হুমায়ূন আহমেদ : এক বহুপ্রসূ লেখকের জন্মদিনে : মুম রহমান

জন্মদিনে শ্রদ্ধার্ঘ্য

ইংরেজি ‘Prolific Writer’ শব্দটির কোনও বাংলা পরিভাষা আমার চোখে পড়েনি। অভিধানে প্রোলিফিক বলতে বোঝায় প্রচুর উৎপাদনশীল, প্রচুর ফল দেয়, ব্যাপক সৃষ্টিশীল মানুষকে। ইংরেজিতে প্রোলিফিক রাইটার শব্দটি বহুব্যবহৃত। আমি অন্তত বাংলা ভাষায় এর নিকটবর্তী কোনও শব্দও ব্যবহৃত হতে দেখিনি। আমি ‘Prolific Writer’-এর বাংলা করতে চাই ‘বহুপ্রসূ লেখক’। বহুপ্রসূ লেখক বিশ্বসাহিত্যে কম নয়। বিশ^সাহিত্যের কয়েকজন বহুপ্রসূ লেখকের কথা একটু বলে নিয়ে মূল কথায় আসছি।

ফরাসি লেখক ফ্রাঙ্কো-মারি অঁরুতকে আমরা ভলতেয়ার (১৬৯৪-১৭৭৮) নামেই চিনি। ভলতেয়ারের কয়টি বইয়ের কথা আমরা বলতে পারব ? এই বহুমাত্রিক লেখক নাটক, কবিতা, উপন্যাস, ইতিহাস, বিজ্ঞান বিষয়ক প্রবন্ধাবলিসহ বহু ধরনের লেখাই লিখেছেন এক জীবনে। বিস্ময়কর হলেও সত্য যে, প্রায় ২০০০ ছোট-বড় বই আছে তার লেখা। শুধু তা-ই নয়, তিনি এক জীবনে হাজার বিশেক চিঠিও লিখেছেন। 

ফরাসি লেখক আলেক্সান্দর দ্যুমা (১৮০২-১৮৭০) ২৭৭টি বই প্রকাশ করেছেন। কাউন্ট অব মন্টিক্রিস্টো, থ্রি মাস্কেটিয়ার্স, ব্ল্যাক টিউলিপ, দ্য কুইন্স নেকলেস-এর মতো রোমাঞ্চর ধ্রুপদী উপন্যাসের জনক দ্যুমা নাটক লিখেছেন, ভ্রমণকাহিনি লিখেছেন, রোমান্স, ফ্যান্টাসি, ঐতিহাসিক কাহিনিও লিখেছেন প্রচুর। তার সমগ্র রচনাবলি লক্ষ পৃষ্ঠার অধিক। এখন পর্যন্ত তার গল্প, উপন্যাস, নাটক নিয়ে দুই শতাধিক চলচ্চিত্রই নির্মিত হয়েছে। 

স্প্যানিশ নাট্যকার লোপ দ্য ভেগা (১৫৬২-১৬৩৫)-এর একটি নাটক ভলপেন্নো বিশ্বব্যাপী নাটকের ছাত্রদের অবশ্যপাঠ্য। আমরাও নাট্যতত্ত্ব নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় এ নাটক পড়েছি। পরবর্তীকালে জেনে বিস্মিত হয়েছি, তিনি ২২০০ নাটক লিখেছিলেন। প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পর থেকে গড়ে সপ্তাহে একটা করে নাটক লিখেছেন তিনি। অবশ্য বর্তমানে তার ৪০০ নাটক টিকে আছে। ইংরেজিতে তার প্রায় ৫০টি নাটকের অনুবাদ প্রকাশিত হয়েছে। বলাবাহুল্য যে, এই সংখ্যাটিও নেহাত কম নয়। এই বিপুলসংখ্যক নাটকের বাইরেও তার অসংখ্য পদ্য এবং গদ্যকর্ম রয়েছে। স্প্যানিশ সাহিত্যের মহত্ত্বম ঔপন্যাসিক মিগুয়েল দ্য সার্ভান্তেস অগ্রজ এই লেখক সম্পর্কে বলেছিলেন, ‘প্রকৃতির দানব।’ বহুপ্রসূ লেখকরা হয়ত প্রকৃতির দানবই হয়। আদতে প্রতিভা ও পরিশ্রমের সমন্বয়েই আমরা পাই একজন বহুপ্রসূ লেখককে।

এবার একটু স্প্যানিশ, ফরাসি রেখে, আরবি সাহিত্যের দিকের নজর দিতে পারি। আরবি সাহিত্যে জালালউদ্দিন সুয়েতি (১৪৪৫-১৫৫০) এক বিখ্যাত নাম। তিনি কোরআন শরিফের তফসির করেছেন, হাদিস, কোরআন, ফিকাহ ইত্যাদি বিষয়ে বহু বই লিখেছেন। সুফিবাদ, ইসলামি চিন্তা চেতনায় তার লেখা গ্রন্থ সংখ্যা ১৪৪৫টি। ইসলামিক চিন্তাবিদ, লেখক, হাদিস-কোরআনের ব্যাখ্যাকারী জালালউদ্দিন সুয়েতির মতো বহুপ্রসূ লেখক আরবি ভাষা ও ইসলামি সাহিত্যকে একাই শক্ত ভিত্তি তৈরি করে দিয়েছেন।

ধ্রুপদী গ্রিক নাট্যকার সফোক্লিসের সাতটি নাটক টিকে আছে। তার ইডিপাস বিশ্ব নাট্য সাহিত্যের অন্যতম সেরা সৃষ্টি। এই একটি নাটক যুগে যুগে বিশে^র বহু সাহিত্যিক, চিন্তাবিদকে প্রভাবিত করেছে। আধুনিক মনস্তত্ত্ববিদ সিগমুণ্ড ফ্রয়েড ইডিপাস কমপ্লেক্স নিয়ে রীতিমতো গবেষণা করেছেন। মাত্র সাতটি নাটক পাওয়া গেলেও শোনা যায় সফোক্লিস ১২৩টি নাটক লিখেছিলেন। আরও দুই গ্রিক নাট্যকার এসকাইলস এবং ইউরোপিদিসের রচিত নাটকের সংখ্যাও শতের কম নয়। সে সময় গ্রিসে প্রতিবছর নাট্য উৎসব হতো সাড়ম্বরে। এই সব উৎসবের প্রাণ পুরুষ ছিলেন নাট্যকারগণ। তারা প্রতি উৎসবকে কেন্দ্র করেই প্রতিযোগিতামূলক মনোভাব নিয়ে একের পর এক নাটক লিখে গেছেন। আজকের বিশ^সাহিত্যচর্চা ধ্রুপদী গ্রিক নাটককে বাদ দিয়ে ভাবাই যায় না। আর নিঃসন্দেহে এই ধ্রুপদী গ্রিক নাটকের নাট্যকারগণ বহুপ্রসূ লেখক।

আধুনিককালের অন্যতম জনপ্রিয় লেখক আইজাক এসিমভ (১৯২০-১৯৯২)। তার লেখা বইয়ের সংখ্যা ৫০৬টি। ‘আমার কাছে লেখা হলো স্রেফ আঙুলের মাধ্যমে চিন্তা করা’―এমন কথাই বলেছেন আইজাক এসিমভ।

পুলিৎজার ও নোবেল পুরস্কার বিজয়ী উইলিয়াম ফকনার প্রায় ৯০০ বই লিখেছেন। উপন্যাস, ছোটগল্প, কবিতা, প্রবন্ধের পাশাপাশি তিনি নাটক লিখেছেন, হলিউডের জন্য বহু চিত্রনাট্য লিখেছেন।

এবার একটু দেশের দিকে ফেরা যাক। অনেকেই হয়ত মনে করবেন, বাংলায় প্রোলিফিক কোনও লেখকই নেই! কিন্তু তাই বা কি করে মানি ? এক রবীন্দ্রনাথ একাই তো বহুমাত্রিক। বাংলায় সার্থক ছোটগল্প রচনার সূচনা তার হাত দিয়ে, গানকে সাহিত্যের কাতারে ঠাঁই দিয়েছেন তিনি। প্রবন্ধ, উপন্যাস, অনুবাদ, নাটক, এমনকি চিঠিপত্র দিয়েও তিনি সাহিত্যের বিশাল অঙ্গন নিজের আওতায় রেখেছেন। তার সঙ্গে ছবি আঁকা, কৃষিবিদ্যা, জমিদারি, শিক্ষাক্ষেত্রেও তিনি অনন্য। আমরা রবীন্দ্রনাথকে ‘বিশ^কবি’ তকমা দিয়ে তার বহুপ্রসূ সত্তাটিকে নজরদারি করিনি। আমাদের কোনও এক বিচিত্র কারণে ধারণা হয়েছে যে অধিক লিখলেই লেখাগুলো দুর্বল হয়। অথচ আমরা এটা মানি যে কোনও কাজ যত বেশি করা যায়, যত চর্চা করা যায় তত উৎকর্ষতার দিকেই যায়। কেউ যদি প্রতিদিন একটা ডিমও ভাজি করে তবে সে ডিমভাজিতে দক্ষতা অর্জন করে। আর প্রতিভাবান লোক যদি কোনও একটি কাজে ধারাবাহিক মনোনিবেশ করে নিশ্চয়ই তার কাজের মান বাড়তেই থাকে। দুর্মুখেরাও বলতে বাধ্য হবেন যে রবীন্দ্রনাথ তার প্রথম কাব্যগ্রন্থে যে দক্ষতা দেখিয়েছেন শেষ কাব্যগ্রন্থে সেই দক্ষতাকে ছাড়িয়েই গেছেন। একজন লেখকের বয়সের সঙ্গে সঙ্গে তার ঝুলিতে অভিজ্ঞতা ও প্রাজ্ঞতাই যুক্ত হয়। সত্যিকারের লেখক জীবিতকালে মরে না, মৃত্যুর পরও মরে না। রবীন্দ্রনাথের মৃত্যু নেই। বিশাল ৩২ খণ্ডের রচনাবলি, ১১ খণ্ডের চিঠিপত্র আমাদের রবীন্দ্রসাহিত্যের আকার প্রকার সম্পর্কে ধারণা তো দেয়ই। নেহাত একটি শেষের কবিতা, যোগাযোগ, রক্তকরবী, অচলায়তন, সোনার তরী, গীতাঞ্জলী কিংবা সভ্যতার সংকট দিয়ে রবীন্দ্রনাথকে চেনা সম্পূর্ণ হয় না। আমাদের রবীন্দ্রনাথ আবিষ্কার এখনও বাকি রয়ে গেছে বলেই বিবেচনা করি। বিশ^সাহিত্যের অন্যান্য বহুপ্রসূ লেখকের তুলনায় রবীন্দ্রনাথ নানা কারণেই এগিয়ে, কারণ তার মতো এত বিচিত্র পথে খুব কম লেখকই হেঁটেছেন। গোটা কয়েক কবিতা, শ’খানেক সনেট আর মাত্র ছত্রিশটি নাটক দিয়ে উইলিয়াম শেক্সপিয়র বিশ^সাহিত্যে বিরাট আসন গ্রহণ করে আছেন। সেই বিবেচনায় আমাদের রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে মূল্যায়ন এখনও বাকি আছে বলে মনে করি।

কাজী নজরুল ইসলামের সাহিত্যচর্চার সময় কাল খুব বেশি নয়, জীবনের একটা দীর্ঘ সময় তিনি অসুস্থ আর লিখতে অক্ষম ছিলেন। সেই নজরুলের বিপুল গান কবিতার পাশাপাশি, গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ, চিঠিপত্র তো রয়েছেই এমনকি তিনি মূল আরবি, ফার্সি থেকে অনুবাদও করেছেন একাধিক গ্রন্থ। রচনার সময়কালের বিবেচনায় তিনি অবশ্যই একজন বহুপ্রসূ লেখক।

বহু লেখকই আছেন যে ৬৫ বছর বয়সে ৬৫টি উপন্যাস লিখতে পারেননি। কিন্তু তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় ৬৫টি উপন্যাস লিখেছেন, ৫৩টি ছোটগল্পের বই আছে তার, ১২টি নাটক, ১টি কবিতাগ্রন্থ, ৪টি প্রবন্ধ গ্রন্থ, ৪টি আত্মজীবনীমূলক রচনা এবং ২টি ভ্রমণ কাহিনি লিখেছেন তিনি। পদ্মশ্রী এবং পদ্মভূষণ প্রাপ্ত বহুপ্রসূ লেখক তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় সিনেমার জন্য গানও লিখেছেন। 

মাত্র ৪৮ বছর বেঁচেছিলেন মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়। লেখালেখিতে সংযুক্ত হন বন্ধুদের সঙ্গে বাজি ধরে। বাংলাভাষায় প্রথম পেশাদার লেখক বলা যায় তাকে। ক্ষণজন্মা প্রগতিশীল এই লেখক ৩৬টি উপন্যাস, ২৫০টি ছোটগল্প রচনা করেছেন যার অধিকাংশই আজ ধ্রুপদী সাহিত্যের মর্যাদা পায়।

বাংলা সাহিত্যে জীবনানন্দ দাশ স্বয়ং এক বিস্ময়। তার জীবিতকালে মাত্র কয়েকটি কবিতার বই প্রকাশিত ছিল। ধারণা করা হয়েছিল, তিনি হয়ত খুব কমই লিখতেন। কিন্তু পরবর্তী সন্ধানে দেখা গেল, জীবনানন্দের প্রকাশিত লেখার চেয়ে অপ্রকাশিত লেখার সংখ্যা কয়েকগুণ বেশি। বিপুল আকারের উপন্যাস, গল্প লিখে রেখে গেছেন তিনি। আজকের দিনে এসে জীবনানন্দের কবিতা, গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধের দিকে তাকালে বোঝা যায় তিনিও একজন বহুপ্রসূ লেখক ছিলেন। ‘নির্জনতার কবি’ আদতে একজন বহুপ্রসূ লেখক। এমনকি জীবনানন্দের লেখা ইংরেজি প্রবন্ধও আমরা পাই। 

এটা বলার অপেক্ষা রাখে না, বুদ্ধদেব বসু, সমরেশ বসু থেকে শুরু করে সুনীল, শীর্ষেন্দুগণ বাংলা ভাষায় বহুপ্রসূ লেখকের আদর্শ উদাহরণ। এই স্বাধীন বাংলাদেশে শামসুর রাহমানের বিপুল কাব্যভাণ্ডারের দিকে তাকালে আমরা বিস্মিত হই। তিনি অনুবাদও করেছেন, উপন্যাসও লিখেছেন, প্রবন্ধও লিখেছেন। তবে লেখার বিপুলতা আর গ্রহণযোগ্যতার বিবেচনায় স্বাধীন বাংলাদেশের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য এবং গুরুত্বপূর্ণ বহুপ্রসূ লেখক হুমায়ূন আহমেদ। তার বহুমুখিনতার উদাহরণ অবিস্মরণীয়। বাংলাদেশে প্রথম বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনির জন্ম তিনি দিয়েছেন। তার রচিত ‘তোমাদের জন্য ভালোবাসা’ বাংলা বৈজ্ঞানিক কল্প-কাহিনির জগৎকে উন্মোচিত করেছে। পরবর্তী পর্যায়ে তিনি  বৈজ্ঞিানিক কল্পকাহিনি ভিত্তিক ১২টি উপন্যাস এবং একাধিক ছোটগল্প রচনা করেছেন। এরমধ্যে ‘তারা তিন জন’, ‘অন্য ভুবন’, ‘ইরিনা’, ‘ফিহা সমীকরণ’, ‘শূন্য’, ‘নি’, ‘ওমেগা পয়েন্ট’ উল্লেখযোগ্য। হুমায়ূন আহমেদ রচিত ‘তোমাদের জন্য ভালোবাসা’ বাংলাদেশের প্রথম বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনি। বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনিকে তিনি বাংলা সাহিত্যের মূল ধারায় সংযোজন করেছেন।

বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনির মতো স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের সাহিত্যে অতিপ্রাকৃত গল্প রচনায় তিনি বিস্ময়কর, অনন্য দক্ষতা দেখিয়েছেন। রবীন্দ্রনাথ ও বিভূতিভূষণের পর তিনিই অতিপ্রাকৃত বিষয়াদি নিয়ে বাংলাভাষায় এতটা মনোনিবেশ করেন। তার গল্পগ্রন্থ ছায়াসঙ্গী বাংলাভাষায় অতিপ্রাকৃত সাহিত্যচর্চার গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন। এই গল্পগ্রন্থের ‘ছায়াসঙ্গী’, ‘শবযাত্রা’, ‘ভয়’, ‘ওইজা বোর্ড’, ‘কুকুর’ ইত্যাদি গল্পসমূহ অতিপ্রাকৃত সাহিত্যের অনন্য উদাহরণ হয়ে থাকবে। অতিপ্রাকৃত, রহস্য, মনোজাগতিক বিষয়াদির ক্ষেত্রে হিমু এবং মিসির আলির মতো একাধিক উপাখ্যানের নাম উল্লেখ করা যায়। এইসব রচনাবলির কারণে তাকে ‘বাংলাদেশের এলান পো’ মনে হয় আমার।  

হিমু ও মিসির আলি উপাখ্যান সিরিজসমূহ রচনার মাধ্যমে তিনি বাংলা সাহিত্যে মরমিবাদ, দর্শন ও মনস্তত্ত্ব চর্চার দিগন্ত খুঁলে দিয়েছেন। উল্লেখ করা দরকার, তিনি সচেতনভাবেই, নিয়ম করে প্রতি বছর ‘হিমু’ আর ‘মিসির আলি’কে নিয়ে লিখতেন। হিমুকে নিয়ে ২৫টি এবং মিসির আলিকে নিয়ে ২০টি বই প্রকাশিত আছে। বাংলা সাহিত্যে একাধিক আইকনিক চরিত্র সৃষ্টি করেছেন হুমায়ূন আহমেদ। ফিহা, হিমু, রূপা, মিসির আলি, শুভ্র, বাকের ভাই, নান্দাইলের ইউনুস এমনি সব চরিত্র সৃষ্টি হয়েছে তার বহুপ্রসূ কলম থেকে। তার গল্প-উপন্যাসের চরিত্রের চালচলন, পোশাক আশাক অনুকরণ করে তরুণ সমাজ।

দারুচিনি দ্বীপ’ লেখার সূত্র ধরেই সেন্টমার্টিন দ্বীপ সম্পর্কে সাধারণ পাঠকের আগ্রহ তীব্র হয়। এই উপন্যাসের সিক্যুয়াল হিসেবেই রূপালী দ্বীপ প্রকাশিত হয়, যা সেন্টমার্টিন দ্বীপ নিয়ে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ। রবীন্দ্রনাথ, জীবনানন্দের মতো হুমায়ূন আহমেদও ভীষণ প্রকৃতি-ঘনিষ্ঠ লেখক। এই বহুপ্রসূ লেখক বাঙালিকে আরও জোছনাপ্রেমী করেছে, বৃষ্টিকে ভালোবাসতে শিখিয়েছে। এমনকি বৃক্ষ নিয়ে তিনি আলাদা বই লিখেছেন ‘বৃক্ষকথা’ শিরোনামে। হুমায়ূন আহমেদ ঐতিহাসিক উপন্যাস, মুক্তিযুদ্ধের উপন্যাস রচনার ক্ষেত্রেও নতুন দৃষ্টিভঙ্গির পরিচয় দিয়েছেন। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে তার আটটি উপন্যাস আছে। এরমধ্যে জোছনা ও জননীর গল্প ঢাউস আকারের উপন্যাস। উল্লেখ্য জোছনা তার প্রিয় প্রসঙ্গ। তার একাধিক বইয়ের শিরোনামেই আমরা জোছনাকে পাই, যেমন : জল ও জোছনা, তেঁতুল বনে জোছনা, হিমুর নীল জোছনা।

তার রচিত ছোটগল্পগুলো সম্পর্কে এমনকি তার বিরূপ সমালোচনাকারীরাও প্রশংসা করে থাকেন। হুমায়ূন আহমেদ প্রায় শতাধিক ছোটগল্প লিখেছেন। ছোটগল্পের ক্ষেত্রে তিনি বিষয়বৈচিত্র্যে আর প্রকরণে অভিনব।  মধ্যবিত্ত জীবনের চালচিত্র, নিম্নবর্গ মানুষের বয়ান, বাঙালির মুক্তিযুদ্ধের গৌরব থেকে শুরু করে অতি সাধারণ প্রেমের মিষ্টি কাহিনিও তিনি বেছে নিয়েছেন ছোটগল্পের ক্যানভাসে। বহুপ্রসূ লেখক হুমায়ূন রহস্য, অদ্ভুত রস, অতিপ্রাকৃত, বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনি, প্রহসন, শিশুতোষ, ভূতের গল্প ইত্যাদি নানা ধরনের গল্প রচনা করেছেন। তবে তার গল্পের ধরন বা বিষয় যাই হোক না কেন অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তিনি মানবিকতা প্রধান উপজীব্য করে তুলেছেন।  মুহম্মদ আবদুল হাই ও সৈয়দ আলী আহসান বাংলা সাহিত্যের ইতিবৃত্ত গ্রন্থে বলেছেন, ‘হুমায়ূন জীবন ও জগৎকে দেখেছেন এক মায়াবী দৃষ্টিকোণ থেকে। জীবনের ছোটখাটো সুখ-দুঃখ ও নিতান্ত তুচ্ছ ঘটনাও তাঁর এই মায়াবী দৃষ্টির ছোঁয়ায় হয়ে উঠেছে অসামান্য হৃদয়গ্রাহী।’

শিশুসাহিত্যে হুমায়ূন আহমেদের অবদান আমার বিবেচনায় আজও অনির্ণীত। তার বিপুল জনপ্রিয়তার আড়ালে শিশু সাহিত্যের বর্ণছটা ঢাকা পড়ে গেছে। শিশুদের জন্য লেখা তার নীল হাতি, সূর্যের দিন, পুতুল, বোতল ভূত ইত্যাদি রচনায় হুমায়ূন একনিষ্ঠভাবেই শিশুর মনস্তত্ত্বকে ধারণ করেছেন। শিশুর উপযুক্ত ভাষা ও চরিত্র নির্মাণ, কাহিনির অভিনবত্ব হুমায়ূন আহমেদকে শিশু সাহিত্যিক হিসেবে শীর্ষস্থানে অবস্থানের সুযোগ দেয়। এমনকি বড়দের জন্য লেখা একাধিক উপন্যাসেও তিনি শিশু চরিত্রকে অত্যন্ত মুন্সিয়ানায় অঙ্কন করেছেন। বলার অপেক্ষা রাখে না, শিশুদেরকে বুঝতে পারা, তাদের মতো করে ভাবতে পারা উঁচুদরের লেখকের পক্ষেই সম্ভব।

হুমায়ূন আহমেদ গল্প, উপন্যাসের পাশাপাশি ভ্রমণকাহিনি, আত্মজৈবনিক রচনা, পত্র-পত্রিকায় লিখিত কলামের সংখ্যাও কম নয়। দেশের বিভিন্ন সংকটে তিনি কলম ধরেছেন অকাতরে। কবিতা তিনি সরাসরি লেখেননি, তবে তার একাধিক গল্প-উপন্যাসে তিনি কবিতার ব্যবহার করেছেন। কবি শিরোনামের উপন্যাসে তিনি একাধিক কবিতা রচনা করেছেন। এগুলো নিয়ে পরবর্তী পর্যায়ে পকেট বইও প্রকাশিত হয়েছে। গান তিনি সরাসরি রচনা করেছেন। একদিকে তিনি যেমন হাসন, উকিল মুন্সির গানকে নতুন প্রজন্মের কাছে জনপ্রিয় করেছেন তার চলচ্চিত্র ও নাটকের মাধ্যমে, অন্যদিকে নাটক ও চলচ্চিত্রের প্রয়োজনে নতুন গানও লিখেছেন। ‘নদীর নামটি ময়ূরাক্ষী’ শিরোনামে তার গানের সংকলন গ্রন্থও প্রকাশিত হয়েছে সম্প্রতি। হুমায়ূন যে পরিমাণের টিভি নাটক লিখেছেন তার অধিকাংশই আজও অপ্রকাশিত। আমরা হয়ত এখনও টিভি নাটকের সাহিত্যমান নিয়ে সুনিশ্চিত নই। কিন্তু বিশ^াস করি, হুমায়ূন আহমেদের টিভি নাটক এবং চলচ্চিত্রসমূহের চিত্রনাট্যও পাঠক ও গবেষকের জন্য নব দিগন্ত খুলে দেবে। এ প্রসঙ্গে হুমায়ূনের এলেবেলে দ্বিতীয় খণ্ড থেকে একটি অংশ উদ্ধৃতি দিচ্ছি। আশা করি এ উদ্ধৃতি পাঠক এবং প্রকাশককে বুঝতে সাহায্য করবে টিভি নাটকের সাহিত্যমান প্রসঙ্গে :

‘নিউমার্কেটে আমি আমার স্ত্রীকে নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছি। সৈয়দ শামসুল হকের সঙ্গে দেখা। তিনি হাসিমুখে জিজ্ঞেস করলেন, কী লিখছেন ?

আমি বললাম, অয়োময় লিখছি।

তিনি বিস্মিত হয়ে বললেন, সাহিত্য কিছু লিখছেন না ?

এই দিয়েই অয়োময় প্রসঙ্গ শুরু করি। তবে শুরুর আগে বলে নিই, সৈয়দ হকের এই কথায় আমি আহত হয়েছি। টিভির জন্যে নাটক লিখলে সাহিত্য হবে না, মঞ্চের জন্য লিখলে সাহিত্য হবে, এই অদ্ভুত ধারণা তিনি কোথায় পেলেন কে বলবে। যে অয়োময় আমি টিভিতে দিচ্ছি মঞ্চে তা দিয়ে দিলেই সাহিত্য হয়ে যাবে ?’

বলার অপেক্ষা রাখে না যে বিশ^সাহিত্যে মঞ্চনাটকের একটা উচ্চ আসন রয়েছে। স্কাইলাস, সফোক্লিস, ইউরিপেদিস, শেক্সপিয়র থেকে আধুনিক কালের ব্রেখট, ইবসেন, ইউজিন ও’নীল, শেখবের মতো লেখকদের মঞ্চনাটককে আমরা আলাদা মূল্য দিই। হাজার হাজার বিশ^বিদ্যালয়ে পঠিত হয়। আজকের দিনে এসে হ্যারল্ড পিন্টার, স্যাম সেফার্ডের মতো নাট্যকারদের টিভি নাটকও প্রকাশিত হয়, এগুলোর সাহিত্যমান নিয়ে আলোচনা হয়। আমি বিশ^াস করি, আলাদা করে হুমায়ূনের একাধিক টিভি নাটক সাহিত্য হিসেবে আলোচনার সুযোগ আছে। এটা ঠিক যে টেলিভিশনের সর্বগ্রাসী ক্ষুধা এবং বাণিজ্যিকীকরণের কারণে তিনি কিছু দুর্বল টিভি নাটকও রচনা করেছেন। তো একজন বহুপ্রসূ লেখকের দুর্বল, সবল সব লেখাই আলোচনায় আসতে পারে। কেবল প্রশংসা বা একপাক্ষিক দৃষ্টিভঙ্গিতেই সব দেখতে হবে তা তো নয়।

প্রসঙ্গতই জানিয়ে রাখি, হুমায়ূন আহমেদ মঞ্চনাটকও লিখেছেন। কিন্তু মঞ্চনাটকের প্রতি তার আগ্রহ দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। এটা দুঃখজনক যে, তার বৃহৎ সাহিত্যকর্মের বিবেচনায় হুমায়ূন আহমেদ মঞ্চের জন্য খুব কমই লিখেছেন। আমার বিবেচনায় এটা হুমায়ূন আহমেদের অনীহা নয়, বরং আমাদের দৈন্য। এ প্রসঙ্গে  স্বপ্ন ও অন্যান্য শিরোনামে তার মঞ্চনাটক সমগ্রের ভূমিকাটি তুলে ধরতে চাই, ‘যশোহরে একবার নাটকের উপর একটি সেমিনার হল। সেমিনারের বিষয়বস্তু “বাংলাদেশের মঞ্চনাটক : সংকট ও সম্ভাবনা।” মূল প্রবন্ধ যিনি পাঠ করলেন, তিনি বাংলাদেশের মঞ্চ নাটকে সংকট হিসেবে যে কয়েকটি কারণ উল্লেখ করলেন তার একটি হচ্ছে― “হুমায়ূন আহমেদ”। আমি মন খারাপ করে তাঁর বক্তৃতা শুনলাম। তিনি যদি বলতেন, আমি নাটক লিখতে পারি না, যা লিখেছি সবই পা-ধোয়া পানি তাহলেও এতটা খারাপ লাগত না। আমি কেন মঞ্চনাটকে সংকট সৃষ্টি করব ?’ এই কথনে স্পষ্টতই লেখকের বেদনা ও ক্ষোভ লক্ষ্য করি। এটাও যথার্থ যে অর্থে হুমায়ূন আহমেদের কাছে প্রকাশক-সম্পাদকরা ছুটে গেছেন, লেখা আদায় করেছেন, যে অর্থে টিভি কিংবা সিনেমার মানুষেরা তাকে ঘিরে রেখেছেন, সে অর্থে মঞ্চ থেকে তিনি অনেকটাই বিমুখ ছিলেন। অথচ তার প্রধাণ তিনটি মঞ্চ নাটক ‘নৃপতি’, ‘মহাপুরুষ’ এবং ‘১৯৭১’ যথেষ্ট গুরুত্বের দাবি রাখে। 

এইদিক থেকে মনে হয়, তার চিত্রনাট্যসমূহও প্রকাশের দাবি রাখে। লেখক হুমায়ূনের পাশাপাশি টিভি নাটক নির্মাতা, চলচ্চিত্র নির্মাতা হুমায়ূন আহমেদ তার বহুমুখী সত্তারই অংশ। সৃষ্টিশীল, প্রতিভাবান ও পরিশ্রমী হুমায়ূন আহমেদ এক নিয়মতান্ত্রিক, ধারাবাহিক কার্যধারার মাধ্যমেই বাংলাদেশের শিল্প-সাহিত্যে নিজের অবস্থানকে দৃঢ় করেছেন। এটা দুঃখের যে, এখনও আমরা তার আঁকা চিত্রকর্মের একটি প্রদর্শনী দেখার সৌভাগ্য পাইনি। ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকার তার চিত্রকর্মসমূহ সামনে এলে আমরা বহুপ্রসূ হুমায়ূনের আরও একটি রূপকে অনুধাবন করতে পারব বলে বিশ্বাস রাখি।

 লেখক : কথাশিল্পী

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may have missed

shares