কিশোরীদের দেখা মুক্তিযুদ্ধ : ফুলমতি বানু : সুরমা জাহিদ

মুক্তিযুদ্ধ গবেষণা

[ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ প্রকৃতপক্ষে একটা জনযুদ্ধ ছিল। মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশে প্রায় তিন কোটির বেশি নারী ছিলেন। তাঁদের বেশিরভাগই কোনও না কোনওভাবে যুদ্ধের সঙ্গে জড়িত ছিলেন, প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে। তাছাড়া লক্ষ লক্ষ নারী বিভিন্নভাবে বিভিন্ন রকমের সমস্যার সম্মুখে পড়েছেন। মাঝে মাঝে এমন সব বিপদের সম্মুখীন হতে হয়েছে যে, তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত না-নিতে পারলে জান-প্রাণ সবই চলে যাবে এবং সেই সিদ্ধান্তটা ছিল খুবই বিপজ্জনক। তারপরও জানের চেয়ে মান রক্ষা করাটা তাঁদের কাছে ছিল সবার আগে। তাই তাঁরা জঙ্গলে হিংস্র জীবজন্তুকে ভয় না-পেয়ে মানুষকে ভয় পেয়ে সেই হিংস্র প্রাণীর কাছেই আশ্রয় নিতে হয়েছে। মানুষ হয়ে মানুষকে বিশ^াস না-করে, জঙ্গলের সেই হিংস্র প্রাণীকে বিশ^াস করে তার নিকট আশ্রয় নিয়ে জানে বেঁচে আছে লাখ লাখ মানুষ। তাঁদের সেই ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা তাঁরা ভুলতে পারেননি আজও। তাঁদের একজন ফুলমতি বানু, বাবা- মৃত কাশেম মিয়া, গ্রাম- বাঞ্ছারামপুর, নবীনগর, ব্রাহ্মণবাড়িয়া।

তাঁরই জবানিতে তুলে ধরা হলো তাঁর জীবনকাহিনি ]

১৯৭১ সালে যখন যুদ্ধ শুরু হয়, তখন আমার বয়স ১৩ কি ১৪ বছর হবে। আমরা দুই যমজ বোন ছিলাম। আমার বড় আরও দুই বোন দুই ভাই ছিল।

আমরা যমজ দুই বোন। আমি ফুলমতি বানু আর ওই বোনের নাম রূপবতী বানু। আমি ছিলাম খুব শান্ত প্রকৃতির, আর রূপবতী ছিল দুনিয়ার দুষ্ট। যেমন দুষ্ট ঠিক তেমনি চঞ্চল। সব জায়গায় দুষ্টুমি আর চঞ্চলতার জন্য সব সময় সব স্থানে তাকে কথা শুনতে হতো। আর বাড়িতে মার খেত খুব। বেশি মার খেত মা আর দাদির হাতে, মিথ্যা বলার জন্য। সে যে মার বকা খেত, তাই আমার খুব কষ্ট হতো। তাই আমি তাকে বাঁচানোর জন্য অনেক কিছু গোপন রাখতাম, আবার ইচ্ছে না-থাকা সত্ত্বেও তার সঙ্গে থাকতাম। আমি তাকে খুব ভালোবাসতাম। সেও ভালোবাসত কিন্তু মনে হয় আমার মতো না।

মনে আছে যুদ্ধের প্রথম দিকেই দাদা বাবাসহ বাড়ির সব পুরুষ বাড়ির ছোট-বড় সকলকে ডেকেছে এক দিন। সেইদিন বাবা খুব ভালো করে আমাদের সবাইকে বুঝিয়ে দিয়েছেন, যেন আমরা খুব সাবধানে থাকি। বাবা আরও বলেছেন, যুদ্ধ যে কি ভয়াবহ তা তোমরা কোনও কিছুতেই বুঝবে না, নিজের চোখে না-দেখলে। বাবার কথা আমরা সবাই মন দিয়ে শুনেছি। কিন্তু রূপ এক কান দিয়ে শুনেছে, আর অন্য কান দিয়ে বের করে দিয়েছে। বাবার কথাগুলো পাত্তাও দেয়নি।

এর কয়েকদিন পরই শুনি পাশের গ্রামে মিলিটারি এসেছে। এই কথা শুনে আমরাও বাড়ি থেকে চলে যাই। সেই দিন বেশি দূরে যাইনি। আমাদের বাড়ি তো নিচু এলাকা, তাই একটু বৃষ্টি হলেই বাড়ির চারদিক পানিতে ভরে যায়। আমাদের বাড়ির পেছনেই ছিল ছোট একটা বিল। আর বাড়ি থেকে এক দেড় মাইল দূরেই ছিল বড় নদী। তাই একটু বৃষ্টি হলেই পানি জমে থাকত। বাড়ির সামনে উঠান, উঠানের পরেই ছিল কাঠকচু ক্ষেত। সেই কচুক্ষেতে ছিল নানা রকমের বিষাক্ত পোকা-মাকড়। তখন তো এত সার ব্যবহারের প্রচলন ছিল না।

কাঠকচু তো অনেক বড় বড় হয়। সেদিন আমরা অনেকে সেই কচুক্ষেতে গিয়ে পালিয়ে থাকি দুই তিন ঘণ্টা। সেই দুই-তিন ঘণ্টার মধ্যে জোক, বিছাসহ বিষাক্ত পোকারা কামড়িয়ে সারা শরীর ক্ষতবিক্ষত করে ফেলেছে। নিজের সারা শরীরে পোকায় কামড়াচ্ছে, তবু চুপচাপ দাঁড়িয়ে সহ্য করছি। তারপরও নড়াচড়া করার কোনও ক্ষমতা নেই। জোরে শ^াসও ফেলতে পারছি না ভয়ে। শুধু চেয়ে চেয়ে দেখছি। আমার চোখের সামনে একজন মারা গিয়েছে। তাকে সাপে কেটেছে। আমদের শরীরে ঘা হয়ে গিয়েছিল।

তার কয়েকদিন পর আবার শুনি মিলিটারি আসছে। আমরা তখন বিলের মাঝে অনেক ছেলেমেয়ে গোসল করছিলাম। বিল থেকে দেখছি শত শত লোক দৌড়ে পালাচ্ছে। সবাই বিলের ওপারে যাচ্ছে। বিলের ওপারে কিছুটা নিরাপদ ছিল তাই। তখন বর্ষাকাল, তাই বিল পানিতে টুইটুম্বুর। হঠাৎ দেখি কয়েকজন মহিলা অসহায় হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তাদের কোলে বাচ্চা আর এক হাতে কিছু জিনিস। বাচ্চাদেরকে নিয়ে তারা সাঁতার কাটতে পারছে না। আমি কলার ভেলাটি নিয়ে তাদের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি। আমি গিয়ে তাদেরকে ভেলায় তুলে নদী পার করতে থাকি। এই দেখে বাকিরা তাদের ভেলা নিয়ে ছুটে আসে, এভাবেই সবাইকে পার করে দিলাম। আর মাত্র চার-পাঁচজন বাকি আছে পার হওয়ার। তাদের মধ্যে বৃদ্ধ লোক ছিল। তাদেরকে আনতে যাব ওপারে লোকগুলো নামিয়ে। এমন সময় দেখি একদল মিলিটারি এসে সবাইকে ধরে ফেলেছে। এ দেখে ভেলা ছেড়ে দিয়ে বিলে যে ঘাস ছিল, সেই ঘাসের ভেতরে লুকিয়ে থাকি। সমস্ত শরীর পানির নিচে, শুধু নাক-চোখ-মাথাটা উপরে। ঘাস দিয়ে মাথাটা ঢেকে রাখি। আর দেখছি, মিলিটারিরা দৌড়ে এসেই বিলের পাড়ে থাকা লোকগুলোকে ঘিরে ফেলে। দূর থেকে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে না, অস্পষ্টভাবে দেখতে পাচ্ছি যে, তাদেরকে মারছে। এক সময় গুলি করে মেরে তারা চলে যায়। সন্ধ্যা হয় হয় এমন সময় আমরা পানি থেকে উঠে আসি। এসে দেখি বৃদ্ধাসহ কয়েকটা লাশ পড়ে আছে। আর চারপাশ লাল রক্তে চাকা চাকা হয়ে আছে। তা দেখে হাত পা কাঁপছে, দাঁড়াতে পারছি না। আমি বসে আছি, এমন সময় আমাদের একজন বিল থেকে আমাকে ডাকছেন। আর বলছে, ফুল, তাড়া তাড়ি আয়, ঐ পাড়ের লোকগুলো আনতে হবে। আবার তাদেরকে ফিরিয়ে আনি।

বলেছি, না আমার বোন রূপ খুব দুষ্টু, চঞ্চল। পরদিন হঠাৎ করে এমন এক কাণ্ড ঘটেছে, আমাদের বাড়ির পরেই ছিল একটা কাচারি ঘর। সেই ঘরের চারপাশের বেড়া ছিল টিনের। তখন বেলা হয়ত এগারটা কি বারোটা বাজে, সবাই যার যার কাজে ব্যস্ত। আমি কি যেন করছি, তখন রূপ আমাকে বলে, চল, পাশের বাড়িতে গিয়ে আম খাই। পাশের বাড়িতে একটা কাঁচা-মিঠা আমগাছ ছিল, সেই গাছে প্রচুর পরিমাণে আম ধরত। খুব সম্ভবত বারমাসি ছিল আম গাছটা। রূপের কথায় আমি যাইনি। বাড়ির ভেতরে কাজ করছি। হঠাৎ শুনি একটা বিকট শব্দ। সেই শব্দটা অনেকটা মেশিন গানের শব্দের মতো। আর এত জোরে শব্দ হয়েছে যে, গ্রামের সবাই ভয়ে গ্রাম ছেড়ে পালিয়ে গেছে। সবার ধারণা, গ্রামে মিলিটারি এসেছে, আর মেশিন গান দিয়ে মানুষ মারছে। আবার কেউ কেউ ভাবছে, দুই পক্ষে যুদ্ধ শুরু হয়ে গিয়েছে। ঐ শব্দের পর আর কোনও শব্দ হয়নি। তবু গ্রামের লোক সন্ধ্যা পর্যন্ত কেউ গ্রামে ঢোকেনি। সন্ধ্যার পর লোকজন আস্তে আস্তে বাড়িতে ফিরে এসেছে। সেই রাতেই রূপ আমার কাছে বলেছে, টিনের বেড়ায় সে দা দিয়ে টান দেওয়ায় এমন শব্দ হয়েছে। আমি এ কথা সবাইকে বলে দিয়েছি। এ কথা শুনে বাড়ির সবাই তার ওপর প্রচণ্ড রেগে যায়। এই কথা এক সময় গ্রামের সবাই জেনে যায়।

এই ঘটনার কয়েকদিন পর ঘটে এক ভয়াবহ দুর্ঘটনা। সময় তখন দুইটা বা তিনটা বাজে, ভর দুপুর। বাড়ির লোকজন দুপুরের খাবার খাচ্ছে। এমন সময় রূপ তার সঙ্গী-সাথীদের নিয়ে গোসল করতে যাচ্ছে,  সঙ্গে আমিও। আমাদের বাড়ি থেকে একটু দূরেই ছিল একটা বিরাট বিশাল গাব গাছ। সেই গাব গাছের নিচ দিয়ে আমরা যাচ্ছি। তখন কে যেন কি বলেছে, সবাই দেখি গাব গাছে উঠছে। আমিও তাদের সঙ্গে সেই গাব গাছে উঠি। একটু পরেই শুনি কেমন যেন একটা শব্দ, শব্দটা শুনে  বুঝে উঠতে পারছি না যে তা কিসের শব্দ। পরক্ষণেই শুধু গুলির শব্দ, তারপর কান্নার শব্দ, চিৎকার চেঁচামেচি। নিচে তাকিয়ে দেখি, শত শত মিলিটারি গ্রামের লোকদেরকে ধরে চোখ হাত বেঁধে এক জায়গায় জড়ো করছে। শুধু পুরুষ যে তা না, মহিলাও আছে অনেক। নিচে তাকিয়ে আমি ভয়ে কাঁপছি, তখন একটা ডাল জড়িয়ে ধরে বসে থাকি। একদম চুপচাপ, জোরে শ^াসও ফেলছি না। শুধু চোখ ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখছি যে, অন্যেরা গাছে কি করছে। দেখি, সবাই চুপ করে বসে আছে। কেউ নড়াচড়া করছে না। আমার চোখ বন্ধ করে রেখেছি। এক সময় একটা চিৎকারের শব্দ আসে কানে। বুঝতে পারি, এই চিৎকারটা আমার বোন রূপের। আমি তাকিয়ে দেখি, কি যে দেখছি তা আমি বলতে পারছি না। শুধু বলতে পারি, আমার বোনসহ আরও দুই-তিনজন মেয়েকে মিলিটারিরা টেনে হিঁচড়ে তাদের মান ইজ্জত মারছে। আমি এক নজর দেখে আর তাকাতে পারছি না। আহারে কত যে চেষ্টা করেছে আমার বোন তার মান-ইজ্জত রক্ষা করার জন্য, কিন্তু পারেনি। কীভাবে পারবে, তারা কতজন, আট-দশজন শক্তিশালী পুরুষ, আর রূপ একা। কোনও দিন কি পারে তাদের সঙ্গে। মিলিটারিরা তাদের ইচ্ছে মতো কাজ করে চলে গিয়েছে। মিলিটারিরা চলে যাওয়ার পরও আমরা নিচে নেমে আসতে পারছি না ভয়ে। যখন কয়েকজন লোক এসে জড়ো হয়েছে, তখন আমরা নিচে নেমে আসি।

আমার বোন গাছের গোড়ার দিক দিয়ে গাছে উঠে, ডাল দিয়ে আবার নেমে গিয়েছে। তা কিন্তু দেখিনি। আর দেখলেই বা কি করতাম। সে কি আমার কোনও কথা শুনত। সে অত্যধিক চঞ্চল ছিল। কারও কোনও কথা শোনে? মিলিটারিরা এমনভাবে তাকে নির্যাতন করেছে যে, তার ভেতরে বাহিরে অনেক ক্ষতি হয়েছে। প্রথমে এই ঘটনা গোপন রেখে কবিরাজ দিয়ে চিকিৎসা করিয়েছে। কিন্তু কোনও কাজ হয়নি। দিন দিন যখন তার অবস্থা আরও খারাপ হচ্ছে তখন ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাওয়া হয়। ডাক্তার হাসপাতালে ভর্তি করতে বলে। হাসপাতালে ছিল প্রায় তিন-চার মাস। কিন্তু তাতেও কিছু হয়নি। তার ক্ষত থেকেই গেল। আর ভালো ডাক্তার বা বড় হাসপাতালে রেখে যে চিকিৎসা করাবে তখন সেই পরিস্থিতিও ছিল না। কারণ সারাদিন তো দৌড়াদৌড়িতেই থাকতে হয়েছে। অনেক বছর পর্যন্ত সে অসুস্থ ছিল। তাই বিয়েও হয়নি। দেশ স্বাধীন হওয়ার প্রায় সাত আট বছর পর বিয়ে হয়। বিয়ের পর স্বামীর ঘর করতে পারছেন না। তখন তার স্বামী ডাক্তার দেখালে ডাক্তার বলেছে, সে কোনও দিন মা হতে পারবে না। কারণ তার জরায়ু নেই। তখন কেটে ফেলে দিয়েছে ডাক্তাররা। জরায়ুতে নাকি অনেক পচন ধরেছিল, তাই। এগুলো আমি পরে শুনেছি। তারপর সে আর স্বামীর ঘরে যায় না, ছাড়াছাড়ি হয়নি। তার যদি মনে চাইত তাহলে সে যেত, না মনে চাইলে যায় নাই। তার স্বামীর আরও বউ ছিল, তাই সেও নিতে চাইত না। গেলে ফিরিয়েও দিত না। কয়েকদিন থেকে আবার চলে আসত। আস্তে আস্তে সে তার বোধ শক্তি হারিয়ে ফেলেছে, মানসিকভাবে একেবারে অসুস্থ হয়ে পড়ে। কে তার দেখাশোনা করে। কখনও বাড়িতে আসে, আবার কখনও আসে না। শেষ পর্যন্ত কেউই তার আর কোনও খোঁজ পাইনি।

এবার আমার কথা বলি। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর আমরা বাড়ি ফিরে আসি। এসে দেখি, আমাদের বাড়িঘর কিছুই নেই। শুধু পোড়া ভিটা পড়ে আছে। সেই ভিটায় ছোট ছোট ঘর করে থাকতে থাকি। বাড়ি ভাগাভাগি হয়ে যায়। খুব কষ্ট করে দিন যাচ্ছে। বড় হয়েছি বিয়ে দিতে হবে। বিয়েও আসে ভালো ভালো। পছন্দ হচ্ছে দুই পক্ষেরই, কিন্তু একটা জায়গায় গিয়ে সব শেষ হয়ে যায়। সব শুনে কোনও পাত্রপক্ষই বিশ^াস করে না যে, আমি পাকিস্তানি মিলিটারিদের হাতে ধরা পড়িনি। তারপরও বলছে, আমি নির্যাতিত, মিলিটারিরা নাকি আমার ইজ্জত নিয়েছে। এসব কথা রটে গিয়েছে গ্রামে। অথচ যারা আমার সঙ্গে ছিল তারা সবাই জানে এবং সব কিছুই দেখেছে। তাদের কথাও কেউ বিশ^াস করে না, বিয়েও হচ্ছে না।

দুই তিন বছর পর আবার নতুন করে বিয়ের প্রস্তাব আসতে শুরু করে দিয়েছে। সব পাত্রই বয়স্ক এবং অনেক টাকা যৌতুক চাচ্ছে। মা-ও দিশেহারা, বাবাও নেই। এরই মাঝে গ্রামের লোকেরাই একটা বিয়ে ঠিক করে। সেই লোকের সাতটা সন্তান আছে। সবাই বড় এবং বিয়ে হয়ে গিয়েছে। তার স্ত্রী মারা গিয়েছে। মূলত তার সেবা যত্নের জন্য একজন মহিলার প্রয়োজন, তাই গ্রামবাসীরা আমার কথা বলছে। বিয়ের দিন তারিখ সব ঠিক হয়ে যায়। বিয়েতে কিছু দিতে হবে না। এই কথা শুনে আমার ছোট মামা পাত্র দেখতে আসে। এসে দেখে পাত্র বিছানায় পড়া। হাঁটা-চলা করবে দূরের কথা, বিছানা থেকেই উঠতে পারে না। ডান হাত, ডান পা পঙ্গু। তা দেখে মামা আমাকে তার সঙ্গে করে নিয়ে যায়। মামা নিয়ে গিয়েছিল ঠিকই, কিন্তু মামি আর তার ছেলেরা আমাকে জায়গা দেয়নি। মামা তখন আমার এক ফুপুর বাড়িতে নিয়ে যায়। ঐখানেও আমার জায়গা হয়নি। তারপর যায় আরেক মামার বাড়িতে। সে মামার আবার অনেক ছেলেমেয়ে। দিন আনে দিন খায় এই অবস্থা। তারা আমাকে আশ্রয় দিয়েছে ঠিকই কিন্তু দুই তিন দিনেও এক বেলা পেট ভরে খেতে পারি না। অন্য বাড়ি থেকে ভাতের ফেন এনে খুদ দিয়ে জাউ রান্না করে খাচ্ছি সবাই। সেই মামার বাচ্চরা ছিল ছোট ছোট।

অভাবের তাড়নায় কাজ নিলাম একটি বাড়িতে। সারা দিন কাজ করে অল্প কিছু চাল পেলে তা দিয়ে এক বেলাও চলে না। তারপর কাজ করি খেতে খামারে। এক সময় চা-বাগানে কাজ শুরু করি। চা-বাগানে কাজ করার সময় মোটামুটিভাবে চলছে। চা-বাগানে কাজ করতে গিয়ে একটি ছেলের সঙ্গে আমার সম্পর্ক হয়। আমরা ভালোবেসে বিয়ে করি। ভালোই কাটছে দিন মাস বছর। বিয়ের দুই বছর পর একটা মেয়ে হয়। মেয়ে হওয়ার পর আমার স্বামী কার কাছে কি শুনেছে, জানি না। তারপর থেকে সে আর আমাকে বিশ^াস করছে না। আমি জানতে চাই, ঘটনা কি। তখন সে বলে, আমি নাকি মিলিটারিদের হাতে নির্যাতিত হয়েছি। তারা নাকি আমার ইজ্জত মেরেছে। এ কথা আমরা তাকে কিছুতেই বিশ^াস করাতে পারিনি। একপর্যায়ে তার সঙ্গে ছাড়াছাড়ি হয়ে যায়। তারপর আরও দুইটা বিয়ে হয়, একটাও টেকেনি। কারণ কাউকে আমি বিশ^াস করাতে পারিনি যে, আমি  মিলিটারিদের হাতে নির্যাতিত হইনি। তারপর একজনের সঙ্গে আমার পরিচয় হয়, সে-ও চা বাগানে কাজ করত। তার সঙ্গে মাঝে মাঝে আমার সব কথা হতো। এক সময় সে আমার সব কথা জানতে চায়। আমি আমার সব কথা খুলে বলি। আমার সব কথা শুনে সে বলে যে, আমার স্ত্রী মারা গিয়েছে। আমার দুইটা সন্তান আছে। তাদের দেখাশোনা করার মতো কেউ নেই। আমি রাজি থাকলে সে আমাকে ঘরে তুলবে। প্রথমে রাজি হইনি। তারপর রাজি হলাম, বিয়ে হলো। বিয়ের কয়েক মাস পর সেই স্বামী মারা যায়। তার দুই ছেলে, বড় ছেলে আমাকে তাড়িয়ে দিলে, ছোট ছেলে আশ্রয় দেয়। তার বাবা যে ঘরে থাকত সেই ঘরেই থাকতে দেয়। আমি নিজে নিজে কামাই করে খাই। আমার মেয়েটার বিয়ে হয়। আমি সৎ ছেলের কাছেই আছি। আগে তো আমি নিয়মিত কাজ করতাম, কামাই করে অর্ধেক টাকা আমি ছেলেকে দিতাম। আর অর্ধেক টাকা দিয়ে আমি চলতাম। এখন আর আগের মতো কাজ করতে পারি না। তবু যখন ভালো লাগে, তখন কাজ করি।

আমার একটাই কষ্ট, বোনের ওপর হামলা হয়েছে সত্যি। সেটা সবাই দেখেছে শুনেছে। সে সংসার করতে পারেনি। কিন্তু আমার ওপর তো কোনও হামলা হয়নি। মিলিটারিরা আমার ধারে-কাছেও আসতে পারেনি, তারপরও এমন একটা মিথ্যা রটনা রটিয়ে আমার জীবনটা শেষ করে দিয়েছে। কত যে কষ্ট করেছি তা বুঝাতে পারব না। পাকিস্তানিদের সঙ্গে যুদ্ধ শেষ হয়েছে একাত্তরেই। কিন্তু তার জের আজও বয়ে বেড়াচ্ছি। আর সঙ্গে সঙ্গে  যুদ্ধ করে যাচ্ছি জীবন ভর।

স্বামী সংসার ভালোবাসা কিছুই পাইনি, পেয়েছি শুধু অপবাদ, অপমান, লাঞ্ছনা, গঞ্জনা, যা আমার পাওয়ার কথা ছিল না।

লেখক : প্রাবন্ধিক, গবেষক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may have missed

shares