দাউ দাউ করে জ্বলছে আগুন : রাশেদ রউফ

শিশুসাহিত্য : কিশোর গল্প

: চুপ চুপ। কোনও কথা নয়।

গভীর রাত। অন্ধকারের মধ্যে মাকে কথা বলতে নিষেধ করলেন বাবা। আরিফ ঘুমিয়েছিল। নিলুও। কিন্তু ভীষণ হইচই আর কান্নাকাটির আওয়াজে ওরাও জেগে উঠল। মা কিছু বলতে চাইলে বাবা তাঁকে শব্দ না-করার জন্য বলেন।

গভীর রাতে যে আওয়াজ হয়, তাতে শুধু মা নয়, আরিফও ভয় পায়। বাবাকে আঁকড়ে ধরে সে।

শব্দ আসছে দক্ষিণ দিক থেকে। ওদিকে হিন্দুপাড়া। থেকে থেকে আসছে কান্নার রোল। চিৎকার। দাউ দাউ করে আগুন জ্বলছে। আগুনের লেলিহান শিখা যেন তাদের বাড়িতে এসে পড়ছে। পুড়ে যাচ্ছে বাড়িঘর। মৃদুলের বাড়ি মনে হয় জ্বলছে। মৃদুল আরিফের বন্ধু।

বাবা অন্ধকার ঘরে বাতি জ্বালাতে দিচ্ছেন না। হারিকেন জ্বালানো ছিল ছোটো করে। কখন যে সেটাও নিভে যায়, মা-বাবা কেউ বুঝতে পারেননি। এভাবে ভয়ে ভয়ে কান্নার ধ্বনি শুনতে শুনতে আবার ঘুমিয়ে পড়ে আরিফ-নিলু। কিন্তু বাবা ও মায়ের চোখে ঘুম নেই। তাঁরা উদ্বিগ্ন।

হিন্দুপাড়া আগুনে পুড়ে যায়। আগুনে পোড়ার গন্ধ ভেসে বেড়াচ্ছে সারা গ্রাম। বাবাদের মতো কারও চোখে ঘুম ছিল না। ভোর হলে পুকুরপাড়ে সবাই জড়ো হন। একে অপরের ভয়-উদ্বেগের কথা শোনান। তাঁরা বলেন, দেশের স্বাধীনতার জন্য আমাদের তরুণরা যুদ্ধ করছে। এই মুক্তিযুদ্ধে শুধু শহর নয়, গ্রামও দেখি পুড়ে ছাই করে দিচ্ছে শত্রুরা।

আজ দু’দিন ধরে আরিফরা কেবল শুনছে―গ্রামে মিলিটারি আসছে। তারা কখনও ‘মিলিটারি’ দেখে নি। মিলিটারি শব্দ শুনলেই তাদের ভয় লাগে। ওরা নাকি ভয়ংকর। পাকিস্তানি মিলিটারি, ইয়া বড় শরীর। দৈত্যের মতো। মিলিটারি আসবে শুনে গ্রামের মানুষ ভয়ে কাঁপছে। লোকজন কোথায় পালাবে ? শহর থেকে হাজারে হাজারে মানুষ গ্রামে আসছে। কিন্তু গ্রামের মানুষ কোথায় যাবে ? কেউ পালাতে পারছে না। নদীপাড়ে―পুকুরপাড়ে রাত কাটাতে শুরু করেছে গ্রামের কিছু পুরুষ। কিন্তু মেয়েরা লুকাবে কোথায় ? ওদের নিরাপদ স্থান কই ? নিলু বয়স্ক মানুষের মতো উত্তর দেয় : ওদের জন্য আল্লাহ ছাড়া আর কেউ নেই।

আরিফের বাবা নদীর পাড়ে লুকোতে যাননি। বলেন : মরলে এখানে মরব। মা যদিও বেশ কয়েকবার বলেছিলেন অন্যদের মতো ঘরে না-থাকতে।

রাতে হিন্দুপাড়ায় আগুন লাগেনি, আগুন দেওয়া হয়েছিল। ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দিয়েছিল। কারা জ্বালিয়ে দিয়েছিল ? মিলিটারিরা ? পুকুরপাড়ে জড়ো হওয়া লোকগুলো বলাবলি করছেন। না, মিলিটারি এখনও ছনহরা গ্রামে আসেনি। শোনা গেল, গ্রামের কিছু লোক হিন্দুপাড়ায় আগুন দিয়েছে। মিলিটারি আসার আগেই ওদের কাজ করে ফেলল গ্রামেরই কিছু মানুষ! আহা, কী নিষ্ঠুরতা!

আরিফ আর নিলু ঘুম থেকে উঠে মাকে না-বলে চলে যায় হিন্দুপাড়ায়। মৃদুলের বাড়ি দেখতে। গিয়ে দেখল ওখানে অনেক মানুষ। তারাও গেছেন আরিফদের মতো। প্রতিবেশীদের খবর নিতে।

সব পুড়ে ছাই। পুরো পাড়া। একটা ঘরও বাকি নেই। পোড়া বাড়ির জিনিসপত্র ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। কেউ কেউ সেসব জিনিসপত্র বেছে বেছে নিয়ে নিচ্ছে। কাউকে বাধা দেওয়া হচ্ছে না। আরিফ এর আগে কখনও অগ্নিকাণ্ড দেখেনি। অগ্নিকাণ্ড এত ভয়ংকর, এত বীভৎস ও এত করুণ হতে পারে―সে কখনও বোঝেনি।

ওখানে বলাবলি করছে : ঘরে আগুন লাগালো গ্রামের রাজাকাররা। রাজাকার কারা ? আরিফ এদের চেনার চেষ্টা করে। শুনতে পায় : এরা খুব খারাপ লোক। মিলিটারির সঙ্গে এরা যোগ দিয়েছে। ওদের হয়ে কাজ করে। যারা নিজের ভাইয়ের প্রাণ নিতে আনন্দ পায়। যারা নিজের বোনকে অসম্মান করে। এসব শুনে রাজাকারদের ঘৃণা করতে লাগল আরিফ। থুতু দিতে ইচ্ছে করল এদের মুখে।

চারদিকে অনেক মানুষ। খুব ভিড়। এই ভিড়ের মধ্যে আরিফ তার সহপাঠী মৃদুলকে খোঁজার চেষ্টা করে। মৃদুল কই ? তাদের বাড়ি নিশ্চিহ্ন। ধোঁয়া উঠছে কেবল ওখান থেকে। ওদের কারও দেখা নেই। জমা হওয়া একটা দীর্ঘশ্বাস হঠাৎ পোড়া বাড়ির ধোঁয়ার মতো বেরিয়ে আসে আরিফের ছোট্ট বুক থেকে।

সচিত্রকরণ : তাইয়ারা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may have missed

shares