শিশুসাহিত্য : কিশোর গল্প

কেটটা খুলতেই বেরিয়ে এল লাল রঙের একটা রেডিও।

শাহজাহান মির্জা রেডিওটি হাতে নিয়ে অবাক দৃষ্টিতে দেখতে থাকেন। কে পাঠাল রেডিওটি ? কুরিয়ার সার্ভিসের ডেলিভারিম্যানকে প্যাকেটটা হাতে নেওয়ার সময় জিজ্ঞ্যেস করেছিলেন। ডেলিভারিম্যান উত্তরে বলেছিল, এটা আমাদেরও প্রশ্ন। প্যাকেটের গায়ে প্রেরকের ঠিকানা লেখা নেই। নেই মোবাইল নাম্বারও। আছে প্রাপকের নাম ও মোবাইল নাম্বার।

আজ সকালে শাহজাহান মির্জার ঘুম ভেঙেছিল একটা ফোন পেয়ে। ফোনের ওপাশ থেকে জানালো, দুরন্ত কুরিয়ার সার্ভিস থেকে বলছি। আপনার একটা পার্সেল এসেছে। দয়া করে ঠিকানাটা বলবেন স্যার ? 

শাহজাহান মির্জা ঠিকানা জানিয়ে দিলেন। ঠিকানা অনুযায়ী দুরন্ত কুরিয়ার সার্ভিসের ডেলিভারিম্যান প্যাকেটটা এসে দিয়ে গেল।

কিন্তু রেডিওটা কে পাঠাল ? বিস্ময়ের ঘোর কাটে না তার। যে মানুষটা এই উপহার পাঠিয়েছে সে জানল কি করে আমি রেডিও ভালোবাসি। আমার একটা রেডিও ছিল। রঙ ছিল তার লাল। রক্তের মতো লাল। চার ব্যাটারিতে চলত রেডিওটা। তিনটা ব্যাটারি সহজভাবে রেডিওর পেটে দিতে পারলেও একটা ব্যাটারি ঢোকাতে অনেক কসরত করতে হতো। ঠেসে ঠেসে ভরতে হতো। ব্যাটারির কথা মনে পড়তেই শাহজাহান মির্জা রেডিওটা উল্টে দেখলেন ব্যাটারি আছে কি না। না নেই। কিন্তু মুহূর্তের মধ্যে চমকে যাবার মতো একটা জিনিস লক্ষ্য করলেন। ব্যাটারি প্রবেশ করানোর নির্দিষ্ট জায়গার মাঝ বরাবর ছোট্ট একটা কাগজে লেখা ‘প্রেরক : সবুজ’। কাগজটা স্কচটেপ দিয়ে আটকান। অদ্ভুত ব্যাপার! 

মুহূর্তের মধ্যেই শাহজাহান মির্জার মনে হলো কে যেন মাছ ধরার মতো করে শরীরের ওপর জাল ছড়িয়ে দিয়েছে। এ এক রহস্যের জাল। লাল রঙের রেডিও, পাঠিয়েছে সবুজ নামের একজন। অথচ ঠিকানা নেই। মোবাইল নাম্বারও নেই। কেন পাঠালো ? ছিয়াত্তর বছর বয়সে এসে এমন অদ্ভুত রহস্যের মুখোমুখি এর আগে কখনও হননি তিনি।

দুই

মেঘনা রিসোর্টে বেড়াতে এসেছে অন্তু। স্কুল বন্ধ। করোনা ভাইরাসের কারণে এতদিন বাসায় যেন বন্দি জীবন কেটেছে। কি একটা অস্থির অবস্থা। এই শতাব্দীর মানুষেরা পেল এক নতুন অভিজ্ঞতা। করোনা অনেক স্বজনদের কেড়ে নিয়েছে। কত-কত প্রিয়জনকে আমরা হারিয়েছি। আবার নতুন স্বাভাবিক জীবন নিয়ে জেগে উঠবার তীব্র বাসনা নিয়ে জেগে উঠেছে সবাই। তাই তো করোনার প্রথম ধাপের লকডাউন শেষে অনেকেই ঘুরতে বেরিয়েছে। প্রকৃতির খোলা হাওয়ায় কেউ কেউ মেতেছে সৃষ্টিশীল আনন্দে। অন্তুও বেড়াতে এসেছে। বাবা-মা’র সঙ্গে।

নদীর তীর ঘেঁষে হাঁটছিল অন্তু। সঙ্গে বাবা-মা। শান বাঁধানো পুকুরঘাট। পাশ দিয়ে বয়ে গেছে নদী। গাছে গাছে প্রজাপতিরা উড়ছে। আকাশটাও বেশ ঝকঝকে। বাবা-মা’র সঙ্গে হাঁটতে হাঁটতে সব রকমের ভালো লাগার অনুভূতি ছুঁয়ে যায় অন্তুকে।

হঠাৎ চোখে পড়ল একটা লোক নদীর পাড় দিয়ে হাঁটাহাঁটি করছেন। কিছু একটা খোঁজার চেষ্টা করছেন। অন্তু দূর থেকে লক্ষ্য করতে থাকে লোকটিকে। বাবা-মা তখন অন্তুর থেকে একটু দূরে। কি যেন একটা বিষয় নিয়ে তারা হাসাহাসি করছিল। কথা বলছিল।

অন্তু খেয়াল করল, হঠাৎ লোকটি ঘাসের ওপর বসে পড়লেন। দূর থেকে ইশারায় ডাকলেন অন্তুকে।

অন্তু লোকটির কাছে এগিয়ে যায় ভীরু ভীরু পায়ে। অচেনা জায়গা। অচেনা মানুষ। কাছে যাওয়াটা কি ঠিক হচ্ছে ? এই নিয়ে খানিকটা দ্বিধাদ্বন্দ্বে পড়ে যায়। কিন্তু রিসোর্টটা দেখে মনে হয় এখানে সবকিছুই নিরাপদ। এখানকার যারা স্টাফ তারাও বেশ অতিথিপরায়ণ। তাছাড়া যারা বেড়াতে এসেছে, মনে হয় ভালো মানুষেরাই এসেছে। অন্তুরা এই রিসোর্টে এসেছে আজ সকালে। এখন দুপুর গড়িয়ে বিকেল। এখনও পর্যন্ত ওর বয়সি কোনও ছেলেকে দেখতে পায়নি সে। যে কয়েকটি পরিবার এখানে বেড়াতে এসেছে তাদের দলে বেশ কয়েকটা শিশু রয়েছে। ছোট ছোট ছেলে-মেয়ে ঘাসের ডগায় নরম পা রেখে টুকটুক করে দৌড়াচ্ছে। এমন একটা সুন্দর স্নিগ্ধ পরিবেশে আর যাই হোক দুষ্ট মানুষের উপস্থিতি থাকতে পারে না।

অন্তু এগিয়ে যায় লোকটির দিকে। বাবা-মা একটু দূরে। একটা আম গাছের নিচে দাঁড়িয়ে কথা বলছে তারা।

কাছে এগিয়ে যেতে লোকটি জিজ্ঞ্যেস করলেন, কি নাম তোমার ?

অন্তু।

কোন ক্লাসে পড় ?

ক্লাস এইটে।

গল্প শুনতে ভালোবাস ?

হ্যাঁ।

আমার কাছে অনেক গল্প আছে। শুনবে ?

শুনব।

লোকটি গভীর সম্মোহনী কণ্ঠে বললেন, তা হলে এখানে বস।

বসতে পারি তার আগে বলে আসি। ঐ যে আমার বাবা-মা।

ঠিক আছে যাও।

অন্তু এক দৌড়ে বাবা-মা’র কাছে চলে গেল। ওর দৌড় দেখে মনে হলো যেন রঙিন ডানা মেলে একটা প্রজাপতি উড়ে গেল। আবারও ফিরে আসে দৌড়ে। সবুজ ঘাসের নরম বুকে পা ছড়িয়ে অন্তু লোকটির মুখোমুখি বসল।

লোকটি বললেন, তাকিয়ে দেখ তোমার সামনে ফসলের মাঠ, দিগন্ত, নদী বয়ে চলেছে, কৃষকেরা মাঠে কাজ করছে, কোমল হাওয়ার স্পর্শে মন দুলে উঠছে―এই তো আমাদের দেশ। এর নাম বাংলাদেশ। এর স্থপতি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তুমি জান, এই বাংলাদেশ কীভাবে হলো ?

অন্তু খুব নরম স্বরে বলল, হ্যাঁ জানি। বইতে পড়েছি।

মুহূর্তের মধ্যে অন্তু যেন সময়ের স্রোতে অন্য এক কিশোর হয়ে উঠল। যেন ইতিহাসের সাক্ষী হতে এক ময়দানে এসে দাঁড়াল। হাজারো মানুষ। লাখো মানুষ। অযুত-নিযুত মানুষ। হর্ষধ্বনি। করতালি। সবাই অপেক্ষা করছে। হঠাৎ সবার সামনে এসে দাঁড়ালেন একজন। লক্ষ-কোটি মানুষের জনকোলাহল থেমে গেল। নেমে এল স্তব্ধতা। সবার দৃষ্টি কেবল ওই একজন মানুষের একটি তর্জনীর দিকে। ওই মানুষটির তর্জনী নড়ে উঠল। সারা ময়দান যেন স্ফুলিঙ্গের শিখায়-শিখায় জ্বলে উঠল। তিনি বললেন, ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম। এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’

জনস্রোতে মিশে থাকা মানুষেরা সমস্বরে স্লোগান ধরল, তোমার নেতা, আমার নেতা, শেখ মুজিব, শেখ মুজিব। জয় বাংলা।

বইতে পড়া ৭ মার্চের সংগ্রামমুখর ঐতিহাসিক সেই দিনটির ছবি চোখ থেকে যেন সরছে না। লোকটির সামনাসামনি বসে অন্তু কিছুটা বিস্মিত। কিছুটা কৌতূহলী। কে এই লোকটা ? যিনি হৃদয়ের শব্দমালা দিয়ে বাংলাদেশের ছবি আঁকলেন ? বাংলাদেশের এমন ছবি অন্তুর ড্রয়িং খাতার নানান পাতায় ছড়িয়ে আছে। তা হলে কি এই লোকটি আর্টিস্ট ? নাকি কোনও বাউল ? গান করে বেড়ান। অন্তু গভীর দৃষ্টি ফেলে লোকটিকে দেখতে থাকে। লোকটির পায়ে চপ্পল। পরনে সাদা পাজামা-পাঞ্জাবি। চোখে কালো ফ্রেমের চশমা। মাথাভর্তি পাকা চুল। মনে হচ্ছে কি যেন খুঁজছে সে। লোকটির চোখ স্থির থাকছে না। সাহস করে অন্তু বলেই ফেলল, নদীর পাড়ে হেঁটে হেঁটে কি খুঁজছিলেন ?

গম্ভীর গলায় লোকটি বললেন, আমি বঙ্গপোসাগর খুঁজছিলাম। কর্ণফুলির সেই মোহনা খুঁজছিলাম। আমি সাগরের সেই উত্তাল ঢেউ খুঁজছিলাম। দেবে ? দেবে আমাকে ? দাও, এক্ষুনি এনে দাও।

লোকটি পাগল নাকি ? অন্তু ভয় পেয়ে যায়। এখানে থাকতে আর ইচ্ছে করছে না। মায়ের কাছে যাবে বলে দাঁড়িয়ে পড়ল অন্তু।

হো হো করে হেসে উঠলেন লোকটি। হাত ধরে হ্যাচকা টেনে ঘাসের ওপর বসিয়ে দিলেন। কোথায় যাচ্ছ ? গল্প তো শেষ হয়নি।

লোকটির আচরণ অন্তুকে অস্বস্তির মধ্যে ফেলে দেয়। এত বড় মানুষ। বাবার চেয়েও বড়। দাদুর মতন। তাঁর সঙ্গে কি এত কথা বলা যায় ? তাঁকে কি প্রশ্ন করা যায় ? শুধু তাঁর কথা শুনতে হয়। অন্তু ভাবতে থাকে, শোনার জন্যই তো এখানে বসা।

অন্তু বলল, আপনি কি এখানে বেড়াতে এসেছেন ?

লোকটি আবারও সেই কঠিন গম্ভীর গলায় বলতে লাগল, জান, মানুষের জীবনে ঘটে যাওয়া সব কিছুই একদিন গল্প হয়ে স্মৃতির পাতায় জমে থাকে। আবার কিছু কিছু ঘটনা আছে যা শুধু গল্পই হয়ে ওঠে না, হয়ে ওঠে ইতিহাস। আমার রেডিওটি হলো তেমন একটি ইতিহাস।

আপনার সঙ্গে কি রেডিও আছে ? অন্তু সহজ ভঙ্গিতে জিজ্ঞেস করল। আমি তো রেডিও শুনি না। আমাদের বাসায় রেডিও নেই।  

লোকটির কন্ঠে বিষ্ময়!  বললেন, তোমরা রেডিও শোনো না ? এখন অবশ্য তোমরা টেলিভিশন চেন। অথচ এই রেডিও ছিল এক সময় আমাদের সাহস জোগানোর মাধ্যম। কত গান শুনেছি। আমাদের প্রেরণা জুগিয়েছে এই রেডিও। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র। নাম শুনেছ ?

অন্তু এবার স্বাভাবিক। একটু আগে যে অস্বস্তি ভাবটা এসেছিলো তা কেটে গেছে। কেন যেন লোকটাকে এখন আপন মনে হতে লাগল। মাথা দুলিয়ে সম্মতি স্বরে বলল, হ্যাঁ। আমার বইতেও আছে। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে অনেক দেশের গান প্রচার হতো, তাই না।

ঠিক ধরেছ। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র ছিল দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের মানসিক শক্তিতে উজ্জীবিত করার একটা প্রতিষ্ঠান।

আপনি কি মুক্তিযোদ্ধা ? অন্তু জানতে চাইল।

লোকটি অন্তুর চোখে চোখ রেখে তাকিয়ে থাকলেন।

বললেন, একদিন ঝড় উঠেছিল বঙ্গপোসাগরে। আমিই ছিলাম সেই ঝড়ের ঝড়ো হাওয়া। সাঁই সাঁই করে উড়িয়ে দিয়েছি পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীদের জাহাজ। আমরা ছিলাম ষাটজন। এই যে নদী দেখছ, আমার কাছে মনে হচ্ছে এই নদী যেন সেই সমুদ্র। যে সমুদ্রের কাছে আমরা সাহসের সঙ্গে বুক পেতে দিয়েছিলাম। ইতিহাসের পাতায় সেদিনের সেই সাহসের কথাগুলো লেখা হলো ‘অপারেশন জ্যাকপট’ নামে। এজন্য আমাদের অনেক ট্রেনিং নিতে হয়েছে। কীভাবে মাইন ছুড়তে হয়। কীভাবে শত্রুকে হামলা করতে হয়। সাঁতার কাটা, চোখ-নাক ভাসিয়ে মাছের মতো নিঃশব্দে চলার জন্য আমাদের ট্রেনিং নিতে হয়েছে। ট্রেনিং এর আগে আমরা শপথ নিয়েছিলাম ‘দেশের স্বাধীনতার জন্য জীবন বিসর্জন দিতে সম্মত হয়েই এই প্রশিক্ষণ গ্রহণ করছি। মুক্তিযুদ্ধে আমাদের মৃত্যু ঘটলে কেউ দায়ী থাকবে না।’ ট্রেনিং শেষে আমাদের প্রত্যেকের হাতে দেওয়া হলো অস্ত্র আর একটা রেডিও। আমাদের বলা হলো, এই রেডিওতেই বাজানো হবে যুদ্ধের সংকেত। সংকেত হিসেবে থাকবে দুটি গান। অল ইন্ডিয়া রেডিও থেকে বাজানো হবে ওই গান দুটি।

লোকটির কথা শুনে অন্তু নিশ্চিত, এই মুহূর্তে সে একজন মুক্তিযোদ্ধার মুখোমুখি বসে আছে। কিন্তু লোকটি নিজেকে প্রকাশ করছেন না, বলছেন না যে তিনি একজন মুক্তিযোদ্ধা। বীর মুক্তিযোদ্ধা। অন্তু মুক্তিযোদ্ধাদের কথা বইতে পড়েছে। জেনেছে। মুক্তিযোদ্ধারাই পারে সাহসের সঙ্গে লড়তে। মৃদুস্বরে কৌতূহলী মনটাকে জাগিয়ে তুলল অন্তু। বলল, তারপর।

লোকটি বলতে থাকলেন, ১৩ আগস্ট ১৯৭১। অল ইন্ডিয়া রেডিওর সঙ্গীতানুষ্ঠান থেকে ভেসে এল গান। ‘আমার পুতুল আজকে প্রথম যাবে শ্বশুরবাড়ি’। এ গান শুধু গান নয়। অপারেশন জ্যাকপটের পরিকল্পনা অনুযায়ী এটি ছিল প্রথম সংকেত। গানটি শুনে এগোতে হবে চট্টগ্রাম বন্দরের দিকে। আমরা এগোলাম। অপেক্ষা করতে থাকলাম চট্টগ্রাম বন্দরের কাছে আমাদের গেরিলাদের ঘাঁটিতে। পরদিন ১৪ আগস্ট। প্রচার হলো দ্বিতীয় সংকেত। অল ইন্ডিয়া রেডিওতে বাজতে থাকল গান―‘আমি তোমায় শুনিয়েছিলাম যত গান তার বদলে চাইনি কোনও দান’। আমরা আর দেরি করিনি। নেমে পড়লাম অপারেশনে। নিঃশব্দে সাঁতার কেটে পৌঁছে গেলাম জাহাজগুলোর কাছে। ১৫ আগস্ট ১৯৭১ সাল। রাত তখন ১.৪৫ মিনিট। প্রচণ্ড বিস্ফোরণে বিকট শব্দে বন্দরনগরী থরথর করে কাঁপতে লাগল। একদিকে মুক্তিযোদ্ধারা, অন্যদিকে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী। জাহাজে জাহাজে চলল লড়াই। রক্তাক্ত লাশ ভেসে ভেসে সাগরের জলরাশিতে মিশে গেল। বাঙালির নৌ কমান্ডোদের বীরত্বপূর্ণ সাহসিকতায় পরাস্ত হলো পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী। আমরা বিজয়ী হলাম। কিন্তু আমাদের রেডিওটাও হারিয়ে গেল। রেডিওটার জন্য আমার কান্না পায়। লাল রঙের রেডিও। এই রেডিও আমাদের শুনিয়েছে বঙ্গবন্ধুর বজ্রকণ্ঠ। শুনিয়েছে চরমপত্র, জল্লাদের দরবার। মুক্তিযোদ্ধাদের উদ্দীপনা জাগাতে শুনিয়েছে দেশের গান। একাত্তরের শব্দসৈনিকদের স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র ছিল মুক্তিযুদ্ধের দ্বিতীয় ফ্রন্ট। 

অন্তুর চোখ ছলছল করে উঠল। হঠাৎ বাবার কণ্ঠ শুনতে পেয়ে পেছনে তাকাল। কখন যে বাবা আর মা কাছে এসে বসেছে টেরই পায়নি অন্তু। বাবা বলল, আপনার স্মৃতি কথা শুনে বুঝতে পেরেছি আপনি একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা। আপনাকে অভিবাদন।

লোকটি বললেন ঠিক ধরেছেন। হ্যাঁ আমি একজন মুক্তিযোদ্ধো।

বাবা-মা আর অন্তু দাঁড়িয়ে স্যালুট জানায় বীর মুক্তিযোদ্ধাকে। মুক্তিযোদ্ধা অন্তুর কাছে জানতে চাইলেন আমাদের বিজয়ের সবচেয়ে বড় কারণ কি জান ?

বাবা-মা, অন্তু সবাই চুপ।

মুক্তিযোদ্ধা বললেন, বিজয়ের সবচেয়ে বড় কারণ আমাদের সাহস। সাহসের প্রতীক আমাদের মহান নেতা বঙ্গবন্ধু।

অন্তুর মনে হলো রিসোর্টের গাছগুলো, ফুলগুলো, শাখা-প্রশাখায় ভরে থাকা পাখিগুলো সবাই যেন মুক্তিযোদ্ধাকে অভিবাদন জানাচ্ছে।

মুক্তিযোদ্ধা তার পাঞ্জাবির পকেট থেকে একটি ভিজিটিং কার্ড বের করে বাবার হাতে দিলেন।

তিন

শাহজাহান মির্জা দোকান থেকে চারটা ব্যাটারি কিনে নিয়ে এলেন। হঠাৎ তার মনে হলো অচেনাজনের থেকে পাওয়া এই রেডিওটা তার নয়। উড়ো চিঠির মতো যেন উড়ো রেডিও। ব্যাটারি লাগানোটা ঠিক হবে না। আগে প্রাপককে খুঁজে পাই। তারপর ব্যাটারি লাগিয়ে চালু করা যাবে এই রেডিও। শাহজাহান মির্জা ব্যাটারিসহ রেডিওটি আলমারিতে রেখে দিলেন।

ঘরে আসবাবপত্র বলতে এই আলমারিটাই তার সম্পদ। একাকী জীবন তার। না বাবা, না মা, না তার পরিবার পরিজন, সন্তান-সন্তুতি কেউ নেই। কে কোথায় আছে, কে জানে ? মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস এমনই।  কারও বুকে সন্তান হারানোর কান্না, কারও বুকে পিতা-মাতা হারানোর কান্না, স্বজন হারানোর কান্না। বুক ফাটিয়ে অঝোর কান্নামাখা আর্তনাদ হয়ত অনেকের কাছে পৌঁছায় না। যেমন শাহজাহান মির্জার কান্না। স্বজন হারানোর বেদনা নিয়ে বাবার দেওয়া ঘরটুকু আগলে রেখেছেন। গ্রামের নাম হলুদিয়া। ময়মনসিংহ শহর থেকে খানিকটা দূরের একটি গ্রাম। অবশ্য শহরের একটু ছোঁয়া লেগেছে এখন। বুকচিরে পাকা রাস্তা হয়েছে গ্রামে। ঝলমল করা আলো এসেছে। একাত্তরে বঙ্গবন্ধুর ডাকে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিতে শাহজাহান মির্জা পরিবার পরিজন ফেলে চলে গিয়েছিলেন পশ্চিমবঙ্গে। সেখানকার মুর্শিদাবাদের ভাগীরথি নদীর তীর ঘেঁষে জেগে থাকা পলাশীতে নৌ-কমান্ডোরা ট্রেনিং গ্রহণ করেছেন। যুদ্ধ শেষে দেশে ফিরে এসে শাহজাহান মির্জা শুধু তার বাবাকেই পেয়েছিলেন। কিন্তু বিজয়ের কয়েকদিন পর একদল রাজাকার আক্রমণ চালায় বাড়িতে, বাবাসহ তাকে বন্দি করে ফেলে। রাজাকাররা তাদেরকে হত্যা করার জন্য দড়ি দিয়ে বেঁধে নৌকায় করে দূরে নিয়ে যেতে থাকে। একসময় কৌশলে শাহজাহান মির্জাকে বাঁধা দড়ির গিট খুলে দেয় তার বাবা। রাজাকাররা এই দৃশ্য দেখে ফেললে বাবাকে চাকু দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করল। মুক্তিযোদ্ধা সন্তানকে বাঁচাতে গিয়ে বাবা শহিদ হন।

শাহজাহান মির্জার আর কিছুই মনে নেই। শুধু বেঁচে আছেন একাত্তরের স্মৃতি নিয়ে বিজয়ের আনন্দে।

চার

কয়েক মাস পর। আবারও করোনার ছোবল। আবারও লকডাউন। আবারও ঘরবন্দি জীবন। হাঁপিয়ে উঠল মানুষ। কয়েক মাস পর লকডাউনের নিষেধাজ্ঞা তুলে দেওয়া হলো। হু-হু করে ঘর ছেড়ে আবারও মানুষেরা বের হলো। শুরু করল কর্মচঞ্চল জীবন। ভেতরে জমে থাকা হাহাকারগুলো ছেড়ে দিতে আবারও মানুষেরা প্রকৃতির কোলে ছড়িয়ে পড়ল। ঘুরে বেড়াতে লাগল পাহাড়-পবর্ত, নদী-সমুদ্র, ঝর্নাধারা। পর্যটন কেন্দ্রগুলোতে আবারও উপচে পড়ল মানুষের ঢল।

বাবা-মা অন্তুকে সঙ্গে নিয়ে আবারও এসেছে সেই মেঘনা রিসোর্টে। জায়গাটা মা’র এত ভালো লেগেছে তাই বাবা আর না-করেনি। সেই গাছ-গাছালি, সেই পাখির কলতান, সেই প্রজাপতির ডানা মেলে উড়ে বেড়াবার দৃশ্য, সবুজ ঘাসের নরম বুকে ছড়িয়ে যাওয়া রোদের আলো দেখতে ওরা ঘুরতে লাগল রিসোর্ট চত্বরে। হঠাৎ চেঁচিয়ে উঠল অন্তু। বলল, মা দেখ দেখ ওই লোকটা।

মা তাকিয়ে দেখে, তাই তো। পাজামা-পাঞ্জাবি গায়ে চেপে সেই লোকটি নদীর তীর ঘেঁষে হাঁটছেন। নদীতে কোনও ঢেউ ছিল না। নদীটার বুকে কোনও জলতরঙ্গ নেই। লোকটি ঠিক আগের মতোই নদীর পাড় ঘেঁষে কি যেন খুঁজছেন। বাবাকে ডেকে লোকটাকে দেখালো মা।

বাবা বলল, চল লোকটার কাছে যাই।

লোকটা ততক্ষণে ক্লান্ত দেহ নিয়ে সবুজ ঘাসের ওপর পা ছড়িয়ে বসে পড়লেন।

কাছে গিয়ে বাবা বলল, আপনি তো সেই শাহজাহান মির্জা। বীর মুক্তিযোদ্ধা। আমাদের চিনতে পেরেছেন ? সেই যে আমাদের দেখা হলো। আপনি আমাকে ভিজিটিং কার্ড দিয়েছিলেন।

বীর মুক্তিযোদ্ধা হাসলেন। বললেন মনে পড়েছে।

বাবা বলল, ভিজিটিং কার্ডে শুধু আপনার নাম ও মোবাইল নম্বর ছিলো। ঠিকানা লেখা ছিল না। কুরিয়ার সার্ভিসে আপনার জন্য উপহার পাঠিয়ে ছিলাম।

অন্তু বলল, লাল রঙের রেডিওটা পেয়েছিলেন ?

বীর মুক্তিযোদ্ধা বিস্ময়ভরা দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলেন। অন্তুর কথা শুনে যেন রহস্যের জাল ছিঁড়ে ফেলার ইশারা পেলেন।

অন্তু বলল, আমি পাঠিয়েছিলাম।

বীর মুক্তিযোদ্ধা শাহজাহান মির্জা এবার মুখ খুললেন, না, ওটা পাঠিয়েছে সবুজ। তোমার নাম তো অন্তু।

অন্তু বলল, সবুজ ছাড়া লাল রঙ কি মানাবে ? তাই আমি নাম দিয়েছি সবুজ। লালের সঙ্গে সবুজ মিলে আমাদের লাল-সবুজের বাংলাদেশ। ভালোবাসি বাংলাদেশ।

বীর মুক্তিযোদ্ধা হাসলেন। তুমি খুব সুন্দর করে কথা বলতে পারো। লাল-সবুজের এই পতাকা তোমরাই রক্ষা করবে। কি পেলাম, কি পেলাম না―এ নিয়ে ব্যস্ত থেকো না। নিজের কাজটা সততার সঙ্গে করবে। তবেই দেখবে দেশটা হবে সোনার বাংলাদেশ।

এই বলে কাঁধে ঝোলানো চটের ব্যাগ থেকে বের করলেন লাল রেডিও। সঙ্গে চারটা ব্যাটারি। বললেন, আজ আমি প্রাপককে খুঁজে পেয়েছি। আজ রেডিওটি চালু করব।

মা বলল, আপনাকে রেডিওটি উপহার দিতে পেরে আমরা অনেক খুশি।

বীর মুক্তিযোদ্ধা শাহজাহান মির্জা বললেন, আমার একাত্তরের স্মৃতিকে তীব্রভাবে আরও জাগিয়ে দিল এই রেডিওটি। আমিও খুশি।

ব্যাটারি লাগানোর পর রেডিওটা চালু করতেই ভেসে এল ঘোষণা। বাংলাদেশ বেতার, ঢাকা। এখন শুনবেন দেশের গান। গানের কথা লিখেছেন, গাজী মাজহারুল আনোয়ার। সুর করেছেন আনোয়ার পারভেজ। সবাই কান পেতে শুনতে থাকল বাংলাদেশ বেতারের গান :

জয় বাংলা বাংলার জয় ॥

হবে হবে হবে, হবে নিশ্চয়

কোটি প্রাণ একসাথে জেগেছে অন্ধরাতে

              নতুন সূর্য উঠার এই তো সময় ॥

সচিত্রকরণ : ধ্রুব এষ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may have missed

shares