৃশ্যমান হয়ে উঠল সেই বাঁশের পানিতে সেঁধিয়ে যাওয়া অংশটা। যেখানে আরও তিনটে সরু বাঁশকে শিঙাড়ার মতো ত্রিকোণ আকৃতির শেপে জোড়া দিয়ে মোটা দড়ি আর সুতোর সাহায্যে জুড়ে দেওয়া হয়েছে জাল। বেশ বড় জাল। বাঁশের ফ্রেমে আটকে থাকা জাল ক্রমশ উঁচুতে উঠলে দেখা গেল বেশ কিছু ছোট আর মাঝারি সাইজের মাছ জালের মধ্যে আটকে পড়ে সমানে লাফাচ্ছে। বিস্ময়ে হতবাক আমি―কী আশ্চর্য! এইভাবে মাছ ধরে নাকি!

নৌকো থেকে নেমে বিভিন্ন ক্ষেতের আইল দিয়ে হেঁটে হেঁটে আমরা মিনিট দশেকের মধ্যেই পৌঁছে গেলাম বাঁশগাড়ি গ্রামে। খুব বেশি বড় নয় গ্রামটা। পুব পাড়া আর পশ্চিম পাড়া মিলিয়ে শ’খানেক পরিবারের ছোট্ট একটা গ্রাম। পূব আর পশ্চিম পাড়ার মাঝখানে মিনিট কুড়ির হাঁটাপথের একটা ফাঁকা জায়গা আছে। এই জায়গাটায়, বেশ কিছু ফসলি জমি আর বিশাল বিশাল গাছ। একটা গাছের গোড়া অর্থাৎ মাটির ভেতর সেঁধিয়ে যাওয়া শেকড়-বাকড়গুলোর বড় রকমের অংশ বাইরে বেরিয়ে আছে। ইয়া মোটা মোটা শেকড়গুলো যে যেদিকে পেরেছে ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে এর গলা ধরে ওর পেটের ওপর দিয়ে এর সঙ্গে গিটঠু পাকিয়ে ওর সঙ্গে কঠিন একটা জুজুৎসুর প্যাঁচ লাগিয়ে মাটির তলায় ঢুকেছে। এই গাছের নাম বটগাছ। অর্থাৎ কি না বটবৃক্ষ। সূর্যের চকচকে আলোয় চারদিক সয়লাব হয়ে গেলেও এই বটগাছের নিচে অদ্ভুত একটা ছায়াময় মায়াময় পরিবেশ বিরাজ করছে।

বাবা যেদিকেই যাচ্ছেন তাঁর পেছন পেছন ছোটোখাটো একটা মিছিল থাকছেই। অবিরাম সিগারেট ফোঁকা বাবার অভ্যেস। গ্রামেও সেটা চলছে। সিগারেট ক্রমশ ছোট হয়ে এলে, ফিল্টারের কাছে আগুন পৌঁছানোর খানিক আগে বাবা সেটা ছুড়ে ফেলে দিচ্ছেন ডান কিংবা বামদিকে। বাবার ফেলে দেওয়া সিগারেটের টুকরোটার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ছে কয়েকজন। তারপর কোনও একজন বাবার উচ্ছিষ্ট সেই সিগারেটের টুকরোটা অনেক যত্ন করে তুলে নিয়ে মহা আয়েসে সুখটান দিচ্ছে।

কুড়িয়ে পাওয়া সিগারেটের অংশ তুলে নিয়ে ওদের একজন বলল―আহ্‌হারে দোতালা সিগারেট। অনেক দামি। নে তুইও খা, বলে বাড়িয়ে দিল অন্যজনকে।

খুব খারাপ লাগল আমার এমন দৃশ্য দেখে। এই লোকগুলো কত্ত গরিব! একটা সিগারেট কেনার মতো বাড়তি টাকাও নেই ওদের! বাবার ফেলে দেওয়া টুকরোটা ওদের কাছে মনে হচ্ছে স্বর্গীয় কোনও জিনিস। বাবার তো উচিত প্যাকেট খুলে ওদের সবাইকে একটি করে সিগারেট দেওয়া। কিন্তু বাবা দিচ্ছেন না। বাবা আরেকটা সিগারেট একই কায়দায় ধরালেন, একই কায়দায় ছুড়ে ফেলে দিলেন এবং আরও কিছু লোক একইভাবে সেটার ওপর হামলে পড়ল। আমার কেন জানি মনে হলো বাবা দৃশ্যটা খুব উপভোগ করছেন। কী জানি! আমার ভুলও হতে পারে। এই রকম দৃশ্যে তাঁর মজা পাবার কথা না। মজা পাওয়া উচিত না। কিন্তু―মানুষ বড়ই বিচিত্র। একজন মানুষের ভেতরে অনেকগুলো মানুষ বাস করে। একেক ঘটনায় একেকটা মানুষ প্রকাশিত হয়। আমি কি তবে বাবার ভেতরকার কোনও একজন মানুষকে একটু আগে দেখে ফেললাম!

বাবাকে পেয়ে গ্রামটা যেন উৎসবে মেতে উঠল। সেই উৎসবে আমরা ভাইবোনেরা হচ্ছি বাড়তি বোনাস। লোকজন যা ইচ্ছে জিজ্ঞেস করে। জিজ্ঞেস করা উচিত নয় এমন প্রশ্নও করেন অবলীলায়। সবচে আশ্চর্যের ব্যাপারটা হচ্ছে এখানে কেউই অন্য কারও প্রাইভেসি বিষয়ে সচেতন না। ব্যক্তিগত ব্যাপার বলে কোনও কিছুকে এঁরা আলাদা করে দেখতে শেখেননি।

আমার চাচা আর চাচি খুব আদর যত্ন করলেন। আমাদের কি খাওয়াবেন সেটা নিয়ে দু জনেরই পাগল পাগল অবস্থা। বাবা যতই বলছেন ‘ব্যস্ত হইও না’ ওঁরা ততই ব্যস্ত হয়ে পড়ছেন।

চিনির প্রলেপ দেওয়া অদ্ভুত এক ধরনের মিষ্টি আমাকে খেতে দিলেন তাঁরা। এটার নাম নাকি জাম। নাম জাম হলেও দেখতে এটা জামের মতো নয়। জাম তো কালো হয়। জাম মানে তো কালোজাম। কিন্তু এইটার রঙ শাদা এবং পিংকের মাঝামাঝি। সাইজটা কালোজামের চাইতে সামান্য ছোট। প্রতিটা পিংক-শাদা জামকে চিনির ওপর গড়িয়ে দিয়ে তার পুরো শরীরে চিনির বেশ মোটা একটা প্রলেপ লাগানো হয়েছে। মিষ্টির ওপরের অংশটা তাই বেশ শক্ত। কিন্তু কামড় বসালে ভেতরের নরম মিষ্টিটা আবিষ্কৃত হয়। ভয়াবহ রকমের সুস্বাদু মিষ্টিটা। এমন মজার মিষ্টি আমি জীবনেও খাইনি। এমনিতেই মিষ্টি খেতে ভালোবাসি। এই স্পেশাল জামটা খেয়ে নিলাম টপাটপ অনেকগুলো। বাবার গ্রামে আমার প্রথম ভালোলাগা আইটেম এই জাম মিষ্টি।

কিছুক্ষণ পরেই বেরুলাম গ্রাম দেখতে। গ্রামটা খুব সবুজ। খুব সুন্দর। কিন্তু মানুষগুলো খুব গরিব। তাঁদের পরনের পোশাক ছেঁড়া কিংবা মলিন। বাচ্চা এবং কিশোরদের গায়ে জামা নেই বেশির ভাগ। এরা উদোম গায়ে থাকে। পায়ে স্যান্ডেল নেই একজনেরও। এখানে কিশোরীরাও শাড়ি পড়ে। সালোয়ার কামিজ পড়া কিশোরীর সংখ্যা হাতে গোনা। মহিলারা প্রায় প্রত্যেকেই মাথায় ঘোমটা দিয়ে রাখেন। বয়স্ক পুরুষেরা বেশির ভাগই দাঁড়িঅলা। বৃদ্ধ আর বৃদ্ধারা রোগা-পটকা। পুরো গ্রামে মোটা মানুষ প্রায় নেই বললেই চলে। কঠিন শারীরিক পরিশ্রম আর খাদ্য-স্বভাবের কারণেই গ্রামে মোটা হবার সম্ভাবনা কম থাকে। সুঠাম দেহের মানুষ আছেন অনেক, কিন্তু জীর্ণ শীর্ণ মানুষের সংখ্যাই বেশি।

আমার খুবই মন খারাপ হলো।

বাড়িঘরগুলোতেও দারিদ্র্যের ছাপ স্পষ্ট। বর্ণহীন ঘোলাটে টিনের চালের নিচে কেমন হলদেধূসর রঙের বেড়ার ঘর। কিছু বাড়ি পাটখড়ি দিয়ে বানানো। চকচক করছে কেবল আমাদের বাড়িটা। টিনশেড হলেও ঝকঝকে। বাড়ি দেখেই বোঝা যায় এটা ধনাঢ্য গৃহস্থের বাড়ি। গ্রামের পুব পাড়ার একমাত্র কুয়োটা আমাদের বাড়ির সীমানার ভেতরেই। গ্রামের মহিলারা এখান থেকেই পানি নেয় কলস ভরে। গ্রামের একমাত্র মসজিদটাও আমাদের বাড়ির সীমানার ভেতরেই। গ্রামের লোকজন নামাজ পড়েন এই মসজিদেই।

সেবারই প্রথম প্রথম আমি হাত দিয়ে ছুঁয়ে ছুঁয়ে শাপলা আর শালুক দেখলাম। আমার বন্ধু হয়ে ওঠা এক কিশোর আমাকে বলেছিল―জানো, এই শাপলা আর শালুক খাইয়া গ্রামের কত গরিব মানুষ বাঁইচা থাকে!

আমি তো অবাক!―বলো কি! শাপলা আর শালুক লোকে খায়ও নাকি!

খায়। শাপলা দিয়া তরকারি রাইন্ধা খায় আর শালুক খায় সিদ্ধ কইরা নাইলে আগুনে পোড়াইয়া।

আমাকে মন খারাপ করতে দেখে গ্রামের সরল সেই বন্ধুটা বলেছিলো―মন খারাপ কইরো না। দ্যাশের বেশির ভাগ মানুষই তো গরিব। গ্রামের মানুষরা আরও বেশি গরিব। গ্রামে গরিবরা ভাত জোগাড় করতে পারে না―বইল্লা বাড়ি বাড়ি ঘুইরা ভাতের ফ্যান চায়। সেইটাও সব সময় দেয় না গৃহস্থরা। গরুতে খায় ফ্যান। দিয়া দিলে গরু কি খাইব ? ভাতের ফ্যান মানি মাড়। তোমরা যেইটারে বলো মাড়, গ্রামে সেইটাই ফ্যান।

বলো কী! ভাতের ফ্যান কীভাবে খায় ?

ফ্যানের মইধ্যে লবণ দিয়া কাঁচা মরিচ দিয়া খায়। এইটা ধরো অনেকটা ডাইলের লাহান। ভাতের ফ্যানে অনেক শক্তি থাকে। সেই কারণে এইটা খাইলেও বাঁচন যায়। তাছাড়া ভাতের ফ্যান তো তাই ফ্যানের মইধ্যে ভাতের গন্ধ থাকে। এই ভাতের গন্ধটা উপোসি মানুষগো আত্মারে শান্তি দেয়। উপাসী মানুষটা ভাত খাওনের তৃপ্তি পায় মনে মনে। এইডা মনে করো য্যান নিজেরে নিজে একটা বুঝ দিল। নিজের লগে নিজের একটা প্রতারণাও কইতে পারো। খাইলাম ফ্যান কিন্তু গন্ধটা তো ভাতের!

আহারে! ভাতের গন্ধ! ভাতের গন্ধ জিনিসটাকে আলাদা করে কখনও ভাবিনি তো! মানুষ বেঁচে থাকার জন্যে কত কষ্টই না করে! ভাত না-পেয়ে ভাতের ফ্যান খায়। সেটাও পায় না! আহারে …!

প্রচুর হাঁস এই গ্রামটায়। প্যাঁক প্যাঁক করে ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে হাঁসগুলো ছুটোছুটি করছে। ওদের পেছনে গ্রামের কয়েকটা দুষ্টু ছেল। ছেলেগুলো খামোখাই ধাওয়া করছে হাঁসগুলোকে। প্রায় প্রতিটা বাড়ির উঠানেই বেশ উঁচু উঁচু খড়ের গাদা। রান্না ঘরের পাশে পাটখড়ির স্তূপ। রান্নাঘরের চুলোগুলো সব মাটির তৈরি। এ রকম মাটির চুলোয় পাটখড়ি আর গাছের শুকনো ডালের লাকড়িতে আগুন জ্বালিয়ে রান্না করা হয়। প্রচুর ধোঁয়া তাই রান্নাঘরকে ঘিরে। গৃহস্থ বাড়িতে গরু থাকবেই। যে গৃহস্থ যত বেশি ধনী তার তত বেশি গরু। গরুদের থাকবার জন্যে বানানো হয় গোয়াল ঘর। কোনও কোনও বাড়িতে আলাদা গোয়ালঘর নেই। রান্নাঘর লাগোয়া খালি জায়গায় গরুগুলোকে বেঁধে রাখা হয়েছে। মাটির তৈরি বিরাট বড় কালো গামলায় ভাতের ফ্যান কিংবা পানি তুলে রাখা। গামলার পাশে শুকনো খড় এবং ঘাসের স্তূপ। এগুলো গরুর খাবার। কিছুক্ষণ পর পর অকারণেই ডেকে ওঠে গরু―হাম্বাআআআ।

গ্রামে ছাগলের সংখ্যাও বিপুল। গরু-ছাগল-হাঁস-মুরগি হচ্ছে গ্রামের মানুষদের কাছে মূল্যবান সম্পদ। ছাগলের বাচ্চাগুলো এত কিউট! দেখলেই কোলে নিয়ে আদর করতে ইচ্ছে করে।

গ্রামে এসে নতুন একটা শব্দের সঙ্গে পরিচিত হলাম আর সেটা হচ্ছে আড়ং। আড়ং হচ্ছে প্রতিদিনের সকালের বাজার। মাছ মাংস শাকসবজি তেল ডাল নুন সব পাওয়া যায় আড়ং-এ। রোজ বসে যেই বাজার সেটা আড়ং। আর প্রতি সপ্তাহে বড় একটা বাজার বসে বাঞ্ছারামপুরে। সেটা হচ্ছে হাট। আশপাশের দশগ্রামের মানুষ জড়ো হয় হাটে। ধনাঢ্য বেপারিদের বিপুল পসরায় গমগম করতে থাকে জমজমাট হাটটি। হেন জিনিস নেই যা বিক্রি হয় না হাটে।

১০

কোনও আনন্দই দীর্ঘস্থায়ী নয়। আমার সকল আনন্দ ম্লান করে দিয়ে মুসলমানির দিন ঘনিয়ে আসছিল। আমি প্রতিদিন রাতে ঘুমুতে যাবার আগে প্রার্থনা করতাম―হে আল্লাহ আমাকে তুমি মেয়ে বানিয়ে দাও। আমি মেয়ে হয়ে জন্মালে কী এমন ক্ষতি হতো এই পৃথিবীর ? আমাকে তুমি মেয়ে বানিয়ে দাও আল্লাহ। শুনেছি তোমার কুদরতের কোনও শেষ নাই। ঘুমের মধ্যেই আমি যেন একটা মেয়ে হয়ে যাই! ঘুম থেকে জেগে উঠে আমি যেন দেখি―একটা মেয়ে হয়ে গেছি আমি!

প্রতিদিন ঘুম থেকে জেগে আমি বুঝতে পারতাম আমার প্রার্থনা কবুল হয়নি। খামোখাই একটা ছেলে হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছি আমি নিষ্ঠুর এই দুনিয়ায়!

মাঝেমধ্যেই মনে হতো―আচ্ছা আমি কোনও হিন্দু পরিবারে জন্মালে কী এমন ক্ষতি হতো এই পৃথিবীর! পৃথিবীতে একটা মুসলমান কম হলে কী এমন আসত যেত!

গ্রামে আমার বেশ কিছু সমবয়েসি বন্ধুর একজনের নাম ছিল ‘কাইক্কা’। কাকিলা মাছকে গ্রামে কাইক্কা বলত সবাই। ছেলেটার মুখের আকৃতির সঙ্গে কাকিলা মানে কাইক্কার সদৃশ আবিষ্কার করে কোনও এক বদমাশ কিশোর ওকে কাইক্কা উপাধি দিয়েছে। এবং জনগণ বিপুলভাবে সেই উপাধিকে সমর্থন দিয়েছে। আর সে কারণেই ছেলেটার প্রকৃত নামটা ঢাকা পড়ে গেছে এই কাইক্কা নামের আড়ালে। এক দুপুরে কাইক্কা আমাকে জানালো সে পয়গম্বর হয়ে গেছে।

মানে ?

মানে সকালে ঘুম থেকে জেগে সে দেখে যে রাতে অটোমেটিক ঘুমের ঘোরেই তার মুসলমানি হয়ে গেছে। গ্রামে নাকি এটাকে বলে পয়গম্বর হওয়া।

এরপর আমার প্রার্থনার ভাষা গেলো পাল্টে―হে আল্লাহ্‌ আমাকে তুমি পয়গম্বর বানিয়ে দাও …।

কিন্তু আমার এই প্রার্থনাটাও মঞ্জুর হয়নি।

১১

এক সকালে থুঁতনিতে ছাগলদাড়ি সমৃদ্ধ হাজাম এসে উপস্থিত হলেন আমাদের উঠোনে। খুঁটা ছেঁড়া গরুর মতো আমি তো দিলাম একটা দৌড়। দূরের বিস্তীর্ণ ফসলের মাঠ থেকে আমাকে ধরে আনা হলো। অনেকটা নিলডাউন টাইপের অদ্ভুত একটা ভঙ্গিতে আমাকে বসিয়ে আমার দুই হাতকে হাঁটুর তলা দিয়ে বিশেষ কায়দায় পেঁচিয়ে এমনভাবে আমাকে ধরে রাখল দু জন যে আমার একেবারেই যাকে বলে নট নড়ন চড়ন অবস্থা!

গ্রামের মানুষেরা প্রাইভেসির ধার ধারে না। সুতরাং একটা অসহায় বালকের ইয়ে কর্তন পরিদর্শনের নিমিত্তে উঠোনভর্তি উৎসাহী জনতা হামলে পড়ল দরোজার সামনে। আমার ভয়ার্ত আর বিস্ফারিত চোখের সামনে হাজাম ব্যাটা তার ছোট্ট বাক্সটা খুলে সেখান থেকে কোনও ক্ষুর-কাঁচি বের না-করে খুবই পাতলা একটা সবুজ রঙের ডাল টাইপের কি একটা বের করলেন। তারপর খুব গৌরবের সঙ্গে ঘোষণা করলেন―এইটা হইতাছে ধার দেওয়া দাও দিয়া সবুজ বাঁশ থেইকা চাঁইছা বাইর করা ছাল দিয়া বানানি অস্ত্র। ক্ষুর-কাঁচির থেইকাও এইটার ধার বেশি। কুট্টুস কইরা কাইট্টা ফালাইবো টের পাওনের আগেই। কুনু ব্যথা পাইবা না। আরে! আসমানে অইডা কী ? বলে লোকটা আকাশের দিকে আমার দৃষ্টি ফেরাতে চায়। কিন্তু আমি তার এইসব জাড়িজুড়ি বিশ্বাস না-করে তাকিয়ে আছি তার সেই বিশেষ আর্মসের দিকে! আর চিৎকার করছি গগনবিদারী―আমি মুসলমানি করব না …

হাজামের ইশারায় আমার দুইপাশে থাকা আমাকে ঠেসে ধরে রাখা দুই ষণ্ডামার্কার একজন একহাতে আমার চোখ ঢেকে ফেলল এবং সেকেণ্ডেরও কম সময়ে আমার সর্বনাশ যা ঘটার তা ঘটে গেল। খুব সামান্য পিঁপড়ার কামড়ের মতো একটু ব্যথা পেলেও আমি এমন চিৎকার দিলাম যে মনে হলো আমার কাহিনি খতম! এখন শুধু ইন্না লিল্লাহিটা পড়া বাকি! হাজাম লোকটা অপূর্ব দক্ষতায় আগে থেকেই জ্বালিয়ে রাখা কুপির আগুনে ইঞ্চিদেড়েক ব্যাসার্ধের কয়েকপ্রস্তে মোড়ানো একটা কাপড়ের টুকরাকে পুড়িয়ে ছাই টাইপের ব্যান্ডেজ বানিয়ে সেটা দিয়ে মুড়িয়ে দিলেন ক্ষতস্থান। ব্যস। আর কোনও ওষুধপত্রের বালাই নেই।

খানিকটা ঝলসে যাওয়া চিনচিনে একটা জ্বলুনি ধরনের ব্যথা আর বুক ভরা অভিমান নিয়ে অশ্রুসজল আমি শুয়ে থাকলাম নতুন কেনা একটা ছোটদের লুঙ্গি পরে। দু পাশের দুই হাঁটুকে উঁচু বালিশের সাপোর্ট দিয়ে মোহনীয় ভঙ্গিতে শুইয়ে রাখা হয়েছে আমাকে।

আমার তথাকথিত নিষ্ঠুরস্বজনরা তখন মিষ্টি খাওয়ার মচ্ছবে মেতে উঠেছে!

হায় রে অসহায় কিশোর …বালকের দুঃখ বোঝে না এই ধরিত্রি …

১২

একাত্তরের পুরো নয় মাস আমরা গ্রামে ছিলাম। ওই সময়টাতেই আমি ফুল চিনেছি, ফল চিনেছি। মাছ চিনেছি, গাছ চিনেছি। নদী এবং জল চিনেছি। জোয়ার ভাটা চিনেছি। ফড়িং পাখি আর প্রজাপতি চিনেছি। আর চিনেছি মানুষ।

বাবা সরকারি চাকুরে। আমাদের সবাইকে গ্রামে রেখে তিনি তাই চলে গেলেন ঢাকায়। সাত দিনের ছুটি নিয়ে এসেছিলেন তিনি।

এল পঁচিশে মার্চের ভয়াল রাত।

ঘুমিয়ে পড়া রাজধানী ঢাকায় আচমকা ঝাঁপিয়ে পড়ল দানবরূপী পশ্চিম পাকিস্তানি সেনাবাহিনী। বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র হল, রাজারবাগ পুলিশ লাইন এবং বিশেষ বিশেষ হিন্দু অধ্যুষিত এলাকায় নৃশংস গণহত্যা চালালো ওরা। রক্তের বন্যা বয়ে গেল শহরজুড়ে।

আমরা আটকে পড়লাম গ্রামের বাড়িতে।

চাকরি বাঁচাতে ঢাকায় একা থাকেন বাবা।

মাসে একবার গ্রামে আসেন।

উত্তরাধিকার সূত্রে পৈতৃক ভিটের তিন ভাগের এক ভাগ পেয়েছেন বাবা। বাবার বড় দুই ভাই। দুই জেঠুর সঙ্গেই আমাদের খুব সুন্দর সম্পর্ক ছিল। যদিও বাড়িটা তিন ভাগে ভাগ করার সময়েই আমার দুই জেঠু খুব কায়দা করে বাবাকে ঠকিয়েছিল। গ্রামের মসজিদটা ছিল বাবা-জেঠুদের ভিটে বাড়ির মধ্যেই। জেঠুরা এমনভাবে বাড়িটাকে তিন ভাগ করেছিলেন যাতে আমার বাবার অংশে মসজিদটা পড়ে। বাবা সেটা মেনে নিয়েছিলেন। আমরা সপরিবারে গ্রামে না গেলে আমাদের ঘরটি জেঠুরাই ব্যবহার করতেন। আমরা যাওয়াতে ঘরটি এবং একটি রান্না ঘর ছেড়ে দিতে হলো তাদের। একটা কমন উঠোন আমরা তিনটি পরিবার ব্যবহার করতাম। উঠোনটা বেশ বড় ছিল।

বাবা পুরো মাস ঢাকায় থাকতেন বলে জেঠুরা, বিশেষ করে বড় জেঠু অনেক কর্তৃত্ব ফলাতে চাইতেন মায়ের সঙ্গে। গ্রাম্য কায়দায়। একবার মাস শেষে বাবা ফিরে এলে একটা পারিবারিক সালিশ বসল। আমার মায়ের প্রতি অনেক অভিযোগ বড় জেঠুর। মা কথা শোনে না। নিজের মতো চলে। এটা মেনে নেওয়া যায় না। সালিশে বাবা স্পষ্ট জানিয়ে দিলেন, আমার মায়ের কাছে যেটা ভালো মনে হবে মা সেটাই করবেন। সেভাবেই চলবেন। জেঠুদের দরকার নেই আমাদের মাকে বুদ্ধি পরামর্শ দিয়ে চালানোর।

শুনে বড় জেঠু ক্ষিপ্ত হয়ে বললেন, ―‘তুই তো তাইলে তোর বউকে রাতা বানিয়ে দিয়ে গেলি!’  (রাতা মানে মোরগ।)

বাবা আবার ঢাকায় চলে গেলেন।

সারা দেশে জোরেশোরে মুক্তিযুদ্ধ চলছে। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের অনুষ্ঠান শুনি আমরা উঠোনে, উৎসাহী গ্রামবাসীদের নিয়ে। বাবা আমাদের বড়সড় একটা রেডিও কিনে দিয়ে গেছেন। যেন আমরা গ্রামে থেকেও ঢাকার খবর পাই। মুক্তিযুদ্ধের খবরাখবর পাই।

স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের ‘চরমপত্র’সহ সব অনুষ্ঠানের আমি একনিষ্ঠ শ্রোতা। বিশেষ করে গানগুলো―‘জয় বাংলা বাংলার জয়, সালাম সালাম হাজার সালাম, মুজিব বাইয়া যাও রে, মোরা একটি ফুলকে বাঁচাব বলে যুদ্ধ করি, তীর হারা এই ঢেউয়ের সাগর, পূর্ব দিগন্তে সূর্য উঠেছে, শোনো একটি মুজিবরের থেকে, ভেবো নাগো মা তোমার ছেলেরা হারিয়ে গিয়েছে পথে’ গানগুলো আমাকে মোহিত ও আবিষ্ট করে রাখত।

পুরান ঢাকায় ওয়ারিতে আমাদের বাসা ছিল বলে ঢাকাইয়া ভাষায় রচিত ও পঠিত ‘চরমপত্র’ ছিল আমার দারুণ পছন্দের। গ্রামের মাঠে, নদীর তীরে, ধানের ক্ষেতে একলা একা হাঁটতে হাঁটতে আমি মুকুল ভাইয়ের কণ্ঠস্বর নকল করে মুখস্থ চরমপত্র পাঠ করতাম। আর গাইতাম―‘জয় বাংলা বাংলার জয়, হবে হবে হবে, হবে নিশ্চয়, কোটি প্রাণ একসাথে জেগেছে অন্ধ রাতে নতুন সূর্য ওঠার এই তো সময় …।’ 

এভাবেই দিন যাচ্ছিল।

স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের মাধ্যমে এবং বাবার গ্রামে আসার সুবাদে মুক্তিযুদ্ধের ঘটনা প্রবাহের গুরুত্বপূর্ণ এবং সাম্প্রতিকতম তথ্যও আমাদের  নাগালের মধ্যে থাকত।

মাকে জেঠুর কথিত ‘রাতা’ বানিয়ে বাবার ঢাকা চলে যাবার পরে আমাদের বিশাল উঠোনটা একদিন ছোট হয়ে গেল।

আমার বড় জেঠু সীমানা মেপে তার ভাগের জায়গায় এমনভাবে নতুন একটা ঘর তুললেন যে আমরা রীতিমতো বন্দি হয়ে গেলাম। তিনি তার নতুন ঘরটার পেছন দিকটা আমাদের দিকে স্থাপন করলেন এমন ইঞ্জিনিয়ারিং বুদ্ধিতে যে গ্রামের সড়ক পথ দিয়ে আমাদের বাড়িতে ঢোকার বিশাল প্রশস্ত পথটা একেবারে সরু হয়ে গেল। দু জন মানুষ পাশাপাশি হেঁটে যাওয়াও দুষ্কর, এমন অপ্রশস্ত। গ্রামের লোকজন বিস্ময় প্রকাশ করল―এইটা কেমন কাজ হলো! তোতা মিয়াকে (আমার বাবার নিক নেম) তো একেবারে একঘরে করে ফেলল!

১৩ 

সারা দেশের মুক্তিযুদ্ধের আঁচ এসে পৌঁছাল আমাদের বাঞ্ছারামপুরেও। পাকিস্তানি একদল মিলিটারি বাঞ্ছারামপুর থানায় এসে বিশাল ক্যাম্প খুলে বসল। আশপাশের গ্রামে শুরু হলো হত্যা, মারপিট, অগ্নিসংযোগ আর নারী নিপীড়ন।

বাঞ্ছারামপুর গ্রামটা আমাদের গ্রাম থেকে খানিকটা দূরে এবং মাঝখানে একটা নদী থাকায় আমাদের বাঁশগাড়ি গ্রামটা মোটামুটি নিরাপদই ছিল। দূর থেকে আমরা আগুনের ফুলকি দেখতাম। গাঢ় ধোঁয়ার কুণ্ডলি দেখতাম। আর শুনতাম ঠা ঠা ঠা টা ঢিঁচো ঢিঁচো গুলির শব্দ। বড় ভয়ংকর ছিল সেই গুলির শব্দ। কোনও কোনওদিন সারা রাতব্যাপী, কোনও কোনওদিন দিনব্যাপী চলত গোলাগুলি। আমরা বুঝতে পারতাম দূরের কোনও গ্রামে মুক্তিযোদ্ধারা এসেছে। তাদের সঙ্গেই লড়াই হচ্ছে ভয়াবহ।

এক বিকেলে হঠাৎ খবর রটল যে পাকিস্তানি একদল সৈন্য স্থানীয় দালাল রাজাকারদের সহযোগিতায় আমাদের গ্রামের দিকে রওনা হয়েছে।

পুরো গ্রামে হইচই পড়ে গেল। পালাও পালাও।

যে যেদিকে পারছে পালাচ্ছে। আমার বড় জেঠু একটা কোশা নৌকায় তার মেয়ে এবং দুই ভাস্তিকে নিয়ে নিরাপদ জায়গায় সরে যাচ্ছেন। ওদের কোশা নৌকোটা স্টার্ট নেবার সময় আমার মা আর বড় ভাই আমার ইমিডিয়েট বড় বোনটিকে নিয়ে জেঠুকে অনুরোধ করলেন ওদের সঙ্গে আমার কিশোরী বোনটিকেও নিতে। ভীত হরিণীর মতো সন্ত্রস্ত কম্পমান আমার কিশোরী বোনটির পাশে আমিও দাঁড়িয়ে আছি। আর ভাবছি, যাক পাকিস্তানি পশুরা আমাদের গ্রামে এলেও কিশোরী বোনটি আমার বেঁচে গেল। কিন্তু আমাদের অবাক করে দিয়ে জেঠু হাসতে হাসতে ‘আমাদের নাওয়ে জায়গা নাই’ বলতে বলতে নৌকা ভাসিয়ে দিলেন! অথচ নৌকায় প্রচুর জায়গা ছিল। আমার বোনের মতো আরও অন্তত চারটি মেয়ে ওই নৌকায় অনায়াসে ঠাঁই পেতে পারত!

আমার কিশোর মনে এই ভয়ংকর দৃশ্যটা চিরস্থায়ী হয়ে রইল। এরকম ঘোর বিপদের সময় নিজের ছোট ভাইয়ের কিশোরী কন্যাকে ফেলে যায় কী করে একজন মানুষ! লোকটাকে ক্ষমা করিনি আজও।

১৪

মাসের শুরুর দিকে ঢাকা থেকে বাবা এসে ঘটনা শুনে আমাদের জন্যে একটা কোষা নৌকা কিনে ফেললেন। আমার বড় ভাই আর আমি শিখে নিলাম নৌকা চালান। লগি আর বৈঠা দুটোই চালাতে শিখে গেলাম দ্রুতই।

ভবিষ্যতে বিপদের সময় মা আর ভাইবোনকে নিয়ে আমরা দুই ভাই পালাতে পারব কারও সাহায্য ছাড়াই। 

এই নৌকাটা আমার খুব প্রিয় হয়ে উঠলও। বাতাস আর স্রোতের সময় অনুকূল পথে আমি শুধু বৈঠা ধরে বসে থাকি। জলের স্রোত আর বাতাস আমার নৌকাকে ভাসিয়ে নিয়ে যায় দূরে বহুদূরে। তারপর প্রতিকূল পথে বৈঠা চালিয়ে অনেক পরিশ্রম করে ঘাম ঝরিয়ে ফিরে আসি আমি একলা একা। সে এক অন্যরকম অনুভূতি। কোষা নৌকায় বৈঠা মেরে জলের সঙ্গে লড়াই করে নদীতে ভাসতে যে বিপুল আনন্দ সেই আনন্দের ধারে কাছেও নেই ঝা চকচকে গাড়িতে স্টিয়ারিং হাতে ড্রাইভিং সিটে বসে থাকা। খুব মিস করি আমি আমার কালো সেই নৌকাটিকে। কত ঘুরেছি ওই নৌকাটা নিয়ে। নৌকাটা বাইবার সময় আমি গলা ছেড়ে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের গানগুলো গাইতাম প্রাণভরে। 

১৫

গ্রামের ছেলেমেয়েদের আরবি পড়ানোর জন্যে একজন মুনশি আছেন। মুনশি থাকেন ছোট্ট একটা টং মতোন ঝুপড়ি ঘরে। ওটা আমাদের বাড়ির সীমানার ভেতরে পড়েনি।

মুনশি একা মানুষ। তিনি অন্য গ্রামের লোক। কিন্তু থাকেন এই গ্রামে। ছেলেমেয়েদের আরবি পড়ানোর বিনিময়ে তিনবেলা খাওয়া আর বছর শেষে একবার নতুন লুঙ্গি-পাঞ্জাবি-জায়নামাজ-টুপি এবং তসবিহ কিনে দেওয়া হয় মুনশিকে। মুনশির খাওয়ার সিস্টেমটা দারুণ! মাসের তিরিশ দিন ঘুরেফিরে পাঁচ-ছটা বাড়িতে তিনি খাওয়া-দাওয়া করেন। কোন বাড়িতে কবে খাবেন সেটা পূর্ব নির্ধারিত।

মুনশি বেশ সুখেই আছেন। প্রায় প্রতিদিনই তিনি কোনও না কোনও বাড়ির অতিথি! বেড়াতে যাবার মতো করে তিনি বিভিন্ন বাড়িতে গিয়ে ভালো-মন্দ খেয়ে আসেন। এমনিতে মুনশি গরিব মানুষ। কিন্তু গ্রামের লোকজনের শ্রদ্ধা ভালোবাসায় লোকটা টইটম্বুর। গৃহবধূরা মুনশির জন্যে খুব আন্তরিকতা আর মমতা দিয়ে রান্না করেন। এই মানুষটার কল্যাণেই তাঁদের ছেলেমেয়েরা আরবি পড়তে শিখছে। লোকটাকে খাওয়ালেও সওয়াব।

মুনশির সঙ্গে পরিচয়ের কিছুক্ষণের মধ্যেই খুব নিচু কণ্ঠে আমার কাছে জানতে চেয়েছিলেন মুনশি―বাজান আপনে কি আরবি পড়তে পারেন ?

আমাকে আপনি করে না বলতে অনুরোধ করে তাঁকে বলেছিলাম―জ্বী না। আমি আরবি পড়তে পারি না।

কুনু অক্ষরও চিনেন না মানে চিনো না ? এই যেমন আলিফ বে তে ছে জিম ?

জ্বী না।

তাইলে আমার কাছে আইসো আমি শিখাইয়া দিমু।

জ্বী আসব।

শোনো বাজান খোদার দুনিয়ায় খালি বাংলা ইংরাজি শিখলে হইব না। শেষ বিচারের দিন কেয়ামতের ময়দানে আল্লায় তোমারে আরবিতে প্রশ্ন করলে জবাব দিতে হইব না ? আরবি না শিখলে জবাব দিবা ক্যামনে ?

আমি বলেছিলাম―আল্লাহ তো সব জানেন। আল্লাহ বাংলাও জানেন। আমি বাংলায় জবাব দিলেও আল্লাহ ঠিকই বুঝবেন।

আমার যুক্তিতে হেরে গিয়ে চমৎকার একটা হাসিতে পরাজয় মেনে নিয়েছিলেন মুনশী―ঠিকই কইছ তো বাজান! আল্লায় পৃথিবীর সব ভাষা বোঝেন। পশু-পাখিদের ভাষাও বোঝেন। তিনি পোকা মাকড়ের ভাষাও বোঝেন। তোমার তো দারুণ বুদ্ধি! তারপরেও শিখলে তো অসুবিধা নাই। আমি তোমারে আরবি হরফ শিখাইতে চাই। তোমার মাথা যেমুন সরস দুই দিনেই তুমি সব হরফ চিন্না ফালাইবা।

আমি বলেছিলাম―শিখব। আপনার কাছে আমি আরবি শিখব স্যার।

আমারে স্যার কইও না। স্যার হইল ইশকুলে যারা পড়ায় হ্যারা। আমি হুজুর। আমারে হুজুর বইলা ডাইকো।

আমি বলেছিলাম―জ্বি হুজুর।

মাসব্যাপী মুনশির খাওয়া-দাওয়ার দিন তারিখ নির্ধারণ করে দিয়েছিলেন গ্রামবাসীর উপস্থিতিতে বাবা আর জেঠুরা মিলে, মিটিং করে। আমাদের বাড়িতে এক সপ্তাহ খাওয়ার কথা থাকলেও মুনশি ঘুরে ফিরে আমাদের বাড়িতেই খেতে আসতেন বেশির ভাগ সময়। শুধু দু’সপ্তাহ অন্যদের বাড়িতে খেতেন। ব্যবস্থাটা আমার কাছে খুবই চমৎকার লেগেছিল!

লম্বাটে গড়নের টিঙটিঙে স্বাস্থ্যের মুনশিকে আমার বেশ সুখি মনে হতো। খুব হাসিখুশি থাকতেন সারাক্ষণ। কথা বলতেন নিচু স্বরে। আচরণে ভীষণ ভদ্র আর বিনয়ী।

আমিও আরবি পড়েছি মুনশির কাছে। আমাকে তিনি খুবই ভালোবাসতেন। আমি খুব চটপটে স্বভাবের ছিলাম। মুনশি আমার কথাবার্তায় খুব মজা পেতেন। মন খুলে হাসতেন। তাঁর হাসিতে অপরূপ একটা মিষ্টি সারল্য ছিল। আমাদের অনুকরণে আমার মাকে তিনিও ‘আম্মা’ সম্বোধন করতেন। আম্মা খুব যত্ন করে খাওয়াতেন এই মুনশিকে।

১৬

একাত্তরের অক্টোবর-নভেম্বরে আমাদের পরিবারে একজন নতুন সদস্যের আগমন ঘটল। একটি মেয়েশিশুর জন্ম দিলেন আমাদের আম্মা। বাবা তখন চাকরি সুবাদে ঢাকায়। ছোট্ট কন্যাশিশুটির জন্মের দুদিন পরেই যেন বা কেয়ামত নেমে এল গ্রামটায়।

সকাল নয়টার দিকে খবর এল মিলিটারি আসছে দক্ষিণের পথ দিয়ে। গ্রামের নারী-পুরুষ-বৃদ্ধ-শিশুকিশোরের দল ছুটে পালাতে লাগল উত্তর দিকে। সড়ক পেরিয়ে ক্ষেতের আল ধরে পড়িমরি ছুটে যাচ্ছে ভয়ার্ত মানুষের বিশাল কাফেলা, অন্য কোনও নিরাপদ গ্রামের উদ্দেশ্যে।

পুরো গ্রাম জনশূন্য হয়ে গেল খুব দ্রুত।

জেঠুরাও কখন চলে গেছেন! শুধু আমরা, ভাইবোনেরা বসে আছি শুয়ে থাকা মাকে ঘিরে। মায়ের পাশে ছোট্ট কাঁথা মুড়ি দিয়ে নির্ভয়ে ঘুমুচ্ছে দুদিন বয়েসি ছোট্ট পুতুলের মতো তুলতুলে আমাদের বোনটা। আমরা পালাতে পারব না। দুদিন আগে যে মায়ের গর্ভ থেকে সন্তান ভূমিষ্ঠ হয় সেই মা দৌড়ুতে পারেন না। সুতরাং আমাদের কোথাও যাবার তাগিদ নেই। যা হবার হবে। যে কোনও পরিস্থিতির জন্যে আমরা প্রস্তুত।

সহসা উঠোনে হাঁকডাক শোনা গেল মুনশির।

আমি দৌড়ে তাঁর কাছে গেলাম। আমাকে দেখেই বিস্মিত মুনশি জিজ্ঞেস করলেন, ‘তোমরা এহনো বাড়িৎ‌ বইসা রইছ! পুরা গ্রামে কুনো জনমানব নাই।’ বড় ভাই মুনশিকে জানালেন আমাদের ছোট্ট বোনটির কথা। বললেন, ‘এই অবস্থায় আম্মাকে নিয়ে পালানো সম্ভব না।’ 

হঠাৎ, নিচুস্বরে কথা বলা মায়ের দিকে চোখ তুলে না তাকানো মুনশি আশ্চর্য দৃঢ়তায় সাহসী রাজকুমারের ভূমিকায় অবতীর্ণ হলেন। আমাদের ঠেলে তিনি দরোজার সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন। তারপর অনুচ্চ স্বরে বললেন, ‘আম্মা আমি আপনের আরেকটা সন্তানের মতোই তো! আমি আছি না! আমি আমার বইনটারে কোলে নিতাছি। আপ্নে কুনু চিন্তা করবেন না। তারে আমি খুব আস্তে কইরা কোলে রাখব। আপনে আস্তে আস্তে হাঁটবেন। দৌঁড়ানের দরকার নাই। যা আছে কপালে। আপ্নের লগে লগে আমরা হাঁটমু। কুনু ডর নাই। আল্লা ভরসা। উঠেন। যাইতে হইব। বাঁচতে হইব। ছোডো বইনটারেও বাঁচান লাগবো আম্মা।’ 

মুনশির কথায় আম্মাও কেমন সাহসী হয়ে উঠলেন। অসুস্থ শরীরে উঠে দাঁড়ালেন আম্মা। আম্মাকে ঘিরে আমরা কয়েকটা কিশোর  ভাইবোন। আমার বড় ভাই আর কিশোরী বোনটা দুদিক থেকে আম্মাকে ধরে রেখেছে। আম্মার একেবারে সামনেই মুনশির কোলে একটা কাপড়ের পুটুলি। সেই পুটুলির ভেতরে দুদিন আগে পৃথিবীতে আসা আমাদের ছোট্ট বোনটা পিট পিট করে তাকাচ্ছে! আহারে, কী বিপদেই না পড়েছে বাচ্চাটা পৃথিবীতে এসে!

অনাত্মীয় মুনশির নেতৃত্বে ধীর পদক্ষেপে আমরা হেঁটে যাচ্ছি আপাতত নিরাপদ দূরের একটা গ্রামের দিকে। সেই গ্রামে আমার মায়ের একজন ভাই থাকেন। মামা নিশ্চয়ই আমাদের আশ্রয় দেবেন।   

সকালের উজ্জ্বল রোদ ক্রমশ তীব্র হচ্ছে। সবুজ দূর্বা ঘাস আর মুগ সরিষা কলুই ক্ষেতের অজস্র খুদে খুদে পাতায় জমে থাকা ভোরের শিশিরকণারা তখনও একরাশ মুগ্ধতা নিয়ে লড়াই করে যাচ্ছে সূর্যের আলো ও তার উষ্ণতার সঙ্গে। আর কিছুক্ষণের মধ্যেই পরাজিত হবে জেনেও। 

আহা একাত্তর! তুমি আমাদের নিক্ষিপ্ত করেছিলে নৃশংসতা অমানবিকতা প্রেম সৌন্দর্য স্বপ্ন আর ভালোবাসার পরস্পর হাত ধরাধরি করে থাকা আশ্চর্য এক কুয়াশার ভেতরে!

সচিত্রকরণ : ধ্রুব এষ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may have missed

shares