সৈয়দ শামসুল হকের যেকোনো দরজা : অপ্রথাবদ্ধ গদ্যের মাতাল আমন্ত্রণ : সালমা আক্তার

জন্মদিনে শ্রদ্ধার্ঘ্য

[সৈয়দ শামসুল হকের জন্ম ২৭ ডিসেম্বর, ১৯৩৫ সালে কুড়িগ্রামে এবং মৃত্যু ২৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ সালে ঢাকায়। তিনি কবিতা, গল্প, প্রবন্ধ, নাটক, উপন্যাস, অনুবাদ, সংগীত, চিত্রকলা, সমালোচনাসহ সাহিত্যের প্রায় সব শাখায়  বিচরণ করেছেন। অনুবাদেও পারদর্শিতার স্বাক্ষর রেখেছেন। শেক্সপিয়রের ম্যাকবেথ, টেম্পেস্ট, সবখানে তাঁর দক্ষতা প্রকাশ পেয়েছে। শেক্সপিয়রের ভাষা যেমন সমৃদ্ধ, সৈয়দ শামসুল হকের অনুবাদে বাংলা ভাষাটাও তেমনি সমৃদ্ধ হয়ে আমাদের কাছে ধরা দিয়েছেÑরস বা ভাষার যথার্থতা ক্ষুণ্ন হয়নি। সাহিত্যের প্রায় সব শাখায় তাঁর সাবলীল পদচারণার জন্য তাঁকে ‘সব্যসাচী’ লেখক বলা হয়।

উপন্যাস হলো লেখকের বর্ণনাত্মক  কাহিনি। সৈয়দ শামসুল হকের উপন্যাসগুলোও তাঁর কল্পিত কাহিনি, কিন্তু তা বাস্তবতার নিরিখে লেখা। র‌্যালফ ফক্স বলেছেন, ‘উপন্যাস হলো মানুষের জীবনের গদ্য। উপন্যাস হলো মানুষকে পরিপূর্ণভাবে গ্রহণ করার এবং তাকে প্রকাশ করার প্রথম নান্দনিক প্রচেষ্টা।’ জীবনের যে বাস্তবসম্মত অভিজ্ঞতা, মানুষ ও জাতি সম্পর্কে তাঁর যে দৃষ্টিভঙ্গি, সমাজ ও রাজনীতি সম্পর্কে তাঁর যে চিন্তা-ভাবনা বা জিজ্ঞাসা এসবের প্রতিফলন ঘটিয়েছেন তাঁর উপন্যাসগুলোতে। লেখক হিসেবে তিনি শুধু সৃষ্টিপ্রয়াসীই নন, দেশের সামাজিক-সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক আন্দোলনেও ভূমিকা রেখেছেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালীন মাত্র একুশ বছর বয়সে ১৯৫৬ সালে সৈয়দ শামসুল হকের প্রথম উপন্যাস  দেয়ালের দেশ প্রকাশিত হয়। কবিতা, গল্প, নাটক, গান, অনুবাদ, শিশুসাহিত্যের পাশাপাশি পরবর্তীকালে লিখেছেন একের পর এক উপন্যাস। তাঁর রচিত উপন্যাসগুলোর মধ্যে রয়েছে―এক মহিলার ছবি, অনুপম দিন, সীমানা ছাড়িয়ে, খেলারাম খেলে যা, নিষিদ্ধ লোবান, নীল দংশন, স্মৃতিমেধ,  বনবালা কিছু টাকা ধার নিয়েছিল, ত্রাহি, তুমি সেই তরবারী, কয়েকটি মানুষের সোনালী যৌবন, বৃষ্টি ও বিদ্রোহীগণ, নির্বাসিতা, মেঘ ও মেশিন, ইহা মানুষ, মহাশূন্যে পরাণ মাষ্টার, অন্য এক আলিঙ্গন, মৃগয়ায় কালক্ষেপ, স্তব্ধতার অনুবাদ, এক যুবকের ছায়াপথ, স্বপ্ন সংক্রান্ত, বারো দিনের শিশু, এক মুঠো জন্মভূমি, বুকঝিম ভালোবাসা, অচেনা, দ্বিতীয় দিনের কাহিনী, বালিকার চন্দ্রযান, আয়না বিবির পালা, কালধর্ম, দূরত্ব, না যেয়ো না, আলোর জন্য, রাজার সুন্দরী, ময়লা জামায় ফেরেশতারা, নারীরা, গল্প কোলকাতার, নদী কারো নয়, কেরানিও দৌড়ে ছিল, ক্ষুধাবৃত্তান্ত ইত্যাদি। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী তাঁর উপন্যাসের সংখ্যা প্রায় চল্লিশটিরও বেশি।

সুদীর্ঘ ৮০ বছরের জীবনের সাহিত্যচর্চার স্বীকৃতিস্বরূপ সৈয়দ শামসুল হক বাংলা একাডেমি পুরস্কার, একুশে পদক, আদমজী সাহিত্য পুরস্কার, পদাবলী কবিতা পুরস্কার, স্বাধীনতা পদক, নাসিরউদ্দীন স্বর্ণপদক, আলাওল সাহিত্য পুরস্কার, ব্রাক ব্যাংক সমকাল সাহিত্য পুরস্কার ইত্যাদি নানা পদকে তিনি ভূষিত হয়েছেন।]

যেকোনো দরজা সৈয়দ শামসুল হকের একটি অপ্রকাশিত উপন্যাস ছিল। ছাব্বিশ বছর বয়সে ১৯৬১ সালে লেখা এই উপন্যাসের পাণ্ডুলিপি আবিষ্কার করে জানা যায় যে, সুদীর্ঘ ঊনষাট বছর ধরে অগ্রন্থিত ছিল, তাঁর মৃত্যুদিবসে প্রথমা প্রকাশন থেকে যেকোনো দরজা নামে প্রকাশিত হয়েছে। বলা বাহুল্য উপন্যাসটি লেখা হয়েছিল পাকিস্থান আমলে। তাই এর পরতে পরতে রয়েছে পঞ্চাশ ও ষাট দশকের শহর ঢাকা, বুড়িগঙ্গা নদী, হোটেল, গোপীবাগ, জিন্নাহ অ্যাভিনিউ (বর্তমানে বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউ) ইত্যাদি প্রসঙ্গ। উপন্যাসটি ৭২পৃষ্ঠায় এবং  আটটি অধ্যায়ে বিভক্ত।

একজন লেখকের মনোজগতে যেমন বাস্তব চরিত্র থাকে, তেমনি থাকে তাঁর রচিত কাল্পনিক চরিত্রগুলোও। রচিত চরিত্রগুলো কখনও বাস্তব থেকে উঠে আসে, কখনও আসে লেখকের কল্পনার জগৎ থেকে। কিন্তু উভয় চরিত্রের প্রধান উদ্দেশ্য থাকে লেখক যা বলতে চান তার বাস্তবায়ন। এভাবে চরিত্ররা লেখকের বিবেচনার পাত্র-পাত্রী চিত্রায়ণ হয়ে তাঁর রচনায় বিরাজ করে। মাঝেমধ্যে লেখকের মনোজগতে কল্পনার চরিত্রগুলো এমনভাবে থেকে যায় যে লেখক এই দুই জগতের মধ্যকার বিভেদাত্মক সুতোটি ধরতে পারেন না। তখন কল্পনা ও বাস্তবের চরিত্ররা তাঁর মনোজগতে এসে বিবিধ ক্রিয়া করতে থাকে। তাঁর চিন্তার জগৎ ও বিবেচনাবোধকে প্রভাবিত করতে থাকে। যেকোনো দরজা উপন্যাসের চরিত্রগুলোও তেমন বাস্তবতা ও কল্পনায় মিলেমিশে একাকার।

মনস্তাত্ত্বিক উপন্যাসের প্রধান আশ্রয় পাত্র-পাত্রীর মনোজগতের ঘাত-সংঘাত ও ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া; চরিত্রের অন্তর্জগতের জটিল রহস্য উদ্ঘাটনই ঔপন্যাসিকের প্রধান লক্ষ্য। মনস্তাত্ত্বিক উপন্যাসে কাহিনি একটা অবলম্বন মাত্র। প্রকৃত উদ্দেশ্য থাকে মানবমনের জটিল দিকগুলো সার্থক বিশ্লেষণের মাধ্যমে উপস্থাপন করা। রবীন্দ্রনাথের চোখের বালি, সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর চাঁদের অমাবস্যা, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের গৃহদাহ ইত্যাদি মনস্তাত্ত্বিক উপন্যাস।

সৈয়দ শামসুল হকের যেকোনো দরজা উপন্যাসটি চারজন মানুষের জীবন যাপন পদ্ধতি ও ভিন্ন চিন্তাধারার প্রেক্ষাপটে লেখা এক মনস্তাত্ত্বিক উপন্যাস। মনে করা যেতে পারে এ শুধু চারজন মানুষের জীবন কাহিনি নয়; যেন চারটি ঘর এবং প্রত্যেক ঘরে একটি করে দরজা আছে। এর যেকোনো এক দরজা দিয়ে প্রবেশ করলেই বাকি তিনটি ঘরের মধ্যে প্রবেশ করা যায়।

উপন্যাসের চারটি প্রধান চরিত্রের একজন হলো জামাল। তার অতীত স্মৃতিচারণের মধ্য দিয়েই শুরু হয় উপন্যাসের কাহিনি। এর সূচনা অংশ কিছুটা রহস্যে ঘেরা এবং রোমাঞ্চকর। আমরা দেখতে পাই, রেঙ্গুন থেকে ছুটে আসা এক ভাগ্যান্বেষী যুবক জামালকে। যে নবাব বাড়ির সিঁড়িতে বসে স্মৃতিচারণ ও ছোট ছোট বিষয়গুলো খেয়াল করছে। সমুদ্র আর নদীর মাঝে সাদৃশ্য খোঁজার চেষ্টা করছে। তার  মনে হয়েছে এই অচেনা শহরও যেন একটা সমুদ্রের মতো। সমুদ্র অবিরাম আছড়ে পড়ছে এবং তার অশ্রান্ত গর্জন ফুলে ফুলে উঠছে, কখনও বা মনে হয়েছে কোনও বিপজ্জনক হাতছানি দিয়ে তাকে সারাক্ষণ ডাকছে। কিন্তু তবু সে আর পিছু ফিরে যেতে চায় না। যেতে চায় না সে পুরোনো শহরে।

‘সবকিছু পেছনে ফেলে এসে অচেনা এই শহর থেকে আর কোথাও যাবে না।’ (পৃ. ০৭, অধ্যায়: এক )

তার কাছে মনে হয়েছে সমুদ্র তো সবসময় নিষ্ঠুর নয়। মাটির জননী সমুদ্র। অথৈ মমতার স্পর্শ ও একটা টান অনুভব করে সে। মনের মধ্যে বিহঙ্গের ডাক শুনতে পায়। পার্থিব জগতের জীবন সংসার বিপদসংকুল সমুদ্রের মতো। মানুষ এখানে প্রতিনিয়ত সংগ্রাম করে বেঁচে থাকে। আশায় বুক বাঁধে। কেননা আশায় জীবন, জীবনের গতি। আশা আছে বলেই মানুষ বেঁচে আছে। আশা হচ্ছে আত্মার নোঙর। তাই জামালও তার মনের মাঝে নতুন করে স্বপ্নের বীজ বপন করতে শুরু করে।

একবার তার ছোট চাচা তাকে কক্সবাজার নিয়ে গিয়েছিল। বাবার আদলেই ছোট চাচার চেহারা হলেও বাবার চোখে যে হিংস্রতা ছিল চাচার চোখে সেই হিংস্রতা ছিল না। তাই বাবাকে ভয় পেলেও ছোট চাচাকে সে ভয় পায়নি। জামালের বাবা তার মাকে হত্যা করে ফাঁসির কাষ্ঠে ঝুলে পড়ে। এ কথা কক্সবাজারের সবাই জেনে গেলে তাকে সহানুভূতি দেখায়। কিন্তু স্কুলের ছেলেরা তাকে প্রায় একঘরে করে রেখেছিল। তার ওইটুকু বালক-মনে এটা মনে হয়েছিল যে তারা ওকে দেখে কেন পালায় ? অনেক সময় তার মনে হতো যদি তার মাথায় শিং থাকত! রাক্ষসের মতো দাঁত থাকত! পাহাড়ের মতো শরীরে শক্তি থাকত! তাহলে সে সমস্ত কিছু কুটিকুটি করে ছিঁড়ে ফেলত। আর আকাশটাকে থিয়েটারের পর্দার মতো টেনে ছিঁড়ে নামাত এবং ছেলেগুলোকে ডাঙায় থাকা থলথলে জেলি মাছের মতো থেঁতলে রাখত। তাকে অবজ্ঞা-অবহেলার কারণেই তার মাঝে এক ধরনের প্রতিশোধ স্পৃহা জেগে ওঠে।

একদিন চাচার দেওয়া বাঁশি বাজাতে-বাজাতে সে ক্লান্ত হয়ে ঝাউবনের ভেতর শুয়ে পরলে―

‘জামালের মনে হলো, তাকে যেন কেউ নির্বাসন দিয়ে রেখেছে এই বুক-ছমছম-করা ঝাউবনের নির্জনতায়। মাটির সঙ্গে তাকে গেঁথে রেখেছে। আর কোনো দিন উঠতে পারবে না। এখানে এমনি করে মরে যেতে হবে তাকে।’ (পৃ: ০৯, অধ্যায়: এক)

কিছু কষ্ট ডানায় ভর করে উড়ে যায়, কিছু কষ্ট সমস্ত ডানা মুড়েই থাকে, আবার কিছু কষ্টের স্মৃতি তরল পারার মতো গলে গলে পড়ে। কিছু কষ্ট অযাচিত নক্ষত্র হয়ে ফুটে থাকে। জামাল হঠাৎ করে বুঝতে পারে সে নয়, অথচ তারই মধ্যে কেউ যেন মায়ের জন্য বিলাপ করে কাঁদছে, অন্ধকারে মৃদু ভাষায় জ্বলজ্বল করছে যেন। তার জন্য ক্ষুণ্ন হলো তার আত্মা, সে নিজেও শোকার্ত হলো নিজের জন্য।

জামাল শেকড়হীন এক অসহায় বেকার যুবক। অতীতের একরাশ তিক্ত স্মৃতি মুছে ফেলার প্রত্যাশায়  ভাগ্যান্বেষণে রেঙ্গুন থেকে নানা পথ ঘুরে আসে ষাটের দশকের ঢাকায়। তবু পেছনের রেখে আসা, ফেলে আসা ঘরবাড়ি-ঘটমানতা বা স্মৃতিসমগ্র, তাকে বার বার তাড়িত করছে দূর থেকে দূরে, বহুদূরে। চলমান দৃশ্যের অনেক সত্যকেই আমরা এড়িয়ে যেতে পারি, যখন দেখি না। জামাল জানে না, সে কতদূর যাবে, কার কাছে যাবে ? তার পেছনে ফেরার রাস্তা নেই, সে ফিরতেও চায় না। সে শুধু জানে তাকে যেতে হবে সামনেই।

এতক্ষণ, প্রথম অধ্যায়ে আমরা শুধু একটি চরিত্র বা ঘর এবং ঘরের দরজা দেখতে পেয়েছি। দ্বিতীয় অধ্যায়ে দেখতে পাই, সালমা নামক আরেকটি ঘর। তার মনের দরজা রয়েছে, রয়েছে তার অলিগলিও। আমরা সে পথেই প্রবেশ করতে যাচ্ছি। সময়ের বাঁকে বাঁকে জীবনের প্রতিটি মোড়েই মানুষের জীবনের নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়। হতে পারে সেটা নতুন কোনও ঘটনার জন্য, হতে পারে কোনও পরিচিত মানুষের সান্নিধ্য লাভের জন্য অথবা হতে পারে অপরিচিত কোনও মানুষের সঙ্গে পরিচিত হয়ে। হ্যাঁ, সালমার সঙ্গে জামালের পরিচয় এমনই একটা সম্পর্কের সূচনা করে।

সালমা সিনেমা দেখার জন্য টিকিট কেটে আলফা ক্যাফেতে খালেদের জন্য অপেক্ষা করছিল। হঠাৎ ঝড় উঠলে ক্যাফেতে শ্যামবর্ণের একজন লোক প্রবেশ করে। পরে আরও দুজন প্রবেশ করে। হাতে অফুরন্ত সময় থাকায় সে বাইরের মানুষদের বিচরণ খেয়াল করছিল। সালমা খেয়াল করল শ্যামবর্ণের লোকটি বকশিশ না দেওয়ায় হোটেল বয় তার সঙ্গে খারাপ আচরণ করে। এই বিষয়টা তার খুব খারাপ লাগে। সে বুঝতে পারে হয়তবা লোকটি এ শহরে নতুন। সে এ শহরের অনেক কিছুই জানে না। অনেক কিছুর সঙ্গেই অভ্যস্ত হয়ে ওঠেনি এখনও। সালমা তার হয়ে বেয়ারার দিকে টাকা ছুড়ে মারে। পরক্ষণেই সে লজ্জিত হয়। সে বুঝতে পারছিল না লোকটিকে অপমান করা হলো কি না, তাই সে তার সামনে গিয়ে দাঁড়াল এবং তার সঙ্গে কথা বলতে চাইল। একজন অপরিচিত মানুষের জন্য সে এমন ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ কেনই বা করল! হয়তবা সে গভীর থেকে লোকটির অপমানটা অনুধাবন করতে পেরেছিল। সেই শ্যামবর্ণের লোকটি ছিল জামাল। প্রথম দেখায় সালমার জামালকে ভালো লেগে যায়। জামালের সরলতা আর নম্রতা তাকে স্পর্শ করে।

ঢাকার অলিতে-গলিতে ভাগ্যান্বেষী জামাল ঘুরে বেড়াতে বেড়াতে ঘটনাক্রমে হঠাৎ এভাবেই তার সঙ্গে পরিচয় হয়ে গেল নিতান্ত সাদামাটা অথচ ভীষণ রহস্যময়ী এক তরুণী সালমার। পরিচয়ের প্রথম দিনই সালমা তাকে নিয়ে যেতে চায় নিজের বাড়িতে।

জামালও হয়তবা সালমার ওখানে গিয়েছে শুধু অন্য এক সূক্ষ্ম হৃদয়ানুভূতির টানে। মা ছাড়া তার জীবনে অন্য কোনও নারীর আগমন ঘটেনি। অন্য কোনও নারীর সঙ্গ পাওয়া তার হয়ে ওঠেনি। নারী মানেই তার কাছে মমতাময়ী মা, নারী মানে স্নেহময়ী, নারী মানেই মোহনীয় টান। হয়তবা এ কারণেই জামাল সালমার ওখানে গিয়েছিল। কীসের যেন এক অদৃশ্য এবং সূক্ষ্ম তাড়না তাকে ডেকে নিয়ে যাচ্ছে সালমার পানে! কিন্তু সে তা কিছুতেই বুঝতে পারছে না। কোনও এক আকর্ষণ তাকে নিয়ে যাচ্ছে, স্বরচিত ইচ্ছে বা সুখের গুপ্ত-সুড়ঙ্গে। যে সুড়ঙ্গ পথের গভীরতা তার জানা নেই।

বৃষ্টির তির এসে দুজনকে খুব করে ভিজিয়ে দিয়ে গেছে। অস্পষ্টভাবে কিছু বলতে গিয়েও কথা খুঁজে না-পেয়ে জামাল থামলেও তার অস্পষ্ট প্রশ্নটা স্পষ্ট বুঝতে পারে সালমা। কী জবাব দেবে সে ? জামালকে যখন নিজের বাসায় নিয়ে যাবার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, তখন এক মুহূর্তের জন্য সালমা ভুলে গিয়েছিল তার পরিচয়―অতীত, বর্তমান। ঝাঁপিয়ে পড়ে নিষ্ঠুর সত্যটা। জীবন তবু অবিস্মরণীয় সততাকে চায়। কখনও জানানো যায় না এমনতরো দুঃখ ও তাপ আমাদের বুকে বাসা বাঁধে। তখন অন্ধকারে বন্ধুর হাত খুঁজি। হয়ত সালমাও তেমন এক বন্ধুর খোঁজে জামালের দিকে অগ্রসর হয়েছিল। সালমা ভাবে―

‘আমি অনেক আত্মত্যাগ করেছি―কিন্তু ওই লোকটা কোনো দিন তা জানবেও না। আমার অনেক রক্ত নিঃশেষ হয়েছে ফোঁটায় ফোঁটায়―তবু আমি হেসেছি, তবু আমার চোখ তো কাঁপেনি। কিন্তু কেউ তা জানবে না। আমি বড়―আমি বড়―আমি বড়। মনে মনে ছড়ার মতো আবৃত্তি করতে করতে তার চোখের পলক নেশায় ভারী হয়ে উঠল।’ (পৃ: ১৯, অধ্যায়: দুই )

সেদিন বৃষ্টিতে ভিজে সালমার গা থেকে অস্পষ্ট সৌরভ যেন তাকে আকুল করে। তার পাশে বসে অকারণে হু হু করতে থাকে জামালের বুক। একা ঘরে সালমার জন্য আকুল হয়ে ওঠে মন। সালমার প্রতি তার আলাদা একটা ভালোলাগা, মুগ্ধতা ও আকুলতা তৈরি হয়। সালমার চেহারা অন্যরকম, একধনের মমতা আছে। এক তীব্র আকর্ষণ অনুভব করে সে। খুব সহজেই সে জামালের মনের গহিনে একটা বিশেষ স্থান করে নেয়।

পক্ষান্তরে সালমার জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে খালেদ নামক এক ভিন্ন যুবক এবং এ উপন্যাসের আরেক দরজা বা প্রধান চরিত্র। সালমা খালেদকে ভালোবাসে। খালেদ-সালমার মধ্যে একটা সম্পর্কের অস্তিত্ব টের পাওয়া গেলেও তার কোনও নামকরণ করা যায় না। দীর্ঘদিন-মাস-বছর তারা একত্রে থাকলেও খালেদ সালমাকে নিয়ে ঘর বাঁধার স্বপ্ন দেখে না; সালমা প্রস্তাব উত্থাপন করলেও খালেদ এড়িয়ে যায়। সে সেখানে প্রতারিত হয়তবা, তাই ভিন্ন এক আবেগে জামালকে তার বাসায় নিয়ে গিয়েছিল। সে মুহূর্তে ভুলে গিয়েছিল সে কে ? তার নিজেকে ছোট মনে হলো। অনুভবে ধরা দিল―

‘পৃথিবীর সবচেয়ে নিচের সিঁড়িতে কে যেন তাকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিয়েছে। আর কোনো দিন সে উঠে আাসতে পারবে না হয়তো।’ (পৃ: ২৪, অধ্যায় : তিন)

খালেদের সঙ্গে রেস্টুরেন্টে সালমার পরবর্তীতে দেখা হওয়া, সেখানে তাদের জীবন সম্পর্কিত আলোচনা, তাদের টেবিলের পেছন দিয়ে এক আগন্তুকের চলে যাওয়া, সামনে রিসেপসনিস্টে দাঁড়িয়ে ঢাকা শহরে নেই-এমন এক নম্বরেই বার বার ডায়াল করে সময় পাস করা, পরবর্তীতে আগন্তুকের গাড়িতে ওঠা, গাড়িতে আগে থেকেই বসে থাকা নারী চরিত্র, গাড়িটা একটা গভীর জঙ্গলের দিকে যাওয়া, নারীটির নাম জানতে চাওয়া―এসব কিছুই যখন একজন পাঠক মনোযোগ সহকারে পড়ে―তখন আর কোনও অস্পষ্টতা থাকে না। সমস্ত ধোঁয়াশা কেটে যায়, আমরা বুঝতে পারি এই নারী চরিত্রটি সালমা।

গাড়ির মধ্যে সালমা নীরব ছিল। তার সে নীরবতা ছিল দিগন্ত-বন্ধনীর বৃক্ষের মতো। কেন না, সে ব্যবহৃত হতে হতে আজ লাঞ্ছিতার পোশাকে আবৃত হয়েছে। অস্তিত্বের অতলান্ত ফলার মুখে মুখোশ লাগিয়ে নিজেকে সংগোপন রেখেছে। আর নিজেরই পাঁজর ছুড়ে দক্ষযজ্ঞ ঘটবার অপেক্ষায় প্রস্তুতি নিচ্ছিল! এত আড়াল আর কেউ খোঁজেনি কখনও।

সালমা খালেদের ভালোবাসা পাওয়ার জন্য সব করতে পারে। তাই তো সে মনে করে, ‘জীবনের পরম দেওয়া-নেওয়ার আত্মীয় করে যে মানুষকে সে দেখেছে, তার কাছে ইচ্ছের নিরাকুল বিসর্জনই তো প্রেম।’ (পৃ: ৩৩, অধ্যায়: চার)

কখনও মনে হয়েছে সালমার সঙ্গে খালেদের এই নামহীন সম্পর্কের নাম কী ? এর নাম কি প্রেম ? প্রেমই যদি হবে তবে, দীর্ঘদিন একত্রে বসবাস করলেও সালমাকে বিয়ে করতে অনীহা কেন খালেদের ? সালমা সারাজীবন শুধু ভালোবাসাই খুঁজেছে, খুঁজেছে প্রেম। অথচ সে বার বার ব্যর্থ হয়েছে, প্রত্যাখ্যাত হয়েছে খালেদের কাছে। ভালোবাসার বদলে পেয়েছে এক নারকীয় অন্ধকার জীবন। তাকে হতে হয়েছে অন্যের কামনা আর লালসার পাত্রী। টাকার কাছে হেরে গেছে তার ভালোবাসা। বদলে যাওয়া বা দূরে সরে যাওয়া খালেদের জন্য সালমার বুকে পাহাড় সমান অভিমান জড়ো হয়েছে। সুন্দর এক সংসার গড়ার যে স্বপ্ন সালমার হৃদয়ে ছিল দীপ্যমান তা নিমিষেই ভেঙে চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যায়। প্রতিনিয়ত অন্যের বিছানার সঙ্গী হতে হতে সে ভেতরে ভেতরে ক্ষতবিক্ষত হয়েছে, ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। সে যেন আজ কৃষ্ণপক্ষের ক্ষীণ চাঁদ, পুঞ্জীভূত মেঘ অথবা মেঘাবৃত দিনের অর্ধ বিকশিত স্থলপদ্মতুল্য। আর চক্রবাকীর মতো নিঃসঙ্গ এবং অনিকেত। একসময় সে মুক্তি খুঁজেছে। প্রতিনিয়ত নিজের ভেতরে ডুব দিয়ে নিজের মতো করে বাঁচতে চেয়েছে। কিন্তু এই শৃঙ্খল থেকে মুক্ত হতে পারেনি। কারণ তার মনে হয়েছে―

 ‘চোখের সব কটা বাতি কে যেন নিভিয়ে দিয়ে গেল।’ (পৃ: ৩৩, অধ্যায়: চার)

পৃথিবীতে সব মানুষই একটি সুখী ও সমৃদ্ধ জীবনের প্রত্যাশা করে। এজন্য মানুষের প্রাণান্তকর প্রয়াস চিরদিনের। তাই মানুষ সর্বদা সযত্নে দুঃখকে এড়িয়ে চলতে চায়। কিন্তু মানুষের জীবনের চলার পথ কুসুমাস্তীর্ণ নয়। নানা বাধা বিঘ্নে ভরা। এখানে সুখ ও দুঃখ যেন একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। তাই বলা যায়, তরঙ্গহীন সাগর যেমন অকল্পনীয় তেমনই দুঃখ-কষ্ট ব্যতীত জীবনও কল্পনাতীত। তবু সমস্যাসংকুল সংসারে প্রতিকূল পরিবেশে আশার ওপর নির্ভর করেই মানবজীবনের দিনগুলো অতিবাহিত হয়। বিক্ষুব্ধ তরঙ্গরাশি যেমন সাগরের বুক উত্তাল করে রাখে, তেমনই সংসাররূপ সাগরে বহুবিধ প্রতিবন্ধকতা মানুষকে গ্রাস করতে চায়। সেই অকূল-উত্তাল দুঃখের সাগর মানুষ অতিক্রম করে আশার তরণী ভাসিয়ে। সালমাও চেয়েছিল কিন্তু সে ব্যর্থ, প্রত্যাখ্যাত হয়েছে বারবার। সবকিছুই তার কাছে কুহকী ফাঁদ মনে হয়।

কিছু মানুষের বাস স্বপ্নের জগতে। আর কিছু মানুষের বাস বাস্তবে। কিন্তু সেই বাস্তব স্বপ্নের চেয়েও রোমহর্ষক। সালমার জীবনও সেই রোমহর্ষক ভয়ংকর বাস্তবতার মাঝেই অতিবাহিত হচ্ছে। কিছু চাওয়া তার অপূর্ণ। পাওয়ার খাতাটাও থাকে শূন্য, শূন্য শুধু শূন্যতায় পরিপূর্ণ। বিশ্বাস, অবিশ্বাসের কুহকে একসময় মুষড়ে পড়ে ভালোবাসার পুরুত্ব। তবু জীবন থেমে থাকে না। জীবন তো জীবনের নিয়মে চলে, তাই তো অবিরাম এ পথচলা। সালমাও এগিয়ে চলেছে নামহীন, সম্পর্কহীন, ভালোবাসাহীন এক অন্ধকার জগতের মধ্য দিয়ে, জীবনের এলোমেলো ছক এঁকে। সালমার জীবন যেন বিষাদের এক মাইসেলিয়াম জালক। সালমা যখন রেস্টুরেন্টে খদ্দেরের সঙ্গে যাচ্ছিল তখন সে খালেদকে বলে সে যেন তাকে না দেখে। কারণ―

‘মানুষ যখন কবরে যায়, তখন তার মুখ দেখতে নেই।’ (পৃ: ৩৫, অধ্যায় : চার)

কী নিষ্ঠুর আত্মোপলব্ধি! সে তার গচ্ছিত হৃদয়কে জমিন করে যে অন্ধকার জগতে পা বাড়িয়েছে, একদিক দিয়ে সে তো মৃতই।

সম্পর্কের অতি পরিচিত কিন্তু অচেনা দিকগুলো যখন ব্যাপিত হওয়ার পরিবর্তে শীতল হয়ে জমতে শুরু করে তখন এর রঙ হালকা না-হয়ে গাঢ় হয়ে যায়; বরফ সাদা না-হয়ে কালো বরফ হয়ে নির্বাপিত হয়ে যায় গল্পের মতো করে। জীবনযাপনের উদ্দেশ্য যখন একটাই, অধিক টাকা উপার্জন। সে উদ্দেশ্য চরিতার্থের জন্য সালমাকে অধিক পুরুষের মধ্যে বিলিয়ে দেয়ার জন্য খালেদের নিন্দা প্রাপ্য বটে! একাধিক পুরুষের দিকে ঠেলে দেওয়া, তা নিন্দাতেই সীমিত থাকার কথা নয়, তা অপরাধও বটে! সুতরাং খালেদ অপরাধী এবং তার শাস্তি প্রাপ্য।

আমরা যদি খালেদের শৈশবের দিকে ফিরে যাই তাহলে দেখতে পাই, তার বাবা মারা যাওয়ার পর মা অন্য একটা লোককে বিয়ে করে তাকে অস্বীকার করে। এমনকি তার সঙ্গে সমস্ত সম্পর্ক ছিন্ন করে। সে তার মাকে দেখেছে দূর থেকে। কিন্তু কাছে যেতে পারেনি। টাকা মানুষকে অনেক স্বার্থপর করে দেয়। অস্তিত্ব রক্ষা এবং স্বার্থপরতা কাছের মানুষকে দূরে ঠেলে দেয়। খালেদ অনেক টাকার মালিক হতে চেয়েছে। টাকায় মোড়ানো একটা জীবনকে চেয়েছে। তাই সালমাকে প্রথমদিকে ভালোবাসলেও, পরে সালমাকে দিয়েই সে টাকা রোজগার করার পথ খুঁজে পায়।

মনস্তাত্ত্বিক উপন্যাস আধুনিক যুগের স্বভাবকে প্রকাশ করে। একদিকে বিংশ শতাব্দীর জটিল পটভূমি, অন্যদিকে ফ্রয়েড, ইয়ুং এ্যাডলার প্রভৃতি মনস্তাত্ত্বিকের আবিষ্কারে মানুষ তার সমস্ত মূল্যবোধকে হারাতে বসেছিল। ক্রমাগত মানুষ নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে নিঃসহায় আত্মকেন্দ্রিক হয়ে পড়ছে, বাইরের সমাজ থেকে বিশেষ কোনও চেতনা বা মূল্যবোধকে না-পাওয়ায় মানুষ নিজের চারদিকে পরিখা রচনা করে চলেছে। আধুনিক মনস্তাত্ত্বিক উপন্যাস মানুষের এই আত্মকেন্দ্রিকতাকে রূপ দেয় এবং সার্থক ঔপন্যাসিক বুঝিয়েও দেন এভাবে আত্মকেন্দ্রিক হয়ে পড়ায় মানুষের মুক্তি নেই। যেমনটা  সৈয়দ শামসুল হকও  দেখিয়েছেন উপন্যাসের খালেদ চরিত্রের ক্ষেত্রে।

এ উপন্যাসের ভিতর আরও কিছুটা এগোলে দেখতে পাওয়া যায় যে, ভাগ্যান্বেষী জামাল ভাগ্যান্বেষণ করতে করতে অনেকটা সালমার সহায়তায় সহসা এক ধনাঢ্য ঠিকাদার বিপত্নীক সালাহউদ্দিন চৌধুরীর ফার্মে চাকরি পায়। 

চাকরি পাওয়ার পর মধ্যরাতের ঢাকার কোনও এক নীরব জনমানবহীন যানহীন রাস্তায় ম্রিয়মাণ নিয়ন আলোর নিচে দাঁড়িয়ে, দূরে বহুদূরে তাকিয়ে কল্পনায় সে সালমার কাছে যাওয়ার জন্য উন্মুখ হয়ে ওঠে। কিন্তু সে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করে ভালো করেছিল। নতুবা সে সালমার অন্ধকার জীবনের সন্ধান পেয়ে যেত।

সালাউদ্দিন এ উপন্যাসের আরেকটি প্রধান দরজা। মানুষকে হিপনোটাইজ করার এক অলৌকিক ক্ষমতা আছে তার মাঝে। সে অনুভব করে মানুষ সবসময় তার ইচ্ছে অনুযায়ী কাজ পায় না। তার কাছে রূপ হচ্ছে রূপকথার ঠকালে বুড়ি। যার রূপ নেই তাকে ঠকতে হয় না। জীবন সংগ্রামমুখর। শুধু কঠোর পরিশ্রম, সাধনা, প্রতিভা দিয়ে সাফল্য অর্জন করতে হয়। এতে সময় লাগলেও তা চিরস্থায়ী।

তবে জামালের চাকরি আর পাঁচটা সাধারণ চাকরির চেয়ে আলাদা; বলা ভালো, অদ্ভুত। এমনকি, চাকরিদাতা ব্যবসায়ী সালাউদ্দিন চৌধুরীও বেশ অদ্ভুত মানসিকতার মানুষ যিনি কিনা সমগ্র মানবজাতির মধ্যে গ্রথিত থাকা অহংবোধকে সমূলে উৎপাটিত করতে চান। সে জামালকে ‘মৌলিক চিন্তা’ করার প্ররোচনা দেয় এবং তাকে কুকুর নিয়ে গবেষণা করার কাজ দেয়। সালাউদ্দিন জামালকে ‘কুকুর নিয়ে গবেষণা এবং কুকুর নিধনবিরোধী’ মৌলিক চিন্তাবিষয়ক তার বক্তৃতা-ধ্যান-ধারণা-ডিকটেশন বা নোট সাজিয়ে গুছিয়ে পুনর্লিখন করতে বলেন। এ জন্য তাকে প্রতি মাসে সাড়ে ৩৫০ টাকা বেতন দেওয়া হবে। জামাল প্রথমে তার চাকরিটা আসলে কিসের  বা কুকুর সম্পর্কে কেন সালাউদ্দিনের এত আগ্রহ সেটা বুঝতে পারছিল না। কিন্তু সে যখনই কান্নাকে নানাভাবে নানা রূপে আবিষ্কার করল ঠিক তখনই সে কুকুর সম্পর্কে অন্তর্নিহিত তাৎপর্য উপলব্ধি করতে পারল। আমাদের চেনা জগৎকে নিয়ে আমরা যেভাবে খুব সহজেই ভাবতে পারি অচেনা, অপরিচিত হলে ভাবনাটা হয় ঠিক তার ভিন্ন। যদি বলি, কুকুর―ক-এ হ্রস্ব উকার, র―ব-এ শূন্য র। তাহলে আমরা এ সম্পর্কে কোনও ধারণা পাব না। যতক্ষণ না আমাকে কেউ বলে দিয়েছে কুকুর একটা ভিন্ন প্রাণীর নাম। মূলত জামালকে এই কাজে সহায়তা করবার জন্যেই নিযুক্ত করা হয়েছে। তার আসল উদ্দেশ্য মানুষের অহংবোধকে নষ্ট করে দেওয়া।

শুধু সৈয়দ শামসুল হকের লেখায় নয় বাংলা সাহিত্যের প্রাচীনতম নিদর্শন চর্যাপদে কাক, কোকিলসহ অনেক প্রাণীর কথা কবিরা উল্লেখ করে গেছেন। মধ্যযুগের সাহিত্যের প্রায় সবগুলো ধারায় প্রাণীর কথা আছে। মনসামঙ্গল তো সাপ নিয়েই লেখা। মুকুন্দরাম চক্রবর্তীর চণ্ডীমঙ্গলকাব্যে অনেক প্রাণীর কথা আছে। অনুরূপ মুসলমান লেখকদের লেখায় ঘোড়া, উটসহ অনেক প্রাণীর কথা সাহিত্যে আছে। কারবালার বিয়োগান্তক ঘটনার বর্ণনায় ইমাম হোসেনের প্রিয় ঘোড়া দুলদুলের করুণ ঘটনা আছে।

ইতিহাসের শুরু থেকে প্রাণী নানা কাজে সহায়ক এবং সহযোগী বলে মানুষের কথায়, কাজে, আচরণে, গল্পে-শিল্পে, ধর্ম-দর্শন-বিজ্ঞান-সাহিত্যসহ সব কায়িক এবং মানসিক, চিন্তাশীল ও সৃজনশীল কাজে এসব প্রাণীর কথা আছে। প্রাচীন ধর্মে উট এবং গরুর কথা বিশেষভাবে রয়েছে। মানুষের ধর্মের অংশ হিসেবে এসব প্রাণী সম্পর্কে কোথাও কৃতজ্ঞতাপ্রসূত প্রশংসা রয়েছে, আবার কোথাও মিথ হিসেবে ট্যাবু বা নিষেধাজ্ঞা নিয়ে উপস্থিত আছে। রামায়ণ, মহাভারত, বেদ, গীতা, ত্রিপিটক, জাতক, বাইবেলের ওল্ড টেস্টামেন্ট, নিউ টেস্টামেন্ট, কোরআনসহ প্রাচীন প্রায় সমস্ত গ্রন্থে জীববৈচিত্র্য রয়েছে। দর্শনের চিন্তাশীল রচনাগুলোতেও প্রাণীর কথা আছে। প্লেটোর রিপাবলিক-এ সক্রেটিস তো থ্রাসুমাকসের কুকুরের বুদ্ধিমত্তা দেখে ওটাকেই দার্শনিক বলে অভিহিত করেছেন।

আধুনিক লেখকদের মধ্যে কুকুর নিয়ে দুটো উপন্যাসের  নাম হলো―এক. সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়ের কুকুর সম্পর্কে দুটো একটা কথা যা আমি জানি। আর দুই, নবারুণ ভট্টাচার্যের লেখা লুব্ধক নামের নভেলা―যার প্রস্তাবনায় লেখা ‘একটি কুকুরের উপকথা।’ আবার তলস্তয় তাঁর উপন্যাস ওয়ার অ্যান্ড পিস-এ পঞ্চাশটির অধিক ঘোড়া ও কুকুরের চরিত্র এবং ব্যক্তিত্ব সৃষ্টি করেছেন। প্রতিটি প্রাণী নিজস্ব নামে এবং চরিত্রে প্রকাশিত। সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী লিখেছেন, ‘প্রত্যেকটি চরিত্র স্বতন্ত্র, একটির সঙ্গে হুবহু মিশে যায় না অন্যটি, এমনকি কুকুরগুলোও পারস্পরিকভাবে স্বতন্ত্র।’ সাহিত্যে নানা প্রাণীর কথা বার বার উল্লেখিত হয়েছে কখনও মূল চরিত্র হয়ে, আবার কখনও বা রূপক চরিত্র হয়ে।

মানুষ আর পশুদের মধ্যেকার পার্থক্য হলো মানুষের বিপদে মানুষ সুযোগ খোঁজে, আর বনের পশু বিপদে হিংসা বিদ্বেষ ভুলে যায়। ওরা মনে রাখে না পেছনের ঘটনা, মানুষ মনের মাঝে পুষে রাখে পেছনের সব ঘটনা, কারণ মানুষের স্মৃতিশক্তি প্রখর। স্মৃতিশক্তি, বুদ্ধিমত্তা এবং অন্য গুণাবলির কারণেই সৃষ্টির সেরা জীব হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে মানুষ। সে বুদ্ধি খাটিয়ে সমস্ত পশুকে পরাস্ত করতে সক্ষম। কিন্তু সে নিজের ভেতরের পশুত্বটকে পরাস্ত করতে পারেনি।

কুকুর মানুষের চেয়ে অনেক বেশি বিশ্বস্ত। কুকুর চুরি করে না, মিথ্যা বলে না, মানুষের মুখের গ্রাস কেড়ে নেয় না, ভেজাল  ওষুধে বাজার সয়লাব করে না, মানুষের জীবন নিয়ে খেলা করে না, মানুষকে ধোঁকা দেয় না অথচ, সেই কুকুরকে মেরে ফেলার জন্য মানুষ কুকুর নিধনের জন্য মিছিল করে! শত শত প্রাণকে হত্যা করার জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে! যেহেতু নিধনের অস্ত্র তাদের হাতেই!

  মানুষের আজ শ্রেষ্ঠত্বের বড়াইয়ের জন্য সালাউদ্দিন হোমারকে দায়ী করেন। তার মতে হোমার এই পতনের প্রথম উদ্যোক্তা পুরুষ। তিনি তাঁর মহাকাব্যে এই একটি কথাই প্রমাণ করতে চেয়েছেন যে, মানুষের মনুষ্যত্বের চেয়ে বড় স্বধর্ম আর নেই। তাঁর কাব্যে মানবচরিত্রের চেয়ে পশুচরিত্র অধিক। কিন্তু সে পশুত্বকে প্রকৃতির আকাক্সিক্ষত উজ্জ্বলতায়, স্বক্রিয়তায়, যথার্থতায় তিনি দেখেননি― তিনি দেখেন মানুষের অহংকারী দৃষ্টিকোণ থেকে। তাই বলা যায় তাঁর দিক থেকে তিনি সফল হয়েছেন। কিন্তু মানুষ কয়েক হাজার বছর ধরে তার দৃষ্টিকোণ থেকে এতটুকু দূরে সরে আসতে পারেনি।

কুকুর নিধন যজ্ঞে মেতে ওঠা মানুষ দেখলেই বোঝা যায়, পৃথিবীর আদি যাত্রা থেকে যখন মানুষ কাঁচা মাংস খেয়ে বেঁচে থাকত, তার চেয়ে একটুও সামনের দিকে অগ্রসর হতে পারেনি! কী আশ্চার্য! এসব ভাবতে গিয়ে সৈয়দ শামসুল হকের বইটির দিকে তাকালেই বোঝা যায়, কত আগেই তিনি যেকোনো দরজা’য় লিখেছেন :

‘সে বলবে―আমি মানুষ, আমি পশুর চেয়ে শ্রেষ্ঠ। বুঝতে পারছ, মানুষের কি ভয়ংকর উক্তি―এই, আমি পশু নই, আমি মানুষ। কে তাকে শেখাল পশু মানে ঘৃণিত, অভিশপ্ত, পাপে আকীর্ণ একটি অস্তিত্ব ? কে তাকে বলে দিল, পশুত্ব মনুষ্যত্বের বিপরীত ? মনুষ্যত্ব পশুত্বের চেয়ে শ্রেষ্ঠ ? পশুকে উন্নত বুদ্ধির উপযুক্ত করে গড়েনি প্রকৃতি। সে তার ইনস্টিংক্ট ফলো করছে। বুঝতে পারছ, সে তার বেঁচে থাকার জন্যে রক্তের ডাক শুনে ব্যবহার করে যাচ্ছে মাত্র! তুমি কে তার বিচার করবার ? তুমি কোন মানদণ্ডে মেপে দেখলে যে সে পশু, ঘৃণার পাত্র ? কোন মানদণ্ডে ? তোমার মানদণ্ড। তুমি মানুষ, তুমি তোমার মানদণ্ডে বিচার করতে চাও পশুকে ? এর চেয়ে নির্বুদ্ধিতা আর কী হতে পারে ? তুমি মানুষ, বেঁচে থাকার ভিত্তিতে তোমার ধর্মনীতি, তোমার সমাজনীতি, তোমার রাষ্ট্রনীতি, তোমার অর্থনীতি, তোমার তামাম নীতি গড়ে নাওনি ? তাতে কেউ তো তোমার মনুষ্যত্বকে তিরস্কার করতে বসেনি। করলে বোধ হয় তার গলা টিপে মারতে। সেই তুমি, মানুষ নামক আরও একটি জন্তুর মুখ উজ্জ্বল করা বংশধর, তুমি কিনা পশুর পশুত্বকে দেখলে হীন করে ? আত্মপ্রসাদ আর অহমিকা তোমাকে অন্ধ করেছে আজ থেকে পাঁচ হাজার বছর আগে, যেদিন তুমি প্রথম নিজেকে মানুষ বলে চিনতে পেরেছিলে! জাহান্নামে যাক সেদিন।’ (পৃ: ৫৪, অধ্যায় : সপ্তম)

পৌরসভা বা সিটি কর্পোরেশন কুকুরের মতো প্রাচীন বন্ধুকে নিধন অথবা স্থানান্তর করতে আগ্রহী হয়ে ওঠে। যদিও রাষ্ট্র আইন করে তা নিষিদ্ধ করেছে। মানুষের সবচেয়ে কাছের এই বন্ধুটির ওপর চরম নির্দয়তার প্রকাশ আমরা প্রায়ই দেখতে পাই। এই অসংবেদনশীলতা দূর হোক আমরা তা মনে-প্রাণে চাই।

আমাদের সেই গভীর পাপ স্খলনের জন্যই বিধাতা যেন পাঠকের হাতে তুলে দিয়েছেন সৈয়দ শামসুল হকের এ বইটি। জীবনের বড় একটা সময় লেখক কাটিয়েছেন দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের আওতাধীন পুরান ঢাকায়। তাই বলতে পারি, এ হয়ত জীবনের ওপার থেকে এই সংবেদী শিল্পীর সোচ্চার প্রতিবাদ।

পশু হচ্ছে প্রাণ। আর প্রাণই হলো অস্তিত্ব, যা নিধন করে ফিরিয়ে দেওয়ার সামর্থ্য মানুষের নেই। উপন্যাসটি পড়ে শুধু মনে হয়েছে, মাত্র ২৬ বছর বয়সে এ রকম একটি দর্শন কীভাবে আয়ত্ত করেছিলেন তিনি! তাঁর এই বইটির দর্শন মানুষের আত্মম্ভরিতার ভিত নড়িয়ে দেয়।

এ উপন্যাসের সালাউদ্দিনের মতো পশুপ্রেমি বাস্তবেও দেখতে পাওয়া যায়। যারা এসব অবহেলিত প্রাণীর জন্য লড়ে চলেছেন।

তাই তো তিনি বলেছেন―

 “আমি একা হাঁটু গেড়ে ক্ষমা চাইলে যদি হাজার বছরের কোটি কোটি মানুষের অহংকারের প্রায়শ্চিত্ত হতো, তো এই আমি হাঁটু গেড়ে বসছি―এই আমি বলছি―আমি মানুষ, জন্ম থেকে জন্মে আমি যে অপরাধ করেছি, তা ক্ষমা করে দাও। আমি আমার রাজ্যে রাজা, তুমি তোমার রাজ্যে। আমি তোমাকে আমার উন্নত বুদ্ধির বড়াই নিয়ে নিন্দা করব না, আমার ভাষা থেকে পশুর সমস্ত অর্থ মুছে ফেলে দেব।

( পৃ: ৭২, অষ্টম অধ্যায় )

শেষ পর্যন্ত আমরা দেখতে পাই, যেকোনো দরজার প্রধান উপজীব্য মানুষ। এখানে আছে মানুষের মনুষ্যত্ব হারিয়ে ফেলার প্রসঙ্গ। কাব্যিক ভাষায় এবং নানা রূপক ব্যবহারের মাধ্যমে এতে এসেছে একের পর এক দৃশ্যাবলি। এই উপন্যাস পাঠের পর প্রাণজগতের দরজা সংরক্ষণ করা হবে বলেই বিশ্বাস। উপন্যাসের চরিত্র সালাউদ্দিন চৌধুরীর ভাষায়, ‘আমি বলব―পশু হচ্ছে প্রাণ, যেমন এ প্রাণ আমার; বলব―পশু হচ্ছে অস্তিত্ব, যেমন এ অস্তিত্ব আমার। আমাকে ক্ষমা করো।’ (পৃ: ৭২, অধ্যায় : অষ্টম )

সৈয়দ শামসুল হক জীবনকে দেখেছেন সম্পূর্ণ ভিন্ন আঙ্গিকে। কখনও প্রেম, জাতি, ভাষা, সমাজ, দেশ এই বিষয়গুলোকে তিনি খুব সুন্দরভাবে একীভূত করেছেন। তাঁর লেখায় অনুপম সৌন্দর্যের আধার হলো উপমা এবং চিত্রকল্প। যিনি শব্দবিন্যাস প্রয়োগে, কাব্যময়তায়, উপমায়, চিত্রকল্পে, শব্দের যথারীতি রূপায়ণে অত্যন্ত কৌশলী ছিলেন। যা তাঁকে দিয়েছে একটি একক কিন্তু সম্পূর্ণ ভিন্ন পরিচিতি। অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি যে শুধু পদ্য নয়, গদ্যেও তা দেখা যায়। এখানেই তিনি আর সবার থেকে ব্যতিক্রম এবং উচ্চমার্গীয়।

লেখকের গদ্যশৈলীর আলোচনা অসম্পূর্ণ থেকে যাবে যদি তাঁর ব্যবহৃত বিশেষণ, উপমা ও বাকপ্রতিমার উল্লেখ করা না হয়। উপন্যাসটিতে উপমা―চিত্রকল্পের ব্যবহার ছিল অনেক। পড়তে গিয়ে বারবার মনে হচ্ছিল, কোনও উপন্যাস নয় যেন কবিতা পড়ছি। কয়েকটি দৃষ্টান্ত দিলেই এ ক্ষেত্রে তাঁর সৃজনশীলতা এবং স্বতঃস্ফূর্ত উদ্ভাবনের নমুনা পাওয়া যায়। যেমন :

উপমা :

‘আকাশটাকে থিয়েটারের পর্দার মতো টেনে ছিঁড়ে নাবাতাম।’ (পৃ. ০৮, অধ্যায়: এক)

‘শূলের ব্যথায় আজ আঠারো বছর কোরবানির গরুর মতো চেঁচিয়েছে।’ (পৃ. ১৩, অধ্যায়: এক)

‘পোষা পশুর মতো মায়াময় শ্যামল লোকটার চোখজোড়া কেবলই কাকে যেন খুঁজছে।’ (পৃ. ২০, অধ্যায়: দুই)

‘আর স্টেডিয়ামের তোরণ দুটো অথৈ সমুদ্রে বাতিঘরের মতো অচল দাঁড়িয়ে।’ (পৃ. ২২, অধ্যায়: দুই)

‘তখন মনের মতন মসৃণ হয়েছে কাপড় দুটো।’ (পৃ. ২৯, অধ্যায়: তিন)

‘রাতের নীল রঙের মতো নীল একটা গাড়ি।’ (পৃ. ৩৪, অধ্যায়: চার)

‘রূপ হচ্ছে রূপকথার ঠকালে বুড়ি।’ (পৃ. ৪৪, অধ্যায়: ছয়)

চিত্রকল্প:

‘পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্ত অবধি কোটি হাতে করতালি বেজে চলেছে।’ (পৃ. ১২, অধ্যায়: এক)

‘জামাল চোখ মেলে তাকিয়ে দেখে, আকাশ কী স্বচ্ছ―ঝকঝক করছে, তারায় তারায় ঠিকরে পড়ছে অন্ধকার।’ (পৃ. ১৩, অধ্যায়: এক )

‘যখন ভোরের আলোয় সাদা সুতা থেকে কালো সুতাকে চিনে নেওয়া যাবে―ঠিক সেই পবিত্র লগ্নে।’ (পৃ. ১৩, অধ্যায়: এক)

‘নুড়ির সঙ্গে মুখ ঠেকিয়ে সব কটা ল্যাজ উঁচিয়ে পড়ে আছে।’ (পৃ. ১৮, অধ্যায়: দুই)

‘আকাশ-পৃথিবী গাঢ় ধূসর হয়ে আছে মুষলধারায়।’  (পৃ. ২২, অধ্যায়: তিন)

‘যেন কবরের ভেতর থেকে চেরাগ তুলে দেখছেন তাকে।’ (পৃ. ৪০, অধ্যায়: পাঁচ)

‘আকাশের বিস্তীর্ণ তারকা মেলা মাঠ দুলে দুলে উঠছে।’ (পৃ. ৫৪, অধ্যায়: সাত)

‘জানালায় আলোর আয়তক্ষেত্র সিনেমার শূন্য পর্দার মতো অন্ধকার থেকে ঝুলছে।’ (পৃ. ৬১, অধ্যায়: সাত)

দর্শন : এ উপন্যাসে কিছু দার্শনিক চিন্তা-ভাবনার অবতারণা দেখি। যেমন :

‘যা যাবে, আর ফিরবে না। যা গেছে, আর যেন তা ফিরে না আসে।’ (পৃ. ১৪, অধ্যায়: এক)

‘পৃথিবীতে যা কিছু সুন্দর, তা একপলকের।’ (পৃ. ৩২, অধ্যায়: চার)

‘যা বিশ্বাস করা যায়, সব সময় তা নিয়ে লড়াই করা যায় না। অনেক সময় উল্টোটাকেই সায় দিতে হয়।’ (পৃ. ৫৭, অধ্যায়: সাত)

‘মানুষ কি সহজে মরে ?’  (পৃ. ৬৪, অধ্যায়: আট)

‘দুঃখ তো মানুষের চেয়ে বড় নয় যে তাকে এড়ানো যায় না!’ (পৃ. ৬৪, অধ্যায়: আট)

কবিতা:

‘প্রিয়তমা আমায় ডাক দিয়েছে।

আমার সন্ধ্যেই-বা কী ? সকালই-বা কী ?’ (পৃ. ১৪, অধ্যায়: এক)

‘পৃথিবীজুড়ে সেই একই শান্তির অন্বেষণ।

কারও মিলল দুধে, কারও মিলল মদে।’ (পৃ. ৪০, অধ্যায়: পাঁচ)

পদ:

‘বন্ধু, পান্থশালায় রাতটুকু যা কাটাই পরিচয় দেওয়া বা নেওয়ার বিলাসিতা আমার কই ?’ (পৃ. ১৪, অধ্যায়: এক)

গান : ‘ওহো, স্বপ্ন জড়ানো দ্বীপ

 চাঁদে ডুবে আছে।

 যেতে চাই কাছে,

 নীল সাগরে আমি।

 পাশে আছ তুমি,

 আর ওই চাঁদ আছে ওহো-ও-ও।’ (পৃ. ৬১, অধ্যায়: সাত)

এ উপন্যাসে ব্যবহিত কবিতা, পদ এবং গান তাঁর নিজস্ব সৃষ্টি।

সৈয়দ শামসুল হকের ভাষ্য অনুযায়ী তাঁর রচিত প্রথম পদ তিনি লিখেছিলেন এগারো-বারো বছর বয়সে। টাইফয়েডে শয্যাশায়ী কবি তাঁর বাড়ির রান্নাঘরের পাশে সজনে গাছে একটি লাল টুকটুকে পাখি দেখে দু’লাইনের একটি পদ “আমার ঘরে জানালার পাশে গাছ রহিয়াছে/ তাহার উপরে দুটি লাল পাখি বসিয়া আছে” রচনা করেন।

স্থানের নাম : উপন্যাসে বেশকিছু স্থান এবং একটি নদীর নাম এসেছে। যেমন―রেঙ্গুন, কক্সবাজার, আকিয়াব, ব্রান্ড আইল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, কলকাতা, বোম্বে, দিল্লি, এছাড়া ঢাকার ইসলামপুর, গোপীবাগ, হাইকোর্ট, জিন্নাহ অ্যাভিনিউ, বাদামতলীর স্টিমারঘাট ইত্যাদি স্থান এবং বুড়িগঙ্গা নদী।

উপন্যাসটিতে রয়েছে অসাধারণ বর্ণনাভঙ্গি, যা তাঁর বাকি সব বইয়ের মতো। ভীষণ সুন্দরভাবেই তিনি সহজ কথাগুলোকে কাব্যিকতায়, শব্দের রূপকল্পতায়, আবেগের রহস্যময়তায়, কথার মালায় সাজিয়েছেন। যেন একেকটি শব্দ একেকটি গল্প, একেকটি কাহিনি, একেকটি উপন্যাস। যার একটি শুরু, উত্থান, ক্লাইম্যাক্স ও শেষ থাকবে। আর পাঠক সেই লেখার সমস্ত নির্যাসটুকু অমিয় সুধার মতো পান করবে।

ঊনষাট বছর পর পাওয়া এই উপাখ্যানের পরতে পরতে রয়েছে কাহিনি ও কাব্যের মায়া, আছে সব্যসাচী লেখকের অপ্রথাবদ্ধ গদ্যের মাতাল আমন্ত্রণ। যেকোনো দরজার অভিনব কাহিনি আপনাকে কখনও ভাবাবে, প্রশ্নবিদ্ধ করে উত্তর খুঁজতে নিয়ে যাবে ভাবনার অতল গহ্বরে। ভাবনার পাশাপাশি করাঘাত করবে আপনার মনের দরজায়।

সৈয়দ শামসুল হকের পাঠকপ্রিয়তার মূলে রয়েছে তাঁর ভাষাশৈলী, ভাষারীতি ও ভাষাদর্শন। নিজের তৈরি কিছু শব্দ, উপমা, উৎপ্রেক্ষা ও চিত্রকল্প যা তাঁর রচনার শিল্পগুণকে উন্নত করতে সাহায্য করেছে। সর্বোপরি, সৈয়দ শামসুল হক একজন বড় কবি, বড় লেখক এবং বড় দার্শনিকও বটে। ঠিক তত বড় শব্দশিল্পীও; যার প্রভাব পদ্য ছাড়িয়ে গদ্যেও উপচে পড়েছে। সে জন্যই তাঁর কোনও কোনও গল্প ও উপন্যাস পড়তে বসলে মনে হয়, একজন বড় কবি গল্পের জমজমাট আসর পেতে বসেছেন।

ভাষা ও বাক্যের বিন্যাসে সবসময় তিনি অবিচল। এ বইয়ের একটি আকর্ষণীয় দিক হলো এর ভাষা। এখানে ভাষায় কোনো আঞ্চলিকতা নেই যা ভাষার প্রাঞ্জল বিন্যাসকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধেছে। আর সৈয়দ শামসুল হক এ ব্যাপারে বরাবরই সফল ছিলেন। তাই তাঁর লেখা সর্বজনীনভাবে ও সহজে বোধগম্যতা পায়। উপন্যাসটি তাঁর নিজস্ব এক গদ্যভঙ্গিকে উন্মোচন করেছে। লেখকের জাদুকরী লেখায় অল্পেই সেটা প্রস্ফুটিত হয়েছে শুদ্ধভাবে, সুন্দরভাবে। শব্দ বিন্যাস, ভাষার সৌন্দর্য, ধ্বনির ইন্দ্রজাল সৃষ্টিতে নিপুণতায় শক্তিসম্পন্ন প্রকাশভঙ্গি!

তিনি লিখেছেন, ‘ভাষা আমাদের শেখানো হয়; কিন্তু ভাষাবোধ আমাদের ভেতর সৃষ্টি করা হয় না। ভাষা আর ভাষাবোধ এক জিনিস নয়। আমাদের বাক্য ব্যাকরণের বিস্তারে হয়তো শুদ্ধ। কিন্তু ভাষাবোধটি না থাকলে ভাব-প্রকাশ শুদ্ধ নাও হতে পারে।’ (কথা সামান্যই, পৃ. ৯১)

ভাষা ব্যবহারের সাধারণ সূত্র হিসেবে মার্জিনে মন্তব্য বইতে ‘বিষয়ের চেয়ে গদ্যকে বড় করে দেখা’ শীর্ষক লেখায় সৈয়দ হক লিখেছেন : ‘কারণ, গদ্য তো বাহন মাত্র। পালকির পেল্লাদার নকশায় আরোহিণীর রূপই ম্লান হয়ে যাচ্ছে যে। কখনও কখনও তাকে তাকে চোখেই পড়ছে না।’

স্পষ্ট করেই সৈয়দ হক বলেছেন, ভাষাকে তিনি ভাবের, বক্তব্যের এবং কাহিনীর বাহন করে ব্যবহার করতে চান।

কিছু কিছু বই মনে দাগ কেটে যায়; দাগ কেটে যাওয়া বইদের নিয়ে আলাদা একটা মুগ্ধতা থাকে!

কিছু বই দাগ না-কাটলেও রেখে যায় চিন্তার রেখা, নতুন করে ভাবনার সৃষ্টি করে। কিছু বই পড়লে মনের নতুন দুয়ার খুলে যায়। সৈয়দ শামসুল হকের যেকোনো দরজা তেমনই একটা বই। উপন্যাসটি পড়ে আমার কাছে মনে হয়েছে এ উপন্যাসে মোট চারটি ঘর এবং দরজা আছে। যেকোনও দরজা দিয়ে এগোলেই এক একটি ঘরের কাহিনি জানা যাবে। একটা ঘরের সঙ্গে আরেকটি ঘরের রয়েছে গভীর সম্পৃক্ততা। এ উপন্যাসে ভাব-ভাষা, কাহিনি আমাদের আবেগের জায়গায় তীব্র আঘাত হেনেছে। লেখক এখানে সমাজের অনিয়ম-অবিচারের প্রতি অঙ্গুলি নির্দেশ করেছেন। বইটির নাম এবং প্রচ্ছদ বইটির বক্তব্যকেও ছাড়িয়ে গেছে। সেদিক বিচারে বলা যায় এ বইটি নামকরণ সার্থক।

সৈয়দ শামসুল হকের লেখায় প্রেম, বিরহ, দ্রোহ, বাস্তব জীবন এসব কিছু মূর্ত হয়ে ওঠে। মনোজগতের অন্তর্নিহিত খনিজ তিনি তুলে আনেন ডুবুরির মতো। স্বতন্ত্রধারায় উজ্জ্বল এই লেখকের ‘যেকোনো দরজা’ পাঠকের সামনে মেলে ধরেছে সমাজের ভিন্ন এক জগৎ।

এক সাক্ষাৎকারে তিনি নিজেই বলেছেন, ‘আমার খেলা মহাকালের সঙ্গে, ব্যক্তির সঙ্গে নয়―তিনি যত বড়ই হোন। তিনি শেক্সপিয়র হন, কী কালিদাস হন, কী রবীন্দ্রনাথ হন, বার্ল্টড ব্রেশট হন, কী তলস্তয় হন―আমার খেলা হচ্ছে মহাকালের সঙ্গে। সেখানে আমি এবং মহাকাল; আমরা একটা বিশাল সমুদ্রতীরে বসে গোধূলিলগ্নে― গোধূলি মানে ভোর কিংবা সন্ধ্যা দুটিই হতে পারে বাংলা ভাষায়―সেই রকম একটি আলোছায়ার ভেতরে আমরা বসে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছি। দেখি মহাকাল আমাকে বিলীন বিলুপ্ত করতে পারে কিনা।’

তাঁর কথায় সুর মিলিয়ে আমরাও তাই বলতে পারি, সুদীর্ঘ সাহিত্যজীবনে বাংলা সাহিত্যের সকল শাখায় অনবদ্য অবদান খুব কম লেখকই রেখেছেন। তাঁদের মাঝে সৈয়দ শামসুল হক একজন। তাঁর সৃষ্টিপ্রয়াসকে মানুষ ভালোবেসেছে, ঠাঁই দিয়েছে হৃদয়ের মণিকোঠায়। তিনি যেন হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালা হয়েই এ দেশের সাহিত্যপ্রেমী মানুষকে শুনিয়েছেন তাঁর মোহময়ী নানা সুর। নিজের সৃষ্টি প্রতিভার মাধ্যমে তিনি ভিন্ন স্বাদের, ভিন্ন আঙ্গিকে বৈচিত্র্যময় লেখা উপহার দিয়ে সাহিত্য ও বিদগ্ধ পাঠককে করেছেন মুগ্ধ এবং সমৃদ্ধ। নিজেও সিক্ত হয়েছেন তাদের ভালোবাসা আর শ্রদ্ধায়। নিজস্ব শিল্প কৌশলের প্রকরণে এবং ধ্রুপদী সঞ্চালনার স্বতন্ত্র মহিমায় তিনি সাহিত্যপ্রেমীদের মনের ফ্রেমে অনন্তকাল বন্দি থাকবেন বলে আশা করি।

লেখক : সহকারী অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ, এমফিল গবেষক, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

প্রাবন্ধিক ও সাহিত্যবিশ্লেষক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may have missed

shares